Profile Photo

অভিমানী মনOffline

  • ovimanimon
  • Profile picture of অভিমানী মন

    অভিমানী মন

    4 years, 4 months ago

    জীবীকা

    আবু মিয়ার সঙ্গে আবার দেখা হয় ডেমরা থানার মোড়ে। গলায় মাফলার পেঁচিয়ে লোকজনের ভিড়ে ঘুরঘুর করতেছিলো। ফুটপাতের দোকানে বসিয়ে জোর করে চা খাওয়ায়। কুশল জানতে চাইলে মিষ্টি হেসে বলে—মাশাল্লা, ভালো আছি স্যার। বহুত শান্তিতে আছি…।
    এতদিন দেখি নাই যে! গ্রামের বাড়িতে গেছিলা নাকি?
    আবু আক্ষেপ করে—গেরামের বাড়ি! হাসাইলেন স্যার। গেরাম আছে, বাড়ি নাই।
    তাইলে কী দুবাই, সিঙ্গাপুর? তোমারতো আবার নানান লাইন।
    সেই ভাগ্য এখনো হয় নাই; তয় ইচ্ছা আছে, আল্লা চাইলে একবার ইতালি যাবো।
    এত দেশ থাকতে ইতালি কেনো?
    সোফিয়া লরেনরে দেখার বহুত শখ।
    সেতো এখন বুড়ি!
    কিযে কন স্যার, মনের মানুষের কুড়ি আর বুড়ি!
    দেড় বছরে ঢাকা শহরের কোথাও কেউ আবুকে দেখেছে, এমন প্রমান নাই। এই সময়টায় পুটির মাও কারো কাছে ধার-দেনা চাইতে আসেনি। চুরি-ছিনতাই করে ধরা পড়লে আবুকে ছুটানোর জন্য এর-ওর কাছে কত যে ধর্ণা দিতো! তবে কি লোকটা আলাদিনের চেরাগ পেয়ে গেছে! পুঁজির বিকাশের এই যুগে কার ভাগ্য কিভাবে খুলে যায় বোঝা কঠিন।
    শেষবার আবুর সাথে দেখা হয় সদরঘাটের কোর্ট-কাচারীতে। বাদামতলায় চুপচাপ বসেছিলো। এক উকিল সাহেব ওকে তলব করেছে। জানতে চেয়েছিলাম—মামলা মোকাদ্দমায় জড়িয়ে পড়েছো নাকি?
    জ্বী না, স্যার; ব্যবসা।
    উকিলের সঙ্গে ব্যবসা! আমি রহস্যের গন্ধ পাই। আবু বলে—দোয়া করবেন, স্যার। জ্ঞানী লোকের দোয়া বিফলে যায় না। এইবার লাইগা যাইবো মনে হইতাছে…।
    উকিল সাহেবের সঙ্গে ব্যবসাটায় ছক্কা-পাঞ্জা মেরে দেয় আবু। এডভোকেট প্রকাশ বলেছে—নগদ কারবার; পনের মাসে দেড় লাখ; কী রাজি?
    আবু বলেছে—পুরাটা আগাম চাই।
    এডভোকেট প্রকাশ মানুষ ভালো। বস্তির ঘরে গিয়ে গুনে গুনে আবুকে দেড় লাখ দিয়ে এসেছে। পুটির মা চক্ষু কপালে তুলে বলেছে—জাল টাকা নাতো?
    আবু বলেছে—এইবার আমারে বিদায় দে। কিন্তু সাবধান; পোলাপানে জিগাইলে কি কবি?
    কমু আপনে বিদেশ গেছেন।
    হ। টেকা নেশা জিনিস; ভালো মানুষরে পাগল বানায়। টেকা দিয়া কি করবি, ক?
    কি করুম তা আপনার শিখায়া দেওন লাগবো না। আপনে যান…।
    পনের মাস পর কেন্দ্রিয় কারাগার থেকে বেরিয়ে দুনিয়াটাকে নতুন লাগে আবু মিয়ার। পুটির মার শরীরেও হালকা মাখন লাগছে। স্কুটারে চড়িয়ে পুটির মা ওকে যেখানে নিয়ে আসে, সেখানে আগে আসেনি। কাঁচা গলির মাথায় এসে স্কুটার আর যায় না। আবু বলে—কই লয়া আইলা!
    তোমার বাড়িতে।
    এই বিলের মধ্যে!
    দেড় লাখ টেকায় বিলের মধ্যে হইবো না তো হাউজিং প্লটে হইবো!
    আবু যখন বদলি কয়েদ খাটে, পুটির মা তখন মিজমিজির এই জনবিরল প্রান্তরে জায়গা কিনে টিনের ঘর তোলে। টিউবয়েল বসাইছে; কিন্তু বাত্তির লাইন আনতে পারে নাই। এনজিও আপাদের পরামর্শে ঘরের নামায় সব্জিক্ষেত আর মুর্গির ফার্ম করেছে। সব দেখে ভালো লাগে আবুর। ও বলে—তয় জায়গাডা বড় নির্জন।
    পুটির মা ঝংকার দেয়—এই যে জোগাইছি, শুকরিয়া করেন । আপনে থাকলেতো টেকাগুলা পানিতে ফালাইতেন।
    জেলে থাকতে দিনে ঘুম আর রাতে জাগার অভ্যাস করে নিয়েছে আবু। সন্ধ্যার পর তাই হাটতে হাটতে বড় রাস্তার মোড়ে এসে টং দোকানে আড্ডা দেয়। নতুন জমিদারকে সবাই সমিহ দেখায়। এলাকায় বিদ্যুৎ আনা নিয়ে আলোচনা করে। তারপর বাসে চড়ে ডেমরার মোড়ে এসে নামে।
    এই মোড়টা রাতভর লোকারণ্যই থাকে। আমাকে পেয়ে ওর কথা শেষ হয় না। মিজমিজির নতুন বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার আবদার জানায়।‘ যাবো একদিন’ বলে আমি রিক্সায় উঠে গেলে আবু ফুটপাতে নেমে এসে ভাবচ্চক্কর নিয়ে সিগারেট ধরিয়ে একজনের কাছে জানতে চায়—শপুর মা আইছে?
    হ। ওইতো; ঝিলমিলা শাড়ি পইড়া ঘুরতাছে।
    শপুর মা কয়েকজন উটকো লোককে বুক দেখাচ্ছিলো আর পানোয়ালা ছোকরার সাথে খিস্তি করছিলো। হন্তদন্ত হয়ে হেটে যাওয়া একজনকে পাছা দিয়ে ঠেলা মারে খপ করে হাতটা ধতে ফেলে চিৎকার জুড়ে দেয়—ঐ মাঙ্গের পো, অসভ্য বেডা কোথাকার; তোর ঘরে মা-বইন নাই! মাইয়া মানুষ দেখলে মাথায় মাল উইঠা যায়…। লোকটা হাতজোড় করে অনুনয়-বিনয় করে—স্যরি বোন, খেয়াল করিনি…।
    মুহুর্তে ভিড় জমে গেলে মওকা বুঝে আবু মিয়া হাজির হয়। শপুর মা বলে—দেখেন হাবিলদার সাব, আন্ধারে পাইয়া এই বেডায় আমার গায়ে হাত দিছে…।
    আবু বাঁজখাই গলায় বলে ওঠে—ওই মিয়ারা, এখানে কি সার্কাস চলতাছে! ভিড় ছাড়ো..। লোকটা আবুকে অনুসরণ করে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলে—স্যার, আমি ওনার গায়ে হাত দি নাই…।
    আবু হাসে—পুরুষ মানুষের হাত কখন যে কোনদিকে যায়..। কিছু টাকা ছাড়েন। তারপর কুইক কাইটা পড়েন…।
    রাত দশটা পেরিয়ে যায়। চৌরাস্তায় লোকজন কমতে শুরু করে। চক্রের সদস্যদের টাকা ভাগ করে দিয়ে শুক্কুরের দোকানে চা-টা খেয়ে চেনা হকারের কাছ থেকে এক হালি আনারস কেনে আবু।
    পুটির কদিন ধরে জ্বর। আনারস হইলো জ্বরের টনিক। ফুটপাতের মেছোপট্টিতে রুই মাছের ভাগা দেখে দুই ভাগা নিয়ে নেয়। মনে মনে বলে—এতরাতে মাছ দেখে পুটির মা রাগারাগি করবে নাতো? করুক গিয়া; মাইয়া আমার রুই মাছ খুব খায়।

    23
    13 Comments
Skip to toolbar