-
#উক্তি
বেলি ফুলের মিষ্টি সৌরভ ছড়ানো ঘরময়। অসংখ্য ফুলের অপরূপ সজ্জাবিন্যাস। ছাদ অবধি সযতনে টাঙ্গানো ফুলে ছাওয়া চাঁদোয়া। সারা খাট জুড়ে নকশি ফুলের বাহার ঝোলানো। খাটের একপাশে মস্ত আয়নায় নববধূর বেশে আড় চোখে বারবার চেয়ে চেয়ে দেখে সাজিয়া।
বিয়ে বাড়ির কোলাহল তখনও পুরোটা থেমে যায়নি। ঘরের বাইরের ব্যস্ত চলাচল ছাপিয়ে এই বাসর ফুল রাজ্যে কেমন যেন একাকীত্বে পেয়ে বসে সাজিয়াকে। ঘরের এক কোনে রাখা ত্রিপায়ার মস্ত ফ্লাওয়ার ভাসে টকটকে গোলাপ আর মাথার উপর হালকা গতিতে ঘোরা পাখায় ভর করে কি এক অদ্ভুত ফুলেল মাদকতা বয়ে আনছে। বুক ভরে শ্বাস নেয় সাজিয়া, বেলি আার গোলাপের মিষ্টি গন্ধে মনটা যেন ভুলে যেতে বসেছে নববধূর বাসর ঘরে সে। ঘরের মাঝখানের ক্রিষ্টালের ঝাড়বাতির নরম আলোয় নিজেকে ছেলেবেলার প্রজাপতির পিছে ঘুরে বেড়ানো সময়টার মত মনে হচ্ছে। এই বুঝি প্রজাপতিটা হাত ফসকে বেরিয়ে যাবে আর সে বাগান থেকে ছিটকে কোলাহলে মিশে যাবে।
হঠাৎ দরজার মৃদু শব্দে চোখ তুলে। তাকায় সাজিয়া। মাত্র মাস দুয়েক আগে দেখতে আসা অপরিচিত সেই মানুষটি তার সামনে এখন। সেদিনই হবু শাশুড়ি অনামিকায় আংটির বাঁধন এঁকে পাকাপাকি করে ফেলেন বিয়ের দিনক্ষন। লাজমাখা দৃষ্টি বিনিময়ের ঐটুকু সম্বল করে এই মানুষটির সাথে তিন কবুলে আবদ্ধ হয়েছে কয়েক ঘন্টা আগে। দুরুদুরু বুকে সারাক্ষনই বেজেছে কি জানি কেমন মন মানসিকতার সাথে জোট বাঁধলো তার কল্পনাবিলাসী স্বচ্ছ সহজ মনটা। প্রথম পদক্ষেপের সবটুকু এমন মন ছোঁয়া হবে ভাবেনি এটিও।
—– তোমার পুরো নামতো সাজিয়া সুলতানা তাই না?
ভরাট কন্ঠের এমন প্রশ্নে একটু যেন হকচকিয়ে যায় সাজিয়া। চোখ না তুলে হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়ে শুধু।
আর ভাবে এ কেমন তরো প্রশ্ন। নাম জিজ্ঞেস করার ধরন যে চাকরির ইন্টাভিউ বোর্ডের মতো। বিয়ের প্রথম রাতে কত রোমান্টিকতার গল্প শুনেছে বান্ধবীদের কাছে। আর তার এতগুলো বছরের জালে বোনা স্বপ্নমাখা আলাপনগুলো প্রথম এক বাক্যেই যেন সুতো ছিড়ে যাবার উপক্রম।
গুরুজনদের কথানুযায়ী বরের পা ছুঁয়ে সালাম করার ব্যাপারটা কখন কিভাবে সম্পন্ন করবে ভেবে গলা শুকিয়ে আসছিলো।
ততক্ষনে তার স্বামী ভদ্রলোকটি পাশে এসে বসে। না, চিবুক তুলে ফিসফিসিয়ে কোন আবেগের বুলি নয়, সহজ স্বাভাবিকভাবে পকেট থেকে মলিন খামটি বের করে ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলে-
—— দীর্ঘ পাঁচটি বছর আগলে রেখেছি, আজ খুলবো বলে। যদিও স্রেফ কথার কথা। তবুও আবীর ভাইকে দেয়া কথা রেখেছি আমি। আবীর ভাই কতটুকু পেরেছে তা জানার সময় এখন।সাজিয়ার নতমুখি মনটায় তখন এলোপাথাড়ি ভাবনা। গলার কাছটায় কষ্টগুলো আছড়ে পড়ছে একটু একটু করে।
এমন নিরুত্তাপ হবে আজীবনের সংগী ভাবেনি সাজিয়া ঘুনাক্ষরেও। নববধূর নিটোল ছবির মত মুখখানা চিবুক তুলে ধরে দেখার সাধও হলো না একবার। এই বুঝি কোথাকার কোন আবীর ভাইকে স্মরণ করার সময়? তা স্মৃতি আগলে রাখার মাহেন্দ্রক্ষণ?
—— কই কিছু বলছো না যে। শিরশিরিয়ে ওঠে সাজিয়ার অশ্রুভেজা দুচোখের সাজানো পাপড়ি, অনুভব করে কোলের ওপর রাখা কারুকার্যময় হাত দু’খানা রাজীবের শক্ত হাতের মুঠোয়। রাজীব চোখে হাসি ছড়িয়ে বলে এবার,
—— অন্তত একবার তাকাও আমার চোখের দিকে। যে চাহনি দেখে তোমার মনের সবটুকুই দেখেছিলাম সেদিন আমার চাওয়ার মত করে।
চোখ তুলে সাজিয়া। সামনে ঝুঁকে পড়া রাজীবের চোখের তারায় আটকা পড়ে আবার ত্বরিতে নামিয়ে নেয় সলাজ দৃষ্টি।
আলতো করে সাজিয়ার কারুকার্যময় ওড়নাটা তুলে নেয় রাজীব। চিবুকে হাত রেখে বলে
—— সাজিয়া সাজিয়া সাজিয়া। এর চেয়ে বড় সত্যিতো আমার কাছে এ মুহূর্তে আর কিছু হতে পারেনা। অথচ এই কাগজটিতে দেখো—
খামের ভিতর থেকে এক টুকরো কাগজ মেলে ধরে রজীব সাজিয়ার চোখের সামনে। ছোট দুটি অক্ষর পড়ে ফেলে সাজিয়া অস্ফুট স্বরে, ‘মি নু’।
রজীব তখনো বলে চলেছে, আবীর ভাই হয়তো নিজেও নিশ্চিত ছিলেন না বলেই বলেছিলেন, ” অন্তত প্রথম অক্ষরটা মিলবেই।” শুধু শুধু আমাদের অপেক্ষার প্রহর গোনা কাঙ্খিত রাতে ভুয়া ভবিষ্যৎ বানী টেনে অপচয় করলাম অনেকটা সময়।
—– ভবিষ্যৎ বানী! অস্ফুট কন্ঠ আবারও সাজিয়ার।
—— ঐ যে বল্লাম ভুয়া। আমার নববধূর নামের ভবিষ্যৎ বানী। তাও আবার দু’ চার মাস আগে নয়, পাক্কা পাঁচটি বছর আগে এই খামের মুখ বন্ধ করে তিনি যা লিখেছিলেন তা আর কেউ জানতো না কি লেখা আছে।
—— অদ্ভুততো! সলাজ দৃষ্টির সবটুকুতে এখন কৌতুহলি দৃষ্টি সাজিয়ার।
সাজিয়ার মেহেদী আঁকা আঙ্গুলগুলোতে চোখ বুলিয়ে বলে রাজীব, —– থাক না এখন আবীর ভাই প্রসংগ এটুকুই।নিতান্তই এক ছেলেমানুষী কৌতুহল পুষেছি পাঁচটি বছর। বাসর রাতে নববধূর সামনে খামটি খুলে দেখার কথা দিয়েছিলাম, রেখেছি।কিছুক্ষন আগের লাজনম্র চাহনি, জড়ানো কন্ঠ আর দ্বিধা দ্বন্দ্বে দোলানো মন, সবকিছু ভুলে চেহারায় উজ্জ্বলতা ফুটে ওঠলো সাজিয়ার কি জানি কোন যাদুবলে।
রাজীব অবাক বিস্ময়ে শোনে সাজিয়ার হঠাৎ কন্ঠ পরিবর্তনের উচ্ছাস–
——আবীর ভাই কই? কোথায় এখন?
মেয়েলি কৌতুহল ভেবে সাজিয়ার আগ্রহে সায় দেয় রাজীব। নড়েচড়ে বসে বলতে শুরু করে আবীর ভাই উপাখ্যান। সাজিয়া সব জড়তা ভুলে রাজীবের মুখের দিকে চেয়ে থাকে নিষ্পলকেরাজীব বিস্মিত হয়, সাজিয়ার আগ্রহ ভরা চোখে চোখ রেখে। যেন কত দিনের চেনা এই দৃষ্টি। যুগ যুগ ধরে কত কথাই যেন বলা হয়ে গেছে দুজন দুজনাকে। জন্ম জন্মান্তরের চেনা এক জোড়া চোখ অধীর আগ্রহ নিয়ে তার জীবনের আর এক গল্প শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষারত সামনে।
——- কই কিছু বলছো না যে?
সাজিয়ার মৃদু কন্ঠের তাড়ায় ধৈর্য্যচ্যুতি অনুমান করে রাজীব বলতে শুরু করে—–
——তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার্থী আমি। মেসে থাকতাম। আাশে পাশের দু’চার রুমের সিনিয়র ভাইদের সাথে বেশ সদ্ভাব হয়ে যায়। এমনি একজন ছিলেন আবীর ভাই। এম এ পরীক্ষা শেষ করে বিভিন্ন চাকরীর ইন্টারভিউ দিতেন আর তিন / চারটে টিউশনি করতেন। আমার পড়াশোনার ব্যাপারে কখনও সহযোগীতা চাইলে নিরাশ করেন নি।খুব স্নেহ করতেন উনি আমাকে। আরও একটা ব্যাপারে উনার খুব ভক্ত ছিলাম আমি। খুব সুন্দর বাচনভংগি ছিল উনার। যে কেউ একবার কথার শুরুতে উপস্হিত থাকলে, শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরে যেত পারতো না। আকর্ষনীয় লাগতো উনার মুখের বর্ননায় যে কোন সাধারন ঘটনাও। রসিকতার ছলে এক একদিন এক একজনকে টার্গেট করে ভবিষ্যদ্বানী আওড়াতেন। কখনও কোনটা কাকতালীয় ভাবে মিলেও যেত। আমি প্রায়ই ইয়ার্কিচ্ছলে বলতাম, আবীর ভাই আমার ভবিষ্যদ্বানী করেন না একটা।
হেসে বলতেন —– সময় হলে ঠিক বলে দেব।
এক সময় পরীক্ষা শেষ করে বেডিংপত্র বেঁধে দেশের বাড়িতে চলে আসার সময়ও হলো। দেখা করতে গিয়ে বল্লাম–
—– আবীর ভাই দোআ করবেন। আপনার কথা ভুলবো না কখনই।
নিজের পাশে বসিয়ে মাথায় হাত রেখে সস্নেহে বল্লেন,
——একটা ভবিষ্যদ্বানী চাইছিলি না?
চটপট বল্লাম,
——বলেনতো কোন ডিভিশন পাবো?
—— যেমন পরীক্ষা দিয়েছিস, তেমনি পাবি।
—— এটা কোন ভবিষ্যদ্বানী হলো না আবীর ভাই।উনি কিছু না বলে ড্রয়ার থেকে এক টুকরো কাগজে খসখস করে কি যেন লিখে খামে পুরলেন। তারপর মুখবন্ধ করে আমার হাতে দিয়ে বললেন,
—– এটা রাখ রাজীব। লেখাপড়া শেষ করে যখন বিয়ে করবি, ঠিক বাসর রাতে নববধূর সামনে খামটা খুলবি। তোর বৌএর নাম লিখে দিলাম এতে, শুধু মিলিয়ে নিবি। তারপর একটু থেমে বললেন, যদি হুবহু নাও মিলে তবে প্রথম অক্ষরটা মিলবেই। তবে কথা দে, বাসর রাতের আগে খুলবি না যেন কৌতুহলি হয়ে।
সেদিনের একেতো কৌতুহলি মন, তদুপুরি আবীর ভাইয়ের স্নেহাধিক্যের দৌর্বল্য। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে সেই যে সার্টিফিকেটের ফাইলে খামটি রেখেছি আর খুলিনি কখনো।
প্রথম প্রথম অবশ্য খামটা নেড়ে চেড়ে দেখতাম, কেমন যেন একটা অনুভুতি জাগতো। ভার্সিটিতে পড়ার সময় কোন মেয়েকে ভাল লাগলেই মনে হতো এর নামটি বুঝি আবীর ভাই লিখে রেখেছেন মুখবন্ধ ঐ খামটিতে। তারপর একসময় জীবনের বাস্তবতায় পেপারকাটিং, দরখাস্ত, ইন্টারভিউ, চাকরী, ট্রেনিং, পোষ্টিং একের পর এক ছুটোছুটিতে ভুলেও গিয়েছি।
হঠাৎ সেদিন মায়ের সাথে তোমাকে দেখতে গিয়ে যখন মা আমার মত নিয়ে দিনক্ষন পাকা করে ফেল্লেন, অনেকদিন পর খামটি কৌতুহলি করে তুলেছিলো হঠাৎ কয়েকটি মুহূর্ত। পরক্ষনে আর দুটো মাসের জন্য কথা খেলাপ করবো ভেবে স্বাভাবিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি আবীর ভাই খামটির ভিতর ‘ সাজিয়া’ লিখেছেন অবশ্যই। উনার ভালোবাসা কিংবা যে কোন কারনেই হোক, গাঢ় একটা বিশ্বাস যেন গেঁথে বসেছিল মনে। ওখানে সাজিয়া ছাড়া আর কিছু লেখা থাকতে পারে না। অথচ কেমন ঠক খেলাম দেখলেতো।অপলক চোখে এতক্ষন সব শুনছিলো সাজিয়া। এবার বললো–
—-একটু ভুল ছিল শুধু তোমার ভাবনায়, তাই হয়তো এটুকু তোমার পাওনা ছিল।রাজীব বিস্ময়াভিভুত হয়ে সাজিয়ার কথা বলার ধরন দেখছিল। নববধূর এতটুকু জড়তা ছাড়াই সাজিয়া নির্বিকার কন্ঠে, আর সহজ ভংগিতে হাসছিল কেবল।
রাজীব এবার সেই হাসির খেই ধরে বললো,
—– ঠক আবার কারো পাওনা হতে পারে নাকি। এতো আবীর ভাইয়ের ভুয়া বানী। আরতো সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না, কি বলো?সাজিয়া ওঠে দাঁড়ায়। মাথায় শাড়ির আঁচল টেনে নীচু কন্ঠে বলে-
—- এমন চমকপ্রদ একটা কাকতালীয় ব্যাপার যে, আজকের পরিবেশটাই কেমন পাল্টে গিয়েছে।অবস্হানটাই প্রায় ভুলতে বসেছিলাম এতক্ষন।
মুখে স্মিত হাসি ফুটিয়ে বললো সাজিয়া—– একটু দাঁড়াবে?
পা ছুঁয়ে সালাম শেষে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বুকে টেনে নেয় রাজীব সাজিয়াকে।
আবেগ জড়ানো কন্ঠে বলে—– কি দোআ করবো
বলোতো?কি চাই তোমার?
সাজিয়া নিজেকে সবটুকু সঁপে দিয়ে বুকের মাঝখানে মুখ রেখে বলে—- সারাটা জীবন তোমার মিনুকে এমনি আগলে রেখো।
রাজীব হেসে বলে –
—ওরে দুষ্টু মেয়ে, ওসব চলবে না। আমার পাঁচ বছরের লালন করা অজানা মুখবন্ধ খামটি নিয়ে ফাজলামু হচ্ছে?মাথা তুলে রাজীবের চোখে চোখ রেখে হাসে সাজিয়া-
——মোটেও না।পরম শ্রদ্ধেয় আবীর ভাই তার স্নেহের রাজীবকে নিয়ে ফাজলামু করতে দিতে পারেন না। আমার জীবনসংগী কোন ভুলেরও স্বীকার হতে পারে না। তুমি পাঁচ বছর ধরে মনের অজান্তে লালন করা মিনুকেই পেয়েছো।রাজীব থ’ হয়ে তাকায় সজিয়ার কথায়। কোনমতে বলে,
—– মা……. নে???
—- মানে অতি সহজ। অতি প্রাকৃত এই ঘটনাটি আমার নাম নিয়েই। আমার ডাক নাম মিনু। পারিবারিকভাবে এ নামেই আমাকে ডাকে সবাই।
**************
ফাহমিদা রিআ
**************4 Comments
Friends
Fahmida Akter
@fahmida420
র. জামিল
@r-jamil
Diponkor Sharma Partho
@parthodip218
মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল
@ashraful710
Tapan Debbarma
@tanu48
Rahnuma Nira
@tamannahtasneem90
Nahian Hasan
@hasan009
Zahidul Jamy
@zahidul
AdabenTatali
@adabentatali


শুভেচ্ছা