<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?>
<rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>তুলট | বিষণ্ন সুমন | Activity</title>
	<link>https://toulot.com/n_members/logolabbd/activity/</link>
	<atom:link href="https://toulot.com/n_members/logolabbd/activity/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<description>Activity feed for বিষণ্ন সুমন.</description>
	<lastBuildDate>Wed, 21 Oct 2026 15:31:19 +0600</lastBuildDate>
	<generator>https://buddypress.org/?v=</generator>
	<language>en-US</language>
	<ttl>30</ttl>
	<sy:updatePeriod>hourly</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>2</sy:updateFrequency>
	
						<item>
				<guid isPermaLink="false">47ad0949187cc1991cedeace0913b80c</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় চৌদ্দ)
মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নির্মাণস্থলে বিস্ফোরণের পর কয়েকটা দিন যেন অস্বাভাবিক ধীর গতিতে কাটল। পাহাড়ের বুকের যে জায়গাটায় কয়েক সপ্তাহ আগেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেশিনের শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন বেশিরভাগ সময় জুড়ে থাকে এক ধরনের ভারী নীরবতা। ধ্বংস হয়ে যাওয়া কাঠামোর ওপর বৃষ্টির পানি জমে আছে, কোথাও ভাঙা কংক্রিটের ফাঁক দিয়ে আগাছা মাথা তুলতে শুরু করেছে, কোথাও লোহার রড বাঁকা হয়ে আকাশের দিকে উঠে আছে। 

একসময় যেখানে শ্রমিকদের আনাগোনা ছিল, সেখানে এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে কাঠের টুকরো, ছেঁড়া দড়ি, ভাঙা বাঁশ আর নির্মাণসামগ্রীর অবশিষ্টাংশ। দূরের পাহাড়গুলো অবশ্য এসবের কিছুই জানে না। ভোর হলে মেঘ এসে তাদের কাঁধে বসে। দুপুরে সূর্যের আলো সবুজ ঢাল বেয়ে নেমে আসে। বিকেলে আবার পাহাড়ের গায়ে ছায়া দীর্ঘ হতে থাকে। নিচের ছড়ার পানি নিজের নিয়মে বয়ে যায়। বাঁশঝাড় বাতাসে দোলে, পাখিরা আগের মতোই ডাকে। মানুষের তৈরি একটা স্বপ্ন ভেঙে গুড়ো হয়ে পড়ে আছে, যদিও তাতে পাহাড়ের জীবনে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

পরিবর্তন ঘটেছে শুধু মানুষের মনে। শ্রমিকেরা আর আগের মতো এখানে ফিরে আসতে চাইছিল না। প্রথমদিকে কোম্পানি তাদের বাড়তি মজুরি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। থাকার ব্যবস্থা উন্নত করার কথা বলেছিল। রাতে পাহারার জন্য আরও লোক আনা হয়েছিল। কয়েকটা শক্তিশালী আলো বসানো হয়েছিল নির্মাণস্থলের চারপাশে। এমনকি পাহাড়ের বাইরে থেকে নতুন নিরাপত্তাকর্মী আনার কথাও উঠেছিল। কিন্তু মানুষের ভয়কে হিসাবের খাতায় লেখা যায় না। যে লোক একবার অন্ধকার পাহাড়ের মধ্যে নিজের চোখের সামনে অস্বাভাবিক ঘটনা দেখেছে, তাকে শুধু বেশি টাকা দিয়ে আবার সেই জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া সহজ কাজ নয়।

কেউ সরাসরি বলত না যে তারা রেজোয়ানকে ভয় পায়। তারা বলত, পাহাড়টা নিরাপদ নয়। রাতে থাকার ব্যবস্থা ভালো নয়। নয়তো বলত, পরিবারে সমস্যা হয়েছে তাই আসতে পারবেনা।

কেউ আবার কোনো কারণই দেখাত না। সকালে মজুরি নিয়ে চলে যেত, তারপর আর ফিরত না। নতুন লোক আনা হলো। তারাও কয়েকদিন কাজ করে চলে গেল।

ফলে নির্মাণকাজ ধীরে ধীরে এমন জায়গায় এসে দাঁড়াল, যেখানে মেশিন ছিল, নির্মাণসামগ্রী ছিল, টাকা ছিল, কিন্তু কাজ করার মতো মানুষ ছিল না।

কোম্পানির হিসাবরক্ষকের কাছে প্রতিদিনের হিসাব ক্রমশঃ ভয়ংকর হয়ে উঠছিল। মেশিন বসিয়ে রাখার খরচ, নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন, পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানোর খরচ, নির্মাণসামগ্রী নষ্ট হওয়া, নতুন শ্রমিক আনার খরচ, আগের কাঠামো সরিয়ে আবার নতুন করে কাজ শুরু করার সম্ভাব্য ব্যয়, সবকিছু একসঙ্গে যোগ করলে সংখ্যাটা দ্রুত ফেঁপে উঠছিল। অথচ বিনিময়ে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় শূন্য।

সবচেয়ে বিপজ্জনক ছিল অনিশ্চয়তা। আবার যদি কাঠামো তোলাও হয়, তারপর আবারও যদি রাতের অন্ধকারে কিছু ঘটে? 

আবার যদি শ্রমিকেরা চলে যায়? আবার যদি টাকা ঢেলে কাজ শুরু করার পর আরেকটা ধ্বংস নেমে আসে?

কোম্পানির মালিক নিজের অফিসে বসে এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ঢাকার অফিসে তখনও সবকিছু বাইরে থেকে স্বাভাবিক। কাচের দেয়াল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর, পালিশ করা টেবিল, কম্পিউটারের পর্দায় প্রকল্পের নকশা, দেয়ালে পাহাড়ের সুন্দর ছবি। ছবিতে খাগড়াছড়ির পাহাড় ছিল অপরূপ। সবুজ ঢাল, নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাঠের কটেজ। সেই ছবির দিকে তাকালে মনে হতো, প্রকল্পটা যেন ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে।

কিন্তু ছবির বাইরে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে পড়ে আছে ভাঙা কংক্রিট। আর তার ওপরে বসে বসে তা দিচ্ছে অকপট অনিশ্চয়তা।

একদিন বিকেলে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে মালিকের দীর্ঘ ফোনালাপ হলো। এতদিন পর্যন্ত তিনিই ছিলেন মালিকের সবচেয়ে বড় ভরসা। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার সময়, স্থানীয় লোকজন সামলানোর সময়, জমি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব কাজে লাগানো হয়েছিল। কিন্তু এবার তার কণ্ঠেও আগের সেই দৃঢ়তা নেই।

মালিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আপনি তো বলেছিলেন ব্যাপারটা সামলে ফেলবেন।”

ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর উত্তর এল, “চেষ্টা তো করছি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি একটু অন্যরকম।”

মালিক জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। “অন্যরকম মানে?”

“লোকজন ভয় পাচ্ছে। আপনার লোকজনও। আর এত টাকা খরচ হওয়ার পরেও যদি কাজ না এগোয়, তাহলে আমিও আর কতদূর যেতে পারি?”

মালিক আর কিছু বললেন না। ফোন রেখে তিনি অনেকক্ষণ চেয়ারে বসে রইলেন।

এতদিন পর্যন্ত তিনি সমস্যাটাকে একজন জেদি জমির মালিকের সমস্যা হিসেবে দেখেছিলেন। ভেবেছিলেন, কয়েকজন লোক পাঠানো হবে, প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলা হবে, একটু চাপ সৃষ্টি করা হবে, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। পরে যখন রেজোয়ান প্রকাশ্যে বাধা দিল, তখনও তিনি ভেবেছিলেন, দুটো ধমক, কয়েকজন লোক আর কিছু টাকা এই সমস্যার সমাধান করে দেবে।

তারপর পাহাড় তাকে অন্য হিসাব শিখিয়েছে। রেজোয়ানকে ভয় দেখানো যায়নি। লোক বাড়িয়েও লাভ হয়নি। পাহারা বাড়িয়েও কাজ হয়নি। বরং প্রতিটি নতুন ব্যবস্থা নতুন করে খরচ বাড়িয়েছে।

আর রেজোয়ান? সে যেন এসবের কোথাও নেই।

দিনের বেলায় তাকে প্রায় দেখাই যায় না। শহরে তার গাড়ি দেখা যায়। কখনো মাউন্ট ইন-এ আবার কখনো খাগড়াছড়ির পরিচিত কিছু মানুষের সঙ্গে বসে চা খেতে দেখা যায়। কিন্তু রিসোর্টের লোকেরা তাকে খুঁজতে গেলে এমনভাবে অদৃশ্য হয়ে যায় যে মনে হয়, লোকটা যেন পাহাড়ের সঙ্গে মিশে গেছে।

কোম্পানির লোকেরা কয়েকবার তাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছে। কেউ তাকে হারিয়েছে শহরের ভিড়ে। কেউ পাহাড়ি রাস্তায়। 

কেউ আবার এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখান থেকে সামনে-পেছনে শুধু গাছ আর পাহাড় দেখা যায়। 

রেজোয়ান যেন ইচ্ছা করেই তাদের কিছু বুঝতে দেয়নি। কিন্তু আসল কথাটা ছিল আরও সহজ। সে অপেক্ষা করছিল। কারণ যুদ্ধ জিততে সবসময় গুলি চালাতে হয় না।

কখনো কখনো প্রতিপক্ষকে নিজের হিসাবের ওজনের ভারেই ভেঙে পড়তে দিতে হয়।

রেজোয়ানের এই চিন্তাটা তার দীর্ঘ সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে। সে জানত, পাহাড়ে কোনো বাহিনীকে পরাজিত করার জন্য সবসময় তার সৈন্যসংখ্যার চেয়ে বেশি সৈন্য প্রয়োজন হয় না। কখনো শুধু তাকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হয়, যেখানে তার শক্তি আর কোনো কাজে আসে না। মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের ক্ষেত্রেও সে ঠিক সেটাই করেছে। মানুষকে সে একে একে সরিয়ে দেয়নি, তাদের মনে এমন একটা প্রশ্ন তৈরি করেছে, যার উত্তর তারা নিজেরাই খুঁজে নিয়েছে এবং সেই অনুযায়ী কাজও করেছে।

এই পাহাড়ে রাতে থাকা নিরাপদ কি না। উত্তরটা তারা নিজেরাই পেয়েছে।

কয়েকদিন পর কোম্পানির হিসাবরক্ষক নতুন হিসাব নিয়ে মালিকের সামনে বসেছিল। মোটা ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখার সময় তার হাতের ভঙ্গিতেই স্পষ্ট ক্লান্তি বোঝা যাচ্ছিল। গত কয়েক সপ্তাহের খরচ এক জায়গায় এনে হিসাব করা হয়েছে। নির্মাণ বন্ধ থাকার ক্ষতি, অতিরিক্ত নিরাপত্তা, শ্রমিক পরিবর্তন, নতুন লোক আনা, ভেঙে যাওয়া কাঠামো সরানো, নতুন করে নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয়, সবকিছু।

মালিক ধীরে ধীরে পাতাগুলো উল্টাতে লাগলেন। সংখ্যাগুলো বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রকল্পটা লাভজনক রাখাই কঠিন হয়ে পড়ছে।

“আর যদি কাজ শুরু করি?” 

হিসাবরক্ষক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তাহলে নতুন খরচ শুরু হবে।”

“কত?”

সে একটা সংখ্যা বলল। 

মালিকের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “আর যদি আবার সমস্যা হয়?”

হিসাবরক্ষক এবার কোনো উত্তর দিল না। তার নীরবতাই যথেষ্ট ছিল।

মালিক ফাইলটা বন্ধ করে দিলেন। ঘরের ভেতর কয়েক মুহূর্ত কোনো শব্দ হলো না।

বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। কাচের দেয়ালের ওপারে ঢাকার আকাশে সূর্যের শেষ আলো নিভে যাচ্ছে। নিচে গাড়ির সারি, রাস্তার আলো, মানুষের ভিড়। এত বড় শহরের মধ্যে বসেও তার মনে হচ্ছিল, সে যেন দূরের কোনো পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখোমুখি খাগড়াছড়ির সেই পাহাড়। সেই ভাঙা কাঠামো। আর সেই মানুষটা। কর্ণেল রেজোয়ান।

পরদিন বোর্ডের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকলেন তিনি। বৈঠক দীর্ঘ হলো।

প্রকল্পের নকশা সামনে রাখা হলো। বিনিয়োগের হিসাব দেখা হলো। জমির বর্তমান অবস্থা নিয়ে রিপোর্ট পড়া হলো। স্থানীয় পরিস্থিতির কথা উঠল। নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলো। আইনগত ঝুঁকির কথাও উঠল। একসময় বোর্ডের একজন সরাসরি বললেন, এই প্রকল্পে আরও টাকা ঢালা মানে অনিশ্চিত ঝুঁকির পেছনে নিশ্চিত অর্থ ব্যয় করা।

আরেকজন বললেন, জমিটা ছেড়ে দিলে ইতিমধ্যে খরচ হওয়া অর্থের একটা অংশ হয়তো উদ্ধার করা যাবে। 

কথাটা শুনে মালিক মাথা তুললেন। কয়েক মুহূর্ত কারও দিকে তাকালেন না। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “রেজোয়ানের জমি ছেড়ে দিতে হবে?”

বোর্ডরুমে নীরবতা নেমে এল। একজন সদস্য বললেন, “এখনকার হিসাবে সেটাই সবচেয়ে বাস্তব সিদ্ধান্ত।” 

মালিক জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার সামনে কাগজে আঁকা একটা রিসোর্টের ছবি। সুন্দর পাহাড়। কাঠের কটেজ। সবুজের মধ্যে পথ। একটা স্বপ্ন। যে স্বপ্নের জন্য তারা অন্যের জমিতে ঢুকেছিল।

আর সেই স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল, যার বিরুদ্ধে তারা এখনো কোনো শক্ত প্রমাণ দাঁড় করাতে পারেনি। 

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্ট রেজোয়ানের জমি ছেড়ে দেবে।

বৈঠক শেষ হওয়ার পর সবাই একে একে বেরিয়ে গেল। মালিক একা বসে রইলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি উঠে জানালার কাছে গেলেন। শহরের আলো তখন একে একে জ্বলে উঠেছে। কিন্তু তার চোখের সামনে ঢাকার কোনো দৃশ্য ছিল না। 

তিনি যেন দেখতে পাচ্ছিলেন খাগড়াছড়ির পাহাড়। কুয়াশায় ঢাকা ঢাল। ঘন বাঁশঝাড়। দূরে বয়ে যাওয়া ছড়া। আর পাহাড়ের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা তার অসমাপ্ত স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপ।

মালিক দীর্ঘক্ষণ সেই কল্পিত দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব ধীরে চোখ নামালেন।

যে মানুষটাকে কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি একজন জেদি অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল ছাড়া আর কিছু মনে করেননি, সেই মানুষটাই শেষ পর্যন্ত তাকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে পিছিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথই খোলা রইলো না।

তার পরদিনই খাগড়াছড়িতে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের পাহাড়ি প্রকল্প থেকে লোকজন সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়ে গেল বলা চলে একেবারে নীরবে। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি, কোনো মিটিংও হয়নি। শ্রমিকদের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ বলেনি যে প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ পাহাড়ের মানুষ খবর বুঝতে কাগজ পড়ে না। তারা অবস্থার পরিবর্তন দেখে নিজেরাই খবর বুঝে নেয়। 

একদিন যে জায়গায় সকাল থেকে মেশিনের গর্জন শোনা যেত, সেখানে মেশিনগুলো একে একে নীরব হয়ে গেল। যে পথে সারাদিন ট্রাক উঠানামা করত, সেই পথে এখন মাঝে মাঝে একটা করে গাড়ি চলে যেতে দেখা গেল। বাঁশের শেডের সামনে পড়ে থাকা জ্বালানির ড্রাম কমতে লাগল। কাঠের স্তূপ ছোট হতে লাগল। লোহার পাইপগুলো এক এক করে ট্রাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। পাহাড়ের গায়ে কাটা মাটির লালচে দাগগুলো অবশ্য তখনো স্পষ্ট। কিন্তু মানুষের পদচারণা কমে যাওয়ায় অরণ্য যেন ধীরে ধীরে নিজের পুরনো চেহারা ফিরে পেতে শুরু করল।

রেজোয়ান সবকিছু দেখছিল দূর থেকে। তার মাঝে কোনোরকম তাড়াহুড়ো নেই। কোনো বিজয়ের উল্লাসও নেই।

সকালের দিকে কখনো সে নিজের করিমের বাড়ির বারান্দায় বসে চা খেত। তার সামনে পাহাড়ের ঢাল, ওপরে সাদা মেঘের ভেলা, নিচে সরু ছড়া দৃশ্যমান হতো। তখন চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠত। বাঁশঝাড়ে বাতাস লাগলে পাতাগুলো একসঙ্গে সরে যেত। দূরের কোনো পাহাড়ি বাড়ি থেকে মোরগের ডাক ভেসে আসত। সে সব ছাড়িয়ে কখনো কখনো তার চোখ মাঝেমধ্যে চলে যেত রিসোর্টের দিকের পাহাড়ে। 

সে জানত, এই লড়াই প্রায় শেষ। তবু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে কোনো কিছু নিজ থেকে ভেবে নিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে চাইছিল না।

সামরিক জীবনে একটা শিক্ষা সে কখনো ভুলে যায়নি, কোনো অবস্থাকেই সব শেষ বলে ধরে নেওয়া যায় না, যতক্ষণ না শেষ মানুষটিও সরে যায়। তাই  সে অপেক্ষা করল।

দিন গেল। আরও দুটো ট্রাক নিচে নেমে গেল। তারপর নির্মাণসামগ্রী বোঝাই একটা বড় গাড়ি। তারপর নিরাপত্তার লোকজন।

অস্থায়ী শেডের টিন খুলে ফেলা হলো। বাঁশের খুঁটি একে একে মাটি থেকে তুলে নেওয়া হলো। কোথাও পড়ে রইল ছেঁড়া দড়ি, কোথাও ভাঙা কাঠ, কোথাও শ্রমিকদের ফেলে যাওয়া ছোটখাটো জিনিস। কয়েকদিন আগেও জায়গাটা যেন মানুষের দখলে ছিল, এখন সেখানে মানুষের উপস্থিতির চিহ্নগুলোও দ্রুত মুছে যাচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত সেই দিনটাও এল। বিকেলের আলো তখন পাহাড়ের পশ্চিম ঢালে হেলে পড়েছে। বর্ষার পরের আকাশ পরিষ্কার, কিন্তু দূরের পাহাড়ের মাথায় হালকা মেঘ জমে আছে। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ। নিচের ছড়ার পানি পাথরে ধাক্কা খেয়ে ক্ষীণ শব্দ করছে। রেজোয়ান নিজের জমির ধারেই একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল।

দূরে একটা গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল। সে তাকাল। রিসোর্টের শেষ গাড়ি। ধীরে ধীরে নতুন কাটা রাস্তা ধরে নিচের দিকে নামছে। গাড়িটা একটা বাঁক ঘুরে কিছুক্ষণ দেখা গেল, তারপর পাহাড়ের আড়ালে চলে গেল।

রেজোয়ান অনেকক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের জমির দিকে এগিয়ে গেল। কিছুদিন আগেও যেখানে মানুষের কণ্ঠ, মেশিনের শব্দ আর গাড়ির আওয়াজে চারপাশ মুখর ছিল, সেখানে এখন আবার অরণ্যের নিজস্ব শব্দ ফিরে এসেছে। ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। পাতার ভেতর অদৃশ্য কোনো পাখি নড়াচড়া করছে। দূরের পাহাড় থেকে ভেসে আসছে অচেনা একটা পাখির ডাক। 

বাতাসে কাটা গাছের তীব্র গন্ধ এখন অনেকটাই কমে এসেছে। ভেজা মাটির ওপর নতুন ঘাসের সরু ডগা দেখা যাচ্ছে। যেখানে মেশিনের দাঁত পাহাড়ের বুক চিড়ে ফেলেছিল, সেখানেও প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে ক্ষত ঢাকার কাজ শুরু করেছে।

রেজোয়ান নিচু হয়ে দাঁড়াল। তার সামনে মাটি। এই মাটির জন্যই এত ঝামেলা। সে ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসল। ডান হাত বাড়িয়ে মাটির ওপর রাখল। ভেজা মাটি আঙুলের ফাঁকে ঢুকে গেল। এক মুঠো মাটি তুলে নিল সে। কিছুক্ষণ হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুঠোটা একটু শক্ত করল।

এই জমিটা সে কিনেছিল বহু বছর আগে। তখন এখানে শুধু পাহাড় ছিল। ছিল শুধু অরণ্য আর নীরবতা। সে এই নীরবতাটাই চেয়েছিল। শেষ প্রহরে সেই নিরবতাটাই আবার ফিরে এসেছে। 

রেজোয়ান উঠে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো বিজয়ীর হাসি নেই। কারণ তার কাছে এটা জয় নয়। এটা শুধু নিজের জিনিস আবারও নিজের কাছে ফিরে পাওয়া।
(শেষ)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/277800/</link>
				<pubDate>Thu, 24 Sep 2026 03:31:35 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় চৌদ্দ)<br />
মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নির্মাণস্থলে বিস্ফোরণের পর কয়েকটা দিন যেন অস্বাভাবিক ধীর গতিতে কাটল। পাহাড়ের বুকের যে জায়গাটায় কয়েক সপ্তাহ আগেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেশিনের শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন বেশিরভাগ সময় জুড়ে থাকে এক ধরনের ভারী নীরবতা। ধ্বংস হয়ে যাওয়া কাঠামোর ওপর বৃষ্টির পানি জমে আছে, কোথাও ভাঙা কংক্রি&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-277800"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/277800/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">3fc3df1969ea8d9b8d177d9fc4988e9b</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় তেরো)
পরদিন সকাল থেকে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নির্মাণস্থলে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা দেখা গেল। আগের রাতের ঘটনার পরও কোম্পানি কাজ বন্ধ রাখেনি, বরং যেন আরও মরিয়া হয়ে উঠেছে। সকালবেলার কুয়াশা পুরোপুরি কাটার আগেই মেশিনের শব্দ পাহাড়ের বুক কাঁপাতে শুরু করল। এক্সকাভেটরের লোহার দাঁত লালচে পাহাড়ি মাটির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। ট্রাক একের পর এক উঠে আসছে। শ্রমিকেরা মাথায় ঝুড়ি নিয়ে এদিক ওদিক ছুটছে। দূরের পাহাড়ের ঢালে তখনো সাদা মেঘের টুকরো ঝুলে আছে। কোথাও জুমের পুরনো জমিতে নতুন সবুজ ঘাস উঠেছে। আবার কোথাও বাঁশঝাড়ের মাথা সকালের বাতাসে দুলছে। নিচের ছড়ায় রাতের পানি এখনো দ্রুত বয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির সেই শান্ত দৃশ্যের মাঝখানে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের জায়গাটা যেন এক টুকরো অশান্তির দ্বীপ হয়ে জ্বলছে।

রেজোয়ান দূর থেকে সব দেখছিল। তার হাতে কোনো দূরবীন ছিল না। অবশ্য তার প্রয়োজনও হয়নি।

খালি চোখেই সে বুঝতে পারছিল, কোম্পানি আগের চেয়ে দ্রুত কাজ করছে। মূল কাঠামোর যে অংশটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে, সেটার চারপাশে নতুন করে লোক বসানো হয়েছে। পাহারাও বেড়েছে। দিনের বেলায় কয়েকজন লোক নির্মাণস্থলের আশপাশে ঘুরছে। সন্ধ্যার পর আলোর সংখ্যা বাড়ছে। মেশিন, নির্মাণসামগ্রী, শ্রমিক, পাহারা, সব মিলিয়ে কোম্পানি যেন জায়গাটাকে একটা ছোট খাটো দুর্গ বানানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

রেজোয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। কিন্তু তার মাথার ভেতর হিসাব ঠিকই চলছে।

সে জানে, এই অবস্থায় মানুষের সঙ্গে আরও লড়াই করে লাভ নেই। একজনকে সরালে আরেকজন আসবে। একজন পাহারাদার চলে গেলে নতুন দশজন পাওয়া যাবে। টাকা দিয়ে ভয় ঢেকে রাখা যায় কিছুদিন।

কিন্তু সময় এমন একটা জিনিস যা টাকা দিয়ে ফেরানো যায় না। প্রতিদিন যে হারে সময় নষ্ট হচ্ছে, তার একটা দাম আছে। আর এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটা সেখানেই।

সেদিন দুপুরে রেজোয়ান একা বসেছিল তার পুরনো পরিচিত করিমের বাড়ির পেছনের বারান্দায়। সামনে পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে নিচের দিকে। বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে দূরের আকাশ দেখা যায়। একটা পুরনো কাঠের টেবিলের ওপর চায়ের কাপ পড়ে আছে। পাশের গাছ থেকে শুকনো পাতা মাঝে মাঝে মাটিতে পড়ছে। দূরে কোনো পাহাড়ি বাড়ি থেকে ভেসে আসছে মুরগির ডাক। তার কিছুক্ষণ পর একটা মোটরসাইকেলের শব্দ পাহাড়ি রাস্তা ধরে উঠে এসে আবার মিলিয়ে গেল।

রেজোয়ান চুপ করে বসে ছিল। তার সামনে আর কোনো পরিকল্পনা নেই। কেননা, তার এক প্রকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে।

তার সামরিক জীবনের একটা পুরনো শিক্ষা সে ভুলে যায়নি। যে জায়গায় সরাসরি আঘাত করে লাভ নেই, সেখানে কাঠামোর দুর্বল জায়গাটা খুঁজতে হয়।

আর মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের দুর্বল জায়গা মানুষ নয়। তার নির্মাণাধীন কাঠামো।

পরবর্তী দুই দিন রেজোয়ান কোনো তাড়াহুড়ো করল না। বরং আগের চেয়েও স্বাভাবিক হয়ে গেল। দিনের বেলায় তাকে কখনো শহরে দেখা গেল। কখনো নিজের গাড়ি নিয়ে মাউন্ট ইন-এ ঢুকতে দেখা গেল। সন্ধ্যার পর সে কোথায় থাকে, সেটা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারল না। এমনকি যারা তার ওপর নজর রাখছিল, তারাও বুঝতে পারল না আসলে কখন সে পাহাড়ের দিকে যায়।

এই সময়টায় রেজোয়ান আরেকটা কাজ করল। নিজের পুরনো কানেকশনের একটা দরজায় কড়া নাড়লো। অতীতে সামরিক জীবনে সে বহু জায়গায় কাজ করেছে। বহু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। অবসর নেওয়ার পর সেই সম্পর্কগুলোর বেশিরভাগই ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে গেছে। তাই প্রয়োজন হলে একটা ফোন এখনও অনেক দূরের দরজা খুলে দিতে পারে। রেজোয়ান নিজের হাতে কোনো বিস্ফোরক তৈরি করার মতো ঝুঁকি নিল না। তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এমন এক পুরনো কানেকশনের মাধ্যমে সংগ্রহ করল।

কীভাবে জিনিসটা তার হাতে এল, সেটা রেজোয়ান কাউকে বলার প্রযোজন মনে করলো না। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেটার দরকারও ছিল না।

তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত হয়েই সে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার হাতে যা এসেছে এটা দিয়ে মানুষের ক্ষতি করার জন্য নয়, বরং নির্মাণাধীন কাঠামোর নির্দিষ্ট অংশ অচল করার মতো কাজ করা সম্ভব। 

রেজোয়ানের পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সময়। রাতে সেখানে মানুষ থাকবে না, এটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সে আসলে কিছুই করবে না।

সেদিন সন্ধ্যা থেকে সে পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় তার অবস্থান বদলাতে লাগল। দূর থেকে নির্মাণস্থলের আলো দেখল। শ্রমিকেরা কখন শেডে ফিরছে দেখল। পাহারাদারদের টহলের ধরন দেখল। কোথায় আলো জ্বলছে, কোথায় অন্ধকার ঘন, কোন সময় মেশিনের শব্দ থেমে যায়, সবকিছু তার মাথায় সেট হতে লাগল।

রাত বাড়তে থাকল। খাগড়াছড়ির পাহাড় তখন অন্য এক পৃথিবী। দিনের সবুজ আর অন্ধকারের সবুজ এক নয়। দিনের বেলায় পাহাড়ের ঢালে গাছ আলাদা করে দেখা যায়। বাঁশঝাড় আলাদা করে বোঝা যায়। ছড়ার পানি চোখে পড়ে। কিন্তু রাতে সবকিছু একটা বিশাল কালো শরীরে মিশে যায়। বাতাস গাছের পাতার ভেতর দিয়ে গেলে মনে হয় অরণ্যের গভীর থেকে কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে। দূরের পাহাড়ে কোনো অচেনা পাখি ডাকলে সেই শব্দ অনেক দূর গিয়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। ছড়ার পানি পাথরে আঘাত করে একটানা শব্দ তুলতে থাকে। কোথাও শুকনো পাতার ওপর ছোট কোনো প্রাণী ছুটে গেলেও মুহূর্তের জন্য শব্দ হয়। তারপর আবার নীরবতা।

সেই নীরবতার মধ্যে রেজোয়ান দাঁড়িয়ে ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সে জানত, রাত যত গভীর হবে, মানুষের সতর্কতা তত কমবে। 

একসময় রিসোর্টের শেষ আলোটাও নিভে গেল। শ্রমিকদের শেড অন্ধকার। কাজের জায়গা ফাঁকা। শুধু কয়েকটা নিরাপত্তা বাতি জ্বলছে। দুজন পাহারাদার দূরে হাঁটছে। তারপর তারাও অন্যদিকে চলে গেল।

রেজোয়ান অপেক্ষা করল। আরও কিছুক্ষণ। তারপর অন্ধকারের মধ্যে সে  নড়ে উঠলো। 

তার চলাফেরায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই। শরীর নিচু। পা মাটিতে পড়ছে হিসাব করে। কোনো শুকনো ডাল এড়িয়ে যাচ্ছে। কোথাও ভেজা মাটিতে পা রাখছে। একটা জায়গায় থেমে চারপাশ এর শব্দ শুনল। তারপর আবার এগোল।

এই মানুষটাকে দিনের আলোয় দেখলে কেউ ভাবতেই পারত না, সে একসময় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমান্ডো ছিল। কিন্তু তার শরীর এখনো সেই প্রশিক্ষণের কথা মনে রেখেছে।

কয়েক মিনিট পর সে নির্মাণাধীন কাঠামোর কাছে পৌঁছাল। চারপাশে তাকাল। কেউ নেই। রেজোয়ান নিজের সঙ্গে আনা ব্যাগ থেকে ছোট ব্লক আকারের কয়েকটা জিনিস বের করল, যা দেখতে অনেকটা সাবানের মতো। এটি ছিল কমান্ডোদের জনপ্রিয় সি-ফোর বিস্ফোরক। ওজন বড় জোর ১ পাউন্ডের মত। বিস্ফোরকগুলোকে টাইম বোমায় রূপান্তর করতে কলমের মতো ছোট একটি প্লাস্টিক টিউব জুড়ে দিল, যা ছিল মূলতঃ একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র ডিজিটাল টাইমার ডিভাইস, যাকে মিলিটারিতে ফায়ারিং ডিভাইস বা টাইম ফিউজ বলা হতো। এর সাথে যুক্ত করলো আধুনিক ডিজিটাল টাইমার এবং প্রতিটাতেই একটা নির্দিষ্ট টাইম সেট করে দিল। 

তারপর শুরু করলো বেছে বেছে বেশ ক’টি পিলারে সেগুলো ফীট করার কাজ। প্রতিটি মুহূর্তে তার চোখ ছিল সময়ের দিকে এবং কান সজাগ ছিল চারপাশের প্রতিটা শব্দে। সে জানত, এখানে এক মুহূর্তের ভুল মানে শুধু তার নিজের বিপদ নয়, নিরপরাধ কারও প্রাণহানিও হতে পারে। তাই সে বারবার নিশ্চিত হলো, আশেপাশে কেউ নেই। 

তারপর এগিয়ে গেল কাঠামোর মুল অংশের কাছে, যেটাকে সে দিনের পর দিন পর্যবেক্ষণ করেছে। সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। সেট করলো সর্বশেষ বোমাটি। তারপর ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে গেল।

তার মাঝে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কোনো বিজয়ের উচ্ছ্বাস নেই। যেন সে শুধুই একজন সৈনিক, যে কিনা যুদ্ধ জেতার জন্য এই কাজ করতে বাধ্য হয়েছে।

অরণ্যের দিকে ঢোকার আগে একবার পেছনে তাকাল রেজোয়ান। নির্মাণাধীন ভবনটা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর সে গাছের আড়ালে মিলিয়ে গেল। সময় গড়িয়ে রাত প্রায় শেষ প্রহরে পৌঁছাল। পাহাড়ের ওপর তখন এমন নীরবতা, যেন পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে।

তারপর হঠাৎ...বুম! একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে পাহাড় কেঁপে উঠল। 

শব্দটা এত তীব্র ছিল যে কাছের গাছ থেকে পাখির ঝাঁক একসঙ্গে উড়ে গেল। ছড়ার পানি যেন মুহূর্তের জন্য আরও জোরে গর্জে উঠল। পাহাড়ের ঢালে প্রতিধ্বনি ছুটে গেল একটার পর একটা, বুম... বুম... বুম...!

নির্মাণস্থলের দিকে ধুলোর বিশাল মেঘ উঠল। কাঠের মাচা ভেঙে পড়ার শব্দ। লোহার রডের বিকট ঠোকাঠুকি। কংক্রিট ভাঙার গর্জন। তারপর একটা বড় অংশ ধসে পড়ল।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যে কাঠামোটা দিনের আলোয় ভবিষ্যতের একটা বড় রিসোর্টের আকার নিচ্ছিল, তার একটা অংশ পরিণত হলো ধ্বংসস্তূপে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মানুষের কোনো চিৎকার শোনা গেল না। কারণ রেজোয়ান অপেক্ষা করেছিল সেই সময়ের জন্য, যখন নির্মাণস্থলে কেউ থাকবে না বলেই সে নিশ্চিত ছিল। 

সে তো কেবল কাঠামোটাই ধ্বংস করতে চেয়েছিল। অনেক দূরে একটা পাহাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে রেজোয়ান বিস্ফোরণের আলো দেখল। তার মুখে কোনো হাসি নেই। শুধু চোখ দুটো স্থির। কিছুক্ষণ পর সে ঘুরে দাঁড়াল। পাহাড়ের অন্ধকার তাকে গিলে নিল।

ভোর হওয়ার পর মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টে বিশৃঙ্খলা শুরু হলো। শ্রমিকেরা ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে। কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না, রাতের মধ্যে এত বড় একটা অংশ কীভাবে ধসে পড়ল। কোম্পানির লোকজন চারপাশে ঘুরছে। পুলিশ এলো। তদন্ত শুরু হলো। ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করা হলো। রাতের পাহারা দেওয়া লোকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো।

কেউ কিছু দেখেনি। কেউ কাউকে ঢুকতে দেখেনি। কেউ রেজোয়ানকে সেখানে দেখেনি। তার নামও কেউ উচ্চারণ করল না। কারণ প্রমাণ নেই। শুধু সন্দেহ করে তো আর কারো নাম মুখে নেওয়া যায়না।

দুপুরের দিকে কোম্পানির মালিক ঢাকা থেকে চলে এলেন। ম্লান মুখে ধ্বংসস্তূপের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার সামনে পড়ে আছে কংক্রিট, লোহার রড, কাঠ আর ধুলোর স্তূপ। 

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে চারপাশে তাকালেন। তার চোখ গিয়ে থামল পাহাড়ের দিকে। সেই পাহাড়, যেখানে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একজন মানুষ তাকে একের পর এক শিক্ষা দিয়ে আসছে।

প্রথমে পাহারাদার। তারপর শ্রমিক। তারপর রাতের দল। এবার ভবনের কাঠামো।

লোকটা আর সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে না। কিন্তু প্রতিবারই তার উপস্থিতির চিহ্ন রেখে যাচ্ছে।

মালিকের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তিনি জানতেন, তদন্তকারীরা হয়তো প্রমাণ পাবে না। কিন্তু তার নিজের কাছে কোনো সন্দেহ নেই। এটা রেজোয়ানের কাজ।

কারণ একজন সাধারণ জমির মালিক প্রতিশোধ নিতে পারে। একজন রাগী মানুষ কিছু ভাঙচুর করতে পারে। কিন্তু এতদিন ধরে যে মানুষ প্রতিটি পদক্ষেপে সময়, জায়গা আর মানুষের দুর্বলতা বুঝে এগিয়েছে। তারপর একটা নির্মাণাধীন কাঠামোর ওপর আঘাত করে সেটাকে গুড়িয়ে দিয়েছে, তাকে আর যাই হোক রাগী মানুষের সাথে গুলিয়ে ফেলা যায় না। এই বিস্ফোরণ কখনোই কোন হটকারী সিদ্ধান্ত নয়। 

বরং এটা একটা সামরিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। মালিক ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে বললেন, “কর্ণেল, এবার বুঝলাম তুমি আসলে কী।” এই প্রথম নিজেকে তার ভুল মনে হলো।  

দূরের পাহাড় নীরব। ছড়ার পানি আগের মতোই বয়ে যাচ্ছে। বাঁশঝাড় বাতাসে দুলছে।

আর সেই পাহাড়ের কোথাও, মানুষের চোখের আড়ালে, রেজোয়ান তখন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছে। তার ভাব এমন যেন গত রাতে কোথাও কিছুই ঘটেনি। 

কিন্তু মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের মালিকের কাছে একটা বিষয় এবার পরিষ্কার হয়ে গেছে। রেজোয়ান আর তাদের প্রকল্পের বাইরে দাঁড়িয়ে নেই। সে এখন নিজের জমির ভেতরেই তার অস্থিত্ব জোরালো ভাবে তুলে ধরেছে। 
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/277396/</link>
				<pubDate>Wed, 23 Sep 2026 04:26:25 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় তেরো)<br />
পরদিন সকাল থেকে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নির্মাণস্থলে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা দেখা গেল। আগের রাতের ঘটনার পরও কোম্পানি কাজ বন্ধ রাখেনি, বরং যেন আরও মরিয়া হয়ে উঠেছে। সকালবেলার কুয়াশা পুরোপুরি কাটার আগেই মেশিনের শব্দ পাহাড়ের বুক কাঁপাতে শুরু করল। এক্সকাভেটরের লোহার দাঁত লালচে পাহাড়ি মাটির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। ট্রাক একে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-277396"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/277396/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">3ae43fa3d7aa64ac9ad7e6a772fe365c</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় বারো)
ভোর হওয়ার আগেই মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নির্মাণস্থলে যে নীরবতা নেমে এসেছিল, তার মধ্যে পরাজয়ের একটা গন্ধ জুড়ে ছিল। আগের রাতের লোকগুলো কেউ ভালো করে ঘুমায়নি। কারও হাঁটুতে ব্যান্ডেজ, কারও কপালে শুকনো রক্তের দাগ, কারও চোখে রাতভর আতঙ্কের ছবি। অথচ সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার মেশিনের শব্দ জেগে উঠল। যেন কিছুই ঘটেনি এমন একটা ভাব। দানবীয় এক্সকাভেটর পাহাড়ের বুকের ওপর লোহার দাঁত বসিয়ে মাটি কাটতে শুরু করল। ডিজেলের ধোঁয়া ভেজা সকালের বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। শ্রমিকেরা অনিচ্ছায় কাজে ফিরল। দূরের পাহাড়ের গায়ে তখনো কুয়াশার পাতলা আস্তরণ, সূর্যের আলো পুরোপুরি পৌঁছায়নি। নিচের ছড়ায় রাতের বৃষ্টির পানি একটু ফুলে উঠেছে। পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে সাদা ফেনা তুলছে। সবকিছু যেন স্বাভাবিক, শুধু স্বাভাবিকতা নেই মানুষগুলোর চোখে আর ।

ঢাকার অফিসে বসে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের মালিক আগের রাতের হিসাব শুনলেন। তার সামনে কাঁচের টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিল প্রকল্পের নকশা, খরচের হিসাব আর নির্মাণের সময়সূচি। বড় কাচের জানালার ওপারে শহরের অসংখ্য ভবন, গাড়ির সারি, ব্যস্ত রাস্তা। এখানে পাহাড়ের কোনো গন্ধ নেই, নেই ছড়ার শব্দ, নেই বাঁশঝাড়ের অন্ধকার। তবু তার মাথার মধ্যে তখন বারবার ফিরে আসছিল সেই খালি কাঠের খুঁটিটা, যেখানে এক রাত আগেও কোম্পানির ফলক ঝুলছিল। একজন মানুষকে খুঁজতে পাহাড়ে এতগুলো লোক পাঠানো হয়েছিল। অথচ তারা ফিরে এসেছে আহত হয়ে। আর সেই মানুষটি তাদের চোখ এড়িয়ে নির্মাণস্থলের একেবারে সামনে এসে কীভাবে ফলক সরিয়ে নিয়ে গেল, কারও কাছেই তার কোনো উত্তর নেই।

কিছুক্ষণ পর তিনি প্রজেক্ট ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বললেন। “শুনুন, কোন মতেই কাজ বন্ধ থাকবে না। যেভাবেই হোক কাজ চালু রাখুন।”

কথাটা খুব সহজভাবে বলা হয়েছিল। কিন্তু কথার পেছনে যে চাপ ছিল, সেটা ম্যানেজার ঠিকই বুঝেছিল।

মালিক জানেন, এখন পিছিয়ে আসার অর্থ শুধু একজন জমির মালিকের কাছে হার মানা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিমধ্যে খরচ হয়ে যাওয়া বিপুল টাকা, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, অংশীদারদের প্রত্যাশা এবং সবচেয়ে বড় কথা, তার নিজের অহংকার। তিনি মনে করেন, একটা অবসরপ্রাপ্ত মানুষকে কেন্দ্র করে এত বড় একটা প্রকল্প থেমে থাকতে পারে না। পৃথিবীর কোনো ব্যবসায়িক হিসাবেই এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

কিন্তু পাহাড়ের হিসাব আলাদা। সেখানে টাকা দিয়ে সবকিছু কেনা যায় না। আর রেজোয়ান সেটা খুব ভালো করেই জানে বলেই সেই মোতাবেক কাজ করে চলেছে।

সেদিন দুপুরে তাকে দেখা গেল খাগড়াছড়ি শহরের একটি চায়ের দোকানের সমানের বেঞ্চিতে বসে থাকতে। চারপাশে সাধারণ মানুষের ভিড়। পাহাড়ি ফলের ছোট দোকান। কোন দোকান বাঁশের তৈরি নানা জিনিস দিয়ে। মোটরসাইকেলের শব্দ, রিকশার ঘণ্টা, দূরের বাজারের কোলাহল, সব মিলিয়ে শহরের সর্বত্রই স্বাভাবিক ব্যস্ততা। রেজোয়ানের পরনে সাদামাটা শার্ট আর গাঢ় রঙের প্যান্ট। হাতে চায়ের কাপ। দেখে মনে হয়, অবসর নেওয়া কোনো মানুষ নিজের মতো করে সময় কাটাচ্ছেন।

কেউ বুঝতে পারল না, তার চোখ মাঝে মাঝে রাস্তার ওপারে গিয়ে থেমে যাচ্ছে। আসলে সে গত রাতের প্রতিটি ঘটনা মনে মনে সাজাচ্ছে আর ভাবছে। কে কোন দিক থেকে এসেছিল। কারা পথ চিনত। কারা চিনত না। কোথায় তারা দল ভেঙেছিল। কোথায় অন্ধকার তাদের বিরুদ্ধে গিয়েছিল। আর কোথায় তারা নিজেদের ভয়েই ভুল করেছিল। সব তার মাথায় হিসেব মত বসে যাচ্ছে।

রেজোয়ান জানে, শত্রুকে হারানোর সবচেয়ে সহজ উপায় সবসময় তাকে আঘাত করা নয়। অনেক সময় তাকে নিজের শক্তিটাই ফিরিয়ে দিয়ে তাকে ভুল করতে বাধ্য করাটাই যথেষ্ট।

কোম্পানির সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের লোকবল নয়। তাদের টাকা। সময়। আর নির্মাণযন্ত্র। সবশেষে তাদের পরিকল্পনা। আর সেই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জমিটা। জমি ছাড়া পুরো প্রকল্পের নকশাই অসম্পূর্ণ।

এই চিন্তাটা মাথায় আসতেই রেজোয়ান চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ধীরে দূরে পার্ক করা নিজের গাড়ির দিকে হাঁটা দিল।

সেদিন বিকেলে সে আবার পাহাড়ের দিকে গেল। খাগড়াছড়ির বিকেল তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। বর্ষার পরের পাহাড় সবুজের অসংখ্য ছায়ায় ভরা। কাছের ঢালে বুনো কলাগাছের বড় বড় পাতা বাতাসে কাঁপছে। কোথাও বাঁশঝাড় এত ঘন যে ভেতরটা দিনের আলোতেও অন্ধকার। পাহাড়ের গায়ে পুরনো জুমের জমির দাগ, তার পাশে নতুন জন্ম নেওয়া ঘাস। দূরে নীলচে পাহাড়ের সারি, তার ফাঁক দিয়ে সাদা মেঘের দল ভেসে যাচ্ছে। কোনো কোনো ঢালে ছোট পাহাড়ি বাড়ি, টিনের চালের ওপর রোদ পড়ে ঝিলিক দিচ্ছে। কোথাও কাঠের ধোঁয়া সোজা উঠে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। নিচের উপত্যকায় সরু রাস্তা সাপের মতো বেঁকে গেছে। মাঝে মাঝে একটা মোটরসাইকেল সেই পথে ছোট্ট কালো বিন্দুর মতো চলে যাচ্ছে।

রেজোয়ান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখল। এই পাহাড় তার কাছে এখন আর শুধু নিজের জমি নয়। এটা একটা জীবন্ত মাইন, যে কারো সামান্য ভুলে ফাঁটার অপেক্ষায়।

দিনে একরকম দেখায়। আবার রাতে মনে হয় আরেকরকম। বৃষ্টির পরে একরকম ভাব নেয়। পরক্ষণে বৃষ্টির শুকনো দিনে অন্যরকম আচরন করে। 

আর যে মানুষ এই পরিবর্তনগুলো পড়তে পারে, বুঝতে পারে, তার কাছে পরবর্তী করণীয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও সহজ হয়।

সন্ধ্যা নামার আগেই রেজোয়ান নিজের পরিচিত আশ্রয়ে ফিরে গেল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার বের হলো। তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই, কোনো ব্যাগ নেই। শুধু একটা ছোট টর্চ, সেটাও সে প্রয়োজনে শেষ মুহূর্তের আগ পর্যন্ত ব্যবহার করবে না।

রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের চেহারা বদলে গেল। দূরের বাড়িগুলোর আলো একে একে নিভে গেল। রিসোর্টের নির্মাণস্থলে কয়েকটা শক্তিশালী বাতি জ্বলছে। সেই আলো পাহাড়ের ঢালের ওপর একটা কৃত্রিম উজ্জ্বলতা তৈরি করেছে। আলো যেখানে শেষ হয়েছে, তার পরেই অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 

কাছের বাঁশঝাড়ে বাতাস ঢুকে শুকনো বাঁশগুলোকে একে অপরের সঙ্গে ঘষে দিচ্ছে। ছড়ার পানির শব্দ এখন দিনের চেয়ে পরিষ্কার। মাঝে মাঝে কোনো নিশাচর পাখি হঠাৎ ডেকে উঠছে, তারপর অনেক দূরের পাহাড় থেকে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি ফিরে আসছে। ভেজা পাতার ওপর শিশির জমেছে। মাটিতে পা ফেললে কোথাও নরম শব্দ হচ্ছে। কোথাও আবার শুকনো পাতা মচমচ আওয়াজ তুলছে।

রেজোয়ান কোনো অস্বাভাবিক শব্দ না করে অত্যন্ত ধীরে এগিয়ে চলল। একসময় সে এমন একটা জায়গায় পৌঁছাল, যেখান থেকে পুরো নির্মাণস্থলের একটা বড় অংশ দেখা যায়। নিচে বিশাল জায়গা পরিষ্কার করা হয়েছে। মাঝখানে ভবনের মূল কাঠামোর জন্য লোহার রড উঠে এসেছে। কয়েকটা জায়গায় কংক্রিটের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। পাশে পড়ে আছে ইট, বালু, পাথর, কাঠ আর লোহার সামগ্রী। একটা বড় মেশিন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে, দিনের পরিশ্রমের পর যেন ক্লান্ত কোনো জন্তুর মতো। কয়েকটা অস্থায়ী আলোয় শ্রমিকদের শেড দেখা যাচ্ছে। বাতাসে ডিজেল আর ভেজা মাটির গন্ধ।

রেজোয়ান অনেকক্ষণ নড়ল না। তার চোখ এবার পুরো জায়গাটাকে দেখছিল। সেই সাথে সামরিক মানচিত্রের মতো করে প্রতিটা ইঞ্চি ইঞ্চি জায়গা মাপছিল। একজন অভিজ্ঞ কমান্ডোর মতো, সে বুঝতে চাইছে কোন জিনিস কোথায় আছে, কোন অংশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কোন কাজ এখনো অসম্পূর্ণ, আর কোন জায়গার ওপর পুরো প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

তার চোখ ধীরে ধীরে নির্মাণাধীন মূল কাঠামোর ওপর স্থির হলো। কিছুক্ষণ পর মুখের রেখা আরও শক্ত হয়ে উঠল।

এতদিন সে পাহারাদারদের সঙ্গে লড়েছে। তাদের ভয় দেখিয়েছে। তাদের বুঝিয়েছে, রাতের পাহাড়ে তারা নিরাপদ নয়। কিন্তু তাতে প্রকল্প থামেনি। শুধু গতি কমেছে। 

এবার তাকে এমন কিছু করতে হবে, যার প্রভাব শুধু একজন পাহারাদারের ওপর পড়বে না। 

রেজোয়ান নিচু হয়ে মাটির একটা শুকনো ডাল তুলে নিল। আঙুলের মধ্যে একবার ঘুরিয়ে আবার ফেলে দিল।

তার চোখ তখনো কাঠামোর ওপর। তারপর ধীরে ধীরে চারপাশের অন্ধকারের দিকে তাকাল। উপরে পাহাড়। নিচে ছড়া। ডানে ঘন বাঁশঝাড়। বাঁয়ে কাটা ঢাল।

আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মানুষের তৈরি সেই কাঠামো, যা কিনা তার নিজের জমির ওপর তৈরি হওয়ার কথা ছিল না।

রেজোয়ানের মুখে এবার কোনো রাগ নেই। শুধু সিদ্ধান্ত। সে জানে, সামনে যে পথটা বেছে নেবে, তার পর থেকে এই লড়াই আর আগের জায়গায় থাকবে না। 

এতদিন মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্ট তাকে একজন বিরক্তিকর জমির মালিক হিসেবে দেখেছে। এরপর থেকে তাকে তারা অন্য চোখে দেখতে বাধ্য হবে। 

রেজোয়ান শেষবারের মতো নির্মাণাধীন কাঠামোটার দিকে তাকাল। তারপর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। পেছনে রয়ে গেল পাহাড়ের বাতাস, ছড়ার একটানা শব্দ আর দূরের নির্মাণস্থলের আলো। 

পরবর্তী আঘাত আর মানুষের ওপর নয়। এবার লক্ষ্য হবে প্রকল্প নিজেই।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/276904/</link>
				<pubDate>Tue, 22 Sep 2026 04:11:09 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় বারো)<br />
ভোর হওয়ার আগেই মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নির্মাণস্থলে যে নীরবতা নেমে এসেছিল, তার মধ্যে পরাজয়ের একটা গন্ধ জুড়ে ছিল। আগের রাতের লোকগুলো কেউ ভালো করে ঘুমায়নি। কারও হাঁটুতে ব্যান্ডেজ, কারও কপালে শুকনো রক্তের দাগ, কারও চোখে রাতভর আতঙ্কের ছবি। অথচ সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার মেশিনের শব্দ জেগে উঠল। যেন কিছুই ঘ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-276904"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/276904/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">85ac2b594878fb7e16df92843101835f</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় এগারো)
বিকেলের শেষ দিকে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নতুন কাটা রাস্তা দিয়ে একটার পর একটা গাড়ি উঠতে দেখে শ্রমিকদের অনেকেই কাজ থামিয়ে তাকিয়েছিল। প্রথমে একটা কালো মাইক্রোবাস, তার পেছনে দুটো পিকআপ, সবশেষে আরেকটা জিপ। গাড়িগুলোর গায়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নেই, ভেতরে বসে থাকা লোকগুলোকেও নির্মাণকাজের মানুষ বলে মনে হলো না। বেশিরভাগের বয়স তিরিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে, শরীর শক্তপোক্ত, পোশাক সাধারণ, কিন্তু চোখের চাহনি এবং গাড়ি থেকে নেমেই চারপাশ দেখার ধরন আলাদা। কারও হাতে মোটা বাঁশের লাঠি, কারও কোমরে শক্ত টর্চ, কয়েকজনের পিঠে ছোট ব্যাগ। তারা এসেছে কাজ করতে নয়, সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হলো না। খবরটা শ্রমিকদের শেডে পৌঁছাতে সময় লাগল না। কোম্পানি এবার বাইরে থেকে লোক এনেছে। উদ্দেশ্য একটাই, রাতের পাহাড়ে যে মানুষটা তাদের প্রকল্পকে ধীরে ধীরে অচল করে দিচ্ছে, তাকে খুঁজে বের করা।

রিসোর্টের মালিক শেষ পর্যন্ত হিসাবের খাতার কাছে হার মেনেছেন। প্রথম দিকে ব্যাপারটা তার কাছে একজন জমির মালিকের জেদ ছাড়া আর কিছু ছিল না। তারপর কয়েকজন পাহারাদার আহত হলো, শ্রমিক চলে গেল, নতুন শ্রমিক আনতে হলো, নিরাপত্তা খরচ বাড়ল, মেশিন দিনের পর দিন অলস দাঁড়িয়ে রইল। এখন প্রতিটি নষ্ট দিন মানে টাকা। অনেক টাকা। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আর ভয় দেখিয়ে বা অপেক্ষা করে লাভ নেই। রেজোয়ানকে খুঁজে বের করতে হবে, ধরে সামনে আনতে হবে, তারপর এমনভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে যেন এই পাহাড়ের আশপাশে সে আর না আসে।

তারা আসলে ভুল করেছিল। তারা জানলই না যাকে খুঁজতে এতগুলো মানুষ পাহাড়ে এসেছে, সেই মানুষটি তখন তাদের চেয়ে অনেক ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। 

রেজোয়ান আসলে তাদেরই দেখছিল। সে ছিল পশ্চিমের একটা ঢালে, যেখানে কয়েক বছর আগে জুমচাষ হয়েছিল। এখন জায়গাটা আবার ঝোপ আর বুনো ঘাসে ঢেকে গেছে। সামনে ছড়িয়ে থাকা খাগড়াছড়ির পাহাড়গুলো বিকেলের নরম আলোয় একটার পেছনে আরেকটা ভিন্ন ভিন্ন স্তরের মতো দেখা যাচ্ছে। কাছের পাহাড় গাঢ় সবুজ, তার পরেরটা একটু নীলচে। আরও দূরের পাহাড় ধোঁয়ার মতো ফিকে। নিচে বাঁশঝাড়ের মাথা বাতাসে দুলছে। একটা সরু ছড়া পাহাড়ের গা ঘেঁষে নেমে গেছে। পানির শব্দ এত ওপর থেকেও শোনা যায়। দূরে কোথাও ছোট পাহাড়ি পাড়ার কয়েকটা টিনের চাল রোদের শেষ আলোয় চকচক করছে। বাতাসে দিনের গরম কমে এসেছে। ভেজা মাটি আর কচি বাঁশপাতার গন্ধের সঙ্গে কোথা থেকে রান্নার ধোঁয়ার হালকা গন্ধ ভেসে আসছে।

রেজোয়ান নিচের গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। একবার। দুবার। বেশ ক’বার। তারপর আর তাকানোর প্রয়োজন মনে করলো না।

সতেরোজন। গাড়িচালক বাদ দিলে মাঠে নামতে পারে চৌদ্দ থেকে পনেরোজন। তার ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটা হাসির রেখা ঝিলিক দিয়ে আবার মিলিয়ে গেল।

বহু বছর আগে এ ধরনের সংখ্যা দেখলে তার মাথায় প্রথম যে প্রশ্নটা আসত, আজও সেটাই এল। ওরা কতজন, সেটা আসল ব্যপার নয়। ওরা কীভাবে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে যাবে, সেটাই আসল।

রেজোয়ানের চোখ আবার নিচে নামল। 

লোকগুলোকে একজন নির্দেশ দিচ্ছে। বাকিরা শুনছে। অর্থাৎ দলনেতা একজন। দুজন এলাকার লোক, বোঝা যায় তাদের চলাফেরায়, তারা বারবার পাহাড়ের বিভিন্ন দিক দেখিয়ে কিছু বোঝাচ্ছে। বাকিরা জায়গাটা চেনে না।

এটাই প্রথম সুবিধা। দ্বিতীয় সুবিধা, রাত নামছে। তৃতীয় সুবিধা, তারা জানে শিকার একজন।

রেজোয়ান ধীরে ধীরে পেছনে সরে গেল। তার চলার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। পঞ্চাশ পেরিয়ে যাওয়া শরীর, কিন্তু এখনও তাকে দেখলে বয়স অনুমান করা কঠিন। ছয় ফুটের কাছাকাছি দীর্ঘ দেহ, চওড়া কাঁধ, মেদহীন কোমর, ধূসর হয়ে আসা ছোট চুল। দিনের আলোয় মুখে বয়সের রেখাগুলো স্পষ্ট বোঝা যায়, কিন্তু শরীরের চলনে বয়সের সেই হিসাব মেলে না। দীর্ঘ সামরিক জীবন তার শরীরে শুধু শক্তি তৈরি করেনি, তৈরি করেছে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবল ইচ্ছে শক্তি। কোথায় পা ফেলতে হবে, কতটা নিচু হতে হবে, কখন শরীরের ওজন সামনের পায়ে নিতে হবে, কখন থেমে যেতে হবে, এসব তাকে এখন আর ভেবে করতে হয় না।

অভিজ্ঞতা আর শরীরের গভীরে ঢুকে যাওয়া বহু বছরের অভ্যাস। আর রাতের অন্ধকারে সে ছিল সবসময়ই সেরা। সে কারণেই এই দক্ষতার জন্যই সহযোদ্ধাদের মধ্যে তার একটা নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। নাইট উলফ, যে কিনা অন্ধকারে শত্রুকে খুঁজে বেড়ায় না। ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করে। এক সময় শত্রুই তার কাছে আসে। আজ অনেক বছর পর সেই পুরনো নামটাই আবার তার ভেতর মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।  

সূর্য ডুবে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর প্রথম দলটা বের হলো। তারা পাঁচজন।

সামনে একজন স্থানীয় লোক। তার হাতে বড় টর্চ। বাকিরা পেছনে। তাদের ধারণা, রেজোয়ান রিসোর্টের উত্তর পাশের অরণ্য ব্যবহার করে এদিকে আসে। গত কয়েকটা ঘটনার অবস্থান মিলিয়ে তারা একটা সম্ভাব্য পথও ঠাহর করেছে। 

কিন্তু তারা জানতো না, রেজোয়ান কখনো একই পথ দুবার ব্যবহার করে না।

পাঁচজন অরণ্যের ভেতর ঢুকে যাওয়ার প্রায় দশ মিনিট পর আরেকটা দল দক্ষিণের ঢাল ধরে এগোল। তৃতীয় দলটা অপেক্ষা করল নির্মাণস্থলের কাছে। তাদের কাজ, অন্য দুই দল কাউকে তাড়িয়ে আনলে তার পথ আটকে দেওয়া।

পরিকল্পনাটা খারাপ নয়। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অরন্যঘেরা পাহাড় মোটেও সহজ জায়গা নয়। কেননা, এটা তো আর কোনো থ্রীলার উপন্যাস নয় যে, লেখক যে ভাবে চাইবে গল্পটা সেভাবেই এগোবে। 

রাত আটটার পর খাগড়াছড়ির সেই গভীর পাহাড়ের চেহারা পুরোপুরি বদলে গেল। আকাশে মেঘ জমেছে। চাঁদ থাকলেও দেখা যাচ্ছে না। পাহাড়ের ঢালগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা মিশে বিশাল কালো দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। নিচের ছড়ার পানি পাথরে ধাক্কা খেয়ে অবিরাম শব্দ করছে। ঝোপের মধ্যে অদৃশ্য পোকামাকড় ডাকছে, মাঝে মাঝে বাঁশঝাড়ের ভেতর বাতাস ঢুকে শুকনো বাঁশের গায়ে বাঁশ ঘষে কর্কশ আওয়াজ তুলছে। দিনের আলোয় যে পথটাকে সহজ মনে হয়েছিল, এখন সেখানে টর্চ ছাড়া দুই পা&#039;ও এগোনো যায় না। স্বাভাবিক ভাবেই কেউ টর্চ জ্বালালেই ধরে নেয় সে নিজেকে পথ দেখাচ্ছে, যদিও বাস্তবতা হলো সে আসলে দূরে থাকা কারো কাছে নিজের অবস্থানই জানিয়ে দিচ্ছে।

রেজোয়ান অন্ধকারে বসে পাঁচটা আলো এগিয়ে আসতে দেখল। একই সরল রেখায়। তার মনে পড়ল বহু বছর আগের অভিজ্ঞতার কথা। রাতের অরণ্যে কাউকে দেখার জন্য শরীর দেখতে হয় না। তার হাতে থাকা আলো দেখলেই চলে।

সে অপেক্ষা করল। 

পাঁচটা আলো বাঁশঝাড়ের কাছে এসে থামল। সামনের লোকটা পথ দেখাচ্ছে।

রেজোয়ান তখন তাদের বাঁ দিকে মাত্র ত্রিশ গজ দূরে। কেউ জানে না। একটা ছোট পাথর তুলে সে ডান দিকের ঝোপের দিকে ছুড়ে দিল।

খসখস শব্দ শুনে সবগুলো টর্চ একসঙ্গে সেদিকে ঘুরে গেল।

“ওদিকে!”

দুজন এগিয়ে গেল। বাকি তিনজন কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে তাদের অনুসরণ করল।

রেজোয়ান নড়ল না। লোকগুলো তার সামনে দিয়েই চলে গেল। মাত্র কয়েক গজ দূর দিয়ে।

অন্ধকারের মধ্যে একটা মোটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে শরীর মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে। কালচে পোশাক, মুখের উজ্জ্বল অংশে ছায়া। লোকগুলোর টর্চ সামনে, তাই পাশে কী আছে কেউ দেখল না।

শেষ লোকটা পেরিয়ে যাওয়ার পরও রেজোয়ান অপেক্ষা করল। পাঁচ সেকেন্ড। দশ সেকেন্ড। তারপর তাদের পেছনে চলতে শুরু করল।

শিকারি দল জানলই না, কখন শিকার তাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

প্রায় পনেরো মিনিট পর সামনের দুজন বুঝল পথটা ভুল। সামনে ঘন বাঁশঝাড়। তার ভেতর দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। 

“ফিরতে হবে।” দলটা ঘুরল। কিন্তু ফেরার সময় একটা সমস্যা দেখা দিল। তারা যে সরু পথ ধরে এসেছিল, অন্ধকারে সেটা আর খুঁজে পাচ্ছে না।

টর্চের আলো এদিক ওদিক ঘুরতে লাগল। একজন বিরক্ত হয়ে গালি দিল। ঠিক তখন বাঁ পাশের অন্ধকারে একটা ছায়া নড়ল।

শেষে থাকা লোকটা ঘুরে দাঁড়াল। “কে?”

কোনো উত্তর নেই। সে টর্চ ফেলল। কিছু নেই।

পরের মুহূর্তে তার পেছনে রেজোয়ান। লোকটা বুঝে ওঠার আগেই একটা হাত তার মুখ চেপে ধরল, অন্য হাত কনুইয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিল। শরীরটা সামান্য ঘুরল। লোকটার ভারসাম্য চলে গেল এক মুহূর্তে। চিৎকার করার সুযোগ পেল না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে মাটিতে, রেজোয়ানের হাঁটু তার দুই কাঁধের মাঝামাঝি, হাতটা পেছনে নিয়ন্ত্রিত।

রেজোয়ান তার কানের কাছে নিচু স্বরে বলল, “চুপচাপ শুয়ে থাক।”

লোকটা শরীর ঘোরানোর চেষ্টা করল। ভুল করল।

রেজোয়ানের চাপ সামান্য বাড়তেই তার মুখ থেকে চাপা গোঙানি বের হলো। তারপর চাপটা চলে গেল।

লোকটা মাথা তুলল। কেউ নেই। মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

সামনের চারজন তখনও বুঝতে পারেনি তাদের একজন পেছনে পড়ে গেছে।

রেজোয়ান ইতিমধ্যে বাঁশঝাড়ের অন্ধকারে মিশে গেছে। 

কিছুক্ষণ পর লোকটার চিৎকার শুনে বাকিরা ফিরে এল। তাকে মাটিতে বসে থাকতে দেখে প্রশ্নের পর প্রশ্ন শুরু হলো।

“কী হয়েছে?”

লোকটা হাঁপাচ্ছে। “ও এখানে ছিল।”

“কে?”

“কর্ণেল।”

চারটা টর্চ একসঙ্গে চারদিকে ঘুরল। কোথাও কেউ নেই।

এদিকে দক্ষিণের দলটাও ভালো অবস্থায় নেই। তারা একটা শুকনো পাহাড়ি নালার ভেতর ঢুকে পড়েছে। দিনের আলোয় জায়গাটা সহজ পথ মনে হয়, কিন্তু বর্ষার শেষের ভেজা পাথর রাতের অন্ধকারে বিপজ্জনক। একজন পিছলে পড়ে হাঁটুতে আঘাত পেয়েছে। আরেকজন তাকে তুলতে গিয়ে নিজেই পড়ে গেছে।

রেজোয়ান তাদের কাছে যায়নি। যাওয়ার প্রয়োজনও নেই। তার সাজানো ট্র্যাপই তার হয়ে কাজটা করে দিয়েছে।

রাত যত গভীর হলো, তিনটা দলের মধ্যে যোগাযোগ তত দুর্বল হয়ে গেল। মোবাইল নেটওয়ার্ক কোথাও আছে, কোথাও নেই। ওয়াকিটকির সিগনাল পাহাড়ের আড়ালে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ফলে একজনের কথা অন্যজন পুরোপুরি বুঝতে পারছে না। কেউ উত্তর দিচ্ছে, কেউ দিচ্ছে না।

তারপর দ্বিতীয় মুখোমুখি সংঘর্ষটা ঘটল। এবার তিনজন একসঙ্গে ছিল। তারা একটা সরু ঢাল ধরে ওপরে উঠছিল। সামনের লোকটার টর্চ হঠাৎ একটা মানুষের ওপর গিয়ে পড়ল। লোকটা থেমে গেল। 

রেজোয়ান। মাত্র পনেরো গজ সামনে দাঁড়িয়ে।

“ওই যে!”

তিনজন একসঙ্গে ছুটল।

রেজোয়ান ঘুরে দৌড় দিল।

বয়স যেন মুহূর্তে তার শরীর থেকে ঝরে গেল। ঢালু পাহাড়ি পথে তার পা পড়ছে ছোট ছোট মাপা ধাপে। কোথায় পাথর, কোথায় শিকড়, কোথায় মাটি নরম, সব যেন আগে থেকেই জানা। পেছনের তিনজন দ্রুত দৌড়াচ্ছে, কিন্তু তাদের টর্চের আলো লাফাচ্ছে। শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।

হঠাৎ রেজোয়ান থামল। ঘুরে দাঁড়াল।

প্রথম লোকটা এত দ্রুত আসছিল যে থামার সুযোগ পেল না। রেজোয়ানের শরীর সামান্য পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে গেল। লোকটার ছুটে আসা শরীর সহসা শূন্যে উঠে গেল। একই সঙ্গে রেজোয়ানের ডান হাতটা ঝলসে উঠল। ছোট, শক্ত একটা আঘাত এসে লাগল লোকটার বুকের ওপর। মনে হলো ছুটে আসা শরীরটা যেন অদৃশ্য কোনো দেয়ালে ধাক্কা খেল। তার পা মাটি ছেড়ে গেল না, কিন্তু সমস্ত গতি থেমে গেল। পরমুহূর্তেই রেজোয়ানের পা তার গোড়ালির পেছনে ঢুকে শরীরের ভারসাম্য কেড়ে নিল।

ধপাস করে লোকটা পিঠের ওপর পড়ল।

দ্বিতীয়জন ঘুষি চালাল। রেজোয়ানের মাথা কয়েক ইঞ্চি সরে গেল। ছুটে আসা ঘুষিটা বাতাস কাটল। পরমুহূর্তে তার বাঁ হাত প্রতিপক্ষের কবজি সরিয়ে দিল, ডান হাতের তালুর গোড়া এসে আঘাত করল চোয়ালের পাশে। লোকটার মাথা ঝাঁকুনি খেল। চোখের সামনে যেন একসঙ্গে কয়েকটা আলো জ্বলে উঠল। সে টলতে না টলতেই রেজোয়ান তার জামার সামনের অংশ ধরে নিজের দিকে টেনে শরীর ঘুরিয়ে দিল। লোকটা গিয়ে পড়ল ভেজা ঘাসের ওপর।

তৃতীয়জন এবার থেমে গেছে। তার সামনে পঞ্চাশোর্ধ্ব কোনো অবসরপ্রাপ্ত মানুষ নেই। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অন্য কেউ।

রেজোয়ান তাকাল তার দিকে। 

লোকটা আর এগোল না। মাত্র দুই সেকেন্ড। 

তারপর পাশের অন্ধকারে ঢুকে গেল রেজোয়ান।

লোকটা টর্চ তুলল। আলো ছুটল গাছ থেকে গাছে। এবারো কোথাও কেউ নেই। বেমালুম হাওয়া হয়ে গেছে।

রাত প্রায় তিনটার দিকে অনুসন্ধান কার্যত ভেঙে পড়ল। যে দল রেজোয়ানকে ধরতে এসেছিল, এখন তাদের প্রধান কাজ হয়ে গেল নিজেদের লোকজনকে খুঁজে বের করা। একজন হাঁটতে পারছে না। দুজন পথ হারিয়েছে। আর একজনকে পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য যারা রেজোয়ানকে দেখেছে, তারা এখন আর তাকে খুঁজতে খুব একটা আগ্রহী নয়।

ভোরের আগেই দলটা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হলো। একজন একজন করে সবাই নির্মাণস্থলে ফিরতে শুরু করল। 

দেখা গেল কারও জামা কাদায় ভরা। আবার কারও হাঁটু ছড়ে গেছে। একজন অন্যজনের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছে। কারও টর্চ হারিয়েছে। সবার মুখে ক্লান্তি, বিরক্তি আর তার চেয়েও বেশি এমন একটা অপমান, যার কথা কেউ উচ্চস্বরে বলতেও চাইছে না।

সতেরোজন মানুষ এসেছিল একজনকে ধরতে। লোকটাকে তারা দেখেছে। তারপরেও ধরতে পারেনি। 

যদিও কখনো সে তাদের সামনে ছিল, আবার কখনো পেছনে।  কখনো এতই কাছে যে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়, অথচ পরমুহূর্তেই নেই হয়ে গেছে।

পূর্বের পাহাড়ের মাথায় তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। কালো আকাশ ধীরে ধীরে ছাই রঙের হচ্ছে। বাঁশপাতার ডগায় রাতের শিশির। নিচের উপত্যকার ওপর পাতলা কুয়াশা জমেছে। দূরে কোনো পাহাড়ি বাড়ি থেকে মোরগের ডাক ভেসে এল।

ক্লান্ত দলটা নির্মাণস্থলের সামনে এসে থামল। তারপর সবাই একসঙ্গে চুপ হয়ে গেল। সামনে একটা কাঠের খুঁটি। গতকাল পর্যন্ত সেখানে ছোট একটা ফলক লাগানো ছিল। সেটা ছিল মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নির্মাণ প্রকল্পের নাম লেখা ফলক। এখন সেটা নেই। স্রেফ খালি খুঁটিটা দাঁড়িয়ে তাদের যেন উপহাস করছে।

তারপরেও কেউ কিছু বলল না। 

দলনেতা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে খুঁটিটার সামনে দাঁড়াল। তার চোখ চারপাশে ঘুরল। রাতে তারা সবাই অরণ্যের ভেতর রেজোয়ানকে খুঁজেছে। আর সেই সময় সে ঠিকই এখানে ফিরে এসেছিল। এতদিন তাদের চোখের সামনে থাকা ফলকটা আজ সরিয়ে নিয়ে গেছে।

দলনেতার মুখ শক্ত হয়ে গেল। কারণ এবার বার্তাটা ভয় দেখানোর চেয়েও অপমানজনক।

যখন তারা পুরো পাহাড়জুড়ে রেজোয়ানকে খুঁজছিল, রেজোয়ান তখন তাদের ফাঁকা পড়ে থাকা ঘাঁটির একেবারে ভেতর পর্যন্ত চলে আসতে পেরেছিল।

আর ভোরের আলোয় খালি কাঠের খুঁটিটার দিকে তাকিয়ে প্রথমবার তাদের একজনের মাথায় প্রশ্নটা এল। তারা কি সত্যিই রেজোয়ানকে সারারাত তাড়া করেছে? 
নাকি রেজোয়ানই সারারাত তার ইচ্ছেমত তাদের যেখানে চেয়েছে, সেখানেই নিয়ে গেছে?
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/276525/</link>
				<pubDate>Mon, 21 Sep 2026 03:37:21 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় এগারো)<br />
বিকেলের শেষ দিকে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নতুন কাটা রাস্তা দিয়ে একটার পর একটা গাড়ি উঠতে দেখে শ্রমিকদের অনেকেই কাজ থামিয়ে তাকিয়েছিল। প্রথমে একটা কালো মাইক্রোবাস, তার পেছনে দুটো পিকআপ, সবশেষে আরেকটা জিপ। গাড়িগুলোর গায়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নেই, ভেতরে বসে থাকা লোকগুলোকেও নির্মাণকাজের মানুষ বলে মনে হলো&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-276525"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/276525/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">0681bb96c6573468bb956b523cb847bf</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় দশ)
মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের পাহাড়ি প্রকল্পে এবার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াল ভয়। প্রথম দিকে কয়েকজন পাহারাদার আহত হয়েছিল। দু-একজন পথ হারিয়েছিল। তারপর একজন রেজোয়ানকে চোখের সামনে দেখেও পর মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখেছিল। এসব ঘটনা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে হয়ত কানাঘুষা ছিল, কিন্তু তারপরেও কাজ চলছিল। এখন আর সেই অবস্থা নেই। ভয় ধীরে ধীরে তাদের মনে এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যে দিনের আলোয় তারা পাহাড়ের বুকে কাজ করলেও সূর্য পশ্চিমের পাহাড়ের আড়ালে নামতে শুরু করলেই তাদের মনে হতে থাকে, এই বুঝি আসল বিপদ শুরু হবে। 

খাগড়াছড়ির পাহাড়ে সন্ধ্যা নামার একটা নিজস্ব চরিত্র আছে। দিনের গরমে যে অরণ্য প্রাণে ভরা থাকে, বিকেলের শেষ আলো সরে গেলেই সেই অরণ্য যেন হঠাৎ নিজের ভেতর নিজেকে গুটিয়ে নেয়। দূরের পাহাড়ের চূড়ায় প্রথমে ছায়া পড়ে, তারপর ঢালের ওপর দিয়ে সেই ছায়া নিচে নামে। বাঁশঝাড়ের মাথা কালো হয়ে যায়, ছড়ার পানিতে আকাশের শেষ আলোটুকু কাঁপতে কাঁপতে মিলিয়ে যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই চারপাশে এমন এক আবছা অন্ধকার জমে ওঠে, পরিচিত পথও তখন অপরিচিত বলে মনে হয়। আর সেই সময়টাকে এখন রিসোর্টের লোকজন সবচেয়ে বেশি ভয় পায়।

কিছু শ্রমিক বিকেল পাঁচটার পর থেকেই বারবার ঘড়ি দেখতে শুরু করত। কেউ কেউ কাজ শেষ হওয়ার আগেই মেশিনের কাছ থেকে সরে গিয়ে শেডের দিকে চলে যেত। আবার কেউ একা অরণ্যের ধারে যেত না। পাহাড়ের নিচের ছড়া থেকে পানি আনতে হলেও দুজন একসঙ্গে যেত। রান্নার জন্য কাঠ আনতে হলে দিনের আলো থাকতে থাকতে কাজ শেষ করার চেষ্টা করত সবাই। রাতের পাহারার কথা উঠলেই মুখগুলো শক্ত হয়ে যেত। আগে যে লোকেরা নিজেদের মধ্যে গল্প করত, হাসাহাসি করত, তাস খেলত, তারা এখন সন্ধ্যার পর শেডের ভেতর গাদাগাদি করে বসে থাকত। বাইরে থেকে সামান্য কোনো শব্দ এলেই তাদের কথাবার্তা থেমে যেত।

প্রথম যে শ্রমিকটা কাজ ছেড়ে চলে গেল, তাকে কেউ খুব একটা আটকায়নি। তারপর দ্বিতীয়জন। তৃতীয়জন যাওয়ার সময় তার সঙ্গে থাকা লোকজনকে বলেছিল, সে আবার কোনোদিন পাহাড়ে রাত কাটাবে না। তার কথাটা তখনও অনেকের কাছে বাড়াবাড়ি মনে হয়েছিল। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই দেখা গেল, শুধু পুরনো শ্রমিক নয়, নতুন করে আনা লোকেরাও বেশিদিন টিকছে না। যারা দূরের জেলা থেকে টাকা রোজগারের আশায় এসেছিল, তারাও আগের শ্রমিকদের কাছ থেকে রাতের গল্প শুনে অস্বস্তিতে পড়ে যাচ্ছিল। কেউ বলছিল, এসব নিছক দুর্ঘটনা। কেউ বলছিল, পাহাড়ে কাজ করতে গেলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু যারা রাতের অন্ধকারে পাহাড়ের পথ ধরে হাঁটতে গিয়ে এসব ঘটনার, তারা জানত, কথাগুলো মুখে বলা যত সহজ, অন্ধকারে সেই পথ পেরোনো তত সহজ নয়।

রেজোয়ান এসব দেখছিল। তবে দূর থেকে। দিনের আলোয় সে রিসোর্টের শ্রমিকদের সঙ্গে কোনো সংঘর্ষে যাচ্ছিল না। এমনকি তাদের সঙ্গে অকারণে কথাও বলত না। কোনো শ্রমিক তাকে দেখলে সে স্বাভাবিকভাবে পাশ কাটিয়ে চলে যেত। 

কখনো পাহাড়ের অন্য ঢালে দাঁড়িয়ে কাজ দেখত, কখনো নিজের জমির সীমানা ধরে ধীরে ধীরে হাঁটত, কখনো ছড়ার ধারে বসে অনেকক্ষণ পানির স্রোত দেখত। তার আচরণে এমন কিছু ছিল না, যা দেখে একজন সাধারণ মানুষ তাকে বিপজ্জনক বলে মনে করতে পারে।

কিন্তু রাত নামলে পাহাড়ের ভেতর তার চলাফেরা বদলে যেত। সে জানত, এই লড়াইয়ে তাকে বেশি কিছু করতে হবে না। ভয় নিজে থেকেই কাজ করবে। একজন মানুষকে দশবার আঘাত করার প্রয়োজন নেই, যদি প্রথম আঘাতের স্মৃতি তার মনে দশ রাত বেঁচে থাকে।

এক রাতে রিসোর্টের উত্তর দিকের পাহাড়ি ঢালে নতুন করে মাটি কাটার কাজ শুরু করার কথা ছিল। দিনের বেলায় মেশিন দিয়ে জায়গাটা মোটামুটি পরিষ্কার করা হয়েছিল। কয়েকটা বড় পাথর সরানো হয়েছে, ঝোপঝাড় কাটা হয়েছে, আর একটা সরু পথ তৈরি করা হয়েছে যাতে পরদিন ভারী যন্ত্রপাতি ওপরে তোলা যায়। রাতের পাহারার দায়িত্বে থাকা লোকজনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, পথটা যেন কেউ নষ্ট না করে।

তিনজন লোক রাত দশটার দিকে সেই পথে বের হলো। আকাশে চাঁদ ছিল না। মেঘে ঢাকা আকাশের কারণে তারাও দেখা যাচ্ছিল না। রিসোর্টের আলো অনেক পেছনে পড়ে রইল। সামনে শুধু টর্চের সরু আলোর রেখা। সেই আলোয় কখনো গাছের গুঁড়ি দেখা যাচ্ছে, কখনো ভেজা মাটি, কখনো পাথর। চারপাশের অন্ধকার এত ঘন যে টর্চের আলোর পরিধি যেখানে শেষ হচ্ছে, ঠিক তার পরেই মনে হচ্ছিল কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

তিনজনের মাঝখানের লোকটা হঠাৎ থেমে গেল। 

“কী হলো?”পেছন থেকে একজন জানতে চাইলো।

সে উত্তর দিল না। সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু একটা শব্দ হয়েছে। খুব ক্ষীণ। ডান পাশের বাঁশঝাড়ে যেন কেউ পা রেখেছে।

তিনজন একসঙ্গে সেইদিকে টর্চ ফেলল। বাঁশের সরু কঞ্চিগুলো বাতাসে দুলছে। আর কিছু নেই। 

তারা আবার হাঁটতে শুরু করল। এক পা। দুই পা। .......দশ পা। ......বিশ পা। 

তারপর সামনের লোকটা হঠাৎ পেছনে তাকাল। তৃতীয় লোকটা নেই। সে যেখানে ছিল, সেখানে শুধু টর্চের আলো মাটিতে পড়ে আছে।

বাকী দুজন একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। 

একজন টর্চ তুলে চারদিকে আলো ফেলল। “রহিম!”

কোনো উত্তর নেই। 

আরেকবার ডাকল। “রহিম!”

এবারও নীরবতা। দূরে কোনো পাহাড়ি পাখি ডেকে উঠল। তারপর আবার সব চুপ। 

দুজন একই সংগে পেছনে ফিরল। কয়েক গজ দূরে লোকটাকে পাওয়া গেল। সে মাটিতে বসে আছে। তার মাথা নিচু। আর মুখে আতঙ্ক।

“কী হয়েছে?”

লোকটা কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। তারপর শুধু বলল, “পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।”

দুজন লোক আবার পেছনে তাকাল। কেউ নেই। এরপর তারা আর সামনে এগোয়নি।

পরদিন সকালে ঘটনাটা নিয়ে অনেক কথা হলো। কেউ বলল, লোকটা ভয় পেয়ে ভুল দেখেছে। কেউ বলল, কোনো বন্য প্রাণী থাকতে পারে। কিন্তু রেজোয়ানকে কেউ সেখানে দেখেনি। 

আর সেটাই ছিল আসল ব্যাপার। রেজোয়ান তাদের কাছে এমনভাবে নিজের উপস্থিতি ব্যবহার করছিল, যাতে তাকে নিয়ে কেউ কোনো সুনির্দিষ্ট ছবি দাঁড় করাতে না পারে।

কোম্পানির লোকেরা চাইলে তাকে সন্দেহ করতে পারে। কিন্তু সন্দেহ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। এই পার্থক্য রেজোয়ান খুব ভালো করেই জানে।

তার সামরিক জীবনে বহুবার তাকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে, যেখানে কাজের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিজের উপস্থিতির কোনো চিহ্ন রেখে যাওয়ার সুযোগ নেই। পাহাড়ে ফিরে এসে সে সেই পুরনো অভ্যাসগুলোকেই আবার নতুন করে ব্যবহার করছিল। তার কাছে অন্ধকার শুধু আলো না থাকার নাম নয়। অন্ধকার মানে দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা। আর যে মানুষ অন্যের দৃষ্টির সীমা বুঝতে পারে, সে জানে কখন দাঁড়াতে হয়, কখন চলতে হয়, কখন অপেক্ষা করতে হয়।

রেজোয়ানের বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে, কিন্তু তার শরীর এখনো সামরিক জীবনের ছাপটাই ধরে রেখেছে। তার কাঁধ চওড়া, কোমর শক্ত, পায়ের পেশিতে বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিক দৃঢ়তা। চলার সময় তার পা মাটিতে পুরোপুরি ভর করে না। বরং প্রতিটি পদক্ষেপের আগে পা ফেলার জায়গাটা আগে বুঝে নেয়। চোখ সবসময় সামনে থাকে না। অনেক সময় সে মাথা না ঘুরিয়েই পাশের শব্দ শুনে নেয়। অরণ্যে চলার সময় শুকনো ডাল কোথায়, ভেজা মাটি কোথায়, কোন পাতার ওপর পা দিলে শব্দ হবে, কোন জায়গায় মাটি ফাঁপা, এসব তার কাছে একটা থেকে আরেকটা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

এগুলো কোনো জাদু নয়। এগুলো তার অভ্যাস। দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণের ফল। এই পাহাড় তার সেই অভ্যাসকেই ঝালিয়ে নেবার সুযোগ করে দিচ্ছে। 

দিনের পর দিন রিসোর্টের লোকজনের ওপর ছোট ছোট চাপ বাড়তে লাগল। কখনো পাহারার দল ভুল পথে চলে যায়। কখনো রাতের টহলে একজনকে আরেকজনের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যেতে হয়। কখনো অন্ধকারে চলতে গিয়ে কেউ পড়ে গিয়ে আহত হয়। আবার কখনো রাতের পাহারার মাঝখানে দূরে মানুষের পায়ের শব্দ শোনা যায়, যদিও টর্চের আলো ফেললে কাউকেই দেখা যায় না।

কেউ মারা যায়নি। কেউ গুরুতরভাবে আক্রান্তও হয়নি। কিন্তু প্রত্যেকটি ঘটনার পর ভয় আরও একটু করে বেড়েছে।

রিসোর্টের হিসাবেও তার প্রভাব পড়তে শুরু করল। দিনের কাজের জন্য যতজন লোক প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি লোক এখন শুধু নিরাপত্তার জন্য রাখতে হচ্ছে। রাতে পাহারা দিতে দুজনের জায়গায় চারজন লাগছে। চারজনের জায়গায় ছয়জন। তবু কেউ একা যেতে চাইছে না। নতুন লোক আনতে পরিবহন খরচ বাড়ছে। পুরনো লোক চলে যাওয়ায় কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে। পাহাড়ের ওপর একদিন যে কাজ হওয়ার কথা ছিল, তা শেষ করতে দুই দিন লাগছে। কোনো কোনো দিন মেশিন চালানোর মতো পর্যাপ্ত লোক পাওয়া যাচ্ছে না।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, কাজের জায়গায় যারা থাকে, তারা এখন কাজের চেয়ে নিরাপত্তার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

মাটি কাটার মেশিন চলছে। কিন্তু মেশিনের পাশে দাঁড়ানো লোকটা বারবার অরণ্যের দিকে তাকাচ্ছে। রাস্তার কাজ হচ্ছে। কিন্তু পাহারাদার টর্চ হাতে চারদিকে আলো ফেলছে। শ্রমিকেরা বাঁশ কাটছে। কিন্তু সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়লেই তাদের চোখ ঘড়ির দিকে। 

এভাবে কোনো বড় প্রকল্প এগোয় না।

একদিন বিকেলে রিসোর্টের নতুন আনা সাতজন শ্রমিকের মধ্যে তিনজন ম্যানেজারের কাছে গিয়ে জানাল, তারা আর রাতের শিফটে কাজ করবে না। ম্যানেজার প্রথমে রেগে গেল। তারপর বোঝানোর চেষ্টা করল। শেষপর্যন্ত অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার কথাও বলল।

তারপরেও তারা রাজি হলো না। শেষ পর্যন্ত একজন বলল, “টাকা দিয়ে ভয় সরানো যায় না, স্যার।”

কথাটা শুনে ম্যানেজার চুপ করে গেল। 

সেদিন রাতে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের শেডগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক আগে আলো নিভে গেল। শুধু মূল নির্মাণস্থলের পাশে কয়েকটা বাতি জ্বলছিল। সেই আলো থেকে একটু দূরেই শুরু হয়েছে অরণ্য।

গাছের মাথাগুলো বাতাসে দুলছে। বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে অন্ধকার আরও ঘন। নিচের ছড়ায় পানির শব্দ একটানা বয়ে যাচ্ছে। দূরের পাহাড়ে কোনো অচেনা পাখি ডেকে উঠল, তারপর সেই ডাক পাহাড় থেকে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে মিলিয়ে গেল।

রিসোর্টের পাহারাদাররা সেদিন অরণ্যের দিকে তাকাতে সাহস করছিল না।

কিন্তু অরণ্যের এক জায়গায়, তাদের চোখের সম্পূর্ণ বাইরে, সেই সময়টাতেই রেজোয়ান দাঁড়িয়ে ছিল। তার সামনে নিচে নেমে গেছে একটা সরু ঢাল। তার ওপারে রিসোর্টের আলো। সে কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল সে। তারপর নিঃশব্দে পেছনে সরে গেল। কেউ তাকে দেখল না।

কিন্তু পরদিন সকালে রিসোর্টের প্রধান রাস্তার পাশে পাওয়া গেল একটা জিনিস। একটা পুরনো সামরিক ধরনের কম্পাস। রিসোর্টের কারও নয়। কেউ জানত না সেটা সেখানে এল কীভাবে।

আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল, কম্পাসটা এমন জায়গায় পড়ে ছিল, যেখানে পৌঁছাতে হলে রিসোর্টের পাহারার পুরো এলাকার ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

ম্যানেজার কম্পাসটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর প্রথমবার তার মনে হলো, এতদিন তারা যে মানুষটাকে দুরে খুঁজছিল, সে হয়তো তাদের নিজেদের চেয়েও অনেক কাছ থেকে তাদের সবাইকে দেখছে।

আর সেদিন রাতেই কোম্পানির মালিকের কাছে একটা ফোন গেল। ফোনের ওপাশ থেকে কাঁপা গলায় বলা হলো, “স্যার, ও শুধু ভয় দেখাচ্ছে না। মনে হচ্ছে ও আমাদের প্রতিটা লোকের চলাফেরা আলাদাভাবে খেয়াল করছে।”

কথাটা শুনে মালিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন, “তাহলে এবার জানতে হবে, লোকটা আসলে কী চায়।”

কিন্তু তিনি জানতেন না, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য রেজোয়ান এখনো প্রস্তুত নয়।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/276524/</link>
				<pubDate>Mon, 21 Sep 2026 03:36:37 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় দশ)<br />
মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের পাহাড়ি প্রকল্পে এবার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াল ভয়। প্রথম দিকে কয়েকজন পাহারাদার আহত হয়েছিল। দু-একজন পথ হারিয়েছিল। তারপর একজন রেজোয়ানকে চোখের সামনে দেখেও পর মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখেছিল। এসব ঘটনা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে হয়ত কানাঘুষা ছিল, কিন্তু তারপরেও কাজ চলছিল। এখন আর সেই অবস্&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-276524"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/276524/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">0f4699454ce9340b2d5fe8146782818a</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় নয়)
মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের মালিক শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিলেন, ভয় দেখিয়ে শ্রমিক ধরে রাখা যাবে না। একদল চলে গেছে, আরেকদল যাওয়ার কথা ভাবছে। এদিকে রাতের পাহারায় আর লোক পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ পাহাড়ের কাজ থামিয়ে রাখার মতো অবস্থাও নেই। তার ওপর প্রতিদিনের বিল, মেশিনের খরচ, রাস্তার কাজ, মালামাল আনা, শ্রমিকের মজুরি, সব মিলিয়ে প্রকল্পের খরচ ক্রমশঃ বেড়ে যাচ্ছিল। তাই এবার বাইরে থেকে আরও লোক আনা হলো। শুধু শ্রমিক নয়, পাহারার জন্যও লোক বাড়ানো হলো। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতার কয়েকজন লোকও এসে দাঁড়াল কোম্পানির পাশে। তাদের উপস্থিতিতে রিসোর্টের অস্থায়ী ক্যাম্পে আবার যেন আত্মবিশ্বাস ফিরে এল। দিনের বেলায় অনেকগুলো মানুষকে একসঙ্গে দেখা যেতে লাগল। কেউ মাটি কাটছে, কেউ বাঁশ নামাচ্ছে, কেউ রাস্তার পাশে পাথর সাজাচ্ছে, কেউ পাহারার জায়গা ঘুরে দেখছে। দূর থেকে মনে হচ্ছিল, সব কিছ আগের মতই চলছে। 

এত লোকের ভিড়ে একজন মানুষ আর কী-ই-বা করতে পারে?

রেজোয়ান সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোনো তাড়াই দেখাল না। সে দিনের আলোয় একেবারেই চুপ মেরে গেল।

কয়েকদিন ধরে তাকে রিসোর্টের আশপাশে আর দেখা গেল না। তার গাড়ি কখনো খাগড়াছড়ি শহরে হোটেল মাউন্ট ইন-এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। দুপুরে তাকে কোনো চায়ের দোকানে বসে চা খেতে দেখা গেল। একদিন তাকে বাজারের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে দেখলো কেউ। আরেকদিন সে পুরনো পরিচিত করিমের বাড়ির উঠানে বসে অনেকক্ষণ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

সবকিছু এত স্বাভাবিক যে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের লোকজন ধীরে ধীরে ভাবতে শুরু করল, রেজোয়ান হয়তো পিছিয়ে গেছে। 

এই ধারণাটাই রেজোয়ান প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কারণ সে জানে, মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হয় তখন, যখন সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে বিপদ কেটে গেছে।

বিকেল নামলে খাগড়াছড়ির পাহাড়ের রং বদলে যেতে থাকে। দুপুরের তীব্র সবুজ ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে। দূরের পাহাড়গুলো প্রথমে সবুজ, তারপর ধূসর, তারপর নীলচে হয়ে যায়। কোথাও পাহাড়ের গায়ে মেঘ আটকে থাকে। কোথাও শেষ বিকেলের আলো গাছের মাথায় পড়ে সোনালি রেখা তৈরি করে। নিচের ছড়াগুলো তখনও একইভাবে বয়ে চলে, কিন্তু অরণ্যের ভেতর আলো কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের শব্দ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে। বাঁশঝাড়ে বাতাস ঢুকলে পাতাগুলো একে অন্যের সঙ্গে ঘষা খেয়ে যে শব্দ তৈরি করে, দূর থেকে সেটা কখনো মানুষের ফিসফিসের মতো শোনায়। পাখিরা একে একে নীরব হয়ে যায়। দিনের পরিচিত শব্দগুলো সরে গিয়ে জায়গা নেয় ঝিঁঝিঁ পোকার অবিরাম ডাক, ব্যাঙের ডাক আর অদৃশ্য কোনো প্রাণীর পাতার ওপর চলার মৃদু শব্দ।

রাত পুরোপুরি নামার পর পাহাড় আর আগের মত অন্ধকার থাকে না। অন্ধকারেরও বিভিন্ন স্তর আছে। কোথাও ঘন কালো, কোথাও গাছের ফাঁক দিয়ে সামান্য আকাশ দেখা যায়, কোথাও দূরের কোনো পাহাড়ি ঘরের ক্ষীণ আলো জ্বলতে থাকে। রিসোর্টের বৈদ্যুতিক বাতিগুলো সেই অন্ধকারে ছোট ছোট দ্বীপের মতো ভেসে থাকে। আলো যেখানে শেষ হয়, তার পরেই শুরু হয় অরণ্য।

রেজোয়ান আলো আর অরণ্যের সেই সীমারেখাটাকেই ব্যবহার করত। কিন্তু তার মাঝে কোনো রকম তাড়াহুড়ো ছিল না।

এক রাতে নতুন নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন লোককে নিয়ে পাহারাদারদের দল বের হলো। তাদের মধ্যে দুজন স্থানীয়, বাকিরা বাইরে থেকে এসেছে। হাতে টর্চ, সঙ্গে লাঠি। তারা আগের লোকদের গল্প শুনেছে, কিন্তুেএখন অবধি নিজের চোখে কিছুই দেখেনি। তাই ভয় আর অবিশ্বাসের মাঝামাঝি একটা অবস্থায় তারা পাহাড়ের পথে এগোচ্ছিল।

সামনে হাঁটছিল সবচেয়ে লম্বা লোকটা। তার পেছনে দুজন। আর কিছুটা দূরে আরও দুজন।

পাহাড়ি পথটা খুব সরু। একদিকে উঠে গেছে অরণ্যে ঢাকা ঢাল, অন্যদিকে নিচে নেমে গেছে ঝোপঝাড়ের ভেতর। বর্ষার পানি মাটিকে নরম করে রেখেছে। কোথাও পা রাখলে জুতো মাটির মধ্যে সামান্য ঢুকে যাচ্ছে। আবার কোথাও পাথরের ওপর শুকনো পাতা জমে আছে।

হঠাৎ সামনের লোকটা থেমে গেল। 

“কী হলো?”

সে টর্চের আলো সামনে ফেলল। কিছু নেই। শুধু গাছ। আর গাছের পেছনে অন্ধকার। সে আবার হাঁটতে শুরু করল। 

কয়েক পা যাওয়ার পর তার পেছনের লোকটা বলল, “এই পথটা তো আগে এদিকে ছিল না।” 

সামনের লোকটা ঘুরে তাকাল। “ছিল।”

“নিশ্চিত?”

“হ্যাঁ।”

আর কোনো কথা হলো না। তারা এগিয়ে গেল। 

কিন্তু কয়েক মিনিট পর আবার একই জায়গার মতো একটা বাঁক সামনে দেখা গেল। 

একজন টর্চ উঁচু করে চারপাশ দেখল। তার মুখে এবার সন্দেহ। পাহাড়ে সবকিছু একই রকম দেখতে। একই ধরনের গাছ। একই ধরনের বাঁশঝাড়। একই রকম ঢাল। একই অন্ধকার। তবু একটা অস্বস্তি হচ্ছিল।

তারা আসলে বুঝতে পারেনি, পথ হারায়নি তারা। আসলে তাদের পথটাই বদলে গেছে। কিন্তু, কীভাবে, সেটা তারা জানত না। 

আর কিছুদূরে অন্ধকারের আড়ালে রেজোয়ান দাঁড়িয়ে ছিল। সে তাদের খুব কাছেই ছিল। তারপরও কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছিল না।

রেজোয়ান ধীরে ধীরে একটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। কয়েক পা। তারপর থামল। তার চোখ পাহারাদারদের ওপর। তাদের চলার গতি, টর্চের আলো, কে সামনে, কে পেছনে, সবকিছু সে লক্ষ্য করল।

তারপর সে মাটিতে পড়ে থাকা একটা শুকনো বাঁশের ডগা পায়ের সামান্য চাপ দিয়ে সরিয়ে দিল। 

সামনের লোকটা শব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়াল। “কে?”

কোনো উত্তর নেই। টর্চের আলো চারদিকে ঘুরল। কিছু নেই।

রেজোয়ান তখন তাদের বাঁ পাশে। একেবারে স্থির। একজন পাহারাদার হঠাৎ সেই দিকে আলো ফেলল। আলো গাছের গায়ে পড়ল।

রেজোয়ান এক মুহূর্তে গাছের আড়ালে সরে গেল। আবার আলো ফিরল। কেউ নেই।

পাহারাদারের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে বুঝতে পারল না, সত্যিই কিছু দেখেছিল কি না। দলের অন্যরা তাকে নিয়ে হাসতে গিয়েও আর হাসল না।

কেননা তখন দূরে কোথাও একটা ভারী শব্দ হলো। মনে হলো কোনো পাথর ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নিচে পড়েছে। সবাই একসঙ্গে সেইদিকে তাকাল।

তারপর একজন বলল, “চলো ফিরে যাই।”

কেউ আপত্তি করল না। তারা ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু ফেরার পথেই বিপদ হলো।

সামনের লোকটা পা রাখতেই মাটি হঠাৎ বসে গেল। সে কোমর পর্যন্ত নরম কাদার মধ্যে ঢুকে গেল। পেছনের লোকেরা তাকে টেনে তুলতে গিয়ে নিজেরাও হিমশিম খেল। কেউ আহত হলো না, কিন্তু তাদের প্রায় আধঘণ্টা সেখানে আটকে থাকতে হলো।

যখন শেষ পর্যন্ত সবাই উঠে দাঁড়াল, তখন তাদের জামাকাপড় কাদায় মাখামাখি।

আর রেজোয়ান তখন অনেক দূরে। সে তাদের দিকে ফিরে তাকালও না। তার উদ্দেশ্য ছিল না কাউকে আহত করা। তার উদ্দেশ্য ছিল স্রেফ একটা মিশ্র অনুভূতি তৈরি করা। 

এই পাহাড়ে তারা যত লোকই আনুক, রাতের অন্ধকারে তাদের প্রত্যেকটা পদক্ষেপের ওপর তার পক্ষে নজর রাখা সম্ভব। 

পরের কয়েকদিনে এমন ঘটনা আরও ঘটল। কখনো দুজন পাহারাদার অরণ্যের একটা অংশে গিয়ে ফিরে এসে বলল, তারা ভুল পথে চলে গিয়েছিল। কখনো একজন পাহাড়ি ঢালে পিছলে পড়ে হাতে আঘাত পেল।

কখনো রাতে রিসোর্টের কাজের জায়গায় যাওয়ার পথে কয়েকজনকে এমন একটা জায়গায় আটকে থাকতে হলো যেখানে কাদা আর পানি মিশে পথ চলার অযোগ্য হয়ে পড়েছিল।

কোনো ঘটনারই পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না। আর কোনো ঘটনার সাক্ষীও পাওয়া গেল না।

কোম্পানির লোকজন চারপাশে খুঁজল। রেজোয়ানের কোনো চিহ্ন নেই। তার গাড়ি অন্য কোথাও। তার থাকার জায়গা অন্যদিকে। কখনো সে শহরে। কখনো হোটেলে। আবার কখনো করিমের বাড়িতে।

দিনের আলোয় রেজোয়ান যেন পাহাড়ের ঘটনাগুলোর সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত নয়। রাতের অন্ধকারই কেবল তার দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করছে।

এক রাতে পাহারার জন্য বের হয়েছিল চারজন। রাত তখন প্রায় একটা। আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় কিছুটা চাঁদের আলো ছিল। পাহাড়ের মাথায় মেঘ নেই। গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে মাটিতে ছোপ ছোপ দাগ ফেলেছে। কোথাও আলো, কোথাও অন্ধকার। দূরের পাহাড়গুলো কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিচে ছড়ার পানি চাঁদের আলো বুকে ধরে চিকচিক করছে।

চারজন লোক একটা সরু পথ ধরে এগোচ্ছিল। তাদের একজন হঠাৎ থেমে গেল। সামনের গাছের পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। একজন মানুষ। একদম স্পষ্ট। চাঁদের ফিকে আলোয় তার মুখ দেখা যাচ্ছে। ধূসর শার্ট। স্থির দৃষ্টি। দুই হাত শরীরের পাশে। 

লোকটা এক মুহূর্তের জন্য যেন জমে গেল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “কর্ণেল...”

সামনের মানুষটা নড়ল না। রেজোয়ান। সে এবার আড়ালে নেই। সরাসরি দাঁড়িয়ে আছে।

পাহারাদার হাতের টর্চটা শক্ত করে ধরল। “আপনি এখানে কী করছেন?”

রেজোয়ান ধীরে ধীরে তার দিকে এক পা এগিয়ে এল। “আমি আমার নিজের জমিতেই আছি।” 

কথাটা খুব শান্ত। কোনো হুমকি নেই। কোনো উত্তেজনা নেই। কিন্তু সেই শান্ত স্বরটাই লোকটার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভয় ঢুকিয়ে দিল।

সে এক পা পিছিয়ে গেল। তার পেছনের লোকজনও থেমে গেছে। কেউ এগিয়ে আসছে না। 

রেজোয়ান আরও এক পা এগোল। তার চোখ চারজনের ওপর দিয়ে একবার ঘুরে গেল। তারপর বলল, “সবাই ফিরে যাও।”

একজন সাহস করে সামনে এগোতে গেল। 

রেজোয়ানের শরীর তখনই বদলে গেল। যেন স্থির পাথরের ভেতর হঠাৎ স্প্রিং খুলে গেছে। 

লোকটা হাত বাড়ানোর আগেই রেজোয়ানের ডান হাত তার কবজি ধরে ফেলেছে। এক টানে শরীরটা সামনে এল। রেজোয়ানের বাঁ কাঁধ সামান্য ঘুরল, লোকটা ভারসাম্য হারালো, আর পরের মুহূর্তেই সে হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে পড়ল।

কোনো ঘুষি নয়। কোনো লাথি নয়। শুধু গতি আর ভারসাম্যের নিখুঁত ব্যবহার।

লোকটা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল।

রেজোয়ান তাকে ছেড়ে দিল।

সে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু তার চোখে এবার আর রাগ নেই। আছে ভয়।

রেজোয়ান এক পা, দুই পা করে পেছনে সরে গেল। তারপর গাছের ছায়ায় ঢুকে গেল।

একজন টর্চের আলো সেই জায়গায় ফেলল। কেউ নেই।

চারজন মানুষ কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারা জানত, মানুষটা তাদের সামনেই ছিল। তারপরও কীভাবে চোখের সামনে থেকে গায়েব হয়ে গেল, সেটা তারা বুঝতে পারল না।

পরদিন সকালে এই ঘটনাটা রিসোর্টে পৌঁছাল।

যে লোকটা রেজোয়ানকে দেখেছিল, সে তখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। তার মুখে রাতের আতঙ্ক স্পষ্ট।

ম্যানেজার তাকে বারবার জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছিল।

লোকটা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর শুধু বলল, “লোকটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।” সে একটু থামল। তারপর খুব ধীরে বলল, “তারপর আমি বুঝতেই পারিনি, সে কোথায় গেল।”

ঘরের ভেতর কেউ কথা বলল না। বাইরে তখন দিনের আলো। পাহাড়ের ঢালে রোদ পড়েছে। শ্রমিকেরা আবার কাজে নেমেছে।

মাটি কাটা হচ্ছে। বাঁশ ওঠানো হচ্ছে। মেশিন চলছে। সবকিছু স্বাভাবিক। শুধু রিসোর্টের লোকজনের চোখে এখন আর আগের সেই আত্মবিশ্বাস নেই।

কারণ এখন আর রেজোয়ান তাদের কাছে কোনো গল্প নয়। তারা তাকে সরাসরি দেখেছে। একদম চোখের সামনে। তারপরও তাকে তারা ধরে রাখতে পারেনি।

সেদিন বিকেলে কোম্পানির নতুন আনা লোকজনের মধ্যে আরও কয়েকজন রাতে পাহারায় যেতে অস্বীকার করল।

মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের মালিক খবরটা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর টেবিলে রাখা হিসাবের কাগজটা সামনে টেনে নিলেন।

লোক বাড়ছে। খরচ বাড়ছে। কিন্তু, কাজ পিছোচ্ছে। 

আর একজন মানুষ, যাকে তিনি প্রথমে স্রেফ একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল ভেবে পাত্তা দেওয়ার চিন্তা মাথায়ই আনেন নাই, এখন সে তার পুরো প্রকল্পের হিসাব বদলে দিতে শুরু করেছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/275720/</link>
				<pubDate>Sat, 19 Sep 2026 03:25:50 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় নয়)<br />
মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের মালিক শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিলেন, ভয় দেখিয়ে শ্রমিক ধরে রাখা যাবে না। একদল চলে গেছে, আরেকদল যাওয়ার কথা ভাবছে। এদিকে রাতের পাহারায় আর লোক পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ পাহাড়ের কাজ থামিয়ে রাখার মতো অবস্থাও নেই। তার ওপর প্রতিদিনের বিল, মেশিনের খরচ, রাস্তার কাজ, মালামাল আনা, শ্রমিকের মজুরি, সব মিলিয়ে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-275720"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/275720/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">b8ded8feeba1e9aec978c36b2450cfad</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় আট)
শ্রমিকেরা একে একে চলে যাওয়ার পর মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের কাজ যেন হঠাৎ করেই ধীর হয়ে গেল। দিনের আলোয় বাইরে থেকে দেখলে অবশ্য তেমন কিছু বোঝার উপায় ছিল না। পাহাড়ের গায়ে মাটি কাটার মেশিন দাঁড়িয়ে আছে। নতুন রাস্তার পাশে বাঁশের খুঁটি পড়ে আছে। কাঠ আর পাথরের স্তূপ আগের জায়গাতেই আছে। অস্থায়ী শেডগুলোর চুলা থেকে ধোঁয়া উঠছে। কিন্তু আগের সেই ব্যস্ততা আর নেই। যে জায়গায় সকাল থেকেই মানুষের হাঁকডাক শোনা যেত, সেখানে এখন মাঝেমধ্যে মেশিনের শব্দ উঠছে, আবার থেমেও যাচ্ছে। যদিও কয়েকজন শ্রমিক কাজ করছে, কিন্তু কাজের ফাঁকে তাদের চোখ বারবার চলে যাচ্ছে অরণ্যের দিকে।

কোম্পানি অবশ্য এতে থেমে থাকার পাত্র নয়। দুদিনের মধ্যেই তারা নতুন শ্রমিক আনলো।

খাগড়াছড়ির আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক জোগাড় করা হলো। কেউ আগে পাহাড় কাটার কাজে ছিল, কেউ রাস্তা তৈরির কাজে, কেউ আবার শুধু দিনমজুরির জন্য এসেছে। তাদের কাছে এই কাজটা ছিল ভালো মজুরির একটা সুযোগ। তারা ভাবছিল এই সুযোগে পাহাড়ি এলাকায় কয়েক মাস কাজ করে কিছু টাকা জমিয়ে বাড়ি ফিরবে।

কিন্তু নতুন শ্রমিকেরা পৌঁছানোর আগেই আগের শ্রমিকদের গল্প তাদের কাছে পৌঁছে গেল। তারা জেনে গেল, পাহাড়ে রাতে একা যাওয়া যায় না। কারণ অন্ধকারে কেউ একজন ঘোরা-ফেরা করে। তার কারণেই কিনা কেউ জানেনা, তবে এরই মধ্যে বেশ কয়েক জন আহত হয়েছে। আবার একজনকে অনেক দূরে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেছে।

কেউ কেউ বলেছে, তারা রেজোয়ানকে চোখের সামনে দেখেছে। আবার কেউ বলেছে, দেখেনি শুধু কয়েক হাত দূরে তার উপস্থিতিও টের পেয়েছে। এভাবেই গল্পের সঙ্গে গল্প যোগ হয়েছে, সত্যের সঙ্গে কল্পনা মিশেছে, আর শেষ পর্যন্ত কর্ণেল রেজোয়ান নামটা নতুন শ্রমিকদের কাছে এমন এক চরিত্রে পরিণত হয়েছে, যার বাস্তব অস্তিত্বের চেয়ে তার সম্পর্কে ছড়িয়ে পড়া ভয়টাই এখন বেশি শক্তিশালী।

নতুন শ্রমিকেরা প্রথম দিন পাহাড়ে এসে কাজ শুরু করল ঠিকই, কিন্তু সন্ধ্যার পর তাদের আচরণ বদলে গেল। কেউ অকারণে অরণ্যের দিকে যাচ্ছিল না। কাজ শেষ হওয়ার আগেই সবাই শেডের কাছে ফিরে আসছিল। রাতের খাবারের পর তারা দল বেঁধে বসে থাকত। সামান্য একটু দূরে কোথাও শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ হলেই তাদের কথাবার্তা থেমে যেত।

মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের ম্যানেজার বিষয়টা লক্ষ্য করছিল। সে কয়েকজনকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে এসব গুজব ছাড়া আর কিছু নয়। পাহাড়ে রাতের বেলায় পথ হারানো মোটেই অস্বাভাবিক নয়। বৃষ্টির পর মাটি নরম থাকে, ঢাল পিচ্ছিল হয়। কেউ পড়ে গিয়ে আহত হতে পারে। আর অন্ধকারে ভয় পেয়ে মানুষ অনেক কিছুই কল্পনা করে।
 
কথাগুলো যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু যুক্তি দিয়ে ভয় তাড়ানো যায় না। বিশেষ করে যখন একই ধরনের ঘটনা একবার নয়, পরপর বেশ ক’বার ঘটে।

এদিকে রেজোয়ান তার নিজের মত করেই চলছিল। দিনের বেলায় সে রিসোর্টের লোকজনের সামনে ইচ্ছা করেই আসত না। নিজের জমিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে কাজ বন্ধ করতে বলার মতো প্রকাশ্য কোনো কাজও সে আর করছিল না। সে জানত, একবার প্রকাশ্য সংঘর্ষে গেলে কোম্পানি তার বিরুদ্ধে প্রচারের সুযোগ পাবে। একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল, বয়স পঞ্চাশের ওপরে, জমি নিয়ে উত্তেজিত হয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে মারামারি করছেন, এই ছবিটাতে তাদেরই লাভ বেশী হবে।

রেজোয়ান তাদের সেই সুযোগ দিচ্ছিল না। তার লক্ষ্যও কোনো শ্রমিক নয়। যে মানুষগুলো দিনভর কোদাল চালায়, মাটি কাটে, বাঁশ বয়ে নিয়ে যায়, তাদের সঙ্গে রেজোয়ানের কোনো বিরোধ নেই। সে জানে, ওই মানুষগুলো শুধু মজুরির জন্য এসেছে। জমি কার, রিসোর্ট কার, প্রশাসনের সঙ্গে কার যোগাযোগ, এসব তাদের মাথাব্যথা নয়।

তাই রাতের পাহাড়ে তার চলাফেরার একটা অলিখিত সীমানা তৈরি হয়েছিল। কাজের লোকদের সে বরাবরই এড়িয়ে চলত।

শুধু যারা জায়গাটা পাহারা দিচ্ছে, যারা অন্যদের ভয় দেখিয়ে দখলটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখছে, যারা রাতের অন্ধকারে তাকে খুঁজতে বের হয়, তারাই কেবল তার লক্ষ্য ছিল।

এক রাতে তিনজন লোক নতুন রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল। নিচে শহরের দিক থেকে আসা বাতাস পাহাড়ের ঢালে উঠে এসে তাদের গায়ে লাগছিল। বর্ষার শেষ হলেও বাতাসে এখনো আর্দ্রতা। দূরের পাহাড়ের গায়ে কোথাও কোথাও মেঘ আটকে আছে। যদিও অন্ধকারে সেই মেঘ আর পাহাড়ের মধ্যে পার্থক্য ঠিক বোঝা যায় না।

পাহারাদার তিনজনের হাতে টর্চ। একজনের হাতে লাঠি। তারা নিচু গলায় কথা বলছিল।

“এদিকে কেউ এলে খবর দিস।”

“কেউ আসবে না।”

“তবু চোখ খোলা রাখ।”

তারা জানত না, রাস্তার প্রায় পঞ্চাশ গজ ওপরে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রেজোয়ান তাদের দেখছে। তার শরীরের বেশিরভাগ অংশ অন্ধকারে ঢাকা। শুধু মুখের এক পাশ সামান্য দৃশ্যমান। তার চোখ স্থির। শ্বাস একদম ধীর।

সে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতি মাপল। তিনজন। মাঝখানে প্রায় দশ হাত ফাঁক। পেছনে বাঁশঝাড়। ডানদিকে ঢাল নেমে গেছে। বাঁদিকে শুকনো পাতায় ঢাকা সরু পথ।

রেজোয়ান নিচে নামল না। বরং আরও ওপরে উঠল। একটা বাঁক ঘুরে এমন জায়গায় পৌঁছাল যেখান থেকে নিচের পথটা আড়াআড়ি দেখা যায়। তারপর একটা ছোট পাথর হাতে তুলে নিল।

পাথরটা খুব বড় নয়। সে নিচের রাস্তার একটু দূরে সেটা ছুড়ে দিল। টক্ করে একটা শব্দ হলো।

তিনজন একসঙ্গে টর্চ ঘুরিয়ে দিল। 

“কী হলো?” একজন জানতে চাইলো। 

বাকী দুজনের কেউ উত্তর দিল না।

একজন টর্চ নিয়ে সামনে এগোল। আরেকজন তার পেছনে। তৃতীয়জন দাঁড়িয়ে রইল। সামনের লোকটা ঝুঁকে মাটির দিকে তাকাল। 

ঠিক সেই মুহূর্তে রেজোয়ান অন্ধকার থেকে নেমে এল। তার চলার শব্দ হলো না। একটা হাত পেছনের লোকটার মুখ চেপে ধরল। অন্য হাত তার কনুই নিয়ন্ত্রণ করল।

লোকটা ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই রেজোয়ান তার শরীরের ভারসাম্য সরিয়ে দিল। হাঁটু ভেঙে লোকটা মাটিতে নেমে গেল। 

রেজোয়ান তাকে আঘাত করল না। শুধু কয়েক সেকেন্ডের জন্য এমনভাবে ধরে রাখল যাতে সে উঠে দাঁড়াতে না পারে।

তারপর কানে কানে বলল, “ফিরে যাও।”

লোকটা আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে রইল। 

পরের মুহূর্তে রেজোয়ান তাকে ছেড়ে দিল।

লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকাল। কেউ নেই। শুধু অন্ধকার।

তার টর্চের আলো গাছের গায়ে পড়ছে। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওপর থেকে একটা শুকনো ডাল তার সামনে এসে পড়ল।

লোকটা চমকে পিছিয়ে গেল। তারপর দৌড়ে সঙ্গীদের কাছে ফিরে গেল। আতংকিত স্বরে বললো, “ওখানে কেউ ছিল!”

অন্য দুজন টর্চ নিয়ে ছুটে এল। “কোথায়?”

লোকটা হাত তুলে পাহাড়ের দিকে দেখাল। কিন্তু সেখানে কাউকে দেখা গেল না।

রেজোয়ান তখন অনেক দূরে। সে সোজা নিচে নামেনি। পাহাড়ের ঢাল ব্যবহার করে পাশের একটা সরু পথ ধরে সরে গেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে সে এমন জায়গায় পৌঁছে গেল, যেখান থেকে রিসোর্টের আলো দেখা যায়, কিন্তু রিসোর্ট থেকে তাকে দেখা কখনোই সম্ভব নয়।

সে থামল। পেছনে তাকাল। তিনজন লোক এখনো আলো ফেলছে।

রেজোয়ানের ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য হাসি ফুটল। তারপর সে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

পরদিন সকালে ঘটনাটা ছড়িয়ে পড়ল। কেউ আহত হয়নি কিংবা মারা যায়নি। তারপরেও পরিষ্কার করে কেউ বলতে পারল না, আসলে ঠিক কী হয়েছিল।

কিন্তু পাহারাদারদের মধ্যে একটা নতুন ভয় জন্ম নিল। রেজোয়ান শুধু আঘাত করতে পারে না। সে চাইলে সামনে এসে আবার পরক্ষণেই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।

এরপর কয়েক রাত তুলনামূলক শান্ত গেল। কিন্তু সেই শান্তি ছিল আসলে ঝড়ের আগের নীরবতার মতো।

এক রাতে দুই পাহারাদার অরণ্যের একটা অংশে গিয়ে দেখল, সেখানে রাখা নির্মাণসামগ্রীর কিছু অংশ সরানো হয়েছে। তারা ভাবল, হয়তো শ্রমিকেরা জায়গা বদলেছে। তারপর একজন টর্চের আলো ফেলে মাটিতে কয়েকটা পায়ের ছাপ দেখতে পেল।

দুটো জোড়া। একটা তাদের নিজেদের। আরেকটা অন্য কারও। পায়ের ছাপগুলো তাদের চারপাশে ঘুরে আবার অরণ্যের দিকে চলে গেছে।

কেউ কিছু বলল না। 

পরদিন সকালে ম্যানেজার বিষয়টা শুনে বিরক্ত হলো। তার কথা একটাই, কোনমতেই কাজ থামানো যাবে না।

রিসোর্টের কাজের সময়সূচি ইতিমধ্যে পিছিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার ভিত্তি তৈরির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পাহাড় কেটে জায়গা সমান করার কাজও অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু শ্রমিক কমে যাওয়ায় কাজের গতি কমেছে। নতুন লোক এসেছে, কিন্তু তারা পুরোপুরি কাজে অভ্যস্ত নয়। পুরনো শ্রমিকদের জায়গা নতুন লোক দিয়ে পূরণ করা এত সহজ নয়।

আর সবচেয়ে বড় সমস্যা রাতের পাহারা। আগে যেখানে তিনজন লোক যথেষ্ট মনে হতো, এখন সেখানে চারজন লাগছে। তারপর পাঁচজন। কারণ কেউ আর একা যেতে চাইছে না। বাস্তবতা হলো, অরণ্যের সীমানায় কেউ আর দাঁড়াতেই চাইছে না।

যার দরুন রাতের শিফট বারবার বদলাতে হচ্ছে। 

আবার কোম্পানির হিসাবের খাতায় এই অতিরিক্ত লোকজনের জন্য আগে থেকেই আলাদা কোনো বাজেট ছিল না।

রিসোর্টের হিসাবরক্ষক একদিন ম্যানেজারের সামনে বসে কাগজপত্র দেখছিল। টেবিলের ওপর চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে গেছে। বাইরে দুপুরের রোদ পাহাড়ের ঢালে পড়েছে। অথচ ঘরের ভেতরের পরিবেশ ভারী। “নতুন লোক আনতে আবার টাকা লাগবে।” সে বললো।

ম্যানেজার বিরক্ত হয়ে বলল, “লোক আনলে টাকা লাগবেই।”

“আগের তিনজনও চলে যেতে চাইছে।”

ম্যানেজার চুপ করে গেল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “কেন?”

লোকটা উত্তর দিল, “তারা রাতে পাহারা দিতে রাজি না।”

এই কথাটা শুনে ম্যানেজার কিছুক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। দূরে পাহাড়। সবুজের ওপর রোদের ছায়া। দেখলে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত জায়গাগুলোর একটা। কিন্তু এই শান্ত পাহাড়টাই এখন কোম্পানির জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সেদিন সন্ধ্যায় আরও কয়েকজন শ্রমিকের মধ্যে কথা ছড়িয়ে পড়ল। কাজ শেষ হওয়ার পর তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল।

একজন বলল, “রাতে থাকবি?”

অন্যজন মাথা নাড়ল। “আমি না।”

“কাজ ছেড়ে দিবি?”

“হ্যাঁ।”

“এত ভালো মজুরি?”

লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর অরণ্যের দিকে তাকিয়ে বলল, 
“মজুরি দিয়ে যদি জীবন কিনতে না পারি, তাইলে ওই টাকা দিয়ে কী করব?”

কথাটা খুব নিচু গলায় বলা হয়েছিল। কিন্তু পাশের সবাই শুনেছিল। তারপরেও কেউ কোনো প্রতিবাদ করল না।

সেই রাতে রেজোয়ান পাহাড়ের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার সামনে বিস্তৃত খাগড়াছড়ির পাহাড়। দূরের ঢালে অল্প অল্প আলো। কোথাও পাহাড়ি গ্রামের ঘর, কোথাও একলা বাতি, কোথাও সম্পূর্ণ অন্ধকার। নিচে একটা ছড়া পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে একটানা শব্দ করে বয়ে যাচ্ছে। বাতাসে বাঁশপাতার মৃদু ঘর্ষণ এর শব্দ।

রেজোয়ান অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে বিজয়ের কোনো ছাপ নেই। সে জানে, যুদ্ধ এখনো শুরুই হয়নি। এখন পর্যন্ত সে শুধু একটা বিষয় পরীক্ষা করেছে। সে আসলে দেখতে চেয়েছিল এখানে থাকা কোম্পানির লোকেরা কতটা ভয় পায়।

আর সেই পরীক্ষার ফলাফল তার প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হয়েছে। কিন্তু সে এটাও জানে, ভয়কে অতিরিক্ত সময় দিলে একসময় মানুষ মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু, সেটা সে চায় না।

তার যুদ্ধ কারও জীবন নেওয়ার জন্য নয়। বরং তার যুদ্ধ স্রেফ নিজের দখলকৃত জমিটা ফেরত পাওয়ার জন্য। সে ধীরে ধীরে পাহাড় থেকে নেমে এল।

অন্যদিকে, একই রাতে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের ম্যানেজার কোম্পানির মালিকের কাছে একটা হিসাব পাঠালো। 

কাজের গতি কমেছে। নতুন শ্রমিকের খরচ বেড়েছে। পাহারাদারের সংখ্যা বেড়েছে। তাই রাতের শিফটের জন্য অতিরিক্ত টাকা লাগছে। এদিকে কয়েকজন শ্রমিকও চলে গেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, নির্মাণের মূল কাজ শুরু করার আগেই প্রকল্পের সময়সূচি পিছিয়ে যাচ্ছে। 

মালিক রিপোর্টটা হাতে নিয়ে প্রথমে বিরক্ত হলেন। তারপর হিসাবটা আবার পড়লেন। সংখ্যাগুলো ছোট ছোট।

কিন্তু সবগুলো একসঙ্গে যোগ করলে মোট অঙ্কটা নেহায়েৎ ছোট নয়। এক-দুই দিনের ক্ষতি নয়। পুরো এক সপ্তাহের ক্ষতি। এভাবে কাজ যদি আরও পিছোয়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে কাচের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। নিচে ঢাকার ব্যস্ত শহর অবিরাম ছুটছে। গাড়ির আলো। মানুষের ভিড়। অফিসের আলো। সবকিছু স্বাভাবিক।

তারপরও তার মাথায় তখন খাগড়াছড়ির একটা অন্ধকার পাহাড়। সেখানে একজন মানুষ আছে। দিনের আলোয় প্রায় অদৃশ্য। শুধু রাতে তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। যদিও এখন পর্যন্ত সে কোম্পানির বড় কোনো ক্ষতি করেনি।

কোনো মেশিন ভাঙেনি। শ্রমিককে মারেনি। স্থাপনা ধ্বংস করেনি। তবু তার কারণে কোম্পানির টাকা যাচ্ছে। কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে। আর মানুষ চলে যাচ্ছে।

আর এই প্রথমবার মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের মালিক রেজোয়ানকে জমির মালিক হিসেবে নয়, একটা ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে দেখতে শুরু করলেন। তিনি টেবিলে রাখা হিসাবের কাগজটা আবার হাতে নিলেন। তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন। ধীরে ধীরে বললেন, “এই লোকটাকে থামাতে না পারলে, জায়গাটা পেয়েও আমাদের কোনো লাভ হবে না।”

ঘরের ভেতর উপস্থিত কেউ তার কথাটার কোনো উত্তর দিল না। কারণ তারা সবাই জানত, কথাটা দিবালোকের মত সত্যি।
 “দ্যাট্স হোয়াই, হী মাস্ট বি স্টপ্ড এট এনি কস্ট।” কথাটা সে আস্তে বললেও উপস্থিত সবারই মনে হলো, নিজ কানে তা শুনতে পেয়েছে। 
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/275447/</link>
				<pubDate>Fri, 18 Sep 2026 04:48:06 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় আট)<br />
শ্রমিকেরা একে একে চলে যাওয়ার পর মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের কাজ যেন হঠাৎ করেই ধীর হয়ে গেল। দিনের আলোয় বাইরে থেকে দেখলে অবশ্য তেমন কিছু বোঝার উপায় ছিল না। পাহাড়ের গায়ে মাটি কাটার মেশিন দাঁড়িয়ে আছে। নতুন রাস্তার পাশে বাঁশের খুঁটি পড়ে আছে। কাঠ আর পাথরের স্তূপ আগের জায়গাতেই আছে। অস্থায়ী শেডগুলোর চুলা থেকে ধোঁয়া উঠ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-275447"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/275447/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">73bf7a925dfe22a24ae62cfa25bfe6a8</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় সাত)
রাতের পর রাত কেটে যাচ্ছিল, আর মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের লোকজন ধীরে ধীরে একটা অস্বস্তিকর অবস্থার সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠছিল। দিনের পাহাড় আর রাতের পাহাড় এক থাকলো না। সূর্য ওঠার পর যে ঢালটা সাধারণ একটা রাস্তা, দুপুরে যার ওপর দিয়ে শ্রমিকেরা হাসতে হাসতে ওঠানামা করে, সন্ধ্যা নামার পর সেই একই ঢাল অন্ধকারের মধ্যে নিজের চেহারাটাই বদলে ফেলে। বাঁশঝাড়ের ছায়া তখন আরও ঘন হয়। শুকনো পাতার ওপর সামান্য শব্দও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। ভেজা মাটিতে পায়ের ছাপ বসে থাকে। আবার কোথাও পাথুরে জমি যেখানে কোনো রকম শব্দই হয় না। দিনের বেলায় যেসব গাছ কেবলি গাছ, রাতের অন্ধকারে তাদের কা-ই হয়ে ওঠে বিশাল আড়াল। সেই সব গাছের ডালপালা হয়ে ওঠে দৃষ্টির বাধা, আর পাহাড়ের ঢাল হয়ে ওঠে এমন এক গোলকধাঁধা, যেখানে যে কোনো মানুষ নিজের পূর্ব পরিচিত পথটাও চিনতে ভুল করতে পারে।

রেজোয়ান এই পরিবর্তনটা বহু আগেই বুঝেছিল। সে বরং অপেক্ষা করছিল, অন্যরা কখন সেটা বুঝবে।

দিনের আলোয় তাকে প্রায় সবসময় স্বাভাবিক একজন মানুষ হিসেবেই দেখা যেত। কখনো নিজের গাড়ি নিয়ে খাগড়াছড়ি শহরে ঢুকছে, কখনো মাউন্ট ইন-এর লবিতে বসে চা খাচ্ছে, আবার কখনো পুরনো পরিচিত আবদুল করিমের বাড়ির উঠানে বসে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তার পোশাকেও তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই। বেশীরভাগ সময় তাকে দেখা যেত গাঢ় রঙের প্যান্ট, সাথে ফরমাল শার্ট, আবার কখনো হালকা জ্যাকেট পরে আছে। তাকে দেখে যেন কেউ ভেবে নেয়, নিজের জমি নিয়ে ঝামেলায় পড়া একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা যে কয়েকদিনের জন্যে আশপাশ এলাকায় এসে অবস্থান করছেন। যদিও এজন্য তার মুখে কোনো উত্তেজনার ছাপ নেই। চোখেও কোনো তাড়া নেই।

কিন্তু রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষটার চলাফেরার ধরন বদলে যেত। রেজোয়ান তখন আর অন্ধকারে হাঁটত না, বরং বলা চলে অন্ধকারের মধ্য দিয়েই চলত। এ দুটির মধ্যে পার্থক্য কিন্তু অনেক।

সে কখনো সোজা পথে হাঁটত না, যেহেতু এতে সুবিধা ছিল পাশ দিয়ে আড়াল ব্যবহার করে এগোনো যায়। শুকনো পাতার ওপর পা রাখার আগে চোখ নামিয়ে আগে মাটি দেখত। পাথরের ওপর পা না দিয়ে ভেজা মাটির নরম অংশ বেছে নিত। কোনো ঝোপে ঢোকার আগে হাত দিয়ে ডাল সরিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিত, যাতে ওদিক দিয়ে তার যাওয়ার কোনো চিহ্ন না থাকে। ঢাল বেয়ে নামার সময় শরীরটা সামান্য নিচু রাখত, যাতে হাঁটু ঢিলে থাকে, ওজনটা পায়ের মাঝখানে পড়ে। যার কারণে কখনো পা পিছলে গেলেও পুরো শরীর একসঙ্গে ভারসাম্য হারাবার ভয় থাকে না।

এই অভ্যাসগুলো কোনো নতুন কৌশল নয়। । বরং পুরনো সামরিক কৌশল, যা তার শরীর বহু বছর আগে থেকেই রপ্ত করে নিয়েছে।

কমান্ডো প্রশিক্ষণ মানুষের মাংসপেশিকে শুধু শক্ত করে না, তার প্রতিক্রিয়াকেও বদলে দেয়। বিপদ দেখার আগে বিপদের সম্ভাবনা দেখতে শেখায়। শব্দ শোনার আগে শব্দের উৎস আন্দাজ করতে শেখায়। সামনে কী আছে তার চেয়ে কোথা থেকে বিপদ আসতে পারে, সেটা ভাবতে শেখায়। রেজোয়ানের ক্ষেত্রে বয়স সেই অভ্যাসগুলোর কোনটাই মুছে দিতে পারেনি।

বরং বয়স তাকে আরও হিসেবি করেছে। সে জানে, পঞ্চাশ পেরোনোর পর তরুণ বয়সের মতো শক্তির ওপর ভরসা করা বোকামি। তাই সে শক্তি খরচ করে না। প্রয়োজনের আগে দৌড়ায় না। অকারণে সংঘর্ষে জড়ায় না। তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার শরীর নয়, তার মাথা।

সে কারণেই সে পেরেছে পাহাড়কে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে।

সেই রাতটাও ছিল অন্ধকার। আকাশে চাঁদ ছিল না। পাহাড়ের মাথার ওপর মেঘ জমে থাকায় তারার আলো প্রায় দেখাই যাচ্ছিল না। রিসোর্টের নির্মাণ এলাকায় কয়েকটা বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছিল। আলোয় মাটি, মেশিন, বাঁশ আর শ্রমিকদের থাকার শেড পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু আলো শেষ হওয়ার পরই শুরু হয়েছে অন্য জগত। সেখানে গাছের গায়ে আলো পৌঁছায় না। বাঁশঝাড়ের ভেতর কেবল কালো স্তর, আর তারও পেছনে পাহাড়ের ঢাল।

দুজন পাহারাদার সেদিকেই যাচ্ছিল। তাদের হাতে টর্চ। একজনের হাতে লাঠি।

আগের কয়েকটি ঘটনার পর তারা সতর্ক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সতর্কতা আর অভ্যাসগত প্রশিক্ষিত সতর্কতার মধ্যে পার্থক্য আছে। তারা বারবার টর্চ ঘুরিয়ে চারপাশ দেখছিল। টর্চের আলো একবার সামনে, একবার ডানে, একবার বাঁয়ে ছুটে যাচ্ছিল। ফলে অন্ধকারের মধ্যে তারা যতটা দেখতে পাচ্ছিল, তার চেয়ে বেশি বরং দেখতে পাচ্ছিল না।

রেজোয়ান তখন তাদের প্রায় ত্রিশ গজ সামনে। একটা মোটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে। দুজন তাকে দেখতে পাচ্ছিল না। কিন্তু সে ঠিকই তাদের গতিবিধি দেখছিল।

প্রথম লোকটা একটু দ্রুত হাঁটছিল। দ্বিতীয়জন তার থেকে প্রায় চার হাত পিছনে। মাঝখানে কয়েক গজ খোলা জায়গা। বাঁ দিকে শুকনো পাতায় ঢাকা একটা সরু পথ। ডান দিকে একটা ঢাল নিচে নেমে গেছে।

রেজোয়ান ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। তার পায়ের নিচে একটা শুকনো ডাল ছিল। পা তুলে সে ডালটা এড়িয়ে গেল। এক ইঞ্চিও শব্দ হলো না।

দুজন পাহারাদার সামনে এগিয়ে গেল। রেজোয়ান তাদের পেছনে গেল না। সে অপেক্ষা করল। কারণ সে জানে, মানুষকে ভয় দেখানোর সবচেয়ে ভালো সময় তখনই, যখন মানুষ মনে করে সে আসলে নিরাপদ।

আরও কিছুক্ষণ পর দুজন পাহারাদার রাস্তার একটা বাঁকে পৌঁছাল। সামনের লোকটা টর্চের আলো ফেলল। কিছুই দেখতে পেল না।

সে এক পা এগোল। তারপরই মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে থাকা একটা পাতলা বাঁশের লতা তার গোড়ালির সঙ্গে জড়িয়ে গেল। লোকটা বুঝে ওঠার আগেই পা আটকে গেল। শরীর সামনে ছিটকে গেল। সে দুহাত বাড়িয়ে নিজেকে সামলাতে চাইল। কিন্তু পারল না। ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। তার টর্চ হাত থেকে ছিটকে গিয়ে কয়েক হাত দূরে পড়ে আলো ছড়াতে লাগল। 

পেছনের লোকটা তাকে তুলতে এগিয়ে গেল।

ঠিক তখনই রেজোয়ান অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল। এক ঝলক। শুধু কয়েক মুহূর্তের জন্য।

পেছনের লোকটা ঘুরে দাঁড়াতেই তার চোখের সামনে একটা ছায়া। সে হাত তুলতে গেল। রেজোয়ানের ডান হাত বিদ্যুতের মতো উঠে এল। কবজি ধরে টান। লোকটার শরীর সামনে চলে এল।

পরের মুহূর্তে রেজোয়ানের বাঁ কাঁধ তার বুকের সঙ্গে ঠেকল। শরীরের ঘূর্ণনের সঙ্গে লোকটার ভারসাম্য চলে গেল। মাটিতে পড়ার আগেই রেজোয়ানের পা তার পায়ের পেছনে ঢুকে গেছে। 

একটা মোচড়। লোকটা কাদার ওপর আছড়ে পড়ল। তার মুখ থেকে চাপা গোঙানি বের হলো। 

রেজোয়ান তার ওপর চেপে বসল না। প্রয়োজনও নেই। এক হাত দিয়ে কবজি নিয়ন্ত্রণে রেখে নিচু গলায় বলল, “শান্ত থাক।”

লোকটা ছটফট করছিল। 

রেজোয়ান তার হাত ছেড়ে দিল। তারপর উঠে দাঁড়াল। “ওকে নিয়ে ফিরে যাও।”

লোকটা তাকিয়ে রইল। তার চোখে তখন ভয়। কারণ সে প্রথমবার বুঝতে পারল, সামনে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে সে শুধু শক্তিশালী নয়, তার প্রতিটি নড়াচড়া হিসেব করা।

রেজোয়ান আহত লোকটার দিকে তাকাল। লোকটা তখনো মাটিতে পড়ে আছে। গোড়ালির কাছে লতা জড়িয়ে ছিল। রেজোয়ান সেটা কেটে ছিঁড়ে সরিয়ে দিল। তারপর লোকটাকে বসিয়ে দিল। 

“হাঁটতে পারবে?”

লোকটা মাথা নাড়ল।

রেজোয়ান তার টর্চটা তুলে হাতে দিল। “তাহলে ফিরে যাও।” এর বেশি কিছু বলল না সে। তারপর ঘুরে দাঁড়াল।

দুজন পাহারাদার তখনও তাকিয়ে আছে। রেজোয়ান তিন পা এগিয়ে একটা বাঁশঝাড়ের আড়ালে ঢুকল। পরমুহূর্তে তাকে আর দেখা গেল না।

লোক দুজন টর্চের আলো এদিক-ওদিক ঘোরাতে লাগল। কেউ নেই। শুধু বাঁশপাতা সামান্য দুলছে। তারা বুঝতে পারল না, লোকটা কোনদিকে গেল।

আসলে রেজোয়ান তখন তাদের থেকে অনেক দূরে, একটা নিচু ঢালের আড়ালে চলে গেছে। শরীর নিচু করে সে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। পাহারাদারদের টর্চের আলো দূরে সরে গেল। তারপর সে উঠে দাঁড়িয়ে অন্য পথ ধরল।

সোজা রিসোর্টে ফিরে গেল না। আরেকটা পাহাড়ি পথ ধরে ঘুরে নিজের থাকার জায়গার দিকে চলে গেল।

পরদিন সকালে ঘটনাটা রিসোর্টে পৌঁছাল। দুজন পাহারাদারই বেঁচে ফিরেছে। একজনের গোড়ালি মচকে গেছে। অন্যজনের কাঁধে আঘাত।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কেউ বলতে পারছে না তাদের আক্রমণ করেছিল কে। 

একজন বলল, সে শুধু একটা ছায়া দেখেছে। আরেকজন বলল, লোকটা সামনে ছিল। তারপরই নেই।

কোম্পানির লোকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লতা, ভাঙা ডাল আর মাটির দাগ ছাড়া কিছুই পেল না। 

কেউ রেজোয়ানের নাম মুখে আনল না। যদিও নামটা সবার মাথায় ছিল।

তারপর থেকে রিসোর্টের পাহারায় নতুন নিয়ম হলো। কেউ একা বের হবে না। দুজন একসঙ্গে যাবে। সাথে টর্চের অতিরিক্ত ব্যাটারি থাকবে। সীমানার কাছে যাওয়ার আগে ম্যানেজমেন্টকে খবর দিয়ে রাখতে হবে।

কিন্তু নিয়ম যত বাড়ল, ভয়ও তত বাড়ল। কারণ পাহারাদাররা বুঝতে পারছিল, দুজন একসঙ্গে থাকলেও তাদের কেউ পাহাড়কে চেনে না। আর যে মানুষটা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, সে পাহাড়কে চেনে।

কয়েকদিন পর আরেক ঘটনা ঘটল। এবার একজন পাহারাদার পথ হারাল।

লোকটা আগেও ওই পথে গেছে। রাস্তার কোন বাঁকে শুকনো গাছ, কোথায় ছড়া, কোথায় বাঁশঝাড়, সবই তার পরিচিত। কিন্তু সেদিন রাতের অন্ধকারে কয়েক মিনিটের মধ্যে সে এমন জায়গায় চলে গেল যেখানে কোনো আলো নেই, কোনো পরিচিত চিহ্ন নেই।

সে ফিরে আসতে চেষ্টা করল। একটা পথ ধরে এগোল। তারপর আরেকটা। কিছুক্ষণ পর মনে হলো সে আবার ঘুরে আগের সেই জায়গাতেই এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সে আসলে অরণ্যের আরও গভীরে চলে গেছে।

দুই ঘণ্টা পর তাকে পাওয়া গেল। রিসোর্ট থেকে অনেক দূরে একটা পাহাড়ি ঢালের নিচে। জামাকাপড় কাদায় ভরা। হাতের চামড়া আঁচড়ে গেছে। টর্চের ব্যাটারি শেষ। সে শুধু বলল, “আমি বারবার একই জায়গায় ঘুরছিলাম।”

কেউ তাকে বিশ্বাস করল না। কিন্তু পরদিন যখন ঘটনাস্থল দেখা হলো, তখন কেউ আর হাসল না। কারণ তার চলার পথটা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না।

এক জায়গায় তার পায়ের ছাপ হঠাৎ শেষ হয়েছে। তারপর প্রায় ত্রিশ গজ দূরে আবার সেই ছাপ পাওয়া গেছে। মাঝখানের অংশে কোনোরকম স্পষ্ট চিহ্ন নেই, যা দেখে বলা যায় সে নিজেই হেঁটে গেছে।

সেই রাতে রেজোয়ান প্রকৃতই কোথায় ছিল, সেটা কেউ জানে না। শুধু করিম জানত। কারণে গভীর রাতে তার ঘরের দরজা তাকে একবার খুলতে হয়েছিল।

রেজোয়ান ভেতরে ঢুকে জুতো খুলে রেখেছিল। তার প্যান্টের নিচের অংশে সামান্য কাদা। হাতে একটা আঁচড়।

করিম কিছু জিজ্ঞেস করেনি। রেজোয়ানও কিছু বলেনি।

বাইরে তখন পাহাড়ি বাতাস বইছে। বাঁশঝাড়ে পাতার শব্দ। দূরের ছড়ায় পানি বয়ে যাচ্ছে।

কয়েক মিনিট পর রেজোয়ান জানালার পাশে দাঁড়াল। দূরে অন্ধকার পাহাড়। আর তারও ওপারে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্ট।

রেজোয়ানের চোখে তখনও কোনো উল্লাস নেই। সে জানে, এই লড়াইয়ে তাকে যতটা সম্ভব সীমার মধ্যে থাকতে হবে। কাউকে হত্যা করা যাবে না। অপ্রয়োজনীয় রক্তপাত করা যাবে না। 

শুধু তাদেরকে একটা স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। কিন্তু এমনভাবে যাতে আইন তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সুযোগ না পায়। সহজ কথায়, সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙ্গে।

দিনের বেলায় কোম্পানি তাদের মেশিন, লোকবল আর টাকা নিয়ে যত খুশী পাহাড় দখল করে রাখুক। কিন্তু, রাত হলেই পাহাড় তার। এবং সেই রাতগুলোতে রেজোয়ান তাদের বুঝিয়ে দেবে, জমির কাগজ আসলেই এক দলা কাগজ নয়। 

তারপর আর একদিন দুপুরে কয়েকজন শ্রমিক পাহাড়ের নিচের একটা চায়ের দোকানে বসেছিল। তাদের মাঝে কাজের ফাঁকে চা, বিস্কুট আর বিড়ি নিয়ে বেশ গল্প চলছিল। অরণ্যের দিকে তখন রোদ পড়েছে। দূরের পাহাড় নীলচে। বাতাসে শুকনো বাঁশপাতার গন্ধ।

একজন ভয় মাখানো কণ্ঠে আস্তে বলল, “রাতে আমি আর ওইদিকে যাব না।”

তার কথা শুনে আরেকজন হাসল। “তুই কর্ণেলকে ভয় পেয়েছিস?”

লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “লোকটাকে ভয় পাই না। ভয় পাই রাতটাকে।”

কথাটা শুনে আর কেউ হাসল না। কারণ সবাই একইভাবে ভাবছিল। রেজোয়ানকে তারা অনেকেবার দেখেছে। কিন্তু সেই লোকটাই যখন রাতে আসে, তখন আর তাকে দেখা যায়না।

এখন অবধি তারা শুধু ফলাফল দেখেছে। একজন পড়ে গেছে। আর একজন পথ হারিয়েছে। তারপর আরো একজন আহত হয়েছে।

আবার একজন অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে ফিরে এসে বলেছে, কেউ তাকে দেখছিল।

ধীরে ধীরে রেজোয়ানকে নিয়ে গল্প তৈরি হলো। কেউ বলল, সে একা দশজনকে সামলাতে পারে। কেউ বলল, তার চোখ অন্ধকারেও দেখে। কেউ বলল, সে পাহাড়ের প্রতিটি পথ চেনে। আবার কেউ বলল, কর্ণেল সাহেব দিনে মানুষ হলেও, রাতে অশরীরি কিছু।

গল্প যত বাড়ল, ভয়ও তত বাড়ল। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা হলো শ্রমিকদের মধ্যে।

আগে তারা দিনের কাজ শেষ হলে রাতে শেডে ফিরে নিশ্চিন্তে খাওয়া-দাওয়া করত। এখন সন্ধ্যা নামার আগেই সবাই নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে চাইত। কেউ একা বাইরে যেত না। টয়লেটে গেলেও দুজন যেত। পানি আনতে হলেও দুজন।

রাতের পাহাড়ের দিকে তাকালে তাদের চোখে অস্বস্তি দেখা যেত। কারণ দিনের আলোয় তারা জানত কোথায় কী আছে। কিন্তু, রাতে তারা চারিদিক অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেত না।

এক সন্ধ্যায় কাজ শেষ হওয়ার পর কয়েকজন শ্রমিক শেডের সামনে বসে ছিল। পাহাড়ের ওপর শেষ আলোটুকু তখন নিভে আসছে। দূরের ঢাল ধীরে ধীরে কালো হয়ে যাচ্ছে। বাঁশঝাড়ের মাথা বাতাসে দুলছে।

একজন নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে নিল। 

আরেকজন তাকাল। “কোথায় যাচ্ছিস?”

লোকটা ব্যাগ কাঁধে তুলল। “বাড়ি।”

“আজ?”

“আজই।”

কেউ তাকে থামাল না। কারণ তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, সিদ্ধান্তটা সে অনেকক্ষণ আগেই ভেবে নিয়েছে।

আর তার পরের দিন আরও দুজন একই কথা বলল। তারা কাজ ছেড়ে দেবে। মজুরি কম বলে নয়। কাজ কঠিন বলে নয়। পাহাড় দুর্গম বলে নয়।

তাদের ভয় হচ্ছে রাতকে। কারণ তারা বুঝে গেছে, দিনের কাজ শেষ হলেই সব কিছু শেষ হয় না। দিনের শেষে যখন মেশিন বন্ধ হয়ে যায়, শ্রমিকেরা শেডে ফিরে যায়, আলো নিভে আসে, তখন পাহাড়ের আরেকটা পালা শুরু হয়।

সেই পালায় কোম্পানির মেশিন নেই। লোকবল নেই। কোন টাকা নেই। 
আছে শুধু অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের মধ্যে কোথাও একজন মানুষ হাঁটে। নিঃশব্দে। ধীরে। হিসেব করে।

মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের লোকেরা এখনো তাকে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। কিন্তু একটা জিনিস তারা বুঝতে শুরু করেছে। রেজোয়ান তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে না। সে শুধু তাদের ভয় শেখাচ্ছে।

আর ভয় যখন একবার মানুষের মনে জায়গা করে নেয়, তখন তাকে পাহারা দিয়ে, টাকা দিয়ে, আদেশ দিয়ে কিংবা বন্দুক দেখিয়ে সবসময় সরানো যায় না।

সেদিন রাতে রেজোয়ান পাহাড়ের একটা উঁচু ঢালে দাঁড়িয়ে নিচের রিসোর্টের আলো দেখছিল। বাতাসে দূরের ছড়ার শব্দ ভেসে আসছিল। নিচে কয়েকটা আলো নড়ছে, পাহারাদাররা টহল দিচ্ছে।

রেজোয়ান স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। অন্ধকার তাকে গিলে নিল।

নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পাহারাদাররা কিছুই দেখল না। শুধু একজন হঠাৎ থেমে চারপাশে তাকাল। কেন থামল, সে নিজেও জানে না। কিছু শুনেছে কি না, তাও জানে না। কিন্তু তার বুকের ভেতর অকারণে একটা শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে গেল।

সে টর্চটা শক্ত করে ধরল। তারপর খুব নিচু গলায় সাথের জনকে বলল, “চলো... ফিরে যাই।”

সেদিন থেকে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টে আরেকটা সমস্যা শুরু হলো।

রেজোয়ান তাদের জমি থেকে সরাতে পারেনি, কিন্তু তাদের মানুষগুলোকে সেখানে থাকতে অনিচ্ছুক করে তুলেছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/275036/</link>
				<pubDate>Thu, 17 Sep 2026 03:29:05 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় সাত)<br />
রাতের পর রাত কেটে যাচ্ছিল, আর মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের লোকজন ধীরে ধীরে একটা অস্বস্তিকর অবস্থার সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠছিল। দিনের পাহাড় আর রাতের পাহাড় এক থাকলো না। সূর্য ওঠার পর যে ঢালটা সাধারণ একটা রাস্তা, দুপুরে যার ওপর দিয়ে শ্রমিকেরা হাসতে হাসতে ওঠানামা করে, সন্ধ্যা নামার পর সেই একই ঢাল অন্ধকারের মধ্যে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-275036"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/275036/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">c0f6c10baf801592bab7369f4b3485da</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় ছয়)
রিসোর্টে প্রথম ঘটনার পরের সকালটা অস্বাভাবিক নীরব ছিল। মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নির্মাণ এলাকায় প্রতিদিন সকাল হলেই যে হৈচৈ শুরু হতো, সেদিনও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কথা ছিল না। শ্রমিকেরা ঘুম থেকে উঠে চা-সিগারেট খাবে, কেউ বাঁশ কাঁধে নিয়ে বের হবে, কেউ মাটি কাটার জায়গায় যাবে, মেশিনের ইঞ্জিন গর্জে উঠবে, ট্রাকের চাকা কাদামাটির ওপর গভীর দাগ কেটে পাহাড়ের দিকে উঠবে, সবকিছু আগের মতো চলবে। 

কিন্তু সেদিন মানুষজন কথা বলছিল কিছুটা নিচু গলায়। কেউ একা অরণ্যের দিকে যেতে চাইছিল না। আগের রাতে যে পাহারাদার নিখোঁজ হয়েছিল, তাকে ভোরে আহত অবস্থায় পাওয়া গেছে, এই খবরটা ইতিমধ্যেই সবাই জেনে গেছে। তার মাথার পাশে শুকনো রক্ত, পা ফুলে যাওয়া, জামাকাপড়ে কাদা, আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, রিসোর্টের সীমানা থেকে এত দূরে তাকে পাওয়া গেছে যে, সেখানে সে কীভাবে গেল তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

সকালের সূর্য পাহাড়ের ওপর উঠতেই রাতের রহস্যটা যেন আরও অস্বাভাবিক হয়ে উঠল। দিনের আলোয় সবকিছু পরিষ্কার দেখা যায়, অথচ সেই আলোই আগের রাতের ঘটনাটাকে যেন আরও অবিশ্বাস্য করে তুলেছে। 

যে জায়গায় পাহারাদারটির টর্চ পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে গিয়ে কয়েকজন অনেকক্ষণ মাটি পরীক্ষা করল। ভেজা মাটিতে কিছু পায়ের ছাপ ছিল, কিন্তু সেগুলো কার, বোঝার উপায় নেই। পাহাড়ি মাটিতে মানুষের পায়ের ছাপ নতুন কিছু নয়। শ্রমিকদের চলাচল, পাহারাদারদের চলাফেরা, স্থানীয় মানুষের যাতায়াত, সব মিলিয়ে মাটির ওপর এত চিহ্ন যে একটি নির্দিষ্ট পথ আলাদা করে বের করা কঠিন। তার ওপর রাতের শিশির আর ভোরের হালকা বৃষ্টি অনেক চিহ্নই নষ্ট করে দিয়েছে।

রিসোর্টের ম্যানেজমেন্ট বিষয়টাকে বড় করে দেখতে রাজি হলো না। 

মালিককে খবর দেওয়া হয়েছিল আগের রাতেই। সকালে তিনি ফোনে কথা বললেন কয়েকজনের সঙ্গে। তার কণ্ঠে যথেষ্ট বিরক্তি ছিল, কিন্তু কোন উদ্বেগ নয়। পাহাড়ি এলাকায় দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়। তার মতে একজন পাহারাদার অন্ধকারে পা পিছলে পড়ে যেতে পারে, ঢাল বেয়ে গড়িয়ে অনেক দূরে চলে যেতে পারে, মাথায় আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারাতে পারে। আসলে এতটুকুই ব্যাপার ।

এই ব্যাখ্যাটা সবাইকে শোনানো হলো। কেউ কোন প্রশ্ন করল না। কিন্তু যারা রাতে পাহারা দেয়, তারা ঠিক বিশ্বাস করল না।

কারণ পাহাড়ে কাজ করা লোকেরা ঢাল চেনে। তারা জানে কোন ঢাল কতটা বিপজ্জনক। কোথায় পা পিছলে মানুষ গড়িয়ে যেতে পারে আর কোথায় পড়ে গেলেও একটা নির্দিষ্ট জায়গার বেশি যাওয়া সম্ভব নয় সেটা তারা ভালো করেই জানে। আহত লোকটাকে যে জায়গায় পাওয়া গেছে, সেখানে পৌঁছাতে হলে মাঝখানে অন্তত দুটো প্রাকৃতিক বাধা পার হতে হয়। তার মধ্যে একটা সরু ছড়া, আরেকটা ঘন বাঁশঝাড়। একজন অচেতন মানুষ নিজের শরীর নিয়ে এসব জায়গা পার হয়ে অন্য জায়গায় চলে গেছে, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য ! 

রেজোয়ান তখন করিমের বাড়িতে। সকালের নাশতা শেষ করে বাঁশের তৈরি ছোট বারান্দায় বসে সে চুপচাপ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। সামনে নিচু উপত্যকা, তার ওপারে সবুজ পাহাড়ের সারি। রাতের বৃষ্টিতে পাতাগুলো ধুয়ে চকচক করছে। দূরের পাহাড়ের গায়ে কয়েকটা সাদা মেঘ আটকে আছে, যেন সবুজ ঢালের সঙ্গে মিশে থাকার চেষ্টা করছে। নিচের ছড়ায় বৃষ্টির পানি আগের দিনের চেয়ে বেড়েছে। পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে পানি ছোট ছোট সাদা রেখা তৈরি করে ছুটে যাচ্ছে।

করিম একটা চায়ের কাপ এনে তার পাশে রাখল। “ওই লোকটার খবর শুনেছেন?”

রেজোয়ান কাপটা হাতে নিল। “শুনেছি।”

“দুর্ঘটনা মনে হয়?” করিমের কন্ঠে জিজ্ঞাসা। 

রেজোয়ান কিছু বলল না।

চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল। সে ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর বলল, “দুর্ঘটনা হলে এত দূরে গেল কীভাবে, সেটা আগে জানতে হবে।”

করিম আর কিছু বলল না।

রেজোয়ান কাপ নামিয়ে রাখল। তার চোখ তখন পাহাড়ের দিকে।

একজন সাধারণ মানুষ পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখলে দূরের সবুজ ঢাল দেখে। রেজোয়ান দেখছিল ঢালের রেখা। কোথায় মাটি ভেঙেছে, কোথায় পুরনো পথ নেমে গেছে, কোথায় বাঁশঝাড়ের ঘনত্ব বেশি, কোথায় বৃষ্টির পানি নতুন দাগ কেটেছে, তার চোখ সেসবই পড়ছিল। সে জানে, পাহাড় কখনো নিজের সব রহস্য একবারে প্রকাশ করে না। 

দুপুরের আগে সে নিজের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। রিসোর্টের কাছে গিয়ে সে সরাসরি কাজের জায়গায় ঢুকল না। বরং রাস্তার একটু দূরে গাড়ি রেখে পায়ে হাঁটল। আগের রাতের ঘটনার জায়গাটা দেখতে হবে। তার জন্য কোনো স্থানীয় লোকের প্রয়োজন নেই। সে একাই গেল।

পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে নামতে তার জুতোর নিচে ভেজা মাটি নরম হয়ে উঠছিল। কোথাও পা একটু ঢুকে যাচ্ছে, কোথাও পাথরের ওপর শ্যাওলা। একটা জায়গায় এসে সে হাঁটু গেড়ে বসল। মাটিতে একটা পুরনো দাগ। সম্ভবত কেউ পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু দাগটা খুব গভীর নয়। সে আঙুল দিয়ে মাটি ছুঁয়ে দেখল। তারপর আশপাশের ঝোপের দিকে তাকাল।

একটা বাঁশের নিচে কাপড়ের সূক্ষ্ম সুতা আটকে আছে। রেজোয়ান সেটা তুলে নিল। কিছুক্ষণ দেখল। তারপর পকেটে রেখে দিল। 

আরও কয়েক গজ এগিয়ে গিয়ে সে এমন একটা জায়গায় পৌঁছাল, যেখান থেকে নিচের রাস্তা দেখা যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে তার চোখ হঠাৎ একটা জিনিসে আটকে গেল।

দূরে রিসোর্টের দুজন লোক দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। তারা সম্ভবত তাকে চিনেছে। 

রেজোয়ানও তাদের দেখল। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। বরং ধীরে ধীরে ঘুরে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করল।

লোক দুজনও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজেদের কাজে ফিরে গেল। 

রেজোয়ান হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে একটা হিসাব করল। প্রথম ঘটনা দুর্ঘটনা হতে পারে। কিন্তু দুর্ঘটনা যদি হয়ও, সেটা এমন জায়গায় ঘটেছে যেখানে একজন পাহারাদার অন্ধকারে একা যাওয়ার প্রয়োজনই ছিল না।

আর কেউ যদি তাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে সেই মানুষটা পাহাড়ের পথ জানে। এই চিন্তাটা এস্টাব্লিস হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।

সন্ধ্যার পর রিসোর্টে পাহারার ব্যবস্থা কিছুটা বাড়ানো হলো। আগের ঘটনার পর মালিক নির্দেশ দিয়েছিল, কেউ যেন একা বাইরে না যায়। দুজন দুজন করে পাহারা দেবে। টর্চ পরীক্ষা করা হলো। কয়েকটা অতিরিক্ত ব্যাটারি আনা হলো। কাজের জায়গার চারপাশে আলো বাড়ানো হলো।

শ্রমিকেরা এতে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। কিন্তু পাহাড়ের অন্ধকারকে কয়েকটা বৈদ্যুতিক বাতি দিয়ে তো আর পুরোপুরি আয়ত্বে আনা যায় না।

রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের গায়ে কালো ছায়া জমতে লাগল। দূরের পাহাড়গুলো প্রথমে ধূসর, তারপর কালচে, শেষে একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল। রিসোর্টের আলোয় নির্মাণ এলাকা যথেষ্ট উজ্জ্বল ছিল, কিন্তু আলো শেষ হওয়ার কয়েক গজ পরেই অন্ধকার এমন ঘন যে টর্চ ছাড়া কিছু দেখা যায় না।

সেদিন রাতে রেজোয়ানও পাহাড়ে ছিল। সে করিমের বাড়িতে থাকেনি।

গাড়ি নিয়ে অনেক দূরের একটা জায়গায় গিয়ে থামল। গাড়ির ভেতরে বসে কিছুক্ষণ চারপাশ দেখল। তারপর দরজা খুলে নেমে পড়ল।

তার পরনে গাঢ় রঙের সাধারণ পোশাক। কোনো অস্ত্র হাতে নেই তার।

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সে কয়েক মুহূর্ত স্থির রইল। তারপর ধীরে ধীরে পাহাড়ের ঢালের দিকে এগিয়ে গেল। তার চলার মধ্যে কোনো রকম তাড়াহুড়ো নেই। 

প্রতিটি পা রাখার আগে সে মাটিটা পরীক্ষা করছে। শুকনো পাতা এড়িয়ে যাচ্ছে। পাথরের ওপর পা রাখছে না। 

যেখানে বাঁশের শুকনো ডাল পড়ে আছে, সেখানে পা না দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। 

কয়েক মিনিটের মধ্যে তার শরীর অরণ্যের অন্ধকারে মিশে গেল।

রিসোর্টের লোকজন তখন জানত না, মাত্র কয়েকশ গজ দূরে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে তাদের দেখছে।

রেজোয়ানের চোখ অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। দূরের আলো, পাহাড়ের রেখা, মানুষের চলাচল, সবকিছু সে আলাদা করে বুঝতে পারছে। তার কাছে রাত মানে সম্পূর্ণ অন্ধকার নয়। বরং আলো এবং অন্ধকারের মধ্যে পার্থক্যগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠা।

রাত প্রায় এগারোটার দিকে দুজন পাহারাদার রিসোর্টের সীমানা ধরে হাঁটতে বের হলো। তাদের একজন সামনে, আরেকজন কয়েক গজ পেছনে। টর্চের আলো কখনো মাটিতে, কখনো গাছের গায়ে আছড়ে পড়ছে।

রেজোয়ান তাদের আসতে দেখল। কিন্তু, সে নড়ল না।

লোক দুজন তাকে দেখতে পেল না। তারা তাদের পথে এগিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর রেজোয়ানও অন্য দিক দিয়ে চলতে শুরু করল।

সেই রাতটা কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই কেটে গেল। 

পরদিন সকালে রিসোর্টের লোকেরা ভাবল, হয়তো প্রথম ঘটনাটাই শেষ। এরকম আর কিছু ঘটবে না।

কিন্তু তারা ভেবেছিল ভুল। দুই রাত পর দ্বিতীয় ঘটনাটা ঘটল।

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। আকাশ পরিষ্কার, কিন্তু চাঁদ পাহাড়ের পেছনে। রিসোর্টের মূল কাজের জায়গা থেকে একটু দূরে নতুন রাস্তার একটা অংশ তৈরি হচ্ছিল। সেখানে দিনের কাজ শেষ হলেও কয়েকটা মেশিন রেখে দেওয়া হয়েছিল।

একজন পাহারাদার সেই জায়গাটা দেখতে বের হলো। সে একা ছিল না। তার সঙ্গে আরেকজন ছিল। দুজন পাশাপাশি হাঁটছিল।

রাস্তার এক জায়গায় এসে সামনের লোকটা থেমে গেল। “ওদিকে আলোটা কী?”

পেছনের লোকটা টর্চ তুলে ধরল। কিছু দেখা গেল না। তারা আবার হাঁটতে শুরু করল।

তারপরই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা শব্দ এল। খুব সামান্য। শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ।

দুজন একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল। টর্চের আলো ছুটে গেল বাঁশঝাড়ের দিকে। কিছু নেই।

একজন সামনে এগিয়ে গেল। আর ঠিক তখনই ডান দিকের ঢাল থেকে একটা ছায়া বেরিয়ে এল। 

সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে লোকটা প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ পেল না। একটা শক্ত ধাক্কা তার বুকের মাঝখানে এসে লাগল। সে পিছনে হোঁচট খেল। পা মাটিতে ঠিকমতো বসার আগেই শরীরটা ঢালের দিকে চলে গেল। সে হাত বাড়িয়ে একটা বাঁশ আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করল। বাঁশটা ভেঙে গেল। পরের মুহূর্তে লোকটা কয়েক হাত নিচে গড়িয়ে পড়ল।

পেছনের পাহারাদার চিৎকার করে টর্চ ফেলেই নিচে নামতে গেল। তার সামনে তখন একটা মানুষ দাঁড়িয়ে। অন্ধকারের মধ্যে মুখটা স্পষ্ট নয়। শুধু চোখ দুটো দেখা গেল।

পাহারাদার জমে গেল। 

লোকটা এগিয়ে এল না। শুধু বলল, “ওকে নিয়ে ফিরে যাও।” তার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক শান্ত। 

পাহারাদার কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ পেছনে ফিরে দৌড় দিল।

রেজোয়ান তাকে থামাল না। নিচে পড়ে থাকা লোকটার কাছে গিয়ে সে হাঁটু গেড়ে বসল। লোকটা তখন জ্ঞান হারায়নি, কিন্তু ব্যথায় কাতরাচ্ছে। রেজোয়ান তার পা পরীক্ষা করল। বড় কোনো হাড় বেরিয়ে আসেনি। শ্বাস স্বাভাবিক। 

সে লোকটার কাঁধ ধরে বসিয়ে দিল। বললো, “চিৎকার করবে না।” 

লোকটা ভয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। “আপনি কে?”

রেজোয়ান উত্তর দিল না।

লোকটার হাত থেকে টর্চটা তুলে নিয়ে কয়েক গজ দূরে রাখল। তারপর তাকে ধীরে ধীরে নিরাপদ জায়গায় বসিয়ে দিল। “এখান থেকে রাস্তা কত দূর?”

লোকটা কাঁপা গলায় বলল, “জানি না।”

“তুমি ঠিক জানো।”

লোকটা চুপ করে গেল।

রেজোয়ান উঠে দাঁড়াল। তারপর কয়েক মুহূর্ত অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকল। “তোমরা এই জায়গায় কাজ করছ। কাজেই পথটাও তোমাদের জানা উচিত।”

লোকটা কিছু বলল না। 

রেজোয়ান ঘুরে দাঁড়াল। দুই পা এগিয়ে আবার থামল। “কাল থেকে রাতে একা বের হবে না।” তারপর অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

লোকটা শুধু তাকিয়ে রইল। কয়েক মিনিট পর অন্য পাহারাদার লোকজন নিয়ে ফিরে এল। তারা যখন আহত লোকটাকে তুলে আনল, তখন সে শুধু একটা কথাই বলতে পারল, “ও আমাকে মারতে আসে নাই।”

কেউ বিশ্বাস করল না।

কিন্তু সে বারবার একই কথা বলল। “ও আমাকে মারতে পারত। কিন্তু, মারে নাই।”

রিসোর্টের মালিককে খবর দেওয়া হলো। তিনি এবারও ঘটনাটাকে দুর্ঘটনা বললেন। পাহাড়ি ঢালে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছে। এটাই হলো একমাত্র ব্যাখ্যা।

কিন্তু রিসোর্টের শ্রমিকদের মধ্যে খবরটা অন্যভাবে ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বলল, পাহাড়ে কেউ আছে। কেউ বলল, লোকটা নাকি রাতে ঘোরা-ফেরা করে। আবার কেউ বলল, তাকে দেখা যায় না, কখনো হঠাৎই সামনে এসে দাঁড়ায়।

রেজোয়ান সেসব গুজবের কিছুই জানল না। জানার প্রয়োজনও বোধ করল না।

সে পরদিন সকালে আবার দিনের আলোয় করিমের বাড়ির উঠানে বসে চা খেল। দূরে পাহাড়ের গায়ে সকালের কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল। শোনা যাচ্ছিল পাখির ডাক। কাছের কোন বাড়ি থেকে রান্নার ধোঁয়া উঠছিল। বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল কয়েকজন পাহাড়ি মানুষ ।

সবকিছু স্বাভাবিক। শুধু মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের ভেতর স্বাভাবিকতা আর নেই।

প্রথম ঘটনার পর তারা বলেছিল দুর্ঘটনা। দ্বিতীয় ঘটনার পরও বলল, এটাও দুর্ঘটনা। 

কিন্তু দুর্ঘটনা যখন একই জায়গায় বারবার ঘটতে শুরু করে, তখন মানুষ আর দুর্ঘটনাকে ভয় পায় না। ভয় পায় দুর্ঘটনার অদৃশ্য কারণটাকে। আর সেই কারণটাই তখনো তাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সেদিন রাতে তৃতীয় ঘটনা ঘটল। 

এবার একজন পাহারাদার অরণ্যের আরও গভীরে চলে গিয়েছিল। কেন গিয়েছিল, কেউ জানে না। কাকে খুঁজছিল, সেটাও জানা গেল না। 

শুধু এতটুকু জানা গেল, রাত বারোটার পর তার টর্চের আলো অনেক দূরে দেখা গিয়েছিল। তারপর আলোটা নিভে গেল। মানুষটাও অদৃশ্য হয়ে গেল।

পরদিন ভোরে তাকে পাওয়া গেল রিসোর্ট থেকে আরও দূরে, একটা সরু ছড়ার ধারে। সে বেঁচে আছে। কিন্তু তার শরীরে কোনো গুরুতর আঘাত নেই। তারপরেও সে কিছুতেই কথা বলতে চাইছিল না।

অনেকক্ষণ পর একজন তাকে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছিল?”

লোকটা অরণ্যের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁট কাঁপছিল। “কিছু না।”

“কেউ ছিল ওখানে?” 

সে উত্তর দিল না।

“তুমি কি কাউকে দেখেছিলে?”

অনেকক্ষণ পর লোকটা মাথা নাড়ল। “না।”

তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “কিন্তু মনে হয় কেউ আমারে দেখছিল।”

এই কথাটাই সেদিন দুপুরের মধ্যে পুরো রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়ল। 

আর সেদিন সন্ধ্যার পর প্রথমবার মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের পাহারাদাররা বুঝতে পারল, তারা শুধু একটা নির্মাণস্থল পাহারা দিচ্ছে না। 
তারা এমন একটা জায়গা পাহারা দিচ্ছে, যেখানে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আড়াল থেকে কেউ লক্ষ্য করছে।

সেই রাতেই রেজোয়ান নিজের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। আকাশে মেঘ ছিল। দূরের পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল। রিসোর্টের আলো নিচে ছোট ছোট বিন্দুর মতো জ্বলছিল।

তার মুখে কোনো হাসি নেই। চোখে কোনো উত্তেজনাও নেই। শুধু স্থির দৃষ্টি। তারপর সে ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠল। 

ইঞ্জিন চালু করার আগে শেষবারের মতো অরণ্যের দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলল, “তোমরা এখনো আমাকে বুঝতে পারেনি।” পরমহর্তেই তার ঠোঁটের বাম কোণাটা ঈষৎ বেঁকে উপরে উঠে গেল। গাড়ি স্টার্ট নিতেই সে পাহাড়ি পথ ধরে ধীরে ধীরে নীচে নেমে গেল।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/274628/</link>
				<pubDate>Wed, 16 Sep 2026 04:33:17 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় ছয়)<br />
রিসোর্টে প্রথম ঘটনার পরের সকালটা অস্বাভাবিক নীরব ছিল। মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের নির্মাণ এলাকায় প্রতিদিন সকাল হলেই যে হৈচৈ শুরু হতো, সেদিনও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কথা ছিল না। শ্রমিকেরা ঘুম থেকে উঠে চা-সিগারেট খাবে, কেউ বাঁশ কাঁধে নিয়ে বের হবে, কেউ মাটি কাটার জায়গায় যাবে, মেশিনের ইঞ্জিন গর্জে উঠবে, ট্রাকের চ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-274628"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/274628/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">c04dfe3bfd76c4a4c9cd9804e24f3325</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় পাঁচ)
পরদিন থেকেই রেজোয়ানের চলাফেরায় একটা পরিবর্তন দেখা গেল। আগের দিনের ঘটনাটা তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, দিনের আলোয় দাঁড়িয়ে শক্তি দেখিয়ে এই লড়াই জেতা যাবে না। দুজন লোককে কয়েক সেকেন্ডে মাটিতে ফেলে দেওয়া তার কাছে কোনো বড় ব্যাপার নয়, কিন্তু সেই ঘটনার পর যদি কোম্পানি তাকে প্রকাশ্যে ঝামেলাপ্রবণ একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে সুবিধাটা তাদের দিকেই যাবে। 

সে জানে, আইনগত লড়াইয়ে শুধু সত্যি থাকলেই হয় না, নিজের অবস্থানটাকেও পরিষ্কার রাখতে হয়। তার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ তৈরি করা যত সহজ, পাহাড়ের ওপর চলতে থাকা অবৈধ নির্মাণ বন্ধ করা তত সহজ নয়। তাই এবার থেকে দিনের আলোয় রেজোয়ান অন্য মানুষ। সে কারও সঙ্গে তর্ক করবে না, কাউকে ভয় দেখাবে না, কাজের জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করবে না। বরং সে এমনভাবে সরে দাঁড়াবে, যেন আগের দিনের ঘটনাটা ছিল সামান্য একটা ভুল বোঝাবুঝি। কিন্তু এই নীরবতার আড়ালে তার চোখ অন্য কাজ করতে শুরু করে দিল।

খাগড়াছড়িতে তার একজন পুরনো পরিচিত মানুষ ছিল। বহু বছর আগে সামরিক জীবনে এই অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করার সময় পরিচয় হয়েছিল লোকটির সঙ্গে। তখনকার খাগড়াছড়ি আর এখনকার খাগড়াছড়ির মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে, নতুন রাস্তা হয়েছে, বসতি বেড়েছে, বাজার বড় হয়েছে, পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু পাহাড়ের ভেতরের অনেক পথ এখনো সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। 

লোকটির নাম আবদুল করিম। বয়স এখন সত্তরের কাছাকাছি। শরীর আগের মতো নেই, চুল প্রায় সাদা, হাঁটার সময় বাঁশের লাঠি ব্যবহার করে, কিন্তু পাহাড়ের পথ সম্পর্কে তার জ্ঞান এখনো অসাধারণ। কোন ছড়াটা বর্ষায় ফুলে ওঠে, কোন ঢালে দুপুরের পর কুয়াশা জমে, কোন বাঁশঝাড়ের ভেতর পুরনো হাঁটার পথ আছে, কোন পাহাড়ি রাস্তা কোথায় গিয়ে অন্য পথের সঙ্গে মিশেছে, এসব তার কাছে মুখস্থ।

সামরিক দায়িত্বে থাকার সময় করিমই একবার রেজোয়ানকে এই এলাকার ভেতরের কয়েকটা দুর্গম জায়গা চিনতে সাহায্য করেছিল। সেই সময়কার পরিচয় পরে বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছিল। চাকরি বদলেছে, বছর কেটেছে, রেজোয়ান অবসর নিয়েছে, তবু সম্পর্কটা পুরোপুরি হারায়নি। বহু বছর আগে এই পাহাড়ে জমি কেনার সময়ও করিম তাকে জায়গাটা দেখতে সাহায্য করেছিল। সেই কারণেই এবার রেজোয়ান সরাসরি কোনো হোটেলে দীর্ঘদিন থাকার বদলে তার বাড়িতেই উঠল।

করিমের বাড়িটা পাহাড়ের এক ঢালে, খুব সাধারণ একটা কাঠের ঘর। টিনের চাল বর্ষার বৃষ্টিতে বহুবার বদলানো হয়েছে, তবু পুরনো টিনের কয়েকটা অংশ এখনো রয়ে গেছে। সামনের ছোট উঠানে বাঁশের বেড়া, এক পাশে কলাগাছ, অন্য পাশে পেঁপে আর লেবুর গাছ। ঘরের পেছনে নেমে গেছে সবুজ ঢাল, তারও নিচে সরু একটা ছড়া। দুপুরের রোদে ছড়ার পানি ঝিলিক দেয়, আর সন্ধ্যার পর সেই একই জায়গা কালো অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। 

কাছাকাছি আরও কয়েকটা পাহাড়ি বাড়ি থাকলেও রাতে দূরত্বের কারণে একটার আলো আরেকটা বাড়িতে পৌঁছায় না। বাতাসে বাঁশপাতা নড়ে, দূরে কোনো পাহাড়ি পাখি ডেকে ওঠে, কখনো কুকুরের ঘেউ ঘেউ ভেসে আসে, তারপর আবার চারপাশ এমন নিস্তব্ধ হয়ে যায় যেন মানুষ বলে কিছু এখানে কোনোদিন ছিলই না।

রেজোয়ান কখনো করিমের বাড়িতে থাকে, কখনো নিজের গাড়ি নিয়ে খাগড়াছড়ি শহরের হোটেল মাউন্ট ইন-এ চলে যায়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা থাকে, প্রয়োজনীয় কাজ সারে, কারও সঙ্গে দেখা করে, তারপর আবার পাহাড়ের দিকে ফিরে আসে। তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। কখনো সকালেই শহরে যায়, কখনো দুপুরে, কখনো বিকেলের পর। কখন কোথায় থাকবে, সেটা যেন তার নিজের কাছেও নির্দিষ্ট নয়। আসলে সে নিজেই নির্দিষ্ট করেই রাখেনি।

তার লক্ষ্য একটাই, তাকে যেন কেউ সহজে অনুসরণ করতে না পারে। দিনের বেলায় রেজোয়ান পাহাড়টাকে নতুন করে দেখতে শুরু করল।

এটা কোনো সাধারণ ঘোরাঘুরি ছিল না। একজন পর্যটক পাহাড়ে গেলে সৌন্দর্য দেখে, একজন সাধারণ জমির মালিক সীমানা দেখে, আর রেজোয়ান দেখছিল দুটোই, কিন্তু তার সঙ্গে আরও কিছু। সে দেখছিল চলাচলের সম্ভাব্য পথ, আড়াল, উচ্চতা, দূরত্ব, শব্দের প্রকৃতি, মাটির ধরন এবং মানুষের অভ্যাস।

প্রথম দিন সে নিজের জমির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল না। দূরের একটা উঁচু ঢালে উঠে অনেকক্ষণ বসে থাকল। সেখান থেকে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের কাজের জায়গার বেশিরভাগ অংশ দেখা যায়। নিচে মেশিন চলছে। লালচে মাটি কেটে বড় বড় স্তূপ তৈরি হচ্ছে। শ্রমিকেরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কাজ করছে। কেউ বাঁশ কাটছে, কেউ পাথর সরাচ্ছে, কেউ রাস্তার পাশে মাটি চাপা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে একটা ট্রাক এসে দাঁড়াচ্ছে, কয়েকজন লোক নেমে মালামাল নামাচ্ছে, তারপর আবার চলে যাচ্ছে।

রেজোয়ান কিছুই করল না। শুধু দেখল। পরদিন সে অন্যদিকে গেল। তারপর আরও দূরে।

একদিন একটা শুকনো ছড়ার ধার ধরে অনেকটা পথ হাঁটল। বর্ষার শেষে ছড়ায় পানি কমে এসেছে, কিন্তু পাথরের গায়ে এখনো ভেজা শ্যাওলা। কোথাও পানি হাঁটুর নিচে, কোথাও পাথরের ফাঁকে কালো গভীর গর্ত। সে হাঁটার সময় প্রতিটি পাথরের অবস্থান মনে রাখল। কোন জায়গায় পা রাখলে শব্দ হয়, কোথায় মাটি নরম, কোথায় শুকনো পাতা বেশি, কোথায় বাঁশঝাড়ের নিচে মাটি পরিষ্কার, এসব তার চোখে ধরা পড়তে লাগল।

আরেকদিন সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠল। ঢালটা বাইরে থেকে যতটা খাড়া মনে হয়, ভেতর থেকে ততটা নয়। মাঝখানে কয়েকটা প্রাকৃতিক ধাপ আছে। একটা বড় গাছের শিকড় মাটির ওপর উঠে এসে পায়ের জন্য স্বাভাবিক আশ্রয় তৈরি করেছে। তার একটু ওপরে বাঁশঝাড়। আরও ওপরে গিয়ে একটা সরু সমতল জায়গা। সেখান থেকে নিচের রাস্তা দেখা যায়।

রেজোয়ান জায়গাটা মনে রাখল। কোনো কাগজে লিখল না। তার প্রয়োজন নেই। মনে রাখার জন্য তার মাথাই যথেষ্ট।

কয়েকদিনের মধ্যে পাহাড়টা তার কাছে বদলে গেল। আগে যেখানে সে শুধু পাহাড়, গাছ আর অরণ্য দেখত, এখন সেখানে সে একটা বিশাল জীবন্ত মানচিত্র দেখতে পাচ্ছে। কোথায় গেলে রিসোর্টের মূল কাজের জায়গা এড়িয়ে যাওয়া যায়, কোন পথটা নিচের রাস্তার সঙ্গে যুক্ত, কোথায় পাহাড়ি ছড়া প্রাকৃতিক বাধা তৈরি করেছে, কোন ঢাল থেকে পুরো এলাকা দেখা যায়, কোথায় দাঁড়ালে নিজেকে আড়াল করা যায়, এমনকি রাতের বাতাস কোন দিকে বেশি বইছে, তাও সে খেয়াল করতে লাগল।

তার কমান্ডো প্রশিক্ষণ তাকে শিখিয়েছিল, প্রকৃতি কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। যে মানুষ প্রকৃতিকে যত বেশী বুঝতে পারে, সে ততই তার সুবিধা নিতে পারে। পাহাড়ে এই সত্যটা আরও বেশি কার্যকরী

এখানে দশজন মানুষ দশজনের শক্তি নিয়ে দাঁড়ালেই তারা শক্তিশালী হয়ে যায় না। যদি তাদের চলার পথে সীমাবদ্ধতা থাকে, যদি অন্ধকার তাদের চোখ থেকে আলো কেড়ে নেয়, যদি তারা জায়গাটাকে না চেনে, তাহলে সংখ্যাটা স্রেফ একটা সংখ্যাই মাত্র। অন্যদিকে একজন মানুষ যদি সময়, জায়গা আর গতি নিজের পক্ষে আনতে পারে, তাহলে সেই একজনই তখন যে কারো বা যে কোন দলের বিপক্ষে অনেক বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

রেজোয়ান জানত, তার বয়স কমেনি। বরং বেড়ে গিয়ে ইতিমধ্যে তা পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে।

শরীর এখনো শক্ত, পেশিগুলো প্রশিক্ষিত, প্রতিক্রিয়া দ্রুত, কিন্তু সে আর এখন তরুণ নয়। তাই নিজের শক্তির ওপর অহংকার করার কোনো কারণ নেই তার। বরং বয়সের সঙ্গে এসেছে অভিজ্ঞতা। কোথায় ঝুঁকি নিতে হয় আর কোথায় ঝুঁকি এড়িয়ে যেতে হয়, এই পার্থক্যটা সে ভালোই জানে।

রিসোর্টের লোকজনও তাকে মাঝে মাঝে দেখতে পেত। কখনো সে দূরের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কখনো আছে রাস্তার পাশে গাড়িতে বসে। আবার কখনো কোনো স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলছে।

তারা ভাবত, কর্ণেল সাহেব হয়তো জায়গাটা নিয়ে চিন্তিত। কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করবে, কিছু লোকজনের সঙ্গে কথা বলবে, তারপর ঢাকায় ফিরে যাবে।

এই ধারণাটা রেজোয়ান বদলাতে চাইল না। বরং আরও শক্ত করল।

একদিন দুপুরে সে এমন একটা জায়গায় বসে ছিল, যেখান থেকে রিসোর্টের প্রধান প্রবেশপথ দেখা যায়। নিচে কাজ চলছে। মেশিনের শব্দ পাহাড়ের ঢালে প্রতিধ্বনিত হয়ে বারবার ফিরে আসছে। গরম রোদে কাটা লাল মাটি প্রায় আগুনের মতো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। শ্রমিকদের মাথায় গামছা, কেউ ঘাম মুছছে, কেউ বোতল থেকে পানি খাচ্ছে। একটা ট্রাক ধীরে ধীরে ঢাল বেয়ে উঠল, চাকার নিচে মাটি চেপে গিয়ে গভীর দাগ তৈরি হলো।

রেজোয়ান লক্ষ্য করল, দুপুরের পর কাজের গতি একদম কমে যায়। তারপর বিকেলের দিকে আবার বাড়ে। আবার সূর্য নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন শ্রমিক এখান থেকে চলে যায়।

কিন্তু সবাই যায় না। কিছু লোক থেকে যায়। তাদের মধ্যে কয়েকজন পাহারা দেয়।

রেজোয়ান সেদিন প্রথমবার বুঝল, রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখানে খুব সাধারণ।

পরদিন সে আবার এল। এবার অন্য দিক দিয়ে। তারপর আরেকদিন।

এভাবে কয়েক রাত ধরে দূর থেকে সে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করল। 

কোথায় আলো জ্বলে। কোথায় আলো পৌঁছায় না। 

কোন পাহারাদার একা হাঁটে। কোন দুজন একসঙ্গে থাকে।

কে বেশি সতর্ক। কে কথা বলতে বলতে হাঁটে। কে বারবার পেছনে তাকায়।

কে নিজের টর্চের আলো মাটির ওপর রাখে, আর কে আলো ছুড়ে চারপাশ দেখে।

এসব ছোট ব্যাপার। কিন্তু রেজোয়ানের কাছে কোন কিছুই ছোট নয়। সে জানে একজন মানুষের হাঁটার ভঙ্গি থেকেও অনেক কিছু বোঝা যায়।

রাতে সে কখনো নিজের গাড়িতে বসে দূর থেকে কাজের পুরো এলাকাটা দেখত। কখনো পাহাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকত। কখনো আবার একেবারেই আসত না। তার উপস্থিতি সম্পর্কে একটা অস্পষ্টতা তৈরি হতে লাগল।

রিসোর্টের লোকজন জানত, রেজোয়ান আশপাশে আছে। কিন্তু ঠিক কোথায় আছে, সেটা তারা জানত না। মূলতঃ এটাই ছিল তার প্রথম লক্ষ্য।

এক সন্ধ্যায় পাহাড়ের চূড়ার ওপর দাঁড়িয়ে রেজোয়ান সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখছিল। খাগড়াছড়ির পাহাড়ে সূর্যাস্ত সমতলের মতো নয়। আলোটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় না, বরং পাহাড়ের একটার আড়ালে আরেকটা পাহাড় উঠে এসে আলোকে টুকরো টুকরো করে ফেলে। 

পশ্চিম আকাশে কমলা রঙের একটা সরু রেখা ছিল, তার নিচে পাহাড়গুলো কালচে হয়ে উঠছিল। বাঁশঝাড়ের মাথাগুলো বাতাসে দুলছিল। দূরের কোনো পাহাড়ি গ্রাম থেকে ধোঁয়া উঠছিল, সম্ভবত রাতের রান্না শুরু হয়েছে। কোথাও একটা মোরগ অকারণে ডেকে উঠল। নিচে ছড়ার পানিতে অন্ধকার হওয়ার আগে শেষবারের মতো আলো প্রতিফলিত হলো।

রেজোয়ান অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নিচে নামল।

সেদিন রাতে করিমের বাড়িতে ফিরে পুরনো একটা নোটবুক খুলল সে। পাতাটা একেবারে সাদা। সে কলম হাতে নিয়ে কয়েকটা শব্দ লিখল। ছড়া। উঁচু ঢাল। বাঁশঝাড়। পুরনো পথ। নতুন রাস্তা। কাজের এলাকা। পাহারার জায়গা।

তারপর কলমটা বন্ধ করে নোটবুকটাও বন্ধ করল। এর বেশি লেখার প্রয়োজন নেই।

রেজোয়ান জানে, পাহাড়ে লড়াই করতে গেলে শুধু অস্ত্র নয়, জায়গাটাকেও বুঝতে হয়। কোথায় দাঁড়ালে নিজেকে দেখা যাবে না, কোথা দিয়ে গেলে শব্দ কম হবে, কোথায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য কাউকে আটকে রাখা যায়, কোথায় মাটি পিচ্ছিল, কোথায় ঢাল ভেঙে পড়তে পারে, এসব জানা থাকলে পাহাড় নিজেই বিশ্বস্ত সহযোগী হয়ে ওঠে।

তবে তার পরিকল্পনায় কোন হত্যা ছিল না। 

কোম্পানির লোকজন তাকে যতই বিরক্ত করুক, যতই তার জমিতে ঢুকুক, সে জানে তার সীমাটা কোথায়। কাউকে মেরে ফেলে সমস্যার সমাধান করা যায় না। বরং তখন সমস্যাটা আরও প্রকট হয়।

তার উদ্দেশ্য একটাই। তাদের বোঝানো, এই পাহাড়ে রেজোয়ানের অনুমতি ছাড়া তার নিজের জমিতে ঢোকা নিরাপদ নয়।

এরপর কয়েকটা রাত কেটে গেল। রিসোর্টে কাজ চলল স্বাভাবিক গতিতে। দিনের বেলায় মেশিনের শব্দ। শ্রমিকদের হাঁকডাক। ট্রাকের চলাচল। বাঁশ কাটার শব্দ। পাথর ভাঙার শব্দ।

কিন্তু রাত নামলে পাহাড়টা আবার নিজের চেহারায় ফিরে যায়। অন্ধকারের মধ্যে দূরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, বাঁশপাতার ঘর্ষণ, ছড়ার পানির শব্দ আর মাঝে মাঝে কোনো অচেনা পাখির ডাক শুনা যায়।

রিসোর্টের কাজের জায়গায় কয়েকটা বাতি জ্বলত। কিন্তু সেই আলো পাহাড়ের অন্ধকারকে পুরোপুরি সরাতে পারত না। বরং আলোর পরিধির বাইরে আরও ঘন অন্ধকার তৈরি হতো।

সেই রাতেও আকাশে চাঁদ ছিল না। মেঘে আকাশ ঢাকা। হালকা বাতাস বইছিল।

রিসোর্টের এক পাহারাদার টর্চ হাতে কাজের জায়গা থেকে একটু দূরে বের হলো। তার দায়িত্ব ছিল সীমানার একটা অংশ ঘুরে দেখা। লোকটা এই কাজে নতুন নয়, বরং কয়েকদিন ধরেই করছে। হাতে শক্তিশালী টর্চ, কোমরে বাঁশের লাঠি। সে আলোটা সামনে ফেলে ধীরে ধীরে হাঁটছিল।

রিসোর্টের আলোয় প্রথমে তাকে দেখা যাচ্ছিল। তারপর সে বাঁশঝাড়ের কাছে পৌঁছাল। তার হাঠার তোড়ে আলোটা বাঁশের কা-ে পড়ে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াল। 

লোকটা অন্ধকারের মধ্যে ঢুকে গেল। তারপর আর তাকে দেখা গেল না। কিছুক্ষণ বাদেও সে ফিরে এল না।

প্রথমে কেউ ব্যপারটা গুরুত্ব দিল না। ভাবল, হয়তো অন্যদিকে গেছে। এভাবে আরও কিছু সময় কেটে গেল। 

তারপর একজন পাহারাদার বলল, “ও এখনো ফিরল না কেন?”

আরেকজন টর্চ হাতে উঠে দাঁড়াল। দুজন মিলে তাকে খুঁজতে বের হলো।

অরণ্যের ভেতর টর্চের আলো কেটে কেটে এগোতে লাগল। শুকনো পাতার ওপর পায়ের শব্দ হচ্ছিল। বাঁশঝাড়ের ভেতর বাতাস ঢুকে বাঁশগুলোকে একে অন্যের সঙ্গে ঘষে অদ্ভুত কর্কশ শব্দ তৈরি করছিল।

তারা বারবার তার নাম ধরে ডাকল। কোনো উত্তর নেই। আরও কিছুদূর গিয়ে একজন হঠাৎ থেমে গেল। মাটিতে একটা টর্চ পড়ে আছে। আলো এখনো জ্বলছে। 

টর্চটা কাদার ওপর পড়ে সামান্য কাত হয়ে আছে, তার আলো একটা ঝোপের গোড়ায় স্থির হয়ে রয়েছে। কিন্তু পাহারাদার নেই।

দুজন লোক একে অপরের দিকে তাকাল। এই প্রথম তাদের মনে হলো, ব্যাপারটা স্বাভাবিক নয়। শেষাবধি সারা রাত খোঁজ করেও তার কোন হদিস পাওয়া গেল না।

ভোরে আরও লোক নামল। পাহাড়ের ঢাল, ছড়া, বাঁশঝাড়, পুরনো পথ, সবদিকে খোঁজা হলো।

সূর্য ওঠার পর পাহাড়ের চেহারা বদলে গেল। রাতের ভয় কিছুটা কমল, কিন্তু অরণ্য তখনও ঘন। ভেজা পাতার ওপর সকালের আলো, মাটিতে কুয়াশার শেষ ছাপ, গাছের ডালে জমে থাকা পানির ফোঁটা, সবকিছু এত স্বাভাবিক যে আগের রাতের ঘটনাটা যেন বিশ্বাসই হতে চায় না।

শেষ পর্যন্ত রিসোর্টের জায়গা থেকে অনেক দূরে, একটা নিচু ঢালের পাশে ঘন ঝোপের মধ্যে তাকে পাওয়া গেল। সম্পূর্ণ অচেতন। 

জামাকাপড় কাদায় ভরা। মাথার পাশে শুকনো রক্ত। ডান পায়ের নিচের অংশ ফুলে গেছে। একটা হাত শরীরের নিচে আটকে ছিল। 

তাকে তুলে আনার সময়ও তার জ্ঞান ফেরেনি। 

পরে দুপুরের দিকে জ্ঞান ফিরলে সে চারপাশে তাকিয়ে কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করল, সে আসলে কোথায়। 

কেউ জানতে চাইল, “কী হয়েছিল?”

লোকটা চোখ বন্ধ করে আবার খুলল। তার মুখে ভয়। “আমি কিছুই দেখিনি।”

“তাহলে পড়ে গেলে কীভাবে?”

লোকটা মাথা নাড়ল। “আমি জানি না।” কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে শুধু বলল, “মনে হলো সামনে কেউ ছিল। তারপর...” কথাটা শেষ করল না।

“কেউ ছিল?”

লোকটা আতঙ্কিত চোখে অরণ্যের দিকে তাকাল। “কেউ ছিল কি না, তাও জানি না। হঠাৎ মাথায় এমন একটা আঘাত লাগল... মনে হলো একটা আস্ত গাছ ওপর থেকে পড়ল। তারপর আর কিছু মনে নাই।”

চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল। কারও কাছে কোনো উত্তর নেই।

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, লোকটাকে যেখানে পাওয়া গেছে, সেটা রিসোর্টের কাজের এলাকা থেকে এতটা দূরে যে আহত অবস্থায় নিজের পায়ে সেখানে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। আর তার টর্চ পাওয়া গেছে আরও অনেক দূরে।

সেদিন বিকেলে রিসোর্টে কাজ চলল ঠিকই। মেশিন চলল। শ্রমিকরা মাটি কাটল। ট্রাক এল।

কাজ থামেনি। কিন্তু মানুষের মুখের হাবভাব বদলে গেছে। হাসি কমে গেছে। কথা বলার সময় সবাই আড়চোখে অরণ্যের দিকে তাকাচ্ছে।

যে পাহাড়কে সকালে তারা শুধু কাজের জায়গা হিসেবে দেখেছিল, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সেটাই যেন তাদের কাছে অন্য কিছু হয়ে উঠল।

আর সেই বিকেলে, রিসোর্টের অনেক দূরের একটা উঁচু ঢালে দাঁড়িয়ে রেজোয়ান নিচের কাজের জায়গাটার দিকে তাকিয়ে ছিল।

তার মুখে কোনো বিজয়ের হাসি নেই। চোখেও নেই উত্তেজনা। শুধু গভীর স্থিরতায় ঢাকা একফালি দৃষ্টি লেগে ছিল তাতে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/274188/</link>
				<pubDate>Tue, 15 Sep 2026 03:25:02 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় পাঁচ)<br />
পরদিন থেকেই রেজোয়ানের চলাফেরায় একটা পরিবর্তন দেখা গেল। আগের দিনের ঘটনাটা তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, দিনের আলোয় দাঁড়িয়ে শক্তি দেখিয়ে এই লড়াই জেতা যাবে না। দুজন লোককে কয়েক সেকেন্ডে মাটিতে ফেলে দেওয়া তার কাছে কোনো বড় ব্যাপার নয়, কিন্তু সেই ঘটনার পর যদি কোম্পানি তাকে প্রকাশ্যে ঝামেলাপ্রবণ একজন অবসরপ্রাপ্ত কর&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-274188"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/274188/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">3baf185613636d3342ab03f2ccac1e92</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় চার)
সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পর রেজোয়ানের ভেতরে অদ্ভুত একটা শান্তি নেমে এসেছিল। কয়েকদিন ধরে সে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছিল, সেগুলোর বেশিরভাগই এখন তার কাছে পরিষ্কার। জমির কাগজ তার নামে, সীমানার পুরনো নকশা তার হাতে, ভূমি অফিসে তার মালিকানা নিয়ে সরাসরি কোনো আপত্তি ওঠেনি, প্রশাসন সমস্যাটা জানে, থানাও অভিযোগের কথা জানে, এমনকি মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের মালিক নিজেও স্বীকার করেছে যে জমিটা রেজোয়ানের। তারপরও কাজ বন্ধ হয়নি। বরং পাহাড়ের বুক আরও কাটা হচ্ছে, নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে, মাটি সমান করা হচ্ছে। অর্থাৎ কথা বলার জায়গাটা শেষ। অন্তত আপাতত। 

সকালে ডিওএইচএস-এর বাসা থেকে বের হওয়ার আগে রেজোয়ান শেষবারের মতো ফাইলটা খুলেছিল। দলিল, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ, পুরনো নকশা, সীমানার বিবরণ, পাহাড়ে তোলা ছবি, সবকিছু একবার দেখে ফাইল বন্ধ করল। তার চোখে উত্তেজনা ছিল না। বরং দীর্ঘদিনের অভ্যাসমতো একটা স্থির হিসাব চলছিল মাথার মধ্যে। কোনটা বৈধ পথ, কোনটা বাস্তব পরিস্থিতি, কোথায় কথা বলা যায়, কোথায় অপেক্ষা করতে হয়, আর কোথায় গিয়ে নিজের উপস্থিতি জানানো দরকার, এসব সে আলাদা করে ভাবছিল।

সামরিক জীবনে একটা বিষয় সে শিখেছিল, কোনো পরিস্থিতিকে নিজের ইচ্ছামতো হতে বাধ্য করা যায় না। পরিস্থিতিকে আগে বুঝতে হয়। তারপর তার ভেতর থেকেই নিজের জায়গাটা তৈরি করতে হয়।

এবার সে নিজের জায়গায় দাঁড়াবে। শেষবার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য সে বেরিয়ে গেল।

দিনের প্রথম ভাগটা আবার বিভিন্ন দপ্তরের দরজায় কেটে গেল। আগের অভিযোগের কথা সবাই জানে। নতুন করে কোনো কাগজ চাওয়া হলো না। কোথাও তাকে বলা হলো বিষয়টি বিবেচনাধীন, কোথাও বলা হলো সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, কোথাও আবার স্থানীয় পরিস্থিতির কথা বলে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে বলা হলো। রেজোয়ান এবার আর বেশি কথা বলল না। শুধু প্রয়োজনীয় কথাগুলো শুনল এবং যেখানে সম্ভব, নিজের বক্তব্য লিখিতভাবে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করল।

তার ধৈর্য শেষ হয়ে যাচ্ছিল না। বরঞ্চ বলা চলে তার আরও অপেক্ষা করার প্রয়োজনটাই ফুরিয়ে যাচ্ছিল।

দুপুরের দিকে সে একটা অফিস থেকে বেরিয়ে আসার সময় আকাশের দিকে তাকাল। বর্ষার মেঘ নিচু হয়ে আছে। ঢাকার বাতাস ভারী। দূরে কালো মেঘের নিচে ভবনগুলোর মাথা ধূসর দেখাচ্ছে। রাস্তার পাশে পানি জমে আছে। গাড়ি ছুটে গেলে সেই পানি ছিটকে পথচারীদের কাপড়ে গিয়ে লাগছে। বাসের জানালা দিয়ে মানুষ বাইরে তাকিয়ে আছে, ফুটপাতে ছাতা হাতে লোকজন হাঁটছে, দোকানের টিনের চালের নিচে কয়েকজন বৃষ্টির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।

রেজোয়ান গাড়িতে উঠে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার সামনে এখন আর কোনো অস্পষ্টতা নেই। 

সে আইনগত পথ ছেড়ে দিচ্ছে না। কিন্তু আইন নিজের কাজ করার আগ পর্যন্ত নিজের জমির ওপর অন্যের কাজ চলতে দেবে না। এই দুটো বিষয় তার কাছে আলাদা।

বিকেলের আগেই সে একজন পরিচিত মানুষের কাছ থেকে কল পেল, যে খাগড়াছড়িতে ছিল। লোকটি জানাল, রিসোর্টের জায়গায় কাজ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। পাহাড়ের একটা বড় অংশ কেটে ফেলা হচ্ছে। নতুন মেশিন এসেছে। রাস্তার জন্য মাটি সরানো হচ্ছে।

রেজোয়ান শুধু বলল, “ছবি পাঠান।”

কিছুক্ষণ পর তার মোবাইলে ছবি এল। একটার পর একটা। রেজোয়ান গাড়ির ভেতর বসে ছবিগুলো দেখতে লাগল।

একটা ছবিতে পাহাড়ের সবুজ ঢাল কেটে বিশাল একটা অংশ খোলা হয়েছে। লালচে মাটি স্তরে স্তরে দেখা যাচ্ছে। গাছের শিকড় মাটির বুক থেকে বেরিয়ে আছে। অন্য ছবিতে একটা ভারী মেশিন পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে, তার ধাতব বাহু দিয়ে মাটি সরিয়ে নিচ্ছে। কোথাও শ্রমিকরা বাঁশের খুঁটি বসাচ্ছে, কোথাও পাথর স্তূপ করে রাখা হয়েছে। আরেকটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, নতুন রাস্তা ধরে একটা ট্রাক উঠে যাচ্ছে।

রেজোয়ান শেষ ছবিটা অনেকক্ষণ ধরে দেখল। তার নিজের জমি। নিজের পাহাড়। কিন্তু সেখানে অন্য মানুষের পরিকল্পনা চলছে। 

সে মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর গাড়ি ঘুরিয়ে বাসার দিকে রওনা দিল।

পরদিন ভোরে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে বের হলো সে। ঢাকা ছাড়ার পর শহরের কংক্রিট ধীরে ধীরে পিছনে পড়ে গেল। রাস্তার দুই পাশে বদলে যেতে লাগল দৃশ্য। প্রথমে ঘন বসতি, দোকানপাট, বাজার, মানুষের ভিড়। তারপর ধীরে ধীরে রাস্তার দুপাশে ফাঁকা জায়গা বাড়ল। সবুজের পরিমাণ বাড়তে লাগল। দূরে গাছের সারি, কোথাও ধানক্ষেত, কোথাও ছোট বাজার, কোথাও রাস্তার ধারে চায়ের দোকান। বর্ষার পানি জমে থাকা নিচু জমির ওপর আকাশের মেঘের ছায়া পড়ে আছে।

আর যত খাগড়াছড়ির দিকে এগোল, তত বদলে গেল চারিপাশ।

পাহাড় শুরু হওয়ার পর রাস্তা যেন অন্য একটা জগতের মধ্যে ঢুকে গেল। একদিকে উঠে গেছে সবুজ পাহাড়, অন্যদিকে ঢাল নেমে গেছে নিচের উপত্যকার দিকে। পাহাড়ের গায়ে কোথাও বাঁশঝাড় এত ঘন যে ভেতরের মাটি দেখা যায় না, কোথাও কলাগাছ আর বুনো লতাগুল্মের জঙ্গল, কোথাও জুমের জমি থেকে সদ্য পরিষ্কার করা ঢাল রোদে লালচে হয়ে আছে। বর্ষার শেষে পাহাড়ের শরীর তখনো ভিজে। ছোট ছোট ঝরনা আর ছড়া পাহাড়ের বুক কেটে নেমে এসেছে নিচে। কোথাও পানি পাথরের ওপর দিয়ে স্বচ্ছ স্রোতে বয়ে যাচ্ছে, কোথাও রাস্তার নিচ দিয়ে কালভার্টের ভেতর অদৃশ্য হয়ে আবার অন্য পাশে বেরিয়ে এসেছে। 

পাহাড়ের ঢালে বাঁশের তৈরি ছোট ঘর চোখে পড়ছে, দূরে কোনো কোনো বসতির টিনের চাল রোদের আলোয় চকচক করছে। তারও ওপরে নীলচে পাহাড় একটার পেছনে আরেকটা, যেন দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে তাদের রং ফিকে হয়ে গেছে।

এই দৃশ্য রেজোয়ানকে থামিয়ে দেয়নি। বরং তার চোখে সবকিছু ধরা পড়ছিল। পাহাড়ের ঢাল। রাস্তার বাঁক। ছড়ার অবস্থান। নতুন কাটা মাটি। মানুষের চলাচলের পথ। গাড়ির ওঠানামার জায়গা। কোনটাই বাদ পড়ছিল না।

একজন সাধারণ ভ্রমণকারী এই দৃশ্য দেখে সৌন্দর্য খুঁজে পেত। রেজোয়ানের চোখ সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রকৃতিও দেখছিল। অসংখ্য বছর ধরে গড়ে ওঠা অভ্যাস এটা। 

খাগড়াছড়ির পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে অবশেষে সে পরিচিত পথে ঢুকল। নতুন কাটা রাস্তার মুখে পৌঁছেই সে গাড়ি থামাল। আগের চেহারার সঙ্গে এখন আর খুব বেশি মিল নেই। রাস্তা চওড়া হয়েছে। পাহাড়ের গা আরও কাটা।

একটা জায়গায় মাটি এতটা সরিয়ে ফেলা হয়েছে যে ওপরের সবুজ ঢালটা যেন মাঝখান থেকে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে। কাটা মাটির গায়ে শিকড় ঝুলছে। কোথাও মাটির ভেতর পাথর বেরিয়ে আছে। ভারী মেশিনের শব্দে পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে যাচ্ছে। ডিজেলের গন্ধ বাতাসে মিশে আছে। কাটা মাটির স্যাঁতসেঁতে গন্ধের সঙ্গে সেই গন্ধ মিশে একটা ভারী পরিবেশ তৈরি করেছে।

রেজোয়ান গাড়ি থেকে নামল। তার পরনে সাধারণ শার্ট আর ট্রাউজার। দূর থেকে দেখলে তাকে পাহাড়ে বেড়াতে আসা কোনো মধ্যবয়সী মানুষের মতোই মনে হতে পারে। কিন্তু হাঁটার সময় তার শরীরের ভঙ্গিতে একটা আলাদা দৃঢ়তা ছিল। পা ফেলছে মেপে, চোখ একবারে একটা জায়গায় আটকে নেই, সামনে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশটাও দেখছে।

সে ধীরে ধীরে নিজের জমির দিকে এগিয়ে গেল। 

শ্রমিকরা তাকে দেখল। কেউ কিছু বলল না। কাজ চলতে থাকল।

একটা মেশিনের শব্দ এত জোরে যে পাশে দাঁড়িয়ে কথা বললেও গলা উঁচু করতে হয়। মেশিনের ধাতব বাহু মাটির ভেতর ঢুকে একসঙ্গে অনেকটা মাটি তুলে ফেলছে। ওপর থেকে মাটি গড়িয়ে নিচে পড়ছে। ধুলো আর কাদা মিশে বাতাস ভারী।

রেজোয়ান মেশিনটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। 

অপারেটর তাকে দেখে মেশিন থামিয়ে দিল। কয়েকজন শ্রমিক কাছে এগিয়ে এল। 

রেজোয়ান চারপাশে একবার তাকাল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “তোমরা কাজ বন্ধ কর।”

একজন লোক এগিয়ে এল। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। মুখে কাজের ক্লান্তি, গায়ে মাটি লেগে আছে। “স্যার, আমরা কোম্পানির লোক। আমাদের যা করতে বলা হয়েছে, আমরা সেটাই করছি।”

রেজোয়ান তার দিকে তাকাল। “আমি জানি।”

“তাহলে অফিসে কথা বলেন।”

রেজোয়ানের চোখ কয়েক মুহূর্ত তার ওপর স্থির রইল। “অফিসে অনেক কথা বলেছি। কোন লাভ হয় নাই। এবার নিজের জমিতে দাঁড়িয়ে যা বলার নিজেই বলছি।”

লোকটা একটু অস্বস্তিতে চারপাশে তাকাল। তারপর বলল, “স্যার, আপনি এখান থেকে সরে যান। অযথা ঝামেলা করবে না। এখানে কাজ বন্ধ করার দায়িত্ব আমাদের না।”

“তাহলে কার?”

লোকটা উত্তর দিল না। পেছন থেকে আরেকজন এগিয়ে এল। তার গলায় বিরক্তি। “আপনাকে যা বলার বলা হয়েছে। এখানে কাজ চলবে।”

রেজোয়ান নড়ল না। সে আবার চারপাশে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ পাহাড়ের ঢালের দিকে গেল। তারপর মেশিনের দিকে। তারপর শ্রমিকদের দিকে। তারপর স্থির হলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির ওপর। “আমি কাজ বন্ধ করতে বলেছি।”

লোকটা এবার আরও কাছে এল। “আপনি বুঝছেন না, স্যার।”

“আমি খুব ভালোভাবেই বুঝছি।”

লোকটা রেজোয়ানের কাঁধে হাত রাখল। হাতটা ছিল ঠেলার জন্য।

রেজোয়ান হাতটার দিকে তাকাল। তারপর লোকটার চোখের দিকে। “হাত সরাও।” 

লোকটা সরাল না। বরং সামান্য চাপ দিয়ে তাকে পেছনে সরাতে গেল।

পরের মুহূর্তের ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে আশপাশের লোকেরা প্রথমে বুঝতেই পারল না কী হয়েছে।

রেজোয়ানের শরীর সামান্য ঘুরল। লোকটির হাতের চাপ বাতাসে দুলে রইলো। ওদিকে তার ডান হাত তখন লোকটার কবজির ওপর, বাঁ হাত কনুইয়ের কাছে। স্রেফ একটা টান। সাথে একটা মোচড়।

লোকটির শরীর নিজের ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে গেল। রেজোয়ান তাকে ধাক্কা দিল না। শুধু তার গতিটাকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করল। পরের মুহূর্তে লোকটা হাঁটু গেড়ে মাটিতে, তারপর পুরো শরীর নিয়ে কাদামাটির ওপর পড়ে গেল।

সবকিছু ঘটলো দুই সেকেন্ডেরও কম সময়ে। 

লোকটা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। রেজোয়ান ইতিমধ্যেই সরে গেছে।

পেছন থেকে আরেকজন ঝাঁপিয়ে এগিয়ে এল। এইবার রেজোয়ান তাকে আসতে দেখে ফেলেছিল। লোকটির হাত তার কাঁধের দিকে বাড়ল। তৎক্ষনাত সে এক পা পাশে সরল। লোকটার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা খালি বাতাসে চলে গেল।

একই সঙ্গে রেজোয়ানের কনুই লোকটির বুকের সামনে ঠেকল। লোকটির গতি থেমে গেল। সে তার কাঁধ ধরে শরীরটা ঘুরিয়ে দিল।

মাটির ওপর ভেজা কাদা। পায়ের নিচে সামান্য পিচ্ছিল। লোকটার নিজের গতি আর ভারসাম্যই তার বিরুদ্ধে গেল। সে পিছলে গিয়ে সোজা মাটিতে পড়ে গেল।

চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো স্থির দাঁড়ানো। কেউ এগিয়ে আসলো না।

মেশিন বন্ধ। ডিজেলের গন্ধের মধ্যে হঠাৎ যেন পুরো জায়গাটা নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

রেজোয়ান পড়ে থাকা দুজনের দিকে তাকাল। তার মুখে রাগ নেই। &quot;আমি আবারো বলছি কাজ বন্ধ কর।”

এইবার কেউ কোন উত্তর দিল না। আবার কেউ তাকে আটকানোরও চেষ্টা করল না।

রেজোয়ান আর সেখানে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ঘুরে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার পেছনে কয়েকজন শ্রমিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

কেউ একজন নিচু গলায় বলল, “উনি কে?”

কেউ কোন উত্তর করলো না।

রেজোয়ান গাড়িতে উঠে বসে দরজা বন্ধ করল। ইঞ্জিন চালু করার আগে একবার পেছনে তাকাল।

পাহাড়ের ঢালে সকালের রোদ এসে পড়েছে। কাটা লাল মাটির ওপর আলো পড়ে জায়গাটাকে আরও নগ্ন করে তুলেছে। সবুজ পাহাড়ের বুকের মধ্যে সেই ক্ষত অনেক দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে।

তারপর রেজোয়ানের চোখ গিয়ে থামল মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের সাইনবোর্ডে। কয়েকদিন আগে বোর্ডটা শুধু একটা নাম ছিল। আজ সেটা যেন একটা চ্যালেঞ্জ।

রেজোয়ান গাড়ি চালু করল। পাহাড়ি রাস্তা ধরে গাড়ি নিচে নামতে শুরু করল। সে জানে, আজ যা হয়েছে সেটা এখানেই শেষ হবে না। তবে সে এও জানে না, কোম্পানির লোকেরা এই ঘটনাটা কীভাবে দেখবে।

তার কাছে ঘটনাটা ছিল খুব সামান্য। দুজন লোক তাকে সরাতে এসেছিল। সে উল্টো তাদের সরিয়ে দিয়েছে। এর বেশি কিছু নয়।

কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর, শহরের আরামদায়ক অফিসে বসে যখন মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের মালিক ঘটনাটা শুনল, তখন তার মুখে প্রথমে অবিশ্বাসের ছাপ। তারপর সে হেসে দিল। বললো, “আসলে বুড়ো মানুষটার রাগ হয়েছে। যাকগে, ব্যপার না।” সে হাত নাড়িয়ে মাছি তাড়াবার ভঙ্গী করলো।

সেময় ঘরে থাকা বাকী লোকজনও তার সাথে হেসে দিল। কিন্তু, তারা যদি জানতো আজকের ঘটনাটা কেবল যুদ্ধের শুরু নয়। বরং এটা ছিল তাদের জন্য শেষ প্রকাশ্য সতর্ক বার্তা, তবে এই হাসি কখনোই কূল পেত না।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/273825/</link>
				<pubDate>Mon, 14 Sep 2026 03:27:07 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় চার)<br />
সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পর রেজোয়ানের ভেতরে অদ্ভুত একটা শান্তি নেমে এসেছিল। কয়েকদিন ধরে সে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছিল, সেগুলোর বেশিরভাগই এখন তার কাছে পরিষ্কার। জমির কাগজ তার নামে, সীমানার পুরনো নকশা তার হাতে, ভূমি অফিসে তার মালিকানা নিয়ে সরাসরি কোনো আপত্তি ওঠেনি, প্রশাসন সমস্যাটা জানে,&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-273825"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/273825/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">6670a894bfc732e0c38cd43585a2570d</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় তিন)
পরদিন সকালটা ছিল ভারী উজ্জ্বল। বর্ষার পরের আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার না হলেও মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদ নেমেছিল শহরের ওপর। ডিওএইচএস-এর পরিচিত রাস্তায় গাছের পাতায় জমে থাকা পানির ফোঁটা ঝিলমিল করছিল। গেটের কাছে নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়মিত তৎপরতা, রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া অফিসগামী গাড়ি, স্কুলের পোশাকে ছুটে চলা ছেলেমেয়ে, সব মিলিয়ে চারপাশের জীবন প্রতিদিনের মতোই স্বাভাবিক। 

কিন্তু রেজোয়ানের কাছে সকালটা স্বাভাবিক ছিল না। আগের দুদিনের অভিজ্ঞতা তার মাথার ভেতর একটা অংকের মতো ঘুরছিল। কোনো ঘটনা সে বিচ্ছিন্নভাবে দেখছিল না। পাহাড়ে রাস্তা কাটা, সীমানার পাথর সরানো, বাঁশের বেড়া দেওয়া, নির্মাণসামগ্রী আনা, তারপর প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় তার অভিযোগের পরও অস্বাভাবিক নীরবতা, সবকিছু যেন একই ছবির আলাদা আলাদা অংশ।

সকালের নাশতা শেষ করে সে আবার স্টাডিরুমে বসেছিল। টেবিলের ওপর ফাইল খোলা। পাশে নোটবুক। আগের দিনের নোটগুলো সামনে রাখা। তার হাতের লেখা ছোট, পরিষ্কার এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো শব্দ নেই। কোথায় গিয়েছিল, কার সঙ্গে কথা হয়েছে, কী উত্তর পেয়েছে, কোন কাগজ দেখা হয়েছে, সব লেখা আছে। 

সামরিক জীবনের একটা অভ্যাস তার মধ্যে এখনো পুরোপুরি রয়ে গেছে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ওপর নির্ভর করার আগে তথ্যগুলো সাজিয়ে নেওয়া। আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, কিন্তু ভালো সিদ্ধান্ত নিতে হলে আবেগকে কিছুক্ষণ বাইরে রাখতে হয়।

রেজোয়ান কলমটা হাতে নিয়ে নোটবুকের পাতার ওপর কয়েকটা দাগ টানল। ভূমি অফিস। স্থানীয় প্রশাসন। থানা। তারপর প্রশ্নবোধক চিহ্ন। এবং কোম্পানি।

সে কিছুক্ষণ শেষ শব্দটার দিকে তাকিয়ে থাকল।

আগের দিন পর্যন্ত সে ধরে নিয়েছিল, প্রশাসনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হওয়ার একটা বাস্তব সম্ভাবনা আছে। এখন সেই বিশ্বাসটা অনেকটাই কমে গেছে। তবু সে আইনের পথ একেবারে ছেড়ে দিতে চায় না। কারণ সে জানে, কোনো লড়াই শুরু করার আগে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। পরে যদি কেউ প্রশ্ন করে, সে কী করেছে, তার উত্তর যেন একেবারে পরিষ্কার থাকে।

সাড়ে দশটার দিকে সে আবার বেরিয়ে পড়ল। প্রথমে ভূমি অফিস।

গত দিনের পরিচিত ফাইল আবার বের হলো। আজ রেজোয়ান আগের চেয়ে বেশি কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্ন করল। সীমানা পরিবর্তনের আবেদন কোথা থেকে এসেছে, কবে জমা হয়েছে, তার সঙ্গে কোন কোন কাগজ দেওয়া হয়েছে, জমির ব্যবহার পরিবর্তনের কোনো প্রস্তাব আছে কি না, এসব জানতে চাইল। 

কর্মচারী প্রথমে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই উত্তর দিচ্ছিল। কিন্তু কয়েকটা প্রশ্নের পর তার গলার স্বর বদলে গেল। আগের দিনের তুলনায় আজ সে অনেক বেশি সাবধানী আচরণ করতে লাগলো। 

রেজোয়ান সেটা লক্ষ্য করল। কাগজের ওপর চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল, “এই আবেদনটা কে জমা দিয়েছে?”

নামটা আগেই জানা ছিল। এবার সে লোকটির পদ এবং যোগাযোগের তথ্যও জানতে চাইল। কর্মচারী কিছুক্ষণ ফাইল ঘাঁটল। তারপর নিচু গলায় বলল, “কোম্পানির লোকজনের মাধ্যমেই কাগজটা এসেছে।”

রেজোয়ান আর কিছু বলল না। 

সে কাগজগুলো আবার পড়ল। কোথাও সরাসরি লেখা নেই যে জমির মালিকানা বদলে গেছে। বরং কাগজগুলো এমনভাবে সাজানো, যেন ভবিষ্যতের কোনো প্রশাসনিক কাজে এই জমিকে প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখানো যায়। অর্থাৎ তারা এখনো মালিকানা নিয়ে সরাসরি লড়াই করছে না। তারা শুধু বাস্তব পরিস্থিতিটাকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে যাচ্ছে।

কাগজে রাস্তা। উন্নয়ন। প্রকল্প। আর বাস্তবে তার জমির ওপর ইতিমধ্যেই রাস্তা কাটা হচ্ছে।

রেজোয়ান ফাইল বন্ধ করল। “এটার ওপর কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে?”

কর্মচারী মাথা নাড়ল। “এখনো না।”

“তাহলে কাজ শুরু হলো কীভাবে?”

লোকটি এবার চুপ করে গেল। 

সেই নীরবতার মধ্যে রেজোয়ান অনেক কিছুই বুঝে গেল। সে আর চাপ দিল না। ফাইলের কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ পাতার কপি নিল এবং বেরিয়ে এল।

বাইরে তখন রোদ বেড়েছে। পুরনো সরকারি ভবনের সামনে মানুষের ভিড়। কেউ হাতে কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ সিঁড়িতে বসে অপেক্ষা করছে, কেউ ফোনে কারও সঙ্গে তর্ক করছে। শহরের এইসব দৃশ্য রেজোয়ানের কাছে নতুন নয়। দীর্ঘ কর্মজীবনে দেশের নানা জায়গায় ঘুরেছে সে। সরকারি অফিসের গতি কেমন, ফাইল কীভাবে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে যায়, একটা সিদ্ধান্তের আগে কতগুলো স্তর পেরোতে হয়, এসব তার অজানা নয়।

কিন্তু এই ঘটনায় একটা জিনিস তাকে ভাবাচ্ছিল। ফাইলের গতি ধীর হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে যেন শুধু গতি ধীর নয়, ইচ্ছেটাও বরং আরো ধীর।

সে গাড়িতে উঠে পরের গন্তব্যে রওনা দিল।

স্থানীয় প্রশাসনের দপ্তরে আবার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। আগের দিনের কর্মকর্তা তাকে চিনতে পেরেছেন। রেজোয়ান নতুন কিছু কাগজ সামনে রাখল এবং জানাল, বিষয়টা এখন আরও পরিষ্কার হয়েছে। জমির মূল মালিকানা তার নামে, অথচ তার অনুমতি ছাড়া প্রকল্পের কাজ চলছে।

কর্মকর্তা কাগজগুলো দেখলেন। তারপর চুপ করে বসে রইলেন। “আপনার বক্তব্য আমরা বুঝতে পারছি, কর্ণেল সাহেব।”

রেজোয়ান কিছু বলল না।

“কিন্তু বিষয়টা শুধু জমির মালিকানা দিয়ে দেখলে হবে না।”

“তাহলে?”

কর্মকর্তা একটু থেমে বললেন, “স্থানীয় কিছু ব্যাপার আছে।”

রেজোয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল। এইবার সে আর ব্যাখ্যা চাইল না। কারণ আগের দিনও একই রকম শুনেছিল।

স্থানীয় ব্যাপার। আজ সেই শব্দটার অর্থ তার কাছে অনেক বেশি পরিষ্কার। সে উঠে দাঁড়াল। “আপনারা লিখিতভাবে কিছু করতে পারবেন?”

কর্মকর্তা সরাসরি উত্তর দিলেন না। “আমরা বিষয়টা দেখছি।”

রেজোয়ান মাথা নেড়ে বেরিয়ে এল। গাড়িতে বসে ইঞ্জিন চালু করার আগে সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর সামনের কাচ দিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল।

ঢাকার দুপুরের ব্যস্ততা তখন তুঙ্গে। বাসের ধোঁয়া, প্রাইভেট গাড়ির সারি, রিকশার ভিড়, ফুটপাতে মানুষের চলাচল, দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন, সবকিছু মিলিয়ে শহর যেন নিজের গতিতে ছুটছে। এই বিশাল শহরে তার ব্যক্তিগত জমির সমস্যাটা হয়তো কারও কাছে খুব ছোট একটা বিষয়।

কিন্তু রেজোয়ান ছোট বিষয় আর বড় বিষয়ের পার্থক্য অন্যভাবে দেখে। একটা মানুষ তার জমিতে ঢুকেছে। তারপর সীমানা বদলেছে। তারপর প্রশাসনের দরজায় গিয়েও সে কার্যকর ব্যবস্থা পায়নি।

এর মানে হলো, যে পক্ষটা জমি দখল করেছে তারা শুধু সাহসী নয়, আত্মবিশ্বাসী। না, বলা চলে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী। এর কারণটা জানতে হবে। 

দুপুরের পর সে থানায় গেল। সেখানেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা হলো। অভিযোগ নেওয়া হলো, কাগজ দেখা হলো, ছবি দেখা হলো। কিন্তু বাস্তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ করা বা দখলকারীদের সরিয়ে দেওয়ার কোনো তাৎক্ষণিক উদ্যোগ দেখা গেল না।

একজন কর্মকর্তা কিছুক্ষণ কাগজ দেখে বললেন, “কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছেন?”

“না।”

“কথা বলে দেখুন।”

রেজোয়ান এবার আর কোনো উত্তর দিল না। থানা থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় তার মাথায় সিদ্ধান্তটা তৈরি হয়ে গেছে।

আর কোন সরকারী অফিস নয়। এবার সরাসরি কোম্পানি।

কোম্পানির নাম আগেই জানা ছিল। মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্ট। ঢাকায় তাদের অফিস কোথায়, সেটা খুঁজে বের করতে বেশি সময় লাগল না। বিকেলের দিকে রেজোয়ানের গাড়ি মতিঝিলের ব্যস্ত এলাকায় ঢুকল।

ঢাকার এই অংশটা খাগড়াছড়ির পাহাড় থেকে যেন সম্পূর্ণ অন্য পৃথিবী। এখানে পাহাড় নেই, অরণ্য নেই, দূরের মেঘে ঢাকা সবুজ ঢাল নেই। আছে কংক্রিটের দেয়াল, কাচের জানালা, অসংখ্য গাড়ি, মানুষের ভিড়, রাস্তার ওপর জমে থাকা ধুলো আর সারাক্ষণ বেজে চলা হর্ন। ভবনের পর ভবন দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি, কোথাও পুরনো স্থাপনা, কোথাও নতুন কাচের টাওয়ার। দুপুরের রোদ কংক্রিটের দেয়ালে পড়ে গরম হয়ে উঠেছে শহর।

মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের অফিস একটা আধুনিক বাণিজ্যিক ভবনের কয়েকতলায়। রিসেপশনে বসা তরুণী রেজোয়ানের পরিচয় শুনে সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে বসলো। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পর তাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। 

অফিসের ভেতর ঢুকেই রেজোয়ানের চোখে পড়ল দেয়ালের বিশাল ছবিগুলো। খাগড়াছড়ির পাহাড়। কুয়াশায় ঢাকা সবুজ ঢাল। পাহাড়ের গায়ে কাঠের কটেজ। ঝরনার পাশে বসে থাকা পর্যটক। একটা ছবিতে বিকেলের আলোয় পাহাড়ের ওপর মেঘ ভেসে আছে।

রেজোয়ান কয়েক সেকেন্ড ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এগিয়ে গেল।

ঘরের ভেতরের সাজসজ্জা দেখে বোঝা যায়, কোম্পানিটা ছোট নয়। বড় টেবিল, কাচের দেয়াল, নকশা করা আলো, দেয়ালে বিভিন্ন প্রকল্পের ছবি। একটা বড় বোর্ডে খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রকল্পের নকশা টাঙানো।

রেজোয়ান নকশাটার দিকে একবার তাকাল। তারপর চোখ সরিয়ে নিল।

কোম্পানির মালিক উঠে দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। পরিচ্ছন্ন পোশাক, পরিপাটি চুল, মুখে স্বাভাবিক হাসি। এমন হাসি, যা বহুবার ব্যবসায়িক আলোচনার টেবিলে ব্যবহার করা হয়েছে। “কর্ণেল সাহেব, আসুন। আপনাকে আসতে হলো বলে আমি দুঃখিত।”

রেজোয়ান বসে পড়ল। “কিছু কথা সামনাসামনি বলাই ভালো। তাই চলে আসতেই হলো।&quot;

লোকটি হাসল। “অবশ্যই।”

রেজোয়ান কোনো ভূমিকা করল না। ফাইল খুলে দলিলের কপি টেবিলের ওপর রাখল। তারপর পুরনো নকশা। তারপর পাহাড়ে গিয়ে তোলা ছবিগুলো।

লোকটি একে একে সব দেখল। তার মুখে বিস্ময়ের কোনো চিহ্ন নেই। বরং মনে হলো, সে সবকিছু আগে থেকেই জানে। 

রেজোয়ানের চোখ তার মুখে স্থির হলো। “জায়গাটা আমার।”

“আমরা জানি।” উত্তরটা খুব সহজভাবে এল।

রেজোয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। “তাহলে সেখানে কাজ করছেন কেন?”

লোকটি চেয়ারে হেলান দিল। “কারণ জায়গাটা আমাদের প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন।”

“প্রয়োজন আর মালিকানা এক জিনিস নয়।”

“তা ঠিক।” লোকটির মুখে তখনো হাসি। “আপনার মালিকানা নিয়ে আমরা কোনো প্রশ্ন করছি না।”

রেজোয়ানের চোখ আরও সরু হলো। “তাহলে?”

লোকটি টেবিলের ওপর আঙুল টুকে টুকে ধীরে ধীরে একটা ছন্দ তৈরি করল। “আমরা অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছি। রাস্তা তৈরি হচ্ছে, জায়গা প্রস্তুত হচ্ছে, মেশিন গেছে, শ্রমিক গেছে। প্রকল্পের পরিকল্পনা অনেক দূর এগিয়েছে। এখন সব বন্ধ করলে আমাদের বড় ক্ষতি হবে।”

রেজোয়ানের কণ্ঠ শান্ত। “ক্ষতি আপনাদের ব্যপার। কিন্তু, জমিটা তো আমার।”

লোকটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “কর্ণেল সাহেব, ব্যবসার জগতে সবকিছু কাগজ দিয়ে চলে না।”

রেজোয়ানের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না। “আমার ক্ষেত্রে চলবে।” খুব ধীর শান্তভাবে বললো সে।

ঘরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল। বাইরের কাচের দেয়ালের ওপারে ঢাকা শহর তখন ছুটছে। নিচে গাড়ির সারি, দূরে ভবনের ওপর রোদ, কোথাও নির্মাণাধীন ভবনের লোহার কাঠামো। এয়ারকন্ডিশনারের ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে বসে থাকা দুই মানুষের কথাবার্তার সঙ্গে সেই ব্যস্ত শহরের কোনো সম্পর্ক নেই।

কোম্পানির মালিক এবার একটু সামনের দিকে ঝুঁকলেন। “আপনি চাইলে আমরা আপনাকে ভালো একটা সমাধান দিতে পারি।”

“কী সমাধান?”

“আপনি জায়গাটা আমাদের ছেড়ে দেবেন। বিনিময়ে আমরা আপনাকে ক্ষতিপূরণ দেব।”

রেজোয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। “আমি জমি বিক্রি করতে চাই না।”

“আপনি চাইলে দাম নিয়ে কথা বলা যায়।”

“দাম নিয়ে কোন কথা বলছি না।”

“তাহলে?”

রেজোয়ান ধীরে ধীরে ফাইলটা বন্ধ করল। “জায়গাটা আমার। আমি সেটা রাখব।”

মালিক এবার প্রথমবারের মতো কিছুটা বিরক্ত দেখালেন। তবে সেটা এক মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই আবার হাসি ফিরে এল। “আপনি অবসর নিয়েছেন, কর্ণেল সাহেব। এখন নিশ্চিন্তে জীবন কাটানোই ভালো। একটা জমির জন্য এত ঝামেলায় যাওয়ার প্রয়োজন আছে কি?”

রেজোয়ান উত্তর দিল না। লোকটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “আমার জীবনে কোন জিনিসের জন্য কতটা ঝামেলায় যেতে হয়, সেটা আমি নিজেই ঠিক করি।”

মালিকের হাসি একটু ম্লান হলো। কয়েক সেকেন্ড সে চুপ করে থাকল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আপনি চাইলে কিছু ক্ষতিপূরণ নিতে পারেন। কিন্তু জায়গাটা আমরা ছাড়ব না।”

রেজোয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরে ধীরে নিজের কাগজপত্র গুছিয়ে নিল। তার চোখে রাগ নেই। বরং আশ্চর্য রকম শান্ত। তাতে কোনো হুমকির ছাপও নেই।

শুধু একটা বিষয় তার কাছে এখন একেবারে পরিষ্কার। ওরা জানে জমিটা তার। ওরা এও জানে তাদের সেখানে থাকার বৈধ অধিকার নেই। তবু তারা জায়গা ছাড়বে না। কারণ তারা বিশ্বাস করে, মালিকানা আর ক্ষমতা এক জিনিস নয়।

কাগজে মালিক রেজোয়ান। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে। 

রেজোয়ান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে যাওয়ার আগে একবার ঘরের দেয়ালে টাঙানো খাগড়াছড়ির ছবিগুলোর দিকে তাকাল। ছবির পাহাড়গুলো নিঃশব্দ। সবুজ ঢালের ওপর মেঘ জমে আছে। দূরে একটা সরু পাহাড়ি পথ অরণ্যের মধ্যে হারিয়ে গেছে।

ছবিটা দেখে তার মনে পড়ল নিজের জমির কথা। সেই পথ। গাছ। ছড়া। আর সেই কাটা পাথর।

তারপর সে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। লিফটের দরজা বন্ধ হলো। কয়েক সেকেন্ড পর লিফট নিচে নামতে শুরু করল। রেজোয়ান একা দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে নিজের ফাইল। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। কিন্তু মাথার ভেতর কদিন ধরে চলতে থাকা অংকটা এবার মিলে গেছে।

সে প্রশাসনের কাছে গেছে। ভূমি অফিসে গেছে। থানায় গেছে। তারপর কোম্পানির মালিকের সঙ্গেও সরাসরি কথা হয়েছে।

কেউ তার মালিকানা অস্বীকার করেনি। কেউ তাকে ভুলও বলেনি। কিন্তু কেউ তাকে তার জমি ফিরিয়েও দেয়নি।

লিফটের দরজা খুলল। রেজোয়ান বেরিয়ে এল।

বাইরে বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হচ্ছে। মতিঝিলের রাস্তায় মানুষের ভিড় আরও বেড়েছে। গাড়ির হর্ন, বাসের ব্রেকের শব্দ, পথচারীদের ব্যস্ততা, ফুটপাথের দোকানদারদের ডাক, সব মিলিয়ে শহর আবার তার স্বাভাবিক বিশৃঙ্খলায় ফিরে গেছে।

রেজোয়ান গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করল। ইঞ্জিন চালু করার আগে কিছুক্ষণ স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে চুপ করে বসে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে গাড়ি ছাড়ল।

আজ সে কাউকে ভয় দেখায়নি। আবার কাউকে হুমকিও দেয়নি। শুধু নিজে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আইনের দরজায় সে যথেষ্ট কড়া নেড়েছে। এবার দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে একটু কাছ থেকে দেখতে হবে।

কারণ সে বুঝে গেছে, এই লড়াইয়ে কাগজ তার পক্ষে থাকলেও প্রতিপক্ষ কাগজের শক্তিতে বিশ্বাস করে না। আর রেজোয়ানের সবচেয়ে বড় সুবিধাটা কাগজে লেখা নেই। সেটা আছে তার মাথার ভেতর।

গাড়ি শহরের ভিড় পেরিয়ে এগিয়ে চলল। রেজোয়ানের চোখ সামনে। মুখ শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত মুখের আড়ালে বহু বছরের অভিজ্ঞতায় কঠোর প্রশিক্ষণে তৈরি একটা পুরনো চেহারা ধীরে ধীরে অবয়ব পাচ্ছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/273466/</link>
				<pubDate>Sun, 13 Sep 2026 04:20:25 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় তিন)<br />
পরদিন সকালটা ছিল ভারী উজ্জ্বল। বর্ষার পরের আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার না হলেও মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদ নেমেছিল শহরের ওপর। ডিওএইচএস-এর পরিচিত রাস্তায় গাছের পাতায় জমে থাকা পানির ফোঁটা ঝিলমিল করছিল। গেটের কাছে নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়মিত তৎপরতা, রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া অফিসগামী গাড়ি, স্কুলের পোশাকে ছুটে চলা ছে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-273466"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/273466/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">4afadd226d7791c4a7aaf8029bd777a5</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় দুই)
রাতে ভালো ঘুম হয়নি রেজোয়ানের। খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে আসার পর ডিওএইচএস এর পরিচিত, নিরাপদ পরিবেশেও তার মনটা যেন পাহাড়েই পড়ে ছিল। জানালার বাইরে রাতের ঢাকা শান্ত। রাস্তার দুপাশে ছায়াঘেরা গাছ, নির্দিষ্ট দূরত্বে নিরাপত্তার আলো, গেটের কাছে পাহারারত নিরাপত্তাকর্মী। মাঝেমধ্যে নিঃশব্দে কোনো গাড়ি ঢুকে যাচ্ছে, আবার কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে যাচ্ছে। শহরের এই নিয়ন্ত্রিত, পরিচ্ছন্ন এবং সুরক্ষিত আবাসিক পরিবেশের সঙ্গে খাগড়াছড়ির গভীর পাহাড়ের কোনো মিল নেই। সেখানে রাত নামলে অন্ধকার যেন চারদিক থেকে এগিয়ে আসে। আর এখানে রাতের অন্ধকারও মানুষের তৈরি আলো আর নিরাপত্তার মধ্যে বন্দী।

তবু রেজোয়ান চোখ বন্ধ করলেই তার মনের মাঝে ফিরে আসছিল সেই পাহাড়। কাটা গাছের গুঁড়ি। নতুন কাটা লালচে মাটি। ভারী গাড়ির চাকার দাগ। বাঁশের বেড়া। আর তার নিজের জমির বুকের ওপর সাদা চুন দিয়ে টানা রেখা। সবশেষে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের সেই সাইনবোর্ড।

রেজোয়ান বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। ঘড়ির কাঁটা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ঘুম না হওয়া তার কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়। সামরিক জীবনে অল্প ঘুমে তাকে বহুদিন থাকতে হয়েছে। সে এতে অভ্যস্ত। কখনো কয়েক ঘণ্টার ঘুম, কখনো তারও কম। কিন্তু তার আজকের অস্বস্তি শরীরের ক্লান্তির কারণে নয়।

তার মাথায় কয়েকটা প্রশ্ন ঘুরছিল। কেউ কীভাবে তার জমিতে ঢুকল? কতদিন ধরে কাজ চলছে? জমির সীমানা কে দেখিয়ে দিল? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, স্থানীয় প্রশাসনের কেউ কি বিষয়টা জানে না, না কি জেনেও না জানার ভান করছে?

এই শেষ প্রশ্নটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছিল।

কারণ পাহাড়ের এতটা ভেতরে গিয়ে কেউ হঠাৎ করে রাস্তা কেটে, গাছ ফেলে, মাটি সমান করে, শ্রমিকের থাকার জায়গা বানিয়ে কাজ শুরু করে দিতে পারে না। এর পেছনে পরিকল্পনা আছে। টাকা আছে। লোকবল আছে। নিশ্চয়ই কোনো স্থানীয় যোগাযোগও আছে।

রেজোয়ান পাশ ফিরে শুল। কিন্তু, ঘুম এল না। 

রাতের শেষ ভাগে অল্প সময়ের জন্য চোখ লেগেছিল। সকালে ঘুম ভাঙতেই সে সরাসরি স্টাডিরুমে চলে গেল।

ঘরটা বাড়ির অন্য অংশের তুলনায় বেশ নিরিবিলি। একপাশে বইয়ের তাক, অন্যপাশে ফাইল রাখার আলমারি। জানালার সামনে ভারী পর্দা, মাঝখানে প্রশস্ত কাঠের টেবিল। দেয়ালে তার সামরিক জীবনের দু-একটা ছবি আছে, কিন্তু প্রদর্শনীর মতো করে সাজানো নয়। কয়েকটি স্মারকও আছে, সেগুলোর ওপর ধুলো জমেনি, কিন্তু বোঝা যায় বহুদিন কেউ সেগুলোতে হাত দেয়নি।

রেজোয়ান সামরিক জীবনের স্মৃতি নিয়ে বসে থাকতে পছন্দ করে না। অতীতকে সে ভুলে যায়নি। আবার তাকে সবসময়ের জন্য সামনে এনে বসিয়েও রাখেনি।

আলমারির নিচের দিকে রাখা একটা পুরনো ফাইল বের করল সে। ফাইলটা টেবিলে রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুলল।

একটার পর একটা কাগজ বেরিয়ে এল। জমির দলিলের কপি। নামজারির কাগজ। ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়ার রসিদ। পুরনো নকশা। সীমানার বিবরণ। জমি কেনার সময়কার অন্যান্য কাগজপত্র।

রেজোয়ান প্রতিটা কাগজ মন দিয়ে দেখতে লাগল। তার চোখ দ্রুত চলে, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে না। একটা জায়গায় থামে, আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়। তার দীর্ঘ কর্মজীবনে কাগজ পড়ার একটা নিজস্ব অভ্যাস তৈরি হয়েছে। সে কোনো তথ্যকে আলাদা করে না দেখে পুরো বিষয়টার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে।

দলিলের মূলে জমিটা তার। নামজারিও তার নামে। করও দিয়েছে নিয়মিত। পুরনো নকশায় সীমানার বিবরণও পরিষ্কার।

রেজোয়ান এবার নকশাটা পুরো টেবিলজুড়ে মেলে ধরল। উত্তরে পাহাড়ি ছড়া। দক্ষিণে জঙ্গল। পূর্ব দিকে পুরনো হাঁটার পথ। পশ্চিমে উঁচু ঢাল।

সীমানার কয়েকটা প্রাকৃতিক চিহ্নও উল্লেখ করা আছে। একটা বড় পাথর। তার পাশে বাঁকা গাছ। আর নিচে সরু একটা ছড়া। 

রেজোয়ানের মনে পড়ল আগের দিনের দৃশ্যটা। বাঁকা গাছটা সে পেয়েছিল। ছড়াটাও পেয়েছিল। পাথরটাও পেয়েছিল। কিন্তু পাথরটা তার জায়গায় ছিল না। উপড়ে ফেলে মাটিতে ফেলে রাখা হয়েছিল।

রেজোয়ান নকশার ওপর আঙুল রেখে ধীরে ধীরে রেখাটা অনুসরণ করল। তারপর থেমে গেল। এখানেই আসল ব্যাপার।

যে মানুষ শুধু অবৈধভাবে জমিতে ঢোকে, সে সাধারণত এত নিখুঁতভাবে সীমানার চিহ্ন সরায় না। এখানে কেউ জানত কোথায় কী আছে। কেউ আগে জায়গাটা দেখেছে। হয়তো মেপেছে। তারপর পরিকল্পনা করে কাজ শুরু করেছে।

অর্থাৎ ব্যাপারটা নতুন নয়। শুধু তার কাছে নতুন। রেজোয়ান চেয়ার ছেড়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

ডিওএইচএস-এর সকাল ততক্ষণে পুরোপুরি শুরু হয়ে গেছে। রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। নিরাপত্তারক্ষীরা গেটের কাছে দায়িত্ব পালন করছে। পাশের বাড়ির সামনে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে, ড্রাইভার দরজা খুলে অপেক্ষা করছে। দূরে কোনো শিশুর স্কুলে যাওয়ার তাড়া। কোথাও সকালের বাজারের ব্যাগ হাতে একজন গৃহকর্মী রাস্তা পার হচ্ছে।

সবকিছু চলছে নিয়মের মধ্যে। এই পরিবেশে নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ নিরাপদ জীবন রেজোয়ানের পরিচিত।

বরং এই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনেকটাই তার কর্মজীবনের পুরনো জগতের সঙ্গে মিল আছে। কে ঢুকছে, কে বেরোচ্ছে, কোথায় কী হচ্ছে, সবকিছু একটা সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে চলছে।

কিন্তু খাগড়াছড়ির পাহাড়ে কোনো কিছুই এত সহজ নয়। সেখানে একটা বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে পথ চলে যেতে পারে। একটা পাহাড়ি ছড়া রাস্তার দিক বদলে দিতে পারে। একটা ঢাল দূরত্বকে দ্বিগুণ করে দিতে পারে। আর একটা ছোট ভুলের সুযোগে কয়েক ঘণ্টার পথ হারিয়ে যেতে পারে মানুষ।

রেজোয়ান আবার টেবিলের কাছে ফিরে এল। মোবাইলটা হাতে নিয়ে আগের দিনের ছবিগুলো খুলল। একটা একটা করে দেখতে লাগল। নতুন রাস্তা। কাটা গাছ। মাটি কাটার মেশিন। বাঁশের বেড়া। অস্থায়ী শেড। নির্মাণসামগ্রী। সবশেষে রিসোর্টের সাইনবোর্ড।

সে ছবিগুলো ঘুরে ফিরে আরো একবার দেখল। তারপর আবার দেখল। 

কিছুক্ষণ পর একটা নোটবুক খুলে কয়েকটা নাম লিখল। ভূমি অফিস। স্থানীয় প্রশাসন। থানা। তারপর কোম্পানি।

একটা মুহূর্ত থেমে সে কলমটা টেবিলে রাখল। প্রথমে প্রশাসন। এটাই স্বাভাবিক পথ।

নিজের জমি নিয়ে বিরোধ হয়েছে বলে সে সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করবে না। আইন আছে। প্রশাসন আছে। অভিযোগ করার জায়গা আছে। কাগজপত্র তার হাতে আছে। কাজেই সেই পথটাকে সুযোগ না দিয়ে অন্য পথে যাওয়া তার কাছে যুক্তিযুক্ত নয়।

আর একটা বিষয় সে ইচ্ছে করেই মাথায় আনল না। তার পুরনো সামরিক পরিচিতদের কথা।

সেনাবাহিনীতে দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে তার পরিচিত মানুষ কম নয়। তার সঙ্গে কাজ করা অনেকেই এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। তাদের কাউকে ফোন করলে হয়তো কয়েকটা দরজা দ্রুত খুলে যেতে পারে।

কিন্তু রেজোয়ান জানে, সেটা করা উচিত নয়। অবসর নেওয়ার অর্থ শুধু ইউনিফর্ম খুলে ফেলা নয়। এর সঙ্গে একটা সীমারেখাও আসে।

নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিরোধে বর্তমান সামরিক কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত প্রভাব ব্যবহার করতে সে চায় না। তার কারণে পুরনো সহকর্মীদের কোনো রকম অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হবে, এটাও সে চায় না।

এটা তার নিজের সমস্যা। কাজেই নিজেকেই সামলাতে হবে।

রেজোয়ান ফাইল বন্ধ করল। তারপর উঠে দাঁড়াল। দুপুরের আগেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। প্রথম গন্তব্য ভূমি অফিস। তেজগাঁও।

পুরনো সরকারি ভবনটার ভেতরে ঢুকতেই ভিন্ন একটা জগতের মুখোমুখি হলো সে। পুরনো দেয়াল, লোহার আলমারি, কাঠের টেবিল, ফাইলের স্তূপ, কোথাও ধুলো জমে থাকা কাগজের গন্ধ। কয়েকজন মানুষ বিভিন্ন কাজ নিয়ে বসে আছে। কেউ নামজারির জন্য এসেছে, কেউ জমির খতিয়ান তুলতে, কেউ কোনো পুরনো রেকর্ড খুঁজছে।

রেজোয়ান নিজের পরিচয় দিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিল। তার জমির রেকর্ড খুঁজে বের করতে কিছুটা সময় লাগল।

একজন কর্মচারী পুরনো ফাইল খুলে বসে গেল। পাতার পর পাতা উল্টাতে লাগল। মাঝে মাঝে ভ্রু কুঁচকে কোনো একটা জায়গা পড়ছে, আবার পরের পাতায় যাচ্ছে। 

শেষ পর্যন্ত সে রেজোয়ানের দিকে তাকাল।

মূল রেকর্ডে সমস্যা নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ওই এলাকার সীমানা নিয়ে কিছু পরিবর্তনের আবেদন জমা পড়েছে।

রেজোয়ানের চোখ স্থির হলো। “কার আবেদন?”

কর্মচারী নামটা বলল। 

রেজোয়ান নোটবুকে নামটা টুকে নিল। তারপর জানতে চাইলো, “কীসের ভিত্তিতে?”

লোকটা আবার ফাইল দেখতে লাগল। কিছু কাগজ বের হলো। 

রেজোয়ান সামনে ঝুঁকে সেগুলো দেখল। কোথাও সীমানার বর্ণনায় সামান্য পরিবর্তন। কোথাও মাপের সঙ্গে অমিল। কোথাও পুরনো বিবরণের বদলে নতুন বিবরণ বসানোর চেষ্টা।

কাগজগুলো দেখতে দেখতে রেজোয়ানের মনে হলো, কেউ সরাসরি তার দলিলকে অস্বীকার করছে না। বরং এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করছে যেখানে পরে বলা যাবে, সীমানা নিয়ে তো বিতর্ক ছিল।

সে মাথা তুলল। “এটার অনুমোদন হয়েছে?”

কর্মচারী একটু থামল। “প্রক্রিয়াটা চলছে।”

“কোথায়?”

লোকটা এবার সরাসরি উত্তর দিল না। বললো, “বিষয়টা উপরের দপ্তরে আছে।”

রেজোয়ান বুঝল, এখানেই প্রথম দেয়াল। সে তর্ক করল না। কাগজের কপি নিল। তারপর উঠে দাঁড়াল। পরের গন্তব্য স্থানীয় প্রশাসনের অফিস।

সেখানেও অপেক্ষা করতে হলো। শেষ পর্যন্ত একজন কর্মকর্তা তাকে সময় দিলেন। রেজোয়ান তাকে আবার পুরো ঘটনা বলল। জমির দলিল দেখাল। পাহাড়ে গিয়ে তোলা ছবিগুলো দেখাল।

কর্মকর্তা ছবিগুলো বেশ কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর কাগজগুলো দেখলেন। তার ভ্রু কুঁচকে উঠলো। রেজোয়ানের দিকে ফিরে বললেন, “আপনি কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছেন?”

“এখনো না।”

“আগে কথা বললে হয়তো ভালো হতো।”

রেজোয়ান চুপ করে রইল। 

কর্মকর্তা একটু ইতস্তত করে বললেন, “পাহাড়ি এলাকার বিষয়। এখানে স্থানীয় কিছু ব্যাপার থাকে। বিষয়টা একটু জটিল।”

রেজোয়ানের চোখ তার মুখে স্থির। “জটিলতাটা কী?”

কর্মকর্তা সরাসরি উত্তর দিলেন না। “আপনি কোম্পানির সঙ্গে বসে কথা বলুন। যদি সমাধান না হয়, তখন দেখা যাবে।”

রেজোয়ান আর কোনো প্রশ্ন করল না। অফিস থেকে বেরিয়ে আসার সময় তার মুখে বিরক্তি ছিল না। বরং তার চোখে সেই স্বাভাবিক স্থিরতা।

সে একটা জিনিস বুঝেছে। এখানে সবাই সমস্যাটা জানে। কিন্তু কেউ প্রথম মানুষ হতে চাইছে না, যে সমস্যাটার সামনে দাঁড়াবে।

বিকেলে থানায় গেল সে। সেখানেও একই দৃশ্য। অভিযোগ শোনা হলো। দলিল দেখা হলো। ছবি দেখা হলো। কিন্তু কোনো তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না।

একজন কর্মকর্তা তাকে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, “কর্ণেল সাহেব, এত দূরে জায়গা কিনেছিলেন কেন?”

রেজোয়ান লোকটার দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল। “জায়গাটা আমার পছন্দ হয়েছিল।” কথাটা বলে সে চুপ করে গেল। এর বেশি ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন সে বোধ করল না।

সন্ধ্যার আগেই ডিওএইচএস-এ ফিরে এল রেজোয়ান। দিনটা কেটে গেছে। কিন্তু সমস্যাটার সলিউশন এক ইঞ্চিও এগোয়নি।

কেউ তার দলিলকে ভুল বলেনি। বলেনি জমিটা তার নয়। তাকে মিথ্যাবাদীও বলেনি। আবার কেউ তাকে সরাসরি ফিরিয়েও দেয়নি।

শুধু একটা অদৃশ্য দেয়াল প্রত্যেকটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। 

রেজোয়ান স্টাডিরুমে ফিরে আবার কাগজগুলো টেবিলে সাজাল। এক পাশে তার দলিল। অন্য পাশে সাম্প্রতিক সীমানা পরিবর্তনের কাগজ। দুটোর মাঝখানে কয়েক ইঞ্চি ফাঁক। কিন্তু সেই ফাঁকটাই যেন পুরো সমস্যাটার জলজ্যান্ত ছবি।

কাগজে প্রকৃত মালিক সে। অথচ তারই মাটিতে কাজ করছে অন্য কেউ।

রেজোয়ান চেয়ারটায় বসে অনেকক্ষণ নীরবে কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নোটবুক খুলল।

আজকের প্রতিটি জায়গার নাম লিখে রাখল। কার সঙ্গে কথা হয়েছে। কী বলা হয়েছে। কোথায় কী কাগজ পাওয়া গেছে। কোথায় উত্তর মেলেনি।

সে জানে, তার স্মৃতি ভালো। সহজে কোন কিছু ভুলে না। তারপরেও তার মনে হলো সবকিছু লিখে রাখা আরও ভালো। বিশেষ করে যখন একটা ঘটনা ধীরে ধীরে জটিল হয়ে উঠছে।

রাত নেমে এসেছে। ডিওএইচএস-এর প্রতিটা ঘরের বাইরে আলো জ্বলছে। নিরাপত্তারক্ষীরা পালা বদল করছে। দূরে কোনো গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো, তারপর আবার নীরবতা।

রেজোয়ান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। তার মাথায় এখন একটা সিদ্ধান্ত পরিষ্কার। প্রশাসনের পথ সে এখনই ছাড়বে না।

কিন্তু পাশাপাশি তাকে জানতে হবে, মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্ট আসলে কার। কারা এত টাকা খরচ করে পাহাড়ের ওই দুর্গম জায়গায় প্রকল্প করছে। কারা স্থানীয়ভাবে তাদের কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তার জমিটাই কেন তাদের দরকার হলো।

রেজোয়ান মোবাইলটা হাতে নিল। আগের দিনের ছবিগুলো আবার খুলল। সাইনবোর্ডের ছবিটায় গিয়ে থামল। মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্ট। নামটা কয়েকবার মনে মনে পড়ল।

তারপর কোম্পানির নামটা নোটবুকে লিখে নিচে একটা ফাঁকা জায়গা রাখল। 

মালিকের নাম। ঠিকানা। ব্যবসার ধরন। স্থানীয় যোগাযোগ। সব জানতে হবে। 

রাত আরও গভীর হলো। রেজোয়ান ফাইল বন্ধ করল। কিন্তু ঘুমাতে যাওয়ার আগে সে আবার পুরনো নকশাটা খুলে দেখল।

তার আঙুল ধীরে ধীরে সীমানার ওপর দিয়ে এগিয়ে গেল। উত্তরের ছড়া। দক্ষিণের জঙ্গল। পূর্বের পুরনো পথ। পশ্চিমের ঢাল। তারপর থেমে গেল সেই জায়গাটায়, যেখানে বাঁকা গাছের পাশে বড় পাথরটার কথা লেখা।

গতকাল সেই পাথরটা মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেছিল সে। একটা সাধারণ পাথর। কিন্তু এখন আর সেটাকে সাধারণ মনে হচ্ছে না। কারণ কেউ একটা সীমানা মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আর সেটা করেছে কাজ শুরু হওয়ার আগেই।

রেজোয়ান নকশাটা ভাঁজ করে ফাইলের মধ্যে রেখে দিল। তার চোখে তখন কোনো রাগ নেই। শুধু সিদ্ধান্ত।

আগামীকাল থেকে তাকে কোম্পানির দিকে নজর দিতে হবে। আইনের দরজা সে খুলেছে। এবার সেই দরজার ওপাশে কে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে সেটা জানতে হবে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/273105/</link>
				<pubDate>Sat, 12 Sep 2026 03:23:44 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় দুই)<br />
রাতে ভালো ঘুম হয়নি রেজোয়ানের। খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে আসার পর ডিওএইচএস এর পরিচিত, নিরাপদ পরিবেশেও তার মনটা যেন পাহাড়েই পড়ে ছিল। জানালার বাইরে রাতের ঢাকা শান্ত। রাস্তার দুপাশে ছায়াঘেরা গাছ, নির্দিষ্ট দূরত্বে নিরাপত্তার আলো, গেটের কাছে পাহারারত নিরাপত্তাকর্মী। মাঝেমধ্যে নিঃশব্দে কোনো গাড়ি ঢুকে যাচ্ছে, আবার কিছ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-273105"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/273105/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">ffc0b8987f42d5dea92bd060f614151a</guid>
				<title>অরণ্যের শেষ প্রহর

(অধ্যায় এক)
বিকেলের আলো তখনো পাহাড়ের গা ছেড়ে যায়নি। খাগড়াছড়ির শহর অনেক পেছনে পড়ে গেছে, আর পিচঢালা রাস্তার পরিচিত চেহারাটাও বেশ কিছুক্ষণ হলো বদলে গেছে সরু, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে। 

গাড়িটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল। রাস্তার এক পাশে পাহাড় উঠে গেছে ধাপে ধাপে, কোথাও মাটির ঢাল, কোথাও কালচে পাথরের খাঁজ, কোথাও আবার বাঁশঝাড় আর বুনো গাছপালা এমন ঘন হয়ে আছে যে ভেতরের কিছুই দেখা যায় না। অন্য পাশে ঢাল নেমে গেছে নিচের উপত্যকার দিকে। 

অনেক নিচে কোথাও পাহাড়ি ছড়া চিকচিক করছে, কোথাও গাছের মাথার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে টিনের ছাউনি দেওয়া দু-একটা ঘর। দূরের কোনো পাহাড়ের ঢালে জুমের পুরনো জমির রেখা, কোথাও নতুন চাষের চিহ্ন, কোথাও কুয়াশার মতো পাতলা ধোঁয়া উঠছে। বর্ষার শেষ ভাগ বলে মাটির গায়ে এখনো ভেজা ভাব। 

পাহাড়ের বুক চিরে নামা ছোট ছোট জলধারা জায়গায় জায়গায় রাস্তা পার হয়েছে, গাড়ির চাকা তার ওপর দিয়ে গেলে স্বচ্ছ পানি দুপাশে ছিটকে পড়ছে। বাতাসে ভেজা মাটি, স্যাঁতসেঁতে পাতা, বাঁশপাতা আর বুনো ফুলের গন্ধ। শহরের ধুলো আর মানুষের কোলাহল থেকে এই জায়গাটা এতটাই আলাদা যে মনে হয়, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যেন অন্য একটা পৃথিবীতে এসে পড়া গেছে।

গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে রাখা মানুষটার চোখ কিন্তু শুধু রাস্তার দিকে নেই। রাস্তা যতটা সে দেখছে, তার চেয়ে বেশি দেখছে রাস্তার বাইরে।

একটা বাঁক আসার আগেই তার চোখ চলে যাচ্ছে বাঁকের পরের ঢালে। রাস্তার পাশে নতুন কাটা মাটি দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য গতি কমিয়ে দিচ্ছে। কোথাও পাথর আলগা হয়ে আছে কি না, কোথাও পাহাড়ের গা থেকে পানি নেমে এসে রাস্তা দুর্বল করেছে কি না, কোথাও গাছের আড়ালে মানুষের চলাচলের চিহ্ন আছে কি না, সেদিকেও তার দৃষ্টি যাচ্ছে। কয়েকবার এমন হয়েছে, সামনে রাস্তা ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও সে হঠাৎ আয়নায় তাকিয়েছে, তারপর আবার চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

তার মধ্যে কোনো অহেতুক অস্থিরতা নেই। বরং সে অস্বাভাবিক রকমের স্থির।

গাড়ি চালানোর সময় তার শরীরের কোনো অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া নেই। স্টিয়ারিংয়ে দুই হাতের অবস্থান একই থাকে। ব্রেক করার আগে চোখ রাস্তার অনেকটা সামনে চলে যায়। বাঁক নেওয়ার সময় গাড়ির গতি এতটাই হিসেব করে কমায় যে চাকার শব্দও প্রায় শোনা যায় না।

দেখলে মনে হবে, মানুষটা এই ধরনের রাস্তার সঙ্গে অপরিচিত নয়। কিন্তু তার চেহারা দেখে তাকে পাহাড়ি পথের কোনো সাধারণ চালকও মনে হয় না।

বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে অনেক আগেই। মাথার চুলের বেশিরভাগই ধূসর, কপালের দুপাশে বয়সের রেখা স্পষ্ট। চোখের কোণে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়েছে, মুখের চামড়ায় বয়সের ছাপ আছে। কিন্তু শরীরের গড়ন এখনো শক্ত এবং সংহত। বুক চওড়া, কাঁধ দুটো ভারী, কোমর সরু। দীর্ঘদিন নিয়মিত শরীরচর্চা করা মানুষের মতো তার চলাফেরায় একটা সংযত শক্তি আছে।

বয়স তাকে ধীর করেছে, এমন কোনো লক্ষণ নেই। বরং তার চোখে এমন এক ধরনের সতর্কতা, যা সাধারণত দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর মানুষের মধ্যে তৈরি হয়।

মানুষটা কর্ণেল রেজোয়ান। মাত্র কদিন আগেই অবসর নিয়েছে।

তার সামরিক জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে দেশের নানা জায়গায়, কখনো শহরে, কখনো সীমান্তের কাছাকাছি, কখনো এমন দুর্গম এলাকায় যেখানে রাস্তা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও অনেক দূর পায়ে হাঁটতে হয়েছে। দীর্ঘদিনের সেই জীবনের একটা অভ্যাস এখনো তাকে ছেড়ে যায়নি, কোনো জায়গায় ঢুকলে সে জায়গাটাকে শুধু চোখ দিয়ে দেখে না, পড়ার চেষ্টা করে।

তবে আজ তার মাথায় কোনো দায়িত্ব নেই। কোনো অপারেশন নেই। মাথার উপর কোনোরকম আদেশ নেই। সে আজ নিজের জন্য বেরিয়েছে।

বহু বছর আগে, চাকরিতে থাকতেই খাগড়াছড়ির এই দুর্গম এলাকায় একটা জমি কিনেছিল রেজোয়ান। তখন জায়গাটার আশপাশে এত রাস্তা ছিল না। শহর থেকে এত সহজে এখানে আসাও যেত না। জায়গাটার প্রতি তার আকর্ষণের কারণ ছিল এর নির্জনতা। পাহাড়ের গায়ে তখনো মানুষের হাত খুব বেশি পড়েনি। কয়েকটা পুরনো পথ, কিছু পাহাড়ি ছড়া, বাঁশঝাড়, বুনো গাছ আর দূরের পাহাড়ি বসতি, এই ছিল চারপাশের চেহারা।

সেই সময়েই একটা ছোট স্বপ্ন দেখেছিল সে। অবসরের পর এখানে একটা রেস্টহাউজ করবে। খুব বড় কিছু নয়, কাঠ আর পাথরের একটা সুন্দর বাড়ি, সামনে প্রশস্ত বারান্দা, বারান্দার ওপারে পাহাড়, পেছনে কয়েকটা গাছ আর ছোট একটা বাগান। পরিবার নিয়ে বছরে দু-একবার আসবে। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে কয়েকটা দিন কাটাবে। ভোরে উঠে বারান্দায় বসে চা খাবে, সামনে মেঘে ঢাকা পাহাড় দেখবে, দুপুরে বই পড়বে, সন্ধ্যায় অন্ধকার নামা দেখবে।

এই সামান্য স্বপ্নটার কথা মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল। তারপরই গাড়ির গতি কমে গেল। সামনের বাঁকটা পেরোতেই সে রাস্তার পাশে কিছু অস্বাভাবিক দেখতে পেয়েছে। পাহাড় কেটে নতুন একটা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।

রেজোয়ান ব্রেক করল। গাড়ি থেমে গেল। সে কিছুক্ষণ স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখেই সামনের দৃশ্যটা দেখল। তারপর ইঞ্জিন বন্ধ করে গাড়ি থেকে নামল।

নতুন কাটা মাটির রং এখনো গাঢ় লালচে। পাহাড়ের ঢাল থেকে শিকড় বেরিয়ে আছে। কয়েকটা মাঝারি আকারের গাছ কেটে পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। কাটা গুঁড়িগুলোর গায়ে করাতের দাগ স্পষ্ট। মাটির ওপর ভারী গাড়ির চাকার দাগ একটার ওপর আরেকটা পড়ে শক্ত হয়ে গেছে।

রেজোয়ান নিচু হয়ে চাকার দাগ দেখল। একটা গাড়ি নয়। অনেকগুলো।

চাকার গভীরতা দেখে বোঝা যায়, হালকা গাড়ি নয়। ভারী ট্রাক বা নির্মাণসামগ্রী বহনকারী কোনো গাড়ি নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করছে।

সে মাথা তুলল। দূর থেকে মেশিনের গম্ভীর শব্দ ভেসে আসছে। পাহাড়ের নীরবতার মধ্যে সেই শব্দ অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট। 

রেজোয়ান গাড়িতে ফিরে বসল। নতুন রাস্তা ধরে এগোল।

কিছুদূর যাওয়ার পর দৃশ্যটা আরও পরিষ্কার হয়ে উঠল। পাহাড়ের একটা বড় অংশ কেটে জায়গা সমান করার কাজ চলছে। মাটি কাটার মেশিন দাঁড়িয়ে আছে। পাশে লোহার পাইপ, কাঠ, বালু, পাথর আর নির্মাণসামগ্রী। কয়েকটা বড় ড্রাম পড়ে আছে। পাহাড়ের ঢালের একটু ওপরে বাঁশ আর টিন দিয়ে কয়েকটা অস্থায়ী ঘর তৈরি হয়েছে। সেখানে কাপড় শুকোচ্ছে। একটা ঘরের সামনে কয়েকজন শ্রমিক বসে চা খাচ্ছে।

আরও সামনে গিয়ে রেজোয়ান দেখল বাঁশের বেড়া। নতুন বাঁশের খুঁটি দিয়ে জায়গাটা ঘিরে ফেলা হয়েছে। বেড়ার পাশে দুজন লোক দাঁড়িয়ে। একজনের হাতে লাঠি। অন্যজনের হাতে টর্চ।

রেজোয়ানের গাড়ি কাছে যেতেই একজন হাত তুলে থামার সংকেত দিল।

রেজোয়ান গাড়ি থামাল।

লোকটা কাছে এসে জানালার পাশে দাঁড়াল। বয়স চল্লিশের মতো। গায়ে ধূসর শার্ট, নিচে পুরনো প্যান্ট, পায়ে স্যান্ডেল। মুখে এমন এক ধরনের নিশ্চিন্ত ভাব, যেন এখানে কে ঢুকবে আর কে ঢুকবে না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তারই।

“কোথায় যাবেন?”

রেজোয়ান তার দিকে তাকাল। “সামনে।”

লোকটা ভ্রু কুঁচকাল। “ওদিকে কাজ চলছে। গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না।”

“কীসের কাজ?”

“রিসোর্টের।”

রেজোয়ান কিছু বলল না। তার চোখ তখন লোকটার পাশ দিয়ে আরও সামনে চলে গেছে। রাস্তার ধারে একটা বড় সাইনবোর্ড দাঁড়িয়ে আছে। 

গাড়ির হেডলাইটের প্রয়োজন হলো না। বিকেলের আলোয় এবার নামটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্ট।

রেজোয়ানের চোখ কয়েক সেকেন্ড বোর্ডটার ওপর স্থির রইল। তারপর সে গাড়ি থেকে নামল। “এই জায়গাটা আমার।”

লোকটা প্রথমবার তাকে ভালো করে দেখল। “আপনার?”

“হ্যাঁ।” রেজোয়ান চারপাশটায় একটু চোখ ঘুরিয়ে আবার লোকটার মুখের উপর স্থির হলো। “এই জায়গার মালিক আমি।”

লোকটা আবারও তাকে ভালো করে মেপে দেখলো। তারপর বললো, “স্যার, এসব আমরা জানি না। আমাদের নির্দেশ আছে, বাইরে থেকে কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না।”

রেজোয়ানের চোখ এবার তার মুখে উঠল। “কার নির্দেশ?”

লোকটা উত্তর দিল না। তার সেই নীরবতাই যথেষ্ট ছিল।

রেজোয়ান আর কথা বাড়াল না। গাড়িটা রাস্তার একপাশে রেখে পায়ে হাঁটতে শুরু করল। 

লোক দুজন তাকে আটকানোর চেষ্টা করল না। তাদের মুখের ভাবেই বোঝা গেল, তারা মনে করছে, একটু সামনে গিয়ে জায়গাটা দেখে মানুষটা নিজেই ফিরে আসবে।

অরণ্যের ভেতরে ঢুকতেই বাইরের শব্দ ধীরে ধীরে কমে গেল। মাথার ওপর গাছের ডালপালা জড়িয়ে আছে। কোথাও বাঁশঝাড়ের সরু পাতা বাতাসে কাঁপছে, কোথাও বুনো লতাগুল্ম গাছের গায়ে উঠে গেছে। পায়ের নিচে ভেজা পাতা, তার নিচে নরম মাটি। জায়গায় জায়গায় পাহাড়ি পানির সরু ধারা মাটির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। বাতাসের গন্ধও বদলে গেল, বাইরে নির্মাণকাজের ধুলো আর ডিজেলের গন্ধ ছিল, এখানে শুধু ভেজা মাটি, পাতা আর অরণ্যের গন্ধ।

রেজোয়ান ধীরে ধীরে এগোল। বহু বছর আগের জায়গা। সবকিছু বদলে গেছে, তবু তার মনে থাকা কয়েকটা চিহ্ন এখনো আছে। একটা বাঁকা গাছ। তার পাশে বড় পাথর। আর একটু নিচে সরু ছড়া। 

গাছটা সে খুঁজে পেল। তারপর পাথরটাও। কিন্তু পাথরটা যেখানে থাকার কথা সেখানে নেই। মাটিতে পড়ে আছে।

রেজোয়ান থেমে গেল। সে নিচু হয়ে পাথরটা হাতে তুলে নিল। পাথরের গায়ে ভেজা মাটি। নিচের দিকে ছিঁড়ে যাওয়া শিকড়ের অংশ লেগে আছে। কেউ পাথরটা উপড়ে ফেলেছে। 

সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সামনেই বাঁশের বেড়া। বেড়ার ওপারে তার জমির একটা বড় অংশ পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। গাছ কাটা হয়েছে। মাটি সরানো হয়েছে। কোথাও সাদা চুন দিয়ে রেখা টানা। কোথাও কাঠের খুঁটি পোঁতা।

রেজোয়ান আরও কিছুদূর এগিয়ে একটা উঁচু জায়গায় উঠল। সেখান থেকে পুরো জায়গাটা পরিষ্কার দেখা গেল। 

নতুন রাস্তা তার জমির ভেতরে ঢুকে গেছে। মাটি সমান করার কাজ চলছে। নির্মাণসামগ্রী এনে রাখা হয়েছে। কয়েকজন শ্রমিক কাজ করছে।

সবকিছু দেখে বিষয়টা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। এটা হঠাৎ করে করা হয়নি। অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথমে জায়গাটা মাপা হয়েছে। তারপর রাস্তা কাটা হয়েছে। সীমানার চিহ্ন সরানো হয়েছে। 
এখন শুধু পরের ধাপের অপেক্ষা।

রেজোয়ান পকেট থেকে মোবাইল বের করল। একটার পর একটা ছবি তুলল। কাটা গাছ। নতুন রাস্তা। বাঁশের বেড়া। মাটি কাটার মেশিন। নির্মাণসামগ্রী। অস্থায়ী শেড। রিসোর্টের সাইনবোর্ড। সবকিছু।

তারপর মোবাইলটা পকেটে রেখে দাঁড়িয়ে রইল। তার খুব রাগ হচ্ছিল। কিন্তু রাগের ওপর সিদ্ধান্ত নিতে সে অভ্যস্ত নয়। প্রথমে জানতে হবে, কীভাবে তারা এখানে ঢুকেছে। কারা কাজ করছে। কোম্পানির মালিক কে। জমির রেকর্ডে কোনো পরিবর্তন করা হয়েছে কি না। আর প্রশাসন এসব জানে কি না।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। রেজোয়ান ফিরে দাঁড়াল।

বিকেলের আলো তখনও পাহাড়ের গায়ে আছে। পশ্চিম দিকের সূর্য একটু নিচে নেমেছে, কিন্তু অরণ্যের ভেতর এখনো যথেষ্ট আলো। দূরের পাহাড়ের চূড়ায় সোনালি আভা পড়েছে, নিচের ছড়ার পানি সেই আলো ধরে চিকচিক করছে।

রেজোয়ান ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। ঠিক তখনই নতুন রাস্তার দিক থেকে ভারী ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এল। সে থেমে তাকাল।

একটা ট্রাক পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠছে। তার পেছনে আরেকটা গাড়ি। তারপর আরও একটা। তিনটে গাড়িই ঢুকছে তার জমির দিকে।

রেজোয়ান কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর গাড়িতে উঠে বসল। ইঞ্জিন চালু করার আগে আবার একবার রিয়ারভিউ মিররে তাকাল। মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের বোর্ডটা এখনো দেখা যাচ্ছে। সে গাড়ি ঘুরিয়ে নিচের রাস্তা ধরল।

মাথার ভেতর তখন একটা সিদ্ধান্ত তৈরি হচ্ছে। তাকে আইনের পথ দিয়েই শুরু করতে হবে। প্রথমে প্রশাসনের কাছে যাবে। তারপর ভূমি অফিসে যাবে। প্রয়োজনে থানায় যাবে। কোম্পানির মালিকের সঙ্গেও কথা বলবে।

নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য স্বাভাবিক যে পথগুলো আছে, সবগুলোই সে আগে ব্যবহার করবে। তারপরও যদি কেউ না শোনে, তখন কী করতে হবে, সে সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া যাবে।

গাড়ি পাহাড়ি রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগল। পেছনে পড়ে রইল কাটা পাহাড়, বাঁশের বেড়া আর সেই বোর্ড। মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্ট।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/272749/</link>
				<pubDate>Fri, 11 Sep 2026 05:08:50 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অরণ্যের শেষ প্রহর</p>
<p>(অধ্যায় এক)<br />
বিকেলের আলো তখনো পাহাড়ের গা ছেড়ে যায়নি। খাগড়াছড়ির শহর অনেক পেছনে পড়ে গেছে, আর পিচঢালা রাস্তার পরিচিত চেহারাটাও বেশ কিছুক্ষণ হলো বদলে গেছে সরু, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে। </p>
<p>গাড়িটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল। রাস্তার এক পাশে পাহাড় উঠে গেছে ধাপে ধাপে, কোথাও মাটির ঢাল, কোথাও কালচে পাথরের খাঁজ, কোথাও আবার বাঁশঝাড় আর বুনো গাছ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-272749"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/272749/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">c1f02abed37d293f824e8275e25f5d3e</guid>
				<title>রিটায়ার্ড কর্ণেল রেজোয়ান। চাকুরীতে থাকাকালীন খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় একটা জায়গা কিনেছিলেন। ইচ্ছে ছিল অবসরে যাবার পর ওখানে একটা রেস্টহাউজ বানাবেন। পরিবার পরিজন নিয়ে এসে মাঝে মাঝে থাকবেন। কিন্তু, যখন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে জায়গায় যান, দেখেন ওখানে এক রিসোর্ট কোম্পানীর সাইনবোর্ড ঝুলছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, পাহাড়ের এক পরাক্রমশালী নেতার সহায়তায় ওই কোম্পানী জায়গায়টা অনেকটা জোর যার মুল্লুক তার পদ্ধতিতে দখল করে নিয়েছে। তিনি এ বিষয়ে প্রশাসনের কয়েক জায়গায় নক করে ব্যর্থ হলেন। রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার বলে কেউ তার ব্যপারটায় গুরুত্ব দিল না। কেউ কেউ এমন গহীন পার্বত্য এলাকায় জায়গা কেনবার জন্য উপহাস করলো। বুঝে গেলেন যা করবার নিজেকেই করতে হবে। যোগাযোগ করলেন ওই কোম্পানীর মালিকের সাথে। তাদেরকে বুঝিয়ে বললেন, জায়গাটা ভালোয় ভালোয় ছেড়ে দেবার জন্য। তার কথা তো তারা শুনলই না, উল্টো বিষয়টা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য হুমকী দিল। কিন্তু, তারা জানতো না আর্মিতে রেজোয়ানের আরেক নাম ছিল, নাইট ওলফ। তিনি একজন আনআর্মড কমব্যাট পারদর্শী দুর্ধর্ষ কমান্ডো। যুদ্ধের ময়দানে যে ছিলেন একাই একশো। এবার সময় এসেছে নিজের ব্যাক্তিগত যুদ্ধে সেই শক্তি দেখাবার। সে কি পারবে তার বেদখল জায়গাটা উদ্ধার করতে? জানতে হলে আমার সঙ্গেই থাকুন। অচিরেই আসছি নতুন ধারাবাহিক নিয়ে। আশাকরছি আগের মতই পাশে পাব সবাইকে। ধন্যবাদ।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/272443/</link>
				<pubDate>Thu, 10 Sep 2026 09:53:57 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>রিটায়ার্ড কর্ণেল রেজোয়ান। চাকুরীতে থাকাকালীন খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় একটা জায়গা কিনেছিলেন। ইচ্ছে ছিল অবসরে যাবার পর ওখানে একটা রেস্টহাউজ বানাবেন। পরিবার পরিজন নিয়ে এসে মাঝে মাঝে থাকবেন। কিন্তু, যখন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে জায়গায় যান, দেখেন ওখানে এক রিসোর্ট কোম্পানীর সাইনবোর্ড ঝুলছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, পাহাড়ের এক পরাক্রমশ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-272443"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/272443/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">6d56bdf957e2a984dced23058ba6a334</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ৩০
র‌্যাঞ্চের ওপর সকাল নেমেছিল, কিন্তু সেই সকাল আর অন্য দিনের মতো ছিল না। সূর্য উঠেছিল যথারীতি, ঘাসের ডগায় আলো পড়েছিল, আস্তাবলের সামনে ঘোড়াগুলোকে পানি দেওয়া হচ্ছিল, দূরের মাঠে গবাদি পশু ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল, তবু পুরো জায়গাটার ওপর যেন অদৃশ্য একটা চাপ জমে ছিল। ভাঙা বেড়ার জায়গায় নতুন কাঠ বসানো হয়েছে, বাড়ির দেয়ালের গুলির দাগ মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু কিছু দাগ এমন থাকে যেগুলো কাঠ থেকে মুছে ফেলা গেলেও মানুষের মন থেকে মুছে যায় না। পাহাড়ের দিকে তাকালেই সবাই জানত, বিপদ চলে যায়নি। ভিক্টর কেইন এখনও কোথাও আছে।

লারসেনের ক্ষত শুকিয়ে আসছিল। হাঁটতে তার আর আগের মতো কষ্ট হচ্ছিল না, কিন্তু বাম কাঁধের কাছে শক্ত ব্যথা রয়ে গেছে। এলিয়াসও ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে। কয়েকদিন আগের দুর্বলতার জায়গায় এখন তার চোখে আবার পুরোনো দৃঢ়তা ফিরেছে। তবু সে ভারী কাজ করে না। বারান্দায় বসে থাকে, দূরের পথ দেখে, মানুষের কথাবার্তা শোনে। যেন এই র‌্যাঞ্চের প্রতিটি শব্দের মধ্য থেকে সে এমন কিছু খুঁজছে, যা অন্যদের কানে পৌঁছায় না।

বাড হিগিন্স আগের মতোই কাজের হিসাব নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু এখন তার অভ্যাস হয়েছে কাজের মাঝেও একবার চারপাশ দেখে নেওয়া। ক্লে মরগান দিনের আলোয়ও কোমরের কোল্ট থেকে হাত খুব দূরে রাখে না। হ্যাঙ্ক ডসন র‌্যাঞ্চের উঁচু জায়গাগুলো বদলে বদলে পাহারা দেয়। মিগুয়েল প্রায় প্রতিদিন ঘোড়ায় চড়ে দূরের পথ দেখে আসে। রুবেন কোলের লোকেরা ব্ল্যাক রিভার, উত্তরের পথ আর পাহাড়ের নিচের বসতিগুলো থেকে খবর নিয়ে আসে। কেউ কেইনের দেখা পায়নি, কিন্তু সবাই জানে, কোনো খবর না পাওয়া মানেই সে নেই, এমন নয়।

মারদেকার দিন কাটছিল অন্যরকমভাবে। সকালবেলা লারসেনের সঙ্গে অনুশীলন, তারপর র‌্যাঞ্চের কাজ, আবার বিকেলে অস্ত্রের অনুশীলন। তার পিস্তল এখন কোমরের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে থাকে। হাঁটার সময় তার হাত আর অকারণে হোলস্টারের কাছে যায় না। অস্ত্র বের করার সময় শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয় না। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে পিস্তল তার কাছে ছিল নতুন কোনো পৃথিবীর দরজা, এখন সেটাই ধীরে ধীরে তার শরীরের সঙ্গে মানিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন ছিল। কেইন কেন অপেক্ষা করছে? উত্তরটা এক সকালে এসে পৌঁছাল।

রুবেনের পাঠানো এক লোক ঘোড়া ছুটিয়ে র‌্যাঞ্চে ঢুকেছিল। লোকটা ক্লান্ত, ঘোড়াটা ঘামে ভেজা। সে কিছুক্ষণ রুবেনের সঙ্গে নিচু গলায় কথা বলল। রুবেনের মুখের ভাব বদলে গেল। তারপর সে সরাসরি লারসেনের কাছে গেল। কথাটা শুনে লারসেন কিছুক্ষণ নীরব রইল।

খবরটা ছিল অল্প, কিন্তু যথেষ্ট। কেইনের লোকেরা আবার নড়াচড়া শুরু করেছে। এবার তাদের কথাবার্তায় বারবার একটা জিনিসের উল্লেখ এসেছে, পুরনো নথিপত্র।

সেদিন সন্ধ্যার আগে মারদেকা লক্ষ্য করল, লারসেন তাকে বারবার দেখছে। শেষ পর্যন্ত রাত নামার পর সে মারদেকাকে বাড়ির পেছনের ঘরে ডাকল। ঘরটা ছোট, জানালার বাইরে অন্ধকার উঠোন। টেবিলের ওপর একটা পুরোনো লণ্ঠন জ্বলছে। আলো খুব বেশি নয়। কাঠের দেয়ালে দুজনের ছায়া স্থির হয়ে আছে।

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তোমার কাছে আমার একটা কথা বলা দরকার।”

মারদেকা অপেক্ষা করল।

লারসেন টেবিলের নিচের একটা পুরোনো কাঠের বাক্স বের করল। বাক্সটা দেখতে সাধারণ। কিন্তু তার তালার ওপর বহু বছরের ব্যবহারের চিহ্ন। লারসেন চাবি ঘুরিয়ে ঢাকনা তুলল।

ভেতরে কাপড়ে মোড়া কয়েকটি পুরোনো কাগজের প্যাকেট।

মারদেকা এগিয়ে তাকাল।

লারসেন বলল, “তেরো বছর আগে আমি দল ছেড়ে আসার সময় এগুলো সঙ্গে এনেছিলাম।”

মারদেকা কিছু বলল না।

“এগুলো শুধু পুরোনো কাগজ নয়। এখানে সেই দলের হিসাব আছে। কারা ছিল, কোথায় টাকা গেছে, কোন কাজ কে করেছে, অনেক কিছু।”

লারসেন একটা প্যাকেটের ওপর হাত রাখল। “কেইনের বিরুদ্ধে প্রমাণও আছে।”

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। মারদেকা এতদিন জানত, লারসেন অতীত থেকে কিছু একটা নিয়ে পালিয়ে এসেছিল। জানত, ড্যানিয়েল রিড কোনো এক সময় সেই পুরোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এতদিন সে ভাবেনি, সেই অতীত এখনও কাগজের কয়েকটি পাতার মধ্যে বেঁচে আছে।

লারসেন ধীরে ঢাকনা বন্ধ করল। “ড্যানিয়েল এই নথির কিছু অংশের কথা জানতে পেরেছিল। সে বুঝেছিল, কেইনের বিরুদ্ধে শুধু গল্প নয়, প্রমাণও আছে।”

মারদেকার চোখ নিচু হয়ে গেল। ড্যানিয়েল কেন মারা গিয়েছিল, সেই প্রশ্নের শেষ উত্তরটাও যেন এবার সম্পূর্ণ হলো। তার বাবা কোনো অজানা কারণে মারা যায়নি। সে এমন কিছুর কাছে পৌঁছে গিয়েছিল, যা ভিক্টর কেইনের সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করতে পারত। আর সেই প্রমাণ এখনও লারসেনের কাছে।

বাইরে বাতাস উঠেছিল। জানালার ফাঁক দিয়ে শুকনো ঘাসের গন্ধ আসছিল। মারদেকা ধীরে বলল, “কেইন এগুলো নিতে চায়।”

লারসেন মাথা তুলল। “হ্যাঁ।”

কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না। তারপর লারসেন বাক্সটা আবার সরিয়ে রাখল। “সে শুধু তোমাকে মারতে চায় না। সে চায়, তার বিরুদ্ধে থাকা শেষ প্রমাণটাও যেন পৃথিবীতে না থাকে।”

মারদেকা জানালার বাইরে তাকাল। অন্ধকার মাঠের ওপারে পাহাড়ের কালো রেখা দেখা যাচ্ছে। সে বুঝতে পারল, কেইনের সঙ্গে এই লড়াই শুধু তার বাবার জন্য নয়। এটা সেইসব মানুষের জন্যও, যাদের নাম হয়তো এই কাগজগুলোর পাতায় লেখা আছে।

পরদিন ভোর থেকেই র‌্যাঞ্চের পরিবেশ বদলে গেল। বাডকে সব জানানো হলো। ক্লে, হ্যাঙ্ক, মিগুয়েল এবং রুবেনও জানতে পারল নথির কথা। কেউ কাগজগুলো দেখতে চাইল না। প্রয়োজনও নেই। তারা শুধু বুঝল, কেইনের শেষ আঘাত এবার আরও বড় হতে পারে।

লারসেন নথিগুলো অন্য কোথাও সরিয়ে রাখার কথা বলেছিল। কিন্তু মারদেকা জানত, জায়গা বদল করলেই সমস্যা শেষ হবে না। কেইন জানে নথি আছে। সে জানে লারসেনের কাছে আছে। সে জানে র‌্যাঞ্চ কোথায়।

দুপুরের দিকে খবর এল, উত্তরের পুরোনো পথের পাশে কেউ একটা বার্তা রেখে গেছে। বাড গিয়ে সেটা নিয়ে এল। কাগজের টুকরো। মাত্র কয়েকটি কথা। নথি দাও। নইলে আগুন আবার জ্বলবে। 

কাগজটা পড়ার পর ঘরে কোনো শব্দ রইল না।

ইলাইও সেখানে ছিল। সে কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মারদেকার দিকে। তার মুখে ভয় ছিল না, কিন্তু চোখে উদ্বেগ স্পষ্ট।

বাড বলল, “ওরা চায় আমরা ভয় পাই।”

লারসেন কাগজটা ভাঁজ করল। “ওরা জানে, ভয় দেখালে কীভাবে মানুষকে ভুল করানো যায়।”

মারদেকা তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বাইরে তাকিয়ে রইল। তার চোখে র‌্যাঞ্চের প্রতিটি পরিচিত জায়গা ভেসে উঠল। আস্তাবল। রান্নাঘর। গবাদি পশুর ঘের। বাডের কাজের জায়গা। ক্লের পাহারার পথ। হ্যাঙ্কের উঁচু অবস্থান। মিগুয়েলের ঘোড়া। রুবেনের বারান্দা। আর সেই ঘর, যেখানে ইলাই তাকে অসুস্থ হলে খাবার খাইয়ে দিয়েছে। 

কেইন যদি এখানে আসে, গুলি শুধু তাকে লক্ষ্য করে আসবে না। সে ধীরে লারসেনের দিকে ফিরল। “আমি বাইরে যাব।”

ঘরে থাকা সবাই তার দিকে তাকাল। 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “না।”

মারদেকা চুপ করে রইল।

লারসেন বলল, “এটা তোমার একার লড়াই নয়।”

মারদেকা এবার শান্ত গলায় বলল, “এই জন্যই যেতে চাই।”

লারসেনের চোখে কঠিন দৃষ্টি ফুটে উঠল।

মারদেকা জানত, সে কী বলতে চাইছে। সাত বছর বয়সে সে পালিয়েছিল। তখন তার সামনে ছিল শুধু আগুন, গুলি আর বাবার শেষ নির্দেশ। আজ তার সামনে অন্য কিছু আছে। তার পেছনে মানুষ আছে। এই মানুষগুলোকে সে বিপদের মধ্যে রেখে নিজে ঘরের আড়ালে বসে থাকতে পারবে না।

এলিয়াস এতক্ষণ চুপ করে ছিল। সে ধীরে বলল, “ও ঠিক বলছে।”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “কেইন ছেলেটাকে চাইছে। নথিও চাইছে। যদি মারদেকা বাইরে যায়, হয়তো সে র‌্যাঞ্চের ওপর সরাসরি আঘাত করবে না।”

ক্লে তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। সে ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “খোলা মাঠে ওদের সুবিধা কম।”

বাড কিছু বলল না। কিন্তু তার মুখ দেখে বোঝা গেল, সে হিসাব করছে।

লারসেন দীর্ঘক্ষণ মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জানালার বাইরে তাকাল। খোলা মাঠের ওপারে পাহাড়। সেই পাহাড়ের দিকেই তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মুখের কঠোরতা ধীরে বদলে গেল।

শেষ পর্যন্ত সে বুঝল, ছেলেটাকে আর আটকে রাখা যাবে না। তবে সে একা যাবে না।

সন্ধ্যার আগে প্রস্তুতি শুরু হলো। বেশি লোক নয়। দূর থেকে পাহারা থাকবে। লারসেন, এলিয়াস, বাড, ক্লে, হ্যাঙ্ক, মিগুয়েল এবং রুবেন নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকবে। তারা মারদেকার খুব কাছে যাবে না। কারণ শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে মারদেকাকেই।

লারসেন তার পিস্তল পরীক্ষা করল। তারপর মারদেকার হোলস্টারের দিকে তাকাল। “ভয় পাচ্ছ?”

মারদেকা সত্যি কথাই বলল। “হ্যাঁ।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “ভালো।”

মারদেকা তার দিকে তাকাল।

“ভয় না থাকলে মানুষ বোকা হয়। ভয় থাকুক। শুধু তাকে তোমার হাত চালাতে দিও না।”

রাত নামার আগে মারদেকা নিজের ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ একা বসে রইল। জানালার বাইরে অন্ধকার। বিছানার পাশে তার ছুরি। কোমরের পিস্তলটা খুলে টেবিলের ওপর রাখা। সে হাত বাড়িয়ে অস্ত্রটা তুলল, ওজন অনুভব করল।

এটাই সেই অস্ত্র, যার দিকে তাকিয়ে কয়েক সপ্তাহ আগে তার হাত থেমে গিয়েছিল। একজন মানুষকে লক্ষ্য করে সে গুলি করতে পারেনি। আজ তাকে হয়তো আবার সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কিন্তু এবার তার মনে প্রতিশোধের আগুন নেই। শুধু একটা পরিষ্কার অনুভূতি। সে কাউকে খুঁজে বের করতে যাচ্ছে না। সে অপেক্ষা করবে। কেইন আসবে।

আর যে মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসবে, সে তখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে।

পরদিন ভোরে র‌্যাঞ্চের ওপর কুয়াশা ছিল সামান্য। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেটা মিলিয়ে গেল। ঘোড়াগুলো প্রস্তুত করা হলো। দূরের মাঠে বাতাসে শুকনো ঘাস দুলছে। র‌্যাঞ্চের কাঠের বাড়িটা পেছনে রেখে মারদেকা ঘোড়ায় উঠল।

একবার সে পেছনে তাকাল। ইলাই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। বাড ঘোড়ার পাশে। ক্লে নীরবে অস্ত্র পরীক্ষা করছে। হ্যাঙ্ক দূরের উঁচু জায়গায়। মিগুয়েল পথের দিকে তাকিয়ে। রুবেন তার পাশে। এলিয়াস আহত শরীর নিয়েও বেরিয়ে এসেছে। আর লারসেন দাঁড়িয়ে আছে সবার সামনে।

মারদেকার মনে হলো, সে যেন নিজের ঘরটাকে পেছনে রেখে যাচ্ছে না। বরং নিজের ঘরকেই রক্ষা করতে বেরিয়ে যাচ্ছে। ঘোড়াগুলো ধীরে ধীরে র‌্যাঞ্চ ছাড়ল।

কিছু দূর যাওয়ার পর খোলা প্রান্তর আরও বিস্তৃত হয়ে উঠল। শুকনো ঘাস কোমর পর্যন্ত উঠেছে কোথাও কোথাও। বাতাসে ধুলো। দূরের পাহাড় নীলচে ধোঁয়ার মতো। আকাশ বিশাল, মেঘহীন।

মারদেকা সামনে তাকিয়ে রইল। তার ডান পাশে পিস্তল। বাম পাশে ছুরি। আর বুকের ভেতর সেই পুরোনো শব্দ নেই। দৌড়াও। আজ কেউ তাকে দৌড়াতে বলছে না। আজ সে নিজেই এগিয়ে যাচ্ছে। 

দূরে হঠাৎ একটা কালো বিন্দু দেখা গেল। তারপর আরেকটা। 

মিগুয়েল ঘোড়া থামাল। হ্যাঙ্ক দূরের উঁচু জায়গা থেকে হাত তুলল। সবাই থেমে গেল। 

খোলা প্রান্তরের ওপারে ধুলোর সরু রেখা উঠছে। কেউ আসছে।

মারদেকার হাত হোলস্টারের কাছে গেল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল। ধুলো ক্রমে ঘন হলো। ঘোড়ার খুরের শব্দ বাতাসে ভেসে এল।

লারসেন দূর থেকে তাকে দেখছিল। আর তারপর ধুলোর ভেতর থেকে একটি মানুষ ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল। কালো টুপি। কালো কোট। কোমরে পিস্তল। ঘোড়ার লাগাম এক হাতে। ভিক্টর কেইন।

সে ঘোড়া থামিয়ে কিছু দূরে দাঁড়াল। তার পেছনে আরও কয়েকজন লোক ছিল, কিন্তু তারা অনেক দূরে থেমে গেল। যেন সবাই জানে, সামনে যে জায়গাটা, সেখানে আর অন্য কারও প্রয়োজন নেই।

কেইনের চোখ সরাসরি মারদেকার ওপর স্থির হলো। তার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল। “তুমি ড্যানিয়েল রিডের ছেলে।”

মারদেকা কোনো উত্তর দিল না।

কেইন ধীরে ঘোড়া থেকে নামল। তার চোখ একবার লারসেনের দিকে গেল, তারপর আবার মারদেকার দিকে ফিরল। “তেরো বছর ধরে অনেক কিছু বদলেছে,” সে বলল। “কিন্তু কিছু হিসাব বদলায়নি।”

লারসেন দূর থেকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

কেইন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “নথিগুলো কোথায়?”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। কেইনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

মারদেকা তখন প্রথমবার বুঝল, এই মানুষটির সবচেয়ে বড় ভয় মৃত্যু নয়। প্রমাণ। তার বিরুদ্ধে থাকা সত্য। আর সেই সত্য এখনও জীবিত।

কেইন ধীরে মারদেকার দিকে এগিয়ে এল। খোলা প্রান্তরে বাতাস বইছে। শুকনো ঘাস দুলছে। ঘোড়াগুলো পেছনে দাঁড়িয়ে অস্থিরভাবে নড়ছে। দূরের পাহাড় নীরব সাক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।

মারদেকা আস্তে করে ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ালো। ডানে পাশে কয়েক কদম সরে কেইনের মুখোমুখি অবস্থানে স্থির হলো। পায়ের ভর ঠিক করল। কেইনের চোখ নেমে গেল তার কোমরের পিস্তলের দিকে। তারপর আবার চোখ উঠল। দুজনের মধ্যে এখন কয়েক গজের বেশি দূরত্ব নেই।

লারসেনের শিক্ষা মারদেকার মনে ফিরে এল। দ্রুত হওয়া নয়। সঠিক হওয়া।

কেইনের ডান হাত ধীরে ধীরে কোমরের দিকে নামল।

মারদেকা নড়ল না। তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন দ্রুত হচ্ছে। ভয় আছে। কিন্তু ভয় এবার তার পা নিয়ন্ত্রণ করছে না।

কেইনের আঙুল পিস্তলের বাঁট ছুঁল।

মারদেকার চোখ স্থির হয়ে গেল তার হাতের ওপর। 

আর সেই মুহূর্তে পুরো প্রান্তর যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল।

কেইনের আঙুল ধীরে ধীরে পিস্তলের বাঁটের দিকে এগিয়ে গেল।

মারদেকা তা দেখছিল। তার চোখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। পায়ের নিচে শুকনো মাটি, চারপাশে হলদে ঘাস, দূরে পাহাড়ের নীলচে রেখা। বাতাস কখনও ডান দিক থেকে এসে ঘাসগুলোকে একসঙ্গে নুইয়ে দিচ্ছে, আবার কখনও হঠাৎ থেমে যাচ্ছে। 

সেই থেমে যাওয়া বাতাসের মধ্যেই দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল, একজন বহু বছরের অভিজ্ঞ বন্দুকবাজ, অন্যজন মাত্র তেরো বছরের এক ছেলে। 

কিন্তু এই মুহূর্তে বয়সের কোনো অর্থ ছিল না। কেইনের চোখ মারদেকার মুখে। মারদেকার চোখ কেইনের হাতে।

লারসেন, এলিয়াস, বাড, ক্লে, হ্যাঙ্ক, মিগুয়েল আর রুবেন দূরে দাঁড়িয়ে। কেউ অস্ত্র তুলছে না। তারা জানে, এই লড়াইয়ে কেউ মারদেকার হয়ে গুলি চালাতে পারবে না। এতদিন যে ছেলেটা তাদের চোখের সামনে বড় হয়েছে, আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার নিজের অতীত।

কেইনের ঠোঁটে ধীরে একটা হাসি ফুটল। &quot;তুমি অপেক্ষা করছ কেন, ছেলে?&quot;

মারদেকা উত্তর দিল না।

কেইনের হাত আরও একটু নামল। তার চোখে আত্মবিশ্বাস।

সে এই মুহূর্ত বহুবার দেখেছে। বহু মানুষকে দেখেছে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। কেউ ভয় পেয়ে আগে অস্ত্র তুলেছে, কেউ হাতের দিকে তাকিয়ে ভুল করেছে, কেউ শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গেছে। কেইনের কাছে বন্দুকযুদ্ধ ছিল অভ্যাসের ব্যাপার। তার কাছে কয়েকটি হৃদস্পন্দনের ব্যবধানই জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে।

কিন্তু মারদেকা জানত, লারসেন তাকে কী শিখিয়েছে। বন্দুক দ্রুত বের করাই সবচেয়ে বড় কথা নয়। সঠিক সময়ে বের করতে জানতে হয়।

মারদেকার ডান হাত এখনও নিচে। তার আঙুল পিস্তলের বাঁট ছোঁয়নি।

কেইনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় দেখা গেল। তারপর সে সিদ্ধান্ত নিল। তার কাঁধ সামান্য ঝুঁকল। হাত ছুটে গেল কোমরের দিকে। পিস্তলের বাঁট আকড়ে ধরলো।

সেই মুহূর্তে মারদেকা নড়ল। এত দ্রুত যে দূর থেকে মনে হলো, ছেলেটার হাত যেন হঠাৎ তার শরীরের পাশ থেকে জন্ম নিয়েছে। হোলস্টারের চামড়ায় ধাতব ঘর্ষণের ক্ষীণ শব্দ। 

কেইনের পিস্তল এখনও পুরোপুরি বেরোয়নি। মারদেকার অস্ত্র ইতিমধ্যে তার হাতে। একটি আগুনের ঝলক। একটি মাত্র গুলি।

শব্দটা খোলা প্রান্তরের ওপর বিস্ফোরিত হলো। দূরের পাহাড়ে গিয়ে ধাক্কা খেল, তারপর ক্ষীণ প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল।

কেইনের শরীর থেমে গেল। তার চোখ বড় হয়ে উঠল। পিস্তলটা তার হাত থেকে ছিটকে পড়ল। সে যেন কয়েক মুহূর্ত বুঝতেই পারল না কী ঘটেছে। তারপর এক পা পিছিয়ে গেল। হাঁটু ভেঙে মাটিতে নেমে এল। শরীরটা ধীরে ধীরে শুকনো ঘাসের ওপর কাত হয়ে পড়ল। তারপর নিস্তব্ধতা। 

মারদেকার পিস্তলের মুখ থেকে ধোঁয়ার সরু রেখা উঠছিল। সে নড়ল না। তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এখনও দ্রুত। হাতের তালুতে ঘাম। কানে নিজের রক্তের শব্দ। অথচ মুখ শান্ত।

সে কেইনের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটার জন্যই তার শৈশব আগুনে পুড়েছিল। এই মানুষটার কারণেই ড্যানিয়েল রিড আর ফিরে আসেনি।

এই মানুষটার জন্যই লারসেন তেরো বছর নিজের অতীতকে কবর দিয়ে বেঁচে ছিল। আর আজ সেই মানুষটা মাটিতে পড়ে আছে।

মারদেকার মনে কোনো আনন্দ এল না।

সে ভেবেছিল, হয়তো বাবার হত্যাকারীকে মেরে ফেললে বুকের ভেতর জমে থাকা আগুন নিভে যাবে। কিন্তু আগুন নিভল না। বরং মনে হলো, এত বছর ধরে যে প্রশ্নটা তার সঙ্গে ছিল, তার একটা দরজা শুধু বন্ধ হয়ে গেল।

দূর থেকে লারসেন এগিয়ে এল। তার আহত কাঁধ এখনও পুরোপুরি শক্ত হয়নি। হাঁটার সময় শরীরের এক পাশ সামান্য শক্ত হয়ে থাকছে। তবু তার মুখে সেই পুরোনো স্থিরতা।

সে কেইনের মৃতদেহের কাছে গিয়ে থামল। মাটিতে পড়ে থাকা পিস্তলের দিকে একবার তাকাল। তারপর মারদেকার দিকে।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। 

শেষ পর্যন্ত লারসেন এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রেখে একটা চাপ দিল।

মারদেকা ধীরে পিস্তলটা নামিয়ে আনল। মুখ ঘুরিয়ে লারসেনকে এক নজর দেখলো। তারপর সেটা আবার হোলস্টারে ফেরত পাঠালো।

লারসেন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, &quot;এবার তুমি বন্দুক চালাতে শিখেছ।&quot;

মারদেকা কোনো উত্তর দিল না। এবার তার চোখ চলে গেল দূরের পাহাড়ের দিকে।

তেরো বছর ধরে লারসেন যে অতীত থেকে পালিয়েছে, আজ সেই অতীত তার সামনে পড়ে আছে। এলিয়াসও এসে দাঁড়াল। তার মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে এমন এক স্বস্তি, যেন বহুদিনের একটা ভার নামতে শুরু করেছে।

কেইন মারা গেছে। কিন্তু লারসেন জানত, এখনও একটি কাজ বাকি।

র‌্যাঞ্চে ফিরে সে অনেক বছর ধরে লুকিয়ে রাখা পুরোনো কাঠের বাক্সটি বের করল। বাক্সটির কাঠ কালচে হয়ে গেছে। লোহার বন্ধনিতে মরচে। কেউ দেখলে ভাবত, এর ভেতরে হয়তো পুরোনো কোনো সরঞ্জাম ছাড়া আর কিছু নেই।

লারসেন ঢাকনা খুলল। ভেতরে কাপড়ে মোড়া কাগজ। তেরো বছরের পুরোনো নথিপত্র।

দলের সদস্যদের নাম। হিসাবের খাতা। টাকা লেনদেনের বিবরণ। বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত হত্যাকা-ের উল্লেখ। আদেশের চিহ্ন। সাক্ষীদের নাম। আর এমন সব তথ্য, যা ভিক্টর কেইনের বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ নয়, প্রমাণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই নথির জন্যই কেইন এত বছর লারসেনকে খুঁজেছে। এই নথির কারণেই ড্যানিয়েল রিড সত্যের কাছে পৌঁছেছিল। এই নথিই ছিল কেইনের সবচেয়ে বড় ভয়। 

লারসেন কাগজগুলো অনেকক্ষণ হাতে ধরে রাখল। তারপর সেগুলো আবার গুছিয়ে বাঁধল। এবার আর বাক্সে লুকিয়ে রাখার জন্য নয়। ব্ল্যাক রিভারের মার্শাল এলি ব্রুকস এর হাতে তুলে দেবার জন্য।

কেইন মারা গেছে, কিন্তু তার অপরাধ যেন তার সঙ্গে মরে না যায়। যারা তার হয়ে কাজ করেছে, যারা তার আদেশ পালন করেছে, যারা মানুষের জীবনকে অর্থের হিসাবের মতো ব্যবহার করেছে, তাদের নাম যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।

সেদিন সন্ধ্যায় র‌্যাঞ্চে অদ্ভুত শান্তি নেমে এল। কেউ বন্দুকের কথা বলল না। কেউ কেইনের নাম উচ্চারণ করল না।

হ্যাঙ্ক অভ্যাসবশত একবার উত্তর দিকের বেড়া ঘুরে এল। ক্লে আস্তাবল দেখে নিল। বাড ভাঙা জায়গাগুলো পরীক্ষা করল। মিগুয়েল ঘোড়াগুলোকে পানি দিল। এলিয়াস বারান্দায় বসে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

আর ইলাই রান্নাঘরে খাবার তৈরি করছিল। 

মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।

ইলাই তার দিকে তাকিয়ে বলল, &quot;খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।&quot;

মারদেকা ভেতরে গেল।

সেই রাতের খাবার ছিল সাধারণ। কিন্তু বহুদিন পর সেই টেবিলে বসা মানুষগুলোর মনে কোনো অদৃশ্য ভয় ছিল না।

পরের কয়েক দিন র‌্যাঞ্চ ধীরে ধীরে আগের জীবনে ফিরে গেল।

নতুন কাঠ দিয়ে বেড়া মেরামত হলো। গুলির দাগগুলো কিছু জায়গায় থেকে গেল। জানালার নতুন কাচ বসানো হলো। গবাদি পশু আবার মাঠে গেল। ঘোড়াগুলো আবার সকালবেলার কাজে বেরোল।

লারসেনের গুলিটা বের করা হয়েছে। সেই ক্ষতও শুকাতে শুরু করল। এলিয়াসও ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে পেল। 

মারদেকা আবার কাজ করতে লাগল। কিন্তু সে আর আগের মারদেকা নয়। তার কোমরের পিস্তল এখন শুধু একটি অস্ত্র নয়। সে জানে, সেটার সঙ্গে সিদ্ধান্তের ভারও থাকে।

এক সন্ধ্যায় সূর্য পাহাড়ের পেছনে নামছিল। আকাশের নিচে লালচে আলো ছড়িয়ে ছিল। লারসেন বারান্দা থেকে মারদেকাকে ডাকল।

ছেলেটা এসে দাঁড়াল। লারসেন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, &quot;তোমার মায়ের কথা কখনও ভেবেছ?&quot;

মারদেকা যেন হঠাৎ অনেক দূরের কোনো দরজা খুলতে শুনল। মা। শব্দটা তার ভেতরে অদ্ভুতভাবে প্রতিধ্বনিত হলো।

বাবার মুখ সে এখন জানে। বাবার মৃত্যুর সত্য জানে। কিন্তু তার জন্মদাত্রী মাকে সেই যে কবে পাহাড়ের ওপারে ইন্ডিয়ান গ্রামে রেখে এসেছে, সে কেমন আছে কিংবা আদৌ বেঁচে আছে কি না, তার কিছুই জানে না।

এতদিন সে নিজের অতীতের একটা অংশকে অন্ধকারেই রেখে দিয়েছিল। এবার সে সেটার দিকে তাকাতে চাইল। &quot;আমি তাকে দেখতে যেতে চাই।&quot;

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, &quot;তাহলে দেখে এসো।&quot;

কয়েক দিন পর ভোরে মারদেকা ঘোড়ায় চড়ল। বাঁ পাশে খাপসহ ছুরি। ডান পাশে পিস্তল। পিঠে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

র‌্যাঞ্চের সবাই তাকে বিদায় জানাতে বেরিয়ে এল। ইলাই খাবারের পুঁটলি গুঁজে দিল। বাড ঘোড়ার পা দেখে নিল। মিগুয়েল পাহাড়ের ওপারের পুরোনো পথের কথা বলল। হ্যাঙ্ক শুধু মাথা নেড়ে সতর্ক থাকতে বলল। ক্লে কিছুক্ষণ তার কোমরের পিস্তলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

লারসেন শেষে এগিয়ে এল। &quot;আবার ফিরে এসো। এটা তোমারই ঘর।&quot;

মারদেকা মাথা নেড়ে ঘোড়ার লাগাম টানল। র‌্যাঞ্চ পেছনে পড়ে গেল। আগে সে ব্ল্যাক রিভারের কাছে পৌঁছাল। শহরটাকে অনেকদিন পর দেখেও তার মনে হলো, যেন জায়গাটা ছোট হয়ে গেছে।

এক বছর আগে এই শহরের রাস্তায় হাঁটার সময় সে ছিল অচেনা এক ছেলে। আজ তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে গেছে। কোমরের অস্ত্রের ভার সে আর অনুভব করছে না। অস্ত্র যেন তার শরীরেরই অংশ।

রকডাস্ট সেলুনের সামনে এসে তার ঘোড়া ধীর হয়ে গেল। ভেতর থেকে হাসির শব্দ। গ্লাসের ঠোকাঠুকি। পিয়ানোর পুরোনো সুর। মারদেকা কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর ঘোড়া থেকে নামল। 

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ঘরের কয়েকটি কণ্ঠ থেমে গেল। ধোঁয়ায় ভরা ঘর। কাউন্টারের পাশে কয়েকজন। দেয়ালের কাছে কয়েকটি টেবিল। আর কোণের একটা টেবিলে বসে থাকা একজন মানুষ।

লোকটির নাম জ্যাক &quot;সানডাউন&quot; ম্যাক্রি। ব্ল্যাক রিভার থেকে আরও পশ্চিমে তার নাম সবাই জানত।

দ্রুত বন্দুক বের করার জন্য সে ইতিমধ্যেই কয়েকজনের মৃত্যু ঘটিয়েছে। বলা হতো, তার হাত অস্ত্রের বাঁট ছোঁয়ার আগেই মানুষ বুঝে যেত না যে তাদের শেষ মুহূর্ত এসে গেছে। কেউ বলত, সানডাউন ম্যাক্রির ড্র পশ্চিমের দ্রুততম। কেউ বলত, তার সামনে দাঁড়ালে মানুষ আগে চোখ বন্ধ করে, তারপর গুলি শোনে।

ম্যাক্রির বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। মুখে পুরোনো দাগ। চোখে ঠান্ডা আত্মবিশ্বাস। তার পিস্তলটা কোমরের পাশে এমনভাবে রাখা, যেন প্রয়োজনে এক মুহূর্তেই হাতে চলে আসবে।

মারদেকা তাকে চিনত না। 

ম্যাক্রি মারদেকাকে দেখছিল। বিশেষ করে তার কোমরের দিকে। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। &quot;বাচ্চা ছেলের কোমরে পিস্তল!&quot; কন্ঠে বিদ্রপ ঢেলে বললো সে। তার বলার ভঙ্গীতে কয়েকজন হেসে উঠল।

মারদেকা শুনেও না শোনার ভান করল। সে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল।

ম্যাক্রির হাসি মিলিয়ে গেল। লোকটা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। ধীরে। কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

ঘরের মানুষগুলো বুঝতে পারল, এখন ব্যাপারটা আর মজা নেই।

ম্যাক্রি কয়েক পা এগিয়ে এসে মারদেকার সামনে দাঁড়াল। &quot;তুমি জানো এটা বড়দের জায়গা?&quot;

মারদেকা তার দিকে তাকাল না।

ম্যাক্রির মুখ শক্ত হয়ে উঠল। সে একবার পিস্তলের দিকে তাকাল। তারপর মারদেকার চোখে।

&quot;ওটা খুলে রাখো।&quot;

মারদেকা এবার তার দিকে তাকাল। শুধু এক মুহূর্ত। তারপর আবার মুখ ফিরিয়ে নিল। ঘরের ভেতর কেউ আর হাসল না।

ম্যাক্রির ডান হাত ধীরে কোমরের দিকে নামল।

মারদেকা নড়ল না। 

একজন লোক টেবিলের ওপরের গ্লাস সরিয়ে নিল। কেউ চেয়ার থেকে উঠল না। পুরো সেলুন যেন অপেক্ষা করতে লাগল।

ম্যাক্রির আঙুল সহসা পিস্তলের বাঁট ছুঁল।

মারদেকার ডান হাত তখনও নিচে।

ম্যাক্রির চোখে আত্মবিশ্বাস ফিরে এল।

এই দৃশ্য সে বহুবার দেখেছে। আর এটাতো একটা বাচ্চা ছেলে। ভীত চোখ। কোমরে নতুন পিস্তল। উঠাতে তো দূরে থাক, ওজন নিতে পারবে কিনা সন্দেহ।

আর তার সামনে দাঁড়িয়ে সানডাউন ম্যাক্রি। পশ্চিমের দ্রুততম বন্দুকবাজদের একজন। ম্যাক্রি অস্ত্র টানল। 

কিন্তু তার পিস্তল হোলস্টারের মুখ ছাড়ার আগেই মারদেকার হাত নড়েছে। এক ঝলক। ধাতব শব্দ। আগুন। গুলির শব্দ।

ম্যাক্রির শরীর পেছনে হেলে গেল। তার চোখে অবিশ্বাস। তারপর সে মেঝেতে পড়ে গেল।

সেলুনের ভেতর কেউ কথা বলল না। পিস্তলের ধোঁয়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে গেল। 

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে কোনো গর্ব নেই। সে পিস্তলটা ধীরে হোলস্টারে ঢুকিয়ে দিল। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কেউ তাকে আটকানোর সাহস করল না।

দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে সে ঘোড়ায় উঠল। একবারও পেছনে তাকাল না। তার ঘোড়া ধুলো উড়িয়ে ব্ল্যাক রিভারের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল।

সেলুনের ভেতর তখন ধীরে ধীরে মানুষের কণ্ঠ ফিরে আসছে। কেউ ম্যাক্রির মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ দরজার দিকে। কেউ এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না কী দেখেছে।

একজন ধীরে বলল, &quot;এটা ওই হাফ ব্রীড ছেলেটা?&quot;

কেউ উত্তর দিল না। আরেকজন বলল, &quot;মারদেকা।&quot;

নামটা ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। 

তারপর আরেকজন বলল, &quot;ওই মারদেকা!”

কেউ জানত না নামটা ঠিক কীভাবে উচ্চারণ করতে হয়। 

কেউ বলল, সে লারসেনের লোক। 

কেউ বলল, পাহাড় থেকে এসেছে।

কেউ বলল, সে নাকি ভিক্টর কেইনকেও মেরেছে।

সত্য আর গল্পের মধ্যে ব্যবধান পশ্চিমে কখনও বেশি দিন থাকে না। সেই দিন থেকেই গল্প ছড়াতে শুরু করল। এক শহর থেকে আরেক শহর। এক সেলুন থেকে আরেক সেলুন। এক র‌্যাঞ্চ থেকে অন্য র‌্যাঞ্চে।

মানুষ বলতে লাগল, তেরো বছরের এক ছেলে সানডাউন ম্যাক্রিকে ড্র-তে হারিয়েছে। 

কেউ বলল, ছেলেটা বন্দুক বের করার আগেই ম্যাক্রির হাত নাকি থেমে গিয়েছিল।

কেউ বলল, না, তার হাত দেখা যায়নি। শুধু গুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল। 
 
আর তারপর একদিন কেউ নামটা বদলে দিল। মারদেকা হয়ে গেল মারদেগা। যার মানে দাঁড়ালো, মেরে দেবে। নামটা তখনো সত্যি ছিল না। কিন্তু পশ্চিমে ছড়াবার জন্য সত্যি নাম সবসময় দরকার হয় না। নামটা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে কিংবদন্তি হয়ে গেল। 

সবাই জানে পশ্চিম একদিন তাকে মনে রাখবে তার দ্রুত হাতের জন্য। কেউ বলবে, সে ছিল পশ্চিমের সর্বকনিষ্ঠ বন্দুকবাজ। 

মারদেকা এসবের কিছ্ইু জানলো না। এখন আর সে আর দৌড়াচ্ছে না। তার ঘোড়াটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। সামনে খোলা পথ। দূরে নীল পাহাড়। তার ডান কোমরে পিস্তল। বাঁ পাশে ছুরি। সে পাহাড়ের ওপারের পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। লক্ষ্য তার মায়ের গ্রাম। পেছনে র‌্যাঞ্চ।

হয়তো আরেকটি অজানা পথ। হয়তো আরও অনেক ঘটনা। 

একটি ছেলে সত্যি সীমানা পেরিয়েছিল। ভয়ের সীমানা। অতীতের সীমানা। আর শেষ পর্যন্ত নিজের ভাগ্যের সীমানাও। 
(সমাপ্ত।)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/271898/</link>
				<pubDate>Wed, 09 Sep 2026 04:37:28 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ৩০<br />
র‌্যাঞ্চের ওপর সকাল নেমেছিল, কিন্তু সেই সকাল আর অন্য দিনের মতো ছিল না। সূর্য উঠেছিল যথারীতি, ঘাসের ডগায় আলো পড়েছিল, আস্তাবলের সামনে ঘোড়াগুলোকে পানি দেওয়া হচ্ছিল, দূরের মাঠে গবাদি পশু ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল, তবু পুরো জায়গাটার ওপর যেন অদৃশ্য একটা চাপ জমে ছিল। ভাঙা বেড়ার জায়গায় নতুন কাঠ বসানো হয়েছে,&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-271898"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/271898/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">1db7214278ac0f9fa2be31e75dee1e79</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২৯
র‌্যাঞ্চের ওপর হামলা শেষ হওয়ার পরও বন্দুকের গন্ধ বাতাসে লেগে ছিল। দুপুরের সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে, কিন্তু খোলা মাঠের ওপর ধুলো এখনও পুরোপুরি বসেনি। ভাঙা বেড়ার কয়েকটি খুঁটি মাটিতে কাত হয়ে পড়ে আছে। কোথাও কাঠের তক্তায় গুলির কালো দাগ, কোথাও ছড়িয়ে আছে ভাঙা জানালার কাচ। যে উঠোনে সকালে ঘোড়ার খুরের শব্দ আর মানুষের কাজের ব্যস্ততা ছিল, সেখানে এখন পড়ে আছে শুকনো কাঠের টুকরো, ছেঁড়া দড়ি আর ধুলোয় মাখা রক্তের দাগ।

কয়েকটি ঘোড়া এখনও অস্থির। কেউ তাদের শান্ত করার চেষ্টা করছে, কেউ দড়ি বদলে নতুন জায়গায় বাঁধছে। গবাদি পশুগুলোকে আবার মাঠে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তারা আগের মতো নিশ্চিন্ত নয়। বারবার মাথা তুলে চারদিকে তাকাচ্ছে। দূরের কোনো শব্দ পেলেই কান খাড়া করছে। মনে হচ্ছে, মানুষের চেয়ে পশুরাই যেন এইমাত্র ঘটে যাওয়া বিপদের গন্ধটা বেশি সময় ধরে মনে রাখবে।

লারসেনকে বাড়ির বারান্দার কাছে একটা চেয়ারে বসানো হয়েছে। তার বাম পাশের জামা কেটে ক্ষত পরিষ্কার করা হয়েছে। গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়নি, কিন্তু গভীরে ঢোকেনি বলেই মনে হচ্ছে। ইলাই বারবার কাপড় বদলে ক্ষতের ওপর চাপ দিচ্ছে। লারসেন মুখে কোনো অভিযোগ করছে না। শুধু মাঝে মাঝে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে, যখন ব্যথাটা একটু বেশি বাড়ছে।

এলিয়াস পাশের ঘরে শুয়ে। পাহাড়ের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি। আজকের বন্দুকযুদ্ধ তার শরীরকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। তবু সে ঘুমাচ্ছে না। দরজা খোলা থাকায় বাইরে র‌্যাঞ্চের প্রতিটি শব্দ তার কানে পৌঁছাচ্ছে।

বাড ভাঙা বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করছিল। তার হাতে একটা ছোট নোটবুক। কোথায় কত কাঠ ভেঙেছে, কোন ঘোড়া হারিয়েছে, কোন অস্ত্রের কত গুলি খরচ হয়েছে, সবকিছু সে লিখে রাখছে। তার মুখে কোনো আবেগ নেই। কিন্তু চোখে সেই সতর্কতা, যা গত কয়েকদিনে আরও গভীর হয়েছে।

ক্লে পশ্চিম দিকের বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে বন্দুক পরিষ্কার করছিল। তার দুই কোল্ট হাঁটুর পাশে রাখা। মাঝে মাঝে সে দূরের মাঠের দিকে তাকাচ্ছে। হ্যাঙ্ক একটু উঁচু জায়গায় বসে উইনচেস্টার কোলে নিয়ে পাহারা দিচ্ছে। মিগুয়েল আক্রমণকারীদের খুরের দাগ অনুসরণ করে অনেক দূর পর্যন্ত গিয়েছিল। এখনও ফেরেনি।

রুবেন বাড়ির বারান্দায় বসে ছিল। তার হাতে কাগজ। ব্ল্যাক রিভারের দিকে পাঠানো লোকদের কাছে আবার খবর পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। কেউ কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেছে, আর কত লোক লাগবে। সে শুধু মাথা নেড়ে বলেছে, যত কম লোককে জানানো যায়, তত ভালো।

এই সবকিছুর মাঝখানে মারদেকা একা দাঁড়িয়ে ছিল। তার কোমরে হোলস্টার। পিস্তল ভেতরে। আজ সেই অস্ত্র থেকে সে একটি গুলিও ছোড়েনি।

কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, যেন পুরো দিনটাই সেই একটিমাত্র প্রশ্ন তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। যদি সে গুলি করত? যদি সেই মানুষটা তাকে না দেখে সরাসরি রাইফেল তুলত? যদি লারসেন সেখানে না থাকত? যদি আরেকটু দেরি হতো?

সে জানে না। সে শুধু জানে, যখন মানুষের মুখটা তার সামনে উঠেছিল, তার হাত পিস্তলের বাঁটে পৌঁছেও থেমে গিয়েছিল।

পাহাড়ে সে শত্রুর হাত থেকে ছুরি কেড়ে নিয়েছে। অন্ধকারে মানুষের চলার শব্দ শুনে পথ বদলেছে। গুলির মধ্যে দিয়ে আহত মানুষকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু আজ প্রথমবার তাকে নিজের হাতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, একজন মানুষ বাঁচবে, না মরবে।

এই সিদ্ধান্তটাই তাকে ভেতর থেকে অস্বস্তি দিচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল না, সে দুর্বল হয়েছিল, নাকি ঠিক কাজটাই করেছিল।

বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। মারদেকা একসময় লারসেনের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, “আমি গুলি করতে পারিনি।”

লারসেন তার দিকে তাকাল। তার মুখে ব্যথার ছাপ ছিল, কিন্তু চোখ শান্ত। “জানি।”

মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। “আমি যদি গুলি করতাম, লোকটা মারা যেতে পারত।”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “হতে পারত।”

মারদেকা মাথা তুলল। সে যেন অন্য উত্তর আশা করেছিল।

লারসেন বলল, “কিন্তু বন্দুক হাতে নেওয়া আর মানুষ হত্যার জন্য প্রস্তুত হওয়া এক জিনিস নয়।”

মারদেকা কিছু বলল না।

“তুমি আজ গুলি করোনি বলে তুমি দুর্বল নও।” লারসেন বলল। “তুমি শুধু এখনও জানো না, কখন গুলি করা দরকার।”

এই কথাটা মারদেকার মনে গেঁথে গেল।

সূর্য ডুবে যাওয়ার পর র‌্যাঞ্চে রাতের প্রস্তুতি শুরু হলো। ভাঙা বেড়ার জায়গাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করা হলো। পাহারার জায়গা বদলানো হলো। হ্যাঙ্ক উত্তর দিকে গেল, ক্লে পশ্চিমে। বাড দক্ষিণের পথটা পরীক্ষা করল। রুবেন আবার দুজন লোককে খবর নিয়ে বের করে দিল।

মিগুয়েল অনেক রাতে ফিরল। তার ঘোড়ার শরীর ঘামে ভেজা। সে নামার পর সরাসরি লারসেনের কাছে গেল। বেশি কথা বলল না। শুধু জানাল, শত্রুরা র‌্যাঞ্চ থেকে অনেক দূরে গিয়ে উত্তর-পশ্চিমে ঘুরেছে। সেখানে কয়েকটি ঘোড়ার দাগ মিলেছে অন্য দাগের সঙ্গে।

লারসেনের চোখ সরু হলো। “কেইনের লোক?”

মিগুয়েল কাঁধ ঝাঁকাল। “নিশ্চিত নই। কিন্তু তারা থামেনি।”

এই খবরের পর আর কোনো আলোচনা হলো না। 

পরদিন ভোরে মারদেকা আবার লারসেনের সামনে দাঁড়াল। 

লারসেন তখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। বাম হাত নড়াতে কষ্ট হচ্ছে। তবু তার সামনে কাঠের খুঁটি, টেবিল আর হোলস্টার রাখা। পিস্তলটাও আছে।

মারদেকা এগিয়ে এল।

লারসেন বলল, “গতকাল তুমি কী শিখেছ?”

মারদেকা একটু ভেবে বলল, “গুলি করার আগে ভাবতে হয়।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “আর?”

“পা ঠিক রাখতে হয়।”

“আর?”

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

লারসেন বলল, “সময়।”

মারদেকা মাথা তুলল।

“বন্দুক দ্রুত বের করাই সবচেয়ে বড় কথা নয়। সঠিক সময়ে বের করতে জানতে হয়।”

তারপর আবার অনুশীলন শুরু হলো। প্রথমে শুধু হাত। হোলস্টারের ওপর রাখা। সরানো। আবার রাখা।

তারপর ধীরে অস্ত্র বের করা। কবজি সোজা রাখা। শরীরের ভার যেন সামনে না চলে যায়। পা যেন অকারণে নড়ে না ওঠে। অস্ত্র সামনে আসার আগেই চোখ যেন লক্ষ্যস্থির করে।

প্রথম কয়েকবার মারদেকার হাত ঠিকমতো চলল না। একবার পিস্তলের বাঁট হোলস্টারের মুখে আটকে গেল। আরেকবার অস্ত্র বের করতে গিয়ে তার ডান পা অযথা পিছিয়ে গেল।

লারসেন কোনো রাগ দেখাল না। সে শুধু ভুলটা দেখিয়ে দিল।

মারদেকা আবার করল। তারপর আবার।

কিছুক্ষণ পর ক্লে দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। সে বন্দুক পরিষ্কার করা থামিয়ে মারদেকার দিকে তাকিয়ে ছিল। একসময় তার মুখে হালকা হাসি ফুটল। “ছেলেটা দ্রুত নয়।”

লারসেন তার দিকে তাকাল।

ক্লে বলল, “কিন্তু ভুল সময়েও বন্দুক বের করছে না।”

লারসেন কিছু বলল না। শুধু মারদেকার দিকে তাকাল। 

মারদেকা আবার হোলস্টারের ওপর হাত রাখল। এইবার তার হাত আগের চেয়ে স্থির।

সকালের রোদ তখন ধীরে ধীরে উঠছে। দূরে ঘোড়াগুলো মাঠে ছুটছে। ভাঙা বেড়ার পাশে নতুন কাঠ বসানোর শব্দ হচ্ছে। র‌্যাঞ্চ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চেষ্টা করছে।

কিন্তু মারদেকার জন্য সেই সকালটা আর আগের মতো নয়। তার সামনে এখন শুধু বন্দুক শেখার শিক্ষা নয়। সামনে একটা সিদ্ধান্তও তৈরি হচ্ছে।

সাত বছর বয়সে সে দৌড়েছিল, কারণ তার বাবা তাকে বলেছিল, দৌড়াও।”

আজ সে তেরো বছরের। এখন তার সামনে দৌড়ে পালানোর পথ থাকলেও, সেই পথে একা চলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।

এই র‌্যাঞ্চে ইলাই আছে। বাড আছে। ক্লে, হ্যাঙ্ক, মিগুয়েল, রুবেন আছে। আহত অবস্থায় লারসেন আছে। এলিয়াস আছে। এরা তার রক্তের মানুষ নয়, কিন্তু তার জীবনের মানুষ।

মারদেকা ধীরে পিস্তলটা হোলস্টারে ফিরিয়ে দিল। এইবার তার হাত কাঁপল না।

দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল, ভিক্টর কেইন এখনও শেষ কথা বলেনি। আর এবার সে তার জন্য অপেক্ষা করবে।

সূর্য যখন র‌্যাঞ্চের ওপর উঠে এল, তখন আগের দিনের যুদ্ধের চিহ্নগুলো এখনও মুছে যায়নি। ভাঙা বেড়ার জায়গায় নতুন কাঠ বসানো হচ্ছে, মাটিতে জমে থাকা রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে, আর বাড়ির দেয়ালে গুলির দাগগুলো যেন নীরব সাক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। দূরের মাঠে আবার গবাদি পশু চরছে, ঘোড়াগুলোও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়েছে, কিন্তু র‌্যাঞ্চের মানুষগুলোর চোখে সেই স্বাভাবিকতা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। প্রত্যেকেই জানে, যে লোকেরা গতকাল এসেছিল তারা পরাজিত হয়ে ফিরে যায়নি। তারা শুধু দেখে গেছে, মেপে গেছে, তারপর চলে গেছে।

লারসেনের ক্ষত এখনও তাকে কষ্ট দিচ্ছে। সে হাঁটছে, কাজ করছে, লোকজনের সঙ্গে কথা বলছে, কিন্তু মাঝে মাঝে বাম হাতটা শরীরের কাছে একটু শক্ত করে ধরে রাখছে। ইলাই তাকে বিশ্রাম নিতে বলেছে বহুবার। লারসেন শোনেনি। তার কাছে আহত হওয়া মানে কাজ থামিয়ে দেওয়া নয়। তবে আগের মতো দ্রুত চলতে পারছে না, এটুকু সে নিজেও বুঝতে পারছে।

মারদেকার প্রশিক্ষণও থামেনি। বরং এখন সেটাই তার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে উঠেছে। সকালে লারসেন তাকে খোলা জায়গায় দাঁড় করায়। দুপুরে সে নিজের মতো করে অনুশীলন করে। সন্ধ্যায় ক্লে কখনও কখনও তাকে দূর থেকে দেখে। কেউ তাকে প্রশংসা করে না। কেউ বলে না যে সে অসাধারণ। ভুল হলে ভুলই বলা হয়, আবার করতে বলা হয়।

প্রথম কয়েকদিন মারদেকা বারবার একই ভুল করল। অস্ত্র বের করার সময় তার হাত কখনও একটু নিচে চলে যায়, কখনও পা অকারণে নড়ে ওঠে। কখনও সে লক্ষ্যস্থির করার আগেই হাত শক্ত করে ফেলে। লারসেন প্রতিবার তাকে থামিয়ে দেয়। “তাড়াহুড়ো করো না।”

মারদেকা আবার শুরু করে। 

কিছুক্ষণ পর, “পা দেখো।”

সে নিজের পায়ের দিকে তাকায়।

“চোখ সামনে রাখো। পা তুমি অনুভব করবে।”

মারদেকা আবার চেষ্টা করে।

এই শিক্ষা বাইরে থেকে দেখলে একঘেয়ে মনে হতে পারে। কিন্তু মারদেকার জন্য প্রতিটি মুহূর্ত ছিল নিজের শরীরকে নতুন করে চিনে নেওয়ার মতো। পাহাড়ে সে যে ভারসাম্য এতদিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যবহার করেছে, এখন সেই একই ভারসাম্যকে অস্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হচ্ছে। পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে শরীরের ওজন সামলানো আর বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক জিনিস নয়। কিন্তু মূল শিক্ষা একই, শরীরকে আগে মানতে হবে, তারপর অস্ত্রকে।

এক সকালে লারসেন কাঠের খুঁটির সামনে দাঁড়িয়ে একটা খালি বোতল ঝুলিয়ে দিল। তারপর অনেক দূরে সরে গিয়ে মারদেকাকে বলল, অস্ত্র বের না করে শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে।

মারদেকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। “লক্ষ্য দেখো।”

মারদেকা বোতলের দিকে তাকাল।

“এখন চোখ বন্ধ করো।”

সে চোখ বন্ধ করল।

“এবার বলো, তোমার ডান পা কোথায়।”

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বলল, “একটু সামনে।”

“বাঁ পা?”

“পেছনে।”

“শরীরের ভার?”

মারদেকা উত্তর দিল, “দুই পায়ে।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “এবার চোখ খোলো।”

মারদেকা চোখ খুলল।

“বন্দুক হাতে নিলে এই জিনিসটাই বদলাবে না। শুধু তোমার মন বদলাবে। ভয় পেলে পা শক্ত হবে। রাগলে হাত শক্ত হবে। তাড়াহুড়ো করলে চোখ ভুল করবে। তাই আগে শরীরকে নিজের কথা শুনতে শেখাও।”

মারদেকা কিছু বলল না।

সেদিন প্রথমবার তাকে গুলি ছোড়ার অনুমতি দেওয়া হলো। খুব দূরের একটা কাঠের বোর্ডে ছোট একটি কালো দাগ করা হয়েছিল। লারসেন তাকে বলেছিল, গুলি করার আগে অন্তত কয়েক মুহূর্ত লক্ষ্যস্থির রাখতে। মারদেকার হাত সামান্য কাঁপছিল। গুলি ছুটল। শব্দে কাছের ঘোড়াগুলো চমকে উঠল।

গুলি দাগের অনেকটা পাশে গিয়ে কাঠে ঢুকল। মারদেকা হতাশ হয়ে তাকিয়ে রইল। 

লারসেন শুধু বলল, “আবার।”

দ্বিতীয় গুলি আগের চেয়ে কাছে গেল। তৃতীয়টি আরও কাছে। 

চতুর্থবার সে গুলি করার আগে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর ট্রিগার চাপল। গুলি বোর্ডের কালো দাগের একেবারে পাশে গিয়ে লাগল।

ক্লে দূর থেকে সব দেখছিল। সে এগিয়ে এসে বোর্ডের দিকে তাকাল। তারপর মারদেকার দিকে। “মন্দ নয়।”

এই দুটো শব্দই তার কাছ থেকে বড় প্রশংসা। মারদেকা কোনো উত্তর দিল না।

সেদিন বিকেলে লারসেন তাকে একটা কথা বলল, যা তার মনে অনেক দিন থাকবে। “তুমি ভাবছ, বন্দুক তোমাকে শক্তিশালী করবে।”

মারদেকা চুপ করে রইল। “ভুল। বন্দুক শুধু তোমার সিদ্ধান্তকে দূরে পৌঁছে দেয়।”

এই কথার অর্থ সে পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। কিন্তু পাহাড়ের সেই রাত, র‌্যাঞ্চের ওপরের হামলা, নিজের থেমে যাওয়া হাত, লারসেনের রক্তাক্ত শরীর, সবকিছু মনে পড়তেই কথাটা ধীরে ধীরে তার কাছে পরিষ্কার হতে লাগল।

বন্দুকের ভয় শুধু গুলির নয়। ভয় হলো, একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে সেটা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।

দিনগুলো এভাবেই কাটতে লাগল। লারসেন ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগল। এলিয়াসের কাঁধের ক্ষতও শুকোতে শুরু করেছে। সে এখনও ভারী কাজ করতে পারে না, কিন্তু প্রতিদিন বারান্দায় বসে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে মাঝে মাঝে এমন একটা দূরত্ব দেখা যায়, যেন সে বর্তমান র‌্যাঞ্চের দিকে তাকিয়েও বহু বছর আগের কোনো দৃশ্য দেখছে।

রুবেনের খবরও একদিন এল। কেইনকে কেউ দেখেনি। কিন্তু তার লোকদের চলাফেরার খবর পাওয়া গেছে। তারা ছড়িয়ে আছে। কেউ শহরের কাছে, কেউ পাহাড়ের দিকে, কেউ আবার র‌্যাঞ্চের উত্তরের পথের আশেপাশে।

এর অর্থ একটাই। কেইন তাড়াহুড়ো করছে না। সে অপেক্ষা করছে। কীসের জন্য, সেটা কেউ জানে না। কিন্তু লারসেন জানত, এই অপেক্ষা বেশিদিন চলবে না।

এক সন্ধ্যায় মারদেকা অনুশীলন শেষ করে পিস্তল খুলে টেবিলের ওপর রাখছিল। তার হাত আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাভাবিকভাবে অস্ত্রটি ধরছে। গুলি ছোড়ার সময় তার চোখ আর বন্ধ হয় না। মানুষের দিকে তাকিয়ে গুলি করার শিক্ষা এখনও সে পায়নি, এবং লারসেন ইচ্ছা করেই তাকে সে শিক্ষা দেয়নি।

সেদিন লারসেন তাকে থামাল। “তুমি গতবারের কথা ভাবছ?”

মারদেকা বুঝল, সে র‌্যাঞ্চে হামলার কথা বলছে। “হ্যাঁ।”

লারসেন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। “তুমি গুলি করোনি বলে নিজের ওপর রাগ করছ?”

মারদেকা মাথা নিচু করল। “আগে ভাবতাম, বন্দুক চালাতে পারলেই ভয় থাকবে না।”

লারসেন ধীরে বলল, “ভয় থাকবে।”

মারদেকা তাকাল।

“বন্দুকবাজও ভয় পায়। পার্থক্য হলো, সে ভয়কে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দেয় না।” কথাটা শেষ করে লারসেন আর কিছু বলল না।

সেই রাতে মারদেকা অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না। জানালার বাইরে চাঁদের আলোয় র‌্যাঞ্চের বেড়া দেখা যাচ্ছে। পাহারার জায়গায় হ্যাঙ্কের ছায়া নড়ছে। দূরে ঘোড়ার হালকা ডাক। কোথাও কাঠের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

সে ভাবল, সাত বছর বয়সে সে কী জানত? কিছুই না। সে শুধু জানত, আগুন থেকে দূরে যেতে হবে। গুলি থেকে দূরে যেতে হবে। বাবার কণ্ঠ তাকে বলেছিল, দৌড়াও। সে দৌড়েছিল।

আজ সে জানে কেন দৌড়েছিল। আজ সে জানে, তার বাবা কেন মারা গিয়েছিল। আর এখন সে জানে, তার সামনে থাকা মানুষগুলো তার জন্য নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে প্রস্তুত।

তাই এবার দৌড়ে পালানোর অর্থ কী? পরদিন ভোরে সে নিজেই লারসেনের কাছে গেল। “আজ কী শিখব?”

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল। “আজ তুমি নিজেই বলো।”

মারদেকা হোলস্টারের ওপর হাত রাখল। “অপেক্ষা।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক।”

মারদেকা ধীরে অস্ত্র বের করল। এবার তার হাত স্থির। সে গুলি চালাল না। শুধু সামনে তাকিয়ে রইল।

দূরে সূর্য উঠছে। ভাঙা বেড়ার পাশে নতুন কাঠ বসানো হয়েছে। র‌্যাঞ্চের কাজ আবার চলছে। ইলাই রান্নাঘরে। বাড লোকজনকে নির্দেশ দিচ্ছে। হ্যাঙ্ক পাহারায়। ক্লে অস্ত্র পরিষ্কার করছে। মিগুয়েল ঘোড়ার পিঠে উঠছে। রুবেন আবার কোনো খবরের অপেক্ষায়।

এরা কেউ জানে না, মারদেকার মনে তখন কী সিদ্ধান্ত তৈরি হচ্ছে। সে প্রতিশোধ নিতে চায় না। তার বাবাকে তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কেইনকে হত্যা করলেই সেই রাতের আগুন মুছে যাবে না।

কিন্তু যদি শত্রুরা আবার আসে, যদি এই মানুষগুলোর দিকে বন্দুক ওঠে, তাহলে এবার সে শুধু পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে না। সে তাদের পাশে দাঁড়াবে। মারদেকা পিস্তলটা ধীরে হোলস্টারে ফিরিয়ে দিল।

দূরের পাহাড় তখন সকালের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেই পাহাড়ের কোথাও তার শৈশবের ভয় পড়ে আছে। কোথাও পড়ে আছে ড্যানিয়েল রিডের শেষ রাতের স্মৃতি। আর তারও ওপারে, অদৃশ্য কোনো পথে, ভিক্টর কেইন অপেক্ষা করছে।

র‌্যাঞ্চের ওপর বাতাস বয়ে গেল। মারদেকা এবার পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল না। সে তাকাল নিজের চারপাশে। তারপর ধীরে ঘুরে র‌্যাঞ্চের ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। 

সে আর পালাবে না। এবার তার হাতে বন্দুক থাকবে, কিন্তু বন্দুকের জন্য নয়। তার মানুষগুলোর জন্য।

আর দূরের কোথাও, অদৃশ্য শত্রুও হয়তো তার সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষাতেই ছিল।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/271435/</link>
				<pubDate>Tue, 08 Sep 2026 03:29:23 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২৯<br />
র‌্যাঞ্চের ওপর হামলা শেষ হওয়ার পরও বন্দুকের গন্ধ বাতাসে লেগে ছিল। দুপুরের সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে, কিন্তু খোলা মাঠের ওপর ধুলো এখনও পুরোপুরি বসেনি। ভাঙা বেড়ার কয়েকটি খুঁটি মাটিতে কাত হয়ে পড়ে আছে। কোথাও কাঠের তক্তায় গুলির কালো দাগ, কোথাও ছড়িয়ে আছে ভাঙা জানালার কাচ। যে উঠোনে সকালে ঘোড়ার খুরের&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-271435"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/271435/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">9c5fd9ab6083188bb1c1d7b084c0b881</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২৮
সকালের সূর্য তখনও পুরোপুরি মাথার ওপর ওঠেনি। র‌্যাঞ্চের ওপর নরম সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে। রাতের ঠান্ডা বাতাস ধীরে ধীরে সরে গিয়ে তার জায়গা নিচ্ছে শুকনো উষ্ণতার। খোলা মাঠের ওপর হালকা কুয়াশার মতো একটা আবছা পর্দা ভাসছিল, যা সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছিল। দূরের পাহাড়গুলো নীলচে ধূসর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দিকে তাকালে মনে হয়, রাতের অন্ধকার এখনও চূড়াগুলোর গায়ে লেগে আছে।

র‌্যাঞ্চে দিনের কাজ শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। আস্তাবলের সামনে দুটো বড় কাঠের পাত্রে পানি ভরা হচ্ছে। ঘোড়াগুলো একে একে মাথা নামিয়ে পানি খাচ্ছে। কেউ লেজ নেড়ে মাছি তাড়াচ্ছে, কেউ আবার কান খাড়া করে দূরের কোনো শব্দ শুনছে। গবাদি পশুগুলোকে ঘের থেকে বের করে খোলা মাঠে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের ধীর গতির চলাফেরা, গলার ঘণ্টার শব্দ আর শুকনো ঘাসের ওপর খুরের মৃদু আওয়াজ মিলেমিশে র‌্যাঞ্চের পরিচিত সকালের শব্দ তৈরি করেছে।

রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে। ইলাই বড় লোহার পাত্রের সামনে দাঁড়িয়ে কাঠের চামচ দিয়ে কিছু নাড়ছে। মাঝে মাঝে সে দরজার দিকে তাকাচ্ছে। তার অভ্যাস হয়ে গেছে, মারদেকা সময়মতো খেয়েছে কি না সেটা না দেখে সে দিনের কাজ শুরু করতে পারে না। আজও তার চোখ একবার উঠোনের দিকে গেল। তারপর সে দেখল, ছেলেটা বাড়ির পেছনের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।

সেখানে লারসেন অপেক্ষা করছিল।

মারদেকার কোমরে সেই হোলস্টার। ভেতরে খালি পিস্তল। গত দুদিনে অস্ত্রটা তার কাছে আর সম্পূর্ণ অপরিচিত নয়, কিন্তু এখনও সেটা তার শরীরের অংশ হয়ে ওঠেনি। হাঁটার সময় কোমরের পাশে নতুন ওজনটা সে অনুভব করে। কখনও হাত অজান্তেই সেখানে চলে যায়। তারপর লারসেনের শেখানো কথা মনে পড়ে, অকারণে অস্ত্র স্পর্শ করা যাবে না।

আজকের অনুশীলন আগের দিনের চেয়ে কঠিন ছিল। লারসেন তাকে শুধু অস্ত্র বের করতে বলেনি, বরং হাঁটা অবস্থায় থামা, শরীরের ভার ঠিক করা, তারপর অস্ত্রের কাছে হাত নেওয়া শিখিয়েছে। প্রতিটি কাজ ধীরে করতে হয়েছে। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কোনো গুলি নেই। শুধু শরীর আর অস্ত্রের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা।

মারদেকা কয়েকবার অনুশীলন করার পর লারসেন তার পায়ের দিকে তাকাল। তার চোখে সন্তুষ্টির সামান্য ছাপ। “তোমার পা এখন আর বন্দুকের সঙ্গে লড়ছে না।”

মারদেকা কিছু বলল না। সে আবার অবস্থান নিল।

লারসেন বলল, “এটাই দরকার।”

মারদেকা এবার পিস্তল বের করল। গতকালের তুলনায় হাত দ্রুত। কিন্তু লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “দ্রুত না। পরিষ্কার।”

মারদেকা আবার অস্ত্রটা হোলস্টারে ঢুকিয়ে দিল। 

এই ছোট্ট অনুশীলনটুকুর মধ্যেই অনেক সময় কেটে গেল। দূরে বাড লোকজনকে দিনের কাজ ভাগ করে দিচ্ছে। কোথায় বেড়া মেরামত হবে, কোথায় গবাদি পশু সরানো হবে, কোন ঘোড়াগুলোকে বাইরে নেওয়া হবে, এসব সে নিজের অভ্যাসমতো সংক্ষিপ্ত কথায় ঠিক করে দিচ্ছে। তার চোখ অবশ্য মাঝে মাঝেই র‌্যাঞ্চের বাইরের দিকে চলে যাচ্ছে। পাহাড়ের দিকটাও সে দেখছে। গত রাতের পর থেকে কেউ আর নিশ্চিন্ত নয়।

মারদেকা শেষবারের মতো অস্ত্রটা হোলস্টারে রেখে লারসেনের দিকে তাকাল। “আজ গুলি ছুড়ব?”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। “আজ নয়।” তারপর সে পিস্তলটার দিকে তাকাল। “যেদিন ছুড়বে, সেদিন যেন কারণ থাকে।”

মারদেকা আর প্রশ্ন করল না।

দুজন যখন বাড়ির দিকে ফিরছে, তখন মিগুয়েল র‌্যাঞ্চের উত্তর দিকের বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তার সোমব্রেরোর ছায়ায় মুখটা প্রায় অদৃশ্য। সে দূরের মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছু একটা যেন তার চোখে পড়েছে।

প্রথমে কেউ বিষয়টা গুরুত্ব দিল না। দূরের প্রান্তরে একটা ধুলোর রেখা উঠছিল। 

এই দেশে ধুলো অস্বাভাবিক কিছু নয়। বাতাস একটু জোরে বইলেই শুকনো মাটির ওপর থেকে ধুলো উঠে আকাশে ভেসে যায়। গবাদি পশুর পাল চললেও একই দৃশ্য হয়। তাই মিগুয়েলও প্রথমে কিছু বলল না। সে শুধু স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধুলোর রেখাটা বদলে গেল। এটা বাতাসে ভেসে যাচ্ছে না। সামনে এগিয়ে আসছে। মিগুয়েল একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল।

দূরের মাঠের ওপর ধুলো ক্রমশ ঘন হচ্ছে। তার নিচে কালো কালো কিছু বিন্দু দেখা যাচ্ছে। বিন্দুগুলো নড়ছে। তারপর ঘোড়ার মাথা বোঝা গেল। আরও কয়েক মুহূর্ত পর ঘোড়সওয়ারদের শরীর স্পষ্ট হতে শুরু করল।

মিগুয়েলের মুখের ভাব বদলে গেল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল না। শুধু দ্রুত বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার হাঁটার গতি দেখেই বাড বুঝে গেল, কিছু একটা হয়েছে। মিগুয়েল কাছে এসে বলল, “ওরা আসছে।”

বাড দূরের দিকে তাকাল। “কতজন?”

মিগুয়েল চোখ সরাল না। “দূর থেকে গুনতে পারছি না। সাত, হয়তো আট।”

বাডের মুখ শক্ত হয়ে গেল। তারপর সবকিছু যেন একসঙ্গে বদলে গেল।

বাড লোকজনকে আর কোনো ব্যাখ্যা দিল না। শুধু হাত তুলে নির্দেশ করতে শুরু করল। যারা উঠোনে ছিল, তারা দৌড়ে অস্ত্র নিতে গেল। আস্তাবলের দরজা বন্ধ করার প্রস্তুতি শুরু হলো। গবাদি পশুগুলোকে দ্রুত ঘেরের ভেতর ফিরিয়ে নেওয়া হলো। ঘোড়াগুলোর মধ্যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। তারা কান খাড়া করে দূরের শব্দ শুনছে।

ক্লে মরগান তখন বাড়ির পশ্চিম পাশে ছিল। খবর শুনে সে ছুটে এল। কোমরের দুই কোল্ট ইতিমধ্যেই তার হাতে। সে দূরের ধুলোর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্থির রইল। তারপর একটা পাথরের নিচু দেয়ালের পাশে গিয়ে অবস্থান নিল।

হ্যাঙ্ক ডসন কোনো কথা বলল না। সে নিজের উইনচেস্টার তুলে নিয়ে র‌্যাঞ্চের উত্তর-পশ্চিম কোণের সামান্য উঁচু জায়গার দিকে এগিয়ে গেল। সেখান থেকে খোলা মাঠের অনেকটা দেখা যায়। তার বিশাল শরীরটাকে একটা কাঠের স্তূপের আড়ালে অদৃশ্য হতে বেশি সময় লাগল না।

রুবেন কোল বাড়ির দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে সেই পরিচিত হাসি নেই। সে চারপাশে তাকিয়ে বুঝে নিল, কোথায় কতজন মানুষ আছে। তারপর দুজনকে দক্ষিণের বেড়ার দিকে পাঠিয়ে দিল।

ইলাই রান্নাঘরের দরজা থেকে সবকিছু দেখছিল। বৃদ্ধ লোকটা বন্দুক হাতে নিতে জানে, কিন্তু আজ তার কাজ অন্য। সে দ্রুত রান্নাঘরের আগুন কমিয়ে দিল, দরজা বন্ধ করল, তারপর বাড়ির ভেতরে থাকা প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রাখল। যাওয়ার আগে সে একবার এলিয়াসের ঘরের দিকে তাকাল।

এলিয়াস তখনও দুর্বল। কাঁধে বাঁধন। কিন্তু বাইরে এত লোকের চলাফেরা শুনে সে উঠে বসেছে। “কী হয়েছে?”

ইলাই দরজার কাছে গিয়ে বলল, “অতিথি এসেছে।”

এলিয়াস তার মুখের দিকে তাকিয়ে সব বুঝে গেল। সে ধীরে বিছানা থেকে নামল। আহত কাঁধের কারণে শরীর সামান্য বেঁকে আছে। তবু সে রাইফেলটা হাতে নিল।

লারসেন তখন উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তার মুখে কোনো আতঙ্ক নেই। শুধু সেই পুরোনো স্থিরতা। সে একবার মিগুয়েলের দিকে তাকাল, তারপর পাহাড়ের দিকে। এরপর দূরের মাঠের দিকে চোখ রাখল।

ধুলোর রেখা এখন অনেক কাছে। ঘোড়ার খুরের শব্দও শোনা যাচ্ছে। একসঙ্গে অনেক ঘোড়া দৌড়ালে মাটির ভেতর দিয়ে যে কম্পন আসে, সেটাও যেন ধীরে ধীরে র‌্যাঞ্চের উঠোনে পৌঁছে যাচ্ছে।

মারদেকা বাড়ির পেছনের দিক থেকে এগিয়ে এল। তার কোমরে পিস্তল। হাতে এখনও ছুরি নেই, কিন্তু সে জানে, প্রয়োজনে সেটা ব্যবহার করতে হবে।

লারসেন তার দিকে তাকাল। “ভেতরে থাকবে।”

মারদেকা মাথা নাড়ল না।

লারসেন আবার বলল, “আমি বলেছি, ভেতরে থাকবে।” 

মারদেকা দূরের ধুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। একদম স্থির। কন্ঠ সংযত কিন্তু দৃঢ়। “আমি এখানেই থাকব।”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আর কিছু বলল না। হয়তো সে বুঝেছে, পাহাড় থেকে ফিরে আসা ছেলেটাকে এবার জোর করে আড়ালে রাখা যাবে না। তবে সে এটাও জানে, মারদেকার হাতে থাকা পিস্তল এখনও যুদ্ধের অস্ত্র হয়ে ওঠেনি।

দূরের ঘোড়সওয়াররা এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তারা সরাসরি র‌্যাঞ্চের দিকে আসছে না। কিছুটা ছড়িয়ে এগোচ্ছে। মাঝখানে কয়েকজন, দুই পাশে দুজন করে। তাদের গতি কমে এসেছে। যেন তারা জায়গাটা দেখে নিচ্ছে।

মিগুয়েল নিচু হয়ে বলল, “ওরা জানে কোথায় আসছে।”

লারসেন উত্তর দিল না। ক্লে তার দুই কোল্টের একটায় হাত রাখল। হ্যাঙ্ক উঁচু জায়গা থেকে রাইফেল তাক করল, কিন্তু গুলি ছুড়ল না।

র‌্যাঞ্চের ওপর হঠাৎ এমন নীরবতা নেমে এল, যেন সবাই একই সঙ্গে শ্বাস বন্ধ করে আছে। শুধু ঘোড়ার খুরের শব্দ। ধুলো। দূরের বাতাস। আর কাঠের বেড়ার সঙ্গে বাঁধা একটা ঘোড়ার অস্থির নড়াচড়া।

মারদেকা তার পিস্তলের দিকে তাকাল না। সে দূরের লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তার কান একসঙ্গে অনেক শব্দ ধরছে। ঘোড়ার খুর, চামড়ার জিনের ঘর্ষণ, ধাতব অস্ত্রের ঠোকাঠুকি, বাতাসের শব্দের মাঝেও মানুষের নড়াচড়া। হঠাৎ তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত চাপ অনুভূত হলো।

পাহাড়ে শত্রুকে দেখলে সে জানত, কী করতে হবে। দৌড়াতে হবে, আড়াল নিতে হবে, পথ খুঁজতে হবে। কিন্তু এখানে তার পেছনে একটা বাড়ি আছে। সেখানে ইলাই আছে। আহত এলিয়াস আছে। লারসেন আছে। বাড, ক্লে, হ্যাঙ্ক, মিগুয়েল, রুবেন সবাই আছে। এই জায়গাটাকে রক্ষা করতে হবে। 

ধুলোর ভেতর থেকে প্রথম বন্দুকের নলটা দেখা গেল। তারপর দ্বিতীয়টি। আরেকজন ঘোড়ার পিঠ থেকে হাত তুলল। লারসেন ধীরে পিস্তল বের করল।

ক্লে দুই হাত নিচু করে প্রস্তুত হলো। হ্যাঙ্কের রাইফেলের নল স্থির হয়ে গেল। মারদেকার হাত ধীরে ধীরে নিজের কোমরের হোলস্টারের ওপর গিয়ে থামল।

দূরের এক ঘোড়সওয়ার হঠাৎ লাগাম টেনে ধরল। ঘোড়াটা সামনের দুই পা সামান্য তুলে দাঁড়াল। পরের মুহূর্তেই প্রথম গুলির শব্দে র‌্যাঞ্চের সকাল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।

প্রথম গুলির শব্দটা যেন পুরো র‌্যাঞ্চকে এক মুহূর্তে জাগিয়ে তুলল। কাঠের বেড়ার ওপর গুলি লেগে শুকনো কাঠের টুকরো ছিটকে উঠল। তার পরেই একসঙ্গে আরও কয়েকটা গুলি ছুটে এল। ঘোড়াগুলো ভয় পেয়ে ছটফট করতে লাগল, কয়েকটা পেছনের পায়ে উঠে সামনের খুর দিয়ে বাতাস কাটল। গবাদি পশুর পাল ছুটে গিয়ে ঘেরের এক পাশে জড়ো হলো। সকালের শান্ত মাঠ মুহূর্তের মধ্যে ধুলো, ধোঁয়া আর বন্দুকের শব্দে ভরে গেল।

লারসেন ইতিমধ্যে নিচু হয়ে গেছে। তার পিস্তল থেকে প্রথম গুলিটা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দূরের একজন ঘোড়সওয়ার কাত হয়ে ঘোড়ার ঘাড়ের আড়ালে চলে গেল। ক্লে মরগানের দুই কোল্ট প্রায় একই সঙ্গে গর্জে উঠল। তার গুলির শব্দ অন্যদের থেকে আলাদা করে বোঝা যাচ্ছিল না, কিন্তু প্রতিবার গুলি ছোড়ার পরই তার অবস্থান বদলে যাচ্ছিল। সে কোনো জায়গায় বেশিক্ষণ দাঁড়াচ্ছে না।

হ্যাঙ্ক ডসনের উইনচেস্টার উঁচু জায়গা থেকে একবার গর্জে উঠল। তারপর আবার। দূরের একজন ঘোড়সওয়ার হঠাৎ ঘোড়া ঘুরিয়ে নিল। তার সঙ্গীরা ছড়িয়ে পড়ল। তারা সরাসরি র‌্যাঞ্চের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে না। প্রথমে চারদিক থেকে জায়গাটা চেপে ধরতে চাইছে।

বাড হিগিন্স বেড়ার আড়াল থেকে লোকজনকে অবস্থান বদলাতে বলল। তার নিজের হাতে রাইফেল। সে একবার পশ্চিম দিকের খোলা জায়গা দেখে নিল, তারপর দক্ষিণের বেড়ার দিকে তাকাল। একটা গুলি তার মাথার ওপর দিয়ে চলে গিয়ে কাঠের খুঁটিতে আঘাত করল।

“নিচু থাকো!” তার গলা বন্দুকের শব্দের মধ্যেও পরিষ্কার শোনা গেল।

মারদেকা তখন বাড়ির পাশের কাঠের দেয়ালের আড়ালে। তার হাত কোমরের হোলস্টারের ওপর। পিস্তলটা সেখানে আছে। খালি নয়, আজ প্রথমবার তাতে গুলি আছে। লারসেন সকালে তাকে গুলি দেয়নি, শুধু অস্ত্রের ব্যবহার শেখাচ্ছিল। কিন্তু আক্রমণ শুরু হওয়ার আগে বাডই তাকে একটা লোড করা পিস্তল এনে দিয়েছিল। তখন মারদেকা কিছু বলেনি। এখন সেই অস্ত্র তার কোমরে।

একজন মানুষ কয়েক গজ দূরে একটা ভাঙা বেড়ার আড়াল থেকে উঠে দাঁড়াল। তার হাতে রাইফেল। সে বাড়ির দিকে তাকাচ্ছে। মারদেকার চোখ তার ওপর স্থির হয়ে গেল। সময় যেন হঠাৎ ধীর হয়ে গেল।

তার হাত দ্রুত হোলস্টারে গেল। আঙুল অস্ত্রের বাঁটে ছুঁল। এক ঝটকায় পিস্তল বের করা সম্ভব। লারসেন তাকে সেটাই শিখিয়েছে। কিন্তু পরের মুহূর্তে মারদেকার হাত থেমে গেল। ওপাশে একজন মানুষ। জীবন্ত মানুষ।

তার মুখ দেখা যাচ্ছে। চোখে আতঙ্ক আর উত্তেজনা। সে রাইফেল তুলছে। মারদেকার বুকের ভেতর হঠাৎ সেই পুরোনো রাত ফিরে এল। আগুন। ধোঁয়া। দৌড়ানো ঘোড়া। মানুষের চিৎকার। তারপর বাবার কণ্ঠ। দৌড়াও।

কিন্তু এবার কেউ তাকে দৌড়াতে বলছে না। সামনের মানুষটাকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে হবে। তার হাত পিস্তলের ওপরই রইল। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর লোকটা রাইফেল তুলল।

মারদেকা গুলি চালাল না। সে পাশের কাঠের স্তূপের আড়ালে সরে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে গুলিটা যেখানে সে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে কাঠের টুকরো উড়িয়ে দিল।

মারদেকা মাটিতে পড়ে গেল। তার বুক দ্রুত উঠছে নামছে। ভয় পেয়েছে সে। কিন্তু ভয় তাকে স্থির করে দেয়নি। বরং তার কান আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে।

সে চোখ বন্ধ করল না। শত্রু কোথায় আছে, সেটা বোঝার চেষ্টা করল। একজন ডানদিকে। আরেকজন বেড়ার কাছে। তৃতীয়জন ঘোড়ার আড়ালে। আর একজন বাড়ির পেছন দিয়ে ঘুরছে।

মারদেকা মাথা সামান্য তুলল। গুলির শব্দের ফাঁকে সে বুটের শব্দ শুনতে পেল। লোকটা কাঠের দেয়ালের পেছন দিয়ে এগিয়ে আসছে।

মারদেকা অপেক্ষা করল। লোকটা তাকে দেখতে পাচ্ছে না।

সে যখন ভাঙা বেড়ার কাছে এসে দাঁড়াল, মারদেকা হঠাৎ অন্যদিকে একটা পাথর ছুড়ে দিল। পাথর গিয়ে পড়ল খালি টিনের পাত্রে। শব্দ হতেই লোকটা সেদিকে ঘুরে গেল।

মারদেকা বিপরীত দিক দিয়ে বেরিয়ে এল। সে ছুরি বের করেছিল কখন, নিজেও বুঝতে পারেনি।

লোকটা ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই মারদেকা তার কবজিতে আঘাত করল। রাইফেলটা হাত থেকে পড়ে গেল। লোকটা তাকে ধরতে ঝাঁপিয়ে এল। মারদেকা শরীর নিচু করে তার হাতের নিচ দিয়ে বেরিয়ে গেল, তারপর হাঁটুর পেছনে লাথি মারল। লোকটা মাটিতে পড়ে গেল।

মারদেকা তার ওপর আর আঘাত করল না। সে শুধু রাইফেলটা দূরে সরিয়ে দিয়ে পিছিয়ে এল। তার বুক ধড়ফড় করছে। সে কাউকে হত্যা করেনি। কিন্তু যুদ্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে প্রথমবার বুঝল, মানুষকে আঘাত করা আর কাগজের লক্ষ্যবস্তুতে গুলি করা এক নয়।

ঠিক তখনই ডান দিক থেকে লারসেনের গলা শোনা গেল। “মারদেকা, নিচু হও!”

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে ঝুঁকে পড়ল। একটা গুলি তার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল। লারসেন পাথরের আড়াল থেকে গুলি ছুড়ল। দূরের একজন আক্রমণকারী ঘোড়ার পেছনে সরে গেল।

কিন্তু পরের মুহূর্তেই আরেকটা গুলি এল। লারসেন হঠাৎ থেমে গেল। তার শরীর সামান্য পেছনে দুলল। তারপর সে এক হাঁটুতে বসে পড়ল।

মারদেকা স্থির হয়ে গেল।

লারসেনের বাম পাশের জামা দ্রুত গাঢ় হয়ে উঠছে। রক্ত।

মারদেকা দৌড়ে তার দিকে যেতে চাইলে লারসেন হাত তুলে থামাল। “এখানে এসো না।”

কিন্তু মারদেকা এবার কথা শুনল না। সে নিচু হয়ে দৌড়ে লারসেনের কাছে পৌঁছাল। গুলিটা কাঁধের নিচে লেগেছে। ক্ষতটা গভীর, কিন্তু সে এখনও সচেতন।

লারসেন দাঁত চেপে নিজের শরীর দেয়ালের সঙ্গে ঠেকিয়ে রাখল। “আমি ঠিক আছি।”

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই প্রথম সে লারসেনকে রক্তাক্ত দেখছে।

এতদিন বিপদ এলেই লারসেন সামনে দাঁড়িয়েছে। পাহাড়ে গুলির মধ্যে, অন্ধকার পথে, শত্রুর সামনে, সবসময় যেন একটা দেয়াল হয়ে ছিল মানুষটা। মারদেকার মনে হয়েছিল, সেই দেয়াল কখনও ভাঙবে না। 

আজ সেই দেয়ালে রক্ত। আর সেই দৃশ্য তার ভেতরে এমন একটা ভয় তৈরি করল, যা কোনো বন্দুকের শব্দও তৈরি করতে পারেনি।

বাড ছুটে এসে লারসেনের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। সে দ্রুত ক্ষত দেখে নিল। “গুলিটা ভেতরে আছে?”

লারসেন মাথা নাড়ল। “জানি না।”

বাড নিজের জামার একটা অংশ ছিঁড়ে ক্ষতের ওপর চাপ দিল।

এদিকে বন্দুকযুদ্ধ থামেনি। ক্লে পশ্চিম দিক থেকে একের পর এক গুলি ছুড়ছে। হ্যাঙ্ক উঁচু জায়গা থেকে শত্রুদের ঘোড়াগুলোকে লক্ষ্য না করে তাদের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করছে। রুবেন লোকজনকে বাড়ির পেছনের দিকে সরিয়ে দিয়েছে। মিগুয়েল ঘোড়ার ঘেরের আড়াল থেকে শত্রুদের চলাফেরা দেখছে।

এলিয়াসও বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। আহত কাঁধ নিয়ে রাইফেল ধরাটা তার জন্য কঠিন, তবু সে লারসেনের দিকে তাকিয়ে আবার দূরের মাঠের দিকে চোখ ফেরাল। “ওরা ভেতরে ঢুকতে চাইছে না।”

তার কথা শুনে লারসেন তাকাল।

এলিয়াস বলল, “ওরা শুধু আমাদের অবস্থান দেখছে।”

মারদেকা কথাটা বুঝল। শত্রুরা সত্যিই অদ্ভুতভাবে লড়ছে। তারা একসঙ্গে এগিয়ে আসছে না। কোনো একজন বেশি কাছে এলে অন্যরা তাকে আড়াল দিচ্ছে। যেন তাদের উদ্দেশ্য জায়গাটা দখল করা নয়।

তারা দেখছে। পরীক্ষা করছে। বিশেষ করে মারদেকাকে।

মারদেকা আবার পিস্তলের দিকে হাত দিল। এবার তার হাত কাঁপছে না। কিন্তু সে এখনও জানে না, এই অস্ত্র দিয়ে তাকে কী করতে হবে।

দূরে একটা ঘোড়সওয়ার চিৎকার করে কিছু বলল। তারপর কয়েকজন একসঙ্গে পিছিয়ে যেতে শুরু করল।

ক্লে গুলি ছুড়ল। হ্যাঙ্কও গুলি করল। 

কিন্তু শত্রুরা আর থামল না। ধুলো উঠতে উঠতে তারা খোলা মাঠের দিকে সরে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বন্দুকের শব্দ কমে এল। তারপর একেবারে থেমে গেল।

র‌্যাঞ্চের ওপর শুধু ধোঁয়া আর ধুলোর গন্ধ। কাঠের বেড়ার কয়েক জায়গা ভাঙা। একটা জানালার কাচ চূর্ণ হয়ে মাটিতে ছড়িয়ে আছে। আস্তাবলের সামনে একটা ঘোড়া দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে গেছে। গবাদি পশুগুলো ঘেরের এক কোণে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে।

কেউ জয়ধ্বনি দিল না। কারণ সবাই বুঝতে পারছে, এই লড়াই শেষ হয়নি।

বাড লারসেনের ক্ষত বাঁধছিল। ক্লে দূরের মাঠের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যাঙ্ক রাইফেল নামায়নি। মিগুয়েল ধুলোয় ঢাকা পথের দিকে তাকিয়ে আছে।

মারদেকা ধীরে নিজের পিস্তলের দিকে তাকাল। অস্ত্রটা এখনও গুলি ছোড়েনি। তার হাতও কাউকে হত্যা করেনি। কিন্তু আজ সে বুঝেছে, বন্দুক চালানো শেখার সবচেয়ে কঠিন অংশ ট্রিগার টানা নয়। কঠিন হলো, কখন অস্ত্র তুলবে আর কখন তুলবে না, সেটা জানা।

লারসেন তার দিকে তাকাল। রক্তাক্ত মুখেও তার চোখ আগের মতোই স্থির। “আজ তুমি একটা জিনিস শিখেছ।”

মারদেকা চুপ করে রইল।

লারসেন ধীরে বলল, “বন্দুক শুধু শত্রুকে মারে না। বন্দুক মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।”

দূরের প্রান্তরে শত্রুদের ধুলো তখনও দেখা যাচ্ছে। তারা চলে যাচ্ছে। কিন্তু পালাচ্ছে না।

মারদেকা বুঝতে পারল, আজকের লড়াই হয়তো র‌্যাঞ্চ দখলের জন্য ছিল না।

কেউ তাকে দেখছিল। কেউ জানতে চাইছিল, ড্যানিয়েল রিডের ছেলে কতটা প্রস্তুত। আর ভিক্টর কেইন এখন সেই উত্তর পেয়ে গেছে।

মারদেকা পিস্তলটা হোলস্টারে ঢুকিয়ে দিল। তারপর প্রথমবার সে নিজে থেকে দূরের পথের দিকে তাকিয়ে দাঁড়াল। তার মনে আর দৌড়ানোর কথা এল না।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/270877/</link>
				<pubDate>Mon, 07 Sep 2026 04:06:08 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২৮<br />
সকালের সূর্য তখনও পুরোপুরি মাথার ওপর ওঠেনি। র‌্যাঞ্চের ওপর নরম সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে। রাতের ঠান্ডা বাতাস ধীরে ধীরে সরে গিয়ে তার জায়গা নিচ্ছে শুকনো উষ্ণতার। খোলা মাঠের ওপর হালকা কুয়াশার মতো একটা আবছা পর্দা ভাসছিল, যা সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছিল। দূরের পাহাড়গুলো নীলচে ধূসর হ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-270877"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/270877/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">671d5a2d9d35dd4770adba7f36d6b0fe</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২৭
পাহাড়ের শেষ ঢালটা পেছনে ফেলে খোলা প্রান্তরের দিকে নামতে নামতে মারদেকার মনে হলো, অনেক দিন পর সে আবার আকাশকে পুরোটা দেখতে পাচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে পাহাড়ের মধ্যে আকাশ যেন সবসময় কোনো না কোনো পাথরের কিনারা, খাড়া দেয়াল কিংবা কালো চূড়ার আড়ালে কেটে গেছে। কোথাও সরু গিরিখাতের ওপরে একফালি নীল দেখা গেছে, কোথাও রাতের আকাশ এত কাছাকাছি মনে হয়েছে যেন হাত বাড়ালেই তারাগুলো ছুঁয়ে ফেলা যাবে। কিন্তু এখানে এসে সেই বন্ধ অনুভূতিটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল। সামনে যতদূর চোখ যায়, ঘাসে ঢাকা প্রান্তর ছড়িয়ে আছে। 

তাদের পেছনে পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যের আলো এখনও পুরোপুরি তার ঢালে পৌঁছায়নি। চূড়াগুলো গাঢ় ধূসর, নিচের গিরিখাতগুলো কালো। সেই পাহাড়ের ভেতরে তারা রেখে এসেছে বহু বছরের পুরোনো আশ্রয়স্থল, আগুনের স্মৃতি, গুলির শব্দ, কালো ধাতব চাকতি, বিশ্বাসঘাতকতা এবং এমন এক রাতের সত্য, যার কথা মারদেকা এতদিন জানত না।

এখন সে জানে। তার বাবার নাম ছিল ড্যানিয়েল রিড। সে জানে, তার বাবা একজন পথচেনা মানুষ ছিল। তার বাবা এমন এক সত্য জেনে ফেলেছিল, যে সত্য জানার মূল্য তাকে জীবন দিয়ে দিতে হয়েছিল। বহু বছর আগে আগুন আর গুলির শব্দের মধ্যে তার বাবা তাকে এই কথাটাই বলেছিল। দৌড়াও। সে দৌড়েছিল। তারপর ড্যানিয়েল রিড মারা গিয়েছিল।

মারদেকা মুখ তুলে একবার পাহাড়ের দিকে তাকাল। দূর থেকে পাহাড়কে এখন শান্ত দেখাচ্ছে। সেখানে কোনো গুলির শব্দ নেই, কোনো মানুষকে দেখা যাচ্ছে না, কোনো ঘোড়ার ছুটে চলার আওয়াজও নেই। তার সামনে তখন প্রান্তর। আর প্রান্তরের ওপারে তার নতুন ঘর।

লারসেন ধীরে ধীরে হাঁটছিল তার পেছনে। পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসার পর তার হাঁটার মধ্যে ক্লান্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, যদিও সে তা প্রকাশ করার চেষ্টা করছিল না। ডান হাতের ক্ষত শুকিয়ে আবার শক্ত হয়ে গেছে, কিন্তু কাপড়ের ওপর কালচে রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে। তার মুখ ধুলোয় ঢাকা, চোখের নিচে ক্লান্তির ছায়া। তবু তার দুই চোখ এখনও আগের মতোই সতর্ক। 

এলিয়াস আরও ধীরে চলছিল। তার কাঁধের ক্ষত থেকে আর খুব বেশি রক্ত বেরোচ্ছিল না। পাহাড়ের শেষ ঢালে বসে লারসেন যে বাঁধন দিয়েছিল, সেটা এখনও শক্ত আছে। কিন্তু তার মুখের রং ফ্যাকাশে। কয়েকবার সে থেমেছে, তারপর আবার হাঁটা শুরু করেছে। মারদেকা তার পাশে যেতে চাইলে সে হাত তুলে তাকে থামিয়েছে। 

একটা সময় প্রান্তরের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে গেল। শুকনো ঘাস একসঙ্গে দুলে উঠল। দূরে কোথাও গবাদি পশুর ঘণ্টার শব্দ ভেসে এল।

মারদেকা থেমে গেল। তার চোখ সরু হয়ে এল। অনেক দূরে, সকালের আলোয় একটা সরু রেখা দেখা যাচ্ছে। প্রথমে মনে হলো, মাটির ওপর সূর্যের আলো পড়েছে। তারপর ধীরে ধীরে রেখাটা স্পষ্ট হলো। কাঠের বেড়া। তারও ওপারে কিছু গাছ। আর আরও দূরে কয়েকটি কাঠের ঘরের ছাদ।

মারদেকার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে উঠল। সে এই দৃশ্য বহুবার দেখেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে। সন্ধ্যায় কাজ শেষে। কিন্তু আজ দৃশ্যটা অন্যরকম। এতদিন সে এই জায়গাটাকে লারসেনের র‌্যাঞ্চ বলে চিনত। আজ প্রথমবার তার মনে হলো, জায়গাটা শুধু লারসেনের নয়। এখানে তারও কিছু আছে।

কাঠের সেই বাড়ি, যেখানে ইলাই খাবার নিয়ে বকাঝকা করে। আস্তাবলের সামনে যেখানে বাড কাজ করতে করতে কাউকে না তাকিয়েই চিনে ফেলে। খোলা জায়গা যেখানে ক্লে মরগান কখনও কখনও ঘোড়ার লাগাম হাতে দাঁড়িয়ে থাকে, মুখে এমন ভাব যেন পৃথিবীর কোনো মানুষই তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে না। হ্যাঙ্কের ভারী পায়ের শব্দ। মিগুয়েলের হাসি। রুবেন কোলের চোখ, যে হাসতে হাসতে এমন কথা বলে বসে, যার অর্থ পরে গিয়ে বোঝা যায়। এসব মানুষ তার জন্মের সঙ্গে যুক্ত নয়। কেউ তার রক্তের সম্পর্কের নয়।

তবু পাহাড় থেকে ফিরে আসার পর দূরে র‌্যাঞ্চের ছাদগুলো দেখে তার মনে হলো, সে বাড়ি ফিরছে। ঠিক সেই মুহূর্তে দূরের কাঠের বেড়ার কাছে একটা নড়াচড়া দেখা গেল।

কেউ পাহারা দিচ্ছিল। লোকটা প্রথমে তিনজনকে দেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সে দ্রুত ঘুরে দৌড় দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে র‌্যাঞ্চের ভেতরে নড়াচড়া শুরু হলো। কেউ আস্তাবল থেকে বেরিয়ে এল। তারপর কাঠের বাড়ির সামনের দরজা খুলে গেল।

প্রথম যে মানুষটা তাদের দিকে এগিয়ে এল, তাকে দেখে মারদেকার মনে হলো, সে হয়তো সবসময়ই এভাবেই হাঁটে, দ্রুত কিন্তু অযথা দৌড়ায় না। বাড হিগিন্স। তার মাথায় পুরোনো টুপি, গায়ে ধুলো মাখা কাজের জামা। সে কয়েক মুহূর্ত দূর থেকেই তিনজনকে দেখল। তারপর তার চোখ প্রথমে গিয়ে থামল লারসেনের হাতে। তারপর এলিয়াসের কাঁধে। তারপর মারদেকার মুখে। সে এগিয়ে এসে প্রথমে লারসেনের দিকে তাকাল। “আপনাদের দেখে মনে হচ্ছে পাহাড়ের বেড়ানোটা তেমন উপভোগ্য হয়নি।”

লারসেনের ঠোঁটের কোণে ক্লান্ত একটা হাসি দেখা গেল। &quot;জায়গাটা মোটেও ভালো  নয়।”

বাড এবার এলিয়াসের দিকে তাকাল। তার মুখের ভাব বদলে গেল। &quot;এ লোকটা কে?”

“পুরোনো বন্ধু।” লারসেন বলল।

বাড আর কোনো প্রশ্ন করল না। তার চোখ একবার এলিয়াসের ক্ষতের ওপর গেল। তারপর সে পেছনের দিকে তাকিয়ে গলা তুলল। &quot;দুজন লোক নিয়ে এসো। আর ইলাইকে বলো, গরম পানি আর পরিষ্কার কাপড় লাগবে।”

তারপর সে মারদেকার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখ মিলল। বাড সম্ভবত বুঝতে পারছিল না পাহাড়ে কী ঘটেছে। কিন্তু সে এটুকু বুঝতে পারছিল, যে ছেলেটাকে সে কয়েকদিন আগে পাহাড়ের পথে যেতে দেখেছিল, সে আর আগের মতো নেই। &quot;তুমি ঠিক আছ?”

মারদেকা উত্তর দেওয়ার আগে একটু সময় নিল। &quot;আছি।”

বাড মাথা নেড়ে বলল, &quot;ভালো।”

ঠিক তখনই কাঠের বাড়ির দিক থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল। &quot;মারদেকা!” 

ছেলেটা মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। ইলাই প্রায় দৌড়ে আসছে। তার বয়স হয়েছে, হাঁটার সময় মাঝে মাঝে কোমর একটু ঝুঁকে যায়, কিন্তু এখন সেসবের কোনো লক্ষণ নেই। সে দ্রুত এগিয়ে এসে মারদেকার সামনে থামল। কয়েক মুহূর্ত যেন কিছু বলতে পারল না। তার চোখে প্রথমে রাগ দেখা গেল। তারপর স্বস্তি। &quot;তোমাকে কি বলেছিলাম পাহাড়ে গিয়ে পাথরের সঙ্গে মারামারি করতে?”

মারদেকা কিছু বলল না।

ইলাই তার জামার ধুলো দেখল, মুখের ছোট আঁচড় দেখল, তারপর মাথা নাড়ল। &quot;আমি যে খাবার দিয়েছিলাম। খেয়েছ?”

এই প্রশ্ন শুনে মারদেকা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার মনে হলো, বুকের ভেতর কোথাও জমে থাকা শক্ত কিছু সামান্য নরম হয়ে গেল। সে মাথা নেড়ে বলল, &quot;খেয়েছি।”

ইলাই সন্দেহের চোখে তাকাল। &quot;মিথ্যা বলছ।” তারপর সে নিজেই বলল, &quot;ভেতরে যাও। পরে কথা হবে।”

এলিয়াসকে দুইজন লোক ধরে বাড়ির দিকে নিয়ে গেল। লারসেন তার সঙ্গে হাঁটছিল। 

মারদেকা কিছুক্ষণ উঠোনে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশের পরিচিত দৃশ্যগুলো সে নতুন করে দেখতে লাগল। আস্তাবলের সামনে বাঁধা কয়েকটি ঘোড়া কান খাড়া করে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। দূরে গবাদি পশুর ঘেরের পাশে দুজন মানুষ কাজ করছে। কাঠের বেড়ার ওপর সকালের রোদ পড়েছে। বাতাসে শুকনো ঘাস, পশু আর ভেজা মাটির মিশ্র গন্ধ। 

তবু মারদেকা জানত, এই র‌্যাঞ্চ আর আগের মতো নেই। পাহাড়ের ছায়া তাদের সঙ্গে ফিরে এসেছে।

কিছুক্ষণ পর ক্লে মরগান ঘোড়ার ঘেরের দিক থেকে এগিয়ে এল। আগের মতোই তার কোমরে দুটি কোল্ট। মুখে সেই কঠিন ভাব। সে লারসেনকে একবার দেখে নিল, তারপর এলিয়াসকে বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দেখে ভ্রু কুঁচকাল। তারপর মারদেকার দিকে তাকাল। &quot;তুমি তো বলেছিলে পাহাড়ে যাচ্ছ।”

মারদেকা বলল, &quot;গিয়েছিলাম।”

ক্লে কিছুক্ষণ তাকে দেখে বললো। &quot;পরেরবার যাওয়ার আগে আমাকে বলবে।” তারপর নিজেই ঘুরে চলে গেল। 

মারদেকা তাকে চলে যেতে দেখল। এই মানুষটার কথাগুলো এখন আর আগের মতো শীতল মনে হয় না।

একটু পর হ্যাঙ্ক ডসনকে দেখা গেল বাড়ির ছাদের পাশে উঠে দাঁড়াতে। বিশালদেহী মানুষটা কাঁধে উইনচেস্টার নিয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সে লারসেনকে ফিরে আসতে দেখেছে, আহত অবস্থাও দেখেছে। এতটুকুই তার জন্য যথেষ্ট। তারপর থেকে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকা তার কাজ।

মিগুয়েলও বেশি সময় র‌্যাঞ্চে দাঁড়িয়ে রইল না। সে প্রথমে সেই পথের দিকে গেল যেদিক দিয়ে লারসেনরা এসেছে। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে মাটির দাগ পরীক্ষা করতে লাগল। 

রুবেন কোল বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার চোখে আগের মতো হাসির আভাস আছে, কিন্তু মুখের ভাব এবার অনেক বেশি চিন্তিত।

লারসেন তাকে দেখেই বলল, &quot;ব্ল্যাক রিভারের খবর কি?”

রুবেন মাথা নেড়ে বলল, &quot;ভেতরে গিয়ে বলব।” 

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই মারদেকা পরিচিত কাঠের গন্ধ পেল। দেয়াল, মেঝে, পুরোনো আসবাব, রান্নাঘরের দিক থেকে আসা ধোঁয়ার গন্ধ, সবকিছুই তার চেনা। সে কয়েক মুহূর্ত দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

ইলাই তাকে বসতে বলল। তারপর কোনো সুযোগ না দিয়েই সামনে একটা বড় মগে গরম পানীয় রেখে দিল। &quot;ধীরে খাবে।”

মারদেকা মগটার দিকে তাকিয়ে রইল।

ইলাই এবার তার সামনে একটা প্লেট রাখল। &quot;এটাও খাবে।”

মারদেকা বলল, &quot;আমার ক্ষুধা নেই।”

ইলাই তার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন এই কথার কোনো মূল্য নেই। &quot;খাবে বলেছি।”

মারদেকা আর তর্ক করল না। খেতে শুরু করার পর সে বুঝতে পারল, সত্যিই তার ক্ষুধা ছিল। শরীরের ক্লান্তি এতক্ষণ যেন তাকে ক্ষুধার কথা বুঝতেই দেয়নি।

লারসেন কিছুক্ষণ পর ঘরে এল। তার হাতের ক্ষত নতুন করে পরিষ্কার করা হয়েছে। বাড জোর করেছিল, আর লারসেন শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছে। কিন্তু সে বসে বিশ্রাম নেওয়ার মানুষ নয়। এলিয়াসকে পাশের ঘরে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। কাঁধের ক্ষত পরীক্ষা করার জন্য ইলাই তার পুরোনো বাক্স থেকে কাপড়, সুঁই, অ্যালকোহল সব বের করেছে। 

এলিয়াসের ক্ষত গভীর। কিন্তু গুলিটা প্রাণঘাতী জায়গায় লাগেনি। গুলিটি বের করা যাবে কি না, সেটা নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা হলো। শেষ পর্যন্ত লারসেন বলল, কাছের শহর থেকে ডাক্তার আনতে হবে। কিন্তু ততক্ষণ এলিয়াসকে বিশ্রামে থাকতে হবে।

বিকেলের দিকে সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে, তখন র‌্যাঞ্চের পরিবেশে আবার স্বাভাবিক কাজকর্মের ছবি ফিরে এল। কিন্তু স্বাভাবিকতা শুধু বাইরে। ভেতরে সবাই জানে, কিছু একটা বদলে গেছে।

হ্যাঙ্ক পাহারা থেকে নামেনি। ক্লে দুবার র‌্যাঞ্চের চারপাশ ঘুরে এসেছে। মিগুয়েল এখনও ফেরেনি। আর লারসেন বারবার বাড়ির সামনের পথটার দিকে তাকাচ্ছে।

সন্ধ্যার আগে প্রধান ঘরের দরজা বন্ধ করে লারসেন সবাইকে ডাকল। বাড হিগিন্স প্রথমে এল। তারপর ক্লে। হ্যাঙ্ক ছাদ থেকে নেমে এসে রাইফেলটা দেয়ালের পাশে রাখল, কিন্তু খুব দূরে রাখল না। রুবেন কোল চুপচাপ একপাশে দাঁড়াল। ইলাইও ঘরের কোণে ছিল, যদিও তাকে কেউ ডাকেনি। সে সম্ভবত বুঝেছিল, আজকের কথা শোনার অধিকার তার আছে। মারদেকা জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিল।

লারসেন ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বলল, &quot;পাহাড়ে আমরা এমন একজনের মুখোমুখি হয়েছি, যাকে আমি বহু বছর আগে মৃত ভেবেছিলাম।”

ঘরের ভেতর কেউ কথা বলল না।

লারসেন বলল, &quot;তার নাম ভিক্টর কেইন।”

বাড নামটা আগে শোনেনি। কিন্তু লারসেনের মুখের ভাব দেখে সে বুঝল, নামটা মনে রাখার মতো।

লারসেন খুব বেশি পুরোনো গল্পে গেল না। পাহাড়ের আশ্রয়স্থল, চাকতি, বহু বছরের পথঘাটের ইতিহাস, সবকিছু আবার নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। সে শুধু এতটুকু বলল, কেইন একসময় তাদের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাদের শত্রু হয়েছিল। কিছু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল তার কারণে। ড্যানিয়েল রিড তার বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করেছিল। তারপর ড্যানিয়েল মারা যায়।

মারদেকার চোখ জানালার বাইরে স্থির হয়ে রইল। সে শুনছিল।

বাড ধীরে মাথা তুলল। &quot;ছেলেটা?”

লারসেন এবার সরাসরি মারদেকার দিকে তাকাল। &quot;ড্যানিয়েল রিডের ছেলে।”

ঘরের নীরবতা বদলে গেল। ক্লে কিছুক্ষণ মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল। রুবেনের মুখের হাসি পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে। হ্যাঙ্ক শুধু একবার নিচু গলায় বলল, &quot;তাহলে কেইন জানে।”

“জানে।” লারসেনের উত্তর। &quot;সে জানে মারদেকা বেঁচে আছে।”

কয়েক মুহূর্ত কেউ কিছু বলল না। তারপর বাড জানালার দিকে তাকাল। 
“তাহলে, ওরা এখানে আসবে।”

লারসেন বলল, &quot;সম্ভব।”

এই কথার পর আর বিশেষ আলোচনা হলো না। কারণ প্রত্যেকেই বুঝে গেছে, এখন থেকে র‌্যাঞ্চের প্রতিটি দিন বদলে যাবে।

রাতে খাবার শেষে মারদেকা একা বাইরে বেরিয়ে এল। আকাশ পরিষ্কার। তারাগুলো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আস্তাবলের ভেতর থেকে ঘোড়ার নড়াচড়ার শব্দ আসছে। দূরে পাহারায় থাকা কারও বুটের শব্দ। বাতাসে ঠান্ডা বাড়ছে। সে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ তার মনে হলো, পাহাড়ে যাওয়ার তার কোনো অতীত ছিল না। অথবা ছিল, কিন্তু সে জানত না। এখন অতীতের একটা দরজা খুলে গেছে। সে জানে তার বাবা কে ছিল। জানে, তার বাবা শেষ মুহূর্তে তাকে বাঁচাতে চেয়েছিল। জানে, সে দৌড়েছিল বলে বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু সে এটাও জানে, এই মানুষগুলো, এই র‌্যাঞ্চ, এই ঘর, এই খোলা মাঠ এখন শুধু লারসেনের সম্পত্তি নয়। এটাই তার ঘর।

পেছনে দরজা খোলার শব্দ হলো। লারসেন বেরিয়ে এল। তার হাতে একটা পিস্তল। 

মারদেকা সেটার দিকে তাকাল।

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। দূরের অন্ধকার প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে আছে সে। তারপর ধীরে বলল, &quot;তোমাকে প্রথম দিন কী শিখিয়েছিলাম মনে আছে?”

মারদেকা মাথা নেড়ে বলল, &quot;পায়ের ভারসাম্য।”

লারসেনের মুখে সামান্য হাসি ফুটল। &quot;তারও আগে?”

মারদেকা ভাবল। &quot;পা কোথায় রাখতে হয়।”

“ঠিক।” লারসেন পিস্তলটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল। 

মারদেকা এবার ধীরে হাত বাড়িয়ে অস্ত্রটা নিল। পিস্তলটা তার হাতে ঠান্ডা আর ভারী লাগল। এতদিন সে লারসেনের কোমরে এই অস্ত্র দেখেছে। ক্লের কোমরে দেখেছে। র‌্যাঞ্চের অন্যদের হাতেও দেখেছে। বন্দুক তার কাছে নতুন কোনো বস্তু নয়।

কিন্তু আজ প্রথমবার সে বুঝতে পারল, নিজের হাতে অস্ত্র নেওয়া আর দূর থেকে অস্ত্র দেখা এক জিনিস নয়।

“এটা খালি।” লারসেন বলল। “তুমি পিস্তল চালানো আজ শুরু করছ।” তারপর সে মারদেকার পায়ের দিকে তাকাল। &quot;কিন্তু তোমার শিক্ষা শুরু হয়েছিল অনেক আগে।”

মারদেকা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। 

লারসেন তার সামনে এসে দাঁড়াল। &quot;প্রথমে বন্দুক নয়।” সে বলল। &quot;প্রথমে তুমি।”

মারদেকা পিস্তলটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পা মাটির ওপর স্থির। দুই পায়ের দূরত্ব, শরীরের ভার, কাঁধের অবস্থান, সবকিছু যেন হঠাৎ নতুন অর্থ পেল।

লারসেন তার হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, &quot;ট্রিগারের ওপর আঙুল রাখবে না। যতক্ষণ না গুলি করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছ।”

মারদেকা আঙুল সরিয়ে নিল।

লারসেন এবার তার কোমরের দিকে ইঙ্গিত করল। &quot;আগামীকাল থেকে শিখবে, কীভাবে এটাকে কোমর থেকে বের করতে হয়।”

মারদেকা পিস্তলটার দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এই ধাতব বস্তুটা শুধু একটা অস্ত্র নয়। এটা একটা পথ। যে পথ তাকে নিয়ে যাবে এমন জায়গায়, যেখানে হয়তো একদিন তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সে আবার দৌড়াবে, নাকি দাঁড়িয়ে থাকবে।

ঠিক তখন দূর থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে এল। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল। মারদেকাও শুনতে পেল। শব্দটা দ্রুত এগিয়ে আসছে। র‌্যাঞ্চের বাইরের পথ থেকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারের ভেতর একটা ঘোড়ার অবয়ব দেখা গেল।

হ্যাঙ্ক পাহারার জায়গা থেকে নিচু গলায় ডাকল। &quot;কে?”

উত্তর এল। &quot;মিগুয়েল।” 

কিছুক্ষণের মধ্যে মিগুয়েল ঘোড়াটা নিয়ে উঠোনে ঢুকল। তার ঘোড়ার গায়ে ঘাম। নিজের মুখেও ধুলো জমে আছে। সে নামার পর প্রথমে চারপাশে তাকাল, তারপর সরাসরি লারসেনের দিকে এগিয়ে এল। তার স্বাভাবিক হাসিটা নেই।

লারসেন বলল, &quot;কী পেয়েছ?”

মিগুয়েল কয়েক মুহূর্ত কথা বলল না। তারপর সে পাহাড়ের দিকের অন্ধকারের দিকে তাকাল। &quot;ওরা আমাদের পেছন পর্যন্ত আসেনি।”

লারসেনের চোখ সরু হলো। &quot;তার মানে?”

মিগুয়েল এবার ধীরে বলল, &#039;তার মানে, ওরা আরও দূর থেকে দেখছিল।”

মারদেকার হাতের পিস্তলটা সামান্য শক্ত হয়ে উঠল।

মিগুয়েল বলল, &quot;পাহাড়ের দিকের উঁচু জায়গায় তিনজনের দাগ পেয়েছি। ঘোড়াগুলো অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল।”

লারসেন নীরব।

“আর একটা জিনিস।” মিগুয়েল বলল। &quot;তাদের একজন আজ র‌্যাঞ্চের পথ পর্যন্ত নেমে এসেছিল।”

মিগুয়েলের কথার পর কয়েক মুহূর্ত কেউ আর কথা বলল না। উঠোনের ওপর রাত নেমে এসেছে পুরোপুরি। কয়েক ঘণ্টা আগেও মনে হতে পারত, রাতটা আর পাঁচটা রাতের মতোই। কিন্তু এখন র‌্যাঞ্চের চারপাশের অন্ধকারের দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল, সেই অন্ধকারেরও চোখ আছে। কেউ তাদের দেখছে।

লারসেন কিছুক্ষণ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখে রাগের কোনো প্রকাশ নেই। বরং সেই স্থিরতা আরও বিপজ্জনক। 

বাড ধীরে এগিয়ে এল। তার হাতে তখনও কাজের দস্তানা &quot;কতজন?”

মিগুয়েল মাথা নাড়ল। &quot;নিশ্চিত নই। তিনজনের ঘোড়ার দাগ পেয়েছি উঁচু জায়গায়। কিন্তু নিচে যে নেমে এসেছিল, সে একাই ছিল।”

ক্লে মরগান কখন যে বাড়ির পাশ থেকে বেরিয়ে এসেছে, কেউ খেয়াল করেনি। সে কিছুক্ষণ চুপ করে মিগুয়েলের কথা শুনল। তারপর দূরের অন্ধকারে চোখ রেখে বলল, &quot;ওরা জায়গাটা দেখছে।”

মিগুয়েল তার দিকে তাকাল। &quot;হ্যাঁ।”

ক্লে কোমরের কোল্ট দুটির একটায় হাত রাখল। &quot;তাহলে পরেরবার দেখতে আসবে না।”

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। &quot;এখনই কেউ কোথাও যাবে না।”

ক্লে মুখ ঘুরিয়ে লারসেনের দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না।

লারসেন আবার মিগুয়েলের দিকে ফিরল। &quot;দাগগুলো কোথায় শেষ হয়েছে?&quot;

“পাহাড়ের নিচের শুকনো খালের কাছে।” মিগুয়েল বলল। &quot;তারপর ওরা আবার উত্তর দিকে গেছে। অন্তত ঘোড়ার দাগ সেদিকেই।”

“ফিরে গেছে?” বাড জিজ্ঞেস করল।

মিগুয়েল কাঁধ ঝাঁকাল। &quot;ফিরে গেছে কি না, সেটা অন্ধকারে বলা কঠিন। কিন্তু একটা কথা নিশ্চিত, ওরা আমাদের পথ জানে।”

এই কথাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। শত্রু কোথাও আছে, সেটা জানা একরকম। কিন্তু শত্রু যদি তোমার বাড়ির পথ জেনে যায়, তোমার আস্তাবল কোথায় জানে, কোন দিক দিয়ে ঘোড়া বের হয় জানে, পাহারার জায়গাগুলো দূর থেকে দেখে নেয়, তাহলে বিপদ আর দূরের থাকে না।

মারদেকা এখনও পিস্তলটা হাতে ধরে ছিল। সে খেয়াল করেনি কখন তার আঙুল শক্ত হয়ে গেছে। 

লারসেন একবার তার হাতের দিকে তাকাল। তারপর শান্তভাবে বলল, &quot;এটা আমাকে দাও।”

মারদেকা পিস্তলটা তার হাতে দিল।

লারসেন অস্ত্রটা নিজের কোমরে রেখে দিল। তারপর তার দিকে তাকাল। &quot;আজকের জন্য যথেষ্ট।”

মারদেকা কিছু বলল না। তার চোখ তখনও পাহাড়ের অন্ধকার দিকে। সেখানেই কোথাও ভিক্টর কেইন থাকতে পারে। হয়তো সে নিজে নেই। হয়তো তার লোকেরা আছে। কিন্তু তারা জানে, সে এখানে। এই কথাটা ভাবতেই তার বুকের ভেতর অস্বস্তি হলো। পাহাড়ে থাকলে বিপদ ছিল সামনে। পাথরের আড়ালে শত্রু ছিল, গুলির শব্দ ছিল, কোথা থেকে আক্রমণ আসছে তা বোঝার চেষ্টা ছিল। সেখানে প্রতিটি মুহূর্তে শরীর আর মন ব্যস্ত থাকত।

কিন্তু র‌্যাঞ্চে ফিরে বিপদটা যেন অন্যরকম হয়ে গেছে। এখানে ইলাই আছে। বাড আছে। ক্লে আছে। হ্যাঙ্ক আছে। রুবেন আছে। মিগুয়েল আছে। এলিয়াস আহত অবস্থায় ঘরের ভেতরে শুয়ে আছে। আর এদের প্রত্যেকের জন্য এখন তার মনে একটা আলাদা ভয় জন্মেছে। যদি শত্রুরা আসে? যদি গুলি শুধু তাকে লক্ষ্য করে না আসে? এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না। 

রাতের খাবারের পর র‌্যাঞ্চের স্বাভাবিক নিয়ম বদলে গেল। সাধারণত রাত নামার পর সবাই নিজের নিজের কাজ শেষ করে। কেউ আস্তাবল দেখে, কেউ পশুর ঘের পরীক্ষা করে, কেউ ঘরের ভেতরে বসে তামাক খায়। পাহারার দায়িত্ব থাকে নির্দিষ্ট কয়েকজনের ওপর। কিন্তু আজ বাড কাউকে কিছু বলতে হয়নি। সবাই নিজে থেকেই বুঝে গেছে।

ক্লে বাড়ির পশ্চিম দিকটা পরীক্ষা করল। হ্যাঙ্ক উত্তর দিকের বেড়ার পাশে পাহারার জায়গা বদলে দিল। মিগুয়েল আবার ঘোড়ার দাগগুলো দেখে আসার জন্য গেল, যদিও এবার র‌্যাঞ্চ থেকে খুব দূরে গেল না।

রুবেন কোল রাতের অন্ধকারে বারান্দায় বসে ছিল। তার হাতে একটা পুরোনো নোটবুক। মাঝে মাঝে সে কিছু লিখছে, তারপর থেমে যাচ্ছে। ব্ল্যাক রিভারের দিকে পাঠানো লোকদের কাছ থেকে সে খবর আশা করছে, কিন্তু খবর আসতে সময় লাগবে।

ইলাই এসবের মধ্যে সবচেয়ে বিরক্ত ছিল। কারণ তার ধারণা, মানুষ যখন ভয় পায়, তখন ঠিকমতো খাওয়া বন্ধ করে দেয়। মারদেকাকে দ্বিতীয়বার খাবার দিতে গিয়ে সে বলেছিল, &quot;আগামীকাল থেকে যত খুশি বন্দুক নিয়ে ঘুরবে। আজ খাও।”

মারদেকা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেনি। ইলাইয়ের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই।

রাত আরও গভীর হলে মারদেকা নিজের ঘরে গেল। কাঠের ছোট ঘরটা তার পরিচিত। বিছানা, জানালার পাশে ছোট টেবিল, দেয়ালে ঝোলানো তার কিছু জিনিস। এতদিন এই জায়গাটাকে সে শুধু থাকার জায়গা বলে চিনত। আজ বিছানায় বসে চারপাশে তাকিয়ে তার মনে হলো, পাহাড় থেকে ফিরে আসার পর ঘরটাও বদলে গেছে।

আসলে ঘর বদলায়নি। সে বদলেছে। সে ধীরে জামার ভেতর হাত দিল। সেই পুরোনো ধাতব টুকরোটা এখনও তার কাছে আছে। এলিয়াস যে টুকরো দেখিয়েছিল, তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পর এখন আর সন্দেহ নেই। এই জিনিসের সঙ্গে তার বাবার সম্পর্ক ছিল। এতদিন ধরে সে এটাকে নিজের জীবনের অংশ বলে বয়ে বেড়িয়েছে, অথচ জানত না কেন।

এতদিন সে এই শব্দ শুনে ভয় পেত। মনে হতো, কেউ যেন তাকে কোথাও থেকে ডাকছে। এখন সে জানে, কেউ তাকে ডাকছিল, তিনি ছিলেন তার বাবা। এই সত্যটা জানার পরও তার বুকের ভেতর কষ্ট হলো। কারণ সে বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু তার বাবা বাঁচেনি।

সে জানালার বাইরে তাকাল। দূরে একটা লণ্ঠনের আলো নড়ছে। সম্ভবত পাহারার লোক জায়গা বদলাচ্ছে। সবকিছু শান্ত। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইল। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, সে নিজেও জানে না।

পরদিন সকালে র‌্যাঞ্চের ওপর সূর্যের আলো উঠতেই আবার পরিচিত কাজ শুরু হলো। কিন্তু আগের দিনের মতো কোনো অলসতা নেই। প্রত্যেক মানুষ কাজের ফাঁকে একবার না একবার দূরের দিকে তাকাচ্ছে।

মারদেকা সকালবেলা ঘর থেকে বেরিয়ে প্রথমেই লারসেনকে দেখতে পেল। সে বাড়ির পেছনের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে একটা কাঠের খুঁটি। আর খুঁটির পাশে ছোট একটা টেবিল। কাছে যেতেই সে দেখল, টেবিলের ওপর একটা হোলস্টার রাখা। পাশে সেই পিস্তল। আজও খালি।

লারসেন তার দিকে তাকাল। &quot;এসো।”

মারদেকা এগিয়ে গেল। সকালের বাতাস এখনও ঠান্ডা। সূর্যের আলো পুরোপুরি গরম হয়নি। দূরে ঘোড়ার নিঃশ্বাসের সঙ্গে সাদা বাষ্প বের হচ্ছে।

লারসেন প্রথমে পিস্তলটা হাতে নিল। &quot;অস্ত্র হাতে নেওয়ার আগে কী দেখবে?”

মারদেকা উত্তর দিল, &quot;অস্ত্র খালি কি না।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, &quot;দেখাও।”

মারদেকা পিস্তলটা নিল। লারসেন আগের রাতে যেভাবে দেখিয়েছিল, সেভাবেই পরীক্ষা করল। তারপর আবার তাকে দেখালো।

“এবার ধরো।”

মারদেকা পিস্তল ধরল। 

&quot;হলো না।” লারসেন বলল। &quot;হাত শক্ত করে ধরছ।”

মারদেকা একটু ঢিলে করল।

“অতিরিক্ত শক্ত করলে হাত শক্ত হয়ে যাবে। অস্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করবে, অস্ত্রকে চেপে ধরবে না।” লারসেন বললো, তারপর সে মারদেকার পায়ের দিকে তাকাল। &quot;এখন দাঁড়াও।”

মারদেকা দাঁড়াল। দুই পায়ের দূরত্ব ঠিক করল। এক পা সামান্য এগিয়ে।শরীরের ভার সমানভাবে ছড়িয়ে দিল।

লারসেন কিছুক্ষণ মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, &quot;দেখেছ, তোমার নতুন কিছু শেখার দরকার হয়নি।” এবার সে  দুই তার পায়ের দিকে তাকাল। &quot;তুমি বন্দুক চালাতে শেখোনি। কিন্তু দাঁড়াতে শিখেছ।” সে একটু থামল। &quot;পা ভুল জায়গায় থাকলে হাত যত দ্রুতই চলুক, গুলি ঠিক জায়গায় যাবে না।”

মারদেকা আবার নিজের অবস্থান ঠিক করল।

লারসেন এবার হোলস্টারটা তার কোমরে বাঁধতে সাহায্য করল। চামড়ার পুরোনো গন্ধ। কোমরে নতুন ওজন। মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। এতদিন তার কোমরে ছুরি ছিল। ছুরির সঙ্গে তার সম্পর্ক আলাদা। ছুরি হাতে নিলে তাকে কাছে যেতে হয়। প্রতিপক্ষের চোখ দেখতে হয়। তার শরীরের নড়াচড়া বুঝতে হয়। কিন্তু বন্দুক দূরত্ব বদলে দেয়। এই জিনিসটা হাতের ভুলের জন্য ক্ষমা করে না।

লারসেন বলল, &quot;এখন বের করবে না।”

মারদেকা তার দিকে তাকাল। &quot;তাহলে?”

“শুধু হাত রাখবে।”

মারদেকা হাত রাখল।

“আবার।”

সে হাত সরাল। আবার রাখল। এভাবে কয়েকবার। কোনো নাটক নেই। কোনো দ্রুততা নেই। শুধু হাতের অবস্থান।

লারসেন তাকে থামাল। &quot;তুমি দ্রুত হতে চাও?”

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, &quot;জানি না।”

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। &quot;ভালো উত্তর।” তারপর সে ধীরে বলল, &quot;কারণ দ্রুত হওয়া আর বেঁচে থাকা এক জিনিস নয়।”

মারদেকা আবার হোলস্টারের ওপর হাত রাখল।

সকালের সূর্য একটু একটু করে ওপরে উঠছে। দূরে র‌্যাঞ্চের কাজ চলছে। কেউ হাতুড়ি দিয়ে কাঠে আঘাত করছে। কোথাও ঘোড়ার খুরের শব্দ। এই সব পরিচিত শব্দের মাঝেই মারদেকার নতুন শিক্ষা শুরু হলো। সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্দুক বের করেনি।

শুধু হাত রেখেছে। সরিয়েছে। আবার রেখেছে। তারপর পিস্তল ধরেছে। আবার হোলস্টারে ফিরিয়ে দিয়েছে। 

লারসেন বারবার তার কাঁধ ঠিক করেছে। কবজি সোজা করেছে। শরীরের ভঙ্গি বদলেছে।

একসময় মারদেকার কপালে ঘাম জমল। সে অবাক হলো।দৌড়ানো নয়। লড়াই নয়। তবু এই সাধারণ কাজটাও কঠিন।

লারসেন বলল, &quot;ক্লান্ত?”

মারদেকা বলল, &quot;না।”

লারসেন তার হাতের দিকে তাকাল। &quot;মিথ্যা।”

মারদেকা চুপ করে রইল।

লারসেনের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি দেখা গেল। &quot;ভালো। ক্লান্তি বুঝতে পারাও শিক্ষার অংশ।”

দুপুরের আগে অনুশীলন থামল। মারদেকা পিস্তলটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। তার মনে হচ্ছিল, সে খুব কম কিছু শিখেছে। কিন্তু শরীর বলছে, সে অনেকক্ষণ ধরে নতুন কিছু করছে।

লারসেন টেবিলের উপর হাত রাখলো। &quot;আগামীকাল আবার।”

মারদেকা জিজ্ঞেস করল, &quot;কবে গুলি করব?”

লারসেন তার দিকে তাকাল। &quot;যখন বন্দুক বের করা তোমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকবে না।”

এই উত্তর শুনে মারদেকা কিছু বুঝল না। কিন্তু সে আর প্রশ্ন করল না।

দুপুরের দিকে এলিয়াসের ঘরে গেল সে। এলিয়াস তখন জেগে আছে। তার কাঁধের ক্ষত নতুন করে বাঁধা হয়েছে। মুখ এখনও দুর্বল, কিন্তু আগের দিনের চেয়ে রং ফিরেছে। মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

এলিয়াস তাকে দেখে বলল, &quot;বন্দুক শিখছ?”

মারদেকা অবাক হলো। &quot;কীভাবে জানলে?”

এলিয়াসের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। &quot;লারসেন যখন কাউকে প্রতিদিন সকালে একই জায়গায় দাঁড় করায়, তখন সাধারণত দুটো জিনিস শেখায়। ধৈর্য, অথবা বন্দুক।”

মারদেকা ভেতরে এসে বসল। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। তারপর সে বলল, &quot;আমি কি বন্দুক চালাতে পারব?”

এলিয়াস সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। জানালা দিয়ে দুপুরের আলো ভেতরে পড়েছে। কাঠের দেয়ালে আলো আর ছায়ার রেখা তৈরি হয়েছে। তারপর সে বলল, &quot;তুমি পাহাড়ে বেঁচে থাকতে শিখেছ। অন্যদের শেখানো ছাড়া কিছু জিনিস তুমি নিজেই শিখেছ। বন্দুকও শিখবে।” সে একটু থামল। &quot;কিন্তু একটা কথা মনে রাখবে। বন্দুক শিখলেই মানুষ বন্দুকবাজ হয় না।”

মারদেকা মাথা নেড়ে বলল।

এলিয়াস জানালার বাইরে তাকাল। “আর আশা করি, তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি সেটা প্রমাণ করতে হবে না।”

সন্ধ্যার আগে রুবেন কোলের লোক ফিরে এল। সে ধুলোয় ঢাকা ঘোড়া নিয়ে র‌্যাঞ্চে ঢুকল। খবর খুব বেশি নয়। ব্ল্যাক রিভারের আশেপাশে কয়েকজন অচেনা লোককে দেখা গেছে। তারা কোথা থেকে এসেছে, কেউ জানে না। তারা শহরে বেশি সময় থাকেনি। সরাইখানায় খেয়েছে, ঘোড়াগুলোকে বিশ্রাম দিয়েছে, তারপর আবার বেরিয়ে গেছে।

রুবেন খবর শুনে চুপ করে রইল। তারপর বলল, যারা ওই লোকদের দেখেছে, তাদের আবার জিজ্ঞেস করতে হবে।

বাড এসে লারসেনের সঙ্গে কথা বলল। হ্যাঙ্ক পাহারার জায়গা আরও দূরে সরানোর প্রস্তাব দিল। ক্লে বলল, র‌্যাঞ্চের সব ঘোড়া যেন রাতে আস্তাবলের ভেতরে না রাখা হয়। যদি হঠাৎ আক্রমণ হয়, একটা জায়গায় সব ঘোড়া থাকলে বিপদ বাড়বে।

লারসেন সবার কথা শুনল। তারপর খুব অল্প কথায় নির্দেশ দিল।

সেই রাত থেকে র‌্যাঞ্চ বদলে গেল। পশ্চিম দিকের বেড়ার কাছে অতিরিক্ত পাহারা বসানো হলো। দক্ষিণের খোলা পথ নজরে রাখা হলো। রাতে লণ্ঠনের আলো কমিয়ে দেওয়া হলো। প্রতিটি ঘরে অস্ত্র প্রস্তুত রাখা হলো।

মারদেকা এসব দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, একটা ঝড় আসার আগে যেমন বাতাস বদলে যায়, র‌্যাঞ্চের পরিবেশও তেমন বদলে গেছে। 

সন্ধ্যার পর লারসেন আবার তাকে খোলা জায়গায় ডাকল। আজও খালি পিস্তল। আজও গুলি নয়। কিন্তু আগের দিনের চেয়ে তার ধরন বদলেছে। সে হোলস্টারের ওপর হাত রাখল। সরাল। আবার রাখল।

লারসেন একসময় বলল, &quot;এবার ধীরে বের করো।”

মারদেকা অস্ত্র বের করল। তার চলন দ্রুত নয়। কিন্তু আগের দিনের চেয়ে কম অস্বস্তিকর।

লারসেন বলল, &quot;আবার।” 

মারদেকা তাই করলো। এভাবে চলতেই থাকলো। একসময় তার হাত ক্লান্ত। 

আকাশের রং বদলাতে শুরু করেছে। সূর্য পশ্চিমে নেমে গেছে। ঘাসের ওপর লম্বা ছায়া। 

হঠাৎ দূর থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ এলো। দুজনেই থেমে গেল।এইবার শব্দটা পাহাড়ের দিক থেকে নয়। উত্তরের পথ থেকে। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, মিগুয়েল দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে। তার মুখের ভাব দেখে বোঝা গেল, সে শুধু র‌্যাঞ্চের চারপাশ পরীক্ষা করে ফিরে আসেনি। সে কিছু পেয়েছে।

ঘোড়ার পিঠ থেকে নামার আগেই সে বলল, &quot;লারসেন।”

লারসেন এগিয়ে গেল। &quot;কী হয়েছে?”

মিগুয়েল একবার মারদেকার দিকে তাকাল। তারপর নিচু গলায় বলল, &quot;ওরা আজ আবার এসেছে।”

চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দূরে শুধু একটা ঘোড়ার হালকা ডাক। লারসেনের চোখ সরু হলো। &quot;কত দূর?”

“এবার খুব বেশি দূরে নয়।” মিগুয়েল বলল। &quot;পাহাড়ের নিচের রিজ থেকে র‌্যাঞ্চ দেখা যায়।”

মারদেকা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মিগুয়েল এবার আরও ধীরে বলল, &quot;সেখানে তিনজন ছিল।”

লারসেনের মুখের কোনো পরিবর্তন হলো না। &#039;কেইন?”

মিগুয়েল মাথা নাড়ল। &quot;দূর থেকে মুখ দেখিনি।” তারপর সে ঘোড়ার লাগাম শক্ত করে ধরল। &quot;কিন্তু তাদের একজন অনেকক্ষণ ধরে শুধু এই বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিল।”

মারদেকার হাত এখনও পিস্তলের ওপর। লারসেন ধীরে তার দিকে তাকাল। তারপর অস্ত্রটা হোলস্টারে ফিরিয়ে দিতে বলল। মারদেকা সেটাই করল। পিস্তলটা কোমরে ফিরে গেল। কিন্তু এবার তার মনে হলো, সে শুধু একটা অস্ত্র ফিরিয়ে রাখল না। সে একটা সিদ্ধান্তকে সাময়িকভাবে অপেক্ষা করতে দিল।

দূরে সূর্যের শেষ আলো মিলিয়ে যাচ্ছে। পাহাড় আবার অন্ধকার হয়ে আসছে। সেই অন্ধকারের ওপারে শত্রুরা আছে। তারা র‌্যাঞ্চকে দেখেছে। তারা পথ চিনেছে। আর এখন র‌্যাঞ্চের মানুষগুলোও জানে, অপেক্ষার সময় খুব বেশি নেই।

মারদেকা ধীরে মুখ তুলে পাহাড়ের দিকে তাকাল। ছয় বছর আগে, সেই পাহাড়ের কোনো এক অন্ধকার পথে সে দৌড়েছিল। আজ সে আবার পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু এবার তার কোমরে হোলস্টার। তার পায়ের নিচে শক্ত মাটি।

চারপাশে নিজের মানুষগুলো। আর সামনে যে পথ আসছে, সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা তার মনে একবারও এল না।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/270452/</link>
				<pubDate>Sun, 06 Sep 2026 07:26:46 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২৭<br />
পাহাড়ের শেষ ঢালটা পেছনে ফেলে খোলা প্রান্তরের দিকে নামতে নামতে মারদেকার মনে হলো, অনেক দিন পর সে আবার আকাশকে পুরোটা দেখতে পাচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে পাহাড়ের মধ্যে আকাশ যেন সবসময় কোনো না কোনো পাথরের কিনারা, খাড়া দেয়াল কিংবা কালো চূড়ার আড়ালে কেটে গেছে। কোথাও সরু গিরিখাতের ওপরে একফালি নীল দেখা গেছ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-270452"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/270452/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">7ee91ffa042f239d173c1752a6095579</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২৬
পাহাড়ের ঢাল এবার ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে এসেছে, কিন্তু পথ সহজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপদ কমেনি। বরং সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের প্রতিটি পাথর, প্রতিটি শুকনো ঝোপ, প্রতিটি উঁচু ঢাল এমন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে লুকিয়ে থাকার সুযোগ যেন আরও কমে আসছিল।

মারদেকা সবার আগে হাঁটছিল। তার চোখ কখনও মাটির দিকে, কখনও সামনের ঢালের দিকে, আবার কখনও দূরের পাথুরে রেখার ওপর গিয়ে স্থির হচ্ছিল। তার কোমরে ছুরি। হাত অস্ত্রের ওপর নেই, কিন্তু শরীরের প্রতিটি পেশি সতর্ক। পেছনে লারসেন, তার এক হাতের ক্ষত কাপড় দিয়ে বাঁধা, যদিও সেখান থেকে আবার রক্ত চুঁইয়ে বেরোতে শুরু করেছে। সবচেয়ে পেছনে এলিয়াস, আহত কাঁধের কারণে তার চলার গতি ধীর হয়ে গেছে।

সূর্যের প্রথম আলো পাহাড়ের মাথায় পড়লেও নিচের সরু গিরিখাতের মধ্যে এখনও ঠান্ডা জমে আছে। বাতাস শুকনো। পাথরের গায়ে রাতের শিশিরের সামান্য আর্দ্রতা কোথাও কোথাও চকচক করছে। দূরে একটা বাজপাখি আকাশে গোল হয়ে ঘুরছিল। তার ডানার নিচে পাহাড়ের বিশাল ছায়া মাটির ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

কিন্তু মারদেকা পাখিটার দিকে তাকাচ্ছিল না। সে থেমে গেল। তার সামনে একটা জায়গায় পাহাড়ি পথ দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে। বাঁ পাশের পথটা নিচের দিকে নেমেছে, দেখতে তুলনামূলক সহজ। ডান দিকের পথটা উঁচু পাথরের গা ঘেঁষে ঘুরে গেছে। সেখানে চলতে কষ্ট হবে, কিন্তু জায়গাটা অনেক বেশি আড়াল দেওয়া।

লারসেন থামল। “কী হলো?”

মারদেকা উত্তর দেওয়ার আগে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল। সূর্যের আলো এখনও পুরোপুরি সেখানে পৌঁছায়নি। সে হাত দিয়ে মাটির ধুলো স্পর্শ করল। তারপর সামনের দিকে ঝুঁকে একটা পাথরের পাশে চোখ সরু করে তাকাল। কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়াল। “বাঁ দিকের পথ।”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “কেন?”

মারদেকা পেছনের দিকে তাকাল না। তার চোখ তখনও সামনে। “ওরা ভাববে আমরা ডান দিক দিয়ে যাব।”

এলিয়াস ক্লান্ত মুখে বলল, “ওটা আড়াল দেওয়া পথ।”

“তাই।” মারদেকা বলল। “আর ওরা জানে আমরা আড়াল চাইব।”

লারসেনের মুখে খুব সামান্য একটা পরিবর্তন দেখা গেল। সে কিছু বলল না। কয়েক মাস আগেও এমন পরিস্থিতিতে সে মারদেকাকে সামনে পাঠাত না। তাকে নিজের পেছনে রাখত। বিপদের জায়গায় ছেলেটিকে চোখের আড়াল হতে দিত না।

কিন্তু আজ সকালটা অন্যরকম। গত রাতের পর থেকে অনেক কিছু বদলে গেছে।

ড্যানিয়েল রিডের নাম এখন আর শুধু অতীতের কোনো অচেনা মানুষের নাম নয়। সে মারদেকার বাবা। একজন শ্বেতাঙ্গ শিকারি, দক্ষ স্কাউট, সীমান্তের দুর্গম পথের মানুষ। যে বিশ্বাসঘাতকতার সন্ধান পেয়েছিল। যে প্রমাণ জোগাড় করতে চেয়েছিল। আর যার মৃত্যুর আগে নিজের সাত বছরের ছেলেকে আগুন আর গুলির শব্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো একটা নির্দেশ দিয়েছিল। 

দৌড়াও শব্দটা মারদেকার মাথার ভেতর এতদিন ধরে ঘুরেছে। স্বপ্নে, জেগে থাকা অবস্থায়, অন্ধকার পাহাড়ি পথে, ভয়ংকর মুহূর্তে। এখন আর সেটা কোনো অদ্ভুত রহস্য নয়। সেটা তার বাবার কণ্ঠ। মানুষটার মৃত্যুর আগের শেষ নির্দেশ।

মারদেকা বাঁ পাশের পথ ধরে হাঁটা শুরু করল। পেছনে লারসেন। তারও পেছনে এলিয়াস।

তারা খুব বেশি দূর যেতে পারেনি, হঠাৎ মারদেকা আবার থামল। এবার সে হাত তুলল না, কোনো শব্দও করল না। শুধু শরীর নিচু করল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে পাথরের আড়ালে সরে গেল। এলিয়াসও। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর দূরে একটা শব্দ। খুব হালকা। পাথরে ঘোড়ার লোহার খুর লাগার শব্দ। একবার। তারপর বিরতি। আবার।

মারদেকা ধীরে মাথা ঘুরিয়ে লারসেনের দিকে তাকাল। “ঘোড়া।”

লারসেন নিচু গলায় বলল, “কতগুলো?”

মারদেকা উত্তর দিল না। সে মাথা সামান্য কাত করল। বাতাস এখন তাদের দিক থেকে পাহাড়ের নিচে যাচ্ছে। শব্দের সঙ্গে বাতাসের দিক মিলিয়ে সে হিসেব করার চেষ্টা করল। একটা। দুইটা। তারপর অন্য একটা শব্দ, যেন কেউ লাগাম টেনে ঘোড়াকে থামিয়েছে।

মারদেকা খুব আস্তে বলল, “তিনটা। হয়তো চারটা।”

এলিয়াস নিচু গলায় বলল, “কেইনের লোক।”

লারসেন পাথরের কিনারা দিয়ে সামান্য বাইরে তাকাল। তারপর আবার সরে এল। “আমাদের দেখতে পায়নি।”

মারদেকা এবার মাথা নাড়ল। “এখনও না।”

কথাটা শেষ হতেই দূরে একটা কণ্ঠ ভেসে এল। “নিচের পথটা দেখো!”

কণ্ঠটা এত দূরে যে মুখ চেনা সম্ভব নয়। কিন্তু পরিষ্কার বোঝা গেল, তারা কাউকে খুঁজছে। 

লারসেন ধীরে পিস্তল বের করল। এলিয়াসের হাতও অস্ত্রের দিকে গেল। 

মারদেকা দুজনের দিকে তাকাল। তার নিজের কোমরে ছুরি। গত রাতেই সে দেখেছে, বন্দুকের লড়াই কেমন। সে দেখেছে বন্দুক চালাতে। অন্তত এটা দেখেছে যে অস্ত্র কীভাবে ধরে, ট্রিগার কোথায়, কীভাবে গুলি ছোড়া হয়। কিন্তু দেখা আর করতে পারা এক জিনিস নয়। আর গুলি ছোড়া আর মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি করা, তার থেকেও আলাদা।

লারসেন তার দিকে তাকাল। “তুমি এখানেই থাকবে। আমরা না বলা পর্যন্ত বের হবে না।”

মারদেকার চোখে অদ্ভুত একটা স্থিরতা দেখা গেল। “যদি ওরা এদিকে আসে?”

লারসেন এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তাহলে আগে আমাকে বলবে।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তারা পাথরের আড়ালে অপেক্ষা করতে লাগল। সময় যেন ধীরে যেতে শুরু করল।

সূর্য একটু একটু করে উপরে উঠছে। পাহাড়ের গায়ে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও সোনালি, কোথাও ফ্যাকাশে সাদা। শুকনো ঘাসের ডগাগুলো আলো পেয়ে চকচক করছে। নিচের দিকে দূরে একটা সরু সমতল জায়গা দেখা যাচ্ছে, তারপর আরও দূরে পাহাড়ের শেষ রেখা।

ওই পথ ধরলেই খোলা প্রান্তর। তারপর র&#x200d;্যাঞ্চ। কিন্তু তার আগে পাহাড়কে পেছনে ফেলে যেতে হবে। আর পাহাড় এখনও তাদের ছাড়েনি।

হঠাৎ বাঁ দিকের ওপরের ঢাল থেকে একটা রাইফেলের গুলি ছুটে এল। শব্দটা এত আচমকা যে এলিয়াস পাথরের সঙ্গে শরীর চেপে ধরল। গুলিটা তাদের থেকে অনেকটা দূরে পাথরে আঘাত করল। 

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় গুলি এলো। এবার আরও কাছে। পাথরের একটা অংশ ভেঙে মারদেকার মুখের ওপর ধুলো এসে পড়ল।

লারসেন পিস্তল তুলে একবার গুলি করল। তারপর চিৎকার করে বলল, &quot;নিচু হও!”

এরপর আর কোনো সতর্কতা দেওয়ার সময় রইল না। চারদিক থেকে গুলির শব্দ শুরু হলো।

পাহাড়ি বন্দুকযুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, মানুষ কখনও নিশ্চিত হতে পারে না শত্রু ঠিক কোথায়। একটা গুলি সামনে থেকে আসে, তার প্রতিধ্বনি অন্য দিক থেকে ফিরে আসে। আরেকটা ওপরের পাথরে লাগে, মনে হয় যেন নিচের খাদ থেকে কেউ গুলি করেছে। ধুলো, শব্দ আর পাথরের ভাঙা টুকরোর মধ্যে দূরত্বের হিসেব হারিয়ে যায়।

কিন্তু মারদেকা চেষ্টা করছিল শব্দগুলো আলাদা করতে। বাম দিকে একজন। সামনে দুজন। আরেকজন অনেক দূরে। সে পাথরের সঙ্গে শরীর ঠেসে বসে রইল।

লারসেন আবার গুলি করল।

এলিয়াস এবারও অস্ত্র তুলেছে, কিন্তু আহত কাঁধের কারণে তার হাত স্থির রাখতে কষ্ট হচ্ছে। তবু সে একবার লক্ষ্য করে গুলি করল। তারপর সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে পড়ল। দূর থেকে একটা আর্তচিৎকার শোনা গেল। 

মারদেকা বুঝতে পারল না গুলিটা কাউকে লেগেছে কি না। সে শুধু শুনছিল। একটা বুট পাথরের ওপর দিয়ে এগিয়ে আসছে। অন্যদের থেকে আলাদা। ধীরে। সাবধানে। সে কান দিয়ে লোকটার অবস্থান ধরতে লাগল। আরও কাছে। আরও। তারপর হঠাৎ থেমে গেল।

মারদেকা লারসেনের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “একজন নিচ দিয়ে আসছে।”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল। “কোন দিক?”

মারদেকা হাত দিয়ে বাঁ দিকের নিচু ঢাল দেখাল। “ওখানে। পাথরের পেছনে।”

লারসেন কোনো প্রশ্ন করল না। সে ধীরে পাথরের অন্য প্রান্তে সরে গেল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর একটি মানুষের ছায়া দেখা গেল।

লোকটা নিচু হয়ে এগোচ্ছিল। হাতে রাইফেল। মুখে দাড়ি। মাথায় ধুলো জমা টুপি। সে পাথরের পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসতেই লারসেন গুলি করল। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে পড়ে গেল।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ওপর থেকে আরেকটা গুলি এলো। লারসেনের টুপির কিনারা ছিঁড়ে সেটা উড়ে গেল।

মারদেকা প্রথমবার বুঝতে পারল, তারা শুধু পালিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে না। শত্রুরা তাদের ঘিরে ফেলছে।

এলিয়াস দাঁত চেপে বলল, “ওরা নিচের পথ বন্ধ করেছে।”

লারসেন এক ঝলক তাকাল। “আর ওপরে?”

এলিয়াস উত্তর দেওয়ার আগেই ওপরের ঢাল থেকে কেউ চিৎকার করে উঠল। “লারসেন!”

সবাই থেমে গেল। গুলির শব্দও থামল। কয়েক মুহূর্তের সেই নীরবতা বন্দুকের আওয়াজের থেকেও ভয়ংকর মনে হলো।

তারপর পাহাড়ের ওপরে একটা মানুষ দেখা দিল। সে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় কালো টুপি। গায়ে লম্বা ধুলোমাখা কোট। তার মুখ এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় না। কিন্তু লারসেন তাকে চিনল। 

দূরের মানুষটা ধীরে ধীরে দুই হাত ছড়িয়ে দিল। &quot;তেরো বছর, লারসেন। এত বছর ধরে আমি ভেবেছি, তোমার সঙ্গে আর কখনও দেখা হবে না।”

লারসেন পিস্তল নামাল না। “আমি ভেবেছিলাম তুমি মৃত।”

পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা হাসল। “তুমি অনেক কিছুই ভেবেছিলে।”

এলিয়াসের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “তোমাকে সেদিন মাটিতে পড়তে দেখেছিলাম।”

ভিক্টর কেইন মাথা সামান্য কাত করল। “তাহলে তুমি ভুল দেখেছিলে।”

তারপর তার চোখ নিচের দিকে ঘুরল। মারদেকার দিকে। 

“ছেলেটা।” কেইন বলল। “আমি তাকে দেখতে চেয়েছিলাম।”

লারসেনের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল। “তুমি তাকে দেখেছ।”

কেইনের হাসি মিলিয়ে গেল। “সেই ছয় বছর আগে, এতটুকুন ছিল। তারপর পালিয়ে গিয়েছিল।&quot; একটু থেমে আবার বললো, &quot;এখন নিশ্চয়ই সেরকম নেই।&quot;

তারপর আবার বন্দুকের গুলি শুরু হলো। মারদেকা নিচু হয়ে পড়ল। এবার গুলি আগের চেয়ে কাছ থেকে আসছে। পাথরের আড়াল আর নিরাপদ নেই। একটি গুলি এলিয়াসের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল। আরেকটি লারসেনের পেছনের পাথরে আঘাত করল।

লারসেন দ্রুত চারপাশে তাকাল। তারপর বলল, “আমাদের অবস্থান বদলাতে হবে।”

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে সামনে তাকাল। নিচে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে একটা ভাঙা পাথুরে ঢাল। তার নিচে শুকনো ঝোপের সারি। জায়গাটা বিপজ্জনক, কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে পারলে শত্রুরা তাদের সরাসরি দেখতে পাবে না।

মারদেকা পথটা দেখল। তারপর বলল, “ওদিক দিয়ে যাওয়া যাবে।”

লারসেন তার চোখের দিকে তাকাল। “নিশ্চিত?”

“ঠিক জানি না।” মারদেকার কন্ঠ দ্বিধান্বিত। “কিন্তু এখানে থাকলে ওরা আমাদের ঘিরে ফেলবে।”

লারসেনের মুখে খুব সামান্য একটা হাসির ছায়া দেখা গেল। এমন একটা মুহূর্তে, গুলির মধ্যে দাঁড়িয়ে, ছেলেটার উত্তরটা যেন তার ভালো লেগেছে। &quot;চলো।” বললো সে।

এলিয়াস উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরের দিক থেকে গুলির শব্দ হলো। এলিয়াসের শরীর ঝাঁকুনি খেলেও সে পড়ে গেল না। গুলিটা তার গায়ে লাগেনি। কিন্তু পাথরের একটা টুকরো ছিটকে এসে তার আহত কাঁধে আঘাত করল। সে দাঁত চেপে দেয়ালে হেলান দিল।

লারসেন বলল, “পারবে?”

এলিয়াস মুখ তুলে তাকাল। “এত বছর অপেক্ষা করেছি।” সে কষ্ট করে বলল। “এখন মরার ইচ্ছে নেই।”

মারদেকা প্রথমবার তার দিকে তাকিয়ে খুব সামান্য হাসল। তারপর তিনজন একসঙ্গে নড়ল।

লারসেন সামনে গুলি ছুড়ে শত্রুদের মাথা নিচু রাখতে চেষ্টা করল। 

মারদেকা প্রথমে বেরিয়ে ডান দিকে ছুটল, তারপর পাথরের আড়াল ধরে নিচের দিকে নেমে গেল। তার পা একবারও থামল না। কোথায় শরীরের ভার দিতে হবে, কোন পাথর আলগা, কোন জায়গায় লাফ দিতে হবে, সে যেন চোখের আগেই বুঝে ফেলছে। পেছনে এলিয়াস। আর সবচেয়ে শেষে লারসেন।

হঠাৎ মারদেকা শুনল অন্যরকম একটা শব্দ।  খুব কাছে। পেছনে নয়। সামনে। সে সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। তার হাত উঠে গেল লারসেনকে থামানোর জন্য। 

কিন্তু ঠিক তখনই নিচের শুকনো ঝোপের ভেতর থেকে একজন মানুষ উঠে দাঁড়াল। তার হাতে রাইফেল। মারদেকার দিকে তাকিয়ে সে প্রথমে থমকে গেল।

সময়টা হয়তো এক সেকেন্ডেরও কম ছিল। কিন্তু সেই এক সেকেন্ডে লোকটার মুখের ভাব বদলে গেল। সে রাইফেল পুরোপুরি তুলল না। বরং বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। 

মারদেকা স্থির। লোকটা আরও এক পা সামনে এগিয়ে এল। তার চোখ এবার মারদেকার মুখের ওপর স্থির। ““ঈশ্বর...” সে বলল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। “তুই একদম ড্যানিয়েল রিডের মতো দেখতে।”

মারদেকার শরীরের ভেতর যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। পেছনে কোথাও গুলি চলছিল। বাতাসে ধুলো উড়ছিল। 

এলিয়াসের আহত নিঃশ্বাসের শব্দ ছিল। লারসেনের হাতে পিস্তল ছিল।

কিন্তু সেই মুহূর্তে মারদেকা শুধু একটা নাম শুনতে পেল। ড্যানিয়েল রিড। তার বাবা। আর সামনের লোকটার মুখে যে বিস্ময়, তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না।

এলিয়াস ধীরে লোকটার দিকে এগিয়ে এল। তার মুখ ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখ কঠিন। “এবার বুঝলে?” সে বলল।

লোকটা রাইফেল শক্ত করে ধরল। কিন্তু তার চোখ এখনও মারদেকার মুখ থেকে সরেনি।

এলিয়াস বলল, “সেদিন যে ছেলেটাকে আগুনের মধ্যে থেকে পালিয়ে যেতে দেখেছিলে, সে মারা যায়নি।”

মারদেকা ধীরে এলিয়াসের দিকে তাকাল। এলিয়াসের চোখে সেই পুরোনো রাতের ছায়া ফিরে এসেছে। সে মারদেকার দিকে তাকালো, &quot;তুমি দৌড়ে পালিয়েছিলে। আর তোমার বাবা তোমাকে দৌড়াতে বলেছিল।”

মারদেকার বুকের ভেতর কিছু একটা শক্ত হয়ে উঠল।

এলিয়াসের কণ্ঠ এবার আরও নিচু। “তুমি পাহাড়ের ঢাল পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কয়েক মিনিট পর ড্যানিয়েলকে ওরা হত্যা করে।”

বাতাস থেমে গেছে বলে মনে হলো। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সামনের লোকটা রাইফেল তুলল। 

লারসেন গুলি করল। আর পাহাড় আবার বন্দুকের শব্দে কেঁপে উঠল।

মারদেকা এখন জানে, কেন লারসেন তাকে সন্তানের মত দেখে। তের বছর আগে সে যদি দল ছেড়ে পালিয়ে না যেত, হয়তো তার বাবাকে মরতে হতো না। মুলত অপরাধবোধের প্রায়শ্চিত্ত করতেই তাকে কাছে টেনে নেওয়া। 

আজকের মারদেকাকে সে ড্যানিয়েল রিডের ছায়া হিসেবে গড়ে তুলেছে। সে কারণেই তার অতীত খুঁজে পেতে তাকে সাথে নিয়েই পাহাড়ে এসেছে। মাথার ভেতর সবসময় শব্দ করা তার অতীত আজ পরিস্কার ছবি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

আর সেই অতীতের মাঝখানে, বন্দুকের ধোঁয়া আর পাহাড়ের ধুলোর মধ্যে, এখনও জীবিত দাঁড়িয়ে আছে তার বাবার হত্যাকারীদের নেতা, ভিক্টর কেইন।

পাহাড়ের শেষ ঢালটা নিচের দিকে নেমে গেছে অনেকটা, কিন্তু পথটা সহজ নয়। রাতের শেষ অন্ধকার তখন ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাচ্ছে, পূর্ব আকাশে জমে থাকা ধূসর আলো পাথরের ধারগুলোকে একে একে আলাদা করে তুলছে। কিছুক্ষণ আগেও যে জায়গাগুলো শুধু কালো ছায়া ছিল, এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে ভাঙা ঢাল, শুকনো ঝোপ, গিরিখাতের মুখ আর বহু বছরের বৃষ্টিতে কেটে যাওয়া সরু জলধারা।

তিনজনের সামনে পাহাড় শেষ হয়ে দূরে খোলা জমি শুরু হয়েছে, কিন্তু সেই খোলা জায়গা এখনও অনেক দূরে। তার আগেই রয়েছে কয়েকটি উঁচুনিচু ঢাল, পাথরের ফাঁক, আর এমন কিছু জায়গা যেখানে আড়াল না পেলে মানুষের শরীর খোলা আকাশের নিচে সহজ লক্ষ্য হয়ে যায়।

এলিয়াস মাঝখানে হাঁটছিল। তার কাঁধের ক্ষত শক্ত করে বাঁধা হয়েছে, কিন্তু রক্ত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কাপড়ের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে গাঢ় দাগ ছড়িয়ে পড়ছে। তার মুখ ফ্যাকাশে, তবু সে নিজের পায়ে হাঁটছে। লারসেন তার কাছাকাছি ছিল, আর মারদেকা সামনে কয়েক গজ দূরে পথ দেখছিল। ছেলেটার হাঁটার ভঙ্গিতে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু দ্বিধা ছিল না। 

কয়েক ঘণ্টা আগেও এই পাহাড় তার কাছে ছিল রহস্যে ভরা এক অন্ধকার জায়গা, যেখানে সে নিজের অতীতের ছিন্ন  অংশ খুঁজছিল। এখন রহস্যের অনেকটাই তার সামনে খুলে গেছে। তার বাবার নাম ড্যানিয়েল রিড। সে ছিল স্কাউট, পথচেনা মানুষ, লারসেনের পুরোনো সঙ্গী। আর ভিক্টর কেইন, সেই পুরোনো দলের বিশ্বাসঘাতক, বহু বছর মৃত বলে পরিচিত থেকেও বেঁচে আছে।

সবচেয়ে বড় কথা, মারদেকা এখন জানে কে সেই শব্দটা উচ্চারণ করে তাকে পালাতে বলেছিল। সেই রাতের আগুনের মধ্যে, গুলির শব্দ আর মানুষের চিৎকারের ভেতর, তার বাবা তাকে ডাক দিয়ে বলেছিল, দৌড়াও।

আর সে দৌড়েছিল। তারপরই ড্যানিয়েল রিডকে হত্যা করা হয়েছিল।

মারদেকা হাঁটতে হাঁটতে হাতের মুঠো শক্ত করল। কোমরের ছুরির হাতল তার তালুর কাছে ঠান্ডা লাগছিল। সে নিজের বাবাকে মনে করতে পারে না। মুখ মনে নেই। কণ্ঠের সম্পূর্ণ রূপও নেই। কিন্তু সেই একটি শব্দ রয়ে গেছে। হয়তো স্মৃতির সবকিছু ভেঙে গিয়েছিল, আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল, তারপর বছরের পর বছর ধরে তার মাথার ভেতর শুধু একটি শব্দ বেঁচে ছিল। দৌড়াও।

এখন আর সেই শব্দ তাকে ভয় দেখায় না। এখন সে জানে, কে বলেছিল। কেন বলেছিল। হঠাৎ মারদেকা থেমে গেল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে এলিয়াসকে থামতে বলল। কয়েক মুহূর্ত কেউ নড়ল না।

মারদেকা মাথা সামান্য নিচু করল। তার চোখ সামনে, কিন্তু সে দেখার চেয়ে বেশি শুনছে। ভোরের আগে পাহাড়ের বাতাসে একটা বিশেষ ধরনের নীরবতা থাকে। রাতের প্রাণীরা গর্তে ফিরে যায়, দিনের পাখিরা এখনও পুরোপুরি ডাক শুরু করে না। সেই নীরবতার মধ্যে দূরের শব্দও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
 
প্রথমে কিছুই শোনা গেল না। তারপর। খট। খুব ক্ষীণ শব্দ। যেন ধাতব কোনো বস্তু পাথরে ঠেকেছে। তারপর শুকনো পাথরের ওপর বুটের চাপ। মারদেকা ধীরে ডান দিকে তাকাল।

লারসেনের হাত ইতিমধ্যেই পিস্তলের ওপর। “কতজন?”

মারদেকা উত্তর দিল না। সে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর নিচু স্বরে বলল, “সামনে দুজন।” একটু থেমে সে মাথা ঘুরিয়ে বাম দিকের ঢালের দিকে তাকাল। “আর একজন ওপরে।”

এলিয়াসের মুখ শক্ত হয়ে উঠল।

লারসেন ধীরে বলল, “কেইন?”

“জানি না।” মারদেকা বলল। “কিন্তু ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

তিনজন সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেল। তাদের সামনে যে জায়গাটা ছিল, সেটা একটা শুকনো জলধারার মতো নিচু হয়ে গেছে। বর্ষার সময় হয়তো এখানে পাহাড়ের ওপর থেকে পানি নেমে আসে, কিন্তু এখন শুধু পাথর আর শুকনো মাটি। তার ওপরে দুপাশে উঁচু ঢাল। সামনে এগোতে হলে ওই খোলা অংশ পার হতে হবে।

লারসেন চারপাশে একবার তাকাল। “ফিরে যাওয়া যাবে?”

এলিয়াস মাথা নাড়ল। “পেছনেও ওরা আছে।”

এই কথার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দূর থেকে ঘোড়ার ক্ষীণ শব্দ এল। শব্দটা অনেক নিচে নয়, বরং পাহাড়ের অন্য দিক থেকে। শত্রুরা তাদের ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। লারসেন বুঝতে পারল, কেইন পুরোনো পথগুলো এখনও মনে রেখেছে। তেরো বছর আগের সেই দল ভেঙে গেছে, মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে, কেউ মারা গেছে, কেউ হারিয়ে গেছে, কিন্তু যে মানুষটা পথ বিক্রি করে জীবন কাটিয়েছে, সে পথ ভুলে যায়নি।

ভোরের আলো আরও একটু বেড়ে উঠল। আর সেই আলোতেই সামনে পাথরের আড়াল থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এল। 

সে একা দাঁড়িয়ে আছে। দূরত্ব এত বেশি নয় যে তাকে দেখা যায় না, আবার এত কমও নয় যে তার মুখ পরিষ্কার বোঝা যায়। মাথায় কালো টুপি। কাঁধে রাইফেল। সে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, “এত বছর পরও তুমি একইভাবে হাঁটো, লারসেন।”

লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না। “আর তুমি এখনও ছায়ার আড়াল থেকে কথা বলো, কেইন।”

লোকটা হেসে উঠল। “ছায়া আমাকে অনেক বছর বাঁচিয়ে রেখেছে।” তারপর সে সামান্য মাথা কাত করল। “তুমি ভেবেছিলে আমি মরে গেছি।”

“আমরা সবাই তাই ভেবেছিলাম।” এলিয়াসের গলা ভারী ছিল।

সামনের লোকটা এবার তার দিকে তাকাল। “এলিয়াস।” তার কণ্ঠে এমন একটা স্বর ছিল, যেন বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো দরজা হঠাৎ আবার খুলে গেছে। “তুমিও বেঁচে আছ।”

এলিয়াস উত্তর দিল না।

ভিক্টর কেইন ধীরে ধীরে সামনে এগোল না। সে জানত, আরেক কদম এগোলেই লারসেনের পিস্তলের নাগালের মধ্যে চলে আসবে। সে জানে বহু বছর আগে লারসেন দল ছেড়ে গেলেও তার বন্দুক তাকে ঠিকই টিকিয়ে রেখেছে। বরং সময়ের তোড়ে ওলফ লারসেন নেকড়ের মতই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। তাই সে নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তার চোখ মারদেকার ওপর এসে থামল। কয়েক মুহূর্ত সে কিছু বলল না।

মারদেকা স্থির দাঁড়িয়ে ছিল। তার শরীরের বেশিরভাগ অংশ পাথরের আড়ালে, কিন্তু মুখ দেখা যাচ্ছে। কেইনের চোখ ধীরে ধীরে তার মুখের ওপর ঘুরে গেল। কপাল, চোখ, গালের রেখা, চোয়াল। তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

দূরের একজন শত্রু, যে অন্য একটা পাথরের আড়ালে ছিল, হঠাৎ সামনে একটু ঝুঁকে তাকাল। ভোরের আলো এবার যথেষ্ট। সে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর বিস্মিত গলায় বলে উঠল, “কেইন ওকে দেখো।”

কেইন নড়ল না।

লোকটা আবার বলল, “ছেলেটাকে দেখো।”

মারদেকার বুকের ভেতর কিছু একটা শক্ত হয়ে উঠল।

লোকটার কণ্ঠ এবার আরও স্পষ্ট। “ড্যানিয়েল রিডের মতো দেখতে।”

কয়েক মুহূর্ত পাহাড়ের সব শব্দ যেন থেমে গেল। বাতাস বইছিল। দূরে কোথাও একটা পাখি ডেকে উঠেছিল। কিন্তু মারদেকার কানে কিছুই পৌঁছাল না। শুধু সেই কথাটা ছাড়া, ড্যানিয়েল রিডের মতো দেখতে।

তারপর কেইনের চোখের ভেতর ধীরে ধীরে এমন একটা দৃষ্টি জন্ম নিল, যা লারসেনকে আরও সতর্ক করে তুলল। 

“তাহলে সত্যিই।”  বলল কেইন, &quot;সে বেঁচে আছে।”

লারসেন এবার পিস্তল পুরোপুরি বের করল। “আর তুমি তাকে আর একবার দেখার সুযোগ পাবে না।”

কেইনের ঠোঁটে আবার হাসি ফুটল। “তেরো বছর, লারসেন। তেরো বছর আমি তোমার কাছে মৃত মানুষ হয়ে ছিলাম। আর দীর্ঘ ছয় বছর পর আমি জানতে পারলাম, ড্যানিয়েল রিডের ছেলে সেদিন মরে যায়নি।” সে চোখ সরাল না মারদেকার দিক থেকে। &quot;এত বছর পরে সে তোমার কাছেই এসে পড়েছে।”

মারদেকা হঠাৎ বলল, “তুমি আমার বাবাকে মেরেছিলে?” প্রশ্নটা বলার পর সে নিজেই অবাক হলো, তার গলা কাঁপেনি।

ভিক্টর কেইন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তোমার বাবা নিজের মৃত্যুর কারণ নিজেই হয়েছিল।”

মারদেকার হাত ছুরির হাতলে চলে গেল। “মিথ্যে।”

এলিয়াসের কণ্ঠ হঠাৎ পাহাড়ের বাতাস কেটে বেরিয়ে এল। কেইন তার দিকে তাকাল। তার মুখ ফ্যাকাশে, কাঁধে রক্তের দাগ, তবু চোখে সেই মুহূর্তে কোনো দুর্বলতা ছিল না। “ড্যানিয়েল জানত তুমি কী করছ। সে জানত তুমি পথ বিক্রি করেছ। সে জানত, তুমি যাদের আমাদের খবর দিয়েছিলে, তাদের মধ্যে কয়েকজন মারা গেছে।”

কেইন হাসল না।

এলিয়াস বলল, “সে প্রমাণ নিয়ে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল।”

“সে প্রমাণ কোথায়?” কেইনের কণ্ঠ ঠান্ডা।

লারসেন উত্তর দিল, “যেখানে তোমার হাত পৌঁছাবে না।”

এই কথার পর আর কোনো সতর্কতা রইল না। প্রথম গুলিটা কেইনের দিক থেকে এল।

লারসেন মারদেকার কাঁধ ধরে তাকে নিচে টেনে ফেলল। গুলিটা তাদের মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে পাথরে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে বন্দুকের শব্দ শুরু হয়ে গেল। পাথরের গায়ে গুলি লেগে ধুলো উড়ছে, শুকনো মাটি ভেঙে ছোট ছোট কণা ছড়িয়ে পড়ছে। ভোরের আলো এখন পাহাড়কে পুরোপুরি প্রকাশ করে দিয়েছে, আর সেই আলোয় মানুষগুলো আর ছায়া নয়। তারা বাস্তব শত্রু।

লারসেন একটা পাথরের আড়াল থেকে উঠে দুবার গুলি করল। একজন লোক সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেল।

এলিয়াস তার রাইফেল তুলে কাঁধের ব্যথা সামলে নিশানা করল। তার প্রথম গুলি কোথায় লাগল বোঝা গেল না, কিন্তু পাহাড়ের ওপর থেকে একটা চিৎকার ভেসে এল।

মারদেকা পাথরের সঙ্গে শরীর চেপে ছিল। তার পাশে একটা রাইফেল পড়ে ছিল, কিছুক্ষণ আগে এলিয়াস নিচে বসার সময় হাত থেকে রেখে দিয়েছিল। সে রাইফেলের দিকে তাকাল। তারপর নিজের হাতের দিকে।

সে বন্দুক ধরতে জানে না। কিন্তু সে জানে বন্দুক দিয়ে মানুষ মারা যায়। এই সত্যটা এতদিন তার কাছে দূরের ছিল। সে বন্দুকের শব্দ শুনেছে, বন্দুক দেখেছে, লারসেনের কোমরে কোল্ট দেখেছে। কিন্তু একটা মানুষের দিকে বন্দুক তাক করা কেমন, সেটা সে জানে না।

তার বুকের ভেতর ভয় জমে উঠল। আর ঠিক তখনই তার মাথার ভেতর আবার সেই শব্দটা ফিরে এল। দৌড়াও। কিন্তু এবার সে জানে, সেই শব্দ কোথা থেকে এসেছে। তার বাবা তাকে বাঁচাতে বলেছিল। সাত বছরের মারদেকা দৌড়েছিল। 

তেরো বছরের মারদেকা পাথরের আড়ালে বসে রইল। সে দৌড়াল না। তার চোখ পাথরের ওপর দিয়ে দ্রুত চারপাশে ঘুরে গেল। সামনে দুইজন। ডান দিকে একজন। কিন্তু একটু আগে যে লোকটা ওপরে ছিল, সে এখন কোথায়?

মারদেকা মাথা সামান্য কাত করল। বন্দুকের শব্দের ফাঁকে সে অন্য একটা শব্দ পেল। পাথর গড়াল। খুব ছোট শব্দ। তারপর বুট। উঁচু জায়গা থেকে নিচে নামছে কেউ। সে লারসেনের কাঁধে হাত রাখল। “বাঁ দিকে দেখুন।”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল না। “কোথায়?”

“ওপরে ছিল। এখন নিচে নামছে।”

এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর পাথরের আড়াল থেকে একজন মানুষ উঠে আসতেই লারসেনের গুলি ছুটল। লোকটা চিৎকার করে পেছনে পড়ে গেল। 

মারদেকা চোখ বন্ধ করল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল।

লারসেন তার দিকে একবার তাকাল। কিছু বলল না। তারপর আবার গুলি শুরু হলো।

এবার তাদের অবস্থান বদলাতে হবে। তারা যেখানে আছে, সেখানে বেশিক্ষণ থাকলে শত্রুরা দুই দিক থেকে ঘুরে এসে তাদের আটকে ফেলবে। 

মারদেকা সামনে একটা নিচু পথ দেখতে পেল। শুকনো ঝোপের ভেতর দিয়ে গেছে। বাইরে থেকে পুরোটা দেখা যায় না। সে বলল, “ওদিকে গেলে নিচে নামা যাবে।”

এলিয়াস তার দিকে তাকাল। “তারপর?”

“তারপর একটা পাথরের দেয়াল আছে। তার পেছনে পথ।” 

লারসেন জিজ্ঞেস করল, “তুমি দেখেছ?”

মারদেকা মাথা নাড়ল। “শুনেছি।”

লারসেনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত একটা দৃষ্টি দেখা গেল। এত অল্প বয়সে এই ছেলেটা কীভাবে পাহাড়কে এভাবে পড়ে নিতে পারে, সে হয়তো এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারে না। কিন্তু এখন প্রশ্ন করার সময় নয়। “এগিয়ে যাও।”

মারদেকা নিচু হয়ে বেরিয়ে এল।

লারসেন তার পেছনে গুলি চালিয়ে আড়াল তৈরি করল। এলিয়াস কষ্ট করে রাইফেল হাতে এগোল। তার আহত কাঁধ এবার প্রায় অসাড় হয়ে এসেছে, কিন্তু সে অস্ত্র ফেলে দেয়নি।

তারা শুকনো ঝোপের ভেতর ঢুকতেই ডান দিক থেকে গুলি এল। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে শুয়ে পড়ল। লারসেনও নিচু হয়ে গেল। 

কিন্তু এলিয়াস এত দ্রুত নড়তে পারল না। গুলিটা তার পাশ দিয়ে চলে গেল, কাঁধে নয়, পাথরে লাগল। তবু ছিটকে আসা ধারালো পাথরের টুকরো তার মুখের পাশে কেটে দিল। সে একবার চোখ বন্ধ করল, তারপর আবার উঠে দাঁড়াতে গেল।

মারদেকা তার কাছে পৌঁছাল। “চলুন।”

এলিয়াস বলল, “আমি পারছি।”

“আমি জানি।” মারদেকা উত্তর দিল। তারপর দুজন আবার এগোল।

সামনে পাথরের দেয়ালটা দেখা গেল। খুব উঁচু নয়, কিন্তু তার নিচে একটা সরু ফাঁক। একসঙ্গে দুজন যেতে পারবে না। মারদেকা আগে ঢুকে ভেতরের জায়গাটা পরীক্ষা করল। পেছনে গুলির শব্দ আরও কাছে এসেছে। সে ঘুরে বলল, “এখানে।”

এলিয়াস আগে ঢুকল। তারপর লারসেন। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে একজন শত্রু ঝোপ ভেঙে বেরিয়ে এল। সে মারদেকাকে দেখতে পেয়ে থেমে গেল। হয়তো সে ভাবেনি, ছেলেটা এত কাছে থাকবে।

তার রাইফেল কাঁধে ওঠার আগেই মারদেকা নিচু হয়ে গেল। গুলি তার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল। 

মারদেকা কোমর থেকে ছুরি বের করল। লোকটা রাইফেল ফেলে হাত দিয়ে তাকে ধরতে এগোল।

মারদেকা পেছনে সরে গেল না। সে লোকটার হাতের নাগালের বাইরে পাশ কাটিয়ে গেল। লারসেনের শেখানো পায়ের কাজ তখন তার শরীরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে সে আর আলাদা করে ভাবতে হয় না। লোকটা তার দিকে ঘুরতেই মারদেকা নিচু হয়ে তার হাঁটুর পেছনে পা ঠেকাল। লোকটা ভারসাম্য হারাল।

মারদেকা তার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল না। সে পাশ কাটিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছুরির হাতল দিয়ে লোকটার মাথার পাশে আঘাত করল। লোকটা গড়িয়ে পড়ল। তার হাত থেকে পিস্তল বেরিয়ে মাটিতে পড়ল।

মারদেকা পিস্তলের দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, সে সেটা তুলে নিতে পারে। কিন্তু সে তুলল না। সে ছুরিটা শক্ত করে ধরে আবার ফাঁকের ভেতর ঢুকে গেল।

পেছনে লারসেনের গলা শোনা গেল। “দ্রুত!” তিনজন আবার চলতে শুরু করল।

এবার পথটা পাহাড়ের নিচের দিকে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আলো বেড়ে যাচ্ছে। আকাশে হালকা সোনালি রং দেখা দিয়েছে। দূরে, বহু নিচে, খোলা প্রান্তরের ওপর কুয়াশার মতো ধুলো ভাসছে।

মারদেকা প্রথমবার বুঝতে পারল, তারা সত্যিই পাহাড়ের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু পেছনে এখনও গুলির শব্দ। আর সামনে এখনও শত্রুর শেষ মানুষটি। ভিক্টর কেইন।

হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। এতক্ষণ ধরে চলা গুলির লড়াইয়ের পর সেই নীরবতা অস্বাভাবিক লাগল।

লারসেন থামল। এলিয়াস পাথরের গায়ে হেলান দিল। মারদেকা সামনে তাকিয়ে রইল। তারপর পাহাড়ের ওপর থেকে ঘোড়ার শব্দ এল। একটি। তারপর আরেকটি।

মারদেকা মাথা তুলল। উঁচু ঢালের কিনারায় ভিক্টর কেইনকে দেখা গেল। সে একা। তার সঙ্গে আর কেউ নেই। তার ঘোড়াটা কালো পাথরের পাশে দাঁড়িয়ে। সূর্যের প্রথম আলো তার টুপির কিনারা ছুঁয়ে গেছে। সে অনেকক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।

লারসেন পিস্তল তুলল। কিন্তু দূরত্ব বেশি।

কেইনও জানে। সে শুধু একবার মারদেকার দিকে তাকাল। তারপর ঘোড়ার লাগাম ঘুরিয়ে দিল।

এলিয়াস নিচু স্বরে বলল, “ওকে যেতে দিও না।”

লারসেন গুলি করল। গুলিটা কেইনের অনেক দূরে পাথরে আঘাত করল।

কেইন আর পেছনে তাকাল না।

আরও কয়েকজন ঘোড়সওয়ার, যারা হয়তো আগে থেকে অন্য ঢালের আড়ালে ছিল, একে একে তার সঙ্গে মিলল। তাদের সংখ্যা বেশি নয়। বন্দুকযুদ্ধে যারা পড়েছে, তাদের কেউ আর ফিরছে না।

ভিক্টর কেইন পাহাড়ের কিনারা ধরে পশ্চিমের দিকে ঘুরে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তারা দৃষ্টির বাইরে।

মারদেকা স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, এতক্ষণ ধরে যে মানুষটাকে সে শুধু নাম হিসেবে চিনত, সে এখন বাস্তব। সে তার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। সে মারদেকাকে খুঁজছে। এবং সে পালিয়ে গেছে।

লারসেন ধীরে পিস্তল নামাল। তার হাতের ক্ষত থেকে আবার রক্ত বের হচ্ছে।

এলিয়াস ক্লান্ত গলায় বলল, “সে জানে আমরা কোথায় যাব।”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। মারদেকা ঘুরে তাকাল।

দূরের প্রান্তর তখন সূর্যের আলোয় ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠছে। পাহাড় শেষ হয়েছে। সামনে বিস্তৃত খোলা পৃথিবী। 

ছেলেটার মুখে ধুলো, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, জামায় পাথরের ঘষায় দাগ। কিন্তু তার চোখ আর আগের মতো নয়।

সে এখন জানে সে কে। সে জানে তার বাবা কে ছিল। সে জানে কেন তার বাবা মারা গেছে। আর সে জানে, ছয় বছর আগে আগুনের মধ্যে যে ছেলেটা দৌড়ে পালিয়েছিল, তাকে এখনও একজন মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

লারসেন ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। র‌্যাঞ্চে ফেরে চল।”

এলিয়াস পাথর থেকে নিজেকে সোজা করল। “কেইনও সেদিকেই যাবে।”

লারসেন দূরের প্রান্তরের দিকে তাকাল। তার মুখে ক্লান্তি ছিল, রক্ত ছিল, কিন্তু চোখে ছিল পুরোনো সেই কঠিন স্থিরতা। “তাহলে এবার ওকে সেখানে স্বাগত জানানো হবে।”

তারা পাহাড়ের শেষ ঢাল ধরে নিচে নামতে শুরু করল। মারদেকা এবারও সামনে হাঁটছিল। কিন্তু এইবার সে শুধু পথ দেখাচ্ছিল না। তার পেছনে পড়ে থাকল সেই পাহাড়, যেখানে সে নিজের জীবনের সব প্রশ্নগুলোর উত্তর পেয়েছে। 

সামনে আছে খোলা প্রান্তর। ঘোড়া। র‌্যাঞ্চ। আর অপেক্ষা করছে আরেকটি যুদ্ধ। পাহাড় তাকে তার অতীত ফিরিয়ে দিয়েছে। এবার সামনে অপেক্ষা করছে তার ভবিষ্যৎ।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/269998/</link>
				<pubDate>Sat, 05 Sep 2026 03:46:39 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২৬<br />
পাহাড়ের ঢাল এবার ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে এসেছে, কিন্তু পথ সহজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপদ কমেনি। বরং সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের প্রতিটি পাথর, প্রতিটি শুকনো ঝোপ, প্রতিটি উঁচু ঢাল এমন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে লুকিয়ে থাকার সুযোগ যেন আরও কমে আসছিল।</p>
<p>মারদেকা সবার আগে হাঁটছিল। তার চোখ কখনও&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-269998"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/269998/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">7b38e01302932b958fecff7f52bcebe8</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২৫
পাথরের ফাঁকটার ভেতর দিয়ে নিচে নামার সময় প্রথমেই মারদেকার মনে হয়েছিল, পৃথিবী যেন হঠাৎ তার পায়ের নিচ থেকে সরে গেছে। ওপরে গিরিখাতের মুখে তখনও গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। 

মারদেকা নিচের দিকে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। অন্ধকার এত গভীর ছিল যে মনে হচ্ছিল পাহাড়ের ভেতর একটা কালো কুয়ো মুখ খুলে আছে। কিন্তু তার কান ধীরে ধীরে অন্য শব্দ ধরতে শুরু করল। কোথাও জল পড়ছে, খুব ধীরে, নিয়মিত বিরতিতে। নিচে এলিয়াসের বুট যখন কোনো ধাপে পড়ছে, তখন পাথরের ভেতর থেকে একটা ভারী প্রতিধ্বনি উঠে আসছে।

কিছুক্ষণ পর এলিয়াস থামল। “এখান থেকে সাবধানে নামো। আর মাত্র কয়েক ধাপ।”

মারদেকা পাথরের দেয়াল ধরে শরীর নামাল। তার ডান পা প্রথমে শূন্যে ঝুলে রইল, তারপর একটা শক্ত জায়গায় গিয়ে ঠেকল। সে শরীরের ভার সেখানে দিল। আরেক ধাপ। তারপর আরেকটা। হঠাৎ তার পা সমতল মাটিতে পড়ল।

একটু দূরে এলিয়াস দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ছোট্ট একটা লণ্ঠন। কখন সেটি জ্বালাল, মারদেকা বুঝতে পারেনি। হলদে আলো জ্বলে উঠতেই সে জায়গাটা দেখতে পেল। এটা কোনো সুড়ঙ্গ নয়। পাহাড়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটা পুরোনো আশ্রয়স্থল।

পাথরের স্বাভাবিক গুহাটাকে বহু বছর আগে মানুষের হাত বদলে দিয়েছে। দেয়ালের কয়েকটি জায়গা সমান করে কাটা, মেঝে থেকে বড় পাথর সরিয়ে ফেলা হয়েছে, এক পাশে শুকনো কাঠের ভাঙা তাক এখনও দেয়ালে গেঁথে আছে। অন্য পাশে একটা পাথরের চৌকির মতো উঁচু জায়গা। মেঝের এক কোণে মরচে ধরা টিনের পাত্র, আরেক পাশে ভেঙে পড়া কাঠের বাক্সের কয়েকটি অংশ। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে পাথরের গন্ধ, যা কোনো পরিত্যক্ত ঘরে ঢুকলেই বোঝা যায়।

এলিয়াস লণ্ঠনটা একটু উঁচু করে ধরল। লারসেন তখন নিচে নেমে এসেছে। তার আহত হাতের কাপড়ে শুকনো রক্ত কালো হয়ে আছে। সে চারপাশে তাকাল, কিন্তু তার চোখে বিস্ময় দেখা গেল না। সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। মারদেকা তাকে অনুসরণ করল।

এক পাশে দেয়ালের গায়ে কয়েকটি লোহার হুক এখনও বসানো আছে। সেগুলো এতটাই মরচে পড়েছে যে প্রথম দেখায় পাথরের অংশ বলেই মনে হয়। আরেক পাশে শুকনো কাঠের ভাঙা দরজার মতো কিছু ছিল, সম্ভবত কোনো ছোট কুঠুরি বা খাদ্য রাখার জায়গা। মেঝেতে ছাইয়ের পুরোনো দাগ। লারসেন হাঁটু গেড়ে বসে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “শেষবার এখানে এসেছিলাম প্রায় তেরো বছর আগে।”

মারদেকা লারসেনের দিকে তাকাল। তেরো বছর শব্দটা তার মনে কেমন যেন ধাক্কা দিল। তার জীবনের পুরো সময়টা যেন এমন এক অতীতের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যার শুরু হয়েছিল তার জন্মেরও অনেক আগে।

এলিয়াস দেয়ালের পাশে গিয়ে লণ্ঠনটা একটা পাথরের ওপর রাখল। &quot;তুমি তো তাও দল থেকে পালিয়ে বেঁচে গিয়েছিলে। কিন্তু, আমাকে দলের সাথে থেকেও শেষমেশ নিজের জীবন বাঁচাতে এদ্দিন পালিয়ে থাকতে হয়েছে।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন। “তাহলে আমরা এখানে কেন এসেছি?” বললো সে।

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না। দূরে কোথাও জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। টুপ। তারপর বিরতি। আবার টুপ।

এলিয়াস ধীরে ধীরে বলল, “কারণ তোমার বাবার সঙ্গে এই জায়গাটার সম্পর্ক ছিল।” তারপর যোগ করল, &quot;তোমরা এখানে না এলে আমার সাথে কখনোই দেখা হতো না। যদিও আমি জানতাম, একদিন লারসেন আসবেই।&quot; কথাটা সে লারসেনের দিকে ফিরে শেষ করলো। 

মারদেকা স্থির হয়ে গেল। লারসেনের মুখের দিকে তাকিয়ে সে তাকে বুঝতে চেষ্টা করল, &quot;তারমানে আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?” 

লারসেন কিছুক্ষণ উত্তর দিল না। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “চিনতাম।”

এই একটি শব্দের পর আশ্রয়স্থলটা যেন আরও নীরব হয়ে গেল। 

মারদেকা এতদিন নিজের বাবাকে নিয়ে খুব কম জানত। পাহাড়ের সেই গ্রামে তার মায়ের গোষ্ঠীর লোকেরা তাকে কখনও পুরোপুরি আপন করে নেয়নি। কেউ সরাসরি কিছু বলত না, কিন্তু সে ছোটবেলা থেকেই বুঝেছিল, তার মধ্যে এমন কিছু আছে যা অন্যদের থেকে তাকে আলাদা করে। তার গায়ের রং, মুখের গঠন, চোখের দৃষ্টি, সবকিছুই ছিল ভিন্ন। 

সে জানত তার বাবা একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষ ছিল। তাকে নিয়ে একদিন শিকারে গিয়েছিল, তারপর আর ফিরে আসেনি। সে একাই তার মায়ের কাছে ফিরেছিল। এখন লারসেন বলছে, সে বাবাকে চিনত। অথচ বছর খানেক  আগে সে নিজেই এই মানুষটাকে চিনেছে। মারদেকার গলা শুকিয়ে এল। “তিনি কেমন মানুষ ছিলেন?”

লারসেন ধীরে ধীরে পাথরের চৌকির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর দেয়ালে হাত রাখল। মনে হলো, সে কথাগুলো নিজের ভেতর থেকে টেনে বের করছে। “ভালো স্কাউট ছিল। যে জায়গায় অন্য মানুষ শুধু পাথর দেখত, সে সেখানে পথ দেখত। যেখানে কেউ পুরোনো খুরের দাগ দেখে কিছু বুঝত না, সে বলতে পারত কতক্ষণ আগে ঘোড়া গেছে, কতগুলো ঘোড়া, আর তারা তাড়াহুড়ো করছিল কি না।”

লারসেন একবার মারদেকার দিকে তাকাল। “তোমার এই ক্ষমতাগুলোর কিছু হয়তো তার কাছ থেকেই এসেছে।”

মারদেকা চুপ করে রইল। তার ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিল। এতদিন তার দক্ষতাগুলো ছিল শুধু তার নিজের। সে পাহাড়ে চলতে জানে, শব্দ শুনে মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে, মাটির দাগ থেকে পথ বুঝতে পারে, অন্ধকারে চোখের চেয়ে কানকে বেশি বিশ্বাস করতে জানে। এগুলো সে শিখেছে প্রায় পুরোটাই লারসেনের কাছ থেকে। এখন সে প্রথমবার ভাবল, তার রক্তের মধ্যেও হয়তো এই শিক্ষার বীজ লুকিয়ে ছিল। 

এলিয়াস পাথরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার বাবা শুধু শিকারি ছিল না।”

লারসেন এবার তাকে থামাল না। 

“আমরা তখন কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে কাজ করতাম। আমাদের কোনো অফিস ছিল না, কোনো পতাকা ছিল না, নিজেদের পরিচয় দেওয়ার মতো কোনো নামও ছিল না। সীমান্তের এই অংশটা তখন এমন সব মানুষের হাতে ছিল, যারা আইনকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করত। যারা টাকা দিয়ে মানুষ কিনত, অস্ত্র চালাত, মানুষকে সীমান্ত পার করাত, আবার প্রয়োজন হলে সেই মানুষকেই মরুভূমিতে ফেলে রেখে চলে যেত।”

মারদেকা স্থির চোখে শুনছিল। 

এলিয়াস আবার বলল, “সবাই অপরাধী ছিল না যারা সীমান্ত পার হতো। কেউ পালিয়ে যেত হত্যার ভয় থেকে, কেউ পরিবারকে বাঁচাতে, কেউ এমন জায়গায় পৌঁছাতে চাইত যেখানে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমরা কিছু মানুষকে নিরাপদে পথ দেখাতাম। আবার যারা এই পথ ব্যবহার করে খারাপ কাজ করত, তাদের খবরও জোগাড় করতাম।”

“আর আমার বাবা?”

“সে আমাদের সঙ্গে ছিল।” এবার লারসেন উত্তর দিল। “তবে সবসময় নয়। সে স্বাধীন মানুষ ছিল। কোনো জায়গায় বেশি দিন থাকত না। কিন্তু কঠিন পথ, বিপজ্জনক কাজ, আর এমন জায়গা যেখানে ভালো স্কাউট দরকার হতো, সেখানে তাকে পাওয়া যেত।”

মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, সে যেন নিজের বাবাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে, যদিও সেই মুখ সে মনে করতে পারে না। সে যে এতদিন কল্পনা করেছে, এবার সেটা বুঝতে পারছে। “তিনি মারা গিয়েছিলেন কীভাবে?”

প্রশ্নটা বেরিয়ে আসার পর কেউ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। লণ্ঠনের আলোয় এলিয়াসের মুখটা আরও বয়স্ক দেখাল। তার গালের কাটা দাগ, চোখের নিচের গভীর ছায়া, সবকিছু যেন হঠাৎ অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল। 

লারসেন ধীরে ধীরে পাথরের দেয়াল থেকে হাত সরিয়ে নিল। তারপর সে নিজের কোটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কালো ধাতব চাকতি দুটির একটি বের করল। ওটা লণ্ঠনের আলোয় মেলে ধরল। কালো ধাতুর ওপর বহু বছরের আঁচড়। মাঝখানে ক্ষয়ে যাওয়া একটা চিহ্ন। “এগুলো ছিল পরিচয়ের চিহ্ন।” বলল সে।

এলিয়াস ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। “আমাদের দলে সবাই এগুলো পেত না। যারা কিছু নির্দিষ্ট পথ চিনত, যাদের ওপর কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল, তাদের কাছে থাকত।”

লারসেন দ্বিতীয় চাকতিটাও বের করল। সে একটি চাকতি উল্টে দেখাল। পেছনে ক্ষীণ কিছু খোদাই আছে। সময়ের সঙ্গে অনেকটাই মুছে গেছে। “প্রত্যেকটার সঙ্গে একটা নাম আর একটা নির্দিষ্ট পথের সম্পর্ক ছিল।”

মারদেকা তাকিয়ে রইল। এতদিন ধরে এই চাকতিগুলো তার কাছে ছিল একটা রহস্য। কোথা থেকে এসেছে, কেন মানুষ এগুলোর জন্য মরতে বা মারতে প্রস্তুত, লারসেন কেন এগুলো এত সাবধানে রাখে, সে জানত না। সে ধীরে বলল, “তাহলে এগুলো কি প্রমাণ করে?”

এবার লারসেনের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল। “এটাই প্রমাণ করে যে কিছু মানুষ একসময় আমাদের সঙ্গে ছিল। যদিও পরে আমি ভুল বুঝতে পেরে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করি। কিন্তু তোমার বাবা দলের সঙ্গে ঠিকই থেকে যায়।”

আশ্রয়স্থলের ভেতর হঠাৎ ঠান্ডা আরও বেড়ে গেছে বলে মনে হলো। মারদেকা চোখ সরাল না। “আমার বাবা কি তবে খুন হয়ে ছিল?”

লারসেন এবার কোনো উত্তর দিল না। তার বদলে এলিয়াস বলল, “তোমার বাবা এমন কিছু জানতে পেরেছিল, যা তার জানা উচিত ছিল না।”

“কী?” মারদেকার কন্ঠ উচ্চকিত।

এলিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর পাথরের চৌকির ওপর বসে পড়ল। তার আহত পা একটু সামনে ছড়িয়ে দিল। সে ক্লান্ত। কিন্তু ক্লান্তির চেয়েও বেশি, যেন এতদিন ধরে বয়ে বেড়ানো একটা বোঝা নামানোর আগে মানুষ যেমন স্থির হয়ে বসে, তার মধ্যে সেই ভাব। সে বলল, “আমাদের মধ্যে একজন ছিল। সে অন্যদের চেয়ে বেশি টাকা চাইত। ক্ষমতাও চাইত। প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি। কারণ সে খুব ভালোভাবে নিজের কাজ করত।”

“তারপর?” মারদেকার গলা চাপা।

“তারপর কিছু পথ ভুল মানুষের হাতে পৌঁছে যেতে লাগল।” এলিয়াসের চোখে লণ্ঠনের আলো কাঁপল। “যে মানুষগুলোকে আমরা নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতাম, তাদের কেউ কেউ পথে আক্রমণের মুখে পড়ত। কিছু চালান অদৃশ্য হয়ে যেত। যারা বিপজ্জনক অপরাধীদের বিরুদ্ধে খবর জোগাড় করত, তাদের মধ্যে কয়েকজন আর ফিরে আসত না।”

লারসেন পাথরের মত দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। 

&quot;আমরা ভাবতাম আমাদের কেউ অনুসরণ করছে।” এলিয়াস তখনও বলে চলেছে। “পরে বুঝলাম, অনুসরণ করার দরকার ছিল না। খবর আমাদের ভেতর থেকেই বের হচ্ছিল।”

মারদেকা অনুভব করল, তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে একটা ভারী পাথর জমছে। “আমার বাবা সেটা জানতে পেরেছিলেন?”

এলিয়াস মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।” তারপর কিছুক্ষণ শুধু জল পড়ার শব্দ শোনা গেল। “তোমার বাবা একটা ভুল করেছিল।”

মারদেকা চোখ তুলল।

“সে লারসেনের মত পালিয়ে যায়নি।” এলিয়াসের কণ্ঠে অনুশোচনা ছিল। “সে দলের সাথে থেকে প্রমাণ জোগাড় করতে চেয়েছিল।”

লারসেন ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। ছোট আশ্রয়স্থলের মধ্যে তার বুটের শব্দ খুব পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল। “আমাদের কাউকে বিশ্বাস করবে কি না, সে জানত না। হয়তো ঠিকই করেছিল। কারণ বিশ্বাসঘাতক লোকটা এমন একজন ছিল, যাকে আমরা সবাই বিশ্বাস করতাম।” তাকে খুব অস্থির দেখালো, &quot; আমি ঠিকই তাকে চিনতে পেরেছিলাম। কিন্তু প্রমাণের অভাবে কিছু করতে পারছিলাম না। আমি জানতাম, দলের কেউ আমার কথা বিশ্বাস করবেনা। তাই নিজেই দল ছেড়ে পালালাম। সংগে নিয়ে গেলাম বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র।&quot;

“সেই লোকটার নাম কী?” মারদেকা প্রশ্ন করল।

এলিয়াস এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।  ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরে কোথাও একটা শব্দ হলো। তিনজনই স্থির হয়ে গেল। এটা গুলির শব্দ নয়। পাথরের ওপর বুটের শব্দও নয়। মনে হলো, ভারী কোনো জিনিস টেনে সরানো হয়েছে।

লারসেনের হাত সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলের দিকে গেল। লণ্ঠনের আলো কাঁপছে।

এলিয়াস ধীরে উঠে দাঁড়াল। “ওরা ফাঁকটা খুঁজে পেয়েছে।”

মারদেকা কিছু বলল না। সে মাথা সামান্য কাত করে শুনতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত পর তার কানেও শব্দটা এল। খুব মৃদু। তারপর আরেকটা। একাধিক মানুষের পা। তারা ওপরে দাঁড়িয়ে আছে, সম্ভবত ফাঁকটার মুখ পরীক্ষা করছে।

লারসেন লণ্ঠনের দিকে তাকাল। “এটা নিভিয়ে দাও।”

এলিয়াস এক ঝটকায় আলো নিভিয়ে দিল। আশ্রয়স্থল আবার অন্ধকারে ডুবে গেল। এবার অন্ধকারের ওপাশে মানুষ আছে। সশস্ত্র মানুষ। তারা জানে, লারসেন এখানে। আর এলিয়াস বেঁচে আছে। হয়তো তারা এটাও জানে, মারদেকাও তাদের নাগালের মধ্যে।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। অন্ধকারে মারদেকা শুধু অনুভব করছিল লারসেন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, এলিয়াস কোন দিকে। তার নিজের নিঃশ্বাস এখন অনেক ধীর। ভয়ের সময় সে আগে যেমন করত, তেমন করে চারপাশের শব্দ আলাদা করতে শুরু করল। উপরে দুজন। না, তিনজন। একজন একটু দূরে। তারপর আরেকটি শব্দ। লোহার কিছু পাথরে ঠেকল। মারদেকা নিচু গলায় বলল, “চারজন।”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর সে ফিসফিস করে বলল, “আমি তিনজন শুনেছি।”
 
“চতুর্থজন পেছনে।” মারদেকা বলল। “তার পা টেনে হাঁটার শব্দ হচ্ছে।”

তারপর ওপরে একটি কণ্ঠ শোনা গেল। শব্দগুলো স্পষ্ট নয়। পাথর আর দূরত্বের কারণে ভেঙে আসছে। কিন্তু একজন মানুষ অন্যদের নির্দেশ দিচ্ছে, সেটা বোঝা গেল।

লারসেন মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। “এখান থেকে আরেকটা পথ আছে?”

মারদেকা জানত, প্রশ্নটা এলিয়াসের জন্য। কিছুক্ষণ নীরবতা।

“আছে।” এলিয়াসের উত্তর আসতে একটু সময় লাগল। “কিন্তু, পথটা এখন আর আগের মতো নেই।”

লারসেনের কণ্ঠ কঠিন হলো। “তাহলে আমরা ওদিকেই যাব।”

এলিয়াস যেন কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেল। তারপর বলল, “আগে একটা কথা তোমাদের জানতে হবে।”

লারসেনের কণ্ঠে এবার চাপা রাগ ফিরে এল। “এলিয়াস, আমরা এখন পাথরের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। ওপরে চারজন লোক আমাদের বের হওয়ার অপেক্ষা করছে। তোমার গল্প শোনার জন্য আমার আর সময় নেই।”

এলিয়াস অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না। “এই কথাটা তোমাদের শোনা দরকার। কারণ যে লোকটা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, সে মারদেকার খুঁজে এসেছে, শুধু চাকতির জন্য নয়।”

মারদেকার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। সে স্থির হয়ে গেল। ওপরে আবার পাথর সরানোর শব্দ হলো। এইবার আরও কাছে।

লারসেন পিস্তল বের করল। অন্ধকারে তার কণ্ঠ শোনা গেল। “তার নাম বলো।”

এলিয়াস এবার আর চুপ করে রইল না। “তার নাম ভিক্টর কেইন।”

কিছুক্ষণ নীরবতা। নামটা মারদেকার কাছে অপরিচিত। 

নামটা শুনে লারসেন থমকে গেল। কেননা সে এই মানুষটকেই সন্দেহ করেছিল। তার কারণেই একদিন দল ছেড়ে ছিল। &quot;কিন্তু, কেইন তো মারা গেছে।” লারসেনের কণ্ঠ এবার বদলে গেছে।

এলিয়াস বলল, “আমরাও তাই ভেবেছিলাম।”

ওপরে আচমকা একটা গুলির শব্দ হলো। পাথরের ফাঁকের মুখে গুলি লেগে ভেতরে ধুলো ঝরে পড়ল।

মারদেকা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিচু হয়ে গেল।

এলিয়াস দ্রুত বলল, “সে মারা যায়নি। আর এত বছর পর সে জানতে পেরেছে যার বাবাকে সে মেরেছিল, এমনকি তার ছেলেটাকেও মারতে চেয়েছিলে, সেই ছেলেটা তুমি যে এখনও বেঁচে আছ।&quot; মারদেকার দিকে ফিরে কথাটা শেষ করলো।

মারদেকা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল। তার নিজের অতীত, বাবার মৃত্যু, সেই পুরোনো দলের বিশ্বাসঘাতকতা, কালো চাকতি, সবকিছু এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো রহস্য বলে মনে হচ্ছিল না। ধীরে ধীরে সেগুলো এক জায়গায় এসে মিলছে।

আর সেই জায়গার ওপাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। একজন জীবিত শত্রু। ভিক্টর কেইন। 

আর পাহাড়ের ওপরে আবার বুটের শব্দ শোনা গেল। এইবার তারা আর পথ খুঁজছে না। তারা জানে, নিচে কেউ আছে। উপরে আবার একটা পাথর গড়িয়ে পড়ল। ছোট্ট শব্দ, কিন্তু আশ্রয়স্থলের ভেতর সেটা অনেক বড় হয়ে উঠল। তারপর কারও বুটের তলায় শুকনো পাথর চূর্ণ হওয়ার শব্দ।

লারসেন খুব নিচু গলায় বলল, “পেছনের পথ দেখাও।”

এলিয়াস আর কথা বাড়াল না। সে অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে দেয়ালের একটা অংশে চাপ দিল। সেখানে ডান পাশে ছিল একটা সরু ফাটল, বহু বছরের পাহাড়ি ধসের ফলে যার মুখ অর্ধেক বন্ধ হয়ে গেছে। সে হাত দিয়ে কয়েকটা ছোট পাথর সরাল। তারপর কাঁধ ঘুরিয়ে নিজের শরীর পাশ করে ভেতরে ঢুকে গেল। “এটা পুরোনো বের হওয়ার পথ।”

লারসেন বলল, “এখনও বের হওয়া যায়?”

“হাঁটু গেড়ে গেলে যায়।”

মারদেকা প্রথমে ঢুকল। জায়গাটা এত সরু যে তাকে শরীর নিচু করে প্রায় হামাগুড়ি দিতে হলো। পাথরের সঙ্গে কাঁধ ঘষা খাচ্ছে, কোথাও কোথাও মাটির ওপর শুকনো ধুলো জমে আছে। বাতাস ভারী, কিন্তু সম্পূর্ণ বন্ধ নয়। সামনের দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছে। তার মানে পথের অন্য প্রান্ত কোথাও বাইরে গিয়ে খুলেছে।

তার পেছনে এলিয়াস, আর সবার শেষে লারসেন। কিছুদূর এগোনোর পর পথটা একটু নিচে নেমে গেছে। মারদেকা হাত বাড়িয়ে মাটি পরীক্ষা করল। শুকনো। কোথাও নতুন পায়ের দাগ নেই। এই পথ দিয়ে বহু বছর কেউ চলেনি।

তারপর হঠাৎ পেছনে গুলির শব্দ হলো। একটা গুলি আশ্রয়স্থলের পাথরে আঘাত করে প্রতিধ্বনি তুলল। তারপর আরেকটা।

লারসেন দাঁত চেপে বলল, “ওরা ঢুকে পড়েছে।”

মারদেকা আর সময় নষ্ট করল না। সে সামনে এগিয়ে গেল। পাথরের সরু পথটা প্রায় পনেরো গজ যাওয়ার পর হঠাৎ শেষ হয়ে গেল একটা নিচু মুখে। পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে নিচের দিকে। বাইরে রাত। আকাশ এখানে অনেকটা খোলা। মেঘ সরে গিয়ে কয়েকটি তারা বেরিয়েছে। 

মারদেকা বাইরে এসে দাঁড়াল না। সে প্রথমেই মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল। কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল। শুকনো ধুলো, কয়েকটি ছোট পাথর, একটা ভাঙা ঝোপের ডাল। একটু দূরে খুরের দাগ। পুরোনো নয়। সে ধীরে মাথা তুলল। “এই পথে ঘোড়া গেছে।”

লারসেন বেরিয়ে এসে তার পাশে বসল। “কতক্ষণ আগে?”

“খুব বেশি নয়।” মারদেকা নিচু গলায় বলল।

“তিনটা ঘোড়া। হয়তো চারটা। কিন্তু দাগ পরিষ্কার নেই।”

এলিয়াস বেরিয়ে এসে তাদের পেছনে দাঁড়াল। তার আহত পা এবার তাকে কষ্ট দিচ্ছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে। সে কয়েক মুহূর্ত চারপাশে তাকিয়ে রইল। “ওরা নিচের পথটাও নজরে রেখেছে।”

লারসেন তাকাল। “তুমি নিশ্চিত?”

“কেইন হলে নিশ্চিত।”

ভিক্টর কেইনের নামটা আবার শুনে মারদেকা লারসেনের দিকে তাকাল। লারসেনের মুখ অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।

তারা ঢাল বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল। জায়গাটা বিপজ্জনক নয়, কিন্তু পাথর আলগা। সামান্য ভুলে নিচে গড়িয়ে পড়া সম্ভব। মারদেকা সামনে, কারণ সে এখন পথ পরীক্ষা করছে। লারসেন তাকে পেছনে যেতে বলেনি। হয়তো এই প্রথমবার সে নিজেই বুঝতে পারছে, এই পাহাড়ে মারদেকার চোখ আর কান তাদের কাজে লাগছে।

নিচে নামার সময় মারদেকার মনে আবার বাবার কথা এল। কিন্তু এবার কোনো ভাঙা দৃশ্য নয়, কোনো কণ্ঠস্বর নয়। সে শুধু জানে, তার বাবা এই পাহাড়ে চলেছে, হয়তো এই পথের আশেপাশে, বহু বছর আগে। তার বাবা মানুষকে পথ দেখাত। আর সেই মানুষটাই কোনো এক রাতে বিশ্বাসঘাতকের কারণে মারা গেছে।

একটা সময় এলিয়াস বলল, “তোমার বাবার নাম ছিল ড্যানিয়েল রিড।”

মারদেকা থেমে গেল। সে ঘুরে তাকাল। “লারসেনও জানত?”

লারসেন এবার নিজেই উত্তর দিল। “জানতাম।”

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার মধ্যে রাগ হওয়া উচিত ছিল। এতদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য দুজন মানুষ জানত, অথচ তাদের একজন সারাক্ষণ তার পাশে থাকলেও বলেনি। কিন্তু সে একই সঙ্গে এটাও বুঝতে পারছিল, লারসেন নিজেও সবকিছু জানত না। তার মুখে যে অনুশোচনা আছে, সেটা অভিনয় নয়।

“তোমরা আমাকে বলোনি কেন?”

কয়েক মুহূর্ত পর লারসেন বলল, “কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না তুমি কে।”

মারদেকার চোখ সরু হয়ে এল। “কেন?”

”তোমাকে আমার র‌্যাঞ্চে নিয়ে যাবার পর খোঁজ-খবর করে তোমার অতীত সম্পর্কে জানলাম “  লারসেন  কিছুক্ষণ থামল। “আমি সন্দেহ করতাম তুমিই সেই ছেলে। তবে প্রমাণ ছিল না।”

এলিয়াস বলল, “প্রমাণটা আমি অনেক পরে পেয়েছি।”

এলিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর সে কোটের পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে সেই পুরোনো চামড়ার থলেটা বের করল। এবার সে থলেটা লুকিয়ে রাখল না। ধীরে ধীরে মুখ খুলল। ভেতর থেকে একটা কালচে ধাতব বস্তু বেরিয়ে এল।

এটা চাকতি নয়। আবার পুরোপুরি অন্য কিছুও নয়। ছোট, ভাঙা, অসম্পূর্ণ একটি ধাতব অংশ। এলিয়াস সেটাকে হাতের ওপর রেখে বলল, “এগুলো একসময় তোমার বাবার সঙ্গে ছিল।”

মারদেকার বুকের ভেতর যেন কেউ শক্ত করে আঘাত করল। মারদেকা ধীরে বুকের কাছে হাত নিয়ে গেল। এইবার আর লুকিয়ে রাখার কোনো অর্থ নেই বুঝে মারদেকা জামার ভেতর থেকে ধাতব টুকরোটা বের করল। এতদিন ধরে সে এটাকে নিজের জীবনের স্বাভাবিক অংশ বলে জেনে এসেছে। ছোটবেলায় কার কাছ থেকে পেয়েছিল, সে জানে না। তার গ্রামের মানুষও এ বিষয়ে তাকে কখনও স্পষ্ট কিছু বলেনি। কেউ বলেছিল এটা তার মায়ের জিনিস। কেউ বলেছিল তার বাবার কাছ থেকে এসেছে। কেউ আবার বলেছিল, তাকে যে রাতে পাওয়া গিয়েছিল, তার গলায় তখনই এটা ছিল।

আজ প্রথমবার টুকরোটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, হয়তো তার জীবন সম্পর্কে কেউই পুরো সত্য জানত না। 

এলিয়াস বলল, “তোমার বাবার কোট থেকে পড়ে গিয়েছিল।”

“তুমি পেয়েছিলে কোথায়?”

“যেখানে তাকে শেষবার দেখেছিলাম।”

এইবার চারপাশের পাহাড় যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মারদেকা ধীরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি দেখেছিলে তাকে মরতে?”

এলিয়াসের উত্তর আসতে সময় লাগল। “পুরোটা না।” তার কণ্ঠ বদলে গেছে। “আমি দূরে ছিলাম। আমরা তখন আলাদা পথে চলছিলাম। আগুনের আলো দেখেছিলাম। গুলির শব্দ শুনেছিলাম। তারপর ঘোড়ার ছুটে যাওয়ার শব্দ।” সে চোখ বন্ধ করল না, কিন্তু তার দৃষ্টি যেন বহু বছর পেছনে চলে গেল। “আমি কাছে পৌঁছানোর আগেই সব শেষ।”

মারদেকার ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। “আর আমি?”

“তোমাকে দেখেছিলাম।” এইবার এলিয়াসের কথায় কোনো দ্বিধা ছিল না। “তুমি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে দৌড়াচ্ছিলে। তোমার পেছনে আগুন ছিল, ধোঁয়া ওড়ছিল। তুমি বারবার পড়ে যাচ্ছিলে, আবার উঠছিলে।”

মারদেকা স্থির হয়ে রইল। তার বুকের ভেতর কোথাও একটা পুরোনো অনুভূতি নড়ে উঠল, কিন্তু এবার সেটা কোনো অস্পষ্ট স্মৃতি নয়। একটা বাস্তব ছবির সঙ্গে বাস্তব কথার মিল। সে হয়তো আগুন দেখেছিল। গুলির শব্দ শুনেছিল। কেউ তাকে বলেছিল দৌড়াতে। আর সে দৌড়েছিল।

এলিয়াস বলল, “আমি তোমাকে ডাকিনি।”

মারদেকা তাকাল। “কেন?”

এলিয়াসের কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল। “কারণ তোমার পেছনে লোক ছিল। আমি যদি তোমাকে ডাকতাম, তারা আমাকে দেখত। আর তোমাকেও।”

মারদেকা আবার হাঁটা শুরু করল। তার হাতে এখনও সেই কালচে ধাতব বস্তু । সে সেটাকে শক্ত করে ধরে আছে। এতদিন তার অতীত ছিল কুয়াশার মতো। এখন কুয়াশা পুরোপুরি সরে যায়নি, কিন্তু তার মধ্যে একটা পথ দেখা যাচ্ছে।

ড্যানিয়েল রিড। তার বাবা। তারপর সেই রাত। তারপর আগুন। তারপর একটি শব্দ। দৌড়াও।

তারা যখন শুকনো জলধারার কাছে পৌঁছাল, তখন পূর্ব দিগন্তের অন্ধকার সামান্য ফিকে হতে শুরু করেছে। রাত শেষ হতে এখনও সময় আছে, কিন্তু পাহাড়ের ওপর আকাশের রং বদলানোর প্রথম লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। 

মারদেকা হঠাৎ থেমে গেল। সে হাত তুলে দুজনকে থামতে বলল। তারপর নিচু হয়ে বসে পড়ল। কিছুদূরে একটা পাথরের পাশে মাটি একটু নরম। সেখানে বুটের দাগ। চারজনের। একজনের বুটের গোড়ালির অংশ ভাঙা। সেই দাগের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “ওরা এখান দিয়ে গেছে।”

এলিয়াস ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। “কোন দিকে?”

মারদেকা ডান দিকের ঢালের দিকে তাকাল। “আমাদের সামনে।”

লারসেন চারপাশে তাকাল। এটা খোলা জায়গা। বাঁ পাশে জলধারা, ডান দিকে পাথরের ঢাল, সামনে কিছু শুকনো গাছ। 

হঠাৎ দূরে একটা কণ্ঠ ভেসে এল। “লারসেন!”

তিনজনই স্থির। কণ্ঠটা খুব জোরে বলা হয়নি। কিন্তু পাহাড়ের খোলা জায়গায় স্পষ্ট শোনা গেল।

লারসেনের মুখের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। “ভিক্টর।”  সে খুব নিচু স্বরে বলল।

দূর থেকে একটা হাসির শব্দ এল। তারপর সেই একই কণ্ঠ আবার শোনা গেল। “তুমি আমাকে এখনও চিনতে পারো, এটা জেনে ভালো লাগছে।”

মারদেকা পাথরের আড়ালে সরে গেল। লারসেন তার বিপরীত পাশে। এলিয়াস নিচু হয়ে জলধারার কিনারায় বসে পড়েছে। কণ্ঠটা কোথা থেকে আসছে, বোঝা কঠিন। পাহাড়ে শব্দ ঘুরে যায়।

লারসেন বলল, “তুমি তো মৃত ছিলে।”

দূর থেকে উত্তর এল। “মৃত মানুষকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই সুবিধাটা আমার কাজে লেগেছে।” তারপর নীরবতা। কিছুক্ষণ পর আবার শোনা গেল। “তোমার সঙ্গে একটা পুরোনো হিসেব আছে, লারসেন। কিন্তু আজ আমি তোমার জন্য আসিনি।”

লারসেনের হাত পিস্তলের ওপর। “আমি জানি।”

দূরে আবার সেই হাসি। “ছেলেটা কোথায়?”

মারদেকার শরীরের ভেতর ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। কিন্তু সে নড়ল না।

এলিয়াস উত্তর দিল না। ভিক্টরের কণ্ঠ আবার এল। “আমি তাকে একবার দেখতে চাই।”

লারসেনের উত্তর এবার পরিষ্কার। “তোমার চোখ দিয়ে নয়।” 

তারপরই গুলিটা এলো। মারদেকা শুধু দেখল, তার মাথার ওপরের পাথরের একটা অংশ ভেঙে ধুলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা গুলি করল। তারপর চারদিক থেকে বন্দুকের শব্দ শুরু হলো।

মারদেকা পাথরের আড়ালে শরীর চেপে রাখল। যদিও এই মুহুর্তে তার কিছুই করার নেই। তার কোমরে ছুরি। চোখ আর কানই এখন তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

একটা গুলি বাম দিক থেকে এসেছে। আরেকটা সামনে থেকে। মারদেকা চোখ বন্ধ না করেও হিসেব করতে লাগল। হঠাৎ সে লারসেনের দিকে ঝুঁকে বলল, “ডান দিকে একজন।”

লারসেন তাকাল। আরেকটা গুলি হলো। মারদেকা বলল, “অন্যজন নিচ দিয়ে ঘুরছে।”

লারসেন আর প্রশ্ন করল না। সে সঙ্গে সঙ্গে এলিয়াসের দিকে তাকাল। &quot;ওদিকে যাও।”

এলিয়াস আহত পা নিয়ে নিচু হয়ে এগোল। 

মারদেকা পাথরের আড়াল বদলাল। কয়েক মুহূর্ত আগে যে লোকটা নিচ দিয়ে ঘুরছিল, তার চলার শব্দ এবার স্পষ্ট। সে খুব সাবধানে এগোচ্ছে। 

মারদেকা তাকে দেখতে পেল না। কিন্তু শুনতে পেল। একবার পাথর। তারপর বুট। তারপর কাপড়ের সঙ্গে ধাতব কিছুর ঠোকাঠুকি। সে নিচু হয়ে অপেক্ষা করল।

লোকটা আরেকটু কাছে আসতেই মারদেকা পাথরের ওপর থেকে একটা ছোট পাথর তুলে বিপরীত দিকে ছুড়ে দিল। পাথরটা গিয়ে লাগল শুকনো ঝোপে। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে সেই দিকে ঘুরল।

ঠিক তখন মারদেকা অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে এল। তার হাতে ছুরি। সে লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল না। লারসেন তাকে শিখিয়েছে, লড়াইয়ে শক্তি নষ্ট করা বোকামি। সে লোকটার পেছনে গিয়ে তার হাঁটুর পেছনে লাথি মারল। লোকটা নিচু হয়ে গেল। মারদেকা তার কাঁধে ধাক্কা দিল।

লোকটা পড়ে যাওয়ার আগেই হাত ঘুরিয়ে তাকে ধরতে চাইল। কিন্তু মারদেকা তার নাগালের বাইরে সরে গেল। তারপর ছুরির হাতল দিয়ে লোকটার কানের নিচে আঘাত করল। লোকটা মাটিতে পড়ে গেল।

তার রাইফেল একপাশে। মারদেকা সেটি তুলে নিল না। সে জানত না কীভাবে অস্ত্রটা ব্যবহার করতে হয়, তা নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে তার হাতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জিনিস তার ছুরি।

দূরে আবার গুলি হলো। লারসেন পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে পাল্টা গুলি করল, তারপর সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরের পাথরে রাইফেলের গুলি লেগে ধুলো উড়িয়ে দিল।

মারদেকা বুঝতে পারল, ভিক্টর কেইন নিজে এখনও গুলি চালায়নি, অথবা সে এমন জায়গায় আছে যেখান থেকে অন্যদের নির্দেশ দিচ্ছে। 

হঠাৎ এলিয়াস একটা গুলির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠল। সে মাটিতে পড়ে গেল। 

মারদেকা উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল। লারসেন তাকে ধরে টেনে নিচে বসিয়ে দিল।

এলিয়াস নড়ছে। সে মৃত নয়। কিন্তু তার কাঁধের কাছে রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে।

লারসেন দাঁত চেপে বলল, “ওকে এখান থেকে বের করতে হবে।”

মারদেকা চারপাশে তাকাল। সামনে খোলা জায়গা। পেছনে পাথর। বাঁ দিকে শুকনো জলধারা আরও নিচে নেমে গেছে। সে হাত তুলে দেখাল। জলধারার পাথরের নিচে একটা সরু অংশ। বর্ষার পানিতে কেটে তৈরি হওয়া গর্তের মতো জায়গা। মানুষ নিচু হয়ে যেতে পারবে। বাইরে থেকে সহজে দেখা যাবে না। “ওটা দিয়ে গেলে আমরা পেছনের ঢালে উঠতে পারব।”

লারসেন এক মুহূর্ত মারদেকার চোখের দিকে তাকাল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “এগিয়ে যাও।”

মারদেকা নিচু হয়ে জলধারার দিকে দৌড় দিল। তার পেছনে লারসেন। লারসেন একবার পেছনে গুলি করে শত্রুদের মাথা নিচু রাখতে বাধ্য করল। তারপর এলিয়াসের কাছে পৌঁছে তাকে কাঁধে তুলতে চেষ্টা করল।

মারদেকা এসে এলিয়াসের অন্য হাত নিজের কাঁধে নিল। তার শরীর ছোট, কিন্তু সে ভারসাম্য ধরে হাঁটতে জানে। তিনজন নিচের সরু জায়গা ধরে এগিয়ে গেল।
 
তাদের মাথার ওপর দিয়ে আবার গুলি গেল। তারপর আরও কয়েকটি।

মারদেকা সামনে এগিয়ে পথ দেখাচ্ছে। কোথাও পাথর উঁচু, কোথাও পানি জমে আছে। এলিয়াসের রক্ত মাটিতে পড়ছে, কিন্তু খুব বেশি নয়। তার কাঁধে গুলি লেগেছে, ভেতরে ঢুকেছে কি না বোঝা যাচ্ছে না।

কিছুদূর যাওয়ার পর গুলির শব্দ কমে এল। তারা পেছনের ঢালে উঠে পড়েছে। সেখান থেকে অনেক দূরে, পূর্ব আকাশে প্রথম আলো দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের চূড়াগুলো কালো থেকে ধূসর হয়ে উঠছে। রাতের শেষ প্রহর। কিন্তু তাদের পেছনে এখনও শত্রু আছে।

লারসেন এলিয়াসকে একটা পাথরের পাশে বসাল। নিজের কোট ছিঁড়ে তার ক্ষত শক্ত করে বেঁধে দিল।

মারদেকা একটু দূরে দাঁড়িয়ে চারপাশ শুনছিল। এই সময় এলিয়াস তার দিকে তাকাল। “এখন তোমার সবটা জানা দরকার।”

লারসেন হাতের কাজ থামাল না। মারদেকা এগিয়ে এল।

এলিয়াস ধীরে বলল, “ড্যানিয়েল রিড জানত ভিক্টর কেইন বিশ্বাসঘাতক। সে শুধু পথ বিক্রি করেনি। যারা আমাদের সাহায্য চাইত, তাদের তথ্যও বিক্রি করত। কয়েকজন মানুষ মারা যায় তার কারণে।”

তারপর সে কষ্ট করে শ্বাস নিল। “ড্যানিয়েল প্রমাণ জোগাড় করেছিল। এই চাকতিগুলোর সঙ্গে সেই প্রমাণের সম্পর্ক ছিল। কিছু পথ, কিছু নাম, আর এমন কিছু লোকের পরিচয়, যাদের কেইন তার নিজের লোক বলে ব্যবহার করত।”

লারসেন এবার কথা বলল। “ড্যানিয়েল আমাকে সব জানাতে পারেনি। কারণ তার আগেই কেইন খবর পেয়ে যায়। আমি তাকে সাবধান করেছিলাম। কিন্তু সে শুনেনি। তারপর আমি নিজের পথ বেছে নিলাম।&quot;

এলিয়াস বলল। “অনেক বছর পর সেই রাতে আগুন জ্বলে উঠে। তোমার বাবা মারা যায়। আর তুমি পালিয়ে যাও।” সে নিচের দিকে তাকাল। “আমি এতদিন ভেবেছিলাম তুমি মারা গেছ। এখন কেইন জানে তুমি বেঁচে আছ।” তার চোখে ক্লান্তির সঙ্গে একটা অদ্ভুত কঠোরতা দেখা গেল। 

দূর থেকে ঘোড়ার শব্দ ভেসে এল। তিনজনই মাথা তুলল। ঘোড়াগুলো দূরে। সম্ভবত শত্রুরা নিচের পথে ঘুরে গেছে। পাহাড় থেকে বের হওয়ার আরও একটা রাস্তা আছে, এবং তারা জানে লারসেনরা কোন দিকে যেতে পারে।

লারসেন উঠে দাঁড়াল। তার নিজের হাতের ক্ষত আবার খুলে রক্ত বেরিয়েছে, কিন্তু সে সেদিকে তাকাল না। “আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে।”

মারদেকা বলল, “ওরা আমাদের পেছনে আসবে।”

লারসেন উত্তর দিল। “আর আমরা পাহাড় থেকে বের হব।”

এলিয়াস ধীরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। মারদেকা তাকে সাহায্য করল।

তারা যখন আবার চলতে শুরু করল, তখন পাহাড়ের ওপর সূর্যের প্রথম আলো পড়েছে। রাতের অন্ধকারে যে জায়গাগুলো এতক্ষণ শুধু ছায়া ছিল, এখন সেগুলো পাথর, গাছ আর খাদের বাস্তব রূপ নিয়ে সামনে দেখা যাচ্ছে। 

পাহাড়ের শেষ ঢালে পৌঁছে মারদেকা একবার পেছনে তাকাল। দূরের উঁচু পাথরের ওপর কয়েকটি ঘোড়সওয়ারের অবয়ব দেখা গেল। তারা এত দূরে যে মুখ চেনা যায় না। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন অন্যদের থেকে সামান্য সামনে। সে স্থির হয়ে বসে আছে। 

মারদেকা জানত না, সে ভিক্টর কেইন কি না। কিন্তু তার মনে হলো, সেই মানুষটাও নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। তার দিকে।

লারসেন মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। “চলো।”

মারদেকা আর পেছনে তাকাল না। সে সামনে হাঁটা শুরু করল। পাহাড়ের পথ এবার নিচের দিকে নেমে গেছে। অনেক দূরে, সেই পাহাড়ের পেছনে অপেক্ষা করছে খোলা প্রান্তর, রাস্তা, ঘোড়া, আর লারসেনের র‌্যাঞ্চ।

কিন্তু এখন সে জানে, র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরে যাওয়া মানে নিরাপদ জায়গায় ফিরে যাওয়া নয়। শত্রু তাদের পথ চিনে ফেলেছে। 

ভিক্টর কেইন বেঁচে আছে। সে জানে ড্যানিয়েল রিডের ছেলে বেঁচে আছে।

প্রায় ছয় বছর আগে যে সাত বছরের ছেলেটি আগুন আর গুলির শব্দের মধ্যে পাহাড়ের অন্ধকার পথে দৌড়ে পালিয়েছিল, সে আজ আবার সেই পাহাড় ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এবার সে পালাচ্ছে না। এবার সে জানে, কে তার শত্রু।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/269051/</link>
				<pubDate>Thu, 03 Sep 2026 03:45:36 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২৫<br />
পাথরের ফাঁকটার ভেতর দিয়ে নিচে নামার সময় প্রথমেই মারদেকার মনে হয়েছিল, পৃথিবী যেন হঠাৎ তার পায়ের নিচ থেকে সরে গেছে। ওপরে গিরিখাতের মুখে তখনও গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। </p>
<p>মারদেকা নিচের দিকে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। অন্ধকার এত গভীর ছিল যে মনে হচ্ছিল পাহাড়ের ভেতর একটা কালো কুয়ো মুখ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-269051"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/269051/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>7</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">d8a9ea315d31485fd6d84864aecbdf57</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২৪
পাহাড়ের অন্ধকারে তিনটি ছায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। সামনে এলিয়াস, তার কয়েক গজ পেছনে লারসেন, আর তাদের মাঝামাঝি মারদেকা। গিরিখাতের সরু পথটা কখনও এত নিচে নেমে যাচ্ছে যে হাঁটতে গেলে মাথার ওপর পাথরের ছাদ মনে হচ্ছে, আবার কোথাও হঠাৎ প্রশস্ত হয়ে দুপাশের দেয়াল একটু দূরে সরে যাচ্ছে। আকাশের সরু ফালি দিয়ে মাঝে মাঝে কয়েকটা তারা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তাদের আলো মাটিতে পৌঁছাচ্ছে না। পাহাড়ের বুকের এই অংশটায় রাত যেন অন্য সব জায়গার চেয়ে আগে নেমে আসে।

কিছুদূর যাওয়ার পর গিরিখাতের মাটি বদলে গেল। পাথরের বদলে নরম ধুলো, তার ওপর ছড়িয়ে থাকা শুকনো পাতা আর ঘোড়ার পুরোনো খুরের দাগ। কোথাও কোথাও মাটির মধ্যে ছোট ছোট গর্ত, যেন বহুদিন ধরে এখানে ঘোড়া থামিয়ে রাখা হয়েছে। লারসেন হাঁটতে হাঁটতে প্রতিটি দাগ লক্ষ করছিল। তার চোখ সামনে থাকলেও মন যেন পেছনে পড়ে থাকা পথটাকে হিসেব করছিল। যারা তাদের ওপর গুলি চালিয়েছিল, তারা এখনও পাহাড়ের কোথাও আছে। তাদের মধ্যে অন্তত একজন ভালো রাইফেলধারী। আর সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, তারা লারসেনের চলার পথ জানে।

এলিয়াস যেন এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়। সে অন্ধকারের মধ্যে এমন নিশ্চিন্তভাবে হাঁটছিল, যেন এই গিরিখাত তার নিজের বাড়ির উঠোন। মাঝে মাঝে সে নিচু হয়ে কোনো পাথর সরিয়ে দিচ্ছিল, কখনও কোনো ঝোপের ডাল হাতে চেপে ধরে তিনজনকে পার হয়ে যেতে দিচ্ছিল। তার চলার মধ্যে এমন একটা অভ্যাস ছিল, যা লারসেনের বহু পুরোনো স্মৃতিকে নাড়া দিচ্ছিল। একসময় এই মানুষটার সঙ্গে সে পাহাড় পেরিয়েছে, মরুভূমি পার হয়েছে, রাতের অন্ধকারে শত্রুর শিবিরের পাশ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে গেছে। তখন এলিয়াসের বয়স কম ছিল, শরীরে ছিল শক্তি, চোখে ছিল আগুন। এখন সেই আগুন নিভে যায়নি, শুধু তার ওপর বহু বছরের ছাই জমেছে।

মারদেকা চুপচাপ হাঁটছিল। তার মাথায় একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরছিল। এলিয়াস কে, কেন লারসেন তাকে মৃত ভেবেছিল, কীভাবে সে মারদেকার স্বপ্নের কথা জানে, আর তার জন্মের আগের এমন কী ঘটনা ঘটেছিল যার সঙ্গে এই মানুষটির সম্পর্ক আছে? সবচেয়ে বেশি তাকে অস্থির করে তুলেছিল সেই একটি কথা, জন্মের আগেই নাকি তার জন্য একটা পথ ঠিক হয়ে গিয়েছিল।

সে নিজের জীবন নিয়ে কখনও খুব বেশি প্রশ্ন করেনি। পাহাড়ের ছোট্ট গ্রাম থেকে বেরিয়ে আসার পর তার কাছে পৃথিবীটা ছিল সহজ। বেঁচে থাকতে হলে শিখতে হবে, শত্রুকে চিনতে হবে, নিজের পা কোথায় ফেলতে হবে সেটা বুঝতে হবে, কখন ছুরি বের করতে হয় আর কখন অস্ত্র না তুলেই বিপদ এড়িয়ে যেতে হয় সেটা জানতে হবে। লারসেন তাকে এসব শিখিয়েছে। তার কাছে লারসেন ছিল শিক্ষক, আশ্রয়দাতা, কখনও কখনও কঠোর পিতা, আবার কখনও এমন একজন মানুষ যার পাশে দাঁড়ালে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপদকেও সামান্য ছোট মনে হয়।

কিন্তু আজ প্রথমবার মারদেকার মনে হলো, লারসেন নিজেও তার কাছে পুরো সত্যি নয়।

এলিয়াস হঠাৎ থামল।

লারসেনও থেমে গেল। মারদেকা পেছন থেকে এসে দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনে অন্ধকারে একটা নিচু পাথরের দেয়াল। তার ওপারে গিরিখাত আরও গভীর হয়ে গেছে। এলিয়াস হাত তুলে চুপ থাকতে বলল। তারপর মাথা সামান্য কাত করল।

কয়েক মুহূর্ত কিছুই শোনা গেল না। তারপর অনেক দূর থেকে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ ভেসে এল। ঘোড়ার খুর পাথরে লাগার শব্দ।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের অন্ধকার পরীক্ষা করল। শব্দটা খুব দূরে নয়। পাহাড়ের বাঁক শব্দকে ঘুরিয়ে আনছে, তাই দিক নির্ণয় করা কঠিন। কিন্তু একজন অভিজ্ঞ মানুষ বুঝতে পারে, একা ঘোড়া হলে শব্দের মধ্যে একটা ছন্দ থাকে। এখানে সেই ছন্দ নেই। মনে হচ্ছে একাধিক ঘোড়া ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।

এলিয়াস নিচু গলায় বলল, “ওরা গিরিখাতে ঢুকেছে।”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “কতজন?”

“জানি না।”

“তুমি জানো না?”

এলিয়াস এবার সামান্য হাসল। “জানা আর শোনা এক জিনিস নয়।”

লারসেন আর কিছু বলল না। সে চারপাশে তাকিয়ে একটা পাথরের আড়াল বেছে নিল। তারপর মারদেকার কাঁধে হাত রেখে তাকে নিচু করে বসিয়ে দিল। এলিয়াসও অন্য পাশে সরে গেল। তিনজনের মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু অন্ধকারে তাদের কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না।

কিছুক্ষণ পর ঘোড়ার শব্দ আরও স্পষ্ট হলো। এবার মানুষের কণ্ঠও শোনা গেল। খুব নিচু স্বরে কেউ কথা বলছে। শব্দগুলো বোঝা গেল না, শুধু কখনও একটা শব্দ, কখনও আরেকটা শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে। তারপর ঘোড়ার লাগাম টানার শব্দ।

মারদেকা পাথরের আড়ালে বসে চোখ বন্ধ না করেই শুনছিল। সে এখন বুঝতে পারছে, লারসেন তাকে যে শিক্ষা দিয়েছে তার আসল অর্থ কী। অন্ধকারে চোখের চেয়ে কান অনেক বেশি সত্যি কথা বলে। দূরের শব্দের ভেতর দিয়ে সে ঘোড়ার সংখ্যা আন্দাজ করার চেষ্টা করল। তিনটি? না, চারটি। একটা ঘোড়া অন্যগুলোর চেয়ে ধীর। তার খুরের শব্দে ভারী ধাতব কিছু ঠোকাঠুকি করছে।

মারদেকা খুব আস্তে লারসেনের দিকে ঝুঁকল। “চারজন।”

লারসেন তার দিকে তাকাল না। শুধু সামান্য মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সেও একই হিসেব করেছে।

এলিয়াসের কোনো শব্দ নেই। ঘোড়াগুলো এবার আরও কাছে এল। তারপর হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। এই নীরবতাটা আগের নীরবতার মতো নয়। এবার যেন কেউ ইচ্ছা করে সবকিছু থামিয়ে দিয়েছে।

লারসেনের আঙুল ধীরে পিস্তলের বাঁটে চলে গেল।

কয়েক মুহূর্ত পর অন্ধকারে একটা ছোট পাথর গড়িয়ে এল। তারপর আরেকটা। কেউ হাঁটছে। মানুষ ঘোড়া থেকে নেমে পায়ে হেঁটে এগোচ্ছে।

মারদেকা পাথরের ফাঁক দিয়ে তাকাল। প্রথমে কিছুই দেখা গেল না। তারপর অন্ধকারের মধ্যে একটা কালো অবয়ব নড়ল। একজন মানুষ দেয়ালের পাশ দিয়ে এগিয়ে আসছে। তার হাতে রাইফেল। মাথায় টুপি। পেছনে আরও দুইজন। চতুর্থজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

মারদেকা লোকগুলোর মুখ দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু তাদের হাঁটার ধরন, অস্ত্র ধরার ভঙ্গি, শরীরের ভারসাম্য, সবকিছু সে লক্ষ্য করল। প্রথম লোকটা অভিজ্ঞ। দ্বিতীয়জনের চলনে অস্থিরতা আছে। তৃতীয়জন বারবার পেছনে তাকাচ্ছে। চতুর্থজন পাহারা দিচ্ছে।

তারা কাকে খুঁজছে, সেটা নিয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই। লারসেনকে। কিন্তু মারদেকার মনে হলো, তাদের আসল লক্ষ্য হয়তো শুধু লারসেন নয়। তার নিজের বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ঠান্ডা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। 

হঠাৎ প্রথম লোকটা থেমে গেল। সে মাথা তুলে চারপাশে তাকাল। তারপর মাটির দিকে ঝুঁকল। কিছু একটা দেখেছে।

লারসেন মারদেকার দিকে তাকাল। তার চোখে সতর্ক সংকেত। মারদেকা নিঃশব্দে নিজের শরীর আরও নিচু করে ফেলল।

লোকটা এবার মাটির ওপর হাত রাখল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে পেছনের লোকদের কিছু বলল। শব্দটা পরিষ্কার শোনা গেল না, কিন্তু তার হাতের ইশারা দেখে বোঝা গেল, তারা তিনদিকে ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে।

এটাই ছিল সুযোগ। লারসেন খুব ধীরে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। তার চলার শব্দ এত কম যে মারদেকা প্রায় দেখতে পেল না কখন সে সামনে চলে গেছে। এলিয়াসও একই সময়ে অন্যদিকে সরে গেল।

মারদেকা একা পড়ে রইল। তার হাতে ছুরি। সামনে অন্ধকার। পেছনে পাথর। সে বুঝতে পারল, এবার তাকে নিজের মতো করে কাজ করতে হবে। একজন লোক তার দিকেই এগিয়ে আসছে।

মারদেকা নিঃশ্বাস ধীরে করল। পায়ের নিচে একটা শুকনো পাতা। সে জানে, সেখানে পা রাখলে শব্দ হবে। তার বাঁ পাশে একটা পাথরের ফাঁক। ফাঁকটা সরু, কিন্তু তার শরীরের জন্য যথেষ্ট। সে ধীরে ধীরে সেখানে সরে গেল।

লোকটা আরও কাছে এল। তার বুটের শব্দ এখন স্পষ্ট। মারদেকা তার শ্বাসের শব্দও শুনতে পেল।
 
আর ঠিক তখনই দূরে একটা গুলির শব্দ হলো। লোকটা মুহূর্তের জন্য ঘুরে তাকাল। 
মারদেকা সেই মুহূর্তটাই ব্যবহার করল।

সে পাথরের ফাঁক থেকে বেরিয়ে এসে লোকটার হাঁটুর পেছনে লাথি মারল। লোকটা ভারসাম্য হারিয়ে নিচু হয়ে পড়তেই মারদেকা তার রাইফেলের নল ধরে একদিকে টেনে নিল। লোকটা শক্তিশালী। সে সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটাকে ঝাঁকিয়ে সরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু মারদেকা তার শরীরের ভার নিচে নামিয়ে দিল, ঠিক যেমন লারসেন তাকে শিখিয়েছে। শক্তির সঙ্গে শক্তি দিয়ে লড়াই না করে ভারসাম্য নষ্ট করতে হবে।

লোকটা মাটিতে পড়ে গেল। মারদেকা তার রাইফেল কাড়তে গেল না। সে জানে, সময় নেই। লোকটার কনুইয়ের কাছে ছুরি ঠেকিয়ে এক মুহূর্ত থামল। তারপর লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে মারদেকার বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল। 

লোকটা তাকে দেখে ভয় পায়নি। বরং অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “তুইই সেই ছেলে।”

মারদেকার হাত শক্ত হয়ে গেল।

লোকটা আর কিছু বলার আগেই দূরে আরেকটা গুলির শব্দ হলো। এবার গুলির পর একজন মানুষের চিৎকার শোনা গেল।

মারদেকা লোকটার ওপর থেকে সরে দাঁড়াল। অন্ধকারের মধ্যে সে লারসেনের কণ্ঠ শুনতে পেল না। এলিয়াসের কণ্ঠও নয়।

শুধু পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসা একটা অদ্ভুত শব্দ, যেন কোথাও ধাতব কোনো বস্তু পাথরের সঙ্গে ঠেকে উঠেছে। টিং।

মারদেকা স্থির হয়ে গেল। একই সংকেত। গিরিখাতের গভীরে যে সংকেত তারা শুনেছিল, আবার সেটাই। কিন্তু এবার শব্দটা এসেছে তার একেবারে কাছ থেকে।

সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। পেছনের অন্ধকারে কেউ নেই। তবু সে জানল, কেউ একজন তাকে দেখছে। আর সেই মুহূর্তেই তার মনে হলো, এই পাহাড়ের রহস্য শুধু লারসেন আর এলিয়াসের অতীত নয়।

মারদেকা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখ অন্ধকারের প্রতিটি স্তর আলাদা করে দেখতে চাইছিল, কিন্তু পাহাড়ের রাত মানুষের চোখকে যতটা দেখায়, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু লুকিয়ে রাখে। কয়েক গজ দূরের পাথরগুলো কালো দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তারও পেছনে আরও পাথর, আরও ছায়া, আরও গভীর অন্ধকার। বাতাস প্রায় নেই, অথচ তার গায়ের কাপড়ের নিচে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। মাটিতে পড়ে থাকা লোকটা নড়ছিল না। তার রাইফেলটা এক পাশে পড়ে আছে। মারদেকা বুঝতে পারছিল না লোকটা অজ্ঞান, নাকি শুধু অপেক্ষা করছে। কিন্তু এখন তার কাছে ওই লোকটার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই ধাতব শব্দটা। টিং। 

শব্দটা কোথা থেকে এসেছিল, সে নিশ্চিত নয়। কিন্তু তার শরীরের ভেতর কোথাও যেন সেই শব্দের সঙ্গে একটা পুরোনো স্মৃতি জেগে উঠেছে। কোনো মুখ নেই, কোনো দৃশ্য নেই, শুধু অন্ধকারের মধ্যে একটা ধাতব শব্দ, তারপর দূর থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর। দৌড়াও।

মারদেকা নিজের অজান্তেই কপালে হাত রাখল। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, মাথার ভেতর যেন কেউ খুব দূর থেকে দরজা খুলছে। দরজার ওপাশে আলো নেই। আছে ধোঁয়া, আগুনের গন্ধ, ঘোড়ার ঘাম, আর মানুষের চিৎকার। সে চোখ বন্ধ করল না। তবু একটা দৃশ্যটা তার সামনে ভেসে উঠল। 

মারদেকা ঝাঁকুনি দিয়ে বর্তমানের মধ্যে ফিরে এল। তার সামনে আবার শুধু অন্ধকার পাহাড়।

সে বুঝতে পারল, স্মৃতিটা তার নিজের দেখা কোনো স্বপ্ন নয়। সেটা হয়তো কারও স্মৃতি, যা এত বছর ধরে তার ভেতরে কোনোভাবে বেঁচে আছে। কিন্তু কীভাবে, কেন, কার স্মৃতি, সে জানে না।

দূরে আবার গুলির শব্দ হলো। এবার খুব কাছে নয়। তার পরপরই আরেকটি গুলি। তারপর নিস্তব্ধতা।

মারদেকা আর দাঁড়িয়ে রইল না। সে দ্রুত সেই দিকেই এগিয়ে গেল যেদিক থেকে শব্দ এসেছে। পথটা সরু, পাথরে ভরা। কোথাও কোথাও পুরোনো খুরের দাগ। সে এগোতে এগোতে হঠাৎ একটা রক্তের গন্ধ পেল। খুব হালকা, কিন্তু তার নাক সেটা ধরল। সে হাঁটু গেড়ে মাটির ওপর হাত না দিয়েই নিচু হয়ে দেখল। পাথরের কিনারায় গাঢ় একটা দাগ। নতুন রক্ত।

তারপর সামান্য দূরে আরেকটা দাগ। আরেকটু সামনে গিয়ে তৃতীয়টা। রক্তের দাগগুলো খুব বেশি নয়। আহত মানুষকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চিহ্নও নেই। বরং মনে হচ্ছে, কেউ দৌড়াতে দৌড়াতে রক্ত ফেলেছে।

মারদেকা বুঝল, লারসেন আহত হতে পারে। এই চিন্তাটা তার বুকের ভেতর এমন একটা ধাক্কা দিল যে সে আর সাবধানে হাঁটল না। দৌড়াতে শুরু করল। 

কয়েক গজ পরেই একটা পাথরের আড়াল থেকে লারসেন বেরিয়ে এল। তার বাম হাত কনুইয়ের কাছে ছিঁড়ে যাওয়া কাপড় দিয়ে চেপে ধরা। রক্ত খুব বেশি নয়, কিন্তু ক্ষত হয়েছে।

মারদেকা থেমে গেল।

লারসেন তাকে দেখে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সে ঠিক আছে। তারপর পেছনের দিকে তাকাল। “এলিয়াস কোথায়?” তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু স্থির।

মারদেকা উত্তর দিতে পারল না। সে নিজেও জানে না।

লারসেন তার মুখের দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত বুঝতে চেষ্টা করল কী ঘটেছে। তারপর ছেলেটার হাতে রক্তের দাগ দেখল। তার চোখ সঙ্গে সঙ্গে কঠিন হয়ে উঠল।

“তুমি লড়াই করেছ?”

মারদেকা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

লারসেন কিছু বলল না। সে শুধু একবার ছেলেটার চোখের দিকে তাকাল। সেখানে ভয় নেই। আছে অন্য কিছু, এমন একটা অনুভূতি যা লারসেন বহু বছর আগে নিজের চোখেও দেখেছিল। অল্প বয়সে পৃথিবীর নিষ্ঠুর সত্যের সঙ্গে প্রথমবার মুখোমুখি হলে মানুষের চোখে যে পরিবর্তন আসে।

লারসেন সামনে এগিয়ে গেল। মারদেকা তার পেছনে।

গিরিখাতের বাঁক ঘুরতেই তারা একটা ছোট খোলা জায়গায় পৌঁছাল। সেখানে তিনটি ঘোড়া বাঁধা ছিল। দুটির লাগাম ছিঁড়ে গেছে। তৃতীয়টি অস্থির হয়ে পাথরের ওপর খুর ঠুকছে। তার চোখে সাদা অংশ দেখা যাচ্ছে। ঘোড়াগুলো মানুষের গন্ধ, রক্ত আর বন্দুকের শব্দে আতঙ্কিত।

কাছেই একজন মানুষ পড়ে আছে। সে নড়ছে না।

লারসেন ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে গলার পাশে হাত রাখল। তারপর মাথা নাড়ল। মৃত।

তার বুকের ডান দিকে গুলির ক্ষত। গুলি খুব কাছ থেকে ছোড়া হয়নি। পোশাকে আগুনের দাগ নেই। রক্ত শুকোতে শুরু করেছে। মানুষটা যে দল তাদের অনুসরণ করছিল, তাদেরই একজন।

মারদেকা মৃত লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বয়স খুব বেশি নয়। হয়তো তিরিশের কাছাকাছি। মুখে দাড়ি, কপালে ঘাম শুকিয়ে সাদা লবণের মতো দাগ। তার ডান হাত এখনও রাইফেলের কাছাকাছি।

মারদেকার মনে হলো, মানুষটা মারা যাওয়ার আগেও কাউকে খুঁজছিল। হয়তো তাকে। হয়তো লারসেনকে। হয়তো এলিয়াসকে।

লারসেন মৃত লোকটার বেল্ট থেকে একটা ছোট চামড়ার থলে খুলে নিল। তারপর তার জ্যাকেটের পকেট পরীক্ষা করল। একটা ভাঁজ করা কাগজ পাওয়া গেল। কাগজটা পুরোনো নয়। সাম্প্রতিক। লারসেন সেটা খুলে দেখল, কিন্তু অন্ধকারে লেখা পড়া কঠিন। সে কাগজটা আলোয় আনার জন্য ঘোড়ার কাছে গেল, যেখানে আকাশের সরু ফালি দিয়ে সামান্য আলো আসছে।

মারদেকা তার পাশে দাঁড়াল। 

কাগজে একটা পাহাড়ের অসম্পূর্ণ মানচিত্র আঁকা। কয়েকটি পথ, একটা গিরিখাত, একটা ক্রস চিহ্ন। আর নিচে মাত্র দুটি শব্দ।

লারসেন অনেকক্ষণ সেই দুটি শব্দের দিকে তাকিয়ে রইল।

মারদেকা জিজ্ঞেস করল না। তার মুখ দেখেই বুঝতে পারল, কাগজে লেখা শব্দ দুটো তাকে অতীতের কোথাও নিয়ে গেছে।

লারসেন কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখল। “চলো।”

তারা ঘোড়াগুলোর দিকে এগোল। কিন্তু তখনই মারদেকা থেমে গেল। তার কান আবার কিছু শুনেছে। দূরে নয়। একেবারে কাছ থেকে। কেউ পাথরের ওপর পা রেখেছে।

লারসেনও শুনেছে। সে সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার আড়ালে সরে গেল। মারদেকা তার নির্দেশের অপেক্ষা করল না। সে নিচু হয়ে পাশের পাথরের ছায়ায় চলে গেল। 

কয়েক মুহূর্ত পরে অন্ধকার থেকে এলিয়াস বেরিয়ে এল। তার কোটের ডান পাশে রক্তের দাগ। হাঁটার সময় সামান্য খুঁড়িয়ে চলছে। কিন্তু তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই।

লারসেন তাকে দেখে এগিয়ে গেল। “তুমি আহত।”

এলিয়াস নিজের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল। “ওদের একজনের ভাগ্য খারাপ ছিল।”

লারসেন বুঝল, এলিয়াসের ক্ষত গুরুতর নয়। পোশাক ছিঁড়েছে, চামড়া সামান্য কেটেছে। কিন্তু তার চোখে অন্য কিছু আছে।

এলিয়াস লারসেনের হাতে থাকা কাগজটার দিকে তাকাল। “ওরা জায়গাটা জেনে গেছে।”

লারসেনের মুখ শক্ত হলো। “কোন জায়গা?”

এলিয়াস উত্তর দিল না। তার চোখ চলে গেল গিরিখাতের শেষ প্রান্তের দিকে। সেখানে পাথরের দেয়ালের মধ্যে একটা সরু ফাঁক দেখা যাচ্ছে। এতদিনের বাতাস আর বৃষ্টিতে পাথর ক্ষয়ে গিয়ে ফাঁকটা তৈরি হয়েছে। দূর থেকে সেটা প্রাকৃতিক মনে হয়। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, পাথরের কিছু অংশ মানুষের হাতে কাটা হয়েছিল।

লারসেন ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। মারদেকা তার পেছনে। এলিয়াসও সঙ্গে এল।

ফাঁকের সামনে গিয়ে লারসেন থেমে দাঁড়াল। তার মুখের ওপর বহু বছরের পুরোনো একটা স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। এই জায়গা সে চিনতে পারছে না, তবু তার শরীর চিনছে। বাম পাশে ভাঙা পাথর। নিচে মাটির গভীরে কালো দাগ। দেয়ালের ওপর ক্ষয়ে যাওয়া একটা চিহ্ন। একটা বৃত্ত। তার মাঝখানে সরু দাগ।

মারদেকার চোখও সেই চিহ্নে গিয়ে আটকে গেল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ আবার সেই ধাতব শব্দ বাজল। টিং। 

কিন্তু এবার বাইরে কোনো শব্দ হয়নি। শব্দটা এসেছে তার মাথার ভেতর থেকে। সে পাথরের দেয়ালের কাছে গিয়ে হাত বাড়াল। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে ফেলল। “ছোঁবে না।”

মারদেকা তার দিকে তাকাল।

লারসেনের চোখে এমন ভয় সে আগে দেখেনি। এটা শত্রুকে ভয় পাওয়ার চোখ নয়। এটা কোনো স্মৃতিকে ভয় পাওয়ার চোখ।

এলিয়াস ধীরে ধীরে বলল, “এখন আর লুকিয়ে রাখার সময় নেই।”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “তুমি জানো এর ওপাশে কী আছে?”

এলিয়াস কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “জানি।”

“তাহলে এতদিন আমাকে বলোনি কেন?” এলিয়াসের মুখে ক্লান্তির ছায়া ফুটে উঠল।

“কারণ তুমি প্রস্তুত ছিলে না।” 

লারসেন তিক্তভাবে হাসল। “আর এখন?”

এলিয়াস মারদেকার দিকে তাকাল। “এখন সময় তোমাদের প্রস্তুত করে দিয়েছে।”

কথাটা শেষ হতেই পাহাড়ের ওপর থেকে একটা বন্দুকের গুলি ছুটে এল। গুলিটা পাথরের দেয়ালে আঘাত করে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিল। তিনজন একসঙ্গে নিচু হয়ে গেল।

পরের মুহূর্তে আরও দুটি গুলি। গিরিখাতের ভেতর প্রতিধ্বনি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ল যে মনে হলো চারদিক থেকে গুলি আসছে।

লারসেন দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে ফেলল। শত্রুরা তাদের অবস্থান জেনে গেছে। সামনে অজানা পথ, পেছনে শত্রু। ঘোড়াগুলো নিয়ে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। খোলা জায়গায় দাঁড়ালে তারা সহজ লক্ষ্য হয়ে যাবে।

এলিয়াস পাথরের দেয়ালের ফাঁকটার দিকে ইশারা করল। “ওখানে ঢোকো।”

লারসেন এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। ফাঁকটা এত সরু যে একজন মানুষ কষ্ট করে ঢুকতে পারবে। তার ওপাশে কী আছে, জানা নেই। কিন্তু বাইরে থাকা নিশ্চিত মৃত্যু হতে পারে।

মারদেকা তখন পাথরের চিহ্নটার দিকে তাকিয়ে আছে। বৃত্তের মাঝখানের সরু দাগটা তার কাছে অদ্ভুত পরিচিত মনে হচ্ছে।

সে নিজের জামার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে গলায় ঝোলানো ছোট ধাতব টুকরোটাকে স্পর্শ করল। লারসেন তাকে বহুদিন ধরে এটা খুলে ফেলতে নিষেধ করেছে। সে জানে না এটা কোথা থেকে এসেছে। শুধু জানে, ছোটবেলা থেকেই এটা তার কাছে আছে। ধাতব টুকরোটা আজ অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা। মারদেকা সেটা বের করল না।

কিন্তু এলিয়াস তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে গেল। তার চোখ হঠাৎ বদলে গেল। “তোমার কাছে এখনও আছে।”

লারসেনও ঘুরে তাকাল। মারদেকার হাত বুকের কাছে।

লারসেনের মুখ সাদা হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে বলল, “তুমি এটা এতদিন ধরে লুকিয়ে রেখেছিলে?”

মারদেকা কোনো উত্তর দিতে পারল না।

এলিয়াস পাথরের চিহ্নটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, 
“ওটা শুধু একটা স্মৃতি নয়।”

বাইরে আবার গুলি হলো। এইবার পাথরের একটা অংশ ভেঙে মারদেকার পায়ের কাছে এসে পড়ল।

লারসেন আর অপেক্ষা করল না। সে মারদেকাকে ধরে পাথরের ফাঁকের দিকে ঠেলে দিল। এলিয়াস তার পেছনে। নিজে ঢোকার আগে লারসেন একবার বাইরে তাকাল।

গিরিখাতের মুখে অন্ধকারের মধ্যে কয়েকটা ছায়া দেখা যাচ্ছে। তারা এগিয়ে আসছে। 
একজন রাইফেল তুলল।

লারসেন পিস্তল বের করে একবার গুলি করল। তারপর নিজেও পাথরের ফাঁকের মধ্যে ঢুকে গেল। ফাঁকের ওপাশে মাটি নেই।

মারদেকার পা হঠাৎ শূন্যে চলে গেল। সে নিচে পড়ে যাচ্ছিল। লারসেন তার হাত ধরে ফেলল। অন্ধকারের ভেতর তাদের তিনজনের শরীর ঝুলে রইল এক মুহূর্ত।

তারপর এলিয়াস নিচে তাকিয়ে খুব ধীরে বলল, “নিচে নামো। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল সবকিছু।”

মারদেকা নিচের অন্ধকারের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, বহু বছর ধরে যে কণ্ঠস্বর তাকে স্বপ্নের মধ্যে ডেকে এসেছে, সেই কণ্ঠস্বর যেন এবার অন্ধকারের নিচ থেকে আবার তাকে ডাকছে। দৌড়াও।

কিন্তু এবার সে জানত, তাকে পালাতে হবে না। তাকে নিচে নামতে হবে। কারণ তার অতীত ওপরে কোথাও পড়ে নেই। তার অতীত অপেক্ষা করছে পাহাড়ের গভীরে।

আর সেই অন্ধকারের মধ্যে হয়তো লুকিয়ে আছে সেই নাম, যেটাকে লারসেন এত বছর ধরে পৃথিবীর চোখ থেকে মাটির নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিল।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/268549/</link>
				<pubDate>Wed, 02 Sep 2026 05:22:21 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২৪<br />
পাহাড়ের অন্ধকারে তিনটি ছায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। সামনে এলিয়াস, তার কয়েক গজ পেছনে লারসেন, আর তাদের মাঝামাঝি মারদেকা। গিরিখাতের সরু পথটা কখনও এত নিচে নেমে যাচ্ছে যে হাঁটতে গেলে মাথার ওপর পাথরের ছাদ মনে হচ্ছে, আবার কোথাও হঠাৎ প্রশস্ত হয়ে দুপাশের দেয়াল একটু দূরে সরে যাচ্ছে। আকাশের সরু ফালি দিয়&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-268549"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/268549/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">9efaffb7954ba675078655b7667feb56</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২৩
“দৌড়াও।”

লারসেনের কণ্ঠস্বরটা পেছন থেকে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মারদেকা আর একবারও ফিরে তাকাল না। তার সামনে পাহাড়ের সরু পথটা অন্ধকারের ভেতর বাঁক নিয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। দুই পাশে খাড়া পাথর, কোথাও কোথাও শুকনো ঝোপ এমনভাবে পথের ওপর ঝুঁকে আছে যে দৌড়াতে গিয়ে শরীর সেগুলোর সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। তার বুটের নিচে ছোট পাথর গড়িয়ে খাদে পড়ছে, আর সেই ক্ষীণ শব্দগুলোও পাহাড়ের নিস্তব্ধতার মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

পেছনে আবার গুলির শব্দ হলো। একটা গুলি তার মাথার অনেক ওপর দিয়ে চলে গিয়ে দূরের পাথরে আঘাত করল। ধুলো আর ছোট ছোট পাথরের টুকরো ছিটকে পড়ল পথের ওপর। মারদেকা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাথা নিচু করল। কিন্তু থামল না।

তার বুকের ভেতর দ্রুত শ্বাস উঠানামা করছে। দৌড়ানোর কারণে নয় শুধু। তার মাথার মধ্যে এখনও সেই নামটা ঘুরছে। এলিয়াস।

নামটা যেন তার নিজের নয়। কোথা থেকে এসেছে, সে জানে না। তবু নামটা উচ্চারণ করার মুহূর্তে তার বুকের ভেতর যে অনুভূতিটা হয়েছিল, সেটা ভয় ছিল না। আবার স্বস্তিও নয়। বরং এমন এক অনুভূতি, যেন বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া কোনো কণ্ঠস্বর হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে থেকে তাকে ডাক দিয়েছে।

তার সামনে পথটা হঠাৎ দুই ভাগ হয়ে গেল। ডান দিকের পথটা অপেক্ষাকৃত চওড়া, কিন্তু খোলা। বাঁ দিকেরটা সরু এবং পাথরের আড়াল দিয়ে নিচে নেমেছে। মারদেকা এক মুহূর্তের জন্য থামতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই পেছন থেকে লারসেনের গলা এল। “বাঁ দিকে।”

মারদেকা বাঁ দিকের পথ ধরে নেমে গেল।

লারসেন তার কয়েক পা পেছনে ছিল। বয়সের তুলনায় মারদেকার গতি বেশি, কিন্তু লারসেন এমনভাবে এগোচ্ছিল যেন প্রতিটি পাথর, প্রতিটি বাঁক এবং প্রতিটি আড়াল তার চোখে আলাদা করে ধরা পড়ছে। সে দৌড়াচ্ছে, আবার একই সঙ্গে শুনছে। পেছনের গুলির শব্দ, ওপরের ঢালে পাথর গড়িয়ে পড়ার আওয়াজ, দূরে ঘোড়ার অস্থির হ্রেষাধ্বনি, সবকিছুই যেন তার মাথার ভেতরে আলাদা আলাদা জায়গায় সাজানো হচ্ছে। আর সেই হিসেবের মাঝখানে একটি নাম বারবার এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে। এলিয়াস। 

বহু বছর ধরে সে নামটা তার কাছে মৃত ছিল। মৃত মানুষের নাম কখনও কখনও মানুষের স্মৃতি থেকে পুরোপুরি মুছে যায় না। বরং কিছু নাম মানুষের ভেতরে এমনভাবে থেকে যায়, যেন পুরোনো ক্ষতের নিচে লুকিয়ে থাকা ভাঙা ধাতু। বাইরে থেকে ক্ষত শুকিয়ে যায়, সময় তার ওপর নতুন চামড়া তৈরি করে, মানুষ স্বাভাবিক জীবনেও ফিরে আসে। কিন্তু একদিন হঠাৎ কোথাও আঘাত লাগলে ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই ধাতু আবার নড়ে ওঠে।

লারসেনের কাছে এলিয়াস ছিল ঠিক তেমনই। কিন্তু সে কখনও ভাবেনি, সেই পুরোনো ক্ষত আবার এভাবে খুলে যাবে। আর তার চেয়েও বড় কথা, সে কখনও ভাবেনি একটি তেরো বছরের ছেলের স্মৃতির ভেতর থেকে সেই নাম ফিরে আসবে।

আরেকটি গুলি হলো। এবার শব্দটা এত কাছে যে লারসেন আর অপেক্ষা করল না। সে সামনে ঝাঁপিয়ে গিয়ে মারদেকার কাঁধ ধরে তাকে পাথরের দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল। দুজনেই নিচু হয়ে বসল। গুলিটা তাদের মাথার ওপরের পাথরে লেগে বিকট শব্দে ছিটকে গেল। কিছুক্ষণ শুধু ধুলো ঝরতে থাকল।

মারদেকা দেয়ালের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে শ্বাস নিচ্ছিল। তার চোখ অন্ধকারে পেছনের পথের দিকে। “ওরা ওপর থেকে আসছে।”

লারসেন মাথা নেড়ে কিছু বলল না। সে পিস্তলটা হাতে ধরে পাথরের কিনারা থেকে সামান্য বাইরে তাকাল। অন্ধকার পুরোপুরি নেমে আসেনি। পশ্চিমের আকাশে দিনের শেষ আলো এখনও পাথরের চূড়াগুলোর কিনারায় লেগে আছে। সেই ফিকে আলোয় দূরের ঢালগুলো কালো হয়ে গেছে। কোথাও কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু লারসেন জানত, দেখা না যাওয়ার অর্থ কেউ নেই, তা নয়।

কিছুক্ষণ আগে তারা দুজনকে দুজন মানুষ দেখেছিল। এখন গুলির দিক দেখে মনে হচ্ছে অন্তত একজন ওপরের অবস্থান বদলেছে। পাহাড়ি জায়গায় একজন রাইফেলধারী মানুষ কয়েক মিনিটের মধ্যে এমন জায়গায় চলে যেতে পারে, যেখানে তাকে দেখা যায় না, কিন্তু সে নিচের চলাচল স্পষ্ট দেখতে পায়।

লারসেনের চোখ আবার সরু হয়ে এল। “চলো।”

মারদেকা নড়ল না। সে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল।

লারসেন এবার তার মুখের দিকে তাকাল। “কী দেখছ?”

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। পাথরের ফাঁক দিয়ে নিচের মাটিটা ভালো করে দেখছিল সে। সেখানে অন্ধকার একটু বেশি। তবু বাতাসের গন্ধ, পাথরের গায়ে জমে থাকা ধুলো, আর সামান্য নরম মাটির অংশে কিছু অস্পষ্ট দাগ তার চোখ এড়িয়ে গেল না। সে নিচু হয়ে বসে একটা জায়গার দিকে আঙুল তুলল। “এখানে কেউ গেছে।”

লারসেন তার দিকে তাকাল। তারপর দাগগুলোর দিকে। “কতক্ষণ আগে?”

মারদেকা মাটি স্পর্শ করল না। লারসেন তাকে বহুবার বলেছে, সবকিছু হাতে ছুঁয়ে পরীক্ষা করতে নেই। বিশেষ করে যখন সময় কম এবং পেছনে শত্রু থাকে। সে শুধু চোখ নামিয়ে দেখল। পাথরের ওপরের ধুলো কোথাও চাপা পড়েছে। একটা শুকনো পাতার ভাঙা অংশ পাশের দিকে সরে আছে। “বেশিক্ষণ না।”

লারসেন কিছু বলল না।

মারদেকা এবার একটু নিচের দিকে তাকাল। “দুজন নয়।”

“কতজন?”

ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল, “নিশ্চিত না। কিন্তু একজনের বেশি।”

লারসেন এবার নিজেই জায়গাটা পরীক্ষা করল। তার চোখে ক্লান্তি ছিল না, কিন্তু মনোযোগের নিচে একটা চাপা অস্থিরতা কাজ করছিল। মারদেকা ঠিকই বলেছে। মাটির ওপরের চিহ্নগুলো পরিষ্কার নয়। তবু এখানে শুধু পাহাড়ি ছাগল বা বুনো প্রাণীর চলাচল হয়নি। মানুষ ছিল। আর সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো, চিহ্নগুলো সেই দিকেই যাচ্ছে যেদিক দিয়ে তাদের যাওয়ার কথা।
 
লারসেন ধীরে মাথা তুলল। এর অর্থ দুটির একটিই হতে পারে। হয় শত্রুরা এই পাহাড়কে তার চেয়েও ভালো চেনে। অথবা তারা আগে থেকেই জানত সে কোন পথ দিয়ে বেরোবে। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটা তার কাছে আরও খারাপ মনে হলো।

কারণ পাহাড়ের অন্য পাশে পাওয়া বাদামি ঘোড়াটা এখন নতুন অর্থ নিচ্ছে। সেই ঘোড়াটা কি কেবল কারও ফেলে যাওয়া ঘোড়া ছিল? নাকি তাদের জন্য আগে থেকেই সেখানে রাখা হয়েছিল? চামড়ার থলে, পুরোনো কাগজ, ধাতব পাত, সবকিছু কি কেবল অতীতের চিহ্ন ছিল?

নাকি কেউ জানত, সে সেখানে পৌঁছাবে? লারসেনের বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা অনুভূতি ছড়িয়ে গেল।

মারদেকা তার দিকে তাকাল। “আমরা কি ফাঁদে পড়েছি?”

প্রশ্নটা শিশুসুলভ কৌতূহল নিয়ে করা হয়নি। ছেলেটা এখন পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে। লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। “এখনও জানি না।”

“আপনি জানেন না?”

“না।”

এই উত্তরটা শুনে মারদেকা অবাক হলো না। বরং তার মুখে এক ধরনের স্থিরতা দেখা গেল। গত কয়েকদিনে সে লারসেনকে এমন অবস্থায় খুব কম দেখেছে। লারসেন সাধারণত কোনো পথ না জানলেও অন্তত কোন পথ এড়িয়ে চলতে হবে তা জানে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে পাহাড়টা তার পরিচিত, অথচ একই সঙ্গে অচেনা হয়ে গেছে।

দূরে কোথাও পাথর গড়িয়ে পড়ল। দুজনেই একসঙ্গে মাথা তুলল। তারপর আবার নীরবতা।

লারসেন হাত তুলে মারদেকাকে নিচু থাকতে ইশারা করল। কয়েক মুহূর্ত পর সে খুব ধীরে পাথরের আড়াল ছেড়ে এগিয়ে গেল। এবার দৌড় নয়। প্রতিটি পা হিসেব করে রাখা। মারদেকাও তার পেছনে গেল।

পথটা নিচে নামতে নামতে হঠাৎ একটা সরু খাদের কিনারা ধরে বাঁক নিয়েছে। বাঁ পাশে উঁচু পাথরের দেয়াল। ডান পাশে এত গভীর অন্ধকার যে নিচে কী আছে বোঝা যায় না। বাতাস নিচ থেকে উঠে এসে ঠান্ডা হয়ে মুখে লাগছে।

মারদেকা একবার নিচে তাকিয়ে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল। এই ধরনের জায়গায় সে পাহাড়ি জীবনে চলেছে। কিন্তু রাত নামার আগে এমন খাড়া পথে দ্রুত এগোনো সহজ নয়। সামান্য ভুল পা, সামান্য ভেজা পাথর, আর মানুষ কয়েকশ ফুট নিচে চলে যেতে পারে।

লারসেন থামল। সামনের দিকে পথটা ভেঙে গেছে। কয়েক গজ অংশ ধসে নিচে পড়ে গেছে। এখন পাথরের দেয়াল ঘেঁষে মাত্র দেড় হাতের মতো একটা সরু অংশ বাকি। সেখানে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ পাশ ফিরে এগোতে পারবে, কিন্তু দ্রুত চলা অসম্ভব।

পেছনে আবার গুলির শব্দ হলো। এবার শব্দটা দূরে। লারসেন চোখ সরু করল।

ওরা অন্ধভাবে গুলি করছে না। বরং মাঝে মাঝে গুলি চালাচ্ছে, যাতে তারা এগিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তাদের উদ্দেশ্য যদি শুধু হত্যা করা হতো, তাহলে এতক্ষণে আরও কাছাকাছি আসার চেষ্টা করত। তাহলে কি তারা সত্যিই কাউকে জীবিত চায়? 

লারসেন নিজের ভাবনাটা শেষ করার আগেই মারদেকা তার হাতের কাছে এসে দাঁড়াল। “আমি আগে যাব।”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। “না।”

“আমি পারব।”

“আমি বলেছি না।”

মারদেকা চুপ করে গেল। কিন্তু তার চোখে বোঝা যাচ্ছিল, সে নিজের দক্ষতা নিয়ে গর্ব করছে না। সে শুধু পথটা দেখে বুঝেছে, তার শরীর হালকা। বয়স কম। সরু জায়গা দিয়ে তার এগোনো সহজ হতে পারে।

লারসেন সেটা বুঝল। তবু সে তাকে আগে যেতে দিতে চাইল না। সে পাথরের দেয়ালের সঙ্গে এক হাত রেখে শরীর ঘুরিয়ে সরু অংশে পা রাখল। পায়ের নিচে ছোট পাথর খসে নিচে পড়ে গেল। শব্দটা অনেকক্ষণ ধরে নিচের অন্ধকারে প্রতিধ্বনিত হলো।

মারদেকা নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইল।

লারসেন এক পা, তারপর আরেক পা এগোল। অর্ধেক পথ পেরোনোর সময় দূরে আবার বন্দুকের শব্দ হলো। এইবার গুলি তাদের দিকে আসেনি। বরং শব্দের প্রতিধ্বনি শুনে মনে হলো, শত্রুরা পথের অন্য দিকে অবস্থান বদলাচ্ছে।

লারসেন থেমে গেল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “শুনে রাখো। আমি ওপারে পৌঁছালে তুমি আসবে। দেয়ালের দিকে তাকাবে। নিচে না।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

কয়েক মুহূর্ত পরে লারসেন ওপারে পৌঁছে গেল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে মারদেকার দিকে তাকাল। “এবার।”

মারদেকা দেয়ালের সঙ্গে শরীর চেপে ধরে এগোতে শুরু করল।

প্রথম কয়েকটা পা সহজ ছিল। তারপর পথটা আরও সরু হয়ে গেল। তার ডান পায়ের নিচে শক্ত জায়গা খুঁজে নিতে হচ্ছে। বাঁ হাত দিয়ে পাথরের খাঁজ ধরে এগোচ্ছে। নিচের খাদ থেকে ঠান্ডা বাতাস উঠে এসে কাপড় নড়াচ্ছে। হঠাৎ তার হাতের নিচের একটা ছোট পাথর নড়ে গেল। তার শরীর সামান্য দুলে উঠল।

লারসেন সামনে হাত বাড়ালেও দূরত্ব বেশি।

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু ভাঁজ করে শরীর দেয়ালের দিকে ঝুঁকিয়ে দিল। পাহাড়ি পথে ভারসাম্য রক্ষার যে অনুশীলন সে এতদিন করেছে, সেটা এখন কোনো শিক্ষার কথা মনে করে নয়, শরীরের অভ্যাস হিসেবে কাজ করল। কয়েক মুহূর্ত সে এক জায়গায় স্থির রইল। তারপর আবার এগোল।

ওপারে পৌঁছে লারসেন তার কাঁধ শক্ত করে ধরল। “ভালো।”

একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু মারদেকা বুঝল, লারসেন সন্তুষ্ট। তারা আর সময় নষ্ট করল না।

পথটা এবার কিছুটা নিচে নেমে একটি সংকীর্ণ গিরিখাতের দিকে চলে গেছে। সেখানে আলো আরও কম। দুই পাশে পাথরের দেয়াল এত উঁচু যে আকাশের মাত্র সরু একটা রেখা দেখা যায়। জায়গাটা এমন, যেখানে কয়েকজন মানুষ সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারে।

লারসেন সেখানে ঢোকার আগে থামল। মারদেকা বুঝতে পারল কেন। নীরবতা খুব গভীর। অস্বাভাবিকভাবে গভীর।

কোনো পাখির ডাক নেই। বাতাসও ভেতরে ঢুকছে না। শুধু দূরে কোথাও থেকে জল পড়ার মতো ক্ষীণ একটা শব্দ আসছে।

মারদেকা চোখ বন্ধ করল না, কিন্তু মাথা সামান্য কাত করল।

লারসেন তার দিকে তাকাল। “কী?”

মারদেকা ফিসফিস করে বলল, “ঘোড়া।”

“কোথায়?”

“এখানে না।”

সে একটু থামল। “আগে ছিল।”

লারসেন চারপাশে তাকাল। গিরিখাতের মাটিতে আলো কম। তবু কয়েক জায়গায় শুকনো ধুলো জমে আছে। সেখানে অস্পষ্ট খুরের দাগ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দাগগুলো নতুন নয়। সম্ভবত কয়েক ঘণ্টা, হয়তো তারও বেশি পুরোনো।

মারদেকা ধীরে এগিয়ে গিয়ে মাটির দিকে তাকাল। “একটা না।”

লারসেন এবার তার পাশে এসে দাঁড়াল। খুরের দাগগুলো পরস্পরের ওপর পড়েছে। কেউ এখানে বহুবার যাতায়াত করেছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু পথটা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে, সেটা সামনে না এগোলে বোঝার উপায় নেই।

ঠিক তখন গিরিখাতের গভীর থেকে একটা শব্দ এলো। খুব ক্ষীণ। ধাতুর সঙ্গে ধাতুর স্পর্শ। দুজনেই স্থির হয়ে গেল।

লারসেনের হাত পিস্তলের বাঁটে।

মারদেকার হাত নিজের ছুরির কাছে গেল, কিন্তু সে সেটি বের করল না।

কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। তারপর আবার সেই শব্দ। টিং।

এবার লারসেনের মুখের ভাব বদলে গেল। সে ধীরে হাত বাড়িয়ে নিজের কোটের ভেতরের পকেটে হাত দিল। সেখানে দুটি কালচে ধাতব চাকতি রয়েছে। তার আঙুল একটির গায়ে ছুঁতেই সে থেমে গেল।

শব্দটা গিরিখাতের ভেতর থেকে এসেছে। কিন্তু শব্দের ধরন এমন, যেন কেউ ইচ্ছা করে ধাতব কোনো ছোট জিনিস পাথরের গায়ে স্পর্শ করিয়েছে। একবার। তারপর বিরতি। আবার একবার।

মারদেকা লারসেনের দিকে তাকাল। “ওরা?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। তার মনে পড়ল গোপন দরজার ওপাশের তিনবারের সংকেত। 

মনে পড়ল ভাঙা কণ্ঠস্বর, “যে মানুষটা এখনও তোমাকে অপেক্ষা করছে।” আর তারপর মনে পড়ল এলিয়াস।  বহু বছর ধরে মৃত বলে ধরে নেওয়া একজন মানুষ। নাকি মৃত নয়?

লারসেনের চোখ অন্ধকার গিরিখাতের দিকে স্থির হয়ে রইল। তারপর সে খুব নিচু গলায় বলল, “আমার পেছনে থাকো।”

মারদেকা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু থেমে গেল।

কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে গিরিখাতের ভেতর থেকে তৃতীয়বারের মতো ধাতব শব্দটা শোনা গেল। টিং। তারপর চারপাশ আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। 

কিন্তু এবার সেই নীরবতা আর খালি পাহাড়ের নীরবতা ছিল না। কোথাও কেউ আছে। আর সে জানে, লারসেন সেখানে পৌঁছেছে।

অন্ধকার গিরিখাতের ভেতর দাঁড়িয়ে লারসেন কয়েক মুহূর্ত কোনো শব্দ করল না। তার ডান হাত এখনও পিস্তলের বাঁটে। বাঁ হাত কোটের ভেতরে, যেখানে কালচে ধাতব চাকতিটা আঙুলের নিচে ঠান্ডা হয়ে আছে। মারদেকা তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে। ছেলেটার চোখ অন্ধকার ভেদ করার চেষ্টা করছে, কিন্তু সামনে কয়েক গজের বেশি কিছু দেখা যাচ্ছে না। গিরিখাতের দুই পাশের পাথরের দেয়াল এত উঁচু যে শেষ আলোটুকুও সেখানে এসে পৌঁছাতে পারেনি।

দূরে কোথাও আবার জল পড়ার শব্দ হলো। তারপর নীরবতা।

লারসেন ধীরে ধীরে এক পা এগোল। পাথরের নিচে শুকনো কাঁকর চাপা পড়ে মৃদু শব্দ করল। সঙ্গে সঙ্গে গিরিখাতের গভীর থেকে কোনো মানুষের পায়ের শব্দ শোনা গেল না। কেউ দৌড়াল না, অস্ত্র তুলল না, এমনকি কোনো সতর্কতাও দিল না।

এটাই লারসেনকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলল। যে মানুষ লুকিয়ে থেকে অপেক্ষা করে, সে সাধারণত শত্রুর আগমন বুঝলে কোনো না কোনো শব্দ করে। কিন্তু এখানে যে অপেক্ষা করছে, সে যেন জানে লারসেন তাকে আক্রমণ করতে আসেনি। অথবা সে এতটাই নিশ্চিত যে লারসেন তার ক্ষতি করবে না।

লারসেন আরও এগোল। মারদেকা পেছনে পেছনে চলল। তার পায়ের শব্দ প্রায় শোনা যাচ্ছিল না। এতদিনে সে শিখে গেছে, অন্ধকারে চলার সময় শরীরের ওজন কীভাবে মাটিতে ফেলতে হয়, শুকনো পাথরের ওপর কোথায় পা রাখা যায় আর কোথায় রাখা যায় না। কিন্তু আজ তার চলার মধ্যে সেই স্বাভাবিক নিশ্চিন্ততা নেই। অদৃশ্য কারও উপস্থিতি সে অনুভব করছে।

কিছুদূর গিয়ে গিরিখাতটা একটু চওড়া হলো। সামনে একটা পাথরের দেয়াল। তার নিচে অন্ধকারের মধ্যে ছোট একটা ফাঁক। ফাঁকটার পাশে শুকনো কাঠের কিছু টুকরো পড়ে আছে। তার ওপর কালচে ছাই। বহুদিন আগে এখানে আগুন জ্বালানো হয়েছিল। ছাই পুরোনো, কিন্তু তার নিচে এখনও একটা অদ্ভুত গন্ধ আছে, পোড়া কাঠের সঙ্গে মিশে থাকা তেলের গন্ধ।

লারসেন থামল। তার চোখ ছাইয়ের ওপর স্থির হলো। এই জায়গাটা সে আগে কখনও দেখেনি। তবু কেন যেন মনে হলো, সে এমন জায়গা বহু বছর আগে দেখেছে। অন্য কোনো পাহাড়ে। অন্য কোনো রাতে। অন্য কিছু মানুষের সঙ্গে।

স্মৃতিটা তার মাথায় পুরোপুরি ফিরে আসার আগেই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। “তুমি এখনও আগের মতোই হাঁটো, লারসেন।”

কণ্ঠস্বরটা কর্কশ নয়। বয়সের ভার আছে, কিন্তু দুর্বলতা নেই। বরং অদ্ভুত শান্ত। এমন শান্ত, যেন এই পাহাড়ের অন্ধকার আর এই রাতের বিপদ তার কাছে বহু পুরোনো পরিচিত জিনিস।

লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। মারদেকা তার পেছনে আরও সোজা হয়ে দাঁড়াল।

লারসেন ধীরে পিস্তল বের করল না। শুধু হাতটা বাঁট থেকে সরিয়ে পাশে নামিয়ে রাখল। “এলিয়াস।”

অন্ধকার থেকে কোনো উত্তর এল না। কয়েক মুহূর্ত পর পাথরের আড়াল থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এল।

প্রথমে তার মুখ দেখা গেল না। লম্বা চাদরের মতো পুরোনো কোট গায়ে, মাথায় ছায়া ফেলা টুপি। শরীর খুব রোগা নয়, আবার আগের মতো শক্তিশালীও নয়। বয়স তার শরীরে নিজের চিহ্ন রেখে গেছে। দাড়িতে ধূসর রং, গালের পাশে পুরোনো কাটা দাগ, আর ডান চোখের নিচে একটা গভীর রেখা।

কিন্তু চোখ দুটো দেখে লারসেনের আর কোনো সন্দেহ রইল না। এলিয়াস। যে মানুষটাকে সে মৃত ভেবেছিল। যার জন্য বহু বছর আগে একটি নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। যার সঙ্গে সম্পর্কিত সব কাগজ, সব চিহ্ন, সব স্মৃতি সে নিজের জীবন থেকে সরিয়ে ফেলেছিল। সেই মানুষ এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে।

এলিয়াস কিছুক্ষণ লারসেনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে সরে গিয়ে মারদেকার ওপর থামল। সেই মুহূর্তে তার চোখের পরিবর্তনটা লারসেনের নজর এড়াল না। 

এলিয়াস ছেলেটাকে দেখছিল না, যেন তার ভেতর দিয়ে অনেক দূরের কোনো সময়কে দেখছে। 

মারদেকাও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ সেই অদ্ভুত অনুভূতিটা ফিরে এল। কোথাও যেন সে এই চোখ দেখেছে। কখনও খুব কাছে নয়। কোনো মুখও নয়। শুধু অন্ধকারের ভেতর একটা অস্পষ্ট উপস্থিতি। তারপর সেই কণ্ঠস্বর। দৌড়াও।

মারদেকা নিজের অজান্তেই এক পা সামনে এগিয়ে গেল। এলিয়াসের চোখ তার মুখে স্থির। কিন্তু সে কিছু বলল না।

লারসেন সেটা লক্ষ্য করল। “তুমি কতদিন ধরে এখানে আছ?”

এলিয়াসের দৃষ্টি এখনও মারদেকার ওপর। “যতদিন তুমি ভাবছ, তার চেয়ে বেশি।”

লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না। “আমাকে অনুসরণ করছিলে?”

“না।”

“তাহলে জানলে কীভাবে আমি আসব?”

এলিয়াস এবার লারসেনের দিকে তাকাল। “কারণ তুমি আসবে, সেটা আমি জানতাম। কখন আসবে, সেটা জানতাম না।”

লারসেন কিছু বলল না। গিরিখাতের ওপর দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল। কোথাও শুকনো পাতার সঙ্গে পাথরের ঘর্ষণের শব্দ হলো। সেই ক্ষীণ শব্দের মধ্যেও তিনজন মানুষের নীরবতা যেন আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মারদেকা এলিয়াসের দিকে তাকিয়ে ছিল।  এবার এলিয়াস ধীরে ধীরে তার দিকে এক পা এগিয়ে এল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলল। 

এলিয়াস থেমে গেল। তার ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটল। “তুমি এখনও কাউকে বিশ্বাস করতে শেখোনি।”

“যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন প্রয়োজনও হবেনা।”

এলিয়াস হাসল না এবার। “সেটা ঠিক।” তারপর সে মারদেকার দিকে তাকাল। “ছেলেটাকে তুমি অনেক কিছু শিখিয়েছ।”

লারসেনের চোখ সরু হয়ে এল। “কীভাবে জানো?”

“ওর হাঁটা দেখে।”

এই উত্তরটা এত সহজ ছিল যে লারসেনের সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।

এলিয়াসের দৃষ্টি মারদেকার পায়ের দিকে গেল। তারপর তার হাতের দিকে। ছেলেটা ছুরিটা বের করেনি, কিন্তু হাতটা এখনও তার কাছেই আছে। “ওকে তুমি পাহাড়ের শব্দ শুনতে শিখিয়েছ।” বললো সে।

লারসেন এবারও কিছু বলল না।

“পায়ের নিচের মাটি পড়তে শিখিয়েছ। বাতাসের গন্ধ আলাদা করতে শিখিয়েছ। অন্ধকারে মানুষের আগে ছায়াকে চিনতে শিখিয়েছ।”

মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল। এগুলো তার শেখা জিনিস। কিন্তু এলিয়াস কীভাবে জানে?

লারসেনের মুখে এবার প্রথমবারের মতো কঠিন বিস্ময় ফুটে উঠল।

এলিয়াস মাথা সামান্য কাত করল। “কিন্তু একটা জিনিস এখনও তুমি ওকে শেখাওনি।”

“কী?”

“কোন মানুষকে বিশ্বাস করা যায়।”

লারসেনের চোখে মুহূর্তের জন্য পুরোনো রাগ জ্বলে উঠল। “এই কথাটা তোমার মুখে ভালো শোনায় না।”

এলিয়াস জবাব দিল না। সে আবার মারদেকার দিকে তাকাল।

ছেলেটার চোখে এখন প্রশ্ন। কিন্তু সে প্রশ্ন করছে না। সম্ভবত তার ভেতরে এমন কিছু নড়েচড়ে উঠেছে, যার ভাষা এখনও সে খুঁজে পায়নি।

এলিয়াস খুব ধীরে বলল, “তুমি কি এখনও সেই স্বপ্নটা দেখো?”

মারদেকা চমকে উঠল।

লারসেনও স্থির হয়ে গেল।

এলিয়াসের প্রশ্নটা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু তার ভেতরে এমন কিছু ছিল যা লারসেনের বুকের ভেতর বহু বছরের পুরোনো একটা দরজা খুলে দিল। তারমানে মারদেকার সেই কণ্ঠস্বরের কথা এলিয়াস জানে।

লারসেন এবার ছেলেটার দিকে তাকাল। মারদেকা কিছু বলছে না। তার মুখে বিস্ময়, কিন্তু ভয় নেই। সে যেন নিজের অজান্তে অপেক্ষা করছে।

এলিয়াস আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে শুধু বলল, “কিছু স্মৃতি মানুষ নিজের চোখে দেখে না। কখনও কখনও অন্য কারও কণ্ঠস্বর হয়ে ফিরে আসে।”

মারদেকার বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল। দৌড়াও শব্দটা যেন আবার তার মাথার ভেতরে ফিরে এল। 

কোনো মুখ নেই। কোনো দৃশ্য নেই। শুধু কণ্ঠস্বর। একটা অন্ধকার পথ। পাথরের ওপর ছুটে চলা পায়ের শব্দ। আর কোথাও একজন মানুষ তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। 

মারদেকা চোখ বন্ধ করল না। সে শুধু মাথাটা সামান্য নিচু করল।

লারসেন সেটা দেখল। তারপর এলিয়াসের দিকে তাকাল। “তুমি ওর কথা জানো।”

এলিয়াস এবার সরাসরি উত্তর দিল না। সে পাথরের পাশে পড়ে থাকা একটা শুকনো কাঠ তুলে নিল। আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে দেখল। তারপর কাঠটা আবার মাটিতে ফেলে দিল। “আমি অনেক কিছু জানি।”

“কতটা?”

“যতটা জানলে তোমার ঘুম আর ফিরবে না।”

লারসেনের মুখ পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। “তাহলে বলো।”

“এখনও না।”

দূরে কোথাও বজ্রের মতো ক্ষীণ শব্দ হলো। সম্ভবত পাহাড়ের ওপারে গুলির প্রতিধ্বনি। শত্রুরা এখনও তাদের খুঁজছে। 

এলিয়াস মাথা তুলে গিরিখাতের মুখের দিকে তাকাল। “তোমার সময় কম।”

“আমার সময় নিয়ে তুমি চিন্তা কোরো না।”

“আমি তোমার জন্য চিন্তা করছি না।”

এলিয়াসের চোখ আবার মারদেকার দিকে গেল। “ওর জন্য করছি।”

এইবার লারসেনের মুখের কঠোরতা ভেঙে গেল না, কিন্তু তার চোখে সতর্কতার সঙ্গে অন্য কিছু এসে মিশল। “ওর ব্যাপারে তুমি কী জানো?”

এলিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর খুব ধীরে বলল, “ও কোথা থেকে এসেছে, সেটা তুমি জানো।”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না।

“ও কেন নিজের লোকেদের কাছেও পর ছিল, সেটাও তুমি জানো।”

মারদেকা এবার লারসেনের দিকে তাকাল। তারপর এলিয়াসের দিকে।

এলিয়াস বলল, “কিন্তু ওর জন্মের আগের গল্পটা তুমি জানো না।”

লারসেনের বুকের ভেতর যেন কেউ হঠাৎ মুঠো করে ধরল। সে বুঝল, কথাটা এখানেই থামানো যাবে না। এলিয়াস এমন কিছু জানে, যা এতদিন শুধু তার ধারণার মধ্যে ছিল।

মারদেকার জন্মের আগের ঘটনা। অর্থাৎ সেই সময়, যখন লারসেনের গোপন দল এখনও ভেঙে যায়নি। যখন তারা পাহাড়ের ওপারে যাতায়াত করত। যখন কিছু মানুষ তাদের সঙ্গে ছিল, যাদের নাম পরে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল।

এলিয়াসের চোখে তখন আর কোনো রহস্যময়তা ছিল না। সেখানে ছিল ক্লান্তি। অনেক বছর ধরে বহন করে আনা কোনো অপরাধের ক্লান্তি। “তুমি কি জানো, লারসেন,” সে ধীরে বলল, “কিছু মানুষ পৃথিবীতে জন্মায় না। তাদের জন্মের আগেই তাদের জন্য একটা পথ ঠিক হয়ে যায়।”

লারসেন চুপ করে রইল। 

“আর সেই পথের ওপর যারা হাঁটে, তারা ভাবে তারা নিজের ভাগ্য বেছে নিয়েছে।” এলিয়াস একটু থামল। “আসলে কেউ একজন তাদের জন্য একটা দরজা খুলে রেখেছিল।”

মারদেকা বুঝতে পারছিল না কথাগুলোর অর্থ। কিন্তু লারসেন বুঝছিল। অন্তত কিছুটা। তার মনে পড়ে গেল বহু বছরের পুরোনো একটি রাত। আগুনের চারপাশে বসে থাকা কয়েকজন মানুষ। একটা মানচিত্র। পাহাড়ের ওপারে যাওয়া নিয়ে তর্ক। একজন তরুণের জেদ। আর একটি সিদ্ধান্ত, যার ফল সে কখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।

সেই স্মৃতির মধ্যে একটা মুখ ছিল। মুখটা সে এখন দেখতে চাইছিল না। 

এলিয়াস যেন তার চোখ পড়েই বুঝে ফেলল। “তুমি মনে করার চেষ্টা করছ।”

লারসেন ধীরে মাথা তুলল। “আমি অনেক কিছু ভুলে গেছি।”

“না। তুমি ভুলোনি।” এলিয়াসের কণ্ঠ এবার আরও নিচু। “তুমি শুধু কিছু জিনিস মনে করতে চাও না।” কথাটা গিরিখাতের পাথরে গিয়ে ধাক্কা খেল। 

মারদেকা দুই মানুষের দিকে তাকিয়ে রইল। তার নিজের জীবন নিয়ে এত কথা হচ্ছে, অথচ তার নাম কেউ সরাসরি উচ্চারণ করছে না। সে বুঝতে পারল, এই দুজন মানুষ তার অতীতের এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যেখানে সে এখনও পৌঁছাতে পারেনি।

তার মনে হলো, সে যদি এখন একটা প্রশ্ন করে, তাহলে হয়তো কোনো দরজা খুলে যাবে। কিন্তু কোন দরজা, সে জানে না।

এলিয়াস যেন তার মনের কথাই বুঝল। “আজ সব জানতে চেয়ো না, ছেলে।”

মারদেকা এবার প্রথমবার কথা বলল। “আমি কী জানতে চাই, সেটা আপনি জানেন?”

এলিয়াসের চোখে ক্ষীণ আলো ফুটল। “তুমি এখনও জানো না তুমি কী জানতে চাও।” 
সে একটু থামল। “কিন্তু খুব শিগগিরই জানবে।”

এরপর এলিয়াস কোটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট চামড়ার থলে বের করল। থলেটা পুরোনো, অনেকবার ব্যবহার করা হয়েছে। সে সেটা খুলল না। শুধু হাতে ধরে রাখল।

লারসেনের চোখ সঙ্গে সঙ্গে থলেটার ওপর গিয়ে স্থির হলো। কারণ চামড়ার নিচে কোনো ধাতব জিনিসের কিনারা বোঝা যাচ্ছে। একই ধরনের ধাতু। যে ধাতব চাকতির রহস্য তাদের এই পাহাড় পর্যন্ত টেনে এনেছে।

এলিয়াস লারসেনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি যেটা খুঁজছ, সেটা শুধু তোমার অতীতের চিহ্ন নয়।”

লারসেন এক পা এগিয়ে গেল। “তাহলে কী?”

এলিয়াস থলেটা আবার কোটের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলল। “একটা নামের চিহ্ন।”

লারসেন স্থির হয়ে গেল। “কার নাম?”

এলিয়াস তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “যে নামটা তুমি এত বছর ধরে মাটির নিচে চাপা দিয়ে রেখেছ।” আর কিছু বলল না সে।

গিরিখাতের বাইরে হঠাৎ ঘোড়ার ক্ষীণ হ্রেষাধ্বনি শোনা গেল। তারপর দূরে একটা গুলির শব্দ। লারসেন বুঝল, সময় শেষ হয়ে আসছে।  কিন্তু তার মাথায় এখন আর শত্রুদের কথা নেই। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা শুধু জীবিত ফিরে আসা এক পুরোনো সঙ্গী নয়।

এলিয়াস এমন এক সত্যের দরজা খুলে দিয়েছে, যার ওপাশে রয়েছে তার নিজের অতীত, তার গোপন দল, বহু বছর আগের একটি সিদ্ধান্ত, আর মারদেকার জন্মের আগের সেই অন্ধকার সময়।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, সেই দরজার চাবি সম্ভবত এতদিন ধরে মারদেকার কাছেই ছিল। ছেলেটা কিছুই জানে না। তবু তার কণ্ঠে যে অচেনা ডাক ফিরে ফিরে আসে, সেই ডাকের সঙ্গে এই পুরোনো রহস্যের যোগ আছে।

লারসেন ধীরে পিস্তলটা আবার কোমরে গুঁজে দিল। তারপর এলিয়াসের দিকে তাকাল। 
“এবার আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে।”

এলিয়াস মাথা নেড়ে সামনে এগিয়ে গেল। কয়েক পা যাওয়ার পর সে থামল।  পেছন ফিরে তাকাল না। শুধু বলল, “কিন্তু এবার থেকে ওকে আর অন্ধকারে রেখো না, লারসেন।”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। 

মারদেকা তার দিকে তাকিয়ে রইল। আর বহুদিন পর প্রথমবার তার মনে হলো, তার জীবনের অন্ধকারটা হয়তো সত্যিই অন্ধকার নয়।

সেখানে কোথাও একটা দরজা আছে। দরজার ওপাশে একজন মানুষ আছে। একটা নাম আছে।

আর সেই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার জন্মের আগের এমন এক ইতিহাস, যার জন্য আজও কেউ কেউ পাহাড়ের অন্ধকারে তাদের পিছু নিয়েছে।

তিনজন ধীরে ধীরে গিরিখাতের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল পুরোনো ছাই, খুরের দাগ আর সেই সংকেতের প্রতিধ্বনি।

আর পাহাড়ের অনেক ওপরে, অন্ধকার ঢালের আড়ালে, কেউ একজন তাদের চলে যেতে দেখছিল।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/268153/</link>
				<pubDate>Tue, 01 Sep 2026 05:04:05 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২৩<br />
“দৌড়াও।”</p>
<p>লারসেনের কণ্ঠস্বরটা পেছন থেকে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মারদেকা আর একবারও ফিরে তাকাল না। তার সামনে পাহাড়ের সরু পথটা অন্ধকারের ভেতর বাঁক নিয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। দুই পাশে খাড়া পাথর, কোথাও কোথাও শুকনো ঝোপ এমনভাবে পথের ওপর ঝুঁকে আছে যে দৌড়াতে গিয়ে শরীর সেগুলোর সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। তার বুটের ন&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-268153"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/268153/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">ec15f76c8e42476f74acd73e1c270a48</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২২
দুপুরের সূর্য তখন পাহাড়ের মাথার ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিমে নামতে শুরু করেছে। পুরোনো আশ্রয়ের ধ্বংসস্তূপের চারপাশে আলো আর ছায়ার অদ্ভুত খেলা চলছে। কোথাও পাথরের গায়ে রোদ এত তীব্র যে চোখ মেলে তাকানো কঠিন, আবার তার পাশেই কয়েক হাত দূরে এমন গাঢ় ছায়া, যেন দিনের আলো সেখানে কোনোদিন পৌঁছায়নি। দূরের পাহাড়ের ঢালে শুকনো ঘাস বাতাসে দুলছে। সেই দোলার শব্দও এখানে এসে কেমন যেন চাপা হয়ে যায়। চারপাশের নীরবতা এত ঘন যে ঘোড়ার নাক দিয়ে বেরিয়ে আসা উষ্ণ নিশ্বাস পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।

লারসেন একবারও পেছনে তাকাল না। ভাঙা আশ্রয়ের দিকে তার চোখ স্থির ছিল, কিন্তু মন যেন আরও দূরের কোনো জায়গায় চলে গেছে। বহু বছর আগে যে মানুষ এই পাহাড় ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সে আর আজকের লারসেন এক মানুষ নয়। তবু পাহাড় মানুষকে তার নিজের কাছ থেকে পালাতে দেয় না। পাথর, গাছ, পথ, এমনকি বাতাসও কখনও কখনও পুরোনো হিসাব মনে করিয়ে দেয়।

তার ডান হাতে এখনও সেই পুরোনো ধাতব টুকরোটা ধরা। বাম দিকের ভেতরের পকেটে দুটি কালচে চাকতি। কোমরে পিস্তল। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তেরো বছরের এক ছেলে, যে কিছুক্ষণ আগেই বলেছে, সে এই জায়গায় আগে ছিল।

মারদেকা ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে ভয় নেই, কিন্তু অস্বস্তি আছে। সে বুঝতে পারছে, তার স্মৃতি আর এই জায়গার মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক আছে, যার শেষ কোথায় সে জানে না। কয়েক মুহূর্ত আগে কাঠের ভাঙা দরজায় হাত রাখার সঙ্গে সঙ্গে যে দৃশ্য তার চোখের সামনে এসেছিল, সেটা এখনও তার মাথার মধ্যে ঘুরছে। আগুনের লাল আলো, ধোঁয়া, রক্তমাখা একটা হাত, আর দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া একটা ছোট ছেলে। সেই ছেলেটা কি সে নিজেই? প্রশ্নটা তার মনে উঠছে, কিন্তু উত্তর আসছে না।

লারসেন ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপের অন্য পাশে গেল। ভাঙা দেয়ালের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে মাটির ওপর হাত বুলিয়ে দেখল। কিছুক্ষণ পর তার আঙুল একটা শক্ত জিনিসে ঠেকল। সে ধুলো সরিয়ে ছোট একটা লোহার পেরেক বের করল। পেরেকটা অস্বাভাবিক মোটা। একসময় কাঠের দরজা বা কড়িকাঠে ব্যবহার করা হয়েছিল। লারসেন সেটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে মুঠোয় রেখে দিল।

মারদেকা লক্ষ্য করল, লারসেনের চোখ বারবার আশ্রয়ের একই অংশে ফিরে যাচ্ছে। জায়গাটা ছিল ধ্বংসস্তূপের একটু নিচে, যেখানে কয়েকটা বড় পাথর একসঙ্গে পড়ে আছে। সেখানে আগুনের দাগ এখনও স্পষ্ট। পাথর কালো হয়ে গেছে। মাটির কিছু অংশও অন্য জায়গার তুলনায় গাঢ়।

মারদেকা ধীরে সেখানে এগিয়ে গেল। “ওখানে কী হয়েছিল?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে একটা পাথর সরাল। নিচে শুকনো মাটি। তারপর আরেকটা পাথর। তার নিচে পোড়া কাঠের টুকরো। “আগুন।”

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকাল। “কে আগুন লাগিয়েছিল?”

লারসেন এবার ধীরে মাথা তুলল। চোখে এমন এক দৃষ্টি, যাতে উত্তর দেওয়ার ইচ্ছা নেই, আবার মিথ্যা বলার অভ্যাসও নেই। “যে আগুন লাগিয়েছিল, সে চেয়েছিল এখানে থাকা সবকিছু শেষ হয়ে যাক।”

মারদেকা আর প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার চোখে প্রশ্নটা রয়ে গেল।

লারসেন দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখল। পাহাড়ের ওপরে, নিচের খাদে, পুরোনো পথের দিকে। ঘোড়ার খুরের শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না। যারা তাদের অনুসরণ করছিল, তারা এখন কোথায় আছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। এই নীরবতাই বরং বেশি বিপজ্জনক।

সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। ভাঙা দেয়ালের পাশে একটা সরু ফাটল। সাধারণ চোখে সেটা পাহাড়ের স্বাভাবিক ফাটল বলেই মনে হবে। কিন্তু লারসেন পাথরের একটা অংশ সরিয়ে দেখাল, ফাটলের ভেতর দিয়ে নিচের দিকে ছোট একটা পথ নেমে গেছে।

মারদেকা নিচু হয়ে তাকাল। অন্ধকার। “এটা কোথায় যায়?”

“ঘরের নিচে।”

মারদেকার চোখ সরু হয়ে গেল। “ঘরের নিচে?” 

লারসেন উত্তর দিল না। সে নিজের কোমর থেকে ছোট একটা ধাতব লণ্ঠন বের করল। তেলের পরিমাণ খুব বেশি নয়। তবু যতটুকু আছে, তাতে কিছুটা আলো পাওয়া যাবে। লণ্ঠন জ্বালিয়ে সে ফাটলের ভেতর আলো ফেলল। নিচে পাথরের সরু সিঁড়ি দেখা গেল। বহু বছরের ধুলোয় প্রায় ঢেকে গেছে। কয়েক জায়গায় সিঁড়ির অংশ ভেঙে পড়েছে।

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল, এই পথ কেউ সম্প্রতি ব্যবহার করেছে। ধুলার ওপর একটা সরু পরিষ্কার রেখা নেমে গেছে। খুব স্পষ্ট নয়। কিন্তু যেখানে অন্য সব জায়গায় ধুলা সমান, সেখানে এই অংশে ধুলা যেন সামান্য ঘষা খেয়েছে। সে নিচু হয়ে তাকিয়ে রইল। 

লারসেন তার চোখের দিক অনুসরণ করল। “দেখেছ?”

মারদেকা মাথা নেড়ে বলল, “কেউ নিচে গেছে।”

“কত আগে?”

মারদেকা আঙুল বাড়িয়ে ধুলার রেখা দেখল। কিছুক্ষণ চিন্তা করল। “আজ। হয়তো গত রাতেও।”

লারসেনের চোখে সন্তুষ্টির ক্ষীণ ছাপ দেখা গেল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেটা মিলিয়ে গেল। সে জানে, পাহাড়ে কোনো চিহ্নকে শুধু একবার দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। 

লারসেন নিজের পিস্তল পরীক্ষা করল। তারপর লণ্ঠনটা নিচু করে ধরল। “আমি আগে যাব।”

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমি কি পেছনে থাকব?”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “তুমি আমাকে অনুসরন করবে। মনে রেখ, আমার পেছন থেকে এক ধাপও এগিয়ে যাবে না।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

তারা ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করল। সিঁড়ির প্রথম কয়েক ধাপ এখনও শক্ত। তারপরই পথ সরু হয়ে এল। দুপাশের পাথরের দেয়াল এত কাছাকাছি যে লারসেনকে কাঁধ সামান্য বাঁকিয়ে চলতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও ছাদের নিচু অংশে মাথা নোয়াতে হচ্ছে। বাতাসে পুরোনো ধুলা, পোড়া কাঠ আর স্যাঁতসেঁতে পাথরের গন্ধ মিশে আছে।

মারদেকা হাঁটতে হাঁটতে চারপাশ শুনছিল। ওপরের পৃথিবীর শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। বাতাসের শব্দ নেই। ঘোড়ার শব্দ নেই। শুধু তাদের পায়ের নিচে পাথরের হালকা ঘর্ষণ।

কিছুদূর নামার পর পথটা দুদিকে ভাগ হলো। লারসেন থামল। ডান দিকের পথ সরু। বাঁ দিকেরটা একটু চওড়া, কিন্তু মাটিতে ধুলা জমে আছে। 

মারদেকা ডানদিকে তাকাল। তারপর বাঁদিকে। “কেউ ডানদিকে গেছে।”

লারসেন তার দিকে তাকাল।

মারদেকা দেয়ালের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ডানদিকের পথের মাটিতে খুব সামান্য কালচে দাগ। সে আঙুল দিয়ে ছুঁল না। শুধু নাকের কাছে এনে বাতাস শুঁকল। “তেল।”

লারসেনের চোখে এবার সতর্কতা ফুটে উঠল। “কীসের?”

“লণ্ঠনের।”

লারসেন ধীরে মাথা নেড়ে ডানদিকের পথ ধরল। পথটা আরও নিচে নেমে গেছে। কয়েক গজ পর একটা ছোট কক্ষের মতো জায়গা পাওয়া গেল। দেয়ালের পাশে পুরোনো কাঠের তাক। অধিকাংশই ভেঙে পড়েছে। মেঝেতে কয়েকটা মরিচাধরা লোহার বাক্স পড়ে আছে। একটা বাক্সের ঢাকনা খোলা। ভেতরে কিছু নেই।

লারসেন একটার পর একটা বাক্স পরীক্ষা করল। কিছুই নেই। তারপর একটা ভাঙা তাকের নিচে হাত ঢুকিয়ে মাটি সরাল। তার আঙুলে একটা ছোট কাগজের টুকরো এল। কাগজের প্রান্ত পুড়ে গেছে।

লারসেন সেটা আলোয় ধরল। লেখা প্রায় মুছে গেছে। তবু একটা শব্দ বোঝা যায়। সে শব্দটা দেখেই স্থির হয়ে গেল। 

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকাল। “কী লেখা?”

লারসেন কাগজটা মুঠোয় ভাঁজ করে ফেলল। “পুরোনো হিসাব।”

“কিসের?”

লারসেন এবার উত্তর দিল না।

মারদেকা বুঝল, সে কিছু লুকাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রশ্ন করে কোনো লাভ নেই। তারা আবার এগিয়ে গেল।

কক্ষের শেষ দিকে একটা পাথরের দেয়াল। দেয়ালের মাঝখানে ছোট লোহার দরজা। দরজাটা এত নিচু যে একজন মানুষকে প্রায় ঝুঁকে ঢুকতে হবে। লোহার গায়ে মরিচা। কিন্তু তালার জায়গাটা আশ্চর্যজনকভাবে পরিষ্কার।

লারসেন হাত বাড়িয়ে তালাটা ছুঁল। তালা নতুন। পুরোনো দরজায় নতুন তালা। এটা অবশ্যই বিপজ্জনক লক্ষণ।

লারসেন পিস্তল বের করল। মারদেকাকে দেয়ালের পাশে সরে দাঁড়াতে ইশারা করল। তারপর তালাটা খুব ধীরে পরীক্ষা করল। তালার ধাতুতে সামান্য আঁচড়ের দাগ। কেউ তাড়াহুড়ো করে খুলেছে বা বন্ধ করেছে।

লারসেন পকেট থেকে পাতলা ধাতব একটা সরঞ্জাম বের করল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তালা খুলে গেল। দরজা ঠেলে খোলার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এল।

ঘরটা অন্য সব জায়গার চেয়ে বড়। মাটির বদলে পাথরের মেঝে। দেয়ালের পাশে কাঠের কয়েকটা বাক্স। ছাদের কাছাকাছি ছোট বাতাস চলাচলের ফাঁক। লারসেন লণ্ঠনটা উঁচু করতেই দেয়ালে কিছু চিহ্ন দেখা গেল। 

একটা। দুটো। তারপর আরও কয়েকটা। কালচে ধাতব চাকতির সেই একই চিহ্ন।

মারদেকা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তার বুকের ভেতর আবার চাপ তৈরি হচ্ছে। চিহ্নগুলোর দিকে তাকালেই তার মাথার মধ্যে যেন পুরোনো কোনো দরজা খুলে যাচ্ছে। সে দেয়ালের একটা চিহ্নের সামনে দাঁড়াল। তার চোখের সামনে হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠল।

একজন মানুষ একটা বাক্স বন্ধ করছে। আরেকজন বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। 
কেউ বলছে, “সময় নেই।” তারপর সেই একই নীল কাপড়। 

মারদেকা চোখ বন্ধ করে ফেলল। এক মুহূর্ত পর সে আবার বর্তমানের অন্ধকার ঘরে ফিরে এল।

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। “কী দেখেছ?”

মারদেকা এবার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। “দুজন লোক ছিল।”

লারসেনের মুখ শক্ত হলো। “আর?”

“একটা বাক্স।”

“কেমন বাক্স?”

“লোহার।”

মারদেকা কপাল চেপে ধরল। স্মৃতিটা যেন ধরা দিচ্ছে, আবার হাত ফসকে চলে যাচ্ছে। “আর একজনের গায়ে নীল কাপড় ছিল।”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। তারপর সে ঘরের সবচেয়ে বড় বাক্সটার দিকে এগিয়ে গেল। বাক্সটা মাটির সঙ্গে আটকে আছে। লোহার তৈরি। সামনে পুরোনো তালা। লারসেন তালাটা পরীক্ষা করল। এই তালাটা পুরোনো। বহু বছর ধরে খোলা হয়নি বলেই মনে হয়। কিন্তু বাক্সের ওপর ধুলা জমলেও তালার চারপাশে সামান্য ঘষার দাগ রয়েছে। কেউ সম্প্রতি এটা খোলার চেষ্টা করেছে।

লারসেন হাত বাড়িয়ে বাক্সের ঢাকনা ছুঁল। তার চোখে বহু বছরের পুরোনো স্মৃতি ফিরে এল। সে যেন আবার সেই রাত দেখতে পেল। আগুন। চিৎকার। দৌড়ানো ঘোড়া। আর একজন মানুষের মুখ। সে চোখ বন্ধ করল। 

মারদেকা কিছু বলল না। ঠিক তখনই ওপরে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ হলো। পাথরের ওপর ঘোড়ার খুর। একবার। তারপর আরেকবার।

লারসেন লণ্ঠনের আলো নিভিয়ে দিল। ঘর মুহূর্তে অন্ধকারে ডুবে গেল। 

মারদেকা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। 

ওপর থেকে এবার মানুষের পায়ের শব্দ ভেসে এল। একজন নয়। কমপক্ষে দুজন। তারপর একটা ভারী শব্দ হলো, যেন কেউ ভাঙা কাঠের ওপর পা রাখল।

লারসেন মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। তাকে দেয়ালের সঙ্গে মিশে দাঁড়াতে ইশারা করল। তারপর নিজে দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

উপরে কেউ কথা বলছে। শব্দ অস্পষ্ট। তারপর একটা বাক্য ভেসে এল। “ওরা নিচে গেছে।”

আরেকজন উত্তর দিল, “তাহলে বের হওয়ার পথ বন্ধ করো।”

মারদেকার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। লারসেনের চোখে এবার সেই ঠান্ডা ছবিটা ফিরে এসেছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় একটা ব্যাপার ঘটেছে। এই লোকগুলো শুধু জানে যে তারা আশ্রয়ে এসেছে তা নয়। তারা জানে, নিচে যাওয়ার পথ কোথায়। 

আর লারসেন বুঝতে পারল, বহু বছর আগে যে গোপন পথ দিয়ে সে পালিয়ে বেঁচেছিল, সেই পথের খবর এতদিনেও কারও কাছে হারিয়ে যায়নি।

অন্ধকার ঘরের এক কোণে হঠাৎ খুব ক্ষীণ একটা ধাতব শব্দ হলো। মারদেকা ঘুরে তাকাল। বাক্সগুলোর পেছনে আরেকটা সরু দরজা। দরজাটা আগে দেখা যায়নি।

লারসেনও সেটা দেখেছে। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল। তারপর সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে আঙুল ঠোঁটে তুলল। 

ওপরে তখন পায়ের শব্দ আরও কাছে আসছে। আর নিচে, বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা সেই গোপন দরজার ওপাশ থেকে, খুব ধীরে কেউ একজন তিনবার টোকা দিল। টক। টক। টক। 

তিনটি শব্দ অন্ধকার পাথরের ঘরের ভেতর এমনভাবে প্রতিধ্বনিত হলো, যেন বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা পাহাড়ের বুক হঠাৎ নিঃশ্বাস নিয়েছে। মারদেকা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ তখন অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে এসেছে। লণ্ঠন নিভে যাওয়ার পরও দরজাটার অস্পষ্ট রেখা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে লারসেনের মুখের পরিবর্তন। এতক্ষণ যে মানুষটির চোখে বিপদের ঠান্ডা সংকেত ছিল, সেই চোখে এখন অন্য কিছু। বিস্ময় নয়, ভয়ও নয়। বরং এমন এক স্মৃতি, যেটাকে সে বহু বছর ধরে নিজের ভেতর পুঁতে রেখেছিল এবং আজ সেই স্মৃতি পাথরের অন্ধকার ফুঁড়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

মারদেকা ধীরে লারসেনের কাছে এগিয়ে এল। লারসেন হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। তার দৃষ্টি সরু দরজাটার ওপর স্থির। বাইরে তখন পায়ের শব্দ। ওপরের লোকগুলো ধীরে ধীরে নিচে নামছে। পাথরের সিঁড়িতে বুটের ঘর্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দুজন লোক। হয়তো তারও বেশি। কিন্তু তাদের শব্দ শুনে মনে হচ্ছে, তারা তাড়াহুড়ো করছে না। তারা জানে, শিকার পালাতে পারবে না। এই নিশ্চয়তাই লারসেনকে বেশি চিন্তিত করল।

দরজার ওপাশে আবার শব্দ হলো। এবার টোকা নয়। কাঠের ওপর নখ বা ধাতব কোনো কিছুর হালকা ঘষা। তারপর নীরবতা। 

লারসেন খুব নিচু গলায় বলল, “কে?” 

কয়েক মুহূর্ত কোনো উত্তর এল না। তারপর ভেতর থেকে এমন এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, যেটা বয়সে ভাঙা, কিন্তু আশ্চর্যভাবে স্থির। “যে মানুষটা এখনও তোমাকে অপেক্ষা করছে।” 

লারসেনের শরীর যেন মুহূর্তের জন্য জমে গেল। 

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারছে, এই কণ্ঠস্বর লারসেনের পরিচিত। খুব পরিচিত। 

ওপরে তখন একটা কাঠ ভাঙার শব্দ হলো। তারপর মানুষের গলা। “নিচে খুঁজে দেখো। ওরা এখানেই আছে।”

লারসেন আর সময় নষ্ট করল না। সে দরজার কাছে গিয়ে নিচু হয়ে লোহার হাতলটা পরীক্ষা করল। হাতল নেই। ভেতরের দিকে পাথরের দেয়ালে ছোট একটা লোহার রিং। লারসেন সেটায় হাত রাখতেই দরজাটা সামান্য কেঁপে উঠল।

ভেতর থেকে কেউ আবার বলল, “দেরি করলে তোমার জন্যও পথ থাকবে না।”

লারসেন এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল। তারপর মারদেকার দিকে তাকাল। “ভেতরে যাবে।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। 

“যা দেখবে, কিছু ছুঁবে না।”

“আর আপনি?”

লারসেন পেছনের অন্ধকার সিঁড়ির দিকে তাকাল। “আমাকে যা করতে হবে, সেটা আমিই করব।”

মারদেকা বুঝল, এর অর্থ সে যা ভাবছে তার চেয়েও বেশি বিপদ সামনে আছে। তবু সে আর প্রশ্ন করল না। লারসেন দরজাটা সামান্য ঠেলে খুলে দিল। ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস এসে দুজনের মুখে লাগল। দরজার ওপাশে এত সরু একটা পথ যে পাশাপাশি হাঁটার উপায় নেই। মাটির বদলে পাথর। ছাদের উচ্চতা কম। কিছু জায়গায় মাথা নিচু করে যেতে হবে।

লারসেন প্রথমে ঢুকল। মারদেকা তার পেছনে। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। অন্ধকার আবার তাদের গিলে ফেলল।

কয়েক গজ এগিয়ে লারসেন থামল। সে পকেট থেকে ছোট একটা দেশলাই বের করল, কিন্তু জ্বালাল না। বরং হাত দিয়ে দেয়াল পরীক্ষা করতে লাগল। পাথরের ওপর পুরোনো আঁচড়। কোথাও কোথাও ক্ষীণ খোদাই। মারদেকা হাত বাড়িয়ে একটার কাছে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু লারসেন তাকে থামাল।

ছেলেটা হাত সরিয়ে নিল। পেছন থেকে খুব ক্ষীণ শব্দ এলো। যেন দরজার বাইরে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। তারপর ধাতুর ঘর্ষণ। কেউ তালা পরীক্ষা করছে।

লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে উঠল। “ওরা দরজা পেয়ে গেছে।”

মারদেকা ফিসফিস করে বলল, “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

“যেখানে এই পথ শেষ হয়।”

“আপনি জানেন?”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। “একসময় জানতাম।”

তারা আবার এগিয়ে গেল। পথটা ক্রমে নিচে নামছে। কয়েক জায়গায় পাথরের সিঁড়ি এতটাই ক্ষয়ে গেছে যে পা রাখার জায়গা বোঝা কঠিন। লারসেন এক পা করে যাচ্ছিল। মারদেকা তার পায়ের দাগ অনুসরণ করছিল। কিছু দূর পর বাতাস বদলে গেল। স্যাঁতসেঁতে গন্ধ কমে গিয়ে ঠান্ডা, শুকনো বাতাসের গন্ধ পাওয়া গেল।

মারদেকা বুঝল, তারা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে অন্য কোনো দিকে যাচ্ছে।

হঠাৎ তার মাথার মধ্যে একটা দৃশ্য ঝলকে উঠল। একটা ছোট আলো। একজন লোক দেয়ালে হাত রেখে হাঁটছে। তার গায়ে গাঢ় নীল কাপড়। হাতে একটা ধাতব চাকতি। লোকটা পেছনে তাকাচ্ছে। মারদেকা থেমে গেল। 

লারসেনও থামল। “কী হলো?”

মারদেকা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার শ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। “আবার দেখলাম।”

“কী?”

“এই পথ।”

লারসেনের চোখ সরু হলো। “তুমি এই পথ দেখেছ?”

মারদেকা ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “আগে। কিন্তু তখন আমি ছোট ছিলাম।”

লারসেন কিছু বলল না। তার ভেতরে এখন একটার পর একটা হিসাব চলছে। মারদেকার বয়স যখন এত কম ছিল, তখন সে কোথায় ছিল? এই আশ্রয়ে সে কীভাবে এসেছিল? কে তাকে এখানে এনেছিল? আর কেন তার স্মৃতির মধ্যে সেই সংগঠনের গোপন পথ রয়েছে?

প্রশ্নগুলো এখন আর আলাদা নয়। একে অপরকে ধরে একটা অদৃশ্য জালের মতো শক্ত হয়ে উঠছে। 

পথের শেষে একটা পাথরের দেয়াল দেখা গেল। তার নিচে সামান্য ফাঁক। বাইরে থেকে বাতাস আসছে। লারসেন হাঁটু গেড়ে বসে ফাঁকটা পরীক্ষা করল। পাথর সরানোর জায়গা আছে। সে দুহাতে চাপ দিল। বহু বছরের ধুলো ঝরে পড়ল। তারপর পাথরটা সামান্য নড়ল।

লারসেন আরও জোর দিল। একটা সরু ফাঁক তৈরি হলো। বাইরের আলো ভেতরে ঢুকে পড়ল। 

মারদেকা চোখ কুঁচকে গেল। তারা পাহাড়ের অন্য পাশে এসে উঠেছে।

ফাঁকটা ছিল একটা খাড়া ঢালের নিচে, যেখানে বড় বড় পাথর প্রাকৃতিকভাবে একটার ওপর আরেকটা পড়ে একটা গুহার মতো জায়গা তৈরি করেছে। নিচে গভীর খাদ। তার ওপারে পাহাড়ের ঢাল। দূরে শুকনো নদীর মতো একটা সাদা রেখা দেখা যাচ্ছে।

লারসেন প্রথমে বেরিয়ে চারপাশ পরীক্ষা করল। তারপর মারদেকাকে ইশারা করল। 

দুজন বাইরে এল। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। পেছনে সেই গোপন পথ। সামনে খোলা পাহাড়। 

কিন্তু লারসেনের চোখ তখন নিচের ঢালের দিকে। সেখানে একটা ঘোড়া বাঁধা।

ঘোড়াটা কালো নয়, বাদামি। তার গায়ে ঘামের দাগ। লাগাম নতুন। জিনও নতুন। তার মানে কেউ এখানে এসেছে এবং খুব বেশিক্ষণ আগে যায়নি।

লারসেন ঘোড়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। জিনের পাশে হাত বুলিয়ে দেখল। তারপর ঘোড়ার পায়ের দিকে তাকাল। “ওরা এখানে আসেনি,” সে বলল।

মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল।

লারসেন নিচের মাটির দিকে ইশারা করল। সেখানে ঘোড়ার খুরের দাগ। কিন্তু দাগগুলো গুহার দিকে এসেছে। ফিরে যাওয়ার কোনো চিহ্ন নেই।

“ঘোড়াটা কার?”

লারসেন উত্তর দিল না। সে জিনের নিচে হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট চামড়ার থলে বের করল। থলেটা খুব সাধারণ। কিন্তু লারসেন সেটা হাতে নিয়েই চিনে ফেলল। তার আঙুল শক্ত হয়ে গেল।

মারদেকা বুঝতে পারল, আবার কোনো পুরোনো স্মৃতি তাকে আঘাত করেছে।

লারসেন থলেটা খুলল। ভেতরে একটা ভাঁজ করা কাগজ। আর একটা ছোট ধাতব পাত। ধাতব পাতটা হাতে নিয়েই তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। সেটার ওপর খোদাই করা ছিল তিনটি ছোট দাগ এবং নিচে একটা অক্ষর। 

লারসেন সেটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

“এটা কী?” মারদেকার প্রশ্ন করলো।

কিন্তু উত্তর এল না। লারসেন কাগজটা খুলল। কাগজে মাত্র কয়েকটি লাইন লেখা। বেশিরভাগই মুছে গেছে। কিন্তু নিচের অংশ স্পষ্ট।

লারসেন পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে গেল। তারপর কাগজটা ভাঁজ করে ফেলল।

মারদেকা এবার তার হাতের দিকে তাকাল। “কী লেখা ছিল?”

লারসেন ধীরে বলল, “যে রাতে আগুন লেগেছিল, সেই রাতে এখানে তিনজন মানুষ ছিল না।”

মারদেকা কিছু বলল না। 

“চারজন ছিল।” পাহাড়ের বাতাস হঠাৎ যেন আরও ঠান্ডা হয়ে গেল। লারসেন দূরের দিকে তাকিয়ে রইল। “আমি এত বছর ধরে একজনকে ভুলে ছিলাম।”

মারদেকার চোখে প্রশ্ন। “কে?”

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “যে মানুষটা তোমাকে নিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।”

মারদেকা স্থির হয়ে গেল। তার মাথার ভেতর যেন একটা দরজা খুলে গেল। আগুন। ধোঁয়া। একজন মানুষ তার হাত ধরে টানছে। কাঠের দরজা। নীল কাপড়। আর সেই কণ্ঠস্বর। “দৌড়াও!”

মারদেকা হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে। চোখের সামনে দৃশ্যগুলো এবার আগের চেয়ে পরিষ্কার। সে দেখতে পাচ্ছে, আগুনে জ্বলছে ঘরের একটা অংশ। একজন মানুষ পড়ে আছে। আরেকজন লোক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। তার গায়ে গাঢ় নীল কাপড়। কিন্তু এবার মুখটাও যেন সামান্য দেখা যাচ্ছে।

মারদেকা চোখ খুলে ফেলল। “আমি তাকে চিনি।”

লারসেন নিচু হয়ে তার সামনে বসে পড়ল। “কাকে?”

মারদেকা উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে যতই মনে করার চেষ্টা করছে, মুখটা ততই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। 

ঠিক তখনই পাহাড়ের ওপর থেকে একটা বন্দুকের গুলির শব্দ হলো। ধুম্ শব্দটা পাথরে প্রতিধ্বনিত হয়ে কয়েকবার ফিরে এল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মারদেকাকে টেনে পাথরের আড়ালে নিয়ে গেল। আরেকটা গুলি। পাথরের গায়ে আঘাত লেগে ছোট ছোট টুকরো ছিটকে পড়ল।

লারসেন পাথরের আড়াল থেকে সামান্য মাথা তুলল। দূরের ঢালে দুটো কালো ছায়া দেখা যাচ্ছে। তারা নিচের দিকে নামছে। একজনের হাতে রাইফেল। আরেকজন ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে।

মারদেকা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।

লারসেন তার কানে ফিসফিস করে বলল, “ওরা আমাদের দেখেছে।”

মারদেকা পাথরের ফাঁক দিয়ে দূরের লোকগুলোর দিকে তাকাল। একজন ঘোড়ায় উঠেছে। অন্যজন পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে। তারপর ঘোড়সওয়ার লোকটি হাত তুলল। তার কবজির কাছে গাঢ় নীল কাপড়।

মারদেকার বুকের ভেতর আবার সেই পুরোনো শব্দ বাজল। দৌড়াও।

কিন্তু এবার সেই শব্দের সঙ্গে আরেকটা শব্দও মিশে গেল। একটা নাম। খুব ক্ষীণ। প্রায় শোনা যায় না। মারদেকা চোখ বন্ধ করল। কিন্তু, তার ঠোঁট নড়ল। “এলিয়াস...”

লারসেন যেন বজ্রাঘাতে স্থির হয়ে গেল। “কী বললে?”
 
মারদেকা নিজেও বুঝতে পারছে না সে কী বলেছে। “আমি... একটা নাম শুনেছি।”

লারসেনের মুখ থেকে রক্ত সরে গেল। 

“এলিয়াস।” সে নামটা খুব ধীরে উচ্চারণ করল।

তারপর বহু বছর পর প্রথমবারের মতো লারসেনের চোখে এমন ভয় দেখা গেল, যা আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কারণ এলিয়াস ছিল সেই মানুষ, যাকে লারসেন মৃত বলে জানত।

আর যদি মারদেকার স্মৃতিতে এখনও তার নাম বেঁচে থাকে, তাহলে তার অর্থ একটাই। সেই রাতের আগুনে সবাই মারা যায়নি।

লারসেন পাথরের আড়াল থেকে নিজের পিস্তল বের করল। দূরের লোকগুলো এখন ঢাল বেয়ে নিচে নামছে। তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। তারা শুধু আশ্রয় পাহারা দিতে আসেনি। তারা কাউকে খুঁজছে।

আর লারসেন এখন বুঝতে পারছে, বহু বছর আগে যে মানুষটাকে সে হারিয়ে ফেলেছিল, সেই মানুষ হয়তো এতদিন ধরে এই পাহাড়ের ছায়াতেই বেঁচে ছিল।

মারদেকা তার দিকে তাকাল। “এলিয়াস কে?”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “আমার সবচেয়ে বড় ভুল।”

পরের মুহূর্তেই দূরে আবার গুলির শব্দ উঠল।

লারসেন মারদেকার কাঁধ ধরে তাকে পাহাড়ের নিচের সরু পথের দিকে ঠেলে দিল। “দৌড়াও।”

মারদেকা এক মুহূর্ত থমকে গেল। এই শব্দটাই সে এতদিন ধরে তার স্মৃতির অন্ধকারে শুনে এসেছে। দৌড়াও।

কিন্তু এবার সেই শব্দ তার নিজের স্মৃতি থেকে আসেনি।  এসেছে লারসেনের মুখ থেকে। 
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/267766/</link>
				<pubDate>Mon, 31 Aug 2026 03:40:03 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২২<br />
দুপুরের সূর্য তখন পাহাড়ের মাথার ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিমে নামতে শুরু করেছে। পুরোনো আশ্রয়ের ধ্বংসস্তূপের চারপাশে আলো আর ছায়ার অদ্ভুত খেলা চলছে। কোথাও পাথরের গায়ে রোদ এত তীব্র যে চোখ মেলে তাকানো কঠিন, আবার তার পাশেই কয়েক হাত দূরে এমন গাঢ় ছায়া, যেন দিনের আলো সেখানে কোনোদিন পৌঁছায়নি।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-267766"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/267766/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">2311d21505933b869e8acbca36e91fca</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২১
সকালের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই লারসেন ঘুম থেকে উঠে পড়েছিল। আসলে ঘুম থেকে ওঠার প্রশ্নই ছিল না। রাতের শেষ প্রহর থেকে সে বিছানায় শুয়ে ছিল, কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই বহু বছরের পুরোনো কিছু দৃশ্য তার মাথার ভেতর ফিরে আসছিল। আগুনের লাল আলো, পাহাড়ের গায়ে কালো ছায়া, ছুটে চলা ঘোড়ার খুরের শব্দ, আর অন্ধকারের মধ্যে কারও চিৎকার। সেই চিৎকারের শব্দ এখন আর পরিষ্কারভাবে মনে পড়ে না তার। বহু বছর ধরে স্মৃতি নিজেই যেন কিছু অংশ মুছে দিয়েছে। কিন্তু এমন কিছু রাত আছে, যেগুলো মানুষ যতই ভুলে যেতে চায়, শেষ পর্যন্ত তারাই আবার ফিরে আসে।

ঘরের বাইরে তখন ভোরের ঠান্ডা বাতাস বইছিল। দূরের পাহাড়গুলো ধূসর অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশের পূর্ব দিকটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে উঠছে, কিন্তু সূর্যের দেখা এখনও নেই। র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে রাতের শিশির জমে আছে। ঘোড়াগুলোর আস্তাবল থেকে মাঝে মাঝে নাক ঝাড়ার শব্দ ভেসে আসছে। কোথাও একটা কাঠের দরজা বাতাসে সামান্য কেঁপে উঠল।

লারসেন বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গেল। দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। গতকাল সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বহু বছর ধরে যে পথের কথা মনে পড়লেই তার বুকের ভেতর একটা ভারী পাথর নেমে বসত, এবার সেই পথেই ফিরে যেতে হবে। পার্থক্য শুধু একটাই। বহু বছর আগে সে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছিল। এবার সে সেখানে যাচ্ছে নিজের ইচ্ছায়।

কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে মারদেকা। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার মনে দ্বিধা ছিল। এখনও আছে। ছেলেটাকে বিপদের দিকে নিয়ে যাওয়া ঠিক কি না, সে প্রশ্নের উত্তর লারসেন নিজের কাছেও পুরোপুরি দিতে পারেনি। অথচ মারদেকাকে র&#x200d;্যাঞ্চে রেখে যাওয়ার কথাও এখন আর ভাবতে পারছে না। যারা গতকাল র&#x200d;্যাঞ্চে এসেছিল, তারা ছেলেটাকে দেখেছে। তারা তার ব্যাপারে জানতে চেয়েছে। এর অর্থ একটাই, মারদেকা এখন আর এই ঘটনার বাইরে নেই।

বরং হয়তো সে কোনোদিনই বাইরে ছিল না। 

টেবিলের ওপর রাখা দুটি কালচে ধাতব চাকতির দিকে তার চোখ গেল। দুটি চাকতি পাশাপাশি রাখা। একটির ওপরের চিহ্ন অন্যটির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, কিন্তু তাদের মধ্যে এমন একটা মিল আছে যা কেবল পুরোনো নিয়ম জানা মানুষই বুঝতে পারবে। লারসেনের আঙুল ধীরে ধীরে একটি চাকতির ওপর গিয়ে থামল। ঠান্ডা ধাতুর স্পর্শে তার মনে হলো, সে যেন বহু বছর পেছনে ফিরে গেছে।

সে হাত সরিয়ে নিল। এখন অতীত মনে করার সময় নয়। এবার অতীতের কাছে যাওয়ার সময়। দরজার বাইরে হালকা একটা শব্দ হলো। 

লারসেন ঘুরে দাঁড়াল। “ভেতরে আসো।”

দরজা খুলে মারদেকা ঢুকল। ছেলেটা পুরোপুরি তৈরি। পায়ে পুরোনো বুট, কোমরে ছুরি, গায়ে মোটা কাপড়ের জ্যাকেট। তার চুল এখনও পুরোপুরি আঁচড়ানো হয়নি। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ আছে। লারসেন বুঝল, সেও রাতে খুব বেশি ঘুমায়নি।

মারদেকা ঘরে ঢুকে প্রথমেই টেবিলের ওপর রাখা চাকতি দুটির দিকে তাকাল। তার চোখে সেই অদ্ভুত পরিবর্তন আবার দেখা গেল। 

লারসেন সেটা লক্ষ্য করল। “কিছু মনে পড়ছে?”

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে চাকতিগুলোর একটিকে ছুঁতে গিয়েও থেমে গেল। “কাল রাতেও মনে করার চেষ্টা করেছি।”

লারসেন অপেক্ষা করল।

“কিন্তু যতবার মনে করতে যাই, সবকিছু যেন কুয়াশার মধ্যে চলে যায়।” ছেলেটা জানালার দিকে তাকাল। বাইরে পাহাড়ের দিকে। “শুধু সেই কথাটা শুনতে পাই।”

লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে উঠল। “দৌড়াও?”

মারদেকা ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। ঘরের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।

লারসেন টেবিল থেকে দুটি চাকতি তুলে নিল। সেগুলো আলাদা আলাদা কাপড়ে জড়িয়ে নিজের ভেতরের জ্যাকেটের পকেটে রেখে দিল। তারপর মারদেকার দিকে তাকাল। “আমরা বের হব।”

মারদেকার চোখ উঠল। “কোথায়?”

“যেখানে হয়তো তোমার প্রশ্নের কিছু উত্তর আছে।”

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “সেই পাহাড়ি আশ্রয়ে?”

লারসেন তার দিকে তাকাল। ছেলেটা এখন আগের চেয়ে অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। তাকে সব কথা বলে দিতে হয় না। বললো, “হ্যাঁ।”

মারদেকা আর কোনো প্রশ্ন করল না।

লারসেন ভেবেছিল, ছেলেটা হয়তো ভয় পাবে। হয়তো দ্বিধা করবে। কিন্তু তার চোখে ভয় নেই। আছে অপেক্ষা। এমন এক ধরনের অপেক্ষা, যা মানুষ তখনই অনুভব করে যখন সে বুঝতে পারে, বহুদিন ধরে যার উত্তর খুঁজছে, সেই উত্তর হয়তো খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। “তোমার ছুরিটা আছে?”

মারদেকা কোমরের দিকে হাত দিল। “আছে।”

“ঠিক আছে। কিন্তু মনে রেখো, ছুরি থাকার অর্থ এই নয় যে তোমাকে তা ব্যবহার করতে হবে।”

মারদেকা সামান্য মাথা নেড়ে বলল। “আমি জানি।”

লারসেনের মুখে ক্ষীণ একটা পরিবর্তন এল। সে জানত, ছেলেটা কথাটা মুখস্থ করে বলছে না। গত কয়েক মাসে সে অন্তত এটুকু শিখেছে। অস্ত্র হাতে থাকলে মানুষ শক্তিশালী হয় না। অনেক সময় অস্ত্র হাতে থাকার কারণেই মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।

বাইরে তখন র&#x200d;্যাঞ্চ ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। লারসেন দরজা খুলে বেরিয়ে এল। ঠান্ডা বাতাস তার মুখে লাগল। আকাশের কিনারায় সূর্যের প্রথম আলো দেখা দিয়েছে। ঘাসের ওপর শিশির চিকচিক করছে। আস্তাবলের সামনে একজন লোক ঘোড়ার জিন ঠিক করছে। রান্নাঘরের দিক থেকে ধোঁয়া উঠছে।

ইলাই আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে বড় একটা কফির পাত্র নামাচ্ছিল। লারসেনকে দেখে বৃদ্ধ মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গেল, সে খবরটা জানে।

র&#x200d;্যাঞ্চে কোনো খবর বেশিক্ষণ গোপন থাকে না। বিশেষ করে যখন আগের দিন সাতজন সশস্ত্র অচেনা লোক এসে লারসেনের সঙ্গে কথা বলে চলে যায়।

ইলাই কিছুক্ষণ লারসেনের দিকে তাকিয়ে রইল। “সত্যিই যাচ্ছ?”

লারসেন থামল। “হ্যাঁ।”

বৃদ্ধ এবার মারদেকার দিকে তাকাল। তারপর আবার লারসেনের দিকে।

“ওকেও সাথে নেবে?”

লারসেন মাথা ঝাঁকালো।

ইলাইয়ের মুখের ভাঁজগুলো যেন আরও গভীর হয়ে গেল। সে জানত, মারদেকা আর সেই পাহাড়ি ছেলে নেই, যে প্রথমদিকে মানুষের ভিড় দেখলে দূরে দাঁড়িয়ে থাকত। কিন্তু তবু তার চোখে মারদেকা এখনও সেই ছেলেই। “পাহাড় এখন আগের মতো নেই, লারসেন।”

লারসেন শান্ত গলায় বলল, “আমিও আগের মতো নেই।”

ইলাই কিছু বলল না। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর সে ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল একটা কাপড়ে মোড়ানো খাবারের পুঁটলি হাতে নিয়ে। “খালি পেটে রহস্য খুঁজতে যেও না।” 

মারদেকার মুখে সামান্য হাসি ফুটল। ইলাই পুঁটলিটা তার হাতে দিল।

র&#x200d;্যাঞ্চের অন্য পাশে বাড দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে কফির মগ। কিন্তু সে কফি খাচ্ছিল না। লারসেন ও মারদেকাকে দেখেই সে ধীরে এগিয়ে এল। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা গেল, এই যাত্রার ব্যাপারে সে সন্তুষ্ট নয়। তবু সে জানে, লারসেন একবার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে বদলানো কঠিন। “কখন ফিরবেন?”

লারসেন বলল, “ফিরে আসার মতো কিছু হাতে পেলেই ফিরব।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি লোকজনকে পাহাড়ের দিকে নজর রাখতে বলেছি। গতকালের দলটা চলে গেছে, কিন্তু তাদের আশপাশে আরও লোক ছিল।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “জানি।”

“ক্লে আর হ্যাঙ্ক পাহারার ব্যবস্থা দেখছে। রুবেন ব্ল্যাক রিভারের দিকে একজনকে পাঠিয়েছে। শহরে কোনো খবর পাওয়া গেলে জানানো হবে।”

লারসেন এবার বাডের দিকে তাকাল। র&#x200d;্যাঞ্চে না থাকলেও সবকিছু ঠিকভাবে চলবে, এই বিশ্বাস সে বাডের ওপর রাখতে পারে। বহু বছর ধরে মানুষটাকে সে দেখেছে। বাড খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু বিপদের সময় তার মাথা ঠান্ডা থাকে। “র&#x200d;্যাঞ্চটা সামলিও।”

বাড মৃদু গলায় বলল, “সেটা নিয়ে ভাববেন না।” তারপর চোখ গেল মারদেকার দিকে। “আর তুমি, লারসেন যা বলবে, তার বাইরে এক পা-ও যেও না।”

লারসেন ঘুরে আস্তাবলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। দুটি ঘোড়া আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। একটি বড়, ধূসর রঙের ঘোড়া, লারসেনের। অন্যটি অপেক্ষাকৃত ছোট, কিন্তু পাহাড়ি পথে চলার জন্য শক্তপোক্ত। মারদেকা গত কয়েক মাস ধরে ঘোড়াটিকে চালিয়েছে। প্রাণীটি তার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

মারদেকা নিজের জিন পরীক্ষা করল। লারসেন দূর থেকে তাকিয়ে ছিল।

ছেলেটা প্রথমে লাগাম দেখল, তারপর জিনের নিচের বাঁধন। এরপর পায়ের রেকাব। এই সবকিছু এখন সে আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করে। আগে ঘোড়ায় উঠতে পারলেই তার কাছে যথেষ্ট ছিল। এখন সে জানে, পাহাড়ে ছোট ভুলও বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে।

লারসেন ধীরে বলল, “কী দেখছ?”

মারদেকা মাথা না তুলেই বলল, “বাঁধনটা একটু ঢিলা।”

লারসেন কাছে এসে পরীক্ষা করল। বাঁধন সত্যিই ঢিলা ছিল। সে কিছু বলল না। শুধু নিজের ঘোড়ার দিকে এগিয়ে গেল।

মারদেকা লারসেনের মুখের দিকে তাকাল। প্রশংসা পাবে বলে অপেক্ষা করছিল না সে, কিন্তু বুঝতে পারল, লারসেন দেখেছে।

কিছুক্ষণ পর দুজন ঘোড়ায় চড়ে রওনা হলো। র&#x200d;্যাঞ্চের লোকেরা দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

বাড বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে। ক্লে আস্তাবলের পাশে। হ্যাঙ্ক বেড়ার কাছে। এলাই রান্নাঘরের দরজায়। সকালের আলো তখন র&#x200d;্যাঞ্চের কাঠের দেয়াল, ঘোড়ার পিঠ আর ধুলোমাখা পথের ওপর পড়ছে।

মারদেকা একবার পেছনে তাকাল। তারপর সামনে। র&#x200d;্যাঞ্চ ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।

প্রথম দিকে পথটা পরিচিত ছিল। খোলা জমি, শুকনো ঘাস, নিচু ঝোপ আর মাঝে মাঝে পাথরের স্তূপ। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর ভূমির রং বদলাতে শুরু করল। জমি উঁচু-নিচু হয়ে গেল। দূরের পাহাড়গুলো আর শুধু দৃশ্যের অংশ নয়, ধীরে ধীরে তাদের সামনে দেয়ালের মতো উঠে দাঁড়াতে লাগল।

লারসেন খুব বেশি কথা বলছিল না। মারদেকাও না। তাদের ঘোড়ার খুরের শব্দ, চামড়ার জিনের কড়কড় শব্দ আর মাঝে মাঝে বাতাসে শুকনো ঘাসের দুলে ওঠার আওয়াজ, এই ছিল পথের প্রধান সঙ্গী।

কিছুদূর যাওয়ার পর লারসেন পথ থেকে সামান্য সরে গিয়ে একটা শুকনো খাতের ধারে থামল। 

মারদেকা তার পেছনে এসে ঘোড়া থামাল। “কিছু হয়েছে?”

লারসেন ঘোড়া থেকে নামল না। নিচের মাটির দিকে তাকাল। “হয়েছে কি না, সেটা তুমি বলো।”

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে এল। 

লারসেন কিছুটা দূরে সরে গেল। 

এটা পরীক্ষা, মারদেকা বুঝতে পারল। সে মাটির কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। শুকনো মাটি। তার ওপর ছড়িয়ে আছে পুরোনো ঘাস। প্রথম দেখায় কিছুই চোখে পড়ার কথা নয়। কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করল না।

লারসেন তাকে একটা জিনিস বারবার শিখিয়েছে, যে মানুষ প্রথম দেখাতেই উত্তর পেয়ে যায়, সে সাধারণত ভুল উত্তর পায়। 

মারদেকা মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হাত দিয়ে না ছুঁয়ে চোখ দিয়ে একটা রেখা অনুসরণ করল। খাতের কিনারায় দুটো ছোট পাথর সরে গেছে। তার পাশে ঘাসের মাথা ভাঙা। আরও একটু দূরে শুকনো মাটিতে চাপ পড়েছে। সে ধীরে উঠে দাঁড়াল। “এখান দিয়ে লোক গেছে।”

লারসেন জিজ্ঞেস করল, “কতজন?”

মারদেকা আবার নিচে তাকাল। “একজন না।”

সে কয়েক কদম সামনে এগোল। “তিনজন। হয়তো চারজন।”

লারসেন এবার ঘোড়া থেকে নেমে এল। সে মাটির দিকে তাকাল, তারপর মারদেকার দিকে। নিচু হয়ে একটা চিহ্ন পরীক্ষা করল। “তুমি তিন বা চারজন বলেছ। কেন?”

মারদেকা শুকনো খাতের দিকে ইঙ্গিত করল। “ওরা একই জায়গা দিয়ে যায়নি। একজন একটু ভারী। তার পায়ের চাপ বেশি। আরেকজন পাথরের ওপর দিয়ে গেছে।”

লারসেন কিছু বলল না। তার মুখের ভাব দেখে বোঝা গেল, সে উত্তরটা শুনে খুশি হয়েছে। কিন্তু তারপর তার চোখ খাতের ওপাশে গিয়ে থেমে গেল।

মারদেকাও তাকাল। সেখানে দূরে একটা শুকনো ঝোপের ডাল ভেঙে আছে। খুব বেশি বড় কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু বাতাসের দিক অনুযায়ী ডালটা এমনভাবে ভাঙার কথা নয়।

লারসেন ধীরে কোমরের দিকে হাত নিয়ে গেল।

মারদেকা সেটা দেখল। “কী?”

লারসেন নিচু গলায় বলল, “আমরা একা নই।”

বাতাস তখনও বইছে। দূরে কোথাও একটা বাজপাখি ডাকল। দুজনেই নীরব হয়ে গেল।

মারদেকা স্বভাবতই নিজের কোমরের ছুরির দিকে হাত নিতে যাচ্ছিল। কিন্তু লারসেনের আগের কথাটা তার মনে পড়ে গেল। যা দেখবে, আগে বুঝবে। তার হাত থেমে গেল।

সে চারপাশে তাকাল। প্রথমে সামনে। তারপর ডানদিকে পাথুরে ঢাল। তারপর বামদিকে শুকনো ঝোপের সারি। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পাহাড়ি পরিবেশে বড় হতে হতে সে জানে, কিছু না দেখা মানেই সেখানে কিছু নেই, এমন নয়। 

হঠাৎ তার নাকে একটা গন্ধ এল। খুব হালকা। ঘোড়ার ঘামের গন্ধ। মারদেকা মুখ ঘুরিয়ে ডানদিকে তাকাল। সেখানে তাদের নিজেদের ঘোড়া ছাড়া আর কোনো প্রাণী দেখা যাচ্ছে না। সে ধীরে বলল, “ওখানে ঘোড়া ছিল।”

লারসেন এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। “কোথায়?”
 
মারদেকা পাথুরে ঢালের দিকে আঙুল তুলল। “ওপাশে।”

দুজনেই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর লারসেন লারসেন ঘোড়ায় উঠল। বললো, “চলো।”

মারদেকা অবাক হলো। “দেখবেন না!”

“না। কারণ যে মানুষ নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে, তার মানে সে চায় তুমি তাকে খুঁজতে যাও।”

মারদেকা নিজের ঘোড়ায় উঠল। তারা খাতের পথ ছেড়ে আবার এগিয়ে গেল। কিন্তু এবার তাদের চলার ভঙ্গি বদলে গেছে। আগে তারা পাহাড়ের দিকে যাচ্ছিল। এখন তারা জানে, পাহাড়ও হয়তো তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

সূর্য আরও উপরে উঠল। সকাল ধীরে ধীরে উষ্ণ হতে শুরু করল। পথ যত এগোতে লাগল, ততই চারপাশের ভূখণ্ড কঠিন হয়ে উঠল। কোথাও খাড়া পাথরের দেয়াল, কোথাও সরু গিরিখাত, কোথাও শুকনো নদীর পুরোনো পথ। মাঝে মাঝে লারসেন এমন সব বাঁক নিচ্ছিল, যেগুলো দেখে মনে হচ্ছিল সে বহু বছর আগে এই পথ মুখস্থ করে নিয়েছিল।

মারদেকা বুঝতে পারছিল, এই মানুষটি এখন অন্যরকম। র&#x200d;্যাঞ্চে লারসেন ছিল শিক্ষক। 
এই পথে সে যেন আবার বহু বছর আগের একজন মানুষ হয়ে উঠছে। একটা সরু পথের মুখে এসে লারসেন ঘোড়া থামাল।

সামনে পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে। নিচে পাথরের মধ্যে দিয়ে সরু একটা পথ বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়েছে। মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। “আমরা এই পথ দিয়ে যাব?”

“একসময় যেতাম।”

মারদেকা আবার জিজ্ঞেস করল, “কত বছর আগে?”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তোমার জন্মেরও আগে।”

মারদেকা কথাটা শুনে আর প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার চোখে কৌতূহল জমে রইল।

লারসেন ঘোড়া নিয়ে নিচে নামতে শুরু করল। মারদেকা তার পেছনে।

পথটা ধীরে ধীরে আরও সরু হয়ে এল। দুপাশের পাথর এমনভাবে উঠে গেছে যে আকাশের একটা সরু ফালি ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। ঘোড়ার খুরের শব্দ পাথরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও পথের ওপর পুরোনো ধসের চিহ্ন। কিছু পাথর নতুন। কিছু বহুদিনের।

মারদেকা হঠাৎ থেমে গেল। 

লারসেন পেছনে তাকাল। “কী হলো?”

মারদেকা মাথা তুলল না। সে পাথরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। দেয়ালের ওপর প্রায় মুছে যাওয়া একটা চিহ্ন। প্রথম দেখায় মনে হবে সময়ের ক্ষয়ে তৈরি কোনো দাগ।

কিন্তু মারদেকার চোখ স্থির হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর অকারণে ধাক্কা লাগল।

লারসেন ধীরে ঘোড়া ঘুরিয়ে তার কাছে এল। “কী দেখছ?”

মারদেকা হাত তুলে দেয়ালের দিকে দেখাল। “এটা।”

লারসেনের মুখ মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। পাথরের গায়ে ক্ষীণভাবে খোদাই করা সেই চিহ্নটি সে চিনতে পেরেছে। বহু বছর আগে এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় এমন চিহ্নই ব্যবহার করা হতো।

সে ঘোড়া থেকে নেমে কাছে গেল। পাথরের ওপর হাত বুলিয়ে দেখল। পুরোনো চিহ্ন। 
খুব পুরোনো। কিন্তু তার নিচে আরও একটা জিনিস আছে। এক টুকরো কাপড়। 
পাথরের সরু ফাঁকে আটকে আছে। বাতাসে সামান্য দুলছে। লারসেন হাত বাড়িয়ে সেটি টেনে বের করল। কাপড়টা মলিন। ধুলোয় ভরা। কিন্তু তার রং এখনও বোঝা যায়। গাঢ় নীল। 

মারদেকার মুখের রং বদলে গেল। এক মুহূর্তের জন্য সে যেন আর সেই সরু পাহাড়ি পথে দাঁড়িয়ে নেই। তার চোখের সামনে অন্ধকার একটা কাঠের দেয়াল ভেসে উঠল। 
দরজা। দরজার পাশে নীল কাপড়। তারপর একটা হাত। কেউ তার হাত শক্ত করে ধরেছে। একটা কণ্ঠস্বর। আতঙ্কে ভরা। “দৌড়াও!”

মারদেকা হঠাৎ পিছিয়ে গেল। তার ঘোড়া অস্থির হয়ে মাথা ঝাঁকাল।

লারসেন দ্রুত তার বাহু ধরে ফেলল। “মারদেকা!”

ছেলেটা হাঁপাচ্ছে। সে চারপাশে তাকাল। যেন কোথায় আছে, সেটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগছে। “আমি...” তার কণ্ঠ শুকিয়ে গেছে। “আমি একটা ঘর দেখেছি।”

লারসেনের হাত আরও শক্ত হলো। “কেমন ঘর?”

“কাঠের।”

“আর?”

মারদেকা চোখ বন্ধ করল। তার কপালে ঘাম জমেছে। “একটা দরজা ছিল।”

লারসেন কিছু বলল না।

মারদেকার ঠোঁট কেঁপে উঠল। “দরজার পাশে নীল কাপড়।”

লারসেনের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা থেমে গেল। এই পথ। পুরোনো চিহ্ন। 
নীল কাপড়। আর মারদেকার স্মৃতি। এবার এগুলোকে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।

ঠিক তখন দূরে কোথাও পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ হলো। খুব ক্ষীণ। কিন্তু এই নীরব গিরিখাতে শব্দটা স্পষ্ট শোনা গেল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল। মারদেকাও ঘুরে তাকাল। পাহাড়ের ওপর কেউ নেই। 
তবু দুজনেই জানল, তারা একা নয়।

লারসেন ধীরে হাত সরিয়ে কোমরের পিস্তলের কাছাকাছি রাখল। তার চোখ ঠান্ডা হয়ে গেছে। 

দুজন আবার ঘোড়ায় উঠল। কিন্তু এবার তারা আগের পথ ধরে এগোল না।

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে পাথরের দেয়ালের পাশের সরু পথটার দিকে তাকাল। সেই পথ প্রায় ঝোপে ঢেকে গেছে। বহু বছর ধরে কেউ ব্যবহার করেনি বলেই মনে হয়। কিন্তু তার মুখে এমন একটা ভাব দেখা গেল, যেন সে পথটাকে চিনেছে।

মারদেকা তার দিকে তাকাল। “ওদিকে?”

লারসেন উত্তর দিল, “ওই পথটা পুরোনো আশ্রয়ের দিকে যায়।”

পাহাড়ের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে গেল। গাঢ় নীল কাপড়ের টুকরোটা লারসেনের মুঠোর মধ্যে কেঁপে উঠল। সে সেটি নিজের পকেটে রেখে দিল। তারপর ঘোড়ার মাথা ঘুরিয়ে সেই সরু, পরিত্যক্ত পথের দিকে এগিয়ে গেল। মারদেকা তার পেছনে চলল।

আর তাদের অজান্তেই, গিরিখাতের অনেক ওপরে, পাথরের আড়াল থেকে কেউ একজন ধীরে ধীরে সরে গেল। তার কোমরের কাছে বাতাসে এক টুকরো গাঢ় নীল কাপড় সামান্য দুলে উঠল।

সরু পথটা এতটাই পুরোনো যে প্রথম কয়েক গজ যাওয়ার পরই মনে হলো, পাহাড়ের বুক থেকে পথটি যেন বহু বছর আগে মুছে গেছে। শুকনো ঝোপের ডাল ঘোড়ার শরীর ঘেঁষে যাচ্ছিল, কোথাও কোথাও পাথরের ধার ঘোড়ার পায়ের কাছে উঠে এসেছে। লারসেন সামনে থেকে পথ পরিষ্কার করে এগোচ্ছিল না, বরং পথটাকে নিজের মতো করে খুঁজে নিচ্ছিল। তার শরীরের ভঙ্গিতে এমন একটা কিছু ছিল, যা মারদেকা আগে খুব কমই দেখেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের পরিচিত জমিতে লারসেনের চলাফেরা ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু এই পাহাড়ি পথে তার প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি মোড় নেওয়া, এমনকি ঘোড়ার লাগাম টানার ধরনও যেন বহু বছরের পুরোনো কোনো স্মৃতির নির্দেশ মেনে চলছিল।

মারদেকা কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারল, তারা যে পথ দিয়ে যাচ্ছে সেটি আসলে একেবারে পরিত্যক্ত নয়। কোথাও শুকনো ঘাসের নিচে শক্ত মাটি, কোথাও পাথরের ওপর ঘষা দাগ, আবার কোথাও ঝোপের ডাল মানুষের চলাচলের কারণে সামান্য বাঁকানো। এসব চিহ্ন এত পুরোনো যে সাধারণ চোখে সেগুলো ধরা পড়ার কথা নয়। কিন্তু লারসেনের চোখও সেগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে না। বরং প্রতিটি চিহ্ন দেখার পর তার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠছে। 

পথটা একটু ওপরে উঠে গিয়ে আবার নিচে নেমে গেল। নিচে ছোট একটা শুকনো খাত। বর্ষাকালে হয়তো সেখানে পাহাড়ি জল নেমে আসে, কিন্তু এখন পাথরের ফাঁকে শুধু ধুলা আর শুকনো পাতার স্তর। খাতের ওপারে একটা পুরোনো গাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছটার অর্ধেক ডাল শুকিয়ে গেছে, কাণ্ডের গায়ে বজ্রপাতের কালো দাগ। তার নিচে পড়ে থাকা পাথরের ওপর শ্যাওলার আস্তরণ জমে আছে।

লারসেন হঠাৎ ঘোড়া থামাল। মারদেকাও সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। 

লারসেন কিছু বলল না। সে শুধু সামনে তাকিয়ে রইল।

মারদেকা চারপাশ শুনতে চেষ্টা করল। বাতাসের শব্দ ছাড়া কিছু নেই। দূরে কোনো পাখি ডাকছে না। ঝোপের মধ্যে ছোট প্রাণীর চলাফেরার শব্দও নেই। পাহাড়ি জায়গায় এই ধরনের নীরবতা কখনও কখনও শব্দের চেয়েও বেশি সতর্ক করে দেয়। স্বাভাবিক পরিবেশে কোথাও না কোথাও জীবন থাকে, একটা পাখি ডাকে, কোনো শুকনো ডাল ভাঙে, টিকটিকি পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে যায়। এখানে যেন সবকিছু কিছুক্ষণের জন্য থেমে আছে।

লারসেন ঘোড়া থেকে নামল। পাথরের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে আঙুল দিয়ে ধুলা সরাল। সেখানে একটা অস্পষ্ট দাগ। মানুষের বুটের গোড়ালির মতো।

মারদেকা ঘোড়া থেকে নেমে তার পাশে দাঁড়াল।

লারসেন ধীরে বলল, “এটা আজকের।”

মারদেকা নিচে তাকিয়ে রইল। দাগটা খুব গভীর নয়। কিন্তু ধুলার ওপর তার ধারগুলো এখনও ভাঙেনি। কয়েক ঘণ্টার বেশি পুরোনো হওয়ার কথা নয়। সে চারপাশে তাকাল। “তাহলে সে জানে আমরা আসছি?”

লারসেন কিছুক্ষণ উত্তর দিল না। “যে মানুষ আমাদের গতিপথ জানতে চাইছে, সে যদি এই পথও জানে, তাহলে আমাদের আসার খবর তার কাছে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে না।”

লারসেনের কথায় ভয় ছিল না। ছিল হিসাব। মারদেকা বুঝতে পারল, বিপদের সময় এই মানুষটা ভয়কে জায়গা দেয় না। ভয়কে সে তথ্যের মতো ব্যবহার করে। কোথায় বিপদ হতে পারে, কতজন হতে পারে, কীভাবে আসতে পারে, সবকিছুকে ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখে। তারা আবার চলতে শুরু করল।

পাহাড় ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। নিচের খোলা জমি এখন অনেক দূরে। সামনে পাথরের দেয়াল উঠে এসেছে, তার গায়ে শুকনো লতাগুল্ম ঝুলছে। সূর্যের আলো সরাসরি সেখানে পৌঁছাতে পারছে না। বাতাস ঠান্ডা হয়ে এসেছে। কোথাও কোথাও পাথরের ফাঁকে বরফের মতো ঠান্ডা জল জমে আছে, যদিও অনেকদিন ধরে বৃষ্টি হয়নি।

মারদেকা অনুভব করল, তার মনে অদ্ভুত একটা চাপ তৈরি হচ্ছে। সে এই জায়গায় আগে কখনও আসেনি, অন্তত তার মনে নেই। অথচ পথের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পাথরের আকার, এমনকি বাতাসের গন্ধও কোথাও যেন পরিচিত।

সে চোখ বন্ধ করল। এক মুহূর্তের জন্য আবার সেই কাঠের ঘর। অন্ধকার। দরজার নিচ দিয়ে বাইরে থেকে আগুনের আলো ঢুকছে। কেউ খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তার ছোট হাত একটা বড় হাতের মধ্যে আটকে। তারপর সেই কণ্ঠস্বর। “দৌড়াও!” মারদেকা চোখ খুলে ফেলল। 

ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা লারসেন তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে বুঝতে পেরেছে। “আবার দেখেছ?”

মারদেকা ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।” 

“একই ঘর?”

“হ্যাঁ।”

“কিছু বদলেছে?”

মারদেকা কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, “এবার আগুন দেখেছি।”

লারসেনের মুখের ওপর যেন হঠাৎ একটা ছায়া নেমে এল। সে আর প্রশ্ন করল না। ঘোড়ার লাগাম টেনে সামনে তাকাল।

মারদেকা বুঝতে পারল, আগুনের কথাটা লারসেনের কাছে নতুন কিছু নয়। বরং সে যেন এমন একটা শব্দ শুনেছে, যার অর্থ সে অনেক আগেই জানত।

পথ আরও সরু হয়ে গেল। কিছুদূর পর একটা পাথুরে দেয়াল পথের সামনে এসে দাঁড়াল। দেয়ালের এক পাশে এতটুকু ফাঁক যে ঘোড়া কষ্ট করে ঢুকতে পারবে। লারসেন ঘোড়া থেকে নেমে লাগাম হাতে নিল। সে প্রথমে নিজে ফাঁকটা দিয়ে গেল, তারপর ঘোড়াকে টেনে নিয়ে গেল। মারদেকাও একইভাবে অনুসরণ করল।

ফাঁকটা পেরিয়ে তারা এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছাল, যেখান থেকে নিচের পুরো গিরিখাত দেখা যায়। ওপরে আকাশ এখন সরু একটা নীল ফালি। নিচে পাথর, ঝোপ আর ছায়া। দূরে তারা যে পথ দিয়ে এসেছিল, সেটাও দেখা যাচ্ছে।

লারসেন দাঁড়িয়ে গেল। 

মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো মানুষ নেই। কিন্তু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেল। নিচের একটা পাথরের ওপর সূর্যের আলো পড়েছে। তার পাশে যেন একটা ছোট কালো বিন্দু নড়ল।

মারদেকা চোখ কুঁচকে তাকাল। একটা পাখি নয়। একটা মানুষ। পাথরের আড়াল থেকে মাথাটা সামান্য উঠেছিল। তারপর আবার অদৃশ্য। সে লারসেনের হাত ছুঁয়ে নিচের দিকে দেখাল।

লারসেন তাকাল। তার চোখে কোনো বিস্ময় দেখা গেল না। বরং ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য কঠিন রেখা ফুটে উঠল। সে হাত তুলে মারদেকাকে নিচু হতে ইশারা করল। দুজনেই পাথরের আড়ালে সরে গেল। কিছুক্ষণ তারা নড়ল না।

নিচে যে লোকটি ছিল, সে এবার বেরিয়ে এল। দূরত্ব এত বেশি যে মুখ দেখা যায় না। লোকটি ঘোড়ার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চারপাশ দেখল। তারপর নিজের কোমরের কাছে হাত নিয়ে কিছু একটা ঠিক করল। বাতাস হঠাৎ তার পোশাকের একটা অংশ উড়িয়ে দিল। গাঢ় নীল।

মারদেকার বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল। লারসেনের চোখ সরু হয়ে গেল।

লোকটি কিছুক্ষণ পর ঘোড়ায় উঠল এবং অন্যদিকে চলে গেল। সে তাদের দেখতে পায়নি। অথবা দেখেও এমন ভান করেছে যেন পায়নি।

লারসেন দীর্ঘক্ষণ তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল। 

“সে আমাদের দেখেছে?” মারদেকা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

লারসেন ধীরে বলল, “আমি জানি না।”

“তাহলে?”

“এখন জানার দরকারও নেই।”

লারসেন ঘোড়ার লাগাম ধরল। তার মুখে এমন এক স্থিরতা এসেছে, যা মারদেকা বহুবার দেখেছে, কিন্তু আজ তার অর্থ অন্যরকম মনে হলো। এতক্ষণ তারা শত্রুকে খুঁজছিল। এখন লারসেন বুঝেছে, শত্রুও তাদের পথ দেখছে।

পথের শেষ অংশে পৌঁছাতে তাদের আরও প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল। সূর্য তখন মাথার অনেকটা ওপরে। কিন্তু পাহাড়ের ভেতর আলো ছায়ায় ভেঙে গেছে। কোথাও তীব্র রোদ, কোথাও দিনের মাঝখানেও সন্ধ্যার মতো অন্ধকার। শেষ পর্যন্ত একটা খোলা জায়গা দেখা গেল।

মারদেকা প্রথমে বুঝতে পারল না, জায়গাটার বিশেষত্ব কী। তারপর ধীরে ধীরে তার চোখে পড়ল, পাথরের দেয়ালের নিচে কাঠের কিছু ভাঙা অংশ পড়ে আছে। কিছু পুরোনো কড়িকাঠ, অর্ধেক মাটির নিচে ঢুকে থাকা দরজার মতো একটা কাঠের ফ্রেম, আর পাশে পাথর দিয়ে তৈরি নিচু দেয়ালের অবশিষ্ট অংশ।

লারসেন ঘোড়া থামিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। মারদেকা বুঝল, এটাই সেই জায়গা। পুরোনো আশ্রয়।

কিন্তু আশ্রয় বলার মতো কিছুই আর নেই। সময়, বরফ, বৃষ্টি, আগুন আর মানুষের হাত মিলে জায়গাটাকে প্রায় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। তবু ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও বোঝা যায়, একসময় এখানে একটা কাঠের ঘর ছিল। পাহাড়ের গায়ে এমনভাবে বানানো হয়েছিল, বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। সামনে একটা সরু পাথুরে চত্বর। তার এক পাশে গভীর খাদ। অন্য পাশে পাহাড়ের দেয়াল।

লারসেন ঘোড়া থেকে নামল। সে অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। তার চোখ ধীরে ধীরে ঘরের অবশিষ্ট অংশের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কোথায় ছিল দরজা, কোথায় জানালা, কোথায় আগুন জ্বলত, কোথায় ঘোড়া বাঁধা হতো, যেন সবকিছু তার চোখের সামনে এখনও অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে প্রথমবার বুঝল, লারসেন শুধু একটা পুরোনো জায়গায় ফিরে আসেনি। সে নিজের জীবনের এমন একটা অংশে ফিরে এসেছে, যেটাকে বহু বছর ধরে নিজের ভেতর কবর দিয়ে রেখেছিল।

লারসেন ধীরে ধীরে ভাঙা কাঠের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। একটা পাথরের নিচে হাত ঢুকিয়ে ধুলো সরাল। কিছুই পেল না। তারপর অন্য জায়গায় গেল। সেখানে একটা কালো হয়ে যাওয়া লোহার টুকরো পড়ে ছিল। সে সেটি তুলে নিল।

মারদেকা কাছে এসে দাঁড়াল।

লারসেন লোহার টুকরোটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এখানেই আগুন লেগেছিল।”

মারদেকার বুকের ভেতর আবার সেই অদ্ভুত অনুভূতি ফিরে এল। সে ভাঙা কাঠের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার আঙুল কাঠের ওপর ছুঁতেই শরীরের ভেতর যেন বিদ্যুৎ ছুটে গেল। একটা ঘর। ধোঁয়া। চিৎকার।

একজন মানুষ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। তার হাত রক্তে ভেজা। আর একটা ছোট ছেলে দৌড়াচ্ছে।

মারদেকা হঠাৎ পিছিয়ে এল। “আমি এখানে ছিলাম।”

লারসেন স্থির হয়ে গেল। “কী বললে?”

মারদেকা নিজের বুকের ওপর হাত রাখল। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে। “আমি... এখানে ছিলাম।”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার মুখের সমস্ত কঠোরতা সরে গিয়ে এক ধরনের গভীর, ক্লান্ত ভাব ফুটে উঠল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই আশ্রয়ের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একটা শব্দ হলো। খুব ক্ষীণ। কাঠের নিচে কিছু যেন নড়ল।

দুজনেই থেমে গেল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মারদেকার সামনে এসে দাঁড়াল। তার ডান হাত পিস্তলের ওপর। চোখ ধ্বংসস্তূপে স্থির। কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই। তারপর আবার। একটা শুকনো কাঠ ভাঙার মতো শব্দ।

লারসেন মারদেকাকে পেছনে থাকতে ইশারা করল। সে ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপের দিকে এগিয়ে গেল। পাথরের আড়াল, ভাঙা কাঠ, শুকনো মাটি, সবকিছু একবার করে পরীক্ষা করল। তারপর একটা ভারী কাঠ সরাল। নিচে একটা ছোট গর্ত। গর্তের ভেতর অন্ধকার। 

লারসেন নিচু হয়ে তাকাল। তার চোখে এমন একটা পরিবর্তন দেখা গেল, যা মারদেকা আগে কখনও দেখেনি। সে হাত বাড়িয়ে গর্তের ভেতর থেকে একটা পুরোনো চামড়ার থলে বের করল। থলেটা ধুলায় ঢাকা। চামড়া শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু মুখটা এখনও বাঁধা। লারসেন থলেটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মারদেকা এগিয়ে এল। “ওটার ভেতরে কী?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে থলেটার ওজন বুঝতে চেষ্টা করল। তারপর মুখের বাঁধন খুলল।

ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কয়েকটা পুরোনো কাগজ, কিছু কালচে হয়ে যাওয়া মুদ্রা, আর একটা ভাঁজ করা কাগজের টুকরো। লারসেন কাগজটা খুলল।

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কাগজে লেখা অক্ষরগুলো বয়সের কারণে অনেকটাই মুছে গেছে। তবু কয়েকটি শব্দ স্পষ্ট। লারসেন পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে গেল।

মারদেকা বলল, “কী আছে?”

লারসেন কাগজটা তার হাতে দিল না। বরং চোখ তুলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া আশ্রয়ের দিকে তাকাল। “যে জিনিসের জন্য এত বছর পর মানুষগুলো ফিরে এসেছে, তার একটা অংশ এখনও এখানেই ছিল।”

মারদেকা চুপ করে রইল। দূরে পাহাড়ের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে গেল। তারপর খুব দূর থেকে ভেসে এল ঘোড়ার খুরের শব্দ। একবার। দুবার। তারপর দ্রুত।

লারসেন মাথা তুলল। শব্দটা আশ্রয়ের দিকে আসছে না। আসছে পাহাড়ের অন্য দিক থেকে। তার চোখ মুহূর্তের মধ্যে কঠিন হয়ে গেল। সে কাগজটা ভাঁজ করে নিজের পকেটে রাখল, চামড়ার থলেটা তুলে নিল এবং মারদেকার দিকে তাকাল। “আমাদের এখানে আসার খবর পৌঁছে গেছে।”

মারদেকা কিছু বলল না। তার চোখ তখন ধ্বংসস্তূপের ওপর। ভাঙা কাঠের নিচে একটা ছোট ধাতব জিনিস দেখা যাচ্ছে। সে নিচু হয়ে সেটি তুলে নিল। তারপর তার মুখের রং বদলে গেল।

ধাতব জিনিসটার ওপর খোদাই করা ছিল সেই একই চিহ্ন, যা সে পাথরের দেয়ালে দেখেছিল। কিন্তু চিহ্নটার নিচে আরও একটা দাগ ছিল। একটা ছোট অক্ষর। মারদেকা অক্ষরটা পড়তে পারল না। 

লারসেন তার হাত থেকে জিনিসটা নিয়ে দেখল। কয়েক সেকেন্ড পর তার চোখে যে আতঙ্ক ফুটে উঠল, সেটা এত ক্ষণিকের ছিল যে মারদেকা নিশ্চিত হতে পারল না সে সত্যিই তা দেখেছে কি না। 

লারসেন ধাতব টুকরোটা মুঠোয় বন্ধ করে ফেলল। “চলো।”

“কোথায়?”

লারসেন পাহাড়ের অন্য ঢালের দিকে তাকাল। “এই আশ্রয়ে আমরা একা নই।”

দূরে আবার ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। এবার আরও কাছে।

লারসেন মারদেকার ঘোড়ার লাগাম ধরল। তার মুখে ফিরে এসেছে সেই পুরোনো কঠোরতা। কিন্তু এবার তার চোখে শুধু অতীতের ভয় ছিল না। ছিল নিশ্চিত জ্ঞান। কেউ তাদের অনুসরণ করে এখানে এসেছে।

আর সেই মানুষটি শুধু লারসেনের পুরোনো পথ জানে না, সে জানে এই আশ্রয়ের নিচে কী লুকিয়ে আছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/267297/</link>
				<pubDate>Sun, 30 Aug 2026 03:51:57 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২১<br />
সকালের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই লারসেন ঘুম থেকে উঠে পড়েছিল। আসলে ঘুম থেকে ওঠার প্রশ্নই ছিল না। রাতের শেষ প্রহর থেকে সে বিছানায় শুয়ে ছিল, কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই বহু বছরের পুরোনো কিছু দৃশ্য তার মাথার ভেতর ফিরে আসছিল। আগুনের লাল আলো, পাহাড়ের গায়ে কালো ছায়া, ছুটে চলা ঘোড়ার খুরের শব্দ, আর অন্ধকারে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-267297"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/267297/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">1ca5158408a06212f897a3cdcf0e4e06</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–বিশ
রাতের সেই মুহূর্তটা অনেকক্ষণ ধরে লারসেনের মনে ঘুরতে থাকল। মারদেকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ছুরি, চোখে এমন এক স্থিরতা, যে স্থিরতা কোনো তেরো বছরের ছেলের চোখে থাকার কথা নয়। লারসেন জানত, ছেলেটা এখন আর শুধু কৌতূহলী নয়। সে বুঝতে শুরু করেছে, র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশে যে অস্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে তার নিজের জীবনেরও কোনো অদৃশ্য সম্পর্ক আছে। বাইরে থেকে মানুষ যত শান্তই দেখাক, কোনো একটা শব্দ, কোনো একটা গন্ধ, কোনো একটা পুরোনো চিহ্ন সেই পাপকে আবার জাগিয়ে তুলতে পারে। গত কয়েকদিনে সেই সব চিহ্ন একে একে ফিরে এসেছে। আর এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এমন একজন, যার শৈশব হয়তো সেই পুরোনো ঘটনার সঙ্গে অজান্তেই জড়িয়ে আছে।

লারসেন ধীরে ধীরে মারদেকার কাছ থেকে সরে এল। ছেলেটাকে আর কিছু বলল না। শুধু একবার তার হাতে ধরা ছুরিটার দিকে তাকাল। ছুরিটা সে নিজেই দিয়েছিল। সেই ছুরি দিয়ে মারদেকা এখন কাঠের গুঁড়িতে আঘাত করে, বাতাসের গতি বোঝে, দূরত্ব মাপে, নিজের শরীরের ভারসাম্য ঠিক করতে শেখে। কিন্তু লারসেনের মনে হলো, ছুরির ধার শেখানোর চেয়ে কঠিন কাজ এখন সামনে। 

সে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। প্রদীপের আলোয় টেবিলের ওপর দ্বিতীয় কালচে চাকতিটা পড়ে ছিল। চাকতিটা সে কিছুক্ষণ আগেও হাতে নিয়েছিল, কিন্তু এবার সেটাকে দেখার ভঙ্গি বদলে গেল। ধাতব চাকতিটা নিছক একটা চিহ্ন নয়। গত রাতের পাহাড়ি আশ্রয়, দেয়ালের চিহ্ন, গাঢ় নীল কাপড়, পুরোনো কার্তুজ, শুকনো খাতে পাওয়া পদচিহ্ন, সবকিছু যেন একই সুতোয় বাঁধা। 

ভোরের কিছু আগে লারসেন আগুনের পাশে বসে ছিল। রাতের শেষ আগুনটুকু তখন নিভে আসছে। কাঠের ভেতর লালচে কয়লার আভা মাঝে মাঝে জ্বলে উঠছে, আবার ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বাড ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বুঝতে পারছিল, আজকের রাত অন্য রাতের মতো শেষ হবে না। লারসেনের মুখে সেই পুরোনো কঠোরতা ফিরে এসেছে, কিন্তু তার নিচে আরও কিছু আছে। 

মারদেকাও তখন ঘুমিয়ে নেই। সে নিজের ঘরে বসে ছিল। লারসেনের কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছিল। সব সত্যি একসঙ্গে জানা ভালো নয়। কথাটা সে বুঝেছে। কিন্তু তার মনে আরেকটা প্রশ্ন জন্মেছে, যদি সত্যি না জানে, তাহলে কীভাবে বুঝবে কোন বিপদ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে? 

সূর্য ওঠার কিছু পরে লারসেন নিজেই বাডকে ডেকে পাঠাল।

র&#x200d;্যাঞ্চ তখন ধীরে ধীরে দিনের কাজে ফিরে যাচ্ছে। ঘোড়াগুলোকে খাওয়ানো হয়েছে, গবাদি পশু ঘেরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে। লোকজনের চলাফেরায় আগের দিনের মতো স্বাভাবিকতা ফিরেছে বলে মনে হলেও লারসেন জানত, এই স্বাভাবিকতা কেবল উপরের আবরণ। পাহাড়ের দিকে তাকালেই তার মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের ওপারে কেউ এখনও অপেক্ষা করছে।

বাড ঘরে ঢুকতেই লারসেন জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাকে বসতে ইশারা করল। টেবিলের ওপর মানচিত্র মেলে রাখা। পাশে দ্বিতীয় চাকতি। আর তার পাশে পুরোনো সেই কাগজ, যার মাঝখানে লেখা নামটি এখন দুজন মানুষের মধ্যেকার নীরবতার মতো ভারী হয়ে আছে।

বাড বসে পড়ল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল না। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মানচিত্রের ওপর আঙুল রাখল। আঙুলটা র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে পশ্চিমে, তারপর আরও দূরে পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে এগোল। “এই জায়গাটা মনে আছে?”

বাড মানচিত্রের দিকে তাকাল। জায়গাটা তার অপরিচিত নয়। বহু বছর আগে কয়েকবার সে লারসেনের সঙ্গে ওই অঞ্চলে গিয়েছিল। কিন্তু তখনও সে জানত না, সেই পথের সঙ্গে লারসেনের জীবনের কী সম্পর্ক। “মনে আছে।”

লারসেন মাথা নেড়ে চাকতিটার দিকে তাকাল। “এই চিহ্নটা আমি প্রথম দেখেছিলাম ওই পথেই।”

বাডের চোখ চাকতির ওপর স্থির হলো।

লারসেন এবার আর থামল না। “অনেক বছর আগে আমি একদল ঘোড়সওয়ারের সঙ্গে কাজ করতাম।”

ঘরের ভেতর যেন হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে গেল। বাড কোনো প্রশ্ন করল না। সে শুধু শুনতে লাগল।

লারসেন ধীরে ধীরে বলল, “ওরা ডাকাত ছিল না। অন্তত নিজেদের ডাকাত বলত না। সীমান্তের এপার-ওপার দিয়ে মাল নিয়ে যেত। অস্ত্র, টাকা, মদ, কখনও নথি, কখনও এমন কিছু জিনিস যার নাম জানাটাও বিপজ্জনক ছিল। যার কাছে টাকা থাকত, সে টাকা দিত। যার কাছে অস্ত্রের দরকার ছিল, সে অস্ত্র নিত। আর আমরা শুধু পথ দেখাতাম।”

লারসেনের চোখ তখন মানচিত্রের ওপর। তার মনে হচ্ছিল, বহু বছর আগের সেই পথগুলো আবার চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে। ধুলোমাখা ঘোড়ার পিঠ, দীর্ঘ রাতের যাত্রা, শুকনো নদীর খাত, পাহাড়ের গায়ে লুকানো সরু পথ, আর কয়েকজন মানুষের মুখ। তখন সে তরুণ ছিল। শক্তি ছিল, সাহস ছিল, পৃথিবী সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ছিল। সে ভাবত, মানুষকে তার কাজ দিয়ে বিচার করা যায়। সে জানত না, কোনো কাজের আসল অর্থ অনেক সময় তার সামনে থাকা জিনিসে নয়, তার পেছনে থাকা উদ্দেশ্যে লুকিয়ে থাকে।

বাড ধীরে বলল, “আপনি তখন জানতেন না, ওরা আর কী করত?”

লারসেন মাথা তুলল। “প্রথমদিকে না।” তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল, “কিন্তু পরে বুঝেছিলাম।” 

দলটা সীমান্তের পথগুলো ভালোভাবে জানত। কোথায় পাহারার লোক কম, কোথায় নদী পার হওয়া যায়, কোথায় রাতে আগুন জ্বালানো নিরাপদ, কোথায় ঘোড়া লুকিয়ে রাখা যায়, সব তাদের জানা ছিল। তাদের চলার নিজস্ব নিয়ম ছিল। আর সেই নিয়মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল চিহ্ন। দূর থেকে কোনো মানুষকে দেখে বোঝা যেত না সে দলের লোক কি না। কিন্তু গাঢ় নীল কাপড়ের একটা টুকরো, কোমরে বাঁধা একটা কালচে চাকতি, কিংবা নির্দিষ্ট জায়গায় আঁকা একটা চিহ্ন, এগুলো ছিল তাদের ভাষা।

চাকতিটা একজন অপরিচিত লোকের কাছে ছিল নিছক ধাতব টুকরো। কিন্তু দলের লোকেরা জানত, কোন চাকতির কোন চিহ্ন কোন পথের পরিচয়, কোন আশ্রয় নিরাপদ, কোন জায়গায় আগে মাল রাখা হয়েছে, কোন পথ ব্যবহার করা যাবে আর কোন পথ এড়িয়ে চলতে হবে।

চাকতি ছিল তাদের কাছে এমন এক ভাষা, যা কাগজে লেখা থাকত না। লারসেন টেবিলের ওপর দ্বিতীয় চাকতিটা আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিল। “এই জিনিসটার জন্যই আমি আজ তোমাদের সামনে বসে আছি।”

বাডের চোখ সরু হলো। “এটা কি কোনো লুকানো সম্পদের চিহ্ন?”

লারসেন মাথা নাড়ল। “না। সম্পদ কোথায় আছে সেটা সরাসরি বলে না। শুধু এমন মানুষকে পথ চিনিয়ে দেয়, যে আগে থেকেই নিয়মটা জানে।”

বাড কিছুক্ষণ চাকতির দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ল, এতদিন ধরে সে ভেবেছিল চাকতিটা হয়তো কোনো গুপ্তধনের চাবি। এখন বুঝতে পারছে, ব্যাপারটা আরও ভয়ংকর। চাবি হারালে তালা খোলা যায় না, কিন্তু একটা পথের চিহ্ন হারালে শুধু পথ হারায় না, পথের সঙ্গে জড়ানো সমস্ত গোপন জিনিসও অদৃশ্য হয়ে যায়।

লারসেন জানালার দিকে তাকাল। “আমি যখন বুঝলাম ওরা শুধু চোরাচালান করছে না, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।”

বাড চুপ করে রইল।

লারসেনের চোখে তখন বহু বছরের পুরোনো একটা রাতের ছায়া নেমে এসেছে। দলটা ধীরে ধীরে বদলে গিয়েছিল। আগে তারা যে মাল বহন করত, তার সঙ্গে মানুষের জীবন জড়িত ছিল না। পরে বন্দুকের বাক্স বাড়তে লাগল। অচেনা লোকেরা আসতে শুরু করল। তাদের সঙ্গে এমন কিছু নথি চলাচল করত, যেগুলো সাধারণ ব্যবসার কাগজ ছিল না। সীমান্তের দুই অঞ্চলের কয়েকজন ক্ষমতাবান মানুষের নাম সেখানে থাকত। কিছু জায়গার জমি, কিছু অস্ত্রের চালান, কিছু সৈন্যের গতিবিধি, কিছু অর্থের হিসাব, সবকিছু যেন এক অদৃশ্য জালের অংশ।

লারসেন তখন বুঝেছিল, তারা শুধু মাল বহন করছে না। তারা একটা বড় খেলার ঘুঁটি হয়ে গেছে। আর সেই খেলায় মানুষ মারা গেলে তার হিসাবও টাকার মতো লেখা হয়।

বাড ধীরে বলল, “তখন আপনি দল ছেড়ে দিয়েছিলেন?”

লারসেনের মুখ শক্ত হলো। “হ্যাঁ।”

কিন্তু কথাটা বলার পরও সে চুপ করে রইল। কারণ দল ছেড়ে যাওয়াটাই গল্পের শেষ নয়। বরং আসল পাপ শুরু হয়েছিল তার পরে। লারসেনের আঙুল মানচিত্রের ওপর থেমে গেল। পাহাড়ের পশ্চিমে একটা জায়গা, তারপর আরও দক্ষিণে একটা সরু পথ। “আমি চলে যাওয়ার আগে একটা চালান এসেছিল।”

“কী ছিল?”

“টাকা।”

বাডের চোখে সামান্য পরিবর্তন এল।

লারসেন বলল, “অনেক টাকা। এত টাকা যে একটা ছোট র&#x200d;্যাঞ্চ কয়েক প্রজন্ম চালানো যায়। কিন্তু টাকার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল আরেকটা জিনিস।” সে পুরোনো কাগজটার দিকে তাকাল। “একটা নথি।”

ঘরের নীরবতা আরও ঘন হয়ে উঠল। লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “ওরা ভেবেছিল টাকা আর নথি নিরাপদ জায়গায় আছে। কিন্তু আমি তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম। আমি জানতাম, ওই জিনিসগুলো যদি আবার তাদের হাতে ফিরে যায়, তাহলে অনেক মানুষ মারা যাবে।”

বাড ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করছিল, গল্পটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। “আপনি সেগুলো নিয়ে চলে গিয়েছিলেন?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। তার মুখে এমন একটা ছায়া ফুটে উঠল, যেন এই প্রশ্নটাই সে এত বছর ধরে নিজেকে করেছে। “আমি নিয়ে যাইনি।”

বাড চমকে তাকাল।

লারসেন ধীরে বলল, “আমি শুধু জানতাম ওগুলো কোথায় ছিল।”

এই কথার পর দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল। বাইরে একটা ঘোড়া হঠাৎ হ্রেষাধ্বনি করল। বাতাসে দরজার কড়িকাঠ সামান্য কেঁপে উঠল। কিন্তু ঘরের ভেতর দুজন মানুষই যেন বহু বছর আগের একটা জায়গায় ফিরে গেছে।

লারসেনের চোখে তখন সেই পুরোনো আগুনের রাত ফিরে এসেছে। সে জানত, টাকা কোথায় রাখা হয়েছিল। সে জানত, নথিটা কোথায় লুকানো হয়েছিল। আর সে এটাও জানত, দলটির কেউ যদি বুঝতে পারে যে সে সবকিছু জানে, তাহলে তাকে বাঁচতে দেওয়া হবে না। সে দল ছেড়ে চলে এসেছিল।

কিন্তু যাওয়ার আগে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার জন্য আজও তার ঘুম ভেঙে যায়। সে রাতের সবকিছু এখনও তার মনে নেই। কিছু ছবি আছে, কিছু শব্দ আছে, কিছু মুখ আছে। কিন্তু একটা জিনিস সে কখনও ভুলতে পারেনি, তার নিজের সিদ্ধান্তের কারণে কয়েকজন মানুষ মারা গিয়েছিল। সে তাদের বাঁচাতে পারেনি।

আর যে জিনিসগুলো সে লুকিয়ে রেখেছিল, সেগুলোও পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। তাই এত বছর পরও সে জানে, হিসাব শেষ হয়নি। 

বাড ধীরে বলল, “আপনি এতদিন কাউকে বলেননি কেন?”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “কারণ যত কম মানুষ জানে, তত কম মানুষ বিপদে পড়ে।” তারপর একটু থেমে যোগ করল, “কিন্তু এখন আর সেটা যথেষ্ট নয়।”

এই কথাটার অর্থ বাড বুঝতে পারল। লারসেন এবার প্রথমবারের মতো অতীতের দরজা খুলেছে। কিন্তু দরজার ওপারে এখনও এমন কিছু আছে, যা সে পুরোপুরি বলতে পারছে না।

ঠিক তখন দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। দুজনেই চুপ করে গেল। মারদেকা। 
সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কি না, বোঝা গেল না।

লারসেন কয়েক মুহূর্ত দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল, “ওকে ভেতরে আসতে বলো।”

বাড উঠে দরজা খুলল। মারদেকা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে কোনো কৌতূহলী শিশুর দৃষ্টি নেই। সে যেন অনেকক্ষণ ধরে নিজের ভেতরে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর এখানে এসেছে। লারসেন তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা চাকতিটার দিকে একবার চোখ গেল।

মারদেকার পকেটের কাছে হাত ছিল। যেখানে সে নিজের চাকতিটা নিরাপদে রাখে। 

লারসেনের বুকের ভেতর হঠাৎ অস্বস্তি জেগে উঠল। প্রথমবার সে স্পষ্টভাবে ভাবল, এই ছেলেটার শৈশবের কোনো ছবি হয়তো কেবল স্মৃতি নয়। হয়তো সেই ছবির পেছনে সত্যিই এই মানুষগুলো ছিল। আর সেই সত্যিটা বলার সময় এসে গেছে।

লারসেন ধীরে চেয়ারটা টেনে দিল। “বসো, মারদেকা।”

মারদেকা বসে পড়ল।

লারসেন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জানালার বাইরে তাকাল। দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। দিনের আলোয় সবকিছু শান্ত। অথচ সে জানে, সেই পাহাড়ের কোথাও তার অতীত এখনও জীবিত।

সে ধীরে চাকতিটা হাতে তুলে নিল। “তুমি এই চিহ্নটা আগে কোথায় দেখেছ, সেটা আমাকে বলবে?”

মারদেকা কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ চাকতির ওপর স্থির হয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “আমি জানি না।”

কথাটা সত্যি কি না, লারসেন বুঝতে পারল না।

কিন্তু মারদেকার চোখে যে ভয় এক মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠেছিল, সেটা লারসেনের চোখ এড়াল না।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার মনে হলো, বহু বছর আগে যে পাপ থেকে সে পালিয়ে এসেছিল, তার ছায়া শুধু তার র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরে আসেনি। সেটা ফিরে এসেছে মারদেকার স্মৃতির ভেতর দিয়েও। 

লারসেন এবার সত্যিটা বলতে মুখ খুলল। কিন্তু বাইরে, দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকা বাড হঠাৎ ঘোড়ার ক্ষীণ শব্দ শুনতে পেল। একটা নয়। কয়েকটা।

সে ধীরে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। আর তার চোখে যে দৃশ্য ফুটে উঠল, সেটা দেখে তার হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোমরের বন্দুকের দিকে চলে গেল।

র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে কয়েকজন অচেনা ঘোড়সওয়ার এগিয়ে আসছে। এবার তারা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে না। এবার তারা সরাসরি র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে আসছে।

র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে এগিয়ে আসা ঘোড়সওয়ারদের সংখ্যা প্রথমে তিনজন বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু পাহাড়ের ঢালের ছায়া পেরিয়ে তারা যখন একটু নিচে নেমে এল, তখন বোঝা গেল, পেছনে আরও কয়েকজন আছে। সকালের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। পূর্ব আকাশে সূর্যের আগমনের আভা উঠেছে মাত্র, আর সেই ম্লান আলোয় ঘোড়াগুলোর শরীর কখনও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, কখনও আবার পাহাড়ের ছায়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। তাদের চলার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু সেটাই বরং বেশি অস্বস্তিকর। যারা কোনো জায়গায় হঠাৎ হামলা করতে আসে, তারা সাধারণত দ্রুত আসে। আর যারা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, তারা আগে থেকেই জানে কোথায় যাচ্ছে। তারা পথ নিয়ে নিশ্চিত, নিজেদের শক্তি সম্পর্কে নিশ্চিত, এবং সবচেয়ে বড় কথা, তারা জানে সামনে থাকা মানুষগুলো তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কি না।

বাড জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল। তার ডান হাত কোমরের বন্দুকের ওপর স্থির। চোখের পাতা প্রায় নড়ছিল না। বহু বছরের অভিজ্ঞতায় সে বুঝতে শিখেছে, দূরের মানুষকে শুধু তাদের পোশাক বা ঘোড়ার রঙ দেখে বিচার করা যায় না। ঘোড়ার গতি, দলবদ্ধ হওয়ার ধরন, দূরত্ব বজায় রাখার পদ্ধতি, কে সামনে আর কে পেছনে, কে চারপাশ দেখছে, এসবই বলে দেয় তাদের উদ্দেশ্য। এই দলটি সাধারণ পথিকের দল নয়। তারা এমনভাবে আসছে যেন র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি বেড়া, প্রতিটি ঘোড়ার আস্তাবল এবং প্রতিটি পাহারার জায়গা তারা আগে থেকেই মেপে রেখেছে।

বাড ধীরে জানালা থেকে সরে এল। লারসেন তখনও টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে। মারদেকা তার সামনে বসে, কিন্তু ছেলেটার চোখ এখন লারসেনের দিকে নয়। সে বাডের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইছিল কী ঘটেছে। বাডের চোখে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটা লুকোনোর মতো ছিল না। লারসেনও জানত, আর সময় নেই। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে সত্যিটা সে বলতে শুরু করতে চেয়েছিল, এখন সেই সত্যির সঙ্গে বন্দুকের শব্দও জুড়ে যেতে পারে।

লারসেন ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো ভয় ছিল না। বরং অদ্ভুত এক স্থিরতা। এই মানুষটাকে বাড বহুবার বিপদের মুখে দেখেছে। গুলি চলার আগে, গুলি চলার পরে, ঘোড়া ছুটে যাওয়ার সময়, কিংবা কোনো মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনার সময়। প্রতিবারই লারসেনের মধ্যে একটা জিনিস অপরিবর্তিত থেকেছে। বিপদ যত কাছে আসে, তার মন তত ঠান্ডা হয়ে যায়। অন্যরা যেখানে আতঙ্কে সিদ্ধান্ত হারায়, লারসেন সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ফিরে পায়। সে জানালার দিকে না তাকিয়েই বলল, “কতজন?”

বাড উত্তর দিল, “সামনে পাঁচজন। পেছনে আরও দুজনের মতো।”

লারসেন মাথা নেড়ে জানালার কাছে গেল। পর্দার ফাঁক দিয়ে একবার বাইরে তাকাল। তারপর সঙ্গে সঙ্গে সরে এল। তার চোখে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল না, কিন্তু বাড বুঝল, সে ঘোড়সওয়ারদের পোশাকের কোনো একটা অংশ চিনেছে। “ওদের সরাসরি উঠোনে ঢুকতে দেবে না।”

বাড অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। “কেন?”

লারসেন শান্ত গলায় বলল, “কারণ ওরা জানতে চায় আমরা তাদের দেখে কী করি।”

এই কথার পর সে আর কিছু বলল না। ঘরের ভেতর একটা অদৃশ্য উত্তেজনা জমে উঠল। মারদেকা ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার হাত পকেটের কাছে। সেখানে তার নিজের কালচে চাকতি। ছেলেটা কিছু বলছে না, কিন্তু তার শরীরের ভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে, সে প্রস্তুত হচ্ছে। 

লারসেন সেটা লক্ষ্য করল। কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে কাছে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল। “তুমি এখন কোনো অস্ত্র তুলবে না।”

মারদেকা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু লারসেনের চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। “যা দেখবে, মনে রাখবে। কিন্তু নিজের থেকে কিছু করবে না।” এই কথাটা বলেই লারসেন সরে গেল।

মারদেকা মাথা নেড়ে জানালার পাশে দাঁড়াল। সে জানত, এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছুরি নয়। তার চোখ আর কান। লারসেন তাকে অনেকদিন ধরে একটা কথা শেখাচ্ছে, বন্দুকের আগে মানুষকে পড়তে হয়। আজ প্রথমবার সেই শিক্ষা বাস্তবের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে।

র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে তখন কয়েকজন মানুষ ইতিমধ্যে বেরিয়ে এসেছে। হ্যাঙ্ক ডসন ঘোড়ার আস্তাবলের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ক্লে মরগান পশ্চিম দিকের বেড়ার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য পাহারাদাররা নিজেদের জায়গা নিয়েছে, কিন্তু কেউ বন্দুক হাতে প্রকাশ্যে দাঁড়ায়নি। লারসেন ইচ্ছা করেই লোকগুলোকে ছড়িয়ে থাকতে দিয়েছিল। সবাই যদি এক জায়গায় জড়ো হয়, আগন্তুকেরা বুঝে যাবে কোথায় প্রতিরোধ হবে। আর লারসেন চায় না তার শত্রুরা এত সহজে তাদের অবস্থান বুঝে ফেলুক।

ঘোড়সওয়াররা আরও কাছে এল। এবার তাদের পোশাক পরিষ্কার দেখা গেল। ধুলোয় মলিন কোট, মাথায় চওড়া কিনারার টুপি, কোমরে অস্ত্র। তাদের পোশাকে কোনো নির্দিষ্ট চিহ্ন নেই। দূর থেকে দেখে সাধারণ ভাড়াটে বন্দুকধারীর দল বলেই মনে হয়। কিন্তু লারসেন জানত, সত্যিকারের বিপদ কখনও নিজের পরিচয় গায়ে লিখে নিয়ে আসে না।

সামনের লোকটি ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিল। তার পাশে থাকা দুজনও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে গেল। তারা র&#x200d;্যাঞ্চের মূল দরজার দিকে সরাসরি না গিয়ে অর্ধচন্দ্রাকারে এগিয়ে এল। পেছনের দুজন আরও দূরে থেকে রইল। যেন পুরো র&#x200d;্যাঞ্চটাকে একটা অদৃশ্য বৃত্তের মধ্যে রেখে দিয়েছে।

বাড সেটা দেখে নিঃশব্দে বলল, “ওরা জায়গাটা চেনে।”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ শুধু সামনের লোকটির ওপর। লোকটির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মুখে কয়েক দিনের দাড়ি। বাঁ গালের কাছে পুরোনো কাটা দাগ। ঘোড়াটা কালো, শক্তপোক্ত, কিন্তু অতিরিক্ত সাজানো নয়। লোকটি ঘোড়ার লাগাম এক হাতে ধরে রেখেছে। অন্য হাতটা কোমরের কাছাকাছি। এমনভাবে, যেন সে বন্দুক ধরেনি, অথচ এক মুহূর্তেই ধরতে পারবে।

লারসেনের চোখ হঠাৎ তার কোমরের বেল্টে আটকে গেল। চামড়ার বেল্টের নিচে গাঢ় নীল কাপড়ের খুব সরু একটা ফালি দেখা যাচ্ছে। এত সরু যে সাধারণ চোখে সেটা চোখে পড়ার কথা নয়।

কিন্তু লারসেন দেখল। তার মনে হলো, বহু বছর আগের একটা দরজা যেন আবার খুলে গেল। সেই নীল কাপড়। সেই পুরোনো চিহ্ন। সেই মানুষদের ঘোড়ার পিঠ। আগুনের রাত। মৃত মানুষের মুখ। আর তারপর এক অন্ধকার পথ, যেখানে সে একা চলে গিয়েছিল।

লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না। কিন্তু তার ভেতরে বহু বছরের পুরোনো একটা ক্ষত যেন আবার খুলে রক্ত ঝরাতে শুরু করল।

সামনের ঘোড়সওয়ারটি র&#x200d;্যাঞ্চের বেড়ার কাছে এসে ঘোড়া থামাল। কিছুক্ষণ চারপাশ দেখল। তারপর উচ্চস্বরে বলল, “আমরা লারসেনের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।”

র&#x200d;্যাঞ্চের কোথাও কোনো উত্তর এল না। লোকটি আবার বলল, “আমরা জানি সে এখানে আছে।”

লারসেন এবার নিজেই বাড়ির বারান্দায় বেরিয়ে এল। তার হাতে কোনো বন্দুক নেই। কোমরের পিস্তল অবশ্য যথাস্থানে। বাড তার কয়েক পা পেছনে। মারদেকা দরজার আড়াল থেকে তাকিয়ে আছে। 

লারসেন বারান্দার শেষ ধাপে এসে থামল। “আমিই লারসেন।”

সামনের লোকটি তাকে কিছুক্ষণ দেখল। তার চোখে বিস্ময় নেই। যেন সে ইতিমধ্যেই জানত, এই মানুষটিই সামনে আসবে। “অনেক বছর পর দেখা হচ্ছে।”

লারসেনের চোখ সরু হয়ে এল। সে লোকটাকে চিনতে পারছে না। অন্তত মুখ দেখে নয়। কিন্তু কথার ভঙ্গি, শরীরের স্থিরতা, ঘোড়ার ওপর বসার ধরন, সবকিছু তার স্মৃতির কোথাও গিয়ে আঘাত করল।

“আমাকে চিনতে পারছেন না?”

লারসেন ধীরে বলল, “চেনার মতো কিছু দেখছি না।”

লোকটি সামান্য হাসল। “সময় অনেক কিছু বদলে দেয়।”

লারসেন বলল, “সময় মুখ বদলায়। অভ্যাস বদলায় না।”

লোকটির হাসি মিলিয়ে গেল। এই ছোট কথোপকথনের মধ্যেই দুজন মানুষ একে অপরকে মেপে নিল। কে কতটা জানে, কে কতটা লুকাচ্ছে, কে আগে গুলি চালাতে পারে, কে অপেক্ষা করবে, সবকিছুর হিসাব যেন কয়েক মুহূর্তের মধ্যে হয়ে গেল।

বাড তখন লক্ষ্য করল, সামনের লোকটির পেছনে থাকা একজন ঘোড়সওয়ার বারবার বাড়ির ডানদিকে তাকাচ্ছে। আরেকজনের চোখ আস্তাবলের দিকে। তৃতীয়জন পাহাড়ের পথের দিকে। তারা কথা বলছে না, কিন্তু প্রত্যেকেই আলাদা জায়গা দেখছে। এরা শুধু লারসেনের সঙ্গে কথা বলতে আসেনি। তারা র&#x200d;্যাঞ্চের অবস্থান পরীক্ষা করছে।

লারসেনও সেটা বুঝেছে। “কী চাই?”

সামনের লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমাদের লোকের সঙ্গে কথা বলতে হবে।”

“কোন লোক?” 

লোকটির চোখ এবার সামান্য বদলে গেল। “যে জিনিস আপনার কাছে আছে।”

লারসেনের মুখে কোনো অভিব্যক্তি এল না। কিন্তু বারান্দার দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মারদেকার বুকের ভেতর হঠাৎ ধাক্কা লাগল। তার হাত অজান্তেই পকেটের ওপর চলে গেল। চাকতিটা সেখানে আছে।

লারসেন সেটা দেখতে পেল না, কিন্তু যেন অনুভব করল। “আমার কাছে অনেক জিনিস আছে।”

সামনের লোকটি বলল, “আমরা জানি কোনটা।”

লারসেন এবার একটু সামনে এগিয়ে এল। “তাহলে তোমাদের ভুল হয়েছে। আমি কোনো জিনিস কাউকে দেব না।”

লোকটির চোখ কঠিন হয়ে উঠল। “আপনি এখনও আগের মতোই জেদি।”

এইবার লারসেনের মনে হলো, সে কণ্ঠটা আগে শুনেছে। খুব বহু বছর আগে। কোনো এক রাতে। আগুনের আলোয়। কেউ একজন তাকে বলেছিল, পালিয়ে গিয়ে লাভ নেই। 
তারপর গুলি চলেছিল।

লারসেনের বুকের ভেতর হঠাৎ পুরোনো স্মৃতির একটা দরজা খুলে গেল। কিন্তু সে সেটা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিল। এখন স্মৃতিতে ডুবে যাওয়ার সময় নয়। সে লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমাদের নেতা কোথায়?”

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আপনি এখনও নামটা উচ্চারণ করতে ভয় পান?” 

বাডের শরীর শক্ত হয়ে গেল। লারসেনের চোখে এবার প্রথমবারের মতো পরিবর্তন দেখা গেল।

লোকটি আরেকবার বলল, “আপনি জানেন সে বেঁচে আছে।”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। দূরে একটা কাক ডাকল। সকালের আলো তখন আরও উজ্জ্বল হয়েছে। পাহাড়ের গায়ে সূর্যের প্রথম রেখা পড়েছে। অথচ র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে যেন সময় থেমে আছে।

বাড বুঝতে পারল, এই লোকেরা যে নামের কথা বলছে, সেই নামই গত রাতে লারসেন কাগজে দেখিয়েছিল। বহু বছর ধরে মৃত বলে ধরে নেওয়া মানুষটি সত্যিই ফিরে এসেছে। আর এই ঘোড়সওয়াররা তার দূত হয়ে এসেছে।

কিন্তু লারসেন তখন অন্য কিছু লক্ষ্য করছিল। সামনের লোকটির ডান হাতের কবজিতে একটা সরু দাগ। ঘোড়ার লাগাম ধরার সময় হাতের চামড়া সামান্য উঠে আসছে। সেই দাগটা লারসেনের মনে পড়ে গেল। একটা মানুষ। একটা রাত। একটা আগুন। আর সেই রাতের শেষে যে মানুষটি ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে গিয়েছিল, তার কবজিতেও একই জায়গায় এমন একটা দাগ ছিল।

লারসেনের চোখ হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। সে এবার বুঝল। এই লোকটি শুধু দলের একজন নয়। সে সেই রাতের সাক্ষী। হয়তো সেই রাতের অংশও।

কিন্তু তার মুখ থেকে নাম বের করার আগেই পাহাড়ের দিক থেকে একটা তীক্ষ্ণ শব্দ এল। গুলি নয়। পাখির ডাকের মতো।

সামনের ঘোড়সওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। তার পেছনের লোকেরাও এক মুহূর্তে সতর্ক হয়ে উঠল।

লারসেন বুঝে গেল, এটা সংকেত। র&#x200d;্যাঞ্চের বাইরে থাকা আরও কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তার চোখ পাহাড়ের দিকে উঠল। কিছু দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পাহাড়ের ঢালের এক জায়গায় শুকনো ঘাসের মাথা সামান্য দুলে উঠল। বাতাস সেই মুহূর্তে অন্যদিকে বইছিল। কেউ সেখানে আছে। শুধু একজন নয়।

লারসেনের মনে হলো, এই দলটি র&#x200d;্যাঞ্চে এসেছে সামনে থেকে কথা বলার জন্য, কিন্তু আসল উদ্দেশ্য অন্য কোথাও। তারা চাইলে রাতেই আক্রমণ করতে পারত। তারা করেনি। কারণ তারা অপেক্ষা করছিল। তারা জানতে চাইছিল, র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরে কী আছে, কে কোথায় থাকে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, চাকতিটা কার কাছে।

মারদেকার দিকে তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য গেল। ছেলেটা এখনও দরজার আড়ালে। 
লারসেনের মনে হলো, শত্রুরা হয়তো তাকে দেখেনি। কিন্তু তারপরই সামনের লোকটির চোখ বাড়ির দিকে উঠল। তার দৃষ্টি সরাসরি দরজার আড়ালে গিয়ে থামল। 
“ছেলেটা কে?”

লারসেনের শরীরের ভেতর যেন মুহূর্তের জন্য বরফ জমে গেল। সে এক পা সামনে এগিয়ে এল। “তোমার জানার দরকার নেই।”

লোকটি মৃদু হাসল। “আমাদের দরকার আছে।”

এইবার বাড আর নিজেকে থামাতে পারল না। সে কোমর থেকে বন্দুকের হাতল বের করে আনল। একই সঙ্গে র&#x200d;্যাঞ্চের অন্য প্রান্তে ক্লে আর হ্যাঙ্কও নিজেদের অবস্থান বদলাল। 

কিন্তু লারসেন হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিল। এখন গুলি চালালে র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশে থাকা অদৃশ্য লোকগুলোও বেরিয়ে আসবে।

সামনের লোকটি সেটা বুঝে ফেলেছে। সে ধীরে ঘোড়ার মাথা ঘুরিয়ে নিল। “আজ আমরা শুধু কথা বলতে এসেছি।”

লারসেন ঠান্ডা গলায় বলল, “পরের বার?”

লোকটি ঘোড়ার ওপর বসেই তার দিকে তাকাল। “পরের বার হয়তো কথা থাকবে না।” সে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিতে শুরু করল। তার পেছনের লোকগুলোও ধীরে ধীরে সরে গেল। কিন্তু তারা যাওয়ার সময় একবারও র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে পিঠ পুরোপুরি ফিরিয়ে দিল না। কয়েক গজ দূর যাওয়ার পর সামনের লোকটি থামল। তারপর পেছনে তাকিয়ে বলল, “চাকতিটা যার কাছে আছে, তাকে নিয়ে সাবধানে থাকবেন।”

লারসেনের চোখ সরু হলো।

লোকটি আর কিছু বলল না। ঘোড়াগুলো ধীরে ধীরে পাহাড়ের দিকে চলে গেল। কয়েক মিনিট পর তাদের শব্দও মিলিয়ে গেল। কিন্তু র&#x200d;্যাঞ্চের কেউ নড়ল না। কারণ সবাই জানত, তারা চলে গেলেও বিপদ চলে যায়নি।

লারসেন ধীরে দরজার দিকে ফিরে তাকাল। মারদেকা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ ফ্যাকাশে নয়, কিন্তু চোখে এক ধরনের কঠিন আলো। পকেটের ওপর তার হাত।

লারসেন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল, “এবার তোমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় হয়েছে।”

মারদেকা এগিয়ে এল। বাডও কাছে এসে দাঁড়াল। অন্যরা দূরে রইল।

লারসেন ঘরে ঢুকে মারদেকার কাছ থেকে প্রথম চাকতিটা চেয়ে নিল। সেটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর দ্বিতীয় চাকতিটা তার পাশে রাখল। দুটো ধাতব চাকতি পাশাপাশি রাখা মাত্র সকালের আলোয় তাদের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠল।

মারদেকা দুটির দিকে তাকিয়ে রইল। দুটোর চিহ্ন একই নয়। কিন্তু তাদের মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক আছে, যা চোখ এড়ায় না।

লারসেন চেয়ার টেনে বসে পড়ল। তারপর অনেকক্ষণ ধরে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। যেন কথাগুলো সাজানোর জন্য সময় দরকার। শেষ পর্যন্ত সে বলল, “অনেক বছর আগে একটা দল ছিল। তারা সীমান্তের দুই পাশে চলত। তাদের কাজ শুধু চোরাচালান ছিল না। তারা মানুষের গোপন তথ্য বহন করত, অস্ত্র বহন করত, টাকা বহন করত। আর কখনও কখনও মানুষও।”

মারদেকা চুপ করে শুনছিল। 

লারসেন বলল, “আমি তাদের সঙ্গে ছিলাম।”

ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। মারদেকার চোখে বিস্ময় ফুটল, কিন্তু সে কিছু বলল না।

লারসেন আবার বলল, “আমি তখন তরুণ ছিলাম। বুঝতাম না, কোন পথ কোথায় গিয়ে শেষ হয়। ভাবতাম আমি শুধু পথ দেখাচ্ছি। কিন্তু পরে বুঝলাম, আমি এমন একটা জালের অংশ হয়ে গেছি যার শেষ কোথায়, সেটা কেউ জানে না।”

সে ধীরে চাকতিগুলোর দিকে তাকাল। “এই চিহ্ন ছিল সেই দলের ভাষা।”

মারদেকা নিচু হয়ে চাকতিগুলোর দিকে তাকাল। সহসা তার মনে আবার সেই অস্পষ্ট ছবি ফিরে এল। একটা কাঠের দেয়াল। গাঢ় নীল কাপড়। একটা দরজা। আর কোনো একজন মানুষের হাত। সেই হাত তার হাতের ওপর রাখা। সে চোখ বন্ধ করল। মুহূর্তের মধ্যে তার মাথার ভেতর একটা শব্দ উঠল। “দৌড়াও।” 

মারদেকা হঠাৎ চোখ খুলল।

লারসেন তাকে দেখছিল। “কী মনে পড়ল?”

মারদেকা উত্তর দিতে পারল না। তার বুকের ভেতর দ্রুত শ্বাস উঠানামা করছে। সে জানে না সেই শব্দ কার। কিন্তু একটা জিনিস সে নিশ্চিতভাবে অনুভব করছে। শব্দটা তার নিজের কল্পনা নয়।

সে খুব ধীরে বলল, “কেউ আমাকে একবার দৌড়াতে বলেছিল।”

লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “কে?”

মারদেকা মাথা নাড়ল। “জানি না।”

বাড তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হলো, দূরের পাহাড়ের আড়ালে এখনও কেউ তাদের দেখছে। হয়তো সেই মানুষ, যে ঘোড়সওয়ারদের পাঠিয়েছে। হয়তো সেই মানুষ, যার নাম বহু বছর ধরে মৃতদের তালিকায় ছিল।

লারসেন ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ এবার আর শুধু অতীতের দিকে নয়। সামনে থাকা ছেলেটার দিকে। সে বুঝতে পারল, এতদিন যে প্রশ্নের উত্তর সে নিজের কাছেও দিতে চায়নি, আজ সেই প্রশ্ন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

মারদেকা কে? কেন এই চাকতি তার কাছে চেনা মনে হয়? কেন সে চিহ্নগুলো দেখলে এমন কিছু মনে করতে পারে যা তার নিজের স্মৃতি হওয়ার কথা নয়? আর সবচেয়ে বড় কথা, সেই পুরোনো রাতের আগুনের সঙ্গে এই ছেলেটার কী সম্পর্ক?

লারসেন জানত, এসব প্রশ্নের উত্তর তার কাছে পুরোপুরি নেই। কিন্তু সে এটাও জানত, উত্তর খুঁজতে হলে তাকে আবার সেই জায়গায় ফিরতে হবে যেখান থেকে সে বহু বছর আগে পালিয়ে এসেছিল। 

পাহাড়ের ওপারে। পুরোনো আশ্রয়ের কাছে। সেই পথের কাছে, যেখানে একদিন টাকা আর নথি লুকানো হয়েছিল। আর যেখানে হয়তো এখনও এমন কোনো সত্যি পড়ে আছে, যেটা জানলে শুধু লারসেনের অতীত বদলাবে না, মারদেকার ভবিষ্যৎও বদলে যাবে।

বাইরে তখন সূর্য উঠে গেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর আলো ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষজন আবার দিনের কাজে ফিরছে। ঘোড়াগুলোকে বাইরে আনা হচ্ছে, রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে, দূরে গবাদি পশুর ডাক শোনা যাচ্ছে। সবকিছু যেন স্বাভাবিক।

কিন্তু লারসেন জানত, এই স্বাভাবিকতা আর বেশিদিন থাকবে না। কারণ শত্রুরা এবার নিজেদের দেখিয়ে গেছে। তারা জানে চাকতি দুটো কোথায়।

তারা জানে লারসেন এখনও বেঁচে আছে। তারা জানে মারদেকা এই র&#x200d;্যাঞ্চে আছে। আর তারা এমন একজনের হয়ে কাজ করছে, যার নাম বহু বছর ধরে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল।

লারসেন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের দিকে তাকাল। তারপর খুব ধীরে মুঠো বন্ধ করল। বহু বছর আগে সে একটা পথ ছেড়ে এসেছিল। আজ সেই পথ আবার তাকে ডাকছে। আর এবার সে একা যাবে না।

তার পাশে থাকবে সেই তেরো বছরের ছেলেটা, যে এখনও জানে না তার নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য কোথায় লুকিয়ে আছে।

দূরের পাহাড়ের ওপর দিয়ে একটা কালো পাখি উড়ে গেল। লারসেনের চোখ সেই পাখির দিকে উঠল। তারপর সে মারদেকার দিকে তাকাল। ছেলেটা তখনও দুটো চাকতির দিকে তাকিয়ে। তার চোখে ভয় নেই।

শুধু একটা প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাদের সবাইকে আবার সীমান্তের ওপারে যেতে হবে। এবার শুধু পুরোনো হিসাবের জন্য নয়। মারদেকার অতীতের জন্যও।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/266941/</link>
				<pubDate>Sat, 29 Aug 2026 07:01:52 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–বিশ<br />
রাতের সেই মুহূর্তটা অনেকক্ষণ ধরে লারসেনের মনে ঘুরতে থাকল। মারদেকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ছুরি, চোখে এমন এক স্থিরতা, যে স্থিরতা কোনো তেরো বছরের ছেলের চোখে থাকার কথা নয়। লারসেন জানত, ছেলেটা এখন আর শুধু কৌতূহলী নয়। সে বুঝতে শুরু করেছে, র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশে যে অস্বাভাবিকতা তৈরি&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-266941"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/266941/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">cf626c6ef1f1036b89eedb74de8b3b05</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–উনিশ
রাত তখন আরও গভীর হয়ে উঠেছে। পাহাড়ের গায়ে চাঁদের আলো এখনও পুরোপুরি পড়েনি, অথচ আকাশের কালো বিস্তারে তারাগুলো এমনভাবে জ্বলছিল যেন দূর কোনো অদৃশ্য আগুনের ছাই বাতাসে ছড়িয়ে আছে। শুকনো খাতের পাশে দাঁড়িয়ে লারসেন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। তার ঘোড়াটা পেছনে অস্থিরভাবে পা বদলাচ্ছিল, মাঝে মাঝে নাসারন্ধ্র দিয়ে গরম বাতাস ছাড়ছিল। কিন্তু লারসেন ঘোড়াটার দিকে ফিরল না। তার সমস্ত মনোযোগ ছিল পাহাড়ের ঢালের দিকে, যেখানে কয়েক মুহূর্ত আগে ক্ষীণ একটা আলো জ্বলে উঠেছিল এবং তারপর হঠাৎ নিভে গিয়েছিল।

আলোটা এত ক্ষীণ ছিল যে অন্য কেউ হয়তো সেটাকে চোখের ভুল বলে ধরে নিত। দূরের কোনো পাথরে চাঁদের আলো পড়া, শুকনো ঝোপের ফাঁকে জোনাকির মতো কোনো ক্ষণস্থায়ী জ্যোতি, অথবা কোনো মানুষের হাতে ঢাকা লণ্ঠনের সামান্য প্রতিফলন। কিন্তু লারসেন জানত, সে ভুল দেখেনি। বহু বছর প্রেইরিতে কাটিয়েছে সে। অন্ধকারে মানুষের আলো আর প্রকৃতির আলো আলাদা করে চেনার মতো চোখ তার তৈরি হয়েছে অনেক আগেই। আর যে আলো একবার জ্বলে উঠেই নিভে যায়, সেটাকে সে কখনও অবহেলা করে না।

সে ধীরে ধীরে ঘোড়ার কাছে ফিরে এল। লাগামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঘোড়ার পিঠে উঠল না। বরং লাগাম ধরে পায়ে হেঁটে পাহাড়ের ঢালের দিকে এগোতে লাগল। ঘোড়ার খুরের শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত যায়। পাথরের ওপর লোহার খুরের আঘাত রাতের নিস্তব্ধতায় অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট শোনা যায়। লারসেন জানত, যদি সত্যিই কেউ তাকে নজরে রেখে থাকে, তবে ঘোড়ায় চড়ে ওপরে ওঠা মানে নিজের অবস্থান ঘোষণা করে দেওয়া। সে বরং ঘোড়াটাকে নিচের ছায়ার মধ্যে রেখে নিজেই উঠবে।

ঢালটা খুব খাড়া নয়, কিন্তু মাটি শুকনো এবং আলগা। কোথাও কোথাও ছোট পাথর পায়ের নিচে গড়িয়ে যাচ্ছে। লারসেন প্রতিটি পদক্ষেপ হিসেব করে ফেলছে। পায়ের চাপ যতটা সম্ভব হালকা। শরীরের ভার এমনভাবে রাখছে যাতে পাথর না গড়ায়। মাঝে মাঝে সে থেমে যাচ্ছে, মাথা সামান্য কাত করে চারপাশের শব্দ শুনছে।

কিছু নেই। শুধু বাতাস। দূরের কোনো নিশাচর পাখি একবার ডাকল। তারপর আবার নীরবতা। 

লারসেন আরও ওপরে উঠল। ঢালের মাঝামাঝি গিয়ে সে থামল। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে হাতের তালু দিয়ে ধুলো সরাল। কিছু শুকনো ঘাস চ্যাপ্টা হয়ে আছে। খুব পুরোনো নয়। তার পাশে পাথরের গায়ে সামান্য ঘষার দাগ। কেউ এখানে দাঁড়িয়েছে। তারপর নিচু হয়ে বসেছে অথবা হাঁটু গেড়েছে।

লারসেন চোখ সরু করল। মানুষটা একা ছিল না। তার একটু দূরে আরও দুটো ভাঙা ঘাসের গোছা। কেউ হয়তো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর ঢালের ওপরের দিকে গেছে।

লারসেন আর সময় নষ্ট করল না। সে আরও ওপরে উঠতে লাগল। পাহাড়ের ঢাল যত ওপরে উঠছিল, বাতাস তত ঠান্ডা হচ্ছিল। নিচের প্রেইরি এখন অনেকটা নিচে পড়ে গেছে। দূরে লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চের কিছু আলো ক্ষীণ বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছে। এত দূর থেকে র&#x200d;্যাঞ্চটাকে শান্ত, নিরাপদ একটা জায়গা বলে মনে হয়। কিন্তু লারসেন জানে, সেই শান্তির নিচে এখন এমন একটা বিপদ ঢুকে পড়েছে, যার শিকড় হয়তো বহু বছর আগের।

অবশেষে সে একটা পুরোনো কাঠের আশ্রয় দেখতে পেল। আশ্রয় বলা যায় কি না সন্দেহ। চারদিকে শুকনো কাঠের খুঁটি, এক পাশে কাত হয়ে থাকা দেয়াল, ছাদের অর্ধেক ভেঙে পড়েছে। তবু বোঝা যায়, একসময় এখানে মানুষ থাকত। হয়তো পথিকেরা। হয়তো শিকারি। হয়তো এমন লোকেরা, যারা নিজেদের অস্তিত্ব গোপন রেখে চলত।

লারসেন আশ্রয়ের সামনে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখল। কোনো ঘোড়া নেই। কোনো মানুষ নেই। আগুনের গন্ধ নেই। কিন্তু এখানে কেউ ছিল।

সে ধীরে ধীরে ভাঙা দরজার কাছে গেল। কাঠের দরজাটা অর্ধেক ঝুলছে। বাতাস লাগলে সামান্য নড়ে কড়কড় শব্দ করছে। লারসেন হাত বাড়িয়ে দরজাটা সরাল। ভেতরটা অন্ধকার। সে কোমর থেকে পিস্তল বের করল না। শুধু হাতটা অস্ত্রের কাছে রাখল এবং ভেতরে ঢুকে গেল।

ঘরের মেঝে শুকনো ধুলোয় ঢাকা। এক কোণে পুরোনো খড়ের স্তূপ। দেয়ালের কাঠে পোকায় খাওয়া অসংখ্য ছোট ছিদ্র। ছাদের ভাঙা অংশ দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। বহু বছর ধরে কেউ এখানে নিয়মিত বসবাস করেনি, সেটা পরিষ্কার।

কিন্তু মেঝের ধুলোয় কয়েকটি তাজা চিহ্ন ছিল। লারসেন প্রথমেই সেগুলো দেখল। একজন এখানে দাঁড়িয়েছে। আরেকজন বসেছে। তারপর তার চোখ গিয়ে থামল দেয়ালের পাশে পড়ে থাকা একটা কাপড়ের টুকরোয়। গাঢ় নীল। 
লারসেন নিচু হয়ে সেটা তুলে নিল।

কাপড়টা আগের দিনের পাওয়া টুকরোটার মতোই মোটা। বুনন শক্ত। বয়সের কারণে কাপড়ের কিছু অংশ শক্ত হয়ে গেছে, কিন্তু রঙের গভীর নীল এখনও স্পষ্ট। লারসেন কাপড়টা আঙুলের মধ্যে মুচড়ে দেখল। তারপর নাকের কাছে নিয়ে এল।

ঘোড়ার গন্ধ নেই। ধোঁয়ার গন্ধও নেই। কিন্তু কাপড়ে খুব ক্ষীণ একটা তেলের গন্ধ আছে। পুরোনো অস্ত্রের তেল। তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। সে কাপড়টা পকেটে রাখল। তারপর মেঝের দিকে তাকাল।

একটা খালি কার্তুজ পড়ে আছে। লারসেন সেটা তুলে নিল। আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে দেখল। ধাতব খোসার গায়ে মরচে ধরেছে, কিন্তু সম্পূর্ণ পুরোনো নয়। ক্যালিবারটা দেখে তার মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল।

এটা সাধারণ র&#x200d;্যাঞ্চের রাইফেলের কার্তুজ নয়। এই ধরনের অস্ত্র সে বহু বছর আগে দেখেছে। খুব কাছ থেকে। তার নিজের জীবনের এমন একটা সময়ে, যখন বন্দুকের শব্দ মানেই ছিল বেঁচে থাকা অথবা মরে যাওয়া।

লারসেন কার্তুজটা পকেটে রাখল। তারপর ভাঙা কাঠের একটা বাক্সের অংশ দেখতে পেল। বাক্সটা দেয়ালের পাশে পড়ে আছে। ঢাকনা ভেঙে গেছে। একটা লোহার কবজা এখনও কাঠের সঙ্গে আটকে। লারসেন বাক্সের টুকরোটা তুলে নিল। কাঠের ওপর একটা পুরোনো দাগ রয়েছে। চিহ্ন নয়, যেন কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে একসময় একটা সংখ্যা কাটা হয়েছিল।

সে সংখ্যাটা দেখে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর বাক্সটা নামিয়ে রাখল। ঘরের সবচেয়ে দূরের দেয়ালে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল। চিহ্নটা সেখানে আঁকা। কালো হয়ে যাওয়া কাঠের ওপর। একটা বাঁকানো রেখা, তার ভেতর দিয়ে কাটা সরু দাগ, আর নিচের দিকে অর্ধচন্দ্রের মতো একটা বক্রতা।

লারসেন কয়েক পা এগিয়ে গেল। আঙুল দিয়ে চিহ্নটা ছুঁল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, বহু বছর আগের একটা দরজা আবার খুলে গেছে।

সে তখনও যুবক। পৃথিবীকে অন্য চোখে দেখত। বিশ্বাস করত মানুষের কথা। বিশ্বাস করত বন্ধুত্বের ওপর। কয়েকজন মানুষের সঙ্গে পথ চলেছিল, যাদের সে নিজের জীবনের অংশ বলে মনে করেছিল। তাদের ঘোড়ার জিনে এই চিহ্ন ছিল। তাদের পোশাকে এই গাঢ় নীল কাপড় ছিল। আর তাদের অস্ত্রের বাক্সে এমন কার্তুজ থাকত, যেগুলো দিয়ে রাতের অন্ধকারে মানুষ মারা হয়েছিল।

তারপর এসেছিল সেই রাত। আগুন। গুলির শব্দ। বিশ্বাসঘাতকতা। আর এমন কয়েকজন মানুষের মৃত্যু, যাদের মুখ লারসেন আজও ভুলতে পারেনি।

সে চোখ বন্ধ করল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, আবার সেই রাতের ধোঁয়া নাকে ঢুকছে। কেউ চিৎকার করছে। কেউ ঘোড়া ছুটিয়ে পালাচ্ছে। কেউ পেছন থেকে গুলি চালাচ্ছে। তারপর সবকিছু অন্ধকার।

লারসেন চোখ খুলল। বর্তমান ফিরে এল। সে ধীরে ধীরে দেয়াল থেকে সরে দাঁড়াল। 
এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। যারা র&#x200d;্যাঞ্চে এসেছিল তারা কোনো হঠাৎ তৈরি হওয়া দল নয়। তারা পুরোনো কোনো হিসাবের উত্তরাধিকারী। তাদের হাতে পুরোনো চিহ্ন আছে। পুরোনো অস্ত্রের স্মৃতি আছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, তারা জানে কোথায় কী খুঁজতে হবে।

অর্থাৎ তারা প্রস্তুত হয়ে এসেছে। একদিনে নয়। এক মাসে নয়। বছরের পর বছর ধরে।

লারসেন আশ্রয়ের ভাঙা জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। পাহাড়ের ঢাল অন্ধকারে ডুবে আছে। নিচে তার ঘোড়া দাঁড়িয়ে। তার ওপরে বিশাল আকাশ।

সে ধীরে নিজের পকেট থেকে কালচে ধাতব চাকতিটা বের করল। চাঁদের আলোয় চাকতিটা সামান্য ঝলকে উঠল। চিহ্নটা যেন দেয়ালের চিহ্নের দিকে তাকিয়ে আছে। 
দুটো চিহ্ন পুরোপুরি একই নয়, কিন্তু একই হাতের লেখা বলেই মনে হয়। যেন একটা ছিল মূল, আর অন্যটা তার কোনো প্রতিলিপি। 

লারসেনের মনে হলো, চাকতিটা শুধু কোনো পরিচয়ের চিহ্ন নয়। এটা হয়তো কোনো পুরোনো গোষ্ঠীর পরিচয়। হয়তো কোনো গোপন পথের। হয়তো এমন কোনো সম্পদের, যার জন্য মানুষ মরতে পারে। আর যদি তা-ই হয়, তবে প্রশ্ন একটাই। এত বছর পরে তারা আবার কেন ফিরেছে? 

লারসেন চাকতিটা মুঠোয় চেপে ধরল। ঠিক তখনই খুব ক্ষীণ একটা শব্দ হলো। পাথরের ওপর পাথর ঘষার শব্দ। সে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল। পিস্তল বেরিয়ে এল হাতে। 
দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল। কিছু নেই।

লারসেন ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল। বাইরে মাথা বের না করে প্রথমে নিচের ছায়া দেখল। তারপর শরীরটা সামান্য সরিয়ে পাহাড়ের ঢালের দিকে তাকাল। কেউ নেই।

শুধু একটা ছোট পাথর ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নিচে নেমে গেছে। সে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর পিস্তল কোমরে গুঁজে দিল।

কেউ তাকে দেখছে কি না, সে নিশ্চিত নয়। কিন্তু এখন সে নিশ্চিত, এই জায়গাটা শুধু অতীতের স্মৃতি নয়। কেউ সম্প্রতি এখানে এসেছে। কেউ এই পুরোনো আশ্রয়কে আবার ব্যবহার করছে।

লারসেন ভাঙা কাঠের মেঝেটা আরও একবার পরীক্ষা করল। একটা কোণে ধুলো সরিয়ে ছোট্ট একটা দাগ পেল। যেন ভারী কিছু সেখানে রাখা হয়েছিল। কাঠের ওপর গোলাকার ঘষার চিহ্ন। তার হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে চাকতির দিকে গেল। তারপর সে থেমে গেল। এটা কি কেবল কাকতালীয়? 

লারসেনের মনে প্রথমবার একটা ভয় ঢুকল। নিজের জন্য নয়। মারদেকার জন্য। ছেলেটা এখন র&#x200d;্যাঞ্চে আছে। তার বয়স তেরো পেরিয়েছে। চোখে আগের চেয়ে বেশি সতর্কতা। কানে সামান্য শব্দও এড়িয়ে যায় না। ছুরি হাতে তার দক্ষতা বাড়ছে। কিন্তু সে এখনও জানে না, যে অন্ধকার তাকে ঘিরে আসছে তার গভীরতা কতটা।

আর লারসেন জানে, কিছু সত্যি এমন থাকে, যেগুলো জানা মানেই বিপদের দিকে এক পা এগিয়ে যাওয়া। সে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। নিচে নেমে ঘোড়ার কাছে পৌঁছে আবার একবার পাহাড়ের দিকে তাকাল। কেউ নেই।

কিন্তু এবার তার মনে হলো, অন্ধকারের ভেতর কোথাও চোখ জ্বলছে। সে ঘোড়ায় উঠল। ঘোড়া ঘুরিয়ে ফিরতি পথ ধরলো। আর একবারও পেছনে তাকাল না।

অন্যদিকে, লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে তখন রাত অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। মারদেকা ঘুমায়নি। 
ছেলেটা নিজের ঘরের জানালার পাশে বসে ছিল। তার সামনে ছোট প্রদীপ। প্রদীপের হলুদ আলোয় কালচে চাকতিটা রাখা। মাঝে মাঝে সে সেটার দিকে তাকাচ্ছিল, আবার চোখ বন্ধ করছিল।

স্মৃতি ফিরে আসছিল না। শুধু কিছু অস্পষ্ট ছবি। একটা কাঠের দেয়াল। একটা পুরোনো দরজা। দরজার পাশে ঝোলানো গাঢ় নীল কাপড়। আর সেই চিহ্ন।

সে জানত না ছবিগুলো সত্যি, নাকি তার কল্পনা। কিন্তু একটা ব্যাপার তাকে অস্বস্তিতে ফেলছিল। সে চিহ্নটা শুধু দেখেনি। কখনও যেন ছুঁয়েছিল।

তারপর দরজায় হালকা শব্দ হলো। মারদেকা দ্রুত চাকতিটা হাতে তুলে নিল। 

দরজা খুলে বাড ভেতরে ঢুকল। কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

মারদেকা চাকতিটা হাতে রেখেই বলল, “আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব।”

বাড চুপ করে রইল।

মারদেকা এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। “লারসেন আমাকে এখানে কেন এনেছিলেন?”

বাডের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না। সে জানালার বাইরে তাকাল। দূরে পাহারার আগুন জ্বলছে। রাতের বাতাসে তার ধোঁয়া বাঁকা হয়ে উঠছে। র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশে লোকজনের চলাফেরা কমে এসেছে। মাঝে মাঝে ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে ধীরে বলল, “তোমার এখানে থাকার কারণ তোমার নিজের ভবিষ্যৎ।”

মারদেকা মাথা নাড়ল। “এটা উত্তর নয়।”

বাড তার দিকে তাকাল। ছেলেটার চোখে এবার এমন দৃঢ়তা যে বাড কিছুক্ষণ কথা খুঁজে পেল না। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “সবকিছু জানা আর সবকিছু বলা এক জিনিস নয়।”

মারদেকার চোখ সরু হয়ে এল। “তাহলে আপনি জানেন।”

বাড কোনো উত্তর দিল না। এই নীরবতাই মারদেকার কাছে যথেষ্ট ছিল।

সে চাকতিটা মুঠোয় চেপে ধরল। তারপর ধীরে বলল, “লারসেন কি আমার জন্য ভয় পান?”

বাড এবার ছেলেটার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার চোখে এমন একটা দৃষ্টি ফুটে উঠল, যা মারদেকা আগে দেখেনি। “লারসেন ভয় পায় না।” কিছুক্ষণ থেমে যোগ করলো, “কিন্তু যাকে সে নিজের মানুষ ভাবে, তাকে হারানোর ভয় সে বোঝে।”

মারদেকা আর কিছু বলল না। 

বাড দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খোলার আগে সে একবার পেছনে তাকাল। 
“ঘুমাও।”

মারদেকা শান্ত গলায় বলল, “লারসেন কোথায় গেছেন?”

বাডের হাত দরজার হাতলে স্থির হয়ে গেল। সে উত্তর দিল না। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

মারদেকা একা হয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দূরের অন্ধকারে চোখ রাখতেই তার মনে হলো, লারসেন যে কারণে বাইরে গেছে, সেই কারণের সঙ্গে তার নিজের অতীতও জড়িয়ে আছে। 

রাত আরও গভীর হলো। অনেক পরে দূরে ঘোড়ার ক্ষীণ শব্দ শোনা গেল। মারদেকা জানালার পাশে দাঁড়িয়েই রইল। 

ভোর হওয়ার কিছু আগে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরল। আকাশ তখন কালচে নীল। পূর্ব দিগন্তে আলো এখনও ওঠেনি। র&#x200d;্যাঞ্চের পাহারার আগুন প্রায় নিভে এসেছে। ঘোড়ার খুরের শব্দে বাড বাইরে বেরিয়ে এল।

লারসেন ঘোড়া থেকে নামল। তার মুখে সারারাতের ক্লান্তি নেই। বরং অদ্ভুত এক কঠিন স্থিরতা। 

বাড এগিয়ে এসে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল।

লারসেন হাত তুলে তাকে থামাল। “ভেতরে চলো।”

দুজন ঘরে ঢুকল। দরজা বন্ধ হওয়ার পর লারসেন কোমরের চামড়ার ব্যাগ খুলল। তার ভেতর থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করল। কাগজটা এত পুরোনো যে ভাঁজের জায়গাগুলো প্রায় ছিঁড়ে গেছে। এক পাশে বাদামি দাগ। অন্য পাশে মোমের পুরোনো সিলের চিহ্ন।

বাড কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল। লারসেন সেটা টেবিলের ওপর মেলে ধরল। কাগজের মাঝখানে একটা নাম লেখা। একটা নাম, যেটা বহু বছর ধরে মৃত মানুষের তালিকায় ছিল।

বাডের মুখের রঙ বদলে গেল। সে খুব নিচু গলায় বলল, “এটা অসম্ভব।”

লারসেন ধীরে মাথা তুলল। “অসম্ভব জিনিসই কখনও কখনও সবচেয়ে বেশি সময় বেঁচে থাকে।” 

বাড আবার নামটার দিকে তাকাল। 

লারসেন জানালার বাইরে ভোরের প্রথম আলো ফুটতে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “লোকটা বেঁচে আছে।”

লারসেনের কথাটা ঘরের বাতাসে কিছুক্ষণ ঝুলে রইল। বাইরে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে পাহাড়ের কালো রেখাগুলোকে ফিকে করে আনছে। রাতের শেষ প্রহরের ঠান্ডা এখনও জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছিল, অথচ বাড হিগিন্সের কপালে হঠাৎ ঘামের চিকচিকে বিন্দু দেখা দিল। টেবিলের ওপর মেলে রাখা পুরোনো কাগজটার দিকে সে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। কাগজের মাঝখানে যে নামটি লেখা, সেটাকে সে চিনত না এমন নয়। নামটি সে প্রথম শুনেছিল বহু বছর আগে, কিন্তু কখনও লারসেনের মুখ থেকে নয়। অন্য লোকের মুখে, অর্ধেক কথায়, থেমে যাওয়া গুজবে, কোনো পুরোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অস্পষ্ট ইঙ্গিতে। তারপর সময়ের সঙ্গে নামটি মুছে গিয়েছিল। অন্তত বাড তাই ভেবেছিল। এখন বুঝতে পারছে, কিছু নাম মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে গেলেও তাদের ছায়া মুছে যায় না।

বাড ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ কাগজ থেকে সরল না। লারসেন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার পিঠের ওপর ভোরের ম্লান আলো এসে পড়েছে। চওড়া কাঁধ, স্থির ভঙ্গি, মাথার সামান্য নত রেখা দেখে মনে হচ্ছিল, বহু বছরের ক্লান্তি সত্ত্বেও মানুষটা যেন কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বাড তাকে বহু বছর ধরে চেনে। এত বছর যে, লারসেনের মুখের সামান্য পরিবর্তন থেকেও তার মনের অবস্থা আন্দাজ করতে পারে। আজকের মুখ সে আগে দেখেছে। বহু বছর আগে, যখন কোনো পুরোনো ক্ষত আবার রক্ত ঝরাতে শুরু করেছিল।

বাডের মনে পড়ে গেল, এক শীতের রাতে সে লারসেনকে প্রথমবার সেই অদ্ভুত চিহ্নের কথা জিজ্ঞেস করেছিল। র&#x200d;্যাঞ্চের উত্তরের বেড়ার কাছে একটা অচেনা ঘোড়ার দাগ পাওয়া গিয়েছিল। লারসেন দাগটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। বাড তখন জিজ্ঞেস করেছিল, ব্যাপারটা কী। লারসেন কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু পাহারা বাড়াতে বলেছিল। তার কয়েক বছর পর আবার একই ধরনের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল এক মৃত ঘোড়ার জিনে। সেবারও বাড প্রশ্ন করেছিল। লারসেন শুধু তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, পুরোনো ব্যাপার। তারপর আর কিছু বলেনি।

বাড কখনও জোর করেনি। কারণ সে জানত, লারসেনের নীরবতার পেছনে কারণ আছে। আর বিশ্বস্ত মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কখনও কখনও প্রশ্নের উত্তর আদায় করা নয়, বরং প্রয়োজনের সময় নিজের লোকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা।

আজ সেই পুরোনো নীরবতা যেন প্রথমবার অর্থ পেল। বাড নিচু গলায় বলল, “আপনি এত বছর ধরে এই নামটা জানতেন?”

লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়েই রইল। পাহাড়ের ওপরে সূর্যের আলো এখনও ওঠেনি, কিন্তু আকাশের রং বদলে গেছে। কালোর জায়গায় নীল, নীলের নিচে ধূসর, আর তার নিচে খুব ক্ষীণ লাল রেখা। নতুন দিনের আগমন যেন এই র&#x200d;্যাঞ্চের ওপরও কোনো অদৃশ্য সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। “জানতাম।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, “আপনি কি নিশ্চিত, লোকটা সেই একই মানুষ?”

লারসেন এবার ঘুরে দাঁড়াল। “নিশ্চিত না হলে তোমাকে বলতাম না।”

বাড আর কিছু বলল না। তার চোখ আবার কাগজের দিকে চলে গেল। এত বছর ধরে সে ভেবেছে, লারসেনের অতীতের শত্রুরা হয়তো একে একে হারিয়ে গেছে। কেউ মরেছে, কেউ অন্য রাজ্যে চলে গেছে, কেউ নিজের নাম বদলে অদৃশ্য হয়েছে। কিন্তু যদি এই মানুষটি বেঁচে থাকে, তাহলে আরও একটা প্রশ্ন সামনে আসে। সে এত বছর কোথায় ছিল? কেন এখন ফিরে এসেছে? আর কেন লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চের আশেপাশে আবার সেই পুরোনো চিহ্নের ছায়া দেখা যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তার কাছে নেই।

কিন্তু লারসেনের চোখে যে উত্তর খোঁজার তাগিদ দেখা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যায়, মানুষটা নিজেও সবকিছু জানে না। তার জানা জিনিস আর অজানা জিনিসের মাঝখানে যেন একটা গভীর অন্ধকার পড়ে আছে। সেই অন্ধকারের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বহু বছরের পুরোনো কোনো ঘটনা, এমন কিছু যার শেষ এখনও হয়নি।

লারসেন কাগজটা ভাঁজ করে বুকের পকেটে রাখল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা কালচে ধাতব চাকতিটা তুলে নিল। ভোরের আলোয় চাকতিটির খোদাই করা চিহ্নটি আরও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ধাতুর ধার বহুদিনের ঘর্ষণে মসৃণ হয়ে গেছে, কিন্তু মাঝখানের চিহ্নটি এখনও তীক্ষ্ণ। লারসেন চাকতিটাকে হাতের তালুর ওপর রেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

এই চাকতিটি সে প্রথম পেয়েছিল সেই রাতের হামলার আগে। আগের ঘটনাটা অন্যরকম ছিল। কয়েকদিন আগে আস্তাবলে একটা ঘোড়া চুরি হয়েছিল। চোর ঘোড়াটাকে নিয়ে পালানোর সময় কোনো এক মুহূর্তে এই একই ধরনের আরেকটি চাকতি ফেলে গিয়েছিল। লারসেন সেটি খুঁজে পেয়েছিল ঘোড়ার খোঁয়াড়ের কাছে। চাকতিটা হাতে নেওয়ার পর সে চিহ্নটি চিনেছিল, কিন্তু তখনও সে নিশ্চিত ছিল না, পুরোনো স্মৃতির কোন দরজা এই চিহ্ন খুলতে চাইছে। সে চাকতিটা নিজের কাছে রেখেছিল কিছুদিন। তারপর একসময় সেটি মারদেকার হাতে তুলে দিয়েছিল, কারণ ছেলেটাকে সে বলেছিল জিনিসটা যত্ন করে রাখতে। এর বেশি কিছু বলেনি।

কিন্তু সেই রাতের হামলার পর ঘটনাটা বদলে যায়। অন্ধকারে একজন আস্তাবলে ঢুকেছিল। নিঃশব্দে। এমনভাবে, যেন জায়গাটা সে আগে থেকেই চেনে। লারসেনের ওপর গুলি চালানোর চেষ্টা হয়েছিল। গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল, আর আক্রমণকারী পালিয়ে যাওয়ার সময় ইচ্ছে করেই আরেকটি চাকতি সেখানে ফেলে গিয়েছিল।

সেই দ্বিতীয় চাকতিটাই এখন লারসেনের হাতে। সেদিন রাতেই সে বুঝেছিল, চাকতিটা ভুল করে পড়ে যায়নি। একজন অভিজ্ঞ লোক কখনও পালানোর সময় এমন জিনিস ফেলে যায় না, যদি না তার ফেলে যাওয়ার কারণ থাকে। আক্রমণকারী চাইলে চাকতিটা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারত। তার কাছে সময়ও ছিল। অথচ সে সেটি রেখে গেছে এমন জায়গায়, যেখানে লারসেনের চোখে পড়বেই।

এটা ছিল একটা বার্তা। হয়তো হুমকি। হয়তো পরিচয়ের ঘোষণা। হয়তো পুরোনো কোনো দরজা আবার খুলে দেওয়ার ইচ্ছাকৃত সংকেত। আর চিহ্নটিও সে চিনেছিল। 
কিন্তু তার অর্থ বাডকে বলেনি।

চাকতিটা হাতের মধ্যে ঘুরাতে ঘুরাতে লারসেনের চোখের সামনে সেই রাতের আস্তাবলটা আবার ভেসে উঠল। অন্ধকার, ঘোড়ার আতঙ্কিত শব্দ, বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধ, কাঠের খুঁটির আড়াল থেকে আসা গুলির শব্দ, তারপর ছুটে পালিয়ে যাওয়া মানুষের অস্পষ্ট ছায়া। লোকটার মুখ সে দেখতে পায়নি। কিন্তু তার চলার ভঙ্গি, গুলির পর মুহূর্তের দ্বিধা, আর চাকতিটা রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, সবকিছুই যেন কোনো পুরোনো প্রশিক্ষণের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল।

তারপর গত রাতের পাহাড়ি আশ্রয়ে আবার সেই চিহ্ন দেখা গেছে। এবার ব্যাপারটা আর কেবল স্মৃতি নয়। এটা একটা নিশ্চিত প্রমাণ যে পুরোনো চিহ্নটি আবার ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু লারসেনের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল অন্য জায়গায়।

ওরা যদি সত্যিই চাকতিটা চায়, তাহলে দ্বিতীয় চাকতিটা রেখে গেল কেন? উত্তরটা হয়তো সেখানেই লুকিয়ে আছে। ওরা হয়তো চাকতিটা খুঁজছে না। ওরা খুঁজছে সেই জিনিস, যার সঙ্গে চাকতিটির সম্পর্ক।

চাকতিটা তাদের কাছে চাবি নয়, বরং চাবির চিহ্ন। আর সেই চিহ্ন দেখিয়ে কেউ লারসেনকে জানিয়ে দিয়েছে, যারা একসময় অদৃশ্য হয়েছিল তারা আবার ফিরে এসেছে। প্রথম চাকতিটা ঘোড়া চুরির সময় দুর্ঘটনাবশত পড়ে গেলেও দ্বিতীয় চাকতিটা ছিল ইচ্ছাকৃত। সেই দ্বিতীয় চাকতিটা যেন প্রথমটির অস্তিত্বকে অর্থপূর্ণ করে তুলেছে। লারসেন ধীরে চাকতিটা মুঠোয় চেপে ধরল। 

বাড তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে কিছুক্ষণ পরে বলল, “এই চিহ্নের সঙ্গে ওই নামের সম্পর্ক আছে?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। চাকতিটা সে ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে দেখল। তারপর টেবিলের ওপর রাখল। “সম্ভবত।”

বাডের মুখে চিন্তার রেখা গভীর হলো। সে চাকতিটার দিকে তাকাল, কিন্তু হাত বাড়াল না। লারসেনের হাতে থাকা জিনিসে অনুমতি ছাড়া হাত দেওয়া তার স্বভাব নয়। “ওরা কি এটা খুঁজছে?”

লারসেন কিছুক্ষণ নীরব থাকল। “চাকতিটা নয়।”

বাড ভ্রু কুঁচকাল। 

লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “চাকতিটা রেখে যাওয়ার কারণটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

বাড বুঝতে পারল না। কিন্তু লারসেনের মুখ দেখে আর প্রশ্ন করল না।

বাইরে তখন র&#x200d;্যাঞ্চের প্রথম মানুষজন জেগে উঠছে। দূরে ঘোড়ার নড়াচড়া, আস্তাবলের দরজা খোলার শব্দ, পাহারার আগুনে কাঠ ফেটে যাওয়ার শব্দ, সব মিলিয়ে নতুন দিনের স্বাভাবিক ব্যস্ততা শুরু হচ্ছে। অথচ এই ঘরের ভেতর সময় যেন এখনও রাতেই আটকে আছে।

বাড ধীরে বলল, “তাহলে তারা কী চায়?”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। “সেটাই জানতে হবে।”

“আপনি কি আগে থেকেই জানতেন, তারা আবার আসতে পারে?”

লারসেন মাথা নাড়ল। “আসবে, সেটা জানতাম না।”
 
একটু থেমে সে বলল, “কিন্তু একদিন পুরোনো হিসাব ফিরে আসতে পারে, সেটা কখনও ভুলিনি।”

বাড মাথা নিচু করল। এটাই হয়তো লারসেন এত বছর ধরে বলতে না চাওয়া কথার সবচেয়ে কাছাকাছি উত্তর। সে জানত, লারসেনের জীবনে এমন কিছু ঘটেছিল যার ছায়া কখনও পুরোপুরি সরে যায়নি। এখন সেই ছায়া আবার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছে।

কিন্তু লারসেনের হাতে থাকা দ্বিতীয় চাকতিটা যেন তাকে আরও একটি কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। এবার যারা এসেছে তারা শুধু অতীতের কথা মনে করিয়ে দিতে আসেনি। তারা চায় লারসেন জানুক, তারা ফিরে এসেছে।

বাড দরজার দিকে এগোতে যাচ্ছিল। ঠিক তখন লারসেন তাকে থামাল। “বাড।”

বাড ফিরে তাকাল।

“মারদেকাকে এখন কিছু বলবে না।”

বাডের চোখে সামান্য বিস্ময় ফুটে উঠল। তারপর সে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। “জি।”

একটু থেমে সে বলল, “কিন্তু ছেলেটা বেশিদিন কিছু না জেনে থাকবে না।”

লারসেনের মুখে কঠিন এক ছায়া নেমে এল। “আমি জানি।”

এই কথার পর আর কিছু বলার ছিল না।

মারদেকা যে অন্য ছেলেদের মতো নয়, সেটা বাড অনেক আগেই বুঝেছে। বয়স তেরোর শেষ দিকে, কিন্তু চারপাশের পৃথিবীকে দেখার তার চোখ বয়সের চেয়ে অনেক পুরোনো। সে শুধু দেখে না, মিলিয়ে দেখে। পায়ের ছাপের সঙ্গে মানুষের ওজন, ঘোড়ার খুরের দাগের সঙ্গে তার গতি, বাতাসের গন্ধের সঙ্গে আগন্তুকের উপস্থিতি, ভাঙা ডালের সঙ্গে চলার দিক, সবকিছুকে সে একসঙ্গে বিচার করে। লারসেন তাকে এসব শেখাচ্ছে বহুদিন ধরে। এখন সেই শিক্ষাই লারসেনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ শত্রু যদি ছেলেটার সামনে এসে পড়ে, মারদেকা শুধু নিজের চোখে দেখা জিনিসের ওপর নির্ভর করবে না। সে প্রশ্ন করবে, খুঁজবে, অনুসরণ করবে, এবং একসময় এমন জায়গায় পৌঁছে যাবে যেখানে তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

বাড দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।

লারসেন কিছুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে রইল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা দ্বিতীয় চাকতিটির দিকে আবার তাকাল। তার মনে হলো, ছোট্ট ধাতব টুকরোটার ওজন যেন হঠাৎ অনেক বেড়ে গেছে। আর একটা ব্যাপার, প্রথম চাকতিটা যেটা নিজেই সেদিন মারদেকাকে রাখতে দিয়েছিল। তখন সে ভাবেনি, একদিন এই দুই চাকতির অস্তিত্ব একই রহস্যের দুই প্রান্তকে জুড়ে দেবে।

সকালের খাবারের সময় র&#x200d;্যাঞ্চের চেহারা অন্য দিনের মতোই ছিল। বৃদ্ধ ইলাই আগুনের ওপর বড় লোহার পাত্র বসিয়ে মাংস, আলু আর পেঁয়াজ নেড়ে দিচ্ছিল। ধোঁয়ার সঙ্গে মশলার গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল। 

মারদেকা খাবারের সামনে বসে ছিল, কিন্তু তার মন খাবারে ছিল না। তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল পাহাড়ের দিকে। বৃদ্ধ ইলাই দূর থেকেই বিষয়টা লক্ষ্য করেছিল। বহু বছর রান্নাঘরের আগুনের পাশে বসে মানুষের মুখ দেখার অভ্যাস তার। ক্ষুধার্ত মানুষ খাবারের দিকে তাকায়, চিন্তিত মানুষ খাবারের মধ্য দিয়েও অন্য কিছু দেখতে থাকে। মারদেকার চোখে দ্বিতীয়টাই ছিল।

ইলাই কিছু না বলে তার সামনে আরও এক টুকরো গরম রুটি রেখে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর মারদেকা নিচু গলায় বলল, “ইলাই, রাতে লারসেন ফিরেছিল কখন?”

বৃদ্ধ লোকটি পেছন ফিরে তাকাল। “ভোরের আগে।”

মারদেকা মাথা নেড়ে আবার পাহাড়ের দিকে তাকাল। তার মুখে আর কোনো প্রশ্ন এল না। কিন্তু চোখে প্রশ্ন আরও গভীর হলো। সে জানত লারসেন বাইরে গিয়েছিল। কিন্তু সে জানত না, কেন গিয়েছিল। আর এই না-জানাটাই তার ভেতরের অস্বস্তিকে বাড়িয়ে তুলছিল।

কিছুক্ষণ পর বাড এসে তার পাশে বসল। আগুনের শিখা দুজনের মুখে ওঠানামা করছিল। কিছু সময় তারা দুজনেই চুপ করে রইল। রান্নাঘরের পাত্রে ফুটতে থাকা ঝোলের শব্দ আর দূরের ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি ছাড়া কাছাকাছি আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না।

মারদেকা আগুনের দিকে তাকিয়েই নিচু গলায় বলল, “লারসেন আমাকে বলেছিলেন, তিনি বাইরে যাচ্ছেন। কিন্তু কোথায় যাচ্ছেন, সেটা বলেননি।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

মারদেকা এবার তার দিকে তাকাল। “আপনি জানেন তিনি কোথায় গিয়েছিলেন?”

বাড সরাসরি উত্তর দিল না। “যতটুকু জানি, তার সবটা বলার সময় এখনও আসেনি।”

মারদেকার চোখ সরু হয়ে এল। “তাহলে সত্যিই কিছু একটা হয়েছে।”

বাড তার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটার চোখে যে আগ্রহ, সেটা নিছক কৌতূহল নয়। সেখানে সতর্কতা আছে। সে বুঝতে চাইছে, তার চারপাশে কী বদলে গেছে। “সব পুরোনো ব্যাপার জানার সময় এখনো আসেনি, মারদেকা।”

মারদেকা আর প্রশ্ন করল না। সে জানে, বাডকে চাপ দিয়ে উত্তর বের করা যাবে না। কিন্তু কথাগুলো সে মনে রাখল। নিজের মতো করে জোড়া লাগাতে শুরু করল রাতের শব্দ, লারসেনের ফিরে আসার সময়, তার মুখের কঠোরতা, আর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকার ভঙ্গি।

বাডের মনে হলো, ছেলেটাকে কিছু না বলা হয়তো তাকে রক্ষা করছে না। বরং অন্ধকারের দিকে নিজের পথ নিজে খুঁজে নেওয়ার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। 
তবু এখনই সব বলা যাবে না। কারণ এটা হয়তো তাদের সবার নিরাপত্তার ব্যাপার।

দুপুরের দিকে র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম প্রান্তে হ্যাঙ্ক ডসন অদ্ভুত ঘোড়ার দাগ দেখতে পেল। খবর পেয়ে লারসেন সেখানে গেল। শুকনো মাটিতে খুরের চাপ স্পষ্ট ছিল। দুটো ঘোড়া পাশাপাশি এসেছিল। কিছু দূর গিয়ে তাদের পথ আলাদা হয়েছে। একজন পাহাড়ের দিকে গেছে, অন্যজন দক্ষিণের দিকে।

লারসেন হাঁটু গেড়ে মাটির দাগ পরীক্ষা করল। খুরের গভীরতা, পায়ের দূরত্ব, মাটির ভাঙন, সবকিছু সে খুঁটিয়ে দেখল। ঘোড়াগুলো খুব দ্রুত আসেনি। বরং সতর্কভাবে এগিয়েছে। যারা ঘোড়ায় ছিল, তারা পথ চিনত। তারা জানত কোথায় মাটি শক্ত, কোথায় নরম, কোথায় খুরের দাগ সহজে চোখে পড়বে না।

লারসেন একটা ছোট পাথর উল্টে দিল। পাথরের নিচে চাপা পড়ে ছিল আধখাওয়া সিগারেটের টুকরো। সে সেটা তুলে নিল। সস্তা তামাক। কিন্তু তামাকের সঙ্গে মিশে থাকা অন্য একটা গন্ধ তার নাকে এসে লাগল। বহু বছর আগে এমন গন্ধ সে পেয়েছিল। এমন মানুষের কাছ থেকে, যাদের নাম সে আর উচ্চারণ করতে চায়নি।

হ্যাঙ্ক তার দিকে তাকিয়ে ছিল। “কিছু পেয়েছেন?”

লারসেন সিগারেটের টুকরোটা পকেটে রেখে উঠে দাঁড়াল। “ওরা খুব কাছে এসেছিল।”

হ্যাঙ্কের মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে আর প্রশ্ন করল না।

সন্ধ্যা নামার সময় র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর অস্বাভাবিক শান্তি নেমে এল। দিনের আলো পাহাড়ের পেছনে ডুবে গেল। গবাদি পশুগুলোকে ঘেরের মধ্যে ঢোকানো হলো। ঘোড়াগুলোকে শেষবারের মতো পানি দেওয়া হলো। পাহারার লোকেরা নিজেদের অবস্থান নিল। ইলাই রান্নাঘরে রাতের খাবারের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। আগুনের আলো আর ধোঁয়ার গন্ধ চারপাশের অন্ধকারে মিশে গেল।

লারসেন নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। দিনের আলোয় যে পাহাড় দূর থেকে নিস্তব্ধ মনে হয়, রাত নামলে সেটাই যেন অন্য রূপ নেয়। কালো ঢাল, পাথরের ছায়া, ঝোপের ফাঁকে জমে থাকা অন্ধকার। সেই অন্ধকারের কোথাও মানুষ আছে কি না বোঝার উপায় নেই।

কিন্তু লারসেন জানে, কেউ আছে। তার চোখ হঠাৎ র&#x200d;্যাঞ্চের পেছনের দিকে গেল। 
মারদেকা সেখানে দাঁড়িয়ে। হাতে ছুরি। চোখ পাহাড়ের দিকে।

লারসেন কিছুক্ষণ তাকে দেখল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। 

মারদেকা ফিরে তাকাল না। কিছুক্ষণ পর সে বলল, “ওরা এখানে আছে।”

লারসেন থেমে গেল। “কাদের কথা বলছ?”

মারদেকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়েই বলল, “যারা আপনাকে খুঁজছে।”

লারসেনের চোখ সরু হয়ে এল। ছেলেটা অনুমান করছে। কিন্তু সেই অনুমানের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। 

মারদেকা এবার তার দিকে তাকাল। “আপনি আমাকে সত্যিটা বলবেন না, তাই তো?”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। “সব সত্যি একসঙ্গে জানা ভালো নয়।”

মারদেকা মাথা নেড়ে নিল। “আমি জানি।” তারপর আবার পাহাড়ের দিকে তাকাল। তার চোখে হতাশা ছিল না। ছিল অপেক্ষা।

লারসেন সেই চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, ছেলেটাকে আর দূরে রেখে নিরাপদ রাখা যাবে না। বিপদ যখন দরজার বাইরে এসে দাঁড়ায়, তখন শুধু দরজা বন্ধ করে রাখা যায় না। একদিন তাকে জানতেই হয়, দরজার ওপারে কী আছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/266125/</link>
				<pubDate>Thu, 27 Aug 2026 04:55:56 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–উনিশ<br />
রাত তখন আরও গভীর হয়ে উঠেছে। পাহাড়ের গায়ে চাঁদের আলো এখনও পুরোপুরি পড়েনি, অথচ আকাশের কালো বিস্তারে তারাগুলো এমনভাবে জ্বলছিল যেন দূর কোনো অদৃশ্য আগুনের ছাই বাতাসে ছড়িয়ে আছে। শুকনো খাতের পাশে দাঁড়িয়ে লারসেন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। তার ঘোড়াটা পেছনে অস্থিরভাবে পা বদলাচ্ছিল, মাঝে মাঝে নাসা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-266125"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/266125/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>7</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">ce24cd5ee2fd698da1ca1deec1a1e8f4</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–আঠারো
পরদিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল, কিন্তু লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে যারা ছিল তারা জানত, আগের রাতের পর থেকে কিছুই আর পুরোপুরি আগের মতো নেই। সূর্য ওঠার আগেই পূর্ব দিগন্তে ফ্যাকাশে আলো জমেছিল। প্রেইরির ওপর পাতলা কুয়াশার মতো ঠান্ডা বাতাস ভেসে বেড়াচ্ছিল। শুকনো ঘাসের মাথাগুলো শিশিরে ভিজে ছিল, আর দূরের পাহাড়ের গায়ে রাতের শেষ ছায়া তখনও আটকে আছে। আস্তাবলের ভেতর ঘোড়াগুলো ধীরে ধীরে নড়াচড়া শুরু করেছে। কোনোটা খুর দিয়ে মাটিতে ঠুকছে, কোনোটা মাথা ঝাঁকাচ্ছে, আবার কোনোটা নাক দিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে খড়ের গন্ধের সঙ্গে নিজের উষ্ণ নিঃশ্বাস মিশিয়ে দিচ্ছে। 

বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, র&#x200d;্যাঞ্চের জীবন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছে। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার নিচে একটা চাপা সতর্কতা জমে আছে। লোকেরা কথা বলছে নিচু গলায়। কেউ দূরের পাহাড়ের দিকে তাকালে একটু বেশি সময় তাকিয়ে থাকছে। উত্তর আর পশ্চিমের বেড়ার কাছে পাহারা আগের চেয়ে ঘন। আর প্রত্যেকের মনে একই প্রশ্ন, যারা রাতের অন্ধকারে এসেছিল তারা কি সত্যিই চলে গেছে?

লারসেন ভোরের আলো ফুটতেই ঘর থেকে বের হয়েছিল। তার হাতে রাইফেল ছিল না। কোমরে পিস্তল আর ছুরিটা ছিল, এই দুটোই যথেষ্ট। সে উঠোন পেরিয়ে প্রথমে উত্তর দিকের বেড়ার কাছে গেল। রাতের শিশিরে মাটি এখনও নরম। আগের দিনের পদচিহ্নের অনেকটাই বাতাস আর মানুষের চলাফেরায় নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু কিছু জায়গায় চিহ্ন এখনও টিকে আছে। লারসেন নিচু হয়ে একটা দাগ দেখল। আঙুল দিয়ে ছুঁল না। শুধু চোখ দিয়ে মাপল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দূরের প্রেইরির দিকে তাকাল। সেখানে কিছুই নেই। কোনো মানুষ নেই। কোনো ঘোড়া নেই। শুধু বাতাসে ঘাসের ঢেউ।

বাড একটু পরে তার কাছে এসে দাঁড়াল। হাতে কফির ধোঁয়া ওঠা কাপ। কয়েক মুহূর্ত সে কিছু না বলে লারসেনের সঙ্গে একই দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “রাতটা শান্ত ছিল।”

লারসেন উত্তর দিল, “শান্ত রাত মানেই সবসময় নিরাপদ নয়।”

বাড কাপ থেকে এক চুমুক নিয়ে বলল, “আমি জানি।”

তারপর আর কথা হলো না। দুজনের মধ্যে এই নীরবতাটাই বহু বছরের পরিচয়ের ফল। একে অন্যকে সব কথা বলতে হয় না। একজনের চোখের পরিবর্তন অন্যজন বুঝে নেয়। 

লারসেন পশ্চিমের দিকে হাঁটতে শুরু করল। বাডও পেছনে গেল। গতকাল যেখানে কাপড়ের টুকরোটা পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে এসে লারসেন থামল। মাটির ওপর রাতের বাতাস অনেক চিহ্ন মুছে দিয়েছে। তবু কয়েকটি ঘাস এখনও ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। একটা জায়গায় মাটি একটু উঁচু হয়ে আছে। আর সেখানেই গতকাল পাওয়া গিয়েছিল কাপড়ের টুকরোটা।

লারসেন কিছুক্ষণ জায়গাটা পরীক্ষা করল। তার চোখে সেই পুরোনো শিকারির দৃষ্টি ফিরে এসেছে। কোনো কিছুই তার কাছে শুধু একটা দাগ নয়। প্রতিটি দাগের পেছনে একটা মানুষ। আর মানুষের পেছনে থাকে উদ্দেশ্য।

সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ওরা এখানে দাঁড়িয়েছিল।”

বাড চারপাশে তাকাল। “কীভাবে বুঝলেন?”

“ঘাসের মাথা ভাঙার ধরন। একজন দাঁড়িয়েছিল, অন্যজন ঘোড়ার কাছে ছিল।”

বাড নিচু হয়ে দেখল। তারপর বলল, “আপনি মনে করছেন তারা দুজন ছিল?”

লারসেন উত্তর দিল না। সে আরও পশ্চিমে তাকাল। “আমি মনে করছি, যারা এসেছিল তাদের সংখ্যা আমরা এখনও জানি না।”

এই কথাটা বাডকে কিছুক্ষণ চুপ করিয়ে দিল। রাতের হামলার সময় অন্ধকার, গুলির শব্দ আর ঘোড়ার ছুটে চলা সবকিছুকে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছিল যে কয়জন লোক ছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায়নি। কেউ একজন গুলি চালিয়েছিল। কেউ ঘোড়া নিয়ে পালিয়েছিল। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সবাই চোখের সামনে ছিল।

লারসেন মাটির ওপর একটা সরু দাগের দিকে তাকিয়ে বলল, “এখান থেকে পশ্চিমে যাওয়ার একটা পথ আছে।”

বাড বলল, “ঘোড়ার?”

“হ্যাঁ। কিন্তু ওরা সরাসরি যায়নি।”

“কেন?”

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “কারণ তারা চায়নি কেউ তাদের পথ সহজে অনুসরণ করুক।”

বাড ধীরে মাথা নেড়ে বুঝে নিল। দুজন ফিরে আসতে শুরু করল। 

উঠোনের কাছে এসে বাড হঠাৎ বলল, “মারদেকা ভোর হওয়ার আগেই উঠে গেছে।”

লারসেনের মুখে খুব সামান্য পরিবর্তন হলো। “কোথায়?”

“আস্তাবলে। ঘোড়াগুলো দেখছিল।”

লারসেন আর কিছু না বলে সেদিকে হাঁটল।

আস্তাবলের ভেতরে তখন সকালের আলো পুরোপুরি ঢোকেনি। কাঠের ফাঁক দিয়ে সূর্যের সরু রেখা মেঝেতে পড়েছে। খড়ের গন্ধ, ঘোড়ার উষ্ণ শরীরের গন্ধ আর পুরোনো চামড়ার গন্ধে জায়গাটা ভারী হয়ে আছে। মারদেকা একটা বাদামি ঘোড়ার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। তার চোখে ঘুমের কোনো চিহ্ন নেই। আগের রাতের ক্লান্তি শরীরে থাকলেও মন যেন আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে।

লারসেন দরজায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকে দেখল।

মারদেকা ঘুরে তাকিয়ে বলল, “ওটা আজ অন্যরকম আচরণ করছে।”

লারসেন ঘোড়াটার দিকে তাকাল। “কীভাবে?”

“বারবার পশ্চিমের দিকে তাকাচ্ছে।”

লারসেনের চোখ সঙ্গে সঙ্গে বাইরে চলে গেল। “তুমি কি কিছু দেখেছ?”

“না।”

“তাহলে বললে কেন?”

মারদেকা একটু থেমে বলল, “ওর কান বারবার ওই দিকে যাচ্ছে।”

লারসেন ঘোড়াটার কান লক্ষ্য করল। সত্যিই প্রাণীটা মাঝেমধ্যে মাথা ঘুরিয়ে পশ্চিমের দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।

লারসেন তার কাছে গিয়ে ঘোড়াটার ঘাড়ে হাত রাখল। “প্রাণী অনেক সময় মানুষের আগে বিপদ টের পায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রতিবার বিপদ থাকবে।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

তারপর লারসেনের চোখ মারদেকার কোমরের দিকে গেল। সেখানে ছোট একটা চামড়ার খাপ ঝুলছে। “কালকের ছুরিটা কোথায়?”

মারদেকা হাত দিয়ে খাপটা ছুঁয়ে বলল, “এখানে।”

এটা সেই ছুরি নয় যেটা আগের দিন প্রশিক্ষণের সময় লারসেন তাকে দিয়েছিল। গতকাল সন্ধ্যায় সে তাকে ছোট একটা পুরোনো ছুরি দিয়েছিল, যেটা সে নিজের কাছে রাখত। ছুরিটার হাতল কালচে হয়ে গেছে, ফলার ওপর বয়সের দাগ আছে, কিন্তু ভারসাম্য ভালো। লারসেন জানে, প্রতিদিনের অনুশীলনের জন্য মারদেকার নিজের একটা ছুরি দরকার। প্রতিবার নিজের ছুরি না থাকলে হাত কখনও অস্ত্রের ওজনের সঙ্গে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয় না।

কয়েক সপ্তাহ আগে সে মারদেকাকে যে ছুরিটা চিনিয়েছিল, সেটা তার বাবা ব্যবহার করতেন। তাই গত রাতের পর সে সিদ্ধান্ত বদলেছে। বাবার ছুরিটা সে নিরাপদে রেখে দিয়েছে। অনুশীলনের জন্য তাকে এই নতুন ছুরিটাই দিয়েছে। 

মারদেকা খাপের ওপর হাত রেখে বলল, “আমি আজ অনুশীলন করতে পারি?”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “প্রতিদিন করবে।”

মারদেকার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল, “কিন্তু আমার সামনে নয়।”

ছেলেটার মুখে বিস্ময় ফুটল।

“একই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রতিদিন একইভাবে ছুরি ছোড়া শেখা নয়। তোমাকে নিজের ভুল নিজেকেই ধরতে হবে।”

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কতবার?”

“যতক্ষণ হাত ক্লান্ত না হয়। তার আগে থামবে।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

লারসেন তখন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর একটা কথা। ছুরিটা কখনও খেলনা হিসেবে ব্যবহার করবে না। র&#x200d;্যাঞ্চে কেউ না থাকলে তবেই অনুশীলন করবে। লক্ষ্য সামনে থাকবে, পেছনে কী আছে সেটা আগে দেখবে।”

মারদেকা গম্ভীর হয়ে বলল, “বুঝেছি।”

লারসেন চলে গেল। কিন্তু কয়েক পা যাওয়ার পর তার মনে হলো, মারদেকাকে সে আর শুধু অস্ত্র শেখাচ্ছে না। ধীরে ধীরে তাকে এমন একটা জীবনের জন্য তৈরি করছে যেখানে ভুলের মূল্য খুব বেশি।

দুপুরের আগে র&#x200d;্যাঞ্চের কাজ স্বাভাবিক গতিতে চলতে লাগল। গরু উত্তর পাশের চারণভূমিতে সরানো হলো। দুজন লোক ভাঙা বেড়া মেরামত করল। মিগুয়েল আস্তাবলের দরজার কবজা বসিয়ে দিল। ক্লে মরগান পশ্চিমের সীমানা আরেকবার ঘুরে এল। বাড লোকজনকে কাজ ভাগ করে দিল। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু লারসেনের ঘরে সেই স্বাভাবিকতার কোনো জায়গা নেই।

টেবিলের ওপর তিনটি জিনিস পাশাপাশি রাখা ছিল। এলি ব্রুকসের চিঠি, পুরোনো চামড়ার টুকরো, আর কালচে ধাতব চাকতি।

লারসেন প্রথমে চিঠিটা খুলল। তিনটি জায়গার নাম আবার পড়ল। তারপর পুরোনো চামড়ার টুকরোটার ওপর চোখ রাখল। চামড়ায় আঁকা চিহ্নগুলো বহু বছরের পুরোনো। কালচে হয়ে যাওয়া রেখাগুলো এতটাই ক্ষীণ যে অপরিচিত চোখে সেগুলো শুধু এলোমেলো দাগ মনে হতে পারে। কিন্তু লারসেন জানে, এগুলো এলোমেলো নয়।

চাকতিটা হাতে তুলে নিয়ে সে চামড়ার ওপর রাখল। চিহ্নটা পুরোপুরি মেলেনি। কিন্তু একটা অংশ মিলে গেল। লারসেন স্থির হয়ে গেল।

এত বছর পরেও তার মনে আছে সেই চিহ্নের মূল রেখা। তখন সে ছিল অন্য মানুষ। তখন তার পাশে ছিল এমন কয়েকজন মানুষ, যাদের নাম সে বহু বছর ধরে মুখে নেয়নি। সেই সময়ের কথা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতর পুরোনো একটা ভার ফিরে এল। সে চোখ বন্ধ করল। কিছুক্ষণ পর আবার চোখ খুলে চাকতিটা উল্টে দিল।

পেছনের অংশে খুব ক্ষীণ একটা আঁচড়। এত ছোট যে আলো না পড়লে বোঝা যায় না। সে নিজের ছুরির ডগা দিয়ে নয়, আঙুলের নখ দিয়ে রেখাটা অনুসরণ করল। তারপর হঠাৎ তার মনে পড়ল, এলি ব্রুকসের চিঠিতে তিনটি জায়গার পাশে যে চিহ্নগুলো ছিল, তার একটির বাঁকও প্রায় একই রকম।

এবার বিষয়টা আর কাকতালীয় মনে হলো না। তিনটি জায়গা। পুরোনো চিহ্ন। চাকতি। আর তার র&#x200d;্যাঞ্চ। কিন্তু একটা প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত। যদি এই চিহ্ন এত পুরোনো হয়, তবে রাতের লোকগুলোর হাতে এর প্রতিলিপি এল কীভাবে?

লারসেন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। উঠোনে মারদেকা নেই। বাডও নেই। পশ্চিমের দিকে কয়েকজন লোক কাজ করছে। তার মনে হলো, এখনই মারদেকাকে সব বলা যাবে না।

ছেলেটার হাতে চাকতি আছে। কিন্তু চাকতিটা তাকে উত্তর দেবে না। বরং প্রশ্ন করবে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মারদেকা হয়তো এমন জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে যেখানে তার বয়স তাকে রক্ষা করবে না।

দরজায় আবার শব্দ হলো। বাড ঢুকল। তার হাতে আগের দিনের কাপড়ে মোড়া সেই টুকরোটা। সে দরজা বন্ধ করে টেবিলের কাছে এসে কাপড়টা খুলল। কাপড়টা মেলে ধরতেই সকালের আলোয় তার বুনন স্পষ্ট হয়ে উঠল।

লারসেন কাপড়টার দিকে তাকিয়ে রইল।

বাড বলল, “আমি আজ ভালো করে দেখেছি।”

লারসেন কাপড়টা হাতে নিল। ছেঁড়া প্রান্তটা চোখের কাছে তুলে ধরল। কাপড়ের সুতো সাধারণ র&#x200d;্যাঞ্চের পোশাকের মতো নয়। বুননটা মোটা, কিন্তু শক্ত। কয়েক জায়গায় সুতো ঘষে মসৃণ হয়ে গেছে। ছেঁড়া প্রান্তের কাছে কালচে নীল রঙের ক্ষীণ দাগ এখনও টিকে আছে।

লারসেনের চোখ স্থির হয়ে গেল।

বাড ধীরে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি এই কাপড় আগে দেখেছেন?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে কাপড়ের বুনন আঙুলের মধ্যে নিয়ে অনুভব করল। তারপর ধীরে বলল, “হ্যাঁ।”

বাড অপেক্ষা করল। 

লারসেনের চোখ তখন আর কাপড়ের ওপর নেই। বহু বছর আগের একটা দৃশ্য তার মনে ফিরে এসেছে। ধুলোমাখা একটা পথ। কয়েকজন ঘোড়সওয়ার। তাদের পোশাকের ওপর একই ধরনের মোটা কাপড়। আর সেই কাপড়ের গাঢ় নীল রং।

সে আবার কাপড়ের ছেঁড়া প্রান্তটা দেখল। তারপর পুরোনো চামড়ার টুকরোর দিকে তাকাল। এরপর কালচে চাকতিটা হাতে নিল।

বাড বুঝতে পারছিল, লারসেন এমন কিছু মনে করার চেষ্টা করছে যা বহু বছর ধরে সে ইচ্ছা করেই ভুলে থাকতে চেয়েছে।

কিছুক্ষণ পর বাড ধীরে বলল, “আপনি ওদের চিনেছেন?”

লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। “মানুষকে নয়। একটা সময়কে।”

বাড আর কিছু বলল না।

লারসেন কাপড়টা ভাঁজ করে টেবিলে রাখল। তার চোখে এবার এমন একটা কঠিনতা দেখা গেল, যা বাড বহু বছর আগে দেখেছিল, কিন্তু তারপর থেকে খুব কমই দেখেছে।
তারপর ধীরে বলল, “ওটা কোনো এক ব্যক্তির চিহ্ন নয়।”

বাড অপেক্ষা করল।

“ওটা একটা দলের চিহ্ন ছিল।”

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

বাড নিচু গলায় বলল, “কোন দলের?”

লারসেন উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি আবার চাকতিটার দিকে গেল।

বহু বছর আগে যে নামটা সে নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলেছিল, সেই নামটা আজ আবার ফিরে আসছে। সে জানে, নাম উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো দরজাগুলো খুলে যাবে। আর সেই দরজার ওপারে আছে এমন কিছু মানুষ, যাদের সে ভেবেছিল আর কোনোদিন দেখতে হবে না।

কিন্তু রাতের গুলির শব্দ, এলি ব্রুকসের চিঠি, তিনটি জায়গার চিহ্ন, কালচে চাকতি আর পশ্চিমের বেড়ার কাছে পাওয়া কাপড়ের টুকরো তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, অতীত কখনও সত্যি মরে না। কখনও কখনও সে শুধু অপেক্ষা করে।

লারসেন ধীরে বলল, “ওরা শুধু র&#x200d;্যাঞ্চে ঢোকেনি।”

বাড তার দিকে তাকাল।

“ওরা কিছু খুঁজছিল।”

“কী?”

লারসেনের চোখ এবার মারদেকার দিকে গেল না। সে জানালার বাইরে তাকিয়েই বলল, “সেটাই জানতে হবে।”

ঠিক সেই সময় দরজার বাইরে মারদেকার পায়ের শব্দ শোনা গেল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে কাপড়টা ভাঁজ করে চিঠির নিচে সরিয়ে রাখল। কালচে চাকতিটা আগের জায়গায় রেখে দিল। তার মুখ আবার শান্ত হয়ে গেল।

দরজা খুলে মারদেকা ভেতরে ঢুকল। তার কপালে ঘাম। হাতে ছুরির খাপ। চোখে অনুশীলনের পরের সেই তীব্র মনোযোগ।

লারসেন তার দিকে তাকাল।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে পকেট থেকে কালচে চাকতিটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর বলল, “আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি।”

লারসেনের চোখ চাকতি থেকে উঠে ছেলেটার মুখে স্থির হলো। “কী?”

মারদেকা চাকতিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই চিহ্নটা আমি আগে কোথাও দেখেছি।”

ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।

বাড লারসেনের দিকে তাকাল।

লারসেনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য পুরোনো অন্ধকার ফিরে এল। সে বুঝল, সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

বাড কিছু বলল না। শুধু লারসেনের দিকে তাকিয়ে রইল। বহু বছরের পরিচয়ে সে জানে, লারসেন যখন কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে এভাবে চুপ করে যায়, তখন তার মাথার ভেতর শুধু বর্তমান নয়, বহু দূরের কোনো অতীতও জেগে ওঠে।

লারসেন ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। চাকতিটা হাতে তুলে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত আলোয় ঘুরিয়ে দেখল। ধাতুর গায়ে বয়সের কালচে ছাপ, কিনারায় ক্ষয়, আর মাঝখানে খোদাই করা সেই অদ্ভুত চিহ্ন। এতদিন ধরে জিনিসটা তার কাছে ছিল একটা অজানা স্মারক, কিন্তু এখন সেটাই যেন অতীতের বন্ধ দরজার চাবি হয়ে উঠেছে। সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে বলল, “কোথায় দেখেছ?”

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে জানালার দিকে তাকাল। বাইরে র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে দুজন লোক একটা ঘোড়াকে নিয়ে ব্যস্ত। দূরে গরুগুলো ধীর গতিতে ঘাস খাচ্ছে। বাতাসে শুকনো মাটির গন্ধ। সবকিছু এত স্বাভাবিক যে কয়েক ঘণ্টা আগের উত্তেজনাকে যেন মিথ্যে বলে মনে হয়। কিন্তু তার চোখে সেই স্বাভাবিকতার কোনো ছাপ নেই। সে ধীরে বলল, “ঠিক কোথায় দেখেছি মনে করতে পারছি না। কিন্তু চিহ্নটা নতুন নয়। মনে হচ্ছে, অনেক আগে দেখেছি।”

লারসেনের দৃষ্টি তার মুখ থেকে সরল না। “কোনো জায়গায়?”

মারদেকা মাথা নেড়ে বলল, “হয়তো।”

বাড এবার বুঝল, ছেলেটা অনুমান করছে না। সে সত্যিই কিছু মনে করার চেষ্টা করছে। তার বয়স কম, কিন্তু গত কয়েক মাসে সে এমন কিছু দেখেছে ও শিখেছে, যা অনেক বড় মানুষের জীবনেও আসে না। তার স্মৃতির ভেতর হয়তো এমন কোনো ছবি লুকিয়ে আছে, যার অর্থ সে নিজেই জানে না।

লারসেন চাকতিটা আবার টেবিলে রাখল। “তুমি যখন প্রথম এটা পেয়েছিলে, তখন কি এর চিহ্নটা লক্ষ্য করেছিলে?”

“না। তখন শুধু চাকতিটাই দেখেছিলাম।”

“এখন কেন মনে হলো?”

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আজ ছুরি ছোড়ার সময়।”

লারসেনের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। 

মারদেকা এবার হাত দিয়ে নিজের কোমরের কাছে দেখাল। “একবার লক্ষ্য থেকে ফিরে আসার সময় চাকতিটা আমার কোমরের কাছে ধাক্কা খায়। হাত দিয়ে সেটা ঠিক করতে গিয়ে চিহ্নটার ওপর আঙুল পড়ে। তখন মনে হলো, এই রেখাটা আমি আগে দেখেছি।”

লারসেনের চোখে চিন্তার ছায়া আরও গাঢ় হলো। মানুষের স্মৃতি অদ্ভুত জিনিস। চোখ কোনো দৃশ্য ভুলে যেতে পারে, কিন্তু শরীর অনেক সময় কোনো স্পর্শ, কোনো গন্ধ, কোনো শব্দ কিংবা কোনো রেখা মনে রেখে দেয়। বহু বছর পরে হঠাৎ কোনো ছোট্ট ঘটনা সেই স্মৃতির দরজা খুলে দিতে পারে। লারসেন নিজেও জানে, তার নিজের অতীতের কতকিছু সে চোখের সামনে দেখেও ভুলে থাকতে চেয়েছে, অথচ কিছু স্পর্শ আর কিছু শব্দ আজও তার ভেতরে জীবন্ত।

সে ধীরে বলল, “কোথায় দেখেছ সেটা মনে করার চেষ্টা করো না। জোর করে মনে করতে গেলে ভুল মনে পড়বে।”

মারদেকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

লারসেন বলল, “যেদিন সত্যি মনে পড়বে, তখন নিজে থেকেই মনে পড়বে।”

মারদেকা মাথা নেড়ে চাকতিটা তুলে নিল। কিন্তু ঘর থেকে বের হওয়ার আগে একবার বাডের দিকে তাকাল। বাড তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা কিছু বুঝতে পারল না, তবু তার মনে হলো, ঘরের মধ্যে এমন কিছু আছে যা তার কাছ থেকে লুকানো হচ্ছে।

দরজা বন্ধ হওয়ার পর বাড ধীরে বলল, “ছেলেটা কিছু টের পাচ্ছে।”

লারসেন জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে মারদেকাকে দেখা যাচ্ছে। সে উঠোন পেরিয়ে পশ্চিমের দিকে যাচ্ছে। তার হাঁটার মধ্যে আগের সেই ছেলেমানুষি তাড়াহুড়ো নেই। গত কয়েক মাসে ছেলেটা বদলেছে। শরীর এখনও কিশোরের মতো সরু, কিন্তু হাঁটার ভঙ্গিতে একটা সতর্কতা এসেছে। চোখ সবসময় চারপাশ মাপছে। কোনো শব্দ শুনলে মাথা ঘুরছে। কোনো মানুষকে দেখলে তার হাত অজান্তেই কোমরের কাছে চলে যাচ্ছে।

লারসেন ধীরে বলল, “পাচ্ছে।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আপনি কতদিন ওকে অন্ধকারে রাখবেন?”

লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়েই বলল, “যতদিন প্রয়োজন।”

বাড দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আপনি জানেন, ও থামবে না।”

“আমি জানি। চাকতিটা নিয়ে ও নিজেই খুঁজবে।”

“তাহলে আগে থেকে সব বলা ভালো নয়?”

লারসেন এবার ঘুরে তাকাল। তার মুখ শান্ত, কিন্তু চোখের গভীরে কঠিন সিদ্ধান্ত। “সব সত্যি সবসময় একসঙ্গে বলা যায় না, বাড।”

বাড আর কিছু বলল না। সে জানে, লারসেনের এই স্বর মানে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। যে বিষয় নিয়ে সে কথা বলছে, সেখানে আর তর্ক করে লাভ নেই।

লারসেন টেবিলের ওপর রাখা কাপড়ের টুকরোটার দিকে তাকাল। আবার সেটা হাতে তুলে নিল। মোটা বুনন, গাঢ় নীল রঙের ক্ষীণ দাগ, ছেঁড়া প্রান্ত। সাধারণ চোখে এর মধ্যে বিশেষ কিছু নেই। কিন্তু লারসেনের কাছে এটা এখন একটা পুরোনো ছায়ার অংশ। সে এমন কাপড় বহু বছর আগে দেখেছে। সেই সময়ের কথা মনে পড়লেই তার চোখের সামনে কয়েকটা মুখ ভেসে ওঠে। কিছু মুখ মৃত। কিছু মুখ অদৃশ্য। আর অন্তত একজনের মুখ এমন, যাকে সে ইচ্ছা করেই ভুলে থাকতে চেয়েছিল।

তারপর তার দৃষ্টি চলে গেল এলি ব্রুকসের চিঠির দিকে। চিঠিতে উল্লেখ করা তিনটি জায়গা তার মাথায় আবার ফিরে এল। প্রথম জায়গাটা ছিল উত্তর-পশ্চিমের পুরোনো শুকনো খাতের কাছে। দ্বিতীয়টা পাহাড়ের নিচের পরিত্যক্ত গবাদি পশুর পথ। তৃতীয় জায়গাটা ছিল তার নিজের র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ব্রুকসের ভাষা ছিল সতর্ক, কিন্তু লারসেন সেই সতর্কতার আড়ালে আরও কিছু বুঝেছিল। মার্শাল এলি ব্রুকস শুধু জায়গাগুলোর নাম জানায়নি। সে চেয়েছিল লারসেন নিজে সেই জায়গাগুলোর অর্থ বুঝুক।

আর এখন চাকতিটা সেই তিন জায়গাকে অন্য এক রেখায় জুড়ে দিচ্ছে।

লারসেন টেবিলের নিচের পুরোনো কাঠের বাক্স খুলে একটা মানচিত্র বের করল। মানচিত্রটা নতুন নয়। বহু বছর ধরে ভাঁজ হয়ে থাকা কাগজের কিনারা শক্ত হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কালি ফ্যাকাশে। পুরোনো পথের অনেক চিহ্ন এখন আর বাস্তবে নেই, কিন্তু লারসেনের স্মৃতিতে সেগুলো এখনও স্পষ্ট। সে মানচিত্রটা টেবিলের ওপর মেলে ধরল।

এক এক করে তিনটি জায়গা চিহ্নিত করল। তারপর চাকতিটা মানচিত্রের মাঝখানে রাখল। কিছুক্ষণ কোনো নড়াচড়া হলো না।

লারসেনের আঙুল ধীরে ধীরে প্রথম জায়গা থেকে দ্বিতীয় জায়গার দিকে গেল। তারপর তৃতীয় জায়গা। তিনটি বিন্দুকে চোখে মিলিয়ে সে একটা কাল্পনিক রেখা টানল। রেখাটা গিয়ে শেষ হলো সেই অঞ্চলে, যেখানে বহু বছর আগে একটা পুরোনো পথ ছিল। তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। পথটা সে চেনে।

শুধু পথ নয়, সেই পথের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি শুকনো পাথর, প্রতিটি পুরোনো গাছের ছায়া তার মনে আছে। বহু বছর আগে সেই পথ দিয়ে সে গিয়েছিল। তখন তার পাশে ছিল কয়েকজন মানুষ, যাদের নাম সে আজও উচ্চারণ করতে চায় না। সেই সময়ের একটা ভুল তাকে বহু বছর ধরে তাড়া করেছে। পরে সে ভেবেছিল, সেই অধ্যায় শেষ হয়েছে।

কিন্তু অতীত কখনও মানুষের ইচ্ছেমতো শেষ হয় না। 

বাড মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “ওটা কি সেই পথ?”

লারসেন মাথা তুলল না। “হ্যাঁ।”

“আপনি এতদিন বলেছিলেন পথটা বন্ধ হয়ে গেছে।”

“বন্ধ হয়েছিল।”

“কত বছর আগে?”

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “যখন আমরা ভেবেছিলাম সব শেষ।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “সব শেষ হয়নি।”

লারসেনের চোখ আবার মানচিত্রে নেমে গেল। “না।”

দুজনের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল। বাইরে বাতাস উঠেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে শুকনো ঘাসের গন্ধ ঘরে ঢুকছে। দূরে কোনো ঘোড়া একবার নাক ঝেড়ে উঠল। র&#x200d;্যাঞ্চের স্বাভাবিক শব্দগুলো চলতেই থাকল, অথচ এই ছোট ঘরের ভেতর যেন বহু বছরের পুরোনো একটা হিসাব আবার খুলে বসেছে।

অবশেষে লারসেন সিদ্ধান্ত নিল। সে মানচিত্র ভাঁজ করে রেখে দিল। চাকতিটা পকেটে ঢোকাল। কাপড়টা চিঠির সঙ্গে রেখে দিল। তারপর বলল, “আজ রাতেই আমি বের হব।”

বাড বিস্মিত হলো না। শুধু জিজ্ঞেস করল, “একা?”

“হ্যাঁ।”

বাডের মুখে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। “মারদেকাকে?”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “ওকে সঙ্গে নেব না।”

বাড মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সে জানে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু নিরাপত্তা নেই। লারসেন মারদেকাকে এমন কিছু থেকে দূরে রাখতে চাইছে, যার ভয় সে নিজের মধ্যে বহু বছর ধরে বহন করছে।

বাড ধীরে বলল, “আপনি ফিরতে দেরি করলে?”

“র&#x200d;্যাঞ্চ তুমি সামলাবে।”

বাড মাথা নেড়ে বলল, “আর যদি না ফেরেন?”

লারসেনের চোখে কঠিন একটা হাসি ফুটল। “তাহলে তুমি জানবে কী করতে হবে।”

বাড আর কিছু বলল না।

সন্ধ্যার আগেই র&#x200d;্যাঞ্চে প্রস্তুতি শুরু হলো। কাউকে কিছু জানানো হলো না। লারসেন শুধু বলল, সে পশ্চিম দিকে যাবে এবং সম্ভবত রাতের আগে ফিরবে না। বাড লোকজনকে নিজের মতো করে বুঝিয়ে দিল। কেউ প্রশ্ন করল না। র&#x200d;্যাঞ্চে যারা দীর্ঘদিন কাজ করেছে তারা জানে, লারসেন যখন কোনো কথা না বাড়িয়ে কাজের নির্দেশ দেয়, তখন সেই নির্দেশের পেছনে এমন কারণ থাকে যা জানার দরকার নেই।

মারদেকা তখন উঠোনের এক পাশে বসে নিজের ছুরিটা পরিষ্কার করছিল। ছুরিটা তার কাছে নতুন, কিন্তু তার হাতের সঙ্গে ইতিমধ্যে একটা পরিচিত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলার ওপর কাপড় চালানোর সময় সে বারবার আলোয় সেটা পরীক্ষা করছিল। ছুরিটা কীভাবে ধরতে হয়, কতটা চাপ দিতে হয়, কোথায় ভারসাম্য, এসব এখন তার হাত বুঝতে শুরু করেছে। কিন্তু ছুরির ফলার দিকে তাকানোর চেয়ে তার চোখ বেশি ছিল দূরের দিকে।

লারসেন কিছুক্ষণ তাকে দেখল। তারপর কাছে গিয়ে বলল, “আজ কতক্ষণ অনুশীলন করেছ?”

মারদেকা মাথা না তুলে বলল, “বেশিক্ষণ নয়।”

“কেন?”

“হাত শক্ত হয়ে যাচ্ছিল।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক করেছ।”

মারদেকা এবার মাথা তুলল। সে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কোথাও যাচ্ছেন?”

প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিকভাবে করা হলেও লারসেন বুঝল, ছেলেটা তাকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিল।

“হ্যাঁ।”

মারদেকা আর প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার চোখ লারসেনের কোমরের পিস্তলের দিকে গেল। তারপর ঘোড়ার দিকে। ঘোড়ার জিন বাঁধা হয়েছে। লাগাম পরীক্ষা করা হয়েছে। পানির চামড়ার থলি প্রস্তুত। এসব কোনো সাধারণ সন্ধ্যার কাজ নয়।

লারসেন সেটা লক্ষ্য করল। “তুমি আজ রাতে ঘরের বাইরে থাকবে না।”

ছেলেটা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু থেমে গেল। 

লারসেন তার কাঁধে হাত রাখল। তার হাতের চাপ ছিল দৃঢ়, কিন্তু স্নেহহীন নয়। “সবকিছুর উত্তর এখনই জানতে হয় না।”

মারদেকা নিচু গলায় বলল, “কিন্তু আপনি যখন কিছু লুকান, তখন বুঝতে পারি।”

লারসেনের হাত কাঁধে স্থির হয়ে গেল। এই ছেলেটা আগের মারদেকা নয়। তার মধ্যে এখনও শিশুসুলভ সরলতা আছে, কিন্তু সেই সরলতার নিচে তৈরি হয়েছে এক ধরনের তীক্ষ্ণ বোধ।

লারসেন ধীরে বলল, “তাহলে আজ শুধু এটুকু মনে রাখো। যে মানুষ সত্যি খুঁজতে চায়, তাকে আগে অপেক্ষা করতে শিখতে হয়।”

মারদেকা তার দিকে তাকিয়ে রইল। লারসেন চলে গেল।

রাত নামার কিছু আগে সে ঘোড়ায় চড়ল। বাড দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে তখন সূর্যের শেষ আলো। পশ্চিমের পাহাড়গুলো লালচে হয়ে উঠেছে। বাতাসে রাতের ঠান্ডা নামতে শুরু করেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের লোকেরা দূরে নিজেদের কাজে ব্যস্ত, কেউ জানে না তাদের মালিক কোথায় যাচ্ছে। কিংবা জানলেও প্রশ্ন করার সাহস নেই।

বাড ধীরে বলল, “সাবধানে যাবেন।”

লারসেন শুধু মাথা নেড়ে পশ্চিমের দিকে রওনা হলো।

র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে কিছু দূর যেতেই সে ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিল। প্রেইরির ওপর সন্ধ্যার ছায়া নেমে এসেছে। শুকনো ঘাস ঘোড়ার পায়ের সঙ্গে ঘষা খেয়ে মৃদু শব্দ করছে। দূরে পাহাড়গুলো ক্রমে কালো হয়ে উঠছে। আকাশে প্রথম কয়েকটা তারা দেখা দিয়েছে।

রাত যত ঘন হলো, তত পুরোনো স্মৃতিগুলো স্পষ্ট হতে লাগল। বহু বছর আগে এই পথ দিয়েই সে গিয়েছিল। তখন তার সঙ্গে ছিল আরও কয়েকজন। তাদের মধ্যে একজনের কোমরেও এমন একটা চাকতি ছিল। তখন চাকতিটা ছিল পরিচয়ের চিহ্ন। পরে সেটা হয়ে উঠেছিল বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ। 

লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে তখনও জানে না, চাকতিটা কীভাবে আবার তার হাতে এসেছে। কে এটা এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিল, কে সেটা এখন তার র&#x200d;্যাঞ্চের কাছে এনে ফেলেছে, আর সবচেয়ে বড় কথা, কেন?

কিন্তু একটা ব্যাপার সে এখন নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারছে। যে দলটাকে সে মৃত বলে ধরে নিয়েছিল, তাদের কেউ একজন এখনও বেঁচে আছে। আর সেই মানুষটি জানে লারসেন কোথায় আছে।

পাহাড়ের কাছে পৌঁছে লারসেন ঘোড়া থামাল। সামনে শুকনো খাত। চাঁদের আলো তখনও পুরোপুরি ওঠেনি। চারপাশে এমন অন্ধকার যে দূরের পাথর আর ছায়ার পার্থক্য বোঝা কঠিন। বাতাস খাতের ভেতর দিয়ে বয়ে গিয়ে শুকনো ঘাসে সরসর শব্দ তুলছে।

লারসেন ঘোড়া থেকে নামল। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে শুকনো মাটির ওপর হাত রাখল। তার আঙুল ধীরে ধীরে মাটির খসখসে স্তর পরীক্ষা করতে লাগল। শিকারির মতো তার চোখও চারপাশে ঘুরছিল। কোনো শব্দ নেই। কোনো তাজা ঘোড়ার গন্ধ নেই। তবু জায়গাটার মধ্যে একটা অস্বাভাবিকতা আছে।

কিছুক্ষণ পর তার আঙুলে একটা দাগ অনুভূত হলো। ঘোড়ার খুরের দাগ নয়। মানুষের জুতোর চাপ। খুব নতুন নয়। কিন্তু একেবারে পুরোনোও নয়। লারসেন উঠে দাঁড়াল। তার চোখ এবার মাটির ওপর থেকে আশপাশের ঢালে উঠল। কেউ এখানে এসেছে। একবার নয়, সম্ভবত একাধিকবার।

সে আরও কিছু দূরে এগিয়ে গেল। একটা পাথরের পাশে থামল। পাথরের নিচে মাটির একটা অংশ যেন সম্প্রতি সরানো হয়েছে। সে হাত দিয়ে মাটি সরাল। কিছু বের হলো না। শুধু একটা সরু কালচে সুতো। লারসেন সুতোটা তুলে আলোয় ধরল। একই গাঢ় নীল। কাপড়ের টুকরোর মতোই। তার চোখে তখন আর কোনো সন্দেহ নেই।

কেউ এখানে এসেছিল। এবং সে শুধু পথ দিয়ে যায়নি। সে অপেক্ষা করেছিল। হয়তো লারসেনের জন্য। হয়তো অন্য কারও জন্য।

লারসেন আবার ঘোড়ার দিকে ফিরল। কিন্তু ওঠার আগে তার চোখ পাহাড়ের ঢালের দিকে গেল। সেখানে অন্ধকারের মধ্যে এক মুহূর্তের জন্য ক্ষীণ একটা আলো দেখা গেল। তারপর নিভে গেল।

লারসেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দূরে কোনো গুলির শব্দ হলো না। কোনো ঘোড়ার শব্দও নয়। শুধু বাতাস। কিন্তু সে জানে, ওই আলো কাকতালীয় নয়।

লারসেন ধীরে ধীরে ঘোড়ায় উঠল। এবার তার মুখে এমন একটা অভিব্যক্তি ফুটে উঠল, যা বহু বছর ধরে তার মুখে দেখা যায়নি। শিকারির মুখ। সে বুঝে গেল, তাকে কেউ অনুসরণ করছে না। বরং তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর সেই পথের শেষ কোথায়, সেটা এখনও সে জানে না।

এদিকে র&#x200d;্যাঞ্চে মারদেকা নিজের ঘরে বসে ছিল। বাইরে রাত নেমেছে। বাড তাকে খেতে ডাকলেও সে বেশি কিছু খায়নি। খাবারের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার মতো অবস্থা তার ছিল না। তার মন বারবার সেই কালচে চাকতির দিকে ফিরে যাচ্ছে।

চাকতিটা সে বিছানার পাশে রেখেছে। ঘরের ছোট প্রদীপের আলোয় চিহ্নটা আবার দেখা যাচ্ছে। আলো বদলালে রেখাগুলোর আকৃতিও যেন বদলে যায়। কখনও মনে হয়, এটা কোনো অচেনা প্রতীক। আবার কখনও মনে হয়, সে সত্যিই এই চিহ্ন বহু আগে কোথাও দেখেছে।

মারদেকা আঙুল দিয়ে রেখাটার ওপর ছুঁয়ে গেল। হঠাৎ তার মনে একটা ছবি ভেসে উঠল। অনেক পুরোনো একটা জায়গা। কাঠের দেয়াল। দরজার পাশে ঝোলানো একটা কাপড়। আর সেই কাপড়ে আঁকা ছিল একই চিহ্ন।

ছবিটা এত দ্রুত চলে গেল যে সে নিশ্চিত হতে পারল না। যেন অন্ধকারের মধ্যে কেউ একটা দরজা খুলে আবার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিয়েছে। 

সে চোখ বন্ধ করল। আবার মনে করার চেষ্টা করল। এবার একটা শব্দ যেন কানে এল। কারও কণ্ঠ। পুরুষের কণ্ঠ। কিন্তু কথাটা স্পষ্ট নয়।

মারদেকা চোখ খুলে ফেলল। তার বুক দ্রুত উঠানামা করছে। সে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল, যেন নিজের ঘরের ভেতরেও কোনো অদৃশ্য উপস্থিতি খুঁজছে। তারপর জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে অন্ধকার।

র&#x200d;্যাঞ্চের দূরের অংশে একটা ঘোড়া হ্রেষাধ্বনি করল। বাতাসে খড়ের গন্ধ। কোথাও একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। তারপর আবার নীরবতা।

মারদেকা জানে, লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে নেই। কিন্তু সে জানে না, লারসেন কোথায় গেছে।

কিছুক্ষণ পর সে আবার ঘরে ফিরে এল। চাকতিটা হাতে নিল। ধাতুর ঠান্ডা স্পর্শ তার আঙুলে লাগতেই সেই অস্পষ্ট স্মৃতিটা আবার মাথার ভেতর জেগে উঠল। সে নিজের মনে বলল, “আমি এটা কোথায় দেখেছি?” কোনো উত্তর এল না।

শুধু স্মৃতির গভীর থেকে সেই অস্পষ্ট ছবিটা আবার একবার ভেসে উঠল।

মারদেকা জানত না, সেই স্মৃতি তার নিজের অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, নাকি লারসেনের অতীতের সঙ্গে। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল, বিষয়টা কেবল চাকতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কোনো একটা জায়গা, কোনো একটা মানুষ, কিংবা কোনো একটা ঘটনা তার স্মৃতির গভীরে চাপা পড়ে আছে।

সেই রাতেই সে একটা সিদ্ধান্ত নিল। লারসেন যতই তাকে অপেক্ষা করতে বলুক, সে আর শুধু অপেক্ষা করবে না। সে খুঁজবে। তবে অস্ত্র হাতে নয়। প্রথমে স্মৃতির মধ্যে।

পরদিন ভোরে লারসেন ফিরে আসার আগেই সে বাডের কাছে যাবে। কারণ মারদেকা এখন বুঝতে শুরু করেছে, র&#x200d;্যাঞ্চে যে রহস্য ঢুকেছে, সেটা এক অদৃশ্য সুতোর মত তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এমন একটা অতীতের দিকে, যার সঙ্গে তার নিজের জীবনেরও হয়তো কোনো সম্পর্ক আছে। 

আর পশ্চিমের অন্ধকার পাহাড়ের নিচে, সেই একই সময়ে, লারসেন একা দাঁড়িয়ে ছিল। 
তার সামনে ছিল পুরোনো পথ। পেছনে র&#x200d;্যাঞ্চ। আর তার মুঠোর ভেতর শক্ত হয়ে ধরা ছিল কালচে ধাতব চাকতি।

সে নিচু গলায় বলল, “এবার দেখি, কে আগে পৌঁছায়।” তারপর ঘোড়ার লাগাম টেনে সে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/265659/</link>
				<pubDate>Tue, 25 Aug 2026 12:15:40 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–আঠারো<br />
পরদিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল, কিন্তু লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে যারা ছিল তারা জানত, আগের রাতের পর থেকে কিছুই আর পুরোপুরি আগের মতো নেই। সূর্য ওঠার আগেই পূর্ব দিগন্তে ফ্যাকাশে আলো জমেছিল। প্রেইরির ওপর পাতলা কুয়াশার মতো ঠান্ডা বাতাস ভেসে বেড়াচ্ছিল। শুকনো ঘাসের মাথাগুলো শিশিরে ভিজে ছিল,&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-265659"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/265659/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">f2055c85bd8fea329bc44843a23a5958</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–সতের
আকাশে কোনো মেঘ নেই। ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে প্রেইরির ওপর। রাতের শেষ অন্ধকার অনেক আগেই সরে গেছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ঠান্ডা এখনও বাতাসের মধ্যে মিশে আছে। পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠে এসেছে, আর তার ফ্যাকাশে সোনালি আলো ধীরে ধীরে শুকনো ঘাসের মাথা, কাঠের বেড়া, র&#x200d;্যাঞ্চের পুরোনো বাড়ি আর শেডের দেয়ালের ওপর গড়িয়ে পড়ছে। রাতের শিশির এখনও কোথাও কোথাও ঘাসের ডগায় আটকে আছে। সূর্যের আলো পড়লে সেগুলো ক্ষুদ্র কাচের টুকরোর মতো ঝিলিক দিয়ে উঠছে। দূরের পাহাড়গুলোর গায়ে আলো আর ছায়ার খেলা চলছে। কোথাও সোনালি আলো, কোথাও ধূসর ছায়া, আবার কোথাও পাহাড়ের ঢাল এখনও সকালের নীলচে অন্ধকারে ঢাকা।

ঘোড়াগুলোও ধীরে ধীরে রাতের আতঙ্ক কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। আস্তাবলের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে খুরের শব্দ ভেসে আসছে। কোনো ঘোড়া নাক ঝেড়ে মাথা ঝাঁকাচ্ছে, কোনোটা কাঠের দরজায় মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভোরের বাতাসে ঘোড়ার শরীরের উষ্ণ গন্ধ, শুকনো খড় আর ভেজা মাটির গন্ধ মিশে আছে। অথচ কয়েক ঘণ্টা আগেও এই একই জায়গায় গুলির শব্দে রাত কেঁপে উঠেছিল।

সকালের আলোয় শেডের দেয়ালের ক্ষতটা এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। লারসেনকে লক্ষ্য করে ছোড়া সেই একটি গুলি শেডের কাঠে গিয়ে আঘাত করেছিল। যেখানে গুলিটি কাঠে ঢুকেছিল, সেখানে ছোট একটি গর্তের চারপাশে কাঠের তন্তু ছিঁড়ে বাইরে বেরিয়ে আছে। আঘাতের ধাক্কায় গর্তটির চারপাশের কাঠ সামান্য ফেটে গেছে। তার কাছাকাছি রাতের গোলাগুলির সময় তৈরি হওয়া আঘাতের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে। কোথাও কাঠের সরু ফালি ভেঙে ঝুলে আছে, কোথাও আঘাতের জায়গায় কালচে বারুদের দাগ লেগে আছে। দেয়ালের নিচে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাঠের ছোট টুকরো, শুকনো ঘাস আর রাতের তাড়াহুড়োয় এদিক-ওদিক সরে যাওয়া কিছু জিনিস। অন্ধকারে যেসব চিহ্ন চোখে পড়েনি, সূর্যের আলো সেগুলোকে এখন একে একে প্রকাশ করছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও মৃত্যু কতটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল, সেই কথাই যেন নীরবে বলে যাচ্ছে শেডের কাঠের সেই ক্ষত।

র&#x200d;্যাঞ্চের লোকেরা নিজেদের কাজে ফিরে গেছে। রাতের আতঙ্কের পরেও কাজ থেমে থাকে না। কেউ উত্তর দিকের বেড়া পরীক্ষা করছে, কেউ ঘোড়াগুলোর দেখাশোনা করছে, কেউ শেডের ক্ষতিগ্রস্ত কাঠ পরীক্ষা করছে। মিগুয়েল আস্তাবলের ভাঙা দরজার কবজা খুলে বসেছে। রুবেন কোল শেডের দেয়ালের ক্ষত পরীক্ষা করে কাঠের অবস্থা দেখছে। ক্লে মরগান পশ্চিম দিকের সীমানা ঘুরে এসেছে। প্রত্যেকেই কাজে ব্যস্ত, কিন্তু তাদের চলাফেরার মধ্যে আগের দিনের স্বাভাবিকতা নেই। কেউ বেশি কথা বলছে না। দূরে কোথাও ঘোড়ার হঠাৎ শব্দ উঠলে কয়েকজনের মাথা একসঙ্গে সেই দিকে ঘুরে যাচ্ছে। বাতাসে শুকনো ঘাসের মৃদু শব্দ হলেও চোখ চলে যাচ্ছে প্রেইরির দিকে।

লারসেন কাউকে র&#x200d;্যাঞ্চের সীমানার বাইরে যেতে নিষেধ করেছে। রাতের অন্ধকারে যারা এসেছিল, তাদের পেছনে ছুটে গিয়ে অজানা জায়গায় নিজেদের লোক হারানোর মতো বোকামি সে করতে চায় না। যারা এসেছিল, তারা যদি আবার ফিরে আসে, আলোয় তাদের দেখা যাবে। আর যদি তারা চলে গিয়ে থাকে, তবে মাটির ওপর রেখে যাওয়া চিহ্নই তাদের পথের কথা বলবে।

বাড উত্তর দিকের বেড়ার কাছে দুজন লোক দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পশ্চিম দিকটাও পরীক্ষা করা হয়েছে। কোথাও তাজা ঘোড়ার খুরের চিহ্ন, কোথাও চাপা পড়া ঘাস, কোথাও মানুষের বুটের দাগ। কিন্তু রাতের অন্ধকার আর তাড়াহুড়োর মধ্যে কোনো চিহ্নই পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

বাইরে থেকে র&#x200d;্যাঞ্চটা আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে বলে মনে হয়। কিন্তু যারা গত রাতের ঘটনাটা দেখেছে, তারা জানে এই স্বাভাবিকতা খুব পাতলা একটা পর্দা। তার নিচে এখনও ভয় আছে। সন্দেহ আছে। আর আছে এমন এক অদৃশ্য বিপদের অনুভূতি, যার কোনো মুখ এখনও দেখা যায়নি।

বাড়ির ভেতরের ছোট ঘরটায় লারসেন একা দাঁড়িয়ে ছিল। জানালার কাঠের পাল্লা অর্ধেক খোলা। সকালের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে ঘরের মেঝের ওপর তির্যক একটা উজ্জ্বল রেখা তৈরি করেছে। সেই আলোর মধ্যে ধুলোর ক্ষুদ্র কণাগুলো ধীরে ধীরে ভেসে বেড়াচ্ছে। ঘরের বাতাসে পুরোনো কাঠ, চামড়া আর রাতের ঠান্ডা মিশে আছে।

টেবিলের ওপর এলি ব্রুকসের চিঠি খোলা। তার পাশে পুরোনো চামড়ার টুকরো। আর তার পাশে পড়ে আছে কালচে ধাতব চাকতিটি। 

লারসেন অনেকক্ষণ কোনো কিছু স্পর্শ করল না। তার দুই হাত জানালার কাঠের ওপর রাখা। চোখ বাইরে, কিন্তু সে আসলে প্রেইরি দেখছে না। তার মনে বারবার ফিরে আসছে এলি ব্রুকসের অফিসঘর। দেয়ালে ঝোলানো মানচিত্র। তিনটি জায়গায় চিহ্ন। সেই তিনটি জায়গাকে কল্পনায় যুক্ত করলে মাঝখানে এসে পড়ে তার র&#x200d;্যাঞ্চ। তারপর সিল মারা খাম। আর সেই চিঠির কয়েকটি লাইন। ওরা হয়তো তোমার জমি চায় না। তোমার জমির চেয়েও পুরোনো কোনো জিনিসের জন্য ওরা ফিরে এসেছে।

লারসেন ধীরে জানালা থেকে সরে এসে টেবিলের কাছে গেল। চিঠির ওপর হাত রাখল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তার মুখে কোনো ভাব প্রকাশ পেল না, কিন্তু চোখের গভীরে চিন্তার রেখা আরও গাঢ় হলো। তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামল কালচে চাকতিটার ওপর।

একই চিহ্নের দ্বিতীয় চাকতি এখন মারদেকার কাছে। গত রাতের অচেনা লোকটা সেটা রেখে গেছে। লারসেন কেন চাকতিটা মারদেকাকে দিয়েছে, সেই সিদ্ধান্তের পুরো ব্যাখ্যা সে নিজেকেও দেয়নি। তবে একটা বিষয় সে জানে, বিশ্বাস কোনোদিন এক লাফে তৈরি হয় না। ছোট ছোট পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সেটা তৈরি হয়।

সে দেখতে চেয়েছিল, মারদেকা এমন একটা জিনিস নিজের কাছে রাখতে পারে কি না যার অর্থ সে জানে না, কিন্তু যার গুরুত্ব সে বুঝতে পারে। গত রাতের ঘটনাগুলো ছেলেটাকে তার চোখে আরও বদলে দিয়েছে। 

মারদেকা ভয় পেয়েছিল। কিন্তু ভয়কে নিজের চোখের ওপর বসতে দেয়নি। সে লক্ষ্য করেছে মানুষের মুখ, দৃষ্টি, থেমে যাওয়া কথা, বদলে যাওয়া আচরণ। লারসেন বহু বছর ধরে মানুষের চোখ পড়েছে। বন্দুক হাতে থাকা লোক নিজের মুখের কথা দিয়ে অনেক কিছু লুকাতে পারে, কিন্তু তার চোখ অনেক সময় সত্যিটা বলে দেয়।

মারদেকা সেই জিনিসটা বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিক দ্রুত বুঝতে শুরু করেছে। এই ক্ষমতা তাকে বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে। আবার ঠিকভাবে শেখানো গেলে একদিন এটাই তাকে বাঁচাতেও পারে।

দরজায় হালকা শব্দ হলো। লারসেন মুখ না ঘুরিয়েই বলল, “ভেতরে এসো।”

দরজা খুলে বাড ঢুকল। হাতে রাইফেল। কাঁধে সকালের ঠান্ডা বাতাসের গন্ধ। বুটের নিচে শুকনো মাটি লেগে আছে। রাত জাগার ক্লান্তি মুখে থাকলেও চোখে সেই পুরোনো সতর্কতা।

ঘরে ঢুকে বাড প্রথমে লারসেনের দিকে তাকাল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা চাকতি আর চামড়ার টুকরোটার দিকে তার দৃষ্টি গেল। বাইরে থেকে আসা আলোয় চাকতিটা কালচে ধাতুর মতো নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে।

বাড ধীরে বলল, “উত্তরের দিকটা এখন শান্ত।”

লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল, “পশ্চিম?”

“ক্লে মরগান দেখে এসেছে। তাজা লোকের চিহ্ন নেই। তবে বেড়ার ওপারে একটা জায়গায় ঘাস চাপা পড়েছে।”

লারসেন এবার তার দিকে ফিরল। “কেউ অনুসরণ করেনি তো?”

বাড মাথা নেড়ে বলল, “না। আপনার কথা পরিষ্কার ছিল। কেউ সীমানার বাইরে যাবে না।”

লারসেন আবার জানালার দিকে তাকাল। তার চোখে কঠিন স্থিরতা। “আমরা এখন তাদের পেছনে গেলে তারা বুঝবে আমরা কী জানি। আমি বরং চাই, তারা ভাবুক আমরা কিছুই জানি না।”

বাডের মুখে সামান্য হাসি ফুটল। সে রাইফেলটা দেয়ালের পাশে ঠেকিয়ে রেখে বলল, “আপনি কখনও সহজ পথ নেন না।” 

লারসেনের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি দেখা গেল। “সহজ পথ সবসময় নিরাপদ পথ নয়।”

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। বাইরে ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। তারপর আবার নীরবতা।

বাডের চোখ ধীরে ধীরে টেবিলের ওপরের চাকতিতে গিয়ে থামল। সে বলল, “ওটা কি আগে দেখেছেন?” 

লারসেন উত্তর দিল, “হ্যাঁ।”

বাড আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। লারসেনের অতীত সম্পর্কে সে অনেক কিছু জানে না। জানার চেষ্টাও করে না। বহু বছর ধরে সে বুঝে গেছে, মানুষের জীবনে কিছু দরজা থাকে যেগুলো বাইরে থেকে খুলতে যাওয়া উচিত নয়।

তবে কিছুক্ষণ পর সে আবার বলল, “মারদেকার হাতে ওটা ........!” কথাটা শেষ করল না।

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আমিই দিয়েছি।”

বাডের চোখে এবার চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। “ওকে বিশ্বাস করছেন?”

লারসেন পাল্টা প্রশ্ন করল, “তুমি করো না?”

বাডের মুখে এবার সত্যিকারের হাসি ফুটল। “আমি ওকে অনেক দিন ধরেই বিশ্বাস করি।”

লারসেনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য উষ্ণতা দেখা গেল।

মারদেকা যখন প্রথম এই র&#x200d;্যাঞ্চে এসেছিল, তখন সে ছিল পাহাড় থেকে পালিয়ে আসা এক কিশোর। ক্ষুধা ছিল, ভয় ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল একরোখা জেদ। বাডই প্রথম তাকে র&#x200d;্যাঞ্চের কাজের মধ্যে টেনে নিয়েছিল। ঘোড়ার পরিচর্যা, পানি তোলা, খড় সরানো, বেড়া মেরামত, জিন পরিষ্কার করা, ভোরে ওঠা, রাতের কাজ শেষ করে সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখা, একটা র&#x200d;্যাঞ্চ কীভাবে মানুষের হাত আর ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, এসব মারদেকা প্রথম শিখেছিল বাডের কাছ থেকেই।

বাড বলল, “আমি শুধু ভাবছিলাম, চাকতিটা ওর কাছে রাখা ঠিক হবে কি না।”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তুমিও জানো, এটা সাধারণ জিনিস নয়।”

বাড জানালার বাইরে তাকাল। প্রেইরির ওপর সকালের আলো তখন আরও উজ্জ্বল হয়েছে। সে ধীরে বলল, “আমি ওকে ভয় দেখাতে চাই না।”

লারসেনের কণ্ঠ শান্ত রইল। “ওকে ভয় দেখানো আর সত্যিটা থেকে দূরে রাখা এক জিনিস নয়।”

বাড মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর বলল, “ছেলেটা এমনিতেই যা দেখে তার চেয়ে বেশি বুঝতে শুরু করেছে।”

লারসেনের চোখে আবার সেই চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। “গত রাতে সে একজন লোকের হাঁটার ধরনও মনে রেখেছে।”

বাড এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। “ও কথাটাই আমি আপনাকে বলতে এসেছিলাম।”

লারসেন চুপ করে রইল।

বাড বলল, “মারদেকা বলেছে, লোকগুলোর একজন বাঁ পায়ে সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। আমি নিজে সেটা নিশ্চিত করে দেখিনি। রাতের আলো ভালো ছিল না। কিন্তু ছেলেটা বলছে, লোকটা ঘোড়ার দিকে যাওয়ার সময় বাঁ পায়ের ওপর পুরো চাপ দিচ্ছিল না।”

লারসেনের চোখ সরু হয়ে এল। সে কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলল না। তারপর ধীরে বলল, “ওকে ডেকে আনো।”

বাড দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে থেমে পেছন ফিরে তাকাল।
“ও রাত থেকে ঘুমায়নি। বলেছিলাম একটু শুয়ে নিতে। শুনল না।”

লারসেনের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। “কেন?”

বাড হেসে বলল, “বলেছে, যারা এসেছিল তাদের একজনের হাঁটা ভুলে যেতে চায় না।”

লারসেন কিছুক্ষণ বাডের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “ওকে পাঠাও।”

বাড বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার পর ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল।

লারসেন টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, মারদেকাকে এখন শুধু আরও কিছু শেখানো দরকার। ছেলেটা দেখতে শিখছে। মানুষের আচরণ পড়তে শিখছে। কিন্তু চোখ যা দেখে, শরীর যদি তার সঙ্গে তাল না মেলায়, তবে বিপদের মুহূর্তে সেই জ্ঞান কোনো কাজে আসে না।

কয়েক সপ্তাহ আগে সে মারদেকাকে বলেছিল, “আগামীকাল থেকে তোমার পা শিখবে।” 
সেই শিক্ষা এখনও শেষ হয়নি। আজ তার সঙ্গে আরও কিছু যোগ হবে।

লারসেন টেবিল থেকে চাকতিটা তুলে নিল। ধাতব পৃষ্ঠে আঙুল বোলাল না। শুধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার রেখে দিল। ছেলেটার হাতে এখন অন্য চাকতিটা আছে। আজ সেটাই যথেষ্ট। রহস্যের পুরো ভার এখনই তার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

কিছুক্ষণ পর বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। মারদেকা দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। তার পেছনে বাড। ছেলেটার চোখে রাত জাগার ক্লান্তি থাকলেও মুখে সেই অদ্ভুত সতর্কতা এখনও আছে।

লারসেন বাডের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি যাও। উত্তরের লোকগুলোকে বলে দাও, দুপুরের আগে কেউ সীমানা ছাড়বে না।”

বাড মাথা নেড়ে বেরিয়ে যেতে লাগল। দরজার কাছে গিয়ে সে মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। মুখে কঠিন ভাব এনে বলল, “ইলাই তোমাকে খাবার খেতে বলেছে। খালি পেটে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না।”

মারদেকা হেসে বলল, “আমি পরে খাব।”

বাড ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। মাথা নেড়ে বলল, “লারসেনকে যত খুশি প্রশ্ন করো, কিন্তু ইলাইকে অপেক্ষা করিয়ে রেখো না। ওটা আমার পক্ষে সামলানো কঠিন।”

লারসেনের মুখেও ক্ষীণ হাসি ফুটল। বাড চলে গেল। মারদেকা ঘরে ঢুকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

লারসেন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “চাকতিটা কোথায়?”

মারদেকা মাথা নেড়ে পকেট থেকে চাকতিটা বের করল। সকালের আলোয় কালচে ধাতব পৃষ্ঠে ক্ষীণ ঝিলিক দেখা গেল। সে চাকতিটা মুঠোর ওপর রেখে লারসেনের দিকে বাড়িয়ে ধরল।

লারসেন সেটা হাতে নিল না। শুধু তাকিয়ে রইল। 

মারদেকা কিছুক্ষণ চাকতিটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “আপনি কি জানেন এটা কী?”

লারসেন তার চোখের দিকে তাকাল। “তুমি কী মনে করো?”

মারদেকা একটু ভেবে বলল, “কোনো চিহ্ন।” আবার চাকতিটার দিকে তাকাল। “হয়তো কোনো লোককে চেনায়।”

লারসেন কিছু বলল না।

মারদেকা আরও কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “হয়তো পুরোনো কোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িত।”

লারসেনের চোখে সামান্য হাসি ফুটল। “এবার তুমি অনুমান করছ।”

মারদেকা মাথা নিচু করল।

লারসেন শান্ত গলায় বলল, “অনুমান করা খারাপ নয়। কিন্তু অনুমানকে সত্যি মনে করা বিপজ্জনক।”

মারদেকা মাথা তুলল। “আপনি বলেছিলেন।”

লারসেন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “আজ তোমার আরেকটা শিক্ষা হবে।”

মারদেকার চোখে কৌতূহল জ্বলে উঠল। “কী শিক্ষা?”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। শুধু দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

মারদেকা চাকতিটা আবার পকেটে রেখে তার পেছনে বেরিয়ে এল।

বাড়ির পেছনে র&#x200d;্যাঞ্চের পুরোনো শেডের আড়ালে একটা ছোট খোলা জায়গা ছিল। একসময় সেখানে ঘোড়ার সরঞ্জাম রাখা হতো। এখন জায়গাটা প্রায় ব্যবহার হয় না। চারদিকে খসখসে কাঠের বেড়া। এক পাশে পড়ে আছে শুকনো গাছের মোটা গুঁড়ি। মাটির ওপর ছোট ছোট পাথর, শুকনো ঘাস আর পুরোনো খড়ের টুকরো ছড়িয়ে আছে। জায়গাটার ওপারে কোনো বাধা নেই। শুধু বিস্তৃত প্রেইরি।

সকালের বাতাসে ঘাসের সমুদ্র ধীরে ধীরে দুলছে। দূরে পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আলো আরও নেমে এসেছে। কোথাও একটা বাজপাখি আকাশে চক্কর দিচ্ছে। তার ডানার নিচে আলো পড়ে এক মুহূর্তের জন্য সাদা ঝিলিক দেখা গেল। তারপর সে আবার উঁচুতে উঠে গেল।

লারসেন মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চারপাশ দেখল। তারপর কোমরের পাশ থেকে একটা ছুরি বের করল। 

মারদেকার চোখ সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটার দিকে চলে গেল। ছুরিটা বড় নয়। হাতলের কাঠ বহু ব্যবহারে মসৃণ হয়ে গেছে। ফলার একপাশে সকালের সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে। ধাতুর ওপর বয়সের ক্ষীণ দাগ আছে, কিন্তু ধার এখনও পরিষ্কার।

মারদেকা বুঝে গেল। তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

তার মুখের পরিবর্তন লারসেনের চোখ এড়াল না। বলল, “আজ থেকে তুমি ছুরি নিক্ষেপ শেখা শুরু করবে।”

কথাটা শুনে মারদেকা কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। যেন সে নিজের কানে শোনা কথাটা বিশ্বাস করতে চাইছে, কিন্তু পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না।

লারসেন এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তবে মনে রেখো, এটা খেলা নয়।”

মারদেকার মুখের আনন্দ একটু থেমে গেল। সে গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে দাঁড়াল।

লারসেন গাছের গুঁড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। পুরোনো কাঠের গায়ে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা দাগ। কোথাও কুঠারের আঘাত, কোথাও কাঠের ফাটল, কোথাও পুরোনো ছুরির সরু চিহ্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঠের রং মলিন হয়ে গেছে, কিন্তু প্রতিটি দাগ এখনও নিজের গল্প বহন করছে।

লারসেন একটা নির্দিষ্ট জায়গার দিকে ইঙ্গিত করল। “ওখানে তাকাও।”

মারদেকা তাকাল। 

“কী দেখছ?”

“অনেক দাগ।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “কোনটা নতুন?”

মারদেকা চোখ সরু করল। বাতাসে শুকনো ঘাসের ডগা দুলছে। তার মাঝেও ছেলেটার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সে মাঝামাঝি একটা সরু দাগ দেখিয়ে বলল, “ওটা।”

লারসেন সন্তুষ্ট হলো। “ভালো। তোমার চোখ এখনও কাজ করছে।” 

তারপর সে মারদেকাকে কয়েক পা দূরে নিয়ে গেল। “এখানে দাঁড়াও।”

মারদেকা দাঁড়াল। লারসেন তার পায়ের দিকে তাকাল। কয়েক সপ্তাহের শিক্ষা তার চোখে অভ্যাস হয়ে গেছে। দুই পা পাশাপাশি নয়। শরীরের ভার একদিকে জমিয়ে নয়। মাটির ওপর এমনভাবে দাঁড়াতে হবে যেন হঠাৎ নড়তে হলেও ভারসাম্য হারিয়ে না যায়।

মারদেকা নিজের পায়ের অবস্থান ঠিক করল। লারসেন বলল, “গত কয়েক সপ্তাহে আমরা যে জিনিসটা শিখেছি, আজ সেটাই কাজে লাগবে।”

মারদেকা বুঝল। “পায়ের ভারসাম্য?”

“হ্যাঁ।”

লারসেন ছুরিটা তার হাতে দিল। “ধরো।”

মারদেকা সাবধানে ছুরিটা ধরল। লারসেন তার আঙুলের অবস্থান দেখল। তারপর বলল, “স্বাভাবিকভাবে ধরো। শক্ত করে নয়।”

মারদেকা হাতের চাপ কমাল।

লারসেন বলল, “এখন ছুরিটাকে অস্ত্র হিসেবে ভাববে না। ওজন হিসেবে অনুভব করো।”

মারদেকা ছুরিটার দিকে তাকাল। হাতের তালুতে ধাতুর ঠান্ডা অনুভূত হলো। কিছুক্ষণ পর বলল, “ভারটা সামনে।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক।”

সে ছুরিটা আবার নিজের হাতে নিল। “আজ তুমি শুধু একটা জিনিস শিখবে। হাত, চোখ আর শরীর যেন একই মুহূর্তে একই কাজে থাকে।”

মারদেকা মন দিয়ে শুনল।

লারসেন নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত সে নড়ল না। বাতাস তার জামার প্রান্ত সামান্য দুলিয়ে দিচ্ছে। দূরের ঘাসের ওপর সূর্যের আলো নড়ছে। অথচ লারসেন যেন সবকিছুর বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তার পা মাটিতে স্থির। দৃষ্টি গাছের গুঁড়ির একটি নির্দিষ্ট জায়গায়। তারপর হঠাৎ তার হাত এগিয়ে গেল। ছুরিটা বাতাস কেটে গিয়ে গাছের গুঁড়িতে গিয়ে ঠুকে বসে রইল।

মারদেকার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সে প্রায় এগিয়ে যাচ্ছিল।

লারসেন শান্ত গলায় বলল, “থামো।”

মারদেকা থেমে গেল।

লারসেন ছুরিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “প্রথম শিক্ষা?”

মারদেকা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “তাড়াহুড়ো করা যাবে না।”

লারসেন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। “আগে দাঁড়াতে হবে। তারপর লক্ষ্য দেখতে হবে।”

মারদেকার হাতে এবার ছুরিটা উঠল। উত্তেজনা তার চোখে স্পষ্ট। 

লারসেন সেটা বুঝতে পারল। “নিজেকে শান্ত করো।”

মারদেকা গভীর শ্বাস নিল। তারপর নিজের জায়গায় দাঁড়াল। গাছের গুঁড়ির দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা গেল না। তারপর ছুরিটা তার হাত থেকে বেরিয়ে গেল। কাঠের গুঁড়িতে লাগল না। মাটির পাশে গিয়ে পড়ল। মারদেকার মুখে হতাশা নেমে এল।

লারসেন ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভালো।”

মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল।

লারসেন বলল, “এখন তুমি জানলে, শুধু ইচ্ছা করলেই হয় না।”

মারদেকা মাটিতে পড়ে থাকা ছুরিটার দিকে তাকাল। সে সেটা তুলে নিল।

দ্বিতীয়বারও লক্ষ্যভেদ হলো না। তৃতীয়বার ছুরিটা গুঁড়ির কিনারায় গিয়ে লাগল, কিন্তু কাঠে আটকে থাকার আগেই নিচে পড়ে গেল। মারদেকার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

লারসেন তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, রাগ হচ্ছে। “রাগ করছ?”

মারদেকা মাথা নেড়ে বলল, “না।”

লারসেনের কণ্ঠে কঠোরতা এল। “করছ।”

মারদেকা এবার চুপ করে গেল।

লারসেন তার কাছে এসে দাঁড়াল। সকালের আলোয় দুজনের ছায়া শুকনো মাটির ওপর লম্বা হয়ে পড়ে আছে। “এই রাগটাই কিন্তু তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু হতে পারে।”

মারদেকা নিচু গলায় বলল, “আমি পারব।”

লারসেন বলল, “পারবে। কিন্তু পারার আগে ব্যর্থ হতে হবে।”

কিছুক্ষণ পরে মারদেকা আবার ছুরিটা হাতে নিল। লারসেন এবার তাকে থামিয়ে দিল। 
“চোখ বন্ধ করো।”
 
মারদেকা অবাক হলেও চোখ বন্ধ করল। চারপাশের শব্দ তখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। দূরে ঘোড়ার নড়াচড়া, কাঠের কোথাও হালকা কড়কড় শব্দ, বাতাসে ঘাসের ঘর্ষণ, আর অনেক দূরে কোনো পাখির ডাক।

লারসেন বলল, “পায়ের নিচের মাটি অনুভব করো।”

মারদেকা স্থির রইল।

“এখন চোখ খোলো।”

সে চোখ খুলল।

“এবার কাঠের গুঁড়িটা দেখো না,” লারসেন বলল। “একটা নির্দিষ্ট জায়গা দেখো।”

মারদেকা গাছের গুঁড়ির ওপর ছোট একটা দাগ বেছে নিল। তার দৃষ্টি সেখানে স্থির হলো। কিছুক্ষণ পর ছুরিটা তার হাত থেকে বেরিয়ে গেল। এবার ছুরিটা গুঁড়ির মাঝামাঝি গিয়ে আঘাত করল। কাঠের ভেতর ছুরিটা কেঁপে উঠল।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত নড়ল না। তারপর মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।

লারসেনও সামান্য হাসল। “এইবার হয়েছে।”

মারদেকার চোখে আনন্দ জ্বলে উঠল। “আমি পেরেছি!”

লারসেন বলল, “একবার সফল হওয়া মানে শেখা শেষ নয়।”

মারদেকার হাসি একটু কমে গেল। সে মাথা নেড়ে আবার ছুরির দিকে এগোল।

তারপর আরও কয়েকবার চেষ্টা হলো। কখনও ছুরি কাঠে লাগল, কখনও পাশে গিয়ে পড়ল, কখনও গুঁড়ির ওপর আঘাত করে মাটিতে গড়িয়ে গেল। সূর্য ধীরে ধীরে আরও ওপরে উঠতে লাগল। সকালের ঠান্ডা একটু একটু করে কমে এল। শুকনো ঘাসের ওপর শিশির শুকিয়ে গেল। দূরের পাহাড়ের ছায়া সরে গিয়ে আরও বেশি জায়গা সোনালি আলোয় ভরে উঠল। 

মারদেকার কপালে ঘাম জমল।

লারসেন তাকে থামাল। “আজ যথেষ্ট।”

মারদেকা ক্লান্ত গলায় বলল, “আরেকবার।”

লারসেন মাথা নেড়ে না বলল। “শরীর ক্লান্ত হয়ে গেলে শেখার ওপর জোর করা উচিত নয়।”

মারদেকা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছুরিটা ফিরিয়ে দিল।

লারসেন সেটা কোমরের পাশে গুঁজে নিল। 

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

গাছের গুঁড়িতে নতুন দাগগুলো সকালের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পুরোনো দাগের ভিড়ে তারাও এখন নতুন হয়ে উঠেছে। খুব বড় নয়, খুব গভীরও নয়। কিন্তু মারদেকা জানে, এগুলো তার নিজের হাতের তৈরি।

লারসেন গাছটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ তুমি একটা জিনিস বুঝলে।”

মারদেকা তার দিকে তাকাল। 

“ছুরি নিক্ষেপের আসল লড়াই লক্ষ্য আর ছুরির মধ্যে নয়।”

দূরে তখন বাডের গলা শোনা গেল। র&#x200d;্যাঞ্চের লোকজনকে সে কোনো নির্দেশ দিচ্ছে। তারপর ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি উঠল। একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল। র&#x200d;্যাঞ্চ আবার দিনের কাজে ঢুকে পড়েছে।

লারসেন হাঁটতে শুরু করল।

মারদেকা তার পাশে এসে হাঁটল।

কয়েক পা এগিয়ে লারসেন হঠাৎ থেমে গেল। মাটির দিকে তাকিয়ে সে বলল, “এখানে কী দেখছ?”

মারদেকা নিচু হলো। শুকনো মাটিতে মানুষের পুরোনো বুটের দাগ। তার পাশে ঘোড়ার খুরের চাপ। কয়েকটি ঘাস মাটির দিকে বাঁকা হয়ে আছে। বাতাসে কিছু দাগ ইতিমধ্যে ঝাপসা হয়ে গেছে। সে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে বলল, “কেউ এখানে দাঁড়িয়েছিল।”

লারসেন জিজ্ঞেস করল, “কতক্ষণ?”

মারদেকা আবার দাগগুলোর দিকে তাকাল। তারপর মাথা তুলল। “জানি না।”

লারসেনের চোখে সন্তুষ্টির ক্ষীণ ছাপ ফুটে উঠল। “এই উত্তরটাই চাই। যেটা জানো না, সেটা জানি না বলতে পারা বড় শিক্ষা।”

মারদেকা মাথা নেড়ে আবার তার পাশে হাঁটতে লাগল। র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে ফিরতে ফিরতে সে পকেটের ভেতর হাত ঢোকাল। আঙুলের ডগায় ঠান্ডা ধাতব চাকতিটা অনুভব করল। গত রাতের রহস্য এখনও তার সামনে অন্ধকার।

অচেনা লোকগুলো কারা, কেন তারা এসেছিল, কেন তাদের একজন সেই চাকতি রেখে গেল, লারসেন তার সম্পর্কে কতটা জানে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও নেই।

কিন্তু আজ সকালে সে অন্য কিছু শিখেছে। অন্ধকারের মধ্যে শুধু সাহস নিয়ে হাঁটা যায় না। চোখ খোলা রাখতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়। নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আর সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে নিজের ভেতরের ভয় ও রাগকে নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দেওয়া যায় না।

সামনে লারসেন হাঁটছিল। তার কোমরের পাশে ছুরিটা নীরবে দুলছিল। সকালের আলোয় তার ধাতব ফলায় মাঝেমধ্যে সূর্যের ক্ষীণ ঝিলিক দেখা যাচ্ছিল। পেছনে পড়ে রইল পুরোনো গাছের গুঁড়িটা। তার গায়ে এখন মারদেকার হাতে তৈরি কয়েকটি নতুন দাগ। ছোট দাগ। অগভীর দাগ। কিন্তু নিজের হাতে তৈরি।

মারদেকা আরেকবার পকেটের ভেতর চাকতিটা স্পর্শ করল। তারপর চোখ তুলে সামনে তাকাল।

র&#x200d;্যাঞ্চের বাড়ি ধীরে ধীরে কাছে আসছে। উঠোনে লোকজনের চলাফেরা। ঘোড়ার শব্দ। কাঠের চাকার কড়কড়। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে সকালের খাবারের গন্ধ। 
জীবন যেন আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু লারসেন জানে, এই স্বাভাবিকতা স্থায়ী নয়।

প্রেইরির ওপারে কোথাও যারা রাতের অন্ধকারে এসেছিল, তারা হয়তো এখনও তাকিয়ে আছে। হয়তো তারা দূর থেকে র&#x200d;্যাঞ্চের গতিবিধি দেখছে। হয়তো তারা অপেক্ষা করছে পরবর্তী সুযোগের জন্য। আর তাদের একজন বাঁ পায়ে সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটে। এই ছোট্ট তথ্যটাই এখন লারসেনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

সে জানে, মানুষের মুখ মনে রাখা কঠিন। কিন্তু হাঁটার ভঙ্গি বদলানো আরও কঠিন। 
মারদেকা সেটা লক্ষ্য করেছে। এই কারণেই ছেলেটাকে আরও শেখানো দরকার। 

শুধু ছুরি নয়। শুধু চোখ নয়। মানুষকে পড়তে হবে। মাটিকে পড়তে হবে। বাতাসকে পড়তে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের ভেতরটাকেও পড়তে হবে।

র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে ঢোকার আগে লারসেন একবার পেছনে তাকাল। দূরের প্রেইরি তখন পুরোপুরি সূর্যের আলোয় ভেসে গেছে। রাতের অন্ধকারের কোনো চিহ্ন সেখানে নেই। শুধু ঘাসের ঢেউ আর তার ওপরে নীল আকাশ। তবু লারসেনের চোখে সেই প্রেইরি শান্ত মনে হলো না।

বাড়িতে ঢোকার আগে লারসেন একবার পেছনে তাকাল। তার চোখ প্রথমে শেডের দিকে গেল। তারপর উত্তরের বেড়া। তারপর পশ্চিমের খোলা জমি। এরপর দূরের পাহাড়। ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। মারদেকা তার পেছনে।

ঘরের ভেতর এখন আর সকালের সেই ঠান্ডা নেই। জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকে মেঝের একটা বড় অংশ উজ্জ্বল করে তুলেছে। টেবিলের ওপর আগের মতোই এলি ব্রুকসের চিঠি পড়ে আছে। পাশে পুরোনো চামড়ার টুকরো। তার পাশে কালচে ধাতব চাকতিটা।

লারসেন চেয়ার টেনে বসল। কিন্তু বসেও বিশ্রাম নিল না। তার চোখ চাকতিটার ওপর গিয়ে স্থির হলো। হাত বাড়িয়ে টেবিলের চাকতিটা তুলে নিল। আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে দেখল। ধাতব পৃষ্ঠে সময়ের ক্ষত আছে। কোথাও ক্ষীণ আঁচড়, কোথাও কালচে জমাট দাগ। মাঝখানের চিহ্নটা এত পুরোনো যে তার রেখাগুলো প্রায় মসৃণ হয়ে এসেছে। তবু লারসেনের চোখে সেটার প্রতিটি বাঁক এখনও পরিষ্কার।

বহু বছর আগে সে এই চিহ্ন দেখেছিল। খুব কাছ থেকে। এমন এক সময়, যখন সে এখনও লারসেন হয়ে ওঠেনি। সেই স্মৃতিটা হঠাৎ তার মনে উঠল, কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে সরিয়ে দিল। এখন অতীতে ফিরে যাওয়ার সময় নয়। বর্তমানই যথেষ্ট বিপজ্জনক।

সে চিঠিটা আবার হাতে নিল। এলি ব্রুকসের লেখা কয়েকটি লাইন তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। তিনটি জায়গা। তিনটি চিহ্ন। আর মাঝখানে তার র&#x200d;্যাঞ্চ। 

এতদিন সে ভেবেছিল, হয়তো জমির কোনো পুরোনো মালিকানা নিয়ে ব্যাপারটা। হয়তো পুরোনো কোনো দলিল, কোনো গোপন জমি, কোনো খনিজ সম্পদ। কিন্তু গত রাতের লোকগুলো সেই ধারণাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

যদি শুধু জমির জন্য তারা আসত, তবে এতটা সাবধানে আসার প্রয়োজন ছিল না। তারা গুলি চালিয়েছে।

কিন্তু র&#x200d;্যাঞ্চে ঢোকার পর যতটা সময় পেয়েছিল, তার মধ্যে কেউ লুটপাট করেনি। একটা ঘোড়াই শুধু নিয়েছে। সেটারও যুৎসই কোন কারণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।তবে আর কিছু নেওয়ার চেষ্টা করেনি। খাবার বা অস্ত্র চুরি করেনি। তারা যেন শুধু কিছু খুঁজছিল। আর সেই কিছুটা কী?

লারসেনের চোখ মারদেকার ওপর গিয়ে থামল। তার কাছে থাকা দ্বিতীয় চাকতিটা যেন অদৃশ্যভাবে এই প্রশ্নের উত্তর বহন করছে।

মারদেকা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়াল। “ওরা কি এইটার জন্য এসেছিল?” সে জিজ্ঞেস করল।

লারসেন চাকতিটা নামিয়ে রাখল। “হতে পারে।”

“কিন্তু, প্রথমটা তো সে ফেলে গিয়েছিল।” 

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “হতে পারে দুটো এক জিনিস নয়।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। সে আর প্রশ্ন করল না।

এই ছেলেটার একটা পরিবর্তন লারসেন লক্ষ করল। কয়েক মাস আগে হলে মারদেকা পরপর প্রশ্ন করত। এখন সে অপেক্ষা করতে শিখছে। উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত চুপ থাকতে পারছে। গত কয়েক সপ্তাহের শিক্ষা হয়তো সত্যিই তার ভেতরে জায়গা করে নিচ্ছে।

লারসেন জানালার দিকে তাকাল। বাইরে বাড এখন শেডের পাশে দাঁড়িয়ে। তার সঙ্গে ক্লে মরগান কথা বলছে। দুজনের মুখের ভঙ্গি দেখে বোঝা যায়, তারা কোনো সাধারণ র&#x200d;্যাঞ্চের ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করছে না।

কিছুক্ষণ পর বাড দরজায় এসে দাঁড়াল। “লারসেন।”

লারসেন মাথা তুলল।

বাড ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। তার হাতে একটা ছোট কাপড়ের টুকরো। মুখে আগের চেয়ে বেশি গম্ভীর ভাব। সে টেবিলের ওপর কাপড়টা রাখল। “পশ্চিমের বেড়ার কাছে পেয়েছি।”

লারসেন কাপড়টা তুলে নিল। আঙুলের মধ্যে ঘষে দেখল। সেটা মাটির রঙে মলিন হয়ে গেছে। একটা প্রান্ত ছেঁড়া। কাপড়ের ওপর শুকনো কাদার দাগ।

বাড বলল, “আর পেয়েছি কতগুলো ঘোড়ার খুরের দাগ।”

লারসেন চোখ তুলল। “কয়টা?”

“দুটো ঘোড়া। একজনের ঘোড়া ভারী ছিল। অন্যটার খুর ছোট।”

লারসেন কাপড়টা নামিয়ে রাখল। তার চোখে চিন্তার ছাপ ঘন হলো।

“ওরা কি দুজন ছিল?”

বাড মাথা নেড়ে বলল, “নিশ্চিত নই। তবে দাগ দুটো আলাদা।” একটু ইতস্তত করে বলল, “মারদেকা যে লোকটার কথা বলেছিল, তার মতো একটা পায়ের দাগও আছে।”

ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। কথাটা শুনে তার চোখ বাডের দিকে উঠল।

বাড কাপড়টা আবার তুলে দেখাল। “ডান পায়ের ছাপ গভীর। বাঁ পায়েরটা তুলনায় হালকা। মনে হচ্ছে লোকটা বাঁ পায়ে পুরো ভর দিচ্ছিল না।”

লারসেন উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এবার আগের সেই স্থিরতা নেই। তার জায়গায় এসেছে ঠান্ডা মনোযোগ। সে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। পশ্চিম দিকের প্রেইরি সকালের আলোয় চকচক করছে। ঘাসের ঢেউয়ের মধ্যে কোথাও কোনো মানুষ নেই। কোনো ঘোড়া নেই। শুধু দূরে কয়েকটা কালো বিন্দু, হয়তো গরু।

মারদেকা তখনও জানালার দিকে তাকিয়ে।

লারসেন তার দিকে ফিরে বলল, “তুমি যে লোকটার হাঁটার কথা বলেছিলে, সেটা আবার মনে করার চেষ্টা করো।”

মারদেকা চোখ বন্ধ করল না। বরং জানালার বাইরে তাকিয়েই স্মৃতিটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল। রাতের অন্ধকার। ঘোড়ার ছায়া। মানুষের দৌড়।

তারপর একজন একটু ধীরে হাঁটছে। বাঁ পা। সে ধীরে বলল, “লোকটা পুরোপুরি খুঁড়িয়ে হাঁটছিল না।”

লারসেন অপেক্ষা করল।

“শুধু বাঁ পায়ে চাপ কম ছিল। যেন ব্যথা ছিল।”

“আর কিছু?”

মারদেকা কপাল কুঁচকাল। “সে ঘোড়ার কাছে যাওয়ার আগে একবার থেমেছিল।”

“কেন?”

“জানি না।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “ভালো। জানো না বলেছ।”

মারদেকা এবার তার দিকে তাকাল।

লারসেনের মুখে সামান্য প্রশান্তি দেখা গেল।

এই ছেলেটাকে তাড়াহুড়ো করে বড় করে তোলা যাবে না। সে এখনও শিশু। কিন্তু তার চোখের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। সেই চোখকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

টেবিলের ওপর রাখা চাকতিটার দিকে তার দৃষ্টি আবার গেল। হয়তো এই ছোট ধাতব টুকরোটাই সেই পুরোনো দরজার চাবি, যার অস্তিত্ব এতদিন সে ভুলে থাকতে চেয়েছিল।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/265094/</link>
				<pubDate>Mon, 24 Aug 2026 04:43:37 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–সতের<br />
আকাশে কোনো মেঘ নেই। ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে প্রেইরির ওপর। রাতের শেষ অন্ধকার অনেক আগেই সরে গেছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ঠান্ডা এখনও বাতাসের মধ্যে মিশে আছে। পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠে এসেছে, আর তার ফ্যাকাশে সোনালি আলো ধীরে ধীরে শুকনো ঘাসের মাথা, কাঠের বেড়া, র&#x200d;্যাঞ্চের পুরোনো বাড়ি&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-265094"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/265094/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">2783c33514a154ee3d148b5116b6d1d9</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–ষোল
ভোর হওয়ার আগের সেই শেষ অন্ধকারটা অন্য সব রাতের অন্ধকারের চেয়ে আলাদা। রাত তখন আর গভীর হচ্ছে না, যদিও সকাল এখনও দিগন্তের ওপারে। পূর্ব আকাশের নিচু প্রান্তে কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তারাগুলোর ধার যেন ধীরে ধীরে ভোঁতা হয়ে আসছে। প্রেইরির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাস শুকনো ঘাসের মাথাগুলোকে একবার এদিকে, একবার ওদিকে নুইয়ে দিচ্ছে। দূরে কোনো অচেনা নিশাচর পাখি একবার ডেকে থেমে গেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের বাড়ি, শেড, আস্তাবল আর বেড়ার সারি অন্ধকারের মধ্যে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কয়েক ঘণ্টা আগের গুলির শব্দ এখনও তাদের কাঠের শরীরের ভেতরে জমে আছে।

উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল ওলফ লারসেন। তার ডান হাতে রিভলভার। বাঁ হাতের মুঠোয় ধরা কালচে ধাতব চাকতিটা। লণ্ঠনের হলুদ আলো বাতাসে দুলছিল, আর সেই দুলতে থাকা আলোয় চাকতিটির গায়ে খোদাই করা চিহ্নটা কখনও স্পষ্ট, কখনও অস্পষ্ট হয়ে উঠছিল। শেডের কাঠে যেখানে গুলি লেগেছে, সেখানে এখনও তাজা ক্ষত দেখা যাচ্ছে। কাঠের ছোট ছোট টুকরো মাটিতে ছড়িয়ে আছে। কোথাও কোথাও পোড়া কাঠের গন্ধের সঙ্গে বারুদের গন্ধ মিশে আছে। কয়েকটি ঘোড়া আস্তাবলের ভেতর অস্থিরভাবে পা বদলাচ্ছে। রাতের আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি।

লারসেন ধীরে ধীরে মুঠো খুলে চাকতিটার দিকে তাকাল। একই চিহ্নের আরেকটি চাকতি তার পকেটে রয়েছে। একটা পাওয়া গিয়েছিল আগেই, আরেকটা রেখে গেছে গত রাতের অচেনা লোকটা। এই সামান্য পার্থক্যটাই এখন তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ যদি শুধু ভয় দেখাতে আসত, গুলি চালিয়ে চলে যেত। কেউ যদি ঘোড়া চুরি করতে আসত, ঘোড়াটা নিয়ে পালাত। কিন্তু এই লোকগুলো ঘোড়া নিয়েছে, গুলি চালিয়েছে, আর তার সঙ্গে রেখে গেছে একটা চিহ্ন। এমন কাজ কখনও উদ্দেশ্য ছাড়া হয় না।

বাড ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। তার হাতে এখনও রাইফেল। কয়েক মুহূর্ত সে চাকতিটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “দুটো দেখতে একই রকম।”

লারসেন চাকতিটা আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে শান্ত গলায় বলল, “দেখতে একই। কিন্তু একই জিনিস আর একই অর্থ এক কথা নয়।”

বাড ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি কি মনে করছেন, দুটো আলাদা উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে চাকতিটা লণ্ঠনের আরও কাছে নিয়ে গিয়ে ধাতুর গায়ে জমে থাকা ক্ষীণ দাগগুলো পরীক্ষা করল। তারপর ধীরে বলল, “এখনও জানি না। তবে দুটো একসঙ্গে এখানে আসেনি, এটা আমি নিশ্চিত।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আপনি এই চিহ্ন আগেও দেখেছেন।”

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত তার চোখ স্থির রইল বাডের মুখে। তারপর ধীরে বলল, “হ্যাঁ। বহু বছর আগে।”

বাডের কণ্ঠ নিচু হয়ে এল। “কোথায়?”

লারসেন উত্তর দেওয়ার আগে চারপাশে একবার তাকাল। ক্লে মরগান, রুবেন কোল, মিগুয়েল আর হ্যাঙ্ক ডসনও কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। রাতের গুলির শব্দে সবাই জেগে উঠেছিল, কিন্তু এখন তাদের চোখে ঘুমের কোনো চিহ্ন নেই। প্রত্যেকেই বুঝতে পারছে, লারসেনের হাতে থাকা ছোট্ট ধাতব চাকতিটা গত রাতের হামলার চেয়েও বড় কোনো রহস্যের দরজা খুলে দিয়েছে।

লারসেন ধীরে চাকতিটা মুঠোয় বন্ধ করে বলল, “কোথায় দেখেছিলাম, সেটা এখন বলার সময় হয়নি।”

ক্লে মরগান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “তাহলে জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ।”

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে সামান্য মাথা নাড়িয়ে বলল, “খুব।”

রুবেন কোল নিচু গলায় বলল, “চিহ্নটা কি কোনো দলের?”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “হতে পারে।”

মিগুয়েল এবার জিজ্ঞেস করল, “কোন দলের?”

লারসেন ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলল, “সেটা এখনও জানি না। আর একটা চিহ্ন দেখেই কোনো দলের নাম বলে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।”

ক্লে একটু এগিয়ে এসে বলল, “কিন্তু গত রাতের লোকগুলো এটা ইচ্ছে করেই রেখে গেছে।”

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “সেটা আমি অস্বীকার করছি না।” তারপর সে চাকতিটা আবার লণ্ঠনের আলোয় ধরল। “কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কেন রেখে গেল?”

কেউ কোন উত্তর দিল না। 

প্রেইরির ওপর দিয়ে হঠাৎ একটু জোরে বাতাস বয়ে গেল। লণ্ঠনের শিখা কেঁপে উঠল। শেডের ছায়া কয়েক মুহূর্তের জন্য উঠোনের ওপর লম্বা হয়ে পড়ল, তারপর আবার আগের জায়গায় ফিরে এল। সেই ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা সবাই যেন একই অদৃশ্য প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

লারসেন ধীরে বলল, “আজ রাতের ঘটনা এখানেই শেষ নয়। কিন্তু এখন আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হবে অন্ধকারের মধ্যে ছুটে গিয়ে কাউকে খুঁজতে যাওয়া।”

হ্যাঙ্ক ডসন রাইফেলের বাঁটটা শক্ত করে ধরে বলল, “তাহলে আমরা বসে থাকব?”

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল, “বসে থাকব না। ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করব। আলো হলে মাটি কথা বলবে।”

বাড ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “আপনি পায়ের চিহ্নের কথা বলছেন।”

লারসেন শান্ত গলায় বলল, “পায়ের চিহ্ন, ঘোড়ার খুরের দাগ, ভাঙা ঘাস, মাটির চাপ, সবকিছু। রাতের অন্ধকারে মানুষ অনেক কিছু লুকাতে পারে, কিন্তু ভোরের আলো মাটির স্মৃতি মুছে দেয় না।”

কথাটা শুনে সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

মারদেকা এতক্ষণ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার শরীরের ওপর রাতের ঠান্ডা জমে আছে, কিন্তু সে সেটা অনুভব করছে না। তার চোখ বারবার লারসেনের মুঠোয় থাকা চাকতিটার দিকে চলে যাচ্ছিল। চাকতিটা তার কাছে কেবল অচেনা ধাতব টুকরো নয়। সে বুঝতে পারছে, লারসেন ওটা দেখার পর বদলে গেছে। খুব সামান্য বদল, কিন্তু সেই সামান্য পরিবর্তনই মারদেকার চোখ এড়ায়নি। আগের মতোই লোকটা শান্ত, আগের মতোই তার মুখে কোনো আতঙ্ক নেই, কিন্তু তার চোখে এখন যেন অন্য কোনো সময়ের ছায়া এসে পড়েছে।

ইলাই ধীরে ধীরে মারদেকার পাশে এসে দাঁড়াল। সে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “ঠান্ডা লাগছে?”

মারদেকা মাথা নাড়িয়ে বলল, “না।”

ইলাই তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, ছেলেটা ঠান্ডার কথা ভাবছে না। সে মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কী ভাবছ?”

মারদেকা কিছুক্ষণ লারসেনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “লারসেন চাকতিটা দেখে ভয় পেয়েছেন।”

ইলাই অবাক হয়ে বলল, “তুমি তাই মনে করছ?”

মারদেকা ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু ভয় পেলে মানুষ পিছিয়ে যায়। তিনি পিছিয়ে যাননি।”

ইলাই কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

মারদেকা আবার ধীরে বলল, “তাই হয়তো এটা ঠিক ভয় নয়। তিনি এমন কিছু মনে করেছেন, যেটা আমরা জানি না।”

ইলাই ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কথাটা বয়সের তুলনায় অদ্ভুত পরিণত মনে হলো। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই দূর থেকে লারসেনের গলা শোনা গেল। “মারদেকা।”

ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল।

লারসেন হাতের চাকতিটা পকেটে রেখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “এদিকে এসো।”

মারদেকা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। সবাই একটু সরে দাঁড়াল। লারসেন কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “তুমি কী ভাবছিলে?”

মারদেকা একটু ইতস্তত করে বলল, “আমি ভাবছিলাম, আপনি চাকতিটা দেখে ভয় পেয়েছেন।”

লারসেনের চোখে ক্ষীণ একটা পরিবর্তন দেখা গেল। সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেন?”

মারদেকা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “কারণ চাকতিটা হাতে নেওয়ার পর আপনি আর আগের মতো কথা বলছেন না।”

লারসেন চুপ করে রইল।

মারদেকা এবার নিজের কথাগুলো আরও গুছিয়ে বলতে শুরু করল। “আপনি প্রথমে চিহ্নটার দিকে তাকালেন। তারপর শেডের দিকে তাকালেন। তারপর আস্তাবলের দিকে। তারপর আবার চাকতিটার দিকে। মনে হলো, এই তিনটা জায়গার মধ্যে কোনো সম্পর্ক খুঁজছেন।”

বাডের চোখ এবার বড় হয়ে উঠল। ক্লে মরগানও ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

লারসেন ধীরে বলল, “আর?”

মারদেকা বলল, “বাড যখন জিজ্ঞেস করল চাকতিটা কী, তখন আপনি উত্তর দিতে দেরি করলেন। কিন্তু ক্লে যখন জিজ্ঞেস করল কোথায় দেখেছিলেন, তখনও আপনি জায়গাটার নাম বললেন না। মনে হলো, জায়গাটা আপনি মনে করতে চাইছেন না।”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “তুমি অনেক কিছু লক্ষ্য করেছ।”

মারদেকা মাথা নিচু করে বলল, “আমি শুধু দেখেছি।”

লারসেনের চোখে এবার প্রথমবারের মতো মুগ্ধতার ক্ষীণ ছাপ ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে মারদেকার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “শুধু দেখা আর লক্ষ্য করা এক জিনিস নয়। বেশিরভাগ মানুষ চোখ দিয়ে দেখে, কিন্তু খুব কম মানুষ দেখে কী বদলেছে।”

মারদেকা চুপ করে রইল।

লারসেন আবার বলল, “তুমি যা দেখেছ, সেটা ঠিকভাবে বলেছ। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবে। তুমি যা দেখেছ আর তুমি যা ভেবেছ, এই দুটোকে কখনও এক করে ফেলবে না।”

মারদেকা মাথা তুলে তাকাল।

লারসেন ধীরে বলল, “দেখা জিনিস হলো সত্য। তার অর্থ কী, সেটা হলো অনুমান। অনুমান ভুল হতে পারে।”

মারদেকা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “তাহলে আমি ভুলও হতে পারি?”

লারসেনের মুখে এবার খুব সামান্য হাসি ফুটল। সে মাথা নেড়ে বলল, “অবশ্যই। আমিও পারি।”

বাড বিস্মিত চোখে লারসেনের দিকে তাকাল। লারসেন নিজের ভুলের সম্ভাবনা এত সহজে স্বীকার করে, এটা সে খুব কমই শুনেছে।

মারদেকা আবার চাকতিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে আপনি কি জানেন, এটা কী?”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “আমি কিছু জানি।”

মারদেকা অপেক্ষা করল।

লারসেন ধীরে যোগ করল, “আর কিছু জিনিস জানতে চাই।”

মারদেকা বলল, “যে লোকগুলো এসেছিল, তারা কি এই চিহ্নের জন্য এসেছিল?”

লারসেন এবার তার দিকে গভীরভাবে তাকাল। তারপর ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলল, “হতে পারে। আবার নাও হতে পারে।”

মারদেকা কিছু বলল না।

লারসেন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু তুমি একটা ভালো প্রশ্ন করেছ।”

ছেলেটার চোখে সামান্য আলো ফুটে উঠল।

লারসেন আর কিছু না বলে সরে গেল। কিন্তু তার ভেতরে তখন অন্য একটা চিন্তা জন্ম নিয়েছে।

এতদিন সে মারদেকাকে দেখেছে একটা বুনো ছেলে হিসেবে, যে পাহাড়ি গ্রাম থেকে পালিয়ে এসে শহরে আশ্রয় নিয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে তার মধ্যে সাহস দেখেছে, শারীরিক ভারসাম্য দেখেছে, বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা দেখেছে। সে ভেবেছিল, ছেলেটাকে অস্ত্র ধরতে শেখানো যাবে। পায়ের অবস্থান শেখানো যাবে। চোখ ও হাতের সমন্বয় শেখানো যাবে।

কিন্তু আজ প্রথমবার সে অন্য কিছু দেখল। মারদেকা মানুষকে দেখছে। শুধু মানুষ নয়, মানুষের আচরণের ছোট ছোট পরিবর্তনও দেখছে। আর সেটা কোনো শিক্ষক তাকে শেখায়নি।

লারসেনের মনে হলো, এই ক্ষমতাটা যদি ঠিকভাবে তৈরি করা যায়, তাহলে একদিন ছেলেটা এমন কিছু দেখতে পারবে যা একজন অভিজ্ঞ বন্দুকবাজও চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। সে সিদ্ধান্তটা তখনই নেয়নি। কিন্তু সিদ্ধান্তের বীজটা তার মনে গেঁথে গেল।

এদিকে বাড শেডের দিকে এগিয়ে গিয়ে কাঠের ক্ষত পরীক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, “গুলির দিকটা দেখেছি। ও শেডের আড়াল থেকে গুলি চালিয়েছে। খুব বেশি সময় এখানে ছিল না।”

ক্লে মরগান যোগ করল, “আমি পশ্চিম দিকের মাটিতে দুই ধরনের বুটের দাগ পেয়েছি।”

লারসেনের চোখ এবার আস্তাবলের দিকে গেল। কয়েক মুহূর্ত সে কিছু বলল না। তারপর ধীরে বলল, “ঘোড়াটা তারা নিয়েছে।”

বাড বলল, “হ্যাঁ।” 

“কিন্তু ঘোড়াটাই তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল না।”

বাড তাকিয়ে রইল।

লারসেন আবার বলল, “যদি শুধু ঘোড়া নিতে আসত, তাহলে গুলি চালানোর প্রয়োজন ছিল না। আর যদি শুধু আমাদের ভয় দেখাতে আসত, তাহলে ঘোড়াটা নিয়ে যেত না।”

ক্লে মরগান বলল, “তাহলে তারা কী চেয়েছিল?”

লারসেন ধীরে পকেটের ওপর হাত রাখল। “এখনও জানি না।” তারপর একটু থেমে যোগ করল, “কিন্তু তারা কিছু খুঁজছিল।”

বাডের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “কী?”

লারসেন উত্তর দিল না। সে ধীরে মাথা তুলে প্রেইরির দিকে তাকাল। 

দিগন্তের নিচে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। অন্ধকারের কালো রং ধীরে ধীরে নীলচে হয়ে আসছে। দূরের পাহাড়ের গায়ে আলো পড়েনি এখনও, কিন্তু তাদের চূড়াগুলো আকাশের পটভূমিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির বাতাসে কাঁপছে। আস্তাবলের ভেতর একটা ঘোড়া নাক ঝেড়ে আবার পা বদলাল।

রাত শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু লারসেন জানে, আসল রাত এখনও শেষ হয়নি। সে ধীরে বলল, “ভোর হলে মাটির চিহ্নগুলো দেখা হবে। কেউ এখন র&#x200d;্যাঞ্চের বাইরে যাবে না।” 

বাড মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে।”

লারসেন একবার মারদেকার দিকে তাকাল। ছেলেটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু ঘুম নেই। সে আবারও চারপাশের মাটি, শেড, আস্তাবল আর বেড়ার দিকে তাকাচ্ছে।

লারসেন কিছুক্ষণ তাকে দেখল। তারপর মনে মনে বলল, এই ছেলেটাকে আমি এতদিন যতটা দেখেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু তার ভেতরে আছে। সে এখনও জানে না, সেই ক্ষমতা তাকে কোথায় নিয়ে যাবে।

কিন্তু গত রাতের চাকতি আর মারদেকার কয়েকটি প্রশ্ন তাকে একই সঙ্গে একটা কথা বুঝিয়ে দিয়েছে। র&#x200d;্যাঞ্চকে রক্ষা করার জন্য শুধু বন্দুকধারী লোক যথেষ্ট নয়। তাদের মধ্যে এমন একজনও দরকার, যে অন্ধকারের মধ্যে অন্যরা যা দেখতে পায় না, সেটা দেখতে পারে।

লারসেন পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে চাকতিটা শক্ত করে ধরল। তারপর ধীরে বলল, “আজ অনেক কাজ আছে।”

মারদেকা তার দিকে তাকাল। লারসেন আর কিছু বলল না। দুজনের মাঝখানে ভোরের প্রথম আলো এসে পড়ছিল।

আর লারসেনের মনে তখন বহু বছরের পুরোনো একটা দরজা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছিল, যার ওপারে ছিল এক মৃত মানুষের রক্ত, একটা অচেনা চিহ্ন, আর এমন এক গল্প, যেটা সে ভেবেছিল বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে।

কিন্তু গত রাত প্রমাণ করেছে, গল্পটা শেষ হয়নি। কেউ সেই গল্পের পরের অধ্যায় লিখতে আবার ফিরে এসেছে।

ভোরের প্রথম আলো যখন র&#x200d;্যাঞ্চের কাঠের বাড়িটার ছাদের কিনারা ছুঁয়ে উঠল, তখন রাতের অন্ধকার আর এক লাফে সরে গেল না। বরং ধীরে ধীরে পিছু হটতে লাগল, যেন প্রেইরির ওপর থেকে বিদায় নেওয়ার আগে শেষবারের মতো চারপাশটা দেখে নিতে চাইছে। শেডের দেয়ালে গুলির ক্ষতগুলো এখন আরও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কাঠের ফাঁটল থেকে ছিটকে বেরিয়ে থাকা তন্তুগুলো সোনালি আলোয় চিকচিক করছে। উঠোনের মাটিতে রাতের পায়ের ছাপ, ঘোড়ার খুরের দাগ আর ছড়িয়ে থাকা কাঠের টুকরোগুলো এমনভাবে পড়ে আছে, যেন কয়েক ঘণ্টা আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এখনও শেষ হয়নি।

লারসেন বাড়ির পেছনের বারান্দা থেকে ধীরে নিচে নামল। রাতভর প্রায় চোখ বন্ধ করেনি সে, তবু তার হাঁটার ভঙ্গিতে ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই। শুধু মুখটা আগের চেয়ে কঠিন। পকেটের ভেতর রাখা ধাতব চাকতিটা হাঁটার সঙ্গে সামান্য নড়ে উঠছিল, আর প্রতিবার সেই নড়াচড়া অনুভব করলেই তার মনে এলি ব্রুকসের মুখটা আবার ভেসে উঠছিল।

ব্ল্যাক রিভারের মার্শাল খুব কম কথার মানুষ ছিল। যে মানুষ নিজের অফিসে দরজা বন্ধ করে কাউকে ডাকে, সে সাধারণত এমন কিছুই বলে, যা বাইরে ছড়িয়ে পড়ার মতো নয়। এলি তখন মানচিত্রের ওপর তিনটি জায়গা দেখিয়েছিল। তিনটি উঁচু জায়গা, যেখান থেকে দূর পর্যন্ত নজর রাখা যায়। আর সেই তিনটি জায়গাকে কল্পনায় যুক্ত করলে মাঝখানে এসে পড়ে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ।

তার মনে আবার এলি ব্রুকসের অফিসঘর ভেসে উঠল। দেয়ালের মানচিত্রে তিনটি পয়েন্ট। সেই তিনটি জায়গার মাঝখানে তার র&#x200d;্যাঞ্চ। এলির গলায় সেই সতর্কতা, আগে জায়গা দেখছে, মানুষের অভ্যাস বুঝছে, তারপর সিদ্ধান্ত নেবে।

শহরের বাইরে যে লোকগুলো কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘুরছিল, পশ্চিমের ফেরিঘাট দিয়ে যারা এসেছিল, আর গত রাতে যারা লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে ঢুকেছিল, তাদের মধ্যে কোনো না কোনো যোগসূত্র আছে।

সেদিন কথাগুলো শুনে লারসেন সতর্ক হয়েছিল। কিন্তু ভয় পায়নি। তারপর এসেছিল সিল মারা খাম।

তারপর সেই সিল মারা খাম। চিঠিটা সে কাউকে দেখায়নি। এমনকি বাডকেও নয়। কারণ এলি যে কথাগুলো লিখেছিল, সেগুলো এমন ছিল না যে কাউকে পড়ে শোনানো যায়। সেখানে নিশ্চিত কোনো নাম ছিল না, কোনো দলের উল্লেখও ছিল না। ছিল শুধু কিছু সন্দেহ, কিছু পুরোনো ঘটনার ইঙ্গিত আর একটা সতর্কতা, যা তখন লারসেন পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।

চিঠির কয়েকটি লাইন। ওরা হয়তো তোমার জমি চায় না। তোমার জমির চেয়েও পুরোনো কোনো জিনিসের জন্য ওরা ফিরে এসেছে। 

লারসেনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে তখনও বুঝতে পারেনি, এলি কী বোঝাতে চেয়েছিল। এখন চাকতিটা হাতে নিয়ে তার মনে হচ্ছে, সেই কথার ভেতরে হয়তো আরও কিছু ছিল।

এলি চিঠিতে সবকিছু লিখতে পারেনি। হয়তো পারেনি, কারণ সে জানত, বার্তাটা ভুল হাতে পড়তে পারে। হয়তো সে নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল না। কিন্তু একটা বিষয় এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই।

এখন সে বুঝতে শুরু করেছে। হয়তো। এই ‘হয়তো’ শব্দটাই তাকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলছিল।

তার পেছনে কয়েক পা দূরে মারদেকা হাঁটছিল। ছেলেটা কিছু বলছিল না। রাতের ঘটনার পর থেকে সে যেন আরও চুপচাপ হয়ে গেছে, কিন্তু তার চোখ আগের চেয়ে বেশি কাজ করছে। সে হাঁটার সময় মাটির দিকে তাকাচ্ছে, আবার মাথা তুলে শেডের দেয়াল, আস্তাবলের দরজা আর বেড়ার দিকে তাকাচ্ছে। যেন প্রতিটি জিনিসের মধ্যে কোনো অদৃশ্য সুতো খুঁজছে।

উত্তরের বেড়ার কাছে বাডকে দেখা গেল। এক হাঁটু মাটিতে, হাতে রাইফেল। সে কিছুক্ষণ একটা পায়ের ছাপ পরীক্ষা করে উঠে দাঁড়াল, তারপর কয়েক গজ এগিয়ে আবার নিচু হলো। ভোরের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা চিহ্নগুলো একে একে বেরিয়ে আসছিল।

লারসেন কাছে গিয়ে থামল। মাটির দিকে তাকিয়েই সে বলল, “কী বলছে মাটি?”

বাড নিচের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “লোকটা এই দিক দিয়ে বেরিয়েছে। বেড়ার কাছে এসে দৌড়ের গতি কমেছে।”

লারসেন হাঁটু গেড়ে বসে পায়ের চিহ্নগুলো পরীক্ষা করল। শুকনো মাটিতে বুটের গোড়ালির দাগ কয়েক জায়গায় গভীর, কিন্তু বেড়ার একেবারে কাছে এসে চাপ হঠাৎ হালকা হয়ে গেছে।

সে ধীরে বলল, “লাফ দিয়েছে।”

বাড মাথা নেড়ে বলল, “আমারও তাই মনে হচ্ছে।”

লারসেন বেড়ার ওপারের ঘাসের দিকে তাকাল। শিশির এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। কয়েকটা ঘাসের ডগা ভাঙা, কিছু নিচের দিকে চাপা। কিন্তু তার পরেই চিহ্নগুলো প্রায় মিলিয়ে গেছে। লোকটা জানত কীভাবে মাটির ওপর নিজের উপস্থিতি যতটা সম্ভব কমিয়ে ফেলতে হয়।

বাড এবার লারসেনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আরেকটা জিনিস আছে।”

লারসেন মাথা তুলল।

বাড পশ্চিম দিকের বেড়ার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “সেদিন যে চামড়ার টুকরোটা পেয়েছিলাম, সেটা কি এখনও আপনার কাছে আছে?”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর পকেট থেকে রুমালে মোড়া সরু একটা জিনিস বের করল। রুমাল খুলতেই কালচে চামড়ার ফালিটা দেখা গেল। বয়সে শক্ত হয়ে গেছে, এক প্রান্ত ছেঁড়া। মাঝখানে এমন একটা ক্ষীণ দাগ, যা প্রথম দেখায় সাধারণ আঁচড় বলেই মনে হয়।

“ফেলে দিইনি,” লারসেন বলল।

বাড মৃদু গলায় বলল, “আমি ভেবেছিলাম আপনি রাখবেন।”

লারসেন চামড়াটার দিকে তাকিয়ে বলল, “কিছু জিনিস ফেলে দিতে নেই।”

মারদেকা একটু কাছে এগিয়ে এল। লারসেন তাকে থামাল না। বরং চামড়ার টুকরোটা সকালের আলোয় এমনভাবে ধরল, যাতে ছেলেটাও দেখতে পারে।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইল।

লারসেন পকেট থেকে ধাতব চাকতিটা বের করে চামড়ার পাশে রাখল। প্রথমে দুটির মধ্যে কোনো মিল বোঝা গেল না। কিন্তু চামড়াটা সামান্য ঘুরিয়ে ধরতেই ক্ষীণ রেখাগুলো এমনভাবে মিলতে শুরু করল যে মাঝখানের নকশাটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠল।

মারদেকা নিচু গলায় বলল, “এটা পুরো চিহ্ন নয়।”

লারসেন তার দিকে তাকাল।

ছেলেটা আবার চামড়াটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ছেঁড়া অংশের সঙ্গে চিহ্নের একটা অংশও চলে গেছে।”

বাড বিস্মিত হয়ে চামড়াটার দিকে ঝুঁকে পড়ল।

লারসেন কিছু বলল না। সে শুধু চামড়ার ছেঁড়া প্রান্ত আর চাকতির চিহ্নের বাঁকগুলো পাশাপাশি মিলিয়ে দেখল।

মারদেকার কথা ঠিক।

বাড ধীরে বলল, “তাহলে চামড়াটা এই চিহ্নের সঙ্গে যুক্ত।”

লারসেন এবার দ্বিতীয় চাকতিটাও বের করল। দুটো ধাতব টুকরো পাশাপাশি রাখতেই একই চিহ্ন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

বাতাসের সঙ্গে শুকনো ঘাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না।

মারদেকা আবার চামড়াটার দিকে তাকিয়ে বলল, “চিহ্নটা শুধু পুরোনো হয়ে মুছে যায়নি।”

লারসেন এবার চোখ তুলে তার দিকে তাকাল।

ছেলেটা বলল, “কেউ ঘষেছে।”

লারসেন চামড়াটা আঙুলের ডগায় উল্টেপাল্টে দেখল। সত্যিই দাগের চারপাশে সূক্ষ্ম ঘষার রেখা রয়েছে। চামড়ার স্বাভাবিক ক্ষয় একরকম, আর চিহ্নের ওপরের ক্ষয় অন্যরকম।

সে ধীরে বলল, “ঠিক বলেছ।”

বাড এবার গম্ভীর হয়ে উঠল। “কেউ চিহ্নটা মুছে ফেলতে চেয়েছিল।”

লারসেন শান্তভাবে বলল, “কিন্তু পুরোপুরি পারেনি।”

তার কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা ছিল না। বরং এমন এক শান্ত ভাব ছিল, যা বাডকে আরও চিন্তিত করে তুলল।

লারসেন চামড়াটা আবার পকেটে রাখল। তারপর দুটো চাকতি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

একটার প্রান্তে মরচে বেশি। অন্যটার গায়ে নতুন আঁচড়। একটা যেন বহু বছর ধরে কোথাও লুকিয়ে ছিল। অন্যটা এসেছে গত রাতের অচেনা লোকের হাত থেকে।

বাড বলল, “দুটো একসঙ্গে তৈরি হয়নি।”

লারসেন ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “সম্ভবত নয়।”

“তাহলে এত বছর পর একই চিহ্ন আবার কেন?”

লারসেন উত্তর দিল না। তার চোখের সামনে আবার এলি ব্রুকসের অফিসটা ভেসে উঠল। টেবিলের ওপর খালি কার্তুজ। দেয়ালের মানচিত্র। পশ্চিমের ফেরিঘাট দিয়ে আসা চারজন অচেনা ঘোড়সওয়ার। আর সেই চিঠি।

চিঠির শেষ অংশটা সে বহুবার পড়েছে। যদি ওরা সত্যিই সেই পুরোনো পথ ধরে এগোয়, তাহলে তোমার র&#x200d;্যাঞ্চের আশপাশে যা আছে, তার দিকে নজর রেখো। আমি নিশ্চিত নই ওরা জমির জন্য এসেছে, না জমির নিচে বা অতীতে লুকিয়ে থাকা অন্য কিছুর জন্য।

তখন কথাগুলো তার কাছে অস্পষ্ট ছিল। তবে আজ নয়। আজ সে প্রথমবার অনুভব করল, এলি হয়তো এই চিহ্নের কথা জানত। অথবা অন্তত শুনেছিল। কিন্তু সে নিশ্চিত ছিল না। তাই নাম লেখেনি। লারসেনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

মারদেকা তখনও চাকতি দুটির দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ পর সে বলল, “যে লোকটা গত রাতে এসেছিল, সে জানত এগুলোর একটা আমাদের কাছে আছে।”

বাড তার দিকে তাকাল। লারসেনও তাকাল।

মারদেকা এবার ধীরে বলল, “নইলে দ্বিতীয়টা এখানে রেখে যাওয়ার দরকার ছিল না।”

কেউ কিছু বলল না।

ছেলেটা আবার বলল, “সে যদি শুধু ভয় দেখাতে চাইত, গুলি করেই চলে যেতে পারত।”

লারসেনের চোখে ক্ষীণ একটা পরিবর্তন দেখা গেল।

মারদেকা বলল, “আর যদি শুধু ঘোড়া নিতে আসত, তাহলে চাকতিটা রেখে যেত না।”

বাড এবার পুরোপুরি ছেলেটার দিকে ফিরল।

মারদেকা একটু থেমে যোগ করল, “হয়তো সে চায় আমরা বুঝি, আগের চাকতিটা ভুলে যাইনি।”

লারসেন ধীরে চাকতি দুটো মুঠোয় বন্ধ করল। এই কথাটা সে নিজেও ভাবছিল। কিন্তু অন্য কারও মুখে শোনেনি।

এত অল্প বয়সে ছেলেটা ঘটনাগুলোকে শুধু আলাদা আলাদা করে দেখছে না। সে তাদের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজছে।

লারসেনের মনে সেই বীজটা আরও গভীরে বসে গেল। সে ধীরে বলল, “তুমি একটা জিনিস বুঝতে শুরু করেছ।”

মারদেকা তার দিকে তাকাল। “কী?”

লারসেন বলল, “ঘটনা কখনও একা আসে না। মানুষ আলাদা আলাদা চিহ্ন রেখে যায়, কিন্তু যারা মন দিয়ে দেখে, তারা বুঝতে পারে কোন চিহ্নগুলো একই পথের।”

মারদেকা কিছু বলল না।

লারসেন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই ক্ষমতা বন্দুকের চেয়েও বিরল।”

বাডের চোখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠল। লারসেন খুব কম মানুষকেই এমন কথা বলে।

দূরে বাড়ির পেছন থেকে ইলাইয়ের গলা শোনা গেল। সকালের খাবার তৈরি। কফির ধোঁয়া ঠান্ডা বাতাসে ভেসে উঠছে। র&#x200d;্যাঞ্চের অন্য লোকেরা নিজেদের কাজে ছড়িয়ে পড়ছে। ক্লে মরগান বেড়ার ভাঙা অংশ পরীক্ষা করছে। রুবেন কোল শেডের গুলির ক্ষত দেখছে। মিগুয়েল আস্তাবলের দরজা মেরামত করছে। বাইরে থেকে সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

কিন্তু লারসেন জানে, স্বাভাবিকতা এখন শুধু একটা পাতলা পর্দা।

সে পকেটে চাকতি দুটো রাখল। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “আজ কেউ র&#x200d;্যাঞ্চের সীমানা পেরোবে না। পশ্চিমের পাহাড়, নদীর পথ, উত্তর দিকের পুরোনো রাস্তা, সব জায়গায় চোখ থাকবে।”

বাড মাথা নেড়ে বলল, “আমি লোক ভাগ করে দিচ্ছি।”

লারসেন বলল, “কাউকে অনুসরণ করবে না।”

বাড থেমে তার দিকে তাকাল।

লারসেন শান্তভাবে যোগ করল, “এলি ব্রুকসও একই কথা বলেছিল।”

বাডের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। এতদিন পর প্রথমবার লারসেন নিজে থেকে মার্শালের নাম উচ্চারণ করল। সে আর কিছু বলল না। কিন্তু এটা বুঝল, ব্ল্যাক রিভার শহরের ঘটনাগুলো আর গত রাতের হামলা এখন লারসেনের মনে একসঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে।

লারসেন বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। মারদেকা তার পাশে এল।

বারান্দার সিঁড়িতে ওঠার আগে লারসেন থামল। পকেট থেকে একটা চাকতি বের করল। কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে ছেলেটার হাতে দিল।

মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল। 

লারসেন ধীরে বলল, “এটা রাখো।”

ছেলেটা ঠান্ডা ধাতব চাকতিটা মুঠোয় নিল।

“কাউকে দেখাবে না,” লারসেন বলল।

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে যোগ করল, “আর যদি কেউ জিজ্ঞেস করে?”

মারদেকা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “যা বলার দরকার নেই, সেটা বলব না।”

লারসেনের মুখে খুব সামান্য হাসি ফুটল। “ঠিক।” তারপর সে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে এখন শুধু একটা ধাতব চাকতি নেই। সে বুঝতে পারছে না কেন লারসেন তাকে এটা দিল, কিন্তু এটুকু বুঝতে পারছে, লোকটা তাকে আগের মতো দেখছে না।

দূরে বাড দাঁড়িয়ে ছিল। সে একবার মারদেকার হাতে থাকা চাকতিটার দিকে তাকাল, তারপর ছেলেটার মুখের দিকে। কিছু বলল না।

সূর্য তখন পুরোপুরি প্রেইরির ওপর উঠে এসেছে। রাতের অন্ধকার সরে গেছে। শিশির শুকাতে শুরু করেছে। ঘাসের ডগায় আলো জমেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের মানুষগুলো আবার নিজেদের কাজে ফিরে গেছে। 

কিন্তু লারসেন জানে, আসল কাজ এখনই শুরু হয়েছে। ব্ল্যাক রিভারের মার্শাল যে অদৃশ্য ছায়ার কথা বলেছিল, সেই ছায়া এখন আর দূরের পাহাড়ে নেই। সে এসে দাঁড়িয়েছে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে।

একটা পুরোনো চামড়ার টুকরো। দুটো কালচে ধাতব চাকতি। একটা সিল মারা চিঠি। 
আর গত রাতের গুলির দাগ। এগুলো আর আলাদা আলাদা ঘটনা নয়। লারসেন এখন সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, এই সত্যের প্রথম সুতোটা ধরতে তাকে সাহায্য করেছে এমন এক ছেলে, যাকে কয়েক মাস আগেও সে শুধু আশ্রয় দেওয়া এক বুনো পাহাড়ি ছেলে বলেই চিনত।

বারান্দার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে লারসেন একবার পেছনে তাকাল। মারদেকা এখনও সেখানে দাঁড়িয়ে। তার মুঠোয় চাকতিটা। চোখে প্রশ্ন।

আর সেই প্রশ্নের ভেতরে এমন এক মনোযোগ, যা লারসেনের বহু বছরের অভিজ্ঞতাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। সে ধীরে ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করল। বাইরে প্রেইরি আগের মতোই শান্ত। দূরের পাহাড় নীলচে কুয়াশার মতো স্থির।

আকাশে কোনো মেঘ নেই।  কিন্তু সেই শান্ত দৃশ্যের নিচে বহু বছর আগের এক পুরোনো গল্প আবার নড়েচড়ে বসেছে। আর লারসেন এখন জানে, এবার সেই গল্পের শেষটা না জেনে তার আর থেমে থাকার উপায় নেই।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/264894/</link>
				<pubDate>Sun, 23 Aug 2026 11:50:11 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–ষোল<br />
ভোর হওয়ার আগের সেই শেষ অন্ধকারটা অন্য সব রাতের অন্ধকারের চেয়ে আলাদা। রাত তখন আর গভীর হচ্ছে না, যদিও সকাল এখনও দিগন্তের ওপারে। পূর্ব আকাশের নিচু প্রান্তে কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তারাগুলোর ধার যেন ধীরে ধীরে ভোঁতা হয়ে আসছে। প্রেইরির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাস শুকনো ঘাসের মাথাগুলোক&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-264894"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/264894/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">f6a3edfb2798d61cb452ac69cff7ba0d</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–পনের
মারদেকা উত্তরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দূরে কোথাও সেই ঘোড়ার ক্ষীণ হ্রেষাধ্বনি আর শোনা যাচ্ছে না। কেবল মাঝে মাঝে বাতাস শুকনো ঘাসের মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, আর তাতে ঘাসগুলো একসঙ্গে সরে গিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসছে। র&#x200d;্যাঞ্চের বাড়ির বারান্দায় লণ্ঠনের হলুদ আলো জ্বলছে। সেই আলো থেকে কয়েক গজ দূরেই অন্ধকার এত ঘন যে তার ভেতরে কী আছে বোঝা কঠিন।

টোকার শব্দে লারসেন দরজা খোলে বারান্দায় বেরিয়ে এলো। হাতে রিভলবার। মারদেকাকে দেখেই প্রশ্ন ছুড়লো, “তুমি ভেতরে যাওনি?” 

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিল না। সে আরও একবার উত্তরের দিকে তাকিয়ে তারপর বলল, “ওরা আমাদের একটা ঘোড়া নিয়ে গেল।” 

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ওরা কি তবে এজন্যই এসেছিল?”

মারদেকার চোখ অন্ধকারের দিকে। সে ধীরে বলল, “ওরা ঘোড়াটা নিয়ে গেছে, পাশাপশি চিহ্ন লুকানোর চেষ্টা করেছে। তবে সেটা তত জোরেসোরে নয়।” 

শব্দ শুনে ততক্ষণে বাডও চলে এসেছে। তার হাত থেকে রাইফেল ঝুলছে। মারদেকার কথা তার কানেও গেছে। বুঝতে পারলো ছেলেটা ভুল কিছু দেখেনি। বলল, “মনে হচ্ছে ওরা ইচ্ছে করেই চাইছে, যাতে আমরা বুঝতে পারি ঘোড়াটা র&#x200d;্যাঞ্চের বাইরে গেছে।” 

লারসেন কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, “ঠিক তাই। এটা চুরি নয়, বাড। এটা একটা বার্তা।”

মারদেকা এবার লারসেনের দিকে তাকাল। “কীসের বার্তা?” 

লারসেন তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটার মুখে ভয় আছে, কিন্তু সেই ভয় তাকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে না। বরং তার চোখে প্রশ্ন। লারসেন ধীরে বলল, “ওরা বুঝাতে চাইছে যেন আমরা জানি, ওরা চাইলে র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতর থেকে কিছু নিয়ে যেতে পারে।” 

কথাটা শুনে মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর তার চোখ আবার অন্ধকারের দিকে চলে গেল।

বাড রাইফেলের নলটা সামান্য নামিয়ে বলল, “আর তীরটা?” 

লারসেনের মুখ আরও শক্ত হয়ে গেল। সে বারান্দার সেই কাঠের খুঁটির দিকে তাকাল, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও তীরটা গেঁথে ছিল। তারপর বলল, “তীরটা ছিল দ্বিতীয় বার্তা।” 

মারদেকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। লারসেন সাধারণত নিশ্চিত না হয়ে কোন কথা বলে না। 

হঠাৎ আস্তাবলের ভেতর থেকে একটা ঘোড়া জোরে পা ঠুকল। কাঠের মেঝেতে খুরের শব্দ উঠল। তারপর আরেকটা ঘোড়া অস্থির হয়ে উঠল। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। বাডও তাকাল। লারসেন হাতের রিভলভার শক্ত করে ধরল। কয়েক মুহূর্ত পর সব আবার শান্ত হয়ে গেল।

মারদেকা ধীরে বলল, “ঘোড়াগুলো এখনও অস্থির।” 

বাড তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। ওরা কিছু টের পেয়েছে।” 

মারদেকা একটু ভেবে বলল, “কিন্তু এবার আগের মতো নয়।” 

বাড ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে?” 

মারদেকা আস্তাবলের দিকে তাকিয়েই বলল, “আগে একটা ঘোড়া ভয় পেয়েছিল, তারপর অন্যগুলো। এখন ওরা শুধু নড়ছে। যেন বাইরে কিছু আছে, কিন্তু সেটা কাছে আসছে না।”

লারসেনের চোখে ক্ষীণ একটা আগ্রহ ফুটে উঠল। সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি এখন শব্দের পার্থক্যও ধরতে পারছ।” 

মারদেকা কোনো উত্তর দিল না। সে নিজেও বুঝতে পারছিল না ঠিক কীভাবে সে ব্যাপারটা বুঝেছে। কয়েক মাস আগে এমন প্রশ্ন করলে হয়তো সে শুধু ঘোড়াগুলো ভয় পেয়েছে বলত। এখন সে শব্দের ভেতরের পার্থক্য শুনতে চেষ্টা করে।

বাড ধীরে রাইফেলটা নামিয়ে বলল, “আজ রাতে আর কাউকে বাইরে যেতে দেওয়া ঠিক হবে না।” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “ঠিক বলেছ।” তারপর সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি আজ আমার সাথেই থাকবে।” 

মারদেকা মাথা নাড়ল, কিন্তু যাওয়ার আগে আবার উত্তরের দিকে তাকাল। সেখানে এখন কিছুই নেই। শুধু অন্ধকার।

তারা তিনজন ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের রাতের শব্দ কিছুটা ম্লান হয়ে গেল। রান্নাঘরের আগুন প্রায় নিভে এসেছে। ইলাই তখন শেষবারের মতো একটা পাত্র সরিয়ে রেখে তাদের দিকে তাকাল। তার চোখ প্রথমে লারসেনের হাতে থাকা রিভলভারে, তারপর বাডের রাইফেলে গিয়ে থামল। সে কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু বুঝতে পারল, রাতটা স্বাভাবিক নয়।

লারসেন টেবিলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাড রাইফেলটা দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখল না, বরং নিজের হাতের নাগালেই রাখল। 

ইলাই ধীরে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?” 

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “উত্তরের দিকে কিছু অস্বাভাবিক নড়াচড়া হয়েছিল।” 

ইলাই আর প্রশ্ন করল না। সে মারদেকার মুখের দিকে তাকাল। ছেলেটার চোখে তখনও বাইরের অন্ধকারের ছাপ।

মারদেকা একটা চেয়ার টেনে বসতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ থেমে গেল। তার মনে পড়ল কিছু একটা। সে লারসেনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি একটা জিনিস দেখেছিলাম।” 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “কী?” 

মারদেকা একটু ভেবে বলল, “উত্তরের বেড়ার কাছে যে কালো দাগটা পেয়েছিলাম, তার গন্ধ ঘোড়ার জিনে ব্যবহার করা তেলের মতো ছিল।” বাড তাকাল তার দিকে। লারসেনও স্থির হয়ে গেল।

বাড ধীরে বলল, “তুমি নিশ্চিত?” 

মারদেকা মাথা নাড়ল। “গন্ধটা আগে পেয়েছি। আস্তাবলে।” 

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর লারসেনের দিকে তাকাল।

“তাহলে লোকটা ঘোড়ার জিনের ব্যাপারে জানে।” লারসেন বলল, “অথবা সে এমন জায়গা থেকে এসেছে যেখানে এই ধরনের তেল ব্যবহার করা হয়।” 

কথাটা শুনে ঘরের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।

ইলাই ধীরে মারদেকার পাশে এসে দাঁড়াল। সে ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে বলল, “তুমি আজ অনেক কিছু দেখেছ।” 

মারদেকা নিচু গলায় বলল, “আমি শুধু যা দেখেছি সেটাই বলেছি।” 

ইলাই মৃদু স্বরে বলল, “সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যা দেখেছ, তার বাইরে গিয়ে কিছু ধরে নিও না।” 

মারদেকা মাথা তুলল। 

লারসেনও ইলাইয়ের দিকে তাকাল। কথাটা সাধারণ হলেও এর মধ্যে এমন একটা শিক্ষা ছিল, যা সে নিজেও মারদেকাকে দিতে চাইত। সে ধীরে চেয়ার টেনে বসল। তারপর মারদেকার দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ তুমি একটা জিনিস ভালো করেছ।” 

মারদেকা চুপ করে রইল। লারসেন বলল, “তুমি ভয় পেয়েছিলে, কিন্তু ভয় তোমাকে অন্ধ করেনি।” 

মারদেকা কিছু বলল না। লারসেন আবার বলল, “মনে রেখো, ভয় থাকা খারাপ নয়। ভয়কে না বোঝাই খারাপ।”

বাড এবার মৃদু হেসে বলল, “আর একটা কথা মনে রাখবে। অন্ধকারে যে জিনিসটা নড়ছে, সেটা সবসময় শত্রু নয়।” 

মারদেকা তার দিকে তাকাল। বাড বলল, “কখনও কখনও সেটা শুকনো ঘাসও হতে পারে।” 

মারদেকার মুখে খুব সামান্য হাসি ফুটল। কিন্তু লারসেন হাসল না। সে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।

বাইরে বাতাস একটু বেড়েছে। জানালার কাঠের পাল্লা খুব সামান্য কেঁপে উঠল। তারপর আবার স্থির। দূরে কোথাও একটা নিশাচর পাখি ডাকল। তার পরেই অনেক দূর থেকে ঘোড়ার খুরের অস্পষ্ট শব্দ ভেসে এল। একবার। তারপর থেমে গেল।

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল। বাডও শুনেছে। লারসেন চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত শব্দটার দিক বোঝার চেষ্টা করল। তারপর বলল, “পশ্চিমে।” 

বাড মাথা নাড়ল। “অনেক দূরে।” 

মারদেকা ধীরে বলল, “দুটো ঘোড়া।” 

বাড এবার তার দিকে তাকিয়ে মৃদু বিস্মিত হলো। সে নিজেও শুনেছিল, কিন্তু শব্দ এত ক্ষীণ যে আলাদা করা কঠিন।

লারসেন উঠে দাঁড়াল। “আজ রাতটা আমরা পাহারা দেব।” 

বাড রাইফেল তুলে নিল। “আমি প্রথম পালা নেব।” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “না। প্রথম পালা আমি নেব।” বাড আপত্তি করতে যাচ্ছিল, কিন্তু লারসেন হাত তুলে থামিয়ে দিল। “তুমি সারাদিন কাজ করেছ। ভোরের আগে তোমারও দরকার হবে।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল। 

লারসেন মারদেকার দিকে তাকিয়ে বলল, “আর মারদেকা থাকবে আমার সঙ্গে।” 

রাত আরও গভীর হয়ে গেল। র&#x200d;্যাঞ্চের ঘরগুলো একে একে নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। রান্নাঘরের আগুন নিভে গেছে অনেকক্ষণ আগে। ইলাই নিজের ঘরে চলে গেছে। বাডও শেষ পর্যন্ত লারসেনের কথামতো রাইফেলটা পাশে রেখে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। সারাদিনের পরিশ্রমে তার শরীর ক্লান্ত ছিল, কিন্তু ঘুম গভীর হওয়ার আগেই ভোরের পাহারার কথা তার মনে গেঁথে ছিল। লারসেন জানত, ভোরের আগে তাকে জাগাতে হবে না। সময় হলে বাড নিজেই উঠে যাবে।

লারসেন বাড়ির পেছনের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে রিভলভার, কিন্তু অস্ত্রটা নিচু করে রাখা। সে বাইরে তাকিয়ে ছিল এমনভাবে, যেন শুধু চোখ দিয়ে নয়, পুরো রাতটাকেই পড়ার চেষ্টা করছে। জানালার কাঁচে তার নিজের মুখের অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে বাতাসের ধাক্কায় জানালার পাল্লা সামান্য কেঁপে উঠছিল। প্রতিবারই লারসেনের চোখ সেদিকে চলে যাচ্ছিল, তারপর আবার অন্ধকারের দিকে ফিরে আসছিল।

মারদেকা ঘরের অন্য পাশে বসে ছিল। তার সামনে একটা ছোট কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর একটা নিভু নিভু লণ্ঠন জ্বলছে। সে কথা বলছিল না। 

কিছুক্ষণ পর লারসেন জানালা থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, “ঘুম আসছে?” 

মারদেকা মাথা নাড়ল, “না।” 

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “ঘুমানোর চেষ্টা করো।” 

মারদেকা ধীরে বলল, “বাইরে যদি কেউ থাকে?” 

লারসেন শান্ত গলায় বলল, “তাহলে সে এখনো জানে না আমরা তাকে দেখেছি।” 

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আর যদি সে জানে?” 

লারসেনের ঠোঁট সামান্য শক্ত হলো। সে বলল, “তাহলে সে আরও সাবধানে চলবে।”

মারদেকা কথাটার অর্থ বুঝতে চেষ্টা করল। 

লারসেন আবার জানালার দিকে তাকাল। “মনে রেখো, মারদেকা, শত্রু তোমাকে যত কম জানে, তত ভালো। কিন্তু তুমি যদি তার সম্পর্কে কিছু জানতে পারো, সেটা আরও ভালো।” 

মারদেকা মাথা নিচু করল। 

লারসেন বলল, “আজ রাতে তুমি বাইরে যাবে না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুমি কিছু করবে না। চোখ খোলা রাখবে, কান খোলা রাখবে। কোনো শব্দ শুনলে সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেবে না। আগে বুঝবে।” 

মারদেকা তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। 

কিছুক্ষণ পর ঘরের নীরবতা আবার ফিরে এল। বাইরে বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই। দূরের কোনো গাছের শুকনো ডাল ঘষে ঘষে কাঁপছে। মারদেকা চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে চোখ বন্ধ করল, কিন্তু ঘুমাল না। তার মাথার মধ্যে বারবার একই দৃশ্য ফিরে আসছিল। উত্তরের অন্ধকার, শুকনো ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মানুষ, দূরে সরে যাওয়া দুটো ঘোড়া, আর বারান্দার কাঠে গেঁথে থাকা তীর। 

হঠাৎ লারসেন হাত তুলে তাকে ইশারা করল। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলল। লারসেন নড়ছে না। তার মাথা সামান্য কাত। সে শুনছে। মারদেকাও নিঃশ্বাস আটকে কান পাতল। প্রথমে কিছুই বোঝা গেল না। তারপর খুব দূর থেকে একটা ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। যেন শুকনো মাটির ওপর বুটের তলা ঘষে গেছে। শব্দটা একবার হলো, তারপর থেমে গেল।

মারদেকা ফিসফিস করে বলল, “পশ্চিমে?” 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আরও কিছুক্ষণ শুনল। তারপর খুব আস্তে বলল, “না। উত্তর-পশ্চিম।” 

মারদেকা উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল। 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে তাকে থামাল। “এখানেই থাকো।” 

মারদেকা আবার বসে পড়ল। 

লারসেন জানালার নিচু অংশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তাকানোর সময় সে শরীরটা এমনভাবে রাখল, যাতে জানালার ফাঁক দিয়ে তার অবয়ব বাইরে থেকে দেখা না যায়।

কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। তারপর দূরে একটা ঘোড়া খুব আস্তে নড়ল। তার সঙ্গে চামড়ার জিনের ক্ষীণ শব্দ। লারসেনের চোখ সরু হয়ে গেল। সে জানালা থেকে সরে এসে ঘরের মাঝখানে দাঁড়াল। 

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, শব্দটা সাধারণ নয়। 

লারসেন ধীরে বলল, “ওরা আবার ঘোড়ার কাছে এসেছে।” 

মারদেকা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কেন?” 

লারসেন বলল, “জানি না। কিন্তু এবার ওরা র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে তাকিয়ে নেই।”

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত ভেবে বলল, “তাহলে ওরা অন্য কিছু খুঁজছে?” 

লারসেন তার দিকে তাকাল। ছেলেটার প্রশ্নটা তার মনে দাগ কাটল। সে ধীরে বলল, “হতে পারে।” তারপর জানালার দিকে ফিরে গেল। “কিন্তু কী, সেটা এখনো জানি না।” বাইরে আবার নীরবতা নেমে এল। কিছুক্ষণ পর সে জানালার পাশে থেকে সরে এসে চেয়ারে বসল। রিভলভারটা তার ডান হাতে। 

মারদেকা নিচু গলায় বলল, “আপনি কি মনে করেন, তারা আজ রাতে আবার আসবে?” 

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “আমি মনে করি, তারা আজ রাতে আমাদের পরীক্ষা করছে।” 

মারদেকা বলল, “কীসের পরীক্ষা?” 

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমরা কতটা সতর্ক, সেটা দেখার।”

মারদেকা ধীরে মাথা নাড়ল। তার চোখে চিন্তার ছাপ। সে বলল, “তাহলে ওরা অপেক্ষা করছে।”

লারসেন বলল, “আমরাও।” কথাটা বলেই সে সামান্য হাসল না, বরং তার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। “যে আগে অধৈর্য হবে, সে ভুল করবে।”

সময় এগিয়ে চলল। লণ্ঠনের তেল কমে আসছিল। বাইরে আকাশের কোনো পরিবর্তন এখনও বোঝা যায় না। রাত যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। মারদেকা একসময় চেয়ারের পিঠে মাথা ঠেকাল। তার চোখ আধবোজা হয়ে এল। লারসেন তাকে কিছু বলল না। সে জানত, ছেলেটার শরীর ক্লান্ত। কিন্তু ঘুমের আগের সেই অবস্থাতেও মারদেকার কান যেন বাইরে রয়ে গেছে।

হঠাৎ মারদেকা চোখ খুলে ফেলল। তার মাথা সামান্য কাত হলো। 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল। মারদেকাকে হাত তুলে কোনো শব্দ না করার ইশারা করল। কয়েক মুহূর্ত পর খুব ক্ষীণ একটা শব্দ শোনা গেল। টুক। তারপর আরেকবার। টুক। তার চোখ এবার দরজার দিকে গেল। শব্দটা বাইরে থেকে এসেছে। খুব কাছ থেকে।

মারদেকা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। লারসেন হাত তুলে তাকে নিজের পেছনে দাঁড়াতে বলল। দুজনেই নিঃশব্দে দরজার দিকে এগোল। লারসেন রিভলভারটা বুকের কাছে তুলল। তার বাঁ হাত দরজার কপাটের ওপর স্থির।

আবার শব্দ হলো। টুক। এবার মারদেকা বুঝতে পারল, শব্দটা দরজায় নয়। দরজার ঠিক বাইরে কাঠের বারান্দার নিচে কোথাও। 

লারসেনও বুঝেছে। সে দরজা খোলেনি। বরং কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থেকে নিচু গলায় বলল, “ওরা খুব কাছে এসেছে।”

মারদেকার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে তাকানোর চেষ্টা করল। বাইরে লণ্ঠনের আলোয় বারান্দার কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বারান্দার নিচের অন্ধকার তার চোখের নাগালের বাইরে।

তারপর হঠাৎ বাইরে ঘোড়ার দড়ি টানার মতো শব্দ হলো। এক মুহূর্তের জন্য দুজনেই স্থির হয়ে গেল। 

লারসেন ধীরে ধীরে দরজার পাশে সরে দাঁড়াল। তার চোখে এবার সেই পরিচিত কঠোরতা। সে ফিসফিস করে বলল, “মারদেকা, পেছনে যাও।”

মারদেকা এক পা পিছিয়ে গেল। পরের মুহূর্তেই বাইরে থেকে একটা ছায়া খুব দ্রুত বারান্দার কিনারা পেরিয়ে গেল।

মারদেকা খুব আস্তে বলল, “লোকটা চলে গেল?”

লারসেন মাথা নাড়ল। “না।”

মারদেকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

লারসেন ধীরে রিভলভারের কক নামিয়ে দিল। তারপর বলল, “সে এখনো এখানেই আছে।”

ঘরের ভেতর আবার নিস্তব্ধতা নেমে এল। 

আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাও এখন বুঝে গেছে, র&#x200d;্যাঞ্চের লোকেরা তার উপস্থিতি টের পেয়েছে।

রাত তখন অনেক গভীর। আকাশের তারাগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কিন্তু প্রেইরির ওপর চাঁদের আলো এখনও পড়েনি। বাড়ির ভেতরের বাতাসও যেন ভারী হয়ে আছে। লারসেন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। বাইরে আর কোনো শব্দ নেই।

মারদেকা ধীরে ধীরে জানালার কাছে এগিয়ে গেল। লারসেন তাকে থামাল না। ছেলেটা জানালার একেবারে পাশে না গিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। উঠোনে লণ্ঠনের আলো স্থির হয়ে আছে। ঘোড়াগুলোও এখন শান্ত। কিন্তু উত্তরের দিকে তাকালেই তার মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের মধ্যে কিছু একটা বদলে গেছে। সে ধীরে বলল, “লোকটা কোথায় গেল?” 

লারসেন নিচু গলায় উত্তর দিল, “যেখানে গেলে তাকে দেখা যাবে না।” 

মারদেকা আবার জিজ্ঞেস করল, “সে কি আমাদের ভয় দেখাতে চায়?” 

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “যদি ভয় দেখানোই তার উদ্দেশ্য হতো, তাহলে তীর ছুড়ে চলে যেত। এখন সে আমাদের দেখছে।”

মারদেকা জানালা থেকে সরে এল। তার চোখে চিন্তার ছাপ। সে ধীরে বলল, “তাহলে সে অপেক্ষা করছে।” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। কিন্তু কিসের জন্য, সেটা এখনো বোঝা যাচ্ছে না।” 

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ বলল, “ঘোড়াটা নিয়ে যাওয়ার পরও সে ফিরে এসেছে।” 

লারসেন তার দিকে তাকাল। “এই কথাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” 

মারদেকা বলল, “মানে ঘোড়াটা নেওয়াই তার আসল কাজ ছিল না।” 

লারসেনের চোখে এবার সামান্য প্রশংসার ছাপ ফুটে উঠল। সে বলল, “সম্ভবত নয়।”

ঘরের বাইরে হঠাৎ একটা ক্ষীণ শব্দ হলো। দুজনেই থেমে গেল। শব্দটা খুব নিচু, যেন শুকনো ঘাসের ওপর কারও বুট ঘষে গেছে। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে রিভলভার তুলে ধরল। মারদেকা তার পেছনে সরে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। তারপর দূরে একটা ঘোড়া মাথা ঝাঁকাল। তার গলায় বাঁধা ধাতব অংশ খুব সামান্য শব্দ করল। লারসেন কয়েক সেকেন্ড শুনে ধীরে অস্ত্রটা নিচু করল। সে বলল, “ওটা আস্তাবলের দিক থেকে।” 

মারদেকা মাথা নাড়ল। “কিন্তু লোকটা ওইদিকে ছিল না।” 

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি নিশ্চিত?” 

মারদেকা উত্তর দিল, “না। শুধু শব্দের দিকটা ভেবে বলছি।”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “এই পার্থক্যটাই মনে রাখবে। নিশ্চিত না হলে নিশ্চিতের মতো কথা বলবে না।” 

মারদেকা মাথা নাড়ল। সে বুঝতে পারছিল, এই রাত শুধু অচেনা লোকদের নিয়ে নয়। এই রাত তার শেখারও একটা পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। লারসেন তাকে বহুদিন ধরে বলেছে, চোখ যা দেখে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো চোখ যা দেখেনি সেটা বুঝতে পারা। 

কিছুক্ষণ পর লারসেন ধীরে ঘরের একপাশে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখা লণ্ঠনটা একটু নিচু করে দিল। ঘর আরও অন্ধকার হয়ে গেল। সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে বলল, “এখন জানালার কাছে দাঁড়াবে না।” 

মারদেকা জিজ্ঞেস করল, “কেন?” 

লারসেন বলল, “বাইরে থেকে আলোয় তোমার ছায়া দেখা যেতে পারে।” মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে সরে এল। সে দেয়ালের পাশে গিয়ে বসল। লারসেনও দরজার কাছের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল।

সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। মারদেকার চোখ ধীরে ধীরে অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। তার কানে এখন ছোট ছোট শব্দও আলাদা হয়ে আসছে। হঠাৎ তার মনে হলো একটা শব্দ অন্যরকম। সে মাথা তুলল। কয়েক মুহূর্ত শুনে লারসেনের দিকে তাকাল। তারপর খুব আস্তে বলল, “ওটা ঘোড়ার শব্দ নয়।” 

লারসেন তার কাছে এল। “কী শুনলে?” মারদেকা বলল, “মাটিতে কিছু পড়ল।” 

লারসেন স্থির হয়ে শুনতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আবার একটা ক্ষীণ শব্দ হলো। এবার সে নিজেও শুনল। শব্দটা বাড়ির পশ্চিম পাশে, শেডের দিক থেকে এসেছে।

লারসেন রিভলভার হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগোল। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। লারসেন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি এখানেই থাকবে।” মারদেকা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু লারসেনের চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। সে জানত, এবার তর্ক করার সময় নয়। লারসেন দরজার কাছে গিয়ে থামল। বাইরে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর দরজাটা খুব সামান্য খুলে বাইরে পা রাখল।

মারদেকা দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে রইল। লারসেন বারান্দার ছায়া ধরে এগিয়ে গেল। তার চলার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়া নেই। সে জানে, তাড়াহুড়া করলে শব্দ হবে। শেডের কাছে পৌঁছে সে নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল। তারপর হাত বাড়িয়ে ধুলোর ওপর পড়ে থাকা একটা ছোট বস্তু তুলে নিল।

মারদেকা দূর থেকে দেখতে পেল, বস্তুটা চকচক করছে। লারসেন সেটা হাতে ঘুরিয়ে দেখল। তারপর কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখের ভাব বদলে গেল। সে বস্তুটা পকেটে রেখে ধীরে ধীরে ফিরে এল।

দরজার কাছে এসে মারদেকা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কী এটা?” 

লারসেন ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। তারপর বলল, “একটা ধাতব বাকল।” 

মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল। “ঘোড়ার জিনের?” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।” মারদেকার চোখ সরু হয়ে গেল। সে বলল, “তাহলে লোকটা ঘোড়ার কাছাকাছি ছিল।” 

লারসেন বলল, “হতে পারে। কিন্তু বাকলটা এখানে কীভাবে এল, সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।”

মারদেকা কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, “যদি লোকটা ঘোড়ার কাছে গিয়ে থাকে, তাহলে সে আস্তাবলের ভেতরও ঢুকেছিল?” 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে টেবিলের কাছে গিয়ে ধাতব বাকলটা বের করে লণ্ঠনের আলোয় দেখল। বাকলের এক পাশে খুব সামান্য আঁচড়। লারসেন আঙুল দিয়ে সেটা ছুঁয়ে দেখল। তারপর ধীরে বলল, “এটা পুরোনো নয়।”

মারদেকা উঠে দাঁড়াল। “তাহলে?” 

লারসেন বাকলটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে বলল, “তাহলে কেউ আমাদের খুব কাছ থেকে পরীক্ষা করছে।” 

মারদেকার চোখে আবার সেই অস্থিরতা ফিরে এল। সে বলল, “কিন্তু বাড তো উত্তরের দিকে পাহারা দেওয়ার কথা ছিল।” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “ভোরের আগে সে উঠবে। এখন সে ঘুমাচ্ছে।” তারপর একটু থেমে বলল, “আর সেই কারণেই আমি চাই না তুমি বাইরে যাও।”

মারদেকা চুপ করে গেল। তার মনে হলো, এই রাতটা যেন ধীরে ধীরে একটা অদৃশ্য জালের মতো চারপাশে শক্ত হয়ে আসছে।

লারসেন আবার জানালার দিকে তাকাল। তারপর মারদেকার দিকে ফিরে বলল, “আজ রাতে তুমি যে জিনিসটা সবচেয়ে ভালোভাবে শিখবে, সেটা কোনো অস্ত্র দিয়ে শেখানো যাবে না। সবসময় শত্রুকে দেখার আগে তার উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করবে। অস্ত্র হাতে নেওয়া সহজ। কিন্তু কখন অস্ত্র তুলবে, সেটা বুঝতে পারাই আসল শিক্ষা।”

মারদেকা ধীরে মাথা নাড়ল। তার চোখে এবার আগের ভয় নেই। আছে গভীর মনোযোগ। সে বুঝতে পারছে, লারসেন তাকে শুধু বিপদ থেকে দূরে রাখছে না। এই রাতের প্রতিটি মুহূর্ত দিয়ে তাকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করছে।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে খুব দূরে একটা ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি শোনা গেল। এবার শব্দটা আগের চেয়ে পরিষ্কার। তারপর আরেকটা ঘোড়া সাড়া দিল। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে জানালার দিকে তাকাল। মারদেকাও শুনেছে। কয়েক সেকেন্ড পর সে খুব আস্তে বলল, “দুটো ঘোড়া।”

লারসেন তার দিকে তাকাল। তারপর জানালার অন্ধকারে চোখ স্থির রেখে বলল, “হ্যাঁ। এবার তারা উত্তরে নেই।”

মারদেকার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। “তাহলে কোথায়?”

লারসেন উত্তর দেওয়ার আগেই পশ্চিম দিক থেকে খুব ক্ষীণ একটা ধাতব শব্দ ভেসে এল।

লারসেনের হাত রিভলভারের ওপর শক্ত হয়ে গেল। সে ধীরে বলল, “এবার মনে হচ্ছে, তারা র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরের আরেকটা পথ পরীক্ষা করছে।”

মারদেকা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে তখন আর কৌতূহল ছিল না। সে বুঝতে পারছিল, রাতের অপেক্ষার সময় শেষের দিকে এগোচ্ছে।

ধাতব শব্দটা দ্বিতীয়বার শোনার পর লারসেন আর অপেক্ষা করল না। সে দরজার পাশের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল, রিভলভারের হাতল শক্ত করে ধরে। মারদেকা দেয়ালের পাশে নিঃশব্দে বসে ছিল। বাইরে পশ্চিম দিকের শেডের কাছে বাতাসের শব্দ ছাড়া কিছুই নেই। তারপর হঠাৎ খুব নিচু একটা ঘর্ষণের শব্দ উঠল, যেন কেউ কাঠের বেড়ার গায়ে হাত রেখে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। লারসেন মাথা সামান্য কাত করল। এবার সে নিশ্চিত। কেউ র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরে ঢোকার পথ খুঁজছে।

লারসেন ধীরে দরজার কাছে গিয়ে ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। উঠোনের একপাশে লণ্ঠনের আলো, তার পরেই গভীর ছায়া। শেডের পেছনের অংশটা পুরোপুরি অন্ধকার। সে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর খুব আস্তে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। মারদেকা তার পেছনে তাকিয়ে রইল। লারসেন বারান্দা পেরিয়ে সরাসরি শেডের দিকে না গিয়ে বাঁদিকে ঘুরল, যাতে বাইরে থেকে তার অবস্থান বোঝা না যায়। তার পায়ের নিচে শুকনো মাটি, তবু সে এমনভাবে পা ফেলছিল যেন প্রতিটি শব্দ আগেই মেপে নিচ্ছে।

শেডের কোণ ঘুরতেই একটা ছায়া হঠাৎ নড়ল। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে রিভলভার তুলল। লোকটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। দুজনের মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি ছিল না। অন্ধকারে মুখ দেখা যাচ্ছিল না, শুধু বোঝা গেল লোকটার গায়ে গাঢ় রঙের পোশাক এবং মাথায় চওড়া কিনারার টুপি। লারসেন নিচু গলায় বলল, “যেখানে আছো, সেখানেই দাঁড়াও।” 

লোকটা কোনো উত্তর দিল না। বরং এক পা পিছিয়ে গেল।

লারসেন আরেক পা এগিয়ে বলল, “র&#x200d;্যাঞ্চে ঢুকে কী খুঁজছ?” 

এবারও কোনো উত্তর নেই। লোকটা হঠাৎ ডানদিকে ঘুরে দৌড় দিল। 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার পেছনে ছুটল। কয়েক গজ যেতেই লোকটা বেড়ার দিকে ছুটে গেল। লারসেন বুঝতে পারল, লোকটা আগেই বেরিয়ে যাওয়ার পথ ঠিক করে রেখেছে। সে চিৎকার করে বলল, “থামো!” কিন্তু লোকটা থামল না।

ঠিক তখনই লোকটা ঘুরে গুলি ছুড়ল। গুলির শব্দে পুরো র&#x200d;্যাঞ্চ কেঁপে উঠল। রাতের নিস্তব্ধতা মুহূর্তে ভেঙে গেল। গুলিটা লারসেনের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে শেডের কাঠে আঘাত করল। কাঠের টুকরো ছিটকে পড়ল। লারসেন নিচু হয়ে মাটিতে গড়িয়ে একপাশে সরে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে রিভলভার তুলল। কিন্তু লোকটা দ্বিতীয় গুলি চালানোর আগেই অন্ধকারের মধ্যে ঝাঁপিয়ে বেড়ার দিকে এগিয়ে গেল।

বাড়ির ভেতর থেকে দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ হলো। প্রথমে ইলাই ছুটে বেরিয়ে এল। তার পেছনে রুবেন কোল, ক্লে মরগান, মিগুয়েল এবং হ্যাঙ্ক ডসন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাডও ঘুম থেকে উঠে রাইফেল হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। গুলির শব্দে কারও ঘুম আর থাকার কথা নয়। 

ইলাই চারদিকে তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে?” 

বাড রাইফেল তুলে শেডের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেউ গুলি করেছে।”

ক্লে মরগান ইতিমধ্যে বারান্দা থেকে নিচে নামছিল। সে বলল, “কোথায় গেছে?” 

রুবেন কোল তার পেছনে এগিয়ে এসে রাইফেল হাতে বলল, “বেড়ার দিকে গেছে।” 

মিগুয়েলও অস্ত্র তুলে নিল। হ্যাঙ্ক ডসন ঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত চারপাশ দেখল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সবাই বুঝে গেল, র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরে একজন সশস্ত্র লোক ঢুকেছিল এবং এখন পালাচ্ছে।

ক্লে মরগান দৌড় দেওয়ার জন্য এগিয়ে যেতেই লারসেন হাত তুলে থামিয়ে দিল। সে তখন শেডের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার রিভলভার এখনও হাতে। সে কঠিন গলায় বলল, “কেউ বেড়ার বাইরে যাবে না।” 

ক্লে থেমে তার দিকে তাকাল। “কিন্তু লোকটা এখনো বেশি দূরে যায়নি।” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “সেটাই কারণ। বাইরে তার আরো লোকজন থাকতে পারে।” 

রুবেন কোল সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। মিগুয়েলও চারদিকে তাকাল। 

হ্যাঙ্ক ডসন ধীরে বলল, “ওরা যদি আমাদের বাইরে টেনে নিতে চায়?” 

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে আমরা তাদের সেই সুযোগ দেব না।”

বাড এবার লারসেনের কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে ঘুমের কোনো চিহ্ন নেই। সে জিজ্ঞেস করল, “তুমি ঠিক আছ?” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “গুলি লাগেনি।” 

বাড শেডের কাঠে গুলির দাগের দিকে তাকাল। তারপর বলল, “লোকটা কী চেয়েছিল?” 

লারসেন কয়েক মুহূর্ত উত্তর দিল না। সে মাটির দিকে তাকাল, যেখানে লোকটার পায়ের চিহ্ন এখনও দেখা যাচ্ছে। তারপর ধীরে বলল, “সেটা এখনো জানি না। তবে সে শুধু ভয় দেখাতে আসেনি।”

মারদেকা তখন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। ইলাই এবার মারদেকার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সে ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে বলল, “ভেতরে থাকো।” 

মারদেকা কিছু বলল না। বাইরে ক্লে মরগান আর মিগুয়েল শেডের দিকে তাকিয়ে আছে, রুবেন কোল উঠোনের উত্তর দিকটা দেখছে, আর হ্যাঙ্ক ডসন বাড়ির পেছনের অন্ধকার পরীক্ষা করছে। বাড রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে আছে লারসেনের পাশে। সবাই এখন জানে, রাতের বিপদ আর দূরের কোনো অদৃশ্য ব্যাপার নয়। একজন সশস্ত্র লোক র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে গুলি চালিয়ে গেছে।

লারসেন ধীরে শেডের কাছে গিয়ে কাঠের গায়ে হাত রাখল। গুলির জায়গাটা পরীক্ষা করে সে মাটিতে তাকাল। সেখানে লোকটার বুটের চিহ্ন। কয়েক গজ দূরে বেড়ার কাছে গিয়ে সে থামল। মাটির ওপর একটা ছোট ধাতব বস্তু পড়ে আছে। লারসেন নিচু হয়ে সেটা তুলে নিল। লণ্ঠনের আলোয় আনতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল। এটা সেই একই ধরনের ধাতব চাকতি, যেটা সে কিছুক্ষণ আগে শেডের কাছ থেকে পেয়েছিল, কিন্তু এবার চাকতির গায়ে খোদাই করা চিহ্নটা আরও স্পষ্ট।

বাড কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “কী পেয়েছ?” 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে চাকতিটা হাতের তালুতে উল্টেপাল্টে দেখল। তারপর ধীরে বলল, “এটা সে ইচ্ছে করে ফেলেছে।” 

বাড ভ্রু কুঁচকে বলল, “চিহ্নটা তুমি চেন?” 

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “চিনি। কিন্তু এখনই এর অর্থ বলার সময় নয়।” 

রুবেন কোল এগিয়ে এসে চাকতিটার দিকে তাকাল। ক্লে মরগানও তার পাশে দাঁড়াল। মিগুয়েল আর হ্যাঙ্ক ডসনও এগিয়ে এল। চারজনের মুখেই প্রশ্ন।

লারসেন চাকতিটা মুঠোর মধ্যে বন্ধ করে ফেলল। তারপর সবাইকে উদ্দেশ করে বলল, “আজ রাত থেকে র&#x200d;্যাঞ্চের পাহারা বদলাবে। কেউ একা বাইরে যাবে না। আর ভোর হলে আমরা প্রথমে বেড়া, শেড আর আস্তাবল পুরোটা পরীক্ষা করব।” 

বাড মাথা নাড়ল। “আমি ভোরে উত্তর দিকটা দেখব।” 

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু একা নয়।” বাড এবার কিছু বলল না।

দূরে কোথাও আবার ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি শোনা গেল। সবাই একসঙ্গে সেই দিকে তাকাল। কিন্তু এবার কেউ দৌড়াল না। কেউ গুলি তুলল না। তারা শুধু দাঁড়িয়ে শুনল। কয়েক মুহূর্ত পর শব্দটা থেমে গেল। রাত আবার শান্ত হয়ে গেল, কিন্তু আগের সেই শান্তি আর নেই।

লারসেন ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখ গিয়ে থামল মারদেকার ওপর। ছেলেটা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে ভয় নেই, কিন্তু সে জানে আজকের রাত তার জন্যও একটা পরিবর্তনের শুরু। লারসেন কিছু বলল না। শুধু রিভলভারটা কোমরে গুঁজে নিল। তারপর সে নিচু গলায় বলল, “সবাই ভেতরে যাও। আজ রাত শেষ হয়নি।”

কেউ আর প্রশ্ন করল না। একে একে ক্লে মরগান, রুবেন কোল, মিগুয়েল এবং হ্যাঙ্ক ডসন বাড়ির ভেতরে ঢুকল। ইলাই মারদেকাকে সঙ্গে নিয়ে গেল। বাড শেষবারের মতো চারপাশ দেখে দরজা বন্ধ করল। লারসেন সবার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল, হাতে সেই কালচে ধাতব চাকতি। পকেট থেকে আগে পাওয়া চাকতিটাও বের করলো। 

সে ভাবছে, বহুদিন ধরে ছায়ার মধ্যে চলতে থাকা ষড়যন্ত্র প্রথমবার র&#x200d;্যাঞ্চের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। আর ভোর হলে সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে তাদের জানতে হবে, শত্রু আসলে কতটা কাছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/264551/</link>
				<pubDate>Sat, 22 Aug 2026 08:53:40 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–পনের<br />
মারদেকা উত্তরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দূরে কোথাও সেই ঘোড়ার ক্ষীণ হ্রেষাধ্বনি আর শোনা যাচ্ছে না। কেবল মাঝে মাঝে বাতাস শুকনো ঘাসের মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, আর তাতে ঘাসগুলো একসঙ্গে সরে গিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসছে। র&#x200d;্যাঞ্চের বাড়ির বারান্দায় লণ্ঠনের হলুদ আলো জ্বলছে। সেই&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-264551"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/264551/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">edf31000824ad248bb087d451a869929</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–চৌদ্দ
মারদেকা দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। আস্তাবলের উঠোনটা প্রায় ফাঁকা। সকালের রোদ এখন অনেকটাই তীব্র হয়ে উঠেছে। কাঠের বেড়ার ওপর পড়ে থাকা আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। দূরে কয়েকটা ঘোড়া মাথা নিচু করে ঘাস খাচ্ছে। বাতাসে শুকনো খড়ের গন্ধ, ঘোড়ার ঘামের গন্ধ আর গরম কাঠের একটা কড়া গন্ধ মিশে আছে।

কিন্তু সেই মুহূর্তে এসবের কোনোটাই মারদেকার মনে জায়গা করে নিতে পারল না। তার কান এখনও সেই শব্দটা নিয়েই ব্যাস্ত। খুব ক্ষীণ একটা শব্দ। যেন ধাতব কোনো জিনিস কাঠের সঙ্গে ঠেকে আবার সরে গেছে।

মারদেকা দরজার ফাঁকটা আরেকটু বাড়িয়ে দিল। তার ডান হাত তখনও দরজার কাঠে রাখা। শরীরের বেশির ভাগটা ছায়ার মধ্যে, শুধু মুখের এক পাশ রোদের মধ্যে বেরিয়ে আছে। সে উঠোনের দিকে তাকাল। কেউ নেই। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে সে বাইরে বেরিয়ে এল।

বুটের তলায় শুকনো মাটি কচমচ করে উঠল। শব্দটা শুনে সে সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল। বাঁদিকে র&#x200d;্যাঞ্চের মূল উঠোন। ডানদিকে পুরোনো কাঠের বেড়া। তার ওপারে নিচু ঝোপঝাড় আর শুকনো ঘাসের বিস্তীর্ণ জমি। আরও দূরে প্রেইরি নেমে গেছে ঢেউ খেলানো বাদামি-সবুজ সমতলের দিকে।

সকালের বাতাস তখনও পুরোপুরি থেমে যায়নি। ঘাসের মাথাগুলো একসঙ্গে দুলছে। তারপর হঠাৎ ডানদিকে, আস্তাবলের পেছনের দিক থেকে খুব মৃদু একটা ঘর্ষণের শব্দ এল। মারদেকার চোখ সরু হয়ে গেল। সে শব্দের দিকে এগিয়ে গেল।

আস্তাবলের পেছনে একটা পুরোনো কাঠের গাড়ি রাখা। বহুদিন ব্যবহার না হওয়ায় চাকাগুলোর ওপর ধুলোর মোটা আস্তরণ জমেছে। গাড়ির একপাশে কয়েকটা ভাঙা বস্তা, পুরোনো দড়ি আর একটা মরচেধরা লোহার চাকা পড়ে আছে। মারদেকা গাড়িটার আড়ালে তাকাল।

কেউ নেই। সে এবার হাঁটু গেড়ে মাটির দিকে তাকাল। ধুলোয় কয়েকটা ছাপ দেখা যাচ্ছে। ঘোড়ার নয়, বুটের। কিন্তু ছাপগুলো খুব পরিষ্কার নয়। কিছুটা পুরোনো, কিছুটা নতুন। তার ওপর বাতাসে উড়ে আসা শুকনো ঘাস আর ধুলো জমে আছে।

মারদেকা আঙুল দিয়ে একটা ছাপের কিনারা ছুঁয়ে দেখল। তারপর হাত সরিয়ে নিল। এখানে কেউ এসেছিল। কখন এসেছিল, সেটা বোঝা কঠিন।

ঠিক তখনই দূর থেকে বাড হিগিন্সের গলা শোনা গেল, &quot;মারদেকা!&quot;

ছেলেটা ঘুরে তাকাল। বাড দ্রুত পায়ে আস্তাবলের দিকে এগিয়ে আসছে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে স্বাভাবিক নিশ্চিন্ততা নেই। মুখটাও আগের মতো শান্ত নয়।

বাড কাছে এসে প্রথমে ছেলেটার মুখের দিকে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, &quot;তুমি এখানে কী করছ?&quot;

মারদেকা আস্তাবলের পেছনের দিকে তাকাল। &quot;একটা শব্দ পেয়েছিলাম।&quot;

&quot;কী শব্দ?&quot;

&quot;লোহার মতো কিছু কাঠে লেগেছিল।&quot;

বাড সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে তাকাল। তার চোখ একবার গাড়ির ওপর গেল, তারপর বেড়ার দিকে। সে কোনো কথা না বলে মারদেকার পাশে এসে দাঁড়াল। &quot;কোথায় শুনেছ?&quot;

মারদেকা হাত তুলে আস্তাবলের পেছনের দিকে দেখাল। বাড সেখানে গিয়ে মাটির দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত কিছু বলল না। তারপর ধীরে হাঁটু গেড়ে বসল।

মাটির ওপর বুটের ছাপটা সে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। কিছুক্ষণ ছাপটার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর উঠে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি এবার চলে গেল উত্তরের দিকে, সেই দিকেই র&#x200d;্যাঞ্চের পুরোনো বেড়া। কয়েক মুহূর্ত সে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। &quot;চলো।&quot;

মারদেকা তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল।

র&#x200d;্যাঞ্চের উত্তর দিকটা অন্য অংশের তুলনায় অনেক বেশি নির্জন। এখানে মানুষের চলাচল কম। বেড়ার কয়েকটি খুঁটি বেঁকে গেছে, কোথাও কাঠের অংশ পচে গিয়েছে। বেড়ার ওপারে কোমরসমান শুকনো ঘাস। তার মধ্যে ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট পাথর, কাঁটাঝোপ আর আগের বছরের শুকনো গাছের ডাল।

মাটিটাও এখানে শক্ত। ঘোড়ার খুরের ছাপ থাকলে সহজেই চোখে পড়ে। বাড হঠাৎ থেমে গেল। মারদেকাও থামল। বাড নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল। সেখানে সত্যিই কয়েকটি খুরের ছাপ। একটার ওপর আরেকটা পড়েছে। কিছুটা বাতাসে মুছে গেছে। কিন্তু দুটো ঘোড়া যে এখানে দাঁড়িয়েছিল, সেটা বোঝা যায়।

মারদেকা নিঃশব্দে ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। 

বাড বলল, &quot;এগুলো আমি রাতেই পেয়েছিলাম।&quot;

মারদেকা মাথা তুলল। &quot;কেউ ঘোড়ায় করে এখানে এসেছিল?&quot;

বাড বেড়ার ওপারের দিকে তাকাল। ”এখন সেটাই জানতে হবে।&quot; সে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে বেড়ার একটা খুঁটি পরীক্ষা করল। কাঠের গায়ে নতুন ঘষার দাগ। তার ভ্রু কুঁচকে গেল। &quot;এই দাগটা আগে ছিল না।&quot;

মারদেকা কাছে এসে তাকাল। দাগটা খুব সামান্য। যেন ধাতব কোনো জিনিস কাঠের সঙ্গে ঘষা খেয়েছে। কাঠের গায়ে নতুন হলদে আঁশ উঠে আছে। সে আঙুল বাড়িয়ে দাগটার ওপর রাখল। তারপর হাত সরিয়ে নিল। &quot;আস্তাবলে যে শব্দটা পেয়েছিলাম...&quot;

বাড তার দিকে তাকাল। কেউ হয়তো রাতে র&#x200d;্যাঞ্চের আশেপাশে ঘোরাফেরা করেছে। কিন্তু কেন? সে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখ এবার বেড়ার ওপারে। সেখানে কোনো মানুষ নেই। কোনো ঘোড়াও নেই। শুধু বাতাসে দুলতে থাকা শুকনো ঘাস।

দূরে একটা বাজপাখি আকাশে চক্কর দিচ্ছে। বাড নিচু গলায় বলল, &quot;এই কথাটা এখন কাউকে বলবে না।&quot;

মারদেকা মাথা নাড়ল। সে আবার মাটির দিকে তাকাল। খুরের ছাপগুলো যেন তার চোখে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে বলল, &quot;ওরা কি র&#x200d;্যাঞ্চটাকে দেখছিল?&quot;

বাড এবার তার দিকে তাকাল। তারপর বলল, &quot;হতে পারে।&quot; বেড়ার ওপর হাত রাখল। দূরের প্রেইরির দিকে তাকিয়ে তার মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল। কিন্তু কে এসেছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সে কেন এসেছিল। আস্তে করে ঘুরে দাঁড়াল। &quot;চলো।&quot;

মারদেকা তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক কদম যাওয়ার পর সে আবার থেমে গেল। তার চোখ আস্তাবলের দিকে। সেখানে বাতাসের সঙ্গে একটা ঝুলন্ত লোহার বকল দুলছে। বকলটা কাঠের খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। টক। টক। খুব ক্ষীণ একটা শব্দ।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে থাকল। তারপর বুঝতে পারল, কিছুক্ষণ আগে যে শব্দ সে শুনেছিল, সেটা হয়তো এই বকলেরও হতে পারে। কিন্তু তার চোখ আবার চলে গেল আস্তাবলের পেছনের সেই জায়গাটার দিকে। কারণ শব্দটা সে শুনেছিল বকলটা থামার আগেই।

মারদেকা ধীরে ধীরে আবার হাঁটতে শুরু করল। বাড তার পাশে। তারা যখন আস্তাবলের কাছে ফিরে এল, তখন মারদেকা হঠাৎ মাটির দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। ধুলোয় একটা সরু দাগ।

ঘোড়ার খুরের নয়। কোনো ভারী জিনিস টেনে নিয়ে যাওয়ারও নয়। বরং যেন বুটের গোড়ালি ঘুরে যাওয়ার সময় মাটিতে একটা অর্ধচন্দ্রাকার দাগ তৈরি হয়েছে।

মারদেকা নিচু হয়ে সেটা দেখল। বাডও পাশে এসে দাঁড়াল।

মারদেকা দাগটার ওপর হাত রাখল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, &quot;কেউ এখানে দাঁড়িয়েছিল।&quot;

বাড তার দিকে তাকাল। &quot;কীভাবে বুঝলে?&quot;

মারদেকা এবার মাটির দিকে তাকিয়েই বলল, &quot;দাগটা একদিকে নয়।&quot;

বাড কিছুক্ষণ দাগটার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর তার মুখে ধীরে ধীরে একটা কঠিন ভাব ফুটে উঠল। সে চারপাশে তাকাল। কেউ দেখছে না। কেউ জানে না। 

আর সেই মুহূর্তে বাড প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল, রাতের সেই অচেনা ঘোড়ার ছাপ হয়তো কেবল বেড়ার বাইরে এসে থেমে থাকা কোনো পথিকের ব্যাপার নয়।

কেউ হয়তো র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতর পর্যন্ত এসেছিল। কতটা কাছে? কেন? আর কী দেখেছে? 
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর এখনো অন্ধকারে। বাড নিচু গলায় বলল, &quot;এখান থেকে সরে যাও। আমরা জানি না কে কোথা থেকে তাকিয়ে আছে।&quot;

মারদেকা আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে ধীরে ধীরে আস্তাবলের দিকে ফিরে গেল।

বাড আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে রইল না। সে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে র&#x200d;্যাঞ্চের মূল বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার বুটের তলায় শুকনো মাটি কচমচ করে উঠছিল, কিন্তু তার মন পড়ে ছিল অনেক পেছনে, উত্তরের বেড়ার কাছে, সেই অচেনা খুরের ছাপ আর কাঠের গায়ে নতুন আঁচড়ের মধ্যে। 

র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর তখন দুপুরের রোদ নেমে এসেছে। সকালের কোমল আলো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। আকাশে একটাও মেঘ নেই। সূর্যের তাপে প্রেইরির ঘাসের রং আরও ফিকে, আরও ধূসর দেখাচ্ছে। দূরের পাহাড়গুলো যেন গরম বাতাসের ভেতর সামান্য কাঁপছে।

উঠোনে আগের মতোই কাজ চলছে। কয়েকজন কাউবয় ঘোড়া প্রস্তুত করছে, কেউ জিন বাঁধছে, কেউ কাঠের বাক্স সরাচ্ছে, কেউ আবার ভাঙা বেড়া মেরামত করছে। 

বাড কাউকে কিছু বলল না। সে প্রথমে নিজের ঘোড়াটার কাছে গেল। ঘোড়াটা মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। লাগামের দড়ি খুলে আবার শক্ত করে বাঁধল, তারপর ঘোড়ার পিঠে হাত বুলিয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তার চোখ চলে গেল মূল বাড়ির দিকে। লারসেনের ঘরের জানালাগুলো বাইরে থেকে বন্ধ দেখাচ্ছে। বারান্দায় কেউ নেই। সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। লারসেনকে এখনই সবটা জানাতে হবে।

সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে গেল। লারসেন বেরিয়ে এল। তার মুখ আগের মতোই শান্ত, কিন্তু চোখে সেই পরিচিত সতর্কতা। শহর থেকে আসা লোকটার সঙ্গে কথা শেষ হয়েছে। লোকটি এখন ঘরের ভেতরের একপাশে বসে আছে। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে সে একবার বাইরে তাকাল, তারপর আবার চুপ করে বসে রইল।

লারসেন বাডের দিকে তাকাল। &quot;কীছু হয়েছে?&quot;

বাড সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে একবার লোকটার দিকে তাকাল। লোকটি তাদের কথা শুনতে পারে এমন দূরত্বে বসে আছে।

লারসেন সেটা বুঝতে পারল। সে ধীরে বারান্দার একপাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাডও তার পেছনে গেল। &quot;বল।&quot;

বাড নিচু গলায় বলল, &quot;উত্তরের দিকটা আবার দেখলাম। খুরের ছাপ দুটো ঘোড়ার। সেটা আগের মতোই আছে। কিন্তু বেড়ার একটা খুঁটিতে নতুন আঁচড় পেয়েছি।&quot;

লারসেনের চোখ সামান্য সরু হলো। &quot;কী ধরনের আঁচড়?&quot;

&quot;ধাতব কিছু ঘষা লেগেছে মনে হয়।&quot; বাড একটু থামল। &quot;আস্তাবলের পেছনে মাটিতে বুটের দাগ পেয়েছি।&quot;

লারসেন এবার তার দিকে পুরোপুরি ফিরে তাকাল। &quot;নতুন?&quot;

&quot;নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কিন্তু একটা দাগের মাটি এখনও শক্ত হয়ে বসেনি।&quot;

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল। &quot;মারদেকা সেটা দেখেছে?&quot; 

&quot;হ্যাঁ।&quot;

&quot;সে কী বলেছে?&quot;

&quot;আস্তাবলের কাছে শব্দ শুনেছিল।&quot;

লারসেনের চোখে এবার সামান্য পরিবর্তন দেখা গেল। &quot;কী শব্দ?&quot;

&quot;লোহার মতো কিছু কাঠে লাগার শব্দ।&quot;

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তার চোখ তখন উঠোনের ওপারে। সেখানে মারদেকা একটা কালো ঘোড়ার লাগাম ঠিক করছে। ছেলেটা মাথা নিচু করে নিজের কাজে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, &quot;ওকে কিছু বলবে না&quot;।

বাড অবাক হয়ে তাকাল। কিন্তু লারসেনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করার অভ্যাস তার নেই।

লারসেন আবার বলল, &quot;আজ থেকে উত্তর দিকের বেড়াটা নজরে রাখবে। তবে প্রকাশ্যে নয়।&quot;

&quot;আবার যদি কেউ আসে?&quot;

লারসেনের চোখ এবার কঠিন হয়ে উঠল। &quot;তখন তাকে আসতে দেবে।&quot;

বাড কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। &quot;আসতে দেব?&quot;

লারসেন ধীরে বলল, &quot;হ্যা, দেখব সে কী করতে আসে।&quot;

বাডের ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, লারসেন এখনই বন্দুকের দিকে যেতে চাইছে না। 

বারান্দায় দাঁড়িয়ে লারসেন কিছুক্ষণ মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা তখন ঘোড়াটার কেশর আঁচড়ে দিচ্ছে। তার ভঙ্গিতে কোনো অস্থিরতা নেই। কিন্তু লারসেন জানে, ছেলেটার চোখ এখন আগের মতো নেই। একবার কোনো অস্বাভাবিক জিনিস চোখে পড়লে সে সেটাকে সহজে ভুলবে না।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতে শুরু করল। সূর্য পশ্চিম আকাশের দিকে একটু একটু করে হেলে পড়েছে। তাপ এখনও কমেনি, কিন্তু আলোয় সেই কঠিন সাদা ঝাঁঝটা নেই। 

র&#x200d;্যাঞ্চের কাজও ধীরে ধীরে কমে এসেছে। কেউ ঘোড়াগুলোকে খোঁয়াড়ে ফিরিয়ে নিচ্ছে। কেউ দিনের শেষের সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখছে। রান্নাঘরের দিক থেকে সন্ধ্যার খাবারের প্রস্তুতির গন্ধ ভেসে আসতে শুরু করল।

মারদেকা তখন আস্তাবলের ভেতরে শেষ ঘোড়াটার খুর পরিষ্কার করছিল।

বাড দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাকে কিছুক্ষণ দেখল। হেসে বলল, &quot;সব কাজ একদিনে শেষ করতে নেই।&quot;

মারদেকা খুরটা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর দুজনেই আস্তাবলের বাইরে এল।

বিকেলের আলো তখন উঠোনের ওপর লম্বা হয়ে পড়েছে। ফটকের ওপারে প্রেইরি প্রায় নিস্তব্ধ। মারদেকা একবার উত্তরের দিকে তাকাল। হঠাৎ বলল, &quot;আজ রাতে ওদিকটায় যাবেন?&quot;

বাডের মুখে মৃদু হাসি ফুটল। &quot;তোমার মাথায় এখন অনেক প্রশ্ন ঘুরছে।&quot;

মারদেকা ধীরে বলল, &quot;হ্যাঁ।&quot;

দুজনেই ধীরে ধীরে মূল বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। কিন্তু তারা জানত না, উত্তরের বেড়ার ওপারে তখন কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

প্রেইরির শুকনো ঘাসের মধ্যে একজন মানুষ নিচু হয়ে বসে ছিল। তার শরীর প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে আছে। মাথায় চওড়া টুপি, গায়ে ধুলোমাখা কোট। হাতে একটা ছোট দূরবীন। সে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখ প্রথমে আস্তাবলের দিকে গেল। 
তারপর মূল বাড়ির দিকে। শেষে থামল মারদেকার ওপর।

লোকটি দূরবীন নামিয়ে নিল। তার ঠোঁটে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটল। তারপর সে পেছনে তাকাল। দূরে তার ঘোড়া বাঁধা ছিল। ঘোড়াটা এত নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে দূর থেকে তাকে শুকনো ঝোপের মতো মনে হয়।

লোকটি ধীরে উঠে দাঁড়াল। সে বেড়ার দিকে এগিয়ে গেল না। বরং ঘুরে প্রেইরির দিকে হাঁটতে শুরু করল। 

সূর্য তখন পশ্চিম দিগন্তের ওপর রক্তের মতো লাল হয়ে উঠছে। র&#x200d;্যাঞ্চের বাড়িগুলোর ছায়া লম্বা হয়ে প্রেইরির দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই ছায়ার বাইরে, ঘাসের সমুদ্রের মধ্যে, অচেনা মানুষটি তার ঘোড়ায় চড়ে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।

তার পেছনে পড়ে রইল শুধু খুরের কয়েকটি অস্পষ্ট দাগ। দাগগুলো বাতাসে খুব বেশিক্ষণ থাকবে না। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে সে এসেছিল, সেটার ছাপ এত সহজে মুছে যাওয়ার নয়।

সন্ধ্যা নামতে নামতে প্রেইরির রং বদলে গেল। পশ্চিম আকাশের রক্তিম আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। দূরের পাহাড়গুলোর মাথা কালো হয়ে উঠেছে, আর তাদের নিচে বিস্তৃত ঘাসের সমুদ্রটা যেন অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। দিনের গরম এখনও মাটির বুক থেকে বেরোচ্ছে, কিন্তু বাতাসে রাতের ঠান্ডার আভাস এসে গেছে।

লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে সন্ধ্যার কাজ প্রায় শেষ। আস্তাবলের দরজাগুলো একে একে বন্ধ হচ্ছে। ঘোড়াগুলোকে শেষবারের মতো খাবার দেওয়া হয়েছে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে হলুদ আলো বাইরে পড়ে উঠোনের ধুলোর ওপর একটা ছোট আলোকচত্বর তৈরি করেছে। বাড়ির ভেতর থেকে থালা-বাসনের শব্দ ভেসে আসছে।

কিন্তু উত্তর দিকের র&#x200d;্যাঞ্চটা অন্ধকার। সেখানে কোনো আলো নেই, কোনো মানুষের কণ্ঠ নেই। শুধু বাতাসে শুকনো ঘাসের ঘর্ষণের শব্দ, আর দূরের কোথাও নিশাচর পাখির ক্ষীণ ডাক।

মারদেকা আস্তাবলের দরজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এল। তার হাতে একটা ছোট লণ্ঠন। দরজায় তালা লাগানোর আগে সে একবার ভেতরের দিকে তাকাল। সারি সারি ঘোড়া অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। কারও চোখে লণ্ঠনের আলো পড়ে ক্ষণিকের জন্য জ্বলে উঠল, তারপর আবার অন্ধকারে হারিয়ে গেল। মারদেকা দরজাটা টেনে বন্ধ করল।

এক পা এগিয়ে যেতেই থেমে গেল সে। তার মাথা সামান্য কাত হলো। কোথাও একটা শব্দ হয়েছে। খুব ক্ষীণ। মনে হলো শুকনো ঘাসের মধ্যে কোনো কিছু ঘষে গেল।

মারদেকা লণ্ঠনটা একটু নিচু করে ধরল। চারপাশে তাকাল। উঠোন ফাঁকা। মূল বাড়ির বারান্দায় একটা বাতি জ্বলছে। আলোয় কাঠের সিঁড়িগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার বাইরে অন্ধকার এত ঘন যে কয়েক গজ দূরের জিনিসও ঠিকমতো বোঝা যায় না। মারদেকা দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে লণ্ঠনটা নিভিয়ে দিল। অন্ধকার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘিরে ফেলল। কিছুক্ষণ সে নড়ল না। তার চোখ ধীরে ধীরে অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করল। আকাশে তখন কয়েকটা তারা দেখা দিয়েছে। উত্তরের দিকে কালো ঘাসের মাথাগুলো বাতাসে দুলছে।

আবার শব্দ হলো। এবার একটু পরিষ্কার। টুক। মনে হলো কাঠের সঙ্গে ধাতব কোনো জিনিসের হালকা সংঘর্ষ। মারদেকার বুকের ভেতর ধুক করে উঠল। সকালের সেই শব্দটা তার মনে পড়ে গেল, আস্তাবলের কাছে শোনা সেই অদ্ভুত শব্দ।

সে নিঃশব্দে এক পা পিছিয়ে গেল। তারপর আরেক পা। কিন্তু এবার সে ভয় পেয়ে পালাল না। লারসেন তাকে শিখিয়েছে, অজানা শব্দ থেকে দূরে সরে যাওয়ার আগে জানতে হয় শব্দটা কোথা থেকে এসেছে।

মারদেকা মাটির দিকে তাকাল। চাঁদের আলো এখনও ওঠেনি। তবু আকাশের ক্ষীণ আলোয় শুকনো মাটির ওপর কিছু দাগ বোঝা যাচ্ছে। সে হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে মাটি ছুঁল। ঠান্ডা। শুকনো। কিন্তু এক জায়গায় মাটি একটু নরম। আঙুল দিয়ে ছুঁতেই সেটা ভেঙে গেল।

ঘোড়ার খুর নয়। বুটের ছাপ।

মারদেকার নিঃশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে ধীরে মাথা তুলল। ছাপটা আস্তাবলের পেছনের দিকে গেছে। আর তার পরের ছাপটা অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেছে।

মারদেকা উঠে দাঁড়াল। তাকে একটা জিনিস জানতে হবে। লোকটা কোথায় গেছে?

সে ধীরে ধীরে এগোল। লণ্ঠন জ্বালাল না। শুধু হাত দিয়ে সামনে পথ মেপে নিচ্ছে। তার বুটের নিচে শুকনো ঘাস চাপা পড়ে খুব সামান্য শব্দ করছে।

আস্তাবলের পেছনে পৌঁছে সে থেমে গেল। সেখানে একটা পুরোনো কাঠের বেড়া। বেড়ার ওপারে অন্ধকার প্রেইরি। দিনের আলোয় জায়গাটা খুব সাধারণ মনে হলেও সন্ধ্যার পর সেটাই যেন অন্য এক জগৎ হয়ে উঠেছে। বেড়ার ওপারের ঘাসগুলো বাতাসে দুলছে, আর অন্ধকারের মধ্যে তাদের মাথাগুলো কখনও দেখা যাচ্ছে, কখনও হারিয়ে যাচ্ছে।

মারদেকা নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল। দুটি ছাপ। তারপর তিনটি। তারপর আর কিছু নেই। সে মাথা তুলে বেড়ার দিকে তাকাল। একটা খুঁটির গায়ে অদ্ভুত কালচে দাগ। হাত বাড়িয়ে দাগটা ছুঁল। তার আঙুলে কালো গুঁড়ো লেগে গেল। সে সেটা নাকের কাছে নিয়ে গেল। তেলের গন্ধ। ঘোড়ার জিনের চামড়ায় ব্যবহৃত তেলের মতো।

হঠাৎ তার পেছনে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ হলো। মারদেকা ঘুরে দাঁড়াল। কেউ নেই। 
শুধু আস্তাবলের কালো দেয়াল। তারপর বাম দিকে ঘাসের মধ্যে কিছু একটা নড়ল। সে ধীরে ধীরে এক পা পিছিয়ে এল। ঘাস আবার নড়ল। এবার একটু বেশি।

মারদেকার চোখ সরু হয়ে গেল। সে বুঝল, বাতাস ওই দিক থেকে আসছে না। তাহলে ঘাস নড়ছে কেন? একটা শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ হলো। সে আর দাঁড়িয়ে থাকল না। সে এক ঝটকায় পাশের কাঠের দেওয়ালের আড়ালে সরে গেল। তারপর নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর ঘাসের মধ্যে আর কোনো শব্দ নেই।

হঠাৎ দূরে একটা ঘোড়া হ্রেষাধ্বনি করে উঠল। র&#x200d;্যাঞ্চের আস্তাবল থেকে নয়। প্রেইরির দিক থেকে। মারদেকার শরীর শক্ত হয়ে গেল। ঘোড়া আছে বাইরে। তারমানে কেউ আছে ওখানে। সে ধীরে মাথা বাড়িয়ে বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকাল। অন্ধকারের মধ্যে কিছুই দেখা গেল না। কিন্তু তারপর খুব দূরে একটা ক্ষীণ আলো দেখা গেল।

লণ্ঠনের আলো। এক মুহূর্ত দেখা গেল। তারপর অদৃশ্য।

মারদেকা চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল। আলোটা আবার জ্বলে উঠল। এবার একটু অন্য জায়গায়। কেউ হাঁটছে না। ঘোড়ায় চড়েছে। লণ্ঠনটা ঘোড়ার পাশে দুলছে। বুঝতে পারল, লোকটা চলে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? সে এত কাছে এসে আবার ফিরে যাচ্ছে কেন?

মারদেকা আর অপেক্ষা করল না। সে দৌড় দিল না, বরং যতটা সম্ভব নিঃশব্দে বেড়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে র&#x200d;্যাঞ্চের মূল বাড়ির দিকে এগোল। কয়েক কদম যাওয়ার পর হঠাৎ থেমে গেল। তার কানে তখন আরেকটা শব্দ এসেছে। খুব দূরে। ঘোড়ার খুরের শব্দ। একটা ঘোড়া নয়। দুটো।

শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। মারদেকা দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল। তার মনে পড়ল সকালের কথা। দুটো ঘোড়ার ছাপ। বাডের মুখ। লারসেনের সতর্কতা। আর সেই অচেনা লোক, যে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে এবার স্পষ্টতঃ বুঝতে পারল, লোকটা একা আসেনি।

মারদেকা দ্রুত মূল বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। বারান্দায় পৌঁছানোর আগেই সে দেখতে পেল বাড সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে রাইফেল। চোখ উত্তরের দিকে। সেও থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত শ্বাস সামলে বলল, &quot;ওরা এসেছে।&quot;

বাডের মুখের ভাব বদলে গেল। &quot;কারা?&quot;

মারদেকা উত্তরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। &quot;জানি না।&quot;

বাড সিঁড়ি থেকে নেমে তার কাছে এল। &quot;কতজন?&quot;

&quot;দেখিনি।&quot;

&quot;তাহলে কীভাবে জানো?&quot;

মারদেকা নিচু গলায় বলল, &quot;দুটো ঘোড়া গেছে।&quot;

বাডের চোখ সরু হয়ে গেল। &quot;কোথা দিয়ে?&quot;

&quot;উত্তরের বেড়ার ওদিক দিয়ে।&quot;

বাড আর কোনো কথা বলল না। সে মারদেকার কাঁধে হাত রেখে তাকে নিজের পেছনে সরিয়ে দিল। &quot;ভেতরে যাও।&quot;

বাডের কণ্ঠ এবার কঠিন। মারদেকা বুঝল, আর কথা বলা যাবে না। সে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগোল।

কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে আবার থেমে গেল। তার চোখ উত্তরের অন্ধকারে। বাড তখন রাইফেল তুলে ধরেছে।

&quot;বাড...&quot;

&quot;কী?&quot;

মারদেকা খুব নিচু গলায় বলল, &quot;ওরা চলে যায়নি।&quot;

বাড তার দিকে তাকাল। &quot;কী বললে?&quot;

মারদেকা উত্তর দিল না। তার চোখ র&#x200d;্যাঞ্চের উত্তর-পশ্চিম কোণের দিকে স্থির। 
সেখানে একটা শুকনো গাছ। গাছটার নিচে অন্ধকারের মধ্যে একটা মানুষের অবয়ব।
একেবারে স্থির।

বাডও এবার সেটা দেখতে পেল। তার আঙুল রাইফেলের ট্রিগারের কাছে শক্ত হয়ে গেল। লোকটা নড়ল না। শুধু কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে মাথাটা সামান্য তুলল। 
তারপর হাত উঠাল। তার হাতে কিছু একটা আছে। মারদেকার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

বাড ফিসফিস করে বলল, &quot;নিচু হও!&quot;

দুজনেই একই সঙ্গে ঝুঁকে পড়ল। পরের মুহূর্তে অন্ধকার চিরে একটা তীক্ষ্ণ সো সো শব্দ ছুটে এল। গুলি নয়। একটা তীর। তীরটা এসে বাড়ির বারান্দার কাঠের খুঁটিতে গেঁথে গেল।

মারদেকা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। বাড ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে এবার বিস্ময়ের চেয়ে বেশি ছিল ক্রোধ। সে তীরটার দিকে তাকাল। তারপর অন্ধকারের দিকে। কিন্তু শুকনো গাছটার নিচে আর কেউ নেই। মানুষটা অদৃশ্য হয়ে গেছে।

বাড দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই বাড়ির ভেতর থেকে লারসেনের কণ্ঠ ভেসে এল। সে ঘুরে তাকাল।

লারসেন দরজার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে রিভলভার। চোখ উত্তরের অন্ধকারে। সে ধীরে ধীরে বাইরে এসে বারান্দায় দাঁড়াল। কাঠের খুঁটিতে গেঁথে থাকা তীরটার দিকে তাকিয়ে তার মুখ এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। 

তারপর তীরটা টেনে বের করল। তীরের মাথায় ছোট একটা কাপড় বাঁধা। লারসেন কাপড়টা খুলল। ভেতরে ভাঁজ করা একটা কাগজ। বাডের চোখ কাগজটার ওপর স্থির হয়ে গেল। মারদেকাও তাকিয়ে আছে।

লারসেন কাগজটা খুলল। মাত্র কয়েকটি শব্দ। সে পড়ল। তারপর আবার পড়ল। তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। কিন্তু এবার তার চোখে যে ঠান্ডা কঠোরতা ফুটে উঠল, সেটা বাড আগে বহুবার দেখেছে। সেই কঠোরতা দেখা দিলে সাধারণত পশ্চিমের কোনো মানুষ খুব বেশি সময় নিরাপদ থাকে না।

বাড নিচু গলায় বলল, &quot;কী লেখা আছে?&quot;

লারসেন কাগজটা ভাঁজ করল। কয়েক মুহূর্ত কোনো উত্তর দিল না।

মারদেকার বুকের ভেতর যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। বাডের মুখও শক্ত হয়ে উঠল।

লারসেন বারান্দার কিনারায় দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে তখনও ভাঁজ করা কাগজটা। উত্তরের প্রেইরির দিকে তাকিয়ে তার চোখ এতটাই স্থির যেন মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের পর্দা ভেদ করে সে সেই অদৃশ্য মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছে।

বাড রাইফেলটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার আঙুল ট্রিগারের ওপর নয়, কিন্তু খুব কাছেই। 

মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তার বুক দ্রুত উঠানামা করছে, কিন্তু সে কোনো শব্দ করছে না। তার চোখ উত্তরের অন্ধকারে। সেই অন্ধকারের মধ্যে আবার ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। তারপর থেমে গেল।

বাড ধীরে মাথা ঘুরিয়ে লারসেনের দিকে তাকাল। &quot;ওরা র&#x200d;্যাঞ্চের বাইরে থেমেছে।&quot;

লারসেন মাথা নাড়ল। &quot;জানি।&quot;

&quot;তীরটা কি শুধু ভয় দেখানোর জন্য?&quot;

লারসেন কাগজটার দিকে তাকাল। &quot;হতে পারে।&quot;

বাড আর কিছু বলল না।

লারসেন ধীরে ধীরে কাগজটা খুলল। লণ্ঠনের হলুদ আলোয় কাগজের ওপর লেখা কয়েকটি শব্দ আবার দেখা গেল। অক্ষরগুলো বড় নয়, কিন্তু লেখার ভঙ্গিতে এমন এক ধরনের আত্মবিশ্বাস ছিল, যেন যে লোক লিখেছে সে জানে, এই কাগজ পড়ার পর যার হাতে পড়বে, সে তার কথাকে হালকা করে দেখবে না।

মারদেকা অনিচ্ছায় এক পা এগিয়ে এল। &quot;কী লেখা আছে?&quot;

লারসেন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাগজটা ভাঁজ করে কোটের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। &quot;সেটা তোমার এখনই জানার দরকার নেই।&quot;

মারদেকা আর প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার চোখে যে প্রশ্নটা রয়ে গেল, সেটা লারসেন বুঝতে পারল। সে উত্তরের দিকে তাকিয়েই বলল, &quot;কারণ ওরা আমাদের ভয় দেখিয়ে জানিয়ে দিয়েছে যে ওরা এখানে আছে।&quot;

লারসেন এবার বারান্দার কাঠের খুঁটির দিকে তাকাল, যেখানে কয়েক মুহূর্ত আগেও তীরটা গেঁথে ছিল। &quot;যে মানুষ সত্যিই কাউকে মারতে আসে, সে আগে থেকে খবর দিয়ে জানায় না।&quot;

বাড ধীরে মাথা নাড়ল। কথাটা সত্যি। পশ্চিমে সে বহুবার দেখেছে, সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষগুলো কখনও নিজেদের উপস্থিতি ঘোষণা করে না। তারা ছায়ার মতো আসে, কাজ শেষ করে চলে যায়। যারা গুলি চালানোর আগে কথা বলে, তাদের ভয়ংকর বলা যায়, কিন্তু যারা কথা না বলে গুলি চালায়, তাদের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগই থাকে না।

হঠাৎ র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম দিক থেকে একটা ঘোড়া চেঁচিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আরও দুটো ঘোড়া আস্তাবলের ভেতর অস্থির হয়ে নড়েচড়ে উঠল। খুরের শব্দ কাঠের মেঝেতে দ্রুত আঘাত করতে লাগল।

মারদেকার মাথা ঘুরে গেল। &quot;ওরা ঘোড়াগুলোকে ভয় দেখাচ্ছে,&quot; সে ফিসফিস করে বলল।

লারসেন তার দিকে তাকাল। 

মারদেকা একটু থেমে বলল, &quot;ওরা কাছাকাছি আছে।&quot;

লারসেনের চোখে ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল। &quot;কেন বলছ?&quot;

&quot;ঘোড়াগুলো একসঙ্গে ভয় পায়নি। একটা আগে চেঁচিয়েছে। তারপর অন্যগুলো।&quot;

বাড এবার ছেলেটার দিকে তাকাল। তার মুখে অল্প বিস্ময় ফুটে উঠেছে।

লারসেন ধীরে বলল, &quot;ভালো।&quot;

তারপর সে বাডের দিকে ফিরল। &quot;তুমি উত্তর দিকটা দেখো।&quot;

&quot;আর পশ্চিম?&quot;

&quot;আমি দেখছি।&quot;

বাড সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। লারসেন মারদেকার দিকে তাকাল। &quot;তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।&quot; মারদেকা মাথা নাড়ল।

তারা দুজন বাড়ির পশ্চিম পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল। লারসেনের হাতে রিভলভার। মারদেকার হাতে একটা ছোট লণ্ঠন। সলতেটা কমানো। পায়ের কাছে ছোট্ট আলো ফেলছে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে আগের সেই কিশোরসুলভ অস্থিরতা নেই। প্রতিটি পা ফেলার আগে সে মাটি অনুভব করছে। শুকনো ঘাস কোথায় বেশি, কোথায় কম, কোথায় মাটি শক্ত, কোথায় বুটের পুরোনো ছাপ, তার চোখ সবকিছু ধরছে।

বাড়ির পশ্চিম পাশটা অন্য জায়গার তুলনায় অনেক অন্ধকার। মূল উঠোনের আলো এখানে এসে পৌঁছায় না। একটা পুরোনো কাঠের শেডের ছায়া প্রায় পুরো জায়গাটাকে ঢেকে রেখেছে। শেডের পেছনে কয়েকটা মরচে ধরা কৃষি-সরঞ্জাম পড়ে আছে। বহুদিন ব্যবহার না হওয়া একটা লোহার চাকা মাটিতে কাত হয়ে পড়ে আছে। তার ওপর শুকনো লতাগুল্ম উঠে গেছে।

লারসেন হঠাৎ হাত তুলে থামার ইশারা করল। সে নিচু হয়ে ঝোপের সামনে মাটি পরীক্ষা করল। কিছুক্ষণ পর তার আঙুল একটা চিহ্নের ওপর থেমে গেল। বুটের ছাপ। খুব নতুন। ছাপটার দিকে সে তাকিয়ে থাকল।

মারদেকা কাছে এসে নিচু হলো। লন্ঠনের সলতেটা একটু বাড়িয়ে দিল। 

লারসেন বলল, &quot;একজন এখানে দাঁড়িয়েছিল।&quot; একটু দূরের মাটির দিকে তাকাল। আরেকটা ছাপ। তারপর আরেকটা। ছাপগুলো পশ্চিম দিকে গেছে।

মারদেকা মাথা তুলল। &quot;সে আমাদের দেখছিল।&quot;

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। &quot;সম্ভবত।&quot;

&quot;তাহলে এখন সে কোথায়?&quot;

লারসেন উত্তর দিল না। দূরে আবার ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। এইবার শব্দটা অনেক স্পষ্ট। দুটো ঘোড়া। কিন্তু তারা র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে আসছে না। পশ্চিমের দিকে যাচ্ছে। লারসেন কয়েক মুহূর্ত শুনে বলল, &quot;চলো।&quot;

তারা দ্রুত বাড়ির পেছনে ফিরে এল। বাড তখন উত্তর দিক থেকে ফিরে আসছে। তার মুখ গম্ভীর।

&quot;কী পেয়েছ?&quot; লারসেন জানতে চাইল।

বাড মাথা নাড়ল। &quot;কেউ নেই। কিন্তু বেড়ার ওপারে নতুন ছাপ আছে। আগের গুলোর চেয়ে তাজা।&quot;

লারসেন কিছু বলল না। বাড এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল, &quot;আর একটা জিনিস পেয়েছি।&quot; সে হাত বাড়িয়ে ছোট একটা বস্তু দেখাল। চামড়ার সরু ফালি। কালো চামড়া। এক প্রান্ত ছেঁড়া। 

লারসেন সেটা হাতে নিল। চামড়ার ওপর খুব ক্ষীণ একটা দাগ ছিল। যেন কোনো চিহ্ন একসময় খোদাই করা হয়েছিল, পরে ইচ্ছা করে ঘষে মুছে ফেলা হয়েছে। লারসেনের চোখ সেই দাগের ওপর স্থির হয়ে গেল।

বাড জিজ্ঞেস করল, &quot;চেনেন?&quot;

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। চামড়ার টুকরোটা মুঠোয় বন্ধ করে ফেলল। &quot;না,&quot; সে ধীরে বলল।

বাড তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, লারসেন সত্যি বলছে না। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রশ্ন করে কোনো লাভ নেই। হঠাৎ বাড়ির ভেতর থেকে দরজা খোলার শব্দ হলো।

শহর থেকে আসা সেই লোকটি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে একটা কাপ। কিন্তু মুখে কোনো স্বাভাবিক ভাব নেই। বাইরের অস্থিরতা সেও টের পেয়েছে। সে নিচু গলায় বলল, &quot;আমার ঘোড়াটা কোথায়?&quot;

বাড ঘুরে তাকাল। &quot;আস্তাবলে।&quot;

লোকটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, &quot;আমাকে এখন যেতে হবে।&quot;

তিনজনই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল। লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। &quot;তুমি নিশ্চিত?&quot;

লোকটা একবার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো। 

বাড আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। সে আস্তাবলের দিকে হাঁটা দিল। ফিরে এলো তার লাল-সাদা ঘোড়াটা নিয়ে। বিদায় নিয়ে লোকটা সন্ধ্যের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

লারসেন তার পেছনে তাকিয়ে রইল। তারপর মারদেকার দিকে ফিরে বলল, &quot;তুমি এখানে থাকবে।&quot; তারপর আবার ঘরে ঢুকে গেল।

মারদেকা মাথা নাড়ল।  কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে রইল না। সে উঠোনে নেমে এল। ততক্ষণে লন্ঠনের সলতেটা আবার নামিয়ে দিয়েছে। ধীরে আস্তাবলের দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখ তখন মাটিতে। নিচে ধুলোর ওপর ভারী কিছু টেনে নেবার দাগ। সে আস্তে করে হাঁটু গেড়ে বসে দাগটা পরীক্ষা করল। সহসা তার চোখে এমন এক পরিবর্তন এল, যা কয়েক মাস আগেও তার মধ্যে দেখা যেত না।

সে ধীরে মাথা তুলল। দূরে উত্তরের অন্ধকারে একটা ছায়া নড়ল। মাত্র এক মুহূর্ত। তারপর অদৃশ্য।

মারদেকার বুকের ভেতর আবার সেই ধক করে ওঠা অনুভূতি হলো। কিন্তু এবার সে ভয় পেল না। সে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। সে বুঝে গেছে, এই পথ দিয়ে একটা ঘোড়া গেছে। ঘোড়াতে কোন সওয়ারী ছিল না। কেউ একজন ঘোড়াটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু, সেই ছাপ মুছবার জন্য ঘোড়ার পিছে বস্তায় ভারী কিছু ভরে টেনে নিয়ে গেছে।

তার চোখ তখন উত্তরের বেড়ার দিকে। অন্ধকারের মধ্যে যেন কেউ তাকে দেখছে। স্রে দ্রুত ঘরে ফিরে এলো। লারসেনের দরজায় টোকা দিল।

আর সেই মুহূর্তেই দূরে কোথাও ঘোড়ার ক্ষীণ হ্রেষাধ্বনি শোনা গেল। একবার। তারপর আরেকবার।  
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/263924/</link>
				<pubDate>Thu, 20 Aug 2026 03:22:45 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–চৌদ্দ<br />
মারদেকা দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। আস্তাবলের উঠোনটা প্রায় ফাঁকা। সকালের রোদ এখন অনেকটাই তীব্র হয়ে উঠেছে। কাঠের বেড়ার ওপর পড়ে থাকা আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। দূরে কয়েকটা ঘোড়া মাথা নিচু করে ঘাস খাচ্ছে। বাতাসে শুকনো খড়ের গন্ধ, ঘোড়ার ঘামের গন্ধ আর গরম কাঠের একটা কড়া গন্ধ মিশে আছ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-263924"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/263924/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">f973d774317f88e445be04ad2dbd40b9</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–তের
পরদিন সকাল। সূর্য তখনও পুরোপুরি ওপরে ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু প্রেইরির বুক থেকে ভোরের শীতলতা এখনও সরে যায়নি। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের ডগাগুলো প্রথম সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। দূরের পাহাড়গুলো ধূসর নীল থেকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দক্ষিণ দিক থেকে আসা হালকা বাতাস শুকনো ঘাসের মাথাগুলো একসঙ্গে দুলিয়ে দিচ্ছে।

লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের পেছনের খোলা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে।

তার সামনে গতকালের সেই কটনউডের গুঁড়ি। বহু বছরের রোদ-বৃষ্টি আর কুড়ালের আঘাতে কাঠটা ক্ষয়ে গেছে। গুঁড়ির গায়ে অসংখ্য দাগ, ফাটল আর কালচে ছোপ। তার সামনে মাটির ওপর পাশাপাশি তিনটি সরু রেখা টানা।

মারদেকা কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে লারসেনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার পরনে র&#x200d;্যাঞ্চের সাধারণ কাজের পোশাক। হাতে কিছু নেই। কিন্তু গতকালের তুলনায় তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে সামান্য পরিবর্তন এসেছে। সে আর নিজের পায়ের দিকে বারবার তাকাচ্ছে না। বরং সামনে, পাশে, পেছনে, চারপাশের সবকিছু একসঙ্গে লক্ষ্য করার চেষ্টা করছে।

বাড হিগিন্স একটু দূরে একটা পুরোনো কাঠের খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করা। মুখে সেই পরিচিত গম্ভীর ভাব, কিন্তু চোখে কৌতূহল।

লারসেন মাটির তিনটি দাগের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, &quot;গতকাল তুমি চোখ দিয়ে দেখতে শিখেছ।&quot;

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। সকালের আলোয় তার মুখের শক্ত রেখাগুলো আরও স্পষ্ট। &quot;আজ পা দিয়ে দেখতে শিখবে।&quot;

মারদেকার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। &quot;পা দিয়ে?&quot; সে কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

লারসেনের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটল। &quot;শুনতে অদ্ভুত লাগছে, তাইনা?&quot;

মারদেকা একটু ইতস্তত করে মাথা নেড়ে বলল, &quot;জ্বী, একটু।&quot;

লারসেন আর কিছু বলল না। মাটির প্রথম দাগটার কাছে গিয়ে বুটের আগা দিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে বলল, &quot;এখানে দাঁড়াও।&quot;

মারদেকা এগিয়ে গিয়ে দাগটার ওপর দাঁড়াল।

লারসেন তার সামনে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হাত তুলে মারদেকার দুই পায়ের দিকে ইশারা করল। &quot;পা দুটো একটু ফাঁক করো। এতটা নয়। হ্যাঁ, এবার ঠিক আছে। শরীরের ভার মাঝখানে রাখো।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে ভঙ্গি ঠিক করল।

লারসেন তার চারপাশে হাঁটতে শুরু করল। কখনও ডান পাশে, কখনও বাঁ পাশে, কখনও একেবারে পেছনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার চোখ মারদেকার পায়ের পাতা, হাঁটু আর কোমরের অবস্থান পরীক্ষা করছে।

প্রেইরির বাতাস একটু জোরে বইছে। পাশের লম্বা ঘাসগুলো ঢেউয়ের মতো দুলছে। দূরে কয়েকটি ঘোড়া মাথা তুলে এদিকে তাকিয়ে আবার ঘাস খেতে শুরু করে।

মারদেকা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথম মিনিটটা সহজেই কেটে যায়। দ্বিতীয় মিনিটে তার ডান পায়ের পেশিতে হালকা টান পড়ে। তৃতীয় মিনিটে সে অজান্তেই বাম পায়ের ওপর শরীরের ভার একটু বেশি দিয়ে ফেলে।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়। &quot;ওদিকে হেলবে না&quot;।

মারদেকা একটু চমকে তাকায়। &quot;আমি তো কিছু করিনি।&quot;

লারসেন  মারদেকার কাছে এসে নিচু হয়ে পায়ের অবস্থাটা দেখে নেয়। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়িয়ে বলে, &quot;করেছ। তোমার শরীর ক্লান্ত হয়ে অন্য পায়ের ওপর ভর নিতে চাইছে।&quot;

মারদেকা নিজের পায়ের দিকে তাকায়।

লারসেন তার দৃষ্টি অনুসরণ করে মাটির দিকে তাকায়, তারপর ধীরে বলে, &quot;ক্লান্তি খারাপ নয়। ক্লান্তির কারণে ভুল করা খারাপ।&quot;

মারদেকা কোনো উত্তর দেয় না। সে আবার শরীরের ভার মাঝখানে ফিরিয়ে আনে।

কিছুক্ষণ পর লারসেন পেছনে সরে গিয়ে হাত দিয়ে সামনে ইশারা করে। &quot;এবার হাঁটো।&quot;

মারদেকা প্রথম পা বাড়াতেই লারসেন বলে ওঠে, &quot;থামো।&quot;

ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়।

লারসেন তার কাছে এসে মাটির দিকে তাকায়। শুকনো ধুলোর ওপর বুটের ছাপ স্পষ্ট। &quot;কীভাবে পা ফেললে?&quot;

মারদেকা নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে বলে, &quot;জানি না।&quot;

লারসেন ধীরে মাথা নাড়ে। &quot;সেটাই সমস্যা।&quot;

সে হাঁটু সামান্য বাঁকিয়ে মাটির ওপর হাত রাখে। শুকনো মাটি আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ে। &quot;তুমি যখন হাঁটো, তোমার চোখ সামনে থাকে। কিন্তু পা মাটির সঙ্গে কথা বলে। কোথায় শক্ত, কোথায় নরম, কোথায় পাথর, কোথায় গর্ত, কোথায় শুকনো ঘাসের নিচে মাটি ফাঁপা, পা সেটা আগে বুঝতে পারে।&quot; 

সে হাতের ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায়। &quot;তুমি যদি নিজের পায়ের কথা শুনতে না শেখো, একদিন এমন জায়গায় গিয়ে পড়বে যেখানে চোখ তোমাকে বাঁচাতে পারবে না।&quot;

মারদেকা নিচের মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে সামনে হাঁটতে শুরু করে। এক পা। দুই পা। তিন পা।

লারসেন এবার কোনো নির্দেশ দেয় না।

মারদেকা নিজের পায়ের নিচের মাটি অনুভব করার চেষ্টা করে। কোথাও শক্ত মাটি, কোথাও সামান্য নরম। কোথাও ছোট পাথর বুটের তলায় গড়িয়ে যাচ্ছে। কোথাও শুকনো ঘাস চাপা পড়ে মৃদু শব্দ করছে।

হঠাৎ তার ডান পা একটা ছোট গর্তে ঢুকে যায়। শরীর সামান্য দুলে ওঠে। কিন্তু সে পড়ে না।

লারসেনের চোখ সরু হয়ে আসে। সে কয়েক কদম এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, &quot;কী করলে?&quot;

মারদেকা নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, &quot;পা সরিয়ে নিয়েছি।&quot; 

লারসেন মাথা নাড়িয়ে বলে, &quot;না। পড়ার আগেই শরীরের ভার অন্য পায়ে দিয়েছ।&quot;

মারদেকা এবার চুপ করে থাকে।

লারসেন বাডের দিকে তাকায়। &quot;দেখেছ?&quot;

বাড এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার খুঁটি থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ে। &quot;হ্যাঁ। ছেলেটার পা দ্রুত শিখছে।&quot;

লারসেন আবার মারদেকার দিকে তাকায়। তার চোখে ক্ষীণ সন্তুষ্টি। &quot;শুধু পা নয়। তোমার শরীরও শিখছে।&quot;

দূরে একটা ঘোড়া হঠাৎ জোরে হ্রেষাধ্বনি করে ওঠে। র&#x200d;্যাঞ্চের মূল ঘরের দিক থেকে ধোঁয়া উঠছে। রান্নাঘরের কাজ শুরু হয়ে গেছে। কয়েকজন কাউবয় আস্তাবলের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সকালের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে বাড়ছে। 

কিন্তু লারসেনের কাছে এই মুহূর্তে র&#x200d;্যাঞ্চের অন্য কোনো শব্দের গুরুত্ব নেই।

সে দ্বিতীয় দাগটার কাছে গিয়ে বুটের আগা দিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে বলে, &quot;এখানে দাঁড়াও।&quot;

মারদেকা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায়।

লারসেন এবার হাত তুলে সতর্ক করে দেয়, &quot;এবার আমার দিকে তাকাবে না। চারপাশ দেখবে।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে চোখ ঘোরায়।

লারসেন তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। &quot;সামনে কী?&quot;

মারদেকা তাকিয়ে উত্তর দেয়, &quot;গুঁড়ি।&quot;

&quot;ডানে?&quot;

&quot;ঘাস।&quot;

লারসেন আরও একটু ডানদিকে হাত বাড়ায়। &quot;ওদিকে?&quot;

মারদেকা চোখ কুঁচকে তাকায়। &quot;আস্তাবল।&quot;

&quot;বাঁয়ে?&quot;

&quot;পুরোনো বেড়া।&quot;

লারসেন এবার একেবারে পেছনে চলে যায়। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে প্রশ্ন করে, &quot;পেছনে?&quot;

মারদেকা ঘাড় না ঘুরিয়েই বলে, &quot;আপনি।&quot;

লারসেনের মুখে এবার স্পষ্ট সন্তুষ্টির ছাপ দেখা যায়। &quot;ভালো।&quot; সে আরও কয়েক কদম পেছনে সরে যায়। তারপর বলে, &quot;এবার হাঁটো।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।

লারসেন তার পেছনে আসে না।

বাডও নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।

মারদেকা কয়েক কদম যাওয়ার পর হঠাৎ থেমে যায়।

লারসেন দূর থেকে জিজ্ঞেস করে, &quot;কেন থামলে?&quot;

মারদেকা মাথা সামান্য কাত করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ সামনে, কিন্তু কান যেন অন্যদিকে। &quot;শব্দ হয়েছে,&quot; সে ধীরে বলে।

বাডের মুখের ভাব বদলে যায়। লারসেনও সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে যায়।

&quot;কী শব্দ?&quot; লারসেন এবার আগের চেয়ে নিচু গলায় জানতে চায়।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর ডান দিকের শুকনো ঘাসের দিকে তাকিয়ে বলে, &quot;ঘাসের মধ্যে।&quot;

তিনজনই নিঃশব্দ হয়ে যায়। শুধু বাতাসের শব্দ। ঘাসের ঘর্ষণের শব্দ। তারপর হঠাৎ শুকনো ঘাসের আড়াল থেকে একটা খরগোশ বেরিয়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সেটি কয়েক লাফে দূরে চলে যায়।

বাডের মুখে প্রশস্ত হাসি ফুটে ওঠে। সে মাথা নেড়ে বলে, &quot;চোখের চেয়ে কানও খারাপ নয়।&quot;

লারসেন অবশ্য হাসে না। সে খরগোশটার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে মারদেকার দিকে ফিরে বলে, &quot;পশ্চিমে যে মানুষ শুধু সামনে তাকায়, সে অর্ধেক পৃথিবী অন্ধ হয়ে দেখে।&quot;

মারদেকা কিছু বলে না। তার চোখ তখনও শুকনো ঘাসের দিকে।

লারসেন মাটির তিনটি দাগের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে, &quot;আজকের শিক্ষা মনে রাখবে।&quot; 

মারদেকা তার দিকে তাকায়। &quot;কী শিখলাম?&quot;

লারসেন মাথা সামান্য কাত করে বলে, &quot;তুমি বলো।&quot;

মারদেকা কিছুক্ষণ চিন্তা করে। তারপর নিজের বুটের দিকে তাকিয়ে বলে, &quot;পা আগে বুঝবে।&quot;

লারসেন মাথা নাড়ে। &quot;আর?&quot;

মারদেকা এবার চারপাশে তাকায়। সকালের আলোয় র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি জিনিস যেন তার চোখে আলাদা হয়ে উঠেছে। ঘোড়ার খোঁয়াড়, পুরোনো বেড়া, কটনউডের গুঁড়ি, দূরের ঘাস, বাতাসে দুলতে থাকা শুকনো ডাল।

সে ধীরে বলে, &quot;চোখ একা যথেষ্ট নয়।&quot;

বাডের মুখে এবার মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। &quot;এবার ঠিক বলেছ।&quot;

সূর্য ততক্ষণে আরও ওপরে উঠে এসেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের ব্যস্ততাও বেড়ে গেছে। আস্তাবল থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ আসছে। কাউবয়রা নিজেদের কাজে ছড়িয়ে পড়ছে। রান্নাঘরের দিক থেকে ভাজা রুটির গন্ধ বাতাসে ভেসে আসছে।

লারসেন মাটির দাগগুলোর দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে তারপর মারদেকার দিকে ফিরে দাঁড়ায়। &quot;এখন যাও।&quot;

মারদেকা নড়ছে না। &quot;কোথায়?&quot; সে জানতে চায়।

লারসেনের মুখে এবার অল্প হাসি ফুটে ওঠে। &quot;যেখানে প্রতিদিন যাও। কাজের সময় হয়ে গেছে।&quot;

মারদেকা বুঝতে পারে। সে ঘুরে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে হাঁটতে শুরু করে। কয়েক পা যাওয়ার পর হঠাৎ থেমে পেছনে তাকায়। লারসেন এখনও দাঁড়িয়ে আছে। বাডও তার পাশে।

মারদেকা কিছু বলে না। শুধু একবার নিজের পায়ের দিকে তাকায়। তারপর মাথা তুলে আবার হাঁটতে শুরু করে। আজ তার হাঁটার ভঙ্গি গতকালের মতো নয়।

পা মাটিতে পড়ছে একইভাবে, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে এখন সচেতনতা আছে। শুকনো ঘাসের শব্দ সে শুনছে। মাটির শক্ত-নরম পার্থক্য অনুভব করছে। বাতাস কোন দিক থেকে আসছে, সেটাও যেন অজান্তে বুঝতে পারছে।

লারসেন অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়া দেখে। বাড ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। দুজনের মাঝখানে কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা হয় না। তারপর বাড নিচু গলায় বলে, &quot;ছেলেটা বদলাচ্ছে।&quot;

লারসেন চোখ সরায় না। দূরে মারদেকার ছোট হয়ে আসা অবয়বের দিকে তাকিয়েই উত্তর দেয়, &quot;সবাই বদলায়।&quot;

বাড মাথা নাড়ে। &quot;ওর বদলানোটা অন্যরকম।&quot;

লারসেন এবার ধীরে শ্বাস নেয়। তার চোখে এমন এক ভাব ফুটে ওঠে, যেন সে ছেলেটার বর্তমানের চেয়ে অনেক দূরের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে। &quot;ওকে তাড়াহুড়ো করে বড় করা যাবে না, বাড,&quot; সে নিচু গলায় বলে। &quot;পশ্চিম নিজেই ওকে বড় করে দেবে।&quot;

দুজনেই আর কথা বলে না। র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তারা দেখতে পায়, মারদেকা ইতিমধ্যে আস্তাবলের দরজায় পৌঁছে গেছে।

সে দরজায় হাত রাখে। এক মুহূর্ত থামে। তারপর ফাঁক করে ভেতরে তাকায়।

ঘোড়াগুলোর উষ্ণ নিঃশ্বাস, খড়ের গন্ধ, কাঠের মেঝেতে খুরের মৃদু শব্দ, ছাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া সকালের আলো আর সেই আলোর মধ্যে ভেসে বেড়ানো অসংখ্য ধুলোর কণা, সবকিছু আজ তার কাছে যেন অন্যরকম স্পষ্ট।

মারদেকা ধীরে ধীরে আস্তাবলের ভেতরে ঢুকে যায়। ভেতরে ঢুকতেই দরজার ফাঁক দিয়ে আসা সকালের আলোটা তার পেছনে লম্বা একটা ছায়া ফেলে। কয়েক মাস আগের সেই ছোট, রোগা ছেলেটার সঙ্গে এখনকার মারদেকার বেশ পার্থক্য। শরীর এখনও কিশোরের মতোই সরু, কিন্তু কাঁধ দুটো আগের চেয়ে চওড়া হয়েছে। বাহুর পেশিতে কাজের টান স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ঘোড়া সামলানো, খড়ের বস্তা টানা, কাঠের বোঝা ওঠানো আর র&#x200d;্যাঞ্চের নিত্যদিনের পরিশ্রম তার শরীরকে ধীরে ধীরে শক্ত করে তুলেছে। মুখের শিশুসুলভ গোলাভাবও অনেকটা কমে এসেছে। বয়স তেরোর কাছাকাছি পৌঁছেছে, আর সেই পরিবর্তন তার হাঁটা, দাঁড়ানো এবং তাকানোর ভঙ্গিতেও ধরা পড়ে।

আস্তাবলের ভেতরটা দিনের ব্যস্ততায় জেগে উঠছে। কয়েকটি ঘোড়া খড়ের ওপর দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে খাবার চিবোচ্ছে। কোথাও লোহার খুর কাঠের মেঝেতে ঠুকছে, কোথাও জিনের চামড়া টেনে শক্ত করার শব্দ। বাতাসে শুকনো খড়, ঘোড়ার ঘাম আর চামড়ার পুরোনো গন্ধ মিশে আছে।

মারদেকা কোনো কথা না বলে তার কাজের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। একটা ধূসর ঘোড়ার পিঠের ওপর হাত বুলিয়ে কিছুক্ষণ স্থির থাকে। ঘোড়াটা মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়, তারপর আবার খাবারের দিকে মুখ নামায়।

মারদেকা ঘোড়াটার পায়ের দিকে তাকায়। তারপর খুরের পাশে জমে থাকা খড় সরিয়ে দেয়।

আগে এসব কাজ সে করত অভ্যাসবশত। এখন তার চোখ অন্যভাবে কাজ করে। খুরের নিচে মাটি কেমন, ঘোড়াটা পায়ের ওপর সমান ভার দিচ্ছে কি না, কান দুটো স্বাভাবিকভাবে নড়ছে কি না, চোখে অস্থিরতা আছে কি না, সবকিছুই সে লক্ষ্য করে।

আস্তাবলের দরজা ঠেলে সদ্য ভেতরে আসা বাড হিগিন্সও তাকে কিছুক্ষণ দেখে। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। &quot;ওটার পেছনের বাঁ পা দেখেছ?&quot; বাড জিজ্ঞেস করে।

মারদেকা মাথা নাড়িয়ে ঘোড়াটার পায়ের দিকে তাকায়। &quot;হ্যাঁ।&quot;

বাড আর কিছু বলে না। সে ঘোড়াটার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে। খুরটা হাতে তুলে দেখে। খুরের কিনারায় সামান্য কাদা জমে আছে।

&quot;এটা পরিষ্কার করো,&quot; সে বলল। &quot;তারপর আবার দেখবে।&quot;

মারদেকা নিচু হয়ে কাজ শুরু করে।

বাড পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। আগের মতো তাকে প্রতিটি ধাপ বুঝিয়ে দিতে হয় না। ছেলেটা এখন নিজের চোখে ভুল ধরতে শেখে। কয়েক মুহূর্ত পর মারদেকা মাথা তোলে।

&quot;খুরে সমস্যা নেই।&quot;

বাড তার দিকে তাকায়। &quot;তুমি নিশ্চিত?&quot;

মারদেকা আবার খুরটার দিকে তাকায়। তারপর ঘোড়াটার পায়ের ওপর চোখ রাখে। &quot;খুরে নয়। হাঁটার সময় ও ডান দিকে ভার দিচ্ছে।&quot;

বাড এবার চুপ করে যায়। ঘোড়াটাকে সামান্য সামনে হাঁটিয়ে নেয়। কয়েক পা যেতেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়। বাম পেছনের পা মাটিতে পড়ার পর ঘোড়াটা সামান্য দ্রুত ডান পায়ের ওপর ভার সরিয়ে নেয়।

বাড ধীরে মাথা নাড়ে। &quot;ভালো দেখেছ।&quot;

মারদেকা শুধু মাথা নোয়ায়। তারপর ঘোড়াটার পা আবার পরীক্ষা করতে থাকে।

বাড কিছুক্ষণ তাকে দেখে থেকে আস্তাবলের দরজার দিকে তাকায়। বাইরে লারসেন আর নেই। তবে কিছু দূরে তার ঘোড়াটা বাঁধা। সম্ভবত সে অন্য কাজে গেছে।

বাড নিচু গলায় বলে, &quot;আজ থেকে একটা কথা মনে রাখবে। চোখ যা দেখে, হাত যেন তার চেয়ে বেশি কিছু করার চেষ্টা না করে।&quot;

মারদেকা মাথা নাড়ে।

এই ছোট্ট ছেলেটার মধ্যে একটা পরিবর্তন বাড বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছে। আগে কোনো কাজের নির্দেশ পেলে মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে সেটা করার চেষ্টা করত। এখন সে এক মুহূর্ত থামে। দেখে। ভাবে। তারপর হাত বাড়ায়।

এই থেমে যাওয়াটাই তাকে অন্যরকম করে তুলছে।

আস্তাবলের বাইরে তখন সূর্য আরও ওপরে উঠেছে। সকালের শীতলতা প্রায় কেটে গেছে। দূরের প্রেইরিতে বাতাসের সঙ্গে ঘাসের ঢেউ তৈরি হচ্ছে। র&#x200d;্যাঞ্চের মূল উঠোনে কয়েকজন ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের বুটের শব্দ ধুলো মাড়িয়ে দূরে সরে যায়।

কিছুক্ষণ পর আস্তাবলের দরজার বাইরে লারসেনকে দেখা যায়। সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে। রোদ থেকে ছায়ায় আসতেই তার চোখ কিছুক্ষণের জন্য অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়। তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামে মারদেকার ওপর।

ছেলেটা তখন ঘোড়ার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে। লারসেন তাকে কিছু বলে না।

মারদেকা তাকে দেখতে পেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।

লারসেন ঘোড়াটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, &quot;কী হয়েছে?&quot;

মারদেকা সংক্ষেপে বলে, &quot;পায়ে ব্যথা নেই। হাঁটার সময় ভার বদলাচ্ছে।&quot;

লারসেন ঘোড়াটার কাছে গিয়ে পা পরীক্ষা করে। তারপর কয়েক পা হাঁটিয়ে দেখে।

ফিরে এসে মারদেকার দিকে তাকায়। &quot;ঠিক ধরেছ।&quot; এই দুই শব্দের বেশি কিছু সে বলে না।

কিন্তু মারদেকার চোখে সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়। প্রশংসা শুনে সে হাসে না, উচ্ছ্বসিতও হয় না। শুধু একবার মাথা নোয়ায়।

লারসেন সেটা লক্ষ্য করে। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য সন্তুষ্টির ছায়া ফুটে ওঠে। সে ঘুরে বেরিয়ে যায়।

মারদেকা তার চলে যাওয়া দেখে না। সে আবার ঘোড়াটার দিকে ফিরে যায়।

বাইরে সূর্য আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আস্তাবলের ছায়া ধীরে ধীরে ছোট হচ্ছে। দিন এগিয়ে যাচ্ছে।

আর মারদেকার ভেতরেও কিছু একটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে, যেটা কোনো একদিন হঠাৎ করে প্রকাশ পাবে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজ, ভুল, সংশোধন আর নীরব শিক্ষার ভেতর দিয়েই সেটা তৈরি হচ্ছে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে তার শরীর যেমন শক্ত হচ্ছে, তেমনি তার নীরবতাও বদলে যাচ্ছে। আগে তার চুপ করে থাকা ছিল অচেনা পৃথিবীর সামনে অসহায়তার চিহ্ন। এখন সেই নীরবতা অনেকটা সচেতনতার। 

সে কম কথা বলে। কিন্তু যখন বলে, তখন দেখে নিয়ে ভেবে চিন্তে বলে।

আস্তাবলের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাড একবার পেছনে তাকায়।

মারদেকা তখন ধূসর ঘোড়াটাকে ধীরে ধীরে হাঁটাচ্ছে। তার পদক্ষেপ মেপে পড়ছে। চোখ সামনে। কান চারপাশে। হাত শান্ত।

বাডের মনে হয়, ছেলেটা আর শুধু র&#x200d;্যাঞ্চে আশ্রয় পাওয়া একটা পাহাড়ি বালক নেই। সে ধীরে ধীরে র&#x200d;্যাঞ্চেরই একজন হয়ে উঠছে।

কিন্তু পশ্চিমের মাটিতে মানুষ যখন কোনো জায়গার অংশ হয়ে ওঠে, তখন সেই মাটির বিপদও একসময় তার নিজের বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। 

দূরের প্রেইরির ওপরে হঠাৎ একটা কালো বিন্দু দেখা যায়। বাড প্রথমে সেটাকে বাজপাখি ভেবেছিল। তারপর বুঝতে পারে, ওটা পাখি নয়।

দূরের পথের ওপর ধুলো উঠছে। খুব সামান্য। কিন্তু ধুলোটা স্থির নয়। কেউ ঘোড়ায় চড়ে আসছে।

বাড চোখ সরু করে তাকিয়ে থাকে।

মারদেকা তখনও কিছু জানে না। সে ধূসর ঘোড়াটাকে নিয়ে আস্তাবলের ভেতরে ফিরছে।

কিন্তু বাডের মুখের ভাব বদলে গেছে। কারণ লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে দূর থেকে আসা প্রতিটি ঘোড়ার ধুলোকে গুরুত্ব দিতে শিখিয়েছে। আর এই ধুলোটা আসছে র&#x200d;্যাঞ্চের শহরমুখী পথ ধরে। কে আসছে, কেন আসছে, আর তার খবর কী, সেটা এখনও কেউ জানে না। 

দূরের পথের ওপর ধুলোটা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠছে। প্রথমে শুধু প্রেইরির বাদামি মাটির ওপর একটা অস্পষ্ট রেখা দেখা যাচ্ছিল, এখন বোঝা যাচ্ছে সেটি এক জায়গায় স্থির নেই, ধীরে ধীরে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছে। কখনও ধুলো বাতাসে উঠে অশ্বারোহীটাকে পুরোপুরি আড়াল করে ফেলছে, আবার পরক্ষণেই তার ভেতর থেকে ঘোড়ার মাথা আর আরোহীর টুপির কিনারা দেখা যাচ্ছে। ঘোড়ার খুরের মৃদু শব্দও এখন বাতাসে ভেসে আসছে।

বাড হিগিন্স আস্তাবলের দরজায় দাঁড়িয়ে চোখ সরু করে পথটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এক হাত দরজার কাঠে রাখা। রোদে পোড়া মুখের ওপর সকালের আলো পড়েছে, কিন্তু তার চোখে কোনো স্বস্তি নেই। পথটা ব্ল্যাক রিভারের দিক থেকে এসেছে। এই পথ তার অচেনা নয়। প্রতিদিনই কেউ না কেউ এই পথ দিয়ে র&#x200d;্যাঞ্চে আসে, আবার চলে যায়। তবু একা অশ্বারোহীটির ধীর গতির মধ্যে এমন কিছু আছে, যা বাডের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে সতর্ক করে দেয়।

আস্তাবলের ভেতরে মারদেকা তখন আর একটি ঘোড়ার খুর পরীক্ষা করছে। বাড কিছুক্ষণ তাকে লক্ষ্য করে তারপর নিচু গলায় বলে, &quot;ওদিকটা দেখো।&quot; 

সে চিবুক তুলে প্রেইরির দিকে ইঙ্গিত করে। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে কাজ থামিয়ে বাইরে আসে। কয়েক মুহূর্ত চোখ কুঁচকে দূরের পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে কোনো কৌতূহল নেই, শুধু মনোযোগ। &quot;একজন আসছে,&quot; সে ধীরে বলে।

বাড তার দিকে তাকিয়ে থাকে। &quot;আর কী দেখছ?&quot; 

মারদেকার চোখ তখনও দূরের ধুলোর ওপর স্থির। &quot;সে দ্রুত আসছে না।&quot; 

বাড এবার সামান্য ভ্রু তোলে। &quot;কীভাবে বুঝলে?&quot; 

মারদেকা উত্তর দিতে একটু সময় নেয়। তারপর বলে, &quot;ধুলো কম উঠছে। ঘোড়া দৌড়াচ্ছে না।&quot; 

কথাটা শুনে বাড আর কিছু বলে না। ছেলেটা এখন শুধু চোখ দিয়ে দৃশ্য ধরতে শেখেনি, সেই দৃশ্য থেকে সঠিক অর্থও বের করতে শিখেছে।

অশ্বারোহীটি ক্রমে কাছে আসে। লাল-সাদো একটি ঘোড়া, তার ওপর মাঝবয়সী এক লোক। মাথায় চওড়া কিনারার টুপি, গায়ে ধুলোমাখা বাদামি কোট। কোমরের কাছে চামড়ার বেল্ট দেখা যাচ্ছে। অস্ত্র আছে কি না এত দূর থেকে বোঝা যায় না। লোকটি ঘোড়াকে তাড়া দিচ্ছে না। বরং এমনভাবে এগিয়ে আসছে, যেন পথটা তার পরিচিত এবং গন্তব্য সম্পর্কে তার কোনো সন্দেহ নেই।

বাড এবার মারদেকার দিকে ফিরে বলে, &quot;লারসেনকে খবর দাও।&quot; 

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকায়। বাডের কণ্ঠে এবার এমন দৃঢ়তা যে আর কোনো প্রশ্ন করার প্রয়োজন পড়ে না। মারদেকা মাথা নাড়িয়ে র&#x200d;্যাঞ্চের মূল বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে। সে দৌড়ায় না। হাঁটার গতি অবশ্য আগের চেয়ে দ্রুত। কিন্তু যাওয়ার সময়ও একবার কাঁধের ওপর দিয়ে পথটার দিকে তাকিয়ে নেয়।

র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে তখন দিনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। ক্লে মরগান একটা ভারী কাঠের বাক্স ছায়ার মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মিগুয়েল একটা ঘোড়ার জিনের বকল পরীক্ষা করছে। রুবেন কোল পুরোনো বেড়ার খুঁটিতে হাতুড়ির আঘাত বসাচ্ছে। হ্যাঙ্ক ডসন একটু দূরে দাঁড়িয়ে একটা লাগামের চামড়া পরীক্ষা করছে। মারদেকা তাদের পাশ দিয়ে চলে যায়। কেউ তাকে থামায় না। এখন এই র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি মানুষই জানে, মারদেকা অকারণে কখনও তাড়াহুড়ো করে না।

মূল বাড়ির বারান্দায় উঠে সে দরজায় দুবার টোকা দেয়। ভেতর থেকে কাগজ সরানোর শব্দ আসে। তারপর লারসেনের কণ্ঠ শোনা যায়, &quot;এসো।&quot; 

মারদেকা দরজা খুলে ঢোকে। ঘরের ভেতরটা বাইরে থেকে অনেক ঠান্ডা। জানালার পর্দা অর্ধেক নামানো। কাঠের টেবিলের ওপর ছড়ানো কয়েকটি কাগজ, একটা পুরোনো মানচিত্র আর কালির বোতল। লারসেন মাথা নিচু করে কিছু লিখছে।

মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলে, &quot;পথে একজন আসছে।&quot; 

লারসেন লেখা থামায়। কলমটা ধীরে টেবিলের ওপর রেখে ছেলেটার দিকে তাকায়। &quot;কত দূরে?&quot; সে জানতে চায়। 

মারদেকা বলে, &quot;আস্তাবল থেকে বেশি দূরে নয়।&quot; 

লারসেন এবার উঠে দাঁড়ায়। &quot;ঘোড়া?&quot; 

&quot;লাল-সাদা।&quot; 

লারসেন কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, &quot;তুমি নিজে দেখেছ?&quot; 

মারদেকা মাথা নাড়ে। &quot;জি।&quot;

লারসেনের চোখে সামান্য আগ্রহ ফুটে ওঠে। &quot;আর?&quot; 

এবার মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, &quot;লোকটার অত তাড়াহুড়ো নেই।&quot; 

লারসেন আর কোনো প্রশ্ন করে না। শুধু দরজার দিকে এগিয়ে যায়। মারদেকা তার পেছনে বেরিয়ে আসে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে লারসেন দূরের পথের দিকে তাকায়। অশ্বারোহী এখন অনেকটাই কাছে। ঘোড়ার গায়ে জমে থাকা ঘাম রোদে চকচক করছে। খুরের আঘাতে শুকনো মাটি উঠে ছোট ছোট ধুলোর মেঘ তৈরি করছে। লারসেন নিচের উঠোনের দিকে তাকিয়ে বলে, &quot;বাড।&quot; 

বাড তখনই আস্তাবল থেকে বেরিয়ে আসে। &quot;জি?&quot; 

লারসেন শান্তভাবে বলে, &quot;লোকটাকে এখানে আসতে দাও।&quot; 

বাড মাথা নাড়ে।

মারদেকা বারান্দায় দাঁড়িয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ সে বলে, &quot;লোকটা বারবার পেছনে তাকাচ্ছে।&quot; 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকায়। তারপর নিজের চোখ পথের ওপর স্থির করে। অশ্বারোহী তখন কয়েকশো গজ দূরে। সত্যিই লোকটা একবার কাঁধ ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। কয়েক মুহূর্ত পর আবারও একই কাজ করে। লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না, কিন্তু তার দৃষ্টি আগের চেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে।

বাতাসের দিক হঠাৎ বদলে যায়। প্রেইরির ওপর দিয়ে একটা দীর্ঘ ঝাপটা এসে শুকনো ঘাসগুলোকে একসঙ্গে নুইয়ে দেয়। দূরের পাহাড়ের গায়ে সকালের আলো একটু ফিকে হয়ে আসে। অশ্বারোহী এবার র&#x200d;্যাঞ্চের ফটকের কাছে পৌঁছে যায়। বাড ফটক খুলে দাঁড়ায়। ঘোড়াটা ধীরে ভেতরে ঢোকে। লোকটি চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়, তারপর ঘোড়া থামায়।

বাড এগিয়ে গিয়ে লাগাম ধরে। লোকটি ঘোড়া থেকে নামতে নামতে বারান্দার দিকে তাকায়। তার চোখ প্রথমে লারসেনের ওপর থামে, তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মারদেকার দিকে যায়। কয়েক মুহূর্ত সে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আবার লারসেনের দিকে ফিরে বলে, &quot;ওলফ লারসেন?&quot; 

লারসেন সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়েই মাথা নাড়ে। &quot;বলে যাও।&quot;

লোকটি কোটের ভেতর হাত ঢোকায়। মারদেকার চোখ সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের দিকে চলে যায়। লারসেনও সেটা লক্ষ্য করে। লোকটি কোনো অস্ত্র বের করে না। তার বদলে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের হয়। সে কাগজটা এগিয়ে দিয়ে বলে, &quot;ব্ল্যাক রিভার থেকে পাঠিয়েছে।&quot;

লারসেন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে কাগজটা হাতে নেয়। কাগজের ওপর শহরের অফিসের সিল। সে সিলটার দিকে একবার তাকিয়ে তারপর কাগজ খুলে পড়ে। প্রথম কয়েক লাইন পড়ার সময় তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। কিন্তু নিচের দিকে যেতে যেতে তার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে ওঠে। বাড দূর থেকে সেটা লক্ষ করে। মারদেকাও লক্ষ করে। কেউ কোনো প্রশ্ন করে না।

লারসেন কাগজটা ভাঁজ করে লোকটির দিকে তাকায়। &quot;ভেতরে এসো।&quot; 

লোকটি ঘোড়ার দিকে তাকায়। বাড সঙ্গে সঙ্গে বলে, &quot;ঘোড়াটা আমি দেখছি।&quot; লোকটি লাগাম বাডের হাতে তুলে দেয়।

লারসেন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। মারদেকাও তার পেছনে যেতে চায়। কিন্তু দরজার কাছে এসে লারসেন ফিরে তাকিয়ে বলে, &quot;তুমি কাজে ফিরে যাও।&quot; 

কণ্ঠে কোনো কঠোরতা নেই, কিন্তু সিদ্ধান্তটা স্পষ্ট। 

মারদেকা থেমে যায়। &quot;জি।&quot; 

লারসেন লোকটাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।

বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে মারদেকা। বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে তার চোখে কোনো শিশুসুলভ কৌতূহল নেই। শুধু একটা স্থির ভাব। তারপর ধীরে ধীরে আস্তাবলের দিকে হাঁটে।

পথে যেতে যেতে তার চোখ বারবার চারপাশে ঘুরে যায়। উঠোনের ধুলো, বেড়ার ওপারে দুলতে থাকা ঘাস, দূরের পথ, ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়ার খুরের ছাপ, সবকিছুই তার চোখে ধরা পড়ে। কয়েক মাস আগেও এই দৃশ্যগুলো তার কাছে শুধু র&#x200d;্যাঞ্চের স্বাভাবিক অংশ ছিল। এখন প্রতিটি জিনিসের মধ্যে সে কোনো না কোনো অর্থ খুঁজতে শেখে।

আস্তাবলের দরজায় পৌঁছে মারদেকা হাত রাখে। ভেতর থেকে ঘোড়ার উষ্ণ নিঃশ্বাসের শব্দ আসে। খড়ের গন্ধ বাতাসে মিশে আছে। ছাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া রোদের সরু রেখার মধ্যে অসংখ্য ধুলোর কণা ভেসে বেড়াচ্ছে। সে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে।

কাজ আবার শুরু হয়। কিন্তু আজকের সকাল আর আগের মতো নেই।

লারসেন দরজা বন্ধ করার পর ঘরের ভেতর কিছুক্ষণ কোনো শব্দ শোনা যায় না।

বাইরে তখন র&#x200d;্যাঞ্চের স্বাভাবিক ব্যস্ততা চলছে। কোথাও ঘোড়ার খুরের শব্দ, কোথাও কাঠের বাক্স সরানোর ঘর্ষণ, কোথাও ধাতব বকলের টুংটাং। কিন্তু মূল বাড়ির এই ঘরটা যেন সেই সব শব্দ থেকে আলাদা হয়ে আছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া সকালের আলো টেবিলের ওপর পড়ে থাকা কাগজগুলোর ওপর সরু রেখা এঁকে দিয়েছে।

লারসেন টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে সেই ভাঁজ করা কাগজ।

কাগজটা সে আবার খুলে। শহরের অফিসের সিলটা একবার দেখে নেয়। তারপর নিচের অংশটায় চোখ নামায়। সেখানে কয়েকটি নাম, একটা তারিখ, আর কয়েকটি জায়গার উল্লেখ রয়েছে। শব্দগুলো খুব বেশি নয়, কিন্তু প্রতিটি শব্দের ওজন যেন আলাদা।

লারসেন ধীরে ধীরে চেয়ার টেনে বসে। কাগজটা টেবিলের ওপর রেখে সে পাশে থাকা পুরোনো মানচিত্রটা টেনে নেয়। মানচিত্রে ব্ল্যাক রিভার, র&#x200d;্যাঞ্চের অবস্থান, দক্ষিণের পাহাড় আর পশ্চিমের দীর্ঘ পথগুলো মোটা কালো রেখায় চিহ্নিত। তার আঙুল ধীরে ধীরে ব্ল্যাক রিভার থেকে পশ্চিম দিকে এগোয়।

তারপর থেমে যায়। কাগজে লেখা জায়গাটার সঙ্গে মানচিত্রের একটা দূরবর্তী অংশ মিলে যায়। লারসেনের মুখে কোনো বিস্ময় নেই। শুধু চোয়ালটা একটু শক্ত হয়ে ওঠে।

লারসেন এবার শহর থেকে আসা লোকটার দিকে তাকায়। &quot;বসো।&quot;

লোকটা সামনে থাকা কাঠের চেয়ারটায় বসে। লারসেন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর কাগজটা আঙুলের ডগায় ঠেলে টেবিলের মাঝখানে নিয়ে আসে। 

&quot;এটা তোমার হাতে কে দিয়েছে?&quot;

লোকটা সামান্য গলা পরিষ্কার করে বলে, &quot;ব্ল্যাক রিভারের মার্শাল এলি ব্রুকস।&quot;

&quot;তোমাকে আর কী বলেছে?&quot;

লোকটা এবার একটু অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসে। &quot;বলেছে, খবরটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার হাতে পৌঁছানো দরকার।&quot;

লারসেন এবার তার দিকে তাকায়। &quot;শুধু এতটুকু?&quot;

লোকটা মাথা নাড়ে। &quot;আর একটা কথা বলেছে।&quot;

&quot;কী?&quot;

&quot;শহরে কয়েকজন লোককে গত দুই দিনে দেখা গেছে। তারা নিজেদের ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু শহরের কেউ তাদের চেনে না।&quot;

ঘরের বাতাস যেন একটু ভারী হয়ে যায়।

লারসেন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। জানালার কাছে গিয়ে পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকায়। উঠোনের ওপারে কয়েকজন লোক নিজেদের কাজে ব্যস্ত। তার চোখ তাদের ওপর নয়। আরও দূরে, র&#x200d;্যাঞ্চের ফটকের বাইরে চলে যাওয়া পথের ওপর স্থির।

&quot;কতজন?&quot;

লোকটা বলে, &quot;তিনজনকে নিশ্চিতভাবে দেখা গেছে।&quot;

লারসেন ধীরে জিজ্ঞেস করে, &quot;অস্ত্র?&quot;

&quot;লুকানো ছিল। তবে চলন দেখে মনে হয়েছে, ওরা খালি হাতে নয়।&quot;

লারসেন কোনো উত্তর দেয় না। কয়েক মুহূর্ত পর সে জানালার কাছ থেকে সরে আসে। টেবিলের ওপর রাখা কাগজটা তুলে নেয়। নিচের দিকে লেখা কয়েকটি লাইন আবার পড়ে।

&quot;ওরা শহরে আছে?&quot; লোকটার কাছে জানতে চায়।

লোকটা বলে, &quot;শেষ খবর তাই।&quot;

&quot;কতক্ষণ আগে?&quot;

&quot;গত রাত।&quot;

লারসেন মাথা নিচু করে কাগজটা ভাঁজ করে। এবার তার মুখে সিদ্ধান্তের ছাপ দেখা যায়। &quot;তুমি এখন কোথায় যাবে?&quot;

লোকটা একটু অবাক হয়ে তাকায়। &quot;শহরে ফেরার কথা ছিল।&quot;

&quot;ঠিক আছে।&quot; লারসেন কাগজটা নিজের কোটের ভেতর ঢুকিয়ে নেয়। &quot;তবে সূর্য ডোবার আগে র&#x200d;্যাঞ্চ ছেড়ো না।&quot;

লোকটা এবার মাথা নাড়ে।

দরজার বাইরে হঠাৎ কারও পায়ের শব্দ শোনা যায়। দুজনেই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকায়।

শব্দটা থেমে যায়। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর দূর থেকে বাডের গলা শোনা যায়, &quot;বস!&quot;

লারসেন দরজা খুলে বাইরে আসে।

বারান্দায় বাড দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে স্বাভাবিক ভাব নেই। 

&quot;কী হয়েছে?&quot; লারসেন নিচু গলায় জানতে চায়।

বাড একটু কাছে এসে বলে, &quot;উত্তরের বেড়ার কাছে নতুন ঘোড়ার ছাপ পেয়েছি।&quot;

লারসেনের চোখ সরু হয়ে আসে। &quot;কখন?&quot;

&quot;রাতের।&quot;

&quot;নিশ্চিত?&quot;

বাড মাথা নাড়ে। &quot;পুরোনো ছাপের ওপর নতুন ছাপ পড়েছে। ঘোড়াটা র&#x200d;্যাঞ্চে ঢোকেনি। বেড়ার বাইরে থেমে ছিল।&quot;

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে, &quot;কতজন?&quot;

&quot;একজনের ছাপ পরিষ্কার।&quot; 

&quot;আর?&quot;

বাড এবার একটু থামে। &quot;আরেকটা ঘোড়া ছিল বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু বাতাসে অনেকটা মুছে গেছে।&quot;

লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন আসে না। সে বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করে।

&quot;বাড।&quot;

&quot;হ্যাঁ?&quot;

&quot;কাউকে কিছু বলবে না।&quot;

বাড মাথা নাড়ে। &quot;বুঝেছি।&quot;

লারসেন হাঁটতে শুরু করে। বাড তার পাশে আসে। দুজনেই র&#x200d;্যাঞ্চের উত্তর দিকের দিকে এগিয়ে যায়।

তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে সেই অচেনা লোকটি। সে কিছুক্ষণ দুজনের চলে যাওয়া দেখে, তারপর ধীরে ঘরের ভেতরে ফিরে যায়।

এদিকে আস্তাবলে মারদেকা কাজ করছে। বাইরের কোনো কথাই সে শুনতে পায়নি। তার সামনে এখন একটা কালো ঘোড়া। ঘোড়াটার কেশর ঘন এবং এলোমেলো। চোখ দুটো উজ্জ্বল, কিন্তু স্বভাবটা শান্ত নয়। মারদেকা তার গলায় হাত রাখতেই ঘোড়াটা মাথা সামান্য সরিয়ে নেয়। তার কান দুটো সামনের দিকে ওঠে।

আস্তাবলের বাইরে থেকে হঠাৎ একটা শব্দ আসে। খুব ক্ষীণ। ধাতব কিছু কাঠের সঙ্গে ঠেকে যাওয়ার মতো।

মারদেকা মাথা তোলে। সে ঘোড়াটার গলায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এবার তার মন পুরোপুরি বাইরে।

ধীরে আস্তাবলের দরজার কাছে যায়। দরজাটা পুরো বন্ধ নয়। কাঠের ফাঁক দিয়ে বাইরে উঠোনের একটা অংশ দেখা যায়। সেখানে তাকিয়ে সে কাউকেই দেখতে পায়না।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/263586/</link>
				<pubDate>Wed, 19 Aug 2026 03:39:41 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–তের<br />
পরদিন সকাল। সূর্য তখনও পুরোপুরি ওপরে ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু প্রেইরির বুক থেকে ভোরের শীতলতা এখনও সরে যায়নি। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের ডগাগুলো প্রথম সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। দূরের পাহাড়গুলো ধূসর নীল থেকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দক্ষিণ দিক থেকে আসা হালকা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-263586"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/263586/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">d34adebabe0078127e2f1c75e41448dc</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)
 
অধ্যায়–বারো
পরদিন ভোরে প্রেইরির ওপর এখনও রাতের শিশিরের শেষ স্পর্শ লেগে আছে। দিগন্তের পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফুটলেও চারপাশের বাতাসে ভোরের শীতলতা রয়ে গেছে। দূরের উঁচু ঘাসগুলো বাতাসে ধীরে ধীরে দুলছে, যেন অদৃশ্য কোনো স্রোত তাদের বুকের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। র&#x200d;্যাঞ্চের বিশাল চারণভূমি জুড়ে গরুগুলো অলসভাবে ঘাস খেতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও ঘোড়ারা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে, মাঝে মাঝে লেজ নেড়ে মাছি তাড়াচ্ছে। আস্তাবলের ভেতর থেকে খড়ের গন্ধ, চামড়ার জিনের গন্ধ আর ঘোড়ার উষ্ণ নিশ্বাস মিলেমিশে এক পরিচিত সকালের আবহ তৈরি করেছে।

ইলাই বরাবরের মতো সবার আগেই জেগে উঠেছে। রান্নাঘরের চুলায় কফির পাত্র চড়িয়েছে। মোটা লোহার তাওয়ায় রুটি সেঁকার শব্দ ভেসে আসছে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে ধোঁয়া উঠে ধীরে ধীরে ভোরের নীল আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর একে একে কাউবয়েরা বেরিয়ে এল। কেউ মুখ ধুচ্ছে, কেউ ঘোড়ার জিন কাঁধে তুলে নিচ্ছে, কেউ আবার কফির মগ হাতে দাঁড়িয়ে দিনের কাজের কথা বলছে। গত কয়েক সপ্তাহের অদৃশ্য চাপ তাদের মুখ থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি, কিন্তু মানুষ এমনই। বিপদ যত দীর্ঘ হয়, তাকে নিয়েই বাঁচতে শিখে যায়।

মারদেকা আগের মতোই সবচেয়ে আগে উঠে কাজ শুরু করেছে। এখন আর কেউ তাকে কী করতে হবে, সেটা বলে দিতে হয় না। কোন ঘোড়াকে আগে খাওয়াতে হবে, কোনটার পায়ের নাল আলগা, কোনটার জিনে নতুন করে তেল লাগানো দরকার, সবকিছুই সে নিজে থেকেই বুঝে নেয়। আস্তাবলের এক কোণে দাঁড়িয়ে সে একটা বাদামি ঘোড়ার কেশর আঁচড়ে দিচ্ছিল। ঘোড়াটা শান্ত হয়ে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে আছে। কাজ করতে করতে মারদেকার চোখ মাঝেমধ্যে উঠোনের দিকে চলে যাচ্ছে। কয়েক দিন ধরে সে একটা অভ্যাস গড়ে তুলেছে। কাজের ফাঁকেও চারপাশে নজর রাখা। কে কোথায় যাচ্ছে, কোন ঘোড়া অস্থির আচরণ করছে, কোন দরজাটা খোলা রয়ে গেছে, এসব যেন অজান্তেই তার চোখে ধরা পড়ে।

ওলফ লারসেন অনেকক্ষণ ধরে বারান্দা থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। বয়স তাকে ধীর করেছে, কিন্তু তার চোখের তীক্ষ্ণতা একটুও কমেনি। মারদেকাকে লক্ষ্য করতে করতে তার মনে হলো, ছেলেটাকে আর শুধু কাজ শেখানোর সময় শেষ। এখন তাকে দক্ষতা শেখাতে হবে। এমন দক্ষতা, যা একজন সাধারণ কাউবয়কে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।

ঠিক তখনই বাড হিগিন্স বারান্দায় উঠে এল। &quot;আজ কোথায় পাঠাবেন ওকে?&quot;

লারসেন মগটা নামিয়ে রাখল। &quot;আজ র&#x200d;্যাঞ্চের কোনো কাজ নেই ওর।&quot;

বাড অবাক হয়ে তাকাল। &quot;তাহলে?&quot;

লারসেন উত্তর না দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। মারদেকার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, &quot;কাজ থামাও। আমার সঙ্গে চলো।&quot;

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশটা নামিয়ে রাখল। &quot;জি।&quot;

এখন আর শব্দ বের করতে তার আগের মতো কষ্ট হয় না। বাক্য ছোট, কিন্তু উচ্চারণ অনেক পরিষ্কার।

আস্তাবলের পেছনে পুরোনো একটি শেড ছিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় বহু বছর ধরে সেখানে ভাঙা জিন, পুরোনো গাড়ির চাকা আর নষ্ট যন্ত্রপাতি ফেলে রাখা হয়েছে। র&#x200d;্যাঞ্চের লোকজন খুব একটা ওদিকে যায় না। লারসেন দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। মারদেকাও তার পেছনে ঢুকল।

ঘরটার ভেতরে আলো কম। ছাদের ফাঁক দিয়ে সূর্যের সরু কয়েকটি রেখা ধুলো ভেদ করে মেঝেতে পড়েছে। এক পাশে পুরোনো কাঠের বাক্স স্তূপ করে রাখা। অন্য পাশে দেয়ালে ঝুলছে নানা রকম দড়ি, লোহার হুক, হাতুড়ি, করাত, পুরোনো জিনের চামড়া। সবকিছুর মাঝখানে একটি লম্বা কাঠের টেবিল।

লারসেন ধীরে ধীরে টেবিলের কাছে গিয়ে নিচের ড্রয়ার খুলল। অনেকগুলো কাপড়ে মোড়া জিনিসের মধ্যে থেকে সে একটি চামড়ার খাপ বের করল। খাপটা খুব পুরোনো। 
চামড়ার রং কালচে হয়ে গেছে। কিন্তু যত্নের অভাব নেই। সে খাপটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর খুব ধীরে ভেতর থেকে একটি ছুরি বের করল।

সকালের সূর্যের একটি সরু আলোর রেখা ঠিক তখনই ফলার ওপর এসে পড়ল। ইস্পাতের চিকচিকে ধার মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরটাকে যেন অন্যরকম করে তুলল। এটা সাধারণ রান্নাঘরের ছুরি নয়। আবার বিশাল কোনো শিকারি ছুরিও নয়। ফলাটা সরু, ভারসাম্য নিখুঁত, হাতলটা পালিশ করা হরিণের শিং দিয়ে তৈরি। বহু বছর ব্যবহারের চিহ্ন আছে, কিন্তু কোথাও অবহেলার ছাপ নেই।

মারদেকা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। তার চোখে কৌতূহল।

লারসেন অনেকক্ষণ ছুরিটার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বলল, &quot;এটা আমার বাবার ছুরি।&quot;

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। বাইরে কোথাও একটা ঘোড়া হালকা হ্রেষাধ্বনি করল। দূরে হাতুড়ির শব্দ শোনা গেল।

লারসেন ছুরিটা হাতের তালুতে ঘুরিয়ে নিয়ে খুব শান্ত কণ্ঠে বলল, &quot;আজ থেকে তোমার নতুন শিক্ষা শুরু হবে।&quot; ওলফ লারসেনের কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা ছিল না। যেন প্রতিদিনের কাজের তালিকায় আরেকটি নতুন দায়িত্ব যোগ হয়েছে মাত্র। 

অথচ সেই ছোট্ট কাঠের শেডের ভেতরে দাঁড়িয়ে মারদেকার মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটির গুরুত্ব অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা। বাইরে সকালের আলো ক্রমেই উজ্জ্বল হচ্ছে, কিন্তু শেডের ভেতর এখনও আধো অন্ধকার। ছাদের পুরোনো তক্তার ফাঁক দিয়ে কয়েকটি সরু আলোর রেখা ভেতরে ঢুকে ধুলোর কণাগুলোকে ঝিকমিক করে তুলেছে। দেয়ালে ঝোলানো পুরোনো জিন, মরচে ধরা লোহার হুক, পাকানো দড়ি আর কাঠের হাতলওয়ালা যন্ত্রপাতি দেখে মনে হয়, এই ঘরটি বহু বছর ধরে র&#x200d;্যাঞ্চের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ওলফ লারসেন টেবিলের ওপর রাখা ছুরিটার দিকে কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর সেটাকে আবার ধীরে ধীরে চামড়ার খাপের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। তার প্রতিটি নড়াচড়া এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে মনে হয়, কাজটা সে হাজারবার করেছে। &quot;এটাকে অস্ত্র ভাবার আগে একটা জিনিস হিসেবে চিনতে শেখো।&quot;

মারদেকা মন দিয়ে শুনছে। তার চোখ ছুরির ওপর স্থির।

লারসেন খাপটা হাতে নিয়েই বলতে লাগল, &quot;এই একটা জিনিস দিয়ে দড়ি কাটা যায়, জিনের চামড়া ঠিক করা যায়, আগুন ধরানোর জন্য কাঠ ছাঁটা যায়, শিকার করা যায়, নিজের খাবার তৈরি করা যায়। আর যখন আর কোনো পথ থাকে না, তখন নিজের জীবনও বাঁচানো যায়।&quot;

সে আবার ছুরিটা বের করল। ফলার ওপর সকালের আলো এসে পড়তেই চিকচিক করে উঠল ইস্পাত। ফলাটার কোথাও বাড়তি কারুকাজ নেই। সৌন্দর্যের জন্য নয়, কাজের জন্য বানানো। বছরের পর বছর ব্যবহারে হাতলের হরিণশিং আরও মসৃণ হয়েছে। এমন একটা জিনিস, যেটা যত পুরোনো হয়েছে, ততই যেন ব্যবহারকারীর হাতের অংশ হয়ে উঠেছে।

&quot;বেশির ভাগ মানুষ ভুলটা এখানেই করে,&quot; লারসেন শান্তভাবে বলল, &quot;তারা ছুরিকে আগে অস্ত্র ভাবে, পরে যন্ত্র।&quot;

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। বাইরে কোথাও একটা ঘোড়া খুর ঠুকল। দূরে হাতুড়ির মৃদু শব্দ ভেসে এল। কিন্তু শেডের ভেতরে যেন সময় একটু ধীরে চলছিল। 

লারসেন ছুরিটা মারদেকার দিকে বাড়িয়ে দিল। &quot;ধরো।&quot;

মারদেকা দুহাতে ছুরিটা নিল। সে ফলায় হাত লাগাল না। হাতলের মাঝখানটা শক্ত করে ধরল। ঠান্ডা ইস্পাতের ওজন ধীরে ধীরে তার হাতে অনুভূত হলো। কয়েক মুহূর্ত সে শুধু ছুরিটা অনুভব করল। মুঠো একটু আলগা করল, আবার শক্ত করল। তারপর কবজি সামান্য ঘুরিয়ে ভারসাম্য বোঝার চেষ্টা করল।

লারসেন লক্ষ্য করছিল। &quot;কেমন লাগছে?&quot;

মারদেকা একটু ভেবে বলল, &quot;ভারসাম্য... ভালো।&quot;

&quot;কীভাবে বুঝলে?&quot;

মারদেকা নিজের হাতের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল, &quot;হাতে... টানছে না।&quot;

ঠিক তখন দরজার পাশে হালকা একটা শব্দ হলো। বাড হিগিন্স এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে কিছু বলল না। শুধু ছেলেটার হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বহু বছরের অভিজ্ঞতায় সে জানে, যে মানুষ প্রথমবার কোনো যন্ত্র হাতে নিয়ে তার ভারসাম্য অনুভব করতে পারে, সে শেখার পথ অনেকটাই পেরিয়ে এসেছে।

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, &quot;ঠিক বলেছ। যে ছুরি হাত টেনে নেয়, সেটা দীর্ঘক্ষণ ব্যবহার করা যায় না।&quot;

সে টেবিলের নিচ থেকে একটা মোটা শণের দড়ি বের করল। দড়িটার গায়ে ধুলোর আস্তরণ জমে আছে। বহুদিনের পুরোনো হলেও আঁশগুলো শক্ত। &quot;কেটে দেখো।&quot;

মারদেকা দড়িটার ওপর ছুরির ধার বসাল। স্বাভাবিকভাবেই সে হাতের জোর বাড়াতে যাচ্ছিল। 

&quot;না।&quot; লারসেনের শান্ত কণ্ঠ তাকে থামিয়ে দিল। সে মারদেকার হাত থেকে ছুড়িটা চেয়ে নিল। তারপর নিজের হাতে দড়িটা ধরে ছুরির ফলা বসাল। কোনো বাড়তি শক্তি নয়। শুধু কবজির মাপা একটি টান। মুহূর্তেই দড়িটা দু&#039;টুকরো হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। &quot;শক্তি দিয়ে নয়,&quot; বলল, &quot;ধার দিয়ে কাটতে হবে।&quot; 

সে কাটা দড়ির টুকরো মারদেকার হাতে দিল। ছুরিটা আবার ফিরিয়ে দিয়ে বলল, &quot;এবার তুমি।&quot;

মারদেকা গভীর মনোযোগে লারসেনের হাতের নড়াচড়া মনে করার চেষ্টা করল। তারপর আগের মতো চাপ না দিয়ে শুধু ফলাটাকে কাজ করতে দিল।

ফস্। দড়িটা পরিষ্কারভাবে কেটে গেল।

বাডের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

লারসেন বলল, &quot;মনে রেখো, মানুষ যত কম শক্তি খরচ করে কাজ করতে পারে, সে তত বেশি সময় টিকে থাকে। পশ্চিমে শক্তি নষ্ট করার সুযোগ খুব কম।&quot; সে টেবিল থেকে তার বাবার ছুড়ির খাপটা তুলে নিল। মারদেকাকে কোমরে সেটা জড়িয়ে নিতে বললো। 

তারপর তারা শেড থেকে বেরিয়ে খোলা জায়গায় এল। সকালের রোদ তখন আরও তীব্র হয়েছে। বাতাসে শুকনো ঘাসের গন্ধ। একটু দূরে কয়েকটা পুরোনো জুনিপার গাছের গুঁড়ি সারি করে পড়ে আছে। বছরের পর বছর রোদ-বৃষ্টি খেয়ে কাঠগুলো শক্ত পাথরের মতো হয়ে গেছে। কাছেই একপাশে পড়ে আছে কাটা ডালের স্তূপ।

লারসেন একটি গুঁড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে কোমরে রাখা নিজের ছুরিটার খাপ খুলল। &quot;আজ ছুরি ছোড়া শেখাব না।&quot;

মারদেকার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। সে হয়তো ভেবেছিল, আজই লক্ষ্যভেদ শেখানো হবে।

লারসেন সময় নিয়ে ধীরে ধীরে বলল, &quot;আগে শিখবে, ছুরি কীভাবে বের করতে হয়।&quot;

সে কোমরে খাপে রাখা ছুরির হাতলে হাত রাখল। তার আঙুলের অবস্থান, কবজির ভঙ্গি, কাঁধের স্থিরতা, সবকিছু এত স্বাভাবিক যে মনে হয় শরীর আর অস্ত্র আলাদা নয়। একটি মসৃণ টানে ছুরিটা বেরিয়ে এল। এক মুহূর্ত। তারপর আবার একই শান্ত ভঙ্গিতে খাপের ভেতর ফিরে গেল।

কোনো শব্দ নেই। কোনো অযথা প্রদর্শন নেই। শুধু অভ্যাসের নিখুঁত ছাপ।

&quot;যে মানুষ ছুরি বের করতেই হিমশিম খায়,&quot; লারসেন বলল, &quot;সে কখনও ছুরি ব্যবহার করতে পারবে না।&quot; এবার সে মারদেকার হাতের ছুড়িটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলো।

এরপর শুরু হলো অনুশীলন। কোনো লক্ষ্যবস্তু নেই। কোনো কাঠে আঘাত নয়। কোনো ছোড়াছুড়ি নয়। শুধু একই কাজ, বারবার। খাপ থেকে ছুরি বের করা। আবার খাপে ঢোকানো। আবার বের করা। আবার ঢোকানো।

প্রথম কয়েকবার মারদেকার আঙুল হাতলের ঠিক জায়গায় বসছিল না। কখনও হাত একটু বেশি ওপরে উঠে যাচ্ছিল, কখনও খাপের মুখ খুঁজে পেতে সময় লাগছিল। একবার তো অসাবধানতায় ফলার ধার প্রায় আঙুল ছুঁয়ে ফেলেছিল। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার কবজি আলতো করে ধরে ঠিক করে দিল। রাগ করল না। ধমকালও না।

শুধু বলল, &quot;ধীরে।&quot; আরেকবার বললো, &quot;তাড়াহুড়ো নয়।&quot; আবার বললো, &quot;একইভাবে।&quot;

সময় কেটে যেতে লাগল। সূর্য ধীরে ধীরে মাথার ওপর উঠে এল। গরম বাড়তে শুরু করল। মারদেকার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে গাল ভিজিয়ে দিচ্ছে। ডান হাতের কবজিতে টান ধরেছে। তবু সে থামল না। প্রতিবার আগের ভুলটা শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করল।

বাড একপাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, বাইরে থেকে দেখলে যে কেউ ভাববে এখানে কিছুই শেখানো হচ্ছে না। অথচ সে জানে, সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা সবসময় সবচেয়ে সাধারণ অনুশীলনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

প্রায় এক ঘণ্টা পরে মারদেকা টানা দশবার ছুরিটা বের করে আবার একই মসৃণতায় খাপে ফিরিয়ে রাখতে পারল। 

লারসেন প্রথমবার সন্তুষ্টির সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, &quot;এবার যথেষ্ট।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়ল। হাত ক্লান্ত, কিন্তু চোখে ক্লান্তি নেই। বরং নতুন কিছু শেখার আনন্দ স্পষ্ট।

বাড হেসে বলল, &quot;সকাল থেকে একটা দড়িও কাটতে দিলে না, একটা কাঠেও আঘাত করতে দিলে না।&quot;

লারসেন নিজের ছুরিটা কোমরে গুঁজে শান্ত স্বরে উত্তর দিল, &quot;যে হাত অস্ত্রকে সম্মান করতে শেখেনি, সেই হাতকে লক্ষ্যবস্তু দেওয়া উচিত নয়।&quot; সে একবার মারদেকার দিকে তাকাল। &quot;আজ ও ছুরি চালানো শেখেনি।&quot; একটু থেমে ধীরে যোগ করল, 
&quot;আজ ও শিখেছে, কীভাবে ছুরির ওপর নিজের হাতের নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়।&quot;

মারদেকা কিছুক্ষণ নিজের হাতে ধরা ছুরিটার দিকে তাকিয়ে রইল। ইস্পাতের ফলায় শেডের আধো অন্ধকার আলো নিঃশব্দে ঝিলিক দিচ্ছে। এতক্ষণ যে ছুরিটা শুধু একটা ধারালো জিনিস বলে মনে হচ্ছিল, এখন সেটাকে যেন অন্যরকম লাগছে। একটা অস্ত্র নয়, বহু বছরের অভিজ্ঞতার ভার যেন ওর ভেতর জমে আছে। আজ সে প্রথমবার বুঝতে পারল, একটি অস্ত্রের সবচেয়ে ধারালো অংশ তার ইস্পাত নয়। সবচেয়ে ধারালো অংশ হলো সেই হাত, যে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।

ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে হাত বাড়াল। &quot;দাও।&quot;

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটা দুই হাতে এগিয়ে দিল। কোমর থেকে খাপটাও খুলে দিল।

লারসেন অত্যন্ত যত্ন করে ছুরিটা নিল। ফলার ধার একবার চোখ বুলিয়ে দেখল, তারপর ধীরে ধীরে চামড়ার খাপের ভেতর ঢুকিয়ে কোমরে নিজের ছুরিটার পাশে গুজে দিল। কাজটা এমন স্বাভাবিকভাবে করল, যেন বহু বছরের অভ্যাসে হাত আর ছুরির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না।

শেডের বাইরে রোদের তেজ আরও বেড়েছে। খোলা দরজা দিয়ে গরম বাতাস ঢুকে আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। দূরে আস্তাবলের দিক থেকে ভেসে আসছে ঘোড়ার ডাক। কোথাও একটা হাতুড়ি নিয়মিত ছন্দে লোহার ওপর আঘাত করছে। র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি মানুষ নিজের কাজে ব্যস্ত, কিন্তু এই ছোট্ট শেডের ভেতরে যেন অন্য এক শিক্ষা চলছে, যার সঙ্গে দিনের কাজের কোনো মিল নেই।

বাড হিগিন্স দেয়ালে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এতক্ষণে সে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। &quot;প্রথম দিনের জন্য খারাপ হয়নি।&quot;
 
লারসেন তার দিকে তাকাল না। শান্ত গলায় বলল, &quot;প্রথম দিন আজও শুরু হয়নি।&quot;

বাড মৃদু হেসে চুপ করে গেল। সে জানে, লারসেন যখন এভাবে কথা বলে, তখন তার মাথায় আরও অনেক দূরের পরিকল্পনা থাকে।

লারসেন শেড থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। মারদেকা ও বাডও তার সঙ্গে বেরোল।

দুপুরের রোদে পুরো র&#x200d;্যাঞ্চ ঝলমল করছে। আস্তাবলের সামনে দুজন কাউবয় একটা কালো ঘোড়ার জিন শক্ত করে বাঁধছে। আরও দূরে কয়েকজন ভাঙা বেড়ার খুঁটি বদলাচ্ছে। শুকনো প্রেইরির ওপর গরম হাওয়ায় হালকা ধুলোর পরত ভেসে উঠছে। আকাশ এত পরিষ্কার যে অনেক ওপরে ভেসে থাকা বাজপাখিটাকেও স্পষ্ট দেখা যায়।

শেডের পেছনের খোলা জায়গায় এসে লারসেন থামল। সেখানে বহুদিন আগে কাটা একটি কটনউড গাছের মোটা গুঁড়ি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। গুঁড়িটার গায়ে অসংখ্য পুরোনো কুড়ালের দাগ। কোথাও কাঠ ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, কোথাও বৃষ্টির কালচে ছাপ এখনও রয়ে গেছে। বোঝাই যায়, বহু বছর ধরে জায়গাটা শুধু কাঠ কাটার জন্য নয়, অনুশীলনের কাজেও ব্যবহার হয়েছে।

লারসেন নিচু হয়ে মাটি থেকে একটা শুকনো আখরোট তুলে গুঁড়িটার ওপর রেখে দিল। তারপর মারদেকার দিকে তাকাল।

&quot;ওটা দেখছ?&quot;

&quot;জি।&quot;

&quot;তাহলে শুধু দেখো।&quot;

মারদেকা স্থির চোখে আখরোটটার দিকে তাকিয়ে রইল।

&quot;শুধু ওটাকে নয়,&quot; লারসেন আবার বলল, &quot;ওটার চারপাশও দেখো।&quot;

মারদেকার দৃষ্টি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হলো। গুঁড়ির গায়ের ফাটল, কাঠের রঙের পার্থক্য, ডান পাশের ছোট ছায়ার রেখা, নিচের শক্ত মাটি, তার ওপর ছড়িয়ে থাকা শুকনো পাতার টুকরো, সবকিছুই এবার আলাদা করে চোখে পড়তে লাগল।

এক ঝলক বাতাস এলো। গুঁড়ির পায়ের কাছে পড়ে থাকা শুকনো ঘাস নড়ে উঠল। মাথার ওপর দিয়ে বাজপাখিটা এক পাক ঘুরে পশ্চিমে সরে গেল। লারসেন বলল, 
&quot;পশ্চিমে লক্ষ্য কখনও একা থাকে না।&quot;

সে গুঁড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। &quot;বাতাস থাকে। আলো থাকে। ছায়া থাকে। মাটি থাকে। এগুলোর একটাও চোখ এড়িয়ে গেলে ভুল হবে।&quot;

মারদেকা এবার আর শুধু আখরোট দেখছে না। সে পুরো জায়গাটা দেখছে।

লারসেন সন্তুষ্টির সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, &quot;ভালো।&quot; তারপর ধীরে ধীরে যোগ করল, 
&quot;এখন তোমার হাতে কোনো অস্ত্র নেই। ইচ্ছে করেই নেই। কারণ আগে চোখ শিখবে, তারপর হাত। হাতকে শেখানো সহজ। চোখকে শেখাতে সময় লাগে।&quot;

বাড চুপচাপ দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিল। তার মনে পড়ল, বহু বছর আগে ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে লারসেন একদিন তাকেও প্রায় একই শিক্ষা দিয়েছিল। তখন সে বুঝতে পারেনি। আজ মারদেকার দিকে তাকিয়ে সেই দিনের কথাগুলো নতুন করে অর্থ পেল।

প্রেইরির ওপর দুপুরের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। সামনে পড়ে থাকা ছোট্ট আখরোটটা নড়েনি, কিন্তু সেটাকে দেখার ভঙ্গি বদলে গেছে। আর সেই পরিবর্তনই বুঝিয়ে দিচ্ছিল, মারদেকার শিক্ষা আজ আর শুধু হাতে সীমাবদ্ধ নেই। আজ থেকে তার চোখও শেখা শুরু করল।

সেদিনই বিকেলের রোদ ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশের দিকে হেলে পড়তে শুরু করেছে। দুপুরের সেই নির্মম তাপ আর নেই, তবে মাটির ভেতরে জমে থাকা উত্তাপ এখনও বাতাসে অনুভব করা যায়। প্রেইরির বুক জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শুকনো ঘাসের ডগাগুলো সোনালি আলোয় চকচক করছে। দূরে কোথাও একঝাঁক বুনো পাখি আচমকা উড়ে গিয়ে আবার অনেক দূরে নেমে বসল। বিশাল চারণভূমিতে ছড়িয়ে থাকা গরুগুলো ধীরে ধীরে পানির খোঁয়াড়ের দিকে এগোচ্ছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে তাদের চলার ভঙ্গিতেও যেন এক ধরনের অলসতা নেমে এসেছে।

র&#x200d;্যাঞ্চের অন্য প্রান্তেও দিনের শেষ কাজগুলো শুরু হয়ে গেছে। দুজন কাউবয় কাঁধে লম্বা বেড়ার খুঁটি নিয়ে ফিরছে। আরেকজন পুরোনো জিনে তেল মাখাচ্ছে। কামারশালার সামনে আগুনের রং ফিকে হয়ে এসেছে। লোহার ওপর হাতুড়ির শব্দ এখন অনেক কম, তবু মাঝেমধ্যে টং... টং... করে ভেসে এসে চারপাশের নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছে। আস্তাবলের ভেতর থেকে খড় চিবোনোর মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঘোড়াগুলো যেন বুঝতে পেরেছে, দিনের পরিশ্রম প্রায় শেষ।

শেডের পেছনের খোলা জায়গাটায় এই কোলাহলের কিছুই নেই। এখানে শুধু বাতাস আছে। রোদ আছে। আর আছে বহু বছরের পুরোনো সেই কটনউড গাছের গুঁড়ি, যার গায়ে অসংখ্য কুড়ালের দাগ সময়ের ইতিহাস হয়ে জমে আছে।

ওলফ লারসেন কটনউড গাছের গুঁড়িটার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে কোনো তাড়া নেই। যেন সে অপেক্ষা করছে, ছেলেটা নিজে থেকে চারপাশকে অনুভব করুক।

মারদেকাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে। এখন আর সে শুধু আখরোটটার কথা ভাবছে না। তার চোখ এদিক-ওদিক ঘুরছে। কোথায় আলো পড়েছে, কোথায় ছায়া ঘন, কোথা দিয়ে বাতাস বইছে, সবকিছুই যেন আলাদা আলাদা করে তার ভেতরে জায়গা নিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পরে লারসেন নিচু হয়ে নিজের বুটের আগা দিয়ে মাটিতে একটি সরল রেখা টেনে দিল। শুকনো ধুলো সরিয়ে গাঢ় মাটি বেরিয়ে এল। তার থেকে চার-পাঁচ হাত দূরে গিয়ে আরেকটি রেখা টানল। তারপর আরও কয়েক কদম পেছনে গিয়ে তৃতীয় রেখা।

সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তিনটি দাগের দিকে তাকিয়ে রইল। &quot;এগুলো দেখছ?&quot;

&quot;জি।&quot;

&quot;আজ তোমার কাজ খুব সহজ।&quot; 

মারদেকা মন দিয়ে শুনছে। &quot;এই প্রথম দাগে দাঁড়াও।&quot;

সে গিয়ে দাঁড়াল।

লারসেন তার চারপাশে একবার ধীরে ধীরে হাঁটল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকে ভালো করে দেখে নিল। &quot;পা দুটো খুব কাছাকাছি রেখো না।&quot;

মারদেকা সামান্য ফাঁক করল। 

&quot;এতটাও নয়।&quot; সে আবার ঠিক করল।

লারসেন নিজের পা দেখিয়ে বলল, &quot;মাটি যেন তোমাকে ধরে রাখে। তুমি যেন মাটিকে আঁকড়ে ধরতে না যাও।&quot;

মারদেকা কথাটা পুরো বুঝল কি না বোঝা গেল না, কিন্তু সে দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা আরেকবার ঠিক করল।

লারসেন এবার তার কাঁধে আলতো হাত রাখল। একটু ঘুরিয়ে দিল। তারপর কোমরের অবস্থান ঠিক করল। সবশেষে বলল, &quot;এবার চোখ তুলে সামনে তাকাও।&quot;

মারদেকা তাকাল।

&quot;কী দেখছ?&quot;

&quot;গুঁড়ি।&quot;

&quot;শুধু গুঁড়ি?&quot;

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, &quot;না... গুঁড়ির পেছনের ঘাসও।&quot;

&quot;আর?&quot;

&quot;ডান পাশে... ছায়া।&quot;

লারসেনের ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটল। &quot;ভালো।&quot; সে ধীরে ধীরে প্রথম দাগ থেকে দ্বিতীয় দাগে গিয়ে দাঁড়াল। &quot;এবার এখান থেকে দেখো।&quot;

মারদেকা এগিয়ে এল। একই গুঁড়ি। একই জায়গা। কিন্তু দৃশ্যটা বদলে গেছে।

এখান থেকে আখরোটটা একটু ছোট দেখায়। গুঁড়ির বাঁ পাশের ফাটলটা স্পষ্ট দেখা যায়। আগে চোখে না পড়া একটা শুকনো ডালও এখন দেখা যাচ্ছে।

লারসেন বলল, &quot;মানুষ ভাবে, জায়গা বদলালে শুধু দূরত্ব বদলায়।&quot; সে মাথা নাড়ল। &quot;আসলে বদলায় চোখ।&quot;

বাড এতক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে পড়ল, প্রায় পনেরো বছর আগে ঠিক এই জায়গাতেই লারসেন তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। তখন তারও মনে হয়েছিল, এসবের কোনো মানে নেই। কিন্তু পরে বুঝেছিল, বন্দুক বা ছুরি হাতে নেওয়ার বহু আগেই একজন মানুষ তার চোখ দিয়ে লড়াই করতে শেখে।

লারসেন এবার তৃতীয় দাগটার দিকে ইশারা করল। &quot;আজ এখানেই শেষ।&quot; 

মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল। &quot;কোন অস্ত্রের দরকার নেই!&quot;

লারসেনের কণ্ঠ আগের মতোই শান্ত। &quot;শরীরের ভারসাম্য না বুঝে অস্ত্র হাতে নিলে, অস্ত্রই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে।&quot; সে কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। তারপর ধীরে ধীরে যোগ করল, &quot;আগামীকাল থেকে তোমার পা শিখবে।&quot;

প্রেইরির ওপর তখন বিকেলের আলো আরও নরম হয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের রং তামাটে হয়ে উঠছে। লম্বা ছায়া কটনউডের গুঁড়ি পেরিয়ে ধীরে ধীরে শুকনো ঘাসের ভেতর গড়িয়ে যাচ্ছে। তিনজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

কেউ আর কোনো কথা বলল না। কারণ ওলফ লারসেন জানত, একজন মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার আগে তাকে মাটির ওপর ঠিকভাবে দাঁড়াতে শেখানোই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/263064/</link>
				<pubDate>Tue, 18 Aug 2026 04:10:23 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–বারো<br />
পরদিন ভোরে প্রেইরির ওপর এখনও রাতের শিশিরের শেষ স্পর্শ লেগে আছে। দিগন্তের পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফুটলেও চারপাশের বাতাসে ভোরের শীতলতা রয়ে গেছে। দূরের উঁচু ঘাসগুলো বাতাসে ধীরে ধীরে দুলছে, যেন অদৃশ্য কোনো স্রোত তাদের বুকের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। র&#x200d;্যাঞ্চের বিশাল চারণভূমি জুড়ে গরুগুলো অ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-263064"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/263064/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">9e7c0faefa9fa29cc9cd0ba6f29a1bdb</guid>
				<title>অধ্যায়–এগারো
&quot;ও... কাজ... খুঁজতে... আসেনি।&quot;

&quot;ও... ঘোড়া... গুনছিল।&quot;

দুটি ছোট্ট বাক্য যেন অফিসঘরের নিস্তব্ধ বাতাস চিরে ছড়িয়ে পড়ল। দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে বাইরে পা বাড়ানো ওলফ লারসেন আর বাড হিগিন্স একই সঙ্গে থেমে গেল। দুজনেই ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। কেরোসিনের লণ্ঠনের হলদে আলোয় মারদেকা তখনও দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। তার চোখে ভয় নেই, অহংকারও নেই। সে শুধু যা দেখেছে, তাই বলেছে। কয়েক মাস আগে যে ছেলেটি একটি শব্দও বুঝত না, আজ সে নিজের পর্যবেক্ষণকে ভাষা দিতে পেরেছে। কথাগুলো ভাঙা, উচ্চারণে জড়তা আছে, কিন্তু তাতে সত্যের ধার একটুও কমেনি।

কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। লারসেনের মতো মানুষ খুব কমই বিস্ময় প্রকাশ করে। তার মুখের রেখা প্রায় কখনও বদলায় না। অথচ এই মুহূর্তে বাড স্পষ্ট দেখল, তার চোখেও বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে মারদেকার দিকে এগিয়ে এল। ছেলেটার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। যেন প্রথমবার তাকে নতুন করে দেখছে। এই কয়েক মাসে মারদেকা লম্বা হয়েছে। কাঁধে মাংসপেশি জমতে শুরু করেছে। প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রমে তার শরীর থেকে শৈশবের দুর্বলতা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। রোদে পুড়ে গায়ের রং আরও গাঢ় হয়েছে। মুখের সরলতা এখনও আছে, কিন্তু চোখে এখন এমন এক স্থিরতা জন্ম নিয়েছে, যা বয়সের চেয়েও অনেক বেশি অভিজ্ঞতার পরিচয় দেয়।

বাডের মুখে অজান্তেই মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে শান্ত স্বরে বলল, &quot;আমি ভেবেছিলাম, তুমি শুধু শুনতে শিখেছ। এখন দেখছি, বলতে শুরু করেছ।&quot;

মারদেকা একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নিচু করল। এতদিনের নীরবতার পরে এতগুলো মানুষের সামনে মুখ খোলা তার জন্য সহজ ছিল না।

ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, &quot;তুমি কেন এমনটা মনে করলে?&quot;

মারদেকা একটু সময় নিল। শব্দ খুঁজে নিতে এখনও তার কষ্ট হয়। &quot;পানি... খাচ্ছিল।&quot; সে থামল। &quot;কিন্তু... চোখ... আস্তাবলে।&quot; আরও একটু ভেবে বলল, &quot;ঘোড়া... বেশি... দেখছিল।&quot;

বাক্যগুলো ছোট। ভাঙা। কিন্তু তার ভেতরের যুক্তি স্পষ্ট।

লারসেন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে জানালার বাইরে তাকাল। তারপর বলল, &quot;পশ্চিমে অনেকেই বন্দুক চালাতে পারে। অনেকেই ঘোড়া চালাতে পারে। কিন্তু সবাই দেখতে পারে না।&quot;

সে আবার মারদেকার দিকে ফিরে তাকাল। &quot;যে মানুষ দেখতে শেখে, সে অনেক সময় বিপদকে অন্যদের আগে চিনে ফেলে।&quot;

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। তারপর লারসেন খুব সংক্ষিপ্তভাবে বলল, &quot;আজ তুমি ভালো দেখেছ।&quot;

এটুকুই। আর কোনো প্রশংসা নয়। কিন্তু বাড জানত, ওলফ লারসেনের মুখ থেকে এই কয়েকটি শব্দ বের হওয়া সহজ ব্যাপার নয়।

লারসেন লণ্ঠনটা হাতে তুলে নিল। &quot;চলো, বাড।&quot; দুজন ধীরে ধীরে অফিসঘর থেকে বেরিয়ে এল।

বাইরে রাত অনেক গভীর। আকাশজুড়ে অগণিত তারা। দূরে প্রেইরির বুক চিরে পাহারারত কাউবয়ের লণ্ঠন ছোট্ট আলোর বিন্দুর মতো এদিক সেদিক দুলছে। কিছুক্ষণ তারা দুজনেই নীরবে হাঁটল। 

তারপর বাড নিচু গলায় বলল, &quot;ছেলেটা বদলে যাচ্ছে।&quot;

লারসেন হাঁটা থামাল না। &quot;হ্যাঁ।&quot; 

&quot;আমি ভাবিনি এত তাড়াতাড়ি ভাষাটা আয়ত্ত করবে।&quot;

লারসেন মৃদু স্বরে বলল, &quot;ভাষা শেখাটা বড় কথা নয়।&quot; সে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে যোগ করল, &quot;আমি অপেক্ষা করছিলাম, কবে ও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে শিখবে।&quot;

বাড কিছু বলল না। তার বহু বছরের অভিজ্ঞতা বলছিল, এই রাতের পর থেকে মারদেকাকে আর আগের মতো দেখা যাবে না।

পরদিন ভোরে সূর্যের প্রথম আলো প্রেইরির ওপর ছড়িয়ে পড়তেই লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ আবার জেগে উঠল। আস্তাবলে ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি, রান্নাঘর থেকে ইলাইয়ের হাঁক, উঠোনে কাউবয়দের ব্যস্ত পদচারণা, সবকিছুই আগের মতো। কিন্তু এই সাধারণ সকালের ভেতরেই অদৃশ্যভাবে একটি পরিবর্তন ঘটে গেছে।

সকালের নাশতা শেষ হওয়ার পর ওলফ লারসেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ মারদেকার কাজ লক্ষ্য করল। ছেলেটা আগের মতোই নিষ্ঠার সঙ্গে ঘোড়ার জিন পরীক্ষা করছে, পানির ট্যাংক ভরছে, তারপর একসময় নিচু হয়ে রাতের খুরের দাগগুলোও দেখে নিল। সে শুধু কাজ করছে না, চারপাশও পর্যবেক্ষণ করছে।

লারসেন তখন বাডকে ডেকে শুধু একটি বাক্য বলল, &quot;আজ থেকে মারদেকার কাজ একটু বদলাবে।&quot;

বাড হিগিন্স বারান্দা থেকে নিচের উঠোনের দিকে তাকাল। মারদেকা তখন আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে একটা ঘোড়ার কাঁধে ব্রাশ চালাচ্ছে। কাজের ভেতর এমন মনোযোগ যে আশপাশে কে কী বলছে, সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। 

বাড শান্ত গলায় বলল, &quot;কোন কাজটা দিতে চান?&quot;

ওলফ লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ ছেলেটার কাজ দেখল। তারপর বলল, &quot;যে কাজ শেখানো যায়, তার বেশির ভাগই ও শিখে ফেলেছে। এখন এমন কিছু শেখাতে হবে, যা বইয়ে লেখা থাকে না।&quot;

&quot;মানে?&quot;

&quot;পশ্চিমকে পড়তে শেখাতে হবে।&quot;

বাড চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারছিল, লারসেনের মাথায় ইতিমধ্যেই একটা পরিকল্পনা তৈরি হয়ে গেছে।

লারসেন ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠোনে নেমে এল। মারদেকা তখনও ঘোড়ার গা পরিষ্কার করছে। লারসেন কাছে আসতেই সে কাজ থামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। &quot;আজ তোমাকে আমার সঙ্গে বাইরে যেতে হবে।&quot;

মারদেকার চোখে কৌতূহল ফুটে উঠল। &quot;জি... কোথায়?&quot; ভাষাটা এখনও পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়, তবু আগের দিনের তুলনায় শব্দগুলো অনেক সহজে বেরিয়ে এল।

লারসেনের চোখের কোণে অদৃশ্য হাসি ফুটল। &quot;র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরেই। তবে কোন কাজ করতে নয়, দেখতে।&quot;

মারদেকা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন ঘোড়ায় চড়ে রওনা দিল। বাডও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। র&#x200d;্যাঞ্চের উত্তর দিকের চারণভূমি পেরিয়ে তারা ধীরে ধীরে আরও নির্জন প্রান্তে পৌঁছাল। এখানে মানুষের আনাগোনা কম। শুকনো ঘাসের ভেতর দিয়ে সরু পথ এঁকেবেঁকে চলে গেছে। দূরে নিচু টিলা, তারও ওপারে জুনিপার আর সেজব্রাশের ঝোপ।

লারসেন ইচ্ছে করেই কোনো কথা বলছিল না। শুধু এগিয়ে যাচ্ছিল। মারদেকাও নীরব। সে বুঝে গেছে, আজকের শেখাটা কথায় হবে না।

একসময় তারা একটা শুকিয়ে যাওয়া খালের ধারে থামল। জায়গাটা নিরিবিলি। চারদিকে এমন নীরবতা যে বাতাসে শুকনো পাতার ঘষাঘষির শব্দও শোনা যায়।

লারসেন ঘোড়া থেকে নেমে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসল। হাত দিয়ে ধুলো সরাল। &quot;এদিকে এসো।&quot;

মারদেকা কাছে এসে নিচু হয়ে বসল। 

লারসেন মাটির ওপর পাশাপাশি থাকা কয়েকটা খুরের দাগ দেখিয়ে বলল, &quot;বলতে পারো, কতগুলো ঘোড়া গেছে?&quot;

মারদেকা মন দিয়ে দাগগুলো দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে বলল, &quot;তিনটা।&quot;

&quot;কীভাবে বুঝলে?&quot;

&quot;দাগ... আলাদা।&quot;

লারসেন মাথা নাড়ল। &quot;আবারও দেখো।&quot;

মারদেকা এবার আরও মনোযোগ দিয়ে দেখল। একটু পরে একটা জায়গায় আঙুল রাখল। &quot;না...&quot; সে নিজের কথাই যেন নিজে ঠিক করল। &quot;চারটা।&quot;

বাড আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।

লারসেন বলল, &quot;শেষেরটা আগে যায়নি। পরে এসেছে।&quot;

মারদেকা বিস্মিত চোখে তাকাল। &quot;কীভাবে বুঝলেন?&quot;

লারসেন মাটির ওপরের দাগে আঙুল বুলিয়ে বলল, &quot;এই দাগটা অন্যগুলোর ওপর উঠে গেছে। যে পরে আসে, তার চিহ্ন আগেরটার ওপর পড়ে।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বুঝল।

লারসেন আবার বলল, &quot;মাটি কখনও মিথ্যে বলে না। মানুষ বলে।&quot; তারপর সে উঠে দাঁড়াল।

&quot;আজ থেকে তোমার কাজ শুধু ঘোড়া সামলানো নয়। প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা তুমি আমার বা বাডের সঙ্গে বের হবে। পথ দেখবে। দাগ পড়বে। বাতাসের গন্ধ চিনবে।&quot; সে চারদিকে তাকাল। &quot;পশ্চিমের সবচেয়ে বড় বইটা কাগজে ছাপা হয়নি।&quot;

মারদেকা চুপচাপ শুনছে। 

লারসেন নিচু হয়ে এক মুঠো ধুলো তুলে বাতাসে ছেড়ে দিল। ধুলোকণা বাতাসের টানে উত্তর-পশ্চিমে ভেসে গেল। &quot;এই বইটা লেখা আছে মাটিতে, ধুলোয়, ঘাসে, বাতাসে আর মানুষের ফেলে যাওয়া চিহ্নে। যে এই বই পড়তে পারে, সে অনেক সময় বন্দুক বের হওয়ার আগেই বুঝে যায় সামনে কী অপেক্ষা করছে।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল। এই প্রেইরি, এই শুকনো খাল, এই ধুলোমাখা পথ, এতদিন তার কাছে ছিল শুধু পথ আর মাটি। আজ প্রথমবার তার মনে হলো, এগুলোও কথা বলে। আর সে সেই ভাষা শিখতে শুরু করেছে।

শুকিয়ে যাওয়া খালের ধারে বেশ কিছুক্ষণ কাটানোর পর ওলফ লারসেন আবার ঘোড়ায় চড়ল। ফেরার জন্য মূল পথ ধরল না। বরং র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম দিকের উঁচু টিলাগুলোর দিকে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল। বাড হিগিন্স একবার তার দিকে তাকাল। জায়গাটা র&#x200d;্যাঞ্চের সীমানার ভেতরেই, কিন্তু কাউবয়রা খুব প্রয়োজন ছাড়া এদিকে আসে না। টিলার পর টিলা, মাঝেমধ্যে পাথুরে ঢাল, কোথাও কোমরসমান সেজব্রাশ, কোথাও খোলা পাথরের চাতাল। এখান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত প্রেইরি দেখা যায়। যে কেউ যদি র&#x200d;্যাঞ্চকে নজরে রাখতে চায়, এই জায়গাগুলোই তার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক।

তিনজন ধীরে ধীরে টিলার চূড়ায় উঠল। ওপরে উঠে মারদেকা নিজের অজান্তেই থেমে গেল। সামনে যতদূর চোখ যায়, রোদে ঝলমল করছে ঘাসের সমুদ্র। তার মাঝখানে ছড়িয়ে আছে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের চারণভূমি। আরও দূরে সরু ফিতের মতো দেখা যাচ্ছে ব্ল্যাক রিভারের দিকে চলে যাওয়া রাস্তা। মাঝে মাঝে ধুলোর মেঘ তুলে কোনো ওয়াগন এগিয়ে যাচ্ছে। এত উঁচু জায়গা থেকে পুরো এলাকাকে একসঙ্গে দেখার সুযোগ তার আগে হয়নি।

লারসেন ঘোড়া থেকে নেমে একটা চ্যাপ্টা পাথরের ওপর দাঁড়াল। &quot;যুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই ভালো যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্র দেখে নেয়।&quot;

সে চারদিকে হাত ঘুরিয়ে বলল, &quot;এখান থেকে কী দেখছ?&quot;

মারদেকা মন দিয়ে চারদিকে তাকাল। &quot;র&#x200d;্যাঞ্চ।&quot;

&quot;আর?&quot;

&quot;রাস্তা।&quot;

&quot;আর?&quot;

মারদেকা এবার আরও সময় নিয়ে দেখল। দূরে একটা সরু গিরিখাত চোখে পড়ল। আরও দূরে শুকনো নদীর আঁকাবাঁকা রেখা। সে ধীরে ধীরে বলল, &quot;ওই... গিরিখাত... লুকানো যায়।&quot;

লারসেনের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল। &quot;ঠিক।&quot; সে আর কিছু না বলে মারদেকাকে আরও কিছুক্ষণ চারপাশ দেখতে দিল।

কিছুক্ষণ পরে সে নিচু হয়ে মাটিতে একটা লাঠি দিয়ে কয়েকটা দাগ কাটল। খুব সহজ একটা মানচিত্র তৈরি হলো। র&#x200d;্যাঞ্চ, রাস্তা, টিলা, শুকনো খাল আর গিরিখাত। &quot;যদি কেউ র&#x200d;্যাঞ্চে আসতে চায়, কোন দিকটা বেছে নেবে?&quot;

মারদেকা মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে রইল। সে তাড়াহুড়ো করল না। তারপর লাঠিটা নিয়ে গিরিখাতের দিকে ইশারা করল। &quot;এখানে।&quot;

&quot;কেন?&quot;

&quot;চোখে... কম... পড়ে।&quot;

বাড এবার হেসে ফেলল। &quot;ভুল বলেনি।&quot;

লারসেন মাথা নাড়ল। &quot;যে নিজের পথ লুকাতে চায়, সে কখনও খোলা মাঠ দিয়ে আসে না।&quot;

সে লাঠিটা মাটিতে ফেলে দিল। &quot;মনে রেখো, মানুষ নিজের মতো করে ভাবে। কিন্তু বিপদ সব সময় নিজের সুবিধামতো পথ বেছে নেয়।&quot;

ফেরার সময় সূর্য অনেকটাই পশ্চিমে হেলে পড়েছে। ঘোড়াগুলো ধীরগতিতে নামছিল পাথুরে ঢাল বেয়ে। হঠাৎ মারদেকার চোখ ডান পাশের একটা জুনিপার গাছের দিকে আটকে গেল। সে কিছু না বলে ঘোড়া থামাল। 

লারসেনও সঙ্গে সঙ্গে থামল। &quot;কী হয়েছে?&quot;

মারদেকা গাছটার দিকে এগিয়ে গেল। নিচু হয়ে মাটির কাছ থেকে একটা সরু ডাল তুলে নিল। ডালটার এক পাশ অদ্ভুতভাবে কাটা। সে গাছটার কাণ্ডে হাত বুলিয়ে দেখল। তারপর বলল, &quot;এটা... স্বাভাবিক... না।&quot;

বাডও নেমে এল। গাছটার গায়ে খুব ছোট্ট একটা কাটা দাগ। দেখলে মনে হবে শুকনো ডাল ভেঙে লেগেছে। কিন্তু ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, ধারালো ধাতু দিয়ে একবার টেনে কাটা হয়েছে।

লারসেন কিছুক্ষণ দাগটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চারপাশে চোখ বুলিয়ে শান্ত গলায় বলল, &quot;পুরোনো।&quot; সে আঙুল দিয়ে দাগের শুকিয়ে যাওয়া অংশ ছুঁয়ে দেখাল। 
&quot;কমপক্ষে কয়েক সপ্তাহ আগের।&quot;

বাড বলল, &quot;কাউবয়দের কাজ?&quot;

&quot;হতে পারে। আবার নাও হতে পারে।&quot; এর বেশি কিছু বলল না লারসেন। কারণ প্রমাণ ছাড়া সে কখনও সিদ্ধান্ত নেয় না।

তারা আবার ঘোড়ায় চড়ে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে ফিরতে লাগল। মারদেকা একবার পেছন ফিরে সেই জুনিপার গাছটার দিকে তাকাল। ছোট্ট একটা কাটা দাগ। হয়তো তুচ্ছ। হয়তো নয়। সে বুঝতে পারল, পশ্চিমে সব রহস্য রক্ত আর গুলির শব্দ দিয়ে শুরু হয় না। কখনও কখনও একটি অদ্ভুত দাগই অনেক বড় গল্পের প্রথম বাক্য হয়ে দাঁড়ায়।

র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরতে ফিরতে সূর্য প্রায় দিগন্ত ছুঁয়ে ফেলেছে। পশ্চিমের আকাশে লাল, কমলা আর বেগুনি রঙের দীর্ঘ রেখা ছড়িয়ে আছে। শুকনো ঘাসের মাথায় সেই আলো পড়ে যেন আগুনের আভা জ্বলছে। দূরে গবাদি পশুর পাল ধীরে ধীরে নিজেদের ঘেরের দিকে ফিরছে। কাউবয়দের শিস, ঘোড়ার খুরের শব্দ আর গরুর ডাক মিলে সন্ধ্যার পরিচিত সুর তৈরি করেছে। দিনের ব্যস্ততা শেষ হওয়ার মুখে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ যেন আবার নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছে। অথচ ওলফ লারসেনের মনে আজ সারাদিন ধরে একটি কথাই ঘুরছে। মারদেকার চোখ। ছেলেটা শুধু দেখে না, দেখার পর মনে রাখেও।

রাতের খাবার শেষ হওয়ার পর প্রতিদিনের মতো পাহারার নতুন পালা দায়িত্ব বুঝে নিল। কয়েকজন কাউবয় লণ্ঠন হাতে উত্তর আর পশ্চিমের বেড়ার দিকে চলে গেল। দুজন দক্ষিণের চারণভূমির দিকে রওনা হলো। একজন আস্তাবলের পাশে থেকে গেল। গত কয়েক সপ্তাহে এই নিয়ম সবার কাছে অভ্যাস হয়ে গেছে। কেউ আর প্রশ্ন করে না কেন এত সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ প্রত্যেকেই বুঝেছে, যে বিপদ দেখা যায় না, তাকে হালকাভাবে নেওয়াই সবচেয়ে বড় ভুল।

খাওয়াদাওয়ার পরে ওলফ লারসেন বারান্দায় বসে পাইপে আগুন ধরাল। বাড হিগিন্স এসে পাশের চেয়ারে বসল। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ উঠোনের দিকে তাকিয়ে রইল। একটু দূরে মারদেকা দিনের শেষে ব্যবহৃত জিন, লাগাম আর রশিগুলো গুছিয়ে তাদের নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দিচ্ছে। কাজ শেষ হওয়ার পরও সে তাড়াহুড়ো করে ঘুমাতে যায় না। কোনো না কোনো কিছু পরীক্ষা করে দেখে। কোথাও বকলস আলগা আছে কি না, চামড়ার বেল্ট শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে কি না, পানির পাত্র ভরা আছে কি না।

বাড ধীরে ধীরে বলল, &quot;ওকে আজ সারাক্ষণ লক্ষ্য করছিলাম।&quot;

লারসেন পাইপ থেকে ধোঁয়া ছাড়ল। &quot;কী দেখলে?&quot;

&quot;আপনি যখন খালের ধারে খুরের দাগ দেখাচ্ছিলেন, ও শুধু আপনার কথাই শোনেনি। আপনি কোথায় দাঁড়াচ্ছেন, কীভাবে দাগ ছুঁয়ে দেখছেন, সেটাও লক্ষ করছিল।&quot;

লারসেন মৃদু হাসল। &quot;সেটাই শেখার প্রথম ধাপ।&quot;

বাড বলল, &quot;বেশির ভাগ মানুষ উত্তর মুখস্থ করে। ও পদ্ধতিটা শিখছে।&quot;

কিছুক্ষণ নীরবতা। দূরে পাহারায় থাকা এক কাউবয়ের শিস ভেসে এল। তারপর আবার সব শান্ত।

লারসেন ধীরে ধীরে বলল, &quot;আমার বয়স যখন ওর মতো ছিল, আমার বাবা আমাকে একটা কথা বলেছিলেন।&quot;

বাড তার দিকে তাকাল। &quot;তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমে সবচেয়ে দামি জিনিস জমি নয়, গরু নয়, সোনাও নয়। সবচেয়ে দামি জিনিস হলো বিচারবুদ্ধি। সেটা হারালে বন্দুকও মানুষকে বাঁচাতে পারে না।&quot;

বাড মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। &quot;মারদেকার মধ্যে সেই বিচারবুদ্ধির শুরুটা দেখা যাচ্ছে।&quot;

&quot;তাই ওকে তাড়াহুড়ো করে কিছু শেখানো যাবে না।&quot; লারসেনের কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু দৃঢ়। &quot;ভিত শক্ত না হলে বড় মানুষ হওয়া যায় না।&quot;

এই সময় ইলাই বারান্দায় উঠে এল। তার হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির পাত্র। হেসে বলল, &quot;আজ তোমাদের দুজনের আলোচনার কি কোন শেষ আছে?&quot;

বাড মুচকি হেসে কাপ এগিয়ে দিল। ইলাই কফি ঢালতে ঢালতে বলল, &quot;ছেলেটা কিন্তু আজ দুপুরে আমাকে অবাক করেছে।&quot;

লারসেন তাকাল। &quot;কী করেছে?&quot;

&quot;রান্নাঘরে এসে প্রথমবার নিজে থেকে বলেছে, &#039;আর পানি লাগবে?&#039;&quot;

ইলাইয়ের চোখে স্নেহের হাসি। &quot;একসময় একটা কথাও বলতে পারত না। এখন নিজের থেকে জিজ্ঞেস করছে।&quot;

কেউ কিছু বলল না। ছোট্ট ঘটনাও কখনও কখনও বড় পরিবর্তনের আভাস দেয়।

কফি শেষ করে লারসেন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। বারান্দা থেকে নামতে নামতে তার চোখ গেল আস্তাবলের দিকে। মারদেকা এখনও সেখানে।

একটা পুরোনো চামড়ার লাগাম হাতে নিয়ে সে মন দিয়ে সেলাইয়ের জায়গাটা পরীক্ষা করছে। তারপর খুব যত্ন করে তেল মাখিয়ে সেটাকে আবার ঝুলিয়ে রাখল। কাজটা করার জন্য কেউ তাকে বলেনি। তবু সে করছে। কারণ সে এখন বুঝতে শিখেছে, ভালো র&#x200d;্যাঞ্চ শুধু বড় গবাদি পশুর পাল দিয়ে গড়ে ওঠে না। ছোট ছোট যত্ন দিয়েই তার ভিত্তি শক্ত হয়।

লারসেন কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, &quot;কাল থেকে আরেকটা নতুন কাজ শুরু হবে।&quot;

বাড প্রশ্ন করল না। সে জানত, লারসেন যখন এভাবে বলে, তখন সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়ে গেছে।

রাত আরও গভীর হলো। আস্তাবলের লণ্ঠন নিভে গেল। এক এক করে র&#x200d;্যাঞ্চের সব আলো অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল। শুধু দূরের প্রেইরিতে পাহারারত কাউবয়দের লণ্ঠনগুলো নক্ষত্রের মতো জ্বলতে থাকল। 

আর সেই রাতেই, নিজের ছোট্ট ঘরে শুয়ে মারদেকা অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারল না। বারবার তার মনে পড়ছিল লারসেনের কথাগুলো। &quot;পশ্চিমের সবচেয়ে বড় বইটা লেখা আছে মাটিতে, ধুলোয়, ঘাসে আর বাতাসে।&quot;

সে জানত না, আগামী দিনের পাঠ শুধু সেই বই পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

খুব শিগগিরই তাকে হাতে তুলে দেওয়া হবে এমন একটি জিনিস, যা পশ্চিমের প্রতিটি মানুষের সাথে থাকে, কিন্তু খুব কম মানুষই তার প্রকৃত মূল্য বুঝতে শেখে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/262777/</link>
				<pubDate>Mon, 17 Aug 2026 13:26:54 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অধ্যায়–এগারো<br />
&#8220;ও&#8230; কাজ&#8230; খুঁজতে&#8230; আসেনি।&#8221;</p>
<p>&#8220;ও&#8230; ঘোড়া&#8230; গুনছিল।&#8221;</p>
<p>দুটি ছোট্ট বাক্য যেন অফিসঘরের নিস্তব্ধ বাতাস চিরে ছড়িয়ে পড়ল। দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে বাইরে পা বাড়ানো ওলফ লারসেন আর বাড হিগিন্স একই সঙ্গে থেমে গেল। দুজনেই ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। কেরোসিনের লণ্ঠনের হলদে আলোয় মারদেকা তখনও দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। তার চোখে ভয় নেই, অহংকারও নেই। সে শুধু যা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-262777"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/262777/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">c2f478aaa14c572c94c6f5d6535d6832</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–দশ
ব্ল্যাক রিভার শহরের মানুষ নতুন আগন্তুকটিকে আর দ্বিতীয়বার খেয়াল করল না। পশ্চিমের এই ছোট্ট শহরে প্রায়ই নানা জায়গা থেকে পথিক আসে, দুদিন থাকে, আবার চলে যায়। কেউ ভাগ্যের সন্ধানে, কেউ গবাদি পশুর ব্যবসায়, কেউ বা কেবল পথের ক্লান্তি মেটাতে। তাই ধুলোমাখা পোশাক পরা এক অচেনা লোককে নিয়ে কারও কৌতূহল জাগল না। লোকটা ধীরে ধীরে প্রধান সড়ক ধরে হাঁটতে হাঁটতে শহরের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে দেখল। কোথায় লোহার কারখানা, কোথায় খাদ্যশস্যের গুদাম, কোথায় ডাকঘর, কোথায় মার্শাল এলি ব্রুকসের অফিস, সবকিছুই যেন অন্যমনস্ক চোখে দেখে নিচ্ছে। কিন্তু তার দৃষ্টি কখনও অস্থির হলো না। বহুদিনের অভ্যাসে সে এমনভাবে চারপাশ লক্ষ করছিল, যেন সে কিছুই দেখছে না।

একসময় সে শহরের শেষ প্রান্তে এসে থামল। এখান থেকে কাঁচা পথটা সোজা চলে গেছে ওলফ লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে। সে বেশিক্ষণ দাঁড়াল না। পথের ধারে পড়ে থাকা শুকনো একটা ডাল জুতোর আগা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে আবার শহরের ভেতর ফিরে গেল। দূর থেকে দেখলে মনে হতো, লোকটা শুধু পথ হারিয়ে এদিকটায় চলে এসেছিল। কিন্তু তার চোখে যে হিসাব চলছিল, সেটা কেউ বুঝতে পারল না।

সেই সময় লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে সকাল অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। সূর্যের আলোয় শিশির শুকিয়ে গেছে। চারণভূমির দিকে গবাদি পশুর দীর্ঘ সারি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। মারদেকা আজ বাড হিগিন্সের সঙ্গে নয়, ক্লে মরগানের সঙ্গে কাজ করছে। লারসেন ইচ্ছে করেই কয়েক সপ্তাহ ধরে তাকে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কাজ করাচ্ছে। প্রত্যেক কাউবয়ের কাজের ধরন আলাদা। বাড ধৈর্য নিয়ে শেখায়, ক্লে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত, মিগুয়েল অল্প কথা বলে কিন্তু কাজে কখনও ভুল করে না। লারসেন চায়, মারদেকা শুধু একজনের কাছ থেকে নয়, সবার কাছ থেকেই কিছু না কিছু শিখুক।

আজ তাদের দায়িত্ব ছিল দক্ষিণের চারণভূমিতে ছড়িয়ে থাকা ছোট একটা গবাদি পশুর দলকে মূল পালের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া। কাজটা সহজ মনে হলেও বাস্তবে তা নয়। কোনো পশু যদি ভয় পেয়ে ভুল দিকে দৌড় দেয়, তাহলে বাকিরাও তাকে অনুসরণ করে। তখন পুরো পাল সামলাতে অনেক সময় লেগে যায়।

ক্লে খুব কম কথা বলে কাজ করছিল। সে শুধু হাতের ইশারা আর ঘোড়ার গতির মাধ্যমে মারদেকাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল কোন দিক দিয়ে এগোতে হবে। কয়েক মাস আগের মারদেকা হলে হয়তো উত্তেজনায় ঘোড়া ছুটিয়ে পশুগুলোকে আরও ভয় পাইয়ে দিত। কিন্তু আজ সে ধৈর্য ধরল। ঘোড়াটাকে অযথা দৌড় করাল না। ধীরে ধীরে বৃত্ত তৈরি করে একপাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া তিনটি বাছুরকে আবার মূল দলের দিকে ফিরিয়ে আনল।

দূর থেকে ক্লে পুরো দৃশ্যটা লক্ষ্য করছিল। কাজ শেষ হলে সে কিছুক্ষণ মারদেকার দিকে তাকিয়ে থেকে শুধু বলল, &quot;এবার ঠিক করেছ।&quot;

একজন কম কথার মানুষের মুখে এই চারটি শব্দই ছিল বড় পুরস্কার।

দুপুরের আগে তারা গবাদি পশুগুলোকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনল। র&#x200d;্যাঞ্চের ফটকের কাছে পৌঁছাতেই ইলাই বারান্দা থেকে হাত তুলে ডাকল। দুপুরের খাবার তৈরি।

ঘোড়া থেকে নামতে নামতে মারদেকা খেয়াল করল, ওলফ লারসেন উঠোনে দাঁড়িয়ে দূরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি স্থির। যেন সে কারও অপেক্ষা করছে।

ঠিক তখনই ধুলোমাখা রাস্তার অনেক দূরে একটা ছোট্ট বিন্দু নড়তে দেখা গেল।

একটি মাত্র ঘোড়া। আরোহী ধীরে ধীরে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকেই এগিয়ে আসছে। এত দূর থেকে মানুষটিকে চেনার উপায় নেই। উঠোনে উপস্থিত প্রায় সবাই স্বাভাবিকভাবেই একবার তাকাল।

কিন্তু ওলফ লারসেনের চোখে যে সতর্কতা ফুটে উঠল, তা মারদেকার দৃষ্টি এড়াল না। ছেলেটা অজান্তেই অনুভব করল, এই আগন্তুক হয়তো কেবল পথ জিজ্ঞেস করতে আসেনি।

র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে তখন দুপুরের কাজ প্রায় থেমে এসেছে। গবাদি পশুর একটা অংশকে ছায়ার দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আস্তাবল থেকে ভেসে আসছে ঘোড়ার নড়াচড়ার শব্দ। ইলাই বারান্দা থেকে আবার একবার খাবারের জন্য ডাক দিলেও কেউ আর সেদিকে মন দিল না। দূরের ধুলোমাখা রাস্তা ধরে আসা একাকী আরোহী এখন অনেকটাই কাছে চলে এসেছে।

লোকটা র&#x200d;্যাঞ্চের প্রধান ফটকের কাছে এসে ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিল। তারপর বিনা তাড়াহুড়োয় ভেতরে ঢুকল। তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। রোদে পোড়া মুখ, গালের ডান পাশে পুরোনো একটা দাগ, মাথায় বিবর্ণ বাদামি টুপি। ধুলোমাখা কোটের নিচে সাধারণ শার্ট, কোমরে পুরোনো রিভলভার। তাকে দেখে কোনো কুখ্যাত বন্দুকবাজ বলে মনে হয় না। বরং বহু পথ ঘোরা একজন সাধারণ পথিক বলেই মনে হয়।

সে ঘোড়া থেকে নেমে প্রথমেই টুপিটা খুলে সম্মান জানাল। &quot;শুভ দুপুর।&quot;

ওলফ লারসেনও শান্ত গলায় উত্তর দিল। &quot;শুভ দুপুর।&quot;

লোকটা চারদিকে একবার তাকিয়ে বলল, &quot;একটু পানি পাওয়া যাবে?&quot;

ইলাই ইতিমধ্যেই বারান্দা থেকে নেমে এসেছে। পশ্চিমের অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী পথিককে পানি না দেওয়া অভদ্রতা। সে কোনো প্রশ্ন না করেই ঠান্ডা পানিভরা একটা টিনের মগ এগিয়ে দিল। লোকটা ধীরে ধীরে পানি খেল। তারপর মগটা ফিরিয়ে দিয়ে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মাথা ঝুঁকাল। &quot;ধন্যবাদ।&quot;

লারসেন এবার জিজ্ঞেস করল, &quot;কোথা থেকে আসছ?&quot;

লোকটা এক মুহূর্তও দেরি না করে উত্তর দিল, &quot;উত্তরের দিক থেকে। কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজের খোঁজে ঘুরছি। শুনেছিলাম ব্ল্যাক রিভারে কাজের অভাব নেই। শহরে আজ সকালটা কাটালাম, দু&#039;এক জায়গায় কথাও বললাম। কিন্তু আমি যে ধরনের কাজ জানি, সেরকম কিছু এখনও জোটেনি। তাই ভাবলাম আশপাশের কয়েকটা র&#x200d;্যাঞ্চেও একবার খোঁজ নিয়ে দেখি।&quot;

কথাগুলো শুনে সন্দেহ করার মতো কিছু নেই। ব্ল্যাক রিভারের মতো ব্যস্ত শহরে কাজের সন্ধানে মানুষ আসেই। তবু লারসেনের অভিজ্ঞ চোখ অন্য কিছু লক্ষ করছিল। লোকটা যতবার কথা বলছে, ততবারই তার চোখ নিঃশব্দে র&#x200d;্যাঞ্চের বিভিন্ন দিকে ঘুরে যাচ্ছে। একবার আস্তাবল, একবার গবাদি পশুর ঘেরা, একবার পানির ট্যাংক, তারপর অফিসঘরের দিকে। দৃষ্টিটা এত দ্রুত যে সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়বে না। কিন্তু ওলফ লারসেন বহু বছর ধরে মানুষের চোখ পড়তে শিখেছে।

সে আবার জিজ্ঞেস করল, &quot;কী কাজ জানো?&quot;

&quot;ঘোড়া সামলাতে পারি। গবাদি পশু নিয়েও কাজ করেছি। প্রয়োজন হলে বেড়া মেরামত, মাল টানা, সবই করি।&quot;

লারসেন শুধু মাথা নেড়ে রইল।

ঠিক সেই সময় মারদেকা আস্তাবলের পাশ থেকে সবকিছু দেখছিল। কথাবার্তার অনেকটাই সে এখন বুঝতে পারে। কয়েক মাস আগে হলে এত দ্রুত ইংরেজি ধরতে পারত না। আজ সে শুধু কথাই শুনছিল না, লোকটার আচরণও লক্ষ করছিল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল লোকটার ঘোড়ার ওপর।

ঘোড়াটা বাদামি রঙের। শক্তসমর্থ। কিন্তু তার বাঁ দিকের সামনের নালে একটা ছোট ভাঙা অংশ রয়েছে।

মারদেকার বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল।

সকালে বাড হিগিন্স তাকে যে খুরের দাগ দেখিয়েছিল, তার একটাতেও ঠিক এমনই ভাঙা নালের ছাপ ছিল।

সে নিশ্চিত হতে পারল না। হয়তো এটা নিছক কাকতালীয়। পশ্চিমে হাজার হাজার ঘোড়ার নাল ভাঙে। তবু তার চোখ আর ঘোড়াটার পা থেকে সরল না।

ঠিক তখনই বাড হিগিন্স ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। সে প্রথমে লোকটার মুখের দিকে নয়, সরাসরি ঘোড়ার সামনের পায়ের দিকে তাকাল। তারপর এক মুহূর্তের জন্য তার চোখের সঙ্গে মারদেকার চোখ মিলল।

কোনো কথা হলো না। কোনো ইশারাও নয়। কিন্তু দুজনেই বুঝে গেল, তারা একই জিনিস লক্ষ্য করেছে।

লারসেন তখনও এমনভাবে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছিল, যেন তার মনে কোনো সন্দেহই নেই।

কিছুক্ষণ পরে সে বলল, &quot;খেয়ে তারপর যেও। পথ এখনও অনেক বাকি।&quot;

লোকটা কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে মাথা নোয়াল। &quot;আপনার এই উপকার মনে থাকবে।&quot;

দুপুরের খাবারের সময় অতিথিকেও টেবিলে বসানো হলো। সে ধীরে সুস্থে খাচ্ছে, মাঝেমধ্যে পথের গল্প করছে, কোথায় কোথায় ঘুরেছে সে কথা বলছে। কিন্তু মারদেকা লক্ষ্য করল, লোকটা যখনই কথা থামাচ্ছে, তখনই চোখ দিয়ে নিঃশব্দে চারপাশ মেপে নিচ্ছে। যেন প্রতিটি মুখ, প্রতিটি ভবন, প্রতিটি দরজা, এমনকি উঠোনের দূরত্বও মনে গেঁথে রাখছে।

খাওয়া শেষ করে লোকটা আবার ঘোড়ায় চড়ল। বিদায় জানিয়ে ধীরে ধীরে প্রধান রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল।

সে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার পর বাড নিচু গলায় মারদেকাকে বলল, &quot;ওর ঘোড়ার বাঁ দিকের সামনের নালটা দেখেছ?&quot;

মারদেকা শান্তভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

বাড আর কিছু বলল না। এখনও অভিযোগ তোলার সময় আসেনি।

কিন্তু সকালের সেই খুরের দাগ আর এই ভাঙা নাল, দুটো একসঙ্গে মিলিয়ে তার অভিজ্ঞ মন প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে সতর্ক হয়ে উঠল।

র&#x200d;্যাঞ্চ আবার নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এল। অতিথি চলে গেছে, উঠোনে আর তার কোনো চিহ্ন নেই। গবাদি পশুর পাল আবার চারণভূমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। আস্তাবলে ঘোড়াগুলোকে পরিচর্যা করা হচ্ছে। দূরে লোহার কারিগরের হাতুড়ির টংটং শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, কয়েক ঘণ্টা আগে এখানে কোনো অচেনা পথিক এসেছিল, এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। কিন্তু ওলফ লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে যারা বহুদিন ধরে কাজ করছে, তারা সবাই বুঝতে পারছিল, অদৃশ্যভাবে কিছু একটা বদলে গেছে।

বিকেলের দিকে বাড হিগিন্স লারসেনের অফিসঘরে ঢুকল। ভেতরে তখন লারসেন খোলা হিসাবের খাতা দেখে কিছু লিখছিল। জানালার ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের আলো কাঠের মেঝেতে লম্বা ছায়া ফেলেছে। বাড দরজা বন্ধ করে ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল।

&quot;লোকটার ব্যাপারে আপনার কী মনে হলো?&quot;

লারসেন কলমটা নামিয়ে রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

&quot;মিথ্যে বলেছে, এমন বলতে পারছি না।&quot;

বাড মাথা নেড়ে বলল, &quot;আমিও না।&quot;

&quot;কিন্তু সব সত্যিও বলেনি।&quot; দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল।

এত বছরের একসঙ্গে কাজের পর তারা জানে, সন্দেহ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। শুধু সন্দেহের ওপর ভর করে কাউকে শত্রু বানানো যায় না। আবার সন্দেহকে পুরোপুরি উপেক্ষাও করা যায় না।

বাড ধীরে ধীরে বলল, &quot;ওর ঘোড়ার ভাঙা নালটা সকালে দেখা দাগের সঙ্গে মিলে যায়।&quot;

লারসেন মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবল। &quot;মিলে যেতে পারে। আবার কাকতালীয়ও হতে পারে।&quot;

&quot;হতে পারে।&quot;

&quot;তবে একটা কথা ঠিক।&quot;

&quot;কী?&quot;

&quot;লোকটা র&#x200d;্যাঞ্চ দেখতে এসেছিল।&quot;

অফিসঘরে আবার নীরবতা নেমে এল। ঠিক সেই সময় দরজায় মৃদু শব্দ হলো।

মারদেকা ভেতরে ঢুকে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। ইলাই তাকে পাঠিয়েছে। হিসাবের খাতাগুলো আবার আলমারিতে তুলে রাখতে হবে। সে নিঃশব্দে কাজ শুরু করল। কিন্তু কাজ করতে করতেই বাড আর লারসেনের কথাগুলো তার কানে যাচ্ছিল।

বাড নিচু গলায় বলল, &quot;যদি ও সত্যিই খবর নিতে এসে থাকে, তাহলে আবারও আসবে।&quot;

লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। &quot;হ্যাঁ। তবে পরেরবার হয়তো একা আসবে না।&quot;

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।

মারদেকা শেষ খাতাটা হাতে তুলে আলমারির দিকে এগোল। কিন্তু তার মনে বারবার ভেসে উঠছিল দুপুরের সেই লোকটার মুখ। তার হাঁটার ভঙ্গি। কথা বলার সময় চোখের দৃষ্টি। আর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছিল ঘোড়াটার আচরণ।

সে জীবনে খুব কম মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। কিন্তু মানুষকে দেখেছে অনেক। নিজের গ্রামে শিকারিদের দেখেছে। ব্যবসায়ীদের দেখেছে। সীমান্তের পথ ধরে চলা কাফেলাও দেখেছে। কেউ যখন সত্যিই ক্লান্ত হয়, তখন সে প্রথমে পানি খোঁজে, তারপর ছায়া। কেউ যখন কাজের খোঁজে আসে, তখন মানুষের মুখের দিকে বেশি তাকায়। কিন্তু লোকটা যেন মানুষের চেয়ে জায়গাগুলোকে বেশি দেখছিল।

মারদেকা ধীরে ধীরে খাতাটা আলমারিতে রেখে জানালার বাইরে তাকাল। দূরে আস্তাবলের সামনে কয়েকটা ঘোড়া নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে আছে।

সেই লোকটাও সবচেয়ে বেশি সময় সেদিকেই তাকিয়েছিল। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে উঠল। সে যেন কোনো অদৃশ্য সূত্রের খুব কাছে পৌঁছে গেছে। কিন্তু এখনও সেই সূত্রকে ভাষায় প্রকাশ করার মতো আত্মবিশ্বাস তার হয়নি। সে শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

ওলফ লারসেন একবার আড়চোখে ছেলেটার দিকে তাকাল। গত কয়েক মাসে সে অনেক বদলেছে। আগে মারদেকা শুধু কাজ দেখত। এখন সে কাজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কারণও খুঁজতে শুরু করেছে।

লারসেন মনে মনে বুঝল, একজন ভালো কাউবয় তৈরি হতে পরিশ্রম লাগে। কিন্তু একজন ভালো পর্যবেক্ষক তৈরি হতে লাগে সময়। আর সেই সময়টা হয়তো ধীরে ধীরে এসে গেছে।

বাইরে তখন সূর্য পশ্চিমের টিলার আড়ালে ডুবে গেছে। দিনের শেষ আলো মিলিয়ে যেতেই র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে একে একে লণ্ঠন জ্বলে উঠল। সারাদিনের কাজের পর সবাই রাতের খাবার খেয়ে যে যার দায়িত্বে ছড়িয়ে পড়ল। নিরাপত্তার নতুন নিয়ম এখন আর আলাদা করে কারও মনে করিয়ে দিতে হয় না। নির্দিষ্ট সময়েই পাহারার পালা বদল হলো। একজন কাউবয় উত্তর দিকের বেড়া ধরে এগিয়ে গেল, আরেকজন দক্ষিণের চারণভূমির দিকে ঘোড়া ছোটাল। দূরে কোথাও ঘোড়ার খুরের মৃদু শব্দ শোনা গেল, তারপর আবার চারদিক আগের মতো নিশ্চুপ হয়ে রইল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে যেন কোনো অশান্তির ছায়াই নেই। অথচ এই নীরবতার আড়ালেই প্রত্যেকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক।

রাত আরও গভীর হলে ওলফ লারসেন নিজের অফিসঘরে বসে দিনের হিসাবপত্র গুছিয়ে রাখছিল। টেবিলের ওপর রাখা কেরোসিনের লণ্ঠনের হলুদ আলোয় কাঠের দেয়ালে লম্বা ছায়া পড়েছে। কিছুক্ষণ পরে বাড হিগিন্স ভেতরে ঢুকল। দরজা বন্ধ করে সে চুপচাপ একটা চেয়ারে বসল। অনেক বছরের সঙ্গী হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে কথার চেয়ে নীরবতার মূল্যই বেশি।

কিছুক্ষণ পরে লারসেন খাতাটা বন্ধ করে বলল, &quot;লোকটার কথা মাথা থেকে যাচ্ছে না।&quot;

বাড ধীরে ধীরে মাথা তুলল। &quot;আমারও না।&quot;

&quot;তুমি কী দেখলে?&quot;

বাড একটু ভেবে বলল, &quot;যে মানুষ সত্যিই কাজ খোঁজে, সে কাজের কথা বলে। লোকটা বলছিল ঠিকই, কিন্তু তার চোখ অন্য জায়গায় ছিল।&quot;

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। লণ্ঠনের শিখাটা হালকা দুলে উঠল। বাইরে রাতের বাতাস জানালার পাল্লায় আলতো ধাক্কা দিল।

কিছুক্ষণ পরে বাড আবার বলল, &quot;খুরের দাগের সঙ্গে ওর ঘোড়ার নাল মিলেছে। সেটা কাকতালীয়ও হতে পারে।&quot;

&quot;হতে পারে।&quot;

&quot;কিন্তু একটা ব্যাপার কাকতালীয় বলে মনে হচ্ছে না।&quot;

&quot;কোনটা?&quot;

&quot;ও র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটা কোণ দেখছিল।&quot;

লারসেন এবার ধীরে ধীরে জানালার বাইরে তাকাল। অন্ধকারে আস্তাবলের ছায়া অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ সে কোনো কথা বলল না।

তারপর শান্ত গলায় বলল, &quot;আমাদের হাতে এখনও সন্দেহ আছে। প্রমাণ নেই।&quot;

বাড উঠে দাঁড়াল। &quot;তাহলে?&quot;

&quot;অপেক্ষা।&quot;

একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের ভেতরেই ছিল বহু বছরের অভিজ্ঞতা।

এই সময় দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মারদেকা। ইলাই তাকে হিসাবের খাতাগুলো গুছিয়ে রাখতে পাঠিয়েছিল। কাজ শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। তবু সে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। দুপুরের সেই পথিকের প্রতিটি মুহূর্ত যেন এখনও তার চোখের সামনে ভাসছে। লোকটা পানি খাচ্ছে। কথা বলছে। ঘোড়ার জিন ঠিক করছে। অথচ তার দৃষ্টি বারবার ঘুরে যাচ্ছে আস্তাবল, বেড়া আর চারণভূমির দিকে।

লারসেন লণ্ঠনটা হাতে তুলে নিল। &quot;চলো, বাড। আজ আর কিছু বোঝা যাবে না।&quot;

দুজন ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। অফিসঘরের ভেতর তখন শুধু মারদেকা দাঁড়িয়ে। দরজার চৌকাঠে এসে লারসেন একবার থামল। তারপর বাইরে পা বাড়াল।

ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে ভেসে এল একটি কণ্ঠ।

ধীর। জড়ানো। কিন্তু একেবারে স্পষ্ট।

&quot;ও... কাজ... খুঁজতে... আসেনি।&quot;

দুজনেই থেমে গেল। 

অফিসঘরের ভেতর থেকে আবার সেই কণ্ঠ শোনা গেল।

&quot;ও... ঘোড়া... দেখছিল।&quot;
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/261785/</link>
				<pubDate>Sat, 15 Aug 2026 03:58:02 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–দশ<br />
ব্ল্যাক রিভার শহরের মানুষ নতুন আগন্তুকটিকে আর দ্বিতীয়বার খেয়াল করল না। পশ্চিমের এই ছোট্ট শহরে প্রায়ই নানা জায়গা থেকে পথিক আসে, দুদিন থাকে, আবার চলে যায়। কেউ ভাগ্যের সন্ধানে, কেউ গবাদি পশুর ব্যবসায়, কেউ বা কেবল পথের ক্লান্তি মেটাতে। তাই ধুলোমাখা পোশাক পরা এক অচেনা লোককে নিয়ে কারও কৌতূহল জাগল না।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-261785"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/261785/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">cd1be44c2bb921fcb6678c27f6f25f21</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–নয়
বিকেলের শেষ আলো নিভে যাওয়ার আগেই ওলফ লারসেন ব্ল্যাক রিভার শহর ছেড়ে র&#x200d;্যাঞ্চের পথে রওনা হয়েছিল। সারাদিনের গরমের পর প্রেইরির বাতাসে হালকা শীতলতা নেমে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ধীরে ধীরে টিলার আড়ালে ডুবে যাচ্ছে, তার লালচে আলো শুকনো ঘাসের সমুদ্রজুড়ে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। লারসেনের ঘোড়া পরিচিত পথ ধরে স্থির গতিতে এগিয়ে চলেছে। তার চোখ সামনে, কিন্তু মন পড়ে আছে মার্শাল এলি ব্রুকসের অফিসে। চারজন অচেনা ঘোড়সওয়ারের খবর, গত দুই মাসের অস্বাভাবিক চলাফেরা, পাহাড়চূড়ার নজরদারি, সবকিছু মিলিয়ে তার বহু বছরের অভিজ্ঞতা একটাই কথা বলছে, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। কেউ একজন ধৈর্য ধরে সময়ের অপেক্ষা করছে।

র&#x200d;্যাঞ্চের ফটক চোখে পড়তেই সে দেখল, উঠোনে এখনও কাজ চলছে। গবাদি পশুর একটা দলকে ঘেরার ভেতরে ঢোকানো হচ্ছে। ক্লে মরগান আর মিগুয়েল শেষ কয়েকটা গরুকে তাড়িয়ে আনছে। বাড হিগিন্স আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে একটা ঘোড়ার সামনের পা পরীক্ষা করছে। দূরে রান্নাঘরের চিমনি দিয়ে ধোঁয়া উঠছে। ইলাই নিশ্চয়ই রাতের খাবারের শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবকিছুই স্বাভাবিক, তবু আজ এই পরিচিত দৃশ্যের দিকে তাকিয়েও লারসেনের মনে এক ধরনের অদ্ভুত সতর্কতা কাজ করল। এতদিন সে এই র&#x200d;্যাঞ্চকে নিজের পরিশ্রমে গড়ে তুলেছে। এখন প্রথমবারের মতো মনে হলো, এই বিস্তীর্ণ জমিটাকে শুধু চালালেই হবে না, রক্ষা করতেও হবে।

মারদেকা ঠিক তখনই পানির বড় কাঠের পিপে থেকে বালতি ভরে আস্তাবলের পাশে রাখা লোহার টবে ঢালছিল। কয়েক মাস আগের সেই ক্লান্ত, ভীত, পথহারা ছেলেটাকে এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তার চলাফেরায় আত্মবিশ্বাস এসেছে, কাজের ভঙ্গিতে এসেছে অভ্যাস। বাড দূর থেকে কিছু বলার আগেই সে অনেক কাজ বুঝে করতে পারে। লারসেনকে ফিরতে দেখে সে বালতিটা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মুখে কোনো প্রশ্ন নেই, কিন্তু চোখে কৌতূহল স্পষ্ট।

লারসেন ঘোড়া থেকে নেমে লাগামটা বাডের হাতে দিল। বাড এক নজর তার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে গেল, শহরে যা আলোচনা হয়েছে, তা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।

সে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, &quot;খারাপ কিছু?&quot;

লারসেন চারপাশে একবার তাকিয়ে বলল, &quot;সবাইকে খাওয়ার পর অফিসঘরে আসতে বলো। কথা আছে।&quot; এইটুকুই। এর বেশি কিছু বলল না সে।

বাড আর কোনো প্রশ্ন করল না। এত বছর একসঙ্গে কাজ করতে করতে সে জানে, ওলফ লারসেন যখন নিজে থেকে কথা গোপন রাখে, তখন তার পেছনে যথেষ্ট কারণ থাকে।

রাত নেমে আসতে বেশি সময় লাগল না। একে একে সবাই খাওয়া শেষ করল। ইলাই টেবিল গুছিয়ে আগুনে আরেকটু কাঠ দিল। বাইরে প্রেইরির ওপর পূর্ণ অন্ধকার নেমে এসেছে। দূরে কোথাও একটা কায়োটির দীর্ঘ ডাক ভেসে এল, তারপর আবার চারদিক নিস্তব্ধ।

লারসেনের অফিসঘরে একটা বড় তেলের বাতি জ্বলছে। কাঠের টেবিলের চারপাশে বাড, ক্লে, মিগুয়েল, রুবেন কোল আর হ্যাঙ্ক ডসন বসে আছে। মারদেকা প্রথমে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ভেবেছিল, বড়দের আলোচনায় তার থাকার কথা নয়। কিন্তু লারসেন দরজার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, &quot;তুমিও ভেতরে এসো।&quot;

ছেলেটা একটু ইতস্তত করলেও শেষ পর্যন্ত ভেতরে এসে দরজার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

লারসেন ধীরে ধীরে সবার মুখের দিকে তাকাল। তারপর কোনো ভূমিকা না করেই শহরে মার্শাল এলি ব্রুকসের সঙ্গে হওয়া পুরো কথোপকথন সংক্ষেপে জানিয়ে দিল। পশ্চিমের ফেরিঘাট, অচেনা ঘোড়সওয়ার, গত কয়েক মাসের সন্দেহজনক চলাফেরা, পাহাড়ের চূড়া থেকে নজরদারি, সবই।

ঘরের ভেতর কেউ কথা বলল না।

ক্লে প্রথম নীরবতা ভাঙল। &quot;তাহলে ব্যাপারটা শুধু আমাদের র&#x200d;্যাঞ্চের নয়।&quot;

&quot;না,&quot; লারসেন বলল। &quot;আজ আমাদের দিকে নজর। কাল অন্য কারও দিকে যেতে পারে।&quot;

মিগুয়েল ধীরে ধীরে বলল, &quot;আমরা কী করব?&quot;

লারসেন টেবিলের ওপর দু হাত রাখল। &quot;ভয় পাব না। কিন্তু অসতর্কও থাকব না। গতকাল থেকে পাহারার নিয়ম যেভাবে বদলেছে, সেভাবেই চলবে। কেউ একা দূরে যাবে না। টিলা, নদীর ধারের পথ আর পশ্চিমের চারণভূমিতে নজর বাড়ানো হবে। তবে মনে রেখো, কাউকে দেখলেই গুলি চালাবে না। আমরা এখনও জানি না, শত্রু কে।&quot;

বাতির আলোয় বসে থাকা সবাই গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মারদেকা এক এক করে সবার মুখের দিকে তাকাল। সব কথা সে বুঝতে পারল না, কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট বুঝল। এতদিন সে এই র&#x200d;্যাঞ্চকে শুধু নিজের আশ্রয় হিসেবে দেখেছে। আজ প্রথমবার তার মনে হলো, এই জায়গাটার ওপর সত্যিই কোনো অদৃশ্য বিপদ নেমে আসছে। আর সেই বিপদের কথা জেনেও এখানকার কেউ পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে না। সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকার।

সেদিন রাতেই মারদেকার মনে আরেকটি নতুন উপলব্ধির জন্ম হলো। পশ্চিমে সাহস মানে শুধু বন্দুক চালানো নয়। কখনও কখনও সাহস মানে অন্ধকার নেমে আসার আগেই তাকে চিনে নেওয়া, আর ভোর না ফোটা পর্যন্ত নিজের জায়গা ছেড়ে না যাওয়া।

রাতের বৈঠক শেষ হওয়ার পর র&#x200d;্যাঞ্চের জীবন আবার নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে গেল। তবে সেই ছন্দের ভেতরে কোথাও যেন এক অদৃশ্য পরিবর্তন স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে। আজকের রাতের পাহাড়ায় যারা থাকবে, তারা প্রস্তুতি নিতে বেরিয়ে গেল। বাকীরা সবাই নিশ্চুপ থাকলো। কেউ আর অকারণে উচ্চস্বরে কথা বললো না। দূরে ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনে বুঝলো পাহারাদরা কাজে যোগ দিল।  যাবার ফাঁকে একবার মাথা তুলে আস্তাবলের দরজা, গুদামের তালা, পানির ট্যাংক, সবকিছু একবার করে চোখ বুলিয়ে নিল। নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা করে কাজ করা এখন র&#x200d;্যাঞ্চের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ হয়ে গেছে।

পরদিন সকালে সূর্য ওঠার আগেই বাড হিগিন্স মারদেকাকে নিয়ে র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম দিকের চারণভূমির দিকে বেরিয়ে পড়ল। দুজনেই ঘোড়ায় চড়ে এসেছে। কয়েক মাস আগেও মারদেকাকে ঘোড়ার পিঠে ঠিকমতো বসে থাকতে শেখাতে হয়েছে। এখন সে নিজের ভারসাম্য এমনভাবে ধরে রাখতে পারে যে মাঝারি গতিতে ছুটলেও আর দুলে যায় না। বাড ইচ্ছে করেই কোনো কথা বলছিল না। সে জানে, আজকের শিক্ষা কান দিয়ে নয়, চোখ দিয়ে নিতে হবে।

চারণভূমির শেষ প্রান্তে গিয়ে তারা ঘোড়া থেকে নামল। জায়গাটা অনেকটাই নির্জন। সামনে নিচু একটা শুকনো খাল, তার ওপারে ঢেউ খেলানো প্রেইরি। দূরে কয়েকটা জুনিপার আর কটনউড গাছ ছাড়া আর কিছু নেই। সকালের রোদ এখনও তেমন তেজি হয়নি। শিশিরে ভেজা মাটি নরম। বাড হাঁটু গেড়ে বসে আঙুল দিয়ে মাটির ওপর একটা খুরের ছাপ দেখাল।

মারদেকা প্রথমে বিশেষ কিছু বুঝতে পারল না। তার চোখে সব ছাপই প্রায় একই রকম। বাড কোনো ব্যাখ্যা দিল না। সে শুধু ইশারা করে ছাপটার চারপাশ দেখতে বলল।

মারদেকা আরও কাছে ঝুঁকে বসল। এবার সে লক্ষ করল, ছাপের কিনারাগুলো বেশ ধারালো। ধুলোর ওপর এখনও হালকা ভেজা ভাব আছে। মনে হচ্ছে খুব বেশিক্ষণ আগে এটা তৈরি হয়নি।

বাড সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নেড়ে আরেকটু সামনে হাঁটল। কয়েক গজ দূরে গিয়ে আরেকটা খুরের দাগ দেখাল। দেখতে প্রায় একই রকম, কিন্তু এবার মারদেকা নিজেই পার্থক্যটা খুঁজতে চেষ্টা করল। এই দাগের ভেতরে শুকনো ধুলো জমে গেছে। একপাশের কিনারা ভেঙেও পড়েছে। সে মাথা তুলে বাডের দিকে তাকাতেই বাডের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। ছেলেটা না শুনেও শিখছে।

এরপর বাড নিজের ঘোড়াটাকে কয়েক গজ দূরে নিয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটিয়ে আনল। তারপর আবার থামল। এবার মাটিতে পাশাপাশি তিন রকমের দাগ। একটি পুরোনো, একটি কয়েক ঘণ্টার, আর একটি একেবারে নতুন। সে কোনো কথা না বলে মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল।

মারদেকা এক এক করে সবগুলো পরীক্ষা করল। কখনও বসে, কখনও হাঁটু গেড়ে, কখনও আলোয় চোখ সরু করে। তারপর দ্বিধা না করেই নতুন দাগটার ওপর হাত রাখল।

বাড এবার প্রথমবারের মতো মুখ খুলল। &quot;ভালো।&quot;

একটি মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই একটি শব্দের মূল্য মারদেকার কাছে অনেক বড়। এতদিনে সে বুঝে গেছে, বাড হিগিন্স অকারণে প্রশংসা করে না।

কিছুক্ষণ পর তারা আরও পশ্চিমে এগোল। সেখানে মাটির ধরন বদলে গেছে। কোথাও শক্ত কাঁকর, কোথাও শুকনো ঘাস, কোথাও আবার বালির আস্তরণ। বাড এবার বোঝাল, সব জায়গায় খুরের ছাপ একভাবে থাকে না। শক্ত মাটিতে দাগ কম পড়লেও ছোট ছোট পাথরের অবস্থান বদলে যায়। শুকনো ঘাস মাড়িয়ে গেলে ঘাস সোজা হতে সময় লাগে। আবার বালির ওপর বাতাসও অনেক সময় চিহ্ন মুছে দেয়। তাই একজন দক্ষ ট্র্যাকার কখনো শুধু এক জায়গার দিকে তাকায় না। সে চারপাশ মিলিয়ে দেখে।

মারদেকা গভীর মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি বিষয় মনে রাখছিল। তার মনে হচ্ছিল, এতদিন সে প্রেইরিকে শুধু দেখেছে। আজ প্রথমবার সে যেন প্রেইরির ভাষা পড়তে শিখছে। এই মাটিরও স্মৃতি আছে। যে মানুষ বুঝতে পারে, তার কাছে প্রতিটি দাগ, প্রতিটি ভাঙা ডাল, প্রতিটি চাপা ঘাস একেকটা বাক্য হয়ে ওঠে।

ঠিক তখনই বাড হঠাৎ হাঁটা থামিয়ে দিল। সে নিচু হয়ে মাটির একটা জায়গা পরীক্ষা করল। তারপর কয়েক পা সামনে গিয়ে আবার থামল। এবার তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে।

মারদেকাও এগিয়ে এল। সে দেখল, শুকনো মাটির ওপর পাশাপাশি দুটো ঘোড়ার খুরের দাগ। দাগ দুটো খুব নতুন নয়, আবার খুব পুরোনোও নয়। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেগুলো র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে আসেনি, র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম সীমানা ঘেঁষে অনেকটা পথ গিয়ে আবার উত্তর-পশ্চিমের দিকে ফিরে গেছে।

বাড অনেকক্ষণ কিছু বলল না। তারপর খুব ধীরে চারদিকে একবার তাকাল। তার অভিজ্ঞ চোখ বলছিল, এটা হয়তো কেবল দুজন পথচারীর চিহ্ন। কিন্তু তার বহু বছরের প্রবৃত্তি আরেকটা কথাও বলছিল। কেউ একজন কয়েক দিন আগে এখান দিয়ে শুধু পথ অতিক্রম করেনি। সে এই জায়গাটা মন দিয়ে দেখে গেছে।

বাড হিগিন্স আরও কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ একবার মাটির দিকে, একবার দিগন্তের দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বহু বছরের অভিজ্ঞতায় সে জানে, প্রেইরিতে সব খুরের দাগই সন্দেহের নয়। কাউবয়, শিকারি, পথহারা ভ্রমণকারী, এমনকি পাশের র&#x200d;্যাঞ্চের লোকজনও মাঝেমধ্যে এদিক দিয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু অভিজ্ঞ মানুষের চোখ শুধু দাগ দেখে না, দাগের উদ্দেশ্যও বোঝার চেষ্টা করে। এই দুটি ঘোড়া কোথাও থামেনি, গবাদি পশুর পালের দিকে যায়নি, পানির উৎসের দিকেও নয়। বরং লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম সীমানা বরাবর অনেকটা পথ এগিয়ে আবার ফিরে গেছে। যেন কেউ দূর থেকে পুরো জায়গাটা দেখে নিয়ে চলে গেছে।

মারদেকা বাডের মুখের দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারছিল, এই দাগগুলো সাধারণ নয়। বাড এবার মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে নিজের আঙুল দিয়ে কয়েকটি চিহ্ন দেখাল। একটি জায়গায় ঘোড়ার খুর একটু গভীরভাবে বসেছে। তার পাশেই ঘাস চাপা পড়ে আছে। তারপর সে হাত তুলে সামনে থাকা টিলাটার দিকে ইশারা করল।

মারদেকা মাথা তুলে তাকাল। টিলাটা খুব উঁচু নয়। কিন্তু সেখানে দাঁড়ালে র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিমের চারণভূমি, আস্তাবলের দিকের পথ, এমনকি প্রধান ফটকের আশপাশও অনেক দূর পর্যন্ত চোখে পড়ে। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার মনে পড়ে গেল কয়েক সপ্তাহ আগে রাতের অন্ধকারে সেই টিলার কাছাকাছি দুটি অচেনা ঘোড়সওয়ারকে দেখা গিয়েছিল। তারা কোনো ঝামেলা করেনি, শুধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গিয়েছিল। আজকের দৃশ্যটা যেন সেই স্মৃতিকেই আরও বাস্তব করে তুলল।

বাড এবার উঠে দাঁড়াল। সে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইল না। অকারণে ভয় পাওয়াও যেমন ভুল, তেমনি অকারণে নিশ্চিন্ত থাকাও বোকামি। সে কোমর থেকে ছোট একটা ভাঁজ করা ছুরি বের করে পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা শুকনো জুনিপার গাছের গায়ে অতি ছোট্ট একটা দাগ কেটে দিল। তারপর মারদেকার দিকে তাকিয়ে ইশারায় বোঝাল, জায়গাটা মনে রাখতে হবে। পরে দরকার হলে আবার এখানে ফিরে আসবে।

ফিরতি পথে দুজনের কেউই খুব একটা কথা বলল না। সকাল গড়িয়ে তখন প্রায় দুপুর। প্রেইরির ওপর গরম বাড়তে শুরু করেছে। দূরে গবাদি পশুর পাল নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে। সবকিছুই স্বাভাবিক। অথচ বাডের মাথার ভেতর বারবার ঘুরে ফিরছে সেই দুটি খুরের দাগ।

র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরে প্রথমেই সে ওলফ লারসেনকে খুঁজল। লারসেন তখন কাঠের বেড়ার একটা অংশ মেরামত করা দেখছিল। বাড কাছে গিয়ে সংক্ষেপে সব কথা জানাল। কোথায় দাগ দেখা গেছে, কতটা নতুন, কোন দিকে গেছে, সবই।

লারসেন মন দিয়ে শুনল। তারপর কোনো প্রশ্ন না করে কয়েক মুহূর্ত পশ্চিমের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখে উদ্বেগের ছাপ নেই, কিন্তু চোখ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। &quot;চিহ্নটা রেখে এসেছ?&quot;

বাড মাথা নেড়ে বলল, &quot;হ্যাঁ।&quot;

&quot;ভালো করেছ।&quot; এর বেশি কিছু বলল না লারসেন। কারণ এখনও হাতে কোনো প্রমাণ নেই। শুধু সন্দেহের ওপর ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া তার স্বভাব নয়। কিন্তু সে এটাও জানে, প্রেইরির প্রতিটি বড় ঘটনা শুরু হয় এমনই ছোট্ট কোনো ইঙ্গিত দিয়ে।

বিকেলের দিকে সে মারদেকাকে নিজের অফিসঘরে ডাকল। ছেলেটা ভেতরে ঢুকতেই লারসেন টেবিলের ওপর রাখা ব্ল্যাক রিভার ও আশপাশের এলাকার একটা পুরোনো মানচিত্র খুলে দিল। এত বড় কাগজে আঁকা পুরো অঞ্চল মারদেকা আগে কখনও দেখেনি। নদী, টিলা, শুকনো খাল, চারণভূমি, শহরের রাস্তা, সবকিছুই তাতে চিহ্নিত।

লারসেন আঙুল দিয়ে র&#x200d;্যাঞ্চের অবস্থান দেখাল। তারপর পশ্চিমের সেই টিলার দিকে ইশারা করল, যেখানে আজ বাড আর মারদেকা গিয়েছিল। এরপর দু জায়গার মাঝখানে আঙুল চালিয়ে ধীরে ধীরে ছেলেটার দিকে তাকাল।

মারদেকা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। কিন্তু একটু পরেই তার চোখে উপলব্ধির ঝলক দেখা দিল। সে বুঝতে শুরু করেছে, র&#x200d;্যাঞ্চ শুধু কয়েকটা ঘর, আস্তাবল আর গবাদি পশুর সমষ্টি নয়। চারপাশের পাহাড়, টিলা, নদী, শুকনো খাল, পুরোনো পথ, সবকিছু মিলিয়েই এই ভূমি। যে এই ভূখণ্ডকে চেনে, সে অনেক সময় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তার আভাস পেয়ে যায়।

ওলফ লারসেন ছেলেটার চোখের সেই পরিবর্তনটা লক্ষ করল। কিছু বলল না। শুধু মনে মনে ভাবল, ঠিক এই কারণেই সে মারদেকাকে অন্যদের মতো শুধু কাজ শেখাচ্ছে না। সে চাইছে, একদিন এই ছেলেটা যেন পুরো পশ্চিমকে পড়তে শেখে, যেমন একজন মানুষ একটি খোলা বই পড়ে।

ঠিক সেই সময়, ব্ল্যাক রিভারের পশ্চিমে বহু দূরের এক নির্জন গিরিখাতের আড়ালে চারটি ঘোড়া বাঁধা ছিল। তাদের মালিকেরা আগুন জ্বালায়নি। দিনের আলো পুরোপুরি ফুরিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় তারা নীরবে বসে ছিল। তাদের একজন কোমর থেকে ভাঁজ করা একটা মানচিত্র বের করে মাটিতে মেলে ধরল। আঙুলের ডগা ধীরে ধীরে এক জায়গায় গিয়ে থামল। লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ।

কেউ কোনো কথা বলল না। তবু নীরবতার ভেতরেই বোঝা গেল, অপেক্ষার সময় ধীরে ধীরে শেষের দিকে এগিয়ে আসছে।

অন্ধকার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে গিরিখাতের ওপর আকাশটা তারায় ভরে উঠল। চারটি ঘোড়া নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে শুকনো ঘাস খাচ্ছিল। তাদের মালিকেরা আগুন জ্বালাল না। ধোঁয়া অনেক দূর থেকে দেখা যায়, আর তারা চাইছিল না এই অঞ্চলে তাদের উপস্থিতির কোনো চিহ্ন রেখে যেতে। কয়েক মুহূর্ত আগে যে মানচিত্রটা মাটিতে বিছানো ছিল, সেটি আবার গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে। 

চারজনের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে প্রবীণ লোকটি চারপাশে একবার তাকিয়ে ধীর গলায় বলল, &quot;আরও কিছুদিন। তারপর আমরা ঠিক করব, কোথা থেকে শুরু করা হবে।&quot;

অন্য একজন নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, &quot;লারসেন?&quot;

লোকটা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে কোমর থেকে একটা ছোট দূরবীন বের করে পশ্চিমের টিলার দিকে তাকাল। তারপর দূরবীনটা নামিয়ে বলল, &quot;না। তাড়াহুড়ো করলে ভুল হবে। আগে নিশ্চিত হতে হবে, কারা ওর পাশে দাঁড়াবে, আর কারা দাঁড়াবে না।&quot;

তার কথায় আর কেউ আপত্তি করল না। তারা সবাই জানে, প্রেইরিতে বন্দুকের গুলির চেয়েও মূল্যবান জিনিস হলো ধৈর্য। যে আগে নিজের রাগ দেখায়, সে অনেক সময় নিজের দুর্বলতাও প্রকাশ করে ফেলে।

এদিকে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে রাতের খাবার শেষ হয়েছে। দিনের পরিশ্রমে সবাই ক্লান্ত। কেউ নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে, কেউ আস্তাবলে শেষবারের মতো ঘোড়াগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। ইলাই রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। এত বছর এই র&#x200d;্যাঞ্চে কাটানোর পরও তার একটা অভ্যাস বদলায়নি। ঘুমোতে যাওয়ার আগে সে একবার পুরো উঠোনটা দেখে নেয়। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।

মারদেকা আস্তাবলের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের দায়িত্বের শেষ কাজটুকু করছিল। সে একে একে ঘোড়াগুলোর পানির পাত্র পরীক্ষা করে দেখল। তারপর খড়ের গাদার পাশে রাখা কাঠের দরজাটা ভালোভাবে বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এল। কাজ শেষ হলেও সে সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ফিরল না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পশ্চিমের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। দিনের বেলায় বাডের সঙ্গে দেখা সেই খুরের দাগ দুটো বারবার তার মনে পড়ছিল। সে জানে না কেন, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, সেই দাগগুলো শুধু মাটিতে নয়, তার মনেও যেন একটা চিহ্ন এঁকে রেখে গেছে।

ঠিক তখনই পেছন থেকে ওলফ লারসেনের কণ্ঠ ভেসে এল। &quot;কী দেখছ?&quot;

মারদেকা চমকে ফিরে তাকাল। লারসেন ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। দুজনেই কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। সামনে শুধু অন্ধকার প্রেইরি। দূরে টিলার কালো রেখা। তার ওপরে অসংখ্য তারা।

লারসেন শান্ত গলায় বলল, &quot;পশ্চিমকে ভয় করলে এখানে টিকে থাকা যায় না। আবার পশ্চিমকে অবহেলাও করা যায় না।&quot;

মারদেকা মন দিয়ে তার কথা শুনছিল।

&quot;আজ তুমি মাটির দাগ পড়তে শিখছ। কাল হয়তো মানুষের দাগও পড়তে শিখবে। মনে রেখো, মানুষের মুখ অনেক সময় মিথ্যা বলতে পারে। কিন্তু তার কাজ খুব কমই মিথ্যা বলে।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কথাগুলোর পুরো অর্থ হয়তো সে আজ বুঝতে পারছে না। কিন্তু সে অনুভব করল, ওলফ লারসেন তাকে শুধু র&#x200d;্যাঞ্চের কাজ শেখাচ্ছে না। তাকে এমনভাবে গড়ে তুলছে, যাতে একদিন সে নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে মানুষ আর পরিস্থিতিকে চিনতে পারে।

পরদিন সকালটা ছিল অস্বাভাবিক শান্ত। সূর্যের আলোয় ভেজা প্রেইরি যেন আগের দিনের সব দুশ্চিন্তা ভুলে গেছে। গবাদি পশুর পাল স্বাভাবিক নিয়মে চারণভূমির দিকে এগিয়ে চলেছে। কাউবয়েরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত। দূর থেকে দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না, এই র&#x200d;্যাঞ্চের মানুষগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক।

কিন্তু ঠিক সেই সময় ব্ল্যাক রিভার শহরের পশ্চিম প্রান্তে এক অচেনা লোক ঘোড়া থেকে নেমে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে প্রধান সড়কের দিকে হাঁটা দিল। তার পোশাক ছিল সাধারণ পথিকের মতো। কোমরে পুরোনো রিভলভার। মুখে ক্লান্তির ছাপ। তাকে দেখে কেউ দ্বিতীয়বার ফিরে তাকাল না।

লোকটা ধীরে ধীরে রাস্তার দুপাশের দোকানগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে এগিয়ে চলল। কোথাও থামল না। কারও সঙ্গে কথা বলল না। কিন্তু তার তীক্ষ্ণ চোখ যেন শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিঃশব্দে মেপে নিচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরে সে একবার মাথা ঘুরিয়ে শহরের শেষ প্রান্তের দিকে তাকাল, যেখানে রাস্তা ধরে এগোলেই পৌঁছানো যায় ওলফ লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে।

তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। তারপর সে আবার ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।

ব্ল্যাক রিভারের মানুষ তখনও জানত না, তাদের শহরে একজন নতুন আগন্তুক এসেছে। কিন্তু সেই মানুষটির আগমন নিছক ভ্রমণ ছিল না। সে এসেছিল দেখতে, মনে রাখতে, আর সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/261042/</link>
				<pubDate>Thu, 13 Aug 2026 06:33:14 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–নয়<br />
বিকেলের শেষ আলো নিভে যাওয়ার আগেই ওলফ লারসেন ব্ল্যাক রিভার শহর ছেড়ে র&#x200d;্যাঞ্চের পথে রওনা হয়েছিল। সারাদিনের গরমের পর প্রেইরির বাতাসে হালকা শীতলতা নেমে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ধীরে ধীরে টিলার আড়ালে ডুবে যাচ্ছে, তার লালচে আলো শুকনো ঘাসের সমুদ্রজুড়ে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। লারসেনের ঘোড়া পরিচিত পথ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-261042"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/261042/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">839b6c54a27f17ab58c8efcd36fffa60</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–আট
ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশের বিশাল প্রেইরিটা ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করল। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের ডগায় সূর্যের আলো পড়ে অসংখ্য কাচের টুকরোর মতো ঝিকমিক করছে। দূরের টিলাগুলো নীলচে কুয়াশার আড়ালে আধো দেখা যাচ্ছে। কোথাও একটা কোয়েল ডেকে উঠল, তারপর আবার চারদিকে নেমে এল গভীর নিস্তব্ধতা। সেই নীরবতা ভাঙল আস্তাবলের ভেতর থেকে ভেসে আসা ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি আর লোহার নালের ঠকঠক শব্দে। র&#x200d;্যাঞ্চের আর সব সকালের মতোই কাজ শুরু হয়েছে, কিন্তু আজকের বাতাসে এমন একটা অদৃশ্য টান লেগে আছে, যা এখানে বহুদিনের মানুষরাও স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে।

ইলাই রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গরম কফির মগগুলো একে একে কাঠের ট্রের ওপর সাজিয়ে রাখছিল। আগুনে সেঁকা ভুট্টার রুটি আর শুকনো মাংসের গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু আজ কেউ ধীরে সুস্থে নাশতা খাওয়ার মেজাজে নেই। উঠোনের মাঝখানে ওলফ লারসেন দাঁড়িয়ে নিজের ঘোড়ার জিন আর লাগাম শেষবারের মতো পরীক্ষা করছিল। গত সন্ধ্যায় ব্ল্যাক রিভারের ডেপুটি মার্শাল এসে যে খবর দিয়ে গেছে, সেটার পর থেকে সে খুব কম কথাই বলেছে। এলি ব্রুকসের মতো মানুষ অকারণে কাউকে ডেকে পাঠায় না। তার মানে শহরে এমন কিছু ঘটেছে, যার সঙ্গে লারসেনের সম্পর্ক থাকা অস্বাভাবিক নয়।

মারদেকা ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। কয়েক মাসের মধ্যে এই দৃশ্য তার কাছে অনেকটাই পরিচিত হয়ে গেছে। ভোরবেলা কাউবয়দের প্রস্তুতি, ঘোড়ার পিঠে জিন তোলা, পানির চামড়ার থলি বেঁধে নেওয়া, উইনচেস্টার কাঁধে তুলে নেওয়া, এসব এখন আর তাকে আগের মতো বিস্মিত করে না। তবু আজ সে বুঝতে পারছিল, কিছু একটা আলাদা। বাড হিগিন্সের মুখে সেই সহজ হাসিটা নেই। ক্লে মরগান অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ। মিগুয়েলও বারবার পশ্চিম দিকের রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে।

লারসেন নাশতা শেষ করে ধীরে ধীরে সবার দিকে তাকাল। তারপর বলল, &quot;আমি শহরে যাচ্ছি। ফিরে আসতে বিকেলও হতে পারে।&quot;

ক্লে সংক্ষেপে মাথা নেড়ে বলল, &quot;র&#x200d;্যাঞ্চের দায়িত্ব নিয়ে ভাববেন না।&quot;

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, &quot;আমি না ফেরা পর্যন্ত কেউ অকারণে র&#x200d;্যাঞ্চের সীমানার বাইরে যাবে না।&quot;

বাড মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কয়েকদিন আগেও কথাটা হয়তো বাড়াবাড়ি মনে হতো। কিন্তু রাতের টিলায় দেখা সেই অচেনা দুই ঘোড়সওয়ারের পর আর কেউ এটাকে অযথা সতর্কতা বলে ভাবছে না।

মারদেকা নিঃশব্দে সব শুনছিল। কথার অর্ধেকও সে বুঝতে পারে না, কিন্তু মানুষের মুখ পড়তে সে শিখে গেছে। ওলফ লারসেনের চোখের স্থিরতা, বাডের গম্ভীর মুখ, ক্লের সংক্ষিপ্ত উত্তর, সব মিলিয়ে সে বুঝতে পারল, আজকের যাত্রা সাধারণ কোনো শহর সফর নয়।

লারসেন ঘোড়ায় চড়ে বসতেই হঠাৎ তার চোখ মারদেকার ওপর গিয়ে থামল। কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থেকে সে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। মারদেকা এগিয়ে এলো।

লারসেন শান্ত গলায় বলল, &quot;আজ তুমি র&#x200d;্যাঞ্চেই থাকবে।&quot;

মারদেকা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল। কয়েক মাস আগে লারসেন তাকে ব্ল্যাক রিভার শহর ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। সেই দিনের প্রতিটি দৃশ্য এখনো তার মনে উজ্জ্বল। সে ভেবেছিল, হয়তো আবার শহরে যাওয়ার সুযোগ হবে। কিন্তু লারসেনের চোখে তাকিয়ে সে বুঝে গেল, আজকের যাত্রা অন্যরকম। এতে কৌতূহলের জায়গা নেই, আছে দায়িত্ব। সে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

বাড এগিয়ে এসে তার কাঁধে আলতো চাপড় দিল। তারপর বলল, &quot;আজ আমার সঙ্গে থাকবে।&quot;

এই কথাটা মারদেকা পুরোপুরি না বুঝলেও বাডের হাতের স্পর্শ বুঝল। সে জানে, র&#x200d;্যাঞ্চে থেকে গেলেও অলস বসে থাকতে হবে না। নতুন কিছু শেখার সুযোগ নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ওলফ লারসেন একাই র&#x200d;্যাঞ্চের ফটক পেরিয়ে শহরের রাস্তার দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। সকালের সূর্য তখন ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে। ধুলোমাখা পথের ওপর ঘোড়ার খুরের দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মারদেকা অনেকক্ষণ সেই পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ফিরে বাডের পাশে এসে দাঁড়াল।

বাড কিছু না বলে আস্তাবলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। মারদেকাও তার পেছন পেছন চলল। র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরে আরেকটি কর্মব্যস্ত দিনের শুরু হলো, কিন্তু সেই সময় ব্ল্যাক রিভারের দিকে এগিয়ে চলা একাকী ঘোড়সওয়ার জানত না, কয়েক ঘণ্টা পরে মার্শাল এলি ব্রুকস যে খবর তাকে জানাবে, সেটাই তাদের সবার জীবনকে ধীরে ধীরে এমন এক পথে ঠেলে দেবে, যেখান থেকে আর কোনো কিছুই আগের মতো থাকবে না।

সকালের রোদ একটু একটু করে তীব্র হয়ে উঠছিল। ওলফ লারসেনের ঘোড়ার খুরের শব্দ অনেক আগেই দূরে মিলিয়ে গেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোন আবার ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছে। গরুর পাল চারণভূমির দিকে বেরিয়ে গেছে, আস্তাবলে নতুন ঘোড়াগুলোর পরিচর্যা চলছে, কোথাও হাতুড়ির শব্দ, কোথাও করাতের ঘষা, কোথাও আবার শুকনো ঘাসের গাদায় লোকজন ব্যস্ত। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এই র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর অদৃশ্য একটা আশঙ্কার ছায়া নেমে এসেছে। কিন্তু যারা এখানে বহু বছর ধরে কাজ করছে, তারা প্রত্যেকেই জানে, আজকের দিনের প্রতিটি মুহূর্ত অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি সতর্ক হয়ে কাটাতে হবে।

বাড হিগিন্স মারদেকাকে নিয়ে আস্তাবলের পেছনের খোলা জায়গায় গেল। সেখানে কয়েকটা কাঠের খুঁটি পুঁতে গোল একটা ঘেরা জায়গা তৈরি করা হয়েছে। নতুন ঘোড়াকে মানুষে অভ্যস্ত করার জন্য মাঝেমধ্যেই জায়গাটা ব্যবহার করা হয়। আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বছর তিনেক বয়সী একটা বাদামি ঘোড়া। প্রাণীটা পুরোপুরি বুনো নয়, আবার পুরোপুরি শান্তও নয়। মানুষের উপস্থিতি সে মেনে নেয়, কিন্তু হঠাৎ শব্দ শুনলেই কান খাড়া করে ওঠে, অস্থিরভাবে পা বদলায়।

বাড কিছুক্ষণ ঘোড়াটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মারদেকার দিকে ফিরে হাতের ইশারায় বোঝাল, আজ কোনো কাজ জোর করে করা যাবে না। ধৈর্য ধরতে হবে। এতদিন সে মারদেকাকে ঘোড়ার পরিচর্যা, জিন বাঁধা, লাগাম পরানো শিখিয়েছে। আজ শেখাবে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রাণীর বিশ্বাস অর্জন করতে হলে নিজের অস্থিরতা আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

মারদেকা ধীরে ধীরে ঘেরাটার ভেতরে ঢুকল। সে কোনো তাড়াহুড়ো করল না। কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে শুধু ঘোড়াটার দিকে তাকিয়ে রইল। প্রাণীটাও তার দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনের মাঝখানে নিঃশব্দ এক ধরনের বোঝাপড়া তৈরি হতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত পর মারদেকা খুব আস্তে এক পা এগোল। ঘোড়াটা মাথা তুলে বাতাস শুঁকল, তারপর আবার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরও কিছুক্ষণ পর সে নিজের হাতটা ধীরে ধীরে সামনে বাড়িয়ে দিল। এবারও কোনো ভয় দেখাল না প্রাণীটা। শুধু গলা একটু নামিয়ে ছেলেটার হাতের গন্ধ শুঁকে নিল।

বাড দূর থেকে সবকিছু দেখছিল। সে কোনো নির্দেশ দিচ্ছিল না। কারণ কিছু শিক্ষা মুখে বলে দেওয়া যায় না। নিজের অনুভূতি দিয়ে শিখতে হয়। কয়েক মাস আগে এই ছেলেটা মানুষের ভাষাই বুঝত না। এখন সে শুধু মানুষ নয়, প্রাণীর আচরণও মন দিয়ে পড়তে শিখছে। তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সে আগে দেখে, তারপর কাজ করে।

একসময় বাড ঘেরার ভেতরে ঢুকে মারদেকার হাতে একটা লম্বা দড়ি দিল। দড়ির অন্য প্রান্তে ছোট একটা চামড়ার ফাঁস বাঁধা। তবে সেটা ব্যবহার করার জন্য নয়, শুধু হাতে ধরে ঘোড়ার পাশে পাশাপাশি হাঁটার অনুশীলনের জন্য। সে ইশারায় বোঝাল, প্রাণীটাকে টেনে নেওয়া যাবে না। তাকে নিজের ইচ্ছায় সঙ্গে আসতে দিতে হবে।

মারদেকা ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল। প্রথমে ঘোড়াটা দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একবার মাথা নাড়িয়ে খুব ধীর গতিতে তার পেছনে হাঁটতে শুরু করল। দুজনের মাঝখানে দড়িটা ঢিলে হয়ে ঝুলে আছে। কোথাও কোনো টান নেই। বাডের ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটে উঠল। ঠিক এভাবেই একজন ভালো অশ্বারোহী তৈরি হয়। শক্তি দিয়ে নয়, ধৈর্য দিয়ে।

দুপুরের দিকে কাজ শেষ হলে ইলাই বারান্দায় বসে মারদেকার জন্য অপেক্ষা করছিল। আজ পড়াশোনার সময় সে নতুন কোনো অক্ষর শেখাল না। বরং এতদিনে শেখা শব্দগুলো দিয়েই ছোট ছোট বাক্য গঠন করতে শুরু করল। মারদেকা কষ্ট করে শব্দগুলো উচ্চারণ করছিল। অনেক জায়গায় ভুল হচ্ছিল, কিন্তু আগের মতো থেমে যাচ্ছিল না। ভুল বুঝতে পারলেই আবার শুরু করছিল। ইলাই সন্তুষ্ট মনে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারছিল, ভাষা আর কাজ, দুটোই ধীরে ধীরে একসঙ্গে এগোচ্ছে।

এদিকে সকালের রোদের তীব্রতা হামাগুড়ি দিয়ে খড়দাহে ধাবিত হতে না হতেই ব্ল্যাক রিভারের প্রধান সড়কে ওলফ লারসেনের ঘোড়া ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ল। কয়েক মাস আগেও এই রাস্তা দিয়ে সে মারদেকাকে শহর দেখিয়েছিল। আজ তার চোখে সেই শহরের কোনো দৃশ্যই ধরা পড়ছে না। সে সরাসরি মার্শাল এলি ব্রুকসের অফিসের সামনে এসে ঘোড়া থামাল। কাঠের বারান্দায় বাঁধা দোলনা চেয়ারটা খালি। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই ডেপুটি মার্শাল, যে আগের দিন র&#x200d;্যাঞ্চে গিয়েছিল। লারসেনকে দেখেই সে দরজা খুলে সরে দাঁড়াল।

ভেতরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এলি ব্রুকস যেন অনেকক্ষণ ধরেই এই মুহূর্তটার অপেক্ষা করছিল। ওলফ লারসেন ঘরে ঢুকতেই সে দরজার দিকে একবার তাকাল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ডেপুটি মার্শাল দরজাটা আস্তে করে টেনে বন্ধ করে দিল। ঘরের ভেতর নেমে এল এক ধরনের ভারী নীরবতা। দূরে প্রধান রাস্তা থেকে ভেসে আসছে ঘোড়ার খুরের ছন্দময় শব্দ, মাঝে মাঝে লোহার কারখানার হাতুড়ির টংটাং আওয়াজ। কিন্তু সেই সব শব্দ যেন এই ছোট্ট অফিসঘরের ভেতরে ঢুকতে পারছে না।

এলি নিজের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড ওলফ লারসেনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, &quot;তোমাকে ডাকার কারণটা সহজ নয়।&quot;

লারসেন টুপিটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। তার মুখে কোনো উদ্বেগের ছাপ নেই, কিন্তু বহু বছরের অভিজ্ঞতায় সে বুঝে গেছে, এলি ব্রুকস কথাটা শুরু করার আগে নিজের ভাষা বেছে নিচ্ছে। সে শান্ত গলায় বলল, &quot;শুনছি।&quot;

এলি টেবিলের ড্রয়ার খুলে ভেতর থেকে একটা ছোট কাপড়ের থলে বের করল। থলেটা খুলতেই কয়েকটা পিতলের খালি কার্তুজ টেবিলের ওপর গড়িয়ে পড়ল। প্রথম দেখায় এগুলো সাধারণ কার্তুজের খোসা বলেই মনে হয়। কিন্তু লারসেন একটা হাতে তুলে নিয়ে চোখের সামনে ধরতেই তার দৃষ্টি বদলে গেল। প্রতিটি খোসার তলায় একই নির্মাতার ছাপ। ব্ল্যাক রিভারের আশেপাশে এই ধরনের গোলাবারুদ খুব কম মানুষ ব্যবহার করে।

এলি বলল, &quot;গত তিন সপ্তাহে শহরের বাইরে তিনটা আলাদা জায়গা থেকে এগুলো পেয়েছি।&quot;

লারসেন কোনো মন্তব্য করল না।

এলি আবার বলল, &quot;প্রথমে ভেবেছিলাম কয়েকজন শিকারি এসেছে। কিন্তু পরে বুঝলাম, তারা শিকার করতে আসেনি। তারা জায়গা দেখছিল।&quot;

লারসেন কার্তুজটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। &quot;কোন দিক?&quot;

এলি এবার দেয়ালে ঝোলানো একটা বড় মানচিত্রের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে ব্ল্যাক রিভার, আশপাশের খামার, নদী, পাহাড় আর র&#x200d;্যাঞ্চগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করা আছে। সে একে একে তিনটি জায়গায় আঙুল রাখল। তিনটিই শহরের বাইরে। তিনটিই এমন উঁচু জায়গা, যেখান থেকে দূর পর্যন্ত নজর রাখা যায়।

লারসেন কয়েক মুহূর্ত মানচিত্রটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, &quot;তিনটা জায়গা মিলে একটা বৃত্ত তৈরি করছে।&quot;

এলি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। &quot;আর সেই বৃত্তের মাঝখানে কী আছে, সেটা তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ।&quot;

লারসেন উত্তর দিল না। তার প্রয়োজনও ছিল না। মানচিত্রে সেই কাল্পনিক বৃত্তের মাঝামাঝি জায়গাতেই বিস্তৃত লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ।

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। বাইরে রাস্তা দিয়ে একটা ঘোড়ার গাড়ি চলে গেল। চাকার শব্দ কয়েক মুহূর্ত শোনা গেল, তারপর মিলিয়ে গেল দূরে।

এলি এবার নিচু স্বরে বলল, &quot;আমি এখনও নিশ্চিত নই তারা কারা। কিন্তু তারা ধৈর্য ধরে কাজ করছে। তারা তাড়াহুড়ো করছে না। আগে জায়গা দেখছে, মানুষের অভ্যাস বুঝছে, তারপর সিদ্ধান্ত নেবে।&quot;

লারসেন জানালার দিকে তাকাল। শহরের সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিদিনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কেউ জানেই না, এই ছোট্ট অফিসঘরের ভেতরে এমন একটা আলোচনা চলছে, যার ফল পুরো অঞ্চলকে বদলে দিতে পারে।

সে ধীরে ধীরে বলল, &quot;তুমি আমাকে শুধু সাবধান করার জন্য ডাকোনি।&quot;

এলি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। &quot;না। আমি সাহায্য চাইতে ডেকেছি।&quot;

লারসেন এবার পুরো মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকাল।

এলি বলল, &quot;শহরের ভেতর আমি নজর রাখতে পারি। আমার ডেপুটি আছে। খবর আনার লোক আছে। কিন্তু শহরের বাইরে আমার চোখ কম। তোমার লোকজন প্রতিদিন প্রেইরি, পাহাড় আর নদীর ধার ঘুরে বেড়ায়। তারা এমন অনেক কিছু দেখতে পারে, যা আমার লোকদের চোখে পড়বে না।&quot;

লারসেন কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, &quot;আমার লোকেরা কাউবয়, আইনরক্ষী নয়।&quot;

&quot;জানি,&quot; এলি শান্ত গলায় বলল। &quot;তাদের কাউকে বন্দুক হাতে কাউকে তাড়া করতে বলছি না। শুধু অস্বাভাবিক কিছু দেখলে আমাকে জানাবে। সেটাই যথেষ্ট।&quot;

এটা যুক্তিসঙ্গত অনুরোধ। বহু বছর ধরে সে নিজের র&#x200d;্যাঞ্চ রক্ষা করেছে। কিন্তু এখন ব্যাপারটা শুধু তার জমির নয়। কেউ যদি এই অঞ্চলে সংগঠিতভাবে ঘাঁটি গেড়ে বসতে শুরু করে, তাহলে একদিন না একদিন ব্ল্যাক রিভারের প্রত্যেকটি পরিবার তার প্রভাব অনুভব করবে। লারসেন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। &quot;আজ থেকেই ব্যবস্থা করব।&quot;

ঠিক তখনই দরজায় তিনবার মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

এলি মুখ তুলে বলল, &quot;ভেতরে আসো।&quot;

দরজা খুলে সেই ডেপুটি মার্শাল ভেতরে ঢুকল, যে কিছুক্ষণ আগে লারসেনকে অফিসে ঢুকিয়ে বাইরে পাহারায় দাঁড়িয়ে ছিল। সে টুপিটা হাতে নিয়ে সম্মান জানিয়ে বলল, &quot;মার্শাল, পশ্চিমের ফেরিঘাট থেকে একজন টহলদার এসেছে। বলছে জরুরি খবর আছে।&quot;

এলি আর লারসেন একে অপরের দিকে তাকাল। এলি শান্ত স্বরে বলল, &quot;ওকে ভেতরে পাঠাও।&quot;

ডেপুটি আবার বাইরে বেরিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের নীরবতার মধ্যে লারসেনের দৃষ্টি ধীরে ধীরে দরজার দিকে স্থির হয়ে রইল। তার বহু বছরের অভিজ্ঞতা বলছিল, এই দরজা দিয়ে যে মানুষটা এখন ঢুকবে, তার মুখে হয়তো এমন একটি খবর থাকবে, যা ব্ল্যাক রিভারের ওপর ঝুলে থাকা অদৃশ্য ছায়াটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে।

ডেপুটি মার্শাল বেরিয়ে যাওয়ার পর অফিসঘরের ভেতর আবার কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল। বাইরে দুপুরমুখী কড়া রোদ এখন কাঠের বারান্দার অর্ধেকটা জুড়ে পড়েছে। রাস্তার ধুলোয় দু একটি ঘোড়ার গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে, দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে লোকজন নিজেদের কাজে ব্যস্ত। শহরের স্বাভাবিক জীবন চলছেই, অথচ এই ছোট্ট অফিসঘরের ভেতরে এমন এক আলোচনার সূচনা হয়েছে, যার খবর ব্ল্যাক রিভারের আর কেউ জানে না।

কয়েক সেকেন্ড পর দরজাটা আবার খুলল। ডেপুটি মার্শাল ভেতরে ঢুকল না। সে কেবল দরজার পাশে সরে দাঁড়াল। তার পেছন দিয়ে ধুলোয় মাখামাখি পোশাক পরা একজন মধ্যবয়সী লোক ভেতরে এল। রোদে পুড়ে তার মুখ তামাটে হয়ে গেছে। বুটজোড়া ধুলোর আস্তরণে ঢাকা। কোমরে কোনো বন্দুক নেই। কাঁধে চামড়ার পানির থলি। দীর্ঘ পথ একটানা অতিক্রম করার ক্লান্তি তার চোখেমুখে স্পষ্ট। লোকটা টুপি খুলে সম্মান জানাল।

এলি ব্রুকস শান্ত গলায় বলল, &quot;বসো।&quot;

লোকটা মাথা নেড়ে বলল, &quot;সময় নেই, মার্শাল। ঘোড়াটাও প্রায় ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। খবরটা দিয়েই আবার ফিরতে হবে।&quot;

এলি আর লারসেন দুজনেই মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকাল।

লোকটা গলা ভিজিয়ে ধীরে ধীরে বলল, &quot;আজ ভোরে পশ্চিমের ফেরিঘাটের ওপারে চারজন অচেনা ঘোড়সওয়ারকে দেখেছি। নদী পার হয়ে এপারে এসেছে। ফেরিঘাটে তারা বেশিক্ষণ দাঁড়ায়নি। কারও সঙ্গে কথাও বলেনি।&quot;

এলি জিজ্ঞেস করল, &quot;শহরের দিকে এসেছিল?&quot;

&quot;না।&quot;

&quot;তাহলে?&quot;

লোকটা উত্তর দিল, &quot;নদীর ধার ধরে উত্তর-পশ্চিমের পুরোনো পথ ধরে চলে গেছে। যে পথ দিয়ে সাধারণ মানুষ খুব কমই যাতায়াত করে।&quot;

লারসেনের চোখ সরু হয়ে এল। &quot;তুমি নিশ্চিত?&quot;

লোকটা দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল। &quot;আমি তাদের যথেষ্ট দূর থেকে অনুসরণ করেছি। তারা বারবার পেছনে তাকাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ অনুসরণ করছে কি না, সেটা যাচাই করছে। পরে আর ঝুঁকি নিইনি।&quot;

এলি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল, &quot;চেহারা চিনতে পেরেছ?&quot;

লোকটা মাথা নেড়ে বলল, &quot;না। সবাই টুপির কিনারা নিচু করে রেখেছিল। দুজনের মুখে দাড়ি ছিল। একজনের ডান গালে পুরোনো কাটা দাগ দেখেছি। আর একটা জিনিস মনে আছে।&quot;

&quot;কী?&quot;

&quot;চারজনের ঘোড়াই খুব ভালো মানের। পথের ডাকাতদের ঘোড়া এমন হয় না। আর তাদের জিনিসপত্রও সস্তা নয়।&quot;

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তাকিয়ে সে যেন নিজের মনেই হিসাব কষছিল। সাধারণ ডাকাত হলে শহরে ঢুকত। সরাইখানায় খেত, মদের দোকানে যেত, কারও সঙ্গে ঝগড়া করত। কিন্তু এরা সেসব কিছুই করছে না। তারা শহরকে এড়িয়ে চলছে। তার মানে তাদের লক্ষ্য অন্য কোথাও।

এলি নিচু গলায় বলল, &quot;আমি লোক পাঠাতে পারি। কিন্তু তারা এখন কোথায় আছে, সেটা কেউ জানে না।&quot;

লারসেন জানালা থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, &quot;লোক পাঠিয়ো না।&quot;

এলি বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল। &quot;কেন?&quot;

&quot;কারণ তারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে না। তারা অপেক্ষা করছে। তুমি যদি এখন লোক পাঠাও, তারা অদৃশ্য হয়ে যাবে। তারপর মাসের পর মাস আর কোনো চিহ্ন পাওয়া যাবে না।&quot;

এলি কিছুক্ষণ ভেবে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। সে জানে, প্রেইরির জীবন সম্পর্কে ওলফ লারসেনের অভিজ্ঞতা তার চেয়ে অনেক বেশি।

লারসেন এবার ফিরে দাঁড়াল। &quot;আমার লোকেরা নজর রাখবে। তবে তারা কাউকে অনুসরণ করবে না। শুধু দেখবে, মনে রাখবে, আর খবর দেবে।&quot;

এলি বলল, &quot;আমিও শহরের ভেতরে খোঁজ চালিয়ে যাব। এরা যদি কোনো ভুল করে, আমরা সেটা ধরব।&quot;

টহলদার লোকটা টুপিটা আবার মাথায় পরে নিল। সে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই এলি তাকে থামাল।

&quot;ফেরিঘাটে ফিরে যাও। কিন্তু কাউকে কিছু বলবে না। মানুষ অকারণে ভয় পেলে আমাদের কাজ আরও কঠিন হবে।&quot;

লোকটা সংক্ষিপ্তভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে বেরিয়ে গেল। ডেপুটি মার্শাল আবার দরজা টেনে বন্ধ করে বাইরে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।

ঘরের ভেতরে ওলফ লারসেন আর এলি ব্রুকস আর কোনো কথা বলল না। তাদের দুজনেরই মনে একই প্রশ্ন ঘুরছিল। চারজন অচেনা ঘোড়সওয়ার কি শুধু পথ যাচাই করছে, নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো দল রয়েছে?

ঠিক সেই সময়, বহু মাইল দূরে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে মারদেকা আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে একে একে ঘোড়াগুলোর শরীরে ব্রাশ চালাচ্ছিল। দিনের আলো ধীরে ধীরে প্রখর হয়ে দুপুরের কোলে আছড়ে পড়ার পায়তারা করছিল। সে জানে না, এই মুহূর্তে ব্ল্যাক রিভারে তার ভবিষ্যৎকে ঘিরে প্রথম সত্যিকারের তদন্ত শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ভাগ্য অদ্ভুতভাবে নিজের পথ তৈরি করে। অচেনা চারজন ঘোড়সওয়ার, একজন অভিজ্ঞ মার্শাল, একজন দূরদর্শী র&#x200d;্যাঞ্চ মালিক, আর প্রেইরির এক কিশোর ছেলেকে ঘিরে যে অদৃশ্য সুতো বোনা শুরু হয়েছে, খুব শিগগিরই সেই সুতোগুলো এক জায়গায় এসে মিলবে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/260546/</link>
				<pubDate>Wed, 12 Aug 2026 03:39:12 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–আট<br />
ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশের বিশাল প্রেইরিটা ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করল। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের ডগায় সূর্যের আলো পড়ে অসংখ্য কাচের টুকরোর মতো ঝিকমিক করছে। দূরের টিলাগুলো নীলচে কুয়াশার আড়ালে আধো দেখা যাচ্ছে। কোথাও একটা কোয়েল ডেকে উঠল, তারপর আবার চারদিকে নেমে এল গভীর নিস্তব্&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-260546"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/260546/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">1ef1b3516f75dd87ac2e2e8a29fd3db6</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়-সাত
পরদিন ভোরে র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে ছিল। সূর্যের প্রথম আলো পাহাড়ের কাঁধ ছুঁয়ে তৃণভূমির ওপর ছড়িয়ে পড়লেও অন্য দিনের মতো কোথাও হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। আস্তাবলের সামনে ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তাদের পরিচর্যা করতে আসা কাউবয়দের মুখে আজ অদ্ভুত গাম্ভীর্য। যেন রাতের অন্ধকার পুরোপুরি সরে গেলেও তার সঙ্গে ভয়টা কোথাও যায়নি। আগের সন্ধ্যায় ব্ল্যাক রিভার শহর থেকে ফিরে আসার পর থেকে সবাই জানে, অদৃশ্য কোথাও একটা ঝড় জমছে। পশ্চিমের চরাগাহের শুকনো ঘাসের ভেতর যে বার্তা রেখে আসা হয়েছে, তাতে এটা তো পরিস্কার, হুমকিটা মিথ্যা নয়। আর সেই কারণেই আজ সকাল থেকে র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক।

মারদেকার ঘুম ভাঙল ঘোড়ার ক্ষীণ হ্রেষাধ্বনিতে। কয়েক মাস আগেও এমন শব্দ তার কাছে ছিল সম্পূর্ণ অচেনা, অথচ এখন এই শব্দেই তার সকাল শুরু হয়। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সে দেখল উঠোনে বাড হিগিন্স, ক্লে মরগান আর রুবেন কোল নিচু গলায় কথা বলছে। তাদের কথার অর্থ সে পুরোপুরি বুঝতে পারে না, কিন্তু মুখের ভাব বুঝতে তার আর অসুবিধা হয় না। আগের দিনের সেই শহর ভ্রমণের আনন্দ যেন রাতারাতি কোথায় মিলিয়ে গেছে। কাল পর্যন্ত যে মানুষগুলো হেসে কথা বলছিল, আজ তাদের চোখে শুধু হিসাব আর সতর্কতা।

ঘর থেকে বেরিয়ে সে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। রান্নাঘরের দরজা খোলা। ভেতরে ইলাই আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে সকালের নাস্তার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বড় লোহার প্যানে বেকনের টুকরো ভাজা হচ্ছে। পাশে কফির পাত্র থেকে ধোঁয়া উঠছে। আরেক পাশে ওভেন থেকে সদ্য বের করা রুটির গন্ধ পুরো ঘর ভরে দিয়েছে। ইলাই বয়সে বৃদ্ধ হলেও তার চলাফেরায় কোনো অস্থিরতা নেই। বহু বছরের অভ্যাসে সে একা হাতে সব সামলে নেয়। কখন রুটি নামাতে হবে, কখন কফি ঢালতে হবে, কখন ডিম উল্টে দিতে হবে, সব যেন না দেখেই জানে। মারদেকাকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে মৃদু হেসে হাতের ইশারায় ভেতরে ডাকল। তারপর কাঠের টেবিলের ওপর রাখা একটা প্লেট তার সামনে এগিয়ে দিল। কয়েক মাস আগেও এই ছেলেটা ক্ষুধা পেলে কীভাবে খাবার চাইতে হয় জানত না। এখন সে নিজের জায়গায় চুপচাপ বসে অপেক্ষা করে। এই ছোট্ট পরিবর্তনটুকুও ইলাইয়ের চোখ এড়ায় না।

খেতে খেতে মারদেকা বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছিল। উঠোনে দাঁড়িয়ে ওলফ লারসেন এক এক করে সবার সঙ্গে কথা বলছে। কখনো আস্তাবলের দিকে ইশারা করছে, কখনো দক্ষিণের চারণভূমির দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন কাউবয় ঘোড়ায় চড়ে উত্তর দিকের বেড়া পরীক্ষা করতে বেরিয়ে গেল। আরেকজন পশ্চিমের পাহাড়মুখী পথ ধরে চলে গেল। র&#x200d;্যাঞ্চে এমন টহল আগে সে দেখেনি। গতকাল শহরে যাওয়ার সময় যে আনন্দ আর কৌতূহল তার চোখে ছিল, আজ তার জায়গা নিয়েছে এক অদ্ভুত অস্বস্তি। সে বুঝতে পারছে, বড়রা এমন কিছুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার আকার সে এখনও কল্পনাও করতে পারে না।

নাস্তা শেষ করে ইলাই তাকে নিয়ে পড়ার ঘরে গেল। টেবিলের ওপর স্লেট, চক আর কয়েকটা পুরোনো বই রাখা। কিন্তু আজ ইলাইয়ের মনও যেন পুরোপুরি পড়াশোনায় নেই। মাঝেমধ্যে সে জানালার বাইরে তাকাচ্ছে। মারদেকাও সেটা লক্ষ্য করল। তারপরও পড়া বন্ধ হলো না। ইলাই ধীরে ধীরে নতুন কয়েকটা শব্দ লিখে দেখাল। Gate, Fence, North, South। প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করে আবার আঙুল তুলে বাইরের কোনো না কোনো দিক দেখিয়ে দিল। মারদেকা প্রথমে বুঝতে পারছিল না কেন আজ এসব শেখানো হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর তার মনে হলো, হয়তো র&#x200d;্যাঞ্চের কাজের জন্যই এই শব্দগুলো দরকার। সে মন দিয়ে উচ্চারণ করতে লাগল। ভুল হলো, আবার বলল। আবার ভুল হলো, তবু থামল না। ইলাই সন্তুষ্ট চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। এই ছেলেটার সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রতিভা নয়, তার অধ্যবসায়।

দুপুরের দিকে বাড হিগিন্স দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ইলাইয়ের সঙ্গে দু একটা কথা বলার পর সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় বাইরে ডাকল। মারদেকা স্লেটটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল। দরজার বাইরে বেরোতেই সে দেখল আস্তাবলের সামনে ইতিমধ্যে কয়েকটা জিন, দড়ি আর নতুন করে তেল মাখানো লাগাম সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বাডের মুখে আগের মতোই সেই সংযত কঠোরতা, কিন্তু চোখে আজ বাড়তি দায়িত্বের ছাপ। মনে হলো, আজকের শিক্ষা অন্য দিনের মতো হবে না। আজ থেকে তাকে শুধু কাজ শেখানো হবে না, শেখানো হবে সতর্ক থাকতে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে মারদেকা বুঝতে না পারলেও, তার জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল।

মারদেকা স্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে বাড হিগিন্সের পেছন পেছন বাইরে বেরিয়ে এল। উঠোন পেরিয়ে দুজনে ধীরে ধীরে উত্তর দিকের চারণভূমির দিকে হাঁটতে লাগল। সকালটা পরিষ্কার। আকাশে একটাও মেঘ নেই। দূরের পাহাড়গুলো নীলচে কুয়াশার আড়াল থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাতাসে শুকনো ঘাসের গন্ধ। চারদিকে সবকিছু আগের মতোই শান্ত দেখাচ্ছে। কিন্তু সেই শান্তির ভেতরেও আজ যেন একটা চাপা টানটান ভাব লুকিয়ে আছে। গত সন্ধ্যার সেই অজ্ঞাত হুমকির পর থেকে র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি মানুষ বুঝে গেছে, এখন আর শুধু কাজ জানলেই চলবে না, চারপাশও দেখতে জানতে হবে।

বাড খুব বেশি কথা বলল না। সে মাঝে মাঝে থামছে, চারদিকে তাকাচ্ছে, আবার হাঁটছে। মারদেকাও তার প্রতিটি ভঙ্গি অনুসরণ করছে। কিছুদূর গিয়ে বাড একটা উঁচু টিলার ওপর উঠে দাঁড়াল। সেখান থেকে র&#x200d;্যাঞ্চের প্রায় অর্ধেকটা চোখে পড়ে। আস্তাবল, গরুর খোঁয়াড়, উত্তর দিকের বেড়া, আরও দূরে শহরের শেষ মাথার কয়েকটা ছাদ, সব একসঙ্গে দেখা যায়। বাড ধীরে ধীরে চারদিকে হাত ঘুরিয়ে দেখাল। তারপর নিজের দুই চোখের দিকে আঙুল ছুঁইয়ে আবার চারপাশের দিকে ইশারা করল।

মারদেকা বুঝতে পারল, আজ তাকে কোনো নতুন কাজ শেখানো হচ্ছে না। শেখানো হচ্ছে কীভাবে দেখতে হয়।

পাহাড়ের গ্রামে বড় হওয়ার কারণে এই শিক্ষাটা তার কাছে পুরোপুরি নতুনও নয়। ছোটবেলায় শিকারে বের হলে গ্রামের প্রবীণরা বলত, যে শুধু সামনে তাকায়, সে শিকার হারায়; যে চারপাশ দেখে, সেই বেঁচে ফিরে আসে। সেই কথাগুলো হঠাৎ মনে পড়ে গেল তার। সে ধীরে ধীরে চারদিকে তাকাতে শুরু করল। বাতাসে ঘাস কোন দিকে দুলছে, কোথায় কাক উড়ছে, কোন ঝোপে খরগোশ লুকিয়ে আছে, কোন পথে গরুর পাল যাচ্ছে, সবকিছু আলাদা করে খেয়াল করতে লাগল।

বাড কিছুক্ষণ তাকে লক্ষ্য করল। তারপর উত্তর দিকের বেড়ার দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে সে কোনো কথা না বলে একটা খুঁটির গায়ে হাত রাখল। খুঁটিটা শক্ত। তারপর পাশের খুঁটিতে হাত দিল। সেটাও ঠিক আছে। কিন্তু তৃতীয় খুঁটির কাছে গিয়ে সে থেমে গেল। কাঠের গায়ে খুব সূক্ষ্ম একটা আঁচড়। নতুন। যেন ধারালো কিছু একটা ঘষে গেছে। আঁচড়টা এতই ছোট যে না দেখালে চোখেই পড়ত না। বাড আঙুল দিয়ে দাগটা দেখাল।

মারদেকা কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ল। কিছুক্ষণ দাগটার দিকে তাকিয়ে থেকে তার চোখ চলে গেল নিচের মাটিতে। সেখানে শুকনো ধুলোর ওপর খুব সামান্য চাপা পড়ার চিহ্ন। মানুষের পায়ের ছাপ স্পষ্ট নয়, কিন্তু ঘাসের মাথাগুলো একদিকে বেঁকে আছে। সে ধীরে ধীরে কয়েক পা এগিয়ে গেল। আরও একটু দূরে একটা ভাঙা ডাল পড়ে আছে। ডালটা শুকনো হলেও ভাঙার জায়গাটা এখনো ফ্যাকাশে সাদা। অর্থাৎ খুব বেশিদিন আগে ভাঙেনি। সে নিচু হয়ে ডালটা তুলে বাডকে দেখাল।

বাড ডালটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখল। তারপর চারপাশে চোখ বুলিয়ে আবার মাটির দিকে তাকাল। এবার তার মুখের ভাব আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নয়, কিন্তু এতগুলো ছোট ছোট লক্ষণ একসঙ্গে কখনোই অবহেলা করার মতো নয়। কেউ একজন এই দিকটায় এসেছিল। হয়তো শুধু দেখে গেছে। হয়তো আরও কিছু করার সুযোগ খুঁজেছে।

ফিরে আসার পথে বাড একবারও কোনো কথা বলল না। কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে গেছে। আর মারদেকাও বুঝতে পারছিল, আজকের সকালটা অন্য দিনের মতো শেষ হয়নি। সে প্রথমবার উপলব্ধি করল, র&#x200d;্যাঞ্চ পাহারা দেওয়া মানে শুধু বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা নয়। তারও আগে দরকার চোখ খোলা রাখা। কারণ পশ্চিমের এই দেশে অনেক সময় বিপদ বন্দুকের গুলির শব্দ করে আসে না। নিঃশব্দে এসে চারপাশে নিজের উপস্থিতির ছোট ছোট চিহ্ন রেখে যায়। আর যে মানুষ সেই চিহ্ন পড়তে পারে, সে অনেক সময় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই শত্রুর খবর পেয়ে যায়।

র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরে তারা দেখল ওলফ লারসেন উঠোনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। বাড সংক্ষেপে সব কথা জানিয়ে দিল। লারসেন মন দিয়ে শুনল। তারপর একবার মারদেকার দিকে তাকাল। ছেলেটা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার চোখে আজ নতুন একটা পরিবর্তন স্পষ্ট। কয়েক মাস আগে সে শুধু আশ্রয়প্রার্থী ছিল। এখন সে ধীরে ধীরে এই র&#x200d;্যাঞ্চের চোখ হয়ে উঠতে শিখছে। আর ওলফ লারসেনের মনে প্রথমবারের মতো দৃঢ়ভাবে জন্ম নিল একটি ভাবনা, সময় এলে এই ছেলেটাকে শুধু রক্ষা করলেই হবে না, তাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন একদিন সে নিজেই এই ভূমিকে রক্ষা করতে পারে।

বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। পশ্চিমের আকাশে সূর্যটা ঢলে পড়েছে, তবু তার শেষ আলো র&#x200d;্যাঞ্চের বিস্তীর্ণ তৃণভূমির ওপর তামাটে আভা ছড়িয়ে রেখেছে। উঠোনের একপাশে কয়েকটা ঘোড়া মাথা নিচু করে শুকনো খড় চিবোচ্ছে। আস্তাবলের চালের নিচে ঝুলে থাকা চামড়ার জিন আর লাগামগুলো সোনালি আলোয় চকচক করছে। দূরে গরুর পাল ফিরিয়ে আনছে দুজন কাউবয়। বাতাসে ধুলোর সঙ্গে মিশে আছে শুকনো ঘাস, ঘোড়ার ঘাম আর কাঠের গন্ধ। সবকিছুই যেন আগের মতো স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই কোথাও একটা অদৃশ্য টান তৈরি হয়েছে। দুপুরে নদীর ধারে পাওয়া সেই অচেনা খুরের দাগ যেন সবার মনে অজান্তেই একটা রেখা টেনে দিয়েছে।

ওলফ লারসেন কোনো কথা না বলে কিছুক্ষণ উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ একবার করে সবার মুখের ওপর ঘুরে গেল। ক্লে মরগান, বাড হিগিন্স, মিগুয়েল, হ্যাঙ্ক, রুবেন, তারপর এসে থামল মারদেকার ওপর। ছেলেটা অন্যদের থেকে একটু পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে এখনো সেই দড়িটা, যেটা দিয়ে সে দুপুরে নদীর ধারে একটা ভাঙা বেড়ার খুঁটি টেনে সোজা করেছিল। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখ দুটো সতর্ক। যেন চারপাশের প্রতিটি শব্দ সে আলাদা করে শুনছে।

লারসেন ধীরে ধীরে বলল, &quot;আজ থেকে পাহারা বদলাবে।&quot; কথাটা শুনেই সবাই তার দিকে তাকাল। &quot;এখন থেকে রাতে দুজন করে পাহারা দেবে। একজন উত্তর দিক দেখবে, আরেকজন নদীর দিক। দিনের বেলায়ও যে যেখানে কাজ করবে, আশপাশে নজর রাখবে। কোনো অচেনা খুরের দাগ, ভাঙা বেড়া, অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে। অনুমান নয়, প্রমাণ চাই।&quot;

কেউ কোনো প্রশ্ন করল না। র&#x200d;্যাঞ্চের লোকেরা জানে, ওলফ লারসেন অকারণে নিয়ম বদলায় না। তার সিদ্ধান্তের পেছনে সবসময় কারণ থাকে। বাড মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ক্লে শুধু বলল, &quot;আজ রাত থেকেই শুরু করছি।&quot; মিগুয়েল চুপচাপ নদীর দিকের পাহারার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিল। হ্যাঙ্ক কিছু না বলেই আস্তাবলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। সে জানে, রাতে বেরোতে হলে ঘোড়াগুলোও প্রস্তুত রাখতে হবে।

এই সবকিছু মারদেকা নীরবে দেখছিল। কথাগুলোর অর্ধেকও সে বুঝতে পারছে না। কিন্তু মানুষের মুখের ভাব, চোখের ভাষা, শরীরের ভঙ্গি, এগুলো বোঝার ক্ষমতা তার অনেক আগেই তৈরি হয়েছে। সে বুঝল, আজ থেকে কিছু একটা বদলে গেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের মানুষগুলো আগের মতো নিশ্চিন্ত নেই।

সন্ধ্যার খাবারের সময়ও সেই পরিবর্তনটা টের পাওয়া গেল। বড় টেবিলের চারপাশে সবাই বসেছে, ইলাই নিজের হাতে রান্না করা গরম স্ট্যু আর রুটি পরিবেশন করছে। অন্যদিন এই সময় দু একজন হেসে গল্প করে, দিনের কাজের হিসাব দেয়, কেউ ঘোড়ার কথা বলে, কেউ গরুর। আজ কথাবার্তা কম। শুধু প্রয়োজনীয় কথাই হচ্ছে। ইলাইও সেটা বুঝতে পারল। বৃদ্ধ একবার লারসেনের দিকে তাকাল। লারসেন মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে খাচ্ছে। তার চোখে সেই গভীর চিন্তার ছায়া, যেটা ইলাই বহু বছর ধরে চেনে।

খাওয়া শেষ হওয়ার পর ইলাই মারদেকাকে নিয়ে পড়ার ঘরে গেল। সেদিনের পাঠ ছিল কয়েকটা নতুন শব্দ। &quot;River&quot;, &quot;Fence&quot;, &quot;North&quot;, &quot;Watch&quot;। বৃদ্ধ প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করে বোঝাতে লাগল। মারদেকা মন দিয়ে শুনল, বারবার বলল, আবার লিখল। হঠাৎ &quot;Watch&quot; শব্দটা শুনে তার মনে বিকেলের দৃশ্যটা ভেসে উঠল। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বাড আর মিগুয়েলের সতর্ক চোখ, লারসেনের কঠিন মুখ, সবার নীরবতা। শব্দের অর্থ সে পুরো বুঝল না, কিন্তু অনুভব করল, এই শব্দটার সঙ্গে আজকের দিনের একটা সম্পর্ক আছে।

রাত অনেকটা নেমে এলে র&#x200d;্যাঞ্চ ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দূরের প্রান্তরে কায়োটের দীর্ঘ ডাক ভেসে এল। আকাশজুড়ে অসংখ্য তারা। উঠোনের মাঝখানে একটা কেরোসিনের লণ্ঠন জ্বলছে। তার হলুদ আলোয় ছায়াগুলো আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। মারদেকা ঘুমোতে যাওয়ার আগে অভ্যাসমতো বারান্দায় এসে দাঁড়াল। কয়েক মাস আগেও সে পাহাড়ের চূড়া থেকে দূরের শহরের আলো দেখত। এখন সে দাঁড়িয়ে আছে সেই র&#x200d;্যাঞ্চের বারান্দায়, যেটা তার নতুন ঘর হয়ে উঠেছে।

ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল একটা দৃশ্য। উত্তর দিকের বেড়ার পাশে ক্লে মরগান ঘোড়ায় চড়ে ধীরে ধীরে টহল দিচ্ছে। অন্যদিকে নদীর পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে মিগুয়েল। দুজনের হাতেই রাইফেল। আগে কখনো সে রাতের বেলা এমন পাহারা দেখেনি। তার মনে প্রশ্ন জাগল, কিন্তু জিজ্ঞেস করার মতো ভাষা এখনো সে শেখেনি।

সে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুতভাবে তার মনে হলো, এই র&#x200d;্যাঞ্চটা যেন আজ আর আগের মতো নিশ্চিন্ত নেই। কোথাও কেউ আছে। দেখা যাচ্ছে না, তবু আছে। সেই অদৃশ্য উপস্থিতি বাতাসের ভেতরেও যেন অনুভব করা যায়।

আর বহু দূরে, ব্ল্যাক রিভারের পশ্চিম প্রান্তের অন্ধকারে, দুটি ঘোড়া কোনো শব্দ না করে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছিল। তাদের আরোহীরা র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে আসছিল না। তারা শুধু দূরের উঁচু টিলা থেকে একবার লারসেনের জমির দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত নীরবে পর্যবেক্ষণ করল। তারপর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে আবার অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল। তারা কোনো চিহ্ন রেখে গেল না। কোনো গুলি ছোড়েনি। কোনো বেড়া কাটেনি। কিন্তু সেদিন রাতেই প্রথমবারের মতো শিকারি আর শিকারের মাঝখানের দূরত্ব আরও একটু কমে এল।

পরদিন ভোরে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর আবারও একটি নতুন দিনের সূচনা হলো। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের প্রথম আলো ফুটতেই রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের মাথাগুলো সোনালি ঝিলিক ছড়িয়ে উঠল। দূরের পাহাড়গুলো তখনও হালকা কুয়াশার আবরণে ঢাকা। আস্তাবল থেকে ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি ভেসে আসছে, গরুর ঘণ্টা ধীরে ধীরে বেজে উঠছে, আর ইলাই রান্নাঘরের চুলায় শুকনো ওক কাঠ জ্বালিয়ে সকালের নাশতার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাইরে থেকে সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক মনে হলেও র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরের পরিবেশে অদৃশ্য একটা পরিবর্তন এসে গেছে। আগের মতো কেউ আর নিশ্চিন্তে কাজ করছে না। প্রত্যেকের চোখ মাঝেমধ্যে অকারণেই র&#x200d;্যাঞ্চের সীমানার দিকে চলে যাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে দূরের টিলায় দেখা সেই দুই অচেনা ঘোড়সওয়ার যেন কাউকে কিছু না বলেও সবার মনে একটি সতর্ক সংকেত রেখে গেছে।

নাশতা শেষ করেই ওলফ লারসেন সবাইকে উঠোনে ডেকে পাঠাল। ক্লে মরগান, বাড হিগিন্স, মিগুয়েল, রুবেন কোল, হ্যাঙ্ক ডসন, সবাই এসে দাঁড়াল। মারদেকাও একটু দূরে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। লারসেন শান্ত গলায় বলল, আজ থেকে র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি সীমানা নতুন করে পরীক্ষা করা হবে। উত্তর দিকের নদীর পাড়, পশ্চিমের টিলা, দক্ষিণের চারণভূমি, সব জায়গা প্রতিদিন ঘুরে দেখতে হবে। কেউ একা বের হবে না। সন্ধ্যার আগেই সবাই ফিরবে। তার কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা ছিল না, কিন্তু এতদিন যারা তার সঙ্গে কাজ করেছে, তারা জানে এই স্বরই সবচেয়ে বিপজ্জনক। ওলফ লারসেন কখনো অকারণে ভয় পায় না। তাই সে যখন সতর্ক হয়, তখন অন্যরাও বুঝে নেয়, বিষয়টা হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সেদিন বাড হিগিন্স মারদেকাকে সঙ্গে নিয়েই দক্ষিণের বেড়া ধরে বেরোল। কয়েক মাস আগেও ছেলেটা শুধু তাদের কাজ দেখত। এখন সে নিজেও কাজের অংশ হয়ে উঠেছে। বাড তাকে নতুন কোনো কৌশল শেখাল না। বরং এতদিন যা শিখেছে, সেগুলো বাস্তবে খেয়াল করতে বলল। কোথাও বেড়ার তার ঢিলে হয়েছে কি না, কোথাও খুঁটির গোড়ার মাটি নরম হয়েছে কি না, কোথাও শুকনো ঘাস অস্বাভাবিকভাবে চ্যাপ্টা হয়ে আছে কি না, সবকিছুই লক্ষ্য করতে বলল। মারদেকা ধীরে ধীরে হাঁটছিল। মাঝেমধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে মাটির দিকে তাকাচ্ছিল, শুকনো ডাল সরিয়ে দেখছিল, আবার উঠে দাঁড়াচ্ছিল। সে এখনো মিগুয়েলের মতো দক্ষ ট্র্যাকার নয়, কিন্তু তার ভেতরে পর্যবেক্ষণের অভ্যাস জন্মাতে শুরু করেছে। বাড সেটা লক্ষ্য করছিল। সে বুঝতে পারছিল, ছেলেটা আর শুধু নির্দেশ পালন করছে না, নিজের চোখ দিয়েও পৃথিবীকে পড়তে শিখছে।

দুপুরের দিকে তারা র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরে এলো। ইলাই তখন বারান্দার ছায়ায় বসে মারদেকার জন্য স্লেট আর বই সাজিয়ে রেখেছে। কয়েক ঘণ্টা ধরে অক্ষর আর ছোট ছোট শব্দ নিয়ে পড়াশোনা চলল। আগের তুলনায় এখন সে অনেক সহজে শব্দ চিনতে পারে। মাঝে মাঝে ভুল করে, আবার নিজেই সেটা ঠিক করার চেষ্টা করে। ইলাই তাকে কখনো তাড়া দেয় না। তার বিশ্বাস, যে ছেলে ধৈর্য ধরে পাহাড় পেরিয়ে নতুন জীবন খুঁজে নিতে পারে, সে একদিন বইয়ের পাতার ভেতর থেকেও নিজের পথ খুঁজে নেবে।

বিকেলের শেষ ভাগে সূর্যের আলো একটু নরম হয়ে এলে র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে হঠাৎ এক ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে উঠল। সবাই স্বাভাবিকভাবেই মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। ধুলোমাখা একটি বাদামি ঘোড়া দ্রুত এগিয়ে এসে প্রধান বাড়ির সামনে থামল। ঘোড়া থেকে নামল ব্ল্যাক রিভারের ডেপুটি মার্শাল। লোকটিকে দেখে লারসেন সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল। বহুবার শহরে গেলে তার সঙ্গে দেখা হয়েছে। 

সে টুপি খুলে সম্মান জানিয়ে বলল, &quot;মার্শাল এলি ব্রুকস আপনাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শহরে যেতে বলেছেন।&quot;

লারসেন স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। &quot;কী হয়েছে?&quot;

ডেপুটি মার্শাল মাথা নেড়ে বলল, &quot;মার্শাল বিস্তারিত কিছু বলেননি। শুধু বলেছেন, বিষয়টা আপনার নিজের কানে শোনা দরকার।&quot;

লারসেন আর কোনো প্রশ্ন করল না। এলি ব্রুকসকে সে বহু বছর ধরে চেনে। মানুষটা অকারণে কাউকে খবর পাঠায় না। বিশেষ করে নিজের ডেপুটিকে র&#x200d;্যাঞ্চ পর্যন্ত পাঠানোর প্রয়োজন সে তখনই মনে করবে, যখন শহরের ভেতরে এমন কিছু ঘটেছে, যার ছায়া শহরের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরেও পড়তে পারে। এই কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট ঘটনাগুলো একে একে লারসেনের মনে ফিরে এল। রাতের অচেনা ঘোড়সওয়ার, বেড়ার বাইরে পাওয়া অস্বাভাবিক চিহ্ন, শহরে কিছু মানুষের অদ্ভুত নড়াচড়া। এতদিন পর্যন্ত এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন যেন অদৃশ্য সুতোয় সবকিছু এক জায়গায় বাঁধা পড়তে শুরু করেছে।

ডেপুটি মার্শাল চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ উঠোনে নীরবতা নেমে রইল। বাতাসে শুকনো ঘাস দুলছে। দূরে গরুর পাল ধীরে ধীরে পানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। লারসেন অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত বলল, &quot;কাল সকালে আমি ব্ল্যাক রিভারে যাব।&quot;

শুধু একটি বাক্য। কিন্তু সেই বাক্য শুনেই বাড, ক্লে আর মিগুয়েল একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল। তাদের কারও মুখে প্রশ্ন নেই। কারণ তারা জানে, ওলফ লারসেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব দিক ভেবেই নেয়।

মারদেকা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। কথোপকথনের বেশিরভাগই সে বুঝতে পারেনি। কিন্তু একটি শব্দ আবার তার কানে স্পষ্ট ধরা পড়ল। ব্ল্যাক রিভার।

কয়েক মাস আগে সেই শহরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েই তার জীবনের মোড় ঘুরেছিল। এখন আবার সেই শহরের নাম উচ্চারিত হচ্ছে, কিন্তু এবারের স্বর সম্পূর্ণ আলাদা। এতে বিস্ময়ের চেয়ে সতর্কতার সুর বেশি। সে বুঝতে পারছিল না কী ঘটতে চলেছে, কিন্তু অনুভব করছিল, র&#x200d;্যাঞ্চের মানুষগুলোর চোখে যে অদৃশ্য সতর্কতা নেমে এসেছে, তার সঙ্গে ব্ল্যাক রিভারের কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে।

পশ্চিমের আকাশে তখন সূর্য ধীরে ধীরে লাল হয়ে নামছে। দীর্ঘ ছায়া এসে পড়েছে র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে। সেই ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে মারদেকা নীরবে শহরের দিকেই তাকিয়ে রইল। সে জানত না, পরদিন ওলফ লারসেন ব্ল্যাক রিভারে গিয়ে কী শুনবে। কিন্তু ভাগ্য যেন অদৃশ্য হাতে ধীরে ধীরে সব গুটি সাজিয়ে ফেলছে। আর সেই খেলায় মারদেকা, ওলফ লারসেন, ব্ল্যাক রিভার এবং অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা অজানা শত্রুর পথ খুব শিগগিরই প্রথমবারের মতো এক বিন্দুতে এসে মিলিত হবে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/260278/</link>
				<pubDate>Tue, 11 Aug 2026 05:45:53 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়-সাত<br />
পরদিন ভোরে র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে ছিল। সূর্যের প্রথম আলো পাহাড়ের কাঁধ ছুঁয়ে তৃণভূমির ওপর ছড়িয়ে পড়লেও অন্য দিনের মতো কোথাও হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। আস্তাবলের সামনে ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তাদের পরিচর্যা করতে আসা কাউবয়দের মুখে আজ অদ্ভুত গাম্ভীর্য। যেন রা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-260278"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/260278/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">7ea520a86b77ff63caf3523ae690af32</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–ছয়
পরদিন ভোরে ব্ল্যাক রিভারের ওপর হালকা কুয়াশার চাদর নেমে ছিল। নদীর দিক থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাস শুকনো ঘাসের মাথাগুলোকে আস্তে আস্তে দুলিয়ে দিচ্ছিল। পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে, কিন্তু র&#x200d;্যাঞ্চের বিস্তীর্ণ তৃণভূমির ওপর এখনো রাতের শিশির ঝলমল করছে। দূরে গরুর পাল নিঃশব্দে ঘাস খাচ্ছে। মাঝেমধ্যে কোনো বাছুর মায়ের ডাক শুনে মাথা তুলে তাকাচ্ছে, আবার ঘাসের ভেতর মুখ নামিয়ে দিচ্ছে। আস্তাবলের সামনে ঘোড়াগুলোও একে একে জেগে উঠেছে। কেউ খুর দিয়ে মাটি আঁচড়াচ্ছে, কেউ দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ তুলে মাথা ঝাঁকাচ্ছে। এই দৃশ্য এখন আর মারদেকার কাছে নতুন নয়। কয়েক মাস আগেও প্রতিটি সকাল তাকে বিস্মিত করত, কিন্তু আজ সে জানে, সূর্য ওঠার আগেই এই র&#x200d;্যাঞ্চের জীবন শুরু হয়ে যায়। পশ্চিমের মানুষ দিনের আলোকে কখনো অপচয় করে না।

গতকালের শহর-ভ্রমণের স্মৃতি এখনো তার চোখের ভেতর ভাসছে। ব্ল্যাক রিভারের দোকানগুলো, মানুষের ভিড়, গরম রুটির গন্ধ, খেলনার দোকানের কাঁচের ভেতর রাখা ছোট্ট কাঠের ঘোড়া, সবকিছু যেন রাতে ঘুমের মধ্যেও তাকে অনুসরণ করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শহরের চাকচিক্য তাকে র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়নি। বরং আজ সকালে উঠোনে পা রাখতেই তার মনে হলো, এটাই তার নিজের জায়গা। সে অভ্যাসমতো প্রথমে আস্তাবলের দিকে গেল। দরজা খুলতেই ভেতর থেকে উষ্ণ নিশ্বাসের সঙ্গে খড়ের গন্ধ এসে লাগল মুখে। সারি সারি ঘোড়া শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে কয়েকটা তাকে দেখেই কান খাড়া করল। বাদামি রঙের বুড়ো ঘোড়াটা, যেটার জিন বাঁধা সে প্রথম শিখেছিল, মাথা বাড়িয়ে তার কাঁধে নাক ছুঁইয়ে দিল। মারদেকা হেসে তার কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। ভাষা আলাদা হলেও মানুষ আর প্রাণীর মধ্যে যে বিশ্বাস জন্মাতে পারে, সেটা সে ধীরে ধীরে নিজের জীবন দিয়েই শিখছে।

বাইরে বেরোতেই বাড হিগিন্স তাকে দেখে মাথা নেড়ে ডাকল। এখন আর আগের মতো বেশি ইশারা করতে হয় না। মারদেকা অনেক শব্দ শিখে ফেলেছে। পুরো বাক্য বলতে পারে না, কিন্তু ছোট ছোট নির্দেশ বুঝতে পারে। বাড মাটিতে রাখা দুটি খালি পানির বালতির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, &quot;ওয়াটার।&quot; মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে বালতি দুটো তুলে কূপের দিকে হাঁটল। কাজটা খুব কঠিন নয়, কিন্তু সহজও নয়। বালতি ভরে ফিরতে ফিরতে তার হাত টনটন করতে লাগল। তবু সে থামল না। কারণ সে বুঝে গেছে, এই র&#x200d;্যাঞ্চে কাউকে আলাদা করে মূল্য দেওয়া হয় না। এখানে যে যত ভালো কাজ করে, তার মূল্য ততই বাড়ে।

সকাল গড়াতে গড়াতে তার হাতে আরও ছোট ছোট কাজ এসে জমল। কোথাও শুকনো খড় এনে রাখতে হলো, কোথাও ভাঙা বেড়ার পাশে নতুন খুঁটি টেনে দিতে হলো, কোথাও আবার দড়ি গুছিয়ে ঝুলিয়ে রাখতে হলো। কয়েক মাস আগেও যেসব জিনিস তার কাছে দুর্বোধ্য ছিল, আজ সেগুলোর অনেকটাই সে নিজে থেকে বুঝে করতে পারে। ভুল এখনো হয়, কিন্তু সেই ভুল আর আগের মতো ঘনঘন হয় না। 

বাড দূর থেকে দাঁড়িয়ে কয়েকবার তার কাজ দেখল। কোনো মন্তব্য করল না। শুধু একসময় মিগুয়েলের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, &quot;ছেলেটাকে এখন আর সবসময় বলে দিতে হয় না।&quot;

মিগুয়েল হেসে উত্তর দিল, &quot;আমি তো প্রথম দিনই বলেছিলাম, ওর চোখ দুটো আলাদা।&quot;

বাড কিছু বলল না। কিন্তু মুখের কোণে চাপা একটা হাসি ফুটে উঠল।

এই সময়টায় ইলাই প্রায়ই উঠোনের এক কোণে বসে পুরোনো বই পড়ত। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। মারদেকা খড়ের বোঝা নামিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে গিয়ে বৃদ্ধের পাশে দাঁড়াল। ইলাই বই বন্ধ করে তার দিকে তাকাল। তারপর মাটিতে কাঠি দিয়ে ধীরে ধীরে কয়েকটা শব্দ লিখল। Horse. River. Sky. তারপর একে একে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করল।

মারদেকাও ধীরে ধীরে অনুসরণ করল। &quot;Horse.&quot; এই শব্দে আর তার জড়তা নেই। &quot;River.&quot; এবারও উচ্চারণ মোটামুটি পরিষ্কার। &quot;Sky.&quot; এই শব্দটা বলতে গিয়ে সে একটু আটকে গেল। ইলাই আবার বলল। মারদেকা দ্বিতীয়বারে ঠিক করে উচ্চারণ করল।

বৃদ্ধের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে এবার আকাশের দিকে আঙুল তুলে আবার বলল, &quot;Sky.&quot; তারপর নদীর দিকে ইশারা করল, &quot;River.&quot; তারপর আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়াগুলোর দিকে দেখিয়ে বলল, &quot;Horse.&quot;

মারদেকা এবার শুধু শব্দ মুখস্থ করল না। শব্দ আর বাস্তব জিনিসের সম্পর্কটাও বুঝতে শুরু করল। ভাষা তার কাছে আর কাগজের অক্ষর হয়ে থাকল না। ধীরে ধীরে তা পৃথিবীকে চিনে নেওয়ার নতুন দরজায় পরিণত হতে লাগল।

দুপুরের দিকে ওলফ লারসেন মাঠ ঘুরে ফিরে এল। ঘোড়া থেকে নেমে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দূর থেকে মারদেকাকে দেখল। ছেলেটা তখন একা হাতে চামড়ার দড়িগুলো পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখছে। কাজ শেষ হলে সে নিজেই সেগুলো ঠিক জায়গায় ঝুলিয়ে দিল। কেউ তাকে সেটা করতে বলেনি। সে নিজের দায়িত্ব বুঝে করেছে। লারসেনের অভিজ্ঞ চোখে বিষয়টা এড়িয়ে গেল না। সে ধীরে ধীরে বাডের পাশে এসে দাঁড়াল। &quot;কেমন করছে?&quot;

বাড চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল, &quot;কাজ শেখানো যায়। কিন্তু কাজ খুঁজে নেওয়া শেখানো যায় না। ও নিজে থেকেই সেটা শিখছে।&quot;

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বিস্তীর্ণ র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। দূরে গরুর ঘণ্টার মৃদু শব্দ ভেসে আসছে। তার চোখ তখনও মারদেকার ওপর স্থির। কয়েক মাস আগে যে ছেলেটা শুধু আশ্রয়ের জন্য এখানে এসেছিল, সে আজ ধীরে ধীরে এই র&#x200d;্যাঞ্চের জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। হয়তো এখনও কেউ সেটা মুখে বলবে না। কিন্তু এই কঠিন পশ্চিমে স্বীকৃতি কথায় নয়, কাজে দেওয়া হয়। আর মারদেকা অজান্তেই সেই স্বীকৃতির দিকে এক ধাপ করে এগিয়ে চলেছে।

কিন্তু একই সময়, ব্ল্যাক রিভারের অন্য প্রান্তে কয়েক জোড়া চোখও নীরবে অপেক্ষা করে আছে। তারা তাড়াহুড়ো করছে না। তারা জানে, বড় আঘাত হানতে হলে আগে সময়কে নিজের পক্ষে আনতে হয়। আর সময়, ধীরে ধীরে, অদৃশ্য স্রোতের মতো, সবাইকে নিজের নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে চলেছে।

সেদিন বিকেলের দিকে রোদ যখন একটু নরম হতে শুরু করেছে, তখন র&#x200d;্যাঞ্চের কাজও ধীরে ধীরে গুছিয়ে আসছিল। প্রখর উত্তাপ কেটে গিয়ে তৃণভূমির ওপর দিয়ে শুষ্ক কিন্তু আরামদায়ক বাতাস বইতে শুরু করেছে। দূরের পাহাড়গুলোর গা ধীরে ধীরে গাঢ় নীল হয়ে উঠছে। সূর্যের আলোয় ঘাসের মাথাগুলো সোনালি রঙে ঝিলমিল করছে। গরুর পালকে পশ্চিমের চারণভূমি থেকে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি চলছে। কয়েকজন কাউবয় ঘোড়ায় চড়ে দূরে ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ বাঁশির মতো সরু সুরে ডাক দিচ্ছে, কেউ লম্বা দড়ি ঘুরিয়ে অলস হয়ে পড়া একটা বাছুরকে আবার পালের দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এই দৃশ্য এখন মারদেকার কাছে শুধু দেখার বিষয় নয়। সে মন দিয়ে লক্ষ্য করে, কে কখন কী করছে, কেন করছে। কারণ সে বুঝে গেছে, র&#x200d;্যাঞ্চে প্রতিটি কাজেরই একটা নিয়ম আছে। সেই নিয়ম না বুঝে শুধু অনুকরণ করলে কখনো প্রকৃত কাউবয় হওয়া যায় না।

বাড হিগিন্স অনেকক্ষণ ধরেই তাকে লক্ষ করছিল। কয়েক মাসে ছেলেটার মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটা চোখে না পড়ে উপায় নেই। আগের মতো সে আর প্রতিটি কাজের আগে নির্দেশের অপেক্ষা করে না। কোথাও দড়ি পড়ে থাকলে নিজে থেকেই গুছিয়ে রাখে, খড়ের গাদা কমে গেলে এনে ভরে দেয়, পানির পাত্র খালি দেখলে কাউকে না বলেই ভরে ফেলে। সবচেয়ে বড় কথা, সে এখন মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক কথাই বুঝে নিতে পারে। ভাষা পুরো শেখেনি, কিন্তু কাজের ভাষা শিখে ফেলেছে।

বাড আস্তাবলের ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ পরে হাতে একটা পুরোনো কিন্তু ভালো অবস্থার জিন নিয়ে বেরিয়ে এল। জিনটা সে মাটিতে নামিয়ে রাখল। তারপর মারদেকাকে ডাকল। ছেলেটা দ্রুত এগিয়ে এল। বাড এবার কোনো কথা বলল না। শুধু জিনটার দিকে তাকাল, তারপর আস্তাবলের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝারি গড়নের বাদামি ঘোড়াটার দিকে আঙুল তুলল।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। এই কাজ সে আগেও শিখেছে। কিন্তু সেদিন বাড প্রতিটি ধাপে তাকে সাহায্য করেছিল। আজ বাডের হাত দুটো বুকের ওপর ভাঁজ করা। তার চোখে এমন একটা দৃষ্টি, যা স্পষ্ট বলে দিচ্ছে, আজ সাহায্য করা হবে না।

ছেলেটা ধীরে ধীরে জিনটা তুলে নিল। আগের তুলনায় এখন তার শরীর অনেকটা শক্ত হয়েছে। প্রথম দিকে যে ওজন তাকে টলিয়ে দিত, আজ সেটা সামলাতে কষ্ট হচ্ছে না। সে ঘোড়ার পাশে গিয়ে একবার প্রাণীটার ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিল। ঘোড়াটাও শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব সাবধানে জিনটা তুলে পিঠের ওপর বসাল। প্রথমবারেই ঠিক জায়গায় বসাতে পারল না। নিজের ভুল সে নিজেই বুঝল। আবার নামাল। একটু পেছনের দিকে সরিয়ে দ্বিতীয়বার বসাল। এবার অবস্থান ঠিক হলো।

বাড এখনো চুপ করে আছে।

মারদেকা নিচু হয়ে পেটের নিচ দিয়ে বেল্ট টেনে আনল। বাকলে আটকে ধীরে ধীরে টান দিল। তারপর আবার হাত ঢুকিয়ে দেখল কোথাও বেশি শক্ত হয়ে গেছে কি না। এই অভ্যাসটা সে বাডের কাছ থেকেই শিখেছে। ঘোড়ার শরীরের আরাম আগে, মানুষের সুবিধা পরে। সবকিছু শেষ করে সে এক পা পিছিয়ে দাঁড়াল।

বাড এগিয়ে এসে নিজে হাতে জিনটা পরীক্ষা করল। সামনের বাঁধন, পেছনের বেল্ট, পায়ের রকাব, সবকিছু একবার দেখে নিয়ে সে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট স্বরে বলল, &quot;ভালো।&quot;

মাত্র একটি শব্দ। কিন্তু সেই একটি শব্দই মারদেকার বুকের ভেতর অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল।

দূরে দাঁড়িয়ে ওলফ লারসেন পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। সে কাছে এসে ঘোড়াটার লাগাম হাতে নিল। তারপর এক মুহূর্তও কিছু না বলে নিজের বুটের পা রেকাবে রেখে অনায়াসে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল। কয়েক কদম সামনে গিয়ে আবার নেমে এল। জিনে কোনো সমস্যা হয়নি। লারসেন এবার বাডের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, &quot;এবার ওকে পরের ধাপ শেখানোর সময় হয়েছে।&quot;

মারদেকা কথাটা পুরো বুঝতে পারল না। কিন্তু &quot;নেক্সট&quot; শব্দটা সে আগে শুনেছে। নতুন কিছু শেখানো হবে, এটুকু বুঝে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

বাড হালকা হেসে বলল, &quot;আগে ভারসাম্য। তারপর গতি।&quot; 

লারসেন সম্মতি জানাল।

সন্ধ্যার আগে তারা র&#x200d;্যাঞ্চের পেছনের খোলা চারণভূমিতে গেল। জায়গাটা সমতল। চারদিকে নরম ঘাস। নতুন কাউকে ঘোড়ায় চড়া শেখানোর জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা হয় না। বাড সেই একই শান্ত স্বভাবের বাদামি ঘোড়াটাকে নিয়ে এল। এবার সে নিজে ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে মারদেকার দিকে তাকাল।

কোনো তাড়া নেই। কোনো চাপ নেই। শুধু একটা নতুন শিক্ষার শুরু।

মারদেকা ধীরে ধীরে ঘোড়ার পাশে এসে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতর উত্তেজনা বাড়ছে। এতদিন সে ঘোড়ার পরিচর্যা করেছে, জিন পরিয়েছে, লাগাম ধরেছে, পাশে পাশে হেঁটেছে। কিন্তু আজ প্রথমবার সে বুঝতে পারল, সামনে যে দরজাটা খুলতে যাচ্ছে, তার ওপারেই রয়েছে পশ্চিমের মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। একজন মানুষকে সত্যিকারের কাউবয় বানায় শুধু বন্দুক নয়, তার আগে ঘোড়া।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে, র&#x200d;্যাঞ্চের বেড়ার অনেক দূরে, ধুলোমাখা পথের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে একজন অচেনা ঘোড়সওয়ার এগিয়ে আসছিল। সে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে তাকাল না, ভেতরে ঢোকার চেষ্টাও করল না। শুধু দূর থেকে জায়গাটা একবার চোখে মেপে নিয়ে আবার নিজের পথ ধরে চলে গেল। র&#x200d;্যাঞ্চের কেউ তাকে খেয়াল করল না।

কিন্তু পশ্চিমের দেশে অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা শুরু হয় এমনভাবেই, যখন কেউ বুঝতেই পারে না যে খেলা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

পরদিন ভোরে সূর্যের আলো যখন ব্ল্যাক রিভারের বিস্তীর্ণ প্রেইরির ওপর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন র&#x200d;্যাঞ্চের পেছনের খোলা চারণভূমিটা প্রায় নিস্তব্ধ। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের মাথায় আলো পড়ে ছোট ছোট কাঁচের টুকরোর মতো ঝিলিক দিচ্ছে। দূরে গরুর পাল এখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। কয়েকজন কাউবয় তাদের দিনের কাজ শুরু করার আগে ঘোড়াগুলোর জিন পরীক্ষা করছে। বাতাসে ঘাস, শুকনো মাটি আর চামড়ার গন্ধ মিশে আছে। সেই খোলা জায়গার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাড হিগিন্স, তার পাশে আগের দিনের সেই শান্ত স্বভাবের বাদামি ঘোড়াটা। আর কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে আছে মারদেকা। গত সন্ধ্যায় লারসেন বলেছিল, এবার তার পরের শিক্ষা শুরু হবে। সেই কথাটাই সারারাত তার মনে ঘুরেছে। উত্তেজনা আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে অজানা কিছুর প্রতি স্বাভাবিক ভয়।

বাড আজও বেশি কথা বলল না। সে জানে, অনেক শিক্ষা মুখে বোঝানো যায় না, হাতে ধরে দেখাতে হয়। প্রথমে সে নিজেই খুব ধীরে ধীরে রেকাবে পা রাখল, শরীরের ভারসাম্য ঠিক রেখে অনায়াসে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল। তারপর আবার নেমে এল। একবারও তাড়াহুড়ো করল না। প্রতিটি নড়াচড়া এত স্বাভাবিক যে মনে হয় কাজটা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ ব্যাপার। তারপর সে রেকাবের দিকে আঙুল দেখিয়ে মারদেকাকে এগিয়ে আসতে ইশারা করল।

মারদেকা ঘোড়ার পাশে এসে দাঁড়াল। একবার প্রাণীটার চোখের দিকে তাকাল। গত কয়েক মাসে সে শিখেছে, ঘোড়াকে কখনো ভয় দেখানো যায় না। ভয় দেখালে সে ভয়ই ফিরিয়ে দেয়। সে আলতো করে ঘোড়ার ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিল। বাদামি ঘোড়াটা শান্তভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মারদেকা বাম পা রকাবে তুলল। ডান হাত দিয়ে জিনের সামনের অংশ শক্ত করে ধরল। কিন্তু শরীরটা ওপরে তোলার মুহূর্তেই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। এক ঝটকায় আবার মাটিতে নেমে এল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিগুয়েল হেসে ফেলল। তবে সেই হাসিতে বিদ্রূপ ছিল না, ছিল নিজের প্রথম দিনের স্মৃতি।

বাডও হাসল না। সে শুধু আবার একই কাজ করে দেখাল। এবার সে নিজের শরীরের ভর কোথায় রাখতে হবে, সেটা হাতের ইশারায় বোঝাল। মারদেকা দ্বিতীয়বার চেষ্টা করল। এবার সে একটু ওপরে উঠতে পারল, কিন্তু ডান পা ঘোড়ার পিঠের ওপারে নেওয়ার আগেই শরীর কাত হয়ে গেল। আবার নেমে এল। কপালে ঘাম জমল। ঠোঁট কামড়ে সে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তৃতীয়বার চেষ্টা করল।

এইবার সে ঘোড়ার পিঠে উঠতে পারল।

তবে ঠিকমতো বসতে পারল না। শরীর শক্ত হয়ে আছে। দুই হাত এত জোরে জিন আঁকড়ে ধরেছে যে আঙুলের গাঁট সাদা হয়ে উঠেছে। ঘোড়াটা কয়েক পা এগোতেই তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। মনে হলো, এই বুঝি পড়ে যাবে। বাড দ্রুত এগিয়ে এসে লাগাম হাতে নিল। খুব ধীরে ধীরে ঘোড়াটাকে হাঁটাতে লাগল। মারদেকা প্রথমে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল। তারপর সাহস করে আবার খুলল। নিচের পৃথিবীটা আগের মতো নেই। সবকিছু যেন একটু উঁচু থেকে দেখা যাচ্ছে। বাতাসও অন্যরকম লাগছে।

বাড শান্ত গলায় বলল, &quot;শরীর শক্ত কোরো না।&quot;

মারদেকা পুরো বাক্যটা বুঝল না, কিন্তু বাড নিজের কাঁধ ঢিলে করে দেখাতেই সে অর্থটা ধরতে পারল। সে ধীরে ধীরে শরীরের জড়তা কমানোর চেষ্টা করল। আশ্চর্যের ব্যাপার, সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার চলাও অনেক আরামদায়ক মনে হতে লাগল। কয়েক মিনিট পরে তার মুখে অচেনা এক হাসি ফুটে উঠল। এই প্রথম সে ঘোড়ার পিঠে বসে পৃথিবীকে দেখছে।

দূরে দাঁড়িয়ে ওলফ লারসেন সব দেখছিল। ইলাইও বারান্দা থেকে তাকিয়ে আছে। বৃদ্ধের চোখে যেন এক ধরনের পিতৃস্নেহের কোমলতা। সে ধীরে ধীরে বলল, &quot;ছেলেটা শিখছে।&quot;

লারসেন উত্তর দিল, &quot;শুধু শিখছে না। ও মনে রাখছে।&quot;

বৃদ্ধ তার দিকে তাকাল।

লারসেন মৃদু স্বরে বলল, &quot;যাকে এক জিনিস বারবার শেখাতে হয়, সে কর্মী হয়। কিন্তু যে একবার দেখে মনে রাখে, সে একদিন নেতৃত্ব দেয়।&quot;

কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে গেল। কেউ আর কিছু বলল না।

পরবর্তী কয়েক দিন একই নিয়মে চলতে লাগল শিক্ষা। প্রথমে শুধু হাঁটা। তারপর ধীরে ধীরে মোড় নেওয়া। লাগাম কতটা টানতে হয়, কখন ছেড়ে দিতে হয়, ঘোড়ার চলার ছন্দের সঙ্গে নিজের শরীর কীভাবে মিলিয়ে নিতে হয়, এসব ছোট ছোট বিষয় বাড ধৈর্য ধরে শেখাতে লাগল। সে কখনো রাগ করত না। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল, মারদেকার সবচেয়ে বড় শক্তি তার কৌতূহল নয়, তার অধ্যবসায়। একই ভুল সে দ্বিতীয়বার খুব কমই করে।

এক বিকেলে অনুশীলন শেষে মারদেকা একাই ঘোড়াটাকে নিয়ে আস্তাবলের দিকে ফিরছিল। ঘোড়াটা ধীর পায়ে হাঁটছে। ছেলেটার দুই হাতে লাগাম, চোখে গভীর মনোযোগ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সে বহুদিন ধরেই এই কাজ করছে। ঠিক তখনই র&#x200d;্যাঞ্চের প্রধান ফটকের সামনে এক অপরিচিত ঘোড়সওয়ার এসে থামল। ধুলোমাখা কোট, মাথায় চওড়া টুপি। সে ভেতরে ঢুকল না। শুধু দূর থেকে র&#x200d;্যাঞ্চটার দিকে একবার তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ঘোড়া ঘুরিয়ে আবার শহরের দিকেই চলে গেল। মারদেকা তাকে খেয়ালই করল না।

কিন্তু বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ওলফ লারসেন লোকটাকে দেখেছিল। তার চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য সরু হয়ে এল। লোকটাকে সে চিনতে পারেনি।

আর পশ্চিমের দেশে এমন অচেনা মুখ, যে দূর থেকে শুধু দেখে চলে যায়, তাকে কখনোই সম্পূর্ণ নিরীহ বলে ধরে নেওয়া হয় না। এখানেই পরবর্তী দিনের অস্থিরতার প্রথম নীরব ছায়া এসে পড়ল।

ব্ল্যাক রিভার শহর থেকে ফেরার পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেল। বাইরে থেকে সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক। ভোর হলে কাউবয়রা মাঠে যাচ্ছে, দুপুরে গরুর পাল অন্য চরাগাহে সরানো হচ্ছে, সন্ধ্যায় ক্লান্ত ঘোড়াগুলো আস্তাবলে ফিরছে। কিন্তু ওলফ লারসেন বুঝতে পারছিল, এই স্বাভাবিকতার নিচে কোথাও একটা অদৃশ্য টান তৈরি হয়েছে। বহু বছরের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, বড় ঝড় আসার আগে প্রকৃতি যেমন অকারণ শান্ত হয়ে যায়, তেমনি মানুষের শত্রুরাও আঘাত হানার আগে কিছুদিন নিঃশব্দে অপেক্ষা করে। শহরে গিয়েও সে সেই অস্বস্তিটা অনুভব করেছিল। কয়েকজন পুরোনো পরিচিত মানুষের চোখে সে এমন এক ধরনের সংকোচ দেখেছে, যা তারা লুকানোর চেষ্টা করছিল। কেউ কিছু বলেনি, কিন্তু সবাই যেন কিছু একটা জানে। এই নীরবতাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছিল।

মারদেকা অবশ্য এসবের কিছুই বুঝতে পারছিল না। তার পৃথিবী এখনও অনেক সহজ। সকালে ইলাইয়ের কাছে পড়াশোনা, দুপুরে বাডের সঙ্গে র&#x200d;্যাঞ্চের কাজ শেখা, আর বিকেলে সুযোগ পেলেই দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। তবে একটা পরিবর্তন সত্যিই ঘটেছে। কয়েক মাস আগেও র&#x200d;্যাঞ্চের লোকেরা তাকে কৌতূহল নিয়ে দেখত। এখন আর কেউ তাকে অচেনা মনে করে না। রান্নাঘরে ঢুকলে রোজা তাকে আলাদা করে খেতে ডাকে। বাড কোনো কাজ শুরু করার আগে ইশারায় তাকে পাশে দাঁড়াতে বলে। ইলাই মাঝে মাঝে বই বন্ধ করে তাকে ছোট ছোট বাক্য বলায়। 

এমনকি ক্লে মরগানও, যে প্রথম দিন থেকেই ছেলেটাকে অপছন্দ করছিল, সেও এখন কাজের ফাঁকে কখনও কখনও ছোট্ট করে জানতে চায়, &quot;সব ঠিক আছে?&quot; 

মারদেকা সব শব্দ বোঝে না, কিন্তু মানুষের চোখের ভাষা এখন অনেকটাই শিখে ফেলেছে। সে বুঝতে পারে কে তাকে গ্রহণ করেছে, কে এখনও দূরত্ব রেখে চলে।

সেদিন বিকেলের দিকে বাড তাকে নিয়ে উত্তর দিকের পুরোনো বেড়াগুলো দেখতে গেল। কয়েকটা খুঁটি ঢিলে হয়ে গেছে। দুজনে মিলে নতুন কাঠ বসাচ্ছিল। কাজ করতে করতেই বাড মাঝেমধ্যে তাকে দড়ি এগিয়ে দিতে বলছে, হাতুড়ি ধরতে বলছে, খুঁটি সোজা করে রাখতে বলছে। মারদেকা এখন আর আগের মতো ভুল করে না। কাজ শুরুর আগে সে নিজেই চারপাশ দেখে নেয়, কী লাগতে পারে আন্দাজ করার চেষ্টা করে। 

বাড একসময় খেয়াল করল, কথা না বলেও ছেলেটা তার প্রয়োজনের অর্ধেক বুঝে ফেলছে। সে মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল, &quot;এভাবেই শেখা যায়।&quot; 

কথার পুরো অর্থ মারদেকা বুঝল না, কিন্তু প্রশংসার সুরটা বুঝল। তার মুখে অজান্তেই ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।

বেড়া মেরামত শেষ করে দুজনে একটু উঁচু ঢিবির ওপর দাঁড়াল। সেখান থেকে পুরো র&#x200d;্যাঞ্চটা দেখা যায়। পশ্চিমে ডুবে যাওয়া সূর্যের আলোয় ঘাসগুলো যেন তামার পাতার মতো ঝিলমিল করছে। দূরে গরুর পাল ধীরে ধীরে ফিরছে। কাউবয়দের ছায়া লম্বা হয়ে মাঠের ওপর বিছিয়ে গেছে। সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মারদেকার মনে হলো, এই জায়গাটা সত্যিই তার নিজের হয়ে উঠছে। পাহাড়ের ওপারের ছোট্ট গ্রামটা এখনও তার স্মৃতিতে আছে, কিন্তু সেই স্মৃতির ব্যথা এখন আর আগের মতো তীব্র নয়। মানুষের জীবনে কখন যে নতুন শেকড় গজিয়ে ওঠে, মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না।

ঠিক তখনই দক্ষিণ দিকের পথ থেকে একটা ঘোড়া দ্রুত ছুটে আসতে দেখা গেল। ঘোড়াটার গা ধুলোয় ঢাকা, আর আরোহী বারবার পেছনে তাকাচ্ছে। বাডের মুখের হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সে চোখ কুঁচকে লোকটাকে চিনতে চেষ্টা করল। কয়েক মুহূর্ত পর চিনতে পেরে বলল, &quot;স্যাম!&quot; পরক্ষণেই সে ঢিবি থেকে নেমে গেল। যথাসম্ভব দ্রুত র‌্যাঞ্চের দিকে এগুলো। 

বাডের হাবভাবে মারদেকাও বুঝে গেল বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। সেও তাকে অনুসরণ করলো।

লোকটা র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে ঢুকেই প্রায় লাফিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল। তার শ্বাস দ্রুত উঠছে। মুখ শুকিয়ে গেছে। ওলফ লারসেন তখন বারান্দা থেকে নেমে এগিয়ে এল। চারপাশের সবাই কাজ থামিয়ে তাকিয়ে আছে।

স্যাম কিছুক্ষণ শ্বাস সামলে নিচু গলায় বলল, &quot;বস... পশ্চিমের চরাগাহের কাছে... দুটো গরু মরে পড়ে আছে।&quot;

লারসেনের চোখ স্থির হয়ে গেল। &quot;রোগ?&quot;

স্যাম ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। &quot;না।&quot;

&quot;তাহলে?&quot; 

স্যাম এবার আরও নিচু গলায় বলল, &quot;গুলির দাগ আছে।&quot;

এক মুহূর্তের জন্য পুরো উঠোনে এমন নীরবতা নেমে এল, যেন বাতাসও থেমে গেছে। বাড ধীরে ধীরে মারদেকার দিকে তাকাল। ছেলেটা কথাগুলোর অর্থ বুঝতে পারেনি, কিন্তু সবার মুখের পরিবর্তন সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে দিনের ক্লান্তি আর শান্তি ছিল, সেখানে এখন অদৃশ্য উত্তেজনা জমে উঠেছে।

ওলফ লারসেন কোনো কথা বলল না। শুধু ধীরে ধীরে ঘুরে আস্তাবলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে র&#x200d;্যাঞ্চের প্রত্যেক মানুষ বুঝে গেল, এটা সাধারণ ঘটনা নয়। কেউ যদি গরু চুরি করত, সেটা একরকম কথা। কিন্তু গুলি করে মেরে রেখে যাওয়া অন্য বার্তা বহন করে। এটা ক্ষতি করার জন্য নয়, ভয় দেখানোর জন্য।

বারান্দার সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে মারদেকা স্থির চোখে সব দেখছিল। সে এখনও জানে না পশ্চিমের মানুষের এই নীরবতার মানে কী। কিন্তু তার বুকের ভেতর আবার সেই অচেনা অস্বস্তিটা ফিরে এল, যেটা সে প্রথম অনুভব করেছিল সেদিন, যখন কয়েকজন অচেনা ঘোড়সওয়ার র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছিল। তার মনে হলো, বাতাসের গন্ধ যেন হঠাৎ বদলে গেছে।

আর অনেক দূরে, পশ্চিমের চরাগাহের শুকনো ঘাসের ভেতর, সন্ধ্যার আলো নিভে আসার সঙ্গে সঙ্গে দুটো মৃত গরুর পাশে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছিল মাটিতে পড়ে থাকা খালি কার্তুজের খোসা। কেউ সেগুলো তুলে নেয়নি। যেন ইচ্ছে করেই রেখে যাওয়া হয়েছে। যেন কেউ চাইছে, ওলফ লারসেন সেগুলো দেখুক... এবং বুঝে যাক, খেলা সত্যিই শুরু হয়ে গেছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/260163/</link>
				<pubDate>Mon, 10 Aug 2026 11:41:50 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–ছয়<br />
পরদিন ভোরে ব্ল্যাক রিভারের ওপর হালকা কুয়াশার চাদর নেমে ছিল। নদীর দিক থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাস শুকনো ঘাসের মাথাগুলোকে আস্তে আস্তে দুলিয়ে দিচ্ছিল। পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে, কিন্তু র&#x200d;্যাঞ্চের বিস্তীর্ণ তৃণভূমির ওপর এখনো রাতের শিশির ঝলমল করছে। দূরে গরুর পাল নিঃ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-260163"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/260163/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">b80b338bbcd2dac328aeceea23cf02c4</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–পাঁচ
রাতের শেষ প্রহর। ব্ল্যাক রিভারের ওপর তখনো ভোরের আলো নামেনি। শহরের প্রধান রাস্তার দুপাশে সারি সারি কাঠের দোকান, লোহার কারখানা, কামারের চুল্লি, ডাকঘর আর সেলুনগুলো অন্ধকারে ডুবে আছে। দিনের বেলা যে রাস্তা ঘোড়ার খুরের শব্দ, গরুর পাল, ব্যবসায়ীদের হাঁকডাক আর মাতাল কাউবয়দের হাসিতে মুখর থাকে, সেই রাস্তা এখন এতটাই নিস্তব্ধ যে দূরের চার্চের টাওয়ারে বসে থাকা একজোড়া কাকের ডানা ঝাপটানোর শব্দও শোনা যায়। 

কিন্তু শহরের পশ্চিম প্রান্তের সেই পুরোনো গুদামঘরটার ভেতরে এখনো আলো জ্বলছে। মোটা কাঠের দরজার ফাঁক গলে লণ্ঠনের হলুদ আলো বাইরে এসে পড়েছে। ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে আছে সস্তা হুইস্কির গন্ধ, পুরোনো চামড়ার গন্ধ আর বহুদিন পরিষ্কার না করা কাঠের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। টেবিলের ওপর ছড়ানো মানচিত্রটা এখনো আগের জায়গাতেই পড়ে আছে। তার ওপর মোটা কালিতে গোল করে দাগ দেওয়া জায়গাটার নাম, লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ। 

লম্বা কালো কোট পরা লোকটা কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকে জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। পূর্ব আকাশে খুব সামান্য আলো ফুটতে শুরু করেছে। সে ধীরে ধীরে ঘুরে বাকিদের দিকে তাকাল। তার চোখে এমন এক ধরনের ঠান্ডা স্থিরতা, যা সাধারণ ডাকাতদের মধ্যে দেখা যায় না। সে তাড়াহুড়ো করে না, উত্তেজিতও হয় না। যেন প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অনেক দূর পর্যন্ত ভেবে নেয়। নিচু গলায় বলল, &quot;আজ নয়। কালও নয়। শিকারকে ধরতে হলে আগে তার অভ্যাস জানতে হয়।&quot; 

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দাড়িওয়ালা লোকটা বিরক্ত মুখে বলল, &quot;তাহলে আমরা কতদিন অপেক্ষা করব?&quot; 

কালো কোটের লোকটা হালকা হাসল। &quot;যতদিন দরকার। ওলফ লারসেন বোকা মানুষ নয়। তার র&#x200d;্যাঞ্চে ঢুকতে হলে আগে জানতে হবে কে কখন বেরোয়, কে কখন পাহারা দেয়, আর কোথায় সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটা আছে।&quot; 

কথাগুলো শুনে আর কেউ প্রতিবাদ করল না। কারণ তারা সবাই জানে, এই লোকটার পরিকল্পনা একবার শুরু হলে সে খুব কমই ভুল করে। কয়েক মুহূর্ত পর সে মানচিত্রটা গুটিয়ে ফেলল। তারপর শান্ত গলায় বলল, &quot;আজ থেকে নজর রাখা শুরু হবে। শহরে যারা আসে, তাদের মধ্যে নতুন মুখগুলোর ওপরও চোখ রাখবে। বিশেষ করে... সেই ছেলেটার ওপর।&quot; 

বাকিরা অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল। &quot;কোন ছেলেটা?&quot; 

লোকটা জানালার বাইরে তাকিয়ে উত্তর দিল, &quot;যে পাহাড় থেকে নেমে এসেছে। যার জন্য লারসেন নিজের দরজা খুলে দিয়েছে। একজন মানুষ কারণ ছাড়া এমন কাজ করে না।&quot; সে আর কিছু বলল না। কিন্তু কথাগুলো বাতাসে এমনভাবে ঝুলে রইল, যেন অদৃশ্য কোনো জাল ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে।

সেই সময় শহর থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সকাল শুরু হচ্ছিল। রাতের শিশিরে ভিজে থাকা ঘাসের ডগাগুলো সূর্যের প্রথম আলোয় রুপোর মতো ঝলমল করছে। দূরের পাহাড়গুলো নীলচে কুয়াশার আড়ালে আধাআধি ঢাকা। আস্তাবলের ভেতর থেকে ঘোড়ার নাক ঝাড়ার শব্দ ভেসে আসছে। গরুর পালও ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। র&#x200d;্যাঞ্চের লোকজনের দিনের শুরু হয়েছে আগের মতোই নিয়ম মেনে। কেউ পানির পাম্প চালাচ্ছে, কেউ আগুনে কফির পাত্র বসাচ্ছে, কেউ আবার চামড়ার জিনে তেল দিচ্ছে। এই নিয়মের ভেতরেই পশ্চিমের মানুষের জীবন। এখানে অলসতার জায়গা নেই। প্রকৃতি প্রতিদিন নতুন করে পরীক্ষা নেয়, আর যে পরীক্ষায় ফেল করে, তাকে দ্বিতীয় সুযোগ খুব কমই দেয়।

মারদেকারও ঘুম ভেঙে গেছে অনেক আগেই। গত রাত থেকে উত্তেজনায় তার ঠিকমতো ঘুমই হয়নি। আজ সে প্রথমবার ব্ল্যাক রিভার শহরে যাবে। এই কয়েকটা দিন সে শুধু দূর থেকে শহরটাকে দেখেছে। আজ সে সেই রাস্তা দিয়ে হাঁটবে, যেখানে এতদিন শুধু কল্পনায় নিজেকে দেখেছে। বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তার চোখ চলে গেল দূরের দিকে। সকালের কুয়াশার ফাঁক দিয়ে শহরের কয়েকটা ছাদ অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। তার বুকের ভেতর আবারও সেই পুরোনো কৌতূহল ফিরে এল। পাহাড়ের ওপারে থাকতে সে ভাবত, শহরে গেলে হয়তো সব মানুষ সুখে থাকে। এখানে এসে সে বুঝেছে, মানুষ যেখানে থাকে, সেখানেই আনন্দ আছে, কষ্টও আছে। তবু শহরটার প্রতি তার আকর্ষণ এতটুকু কমেনি। বরং আরও বেড়েছে। কারণ এখন সে জানে, ওই শহরের সঙ্গে তার নতুন জীবনের সম্পর্ক তৈরি হতে যাচ্ছে।

ইলাই দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। বৃদ্ধ কিছুক্ষণ ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল। উত্তেজনায় মারদেকার চোখ দুটো আজ যেন আরও বড় হয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে বলল, &quot;আজ অনেক কিছু দেখবে। কিন্তু সবকিছু দেখে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না। শহরে মানুষ অবাক হওয়া চোখ খুব তাড়াতাড়ি চিনে ফেলে।&quot; 

কথাগুলোর অর্থ মারদেকা পুরো বুঝল না। কিন্তু ইলাইয়ের কণ্ঠের কোমলতা তাকে আশ্বস্ত করল। সে শুধু মাথা নেড়ে হাসল। তারপর তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে এল।

উঠোনে তখন ওলফ লারসেন নিজের ঘোড়ার জিন শক্ত করে বাঁধছে। ক্লে মরগানও প্রস্তুত। বাড হিগিন্স একটা বস্তার মুখ দড়ি দিয়ে বাঁধছে। বোঝাই যাচ্ছে, তারা শুধু শহর ঘুরতে যাচ্ছে না। র&#x200d;্যাঞ্চের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসও আনতে হবে। লারসেন একবার চোখ তুলে মারদেকার দিকে তাকাল। ছেলেটার চোখে যে উচ্ছ্বাস, সেটা তার দৃষ্টি এড়াল না। খুব সামান্য হাসল সে। তারপর শান্ত গলায় বলল, &quot;বাছা আজ তোমাকে ব্ল্যাক রিভার দেখাবো।&quot;

মারদেকা কথাটা বুঝল না, কিন্তু ইশারাটা বুঝল। তার বুকের ভেতরটা আবার ধক করে উঠল। সে জানত না, আজকের এই ছোট্ট যাত্রাই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথচলাগুলোর একটি হতে চলেছে। কারণ ব্ল্যাক রিভার শুধু একটা শহরের নাম নয়। এই শহরই তাকে মানুষ চেনাবে, বন্ধু দেবে, শত্রুও দেবে। আর অজান্তেই, একই সকালে, শহরের অন্য প্রান্তে কয়েক জোড়া ঠান্ডা চোখও অপেক্ষা করতে শুরু করেছে সেই ছোট্ট ছেলেটাকে প্রথমবার কাছ থেকে দেখার জন্য।

সুর্যের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়তে না পড়তেই লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ আবার নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এল। আস্তাবলের সামনে তখন ঘোড়ার খুরের শব্দ, দড়ি টানার আওয়াজ আর কাউবয়দের ছোট ছোট নির্দেশে চারপাশ মুখর হয়ে উঠেছে। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মারদেকা আগের মতোই বাড হিগিন্সের কাছে এসে দাঁড়াল। কয়েক মাস আগেও এই বিশাল আস্তাবল, ঘোড়ার সারি, চামড়ার জিন আর লাগামের ভিড় তাকে ভড়কে দিত। এখন আর দেয় না। এখন সে জানে কোন ঘোড়াটা অস্থির, কোনটা শান্ত, কোনটার কাছে ধীরে যেতে হয়, আর কোনটার গায়ে হাত রাখলেই সে নিশ্চিন্ত হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। এখনও সে দক্ষ নয়, কিন্তু আর অপরিচিতও নয়। এই কয়েক মাসে র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি সকাল তার শরীর আর মনে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে চোখ বন্ধ করেও সে কাজের ক্রম বলে দিতে পারবে।

বাড তখন একটা বাদামি ঘোড়ার খুর পরীক্ষা করছিল। মারদেকাকে দেখেই মাথা তুলে তাকাল। আগের মতো আর হাত নেড়ে ডাকতে হলো না। ছেলেটা নিজে থেকেই পাশে এসে দাঁড়াল। বাড ঘোড়াটার একটা পা আলতো করে তুলে ধরল, তারপর হাতের ছোট লোহার হুক দিয়ে খুরের ভেতরে আটকে থাকা শুকনো কাদা পরিষ্কার করতে লাগল। কাজ শেষ করে একই হুকটা মারদেকার হাতে দিল। 

ছেলেটা একবার তার মুখের দিকে তাকাল, তারপর হাঁটু গেড়ে বসে ঘোড়ার অন্য পাটা ধরল। প্রথম দিকে এই কাজ করতে গিয়ে সে ভয় পেত। যদি ঘোড়া লাথি মারে? এখন আর সেই ভয় নেই। বরং হাতের স্পর্শেই সে বুঝতে পারে প্রাণীটা অস্থির না শান্ত। ধীরে ধীরে খুর পরিষ্কার করতে করতে সে একবারও তাড়াহুড়ো করল না। বাড চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখল। কাজ শেষ হলে শুধু মাথা নেড়ে মৃদু হাসল। এই হাসিটুকুই মারদেকার কাছে অনেক বড় পুরস্কার।

সকালের নাশতার পর ইলাইয়ের সঙ্গে পড়াশোনাও এখন আগের চেয়ে অনেক এগিয়েছে। কয়েক মাসের চেষ্টায় মারদেকা ছোট ছোট ইংরেজি শব্দ চিনতে শিখেছে। নিজের নাম লিখতে পারে। ওলফ, হর্স, ওয়াটার, ব্রেড, হাউস, স্কাই, রিভার, এই শব্দগুলো এখন আর তার কাছে অচেনা নয়। অনেক সময় ভুল করে, অক্ষর উল্টে ফেলে, উচ্চারণ আটকে যায়, কিন্তু সে হাল ছাড়ে না। ইলাইও কখনো বিরক্ত হয় না। বৃদ্ধ জানে, এই ছেলেটার সবচেয়ে বড় শক্তি তার ধৈর্য। যে ছেলে তিন দিন পাহাড় পেরিয়ে একা অজানা শহরে পৌঁছাতে পারে, তার কাছে একটা ভাষা শেখা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

দুপুরের একটু আগে ওলফ লারসেন আস্তাবলের দিকে এল। তার হাতে একটা মোটা হিসাবের খাতা। সঙ্গে ছিল রুবেন কোল। দুজনে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় কিছুক্ষণ কথা বলল। মারদেকা দূর থেকে দেখছিল। ভাষা পুরোপুরি না বুঝলেও কিছু শব্দ এখন তার কানে ধরা পড়ে। আজও দু একটা শব্দ সে চিনতে পারল। &quot;ব্ল্যাক রিভার&quot;... &quot;স্টোর&quot;... &quot;ময়দা&quot;... &quot;পেরেক&quot;... &quot;কেরোসিন&quot;। কথাগুলো শুনে তার কৌতূহল জাগল। কয়েক দিন পরপরই র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে কেউ না কেউ শহরে যায় প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে। এতদিন সে শুধু তাদের যেতে দেখেছে। কখনো যাওয়ার সুযোগ হয়নি।

রুবেন ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, ঠিক তখনই লারসেনের চোখ গিয়ে পড়ল মারদেকার ওপর। কয়েক মুহূর্ত সে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়াল। লারসেন খাতাটা বন্ধ করে তার দিকে তাকিয়ে খুব সহজ স্বরে বলল, &quot;আজ না। কিন্তু শিগগিরই তোমাকে শহর দেখাব।&quot; 

কথাগুলো মারদেকা পুরো বুঝল না। শুধু &quot;টাউন&quot; শব্দটা তার কানে আটকাল। এই শব্দটা সে আগেও শুনেছে। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখে আলো জ্বলে উঠল। লারসেন সেটা লক্ষ করল। মৃদু হেসে তার কাঁধে হাত রেখে আবার নিজের কাজে চলে গেল।

সারাটা বিকেল সেই একটি শব্দই মারদেকার মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল। টাউন। ব্ল্যাক রিভার। যে শহরকে সে প্রথম দেখেছিল দূরের পাহাড় থেকে, যে শহরের আলো তাকে নিজের গ্রাম ছেড়ে এত দূর টেনে এনেছিল, যে শহরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে নতুন জীবন পেয়েছিল, সেই শহরের ভেতরটা সে এখনও দেখেনি। র&#x200d;্যাঞ্চের বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে দূরের ধোঁয়া ওঠা চিমনি আর ছাদের সারির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, ওখানে কত মানুষ, কত দোকান, কত অজানা গল্প লুকিয়ে আছে। 

পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙতেই মারদেকা বুঝতে পারল, আজকের সকালটা অন্য রকম। কারণ আগের দিন সন্ধ্যায় খাবারের টেবিলে বসে ওলফ লারসেন নিজেই ইলাইকে বলেছিল, &quot;ওকে আর পিছিয়ে দেওয়া যাবে না। কাল ছেলেটাকে ঠিক শহর দেখিয়ে আনব।&quot; 

কথাটা শুনে মারদেকা পুরো অর্থ বুঝতে পারেনি, কিন্তু &quot;টাউন&quot; শব্দটা সে চিনতে শিখেছে। সেই শব্দটাই সারারাত তার মাথার ভেতর ঘুরেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও লারসেন তাকে শহরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিল। তারপর গরু চুরির ঘটনা, র&#x200d;্যাঞ্চের বাড়তি কাজ আর নানা ব্যস্ততায় বিষয়টা পিছিয়ে গিয়েছিল। তখন মারদেকা কিছুই বলেনি। সে এতদিনে বুঝে গেছে, এই র&#x200d;্যাঞ্চে কোনো কাজ কারণ ছাড়া স্থগিত হয় না। তাই আবার যখন লারসেন নিজেই কথা দিল, তখন ছেলেটার মনে অদ্ভুত এক উত্তেজনা জন্ম নিল। মনে হচ্ছিল, যে শহরের আলো তাকে পাহাড়ের ওপার থেকে টেনে এনেছিল, আজ অবশেষে সে সেই শহরের ভেতরে হাঁটবে।

সকালের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। উঠোনে দাঁড়িয়ে বাড হিগিন্স একটা বাদামি ঘোড়ার জিন পরীক্ষা করছিল। মিগুয়েল গরুর খোঁয়াড়ের দিকে যাচ্ছে। রুবেন কোল বেড়ার একটা ভাঙা অংশ দেখে লোকজনকে নির্দেশ দিচ্ছে। সবকিছুই স্বাভাবিক, তবু মারদেকার কাছে আজ সবকিছু যেন একটু উজ্জ্বল লাগছিল। সে বারবার বাড়ির সামনে এসে শহরের দিকের রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল। 

ইলাই সেটা দেখে মৃদু হেসে বলল, &quot;অপেক্ষা করতে শেখাও মানুষের একটা শিক্ষা।&quot; 

কথাটা মারদেকা পুরো বুঝল না, কিন্তু বৃদ্ধের হাসি বুঝল। সে আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর ওলফ লারসেন বারান্দা থেকে নেমে এল। আজ তার কোমরে শুধু রিভলভার নয়, কাঁধে হালকা একটা কোটও ঝুলছে। সে চারদিকে একবার তাকিয়ে বাডকে কয়েকটা নির্দেশ দিল। তারপর মারদেকার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। মারদেকা দৌড়ে এগিয়ে এল। লারসেন তার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, &quot;আজ টাউন।&quot; 

এবার ছেলেটা শব্দটা চিনতে পারল। তার চোখ মুহূর্তের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মুখে এমন এক আনন্দ ফুটে উঠল, যা কোনো ভাষা ছাড়াই বোঝা যায়।

বাড এগিয়ে এসে বলল, &quot;ওকে কি হাঁটিয়েই নিয়ে যাবেন বস?&quot; 

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, &quot;হ্যাঁ। প্রথম দিন ওর চোখ দিয়ে শহরটা দেখতে চাই। ঘোড়ার পিঠে বসলে অনেক কিছুই চোখ এড়িয়ে যায়।&quot; 

বাড হালকা হেসে আর কিছু বলল না। সে জানত, লারসেন যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তার পেছনে একটা কারণ থাকেই।

মারদেকা দ্রুত নিজের পুরোনো টুপিটা মাথায় পরে নিল। তারপর একবার ঘুরে র&#x200d;্যাঞ্চটার দিকে তাকাল। কয়েক মাস আগেও এই জায়গাটা ছিল তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। এখন এই উঠোন, এই আস্তাবল, এই গরুর খোঁয়াড়, এই মানুষগুলো তার প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারল না কেন, কিন্তু বাড়ি থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য বেরিয়েও তার মনে হলো, যেন আপন কিছু পেছনে রেখে যাচ্ছে।

ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল। মারদেকা তার এক কদম পেছনে। র&#x200d;্যাঞ্চের প্রধান ফটক পেরিয়ে তারা সেই ধুলোমাখা পথ ধরে এগিয়ে চলল, যে পথ কয়েক মাস আগে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত আর ভীত এক কিশোর একা হেঁটে এসেছিল। তখন তার সামনে ছিল অনিশ্চয়তা। যাকে সামনে রেখে সে এসেছিল, সে ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত। আজ তার পাশে হাঁটছে এমন একজন মানুষ, যাকে সে সবচেয়ে বেমী চেনে। যার উপস্থিতি তাকে নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়। পথটা একই, কিন্তু যাত্রাটা আর আগের মতো নয়।

সকালের রোদ ধীরে ধীরে তৃণভূমির ওপর নেমে আসছিল। দূরে ব্ল্যাক রিভারের প্রথম দালানগুলোর ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে। শহরটা যেন ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। মারদেকার বুকের ভেতর আবার সেই পুরোনো কৌতূহল জেগে উঠল। সে জানত না, আজ সে কী কী দেখবে। শুধু জানত, তার জীবনের আরেকটা নতুন দরজা খুলতে চলেছে।

আর ঠিক সেই সময়, ব্ল্যাক রিভারের অন্য প্রান্তে, আগের রাতের সেই অন্ধকার ঘরের মানুষগুলো আরেকবার একত্র হয়েছিল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা মানচিত্রটা এবার গুটিয়ে রাখা হয়েছে। কথাবার্তা কম, কিন্তু সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ়। তাদের লক্ষ্য এখনও একটাই, ওলফ লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চ। তারা জানত না, এই মুহূর্তে লারসেন শহরের দিকেই হাঁটছে। আর তারা তো জানার প্রশ্নই আসে না যে, তার পাশে হাঁটছে এক কিশোর, যার ভাগ্য খুব অচিরেই অদৃশ্য সুতোয় জড়িয়ে যাবে তাদের পরিকল্পনার সঙ্গে। এখনো কেউ কাউকে চেনে না। কিন্তু ভাগ্য অনেক সময় মানুষের পরিচয় ঘটিয়ে দেয়, তারও অনেক আগে।

ব্ল্যাক রিভারের প্রথম ঘরগুলো চোখে পড়তেই মারদেকার হাঁটার গতি অজান্তেই ধীর হয়ে গেল। শহরটাকে সে এর আগে দু&#039;বার দেখেছে, কিন্তু দূর থেকে। একবার পাহাড়ের মাথা থেকে, যখন রাতের অন্ধকারে ছড়িয়ে থাকা আলোগুলোকে তার মনে হয়েছিল মাটিতে নেমে আসা আকাশের তারা। আরেকবার যখন ক্ষুধায়, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া শরীর নিয়ে শহরের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সেদিন তার চোখে পৃথিবী দেখার মতো শক্তি ছিল না। আজ প্রথমবার সে সচেতনভাবে ব্ল্যাক রিভারের ভেতরে প্রবেশ করছে।

র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে শহরে আসার পথটা খুব বেশি দীর্ঘ নয়। ধুলোমাখা রাস্তা ধীরে ধীরে শক্ত মাটির চওড়া পথে মিলেছে। দুই ধারে ছোট ছোট কাঠের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। কোথাও কাপড় শুকোচ্ছে, কোথাও একটা বাচ্চা ছেলে কাঠের চাকা গড়িয়ে খেলছে, কোথাও আবার বৃদ্ধা মহিলা বারান্দায় বসে ভুট্টার খোসা ছাড়াচ্ছে। রাস্তায় চলতে চলতে মানুষজন ওলফ লারসেনকে দেখে মাথা নেড়ে সম্ভাষণ জানাচ্ছে। কেউ থেমে দু&#039;একটা কথাও বলছে। লারসেনও সংক্ষেপে জবাব দিচ্ছে। মারদেকা বিস্মিত হয়ে সব দেখছে। পাহাড়ের তার গ্রামে সবাই সবাইকে চিনত। কিন্তু এই শহরে এত মানুষের মাঝেও একজন মানুষকে এত সম্মান করা যায়, সেটা তার কল্পনার বাইরে ছিল।

একসময় তারা শহরের মূল সড়কে পৌঁছাল। সঙ্গে সঙ্গেই মারদেকার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। দু&#039;পাশে সারি সারি দোকান। কোথাও কামারের দোকান থেকে হাতুড়ির টংটং শব্দ ভেসে আসছে। কোথাও কাঠমিস্ত্রি করাত চালাচ্ছে। একটা দোকানের সামনে ঝুলছে নানা রঙের কাপড়। আরেকটায় চামড়ার জুতো, বেল্ট আর জিন সাজানো। বাতাসে ঘোড়ার গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে গরম রুটির গন্ধ, তামাকের গন্ধ, চামড়া আর কাঠের গন্ধ। চারদিকের শব্দ যেন একসঙ্গে মিশে একটা জীবন্ত নদীর মতো বয়ে চলেছে। এত মানুষকে একসঙ্গে সে জীবনে কখনো দেখেনি।

মারদেকা কখনো ডানদিকে তাকায়, কখনো বাঁদিকে। কখনো দোকানের জানালার ভেতরে উঁকি দেয়, কখনো রাস্তার মাঝখান দিয়ে ছুটে যাওয়া ঘোড়ার গাড়ির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। একবার তো এতটাই মুগ্ধ হয়ে একটা খেলনার দোকানের সামনে থেমে গেল যে লারসেন কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে বুঝতে পারল ছেলেটা আর পাশে নেই। সে ফিরে তাকিয়ে দেখল, মারদেকা কাঁচের ওপারে রাখা ছোট্ট কাঠের ঘোড়াটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। লারসেন কিছু বলল না। শুধু মৃদু হেসে অপেক্ষা করল। মারদেকা নিজেই দৌড়ে এসে আবার তার পাশে দাঁড়াল। মুখে লজ্জার হাসি।

রাস্তার মোড়ে পৌঁছে লারসেন একটা বেকারির সামনে থামল। ভেতর থেকে সদ্য ওভেন থেকে বের হওয়া রুটির গন্ধ ভেসে আসছে। দোকানদার লারসেনকে দেখে হেসে বলল, &quot;অনেক দিন পর এদিকে এলেন।&quot;

লারসেনও হেসে জবাব দিল, &quot;র&#x200d;্যাঞ্চই সব সময় আটকে রাখে।&quot;

দোকানদারের চোখ এবার মারদেকার দিকে গেল। কৌতূহল নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে বলল, &quot;নতুন ছেলে?&quot;

লারসেন সংক্ষেপে বলল, &quot;এখন আমাদের সঙ্গেই আছে।&quot;

লোকটা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। পশ্চিমের মানুষ অযথা অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলায় না। সে কাউন্টারের ওপর থেকে একটা ছোট মধু মাখানো রুটি তুলে মারদেকার দিকে বাড়িয়ে দিল। মারদেকা প্রথমে লারসেনের মুখের দিকে তাকাল। অনুমতি পেয়ে ধীরে ধীরে রুটিটা হাতে নিল। এক কামড় দিতেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। এমন স্বাদ সে আগে কখনো পায়নি। দোকানদার হেসে উঠল। শিশুর মতো সেই বিস্ময় দেখে তার নিজেরও ভালো লাগল।

খাবার শেষ করে তারা আবার হাঁটা শুরু করল। কিছু দূর এগিয়ে একটা বড় দোতলা কাঠের ভবনের সামনে এসে লারসেন থামল। ভবনের ওপরে বড় অক্ষরে লেখা, ব্ল্যাক রিভার ব্যাংক। লারসেনের এখানে কিছু কাজ ছিল। সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, &quot;এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। কোথাও যাবে না।&quot;

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। এতদিনে সে এই কথাটুকু বুঝতে শিখেছে।

লারসেন ভবনের ভেতরে ঢুকে গেল।

মারদেকা একা দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখতে লাগল। তার কাছে প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি ঘোড়া, প্রতিটি দোকান যেন নতুন একটা গল্প। 

ঠিক তখনই রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা একজন লম্বা মানুষ তার দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটার গায়ে ধুলোমাখা কালো কোট, মাথায় নিচু করে পরা টুপি। মুখের বেশিরভাগটাই ছায়ায় ঢাকা। সে কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে মারদেকার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে চোখ সরিয়ে ব্যাংকের দরজার দিকে তাকাল, যেদিক দিয়ে ওলফ লারসেন ভেতরে ঢুকেছে।

লোকটার ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। তারপর কোনো তাড়াহুড়ো না করে সে রাস্তার ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।

মারদেকা কিছুই বুঝল না। সে আবার অন্যদিকে তাকিয়ে একটা ঘোড়ার গাড়ি দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু, সে জানলই না যে শহরটাকে সে স্বপ্নের মতো সুন্দর ভেবেছিল, সেই শহরই নীরবে তাকে আর ওলফ লারসেনকে এমন এক ঘটনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার পর থেকে তাদের কারও জীবন আর আগের মতো থাকবে না।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/259439/</link>
				<pubDate>Tue, 04 Aug 2026 06:30:40 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–পাঁচ<br />
রাতের শেষ প্রহর। ব্ল্যাক রিভারের ওপর তখনো ভোরের আলো নামেনি। শহরের প্রধান রাস্তার দুপাশে সারি সারি কাঠের দোকান, লোহার কারখানা, কামারের চুল্লি, ডাকঘর আর সেলুনগুলো অন্ধকারে ডুবে আছে। দিনের বেলা যে রাস্তা ঘোড়ার খুরের শব্দ, গরুর পাল, ব্যবসায়ীদের হাঁকডাক আর মাতাল কাউবয়দের হাসিতে মুখর&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-259439"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/259439/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">ab70088cd79dc7acec8c4327c29f7efc</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–চার
দূরের ধুলোর রেখাটা ক্রমশ বড় হতে লাগল। বিকেলের সূর্য তখন পশ্চিমে একটু হেলে পড়েছে, কিন্তু তার তাপের কোনো কমতি নেই। শুষ্ক তৃণভূমির ওপর দিয়ে গরম বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সেই বাতাসে শুকনো ঘাস একসঙ্গে দুলে উঠছে, যেন অদৃশ্য কোনো হাত বারবার সেগুলোকে স্পর্শ করে যাচ্ছে। র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকেই এখন চোখ রেখে দিয়েছে দিগন্তের দিকে। মুহূর্তখানেক আগেও যেখানে শুধু ধুলোর অস্পষ্ট পর্দা দেখা যাচ্ছিল, এখন সেখানে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কয়েকটি ঘোড়া দ্রুত এগিয়ে আসছে। তাদের খুরের আঘাতে শুকনো মাটি উড়ে আকাশে ধুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। দূরত্ব এতটাই বেশি যে আরোহীদের মুখ চেনা যাচ্ছে না, কিন্তু তারা যে সোজা লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের দিকেই আসছে, তাতে আর কোনো সন্দেহ নেই।

ওলফ লারসেন বারান্দা থেকে ধীরে ধীরে নেমে এল। তার চলাফেরায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই, অথচ তাকে দেখলেই বোঝা যায়, মনের ভেতরে প্রতিটি সম্ভাবনার হিসাব সে ইতিমধ্যেই কষে ফেলেছে। কয়েক কদম এগিয়ে এসে সে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়াল। ক্লে মরগান, বাড হিগিন্স, মিগুয়েল, রুবেন কোল আর হ্যাঙ্ক ডসন নিঃশব্দে তার চারপাশে অবস্থান নিল। কেউ বন্দুক বের করল না, কিন্তু প্রত্যেকের হাত এমন জায়গায় রয়েছে, যেখান থেকে প্রয়োজন পড়লে এক মুহূর্তের মধ্যেই অস্ত্র বেরিয়ে আসবে। পশ্চিমের মানুষ অকারণে অস্ত্র প্রদর্শন করে না। তবে প্রয়োজনের সময় এক মুহূর্তও দেরি করে না।

মারদেকা বারান্দার খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। কয়েক মাস আগেও এমন দৃশ্যের অর্থ সে বুঝত না। কিন্তু র&#x200d;্যাঞ্চে কাটানো এই অল্প সময়েই সে মানুষের চোখের ভাষা পড়তে শিখেছে। ওলফ লারসেনের মুখ শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির নিচে সতর্কতা আছে। বাডের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। ক্লে সামান্য পা ফাঁক করে দাঁড়িয়েছে, যেন যে কোনো মুহূর্তে শরীর ঘুরিয়ে বন্দুক বের করতে পারবে। কেউ উচ্চস্বরে কথা বলছে না। এই নীরবতাই যেন সবচেয়ে জোরে কথা বলছে।

মারদেকার বুকের ভেতরও অজানা একটা চাপ অনুভূত হলো। পাহাড়ের জঙ্গলে বড় হওয়ায় বিপদের গন্ধ চিনতে তার ভুল হয় না। বনে হঠাৎ পাখির ডাক থেমে গেলে যেমন শিকারিরা বুঝে নেয়, আশপাশে কোনো শিকারি জন্তু ঘোরাফেরা করছে, ঠিক তেমনি মানুষের মাঝেও এমন এক ধরনের নীরবতা আছে, যার মানে হলো সবাই অপেক্ষা করছে। সেই অপেক্ষা কখনো আনন্দের হয় না।

ঘোড়সওয়াররা আরও কাছে এলো। এখন তাদের টুপি, ধুলোমাখা কোট আর ঘোড়াগুলোর রঙ আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে। পাঁচজন মানুষ। সামনে যে লোকটা, তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। প্রশস্ত কাঁধ, রোদে পোড়া মুখ, চিবুকে ছাঁটা দাড়ি। মাথার টুপিটা অনেক দিনের ব্যবহারেই রং হারিয়েছে। কোমরে রিভলভার ঝুলছে, কিন্তু তার হাত বন্দুকের ওপর নেই। পেছনের চারজনেরও একই অবস্থা। তাদের ভঙ্গিতে সতর্কতা আছে, কিন্তু শত্রুতার প্রকাশ নেই।

আরও খানিকটা কাছে আসতেই বাড হিগিন্সের মুখের কঠিন ভাব কিছুটা নরম হয়ে এল। সে চোখ কুঁচকে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলল, “মনে হচ্ছে চেনা মানুষ।”

ক্লে উত্তর দিল না। সে অপেক্ষা করল আরও কয়েক মুহূর্ত।

অবশেষে ঘোড়াগুলো র&#x200d;্যাঞ্চের বেড়ার সামনে এসে গতি কমিয়ে দিল। ধুলো ধীরে ধীরে থিতিয়ে পড়তে লাগল। সামনের লোকটা টুপির কিনারা সামান্য তুলে সম্মানের ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, “শুভ অপরাহ্ন, মিস্টার লারসেন।”

ওলফ লারসেন এবার লোকটাকে চিনতে পারল। তার মুখে ক্ষীণ হাসি ফুটল। “টম ব্যারেট।”

লোকটাও হেসে মাথা নেড়ে বলল, “ভাবছিলাম আপনি হয়তো চিনতে পারবেন না।”

“দশ বছরে মানুষ বদলায়,” লারসেন শান্ত গলায় বলল, “কিন্তু ভালো ঘোড়সওয়াররা খুব বেশি বদলায় না।”

উঠোনের টানটান উত্তেজনা যেন এক লহমায় খানিকটা কমে গেল। বাড ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিল কোমরের কাছ থেকে। হ্যাঙ্কও কাঁধের শক্তভাব কিছুটা ছেড়ে দিল। মারদেকা বুঝতে পারল, এরা শত্রু নয়। তবু তার কৌতূহল একটুও কমল না। কারণ সে এই মানুষগুলোর কাউকেই আগে দেখেনি।

টম ব্যারেট ঘোড়া থেকে নামল। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছে বোঝাই যাচ্ছে। তার কোটে ধুলোর আস্তরণ, বুটে শুকনো কাদা লেগে আছে। সে কয়েক পা এগিয়ে এসে লারসেনের সঙ্গে হাত মেলাল। তারপর চারপাশে তাকিয়ে বলল, “আপনার র&#x200d;্যাঞ্চ আগের চেয়ে আরও বড় হয়েছে।”

লারসেন হালকা হেসে বলল, “কাজ করলে জমিও বাড়ে, দায়ও বাড়ে।”

টমের মুখের হাসিটা মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল। “সেই দায়ের কথাই বলতে এসেছি।” কথাটা শুনে আবার নীরবতা নেমে এল।

মারদেকা দূর থেকে দাঁড়িয়ে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভাষার অর্ধেকও বোঝে না, কিন্তু মানুষের মুখ বুঝতে পারে। এই লোকটা এত দূর শুধু গল্প করতে আসেনি। তার চোখে পথের ক্লান্তির চেয়ে চিন্তার ছাপ বেশি।

ইলাই কখন যে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে, কেউ খেয়াল করেনি। বৃদ্ধও চুপচাপ আগন্তুকদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বহু বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, পশ্চিমের পথে কেউ যদি পাঁচজন মানুষ নিয়ে কোনো র&#x200d;্যাঞ্চে আসে, তবে তার কারণ সাধারণত সুখবর হয় না।

ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে বলল, “ভেতরে এসো। বাইরে দাঁড়িয়ে খারাপ খবর শোনার অভ্যাস আমার নেই।”

টম মাথা নেড়ে সায় দিল। সে নিজের লোকদের ইশারা করতেই তারাও ঘোড়া থেকে নেমে লাগাম ধরে উঠোনে ঢুকল।

মারদেকা স্বভাবতই একপাশে সরে দাঁড়াল। লোকগুলো তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একজন মাঝবয়সী কাউবয় কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকাল। অচেনা পোশাক, শ্যামলা মুখ, কালো চুল আর সেই ভিন্নধর্মী চোখ দেখে লোকটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু এগিয়ে চলে গেল।

মারদেকা তাদের চলে যেতে দেখল। তার মনে হচ্ছিল, এই মানুষগুলোর সঙ্গে শুধু নতুন মুখই আসেনি, এসেছে নতুন কোনো ঘটনা। র&#x200d;্যাঞ্চে আসার পর থেকে সে শিখেছে, পশ্চিমের জীবন কখনো একই রকম থাকে না। একদিন শান্ত, পরের দিন ঝড়। আজ সকালের সূর্য যেমন ছিল সাধারণ, বিকেলের আলো তেমন আর নেই।

সে ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগিয়ে এল। দরজার ভেতর দিয়ে দেখতে পেল, ওলফ লারসেন সবাইকে নিয়ে বসার ঘরে ঢুকছে। দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ হলো না। ভেতর থেকে চাপা গলায় কথাবার্তা শুরু হলো।

মারদেকা কিছুই বুঝতে পারল না। তবু তার মনে হলো, সেই কথাগুলোর ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে এমন কিছু, যা শুধু লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের ভবিষ্যৎ নয়, তার নিজের জীবনকেও অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।

বসার ঘরটার জানালাগুলো খোলা ছিল। বিকেলের আলো কাঠের মেঝের ওপর লম্বা আড়াআড়ি দাগ এঁকে রেখেছে। দেয়ালে ঝোলানো কয়েকটা পুরোনো রাইফেল, হরিণের শিং আর একটা বড় মানচিত্র ঘরটাকে যেন আরও গম্ভীর করে তুলেছে। মাঝখানে রাখা ভারী ওক কাঠের টেবিলের চারপাশে ওলফ লারসেন, টম ব্যারেট, ক্লে মরগান, বাড হিগিন্স, মিগুয়েল, রুবেন কোল আর হ্যাঙ্ক ডসন বসেছে। ইলাই নীরবে কফির পাত্র আর কয়েকটা মগ টেবিলে রেখে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে, এই আলোচনায় তার বলার কিছু নেই, কিন্তু শোনার মতো অনেক কিছু আছে।

মারদেকা বাইরে বারান্দার খুঁটির আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ভেতরের সব কথা তার কানে পৌঁছাচ্ছে না, তবে ভাঙা ভাঙা কিছু শব্দ সে ধরতে পারছে। কয়েক মাস আগেও এই শব্দগুলো তার কাছে অর্থহীন আওয়াজ ছিল। এখন অন্তত কিছু শব্দ তার পরিচিত। হর্স... ক্যাটল... ব্ল্যাক রিভার... শব্দগুলোর মানে পুরোপুরি না বুঝলেও সে আন্দাজ করতে পারে, আলোচনা র&#x200d;্যাঞ্চ আর শহরকে ঘিরেই।

টম ব্যারেট কফির মগটা হাতে নিয়েও চুমুক দিল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে সে ধীরে ধীরে বলল, “গত তিন সপ্তাহে শহরের আশপাশ থেকে মোট বারোটা গরু উধাও হয়েছে।”

লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। “জানি,” সে শান্ত গলায় বলল। “আমার তিনটাও গেছে।”

“শুধু আপনার নয়,” টম বলল। “ম্যাকঅ্যালিস্টারের চারটা, বুথের দুটো, আর দক্ষিণের ক্রিকের পাশে যারা থাকে, তাদেরও কয়েকটা গরু হারিয়েছে।”

মিগুয়েল নিচু গলায় বলল, “চিহ্ন পেয়েছিলাম। কিন্তু নদীর ধারে গিয়ে মিলিয়ে গেছে।”

টম এবার মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। “ঠিক সেটাই বলতে এসেছি। চিহ্নগুলো শুধু মিলিয়ে যায়নি। কেউ ইচ্ছে করেই মুছে ফেলেছে।”

ক্লে মরগান এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার সে টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে সামান্য ঝুঁকে এল। “কাউবয়?”

টম মাথা নাড়ল। “পেশাদার।” ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।

পশ্চিমে গরু চুরি নতুন কিছু নয়। ক্ষুধার্ত মানুষ একটা-দুটো গরু নিয়ে পালিয়েছে, এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কিন্তু যারা চিহ্ন মুছে ফেলে, নদী ব্যবহার করে পথ গোপন করে, বিভিন্ন র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে অল্প অল্প করে গরু সরিয়ে নেয়, তারা সাধারণ চোর নয়। তারা পরিকল্পনা করে কাজ করে।

ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে কফিতে চুমুক দিল। “শহরের মার্শাল কী করছে?”

টম মৃদু হেসে ফেলল। সেই হাসিতে আনন্দের চেয়ে বিদ্রূপ বেশি। “মার্শাল এলি ব্রুকস ভালো মানুষ। কিন্তু ব্ল্যাক রিভারের বাইরে তার লোক নেই। শহরের রাস্তা সে সামলাতে পারে, প্রেইরির পঞ্চাশ মাইল ভেতরে গিয়ে নয়।”

বাড হিগিন্স জানতে চাইলো, “তাহলে?”

“তাই আমরা নিজেরাই খোঁজ করছি।” টম আগের মতই হেসে উত্তর দিল।

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর উঠে গিয়ে দেয়ালে ঝোলানো মানচিত্রটার সামনে দাঁড়াল। ব্ল্যাক রিভার শহর, তার উত্তরের পাহাড়, পশ্চিমের শুকনো প্রেইরি, দক্ষিণের নদী আর পূর্বের বনভূমি, সবকিছু সেই মানচিত্রে আঁকা আছে। আঙুল দিয়ে কয়েকটা জায়গা দেখিয়ে সে বলল, “যদি কেউ গরু নিয়ে যায়, তাকে কোথাও বিক্রি করতে হবে। এতগুলো গরু লুকিয়ে রাখা যায় না।”

টমও উঠে এসে মানচিত্রের সামনে দাঁড়াল। “সেটাই সমস্যা। ব্ল্যাক রিভারে বিক্রি হয়নি।”

“তাহলে?”

“হয় আরও পশ্চিমে... নয়তো সীমান্তের ওপারে।”

ক্লে ধীরে ধীরে শিস দিল। “সীমান্তের ওপারে গেলে আর ফেরত পাওয়া কঠিন।”

“জানি।”

মারদেকা দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরের সবাইকে দেখছিল। সে কথাগুলো বুঝতে পারছে না, কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারছে, ঘরের ভেতরে কেউ রাগ করছে না, কেউ চিৎকার করছে না, অথচ সবাই খুব চিন্তিত। তার পাহাড়ি গ্রামের মানুষ হলে এতক্ষণে তর্ক শুরু হয়ে যেত। এখানে সবাই ধীরে ধীরে কথা বলছে। যেন প্রতিটি শব্দের দাম আছে।

ঠিক তখনই ইলাই বাইরে বেরিয়ে এল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মারদেকাকে দেখে মৃদু হেসে বলল, “ক্ষুধা?”

শব্দটা মারদেকা এখন চেনে। সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

ইলাই তার কাঁধে হাত রেখে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে সে লক্ষ্য করল, মারদেকা বারবার পেছন ফিরে বসার ঘরের দিকে তাকাচ্ছে।

বৃদ্ধ সেটা বুঝতে পারল। হেসে বলল, “একদিন... সব বুঝবে।”

মারদেকা পুরো বাক্যটা বুঝল না। কিন্তু ওয়ান ডে কথাটা ইলাই আগেও শিখিয়েছিল। সে শুধু মৃদু হেসে মাথা নেড়ে দিল।

রান্নাঘরে ঢুকেই সে সদ্য বেক করা রুটি আর গরম স্ট্যুর বাটি টেবিলে নামিয়ে রাখলো। মারদেকার দিকে ফিরে স্নেহভরা চোখে বললো, “এসো খেয়ে নাও।”

সে কথাটা বুঝল না, কিন্তু কণ্ঠের উষ্ণতা বুঝল। এই র&#x200d;্যাঞ্চে আসার পর সে একটা বিষয় শিখেছে, সব ভাষা শব্দ দিয়ে বলা হয় না। কিছু ভাষা শুধু মানুষের চোখ আর ব্যবহারে লুকিয়ে থাকে।

খেতে খেতে তার চোখ চলে গেল জানালার বাইরে। সেখান থেকে দূরে ব্ল্যাক রিভার শহরের কয়েকটা ছাদের মাথা দেখা যায়। দুপুরের আলোয় সেগুলো ঝিলমিল করছে। একটা গির্জার চূড়া, তার পাশে ধোঁয়া উঠতে থাকা লোহার কারখানা, আরও দূরে সেলুনের উঁচু সাইনবোর্ড বাতাসে দুলছে।

শহরটা খুব দূরে নয়। হাঁটলে হয়তো আধঘণ্টার পথ। মারদেকা দীর্ঘক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল। সে এখনো শহরটাকে ঠিকমতো দেখেনি। প্রথম দিন ক্লান্ত শরীরে শুধু রাস্তা আর মানুষ দেখেছিল। তারপর থেকে তার পৃথিবী সীমাবদ্ধ ছিল লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চেই।

কিন্তু আজ তার মনে হলো, ওই শহরের ভেতরেও নিশ্চয়ই আরেকটা পৃথিবী আছে। সেখানে এমন মানুষ আছে, যারা এই র&#x200d;্যাঞ্চের লোকদের মতো নয়। সেখানে দোকান আছে, লোহার কারখানা আছে, হোটেল আছে, সেলুন আছে, হয়তো বিপদও আছে।

আর বসার ঘরে যে আলোচনা চলছে, তার সুতোও যেন গিয়ে মিশেছে সেই শহরের কোথাও।

বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছিল। লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর দুপুরের তীব্র উত্তাপ আর নেই। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা একটু কাত হয়ে পড়েছে। মাঠের ওপর দিয়ে দীর্ঘ ছায়া পড়তে শুরু করেছে। বসার ঘরের আলোচনা শেষ হতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল। টম ব্যারেট আর তার সঙ্গীরা যখন বাইরে বেরিয়ে এল, তখন তাদের মুখে আসার সময়কার ক্লান্তির সঙ্গে আরও একটা অনুভূতি যোগ হয়েছে। সেটা হলো দায়িত্বের ভার। বিদায়ের আগে ওলফ লারসেন প্রত্যেকের সঙ্গে করমর্দন করল। বেশি কথা বলল না। শুধু বলল, সাবধানে থাকবে। পশ্চিমে এখন আর আগের মতো শান্ত সময় নেই।

টম নিজের ঘোড়ায় ওঠার আগে একবার চারপাশে তাকাল। তার চোখ গিয়ে থামল আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মারদেকার ওপর। ছেলেটা নীরবে সব দেখছে। চোখে কৌতূহল, কিন্তু অকারণ ভয় নেই। টম কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ওলফ লারসেনকে বলল, ”এই ছেলেটাই কি সেই ইন্ডিয়ান বালক, যাকে কয়েক মাস আগে শহর থেকে নিয়ে এসেছিলেন?

লারসেন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

টম আবার মারদেকার দিকে তাকাল। তারপর মৃদু হেসে বলল, ”বদলে গেছে। প্রথম দেখার সময় মনে হয়েছিল পথ হারানো এক বুনো শাবক। এখন দেখছি চোখে অন্যরকম স্থিরতা এসেছে”।

লারসেন শান্ত গলায় বলল, ”মানুষের জীবনে কখনো কখনো শুধু একটা সুযোগই যথেষ্ট”।

টম আর কিছু বলল না। ঘোড়ার লাগাম টেনে সে সঙ্গীদের নিয়ে শহরের দিকে রওনা হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই খুরের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল। ধুলো ধীরে ধীরে বসে এলো। র&#x200d;্যাঞ্চে আবার সেই চেনা নীরবতা ফিরে এল। কিন্তু এই নীরবতা আগের মতো নিশ্চিন্ত নয়। যেন অদৃশ্য কোনো ছায়া চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মারদেকা অনেকক্ষণ পর্যন্ত পথটার দিকে তাকিয়ে রইল। লোকগুলো চলে গেলেও তাদের কথাবার্তার আবহ যেন বাতাসে রয়ে গেছে। সে কিছুই বুঝতে পারেনি, কিন্তু অনুভব করেছে, বড়দের মুখে আজ হাসি কম ছিল। পশ্চিমের এই নতুন পৃথিবীতে সে একটা জিনিস শিখেছে। যখন অভিজ্ঞ মানুষ কম কথা বলে, তখন বুঝতে হয় সামনে সহজ সময় নেই।

সন্ধ্যার আগেই বাড হিগিন্স তাকে ডাকল। হাতের ইশারায় আস্তাবলের ভেতরে নিয়ে গেল। আজ নতুন কোনো কাজ শেখানোর ইচ্ছে আছে তার।

আস্তাবলের ভেতরে ঢুকতেই পরিচিত গন্ধটা নাকে এল। শুকনো খড়, ঘোড়ার গায়ের উষ্ণতা, চামড়ার জিনে মাখানো তেল আর পুরোনো কাঠের গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছে। কয়েকটা ঘোড়া নিশ্চিন্তে খড় চিবোচ্ছে। কেউ আবার অলস ভঙ্গিতে মাথা দুলিয়ে মাছি তাড়াচ্ছে।

বাড একটা মোটা দড়ি হাতে তুলে মারদেকার সামনে দাঁড়াল। তারপর দড়িটা ভাঁজ করে একটা ফাঁস তৈরি করল। ধীরে ধীরে দেখাতে লাগল কীভাবে দড়ি পাকাতে হয়, কীভাবে ফাঁসটা গোল রাখতে হয়। সে জানে, ভাষা দিয়ে বোঝানো এখনো কঠিন। তাই প্রতিটি কাজ খুব ধীরে, খুব পরিষ্কারভাবে করছে।

মারদেকা মন দিয়ে দেখল। তারপর বাড দড়িটা তার হাতে তুলে দিল। প্রথমবারেই ফাঁসটা এলোমেলো হয়ে গেল।

বাড মাথা নেড়ে আবার দেখাল। দ্বিতীয়বার আগের চেয়ে ভালো হলো। তৃতীয়বারে দড়িটা প্রায় ঠিকঠাক পাকাতে পারল মারদেকা।

বাডের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে এবার আস্তাবলের বাইরে একটা কাঠের খুঁটি দেখিয়ে ইশারা করল।

মারদেকা বুঝল, এবার ফাঁস ছুড়ে খুঁটিটাকে ধরতে হবে। সে চেষ্টা করল। ফাঁস গিয়ে খুঁটির অনেক আগে মাটিতে পড়ে গেল।

আবার চেষ্টা করল। এবার খুঁটির ওপর দিয়ে চলে গেল। তৃতীয়বার দড়িটা খুঁটিতে লেগেও আটকে রইল না।

বাড একবারও বিরক্ত হলো না। সে জানে, রশি ছোড়া শুধু হাতের জোরের ব্যাপার নয়। এতে ধৈর্য লাগে, সময় লাগে।

মারদেকাও হাল ছাড়ল না। সে বারবার চেষ্টা করতে লাগল। 

একসময় বাড লক্ষ্য করল, ছেলেটা প্রতিবার ভুল করার পর একটু থেমে ভাবছে। আগের ভুলটা যেন মনে রাখার চেষ্টা করছে। এই স্বভাবটাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

ঠিক তখনই পাশের ঘোড়ার খোঁয়াড় থেকে একটা তরুণ ঘোড়া হঠাৎ জোরে হ্রেষাধ্বনি করে উঠল। নতুন মানুষ দেখলে সে প্রায়ই অস্থির হয়ে পড়ে। দড়ি টানতে টানতে মাথা উঁচু করে ছটফট করতে লাগল।

বাড দ্রুত সেদিকে এগোতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই মারদেকা দড়িটা মাটিতে রেখে ধীরে ধীরে ঘোড়াটার দিকে এগিয়ে গেল।

তার হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সে সরাসরি ঘোড়ার চোখের দিকে তাকাল না। একটু পাশ ঘেঁষে গিয়ে খুব আস্তে করে নিজের ভাষায় কী যেন বলতে শুরু করল। সেই ভাষা বাডের অচেনা। শব্দগুলো পাহাড়ি ঝরনার মতো ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে।

ঘোড়াটা প্রথমে আরও একবার মাথা ঝাঁকাল। তারপর ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করল। মারদেকা আলতো করে তার ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণীটা স্থির হয়ে গেল।

বাড অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সকালেও সে এমন একটা দৃশ্য দেখেছিল। এখন আবার দেখল। এটা কাকতালীয় নয়।

বাড বহু বছর ধরে ঘোড়া সামলাচ্ছে। তার অভিজ্ঞতা বলছে, কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই প্রাণীদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারে। শেখানো যায় না, শুধু থাকে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। তারপর খুব ধীরে বলল, তুমি ঘোড়াদের ভাষা জানো, তাই না?

মারদেকা কথাটা বুঝল না। কিন্তু বাডের চোখের গভীর মুগ্ধতা বুঝতে পারল।

দূরে তখন ওলফ লারসেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। তার মুখে আগের মতোই সেই সংযত ভাব।

কিন্তু মনে মনে সে উপলব্ধি করছিল, এই ছেলেটার শিক্ষা শুধু বই, অক্ষর আর র&#x200d;্যাঞ্চের কাজে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রকৃতি তাকে এমন কিছু উপহার দিয়েছে, যা কোনো শিক্ষক শেখাতে পারে না।

আর পশ্চিমের এই কঠিন পৃথিবীতে এমন উপহার একদিন আশীর্বাদও হতে পারে, আবার অভিশাপও।

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে পশ্চিমের বিশাল আকাশ জুড়ে লাল, কমলা আর সোনালি রঙের বিস্তীর্ণ চাদর বিছিয়ে দিল। সারাদিনের ব্যস্ততার পর লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ যেন দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। দূরের চারণভূমি থেকে গরুর পাল ফিরছে। তাদের গলায় বাঁধা ঘণ্টাগুলোর টুংটাং শব্দ বাতাস ভরিয়ে তুলেছে। আস্তাবলের সামনে কয়েকটা ঘোড়া মাথা নিচু করে খড় খাচ্ছে। শুকনো ঘাসের গন্ধ, ঘোড়ার শরীরের উষ্ণ গন্ধ আর কাঠের পুরোনো আস্তাবলের গন্ধ মিশে চারপাশে এক পরিচিত পরিবেশ তৈরি করেছে। দিনের শেষ আলোয় কাউবয়রা ধীরে ধীরে নিজেদের কাজ গুটিয়ে নিচ্ছে। কেউ লাগাম খুলছে, কেউ জিন নামিয়ে যত্ন করে ঝুলিয়ে রাখছে, কেউ আবার পানির ট্যাংক ভরছে। সারাদিনের ক্লান্তি তাদের শরীরে স্পষ্ট, কিন্তু কাজ শেষ করার আগ পর্যন্ত কারও হাতে অলসতা নেই।

মারদেকাও আজ অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যস্ত ছিল। বাড হিগিন্স তাকে ছোট ছোট কয়েকটা দায়িত্ব দিয়েছিল। কখনো পানির বালতি টেনে আনতে হয়েছে, কখনো ঘোড়ার সামনে খড় রাখতে হয়েছে, কখনো আবার ব্যবহৃত ব্রাশগুলো পরিষ্কার করে জায়গামতো রেখে দিতে হয়েছে। কাজগুলো খুব সাধারণ হলেও ছেলেটা এমন মনোযোগ দিয়ে করছিল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তার কাঁধেই তুলে দেওয়া হয়েছে। বাড দূর থেকে কয়েকবার তাকিয়ে দেখেছে। কোথাও ভুল হলে ধৈর্য ধরে শুধরে দিয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় তার চোখ এড়িয়ে যায়নি। মারদেকাকে একবার কোনো কাজ দেখিয়ে দিলে দ্বিতীয়বার একই ভুল আর হচ্ছে না। এই বয়সে এমন মনোযোগ খুব কম ছেলের মধ্যেই দেখা যায়।

ওলফ লারসেনও কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। গত কয়েক দিনে সে বুঝে গেছে, এই ছেলেটার সবচেয়ে বড় শক্তি তার শরীর নয়, তার শেখার ক্ষমতা। মানুষ তাকে যা শেখায়, সে শুধু তা নকল করে না; বোঝার চেষ্টা করে। আর যেদিন কোনো মানুষ বোঝার চেষ্টা শুরু করে, সেদিন থেকেই সে অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। মারদেকা তখন একটা ভারী কাঠের বালতি দুই হাতে ধরে পানির ট্যাংকের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। বালতিটা তার জন্য যথেষ্ট ভারী। হাঁটার সময় শরীর সামান্য দুলে যাচ্ছে। তবু সে থামছে না, অভিযোগ করছে না। 

লারসেন কিছুক্ষণ সেটা দেখে শান্ত গলায় ডাকল, &quot;মারদেকা।&quot; ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে সেই চিরচেনা কৌতূহল। লারসেন হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। মারদেকা এগিয়ে এলে সে র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম দিকের দিকে আঙুল তুলে দেখাল। গাছের সারির ওপাশে দূরে ব্ল্যাক রিভার শহরের কয়েকটা ছাদের মাথা আর চার্চের চূড়ার অস্পষ্ট অবয়ব দেখা যাচ্ছে। তারপর নিজের বুকের দিকে আঙুল রেখে আবার শহরের দিকে ইশারা করল। ধীরে ধীরে বলল, &quot;আগামীকাল... শহর।&quot; 

কথাটা মারদেকা পুরো বুঝতে পারল না। কিন্তু ইশারাটা বুঝল। তার চোখ মুহূর্তের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বুকের ভেতর যেন কেউ হঠাৎ আগুন জ্বেলে দিল। 

তিন দিন পাহাড় পেরিয়ে সে যে শহরের আলো দেখে ছুটে এসেছিল, সেই শহরকে সে এখনো সত্যিকার অর্থে দেখেইনি। প্রথম দিন রাতের অন্ধকারে সেলুনে ঢুকেছিল, তারপর সোজা এই র&#x200d;্যাঞ্চে চলে এসেছে। তারপর থেকে তার পৃথিবী বলতে এই র&#x200d;্যাঞ্চ, এই মাঠ, এই আস্তাবল আর এই মানুষগুলো। কাল সে প্রথমবার সেই রহস্যময় শহরের ভেতরে যাবে। উত্তেজনায় তার ছোট্ট বুকটা দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল।

ইলাই তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে মারদেকার পাশে দাঁড়াল। ছেলেটার চোখের উচ্ছ্বাস দেখে তার নিজেরও মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে বলল, &quot;শহর বড় অদ্ভুত জায়গা। সেখানে মানুষ অনেক। কেউ তোমাকে সাহায্য করবে, কেউ ঠকানোর চেষ্টা করবে। কেউ হাসিমুখে কথা বলবে, আবার কেউ চোখের দিকেও তাকাবে না। মনে রাখবে, ভালো মানুষকে চিনতে যেমন সময় লাগে, খারাপ মানুষকেও তেমনি চিনতে শেখা দরকার।&quot; 

মারদেকা কথাগুলোর অর্ধেকও বুঝল না। কিন্তু ইলাইয়ের কণ্ঠের কোমলতা আর সতর্কতার মিশ্র সুর তার কানে ঠিকই পৌঁছাল। সে শুধু বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, শহরটা নিশ্চয়ই এমন এক জায়গা, যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন বিস্ময় অপেক্ষা করে থাকে।

রাতের খাবারের সময় র&#x200d;্যাঞ্চের সবাই আগের মতোই লম্বা কাঠের টেবিলে একসঙ্গে বসেছিল। বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে, কিন্তু ভেতরে ঝোলানো কেরোসিন লণ্ঠনের হলুদ আলোয় ঘরটা উষ্ণ আর প্রাণবন্ত লাগছিল। 

কথাবার্তার ফাঁকে ড্যান ম্যাকরি জানাল, ”কয়েক দিনের মধ্যেই ব্ল্যাক রিভারে বড় গবাদিপশুর হাট বসবে। আশপাশের প্রায় সব র&#x200d;্যাঞ্চ থেকেই লোকজন আসবে”। 

রুবেন কোল বলল, ”গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শহরে অনেক অচেনা লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের বেশির ভাগই কাউবয় নয়, আবার ব্যবসায়ীও মনে হয় না”। 

ক্লে মরগান মাথা না তুলে শান্ত গলায় বলল, &quot;অচেনা মুখ যত বাড়ে, বিপদের গন্ধও তত ঘন হয়।&quot; 

কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত সবাই চুপ করে রইল। ওলফ লারসেন কোনো মন্তব্য করল না। সে শুধু ধীরে ধীরে কফির মগটা নামিয়ে রাখল। তার নীরবতাই যেন বলে দিচ্ছিল, কথাগুলো সে গুরুত্ব দিয়েই শুনেছে।

খাওয়াদাওয়া শেষ হওয়ার পর মারদেকা একা বাইরে বেরিয়ে এল। র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশে ততক্ষণে রাতের নীরবতা নেমে এসেছে। আকাশ এত পরিষ্কার যে অসংখ্য তারা যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। দূরে ব্ল্যাক রিভার শহরের ছোট ছোট আলো জ্বলছে। অন্ধকারের মধ্যে আলোগুলোকে দেখে তার মনে পড়ল সেই প্রথম রাতের কথা, যখন ক্ষুধার্ত আর ক্লান্ত শরীর নিয়ে সে পাহাড়ের চূড়া থেকে এই একই আলো দেখেছিল। তখন এই আলো তার কাছে ছিল শুধু স্বপ্নের প্রতিশ্রুতি। আর আজ সেই স্বপ্নের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে সে। আগামীকাল সে সেই শহরের রাস্তায় হাঁটবে, মানুষের ভিড় দেখবে, দোকান দেখবে, হয়তো নতুন কিছু শিখবে। হয়তো পৃথিবীটা তার কল্পনার চেয়েও বড়। 

কিন্তু সে জানে না, একই শহরের অন্য প্রান্তে এই মুহূর্তেই আরেকটি গল্প শুরু হয়ে গেছে। ব্ল্যাক রিভারের এক নির্জন গলির ভেতরে মদের গন্ধে ভরা অন্ধকার ঘরে কয়েকজন লোক গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় কথা বলছে। তাদের সামনে ছড়িয়ে রাখা একটা পুরোনো মানচিত্রের ওপর মোটা কালিতে চিহ্ন দেওয়া আছে একটি জায়গা। লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ। লম্বা, কালো কোট পরা লোকটা ধীরে ধীরে আঙুল দিয়ে সেই নামের ওপর চাপ দিল। তার ঠোঁটের কোণে শীতল একটা হাসি ফুটে উঠল। সে খুব নিচু স্বরে বলল, &quot;আর বেশি দেরি নেই।&quot; ঘরের ভেতর আর কেউ কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু তাদের চোখের দৃষ্টিই বলে দিল, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে। 
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/259351/</link>
				<pubDate>Mon, 03 Aug 2026 05:45:23 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–চার<br />
দূরের ধুলোর রেখাটা ক্রমশ বড় হতে লাগল। বিকেলের সূর্য তখন পশ্চিমে একটু হেলে পড়েছে, কিন্তু তার তাপের কোনো কমতি নেই। শুষ্ক তৃণভূমির ওপর দিয়ে গরম বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সেই বাতাসে শুকনো ঘাস একসঙ্গে দুলে উঠছে, যেন অদৃশ্য কোনো হাত বারবার সেগুলোকে স্পর্শ করে যাচ্ছে। র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা প্র&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-259351"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/259351/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">608cd5dec53c41e50a508def575d771d</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়-তিন
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি মাটিতে নেমে আসেনি। পূর্ব দিগন্তের নিচু আকাশে লালচে আভা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, যেন রাতের কালো পর্দার নিচ থেকে কেউ নিঃশব্দে আগুনের রেখা টেনে দিচ্ছে। দূরের পাহাড়গুলো এখনো গাঢ় ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মাথার ওপর কুয়াশার পাতলা আস্তরণ ভেসে বেড়াচ্ছে, আর নিচের বিশাল তৃণভূমির ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো প্রথম আলোর স্পর্শে ক্ষণিকের জন্য রুপোর মতো ঝলসে উঠছে। 

বাতাসে রাতের শীতলতা এখনো রয়ে গেছে। সেই বাতাসে শুকনো সেজবুশের গন্ধ, ভেজা মাটির গন্ধ আর দূরের আস্তাবল থেকে ভেসে আসা ঘোড়ার উষ্ণ নিশ্বাসের গন্ধ একসঙ্গে মিশে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যা শুধু পশ্চিমের এই বিস্তীর্ণ প্রান্তরেই অনুভব করা যায়। চারপাশ এতটাই নীরব যে দূরে কোথাও একা একটা ম্যাগপাই ডেকে উঠতেই মনে হলো, বিশাল প্রান্তর যেন তার উত্তর শুনতে থেমে গেছে। কিন্তু এই নীরবতা প্রতারণাময়। কারণ ওলফ লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে দিনের কাজ শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখানে সূর্য ওঠার অপেক্ষা করে কেউ জীবন শুরু করে না। যারা এই কঠিন ভূখণ্ডে বেঁচে থাকতে শিখেছে, তারা জানে, দিনের প্রথম আলো ওঠার আগের সময়টুকুই সবচেয়ে মূল্যবান।

আস্তাবলের সামনে তখন মৃদু ব্যস্ততা। রাতের শিশিরে ভিজে থাকা কাঠের বেড়ার গায়ে লণ্ঠনের শেষ আলোটা মিটমিট করছে। দুজন কর্মচারী ঘোড়াগুলোর সামনে খড় ফেলছে, আরেকজন বড় কাঠের টবে পানি ভরছে। ঘোড়াগুলোও বুঝতে পেরেছে আজ তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। কেউ খুর দিয়ে মাটি আঁচড়াচ্ছে, কেউ নাক দিয়ে গরম বাষ্প ছাড়ছে, কেউ আবার অস্থির হয়ে মাথা নাড়ছে। তাদের চামড়ার গায়ে হাত বুলিয়ে, জিনের ফিতে টেনে, লাগাম পরীক্ষা করে একে একে প্রস্তুত হচ্ছিল চারজন মানুষ। 

ক্লে মরগান নিজের কালো ঘোড়াটার পাশে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে জিনের নিচের বেল্ট শক্ত করছিল। কাজের সময় তার মুখে কোনো তাড়াহুড়ো থাকে না। প্রতিটি গিঁট, প্রতিটি বাকল, প্রতিটি চামড়ার ফিতে সে এমনভাবে পরীক্ষা করে যেন যুদ্ধের আগে সৈনিক নিজের অস্ত্র পরীক্ষা করছে। তার একটু দূরে মিগুয়েল হাঁটু গেড়ে বসে একটা খুর তুলে দেখছিল। আঙুল দিয়ে লোহার নাল ছুঁয়ে দেখল, তারপর ঘোড়াটার পা নামিয়ে দিয়ে মাটির ওপর চোখ বুলিয়ে নিল। অন্যদের কাছে এটা হয়তো অভ্যাস, কিন্তু মিগুয়েলের কাছে প্রতিটি খুর, প্রতিটি দাগ, প্রতিটি ভাঙা ঘাসের ডগা একটা ভাষা। যে ভাষা পড়ে সে মানুষের গতিবিধি বুঝে নিতে পারে। রুবেন কোল কোমরের বেল্টে গুলি গুঁজছিল। কাজ করতে করতেও ঠোঁটের কোণে তার সেই চিরচেনা হাসিটা লেগেই আছে। যেন পৃথিবীতে এমন কোনো বিপদ নেই, যেটাকে একটু ঠাট্টা দিয়ে হালকা করা যায় না। আর হ্যাঙ্ক ডসন চুপচাপ একটা কাঠের খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে উইনচেস্টারের নলে তেল মাখানো কাপড় বুলিয়ে যাচ্ছিল। বিশাল শরীরের মানুষটা যতটা ভয়ংকর দেখতে, কাজের সময় ততটাই ধীর আর নিখুঁত। তার মুখে কোনো কথা নেই, শুধু অভ্যাসে গড়া স্থিরতা।

বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে সবকিছু দেখছিল ওলফ লারসেন। হাতে ধোঁয়া ওঠা কালো কফির মগ। পরনে গাঢ় রঙের শার্ট, তার ওপর চামড়ার ভেস্ট। কোমরে আগের মতোই রিভলভার ঝুলছে, কিন্তু আজ সে নিজে কোথাও যাচ্ছে না। তার প্রয়োজনও নেই। নেতা সব যুদ্ধে নিজে নামে না, কখন লোক পাঠাতে হয় আর কখন নিজে এগোতে হয়, সেটা সে জানে। তার দৃষ্টি একবার ক্লের ওপর, একবার মিগুয়েলের ওপর, আবার রুবেন আর হ্যাঙ্কের ওপর ঘুরে গেল। এই চারজনকে সে বহু বছর ধরে চেনে। প্রত্যেকের শক্তি কোথায়, দুর্বলতা কোথায়, কে বিপদের সময় কী সিদ্ধান্ত নেবে, সব তার জানা। তাই নির্দেশ দেওয়ার সময় সে কখনো অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না।

কিছুক্ষণ পরে ক্লে এগিয়ে এসে বারান্দার নিচে দাঁড়াল। মাথার টুপিটা সামান্য তুলে বলল, “বস, আমরা প্রস্তুত।”

লারসেন মগটা ঠোঁট থেকে নামাল। তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য চারজনের মুখের ওপর ঘুরে গেল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “গরুগুলো আমার দরকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার তোমাদের জীবিত ফিরে আসা।”

চারজনই নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

লারসেন আবার বলল, “চিহ্ন যতই পরিষ্কার হোক, অন্ধভাবে পিছু নেবে না। কেউ যদি ইচ্ছে করে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়, বুঝবে ফাঁদ পাতা হয়েছে।”

মিগুয়েল বলল, “আমি সামনে থাকব।”

“সেই কারণেই বলছি,” লারসেন উত্তর দিল। “মাটি তোমাকে সত্যি কথা বলে, কিন্তু মানুষ সবসময় বলে না।”

কথাটা শুনে রুবেন মৃদু হেসে ফেলল। “আপনি না থাকলে আমরা অর্ধেক বুদ্ধি নিয়েই চলি, বস।”

লারসেন তাকাল না। শুধু বলল, “তাই হলে আজ পুরো বুদ্ধিটাই ব্যবহার করবে।”

ক্লে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল। রোদ এখনো ওঠেনি, তবু তার চোখে সেই চিরচেনা কঠিন দীপ্তি। সে লাগাম টেনে ঘোড়াটাকে সামনের দিকে আনল। “ফিরতে দেরি হলে অপেক্ষা করবেন না।”

লারসেনের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল। “দেরি হলে বুঝব, তোমরা কাজ করছ। আর যদি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসো, তখন প্রশ্ন করব।”

রুবেন নিচু স্বরে হেসে উঠল। হ্যাঙ্কের দাড়ির আড়ালেও যেন অল্প হাসি দেখা গেল। শুধু ক্লে কোনো জবাব দিল না। তার কাছে কাজই কথা।

ঠিক সেই সময় বারান্দার দরজার আড়ালে একটা ছোট্ট ছায়া নড়ে উঠল। মারদেকা।

ঘুম ভাঙার পর প্রথমে সে বুঝতেই পারেনি কোথায় আছে। কয়েক মুহূর্ত বিছানায় বসে থাকার পর আগের রাতের সব ঘটনা মনে পড়তেই তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে এসেছে। নতুন শার্টটা এখনো তার গায়ে একটু ঢিলেঢালা। প্যান্টের কোমর বেল্ট দিয়ে আঁটতে হয়েছে। পায়ে বুট পরার অভ্যাস না থাকায় হাঁটার সময় এখনো একটু অস্বস্তি হচ্ছে। তবু সে নিঃশব্দে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কেউ তাকে লক্ষ্য না করে।

তার চোখ একবার ঘোড়াগুলোর দিকে, একবার বন্দুকের দিকে, আবার মানুষের মুখের দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাহাড়ের গ্রামে শিকারিরা অস্ত্র নিয়ে বেরোত, কিন্তু এমন প্রস্তুতি সে কখনো দেখেনি। এখানে প্রত্যেকটা কাজের মধ্যে একটা নিয়ম আছে, একটা শৃঙ্খলা আছে। কেউ চিৎকার করছে না, কেউ অকারণে ব্যস্ত নয়। অথচ প্রত্যেকে জানে, সামনে বিপদ থাকতে পারে। এই দৃশ্যটা তার কাছে নতুন, অদ্ভুত, আর একই সঙ্গে মুগ্ধকর।

ওলফ লারসেন প্রথমেই ছেলেটাকে দেখতে পেল। কিছু না বলে শুধু হাতের দুই আঙুল সামান্য নেড়ে তাকে কাছে ডাকল।

মারদেকা একটু ইতস্তত করল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার পায়ের শব্দ প্রায় শোনা যায় না।

লারসেন নিচু হয়ে তার চোখের সমান উচ্চতায় এল। তারপর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা চারটা ঘোড়ার দিকে ইশারা করল, আবার উত্তর দিগন্তের দিকে হাত বাড়াল। কোনো শব্দ নয়, শুধু ইশারা।

মারদেকা মন দিয়ে সেটা দেখল। তারপর মাথা তুলে চারজন মানুষের দিকে তাকাল। আবার দূরের পথের দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত পর খুব আস্তে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সে অর্থটা ধরতে পেরেছে। তারা কোথাও যাচ্ছে।

লারসেনের চোখে অদৃশ্য একটুখানি সন্তুষ্টি ফুটে উঠল। ভাষা এখনো আলাদা, কিন্তু বোঝাপড়ার প্রথম সেতুটি যেন নীরবে তৈরি হতে শুরু করেছে।

চারজন অশ্বারোহী একে একে লাগাম টেনে ঘোড়াগুলোকে ঘুরিয়ে নিল। প্রথমে ক্লে মরগান, তার ঠিক পেছনে মিগুয়েল, তারপর রুবেন কোল আর সবশেষে হ্যাঙ্ক ডসন। আস্তাবলের সামনে জমে থাকা ভেজা মাটিতে খুরের আঘাতে ছোট ছোট কাদা ছিটকে উঠল। সকালের নিস্তব্ধতা ভেঙে একসঙ্গে চার জোড়া খুরের ছন্দময় শব্দ উঠোন পেরিয়ে ধীরে ধীরে র&#x200d;্যাঞ্চের উত্তর দিকের সরু পথ ধরে মিলিয়ে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ পর্যন্ত তাদের পিঠ দেখা যাচ্ছিল। তারপর তারা একটা ঢালু টিলা অতিক্রম করতেই শুধু ধুলোর হালকা রেখাটা ভেসে রইল। সেটাও শেষ পর্যন্ত সকালের বাতাসে মিলিয়ে গেল। বিশাল প্রান্তর আবার নিস্তব্ধ হয়ে উঠল। কিন্তু সেই নীরবতা আর আগের মতো ছিল না। যেন কয়েক মুহূর্ত আগেই এখানে ঘটে যাওয়া প্রস্তুতির প্রতিধ্বনি এখনো বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মারদেকা অনেকক্ষণ উত্তর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে কৌতূহল, বিস্ময়, আর এক অদ্ভুত অনুভূতি, যার নাম সে নিজেও জানে না। পাহাড়ের ওপারের ছোট্ট গ্রামে বড় হওয়ার সময় সে বহুবার শিকারিদের দলকে জঙ্গলে ঢুকতে দেখেছে। কেউ আর ফিরত না, এমনও হয়েছে। কেউ আহত হয়ে ফিরেছে। আবার কেউ শিকার নিয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু সেখানে মানুষের দল ছিল ছোট, অস্ত্র ছিল সাধারণ, আর উদ্দেশ্য ছিল বেঁচে থাকা। এখানে যেন সবকিছু অন্যরকম। এই মানুষগুলো শিকারে যায় না, দায়িত্ব পালন করতে যায়। তারা এমনভাবে বেরিয়ে গেল যেন এটাই তাদের প্রতিদিনের জীবন। বিপদ যেন তাদের কাছে ভয় নয়, কাজেরই একটা অংশ। মারদেকা বুঝতে পারছিল না, এই পৃথিবীটা তার পরিচিত পৃথিবী থেকে এত আলাদা কেন। তবু তার মনে হচ্ছিল, সে এই পার্থক্যগুলো জানতে চায়।

ওলফ লারসেন আর কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কফির শেষ চুমুক দিয়ে মগটা রেলিংয়ের ওপর রেখে ঘুরে ভেতরে চলে গেল। যাওয়ার আগে শুধু একবার মারদেকার দিকে তাকিয়েছিল। কোনো নির্দেশ দেয়নি, কোনো ডাকও দেয়নি। কিন্তু সেই দৃষ্টির মধ্যে এমন একটা নিশ্চিন্ত ভরসা ছিল, যেন সে জানে ছেলেটা কোথাও পালিয়ে যাবে না। মারদেকাও নড়ল না। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই র&#x200d;্যাঞ্চের সকাল দেখতে লাগল।

এখন চারদিকে ব্যস্ততা বাড়তে শুরু করেছে। দূরের গরুর খোঁয়াড় থেকে কর্মচারীরা পাল বের করে আনছে। শত শত গরু ধীরে ধীরে খোলা মাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের গলার ঘণ্টার একটানা টুংটাং শব্দ সকালের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। কয়েকজন কাউবয় লম্বা লাঠি হাতে গরুগুলোকে দিক নির্দেশ করছে। কেউ বাঁশির মতো চিকন শিস দিচ্ছে, কেউ ছোট ছোট শব্দ করে পশুগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আশ্চর্যের বিষয়, এত বড় পাল নিয়েও কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই। প্রত্যেক মানুষ জানে তার কাজ, প্রত্যেক প্রাণীও যেন নিজের নিয়মে চলতে অভ্যস্ত। মারদেকা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। তার গ্রামের মানুষ এত বড় গরুর পাল কখনো একসঙ্গে দেখেনি। এতগুলো প্রাণীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা মৃদু কাশির শব্দ শোনা গেল।

মারদেকা ফিরে তাকিয়ে দেখল, ইলাই দাঁড়িয়ে আছে। বৃদ্ধের হাতে একটা কাঠের ট্রে। তার ওপর ধোঁয়া ওঠা এক বাটি ওটমিল, দুটো মোটা রুটির টুকরো আর একটা মাটির মগ। ইলাই ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা নাড়ল। তারপর হাতের ইশারায় তাকে ভেতরে ডাকল।

মারদেকা একটু ইতস্তত করল। বাইরে এত কিছু দেখার আছে, তবু বৃদ্ধের মুখের কোমল হাসিটা তাকে আশ্বস্ত করল। সে ধীরে ধীরে ইলাইয়ের পিছু নিল।

রান্নাঘরের পাশের ছোট্ট খাবার ঘরটায় সকালবেলার আলো জানালা দিয়ে ঢুকে কাঠের টেবিলের ওপর পড়েছে। রাতের মতো বড় আয়োজন নেই। লারসেন সম্ভবত আগেই খেয়ে নিজের কাজে চলে গেছে। টেবিলে শুধু দুটো প্লেট সাজানো। ইলাই ট্রেটা নামিয়ে মারদেকার সামনে খাবার এগিয়ে দিল। তারপর নিজের বুকে হাত রেখে বলল, ”ইলাই।&quot;

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলল। সেও নিজের বুকের ওপর হাত রেখে বলল, ”মারদেকা।&quot;

ইলাই খুশি হয়ে মাথা নেড়ে হাসল। তারপর রুটিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে ধীরে ধীরে বলল, &quot;ব্রেড।&quot;

মারদেকা শব্দটা মন দিয়ে শুনল। ঠোঁট নেড়ে বলার চেষ্টা করল, &quot;বে...ড।&quot; উচ্চারণটা ঠিক হলো না।

ইলাই হেসে ফেলল না। ধৈর্য ধরে আবার বলল, &quot;ব্রেড।&quot;

এইবার মারদেকা একটু ধীরে বলল, &quot;ব্রেড।&quot;

বৃদ্ধের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে মগটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, কফি।&quot;

মারদেকা শব্দটা পুনরাবৃত্তি করল। &quot;ক...ফি।&quot;

ইলাই আবার মাথা নাড়ল। এরপর একে একে সে কয়েকটা সহজ শব্দ শেখাতে লাগল। &quot;ওয়াটার।&quot; &quot;ফুড।&quot; &quot;ডোর।&quot; প্রতিবারই প্রথমে নিজে বলছে, তারপর জিনিসটা দেখাচ্ছে, শেষে মারদেকাকে বলার সুযোগ দিচ্ছে। কোনো বই নেই, কোনো অক্ষর নেই, কোনো চাপ নেই। শুধু জিনিসের সঙ্গে শব্দের পরিচয়। যেন একটা ছোট্ট শিশু প্রথমবার পৃথিবীর নামগুলো শিখছে।

মারদেকার চোখে তখন সেই একই তীব্র মনোযোগ। সে শুধু শব্দ মুখস্থ করছে না, মানুষের ভাষার ভেতর ঢোকার দরজাটা খুঁজে পাচ্ছে। প্রতিটি নতুন শব্দ বলার পর তার মুখে এমন এক ধরনের আনন্দ ফুটে উঠছিল, যেন সে অদৃশ্য কোনো ধন খুঁজে পেয়েছে।

খাওয়া শেষ হলে ইলাই তাকে নিয়ে বাড়ির পেছনের দিকে বেরিয়ে এল। সকালের রোদ তখন আরও উজ্জ্বল হয়েছে। র&#x200d;্যাঞ্চের পেছনে একটা সরু পথ চলে গেছে ফলের বাগানের পাশ দিয়ে। কয়েকটা পুরোনো আপেলগাছ, দু-একটা নাশপাতির গাছ আর তার ফাঁকে ফাঁকে ছোট সবজিখেত। ইলাই হাঁটতে হাঁটতে মাঝেমধ্যে কোনো গাছের দিকে আঙুল দেখিয়ে তার নাম বলছিল। মারদেকা সবকিছুই মন দিয়ে শুনছিল। অনেক শব্দই সে ঠিকমতো বলতে পারছিল না, কিন্তু তার মনে রাখার ক্ষমতা অসাধারণ। একবার শুনেই আবার বলার চেষ্টা করছিল।

বাগান পেরিয়ে তারা যখন আস্তাবলের কাছে পৌঁছাল, তখন ভেতর থেকে ঘোড়ার নড়াচড়ার শব্দ ভেসে আসছিল। দুপুরের রোদ তখনো খুব তীব্র হয়নি। বাতাসে শুকনো খড়ের গন্ধ, চামড়ার জিনে লাগানো তেলের গন্ধ আর ঘোড়ার শরীরের উষ্ণ গন্ধ মিশে আছে। দূরে কয়েকজন কাউবয় গরুর পাল নিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছে। কেউ লাগাম টানছে, কেউ দড়ি গুটিয়ে কাঁধে ফেলছে। চারপাশে অবিরাম কাজ চলছে, কিন্তু অযথা কোনো চিৎকার নেই। প্রত্যেকে জানে তার দায়িত্ব কী।

আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বাড হিগিন্স। হাতে একটা মোটা ব্রাশ, সামনে বাদামি রঙের এক বৃদ্ধ ঘোড়া। সে ধীরে ধীরে প্রাণীটার গা পরিষ্কার করছিল। মারদেকা আর ইলাইকে আসতে দেখে সে কাজ থামাল। কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার চোখে বিস্ময় ছিল না। কারণ এই ছেলেটাকে সে আগেই দেখেছে। সেই রাতে রকডাস্ট সেলুনে, ধুলোয় মাখা, ক্ষুধায় কাতর, ভীত একটা হাফ-ব্রীড ছেলেকে ওলফ লারসেন নিজের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। তখনই বাড ভেবেছিল, লোকটা হয়তো এক রাত আশ্রয় দিয়ে বিদায় করবে। কিন্তু কয়েকদিন পর সেই একই ছেলেকে পরিষ্কার কাপড় পরে র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ধারণা বদলাতে শুরু করেছে।

বাড ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। মারদেকার চারপাশে একবার ঘুরে দেখল। তারপর মৃদু হেসে বলল, &quot;তোমাকে তো চেনাই যাচ্ছে না।&quot;

মারদেকা কথাটা বুঝল না। শুধু লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

ইলাই হেসে বলল, &quot;ও এখনো ভাষা শিখছে।&quot;

বাড মাথা নেড়ে আবার ঘোড়ার দিকে ফিরল। কিছু না বলে হাতে থাকা ব্রাশটা মারদেকার দিকে বাড়িয়ে দিল।

মারদেকা ব্রাশটার দিকে তাকাল। তারপর বাডের দিকে।

বাড এবার ঘোড়ার গায়ে ধীরে ধীরে দু-একবার ব্রাশ চালিয়ে দেখাল। এরপর আবার ব্রাশটা ছেলেটার হাতে দিল।

এবার আর বুঝতে অসুবিধা হলো না। মারদেকা সাবধানে ঘোড়ার কাছে এগিয়ে গেল। প্রথমে হাত বাড়িয়ে প্রাণীটার গলায় আলতো করে স্পর্শ করল। ঘোড়াটাও শান্তভাবে তার গন্ধ শুঁকে আবার মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সে ধীরে ধীরে ব্রাশ চালাতে শুরু করল।

প্রথম কয়েকবার হাতের চাপ বেশি হয়ে গেল। ঘোড়াটা কান নাড়ল। বাড সঙ্গে সঙ্গে তার কবজি আলতো করে ধরে চাপটা কমিয়ে দিল। কোনো কথা বলল না। শুধু কাজটা আবার করে দেখাল।

মারদেকা মন দিয়ে দেখল। তারপর আবার চেষ্টা করল। এবার অনেক ভালো হলো।

বাড একটু দূরে সরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করতে লাগল। ছেলেটা একবার যে ভুল করছে, দ্বিতীয়বার আর সেই ভুল করছে না। প্রতিটা নির্দেশ মন দিয়ে দেখছে, তারপর নিজের মতো করে ঠিক করে নিচ্ছে। এই গুণটা বাডের নজর এড়াল না।

প্রায় আধঘণ্টা কেটে গেল। বাদামি ঘোড়াটার গা ধীরে ধীরে ধুলোহীন হয়ে উঠল। রোদে তার লোম চকচক করতে লাগল।

বাড এগিয়ে এসে নিজের হাতে ঘোড়ার গায়ে একবার হাত বুলিয়ে দেখল। তারপর খুব সংক্ষেপে বলল, &quot;ভালো।&quot;

শব্দটা ছোট। কিন্তু মারদেকা বুঝে গেল, এটা প্রশংসা। তার মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।

বাডও অজান্তে হাসল। তার মনে পড়ল সেই রাতের কথা। রকডাস্ট সেলুনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ধুলোয় ঢাকা, ক্ষুধার্ত ছেলেটার চোখেও ঠিক এমনই একগুঁয়ে আলো ছিল। আজও সেই আলো আছে। শুধু তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নিরাপত্তার অনুভূতি। সে নিজের মনে ভাবল, &quot;হয়তো বস ভুল করেননি।&quot;

ঠিক তখনই আস্তাবলের ভেতর থেকে একটা ধূসর ঘোড়া অস্থির হয়ে হ্রেষাধ্বনি করে উঠল। বাড ঘুরে তাকাল। তারপর মারদেকার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় ডাকল। তাকে নিয়ে গেল আস্তাবলের এক কোণে। সেখানে সারি করে ঝুলছে জিন, লাগাম, দড়ি আর নানা ধরনের সরঞ্জাম। প্রতিটা ব্যবহারের পর পরিষ্কার করে নির্দিষ্ট জায়গায় ঝুলিয়ে রাখা হয়। বাড একটা পুরোনো চামড়ার জিন নামিয়ে তার হাতে দিল। 

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত জিনটার দিকে তাকিয়ে রইল। চামড়ার তৈরি ভারী জিনিসটা তার কাছে অদ্ভুত লাগছিল। এতদিন সে শুধু মানুষের পিঠে কিংবা ঘোড়ার খালি পিঠে চড়ে পথ চলতে দেখেছে। এমনভাবে চামড়া আর লোহার তৈরি একটা আসন ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলাফেরা করতে পারে, এটা সে আগে জানত না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সে আঙুল দিয়ে জিনটার গায়ে হাত বুলিয়ে দেখল। বহু বছরের ব্যবহারে চামড়াটা নরম হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দাগ পড়েছে, আবার কোথাও নতুন করে তেল লাগানোর কারণে হালকা চকচক করছে। পিতলের বাকলগুলো সকালের আলোয় মৃদু ঝিলিক দিচ্ছে। ছেলেটার চোখে আবার সেই পরিচিত কৌতূহল ফুটে উঠল।

বাড কিছু বলল না। সে জানত, ভাষা দিয়ে বোঝানোর চেয়ে দেখিয়ে শেখানোই এখন সবচেয়ে সহজ উপায়। সে দুই হাতে জিনটা তুলে আস্তে করে ধূসর রঙের শান্ত স্বভাবের একটা ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দিল। তারপর একে একে বেল্টগুলো কোথা দিয়ে নামাতে হয়, বুকের নিচে কীভাবে আটকে দিতে হয়, আর পেটের নিচ দিয়ে যাওয়া চামড়ার ফিতে কতটা শক্ত করে বাঁধতে হয়, সব ধীরে ধীরে দেখাতে লাগল। প্রতিটি নড়াচড়া ছিল অভ্যাসে নিখুঁত, তাড়াহুড়ো নেই, অস্থিরতা নেই। বোঝাই যায়, এই কাজ সে হাজারবার করেছে। কাজ শেষ করে সে আবার সব খুলে ফেলল। তারপর জিনটা দুহাতে তুলে মারদেকার দিকে বাড়িয়ে দিল।

মারদেকা প্রথমে একটু ইতস্তত করল। তারপর জিনটা হাতে নিল। ওজন তার ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। দুই হাতে ধরেও ভার সামলাতে গিয়ে শরীরটা সামান্য কেঁপে উঠল। দাঁত চেপে সে সেটাকে ঘোড়ার পিঠে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু প্রথম চেষ্টাতেই জিনটা এক পাশে কাত হয়ে ঝুলে পড়ল। সে বিস্মিত চোখে বাডের দিকে তাকাল। বাড শুধু মাথা নেড়ে আবার চেষ্টা করতে ইশারা করল।

দ্বিতীয়বার জিনটা ঠিকই পিঠে উঠল, কিন্তু অনেকটা সামনে চলে গেল। এবারও বাড কিছু বলল না। শুধু হাত বাড়িয়ে সঠিক জায়গাটা দেখিয়ে দিল। মারদেকা আবার নামাল। আবার তুলল। তৃতীয়বারও ভুল হলো। চতুর্থবারও পুরোপুরি ঠিক হলো না। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, সে একই ভুল দ্বিতীয়বার করছে না। প্রতিবারই আগের চেয়ে একটু ভালো হচ্ছে। তার কপালে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু জমেছে। বাহুর পেশি টনটন করছে। তবু একবারের জন্যও বিরক্ত হয়ে জিনটা ফেলে দেয়নি।

কিছুটা দূরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওলফ লারসেন নীরবে সব দেখছিল। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। তার দৃষ্টি ছিল মারদেকার ওপর। ছেলেটা কত দ্রুত শিখছে, সেটা নয়, সে দেখছিল কীভাবে শিখছে। অনেক মানুষ প্রথম ব্যর্থতার পরেই অজুহাত খোঁজে। কেউ বলে কাজটা কঠিন, কেউ বলে তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু এই হাফ ব্রীড ছেলেটা একবারও নিজের অক্ষমতার দিকে তাকাচ্ছে না। সে শুধু বুঝতে চাইছে কোথায় ভুল হয়েছে।

ঠিক তখনই ইলাই ট্রেতে করে কফি নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। একটা মগ লারসেনের হাতে দিয়ে আরেকটা বাডের দিকে বাড়িয়ে ধরল।

বাড হাত তুলে মৃদু হাসল। &quot;এখন না।&quot; তার চোখ তখনও মারদেকার দিকেই।

আরেকবার চেষ্টা করল ছেলেটা। এবার সে আগের ভুলগুলো মনে রাখল। জিনটা তুলে একটু পেছনের দিকে সরিয়ে আস্তে করে নামিয়ে দিল। এবার সেটা ঠিক জায়গায় বসে গেল। সে নিজেও বুঝতে পারল, কিছু একটা ঠিক হয়েছে। বাড ধীরে ধীরে ঘোড়াটার চারপাশ ঘুরে দেখল। তারপর তার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। &quot;এই তো হয়েছে।&quot;

মারদেকা কথাটা বুঝল না। কিন্তু লোকটার চোখের ভাষা বুঝল। নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণেও একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।

বাড এবার হাঁটু গেড়ে বসে ঘোড়ার পেটের নিচ দিয়ে ঝুলে থাকা বেল্টটার দিকে আঙুল দেখাল। তারপর নিজের হাতে একবার টেনে দেখিয়ে ইশারা করল, এবার এটা বাঁধতে হবে।

মারদেকা ধীরে ধীরে ঘোড়ার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। হাত বাড়িয়ে বেল্টটা ধরতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘোড়াটা বিরক্ত হয়ে ঠুক করে একটা পা মাটিতে মারল। শব্দটা আস্তাবলের ভেতর প্রতিধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়ল। নতুন কেউ হলে হয়তো ভয় পেয়ে সরে যেত। মারদেকাও এক মুহূর্ত থমকে গেল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে ধীরে ধীরে নিজের হাতটা ঘোড়াটার পেটের পাশে রেখে আলতো করে বুলিয়ে দিল। তারপর খুব নিচু স্বরে নিজের মাতৃভাষায় কী যেন বলতে শুরু করল।

বাড বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। ইলাইও থেমে গেল।

কথাগুলোর অর্থ কেউ বুঝল না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কয়েক মুহূর্ত আগেও যে ঘোড়াটা অস্থির ছিল, সে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল। মাথা নিচু করে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। মারদেকা এবার অনায়াসে বেল্টটা টেনে এনে বাকলে আটকে দিল।

আস্তাবলের ভেতর কয়েক সেকেন্ডের জন্য নীরবতা নেমে এল। বাড ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার বহু বছরের অভিজ্ঞতায় এমন দৃশ্য খুব বেশি দেখা হয়নি। সব ঘোড়া মানুষের ভাষা বোঝে না, কিন্তু মানুষের আচরণ বোঝে। আর এই ছেলেটার মধ্যে প্রাণীদের সঙ্গে অদ্ভুত এক সহজ সম্পর্ক আছে। সে ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তার মুখটা অমলিন হাসিতে ভরে উঠলো।

বাডের মুখে আবারো প্রশংসার হাসি দেখে মারদেকা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। মানুষের চোখের ভাষা বোঝার জন্য কোন শব্দ দরকার হয় না। বাডের চোখে অবহেলা ছিল না, করুণা ছিল না। ছিল এক ধরনের স্বীকৃতি। সেই স্বীকৃতি ছেলেটার বুকের ভেতরে অদ্ভুত একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল। পাহাড়ের গ্রামের জীবনে কেউ তাকে কখনো কোনো কাজের জন্য বাহবা দেয়নি। সেখানে সবাই কাজ করত, কারণ কাজ না করলে বেঁচে থাকা যেত না। ভালো করলে কেউ আলাদা করে কিছু বলত না, ভুল করলে শাসন মিলত। অথচ এই অচেনা মানুষটা সামান্য একটা জিন ঠিকমতো বসাতে পারার জন্য তার কাঁধে হাত রেখে হাসল। ছোট্ট ঘটনাটা মারদেকার মনে এমনভাবে গেঁথে গেল, যেন বহুদিনের শুকনো মাটিতে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়েছে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ওলফ লারসেনও এবার কফির মগটা নামিয়ে রাখল। তার স্থির চোখের গভীরে চিন্তার একটা নতুন রেখা ফুটে উঠল। সে মনে মনে বুঝল, এই ছেলেটা শুধু শেখার ক্ষমতা নিয়েই আসেনি। প্রকৃতি তাকে আরও কিছু দিয়ে পাঠিয়েছে।

এরপরের দিনগুলোতে বাড প্রায় প্রতিদিনই তাকে সঙ্গে রাখত। প্রথমে সহজ কাজ, তারপর একটু কঠিন। কখনো ঘোড়ার গা ব্রাশ করতে দিত, কখনো খড় এনে দিতে বলত, কখনো লাগাম পরিষ্কার করাত। কোনো কাজই তাড়াহুড়ো করে শেখাত না। ভুল করলে ধমক দিত না, আবার একই ভুল দ্বিতীয়বার করতে দিত না। মারদেকাও অবিশ্বাস্য ধৈর্য নিয়ে প্রতিটি কাজ শিখতে লাগল। একবার দেখলে দ্বিতীয়বার আর ভুল করত না। তার চোখ যেন সবকিছু গিলে নিচ্ছিল। বাড মাঝে মাঝে অবাক হয়ে দেখত, যে ছেলেটা এখনো ঠিকমতো ইংরেজি বলতে পারে না, সে শুধু হাতের ইশারা দেখেই পুরো কাজটা বুঝে ফেলছে। অনেক সময় কোনো নির্দেশ দেওয়ার আগেই সে বুঝে যেত পরের কাজটা কী হতে পারে। ধীরে ধীরে র&#x200d;্যাঞ্চের কর্মচারীরাও বিষয়টা লক্ষ্য করতে শুরু করল। কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলত না, কিন্তু প্রায় সবাই বুঝে গেল, ছেলেটা সাধারণ নয়।

অন্যদিকে সন্ধ্যা নামলেই মারদেকার আরেকটা জীবন শুরু হতো। রাতের খাবার শেষে ইলাই তাকে নিয়ে যেত সেই ছোট্ট পড়ার ঘরে। কেরোসিনের লণ্ঠনের হলদে আলোয় টেবিলের ওপর খুলে রাখা থাকত স্লেট, চক আর পুরোনো কয়েকটা বই। ইলাই ধীরে ধীরে তাকে অক্ষর শেখাত। প্রথমদিকে অক্ষরগুলো তার কাছে ছিল পাথরের গায়ে আঁকা রহস্যময় চিহ্নের মতো। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সে বুঝতে শুরু করল, এই ছোট ছোট চিহ্ন একসঙ্গে মিলেই মানুষের কথা হয়ে যায়। সে নিজের নাম লিখতে শিখল। প্রথমে কাঁপা হাতে বড় বড় অক্ষরে, তারপর একটু একটু করে ঠিকঠাক। নিজের নাম লেখা শেষ হলে সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই অক্ষরগুলোর দিকে। এতদিন তার নাম ছিল শুধু একটা শব্দ, যা মানুষ মুখে বলত। আজ প্রথমবার সে দেখল, সেই নাম কাগজেও বেঁচে থাকতে পারে। ইলাইয়ের চোখে তখন এমন আনন্দ, যেন নিজের নাতিকে প্রথম লেখা শিখতে দেখছে।

ওলফ লারসেন সবকিছু দূর থেকে দেখত। তার স্বভাবই ছিল এমন। সে অযথা কাউকে প্রশংসা করত না, আবার অহেতুক হস্তক্ষেপও করত না। বারান্দায় বসে কফির মগ হাতে অনেক সন্ধ্যায় সে দেখেছে, পড়ার ঘরের জানালার পাশে মাথা নিচু করে বসে আছে মারদেকা। কখনো আবার আস্তাবলের পাশে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার কেশর আঁচড়ে দিচ্ছে। কোনো কাজেই তার অস্থিরতা নেই। যেন প্রতিটি মুহূর্ত থেকে কিছু না কিছু শিখে নেওয়ার চেষ্টা করছে। 

এক সন্ধ্যায় বাড বারান্দায় উঠে এসে চুপচাপ লারসেনের পাশে দাঁড়িয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ দুজনের কেউ কথা বলেনি। তারপর বাড নিচু গলায় বলেছিল, &quot;বস, ছেলেটার হাত অন্যরকম। ঘোড়াগুলো ওকে খুব তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করে ফেলছে।&quot; 

লারসেন কফিতে এক চুমুক দিয়ে শুধু বলেছিল, &quot;মানুষের আগে পশুরা অনেক সময় সত্যিকারের স্বভাব চিনতে পারে।&quot; তারপর আবার নীরবতা নেমে এসেছিল।

কিন্তু এই শান্ত দিনগুলোও বেশিদিন অশান্তিহীন রইল না। এক বিকেলে কাজ শেষ হওয়ার মুখে দূরের পাহাড়ি পথের দিকে নজর পড়তেই পাহারায় থাকা এক কাউবয় হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। সবাই তাকিয়ে দেখল, পশ্চিমের আলোয় দূরে ধুলোর সরু রেখা উঠছে। প্রথমে মনে হলো, হয়তো কয়েকজন সাধারণ পথিক। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই বোঝা গেল, ঘোড়াগুলো প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসছে। র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে কাজ করা লোকেরা একে একে থেমে গেল। কেউ লাগাম শক্ত করে ধরল, কেউ বন্দুকের দিকে হাত বাড়াল। ওলফ লারসেন বারান্দা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো ভয় নেই, কিন্তু চোখ দুটো আরও ধারালো হয়ে উঠেছে।

মারদেকাও সবার সঙ্গে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না কী হয়েছে, কিন্তু চারপাশের পরিবেশ বদলে যাওয়ার কারণ অনুভব করতে পারছে। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে উঠোনে হাতুড়ির শব্দ, মানুষের হাসি আর ঘোড়ার ডাক মিলেমিশে ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। দূরের ধুলোর রেখাটা ক্রমশ বড় হচ্ছে। সূর্য তখন পশ্চিমের পাহাড়ের কাঁধে হেলে পড়েছে। সেই লাল আলোয় দ্রুত ছুটে আসা অশ্বারোহীদের অবয়ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল।

ওলফ লারসেন খুব আস্তে বলল, &quot;সবাই প্রস্তুত থাকো।&quot; তার গলার স্বর ছিল শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত স্বরের মধ্যেই এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যাতে উপস্থিত প্রত্যেক মানুষ বুঝে গেল, নতুন কিছু শুরু হতে যাচ্ছে।

মারদেকা নিঃশব্দে লারসেনের দিকে তাকাল। তার ছোট্ট বুকের ভেতর অকারণ ধুকপুক শুরু হয়েছে। সে জানে না কারা আসছে। জানে না কেন সবাই এত সতর্ক। কিন্তু তার মনে হলো, যেদিন সে পাহাড় পেরিয়ে এই র&#x200d;্যাঞ্চে এসেছিল, সেদিন যেমন তার জীবনের একটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল, ঠিক তেমনি আজও আরেকটি নতুন অধ্যায়ের দরজা ধীরে ধীরে খুলতে যাচ্ছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/259299/</link>
				<pubDate>Sun, 02 Aug 2026 12:13:29 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়-তিন<br />
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি মাটিতে নেমে আসেনি। পূর্ব দিগন্তের নিচু আকাশে লালচে আভা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, যেন রাতের কালো পর্দার নিচ থেকে কেউ নিঃশব্দে আগুনের রেখা টেনে দিচ্ছে। দূরের পাহাড়গুলো এখনো গাঢ় ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মাথার ওপর কুয়াশার পাতলা আস্তরণ ভেসে বেড়াচ্ছে, আর নিচের বিশাল তৃণভূ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-259299"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/259299/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">61cc4c9079a9c81cd39ec48abddbbc76</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়-দুই
রকডাস্ট সেলুন থেকে বেরিয়েই ওলফ লারসেন থামল না। ধীর পায়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। মারদেকাও কোনো কথা না বলে তার পিছু পিছু চলল। শহরের রাত তখন পুরোপুরি নেমে এসেছে। রাস্তার দু&#039;পাশে কাঠের খুঁটির মাথায় ঝোলানো কেরোসিনের বাতিগুলো হলদে আলো ছড়িয়ে নিস্তব্ধ পরিবেশটাকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে। দিনের ভিড় নেই, কিন্তু শহর তখনো ঘুমোয়নি। কোথাও মাতালের চিৎকার, কোথাও তাসের আড্ডা, কোথাও আবার লোহার নালের সঙ্গে পাথরে ঘোড়ার খুরের ঠকঠক শব্দ ভেসে আসছে। সেলুন থেকে বেরিয়ে আসা লোকগুলো একবার লারসেনের দিকে, আরেকবার তার পেছনে হাঁটা ধুলোয় মাখা হাফ ব্রীড ছেলেটার দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে উঠেলো। কিন্তু, কেউ সামনে এসে কিছু বলার সাহস পেল না।

মারদেকা হাঁটতে হাঁটতে চারপাশ দেখছিল। এত বড় শহরে সে এই প্রথম রাত দেখছে। প্রতিটা জিনিসই তার কাছে নতুন। দোকানের সামনে কাঁচের জানালা, লোহার সাইনবোর্ড, রঙিন কাপড় ঝোলানো বারান্দা, কামারের দোকানের সামনে সাজিয়ে রাখা ঘোড়ার নাল, কসাইখানার সামনে ঝোলানো গরুর চামড়া, সবকিছুই তার চোখে বিস্ময় জাগাচ্ছে। মাঝে মাঝে কোনো ঘোড়া পাশ দিয়ে চলে গেলে সে একটু সরে দাঁড়াচ্ছে। আবার কোনো কুকুর ঘেউ ঘেউ করলে চমকে উঠছে। কিন্তু একবারও লারসেনকে হারিয়ে ফেলছে না। অদ্ভুত একটা বিশ্বাস জন্মে গেছে তার মনে। লোকটা যতক্ষণ সামনে আছে, ততক্ষণ কেউ তাকে আঘাত করবে না।

ব্ল্যাক রিভারের প্রধান রাস্তা পেরিয়ে তারা শহরের উত্তর দিকের উঁচু জায়গাটায় উঠে এলো। এখানকার বাড়িগুলো নিচের শহরের বাড়িগুলোর মতো গাদাগাদি করে বানানো নয়। প্রতিটা বাড়ির সামনে খোলা জায়গা। কোথাও ঘোড়ার আস্তাবল, কোথাও ছোট ফলের বাগান, কোথাও আবার গবাদি পশুর ঘের। আরও খানিকটা এগিয়ে একটা বড় কাঠের বাড়ির সামনে এসে থামল লারসেন। চারদিকে সাদা রঙের বেড়া। ভেতরে কয়েকটা ওক গাছ। বারান্দার একপাশে সারি করে রাখা দোলনা চেয়ার। বাড়িটার পাশেই বিশাল একটা আস্তাবল। ভেতর থেকে ঘোড়ার নড়াচড়ার শব্দ ভেসে আসছে। দরজার ওপরে ঝোলানো লণ্ঠনের আলোয় পুরো জায়গাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

মারদেকা মাথা উঁচু করে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার গ্রামের প্রধানের ঘরটাও এর অর্ধেক ছিল না। এত বড় বাড়ির কথা সে শুধু গল্পেই শুনেছে।

লারসেন সোজা বারান্দায় উঠে দরজায় হাত রাখতেই ভেতর থেকে খুলে গেল সেটা। প্রায় ষাট বছরের এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। মাথার চুল প্রায় সাদা। গায়ে পরিষ্কার এপ্রোন। মুখে বয়সের ছাপ থাকলেও চোখদুটো এখনো তীক্ষ্ণ।

বৃদ্ধ প্রথমে লারসেনের দিকে তাকাল। তারপর মারদেকাকে দেখে কপাল কুঁচকে গেল, &quot;এ কে?&quot;

লারসেন কোট খুলতে খুলতে শান্ত গলায় বলল, &quot;আজ থেকে ও আমাদের সঙ্গে থাকবে।&quot;

বৃদ্ধের মুখে বিস্ময় আরও বেড়ে গেল। বৃদ্ধ বলল, &quot;একজন... ইন্ডিয়ান?&quot;

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। &quot;হাফ ব্রীড।&quot; এক কথার বেশি বলল না।

বৃদ্ধ আর প্রশ্ন করল না। লারসেনের সঙ্গে প্রায় ত্রিশ বছর আছে সে। এই মানুষটার স্বভাব সে জানে। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে লারসেন অনেক ভেবে নেয়। একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে সেটা বদলায় না। সে একটু সরে দাঁড়াল। লারসেন ভেতরে ঢুকল।

মারদেকা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। জীবনে প্রথমবার এমন একটা বাড়ির ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছে সে। তার পা যেন এগোতে চাইছে না। ভয় করছে, ভেতরে ঢুকলেই হয়তো কেউ তাকে বের করে দেবে।

লারসেন পেছন ফিরে তাকাল। তারপর শুধু হাতের ইশারায় ডাকল। মারদেকা এবার ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

বাড়িটার ভেতরটাও তার কাছে বিস্ময়ের আরেক জগৎ। মেঝেতে মোটা কার্পেট। দেয়ালে ঝোলানো হরিণ আর বাইসনের শিং। একপাশে পাথরের তৈরি ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছে। আগুনের হলদে আলো ঘরটাকে আরামদায়ক করে তুলেছে। দেয়ালে কয়েকটা বন্দুক সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা। একটা কাঁচের আলমারিতে সারি সারি বই। ছাদের কড়িকাঠে ঝুলছে তামার লণ্ঠন।

মারদেকা পা টিপে টিপে হাঁটছিল। তার মনে হচ্ছিল, একটু জোরে হাঁটলেই বুঝি এত সুন্দর ঘরটা ভেঙে যাবে।

বৃদ্ধ তখনো ছেলেটার দিকে তাকিয়ে। তার চোখে কৌতূহলের সঙ্গে একটা সংশয়ও আছে।

লারসেন সেটা বুঝতে পারল। শান্ত গলায় বলল, &quot;ইলাই, গরম পানি বসাও।&quot;

বৃদ্ধ অবাক হয়ে বলল, &quot;গোসল করাবেন?&quot;

&quot;হ্যাঁ।&quot;

&quot;আর কাপড়?&quot;

&quot;আমার ছেলের পুরোনো কাপড়গুলো আছে?&quot;

প্রশ্নটা শুনে বৃদ্ধ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে মাথা নেড়ে বলল, &quot;আছে। সবই আছে।&quot; কথাটা বলেই মারদেকার দিকে একবার ফিরেই পরমুহুর্তে যোগ করলো, “ওগুলো ওর গায়ে ফীট করবে তো?” 
 
”চোখের মাথা খেয়েছ নাকি! না তুমি সত্যিই বুড়ো হয়ে গেছ।” লারসেন মৃদু হেসে দিল। তারপর বললো, “ভালো করে তাকিয়ে দেখ গায়ে-গতরে ও আমার ছেলের মতই।” 

লারসেনকে অনুসরণ করে ইলাই আবারো মারদেকাকে দেখলো। তার চোখ এবার উজ্জল হয়ে উঠলো। 

মারদেকা বুঝতে পারল না, বৃদ্ধের মুখটা হঠাৎ এমন উজ্জল হয়ে গেল কেন। সে শুধু আগুনের দিকে তাকিয়ে দুই হাত মেলে ধরল। তিন দিন ধরে পাহাড়ের ঠান্ডা রাত আর দিনের রোদে কাটিয়ে এমন উষ্ণতা সে অনেকদিন পায়নি।

ঠিক তখনই বাইরে ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। একটা নয়। কয়েকটা।

ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যেতেই ইলাই দরজার দিকে তাকাল। মুহূর্ত পরেই উঠোনে পরপর চারটা ঘোড়া এসে থামল। অনেক দূরের পথ পেরিয়ে ফেরার ক্লান্তি তাদের গা থেকেই বোঝা যাচ্ছে। ঘোড়াগুলোর শরীর ঘামে ভিজে চকচক করছে। নাক দিয়ে গরম বাষ্প বেরোচ্ছে। আরোহীরা একে একে জিন থেকে নেমে লাগামগুলো বারান্দার রেলিংয়ে বেঁধে ধীর পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল।

সবার আগে ঢুকল লম্বা, চওড়া কাঁধের এক যুবক। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। রোদে পোড়া মুখ, সরু ঠোঁট, কপালের ওপর তির্যক একটা পুরোনো ক্ষতচিহ্ন। কোমরে নিচু হয়ে ঝুলছে হাতির দাঁতের বাঁটওয়ালা দুটো কোল্ট। হাঁটার ভঙ্গিতেই আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠছে। লোকটার নাম ক্লে মরগান। ওলফ লারসেনের দলের সবচেয়ে দ্রুত বন্দুকবাজ হিসেবে ব্ল্যাক রিভারে তার যথেষ্ট সুনাম আছে।

তার পেছনে ঢুকল রুবেন কোল। মাঝারি গড়নের মানুষ। চোখে-মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকে। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কী লুকিয়ে থাকে, সেটা কেউ সহজে বুঝতে পারে না। হিসেব করে কথা বলা আর মানুষের মন বুঝে চলার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে তার।

তৃতীয় লোকটা মিগুয়েল। ছোটখাটো, গায়ের রং তামাটে। মাথায় চওড়া কিনারাওয়ালা সোমব্রেরো। মরুভূমি, পাহাড় কিংবা জঙ্গলে পথ হারানো মানুষকে খুঁজে বের করার মতো দক্ষ ট্র্যাকার আশেপাশের দশটা শহরে আর নেই।

সবশেষে ঢুকল হ্যাঙ্ক ডসন। বিশালদেহী, কম কথার মানুষ। মুখভর্তি দাড়ি। ডান কাঁধে ঝুলছে উইনচেস্টার। তাকে দেখলে প্রথমেই মনে হয়, মানুষের চেয়ে ভালুকের সঙ্গে লড়াই করতেই যেন বেশি স্বচ্ছন্দ।

চারজনই ভেতরে ঢুকে একসঙ্গে টুপি খুলল।

ক্লে বলল, &quot;শুভ সন্ধ্যা, বস।&quot;

লারসেন মাথা নেড়ে অভিবাদন গ্রহণ করল। &quot;ফিরতে দেরি হলো।&quot;

ক্লে উত্তর দিল, &quot;উত্তরের চর থেকে কয়েকটা গরু সরে গিয়েছিল। সেগুলো খুঁজে আনতেই সময় লেগেছে।&quot;

&quot;সব ফিরে এসেছে?&quot; আবারো প্রশ্ন করলো লারসেন।

&quot;একটাও বাদ যায়নি।&quot; ঘাড় কাৎ করে তাকে আশ্বস্ত করলো ক্লে।

লারসেন আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। কথার চেয়ে কাজের মূল্য সে সবসময় বেশি দেয়।

এই সময় চারজনেরই চোখ গিয়ে পড়ল ফায়ারপ্লেসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মারদেকার ওপর। ভেজা চুল। পরিষ্কার মুখ। কিন্তু পোশাক আর চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, ছেলেটা এই বাড়ির কেউ নয়।

রুবেন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। হ্যাঙ্ক ভ্রু কুঁচকাল। মিগুয়েলের চোখে ফুটে উঠল মমতা।

শুধু ক্লে অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। ধীরে ধীরে মারদেকার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখদুটো ধারালো। সে তার স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা চকচকে দৃষ্টি দিয়ে মারদেকার দিকে তাকাল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখে নিয়ে লারসেনের দিকে ফিরে শান্ত গলায় বলল, &quot;নতুন লোক?&quot;

লারসেন সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল। &quot;হ্যাঁ।&quot;

&quot;র&#x200d;্যাঞ্চে কাজ করবে?&quot;

&quot;সময়ই বলে দেবে।&quot;

ক্লে এবার প্রথমবারের মতো ছেলেটার চোখের দিকে তাকাল। মারদেকাও তার দিকে তাকিয়ে রইল। দু&#039;জনের কেউ চোখ সরাল না। কয়েক মুহূর্তের নীরবতায় যেন অদৃশ্য একটা লড়াই হয়ে গেল। 

শেষ পর্যন্ত ক্লে’ই চোখ ফিরিয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল। &quot;দেখে তো বুনো নেকড়ের বাচ্চা মনে হচ্ছে।&quot; 

কথাটা মারদেকা বুঝল না। কিন্তু লোকটার চোখের ভাষা বুঝল। এই মানুষটা তাকে পছন্দ করেনি।

ঠিক তখনই লারসেনের গলা শোনা গেল। &quot;ক্লে।&quot; 

একটা শব্দ। কিন্তু সেই এক শব্দেই ক্লে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। &quot;জি, বস।&quot;

&quot;ওকে একা থাকতে দাও।&quot; 

&quot;ঠিক আছে বস।&quot; ক্লে ধীরে ধীরে সরে এল। আস্তে আস্তে তার ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। 

সেই হাসির অর্থ তখন কেউ বুঝতে পারেনি। শুধু ওলফ লারসেন কয়েক মুহূর্ত স্থির চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল।

মিগুয়েল তখন কোমরের থলি থেকে একটা শুকনো আপেল বের করে মারদেকার দিকে বাড়িয়ে দিল। ছেলেটা প্রথমে দ্বিধা করল। তারপর আপেলটা হাতে নিল। মিগুয়েল মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

রুবেনও হাসল।

হ্যাঙ্ক নির্বিকার মুখে ফায়ারপ্লেসের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

ঘরের ভেতরের পরিবেশ আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল। ক্লে মরগান আর বাকিরা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ফিরেছে। ইলাই তাদের হাতে একে একে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ ধরিয়ে দিল। চারজন যে যার মতো বসে পড়ল। কেউ বুট খুলে পা ছড়িয়ে দিল, কেউ কোমর থেকে বন্দুকের বেল্ট খুলে চেয়ারের পিঠে ঝুলিয়ে রাখল। সারাদিন ঘোড়ার পিঠে কাটানোর ক্লান্তি মুখে স্পষ্ট। তবু ওলফ লারসেনের সামনে বসে কেউ অকারণে গল্প জুড়ে দিল না। এই বাড়িতে অযথা বকবক করার অভ্যাস কারও নেই।

লারসেন কফির মগে একবার চুমুক দিয়ে ইলাইয়ের দিকে তাকাল। &quot;গরম পানি তৈরি?&quot;

ইলাই মাথা নেড়ে বলল, &quot;অনেকক্ষণ হলো।&quot;

লারসেন এবার মারদেকার দিকে তাকাল। ছেলেটা এখনো ফায়ারপ্লেসের সামনে দাঁড়িয়ে আগুনের শিখার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। আগুনের এত কাছে বসে শরীর গরম করার সুযোগ সে কোনোদিন পায়নি। পাহাড়ের গ্রামে শীতের রাতে আগুন জ্বালানো হতো ঠিকই, কিন্তু সেই আগুন ছিল খোলা আকাশের নিচে। এমন সুন্দর পাথরের চুল্লির মধ্যে বন্দি আগুন তার কাছে নতুন বিস্ময়।

লারসেন মারদেকার দিকে তাকাল। ইশারা করে বলল, &quot;চলো।&quot; মারদেকা তার পিছু নিল। 

বাড়ির পেছনের দিকে ছোট্ট একটা গোসলখানা। বড় কাঠের টবে ধোঁয়া ওঠা পানি ভরা। পাশে সাবান, তোয়ালে আর পরিষ্কার কাপড় রাখা।

ছেলেটা থমকে দাঁড়াল। এত পানি একসঙ্গে সে শুধু নদীতেই দেখেছে। কিন্তু কাঠের টবের মধ্যে গরম পানি ভরে কেউ গোসল করে, এমন দৃশ্য তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন।

লারসেন নিজে টবের কাছে গিয়ে পানিতে হাত ডুবিয়ে দেখল। তারপর মারদেকার দিকে তাকিয়ে নিজের জামার বোতাম খুলে দেখাল। ইশারায় বোঝাল, কাপড় খুলে পানিতে নামতে। 

মারদেকা এবার বুঝল। ধীরে ধীরে নিজের নেংটির মতো পোশাকটা খুলে একপাশে রাখল। তার শরীরজুড়ে আঁচড়ের দাগ। হাঁটুতে শুকনো রক্ত। পায়ের পাতায় অসংখ্য কাঁটার খোঁচা।

লারসেন সেদিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তিন দিনের পথ। একটা বারো বছরের ছেলে। একাই এসেছে। অদ্ভুত জেদ আছে ছেলেটার।

মারদেকা সাবধানে পা ডুবাল পানিতে। তারপরই চমকে উঠল। এত গরম পানিতে সে কোনোদিন নামেনি। কয়েক মুহূর্ত পরে ধীরে ধীরে শরীরটা পানির ভেতর ডুবিয়ে দিল। চোখ দুটো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে এল। মুখে এমন এক প্রশান্তির ছাপ ফুটে উঠল, যা দেখে ওলফ লারসেনের মুখেও অজান্তে হালকা হাসি ফুটে উঠল।

গোসলের পর ঘরে ফিরে এসে লারসেন মারদেকাকে ইলাইয়ের হাতে তুলে দিল। তাকে বৃদ্ধের সাথে যেতে ইশারা করলো। ছেলেটা এবার নির্ভয়ে ইলাইয়ের সঙ্গে চলে গেল।

ওরা চোখের আড়ালে চলে যেতেই রুবেন কফির মগটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। বলল, &quot;বস, ছেলেটাকে কোথায় পেলেন?&quot;

লারসেন সংক্ষেপে পুরো ঘটনাটা বলল। সেলুনের সামনে মাতালদের হাতে অপদস্থ হওয়ার কথা, ছেলেটার ক্ষুধার্ত চেহারা, আর তাকে খাবার খাওয়ানোর কথা।

সবাই চুপচাপ শুনল। শুধু ক্লে মরগানের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না।

কথা শেষ হতেই সে শান্ত গলায় বলল, &quot;একজন হাফ ব্রীডকে বাড়িতে তুলে আনা কি ঠিক হলো?&quot;

ঘরের ভেতর মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এল। হ্যাঙ্ক ধীরে ধীরে কফির মগটা নামিয়ে রাখল। মিগুয়েল চোখ তুলে লারসেনের দিকে তাকাল। রুবেনও অপেক্ষা করতে লাগল, লারসেন কী বলে তা শোনার জন্য।

লারসেন তাড়াহুড়ো করে উত্তর দিল না। জানালার বাইরে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলল, &quot;ও একটা বাচ্চা ছেলে।&quot;

ক্লে মাথা নাড়ল। &quot;আজ হয়তো বাচ্চা। কিন্তু, পাঁচ বছর পর এরকম থাকবে না।&quot;

লারসেন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। &quot;তো?&quot;

ক্লে একটু গলা পরিষ্কার করল। &quot;হাফ ব্রীডদের আমি চিনি, বস। ওরা কোনো দিকেরই হয় না। শ্বেতাঙ্গরা ওদের বিশ্বাস করে না। ইন্ডিয়ানরাও না। শেষে নিজের সুবিধা যেখানে, সেদিকেই যায়।&quot;

লারসেনের মুখের ভাব বদলাল না। সে শুধু জিজ্ঞেস করল, &quot;তুমি কি ওকে চেনো?&quot;

&quot;না।&quot;

&quot;তাহলে আগে মানুষটাকে চিনে নাও। তারপর বিচার কোরো।&quot;

ক্লে আর কিছু বলল না। কিন্তু তার মুখ দেখে বোঝা গেল, সে কথাগুলো মেনে নেয়নি।

ঠিক তখনই করিডোর থেকে একটা শব্দ ভেসে এল। সবাই ঘুরে তাকাল। 

ইলাই ধীরে ধীরে হাঁটছে। তার পাশে মারদেকা। কিন্তু এই ছেলেটাকে যেন আর চেনাই যাচ্ছে না।

মুখ থেকে ধুলো ময়লা ধুয়ে গেছে। লম্বা কালো চুল ভেজা অবস্থায় পেছনে আঁচড়ে দেওয়া। গায়ে পরিষ্কার নীল শার্ট। কোমরে চামড়ার বেল্ট। বাদামি প্যান্টটার ঝুল একটু ছোট হলেও বাদামী মোজার সাথে মিশে গেছে বলে খারাপ লাগছে না। পায়ে ছোট্ট একজোড়া বুট।

মুহূর্তের জন্য ঘরে উপস্থিত সবাই নির্বাক হয়ে গেল। রুবেন বিস্ময়ে শিস দিয়ে উঠল। হ্যাঙ্কের মুখেও হাসি ফুটল।

মিগুয়েল মৃদু স্বরে বলল, &quot;এ তো একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেছে। একদম চেনাই যাচ্ছে না।&quot;

শুধু ক্লে কোনো মন্তব্য করল না। সে শুধু স্থির চোখে মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল।

লারসেন ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ছেলেটার সামনে গিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখল। তারপর ইলাইয়ের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে করে বলল, &quot;ভালো হয়েছে।&quot;

ইলাইয়ের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। বৃদ্ধ প্রায় ত্রিশ বছর ধরে এই বাড়িতে কাজ করছে। লারসেনের মুখে দুটো প্রশংসার কথা শোনা তার কাছে বিরল ঘটনা।

ঠিক সেই সময় রান্নাঘর থেকে ভেসে এল ভাজা মাংসের গন্ধ। ইলাই বলল, &quot;রাতের খাবার তৈরি।&quot;

লারসেন মাথা নেড়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। মারদেকা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে না, এত বড় টেবিলে সে বসবে কোথায়? পুরোটাই খাবারের প্লেট দিয়ে ভরা।

যেন ওর মনের কথাটা বুঝতে পেরেই ওলফ লারসেন পেছন ফিরে ওর দিকে তাকাল। 
তারপর সে নিজে টেবিলে তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারটা টেনে বসে পড়লো। মারদেকাকে তার ডান পাশের খালি চেয়ারটার দিকে হাত দিয়ে ইশারা করে বললো, &quot;এখানে বসো।&quot;

ঘরের ভেতর উপস্থিত পাঁচজন মানুষই এবার একসঙ্গে মারদেকার দিকে তাকাল।

ছেলেটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার মুখে দ্বিধা, চোখে বিস্ময়। চেয়ারটার সামনে এসে থেমে গেল। বিকেলে সেলুনে টুলের ওপর বসতে গিয়ে যেভাবে সবার হাসির পাত্র হয়েছিল, ঘটনাটা এখনো তার মনে তাজা। তাই এবার সে খুব সাবধানে চেয়ারটার দিকে তাকাল। হাত বাড়িয়ে একবার পিঠ ছুঁয়ে দেখল। তারপর ধীরে ধীরে বসতে গেল। শরীরের ভার ঠিকমতো সামলাতে না পেরে চেয়ারটা সামান্য দুলে উঠল। ছেলেটা চমকে আবার উঠে দাঁড়াল। মনে হলো, বুঝি এবারও পড়ে যাবে।

রুবেনের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছিল। কিন্তু লারসেনের উপস্থিতিতে সেটা আর বাইরে এল না।

ইলাই এগিয়ে এসে চেয়ারটা শক্ত করে ধরে রাখল। তারপর হাতের ইশারায় আবার বসতে বলল।

এবার খুব সাবধানে বসে পড়ল মারদেকা। দু&#039;হাত দিয়ে চেয়ার আঁকড়ে ধরে এমনভাবে বসে রইল, যেন একটু নড়লেই সেটা উল্টে যাবে।

ইলাই একে একে সবার সামনে খাবার সাজিয়ে দিতে লাগল। ধোঁয়া ওঠা গরুর মাংস, সেদ্ধ আলু, বিনস, মাখন মাখানো রুটি আর বড় একটা পাত্রে গাঢ় গ্রেভি। শেষে কফির পটটা টেবিলের মাঝখানে রেখে সবার মগ ভরে দিল।

মারদেকা খাবারের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্ষুধায় তার পেট মোচড় দিচ্ছে। কিন্তু কেউ খাওয়া শুরু না করায় সেও হাত বাড়াতে সাহস পেল না। এ রকম নিয়ম তার অজানা, তবু অন্যদের দেখে বুঝে নিয়েছে, আগে অপেক্ষা করতে হয়।

লারসেন চারপাশে একবার তাকিয়ে নিজের প্লেটের দিকে হাত বাড়াল। সঙ্গে সঙ্গে বাকিরাও খাওয়া শুরু করল।

মারদেকা কিছুক্ষণ তাদের দেখল। প্রত্যেকে ছুরি আর কাঁটা দিয়ে মাংস কেটে খাচ্ছে। সে দ্বিধাভরে নিজের সামনে রাখা ছুরিটা হাতে নিল। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখল। তারপর কাঁটাচামচটা হাতে নিয়ে মাংসে গেঁথে কাটতে গেল। মাংস কাটার বদলে পুরো প্লেটটাই প্রায় টেবিল থেকে পড়ে যাচ্ছিল।

হ্যাঙ্ক তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে প্লেটটা সামলে দিল। মারদেকা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।

লারসেন শান্তভাবে সবকিছু দেখছিল। সে নিজের প্লেট থেকে একটা রুটির টুকরো ছিঁড়ে হাতে নিল। তারপর ছুরি-কাঁটা সরিয়ে রেখে হাত দিয়েই মাংস ছিঁড়ে খেতে শুরু করল।

ঘরে বসে থাকা চারজনই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। ওলফ লারসেনকে কেউ কোনোদিন হাত দিয়ে খেতে দেখেনি।

লারসেন কোনো দিকে না তাকিয়েই বলল, &quot;ও যেভাবে পারে, সেভাবেই খাবে।&quot; কথাটা আর কারও উদ্দেশে নয়, যেন পুরো ঘরের জন্যই বলা।

মারদেকা বুঝতে পারল না কথার মানে। কিন্তু লারসেনকে হাত দিয়ে খেতে দেখে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সেও সঙ্গে সঙ্গে দু&#039;হাতে রুটি ছিঁড়ে মাংস তুলে খেতে শুরু করল।

মিগুয়েল মৃদু হেসে মাথা নিচু করল। হ্যাঙ্ক নিজের প্লেটেই মন দিল। রুবেন একবার লারসেনের দিকে তাকিয়ে আবার খেতে শুরু করল। 

শুধু ক্লে মরগানের চোখ দুটো সরু হয়ে এল। সে বুঝতে পারছিল, ব্যাপারটা শুধু দয়া নয়। ওলফ লারসেন নিজের আচরণ দিয়ে ছেলেটাকে অপমানের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। এ কাজ সে খুব কম মানুষের জন্যই করে। তারমানে ছেলেটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টা তার পছন্দ হলো না।

খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। ঠিক তখন বাইরে উঠোনে একটা ঘোড়া এসে থামার শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে সবাই মাথা তুলে তাকাল।

এত রাতে সাধারণত কেউ আসে না। ইলাই দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

দরজা খুলতেই দেখা গেল, একজন অশ্বারোহী ঘোড়া থেকে নেমে দ্রুত বারান্দায় উঠে আসছে। ধুলোয় ঢাকা চেহারা। হাঁপাচ্ছে। অনেকটা পথ না থেমে ছুটে এসেছে বোঝাই যাচ্ছে।

লোকটা ঘরে ঢুকেই টুপি খুলল। লারসেন তাকে চিনল। সে উত্তর দিকের র&#x200d;্যাঞ্চের কর্মচারী।

লোকটা শ্বাস সামলে বলল, &quot;বস... খারাপ খবর আছে।&quot;

টেবিলে বসে খেতে থাকা সবারই হাত থেমে গেল। 

লারসেন ধীরে ধীরে কফির মগটা নামিয়ে রাখল। তার চোখ স্থির। &quot;বলো।&quot;

লোকটা একবার ঘরের সবাইকে দেখে নিল। তারপর নিচু গলায় বলল, &quot;উত্তরের চর থেকে তিনটা দুধেল গাভী নেই।&quot;

ক্লে সঙ্গে সঙ্গে বলল, &quot;নেকড়ে?&quot;

লোকটা মাথা নাড়ল। &quot;না।&quot;

&quot;ইন্ডিয়ান?&quot;

&quot;তাও মনে হয় না।&quot;

ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। লারসেন এবার চেয়ারে হেলান না দিয়ে সোজা হয়ে বসল। &quot;তাহলে?&quot;

লোকটা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, &quot;যে চিহ্ন দেখেছি... তাতে মনে হচ্ছে কাজটা পেশাদার গরু চোরের।&quot;

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। ফায়ারপ্লেসের আগুন তখনও টুকটুক করে জ্বলছে।

আর টেবিলের এক কোণে বসে মারদেকা বিস্মিত চোখে একবার একজনের দিকে, একবার আরেকজনের দিকে তাকিয়ে আছে। লোকগুলোর মুখের ভাষা সে বুঝতে পারে না, কিন্তু তাদের চোখের চাহনি দেখে সে বুঝতে পারল, খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা ঘটেছে।

ঘরের ভেতর আর কেউ কথা বলল না। আগুনের শিখাগুলো ফায়ারপ্লেসের ভেতর টুকটুক করে জ্বলছে। বাইরে হালকা বাতাসে ওক গাছের ডালপালা দুলছে। কফির মগ থেকে ধোঁয়া উঠছে, কিন্তু কারও হাতে আর সেটা উঠল না।

ওলফ লারসেন কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইল। যেন খবরটা শুনে সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে মনে মনে সব হিসাব মিলিয়ে নিচ্ছে। এই স্বভাবটা তার পুরোনো। কোনো খবর শুনেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে না। আগে ভাবে, তারপর কথা বলে। অবশেষে সে মাথা তুলল। বলল, &quot;কবে বুঝতে পেরেছ?&quot;

লোকটা উত্তর দিল, &quot;ঘণ্টাখানেক আগে। সন্ধ্যার পর চর ঘুরতে গিয়ে দেখি গরুগুলো নেই।&quot;

&quot;পায়ের দাগ?&quot;

&quot;অনেকগুলো।&quot;

&quot;কতজন?&quot;

&quot;ঠিক বুঝতে পারিনি। তবে তিনজনের কম হবে না।&quot;

লারসেন আবার চুপ করে গেল।

ক্লে মরগান এবার বলল, &quot;এখনই বেরোই, বস। রাত বেশি হয়নি। ভাগ্য ভালো থাকলে ভোরের আগে ধরে ফেলতে পারব।&quot;

মিগুয়েলও মাথা নেড়ে সায় দিল। &quot;আমি পথ চিনে নিতে পারব।&quot;

কিন্তু লারসেন মাথা নাড়ল। &quot;না।&quot;

একটা শব্দেই সবাই থেমে গেল।

ক্লে অবাক হয়ে তাকাল। &quot;কিন্তু বস...&quot;

লারসেন শান্ত গলায় বলল, &quot;অন্ধকারে তাড়া করতে গেলে আমরাই বিপদে পড়বো। আর ওরাও সেটাই চাইবে। আগে থেকেই যদি জায়গা বেছে নিয়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখে, তাহলে ওদের আ্যম্বুশে পড়ে আমাদের লোকই মরবে।&quot;

ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল। ক্লে বুঝল, যুক্তিটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

লারসেন বলল, &quot;ভোর হতেই বেরোবে।&quot; সে এবার মিগুয়েলের দিকে তাকাল। &quot;তুমি পথ দেখবে।&quot;

মিগুয়েল মাথা নেড়ে বলল, &quot;ঠিক আছে।&quot;

&quot;ক্লে, তুমিও যাবে।&quot;

&quot;জি।&quot;

&quot;রুবেন আর হ্যাঙ্কও যাবে।&quot;

দু&#039;জনেই সম্মতি জানাল।

লারসেন আবার খবর নিয়ে আসা লোকটার দিকে তাকাল। &quot;ঘোড়াটা খুলে রাখো। খেয়ে ঘুমাও। ভোরে আবার বেরোতে হবে।&quot;

লোকটা টুপি হাতে নিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বাইরে চলে গেল। 

দরজা বন্ধ হতেই ইলাই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। &quot;আজ আর খাওয়া হবে না মনে হচ্ছে।&quot;

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। &quot;হবে। খালি পেটে কাউকে কাজে পাঠানো যায় না।&quot;

ইলাই আর কিছু বলল না। উঠে গিয়ে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবার আবার গরম করতে লাগল।

এইসব কথাবার্তার কিছুই বুঝতে পারছিল না মারদেকা। সে শুধু লক্ষ্য করছিল, খবরটা আসার পর থেকেই ঘরের প্রত্যেকটা মানুষের মুখ বদলে গেছে। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে হাসি ছিল, সেখানে এখন কঠিন গাম্ভীর্য।

সে আস্তে করে লারসেনের দিকে তাকাল। লোকটার মুখে কোনো ভয় নেই। কোনো অস্থিরতাও নেই। যেন এমন ঘটনা তার জীবনে নতুন নয়।

কিছুক্ষণ পর সবাই আবার চুপচাপ খাওয়া শেষ করল। তারপর একে একে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

ক্লে নিজের বন্দুকের বেল্ট কোমরে বাঁধতে বাঁধতে একবার মারদেকার দিকে তাকাল। চোখে সেই একই ঠান্ডা দৃষ্টি। তারপর কোনো কথা না বলেই দরজার দিকে হাঁটল।

রুবেন বিদায়ের সময় ছেলেটার মাথায় আলতো করে হাত রেখে বেরিয়ে গেল।

মিগুয়েল কোমরের থলি থেকে আরেকটা শুকনো আপেল বের করে তার হাতে দিল। এবার মারদেকা হেসে ফেলল। ভাষা আলাদা হলেও এই মানুষটার মমতা সে বুঝতে শিখেছে।

হ্যাঙ্ক শুধু মাথা নেড়ে বাইরে চলে গেল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই চারটে ঘোড়ার খুরের শব্দ রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বাড়িটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল।

ইলাই তখন একটা কেরোসিনের বাতি হাতে নিয়ে ফিরে এল। লারসেনের দিকে তাকিয়ে বলল, &quot;ছেলেটার শোবার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।&quot;

লারসেন মাথা নাড়ল। &quot;কোথায়?&quot;

&quot;আমার ঘরের পাশের ছোট কক্ষটায়।&quot; 

&quot;ভালো।&quot;

ইলাই মারদেকার কাছে গিয়ে হাতের ইশারায় তাকে ডাকল। মারদেকা যাওয়ার আগে একবার লারসেনের দিকে তাকাল।

ওলফ লারসেন চেয়ারে বসেই ছিল। তারপর খুব আস্তে মাথা নেড়ে তাকে যেতে বলল।
ছেলেটা ইলাইয়ের পিছু নিল। 

করিডোর পেরিয়ে ছোট্ট একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল তারা। ঘরটায় একটা কাঠের খাট, পরিষ্কার বিছানা, জানালার পাশে ছোট্ট টেবিল আর দেয়ালে ঝোলানো একটা লণ্ঠন। এত পরিষ্কার ঘরে সে কোনোদিন থাকেনি।

ইলাই বিছানার দিকে আঙুল দেখিয়ে হাসল। মারদেকা ধীরে ধীরে খাটের কাছে এগিয়ে গেল। হাত দিয়ে নরম কম্বলটা ছুঁয়ে দেখল। তারপর সাবধানে বসে পড়ল। এত নরম বিছানায় শরীর ডুবে যেতেও পারে, সেটা তার জানা ছিল না।

ইলাই লণ্ঠনের আলো একটু কমিয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। একবার ফিরে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তারপর দরজাটা আস্তে করে টেনে বন্ধ করে দিল।

বাইরে তখন গভীর রাত। দূরে কোথাও একা একটা কোয়োটে ডাকছে।

মারদেকা কম্বলটা গায়ে টেনে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করার আগমুহূর্তে তার মনে পড়ল পাহাড়ের ওপারের ছোট্ট সেই গ্রামটার কথা। মায়ের কথা। আগুনের পাশে বসে শোনা শহরের গল্পগুলোর কথা।

সেই গল্পের শহরেই আজ তার প্রথম রাত। সে জানে না আগামীকাল তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। শুধু এটুকু জানে, তিন দিন আগে যে ছেলেটা একা একা পাহাড় পেরিয়ে অজানা পথ ধরেছিল, সেই ছেলেটার জীবন আজ নিঃশব্দে অন্য এক পথে মোড় নিতে শুরু করেছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/259142/</link>
				<pubDate>Sat, 01 Aug 2026 05:56:04 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়-দুই<br />
রকডাস্ট সেলুন থেকে বেরিয়েই ওলফ লারসেন থামল না। ধীর পায়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। মারদেকাও কোনো কথা না বলে তার পিছু পিছু চলল। শহরের রাত তখন পুরোপুরি নেমে এসেছে। রাস্তার দু&#8217;পাশে কাঠের খুঁটির মাথায় ঝোলানো কেরোসিনের বাতিগুলো হলদে আলো ছড়িয়ে নিস্তব্ধ পরিবেশটাকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে। দিনের ভিড় নেই&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-259142"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/259142/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>1</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">9b703d2fa9ff7c9a1642d1641ef99f0a</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়-এক
তিন দিন ধরে পাহাড় ডিঙিয়ে, জঙ্গল পেরিয়ে, শুকনো প্রেইরি আর পাথুরে উপত্যকার ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছে ছেলেটা। প্রথম দিনটা কেটে গিয়েছিল উৎসাহে, দ্বিতীয় দিনটা কষ্টে, আর তৃতীয় দিনে এসে শরীরের সমস্ত শক্তি যেন ফুরিয়ে গিয়েছিল। পথে দু&#039;একটা ঝরনা না পেলে তৃষ্ণাতেই হয়তো মরতে হতো তাকে। ক্ষুধা লাগলে কখনও বুনো ওল খুঁড়ে খেয়েছে, কখনও পাথর ছুড়ে ধেড়ে ইঁদুর মেরে পেট ভরিয়েছে। 

সারা জীবন সে পাহাড়ের ওপারের ছোট্ট ইন্ডিয়ান গ্রাম ছাড়া আর কিছু দেখেনি। গ্রামের বয়স্করা মাঝে মাঝেই আগুন জ্বেলে বসে শহরের গল্প করত। সেখানে নাকি কাঠের দোতলা বাড়ি আছে, ঘোড়ার গাড়ি আছে, রাতেও দিনের মতো আলো জ্বলে, দোকানে ইচ্ছে করলেই খাবার পাওয়া যায়। এসব গল্প শুনে শুনেই তার মনে একদিন শহর দেখার নেশা চেপে বসে। শেষ পর্যন্ত কাউকে কিছু না বলে এক গভীর রাতে গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সে। কোথায় যাবে, কত দূর যেতে হবে, শহরের মানুষ তাকে আপন করে নেবে কি না, এসব নিয়ে একবারও ভাবেনি। শুধু জানত, পাহাড়ের ওপারে একটা অন্য পৃথিবী আছে, সেই পৃথিবীটা একবার নিজের চোখে দেখতেই হবে।

সকালের দিকে ব্ল্যাক রিভার শহরে পৌঁছে সে প্রথমে ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। এত মানুষ, এত ঘোড়া, এত শব্দ সে জীবনে কখনও একসঙ্গে শোনেনি। কেউ তাকে লক্ষ্যও করছিল না। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত। অনেকক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে সে একটা ঘোড়ার আস্তাবলের কাছে গিয়ে ওয়াটারিং ট্রাফ থেকে পেট ভরে পানি খেল। তারপর স্টেবল হ্যান্ডের চোখ এড়িয়ে খড়ের একটা বড় গাদার ভেতর ঢুকে শুয়ে পড়ল। তিন দিনের ক্লান্তি এমনভাবে তাকে গ্রাস করেছিল যে, মুহূর্তের মধ্যেই গভীর ঘুম নেমে এলো চোখে। ঘুম ভাঙল যখন, তখন সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। শহরের ওপর সন্ধ্যার ছায়া নেমে এসেছে। ক্ষুধা আবার পেটের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। খড়ের গাদা থেকে বেরিয়ে সে গন্ধের টানেই হাঁটতে শুরু করল। ভাজা মাংসের সেই গন্ধ যেন তাকে টেনে নিয়ে এলো শহরের সবচেয়ে জমজমাট জায়গাটায়।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে রকডাস্ট সেলুন। দু&#039;পাশে কেরোসিনের বাতি জ্বলছে। কাঠের বারান্দায় কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে গল্প করছে। দরজার সামনে বাঁধা আছে কয়েকটা দামি ঘোড়া। ভেতর থেকে ভেসে আসছে পিয়ানোর সুর, মানুষের হাসি, মদের গ্লাসের টুংটাং শব্দ আর মেয়েদের খিলখিল হাসি। ছেলেটা ধীরে ধীরে মাথা তুলে জানালার স্বচ্ছ কাচ গলে ভেতরে তাকাল। ড্যান্সফ্লোর ইতিমধ্যে জমে উঠেছে। কতকগুলো সুন্দরী মহিলা একে অন্যের কোমর জড়িয়ে দল বেঁধে নাচছে। পুরুষেরা যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা টেবিল দখল করে বসে আছে। কারও হাতে মদের গ্লাস, কেউ মাতাল হয়ে খিস্তি আউড়াচ্ছে, কেউ আবার নাচনেওয়ালীদের হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছে। এইসব কিছু তার কাছে রূপকথার মতো মনে হলো। জীবনে প্রথমবার এমন দৃশ্য দেখে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ক্ষুধার জ্বালা পর্যন্ত যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল সে।

ছেলেটার নাম মারদেকা। বয়স বারোর বেশি নয়। সে একজন হাফ ব্রীড ইন্ডিয়ান। তার মা ছিল পাহাড়ের ওপারের এক ইন্ডিয়ান গোত্রের মেয়ে। বাবা ছিল একজন শ্বেতাঙ্গ। লোকটাকে সে কখনও দেখেনি। শুধু মায়ের মুখে শুনেছে, বহু বছর আগে এক শিকারি তাদের এলাকায় এসেছিল। কয়েক মাস থাকার পর একদিন চলে যায়। তারপর আর কখনও ফিরে আসেনি। সেই থেকেই গ্রামের লোকেরা মারদেকাকে নিজেদের একজন বলে মেনে নিতে পারেনি। কেউ তাকে শ্বেতাঙ্গ বলত না, আবার ইন্ডিয়ান বলেও স্বীকার করত না। ছোটবেলা থেকেই সে একঘরে হয়ে বড় হয়েছে। তাই গ্রামের প্রতি তার টানও খুব বেশি ছিল না।

ঠিক সেই সময় পেছন থেকে একটা গলা ভেসে এলো। লোকটা বলল, &quot;দে দোন্দে বিনো এস্তে তাপার্রাবোস?&quot; 

কথাটার মানে মারদেকা বুঝল না। কিন্তু গলার ভঙ্গি শুনেই বুঝে গেল, তাকে নিয়েই হাসাহাসি হচ্ছে। সে ঘুরে দাঁড়াতেই চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মাতাল লোক তার দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। একজন এগিয়ে এসে তার কোমরে জড়ানো নেংটির মতো পোশাকটা ধরে টান দিল। আরেকজন হাত বাড়িয়ে তার এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে দিল যেন কোনো অদ্ভুত জন্তু দেখছে।

মারদেকা বিপদ বুঝতে পেরে দৌড়ে পালাতে গেল। কিন্তু দু&#039;পা যাওয়ার আগেই পাশ থেকে একটা মোটা হাত তাকে জাপটে ধরল। পরমুহূর্তেই সে মাটি থেকে ওপরে উঠে গেল। লোকটা কোমর জড়িয়ে তাকে বাতাসে তুলে নিয়েছে। মারদেকা প্রাণপণে হাত-পা ছুড়তে লাগল। মুখ দিয়ে তার সেই অচেনা চি হি শব্দ বেরোতে লাগল। সে আঁচড় কাটল, কামড়াতে গেল, কিন্তু মাতাল লোকটার শক্তির সাথে পেরে উঠলো না। 

চারপাশের লোকগুলোর হাসির শব্দে যেন গোটা রাস্তা কেঁপে উঠল। কেউ হাততালি দিচ্ছে, কেউ আবার টুপি খুলে শূন্যে ঘুরিয়ে চিৎকার করছে। মাতাল লোকটা মারদেকাকে দুহাতে মাথার ওপর তুলে ধরে যেন অদ্ভুত কোনো জানোয়ারের প্রদর্শনী করছে। ছেলেটা প্রাণপণে হাত-পা ছুড়ছে। তার মুখ দিয়ে একটার পর একটা বিজাতীয় চি হি শব্দ বেরিয়ে আসছে। চোখ দুটো ভয় আর অপমানে লাল হয়ে উঠেছে। এত মানুষের সামনে তাকে নিয়ে যে হাসাহাসি হচ্ছে, তার কারণ সে ঠিক বুঝতে না পারলেও এটুকু বুঝতে পারছিল, এরা তাকে মানুষ বলে গণ্য করছে না।

ঠিক সেই সময় সেলুনের ব্যাটউইং দরজা দুটো ধীরে ধীরে খুলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে ভেতরের আলো বাইরে এসে ছড়িয়ে পড়ল। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে হাসির শব্দটা যেন আচমকাই থেমে গেল। যে লোকটা মারদেকাকে মাথার ওপর তুলে ধরেছিল, সেও ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।

ওলফ লারসেন। লোকটার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। কিন্তু চেহারায় বয়সের ছাপ খুব বেশি নেই। লম্বা, চওড়া বুক, মোটা কাঁধ। মাথাভর্তি ধূসর চুল সুন্দর করে আঁচড়ানো। ঠোঁটের ওপর ঘন গোঁফ। কালো কোটের নিচে ধবধবে সাদা শার্ট। কোমরে নিচু হয়ে ঝুলছে হাতির দাঁতের বাঁটওয়ালা দুইটা কোল্ট। তার চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত চোখের ভেতর এমন একটা কঠোরতা ছিল, যার সামনে ব্ল্যাক রিভারের সবচেয়ে মাতাল লোকটাও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

লারসেন শহরে শুধু ধনী মানুষ বলেই সম্মান পায় না। তার কথার দাম আছে। বিচারবুদ্ধি আছে। প্রয়োজন হলে সে যেমন মানুষকে সাহায্য করে, তেমনি অন্যায় করলে নিজের লোককেও ছাড় দেয় না। এই শহরের বহু ব্যবসা তার হাতে চলে। র&#x200d;্যাঞ্চ আছে, গরুর পাল আছে, কাঠের মিল আছে। শহরের শেরিফ পর্যন্ত তার সঙ্গে কথা বলার সময় ভেবেচিন্তে কথা বলে।

সে একবার চারপাশে তাকাল। তারপর শান্ত গলায় বলল, &quot;ছেলেটাকে ছেড়ে দাও।&quot;

কথাটা খুব আস্তে বলা হয়েছিল। অথচ যেন বন্দুকের গুলির চেয়েও বেশি জোরে গিয়ে লাগল উপস্থিত সবার কানে। মাতাল লোকটা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। তাড়াতাড়ি মারদেকাকে ছেড়ে দিল। 

ধপ করে ধুলোয় পড়ে গেল ছেলেটা। সে সঙ্গে সঙ্গে গুটিসুটি মেরে বসে নিজের কোমরের সরে যাওয়া নেংটিটা ঠিক করতে লাগল। তারপর মাথা নিচু করে বসে রইল। মনে হলো, আবার কেউ হয়তো তাকে ধরে ফেলবে।

লারসেন ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এল। এক হাঁটু ভেঙে নিচু হয়ে বসল। কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। এত কাছ থেকে ছেলেটাকে দেখে সে বুঝল, ছেলেটা সাধারণ ইন্ডিয়ান নয়। চোখের রং, মুখের গড়ন, কাঁধের হাড়, সবকিছুতেই শ্বেতাঙ্গ রক্তের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু গায়ের রং, চুল আর চাহনিতে আবার ইন্ডিয়ানদের বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। হাফ ব্রীড। এক নজরেই বুঝে গেল সে।

মারদেকা ভয় পাওয়া হরিণশাবকের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার চোখে বিদ্রুপ নেই, রাগ নেই। এমন দৃষ্টি সে আগে কখনও দেখেনি।

লারসেন মৃদু হেসে বলল, &quot;ভয় পেয়ো না। কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করবে না।&quot;

মারদেকা কথাটা বুঝল না। কিন্তু গলার স্বরটা বুঝল। এই মানুষটা অন্যদের মতো নয়।

লারসেন হাত বাড়িয়ে দিল। ছেলেটা একটু ইতস্তত করল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে দিল। লারসেন এক টানে তাকে দাঁড় করিয়ে দিল।

উপস্থিত লোকগুলো নিঃশব্দে সবকিছু দেখছে। তাদের অনেকেরই কৌতূহল হচ্ছে। একটা নেংটি পরা হাফ ব্রীড ছেলের জন্য শহরের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষটা এত মাথা ঘামাচ্ছে কেন?

লারসেন চারদিকে একবার তাকাল। তার চোখ যাদের ওপর পড়ল, তারা সবাই চোখ নামিয়ে নিল।&quot;আর কেউ ওকে বিরক্ত করবে না।&quot;

কেউ কোনো উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও ছিল না। ওলফ লারসেনের কথা ব্ল্যাক রিভারে আদেশের মতোই মানা হয়।

সে ঘুরে সেলুনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। দু&#039;পা গিয়ে থামল। পেছনে তাকাল। মারদেকা তখনও আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে। লারসেন হাত তুলে ইশারা করল। ”এসো।&quot;

ছেলেটা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর যেন অনেক ভেবে ধীরে ধীরে তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল।

ব্যাটউইং ঠেলে দু&#039;জনে সেলুনে ঢুকতেই ভেতরের কোলাহল কিছুটা থেমে গেল। পিয়ানোর সুর চলছে, মেয়েরা নাচছে, লোকজন মদ খাচ্ছে, কিন্তু প্রায় সবার চোখই এখন নতুন অতিথির দিকে।

এত নোংরা, ধুলোয় মাখা, আধা উলঙ্গ একটা ইন্ডিয়ান ছেলেকে কেউ কোনোদিন এই সেলুনে ঢুকতে দেখেনি।

মারদেকা বিস্ময়ে চারপাশে তাকাতে লাগল। মাথার ওপর ঝুলছে কাঁচের লণ্ঠন। দেয়ালে হরিণের শিং। এক কোণে পিয়ানো বাজাচ্ছে সাদা চুলের এক বুড়ো। মেয়েদের রঙিন পোশাক তার চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে গরম মাংস আর রুটির গন্ধ। তার পেট আবার মোচড় দিয়ে উঠল।

লারসেন নিজের চিরচেনা টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। লোকজন সরে গিয়ে রাস্তা করে দিল। সে চেয়ারে বসে মারদেকার দিকে তাকাল।

ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। কি করবে বুঝতে পারছে না। 

লারসেন পাশে রাখা একটা চেয়ার টেনে দেখিয়ে দিল, &quot;বসো।&quot;

মারদেকা চেয়ারটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর এমনভাবে নিচে বসে পড়ল, যেন চেয়ারটা নয়, মেঝেটাই তার বসার জায়গা।

কাছের কয়েকটা টেবিল থেকে চাপা হাসির শব্দ উঠল। লারসেন কিছু বলল না। ওয়েটারকে হাত তুলে ডাকল। 

ওয়েটার দৌড়ে এসে দাঁড়াল। লারসেন বলল, &quot;একটা কাঠের টুল নিয়ে এসো। আর রান্নাঘরে যা আছে, সবচেয়ে ভালো খাবারটা এই ছেলেটার সামনে দাও।&quot;

ওয়েটার মাথা নেড়ে চলে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই একটা মজবুত কাঠের টুল এনে রাখা হলো।

লারসেন নিজে উঠে দাঁড়িয়ে মারদেকাকে ইশারা করল। বলল, &quot;এখানে বসো।&quot;

ছেলেটা এবার বুঝল। ধীরে ধীরে উঠে টুলের ওপর বসতে গেল। কিন্তু জীবনে কোনোদিন টুলে না বসার ফল যা হওয়ার তাই হলো। একদিকে বেশি ভর পড়তেই টুলটা কাৎ হয়ে গেল। ধড়াম করে আবার মেঝেতে পড়ে গেল সে।

এবার আর চাপা হাসি নয়। সারা সেলুন হো হো করে হেসে উঠল। কেউ বলল, &quot;নেংটো জংলি!&quot; আরেকজন বলল, &quot;আগে বসা শিখে আয়!&quot;

মারদেকা লজ্জায় মাথা নিচু করে মেঝেতে বসে রইল। 

ওলফ লারসেনের মুখে কোনো হাসি ফুটল না। সে ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর নিচু হয়ে দুহাতে মারদেকাকে তুলে নিল। যেন ছোট্ট একটা শিশুকে কোলে তোলা হয়।

সারা সেলুন নিঃশব্দ হয়ে গেল। লারসেন কোনো কথা না বলে তাকে নিজের টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। তারপর শান্তভাবে নিজের চেয়ারে ফিরে বসল।

ওয়েটারও ঠিক সেই সময় ধোঁয়া ওঠা ভাজা মাংস, সসেজ, রুটি আর এক মগ দুধ এনে মারদেকার সামনে নামিয়ে রাখল। খাবারের গন্ধ নাকে যেতেই ছেলেটার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। 

সারা সেলুন তখন অদ্ভুত এক নীরবতায় ডুবে আছে। একটু আগেও যেখানে হাসি, চিৎকার আর মাতালের উল্লাসে কান পাতা দায় হয়ে উঠেছিল, সেখানে এখন কেবল পিয়ানোর মৃদু সুর আর প্লেটের সঙ্গে ছুরিকাঁটার ঠোকাঠুকির শব্দ শোনা যাচ্ছে। সবাই যে যার জায়গায় বসে আছে ঠিকই, কিন্তু চোখের কোণে কোণে একই কৌতূহল। ওলফ লারসেনের মতো মানুষ একটা নেংটি পরা হাফ ব্রীড ছেলেকে নিজের টেবিলের ওপর বসিয়ে খাওয়াচ্ছে, এমন দৃশ্য ব্ল্যাক রিভারের কেউ কোনোদিন দেখেনি।

মারদেকা এসবের কিছুই বুঝতে পারছিল না। তার সামনে ধোঁয়া ওঠা ভাজা মাংস, মোটা সসেজ, এক টুকরো রুটি আর দুধের মগ। এত খাবার সে একসঙ্গে জীবনে কখনো দেখেনি। প্রথমে সাবধানে একটা মাংসের টুকরো তুলে শুঁকল। তারপর দাঁত বসাতেই চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। এমন স্বাদ তার কাছে একেবারে নতুন। পরের মুহূর্তেই আর কোনো ভদ্রতার বালাই রইল না। দুহাতে খাবার তুলে গোগ্রাসে মুখে পুরতে লাগল। মাংসের রস তার থুতনি বেয়ে বুকের ওপর পড়ছে, রুটির টুকরো মেঝেতে গড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। মনে হচ্ছে, কেউ বুঝি এই বুঝি খাবারগুলো কেড়ে নেবে।

ওলফ লারসেন স্থির চোখে ছেলেটার খাওয়া দেখছিল। তার সামনে রাখা হুইস্কির গ্লাসে সে একবারও চুমুক দিল না। একসময় ওয়েটার চুপচাপ এসে খালি গ্লাসটা ভরে দিয়ে চলে গেল। লারসেন তখনও ছেলেটার দিকেই তাকিয়ে।

সেলুনের এক কোণে বসে থাকা মোটা গড়নের একজন কাউবয় আর থাকতে পারল না। চেয়ার ঠেলে উঠে ধীরে ধীরে লারসেনের টেবিলের কাছে এগিয়ে এলো। লোকটার নাম বাড হিগিন্স। শহরের প্রায় সবাই তাকে চেনে। বছর দশেক ধরে লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে কাজ করে। লোকটা খারাপ নয়, তবে মুখে যা আসে তাই বলে ফেলে।

বাড বলল, &quot;বস, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?&quot;

লারসেন চোখ তুলল। &quot;করো।&quot;

বাড ইতস্তত করে মারদেকার দিকে তাকাল, &quot;এই ছুঁচোটাকে নিয়ে কী করবেন?&quot;

সারা সেলুন আবার চুপ হয়ে গেল। অনেকেই কান খাড়া করল। লারসেনের চিবুক শক্ত হয়ে গেল। মুখের ভাব বদলে গেলেও সে উত্তর দিতে তাড়াহুড়ো করল না। টেবিলের ওপর আঙুল দিয়ে দুবার টোকা মেরে তারপর ধীরে ধীরে বলল, &quot;এখনো কিছু ভাবিনি।&quot;

বাড একটু হেসে ফেলল। &quot;হাফ ব্রীডদের বিশ্বাস নেই, বস। আজ আছে, কাল নেই। বড় হলে হয় চোর হবে, না হয় ডাকাত।&quot;

কথাটা শুনে কয়েকজন মাথা নেড়ে সায় দিল। 

লারসেনের মুখের ভাব বদলাল না। শান্তভাবে বলল, &quot;তোমার কথাও একসময় অনেকে এভাবেই বলত, বাড।&quot;

কথাটা শুনে বাডের মুখ শুকিয়ে গেল। সে জানে, কথাটা মিথ্যে নয়। বহু বছর আগে এই শহরে এসে সে নিজেও ছিল মাতাল আর ঝগড়াটে। লারসেনই তাকে কাজ দিয়েছিল। মানুষ হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল।

লারসেন আবার বলল, &quot;মানুষ খারাপ হয়ে জন্মায় না। সুযোগের অভাবে খারাপ হয়।&quot;

বাড আর কোনো কথা বলল না। মাথা নিচু করে নিজের টেবিলে ফিরে গেল।

এই সময় মারদেকা শেষ টুকরো রুটিটাও মুখে পুরে দুধের মগটা দুই হাতে তুলে এক নিঃশ্বাসে খালি করে ফেলল। তারপর মগটা নামিয়ে এমনভাবে চারদিকে তাকাল, যেন বুঝতে চাইছে এবার কী করতে হবে।

লারসেন নিজের প্লেটটা তার দিকে এগিয়ে দিল।জানতে চাইলো, &quot;আরও খাবে?&quot;

ছেলেটা কথাটা বুঝল না। কিন্তু প্লেটের দিকে তাকিয়েই অর্থ বুঝে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে না সূচক ইশারা করল। তার পেট ভরে গেছে।

লারসেন এবার প্রথমবারের মতো মৃদু হেসে উঠল। 

ঠিক তখনই সেলুনের মালিক কার্লোস এগিয়ে এল। মাঝবয়সী মেক্সিকান। মুখে সারাক্ষণ হিসেবি ভাব। লারসেনের কানের কাছে মুখ এনে নিচু গলায় বলল, &quot;মিস্টার লারসেন, লোকজন আপত্তি করছে।&quot;

লারসেন ভ্রু তুলল। 

কার্লোস আবার বলল, &quot;ছেলেটার গা থেকে খুব গন্ধ বেরোচ্ছে। মেয়েরা অভিযোগ করছে।&quot;

লারসেন শান্ত গলায় ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করল, &quot;তোমারও আপত্তি আছে?&quot;

কার্লোস অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মুখ কাচু-মাচু করে বলল, &quot;না... মানে... আমি শুধু তাদের কথাই বলছি।&quot;

লারসেন চেয়ার ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সেলুনের ভেতর আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সে একবার চারদিকে তাকাল। তারপর পরিষ্কার গলায় বলল, “একে নিয়ে যার আপত্তি আছে, সে আজ রাতের খাবার অন্য কোথাও গিয়ে খাবে। বিল আমি মিটিয়ে দেব।&quot;

কেউ কোনো কথা বলল না। নাচনেওয়ালীরা আবার নাচ শুরু করল। পিয়ানোও আগের মতো বাজতে লাগল। যেন কিছুই ঘটেনি।

কার্লোস বিব্রত মুখে মাথা নেড়ে সরে গেল। লারসেন আবার বসে পড়ল।

মারদেকা এবার তার দিকে তাকিয়ে আছে। এতক্ষণে সে বুঝেছে, এই মানুষটার উপস্থিতিতে কেউ তাকে আঘাত করতে সাহস পায় না। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই।

লারসেন কিছুক্ষণ ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে নিজের বুকের দিকে আঙুল দিয়ে বলল, &quot;ওলফ।&quot;

মারদেকা কিছু বুঝল না। 

লারসেন আবার নিজের বুকে হাত রাখল। বলল, &quot;ওলফ।&quot;

এবার মারদেকা বুঝল। লোকটা নিজের নাম বলছে।

সে নিজের বুকেও হাত রাখল। ধীরে ধীরে বলল, &quot;মা...র...দে...কা।&quot; শব্দগুলো একটু জড়ানো। তবু পরিষ্কার।

লারসেন মাথা নেড়ে নামটা মনে রাখল। বলল, &quot;মারদেকা।&quot;

ছেলেটার মুখে প্রথমবারের মতো হাসি ফুটল। এতক্ষণে সে বুঝল, অন্তত একজন মানুষ তার নামটা জানতে চেয়েছে। শুধু তাকে দেখে হাসেনি।

লারসেনের বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে উঠল। বহু বছর আগে তারও একটা ছেলে ছিল। মাত্র আট বছর বয়সে জ্বরে মারা যায়। তারপর আর কখনো সংসার করেনি সে। কাজ, ব্যবসা আর এই শহর নিয়েই জীবন কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই ক্ষুধার্ত, অসহায় ছেলেটার চোখে সে যেন বহু বছর আগের সেই শিশুটার ছায়া দেখতে পেল।

বাইরে তখন রাত পুরোপুরি নেমে এসেছে। সেলুনের জানালার বাইরে বাতাসে ধুলো উড়ছে। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল।

ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। মারদেকার দিকে ফিরে বলল, &quot;চলো।&quot;

মারদেকা কথাটা বুঝল না, কিন্তু ইশারা বুঝল। সে টেবিল থেকে নেমে লারসেনের পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করল। সেলুনের দরজা পেরিয়ে দু&#039;জনে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে এল।

রাস্তার দুই পাশে কেরোসিনের বাতিগুলো দুলছে। শহরের লোকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল, ব্ল্যাক রিভারের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষটা নিজের পাশে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ধুলোয় মাখা এক হাফ ব্রীড ছেলেকে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/259032/</link>
				<pubDate>Thu, 30 Jul 2026 06:46:50 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়-এক<br />
তিন দিন ধরে পাহাড় ডিঙিয়ে, জঙ্গল পেরিয়ে, শুকনো প্রেইরি আর পাথুরে উপত্যকার ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছে ছেলেটা। প্রথম দিনটা কেটে গিয়েছিল উৎসাহে, দ্বিতীয় দিনটা কষ্টে, আর তৃতীয় দিনে এসে শরীরের সমস্ত শক্তি যেন ফুরিয়ে গিয়েছিল। পথে দু&#8217;একটা ঝরনা না পেলে তৃষ্ণাতেই হয়তো মরতে হতো তাকে। ক্ষুধা লাগলে কখনও বুনো ওল&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-259032"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/259032/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">ee6d4eda7b0726cf1624bd88186cdd55</guid>
				<title>শোধ
(ওয়েস্টার্ণ গল্প)

জোনাথন হাক পেশায় একজন গিটার বাদক। রকডাস্ট হোটেলের সেলুনে গিটার বাজিয়ে গান গেয়ে জীবন নির্বাহ করে। তার বউ শার্লিন হাক একজন ওয়েটার। তারা দুজনেই ভালোবেসে বিয়ে করেছে। এক সাথে জীবিকা নির্বাহের দরুন তাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা বেশ। ফলে সংসার জীবনে তারা বেশ সুখী।

প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই রকডাস্ট হোটেলের সেলুনটা জমে উঠে। কাউন্টারের পেছনে বোতলের সারি, ধোঁয়ায় ঝাপসা বাতাস, মাতাল কাউবয়দের হাসি আর তাসের টেবিলে বাজির শব্দের মাঝেও জোনাথনের গিটারের সুর যেন আলাদা করে কানে বাজে। আর সেই সুরের ফাঁকেই টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরে বেড়ায় শার্লিন। ব্যস্ততার মাঝেও দুজনের চোখে চোখ পড়লে এক চিলতে হাসি বিনিময় হয়। সেই হাসিতেই যেন তাদের ছোট্ট সংসারের সমস্ত সুখ ভেসে উঠে।

একদিন তাদের হোটেল কাম সেলুনে এক পেশাদার বন্দুকবাজের আগমন ঘটে। তার চোখ পড়ে সুন্দরী শার্লিনের উপর। সে তাকে তার রুমে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করতে চায়। শার্লিন বাধা দিলে সে জোরাজুরি করে। এক পর্যায় সে চিৎকার করতে গেলে তার গলা চেপে ধরে মেরে ফেলে পালিয়ে যায়।

সেদিন জোনাথন দৌড়ে গিয়ে শুধু স্ত্রীর নিথর দেহটাই দেখতে পেয়েছিল। তার গিটারটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে সে তুলে নিয়েছিল শার্লিনের হাতু দুটো। ঠান্ডা হাত দুটো নিজের বুকে চেপে ধরে সে অনেকক্ষণ বসে ছিল। চোখে পানি ছিল না, ছিল শুধু পাথরের মতো নিশ্চুপ এক শূন্যতা। সেদিনই সে বুঝেছিল, পৃথিবীতে এমন কিছু ঋণ আছে, যা আদালত শোধ করতে পারে না। সেগুলো মানুষকে নিজের হাতেই শোধ করতে হয়।




অনেক বছর পর অন্য এক শহরে একটা সেলুনে একজন নাম না জানা আগন্তক আসে। সে উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে, “আমি একজনকে খুঁজছি।” পশ্চিমে এই কথার মানে হলো, তার সাথে পুরনো কোন হিসেব বাকী আছে।

কথাটা শুনেই সেলুনের ভেতরের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। তাসের টেবিলে বসা খেলোয়াড়রা হাত থামিয়ে নিশ্চুপ তাকিয়ে রয়। গ্লাস মুছতে মুছতে থেমে যায় বারটেন্ডারের হাত। বাতাসে হঠাৎ একটা চাপা উত্তেজনা জমে উঠে।

“তুমি তাকে চেনো?” কেউ একজন তাকে জিজ্ঞেস করে।

উত্তরে সে বলে, “না। তবে আমি তাকে খুঁজছি এটা জানার পর সে নিজেই আমাকে চিনে নেবে।”

এবার সবার মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়। সবাই এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে থাকে। আগন্তক ততক্ষণে সেলুনের বারের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তার কোমরে ডান পাশে ঝুলে থাকা হোলস্টারের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা পিস্তলের বাটটা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ওটার চকচকে ভাবটা সহজেই বুঝিয়ে দিচ্ছে পিস্তলটা সদ্য কেনা হয়েছে।

কেউ একজন খুব আস্তে করে বলে, “বন্দুকটা নতুন... কিন্তু লোকটার চোখ দুটো একদম পুরনো।” কথাটা শুনে কেউ আর উত্তর দেয় না।

“বাছা, তুমি কি আমাকে খুঁজছো?” 

লোকটা কখন এসে আগন্তকের পেছনে দাঁড়িয়েছে, কেউ খেয়ালই করেনি। সবার মনযোগ ছিল আগন্তকের প্রতি। তাই তার কথা বলার শান্ত ভাব আর পা ফাঁক করে দাঁড়ানোর ভঙ্গী উপস্থিত সবাইকে বুঝিয়ে দেয় শো-ডাউন আসন্ন। সবাই দ্রুত লাইন অব ফায়ার থেকে সরে দাঁড়ায়।

চেয়ারগুলো একপাশে সরিয়ে নেওয়া হয়। কয়েকজন দেয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। মুহূর্তের মধ্যে সেলুনের মাঝখানে ফাঁকা একটা বৃত্ত তৈরি হয়ে যায়। শুধু দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে মুখোমুখি।

আস্তে করে ঘুরে দাঁড়ায় আগন্তক। লোকটা তার থেকে মাপা দূরত্বে সেলুনের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা ঠেলে ভেতরে আসা রোদের চকচকে আলোর সামনে তাকে ছায়াময় বিভৎস দেখাচ্ছে। ঠোঁটের একটা কোণ বেঁকে উপরে উঠে আছে।

না, সে হাসছে না। ওটা একটা ক্ষতচিহ্ন, যা ঠোঁটের ফিনিশিং লাইনটাকে ঠেলে উপরে তুলে দিয়েছে। অনেক আগে একটা মেয়ের হাত থেকে ছুড়ে ফেলা মদের বোতলের ভাঙা কাঁচে লেগে কেটে যাওয়ায় ওটার সৃষ্টি হয়েছিল। ওকে চিনবার জন্য আগন্তকের ওই চিহ্নই যথেষ্ট।

এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে যায়। আগন্তকের চোখে কোনো রাগ নেই, কোনো উত্তেজনাও নেই। যেন বহু বছর ধরে আগলে রাখা একটা কাজ শেষ করতে এসেছে সে।

“ঠিক ধরেছ। আমি তোমাকেই খুঁজছি।” বলেই সে হাত ঠেলে দেয় হোলস্টারের দিকে। পরক্ষণেই হাঁটু গেড়ে বসে যায়। ধীরে সুস্থে পিস্তলটা হাতে নিয়ে লোকটার দিকে তাক করে।

সবাই দেখে সেলুনের মাঝখানে দাঁড়ানো লোকটা আগে পিস্তল ড্র করেছে। কিন্তু, বারের সামনে দাঁড়ানো আগন্তক সহসা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ায় তার ছোড়া গুলি পেছনের বারে আঘাত করে। একরাশ বোতল ভাঙার আওয়াজ শোনা যায়। মদের তীব্র গন্ধে মুহূর্তেই বাতাস ভারী হয়ে উঠে।

পরক্ষণেই আগন্তকের গুলি আঘাত করে লোকটাকে। বুক পেতে গুলিটা গ্রহণ করে সে। তারপর সটান শরীর উল্টে মেঝেতে পড়ে যায়।

সেলুনে নেমে আসে অস্বস্তিকর নীরবতা। শুধু ভাঙা বোতল থেকে গড়িয়ে পড়া মদের টুপটাপ শব্দ শোনা যায়।

আগন্তক এগিয়ে এসে পরে থাকা লোকটার মাথার কাছে দাঁড়ায়। 

“তুমি... তুমি......” বিস্ময়ে ককিয়ে উঠে লোকটা। তার মুখ ঠেলে রক্ত বেরিয়ে আসে।

আস্তে করে উবু হয় আগন্তক। তার কানের কাছে ফিসফিস করে উচ্চারণ করে, ”জোনাথন হাক।”

নামটা শুনেই চোখ বড়বড় হয়ে যায় লোকটার। যেন বহু বছর আগের একটা রাত সহসাই জীবন্ত হয়ে তার চোখের সামনে ফিরে আসে। মাথাটা উপরে উঠাতে চায় সে। পরক্ষণেই স্থির হয়ে যায়।

লোকটা মরে গেছে বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়ায় আগন্তক। একবার চারদিকে তাকায়। উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলে, “ওর কাছে আমার একটা ঋণ ছিল। তাই শোধ দিলাম।”

বলেই সমবেত লোকজনের ভেতর দিয়ে সেলুনের বাইরে বেরিয়ে যায় সে। কেউ তাকে থামানোর চেষ্টা করে না। কেউ কোনো প্রশ্নও করে না। পশ্চিমে সবাই জানে, কিছু হিসেব নিজেকেই মেটাতে হয়। একজন প্রকৃত পুরুষ মাত্রই তা করে।
(২৯ জুলাই, ২০২৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/258913/</link>
				<pubDate>Wed, 29 Jul 2026 06:22:17 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>শোধ<br />
(ওয়েস্টার্ণ গল্প)</p>
<p>জোনাথন হাক পেশায় একজন গিটার বাদক। রকডাস্ট হোটেলের সেলুনে গিটার বাজিয়ে গান গেয়ে জীবন নির্বাহ করে। তার বউ শার্লিন হাক একজন ওয়েটার। তারা দুজনেই ভালোবেসে বিয়ে করেছে। এক সাথে জীবিকা নির্বাহের দরুন তাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা বেশ। ফলে সংসার জীবনে তারা বেশ সুখী।</p>
<p>প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই রকডাস্ট হোটেলের সেলুনটা জমে উঠে।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-258913"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/258913/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>8</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">6e28a49295c56cd27a097635557a377b</guid>
				<title>নিষিদ্ধের ব্যাকরণ

এই শহর এখন আর কোনো মানচিত্র নয়,
এটি দীর্ঘশ্বাস, 
অপরাধবোধ আর অঘোষিত কামনার
এক বিশাল আর্কাইভ।

প্রতিটি ব্যালকনিতে ঝুলে থাকে
অর্ধেক ব্যবহৃত চুম্বনের শুকিয়ে যাওয়া দাগ,
আর প্রতিটি লিফট ধীরে ধীরে উঠে যায়
এমন এক নির্জন তলায়,
যেখানে ভালোবাসার প্রবেশ নিষিদ্ধ,
শুধু শরীরের দীর্ঘ ছায়াগুলো নীরবে অপেক্ষা করে।

তোমার ত্বক ছুঁয়েছিলাম আমি,
যেন বহুদিন অনাহারে থাকা
একটি পরিত্যক্ত শব্দ
অবশেষে নিজের হারিয়ে যাওয়া অর্থটুকু খুঁজে পেয়েছে
তোমার নিঃশ্বাসের ভেতরে।

তারপর হঠাৎ
সমস্ত জানালা একসঙ্গে খুলে গেল,
আর সভ্যতা তার অসংখ্য কৌতূহলী চোখ নিয়ে
আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল
একটি অপরাধস্থলের নিঃশব্দ সাক্ষীর মতো।

মুহূর্তের মধ্যেই
শহরটি বিচারকের কালো পোশাক পরে নিল,
আমাদের ঠোঁটের বিরুদ্ধে
রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ দায়ের হলো,
আর প্রতিটি চুম্বনকে
আদালতের নথিতে লেখা হলো
একটি সামাজিক অপরাধের স্বীকারোক্তি হিসেবে।

কামনা এখানে
কোনো বিছানার ক্ষণস্থায়ী ঘটনা নয়,
এটি এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক ভাষা,
একটি অবৈধ পতাকা,
যা রাতের বাতাসে সামান্য উড়ে উঠলেই
সমস্ত সকাল অস্বস্তিতে কেঁপে ওঠে,
আর নীতিবাদীরা তাদের মুখোশ আরও শক্ত করে পরে নেয়।

আমরা একে অপরকে
কখনোই নগ্ন করিনি,
খুলে ফেলেছিলাম শুধু
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে
আমাদের শরীরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া
ভয়, লজ্জা আর নিষেধের পুরোনো পোশাকগুলো।

তবু ইতিহাস
আমাদের প্রতিটি আলিঙ্গনকে
শুধু শরীরের ব্যাকরণে লিখে রাখল,
কেউ পড়তে চাইল না
তার গভীরে লুকিয়ে থাকা
অসংখ্য নির্বাসিত হৃদস্পন্দনের গোপন ভাষা,
যেখানে কামনার চেয়েও বড় ছিল
একজন আরেকজনের কাছে আশ্রয় হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা।

একদিন
এই নগরীর সমস্ত নিয়নবাতি নিভে যাবে,
সমস্ত আদালত ধুলো হয়ে যাবে,
আর নীতির দেয়ালগুলোও একসময় ভেঙে পড়বে
সময়ের অবিরাম বৃষ্টির নিচে।

তখনও হয়তো
কোনো অচেনা প্রেমিক
অন্ধকারের গভীর থেকে হাত বাড়িয়ে দেবে,
আর কোনো অচেনা প্রেমিকা
তার আঙুলের উষ্ণতা ছুঁয়ে
নিঃশব্দে বুঝে যাবে,

নিষিদ্ধ ছিল না
মানুষের স্পর্শ,
নিষিদ্ধ ছিল না
দুটি শরীরের পারস্পরিক আত্মসমর্পণ,

নিষিদ্ধ ছিল শুধু
সমস্ত ভয়, সমস্ত আইন, সমস্ত ভণ্ড নৈতিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে
একজন মানুষকে
তার সমস্ত অসম্পূর্ণতা নিয়ে
নিঃসংকোচে ভালোবেসে ফেলা।
(২৯ জুলাই, ২০২৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/258905/</link>
				<pubDate>Wed, 29 Jul 2026 04:05:09 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>নিষিদ্ধের ব্যাকরণ</p>
<p>এই শহর এখন আর কোনো মানচিত্র নয়,<br />
এটি দীর্ঘশ্বাস,<br />
অপরাধবোধ আর অঘোষিত কামনার<br />
এক বিশাল আর্কাইভ।</p>
<p>প্রতিটি ব্যালকনিতে ঝুলে থাকে<br />
অর্ধেক ব্যবহৃত চুম্বনের শুকিয়ে যাওয়া দাগ,<br />
আর প্রতিটি লিফট ধীরে ধীরে উঠে যায়<br />
এমন এক নির্জন তলায়,<br />
যেখানে ভালোবাসার প্রবেশ নিষিদ্ধ,<br />
শুধু শরীরের দীর্ঘ ছায়াগুলো নীরবে অপেক্ষা করে।</p>
<p>তোমার ত্বক ছুঁয়েছিলাম আ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-258905"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/258905/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">4a9efa0af980b9237fffb280163bf280</guid>
				<title>“শুধু তোমার জন্য”

দুপুরের রোদটা কাঁচের দেয়াল ভেদ করে বহুতল মার্কেটের ভেতরেও এসে পড়েছে। সাদা টাইলসের উপর ছড়িয়ে থাকা আলোয় মানুষের ছায়াগুলো ক্রমশঃ লম্বা হয়ে যাচ্ছে। কোথাও বাচ্চাদের হাসি, কোথাও দোকানিদের ডাকাডাকি, কোথাও নতুন কাপড়ের গন্ধ। চারতলার খোলা বারান্দা ঘেঁষে দাঁড়ালে নিচের তিনটা তলা একসাথে চোখে পড়ে। মাঝখানটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। রেলিংয়ের ওপাশে তাকালে মনে হয় পৃথিবীটা অনেক নিচে নেমে গেছে। সেই রেলিংয়ের পাশ দিয়েই ধীরে ধীরে হাঁটছে মোজাফ্ফর আর সালমা। 

মাস কয়েক আগে বিয়ে হয়েছে ওদের। শহরের উপকণ্ঠে টিনের চালওয়ালা ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া নিয়েছে মোজাফ্ফর। এক কামরার সেই ঘরে একটা খাট, একটা টেবিল, দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার আর রান্নাঘরের কোণে কয়েকটা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পাতিল। সংসার বলতে এটুকুই। কিন্তু প্রথম কয়েকটা দিন ওদের কাছে মনে হয়েছিল, এর চেয়ে সুখের জীবন বুঝি আর হয় না। 

সকালে অফিসে বের হওয়ার আগে সালমা নিজ হাতে প্লেটে গরম ভাত তুলে দিত। সাথে ডিম ভাজা। রাতে ফিরে এলে গামছা এগিয়ে দিত। ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুয়ে মোজাফ্ফর মাঝে মাঝেই ভাবত, মানুষ আসলে খুব বেশি কিছু চায় না। স্রেফ নিজের একটা ঘর আর সেই ঘরে অপেক্ষা করার একজন মানুষ থাকলেই যথেষ্ট।

মোজাফ্ফর একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির বিক্রয়কর্মী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডাক্তারদের চেম্বার, ওষুধের দোকান আর ক্লিনিক ঘুরে বেড়ায়। মাস শেষে বেতন হাতে পায় ঠিকই, কিন্তু সেই টাকার বড় একটা অংশ চলে যায় গ্রামের বাড়িতে। বৃদ্ধ বাবা আর মায়ের ওষুধ, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা, ছোট বোনের কলেজে যাওয়া। এসবের পর হাতে যা থাকে, তা দিয়ে শহরের সংসার চালানোই কষ্টকর। তারপরও সে কখনো সালমাকে এসব বোঝাতে চায়না। বরং নিজের কষ্টটুকু লুকিয়ে রেখে সবসময় হাসিমুখেই বলে, &quot;আরেকটু সময় দাও। সব ঠিক হয়ে যাবে।&quot;

যদিও সালমা খুব বেশি কিছু চাইত না। তবে যখনই কিছু চাইত, সেটা মন থেকেই চাইত। কখনো নতুন শাড়ি, কখনো একটা স্যান্ডেল, কখনো পাশের বাসার ভাবির হাতে থাকা মোবাইলের মতো একটা মোবাইল। 

মোজাফ্ফর প্রথমে না করত। তারপর সালমা অভিমান করত। সেই অভিমান খুব ভয় পেত সে। মেয়েটা কথা বলা বন্ধ করে দিত। রান্না করত, কিন্তু খেতে ডাকত না। নিজেও খেত না। একই বিছানায় শুয়েও উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকত। সেই নীরবতা মোজাফ্ফরের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার ছিল। শেষ পর্যন্ত সে অফিস থেকে অগ্রিম নিয়ে হলেও সালমার ইচ্ছেটা পূরণ করত। তারপর পুরো মাসটা ধার করা টাকার বোঝা মাথায় নিয়ে কাটাত।

আজ সালমার জন্মদিন। এই দিনটার জন্য প্রায় দেড় মাস ধরে একটু একটু করে টাকা জমিয়েছে মোজাফ্ফর। দুপুরে চা খাওয়া কমিয়েছে। নিজের জন্য একটা নতুন শার্ট কেনেনি। কয়েকদিন রিকশার বদলে হেঁটে অফিসে গেছে। সবকিছু করেছে শুধু এই একটা দিনের জন্য। এই দিনটার জন্যই সে আজ অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে।

সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সালমা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কপালে ছোট্ট একটা টিপ পরল। তারপর ঘুরে মোজাফ্ফরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। বললো, &quot;আজ  সারাদিন কিন্তু আমারে রাগাইতে পারবা না।&quot;

মোজাফ্ফরও হেসে ফেলল। বললো, &quot;নারে বউ, আজকে তোমার দিন।&quot;

দুজনেই রিকশায় করে মার্কেটে এল। চারতলার একটা রেস্টুরেন্টে বসে দুপুরের খাবার খেল। চিকেনের শেষ টুকরোটা নিজের প্লেট থেকে তুলে সালমার প্লেটে রেখে দিল মোজাফ্ফর। বললো, &quot;তুমি খাও। আমার আর লাগবো না।&quot;

সালমা তখন সত্যিই খুশি ছিল। তার চোখেমুখে সেই আনন্দ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। 

খাওয়া শেষে তারা একটা শাড়ির দোকানে ঢুকল। দোকানের কর্মচারী একের পর এক শাড়ি খুলে দেখাতে লাগল। লাল, নীল, মেরুন, বেগুনি হরেক রকম শাড়ি। নতুন কাপড়ের গন্ধে পুরো দোকানটা ভরে আছে।

অনেকক্ষণ দেখে মোজাফ্ফর একটা শাড়ি আলাদা করল। তার কাছে সেটাই সবচেয়ে সুন্দর মনে হলো। কারণ সৌন্দর্যের সঙ্গে দামটাও তার নাগালের ভেতর ছিল। শাড়িটা হাতে নিয়ে সালমার দিকে বাড়িয়ে দিল। বললো, &quot;এইডা নাও। তোমারে খুব সুন্দর মানাইবো।&quot;

সালমা শাড়িটার দিকে একবার তাকাল। তারপর মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে সে নিজেই একটা শাড়ি নামিয়ে আনল। গাঢ় লাল রঙের উপর সোনালি জরির কাজ। আলো পড়তেই শাড়িটা ঝিলমিল করে উঠল। বললো, &quot;আমি এইডা নিব।&quot;

মোজাফ্ফর দোকানীর দিকে তাকালো। তার মুখ তেকে দাম শুনে ওর বুকের ভেতরটা ককিয়ে উঠলো। মানিব্যাগে থাকা টাকাগুলো যেন তাকে উপহাস করতে লাগলো। শাড়িটার দাম তার সামর্থ্যের বাইরে।

সে অনেক কষ্টে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। সালমাকে বললো, &quot;আরেকটা দেখো। এইডার দাম একটু বেশি।&quot;

সালমার কপালে ভাঁজ পড়ল। &quot;কত বেশি?&quot;

মোজাফ্ফর উত্তর দিল না। তার নীরবতাই উত্তর হয়ে দাঁড়াল।

সালমার চোখের দৃষ্টিটা বদলে গেল। একটু রাগত স্বরে বললো, &quot;কেন তোমার কাছে এইডা কেনার মত টাকা নাই?&quot;

মোজাফ্ফর ধীরে মাথা নিচু করল। অনুনয়ের কন্ঠে বললো, &quot;এই মাসে আর পারতেছি না বউ। প্লিজ একটু বুঝনের চেষ্টা কর।&quot; তার বলার ভঙ্গীতে দোকানের ভেতরের বাতাসটাও যেন ভারী হয়ে উঠল।

সালমা ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব নিচু গলায় এমন কিছু কথা বলতে শুরু করল, যেগুলো কেবল মোজাফ্ফরের কানে পৌঁছাল। কিন্তু সেই কথাগুলোর প্রতিটা যেন ধারালো কাঁচের টুকরোর মতো তার বুকের ভেতরে ঢুকে যেতে লাগল।

সালমা বললো, &quot;যখন পারোই না, তখন এত বড় বড় কথা কও ক্যান? বিয়ার পর আমার পথ্থম জন্মদিনে পছন্দের একটা শাড়ি কিনে দিতে পারবা না, তাইলে এহানে নিয়া আইছো কেন?&quot;

মোজাফ্ফর আর দাঁড়াতে পারল না। দোকান থেকে বেরিয়ে এল। সালমাও পেছন পেছন বেরিয়ে এল। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। তবু দুজনেই পাশাপাশি হাঁটছে।

একসময় এসে দাঁড়াল চারতলার রেলিংয়ের কাছে। মোজাফ্ফর পেছাতে পেছাতে এসে কোমর ঠেকিয়ে দাঁড়াল রেলিংয়ে। সালমা তার ঠিক সামনে।

মার্কেটের কোলাহল তখনও আগের মতোই চলছে। অথচ মোজাফ্ফরের কাছে সব শব্দ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল।

সালমা হাত নাড়িয়ে কথা বলেই যাচ্ছে। &quot;তোমার মতো মানুষেরে বিয়া করাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।&quot;

কথাটা শুনে মোজাফ্ফর আর উত্তর দিল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল সালমার দিকে। তারপর অদ্ভুত ধীরতায় ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। রেলিংয়ের ওপাশে অনেক নিচে মানুষ হাঁটছে। কেউ হাসছে। কেউ কেনাকাটা করছে। পৃথিবীটা ঠিক আগের মতোই চলছে। 

তার হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ল। মায়ের কথা মনে পড়ল। ছোট ভাইটার ভর্তি ফি। 
অফিসের হিসাব বিভাগের লোকটার মুখ। নিজের সেই অগণিত প্রতিশ্রুতি। একটা ভালো বাসা নেবে। সালমাকে একটা সোনার চুড়ি কিনে দেবে। মাকে শহরে এনে ডাক্তার দেখাবে। ছোট ভাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবে।

কিছুই হয়নি। সে শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়েই গেছে। ধীরে ধীরে আবার সামনে তাকাল।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সালমাকে তখন তার হঠাৎ খুব অচেনা মনে হলো। মনে হলো, এই মেয়েটা সেই মানুষ নয়, যার জন্য প্রতিদিন সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করত। এই মুখটা যেন তাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছে, সে ব্যর্থ। সে অক্ষম। সে কারও স্বপ্ন পূরণ করার মতো মানুষ নয়।

এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, এই পৃথিবীতে তার আর কোনো প্রয়োজন নেই। সে খুব ধীরে দুই হাত তুলে রেলিংয়ের ওপর রাখল। তার চোখদুটো আশ্চর্য রকম শান্ত হয়ে এসেছে।

সালমা তখনও বুঝতে পারেনি কী হতে যাচ্ছে। সে বিরক্ত গলায় বললো, &quot;চুপ কইরা আছ কেন? এরকম সংয়ের মত দাঁড়াইয়া থাকলেই কি সব ঠিক হইয়া যাইবো?&quot;

মোজাফ্ফর শেষবারের মতো স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাল। তারপর দুই হাতের ভর দিয়ে শরীরটা রেলিংয়ের একটু ওপরে তুলল। কয়েক সেকেন্ড স্থির থাকলো যেন সে ওটার উপর বসতে চাইছে। পরমুহুর্তেই নিজেকে পেছনে ঠেলে দিল। 

সালমা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। যখন বুঝল, তখন শুধু দেখল, মোজাফ্ফরের শরীরটা সহসাই তার চোখের সামনে থেকে নেই হয়ে গেল।

সে চিৎকার করে উঠল। দৌড়ে গিয়ে রেলিং আঁকড়ে নিচে তাকাল।

নিচে মানুষের ভিড় জমে গেছে। কেউ ছুটে যাচ্ছে। কেউ চিৎকার করছে। কেউ মোবাইল বের করছে। কিন্তু সালমা কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।

তার কানে শুধু বারবার ভেসে আসছে দুপুরের সেই কথাটা। &quot;আজকে তোমার দিন।&quot;

সালমার দুই হাত তখনও রেলিং শক্ত করে ধরে আছে। কিন্তু সে জানেনা, যে হাতটা তার সারাজীবন ধরে রাখার কথা ছিল, সেটাকে সে আর কোনোদিন ধরতে পারবে না।
(সমাপ্ত)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/258716/</link>
				<pubDate>Sun, 26 Jul 2026 05:57:58 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>“শুধু তোমার জন্য”</p>
<p>দুপুরের রোদটা কাঁচের দেয়াল ভেদ করে বহুতল মার্কেটের ভেতরেও এসে পড়েছে। সাদা টাইলসের উপর ছড়িয়ে থাকা আলোয় মানুষের ছায়াগুলো ক্রমশঃ লম্বা হয়ে যাচ্ছে। কোথাও বাচ্চাদের হাসি, কোথাও দোকানিদের ডাকাডাকি, কোথাও নতুন কাপড়ের গন্ধ। চারতলার খোলা বারান্দা ঘেঁষে দাঁড়ালে নিচের তিনটা তলা একসাথে চোখে পড়ে। মাঝখানটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। রেলিংয়ের ওপাশ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-258716"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/258716/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">39ded47f26eaf206d18253c5cb7a6a76</guid>
				<title>মানুষের ভীড়ে অন্য মানুষ

মেসের ছোট্ট রুমটায় বসে রাশেদ শেষবারের মতো টাকাগুলো গুনল। প্রায় এক বছর ধরে টিউশনি করে একটু একটু করে জমিয়েছে। কত দিন দুপুরে শুধু একটা কলা খেয়ে কাটিয়েছে। ঈদে নতুন জামা কেনেনি। বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যায়নি। সব কষ্টের একটাই কারণ। আজ সে একটা টাচ মোবাইল কিনবে। নিজের খুব শখ ছিল। পড়াশোনারও দরকার ছিল। ফোনটা থাকলে অনলাইনে ক্লাস করতে পারবে, নোট দেখতে পারবে, চাকরির প্রস্তুতি নিতে পারবে। মানিব্যাগটা পকেটে রেখে আয়নায় একবার নিজের মুখটা দেখল। নিজেকে তার খুব সন্তুষ্ট মনে হলো। একটু মুচকি হেসে দরজায় তালা লাগিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

রাস্তায় এসে মোবাইল মার্কেটে যাওয়ার জন্য একটা রিকশায় উঠল। রিকশাওয়ালার বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে। মুখে সাদা দাড়ি। গায়ে পুরোনো একটা শার্ট। পা দুটো দেখে মনে হচ্ছিল, অনেক বছর ধরে রিকশার প্যাডেল ঘুরাতে ঘুরাতে শক্ত হয়ে গেছে। কিছু দূর যেতেই উনার পকেটে থাকা বাটন ফোনটা বেজে উঠল। তিনি রিকশা থামিয়ে ফোনটা কানে নিলেন। ওপাশে কী বলা হচ্ছে শোনা যাচ্ছিল না। শুধু লোকটার কথাগুলো ভেসে এলো। 

তিনি নিচু গলায় বললেন, &quot;কান্দিস না। আমি তো চেষ্টা করতাছি। কি কস ? কালকের মইধ্যে টাকা না দিলে পরীক্ষা দিতে পারবো না!” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললেন, &quot;অহন আমি কার কাছে যামু? কই পামু অত ট্যাহা। সারাদিন রিকশা চালাইয়া আর কয় ট্যাহাই পাই। হুন, পোলাডারে কইস মন খারাপ না করতে। আমি দেহি কি করন যায়।&quot; ফোনটা বুক পকেটে রেখে তিনি গামছা দিয়ে চোখ মুছে আবার রিকশা চালাতে লাগলেন। 

রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, &quot;চাচা, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?&quot;

লোকটা ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে ফিরে বললেন, &quot;কও বাবা।&quot;

রাশেদ বলল, &quot;আপনার ছেলের কী হইছে?&quot;

লোকটা এবার সামনে ফিরে মাথা নিচু করে বললেন, &quot;এই বছর মেট্রিক পরীক্ষা দিব। কাল ফরম ফিলাপের শেষ দিন। আমি অহনো ট্যাহা জোগাড় করতে পারি নাই। পোলাডা পড়া-শোনায় খুব ভালো। শুধু ট্যাহার জন্য যদি পরীক্ষা দিতে না পারে, তাইলে বাপ হইয়া আমি কেমনে সয্য করি?&quot;

এরপর আর কেউ কোনো কথা বলল না। রিকশার চাকার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ হলো না।

মোবাইল মার্কেটের সামনে এসে রিকশা থামল। রাশেদ ভাড়া দিয়ে দোকানের ভেতরে ঢুকে গেল। কাঁচের শোকেসে সাজানো মোবাইলগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, &quot;ভাই, ওই ফোনটা একটু দেন তো?&quot; 

দোকানদার ফোনটা এগিয়ে দিলেন। রাশেদ অনেক যত্ন করে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে নিজের মুখটা দেখলো। সহসা কি মনে করে বাইরে তাকালো। দোকানের কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখলো, বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা দোকানের দিকেই তাকিয়ে আছেন। তারপর ধীরে ধীরে রিকশা ঘুরিয়ে তার সীটে উঠে বসলেন। কিন্তু, তার মাথাটা নিচু। প্যাডেলে চাপ দেওয়ার আগে একবার গামছা দিয়ে নিজের চোখটা মুছলেন।  

রাশেদ আবার হাতের মোবাইলটার দিকে ফিরলো। তারপর আস্তে করে ওটা টেবিলের ওপর রেখে দ্রুত দোকান থেকে বেরিয়ে এল।

দোকানদার অবাক হয়ে বললেন, &quot;ভাই, ফোনটা নেবেন না?&quot;

রাশেদ শুনেও যেন শুনল না। সে প্রায় দৌড়ে গিয়ে রিকশার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, &quot;চাচা, একটু দাঁড়ান।&quot;

রিকশাওয়ালা সজোরে ব্রেক কষলেন। অবাক হয়ে বললেন, &quot;কী হইছে বাবা?&quot;

রাশেদ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। তারপর ভেতরে থাকা সব টাকাগুলো লোকটার হাতে ধরিয়ে দিল। ”এই টাকা গুলা নেন।”

লোকটা কেমন যেন ভয় পেয়ে গেলেন। টাকাগুলো ওকে ফেরত দিতে দিতে বললেন, &quot;না বাবা। এইডা কী করতাছ? আমি এই টাকা নিতে পারমু না।&quot;

রাশেদ তাঁর হাতটা শক্ত করে ধরে চেপে বলল, &quot;রাখেন চাচা। এই টাকা দিয়া আপনার ছেলের ফরম ফিলাপ কইরা দেন।&quot;

লোকটার চোখ ভিজে উঠলো। কাঁপা গলায় বললেন, &quot;কিন্তু এইডা তো তোমার টাকা।&quot;

রাশেদ মুচকি হেসে বলল, &quot;হ, আমারই টাকা। একটা মোবাইল কিনার জন্য গত এক বছর ধইরা অনেক কষ্ট কইরা জমাইছিলাম।&quot;

বৃদ্ধ মানুষটা যেন কথাই হারিয়ে ফেললেন। অনেকক্ষণ রাশেদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, &quot;না বাবা। তোমার এত দিনের কষ্টের টাকা আমি নিতে পারমু না। আমার পোলার কপালে যা আছে তাই হইব।&quot;

রাশেদ এবার টাকাগুলো ভাঁজ করে লোকটার শার্টের বুকপকেটে গুঁজে দিল। তারপর দুই হাত দিয়ে তাঁর হাতটা ধরে আস্তে করে বলল, &quot;চাচা, আমারে আর না কইরেন না। আমার আব্বাও মানুষের বাড়িতে কামলা দেয়। আমি জানি, পোলার জন্য একজন গরিব বাপের বুকের ভিতরে কতটা কষ্ট হয়। মোবাইল আমি পরেও কিনতে পারমু। কিন্তু আপনার পোলা যদি পরীক্ষাই দিতে না পারে, তাইলে তার জীবনটাই নষ্ট হইয়া যাইবো। এই ক্ষতিটা আমি কোনোদিন মেনে নিতে পারুম না।&quot;

লোকটার ঠোঁট কাঁপছিল। তিনি কিছু বলতে গিয়েও পারলেন না। হঠাৎ দুই হাত দিয়ে রাশেদের হাত শক্ত করে ধরে কেঁদে ফেললেন। সেই কান্না ছিল না শুধু টাকার জন্য। সেই কান্না ছিল একজন অসহায় বাবার কৃতজ্ঞতাবোধের কান্না। অনেকক্ষণ পর তিনি চোখ মুছে বললেন, &quot;বাবা... তোমার আব্বা অনেক ভাগ্যবান।&quot;

রাশেদের চোখও ভিজে উঠল। সে মাথা নিচু করে বলল, &quot;ভাগ্যবান আমিও চাচা। আমার আব্বা ছোটবেলা থেইকা একটা কথাই কইছে। আর কিছু না হোক, একজন মানুষ হইস বাপ।&quot;

বৃদ্ধ মানুষটা কাঁপতে কাঁপতে রাশেদের মাথায় হাত রাখলেন। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, &quot;আল্লাহ, আমার পোলাডারে যদি মানুষ বানাও, তাইলে এই ছেলেটার মতো বানাইও। তারে অন্যের কষ্ট বুঝার মত মন দিও।&quot;

রাশেদ আর দাঁড়াল না। আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল। পেছন থেকে বৃদ্ধ মানুষটার ভেজা গলাটা আবার ভেসে এলো, &quot;বাবা... আল্লাহ তোমারে ভালো রাখুক।&quot;

রাশেদ কোন কথা বললো না। শুধু একবার হাত তুলে ইশারা করল। তারপর চলমান মানুষের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
(৬ই জুলাই, ২০২৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/256718/</link>
				<pubDate>Mon, 06 Jul 2026 05:27:35 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>মানুষের ভীড়ে অন্য মানুষ</p>
<p>মেসের ছোট্ট রুমটায় বসে রাশেদ শেষবারের মতো টাকাগুলো গুনল। প্রায় এক বছর ধরে টিউশনি করে একটু একটু করে জমিয়েছে। কত দিন দুপুরে শুধু একটা কলা খেয়ে কাটিয়েছে। ঈদে নতুন জামা কেনেনি। বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যায়নি। সব কষ্টের একটাই কারণ। আজ সে একটা টাচ মোবাইল কিনবে। নিজের খুব শখ ছিল। পড়াশোনারও দরকার ছিল। ফোন&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-256718"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/256718/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">31c1c737da9efbf5261f3ea1147a6a95</guid>
				<title>শিলালিপি
সন্ধ্যা নামে, জানালাতে কাঁদে কুয়াশার জল,
ফিরে আসে স্মৃতিরা সব, জাগে নিঃশব্দ ছল।

মানুষভরা পথের শেষে দাঁড়াই একা আমি,
চারদিকে আলোর মেলা, অন্তর অন্ধগামী।

বুকের ভেতর মরুভূমি, উড়ে বালুর ধোঁয়া,
শুকনো নদীর বুকে শুধু মৃত জোয়ারের ছোঁয়া।

নিভে-যাওয়া নক্ষত্র যেন আমার পরিচয়,
হাজার মুখের মাঝখানেও আপন কেউ আর নয়।

রাত গভীর, শূন্য ঘরে জেগে থাকে দীর্ঘশ্বাস,
দেয়ালজুড়ে ছায়ারা সব লেখে বিষণ্ন ইতিহাস।

নিঃসঙ্গতা প্রাচীন কোনো সমাধিফলকপ্রায়,
প্রতিদিন সে একটু একটু প্রাণের প্রদীপ খায়।

তখন বুঝি, মৃত্যু কেবল দেহের অবসান নয়,
সবাইকে ছুঁয়ে থেকেও একা হওয়াই মহাক্ষয়।
(১৪ মাত্রার মাত্রাবৃত্তে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/256536/</link>
				<pubDate>Sat, 04 Jul 2026 05:15:42 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>শিলালিপি<br />
সন্ধ্যা নামে, জানালাতে কাঁদে কুয়াশার জল,<br />
ফিরে আসে স্মৃতিরা সব, জাগে নিঃশব্দ ছল।</p>
<p>মানুষভরা পথের শেষে দাঁড়াই একা আমি,<br />
চারদিকে আলোর মেলা, অন্তর অন্ধগামী।</p>
<p>বুকের ভেতর মরুভূমি, উড়ে বালুর ধোঁয়া,<br />
শুকনো নদীর বুকে শুধু মৃত জোয়ারের ছোঁয়া।</p>
<p>নিভে-যাওয়া নক্ষত্র যেন আমার পরিচয়,<br />
হাজার মুখের মাঝখানেও আপন কেউ আর নয়।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-256536"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/256536/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
		
	</channel>
</rss>