-
জীবন জুড়ে যুদ্ধ
সত্তুর সালের শুরুতে আব্বা আমাকে কেপিএম স্কুলের উল্টোদিকের পাহাড়ের উপরের শিশু স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। কিন্তু তিন/ চার দিনের বেশি গেছি বলে মনে পড়ে না।
খুব উঁচু আর খাড়া সিড়ি ভেঙে উঠতে উঠতে কাঁদতাম।
এটুকু মনে আছে, স্কুলটা ছিল টিনের আর সামনে মিনারের মতো একটা স্থাপত্য ছিল।
ঐ সময়টায় চন্দ্রঘোনায় খুব মিছিল মিটিং লেগে থাকতো। বিহারী-বাঙালির হাঙ্গামাও হয় কয়েকবার।
বাবা রাজনীতি সচেতন ছিলেন। সত্তুরের নির্বাচনে নৌকায় জালভোট দিয়ে এসে আম্মার সঙ্গে বাগাড়ম্বরতা করেছেন বহুদিন।
আমাদের বাসা কলাবাগান এম্পলয়েজ ক্লাবের ঠিক উল্টোদিকে হওয়ায় ঐ বয়সেই অনেক মিটিং মিছিল দেখেছি।
কর্ণফুলির কাগজ ছিল তৎকালীন স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। চন্দ্রঘোনার কাগজ বার্জে করে করাচিতে গিয়ে সিল মেরে আবার তা পূর্ব বাংলায় বেশি দামে বেচা হতো। এই বৈসম্যের কথা বঙ্গবন্ধুর ভাষণেও উঠে এসেছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম থেকে আসা তখনকার শ্রমিক নেতারা আমাদের বাসায় এসে বসেছেন কখনো কখনো। মাকে দেখছি, কেটলি ভরে চা আর ট্রে ভরে বেলাবিস্কুট দিতে।
বিহারী-বাঙালি দাঙ্গায় দেখেছি, একজনকে স্কুটারের পিছে বেঁধে হেচড়াতে হেচড়াতে আমাদের বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
বহু সন্ধ্যায় মশাল মিছিল দেখেছি এমপ্লয়েজ ক্লাবের সামনে।
ঐ সময় মিলের মাইকে উর্দু গানের বদলে বাংলা গান বাজতে শুনেছি।
আব্বা তখন এসিড প্লান্টের ইনচার্জ। একদিন দেখি, দলবলসহ এসে বারান্দায় অনেকগুলো বাল্ব এনে কালো মুখ ভেঙ্গে সেগুলোতে গ্যালন থেকে এসিড ভরে সাজিয়ে রাখছে। মা জানায়, পাঞ্জাবিরা এলে ছুড়ে মারবে; আর ওরা ভয়ে পালাবে।
মার্চের আগেই চন্দ্রঘোনায় মুক্তিফৌজ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। রোমেল, আলহাজ, শাহ আলম, শাহজাহান, শেখ মতিদের মাথায় লালপট্টি বেঁধে কলোনিতে ঘুরতে দেখেছি।
ওরা রাস্তার পাশে বড় বড় গাছের গুড়ি ফেলে রাখে; পাঞ্জাবিরা এলে যেগুলো দিয়ে বেরিকেড দেওয়া হবে।
যুদ্ধ শুরুর আগেই সিনেমা হলের নিচের বারঘোনা কলোনির ৫ এবং ৬ নম্বর লাইনের মাঝামাঝি রাস্তার পাশে বাংকার খুঁড়ে রাখা হয়।
যুদ্ধের বহুপরও ঐ বাংকারে আমরা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলেছি।
মার্চের শেষে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে কয়েকদিনের মধ্যে কোয়ার্টারগুলো ফাঁকা হয়ে যায়।
ইসহাক চাচা, শাজাহান ভাই, রোজী আপার আব্বা লতিফ চাচা এক সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় এসে আব্বাকে কোয়ার্টার ছেড়ে চলে যেতে বলে।
আমরা বরিশাইল্যা। অমন দুর্যোগের দিনে দূরগ্রামে কীকরে যাবো! মা হতাশায় পড়ে যায়।
সাব্যস্ত হয়, আপাতত বাবার কলিগ রাঙ্গুনিয়ার তৈয়ব চাচার বাড়িতে গিয়ে উঠবো।
পরদিন সকালবেলায় প্রিয় চন্দ্রঘোনা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি।
আমরা ছোট ছোট চার ভাই-বোন। শহীদ মার কোলে।
হাটতে হাটতে আমাদের পা ব্যাথা হয়ে যায়।
*চলবে…15 Comments
Friends
মো. আবু মোহাদ্দেস
@mohaddesh1967
Kishor Kanok
@kishorkanok-2
Shahajahan Tapu
@shahajahantapu
জুলহাজ আলী জীবন
@julhaj
গোলাম রাব্বানী
@rabbi-2
Reazul Kabir
@reazul-kabir
পিপীলিকা
@abujubair
আজহারুল ইসলাম তালহা
@ajharul
Rashed Rahman Abir
@rashed-rahman-abir



nice.