-
শিরোনাম: রক্তে লেখা স্বপ্ন
ধরণ: ছোটগল্পরংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামের ছোট্ট কাঁচা ঘরটিতে জন্মেছিল আবু সাঈদ। দরিদ্রতার সাথে লড়াই ছিল তার প্রতিদিনের সঙ্গী। নয় ভাইবোনের ভিড়ে সে ছিল সবার ছোট, কিন্তু বাবা-মায়ের চোখে সে-ই ছিল সবচেয়ে বড় আশা। মকবুল হোসেন দিনের পর দিন পরিশ্রম করতেন, আর মনোয়ারা বেগম সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন বুনতেন—“আমার ছেলেটা একদিন মানুষ হবে।”
সাঈদ ছোট থেকেই অন্যরকম ছিল। অভাব তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। কুয়াশা ভেজা ভোরে, কিংবা কুপির আলোয় রাত জেগে সে পড়াশোনা করত। তার চোখে ছিল একটাই স্বপ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, মানুষ হবে, নিজের পরিবারকে বদলে দেবে।
অবশেষে সেই স্বপ্ন সত্যি হলো। নিজের মেধা আর পরিশ্রমে সে ভর্তি হলো রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। সেদিন তার মায়ের চোখে জল ছিল, কিন্তু সেটা ছিল আনন্দের জল।
কিন্তু সাঈদ শুধু নিজের জন্য বাঁচতে শেখেনি। তার ভেতরে ছিল অন্যরকম আগুন—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস। দেশের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে লাগল। মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছিল, বাকস্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছিল। অন্যায়ভাবে কোটা পদ্ধতির আড়ালে মেধাবীদের বঞ্চিত করা হচ্ছিল।
একদিন সে বলেছিল,
“মা, আমি শুধু নিজের জন্য পড়াশোনা করলে হবে না। দেশের জন্যও কিছু করতে হবে।”
তারপর শুরু হলো আন্দোলন।
সারা বাংলার ছাত্রসমাজ রাস্তায় নেমে এল। স্লোগানে মুখর হয়ে উঠল রাজপথ—
“মেধা না কোটা? মেধা! মেধা!”
“গোলামি না আজাদি? আজাদি! আজাদি!”
১৬ই জুলাই। আকাশটা যেন অদ্ভুত ভারী ছিল। চারদিকে ১৪৪ ধারা জারি। কিন্তু সাঈদের চোখে কোনো ভয় ছিল না। সে জানত, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা মানেই অন্যায়কে শক্তিশালী করা।
সেদিন সে মিছিলে সামনে ছিল। তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, চোখে ছিল আগুন।
হঠাৎ চারদিক অস্থির হয়ে উঠল। টিয়ার গ্যাস, জলকামান, লাঠিচার্জ—সবকিছু যেন একসাথে নেমে এলো। তারপর গুলির শব্দ। মনে হলো—ফিরে এসেছি সেই ’৭১-এর ভয়াল দিনে,
রক্তে ভেজা ইতিহাস যেন আবার চোখের সামনে।
পার্থক্য শুধু একটাই—তখন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের পাক হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুরতা,
আর আজ, নিজের দেশের স্বৈরাচারী সরকারের নিষ্ঠুরতা।
মানুষ ছুটছে, পড়ে যাচ্ছে। চিৎকারে ভরে উঠল চারপাশ।
কিন্তু সাঈদ পিছু হটেনি।
সে দাঁড়িয়ে রইল সামনে, বুক চিতিয়ে।
এক মুহূর্ত…
একটা গুলি ছুটে এলো।
তার বুক ভেদ করে গেল।
সে ধীরে ধীরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার চোখে তখনো স্বপ্ন—একটা ন্যায়ভিত্তিক দেশ, একটা মুক্ত ভবিষ্যৎ।
তার রক্তে ভিজে গেল রাজপথ।
সেই রক্তই যেন আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে। মানুষের মধ্যে নতুন করে জেগে উঠল প্রতিবাদের শক্তি। আন্দোলন থামেনি—বরং আরও প্রবল হয়েছে।
আবু সাঈদ আর ফিরে আসেনি।
কিন্তু তার স্বপ্ন বেঁচে রইল।
তার রক্তে লেখা হলো এক নতুন ইতিহাস—
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ইতিহাস,
ত্যাগের ইতিহাস,
স্বপ্নের ইতিহাস।
দ্বিতীয় স্বাধীনতার স্বাদ।
আজও বাবনপুর গ্রামের সেই কাঁচা ঘরটিতে বাতাস বইলে মনে হয়, কেউ যেন ফিসফিস করে বলে—
“আমি হারাইনি… আমি বেঁচে আছি, তোমাদের সাহসে, তোমাদের প্রতিবাদে…”3 Comments-
আপনার এই ছোটগল্পটি কেবল একটি রচনা নয়, বরং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের এক জীবন্ত এবং রক্তক্ষয়ী দলিল। আবু সাঈদ আজ আর কেবল একটি নাম নয়, তিনি একটি স্ফুলিঙ্গ—যিনি নিজের বুক চিতিয়ে দিয়ে গোটা জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দিয়েছিলেন। আপনার লেখনীতে সেই বীরত্ব এবং ট্র্যাজেডি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে ফুটে উঠেছে।
Friends
এস এম সজিবুল ইসলাম
@shojib-rumman
Aziza Mahbub Siddique
@aziza-mahbub-siddique
Syed Farah
@syedfarah
ইভান
@ivan
মামুনুর রশিদ
@mamun01722525933gmail-com
আহমেদ আরভিন
@sweetsohely
মোঃ আবু মুনিফ আল মুকিম।
@munifalmukimrocky
অনুভূতির ডাইরি
@onuvutir-dairi
Abcde gh.
@abcdegh


একটি সত্য ঘটনাকে সাহিত্যের ভাষায় এভাবে ধারণ করা কেবল লেখার দক্ষতা নয়, এটি দায়িত্ববোধও! লেখককে গভীর শ্রদ্ধা!