<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?>
<rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>তুলট | বিষণ্ন সুমন | Activity</title>
	<link>https://toulot.com/n_members/logolabbd/activity/</link>
	<atom:link href="https://toulot.com/n_members/logolabbd/activity/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<description>Activity feed for বিষণ্ন সুমন.</description>
	<lastBuildDate>Sun, 06 Sep 2026 00:36:24 +0600</lastBuildDate>
	<generator>https://buddypress.org/?v=</generator>
	<language>en-US</language>
	<ttl>30</ttl>
	<sy:updatePeriod>hourly</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>2</sy:updateFrequency>
	
						<item>
				<guid isPermaLink="false">7ee91ffa042f239d173c1752a6095579</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২৬
পাহাড়ের ঢাল এবার ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে এসেছে, কিন্তু পথ সহজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপদ কমেনি। বরং সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের প্রতিটি পাথর, প্রতিটি শুকনো ঝোপ, প্রতিটি উঁচু ঢাল এমন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে লুকিয়ে থাকার সুযোগ যেন আরও কমে আসছিল।

মারদেকা সবার আগে হাঁটছিল। তার চোখ কখনও মাটির দিকে, কখনও সামনের ঢালের দিকে, আবার কখনও দূরের পাথুরে রেখার ওপর গিয়ে স্থির হচ্ছিল। তার কোমরে ছুরি। হাত অস্ত্রের ওপর নেই, কিন্তু শরীরের প্রতিটি পেশি সতর্ক। পেছনে লারসেন, তার এক হাতের ক্ষত কাপড় দিয়ে বাঁধা, যদিও সেখান থেকে আবার রক্ত চুঁইয়ে বেরোতে শুরু করেছে। সবচেয়ে পেছনে এলিয়াস, আহত কাঁধের কারণে তার চলার গতি ধীর হয়ে গেছে।

সূর্যের প্রথম আলো পাহাড়ের মাথায় পড়লেও নিচের সরু গিরিখাতের মধ্যে এখনও ঠান্ডা জমে আছে। বাতাস শুকনো। পাথরের গায়ে রাতের শিশিরের সামান্য আর্দ্রতা কোথাও কোথাও চকচক করছে। দূরে একটা বাজপাখি আকাশে গোল হয়ে ঘুরছিল। তার ডানার নিচে পাহাড়ের বিশাল ছায়া মাটির ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

কিন্তু মারদেকা পাখিটার দিকে তাকাচ্ছিল না। সে থেমে গেল। তার সামনে একটা জায়গায় পাহাড়ি পথ দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে। বাঁ পাশের পথটা নিচের দিকে নেমেছে, দেখতে তুলনামূলক সহজ। ডান দিকের পথটা উঁচু পাথরের গা ঘেঁষে ঘুরে গেছে। সেখানে চলতে কষ্ট হবে, কিন্তু জায়গাটা অনেক বেশি আড়াল দেওয়া।

লারসেন থামল। “কী হলো?”

মারদেকা উত্তর দেওয়ার আগে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল। সূর্যের আলো এখনও পুরোপুরি সেখানে পৌঁছায়নি। সে হাত দিয়ে মাটির ধুলো স্পর্শ করল। তারপর সামনের দিকে ঝুঁকে একটা পাথরের পাশে চোখ সরু করে তাকাল। কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়াল। “বাঁ দিকের পথ।”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “কেন?”

মারদেকা পেছনের দিকে তাকাল না। তার চোখ তখনও সামনে। “ওরা ভাববে আমরা ডান দিক দিয়ে যাব।”

এলিয়াস ক্লান্ত মুখে বলল, “ওটা আড়াল দেওয়া পথ।”

“তাই।” মারদেকা বলল। “আর ওরা জানে আমরা আড়াল চাইব।”

লারসেনের মুখে খুব সামান্য একটা পরিবর্তন দেখা গেল। সে কিছু বলল না। কয়েক মাস আগেও এমন পরিস্থিতিতে সে মারদেকাকে সামনে পাঠাত না। তাকে নিজের পেছনে রাখত। বিপদের জায়গায় ছেলেটিকে চোখের আড়াল হতে দিত না।

কিন্তু আজ সকালটা অন্যরকম। গত রাতের পর থেকে অনেক কিছু বদলে গেছে।

ড্যানিয়েল রিডের নাম এখন আর শুধু অতীতের কোনো অচেনা মানুষের নাম নয়। সে মারদেকার বাবা। একজন শ্বেতাঙ্গ শিকারি, দক্ষ স্কাউট, সীমান্তের দুর্গম পথের মানুষ। যে বিশ্বাসঘাতকতার সন্ধান পেয়েছিল। যে প্রমাণ জোগাড় করতে চেয়েছিল। আর যার মৃত্যুর আগে নিজের সাত বছরের ছেলেকে আগুন আর গুলির শব্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো একটা নির্দেশ দিয়েছিল। 

দৌড়াও শব্দটা মারদেকার মাথার ভেতর এতদিন ধরে ঘুরেছে। স্বপ্নে, জেগে থাকা অবস্থায়, অন্ধকার পাহাড়ি পথে, ভয়ংকর মুহূর্তে। এখন আর সেটা কোনো অদ্ভুত রহস্য নয়। সেটা তার বাবার কণ্ঠ। মানুষটার মৃত্যুর আগের শেষ নির্দেশ।

মারদেকা বাঁ পাশের পথ ধরে হাঁটা শুরু করল। পেছনে লারসেন। তারও পেছনে এলিয়াস।

তারা খুব বেশি দূর যেতে পারেনি, হঠাৎ মারদেকা আবার থামল। এবার সে হাত তুলল না, কোনো শব্দও করল না। শুধু শরীর নিচু করল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে পাথরের আড়ালে সরে গেল। এলিয়াসও। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর দূরে একটা শব্দ। খুব হালকা। পাথরে ঘোড়ার লোহার খুর লাগার শব্দ। একবার। তারপর বিরতি। আবার।

মারদেকা ধীরে মাথা ঘুরিয়ে লারসেনের দিকে তাকাল। “ঘোড়া।”

লারসেন নিচু গলায় বলল, “কতগুলো?”

মারদেকা উত্তর দিল না। সে মাথা সামান্য কাত করল। বাতাস এখন তাদের দিক থেকে পাহাড়ের নিচে যাচ্ছে। শব্দের সঙ্গে বাতাসের দিক মিলিয়ে সে হিসেব করার চেষ্টা করল। একটা। দুইটা। তারপর অন্য একটা শব্দ, যেন কেউ লাগাম টেনে ঘোড়াকে থামিয়েছে।

মারদেকা খুব আস্তে বলল, “তিনটা। হয়তো চারটা।”

এলিয়াস নিচু গলায় বলল, “কেইনের লোক।”

লারসেন পাথরের কিনারা দিয়ে সামান্য বাইরে তাকাল। তারপর আবার সরে এল। “আমাদের দেখতে পায়নি।”

মারদেকা এবার মাথা নাড়ল। “এখনও না।”

কথাটা শেষ হতেই দূরে একটা কণ্ঠ ভেসে এল। “নিচের পথটা দেখো!”

কণ্ঠটা এত দূরে যে মুখ চেনা সম্ভব নয়। কিন্তু পরিষ্কার বোঝা গেল, তারা কাউকে খুঁজছে। 

লারসেন ধীরে পিস্তল বের করল। এলিয়াসের হাতও অস্ত্রের দিকে গেল। 

মারদেকা দুজনের দিকে তাকাল। তার নিজের কোমরে ছুরি। গত রাতেই সে দেখেছে, বন্দুকের লড়াই কেমন। সে দেখেছে বন্দুক চালাতে। অন্তত এটা দেখেছে যে অস্ত্র কীভাবে ধরে, ট্রিগার কোথায়, কীভাবে গুলি ছোড়া হয়। কিন্তু দেখা আর করতে পারা এক জিনিস নয়। আর গুলি ছোড়া আর মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি করা, তার থেকেও আলাদা।

লারসেন তার দিকে তাকাল। “তুমি এখানেই থাকবে। আমরা না বলা পর্যন্ত বের হবে না।”

মারদেকার চোখে অদ্ভুত একটা স্থিরতা দেখা গেল। “যদি ওরা এদিকে আসে?”

লারসেন এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তাহলে আগে আমাকে বলবে।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তারা পাথরের আড়ালে অপেক্ষা করতে লাগল। সময় যেন ধীরে যেতে শুরু করল।

সূর্য একটু একটু করে উপরে উঠছে। পাহাড়ের গায়ে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও সোনালি, কোথাও ফ্যাকাশে সাদা। শুকনো ঘাসের ডগাগুলো আলো পেয়ে চকচক করছে। নিচের দিকে দূরে একটা সরু সমতল জায়গা দেখা যাচ্ছে, তারপর আরও দূরে পাহাড়ের শেষ রেখা।

ওই পথ ধরলেই খোলা প্রান্তর। তারপর র&#x200d;্যাঞ্চ। কিন্তু তার আগে পাহাড়কে পেছনে ফেলে যেতে হবে। আর পাহাড় এখনও তাদের ছাড়েনি।

হঠাৎ বাঁ দিকের ওপরের ঢাল থেকে একটা রাইফেলের গুলি ছুটে এল। শব্দটা এত আচমকা যে এলিয়াস পাথরের সঙ্গে শরীর চেপে ধরল। গুলিটা তাদের থেকে অনেকটা দূরে পাথরে আঘাত করল। 

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় গুলি এলো। এবার আরও কাছে। পাথরের একটা অংশ ভেঙে মারদেকার মুখের ওপর ধুলো এসে পড়ল।

লারসেন পিস্তল তুলে একবার গুলি করল। তারপর চিৎকার করে বলল, &quot;নিচু হও!”

এরপর আর কোনো সতর্কতা দেওয়ার সময় রইল না। চারদিক থেকে গুলির শব্দ শুরু হলো।

পাহাড়ি বন্দুকযুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, মানুষ কখনও নিশ্চিত হতে পারে না শত্রু ঠিক কোথায়। একটা গুলি সামনে থেকে আসে, তার প্রতিধ্বনি অন্য দিক থেকে ফিরে আসে। আরেকটা ওপরের পাথরে লাগে, মনে হয় যেন নিচের খাদ থেকে কেউ গুলি করেছে। ধুলো, শব্দ আর পাথরের ভাঙা টুকরোর মধ্যে দূরত্বের হিসেব হারিয়ে যায়।

কিন্তু মারদেকা চেষ্টা করছিল শব্দগুলো আলাদা করতে। বাম দিকে একজন। সামনে দুজন। আরেকজন অনেক দূরে। সে পাথরের সঙ্গে শরীর ঠেসে বসে রইল।

লারসেন আবার গুলি করল।

এলিয়াস এবারও অস্ত্র তুলেছে, কিন্তু আহত কাঁধের কারণে তার হাত স্থির রাখতে কষ্ট হচ্ছে। তবু সে একবার লক্ষ্য করে গুলি করল। তারপর সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে পড়ল। দূর থেকে একটা আর্তচিৎকার শোনা গেল। 

মারদেকা বুঝতে পারল না গুলিটা কাউকে লেগেছে কি না। সে শুধু শুনছিল। একটা বুট পাথরের ওপর দিয়ে এগিয়ে আসছে। অন্যদের থেকে আলাদা। ধীরে। সাবধানে। সে কান দিয়ে লোকটার অবস্থান ধরতে লাগল। আরও কাছে। আরও। তারপর হঠাৎ থেমে গেল।

মারদেকা লারসেনের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “একজন নিচ দিয়ে আসছে।”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল। “কোন দিক?”

মারদেকা হাত দিয়ে বাঁ দিকের নিচু ঢাল দেখাল। “ওখানে। পাথরের পেছনে।”

লারসেন কোনো প্রশ্ন করল না। সে ধীরে পাথরের অন্য প্রান্তে সরে গেল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর একটি মানুষের ছায়া দেখা গেল।

লোকটা নিচু হয়ে এগোচ্ছিল। হাতে রাইফেল। মুখে দাড়ি। মাথায় ধুলো জমা টুপি। সে পাথরের পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসতেই লারসেন গুলি করল। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে পড়ে গেল।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ওপর থেকে আরেকটা গুলি এলো। লারসেনের টুপির কিনারা ছিঁড়ে সেটা উড়ে গেল।

মারদেকা প্রথমবার বুঝতে পারল, তারা শুধু পালিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে না। শত্রুরা তাদের ঘিরে ফেলছে।

এলিয়াস দাঁত চেপে বলল, “ওরা নিচের পথ বন্ধ করেছে।”

লারসেন এক ঝলক তাকাল। “আর ওপরে?”

এলিয়াস উত্তর দেওয়ার আগেই ওপরের ঢাল থেকে কেউ চিৎকার করে উঠল। “লারসেন!”

সবাই থেমে গেল। গুলির শব্দও থামল। কয়েক মুহূর্তের সেই নীরবতা বন্দুকের আওয়াজের থেকেও ভয়ংকর মনে হলো।

তারপর পাহাড়ের ওপরে একটা মানুষ দেখা দিল। সে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় কালো টুপি। গায়ে লম্বা ধুলোমাখা কোট। তার মুখ এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় না। কিন্তু লারসেন তাকে চিনল। 

দূরের মানুষটা ধীরে ধীরে দুই হাত ছড়িয়ে দিল। &quot;তেরো বছর, লারসেন। এত বছর ধরে আমি ভেবেছি, তোমার সঙ্গে আর কখনও দেখা হবে না।”

লারসেন পিস্তল নামাল না। “আমি ভেবেছিলাম তুমি মৃত।”

পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা হাসল। “তুমি অনেক কিছুই ভেবেছিলে।”

এলিয়াসের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “তোমাকে সেদিন মাটিতে পড়তে দেখেছিলাম।”

ভিক্টর কেইন মাথা সামান্য কাত করল। “তাহলে তুমি ভুল দেখেছিলে।”

তারপর তার চোখ নিচের দিকে ঘুরল। মারদেকার দিকে। 

“ছেলেটা।” কেইন বলল। “আমি তাকে দেখতে চেয়েছিলাম।”

লারসেনের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল। “তুমি তাকে দেখেছ।”

কেইনের হাসি মিলিয়ে গেল। “সেই ছয় বছর আগে, এতটুকুন ছিল। তারপর পালিয়ে গিয়েছিল।&quot; একটু থেমে আবার বললো, &quot;এখন নিশ্চয়ই সেরকম নেই।&quot;

তারপর আবার বন্দুকের গুলি শুরু হলো। মারদেকা নিচু হয়ে পড়ল। এবার গুলি আগের চেয়ে কাছ থেকে আসছে। পাথরের আড়াল আর নিরাপদ নেই। একটি গুলি এলিয়াসের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল। আরেকটি লারসেনের পেছনের পাথরে আঘাত করল।

লারসেন দ্রুত চারপাশে তাকাল। তারপর বলল, “আমাদের অবস্থান বদলাতে হবে।”

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে সামনে তাকাল। নিচে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে একটা ভাঙা পাথুরে ঢাল। তার নিচে শুকনো ঝোপের সারি। জায়গাটা বিপজ্জনক, কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে পারলে শত্রুরা তাদের সরাসরি দেখতে পাবে না।

মারদেকা পথটা দেখল। তারপর বলল, “ওদিক দিয়ে যাওয়া যাবে।”

লারসেন তার চোখের দিকে তাকাল। “নিশ্চিত?”

“ঠিক জানি না।” মারদেকার কন্ঠ দ্বিধান্বিত। “কিন্তু এখানে থাকলে ওরা আমাদের ঘিরে ফেলবে।”

লারসেনের মুখে খুব সামান্য একটা হাসির ছায়া দেখা গেল। এমন একটা মুহূর্তে, গুলির মধ্যে দাঁড়িয়ে, ছেলেটার উত্তরটা যেন তার ভালো লেগেছে। &quot;চলো।” বললো সে।

এলিয়াস উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরের দিক থেকে গুলির শব্দ হলো। এলিয়াসের শরীর ঝাঁকুনি খেলেও সে পড়ে গেল না। গুলিটা তার গায়ে লাগেনি। কিন্তু পাথরের একটা টুকরো ছিটকে এসে তার আহত কাঁধে আঘাত করল। সে দাঁত চেপে দেয়ালে হেলান দিল।

লারসেন বলল, “পারবে?”

এলিয়াস মুখ তুলে তাকাল। “এত বছর অপেক্ষা করেছি।” সে কষ্ট করে বলল। “এখন মরার ইচ্ছে নেই।”

মারদেকা প্রথমবার তার দিকে তাকিয়ে খুব সামান্য হাসল। তারপর তিনজন একসঙ্গে নড়ল।

লারসেন সামনে গুলি ছুড়ে শত্রুদের মাথা নিচু রাখতে চেষ্টা করল। 

মারদেকা প্রথমে বেরিয়ে ডান দিকে ছুটল, তারপর পাথরের আড়াল ধরে নিচের দিকে নেমে গেল। তার পা একবারও থামল না। কোথায় শরীরের ভার দিতে হবে, কোন পাথর আলগা, কোন জায়গায় লাফ দিতে হবে, সে যেন চোখের আগেই বুঝে ফেলছে। পেছনে এলিয়াস। আর সবচেয়ে শেষে লারসেন।

হঠাৎ মারদেকা শুনল অন্যরকম একটা শব্দ।  খুব কাছে। পেছনে নয়। সামনে। সে সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। তার হাত উঠে গেল লারসেনকে থামানোর জন্য। 

কিন্তু ঠিক তখনই নিচের শুকনো ঝোপের ভেতর থেকে একজন মানুষ উঠে দাঁড়াল। তার হাতে রাইফেল। মারদেকার দিকে তাকিয়ে সে প্রথমে থমকে গেল।

সময়টা হয়তো এক সেকেন্ডেরও কম ছিল। কিন্তু সেই এক সেকেন্ডে লোকটার মুখের ভাব বদলে গেল। সে রাইফেল পুরোপুরি তুলল না। বরং বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। 

মারদেকা স্থির। লোকটা আরও এক পা সামনে এগিয়ে এল। তার চোখ এবার মারদেকার মুখের ওপর স্থির। ““ঈশ্বর...” সে বলল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। “তুই একদম ড্যানিয়েল রিডের মতো দেখতে।”

মারদেকার শরীরের ভেতর যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। পেছনে কোথাও গুলি চলছিল। বাতাসে ধুলো উড়ছিল। 

এলিয়াসের আহত নিঃশ্বাসের শব্দ ছিল। লারসেনের হাতে পিস্তল ছিল।

কিন্তু সেই মুহূর্তে মারদেকা শুধু একটা নাম শুনতে পেল। ড্যানিয়েল রিড। তার বাবা। আর সামনের লোকটার মুখে যে বিস্ময়, তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না।

এলিয়াস ধীরে লোকটার দিকে এগিয়ে এল। তার মুখ ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখ কঠিন। “এবার বুঝলে?” সে বলল।

লোকটা রাইফেল শক্ত করে ধরল। কিন্তু তার চোখ এখনও মারদেকার মুখ থেকে সরেনি।

এলিয়াস বলল, “সেদিন যে ছেলেটাকে আগুনের মধ্যে থেকে পালিয়ে যেতে দেখেছিলে, সে মারা যায়নি।”

মারদেকা ধীরে এলিয়াসের দিকে তাকাল। এলিয়াসের চোখে সেই পুরোনো রাতের ছায়া ফিরে এসেছে। সে মারদেকার দিকে তাকালো, &quot;তুমি দৌড়ে পালিয়েছিলে। আর তোমার বাবা তোমাকে দৌড়াতে বলেছিল।”

মারদেকার বুকের ভেতর কিছু একটা শক্ত হয়ে উঠল।

এলিয়াসের কণ্ঠ এবার আরও নিচু। “তুমি পাহাড়ের ঢাল পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কয়েক মিনিট পর ড্যানিয়েলকে ওরা হত্যা করে।”

বাতাস থেমে গেছে বলে মনে হলো। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সামনের লোকটা রাইফেল তুলল। 

লারসেন গুলি করল। আর পাহাড় আবার বন্দুকের শব্দে কেঁপে উঠল।

মারদেকা এখন জানে, কেন লারসেন তাকে সন্তানের মত দেখে। তের বছর আগে সে যদি দল ছেড়ে পালিয়ে না যেত, হয়তো তার বাবাকে মরতে হতো না। মুলত অপরাধবোধের প্রায়শ্চিত্ত করতেই তাকে কাছে টেনে নেওয়া। 

আজকের মারদেকাকে সে ড্যানিয়েল রিডের ছায়া হিসেবে গড়ে তুলেছে। সে কারণেই তার অতীত খুঁজে পেতে তাকে সাথে নিয়েই পাহাড়ে এসেছে। মাথার ভেতর সবসময় শব্দ করা তার অতীত আজ পরিস্কার ছবি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

আর সেই অতীতের মাঝখানে, বন্দুকের ধোঁয়া আর পাহাড়ের ধুলোর মধ্যে, এখনও জীবিত দাঁড়িয়ে আছে তার বাবার হত্যাকারীদের নেতা, ভিক্টর কেইন।

পাহাড়ের শেষ ঢালটা নিচের দিকে নেমে গেছে অনেকটা, কিন্তু পথটা সহজ নয়। রাতের শেষ অন্ধকার তখন ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাচ্ছে, পূর্ব আকাশে জমে থাকা ধূসর আলো পাথরের ধারগুলোকে একে একে আলাদা করে তুলছে। কিছুক্ষণ আগেও যে জায়গাগুলো শুধু কালো ছায়া ছিল, এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে ভাঙা ঢাল, শুকনো ঝোপ, গিরিখাতের মুখ আর বহু বছরের বৃষ্টিতে কেটে যাওয়া সরু জলধারা।

তিনজনের সামনে পাহাড় শেষ হয়ে দূরে খোলা জমি শুরু হয়েছে, কিন্তু সেই খোলা জায়গা এখনও অনেক দূরে। তার আগেই রয়েছে কয়েকটি উঁচুনিচু ঢাল, পাথরের ফাঁক, আর এমন কিছু জায়গা যেখানে আড়াল না পেলে মানুষের শরীর খোলা আকাশের নিচে সহজ লক্ষ্য হয়ে যায়।

এলিয়াস মাঝখানে হাঁটছিল। তার কাঁধের ক্ষত শক্ত করে বাঁধা হয়েছে, কিন্তু রক্ত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কাপড়ের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে গাঢ় দাগ ছড়িয়ে পড়ছে। তার মুখ ফ্যাকাশে, তবু সে নিজের পায়ে হাঁটছে। লারসেন তার কাছাকাছি ছিল, আর মারদেকা সামনে কয়েক গজ দূরে পথ দেখছিল। ছেলেটার হাঁটার ভঙ্গিতে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু দ্বিধা ছিল না। 

কয়েক ঘণ্টা আগেও এই পাহাড় তার কাছে ছিল রহস্যে ভরা এক অন্ধকার জায়গা, যেখানে সে নিজের অতীতের ছিন্ন  অংশ খুঁজছিল। এখন রহস্যের অনেকটাই তার সামনে খুলে গেছে। তার বাবার নাম ড্যানিয়েল রিড। সে ছিল স্কাউট, পথচেনা মানুষ, লারসেনের পুরোনো সঙ্গী। আর ভিক্টর কেইন, সেই পুরোনো দলের বিশ্বাসঘাতক, বহু বছর মৃত বলে পরিচিত থেকেও বেঁচে আছে।

সবচেয়ে বড় কথা, মারদেকা এখন জানে কে সেই শব্দটা উচ্চারণ করে তাকে পালাতে বলেছিল। সেই রাতের আগুনের মধ্যে, গুলির শব্দ আর মানুষের চিৎকারের ভেতর, তার বাবা তাকে ডাক দিয়ে বলেছিল, দৌড়াও।

আর সে দৌড়েছিল। তারপরই ড্যানিয়েল রিডকে হত্যা করা হয়েছিল।

মারদেকা হাঁটতে হাঁটতে হাতের মুঠো শক্ত করল। কোমরের ছুরির হাতল তার তালুর কাছে ঠান্ডা লাগছিল। সে নিজের বাবাকে মনে করতে পারে না। মুখ মনে নেই। কণ্ঠের সম্পূর্ণ রূপও নেই। কিন্তু সেই একটি শব্দ রয়ে গেছে। হয়তো স্মৃতির সবকিছু ভেঙে গিয়েছিল, আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল, তারপর বছরের পর বছর ধরে তার মাথার ভেতর শুধু একটি শব্দ বেঁচে ছিল। দৌড়াও।

এখন আর সেই শব্দ তাকে ভয় দেখায় না। এখন সে জানে, কে বলেছিল। কেন বলেছিল। হঠাৎ মারদেকা থেমে গেল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে এলিয়াসকে থামতে বলল। কয়েক মুহূর্ত কেউ নড়ল না।

মারদেকা মাথা সামান্য নিচু করল। তার চোখ সামনে, কিন্তু সে দেখার চেয়ে বেশি শুনছে। ভোরের আগে পাহাড়ের বাতাসে একটা বিশেষ ধরনের নীরবতা থাকে। রাতের প্রাণীরা গর্তে ফিরে যায়, দিনের পাখিরা এখনও পুরোপুরি ডাক শুরু করে না। সেই নীরবতার মধ্যে দূরের শব্দও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
 
প্রথমে কিছুই শোনা গেল না। তারপর। খট। খুব ক্ষীণ শব্দ। যেন ধাতব কোনো বস্তু পাথরে ঠেকেছে। তারপর শুকনো পাথরের ওপর বুটের চাপ। মারদেকা ধীরে ডান দিকে তাকাল।

লারসেনের হাত ইতিমধ্যেই পিস্তলের ওপর। “কতজন?”

মারদেকা উত্তর দিল না। সে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর নিচু স্বরে বলল, “সামনে দুজন।” একটু থেমে সে মাথা ঘুরিয়ে বাম দিকের ঢালের দিকে তাকাল। “আর একজন ওপরে।”

এলিয়াসের মুখ শক্ত হয়ে উঠল।

লারসেন ধীরে বলল, “কেইন?”

“জানি না।” মারদেকা বলল। “কিন্তু ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

তিনজন সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেল। তাদের সামনে যে জায়গাটা ছিল, সেটা একটা শুকনো জলধারার মতো নিচু হয়ে গেছে। বর্ষার সময় হয়তো এখানে পাহাড়ের ওপর থেকে পানি নেমে আসে, কিন্তু এখন শুধু পাথর আর শুকনো মাটি। তার ওপরে দুপাশে উঁচু ঢাল। সামনে এগোতে হলে ওই খোলা অংশ পার হতে হবে।

লারসেন চারপাশে একবার তাকাল। “ফিরে যাওয়া যাবে?”

এলিয়াস মাথা নাড়ল। “পেছনেও ওরা আছে।”

এই কথার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দূর থেকে ঘোড়ার ক্ষীণ শব্দ এল। শব্দটা অনেক নিচে নয়, বরং পাহাড়ের অন্য দিক থেকে। শত্রুরা তাদের ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। লারসেন বুঝতে পারল, কেইন পুরোনো পথগুলো এখনও মনে রেখেছে। তেরো বছর আগের সেই দল ভেঙে গেছে, মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে, কেউ মারা গেছে, কেউ হারিয়ে গেছে, কিন্তু যে মানুষটা পথ বিক্রি করে জীবন কাটিয়েছে, সে পথ ভুলে যায়নি।

ভোরের আলো আরও একটু বেড়ে উঠল। আর সেই আলোতেই সামনে পাথরের আড়াল থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এল। 

সে একা দাঁড়িয়ে আছে। দূরত্ব এত বেশি নয় যে তাকে দেখা যায় না, আবার এত কমও নয় যে তার মুখ পরিষ্কার বোঝা যায়। মাথায় কালো টুপি। কাঁধে রাইফেল। সে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, “এত বছর পরও তুমি একইভাবে হাঁটো, লারসেন।”

লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না। “আর তুমি এখনও ছায়ার আড়াল থেকে কথা বলো, কেইন।”

লোকটা হেসে উঠল। “ছায়া আমাকে অনেক বছর বাঁচিয়ে রেখেছে।” তারপর সে সামান্য মাথা কাত করল। “তুমি ভেবেছিলে আমি মরে গেছি।”

“আমরা সবাই তাই ভেবেছিলাম।” এলিয়াসের গলা ভারী ছিল।

সামনের লোকটা এবার তার দিকে তাকাল। “এলিয়াস।” তার কণ্ঠে এমন একটা স্বর ছিল, যেন বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো দরজা হঠাৎ আবার খুলে গেছে। “তুমিও বেঁচে আছ।”

এলিয়াস উত্তর দিল না।

ভিক্টর কেইন ধীরে ধীরে সামনে এগোল না। সে জানত, আরেক কদম এগোলেই লারসেনের পিস্তলের নাগালের মধ্যে চলে আসবে। সে জানে বহু বছর আগে লারসেন দল ছেড়ে গেলেও তার বন্দুক তাকে ঠিকই টিকিয়ে রেখেছে। বরং সময়ের তোড়ে ওলফ লারসেন নেকড়ের মতই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। তাই সে নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তার চোখ মারদেকার ওপর এসে থামল। কয়েক মুহূর্ত সে কিছু বলল না।

মারদেকা স্থির দাঁড়িয়ে ছিল। তার শরীরের বেশিরভাগ অংশ পাথরের আড়ালে, কিন্তু মুখ দেখা যাচ্ছে। কেইনের চোখ ধীরে ধীরে তার মুখের ওপর ঘুরে গেল। কপাল, চোখ, গালের রেখা, চোয়াল। তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

দূরের একজন শত্রু, যে অন্য একটা পাথরের আড়ালে ছিল, হঠাৎ সামনে একটু ঝুঁকে তাকাল। ভোরের আলো এবার যথেষ্ট। সে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর বিস্মিত গলায় বলে উঠল, “কেইন ওকে দেখো।”

কেইন নড়ল না।

লোকটা আবার বলল, “ছেলেটাকে দেখো।”

মারদেকার বুকের ভেতর কিছু একটা শক্ত হয়ে উঠল।

লোকটার কণ্ঠ এবার আরও স্পষ্ট। “ড্যানিয়েল রিডের মতো দেখতে।”

কয়েক মুহূর্ত পাহাড়ের সব শব্দ যেন থেমে গেল। বাতাস বইছিল। দূরে কোথাও একটা পাখি ডেকে উঠেছিল। কিন্তু মারদেকার কানে কিছুই পৌঁছাল না। শুধু সেই কথাটা ছাড়া, ড্যানিয়েল রিডের মতো দেখতে।

তারপর কেইনের চোখের ভেতর ধীরে ধীরে এমন একটা দৃষ্টি জন্ম নিল, যা লারসেনকে আরও সতর্ক করে তুলল। 

“তাহলে সত্যিই।”  বলল কেইন, &quot;সে বেঁচে আছে।”

লারসেন এবার পিস্তল পুরোপুরি বের করল। “আর তুমি তাকে আর একবার দেখার সুযোগ পাবে না।”

কেইনের ঠোঁটে আবার হাসি ফুটল। “তেরো বছর, লারসেন। তেরো বছর আমি তোমার কাছে মৃত মানুষ হয়ে ছিলাম। আর দীর্ঘ ছয় বছর পর আমি জানতে পারলাম, ড্যানিয়েল রিডের ছেলে সেদিন মরে যায়নি।” সে চোখ সরাল না মারদেকার দিক থেকে। &quot;এত বছর পরে সে তোমার কাছেই এসে পড়েছে।”

মারদেকা হঠাৎ বলল, “তুমি আমার বাবাকে মেরেছিলে?” প্রশ্নটা বলার পর সে নিজেই অবাক হলো, তার গলা কাঁপেনি।

ভিক্টর কেইন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তোমার বাবা নিজের মৃত্যুর কারণ নিজেই হয়েছিল।”

মারদেকার হাত ছুরির হাতলে চলে গেল। “মিথ্যে।”

এলিয়াসের কণ্ঠ হঠাৎ পাহাড়ের বাতাস কেটে বেরিয়ে এল। কেইন তার দিকে তাকাল। তার মুখ ফ্যাকাশে, কাঁধে রক্তের দাগ, তবু চোখে সেই মুহূর্তে কোনো দুর্বলতা ছিল না। “ড্যানিয়েল জানত তুমি কী করছ। সে জানত তুমি পথ বিক্রি করেছ। সে জানত, তুমি যাদের আমাদের খবর দিয়েছিলে, তাদের মধ্যে কয়েকজন মারা গেছে।”

কেইন হাসল না।

এলিয়াস বলল, “সে প্রমাণ নিয়ে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল।”

“সে প্রমাণ কোথায়?” কেইনের কণ্ঠ ঠান্ডা।

লারসেন উত্তর দিল, “যেখানে তোমার হাত পৌঁছাবে না।”

এই কথার পর আর কোনো সতর্কতা রইল না। প্রথম গুলিটা কেইনের দিক থেকে এল।

লারসেন মারদেকার কাঁধ ধরে তাকে নিচে টেনে ফেলল। গুলিটা তাদের মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে পাথরে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে বন্দুকের শব্দ শুরু হয়ে গেল। পাথরের গায়ে গুলি লেগে ধুলো উড়ছে, শুকনো মাটি ভেঙে ছোট ছোট কণা ছড়িয়ে পড়ছে। ভোরের আলো এখন পাহাড়কে পুরোপুরি প্রকাশ করে দিয়েছে, আর সেই আলোয় মানুষগুলো আর ছায়া নয়। তারা বাস্তব শত্রু।

লারসেন একটা পাথরের আড়াল থেকে উঠে দুবার গুলি করল। একজন লোক সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেল।

এলিয়াস তার রাইফেল তুলে কাঁধের ব্যথা সামলে নিশানা করল। তার প্রথম গুলি কোথায় লাগল বোঝা গেল না, কিন্তু পাহাড়ের ওপর থেকে একটা চিৎকার ভেসে এল।

মারদেকা পাথরের সঙ্গে শরীর চেপে ছিল। তার পাশে একটা রাইফেল পড়ে ছিল, কিছুক্ষণ আগে এলিয়াস নিচে বসার সময় হাত থেকে রেখে দিয়েছিল। সে রাইফেলের দিকে তাকাল। তারপর নিজের হাতের দিকে।

সে বন্দুক ধরতে জানে না। কিন্তু সে জানে বন্দুক দিয়ে মানুষ মারা যায়। এই সত্যটা এতদিন তার কাছে দূরের ছিল। সে বন্দুকের শব্দ শুনেছে, বন্দুক দেখেছে, লারসেনের কোমরে কোল্ট দেখেছে। কিন্তু একটা মানুষের দিকে বন্দুক তাক করা কেমন, সেটা সে জানে না।

তার বুকের ভেতর ভয় জমে উঠল। আর ঠিক তখনই তার মাথার ভেতর আবার সেই শব্দটা ফিরে এল। দৌড়াও। কিন্তু এবার সে জানে, সেই শব্দ কোথা থেকে এসেছে। তার বাবা তাকে বাঁচাতে বলেছিল। সাত বছরের মারদেকা দৌড়েছিল। 

তেরো বছরের মারদেকা পাথরের আড়ালে বসে রইল। সে দৌড়াল না। তার চোখ পাথরের ওপর দিয়ে দ্রুত চারপাশে ঘুরে গেল। সামনে দুইজন। ডান দিকে একজন। কিন্তু একটু আগে যে লোকটা ওপরে ছিল, সে এখন কোথায়?

মারদেকা মাথা সামান্য কাত করল। বন্দুকের শব্দের ফাঁকে সে অন্য একটা শব্দ পেল। পাথর গড়াল। খুব ছোট শব্দ। তারপর বুট। উঁচু জায়গা থেকে নিচে নামছে কেউ। সে লারসেনের কাঁধে হাত রাখল। “বাঁ দিকে দেখুন।”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল না। “কোথায়?”

“ওপরে ছিল। এখন নিচে নামছে।”

এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর পাথরের আড়াল থেকে একজন মানুষ উঠে আসতেই লারসেনের গুলি ছুটল। লোকটা চিৎকার করে পেছনে পড়ে গেল। 

মারদেকা চোখ বন্ধ করল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল।

লারসেন তার দিকে একবার তাকাল। কিছু বলল না। তারপর আবার গুলি শুরু হলো।

এবার তাদের অবস্থান বদলাতে হবে। তারা যেখানে আছে, সেখানে বেশিক্ষণ থাকলে শত্রুরা দুই দিক থেকে ঘুরে এসে তাদের আটকে ফেলবে। 

মারদেকা সামনে একটা নিচু পথ দেখতে পেল। শুকনো ঝোপের ভেতর দিয়ে গেছে। বাইরে থেকে পুরোটা দেখা যায় না। সে বলল, “ওদিকে গেলে নিচে নামা যাবে।”

এলিয়াস তার দিকে তাকাল। “তারপর?”

“তারপর একটা পাথরের দেয়াল আছে। তার পেছনে পথ।” 

লারসেন জিজ্ঞেস করল, “তুমি দেখেছ?”

মারদেকা মাথা নাড়ল। “শুনেছি।”

লারসেনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত একটা দৃষ্টি দেখা গেল। এত অল্প বয়সে এই ছেলেটা কীভাবে পাহাড়কে এভাবে পড়ে নিতে পারে, সে হয়তো এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারে না। কিন্তু এখন প্রশ্ন করার সময় নয়। “এগিয়ে যাও।”

মারদেকা নিচু হয়ে বেরিয়ে এল।

লারসেন তার পেছনে গুলি চালিয়ে আড়াল তৈরি করল। এলিয়াস কষ্ট করে রাইফেল হাতে এগোল। তার আহত কাঁধ এবার প্রায় অসাড় হয়ে এসেছে, কিন্তু সে অস্ত্র ফেলে দেয়নি।

তারা শুকনো ঝোপের ভেতর ঢুকতেই ডান দিক থেকে গুলি এল। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে শুয়ে পড়ল। লারসেনও নিচু হয়ে গেল। 

কিন্তু এলিয়াস এত দ্রুত নড়তে পারল না। গুলিটা তার পাশ দিয়ে চলে গেল, কাঁধে নয়, পাথরে লাগল। তবু ছিটকে আসা ধারালো পাথরের টুকরো তার মুখের পাশে কেটে দিল। সে একবার চোখ বন্ধ করল, তারপর আবার উঠে দাঁড়াতে গেল।

মারদেকা তার কাছে পৌঁছাল। “চলুন।”

এলিয়াস বলল, “আমি পারছি।”

“আমি জানি।” মারদেকা উত্তর দিল। তারপর দুজন আবার এগোল।

সামনে পাথরের দেয়ালটা দেখা গেল। খুব উঁচু নয়, কিন্তু তার নিচে একটা সরু ফাঁক। একসঙ্গে দুজন যেতে পারবে না। মারদেকা আগে ঢুকে ভেতরের জায়গাটা পরীক্ষা করল। পেছনে গুলির শব্দ আরও কাছে এসেছে। সে ঘুরে বলল, “এখানে।”

এলিয়াস আগে ঢুকল। তারপর লারসেন। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে একজন শত্রু ঝোপ ভেঙে বেরিয়ে এল। সে মারদেকাকে দেখতে পেয়ে থেমে গেল। হয়তো সে ভাবেনি, ছেলেটা এত কাছে থাকবে।

তার রাইফেল কাঁধে ওঠার আগেই মারদেকা নিচু হয়ে গেল। গুলি তার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল। 

মারদেকা কোমর থেকে ছুরি বের করল। লোকটা রাইফেল ফেলে হাত দিয়ে তাকে ধরতে এগোল।

মারদেকা পেছনে সরে গেল না। সে লোকটার হাতের নাগালের বাইরে পাশ কাটিয়ে গেল। লারসেনের শেখানো পায়ের কাজ তখন তার শরীরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে সে আর আলাদা করে ভাবতে হয় না। লোকটা তার দিকে ঘুরতেই মারদেকা নিচু হয়ে তার হাঁটুর পেছনে পা ঠেকাল। লোকটা ভারসাম্য হারাল।

মারদেকা তার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল না। সে পাশ কাটিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছুরির হাতল দিয়ে লোকটার মাথার পাশে আঘাত করল। লোকটা গড়িয়ে পড়ল। তার হাত থেকে পিস্তল বেরিয়ে মাটিতে পড়ল।

মারদেকা পিস্তলের দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, সে সেটা তুলে নিতে পারে। কিন্তু সে তুলল না। সে ছুরিটা শক্ত করে ধরে আবার ফাঁকের ভেতর ঢুকে গেল।

পেছনে লারসেনের গলা শোনা গেল। “দ্রুত!” তিনজন আবার চলতে শুরু করল।

এবার পথটা পাহাড়ের নিচের দিকে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আলো বেড়ে যাচ্ছে। আকাশে হালকা সোনালি রং দেখা দিয়েছে। দূরে, বহু নিচে, খোলা প্রান্তরের ওপর কুয়াশার মতো ধুলো ভাসছে।

মারদেকা প্রথমবার বুঝতে পারল, তারা সত্যিই পাহাড়ের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু পেছনে এখনও গুলির শব্দ। আর সামনে এখনও শত্রুর শেষ মানুষটি। ভিক্টর কেইন।

হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। এতক্ষণ ধরে চলা গুলির লড়াইয়ের পর সেই নীরবতা অস্বাভাবিক লাগল।

লারসেন থামল। এলিয়াস পাথরের গায়ে হেলান দিল। মারদেকা সামনে তাকিয়ে রইল। তারপর পাহাড়ের ওপর থেকে ঘোড়ার শব্দ এল। একটি। তারপর আরেকটি।

মারদেকা মাথা তুলল। উঁচু ঢালের কিনারায় ভিক্টর কেইনকে দেখা গেল। সে একা। তার সঙ্গে আর কেউ নেই। তার ঘোড়াটা কালো পাথরের পাশে দাঁড়িয়ে। সূর্যের প্রথম আলো তার টুপির কিনারা ছুঁয়ে গেছে। সে অনেকক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।

লারসেন পিস্তল তুলল। কিন্তু দূরত্ব বেশি।

কেইনও জানে। সে শুধু একবার মারদেকার দিকে তাকাল। তারপর ঘোড়ার লাগাম ঘুরিয়ে দিল।

এলিয়াস নিচু স্বরে বলল, “ওকে যেতে দিও না।”

লারসেন গুলি করল। গুলিটা কেইনের অনেক দূরে পাথরে আঘাত করল।

কেইন আর পেছনে তাকাল না।

আরও কয়েকজন ঘোড়সওয়ার, যারা হয়তো আগে থেকে অন্য ঢালের আড়ালে ছিল, একে একে তার সঙ্গে মিলল। তাদের সংখ্যা বেশি নয়। বন্দুকযুদ্ধে যারা পড়েছে, তাদের কেউ আর ফিরছে না।

ভিক্টর কেইন পাহাড়ের কিনারা ধরে পশ্চিমের দিকে ঘুরে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তারা দৃষ্টির বাইরে।

মারদেকা স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, এতক্ষণ ধরে যে মানুষটাকে সে শুধু নাম হিসেবে চিনত, সে এখন বাস্তব। সে তার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। সে মারদেকাকে খুঁজছে। এবং সে পালিয়ে গেছে।

লারসেন ধীরে পিস্তল নামাল। তার হাতের ক্ষত থেকে আবার রক্ত বের হচ্ছে।

এলিয়াস ক্লান্ত গলায় বলল, “সে জানে আমরা কোথায় যাব।”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। মারদেকা ঘুরে তাকাল।

দূরের প্রান্তর তখন সূর্যের আলোয় ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠছে। পাহাড় শেষ হয়েছে। সামনে বিস্তৃত খোলা পৃথিবী। 

ছেলেটার মুখে ধুলো, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, জামায় পাথরের ঘষায় দাগ। কিন্তু তার চোখ আর আগের মতো নয়।

সে এখন জানে সে কে। সে জানে তার বাবা কে ছিল। সে জানে কেন তার বাবা মারা গেছে। আর সে জানে, ছয় বছর আগে আগুনের মধ্যে যে ছেলেটা দৌড়ে পালিয়েছিল, তাকে এখনও একজন মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

লারসেন ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। র‌্যাঞ্চে ফেরে চল।”

এলিয়াস পাথর থেকে নিজেকে সোজা করল। “কেইনও সেদিকেই যাবে।”

লারসেন দূরের প্রান্তরের দিকে তাকাল। তার মুখে ক্লান্তি ছিল, রক্ত ছিল, কিন্তু চোখে ছিল পুরোনো সেই কঠিন স্থিরতা। “তাহলে এবার ওকে সেখানে স্বাগত জানানো হবে।”

তারা পাহাড়ের শেষ ঢাল ধরে নিচে নামতে শুরু করল। মারদেকা এবারও সামনে হাঁটছিল। কিন্তু এইবার সে শুধু পথ দেখাচ্ছিল না। তার পেছনে পড়ে থাকল সেই পাহাড়, যেখানে সে নিজের জীবনের সব প্রশ্নগুলোর উত্তর পেয়েছে। 

সামনে আছে খোলা প্রান্তর। ঘোড়া। র‌্যাঞ্চ। আর অপেক্ষা করছে আরেকটি যুদ্ধ। পাহাড় তাকে তার অতীত ফিরিয়ে দিয়েছে। এবার সামনে অপেক্ষা করছে তার ভবিষ্যৎ।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/269998/</link>
				<pubDate>Sat, 05 Sep 2026 03:46:39 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২৬<br />
পাহাড়ের ঢাল এবার ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে এসেছে, কিন্তু পথ সহজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপদ কমেনি। বরং সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের প্রতিটি পাথর, প্রতিটি শুকনো ঝোপ, প্রতিটি উঁচু ঢাল এমন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে লুকিয়ে থাকার সুযোগ যেন আরও কমে আসছিল।</p>
<p>মারদেকা সবার আগে হাঁটছিল। তার চোখ কখনও&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-269998"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/269998/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">7b38e01302932b958fecff7f52bcebe8</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২৫
পাথরের ফাঁকটার ভেতর দিয়ে নিচে নামার সময় প্রথমেই মারদেকার মনে হয়েছিল, পৃথিবী যেন হঠাৎ তার পায়ের নিচ থেকে সরে গেছে। ওপরে গিরিখাতের মুখে তখনও গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। 

মারদেকা নিচের দিকে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। অন্ধকার এত গভীর ছিল যে মনে হচ্ছিল পাহাড়ের ভেতর একটা কালো কুয়ো মুখ খুলে আছে। কিন্তু তার কান ধীরে ধীরে অন্য শব্দ ধরতে শুরু করল। কোথাও জল পড়ছে, খুব ধীরে, নিয়মিত বিরতিতে। নিচে এলিয়াসের বুট যখন কোনো ধাপে পড়ছে, তখন পাথরের ভেতর থেকে একটা ভারী প্রতিধ্বনি উঠে আসছে।

কিছুক্ষণ পর এলিয়াস থামল। “এখান থেকে সাবধানে নামো। আর মাত্র কয়েক ধাপ।”

মারদেকা পাথরের দেয়াল ধরে শরীর নামাল। তার ডান পা প্রথমে শূন্যে ঝুলে রইল, তারপর একটা শক্ত জায়গায় গিয়ে ঠেকল। সে শরীরের ভার সেখানে দিল। আরেক ধাপ। তারপর আরেকটা। হঠাৎ তার পা সমতল মাটিতে পড়ল।

একটু দূরে এলিয়াস দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ছোট্ট একটা লণ্ঠন। কখন সেটি জ্বালাল, মারদেকা বুঝতে পারেনি। হলদে আলো জ্বলে উঠতেই সে জায়গাটা দেখতে পেল। এটা কোনো সুড়ঙ্গ নয়। পাহাড়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটা পুরোনো আশ্রয়স্থল।

পাথরের স্বাভাবিক গুহাটাকে বহু বছর আগে মানুষের হাত বদলে দিয়েছে। দেয়ালের কয়েকটি জায়গা সমান করে কাটা, মেঝে থেকে বড় পাথর সরিয়ে ফেলা হয়েছে, এক পাশে শুকনো কাঠের ভাঙা তাক এখনও দেয়ালে গেঁথে আছে। অন্য পাশে একটা পাথরের চৌকির মতো উঁচু জায়গা। মেঝের এক কোণে মরচে ধরা টিনের পাত্র, আরেক পাশে ভেঙে পড়া কাঠের বাক্সের কয়েকটি অংশ। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে পাথরের গন্ধ, যা কোনো পরিত্যক্ত ঘরে ঢুকলেই বোঝা যায়।

এলিয়াস লণ্ঠনটা একটু উঁচু করে ধরল। লারসেন তখন নিচে নেমে এসেছে। তার আহত হাতের কাপড়ে শুকনো রক্ত কালো হয়ে আছে। সে চারপাশে তাকাল, কিন্তু তার চোখে বিস্ময় দেখা গেল না। সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। মারদেকা তাকে অনুসরণ করল।

এক পাশে দেয়ালের গায়ে কয়েকটি লোহার হুক এখনও বসানো আছে। সেগুলো এতটাই মরচে পড়েছে যে প্রথম দেখায় পাথরের অংশ বলেই মনে হয়। আরেক পাশে শুকনো কাঠের ভাঙা দরজার মতো কিছু ছিল, সম্ভবত কোনো ছোট কুঠুরি বা খাদ্য রাখার জায়গা। মেঝেতে ছাইয়ের পুরোনো দাগ। লারসেন হাঁটু গেড়ে বসে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “শেষবার এখানে এসেছিলাম প্রায় তেরো বছর আগে।”

মারদেকা লারসেনের দিকে তাকাল। তেরো বছর শব্দটা তার মনে কেমন যেন ধাক্কা দিল। তার জীবনের পুরো সময়টা যেন এমন এক অতীতের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যার শুরু হয়েছিল তার জন্মেরও অনেক আগে।

এলিয়াস দেয়ালের পাশে গিয়ে লণ্ঠনটা একটা পাথরের ওপর রাখল। &quot;তুমি তো তাও দল থেকে পালিয়ে বেঁচে গিয়েছিলে। কিন্তু, আমাকে দলের সাথে থেকেও শেষমেশ নিজের জীবন বাঁচাতে এদ্দিন পালিয়ে থাকতে হয়েছে।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন। “তাহলে আমরা এখানে কেন এসেছি?” বললো সে।

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না। দূরে কোথাও জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। টুপ। তারপর বিরতি। আবার টুপ।

এলিয়াস ধীরে ধীরে বলল, “কারণ তোমার বাবার সঙ্গে এই জায়গাটার সম্পর্ক ছিল।” তারপর যোগ করল, &quot;তোমরা এখানে না এলে আমার সাথে কখনোই দেখা হতো না। যদিও আমি জানতাম, একদিন লারসেন আসবেই।&quot; কথাটা সে লারসেনের দিকে ফিরে শেষ করলো। 

মারদেকা স্থির হয়ে গেল। লারসেনের মুখের দিকে তাকিয়ে সে তাকে বুঝতে চেষ্টা করল, &quot;তারমানে আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?” 

লারসেন কিছুক্ষণ উত্তর দিল না। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “চিনতাম।”

এই একটি শব্দের পর আশ্রয়স্থলটা যেন আরও নীরব হয়ে গেল। 

মারদেকা এতদিন নিজের বাবাকে নিয়ে খুব কম জানত। পাহাড়ের সেই গ্রামে তার মায়ের গোষ্ঠীর লোকেরা তাকে কখনও পুরোপুরি আপন করে নেয়নি। কেউ সরাসরি কিছু বলত না, কিন্তু সে ছোটবেলা থেকেই বুঝেছিল, তার মধ্যে এমন কিছু আছে যা অন্যদের থেকে তাকে আলাদা করে। তার গায়ের রং, মুখের গঠন, চোখের দৃষ্টি, সবকিছুই ছিল ভিন্ন। 

সে জানত তার বাবা একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষ ছিল। তাকে নিয়ে একদিন শিকারে গিয়েছিল, তারপর আর ফিরে আসেনি। সে একাই তার মায়ের কাছে ফিরেছিল। এখন লারসেন বলছে, সে বাবাকে চিনত। অথচ বছর খানেক  আগে সে নিজেই এই মানুষটাকে চিনেছে। মারদেকার গলা শুকিয়ে এল। “তিনি কেমন মানুষ ছিলেন?”

লারসেন ধীরে ধীরে পাথরের চৌকির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর দেয়ালে হাত রাখল। মনে হলো, সে কথাগুলো নিজের ভেতর থেকে টেনে বের করছে। “ভালো স্কাউট ছিল। যে জায়গায় অন্য মানুষ শুধু পাথর দেখত, সে সেখানে পথ দেখত। যেখানে কেউ পুরোনো খুরের দাগ দেখে কিছু বুঝত না, সে বলতে পারত কতক্ষণ আগে ঘোড়া গেছে, কতগুলো ঘোড়া, আর তারা তাড়াহুড়ো করছিল কি না।”

লারসেন একবার মারদেকার দিকে তাকাল। “তোমার এই ক্ষমতাগুলোর কিছু হয়তো তার কাছ থেকেই এসেছে।”

মারদেকা চুপ করে রইল। তার ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিল। এতদিন তার দক্ষতাগুলো ছিল শুধু তার নিজের। সে পাহাড়ে চলতে জানে, শব্দ শুনে মানুষ আর পশুর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে, মাটির দাগ থেকে পথ বুঝতে পারে, অন্ধকারে চোখের চেয়ে কানকে বেশি বিশ্বাস করতে জানে। এগুলো সে শিখেছে প্রায় পুরোটাই লারসেনের কাছ থেকে। এখন সে প্রথমবার ভাবল, তার রক্তের মধ্যেও হয়তো এই শিক্ষার বীজ লুকিয়ে ছিল। 

এলিয়াস পাথরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার বাবা শুধু শিকারি ছিল না।”

লারসেন এবার তাকে থামাল না। 

“আমরা তখন কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে কাজ করতাম। আমাদের কোনো অফিস ছিল না, কোনো পতাকা ছিল না, নিজেদের পরিচয় দেওয়ার মতো কোনো নামও ছিল না। সীমান্তের এই অংশটা তখন এমন সব মানুষের হাতে ছিল, যারা আইনকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করত। যারা টাকা দিয়ে মানুষ কিনত, অস্ত্র চালাত, মানুষকে সীমান্ত পার করাত, আবার প্রয়োজন হলে সেই মানুষকেই মরুভূমিতে ফেলে রেখে চলে যেত।”

মারদেকা স্থির চোখে শুনছিল। 

এলিয়াস আবার বলল, “সবাই অপরাধী ছিল না যারা সীমান্ত পার হতো। কেউ পালিয়ে যেত হত্যার ভয় থেকে, কেউ পরিবারকে বাঁচাতে, কেউ এমন জায়গায় পৌঁছাতে চাইত যেখানে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমরা কিছু মানুষকে নিরাপদে পথ দেখাতাম। আবার যারা এই পথ ব্যবহার করে খারাপ কাজ করত, তাদের খবরও জোগাড় করতাম।”

“আর আমার বাবা?”

“সে আমাদের সঙ্গে ছিল।” এবার লারসেন উত্তর দিল। “তবে সবসময় নয়। সে স্বাধীন মানুষ ছিল। কোনো জায়গায় বেশি দিন থাকত না। কিন্তু কঠিন পথ, বিপজ্জনক কাজ, আর এমন জায়গা যেখানে ভালো স্কাউট দরকার হতো, সেখানে তাকে পাওয়া যেত।”

মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, সে যেন নিজের বাবাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে, যদিও সেই মুখ সে মনে করতে পারে না। সে যে এতদিন কল্পনা করেছে, এবার সেটা বুঝতে পারছে। “তিনি মারা গিয়েছিলেন কীভাবে?”

প্রশ্নটা বেরিয়ে আসার পর কেউ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। লণ্ঠনের আলোয় এলিয়াসের মুখটা আরও বয়স্ক দেখাল। তার গালের কাটা দাগ, চোখের নিচের গভীর ছায়া, সবকিছু যেন হঠাৎ অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল। 

লারসেন ধীরে ধীরে পাথরের দেয়াল থেকে হাত সরিয়ে নিল। তারপর সে নিজের কোটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কালো ধাতব চাকতি দুটির একটি বের করল। ওটা লণ্ঠনের আলোয় মেলে ধরল। কালো ধাতুর ওপর বহু বছরের আঁচড়। মাঝখানে ক্ষয়ে যাওয়া একটা চিহ্ন। “এগুলো ছিল পরিচয়ের চিহ্ন।” বলল সে।

এলিয়াস ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। “আমাদের দলে সবাই এগুলো পেত না। যারা কিছু নির্দিষ্ট পথ চিনত, যাদের ওপর কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল, তাদের কাছে থাকত।”

লারসেন দ্বিতীয় চাকতিটাও বের করল। সে একটি চাকতি উল্টে দেখাল। পেছনে ক্ষীণ কিছু খোদাই আছে। সময়ের সঙ্গে অনেকটাই মুছে গেছে। “প্রত্যেকটার সঙ্গে একটা নাম আর একটা নির্দিষ্ট পথের সম্পর্ক ছিল।”

মারদেকা তাকিয়ে রইল। এতদিন ধরে এই চাকতিগুলো তার কাছে ছিল একটা রহস্য। কোথা থেকে এসেছে, কেন মানুষ এগুলোর জন্য মরতে বা মারতে প্রস্তুত, লারসেন কেন এগুলো এত সাবধানে রাখে, সে জানত না। সে ধীরে বলল, “তাহলে এগুলো কি প্রমাণ করে?”

এবার লারসেনের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল। “এটাই প্রমাণ করে যে কিছু মানুষ একসময় আমাদের সঙ্গে ছিল। যদিও পরে আমি ভুল বুঝতে পেরে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করি। কিন্তু তোমার বাবা দলের সঙ্গে ঠিকই থেকে যায়।”

আশ্রয়স্থলের ভেতর হঠাৎ ঠান্ডা আরও বেড়ে গেছে বলে মনে হলো। মারদেকা চোখ সরাল না। “আমার বাবা কি তবে খুন হয়ে ছিল?”

লারসেন এবার কোনো উত্তর দিল না। তার বদলে এলিয়াস বলল, “তোমার বাবা এমন কিছু জানতে পেরেছিল, যা তার জানা উচিত ছিল না।”

“কী?” মারদেকার কন্ঠ উচ্চকিত।

এলিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর পাথরের চৌকির ওপর বসে পড়ল। তার আহত পা একটু সামনে ছড়িয়ে দিল। সে ক্লান্ত। কিন্তু ক্লান্তির চেয়েও বেশি, যেন এতদিন ধরে বয়ে বেড়ানো একটা বোঝা নামানোর আগে মানুষ যেমন স্থির হয়ে বসে, তার মধ্যে সেই ভাব। সে বলল, “আমাদের মধ্যে একজন ছিল। সে অন্যদের চেয়ে বেশি টাকা চাইত। ক্ষমতাও চাইত। প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি। কারণ সে খুব ভালোভাবে নিজের কাজ করত।”

“তারপর?” মারদেকার গলা চাপা।

“তারপর কিছু পথ ভুল মানুষের হাতে পৌঁছে যেতে লাগল।” এলিয়াসের চোখে লণ্ঠনের আলো কাঁপল। “যে মানুষগুলোকে আমরা নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতাম, তাদের কেউ কেউ পথে আক্রমণের মুখে পড়ত। কিছু চালান অদৃশ্য হয়ে যেত। যারা বিপজ্জনক অপরাধীদের বিরুদ্ধে খবর জোগাড় করত, তাদের মধ্যে কয়েকজন আর ফিরে আসত না।”

লারসেন পাথরের মত দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। 

&quot;আমরা ভাবতাম আমাদের কেউ অনুসরণ করছে।” এলিয়াস তখনও বলে চলেছে। “পরে বুঝলাম, অনুসরণ করার দরকার ছিল না। খবর আমাদের ভেতর থেকেই বের হচ্ছিল।”

মারদেকা অনুভব করল, তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে একটা ভারী পাথর জমছে। “আমার বাবা সেটা জানতে পেরেছিলেন?”

এলিয়াস মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।” তারপর কিছুক্ষণ শুধু জল পড়ার শব্দ শোনা গেল। “তোমার বাবা একটা ভুল করেছিল।”

মারদেকা চোখ তুলল।

“সে লারসেনের মত পালিয়ে যায়নি।” এলিয়াসের কণ্ঠে অনুশোচনা ছিল। “সে দলের সাথে থেকে প্রমাণ জোগাড় করতে চেয়েছিল।”

লারসেন ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। ছোট আশ্রয়স্থলের মধ্যে তার বুটের শব্দ খুব পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল। “আমাদের কাউকে বিশ্বাস করবে কি না, সে জানত না। হয়তো ঠিকই করেছিল। কারণ বিশ্বাসঘাতক লোকটা এমন একজন ছিল, যাকে আমরা সবাই বিশ্বাস করতাম।” তাকে খুব অস্থির দেখালো, &quot; আমি ঠিকই তাকে চিনতে পেরেছিলাম। কিন্তু প্রমাণের অভাবে কিছু করতে পারছিলাম না। আমি জানতাম, দলের কেউ আমার কথা বিশ্বাস করবেনা। তাই নিজেই দল ছেড়ে পালালাম। সংগে নিয়ে গেলাম বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র।&quot;

“সেই লোকটার নাম কী?” মারদেকা প্রশ্ন করল।

এলিয়াস এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।  ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরে কোথাও একটা শব্দ হলো। তিনজনই স্থির হয়ে গেল। এটা গুলির শব্দ নয়। পাথরের ওপর বুটের শব্দও নয়। মনে হলো, ভারী কোনো জিনিস টেনে সরানো হয়েছে।

লারসেনের হাত সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলের দিকে গেল। লণ্ঠনের আলো কাঁপছে।

এলিয়াস ধীরে উঠে দাঁড়াল। “ওরা ফাঁকটা খুঁজে পেয়েছে।”

মারদেকা কিছু বলল না। সে মাথা সামান্য কাত করে শুনতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত পর তার কানেও শব্দটা এল। খুব মৃদু। তারপর আরেকটা। একাধিক মানুষের পা। তারা ওপরে দাঁড়িয়ে আছে, সম্ভবত ফাঁকটার মুখ পরীক্ষা করছে।

লারসেন লণ্ঠনের দিকে তাকাল। “এটা নিভিয়ে দাও।”

এলিয়াস এক ঝটকায় আলো নিভিয়ে দিল। আশ্রয়স্থল আবার অন্ধকারে ডুবে গেল। এবার অন্ধকারের ওপাশে মানুষ আছে। সশস্ত্র মানুষ। তারা জানে, লারসেন এখানে। আর এলিয়াস বেঁচে আছে। হয়তো তারা এটাও জানে, মারদেকাও তাদের নাগালের মধ্যে।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। অন্ধকারে মারদেকা শুধু অনুভব করছিল লারসেন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, এলিয়াস কোন দিকে। তার নিজের নিঃশ্বাস এখন অনেক ধীর। ভয়ের সময় সে আগে যেমন করত, তেমন করে চারপাশের শব্দ আলাদা করতে শুরু করল। উপরে দুজন। না, তিনজন। একজন একটু দূরে। তারপর আরেকটি শব্দ। লোহার কিছু পাথরে ঠেকল। মারদেকা নিচু গলায় বলল, “চারজন।”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর সে ফিসফিস করে বলল, “আমি তিনজন শুনেছি।”
 
“চতুর্থজন পেছনে।” মারদেকা বলল। “তার পা টেনে হাঁটার শব্দ হচ্ছে।”

তারপর ওপরে একটি কণ্ঠ শোনা গেল। শব্দগুলো স্পষ্ট নয়। পাথর আর দূরত্বের কারণে ভেঙে আসছে। কিন্তু একজন মানুষ অন্যদের নির্দেশ দিচ্ছে, সেটা বোঝা গেল।

লারসেন মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। “এখান থেকে আরেকটা পথ আছে?”

মারদেকা জানত, প্রশ্নটা এলিয়াসের জন্য। কিছুক্ষণ নীরবতা।

“আছে।” এলিয়াসের উত্তর আসতে একটু সময় লাগল। “কিন্তু, পথটা এখন আর আগের মতো নেই।”

লারসেনের কণ্ঠ কঠিন হলো। “তাহলে আমরা ওদিকেই যাব।”

এলিয়াস যেন কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেল। তারপর বলল, “আগে একটা কথা তোমাদের জানতে হবে।”

লারসেনের কণ্ঠে এবার চাপা রাগ ফিরে এল। “এলিয়াস, আমরা এখন পাথরের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। ওপরে চারজন লোক আমাদের বের হওয়ার অপেক্ষা করছে। তোমার গল্প শোনার জন্য আমার আর সময় নেই।”

এলিয়াস অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না। “এই কথাটা তোমাদের শোনা দরকার। কারণ যে লোকটা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, সে মারদেকার খুঁজে এসেছে, শুধু চাকতির জন্য নয়।”

মারদেকার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। সে স্থির হয়ে গেল। ওপরে আবার পাথর সরানোর শব্দ হলো। এইবার আরও কাছে।

লারসেন পিস্তল বের করল। অন্ধকারে তার কণ্ঠ শোনা গেল। “তার নাম বলো।”

এলিয়াস এবার আর চুপ করে রইল না। “তার নাম ভিক্টর কেইন।”

কিছুক্ষণ নীরবতা। নামটা মারদেকার কাছে অপরিচিত। 

নামটা শুনে লারসেন থমকে গেল। কেননা সে এই মানুষটকেই সন্দেহ করেছিল। তার কারণেই একদিন দল ছেড়ে ছিল। &quot;কিন্তু, কেইন তো মারা গেছে।” লারসেনের কণ্ঠ এবার বদলে গেছে।

এলিয়াস বলল, “আমরাও তাই ভেবেছিলাম।”

ওপরে আচমকা একটা গুলির শব্দ হলো। পাথরের ফাঁকের মুখে গুলি লেগে ভেতরে ধুলো ঝরে পড়ল।

মারদেকা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিচু হয়ে গেল।

এলিয়াস দ্রুত বলল, “সে মারা যায়নি। আর এত বছর পর সে জানতে পেরেছে যার বাবাকে সে মেরেছিল, এমনকি তার ছেলেটাকেও মারতে চেয়েছিলে, সেই ছেলেটা তুমি যে এখনও বেঁচে আছ।&quot; মারদেকার দিকে ফিরে কথাটা শেষ করলো।

মারদেকা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল। তার নিজের অতীত, বাবার মৃত্যু, সেই পুরোনো দলের বিশ্বাসঘাতকতা, কালো চাকতি, সবকিছু এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো রহস্য বলে মনে হচ্ছিল না। ধীরে ধীরে সেগুলো এক জায়গায় এসে মিলছে।

আর সেই জায়গার ওপাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। একজন জীবিত শত্রু। ভিক্টর কেইন। 

আর পাহাড়ের ওপরে আবার বুটের শব্দ শোনা গেল। এইবার তারা আর পথ খুঁজছে না। তারা জানে, নিচে কেউ আছে। উপরে আবার একটা পাথর গড়িয়ে পড়ল। ছোট্ট শব্দ, কিন্তু আশ্রয়স্থলের ভেতর সেটা অনেক বড় হয়ে উঠল। তারপর কারও বুটের তলায় শুকনো পাথর চূর্ণ হওয়ার শব্দ।

লারসেন খুব নিচু গলায় বলল, “পেছনের পথ দেখাও।”

এলিয়াস আর কথা বাড়াল না। সে অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে দেয়ালের একটা অংশে চাপ দিল। সেখানে ডান পাশে ছিল একটা সরু ফাটল, বহু বছরের পাহাড়ি ধসের ফলে যার মুখ অর্ধেক বন্ধ হয়ে গেছে। সে হাত দিয়ে কয়েকটা ছোট পাথর সরাল। তারপর কাঁধ ঘুরিয়ে নিজের শরীর পাশ করে ভেতরে ঢুকে গেল। “এটা পুরোনো বের হওয়ার পথ।”

লারসেন বলল, “এখনও বের হওয়া যায়?”

“হাঁটু গেড়ে গেলে যায়।”

মারদেকা প্রথমে ঢুকল। জায়গাটা এত সরু যে তাকে শরীর নিচু করে প্রায় হামাগুড়ি দিতে হলো। পাথরের সঙ্গে কাঁধ ঘষা খাচ্ছে, কোথাও কোথাও মাটির ওপর শুকনো ধুলো জমে আছে। বাতাস ভারী, কিন্তু সম্পূর্ণ বন্ধ নয়। সামনের দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছে। তার মানে পথের অন্য প্রান্ত কোথাও বাইরে গিয়ে খুলেছে।

তার পেছনে এলিয়াস, আর সবার শেষে লারসেন। কিছুদূর এগোনোর পর পথটা একটু নিচে নেমে গেছে। মারদেকা হাত বাড়িয়ে মাটি পরীক্ষা করল। শুকনো। কোথাও নতুন পায়ের দাগ নেই। এই পথ দিয়ে বহু বছর কেউ চলেনি।

তারপর হঠাৎ পেছনে গুলির শব্দ হলো। একটা গুলি আশ্রয়স্থলের পাথরে আঘাত করে প্রতিধ্বনি তুলল। তারপর আরেকটা।

লারসেন দাঁত চেপে বলল, “ওরা ঢুকে পড়েছে।”

মারদেকা আর সময় নষ্ট করল না। সে সামনে এগিয়ে গেল। পাথরের সরু পথটা প্রায় পনেরো গজ যাওয়ার পর হঠাৎ শেষ হয়ে গেল একটা নিচু মুখে। পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে নিচের দিকে। বাইরে রাত। আকাশ এখানে অনেকটা খোলা। মেঘ সরে গিয়ে কয়েকটি তারা বেরিয়েছে। 

মারদেকা বাইরে এসে দাঁড়াল না। সে প্রথমেই মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল। কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল। শুকনো ধুলো, কয়েকটি ছোট পাথর, একটা ভাঙা ঝোপের ডাল। একটু দূরে খুরের দাগ। পুরোনো নয়। সে ধীরে মাথা তুলল। “এই পথে ঘোড়া গেছে।”

লারসেন বেরিয়ে এসে তার পাশে বসল। “কতক্ষণ আগে?”

“খুব বেশি নয়।” মারদেকা নিচু গলায় বলল।

“তিনটা ঘোড়া। হয়তো চারটা। কিন্তু দাগ পরিষ্কার নেই।”

এলিয়াস বেরিয়ে এসে তাদের পেছনে দাঁড়াল। তার আহত পা এবার তাকে কষ্ট দিচ্ছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে। সে কয়েক মুহূর্ত চারপাশে তাকিয়ে রইল। “ওরা নিচের পথটাও নজরে রেখেছে।”

লারসেন তাকাল। “তুমি নিশ্চিত?”

“কেইন হলে নিশ্চিত।”

ভিক্টর কেইনের নামটা আবার শুনে মারদেকা লারসেনের দিকে তাকাল। লারসেনের মুখ অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।

তারা ঢাল বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল। জায়গাটা বিপজ্জনক নয়, কিন্তু পাথর আলগা। সামান্য ভুলে নিচে গড়িয়ে পড়া সম্ভব। মারদেকা সামনে, কারণ সে এখন পথ পরীক্ষা করছে। লারসেন তাকে পেছনে যেতে বলেনি। হয়তো এই প্রথমবার সে নিজেই বুঝতে পারছে, এই পাহাড়ে মারদেকার চোখ আর কান তাদের কাজে লাগছে।

নিচে নামার সময় মারদেকার মনে আবার বাবার কথা এল। কিন্তু এবার কোনো ভাঙা দৃশ্য নয়, কোনো কণ্ঠস্বর নয়। সে শুধু জানে, তার বাবা এই পাহাড়ে চলেছে, হয়তো এই পথের আশেপাশে, বহু বছর আগে। তার বাবা মানুষকে পথ দেখাত। আর সেই মানুষটাই কোনো এক রাতে বিশ্বাসঘাতকের কারণে মারা গেছে।

একটা সময় এলিয়াস বলল, “তোমার বাবার নাম ছিল ড্যানিয়েল রিড।”

মারদেকা থেমে গেল। সে ঘুরে তাকাল। “লারসেনও জানত?”

লারসেন এবার নিজেই উত্তর দিল। “জানতাম।”

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার মধ্যে রাগ হওয়া উচিত ছিল। এতদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য দুজন মানুষ জানত, অথচ তাদের একজন সারাক্ষণ তার পাশে থাকলেও বলেনি। কিন্তু সে একই সঙ্গে এটাও বুঝতে পারছিল, লারসেন নিজেও সবকিছু জানত না। তার মুখে যে অনুশোচনা আছে, সেটা অভিনয় নয়।

“তোমরা আমাকে বলোনি কেন?”

কয়েক মুহূর্ত পর লারসেন বলল, “কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না তুমি কে।”

মারদেকার চোখ সরু হয়ে এল। “কেন?”

”তোমাকে আমার র‌্যাঞ্চে নিয়ে যাবার পর খোঁজ-খবর করে তোমার অতীত সম্পর্কে জানলাম “  লারসেন  কিছুক্ষণ থামল। “আমি সন্দেহ করতাম তুমিই সেই ছেলে। তবে প্রমাণ ছিল না।”

এলিয়াস বলল, “প্রমাণটা আমি অনেক পরে পেয়েছি।”

এলিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর সে কোটের পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে সেই পুরোনো চামড়ার থলেটা বের করল। এবার সে থলেটা লুকিয়ে রাখল না। ধীরে ধীরে মুখ খুলল। ভেতর থেকে একটা কালচে ধাতব বস্তু বেরিয়ে এল।

এটা চাকতি নয়। আবার পুরোপুরি অন্য কিছুও নয়। ছোট, ভাঙা, অসম্পূর্ণ একটি ধাতব অংশ। এলিয়াস সেটাকে হাতের ওপর রেখে বলল, “এগুলো একসময় তোমার বাবার সঙ্গে ছিল।”

মারদেকার বুকের ভেতর যেন কেউ শক্ত করে আঘাত করল। মারদেকা ধীরে বুকের কাছে হাত নিয়ে গেল। এইবার আর লুকিয়ে রাখার কোনো অর্থ নেই বুঝে মারদেকা জামার ভেতর থেকে ধাতব টুকরোটা বের করল। এতদিন ধরে সে এটাকে নিজের জীবনের স্বাভাবিক অংশ বলে জেনে এসেছে। ছোটবেলায় কার কাছ থেকে পেয়েছিল, সে জানে না। তার গ্রামের মানুষও এ বিষয়ে তাকে কখনও স্পষ্ট কিছু বলেনি। কেউ বলেছিল এটা তার মায়ের জিনিস। কেউ বলেছিল তার বাবার কাছ থেকে এসেছে। কেউ আবার বলেছিল, তাকে যে রাতে পাওয়া গিয়েছিল, তার গলায় তখনই এটা ছিল।

আজ প্রথমবার টুকরোটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, হয়তো তার জীবন সম্পর্কে কেউই পুরো সত্য জানত না। 

এলিয়াস বলল, “তোমার বাবার কোট থেকে পড়ে গিয়েছিল।”

“তুমি পেয়েছিলে কোথায়?”

“যেখানে তাকে শেষবার দেখেছিলাম।”

এইবার চারপাশের পাহাড় যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মারদেকা ধীরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি দেখেছিলে তাকে মরতে?”

এলিয়াসের উত্তর আসতে সময় লাগল। “পুরোটা না।” তার কণ্ঠ বদলে গেছে। “আমি দূরে ছিলাম। আমরা তখন আলাদা পথে চলছিলাম। আগুনের আলো দেখেছিলাম। গুলির শব্দ শুনেছিলাম। তারপর ঘোড়ার ছুটে যাওয়ার শব্দ।” সে চোখ বন্ধ করল না, কিন্তু তার দৃষ্টি যেন বহু বছর পেছনে চলে গেল। “আমি কাছে পৌঁছানোর আগেই সব শেষ।”

মারদেকার ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। “আর আমি?”

“তোমাকে দেখেছিলাম।” এইবার এলিয়াসের কথায় কোনো দ্বিধা ছিল না। “তুমি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে দৌড়াচ্ছিলে। তোমার পেছনে আগুন ছিল, ধোঁয়া ওড়ছিল। তুমি বারবার পড়ে যাচ্ছিলে, আবার উঠছিলে।”

মারদেকা স্থির হয়ে রইল। তার বুকের ভেতর কোথাও একটা পুরোনো অনুভূতি নড়ে উঠল, কিন্তু এবার সেটা কোনো অস্পষ্ট স্মৃতি নয়। একটা বাস্তব ছবির সঙ্গে বাস্তব কথার মিল। সে হয়তো আগুন দেখেছিল। গুলির শব্দ শুনেছিল। কেউ তাকে বলেছিল দৌড়াতে। আর সে দৌড়েছিল।

এলিয়াস বলল, “আমি তোমাকে ডাকিনি।”

মারদেকা তাকাল। “কেন?”

এলিয়াসের কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল। “কারণ তোমার পেছনে লোক ছিল। আমি যদি তোমাকে ডাকতাম, তারা আমাকে দেখত। আর তোমাকেও।”

মারদেকা আবার হাঁটা শুরু করল। তার হাতে এখনও সেই কালচে ধাতব বস্তু । সে সেটাকে শক্ত করে ধরে আছে। এতদিন তার অতীত ছিল কুয়াশার মতো। এখন কুয়াশা পুরোপুরি সরে যায়নি, কিন্তু তার মধ্যে একটা পথ দেখা যাচ্ছে।

ড্যানিয়েল রিড। তার বাবা। তারপর সেই রাত। তারপর আগুন। তারপর একটি শব্দ। দৌড়াও।

তারা যখন শুকনো জলধারার কাছে পৌঁছাল, তখন পূর্ব দিগন্তের অন্ধকার সামান্য ফিকে হতে শুরু করেছে। রাত শেষ হতে এখনও সময় আছে, কিন্তু পাহাড়ের ওপর আকাশের রং বদলানোর প্রথম লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। 

মারদেকা হঠাৎ থেমে গেল। সে হাত তুলে দুজনকে থামতে বলল। তারপর নিচু হয়ে বসে পড়ল। কিছুদূরে একটা পাথরের পাশে মাটি একটু নরম। সেখানে বুটের দাগ। চারজনের। একজনের বুটের গোড়ালির অংশ ভাঙা। সেই দাগের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “ওরা এখান দিয়ে গেছে।”

এলিয়াস ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। “কোন দিকে?”

মারদেকা ডান দিকের ঢালের দিকে তাকাল। “আমাদের সামনে।”

লারসেন চারপাশে তাকাল। এটা খোলা জায়গা। বাঁ পাশে জলধারা, ডান দিকে পাথরের ঢাল, সামনে কিছু শুকনো গাছ। 

হঠাৎ দূরে একটা কণ্ঠ ভেসে এল। “লারসেন!”

তিনজনই স্থির। কণ্ঠটা খুব জোরে বলা হয়নি। কিন্তু পাহাড়ের খোলা জায়গায় স্পষ্ট শোনা গেল।

লারসেনের মুখের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। “ভিক্টর।”  সে খুব নিচু স্বরে বলল।

দূর থেকে একটা হাসির শব্দ এল। তারপর সেই একই কণ্ঠ আবার শোনা গেল। “তুমি আমাকে এখনও চিনতে পারো, এটা জেনে ভালো লাগছে।”

মারদেকা পাথরের আড়ালে সরে গেল। লারসেন তার বিপরীত পাশে। এলিয়াস নিচু হয়ে জলধারার কিনারায় বসে পড়েছে। কণ্ঠটা কোথা থেকে আসছে, বোঝা কঠিন। পাহাড়ে শব্দ ঘুরে যায়।

লারসেন বলল, “তুমি তো মৃত ছিলে।”

দূর থেকে উত্তর এল। “মৃত মানুষকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই সুবিধাটা আমার কাজে লেগেছে।” তারপর নীরবতা। কিছুক্ষণ পর আবার শোনা গেল। “তোমার সঙ্গে একটা পুরোনো হিসেব আছে, লারসেন। কিন্তু আজ আমি তোমার জন্য আসিনি।”

লারসেনের হাত পিস্তলের ওপর। “আমি জানি।”

দূরে আবার সেই হাসি। “ছেলেটা কোথায়?”

মারদেকার শরীরের ভেতর ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। কিন্তু সে নড়ল না।

এলিয়াস উত্তর দিল না। ভিক্টরের কণ্ঠ আবার এল। “আমি তাকে একবার দেখতে চাই।”

লারসেনের উত্তর এবার পরিষ্কার। “তোমার চোখ দিয়ে নয়।” 

তারপরই গুলিটা এলো। মারদেকা শুধু দেখল, তার মাথার ওপরের পাথরের একটা অংশ ভেঙে ধুলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা গুলি করল। তারপর চারদিক থেকে বন্দুকের শব্দ শুরু হলো।

মারদেকা পাথরের আড়ালে শরীর চেপে রাখল। যদিও এই মুহুর্তে তার কিছুই করার নেই। তার কোমরে ছুরি। চোখ আর কানই এখন তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

একটা গুলি বাম দিক থেকে এসেছে। আরেকটা সামনে থেকে। মারদেকা চোখ বন্ধ না করেও হিসেব করতে লাগল। হঠাৎ সে লারসেনের দিকে ঝুঁকে বলল, “ডান দিকে একজন।”

লারসেন তাকাল। আরেকটা গুলি হলো। মারদেকা বলল, “অন্যজন নিচ দিয়ে ঘুরছে।”

লারসেন আর প্রশ্ন করল না। সে সঙ্গে সঙ্গে এলিয়াসের দিকে তাকাল। &quot;ওদিকে যাও।”

এলিয়াস আহত পা নিয়ে নিচু হয়ে এগোল। 

মারদেকা পাথরের আড়াল বদলাল। কয়েক মুহূর্ত আগে যে লোকটা নিচ দিয়ে ঘুরছিল, তার চলার শব্দ এবার স্পষ্ট। সে খুব সাবধানে এগোচ্ছে। 

মারদেকা তাকে দেখতে পেল না। কিন্তু শুনতে পেল। একবার পাথর। তারপর বুট। তারপর কাপড়ের সঙ্গে ধাতব কিছুর ঠোকাঠুকি। সে নিচু হয়ে অপেক্ষা করল।

লোকটা আরেকটু কাছে আসতেই মারদেকা পাথরের ওপর থেকে একটা ছোট পাথর তুলে বিপরীত দিকে ছুড়ে দিল। পাথরটা গিয়ে লাগল শুকনো ঝোপে। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে সেই দিকে ঘুরল।

ঠিক তখন মারদেকা অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে এল। তার হাতে ছুরি। সে লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল না। লারসেন তাকে শিখিয়েছে, লড়াইয়ে শক্তি নষ্ট করা বোকামি। সে লোকটার পেছনে গিয়ে তার হাঁটুর পেছনে লাথি মারল। লোকটা নিচু হয়ে গেল। মারদেকা তার কাঁধে ধাক্কা দিল।

লোকটা পড়ে যাওয়ার আগেই হাত ঘুরিয়ে তাকে ধরতে চাইল। কিন্তু মারদেকা তার নাগালের বাইরে সরে গেল। তারপর ছুরির হাতল দিয়ে লোকটার কানের নিচে আঘাত করল। লোকটা মাটিতে পড়ে গেল।

তার রাইফেল একপাশে। মারদেকা সেটি তুলে নিল না। সে জানত না কীভাবে অস্ত্রটা ব্যবহার করতে হয়, তা নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে তার হাতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জিনিস তার ছুরি।

দূরে আবার গুলি হলো। লারসেন পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে পাল্টা গুলি করল, তারপর সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরের পাথরে রাইফেলের গুলি লেগে ধুলো উড়িয়ে দিল।

মারদেকা বুঝতে পারল, ভিক্টর কেইন নিজে এখনও গুলি চালায়নি, অথবা সে এমন জায়গায় আছে যেখান থেকে অন্যদের নির্দেশ দিচ্ছে। 

হঠাৎ এলিয়াস একটা গুলির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠল। সে মাটিতে পড়ে গেল। 

মারদেকা উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল। লারসেন তাকে ধরে টেনে নিচে বসিয়ে দিল।

এলিয়াস নড়ছে। সে মৃত নয়। কিন্তু তার কাঁধের কাছে রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে।

লারসেন দাঁত চেপে বলল, “ওকে এখান থেকে বের করতে হবে।”

মারদেকা চারপাশে তাকাল। সামনে খোলা জায়গা। পেছনে পাথর। বাঁ দিকে শুকনো জলধারা আরও নিচে নেমে গেছে। সে হাত তুলে দেখাল। জলধারার পাথরের নিচে একটা সরু অংশ। বর্ষার পানিতে কেটে তৈরি হওয়া গর্তের মতো জায়গা। মানুষ নিচু হয়ে যেতে পারবে। বাইরে থেকে সহজে দেখা যাবে না। “ওটা দিয়ে গেলে আমরা পেছনের ঢালে উঠতে পারব।”

লারসেন এক মুহূর্ত মারদেকার চোখের দিকে তাকাল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “এগিয়ে যাও।”

মারদেকা নিচু হয়ে জলধারার দিকে দৌড় দিল। তার পেছনে লারসেন। লারসেন একবার পেছনে গুলি করে শত্রুদের মাথা নিচু রাখতে বাধ্য করল। তারপর এলিয়াসের কাছে পৌঁছে তাকে কাঁধে তুলতে চেষ্টা করল।

মারদেকা এসে এলিয়াসের অন্য হাত নিজের কাঁধে নিল। তার শরীর ছোট, কিন্তু সে ভারসাম্য ধরে হাঁটতে জানে। তিনজন নিচের সরু জায়গা ধরে এগিয়ে গেল।
 
তাদের মাথার ওপর দিয়ে আবার গুলি গেল। তারপর আরও কয়েকটি।

মারদেকা সামনে এগিয়ে পথ দেখাচ্ছে। কোথাও পাথর উঁচু, কোথাও পানি জমে আছে। এলিয়াসের রক্ত মাটিতে পড়ছে, কিন্তু খুব বেশি নয়। তার কাঁধে গুলি লেগেছে, ভেতরে ঢুকেছে কি না বোঝা যাচ্ছে না।

কিছুদূর যাওয়ার পর গুলির শব্দ কমে এল। তারা পেছনের ঢালে উঠে পড়েছে। সেখান থেকে অনেক দূরে, পূর্ব আকাশে প্রথম আলো দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের চূড়াগুলো কালো থেকে ধূসর হয়ে উঠছে। রাতের শেষ প্রহর। কিন্তু তাদের পেছনে এখনও শত্রু আছে।

লারসেন এলিয়াসকে একটা পাথরের পাশে বসাল। নিজের কোট ছিঁড়ে তার ক্ষত শক্ত করে বেঁধে দিল।

মারদেকা একটু দূরে দাঁড়িয়ে চারপাশ শুনছিল। এই সময় এলিয়াস তার দিকে তাকাল। “এখন তোমার সবটা জানা দরকার।”

লারসেন হাতের কাজ থামাল না। মারদেকা এগিয়ে এল।

এলিয়াস ধীরে বলল, “ড্যানিয়েল রিড জানত ভিক্টর কেইন বিশ্বাসঘাতক। সে শুধু পথ বিক্রি করেনি। যারা আমাদের সাহায্য চাইত, তাদের তথ্যও বিক্রি করত। কয়েকজন মানুষ মারা যায় তার কারণে।”

তারপর সে কষ্ট করে শ্বাস নিল। “ড্যানিয়েল প্রমাণ জোগাড় করেছিল। এই চাকতিগুলোর সঙ্গে সেই প্রমাণের সম্পর্ক ছিল। কিছু পথ, কিছু নাম, আর এমন কিছু লোকের পরিচয়, যাদের কেইন তার নিজের লোক বলে ব্যবহার করত।”

লারসেন এবার কথা বলল। “ড্যানিয়েল আমাকে সব জানাতে পারেনি। কারণ তার আগেই কেইন খবর পেয়ে যায়। আমি তাকে সাবধান করেছিলাম। কিন্তু সে শুনেনি। তারপর আমি নিজের পথ বেছে নিলাম।&quot;

এলিয়াস বলল। “অনেক বছর পর সেই রাতে আগুন জ্বলে উঠে। তোমার বাবা মারা যায়। আর তুমি পালিয়ে যাও।” সে নিচের দিকে তাকাল। “আমি এতদিন ভেবেছিলাম তুমি মারা গেছ। এখন কেইন জানে তুমি বেঁচে আছ।” তার চোখে ক্লান্তির সঙ্গে একটা অদ্ভুত কঠোরতা দেখা গেল। 

দূর থেকে ঘোড়ার শব্দ ভেসে এল। তিনজনই মাথা তুলল। ঘোড়াগুলো দূরে। সম্ভবত শত্রুরা নিচের পথে ঘুরে গেছে। পাহাড় থেকে বের হওয়ার আরও একটা রাস্তা আছে, এবং তারা জানে লারসেনরা কোন দিকে যেতে পারে।

লারসেন উঠে দাঁড়াল। তার নিজের হাতের ক্ষত আবার খুলে রক্ত বেরিয়েছে, কিন্তু সে সেদিকে তাকাল না। “আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে।”

মারদেকা বলল, “ওরা আমাদের পেছনে আসবে।”

লারসেন উত্তর দিল। “আর আমরা পাহাড় থেকে বের হব।”

এলিয়াস ধীরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। মারদেকা তাকে সাহায্য করল।

তারা যখন আবার চলতে শুরু করল, তখন পাহাড়ের ওপর সূর্যের প্রথম আলো পড়েছে। রাতের অন্ধকারে যে জায়গাগুলো এতক্ষণ শুধু ছায়া ছিল, এখন সেগুলো পাথর, গাছ আর খাদের বাস্তব রূপ নিয়ে সামনে দেখা যাচ্ছে। 

পাহাড়ের শেষ ঢালে পৌঁছে মারদেকা একবার পেছনে তাকাল। দূরের উঁচু পাথরের ওপর কয়েকটি ঘোড়সওয়ারের অবয়ব দেখা গেল। তারা এত দূরে যে মুখ চেনা যায় না। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন অন্যদের থেকে সামান্য সামনে। সে স্থির হয়ে বসে আছে। 

মারদেকা জানত না, সে ভিক্টর কেইন কি না। কিন্তু তার মনে হলো, সেই মানুষটাও নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। তার দিকে।

লারসেন মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। “চলো।”

মারদেকা আর পেছনে তাকাল না। সে সামনে হাঁটা শুরু করল। পাহাড়ের পথ এবার নিচের দিকে নেমে গেছে। অনেক দূরে, সেই পাহাড়ের পেছনে অপেক্ষা করছে খোলা প্রান্তর, রাস্তা, ঘোড়া, আর লারসেনের র‌্যাঞ্চ।

কিন্তু এখন সে জানে, র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরে যাওয়া মানে নিরাপদ জায়গায় ফিরে যাওয়া নয়। শত্রু তাদের পথ চিনে ফেলেছে। 

ভিক্টর কেইন বেঁচে আছে। সে জানে ড্যানিয়েল রিডের ছেলে বেঁচে আছে।

প্রায় ছয় বছর আগে যে সাত বছরের ছেলেটি আগুন আর গুলির শব্দের মধ্যে পাহাড়ের অন্ধকার পথে দৌড়ে পালিয়েছিল, সে আজ আবার সেই পাহাড় ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এবার সে পালাচ্ছে না। এবার সে জানে, কে তার শত্রু।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/269051/</link>
				<pubDate>Thu, 03 Sep 2026 03:45:36 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২৫<br />
পাথরের ফাঁকটার ভেতর দিয়ে নিচে নামার সময় প্রথমেই মারদেকার মনে হয়েছিল, পৃথিবী যেন হঠাৎ তার পায়ের নিচ থেকে সরে গেছে। ওপরে গিরিখাতের মুখে তখনও গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। </p>
<p>মারদেকা নিচের দিকে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। অন্ধকার এত গভীর ছিল যে মনে হচ্ছিল পাহাড়ের ভেতর একটা কালো কুয়ো মুখ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-269051"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/269051/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>8</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">d8a9ea315d31485fd6d84864aecbdf57</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২৪
পাহাড়ের অন্ধকারে তিনটি ছায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। সামনে এলিয়াস, তার কয়েক গজ পেছনে লারসেন, আর তাদের মাঝামাঝি মারদেকা। গিরিখাতের সরু পথটা কখনও এত নিচে নেমে যাচ্ছে যে হাঁটতে গেলে মাথার ওপর পাথরের ছাদ মনে হচ্ছে, আবার কোথাও হঠাৎ প্রশস্ত হয়ে দুপাশের দেয়াল একটু দূরে সরে যাচ্ছে। আকাশের সরু ফালি দিয়ে মাঝে মাঝে কয়েকটা তারা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তাদের আলো মাটিতে পৌঁছাচ্ছে না। পাহাড়ের বুকের এই অংশটায় রাত যেন অন্য সব জায়গার চেয়ে আগে নেমে আসে।

কিছুদূর যাওয়ার পর গিরিখাতের মাটি বদলে গেল। পাথরের বদলে নরম ধুলো, তার ওপর ছড়িয়ে থাকা শুকনো পাতা আর ঘোড়ার পুরোনো খুরের দাগ। কোথাও কোথাও মাটির মধ্যে ছোট ছোট গর্ত, যেন বহুদিন ধরে এখানে ঘোড়া থামিয়ে রাখা হয়েছে। লারসেন হাঁটতে হাঁটতে প্রতিটি দাগ লক্ষ করছিল। তার চোখ সামনে থাকলেও মন যেন পেছনে পড়ে থাকা পথটাকে হিসেব করছিল। যারা তাদের ওপর গুলি চালিয়েছিল, তারা এখনও পাহাড়ের কোথাও আছে। তাদের মধ্যে অন্তত একজন ভালো রাইফেলধারী। আর সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, তারা লারসেনের চলার পথ জানে।

এলিয়াস যেন এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়। সে অন্ধকারের মধ্যে এমন নিশ্চিন্তভাবে হাঁটছিল, যেন এই গিরিখাত তার নিজের বাড়ির উঠোন। মাঝে মাঝে সে নিচু হয়ে কোনো পাথর সরিয়ে দিচ্ছিল, কখনও কোনো ঝোপের ডাল হাতে চেপে ধরে তিনজনকে পার হয়ে যেতে দিচ্ছিল। তার চলার মধ্যে এমন একটা অভ্যাস ছিল, যা লারসেনের বহু পুরোনো স্মৃতিকে নাড়া দিচ্ছিল। একসময় এই মানুষটার সঙ্গে সে পাহাড় পেরিয়েছে, মরুভূমি পার হয়েছে, রাতের অন্ধকারে শত্রুর শিবিরের পাশ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে গেছে। তখন এলিয়াসের বয়স কম ছিল, শরীরে ছিল শক্তি, চোখে ছিল আগুন। এখন সেই আগুন নিভে যায়নি, শুধু তার ওপর বহু বছরের ছাই জমেছে।

মারদেকা চুপচাপ হাঁটছিল। তার মাথায় একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরছিল। এলিয়াস কে, কেন লারসেন তাকে মৃত ভেবেছিল, কীভাবে সে মারদেকার স্বপ্নের কথা জানে, আর তার জন্মের আগের এমন কী ঘটনা ঘটেছিল যার সঙ্গে এই মানুষটির সম্পর্ক আছে? সবচেয়ে বেশি তাকে অস্থির করে তুলেছিল সেই একটি কথা, জন্মের আগেই নাকি তার জন্য একটা পথ ঠিক হয়ে গিয়েছিল।

সে নিজের জীবন নিয়ে কখনও খুব বেশি প্রশ্ন করেনি। পাহাড়ের ছোট্ট গ্রাম থেকে বেরিয়ে আসার পর তার কাছে পৃথিবীটা ছিল সহজ। বেঁচে থাকতে হলে শিখতে হবে, শত্রুকে চিনতে হবে, নিজের পা কোথায় ফেলতে হবে সেটা বুঝতে হবে, কখন ছুরি বের করতে হয় আর কখন অস্ত্র না তুলেই বিপদ এড়িয়ে যেতে হয় সেটা জানতে হবে। লারসেন তাকে এসব শিখিয়েছে। তার কাছে লারসেন ছিল শিক্ষক, আশ্রয়দাতা, কখনও কখনও কঠোর পিতা, আবার কখনও এমন একজন মানুষ যার পাশে দাঁড়ালে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপদকেও সামান্য ছোট মনে হয়।

কিন্তু আজ প্রথমবার মারদেকার মনে হলো, লারসেন নিজেও তার কাছে পুরো সত্যি নয়।

এলিয়াস হঠাৎ থামল।

লারসেনও থেমে গেল। মারদেকা পেছন থেকে এসে দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনে অন্ধকারে একটা নিচু পাথরের দেয়াল। তার ওপারে গিরিখাত আরও গভীর হয়ে গেছে। এলিয়াস হাত তুলে চুপ থাকতে বলল। তারপর মাথা সামান্য কাত করল।

কয়েক মুহূর্ত কিছুই শোনা গেল না। তারপর অনেক দূর থেকে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ ভেসে এল। ঘোড়ার খুর পাথরে লাগার শব্দ।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের অন্ধকার পরীক্ষা করল। শব্দটা খুব দূরে নয়। পাহাড়ের বাঁক শব্দকে ঘুরিয়ে আনছে, তাই দিক নির্ণয় করা কঠিন। কিন্তু একজন অভিজ্ঞ মানুষ বুঝতে পারে, একা ঘোড়া হলে শব্দের মধ্যে একটা ছন্দ থাকে। এখানে সেই ছন্দ নেই। মনে হচ্ছে একাধিক ঘোড়া ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।

এলিয়াস নিচু গলায় বলল, “ওরা গিরিখাতে ঢুকেছে।”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “কতজন?”

“জানি না।”

“তুমি জানো না?”

এলিয়াস এবার সামান্য হাসল। “জানা আর শোনা এক জিনিস নয়।”

লারসেন আর কিছু বলল না। সে চারপাশে তাকিয়ে একটা পাথরের আড়াল বেছে নিল। তারপর মারদেকার কাঁধে হাত রেখে তাকে নিচু করে বসিয়ে দিল। এলিয়াসও অন্য পাশে সরে গেল। তিনজনের মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু অন্ধকারে তাদের কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না।

কিছুক্ষণ পর ঘোড়ার শব্দ আরও স্পষ্ট হলো। এবার মানুষের কণ্ঠও শোনা গেল। খুব নিচু স্বরে কেউ কথা বলছে। শব্দগুলো বোঝা গেল না, শুধু কখনও একটা শব্দ, কখনও আরেকটা শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে। তারপর ঘোড়ার লাগাম টানার শব্দ।

মারদেকা পাথরের আড়ালে বসে চোখ বন্ধ না করেই শুনছিল। সে এখন বুঝতে পারছে, লারসেন তাকে যে শিক্ষা দিয়েছে তার আসল অর্থ কী। অন্ধকারে চোখের চেয়ে কান অনেক বেশি সত্যি কথা বলে। দূরের শব্দের ভেতর দিয়ে সে ঘোড়ার সংখ্যা আন্দাজ করার চেষ্টা করল। তিনটি? না, চারটি। একটা ঘোড়া অন্যগুলোর চেয়ে ধীর। তার খুরের শব্দে ভারী ধাতব কিছু ঠোকাঠুকি করছে।

মারদেকা খুব আস্তে লারসেনের দিকে ঝুঁকল। “চারজন।”

লারসেন তার দিকে তাকাল না। শুধু সামান্য মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সেও একই হিসেব করেছে।

এলিয়াসের কোনো শব্দ নেই। ঘোড়াগুলো এবার আরও কাছে এল। তারপর হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। এই নীরবতাটা আগের নীরবতার মতো নয়। এবার যেন কেউ ইচ্ছা করে সবকিছু থামিয়ে দিয়েছে।

লারসেনের আঙুল ধীরে পিস্তলের বাঁটে চলে গেল।

কয়েক মুহূর্ত পর অন্ধকারে একটা ছোট পাথর গড়িয়ে এল। তারপর আরেকটা। কেউ হাঁটছে। মানুষ ঘোড়া থেকে নেমে পায়ে হেঁটে এগোচ্ছে।

মারদেকা পাথরের ফাঁক দিয়ে তাকাল। প্রথমে কিছুই দেখা গেল না। তারপর অন্ধকারের মধ্যে একটা কালো অবয়ব নড়ল। একজন মানুষ দেয়ালের পাশ দিয়ে এগিয়ে আসছে। তার হাতে রাইফেল। মাথায় টুপি। পেছনে আরও দুইজন। চতুর্থজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

মারদেকা লোকগুলোর মুখ দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু তাদের হাঁটার ধরন, অস্ত্র ধরার ভঙ্গি, শরীরের ভারসাম্য, সবকিছু সে লক্ষ্য করল। প্রথম লোকটা অভিজ্ঞ। দ্বিতীয়জনের চলনে অস্থিরতা আছে। তৃতীয়জন বারবার পেছনে তাকাচ্ছে। চতুর্থজন পাহারা দিচ্ছে।

তারা কাকে খুঁজছে, সেটা নিয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই। লারসেনকে। কিন্তু মারদেকার মনে হলো, তাদের আসল লক্ষ্য হয়তো শুধু লারসেন নয়। তার নিজের বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ঠান্ডা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। 

হঠাৎ প্রথম লোকটা থেমে গেল। সে মাথা তুলে চারপাশে তাকাল। তারপর মাটির দিকে ঝুঁকল। কিছু একটা দেখেছে।

লারসেন মারদেকার দিকে তাকাল। তার চোখে সতর্ক সংকেত। মারদেকা নিঃশব্দে নিজের শরীর আরও নিচু করে ফেলল।

লোকটা এবার মাটির ওপর হাত রাখল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে পেছনের লোকদের কিছু বলল। শব্দটা পরিষ্কার শোনা গেল না, কিন্তু তার হাতের ইশারা দেখে বোঝা গেল, তারা তিনদিকে ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে।

এটাই ছিল সুযোগ। লারসেন খুব ধীরে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। তার চলার শব্দ এত কম যে মারদেকা প্রায় দেখতে পেল না কখন সে সামনে চলে গেছে। এলিয়াসও একই সময়ে অন্যদিকে সরে গেল।

মারদেকা একা পড়ে রইল। তার হাতে ছুরি। সামনে অন্ধকার। পেছনে পাথর। সে বুঝতে পারল, এবার তাকে নিজের মতো করে কাজ করতে হবে। একজন লোক তার দিকেই এগিয়ে আসছে।

মারদেকা নিঃশ্বাস ধীরে করল। পায়ের নিচে একটা শুকনো পাতা। সে জানে, সেখানে পা রাখলে শব্দ হবে। তার বাঁ পাশে একটা পাথরের ফাঁক। ফাঁকটা সরু, কিন্তু তার শরীরের জন্য যথেষ্ট। সে ধীরে ধীরে সেখানে সরে গেল।

লোকটা আরও কাছে এল। তার বুটের শব্দ এখন স্পষ্ট। মারদেকা তার শ্বাসের শব্দও শুনতে পেল।
 
আর ঠিক তখনই দূরে একটা গুলির শব্দ হলো। লোকটা মুহূর্তের জন্য ঘুরে তাকাল। 
মারদেকা সেই মুহূর্তটাই ব্যবহার করল।

সে পাথরের ফাঁক থেকে বেরিয়ে এসে লোকটার হাঁটুর পেছনে লাথি মারল। লোকটা ভারসাম্য হারিয়ে নিচু হয়ে পড়তেই মারদেকা তার রাইফেলের নল ধরে একদিকে টেনে নিল। লোকটা শক্তিশালী। সে সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটাকে ঝাঁকিয়ে সরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু মারদেকা তার শরীরের ভার নিচে নামিয়ে দিল, ঠিক যেমন লারসেন তাকে শিখিয়েছে। শক্তির সঙ্গে শক্তি দিয়ে লড়াই না করে ভারসাম্য নষ্ট করতে হবে।

লোকটা মাটিতে পড়ে গেল। মারদেকা তার রাইফেল কাড়তে গেল না। সে জানে, সময় নেই। লোকটার কনুইয়ের কাছে ছুরি ঠেকিয়ে এক মুহূর্ত থামল। তারপর লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে মারদেকার বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল। 

লোকটা তাকে দেখে ভয় পায়নি। বরং অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “তুইই সেই ছেলে।”

মারদেকার হাত শক্ত হয়ে গেল।

লোকটা আর কিছু বলার আগেই দূরে আরেকটা গুলির শব্দ হলো। এবার গুলির পর একজন মানুষের চিৎকার শোনা গেল।

মারদেকা লোকটার ওপর থেকে সরে দাঁড়াল। অন্ধকারের মধ্যে সে লারসেনের কণ্ঠ শুনতে পেল না। এলিয়াসের কণ্ঠও নয়।

শুধু পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসা একটা অদ্ভুত শব্দ, যেন কোথাও ধাতব কোনো বস্তু পাথরের সঙ্গে ঠেকে উঠেছে। টিং।

মারদেকা স্থির হয়ে গেল। একই সংকেত। গিরিখাতের গভীরে যে সংকেত তারা শুনেছিল, আবার সেটাই। কিন্তু এবার শব্দটা এসেছে তার একেবারে কাছ থেকে।

সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। পেছনের অন্ধকারে কেউ নেই। তবু সে জানল, কেউ একজন তাকে দেখছে। আর সেই মুহূর্তেই তার মনে হলো, এই পাহাড়ের রহস্য শুধু লারসেন আর এলিয়াসের অতীত নয়।

মারদেকা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখ অন্ধকারের প্রতিটি স্তর আলাদা করে দেখতে চাইছিল, কিন্তু পাহাড়ের রাত মানুষের চোখকে যতটা দেখায়, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু লুকিয়ে রাখে। কয়েক গজ দূরের পাথরগুলো কালো দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তারও পেছনে আরও পাথর, আরও ছায়া, আরও গভীর অন্ধকার। বাতাস প্রায় নেই, অথচ তার গায়ের কাপড়ের নিচে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। মাটিতে পড়ে থাকা লোকটা নড়ছিল না। তার রাইফেলটা এক পাশে পড়ে আছে। মারদেকা বুঝতে পারছিল না লোকটা অজ্ঞান, নাকি শুধু অপেক্ষা করছে। কিন্তু এখন তার কাছে ওই লোকটার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই ধাতব শব্দটা। টিং। 

শব্দটা কোথা থেকে এসেছিল, সে নিশ্চিত নয়। কিন্তু তার শরীরের ভেতর কোথাও যেন সেই শব্দের সঙ্গে একটা পুরোনো স্মৃতি জেগে উঠেছে। কোনো মুখ নেই, কোনো দৃশ্য নেই, শুধু অন্ধকারের মধ্যে একটা ধাতব শব্দ, তারপর দূর থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর। দৌড়াও।

মারদেকা নিজের অজান্তেই কপালে হাত রাখল। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, মাথার ভেতর যেন কেউ খুব দূর থেকে দরজা খুলছে। দরজার ওপাশে আলো নেই। আছে ধোঁয়া, আগুনের গন্ধ, ঘোড়ার ঘাম, আর মানুষের চিৎকার। সে চোখ বন্ধ করল না। তবু একটা দৃশ্যটা তার সামনে ভেসে উঠল। 

মারদেকা ঝাঁকুনি দিয়ে বর্তমানের মধ্যে ফিরে এল। তার সামনে আবার শুধু অন্ধকার পাহাড়।

সে বুঝতে পারল, স্মৃতিটা তার নিজের দেখা কোনো স্বপ্ন নয়। সেটা হয়তো কারও স্মৃতি, যা এত বছর ধরে তার ভেতরে কোনোভাবে বেঁচে আছে। কিন্তু কীভাবে, কেন, কার স্মৃতি, সে জানে না।

দূরে আবার গুলির শব্দ হলো। এবার খুব কাছে নয়। তার পরপরই আরেকটি গুলি। তারপর নিস্তব্ধতা।

মারদেকা আর দাঁড়িয়ে রইল না। সে দ্রুত সেই দিকেই এগিয়ে গেল যেদিক থেকে শব্দ এসেছে। পথটা সরু, পাথরে ভরা। কোথাও কোথাও পুরোনো খুরের দাগ। সে এগোতে এগোতে হঠাৎ একটা রক্তের গন্ধ পেল। খুব হালকা, কিন্তু তার নাক সেটা ধরল। সে হাঁটু গেড়ে মাটির ওপর হাত না দিয়েই নিচু হয়ে দেখল। পাথরের কিনারায় গাঢ় একটা দাগ। নতুন রক্ত।

তারপর সামান্য দূরে আরেকটা দাগ। আরেকটু সামনে গিয়ে তৃতীয়টা। রক্তের দাগগুলো খুব বেশি নয়। আহত মানুষকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চিহ্নও নেই। বরং মনে হচ্ছে, কেউ দৌড়াতে দৌড়াতে রক্ত ফেলেছে।

মারদেকা বুঝল, লারসেন আহত হতে পারে। এই চিন্তাটা তার বুকের ভেতর এমন একটা ধাক্কা দিল যে সে আর সাবধানে হাঁটল না। দৌড়াতে শুরু করল। 

কয়েক গজ পরেই একটা পাথরের আড়াল থেকে লারসেন বেরিয়ে এল। তার বাম হাত কনুইয়ের কাছে ছিঁড়ে যাওয়া কাপড় দিয়ে চেপে ধরা। রক্ত খুব বেশি নয়, কিন্তু ক্ষত হয়েছে।

মারদেকা থেমে গেল।

লারসেন তাকে দেখে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সে ঠিক আছে। তারপর পেছনের দিকে তাকাল। “এলিয়াস কোথায়?” তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু স্থির।

মারদেকা উত্তর দিতে পারল না। সে নিজেও জানে না।

লারসেন তার মুখের দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত বুঝতে চেষ্টা করল কী ঘটেছে। তারপর ছেলেটার হাতে রক্তের দাগ দেখল। তার চোখ সঙ্গে সঙ্গে কঠিন হয়ে উঠল।

“তুমি লড়াই করেছ?”

মারদেকা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

লারসেন কিছু বলল না। সে শুধু একবার ছেলেটার চোখের দিকে তাকাল। সেখানে ভয় নেই। আছে অন্য কিছু, এমন একটা অনুভূতি যা লারসেন বহু বছর আগে নিজের চোখেও দেখেছিল। অল্প বয়সে পৃথিবীর নিষ্ঠুর সত্যের সঙ্গে প্রথমবার মুখোমুখি হলে মানুষের চোখে যে পরিবর্তন আসে।

লারসেন সামনে এগিয়ে গেল। মারদেকা তার পেছনে।

গিরিখাতের বাঁক ঘুরতেই তারা একটা ছোট খোলা জায়গায় পৌঁছাল। সেখানে তিনটি ঘোড়া বাঁধা ছিল। দুটির লাগাম ছিঁড়ে গেছে। তৃতীয়টি অস্থির হয়ে পাথরের ওপর খুর ঠুকছে। তার চোখে সাদা অংশ দেখা যাচ্ছে। ঘোড়াগুলো মানুষের গন্ধ, রক্ত আর বন্দুকের শব্দে আতঙ্কিত।

কাছেই একজন মানুষ পড়ে আছে। সে নড়ছে না।

লারসেন ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে গলার পাশে হাত রাখল। তারপর মাথা নাড়ল। মৃত।

তার বুকের ডান দিকে গুলির ক্ষত। গুলি খুব কাছ থেকে ছোড়া হয়নি। পোশাকে আগুনের দাগ নেই। রক্ত শুকোতে শুরু করেছে। মানুষটা যে দল তাদের অনুসরণ করছিল, তাদেরই একজন।

মারদেকা মৃত লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বয়স খুব বেশি নয়। হয়তো তিরিশের কাছাকাছি। মুখে দাড়ি, কপালে ঘাম শুকিয়ে সাদা লবণের মতো দাগ। তার ডান হাত এখনও রাইফেলের কাছাকাছি।

মারদেকার মনে হলো, মানুষটা মারা যাওয়ার আগেও কাউকে খুঁজছিল। হয়তো তাকে। হয়তো লারসেনকে। হয়তো এলিয়াসকে।

লারসেন মৃত লোকটার বেল্ট থেকে একটা ছোট চামড়ার থলে খুলে নিল। তারপর তার জ্যাকেটের পকেট পরীক্ষা করল। একটা ভাঁজ করা কাগজ পাওয়া গেল। কাগজটা পুরোনো নয়। সাম্প্রতিক। লারসেন সেটা খুলে দেখল, কিন্তু অন্ধকারে লেখা পড়া কঠিন। সে কাগজটা আলোয় আনার জন্য ঘোড়ার কাছে গেল, যেখানে আকাশের সরু ফালি দিয়ে সামান্য আলো আসছে।

মারদেকা তার পাশে দাঁড়াল। 

কাগজে একটা পাহাড়ের অসম্পূর্ণ মানচিত্র আঁকা। কয়েকটি পথ, একটা গিরিখাত, একটা ক্রস চিহ্ন। আর নিচে মাত্র দুটি শব্দ।

লারসেন অনেকক্ষণ সেই দুটি শব্দের দিকে তাকিয়ে রইল।

মারদেকা জিজ্ঞেস করল না। তার মুখ দেখেই বুঝতে পারল, কাগজে লেখা শব্দ দুটো তাকে অতীতের কোথাও নিয়ে গেছে।

লারসেন কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখল। “চলো।”

তারা ঘোড়াগুলোর দিকে এগোল। কিন্তু তখনই মারদেকা থেমে গেল। তার কান আবার কিছু শুনেছে। দূরে নয়। একেবারে কাছ থেকে। কেউ পাথরের ওপর পা রেখেছে।

লারসেনও শুনেছে। সে সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার আড়ালে সরে গেল। মারদেকা তার নির্দেশের অপেক্ষা করল না। সে নিচু হয়ে পাশের পাথরের ছায়ায় চলে গেল। 

কয়েক মুহূর্ত পরে অন্ধকার থেকে এলিয়াস বেরিয়ে এল। তার কোটের ডান পাশে রক্তের দাগ। হাঁটার সময় সামান্য খুঁড়িয়ে চলছে। কিন্তু তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই।

লারসেন তাকে দেখে এগিয়ে গেল। “তুমি আহত।”

এলিয়াস নিজের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল। “ওদের একজনের ভাগ্য খারাপ ছিল।”

লারসেন বুঝল, এলিয়াসের ক্ষত গুরুতর নয়। পোশাক ছিঁড়েছে, চামড়া সামান্য কেটেছে। কিন্তু তার চোখে অন্য কিছু আছে।

এলিয়াস লারসেনের হাতে থাকা কাগজটার দিকে তাকাল। “ওরা জায়গাটা জেনে গেছে।”

লারসেনের মুখ শক্ত হলো। “কোন জায়গা?”

এলিয়াস উত্তর দিল না। তার চোখ চলে গেল গিরিখাতের শেষ প্রান্তের দিকে। সেখানে পাথরের দেয়ালের মধ্যে একটা সরু ফাঁক দেখা যাচ্ছে। এতদিনের বাতাস আর বৃষ্টিতে পাথর ক্ষয়ে গিয়ে ফাঁকটা তৈরি হয়েছে। দূর থেকে সেটা প্রাকৃতিক মনে হয়। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, পাথরের কিছু অংশ মানুষের হাতে কাটা হয়েছিল।

লারসেন ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। মারদেকা তার পেছনে। এলিয়াসও সঙ্গে এল।

ফাঁকের সামনে গিয়ে লারসেন থেমে দাঁড়াল। তার মুখের ওপর বহু বছরের পুরোনো একটা স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। এই জায়গা সে চিনতে পারছে না, তবু তার শরীর চিনছে। বাম পাশে ভাঙা পাথর। নিচে মাটির গভীরে কালো দাগ। দেয়ালের ওপর ক্ষয়ে যাওয়া একটা চিহ্ন। একটা বৃত্ত। তার মাঝখানে সরু দাগ।

মারদেকার চোখও সেই চিহ্নে গিয়ে আটকে গেল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ আবার সেই ধাতব শব্দ বাজল। টিং। 

কিন্তু এবার বাইরে কোনো শব্দ হয়নি। শব্দটা এসেছে তার মাথার ভেতর থেকে। সে পাথরের দেয়ালের কাছে গিয়ে হাত বাড়াল। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে ফেলল। “ছোঁবে না।”

মারদেকা তার দিকে তাকাল।

লারসেনের চোখে এমন ভয় সে আগে দেখেনি। এটা শত্রুকে ভয় পাওয়ার চোখ নয়। এটা কোনো স্মৃতিকে ভয় পাওয়ার চোখ।

এলিয়াস ধীরে ধীরে বলল, “এখন আর লুকিয়ে রাখার সময় নেই।”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “তুমি জানো এর ওপাশে কী আছে?”

এলিয়াস কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “জানি।”

“তাহলে এতদিন আমাকে বলোনি কেন?” এলিয়াসের মুখে ক্লান্তির ছায়া ফুটে উঠল।

“কারণ তুমি প্রস্তুত ছিলে না।” 

লারসেন তিক্তভাবে হাসল। “আর এখন?”

এলিয়াস মারদেকার দিকে তাকাল। “এখন সময় তোমাদের প্রস্তুত করে দিয়েছে।”

কথাটা শেষ হতেই পাহাড়ের ওপর থেকে একটা বন্দুকের গুলি ছুটে এল। গুলিটা পাথরের দেয়ালে আঘাত করে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিল। তিনজন একসঙ্গে নিচু হয়ে গেল।

পরের মুহূর্তে আরও দুটি গুলি। গিরিখাতের ভেতর প্রতিধ্বনি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ল যে মনে হলো চারদিক থেকে গুলি আসছে।

লারসেন দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে ফেলল। শত্রুরা তাদের অবস্থান জেনে গেছে। সামনে অজানা পথ, পেছনে শত্রু। ঘোড়াগুলো নিয়ে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। খোলা জায়গায় দাঁড়ালে তারা সহজ লক্ষ্য হয়ে যাবে।

এলিয়াস পাথরের দেয়ালের ফাঁকটার দিকে ইশারা করল। “ওখানে ঢোকো।”

লারসেন এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। ফাঁকটা এত সরু যে একজন মানুষ কষ্ট করে ঢুকতে পারবে। তার ওপাশে কী আছে, জানা নেই। কিন্তু বাইরে থাকা নিশ্চিত মৃত্যু হতে পারে।

মারদেকা তখন পাথরের চিহ্নটার দিকে তাকিয়ে আছে। বৃত্তের মাঝখানের সরু দাগটা তার কাছে অদ্ভুত পরিচিত মনে হচ্ছে।

সে নিজের জামার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে গলায় ঝোলানো ছোট ধাতব টুকরোটাকে স্পর্শ করল। লারসেন তাকে বহুদিন ধরে এটা খুলে ফেলতে নিষেধ করেছে। সে জানে না এটা কোথা থেকে এসেছে। শুধু জানে, ছোটবেলা থেকেই এটা তার কাছে আছে। ধাতব টুকরোটা আজ অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা। মারদেকা সেটা বের করল না।

কিন্তু এলিয়াস তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে গেল। তার চোখ হঠাৎ বদলে গেল। “তোমার কাছে এখনও আছে।”

লারসেনও ঘুরে তাকাল। মারদেকার হাত বুকের কাছে।

লারসেনের মুখ সাদা হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে বলল, “তুমি এটা এতদিন ধরে লুকিয়ে রেখেছিলে?”

মারদেকা কোনো উত্তর দিতে পারল না।

এলিয়াস পাথরের চিহ্নটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, 
“ওটা শুধু একটা স্মৃতি নয়।”

বাইরে আবার গুলি হলো। এইবার পাথরের একটা অংশ ভেঙে মারদেকার পায়ের কাছে এসে পড়ল।

লারসেন আর অপেক্ষা করল না। সে মারদেকাকে ধরে পাথরের ফাঁকের দিকে ঠেলে দিল। এলিয়াস তার পেছনে। নিজে ঢোকার আগে লারসেন একবার বাইরে তাকাল।

গিরিখাতের মুখে অন্ধকারের মধ্যে কয়েকটা ছায়া দেখা যাচ্ছে। তারা এগিয়ে আসছে। 
একজন রাইফেল তুলল।

লারসেন পিস্তল বের করে একবার গুলি করল। তারপর নিজেও পাথরের ফাঁকের মধ্যে ঢুকে গেল। ফাঁকের ওপাশে মাটি নেই।

মারদেকার পা হঠাৎ শূন্যে চলে গেল। সে নিচে পড়ে যাচ্ছিল। লারসেন তার হাত ধরে ফেলল। অন্ধকারের ভেতর তাদের তিনজনের শরীর ঝুলে রইল এক মুহূর্ত।

তারপর এলিয়াস নিচে তাকিয়ে খুব ধীরে বলল, “নিচে নামো। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল সবকিছু।”

মারদেকা নিচের অন্ধকারের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, বহু বছর ধরে যে কণ্ঠস্বর তাকে স্বপ্নের মধ্যে ডেকে এসেছে, সেই কণ্ঠস্বর যেন এবার অন্ধকারের নিচ থেকে আবার তাকে ডাকছে। দৌড়াও।

কিন্তু এবার সে জানত, তাকে পালাতে হবে না। তাকে নিচে নামতে হবে। কারণ তার অতীত ওপরে কোথাও পড়ে নেই। তার অতীত অপেক্ষা করছে পাহাড়ের গভীরে।

আর সেই অন্ধকারের মধ্যে হয়তো লুকিয়ে আছে সেই নাম, যেটাকে লারসেন এত বছর ধরে পৃথিবীর চোখ থেকে মাটির নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিল।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/268549/</link>
				<pubDate>Wed, 02 Sep 2026 05:22:21 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২৪<br />
পাহাড়ের অন্ধকারে তিনটি ছায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। সামনে এলিয়াস, তার কয়েক গজ পেছনে লারসেন, আর তাদের মাঝামাঝি মারদেকা। গিরিখাতের সরু পথটা কখনও এত নিচে নেমে যাচ্ছে যে হাঁটতে গেলে মাথার ওপর পাথরের ছাদ মনে হচ্ছে, আবার কোথাও হঠাৎ প্রশস্ত হয়ে দুপাশের দেয়াল একটু দূরে সরে যাচ্ছে। আকাশের সরু ফালি দিয়&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-268549"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/268549/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">9efaffb7954ba675078655b7667feb56</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২৩
“দৌড়াও।”

লারসেনের কণ্ঠস্বরটা পেছন থেকে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মারদেকা আর একবারও ফিরে তাকাল না। তার সামনে পাহাড়ের সরু পথটা অন্ধকারের ভেতর বাঁক নিয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। দুই পাশে খাড়া পাথর, কোথাও কোথাও শুকনো ঝোপ এমনভাবে পথের ওপর ঝুঁকে আছে যে দৌড়াতে গিয়ে শরীর সেগুলোর সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। তার বুটের নিচে ছোট পাথর গড়িয়ে খাদে পড়ছে, আর সেই ক্ষীণ শব্দগুলোও পাহাড়ের নিস্তব্ধতার মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

পেছনে আবার গুলির শব্দ হলো। একটা গুলি তার মাথার অনেক ওপর দিয়ে চলে গিয়ে দূরের পাথরে আঘাত করল। ধুলো আর ছোট ছোট পাথরের টুকরো ছিটকে পড়ল পথের ওপর। মারদেকা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাথা নিচু করল। কিন্তু থামল না।

তার বুকের ভেতর দ্রুত শ্বাস উঠানামা করছে। দৌড়ানোর কারণে নয় শুধু। তার মাথার মধ্যে এখনও সেই নামটা ঘুরছে। এলিয়াস।

নামটা যেন তার নিজের নয়। কোথা থেকে এসেছে, সে জানে না। তবু নামটা উচ্চারণ করার মুহূর্তে তার বুকের ভেতর যে অনুভূতিটা হয়েছিল, সেটা ভয় ছিল না। আবার স্বস্তিও নয়। বরং এমন এক অনুভূতি, যেন বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া কোনো কণ্ঠস্বর হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে থেকে তাকে ডাক দিয়েছে।

তার সামনে পথটা হঠাৎ দুই ভাগ হয়ে গেল। ডান দিকের পথটা অপেক্ষাকৃত চওড়া, কিন্তু খোলা। বাঁ দিকেরটা সরু এবং পাথরের আড়াল দিয়ে নিচে নেমেছে। মারদেকা এক মুহূর্তের জন্য থামতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই পেছন থেকে লারসেনের গলা এল। “বাঁ দিকে।”

মারদেকা বাঁ দিকের পথ ধরে নেমে গেল।

লারসেন তার কয়েক পা পেছনে ছিল। বয়সের তুলনায় মারদেকার গতি বেশি, কিন্তু লারসেন এমনভাবে এগোচ্ছিল যেন প্রতিটি পাথর, প্রতিটি বাঁক এবং প্রতিটি আড়াল তার চোখে আলাদা করে ধরা পড়ছে। সে দৌড়াচ্ছে, আবার একই সঙ্গে শুনছে। পেছনের গুলির শব্দ, ওপরের ঢালে পাথর গড়িয়ে পড়ার আওয়াজ, দূরে ঘোড়ার অস্থির হ্রেষাধ্বনি, সবকিছুই যেন তার মাথার ভেতরে আলাদা আলাদা জায়গায় সাজানো হচ্ছে। আর সেই হিসেবের মাঝখানে একটি নাম বারবার এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে। এলিয়াস। 

বহু বছর ধরে সে নামটা তার কাছে মৃত ছিল। মৃত মানুষের নাম কখনও কখনও মানুষের স্মৃতি থেকে পুরোপুরি মুছে যায় না। বরং কিছু নাম মানুষের ভেতরে এমনভাবে থেকে যায়, যেন পুরোনো ক্ষতের নিচে লুকিয়ে থাকা ভাঙা ধাতু। বাইরে থেকে ক্ষত শুকিয়ে যায়, সময় তার ওপর নতুন চামড়া তৈরি করে, মানুষ স্বাভাবিক জীবনেও ফিরে আসে। কিন্তু একদিন হঠাৎ কোথাও আঘাত লাগলে ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই ধাতু আবার নড়ে ওঠে।

লারসেনের কাছে এলিয়াস ছিল ঠিক তেমনই। কিন্তু সে কখনও ভাবেনি, সেই পুরোনো ক্ষত আবার এভাবে খুলে যাবে। আর তার চেয়েও বড় কথা, সে কখনও ভাবেনি একটি তেরো বছরের ছেলের স্মৃতির ভেতর থেকে সেই নাম ফিরে আসবে।

আরেকটি গুলি হলো। এবার শব্দটা এত কাছে যে লারসেন আর অপেক্ষা করল না। সে সামনে ঝাঁপিয়ে গিয়ে মারদেকার কাঁধ ধরে তাকে পাথরের দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল। দুজনেই নিচু হয়ে বসল। গুলিটা তাদের মাথার ওপরের পাথরে লেগে বিকট শব্দে ছিটকে গেল। কিছুক্ষণ শুধু ধুলো ঝরতে থাকল।

মারদেকা দেয়ালের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে শ্বাস নিচ্ছিল। তার চোখ অন্ধকারে পেছনের পথের দিকে। “ওরা ওপর থেকে আসছে।”

লারসেন মাথা নেড়ে কিছু বলল না। সে পিস্তলটা হাতে ধরে পাথরের কিনারা থেকে সামান্য বাইরে তাকাল। অন্ধকার পুরোপুরি নেমে আসেনি। পশ্চিমের আকাশে দিনের শেষ আলো এখনও পাথরের চূড়াগুলোর কিনারায় লেগে আছে। সেই ফিকে আলোয় দূরের ঢালগুলো কালো হয়ে গেছে। কোথাও কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু লারসেন জানত, দেখা না যাওয়ার অর্থ কেউ নেই, তা নয়।

কিছুক্ষণ আগে তারা দুজনকে দুজন মানুষ দেখেছিল। এখন গুলির দিক দেখে মনে হচ্ছে অন্তত একজন ওপরের অবস্থান বদলেছে। পাহাড়ি জায়গায় একজন রাইফেলধারী মানুষ কয়েক মিনিটের মধ্যে এমন জায়গায় চলে যেতে পারে, যেখানে তাকে দেখা যায় না, কিন্তু সে নিচের চলাচল স্পষ্ট দেখতে পায়।

লারসেনের চোখ আবার সরু হয়ে এল। “চলো।”

মারদেকা নড়ল না। সে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল।

লারসেন এবার তার মুখের দিকে তাকাল। “কী দেখছ?”

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। পাথরের ফাঁক দিয়ে নিচের মাটিটা ভালো করে দেখছিল সে। সেখানে অন্ধকার একটু বেশি। তবু বাতাসের গন্ধ, পাথরের গায়ে জমে থাকা ধুলো, আর সামান্য নরম মাটির অংশে কিছু অস্পষ্ট দাগ তার চোখ এড়িয়ে গেল না। সে নিচু হয়ে বসে একটা জায়গার দিকে আঙুল তুলল। “এখানে কেউ গেছে।”

লারসেন তার দিকে তাকাল। তারপর দাগগুলোর দিকে। “কতক্ষণ আগে?”

মারদেকা মাটি স্পর্শ করল না। লারসেন তাকে বহুবার বলেছে, সবকিছু হাতে ছুঁয়ে পরীক্ষা করতে নেই। বিশেষ করে যখন সময় কম এবং পেছনে শত্রু থাকে। সে শুধু চোখ নামিয়ে দেখল। পাথরের ওপরের ধুলো কোথাও চাপা পড়েছে। একটা শুকনো পাতার ভাঙা অংশ পাশের দিকে সরে আছে। “বেশিক্ষণ না।”

লারসেন কিছু বলল না।

মারদেকা এবার একটু নিচের দিকে তাকাল। “দুজন নয়।”

“কতজন?”

ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল, “নিশ্চিত না। কিন্তু একজনের বেশি।”

লারসেন এবার নিজেই জায়গাটা পরীক্ষা করল। তার চোখে ক্লান্তি ছিল না, কিন্তু মনোযোগের নিচে একটা চাপা অস্থিরতা কাজ করছিল। মারদেকা ঠিকই বলেছে। মাটির ওপরের চিহ্নগুলো পরিষ্কার নয়। তবু এখানে শুধু পাহাড়ি ছাগল বা বুনো প্রাণীর চলাচল হয়নি। মানুষ ছিল। আর সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো, চিহ্নগুলো সেই দিকেই যাচ্ছে যেদিক দিয়ে তাদের যাওয়ার কথা।
 
লারসেন ধীরে মাথা তুলল। এর অর্থ দুটির একটিই হতে পারে। হয় শত্রুরা এই পাহাড়কে তার চেয়েও ভালো চেনে। অথবা তারা আগে থেকেই জানত সে কোন পথ দিয়ে বেরোবে। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটা তার কাছে আরও খারাপ মনে হলো।

কারণ পাহাড়ের অন্য পাশে পাওয়া বাদামি ঘোড়াটা এখন নতুন অর্থ নিচ্ছে। সেই ঘোড়াটা কি কেবল কারও ফেলে যাওয়া ঘোড়া ছিল? নাকি তাদের জন্য আগে থেকেই সেখানে রাখা হয়েছিল? চামড়ার থলে, পুরোনো কাগজ, ধাতব পাত, সবকিছু কি কেবল অতীতের চিহ্ন ছিল?

নাকি কেউ জানত, সে সেখানে পৌঁছাবে? লারসেনের বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা অনুভূতি ছড়িয়ে গেল।

মারদেকা তার দিকে তাকাল। “আমরা কি ফাঁদে পড়েছি?”

প্রশ্নটা শিশুসুলভ কৌতূহল নিয়ে করা হয়নি। ছেলেটা এখন পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে। লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। “এখনও জানি না।”

“আপনি জানেন না?”

“না।”

এই উত্তরটা শুনে মারদেকা অবাক হলো না। বরং তার মুখে এক ধরনের স্থিরতা দেখা গেল। গত কয়েকদিনে সে লারসেনকে এমন অবস্থায় খুব কম দেখেছে। লারসেন সাধারণত কোনো পথ না জানলেও অন্তত কোন পথ এড়িয়ে চলতে হবে তা জানে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে পাহাড়টা তার পরিচিত, অথচ একই সঙ্গে অচেনা হয়ে গেছে।

দূরে কোথাও পাথর গড়িয়ে পড়ল। দুজনেই একসঙ্গে মাথা তুলল। তারপর আবার নীরবতা।

লারসেন হাত তুলে মারদেকাকে নিচু থাকতে ইশারা করল। কয়েক মুহূর্ত পর সে খুব ধীরে পাথরের আড়াল ছেড়ে এগিয়ে গেল। এবার দৌড় নয়। প্রতিটি পা হিসেব করে রাখা। মারদেকাও তার পেছনে গেল।

পথটা নিচে নামতে নামতে হঠাৎ একটা সরু খাদের কিনারা ধরে বাঁক নিয়েছে। বাঁ পাশে উঁচু পাথরের দেয়াল। ডান পাশে এত গভীর অন্ধকার যে নিচে কী আছে বোঝা যায় না। বাতাস নিচ থেকে উঠে এসে ঠান্ডা হয়ে মুখে লাগছে।

মারদেকা একবার নিচে তাকিয়ে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল। এই ধরনের জায়গায় সে পাহাড়ি জীবনে চলেছে। কিন্তু রাত নামার আগে এমন খাড়া পথে দ্রুত এগোনো সহজ নয়। সামান্য ভুল পা, সামান্য ভেজা পাথর, আর মানুষ কয়েকশ ফুট নিচে চলে যেতে পারে।

লারসেন থামল। সামনের দিকে পথটা ভেঙে গেছে। কয়েক গজ অংশ ধসে নিচে পড়ে গেছে। এখন পাথরের দেয়াল ঘেঁষে মাত্র দেড় হাতের মতো একটা সরু অংশ বাকি। সেখানে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ পাশ ফিরে এগোতে পারবে, কিন্তু দ্রুত চলা অসম্ভব।

পেছনে আবার গুলির শব্দ হলো। এবার শব্দটা দূরে। লারসেন চোখ সরু করল।

ওরা অন্ধভাবে গুলি করছে না। বরং মাঝে মাঝে গুলি চালাচ্ছে, যাতে তারা এগিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তাদের উদ্দেশ্য যদি শুধু হত্যা করা হতো, তাহলে এতক্ষণে আরও কাছাকাছি আসার চেষ্টা করত। তাহলে কি তারা সত্যিই কাউকে জীবিত চায়? 

লারসেন নিজের ভাবনাটা শেষ করার আগেই মারদেকা তার হাতের কাছে এসে দাঁড়াল। “আমি আগে যাব।”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। “না।”

“আমি পারব।”

“আমি বলেছি না।”

মারদেকা চুপ করে গেল। কিন্তু তার চোখে বোঝা যাচ্ছিল, সে নিজের দক্ষতা নিয়ে গর্ব করছে না। সে শুধু পথটা দেখে বুঝেছে, তার শরীর হালকা। বয়স কম। সরু জায়গা দিয়ে তার এগোনো সহজ হতে পারে।

লারসেন সেটা বুঝল। তবু সে তাকে আগে যেতে দিতে চাইল না। সে পাথরের দেয়ালের সঙ্গে এক হাত রেখে শরীর ঘুরিয়ে সরু অংশে পা রাখল। পায়ের নিচে ছোট পাথর খসে নিচে পড়ে গেল। শব্দটা অনেকক্ষণ ধরে নিচের অন্ধকারে প্রতিধ্বনিত হলো।

মারদেকা নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইল।

লারসেন এক পা, তারপর আরেক পা এগোল। অর্ধেক পথ পেরোনোর সময় দূরে আবার বন্দুকের শব্দ হলো। এইবার গুলি তাদের দিকে আসেনি। বরং শব্দের প্রতিধ্বনি শুনে মনে হলো, শত্রুরা পথের অন্য দিকে অবস্থান বদলাচ্ছে।

লারসেন থেমে গেল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “শুনে রাখো। আমি ওপারে পৌঁছালে তুমি আসবে। দেয়ালের দিকে তাকাবে। নিচে না।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

কয়েক মুহূর্ত পরে লারসেন ওপারে পৌঁছে গেল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে মারদেকার দিকে তাকাল। “এবার।”

মারদেকা দেয়ালের সঙ্গে শরীর চেপে ধরে এগোতে শুরু করল।

প্রথম কয়েকটা পা সহজ ছিল। তারপর পথটা আরও সরু হয়ে গেল। তার ডান পায়ের নিচে শক্ত জায়গা খুঁজে নিতে হচ্ছে। বাঁ হাত দিয়ে পাথরের খাঁজ ধরে এগোচ্ছে। নিচের খাদ থেকে ঠান্ডা বাতাস উঠে এসে কাপড় নড়াচ্ছে। হঠাৎ তার হাতের নিচের একটা ছোট পাথর নড়ে গেল। তার শরীর সামান্য দুলে উঠল।

লারসেন সামনে হাত বাড়ালেও দূরত্ব বেশি।

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু ভাঁজ করে শরীর দেয়ালের দিকে ঝুঁকিয়ে দিল। পাহাড়ি পথে ভারসাম্য রক্ষার যে অনুশীলন সে এতদিন করেছে, সেটা এখন কোনো শিক্ষার কথা মনে করে নয়, শরীরের অভ্যাস হিসেবে কাজ করল। কয়েক মুহূর্ত সে এক জায়গায় স্থির রইল। তারপর আবার এগোল।

ওপারে পৌঁছে লারসেন তার কাঁধ শক্ত করে ধরল। “ভালো।”

একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু মারদেকা বুঝল, লারসেন সন্তুষ্ট। তারা আর সময় নষ্ট করল না।

পথটা এবার কিছুটা নিচে নেমে একটি সংকীর্ণ গিরিখাতের দিকে চলে গেছে। সেখানে আলো আরও কম। দুই পাশে পাথরের দেয়াল এত উঁচু যে আকাশের মাত্র সরু একটা রেখা দেখা যায়। জায়গাটা এমন, যেখানে কয়েকজন মানুষ সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারে।

লারসেন সেখানে ঢোকার আগে থামল। মারদেকা বুঝতে পারল কেন। নীরবতা খুব গভীর। অস্বাভাবিকভাবে গভীর।

কোনো পাখির ডাক নেই। বাতাসও ভেতরে ঢুকছে না। শুধু দূরে কোথাও থেকে জল পড়ার মতো ক্ষীণ একটা শব্দ আসছে।

মারদেকা চোখ বন্ধ করল না, কিন্তু মাথা সামান্য কাত করল।

লারসেন তার দিকে তাকাল। “কী?”

মারদেকা ফিসফিস করে বলল, “ঘোড়া।”

“কোথায়?”

“এখানে না।”

সে একটু থামল। “আগে ছিল।”

লারসেন চারপাশে তাকাল। গিরিখাতের মাটিতে আলো কম। তবু কয়েক জায়গায় শুকনো ধুলো জমে আছে। সেখানে অস্পষ্ট খুরের দাগ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দাগগুলো নতুন নয়। সম্ভবত কয়েক ঘণ্টা, হয়তো তারও বেশি পুরোনো।

মারদেকা ধীরে এগিয়ে গিয়ে মাটির দিকে তাকাল। “একটা না।”

লারসেন এবার তার পাশে এসে দাঁড়াল। খুরের দাগগুলো পরস্পরের ওপর পড়েছে। কেউ এখানে বহুবার যাতায়াত করেছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু পথটা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে, সেটা সামনে না এগোলে বোঝার উপায় নেই।

ঠিক তখন গিরিখাতের গভীর থেকে একটা শব্দ এলো। খুব ক্ষীণ। ধাতুর সঙ্গে ধাতুর স্পর্শ। দুজনেই স্থির হয়ে গেল।

লারসেনের হাত পিস্তলের বাঁটে।

মারদেকার হাত নিজের ছুরির কাছে গেল, কিন্তু সে সেটি বের করল না।

কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। তারপর আবার সেই শব্দ। টিং।

এবার লারসেনের মুখের ভাব বদলে গেল। সে ধীরে হাত বাড়িয়ে নিজের কোটের ভেতরের পকেটে হাত দিল। সেখানে দুটি কালচে ধাতব চাকতি রয়েছে। তার আঙুল একটির গায়ে ছুঁতেই সে থেমে গেল।

শব্দটা গিরিখাতের ভেতর থেকে এসেছে। কিন্তু শব্দের ধরন এমন, যেন কেউ ইচ্ছা করে ধাতব কোনো ছোট জিনিস পাথরের গায়ে স্পর্শ করিয়েছে। একবার। তারপর বিরতি। আবার একবার।

মারদেকা লারসেনের দিকে তাকাল। “ওরা?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। তার মনে পড়ল গোপন দরজার ওপাশের তিনবারের সংকেত। 

মনে পড়ল ভাঙা কণ্ঠস্বর, “যে মানুষটা এখনও তোমাকে অপেক্ষা করছে।” আর তারপর মনে পড়ল এলিয়াস।  বহু বছর ধরে মৃত বলে ধরে নেওয়া একজন মানুষ। নাকি মৃত নয়?

লারসেনের চোখ অন্ধকার গিরিখাতের দিকে স্থির হয়ে রইল। তারপর সে খুব নিচু গলায় বলল, “আমার পেছনে থাকো।”

মারদেকা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু থেমে গেল।

কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে গিরিখাতের ভেতর থেকে তৃতীয়বারের মতো ধাতব শব্দটা শোনা গেল। টিং। তারপর চারপাশ আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। 

কিন্তু এবার সেই নীরবতা আর খালি পাহাড়ের নীরবতা ছিল না। কোথাও কেউ আছে। আর সে জানে, লারসেন সেখানে পৌঁছেছে।

অন্ধকার গিরিখাতের ভেতর দাঁড়িয়ে লারসেন কয়েক মুহূর্ত কোনো শব্দ করল না। তার ডান হাত এখনও পিস্তলের বাঁটে। বাঁ হাত কোটের ভেতরে, যেখানে কালচে ধাতব চাকতিটা আঙুলের নিচে ঠান্ডা হয়ে আছে। মারদেকা তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে। ছেলেটার চোখ অন্ধকার ভেদ করার চেষ্টা করছে, কিন্তু সামনে কয়েক গজের বেশি কিছু দেখা যাচ্ছে না। গিরিখাতের দুই পাশের পাথরের দেয়াল এত উঁচু যে শেষ আলোটুকুও সেখানে এসে পৌঁছাতে পারেনি।

দূরে কোথাও আবার জল পড়ার শব্দ হলো। তারপর নীরবতা।

লারসেন ধীরে ধীরে এক পা এগোল। পাথরের নিচে শুকনো কাঁকর চাপা পড়ে মৃদু শব্দ করল। সঙ্গে সঙ্গে গিরিখাতের গভীর থেকে কোনো মানুষের পায়ের শব্দ শোনা গেল না। কেউ দৌড়াল না, অস্ত্র তুলল না, এমনকি কোনো সতর্কতাও দিল না।

এটাই লারসেনকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলল। যে মানুষ লুকিয়ে থেকে অপেক্ষা করে, সে সাধারণত শত্রুর আগমন বুঝলে কোনো না কোনো শব্দ করে। কিন্তু এখানে যে অপেক্ষা করছে, সে যেন জানে লারসেন তাকে আক্রমণ করতে আসেনি। অথবা সে এতটাই নিশ্চিত যে লারসেন তার ক্ষতি করবে না।

লারসেন আরও এগোল। মারদেকা পেছনে পেছনে চলল। তার পায়ের শব্দ প্রায় শোনা যাচ্ছিল না। এতদিনে সে শিখে গেছে, অন্ধকারে চলার সময় শরীরের ওজন কীভাবে মাটিতে ফেলতে হয়, শুকনো পাথরের ওপর কোথায় পা রাখা যায় আর কোথায় রাখা যায় না। কিন্তু আজ তার চলার মধ্যে সেই স্বাভাবিক নিশ্চিন্ততা নেই। অদৃশ্য কারও উপস্থিতি সে অনুভব করছে।

কিছুদূর গিয়ে গিরিখাতটা একটু চওড়া হলো। সামনে একটা পাথরের দেয়াল। তার নিচে অন্ধকারের মধ্যে ছোট একটা ফাঁক। ফাঁকটার পাশে শুকনো কাঠের কিছু টুকরো পড়ে আছে। তার ওপর কালচে ছাই। বহুদিন আগে এখানে আগুন জ্বালানো হয়েছিল। ছাই পুরোনো, কিন্তু তার নিচে এখনও একটা অদ্ভুত গন্ধ আছে, পোড়া কাঠের সঙ্গে মিশে থাকা তেলের গন্ধ।

লারসেন থামল। তার চোখ ছাইয়ের ওপর স্থির হলো। এই জায়গাটা সে আগে কখনও দেখেনি। তবু কেন যেন মনে হলো, সে এমন জায়গা বহু বছর আগে দেখেছে। অন্য কোনো পাহাড়ে। অন্য কোনো রাতে। অন্য কিছু মানুষের সঙ্গে।

স্মৃতিটা তার মাথায় পুরোপুরি ফিরে আসার আগেই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। “তুমি এখনও আগের মতোই হাঁটো, লারসেন।”

কণ্ঠস্বরটা কর্কশ নয়। বয়সের ভার আছে, কিন্তু দুর্বলতা নেই। বরং অদ্ভুত শান্ত। এমন শান্ত, যেন এই পাহাড়ের অন্ধকার আর এই রাতের বিপদ তার কাছে বহু পুরোনো পরিচিত জিনিস।

লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। মারদেকা তার পেছনে আরও সোজা হয়ে দাঁড়াল।

লারসেন ধীরে পিস্তল বের করল না। শুধু হাতটা বাঁট থেকে সরিয়ে পাশে নামিয়ে রাখল। “এলিয়াস।”

অন্ধকার থেকে কোনো উত্তর এল না। কয়েক মুহূর্ত পর পাথরের আড়াল থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এল।

প্রথমে তার মুখ দেখা গেল না। লম্বা চাদরের মতো পুরোনো কোট গায়ে, মাথায় ছায়া ফেলা টুপি। শরীর খুব রোগা নয়, আবার আগের মতো শক্তিশালীও নয়। বয়স তার শরীরে নিজের চিহ্ন রেখে গেছে। দাড়িতে ধূসর রং, গালের পাশে পুরোনো কাটা দাগ, আর ডান চোখের নিচে একটা গভীর রেখা।

কিন্তু চোখ দুটো দেখে লারসেনের আর কোনো সন্দেহ রইল না। এলিয়াস। যে মানুষটাকে সে মৃত ভেবেছিল। যার জন্য বহু বছর আগে একটি নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। যার সঙ্গে সম্পর্কিত সব কাগজ, সব চিহ্ন, সব স্মৃতি সে নিজের জীবন থেকে সরিয়ে ফেলেছিল। সেই মানুষ এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে।

এলিয়াস কিছুক্ষণ লারসেনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে সরে গিয়ে মারদেকার ওপর থামল। সেই মুহূর্তে তার চোখের পরিবর্তনটা লারসেনের নজর এড়াল না। 

এলিয়াস ছেলেটাকে দেখছিল না, যেন তার ভেতর দিয়ে অনেক দূরের কোনো সময়কে দেখছে। 

মারদেকাও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ সেই অদ্ভুত অনুভূতিটা ফিরে এল। কোথাও যেন সে এই চোখ দেখেছে। কখনও খুব কাছে নয়। কোনো মুখও নয়। শুধু অন্ধকারের ভেতর একটা অস্পষ্ট উপস্থিতি। তারপর সেই কণ্ঠস্বর। দৌড়াও।

মারদেকা নিজের অজান্তেই এক পা সামনে এগিয়ে গেল। এলিয়াসের চোখ তার মুখে স্থির। কিন্তু সে কিছু বলল না।

লারসেন সেটা লক্ষ্য করল। “তুমি কতদিন ধরে এখানে আছ?”

এলিয়াসের দৃষ্টি এখনও মারদেকার ওপর। “যতদিন তুমি ভাবছ, তার চেয়ে বেশি।”

লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না। “আমাকে অনুসরণ করছিলে?”

“না।”

“তাহলে জানলে কীভাবে আমি আসব?”

এলিয়াস এবার লারসেনের দিকে তাকাল। “কারণ তুমি আসবে, সেটা আমি জানতাম। কখন আসবে, সেটা জানতাম না।”

লারসেন কিছু বলল না। গিরিখাতের ওপর দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল। কোথাও শুকনো পাতার সঙ্গে পাথরের ঘর্ষণের শব্দ হলো। সেই ক্ষীণ শব্দের মধ্যেও তিনজন মানুষের নীরবতা যেন আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মারদেকা এলিয়াসের দিকে তাকিয়ে ছিল।  এবার এলিয়াস ধীরে ধীরে তার দিকে এক পা এগিয়ে এল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলল। 

এলিয়াস থেমে গেল। তার ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটল। “তুমি এখনও কাউকে বিশ্বাস করতে শেখোনি।”

“যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন প্রয়োজনও হবেনা।”

এলিয়াস হাসল না এবার। “সেটা ঠিক।” তারপর সে মারদেকার দিকে তাকাল। “ছেলেটাকে তুমি অনেক কিছু শিখিয়েছ।”

লারসেনের চোখ সরু হয়ে এল। “কীভাবে জানো?”

“ওর হাঁটা দেখে।”

এই উত্তরটা এত সহজ ছিল যে লারসেনের সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।

এলিয়াসের দৃষ্টি মারদেকার পায়ের দিকে গেল। তারপর তার হাতের দিকে। ছেলেটা ছুরিটা বের করেনি, কিন্তু হাতটা এখনও তার কাছেই আছে। “ওকে তুমি পাহাড়ের শব্দ শুনতে শিখিয়েছ।” বললো সে।

লারসেন এবারও কিছু বলল না।

“পায়ের নিচের মাটি পড়তে শিখিয়েছ। বাতাসের গন্ধ আলাদা করতে শিখিয়েছ। অন্ধকারে মানুষের আগে ছায়াকে চিনতে শিখিয়েছ।”

মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল। এগুলো তার শেখা জিনিস। কিন্তু এলিয়াস কীভাবে জানে?

লারসেনের মুখে এবার প্রথমবারের মতো কঠিন বিস্ময় ফুটে উঠল।

এলিয়াস মাথা সামান্য কাত করল। “কিন্তু একটা জিনিস এখনও তুমি ওকে শেখাওনি।”

“কী?”

“কোন মানুষকে বিশ্বাস করা যায়।”

লারসেনের চোখে মুহূর্তের জন্য পুরোনো রাগ জ্বলে উঠল। “এই কথাটা তোমার মুখে ভালো শোনায় না।”

এলিয়াস জবাব দিল না। সে আবার মারদেকার দিকে তাকাল।

ছেলেটার চোখে এখন প্রশ্ন। কিন্তু সে প্রশ্ন করছে না। সম্ভবত তার ভেতরে এমন কিছু নড়েচড়ে উঠেছে, যার ভাষা এখনও সে খুঁজে পায়নি।

এলিয়াস খুব ধীরে বলল, “তুমি কি এখনও সেই স্বপ্নটা দেখো?”

মারদেকা চমকে উঠল।

লারসেনও স্থির হয়ে গেল।

এলিয়াসের প্রশ্নটা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু তার ভেতরে এমন কিছু ছিল যা লারসেনের বুকের ভেতর বহু বছরের পুরোনো একটা দরজা খুলে দিল। তারমানে মারদেকার সেই কণ্ঠস্বরের কথা এলিয়াস জানে।

লারসেন এবার ছেলেটার দিকে তাকাল। মারদেকা কিছু বলছে না। তার মুখে বিস্ময়, কিন্তু ভয় নেই। সে যেন নিজের অজান্তে অপেক্ষা করছে।

এলিয়াস আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে শুধু বলল, “কিছু স্মৃতি মানুষ নিজের চোখে দেখে না। কখনও কখনও অন্য কারও কণ্ঠস্বর হয়ে ফিরে আসে।”

মারদেকার বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল। দৌড়াও শব্দটা যেন আবার তার মাথার ভেতরে ফিরে এল। 

কোনো মুখ নেই। কোনো দৃশ্য নেই। শুধু কণ্ঠস্বর। একটা অন্ধকার পথ। পাথরের ওপর ছুটে চলা পায়ের শব্দ। আর কোথাও একজন মানুষ তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। 

মারদেকা চোখ বন্ধ করল না। সে শুধু মাথাটা সামান্য নিচু করল।

লারসেন সেটা দেখল। তারপর এলিয়াসের দিকে তাকাল। “তুমি ওর কথা জানো।”

এলিয়াস এবার সরাসরি উত্তর দিল না। সে পাথরের পাশে পড়ে থাকা একটা শুকনো কাঠ তুলে নিল। আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে দেখল। তারপর কাঠটা আবার মাটিতে ফেলে দিল। “আমি অনেক কিছু জানি।”

“কতটা?”

“যতটা জানলে তোমার ঘুম আর ফিরবে না।”

লারসেনের মুখ পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। “তাহলে বলো।”

“এখনও না।”

দূরে কোথাও বজ্রের মতো ক্ষীণ শব্দ হলো। সম্ভবত পাহাড়ের ওপারে গুলির প্রতিধ্বনি। শত্রুরা এখনও তাদের খুঁজছে। 

এলিয়াস মাথা তুলে গিরিখাতের মুখের দিকে তাকাল। “তোমার সময় কম।”

“আমার সময় নিয়ে তুমি চিন্তা কোরো না।”

“আমি তোমার জন্য চিন্তা করছি না।”

এলিয়াসের চোখ আবার মারদেকার দিকে গেল। “ওর জন্য করছি।”

এইবার লারসেনের মুখের কঠোরতা ভেঙে গেল না, কিন্তু তার চোখে সতর্কতার সঙ্গে অন্য কিছু এসে মিশল। “ওর ব্যাপারে তুমি কী জানো?”

এলিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর খুব ধীরে বলল, “ও কোথা থেকে এসেছে, সেটা তুমি জানো।”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না।

“ও কেন নিজের লোকেদের কাছেও পর ছিল, সেটাও তুমি জানো।”

মারদেকা এবার লারসেনের দিকে তাকাল। তারপর এলিয়াসের দিকে।

এলিয়াস বলল, “কিন্তু ওর জন্মের আগের গল্পটা তুমি জানো না।”

লারসেনের বুকের ভেতর যেন কেউ হঠাৎ মুঠো করে ধরল। সে বুঝল, কথাটা এখানেই থামানো যাবে না। এলিয়াস এমন কিছু জানে, যা এতদিন শুধু তার ধারণার মধ্যে ছিল।

মারদেকার জন্মের আগের ঘটনা। অর্থাৎ সেই সময়, যখন লারসেনের গোপন দল এখনও ভেঙে যায়নি। যখন তারা পাহাড়ের ওপারে যাতায়াত করত। যখন কিছু মানুষ তাদের সঙ্গে ছিল, যাদের নাম পরে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল।

এলিয়াসের চোখে তখন আর কোনো রহস্যময়তা ছিল না। সেখানে ছিল ক্লান্তি। অনেক বছর ধরে বহন করে আনা কোনো অপরাধের ক্লান্তি। “তুমি কি জানো, লারসেন,” সে ধীরে বলল, “কিছু মানুষ পৃথিবীতে জন্মায় না। তাদের জন্মের আগেই তাদের জন্য একটা পথ ঠিক হয়ে যায়।”

লারসেন চুপ করে রইল। 

“আর সেই পথের ওপর যারা হাঁটে, তারা ভাবে তারা নিজের ভাগ্য বেছে নিয়েছে।” এলিয়াস একটু থামল। “আসলে কেউ একজন তাদের জন্য একটা দরজা খুলে রেখেছিল।”

মারদেকা বুঝতে পারছিল না কথাগুলোর অর্থ। কিন্তু লারসেন বুঝছিল। অন্তত কিছুটা। তার মনে পড়ে গেল বহু বছরের পুরোনো একটি রাত। আগুনের চারপাশে বসে থাকা কয়েকজন মানুষ। একটা মানচিত্র। পাহাড়ের ওপারে যাওয়া নিয়ে তর্ক। একজন তরুণের জেদ। আর একটি সিদ্ধান্ত, যার ফল সে কখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।

সেই স্মৃতির মধ্যে একটা মুখ ছিল। মুখটা সে এখন দেখতে চাইছিল না। 

এলিয়াস যেন তার চোখ পড়েই বুঝে ফেলল। “তুমি মনে করার চেষ্টা করছ।”

লারসেন ধীরে মাথা তুলল। “আমি অনেক কিছু ভুলে গেছি।”

“না। তুমি ভুলোনি।” এলিয়াসের কণ্ঠ এবার আরও নিচু। “তুমি শুধু কিছু জিনিস মনে করতে চাও না।” কথাটা গিরিখাতের পাথরে গিয়ে ধাক্কা খেল। 

মারদেকা দুই মানুষের দিকে তাকিয়ে রইল। তার নিজের জীবন নিয়ে এত কথা হচ্ছে, অথচ তার নাম কেউ সরাসরি উচ্চারণ করছে না। সে বুঝতে পারল, এই দুজন মানুষ তার অতীতের এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যেখানে সে এখনও পৌঁছাতে পারেনি।

তার মনে হলো, সে যদি এখন একটা প্রশ্ন করে, তাহলে হয়তো কোনো দরজা খুলে যাবে। কিন্তু কোন দরজা, সে জানে না।

এলিয়াস যেন তার মনের কথাই বুঝল। “আজ সব জানতে চেয়ো না, ছেলে।”

মারদেকা এবার প্রথমবার কথা বলল। “আমি কী জানতে চাই, সেটা আপনি জানেন?”

এলিয়াসের চোখে ক্ষীণ আলো ফুটল। “তুমি এখনও জানো না তুমি কী জানতে চাও।” 
সে একটু থামল। “কিন্তু খুব শিগগিরই জানবে।”

এরপর এলিয়াস কোটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট চামড়ার থলে বের করল। থলেটা পুরোনো, অনেকবার ব্যবহার করা হয়েছে। সে সেটা খুলল না। শুধু হাতে ধরে রাখল।

লারসেনের চোখ সঙ্গে সঙ্গে থলেটার ওপর গিয়ে স্থির হলো। কারণ চামড়ার নিচে কোনো ধাতব জিনিসের কিনারা বোঝা যাচ্ছে। একই ধরনের ধাতু। যে ধাতব চাকতির রহস্য তাদের এই পাহাড় পর্যন্ত টেনে এনেছে।

এলিয়াস লারসেনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি যেটা খুঁজছ, সেটা শুধু তোমার অতীতের চিহ্ন নয়।”

লারসেন এক পা এগিয়ে গেল। “তাহলে কী?”

এলিয়াস থলেটা আবার কোটের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলল। “একটা নামের চিহ্ন।”

লারসেন স্থির হয়ে গেল। “কার নাম?”

এলিয়াস তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “যে নামটা তুমি এত বছর ধরে মাটির নিচে চাপা দিয়ে রেখেছ।” আর কিছু বলল না সে।

গিরিখাতের বাইরে হঠাৎ ঘোড়ার ক্ষীণ হ্রেষাধ্বনি শোনা গেল। তারপর দূরে একটা গুলির শব্দ। লারসেন বুঝল, সময় শেষ হয়ে আসছে।  কিন্তু তার মাথায় এখন আর শত্রুদের কথা নেই। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা শুধু জীবিত ফিরে আসা এক পুরোনো সঙ্গী নয়।

এলিয়াস এমন এক সত্যের দরজা খুলে দিয়েছে, যার ওপাশে রয়েছে তার নিজের অতীত, তার গোপন দল, বহু বছর আগের একটি সিদ্ধান্ত, আর মারদেকার জন্মের আগের সেই অন্ধকার সময়।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, সেই দরজার চাবি সম্ভবত এতদিন ধরে মারদেকার কাছেই ছিল। ছেলেটা কিছুই জানে না। তবু তার কণ্ঠে যে অচেনা ডাক ফিরে ফিরে আসে, সেই ডাকের সঙ্গে এই পুরোনো রহস্যের যোগ আছে।

লারসেন ধীরে পিস্তলটা আবার কোমরে গুঁজে দিল। তারপর এলিয়াসের দিকে তাকাল। 
“এবার আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে।”

এলিয়াস মাথা নেড়ে সামনে এগিয়ে গেল। কয়েক পা যাওয়ার পর সে থামল।  পেছন ফিরে তাকাল না। শুধু বলল, “কিন্তু এবার থেকে ওকে আর অন্ধকারে রেখো না, লারসেন।”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। 

মারদেকা তার দিকে তাকিয়ে রইল। আর বহুদিন পর প্রথমবার তার মনে হলো, তার জীবনের অন্ধকারটা হয়তো সত্যিই অন্ধকার নয়।

সেখানে কোথাও একটা দরজা আছে। দরজার ওপাশে একজন মানুষ আছে। একটা নাম আছে।

আর সেই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার জন্মের আগের এমন এক ইতিহাস, যার জন্য আজও কেউ কেউ পাহাড়ের অন্ধকারে তাদের পিছু নিয়েছে।

তিনজন ধীরে ধীরে গিরিখাতের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল পুরোনো ছাই, খুরের দাগ আর সেই সংকেতের প্রতিধ্বনি।

আর পাহাড়ের অনেক ওপরে, অন্ধকার ঢালের আড়ালে, কেউ একজন তাদের চলে যেতে দেখছিল।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/268153/</link>
				<pubDate>Tue, 01 Sep 2026 05:04:05 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২৩<br />
“দৌড়াও।”</p>
<p>লারসেনের কণ্ঠস্বরটা পেছন থেকে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মারদেকা আর একবারও ফিরে তাকাল না। তার সামনে পাহাড়ের সরু পথটা অন্ধকারের ভেতর বাঁক নিয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। দুই পাশে খাড়া পাথর, কোথাও কোথাও শুকনো ঝোপ এমনভাবে পথের ওপর ঝুঁকে আছে যে দৌড়াতে গিয়ে শরীর সেগুলোর সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। তার বুটের ন&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-268153"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/268153/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">ec15f76c8e42476f74acd73e1c270a48</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২২
দুপুরের সূর্য তখন পাহাড়ের মাথার ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিমে নামতে শুরু করেছে। পুরোনো আশ্রয়ের ধ্বংসস্তূপের চারপাশে আলো আর ছায়ার অদ্ভুত খেলা চলছে। কোথাও পাথরের গায়ে রোদ এত তীব্র যে চোখ মেলে তাকানো কঠিন, আবার তার পাশেই কয়েক হাত দূরে এমন গাঢ় ছায়া, যেন দিনের আলো সেখানে কোনোদিন পৌঁছায়নি। দূরের পাহাড়ের ঢালে শুকনো ঘাস বাতাসে দুলছে। সেই দোলার শব্দও এখানে এসে কেমন যেন চাপা হয়ে যায়। চারপাশের নীরবতা এত ঘন যে ঘোড়ার নাক দিয়ে বেরিয়ে আসা উষ্ণ নিশ্বাস পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।

লারসেন একবারও পেছনে তাকাল না। ভাঙা আশ্রয়ের দিকে তার চোখ স্থির ছিল, কিন্তু মন যেন আরও দূরের কোনো জায়গায় চলে গেছে। বহু বছর আগে যে মানুষ এই পাহাড় ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সে আর আজকের লারসেন এক মানুষ নয়। তবু পাহাড় মানুষকে তার নিজের কাছ থেকে পালাতে দেয় না। পাথর, গাছ, পথ, এমনকি বাতাসও কখনও কখনও পুরোনো হিসাব মনে করিয়ে দেয়।

তার ডান হাতে এখনও সেই পুরোনো ধাতব টুকরোটা ধরা। বাম দিকের ভেতরের পকেটে দুটি কালচে চাকতি। কোমরে পিস্তল। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তেরো বছরের এক ছেলে, যে কিছুক্ষণ আগেই বলেছে, সে এই জায়গায় আগে ছিল।

মারদেকা ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে ভয় নেই, কিন্তু অস্বস্তি আছে। সে বুঝতে পারছে, তার স্মৃতি আর এই জায়গার মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক আছে, যার শেষ কোথায় সে জানে না। কয়েক মুহূর্ত আগে কাঠের ভাঙা দরজায় হাত রাখার সঙ্গে সঙ্গে যে দৃশ্য তার চোখের সামনে এসেছিল, সেটা এখনও তার মাথার মধ্যে ঘুরছে। আগুনের লাল আলো, ধোঁয়া, রক্তমাখা একটা হাত, আর দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া একটা ছোট ছেলে। সেই ছেলেটা কি সে নিজেই? প্রশ্নটা তার মনে উঠছে, কিন্তু উত্তর আসছে না।

লারসেন ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপের অন্য পাশে গেল। ভাঙা দেয়ালের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে মাটির ওপর হাত বুলিয়ে দেখল। কিছুক্ষণ পর তার আঙুল একটা শক্ত জিনিসে ঠেকল। সে ধুলো সরিয়ে ছোট একটা লোহার পেরেক বের করল। পেরেকটা অস্বাভাবিক মোটা। একসময় কাঠের দরজা বা কড়িকাঠে ব্যবহার করা হয়েছিল। লারসেন সেটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে মুঠোয় রেখে দিল।

মারদেকা লক্ষ্য করল, লারসেনের চোখ বারবার আশ্রয়ের একই অংশে ফিরে যাচ্ছে। জায়গাটা ছিল ধ্বংসস্তূপের একটু নিচে, যেখানে কয়েকটা বড় পাথর একসঙ্গে পড়ে আছে। সেখানে আগুনের দাগ এখনও স্পষ্ট। পাথর কালো হয়ে গেছে। মাটির কিছু অংশও অন্য জায়গার তুলনায় গাঢ়।

মারদেকা ধীরে সেখানে এগিয়ে গেল। “ওখানে কী হয়েছিল?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে একটা পাথর সরাল। নিচে শুকনো মাটি। তারপর আরেকটা পাথর। তার নিচে পোড়া কাঠের টুকরো। “আগুন।”

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকাল। “কে আগুন লাগিয়েছিল?”

লারসেন এবার ধীরে মাথা তুলল। চোখে এমন এক দৃষ্টি, যাতে উত্তর দেওয়ার ইচ্ছা নেই, আবার মিথ্যা বলার অভ্যাসও নেই। “যে আগুন লাগিয়েছিল, সে চেয়েছিল এখানে থাকা সবকিছু শেষ হয়ে যাক।”

মারদেকা আর প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার চোখে প্রশ্নটা রয়ে গেল।

লারসেন দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখল। পাহাড়ের ওপরে, নিচের খাদে, পুরোনো পথের দিকে। ঘোড়ার খুরের শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না। যারা তাদের অনুসরণ করছিল, তারা এখন কোথায় আছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। এই নীরবতাই বরং বেশি বিপজ্জনক।

সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। ভাঙা দেয়ালের পাশে একটা সরু ফাটল। সাধারণ চোখে সেটা পাহাড়ের স্বাভাবিক ফাটল বলেই মনে হবে। কিন্তু লারসেন পাথরের একটা অংশ সরিয়ে দেখাল, ফাটলের ভেতর দিয়ে নিচের দিকে ছোট একটা পথ নেমে গেছে।

মারদেকা নিচু হয়ে তাকাল। অন্ধকার। “এটা কোথায় যায়?”

“ঘরের নিচে।”

মারদেকার চোখ সরু হয়ে গেল। “ঘরের নিচে?” 

লারসেন উত্তর দিল না। সে নিজের কোমর থেকে ছোট একটা ধাতব লণ্ঠন বের করল। তেলের পরিমাণ খুব বেশি নয়। তবু যতটুকু আছে, তাতে কিছুটা আলো পাওয়া যাবে। লণ্ঠন জ্বালিয়ে সে ফাটলের ভেতর আলো ফেলল। নিচে পাথরের সরু সিঁড়ি দেখা গেল। বহু বছরের ধুলোয় প্রায় ঢেকে গেছে। কয়েক জায়গায় সিঁড়ির অংশ ভেঙে পড়েছে।

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল, এই পথ কেউ সম্প্রতি ব্যবহার করেছে। ধুলার ওপর একটা সরু পরিষ্কার রেখা নেমে গেছে। খুব স্পষ্ট নয়। কিন্তু যেখানে অন্য সব জায়গায় ধুলা সমান, সেখানে এই অংশে ধুলা যেন সামান্য ঘষা খেয়েছে। সে নিচু হয়ে তাকিয়ে রইল। 

লারসেন তার চোখের দিক অনুসরণ করল। “দেখেছ?”

মারদেকা মাথা নেড়ে বলল, “কেউ নিচে গেছে।”

“কত আগে?”

মারদেকা আঙুল বাড়িয়ে ধুলার রেখা দেখল। কিছুক্ষণ চিন্তা করল। “আজ। হয়তো গত রাতেও।”

লারসেনের চোখে সন্তুষ্টির ক্ষীণ ছাপ দেখা গেল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেটা মিলিয়ে গেল। সে জানে, পাহাড়ে কোনো চিহ্নকে শুধু একবার দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। 

লারসেন নিজের পিস্তল পরীক্ষা করল। তারপর লণ্ঠনটা নিচু করে ধরল। “আমি আগে যাব।”

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমি কি পেছনে থাকব?”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “তুমি আমাকে অনুসরন করবে। মনে রেখ, আমার পেছন থেকে এক ধাপও এগিয়ে যাবে না।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

তারা ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করল। সিঁড়ির প্রথম কয়েক ধাপ এখনও শক্ত। তারপরই পথ সরু হয়ে এল। দুপাশের পাথরের দেয়াল এত কাছাকাছি যে লারসেনকে কাঁধ সামান্য বাঁকিয়ে চলতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও ছাদের নিচু অংশে মাথা নোয়াতে হচ্ছে। বাতাসে পুরোনো ধুলা, পোড়া কাঠ আর স্যাঁতসেঁতে পাথরের গন্ধ মিশে আছে।

মারদেকা হাঁটতে হাঁটতে চারপাশ শুনছিল। ওপরের পৃথিবীর শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। বাতাসের শব্দ নেই। ঘোড়ার শব্দ নেই। শুধু তাদের পায়ের নিচে পাথরের হালকা ঘর্ষণ।

কিছুদূর নামার পর পথটা দুদিকে ভাগ হলো। লারসেন থামল। ডান দিকের পথ সরু। বাঁ দিকেরটা একটু চওড়া, কিন্তু মাটিতে ধুলা জমে আছে। 

মারদেকা ডানদিকে তাকাল। তারপর বাঁদিকে। “কেউ ডানদিকে গেছে।”

লারসেন তার দিকে তাকাল।

মারদেকা দেয়ালের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ডানদিকের পথের মাটিতে খুব সামান্য কালচে দাগ। সে আঙুল দিয়ে ছুঁল না। শুধু নাকের কাছে এনে বাতাস শুঁকল। “তেল।”

লারসেনের চোখে এবার সতর্কতা ফুটে উঠল। “কীসের?”

“লণ্ঠনের।”

লারসেন ধীরে মাথা নেড়ে ডানদিকের পথ ধরল। পথটা আরও নিচে নেমে গেছে। কয়েক গজ পর একটা ছোট কক্ষের মতো জায়গা পাওয়া গেল। দেয়ালের পাশে পুরোনো কাঠের তাক। অধিকাংশই ভেঙে পড়েছে। মেঝেতে কয়েকটা মরিচাধরা লোহার বাক্স পড়ে আছে। একটা বাক্সের ঢাকনা খোলা। ভেতরে কিছু নেই।

লারসেন একটার পর একটা বাক্স পরীক্ষা করল। কিছুই নেই। তারপর একটা ভাঙা তাকের নিচে হাত ঢুকিয়ে মাটি সরাল। তার আঙুলে একটা ছোট কাগজের টুকরো এল। কাগজের প্রান্ত পুড়ে গেছে।

লারসেন সেটা আলোয় ধরল। লেখা প্রায় মুছে গেছে। তবু একটা শব্দ বোঝা যায়। সে শব্দটা দেখেই স্থির হয়ে গেল। 

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকাল। “কী লেখা?”

লারসেন কাগজটা মুঠোয় ভাঁজ করে ফেলল। “পুরোনো হিসাব।”

“কিসের?”

লারসেন এবার উত্তর দিল না।

মারদেকা বুঝল, সে কিছু লুকাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রশ্ন করে কোনো লাভ নেই। তারা আবার এগিয়ে গেল।

কক্ষের শেষ দিকে একটা পাথরের দেয়াল। দেয়ালের মাঝখানে ছোট লোহার দরজা। দরজাটা এত নিচু যে একজন মানুষকে প্রায় ঝুঁকে ঢুকতে হবে। লোহার গায়ে মরিচা। কিন্তু তালার জায়গাটা আশ্চর্যজনকভাবে পরিষ্কার।

লারসেন হাত বাড়িয়ে তালাটা ছুঁল। তালা নতুন। পুরোনো দরজায় নতুন তালা। এটা অবশ্যই বিপজ্জনক লক্ষণ।

লারসেন পিস্তল বের করল। মারদেকাকে দেয়ালের পাশে সরে দাঁড়াতে ইশারা করল। তারপর তালাটা খুব ধীরে পরীক্ষা করল। তালার ধাতুতে সামান্য আঁচড়ের দাগ। কেউ তাড়াহুড়ো করে খুলেছে বা বন্ধ করেছে।

লারসেন পকেট থেকে পাতলা ধাতব একটা সরঞ্জাম বের করল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তালা খুলে গেল। দরজা ঠেলে খোলার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এল।

ঘরটা অন্য সব জায়গার চেয়ে বড়। মাটির বদলে পাথরের মেঝে। দেয়ালের পাশে কাঠের কয়েকটা বাক্স। ছাদের কাছাকাছি ছোট বাতাস চলাচলের ফাঁক। লারসেন লণ্ঠনটা উঁচু করতেই দেয়ালে কিছু চিহ্ন দেখা গেল। 

একটা। দুটো। তারপর আরও কয়েকটা। কালচে ধাতব চাকতির সেই একই চিহ্ন।

মারদেকা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তার বুকের ভেতর আবার চাপ তৈরি হচ্ছে। চিহ্নগুলোর দিকে তাকালেই তার মাথার মধ্যে যেন পুরোনো কোনো দরজা খুলে যাচ্ছে। সে দেয়ালের একটা চিহ্নের সামনে দাঁড়াল। তার চোখের সামনে হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠল।

একজন মানুষ একটা বাক্স বন্ধ করছে। আরেকজন বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। 
কেউ বলছে, “সময় নেই।” তারপর সেই একই নীল কাপড়। 

মারদেকা চোখ বন্ধ করে ফেলল। এক মুহূর্ত পর সে আবার বর্তমানের অন্ধকার ঘরে ফিরে এল।

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। “কী দেখেছ?”

মারদেকা এবার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। “দুজন লোক ছিল।”

লারসেনের মুখ শক্ত হলো। “আর?”

“একটা বাক্স।”

“কেমন বাক্স?”

“লোহার।”

মারদেকা কপাল চেপে ধরল। স্মৃতিটা যেন ধরা দিচ্ছে, আবার হাত ফসকে চলে যাচ্ছে। “আর একজনের গায়ে নীল কাপড় ছিল।”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। তারপর সে ঘরের সবচেয়ে বড় বাক্সটার দিকে এগিয়ে গেল। বাক্সটা মাটির সঙ্গে আটকে আছে। লোহার তৈরি। সামনে পুরোনো তালা। লারসেন তালাটা পরীক্ষা করল। এই তালাটা পুরোনো। বহু বছর ধরে খোলা হয়নি বলেই মনে হয়। কিন্তু বাক্সের ওপর ধুলা জমলেও তালার চারপাশে সামান্য ঘষার দাগ রয়েছে। কেউ সম্প্রতি এটা খোলার চেষ্টা করেছে।

লারসেন হাত বাড়িয়ে বাক্সের ঢাকনা ছুঁল। তার চোখে বহু বছরের পুরোনো স্মৃতি ফিরে এল। সে যেন আবার সেই রাত দেখতে পেল। আগুন। চিৎকার। দৌড়ানো ঘোড়া। আর একজন মানুষের মুখ। সে চোখ বন্ধ করল। 

মারদেকা কিছু বলল না। ঠিক তখনই ওপরে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ হলো। পাথরের ওপর ঘোড়ার খুর। একবার। তারপর আরেকবার।

লারসেন লণ্ঠনের আলো নিভিয়ে দিল। ঘর মুহূর্তে অন্ধকারে ডুবে গেল। 

মারদেকা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। 

ওপর থেকে এবার মানুষের পায়ের শব্দ ভেসে এল। একজন নয়। কমপক্ষে দুজন। তারপর একটা ভারী শব্দ হলো, যেন কেউ ভাঙা কাঠের ওপর পা রাখল।

লারসেন মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। তাকে দেয়ালের সঙ্গে মিশে দাঁড়াতে ইশারা করল। তারপর নিজে দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

উপরে কেউ কথা বলছে। শব্দ অস্পষ্ট। তারপর একটা বাক্য ভেসে এল। “ওরা নিচে গেছে।”

আরেকজন উত্তর দিল, “তাহলে বের হওয়ার পথ বন্ধ করো।”

মারদেকার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। লারসেনের চোখে এবার সেই ঠান্ডা ছবিটা ফিরে এসেছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় একটা ব্যাপার ঘটেছে। এই লোকগুলো শুধু জানে যে তারা আশ্রয়ে এসেছে তা নয়। তারা জানে, নিচে যাওয়ার পথ কোথায়। 

আর লারসেন বুঝতে পারল, বহু বছর আগে যে গোপন পথ দিয়ে সে পালিয়ে বেঁচেছিল, সেই পথের খবর এতদিনেও কারও কাছে হারিয়ে যায়নি।

অন্ধকার ঘরের এক কোণে হঠাৎ খুব ক্ষীণ একটা ধাতব শব্দ হলো। মারদেকা ঘুরে তাকাল। বাক্সগুলোর পেছনে আরেকটা সরু দরজা। দরজাটা আগে দেখা যায়নি।

লারসেনও সেটা দেখেছে। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল। তারপর সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে আঙুল ঠোঁটে তুলল। 

ওপরে তখন পায়ের শব্দ আরও কাছে আসছে। আর নিচে, বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা সেই গোপন দরজার ওপাশ থেকে, খুব ধীরে কেউ একজন তিনবার টোকা দিল। টক। টক। টক। 

তিনটি শব্দ অন্ধকার পাথরের ঘরের ভেতর এমনভাবে প্রতিধ্বনিত হলো, যেন বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা পাহাড়ের বুক হঠাৎ নিঃশ্বাস নিয়েছে। মারদেকা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ তখন অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে এসেছে। লণ্ঠন নিভে যাওয়ার পরও দরজাটার অস্পষ্ট রেখা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে লারসেনের মুখের পরিবর্তন। এতক্ষণ যে মানুষটির চোখে বিপদের ঠান্ডা সংকেত ছিল, সেই চোখে এখন অন্য কিছু। বিস্ময় নয়, ভয়ও নয়। বরং এমন এক স্মৃতি, যেটাকে সে বহু বছর ধরে নিজের ভেতর পুঁতে রেখেছিল এবং আজ সেই স্মৃতি পাথরের অন্ধকার ফুঁড়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

মারদেকা ধীরে লারসেনের কাছে এগিয়ে এল। লারসেন হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। তার দৃষ্টি সরু দরজাটার ওপর স্থির। বাইরে তখন পায়ের শব্দ। ওপরের লোকগুলো ধীরে ধীরে নিচে নামছে। পাথরের সিঁড়িতে বুটের ঘর্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দুজন লোক। হয়তো তারও বেশি। কিন্তু তাদের শব্দ শুনে মনে হচ্ছে, তারা তাড়াহুড়ো করছে না। তারা জানে, শিকার পালাতে পারবে না। এই নিশ্চয়তাই লারসেনকে বেশি চিন্তিত করল।

দরজার ওপাশে আবার শব্দ হলো। এবার টোকা নয়। কাঠের ওপর নখ বা ধাতব কোনো কিছুর হালকা ঘষা। তারপর নীরবতা। 

লারসেন খুব নিচু গলায় বলল, “কে?” 

কয়েক মুহূর্ত কোনো উত্তর এল না। তারপর ভেতর থেকে এমন এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, যেটা বয়সে ভাঙা, কিন্তু আশ্চর্যভাবে স্থির। “যে মানুষটা এখনও তোমাকে অপেক্ষা করছে।” 

লারসেনের শরীর যেন মুহূর্তের জন্য জমে গেল। 

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারছে, এই কণ্ঠস্বর লারসেনের পরিচিত। খুব পরিচিত। 

ওপরে তখন একটা কাঠ ভাঙার শব্দ হলো। তারপর মানুষের গলা। “নিচে খুঁজে দেখো। ওরা এখানেই আছে।”

লারসেন আর সময় নষ্ট করল না। সে দরজার কাছে গিয়ে নিচু হয়ে লোহার হাতলটা পরীক্ষা করল। হাতল নেই। ভেতরের দিকে পাথরের দেয়ালে ছোট একটা লোহার রিং। লারসেন সেটায় হাত রাখতেই দরজাটা সামান্য কেঁপে উঠল।

ভেতর থেকে কেউ আবার বলল, “দেরি করলে তোমার জন্যও পথ থাকবে না।”

লারসেন এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল। তারপর মারদেকার দিকে তাকাল। “ভেতরে যাবে।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। 

“যা দেখবে, কিছু ছুঁবে না।”

“আর আপনি?”

লারসেন পেছনের অন্ধকার সিঁড়ির দিকে তাকাল। “আমাকে যা করতে হবে, সেটা আমিই করব।”

মারদেকা বুঝল, এর অর্থ সে যা ভাবছে তার চেয়েও বেশি বিপদ সামনে আছে। তবু সে আর প্রশ্ন করল না। লারসেন দরজাটা সামান্য ঠেলে খুলে দিল। ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস এসে দুজনের মুখে লাগল। দরজার ওপাশে এত সরু একটা পথ যে পাশাপাশি হাঁটার উপায় নেই। মাটির বদলে পাথর। ছাদের উচ্চতা কম। কিছু জায়গায় মাথা নিচু করে যেতে হবে।

লারসেন প্রথমে ঢুকল। মারদেকা তার পেছনে। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। অন্ধকার আবার তাদের গিলে ফেলল।

কয়েক গজ এগিয়ে লারসেন থামল। সে পকেট থেকে ছোট একটা দেশলাই বের করল, কিন্তু জ্বালাল না। বরং হাত দিয়ে দেয়াল পরীক্ষা করতে লাগল। পাথরের ওপর পুরোনো আঁচড়। কোথাও কোথাও ক্ষীণ খোদাই। মারদেকা হাত বাড়িয়ে একটার কাছে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু লারসেন তাকে থামাল।

ছেলেটা হাত সরিয়ে নিল। পেছন থেকে খুব ক্ষীণ শব্দ এলো। যেন দরজার বাইরে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। তারপর ধাতুর ঘর্ষণ। কেউ তালা পরীক্ষা করছে।

লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে উঠল। “ওরা দরজা পেয়ে গেছে।”

মারদেকা ফিসফিস করে বলল, “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

“যেখানে এই পথ শেষ হয়।”

“আপনি জানেন?”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। “একসময় জানতাম।”

তারা আবার এগিয়ে গেল। পথটা ক্রমে নিচে নামছে। কয়েক জায়গায় পাথরের সিঁড়ি এতটাই ক্ষয়ে গেছে যে পা রাখার জায়গা বোঝা কঠিন। লারসেন এক পা করে যাচ্ছিল। মারদেকা তার পায়ের দাগ অনুসরণ করছিল। কিছু দূর পর বাতাস বদলে গেল। স্যাঁতসেঁতে গন্ধ কমে গিয়ে ঠান্ডা, শুকনো বাতাসের গন্ধ পাওয়া গেল।

মারদেকা বুঝল, তারা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে অন্য কোনো দিকে যাচ্ছে।

হঠাৎ তার মাথার মধ্যে একটা দৃশ্য ঝলকে উঠল। একটা ছোট আলো। একজন লোক দেয়ালে হাত রেখে হাঁটছে। তার গায়ে গাঢ় নীল কাপড়। হাতে একটা ধাতব চাকতি। লোকটা পেছনে তাকাচ্ছে। মারদেকা থেমে গেল। 

লারসেনও থামল। “কী হলো?”

মারদেকা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার শ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। “আবার দেখলাম।”

“কী?”

“এই পথ।”

লারসেনের চোখ সরু হলো। “তুমি এই পথ দেখেছ?”

মারদেকা ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “আগে। কিন্তু তখন আমি ছোট ছিলাম।”

লারসেন কিছু বলল না। তার ভেতরে এখন একটার পর একটা হিসাব চলছে। মারদেকার বয়স যখন এত কম ছিল, তখন সে কোথায় ছিল? এই আশ্রয়ে সে কীভাবে এসেছিল? কে তাকে এখানে এনেছিল? আর কেন তার স্মৃতির মধ্যে সেই সংগঠনের গোপন পথ রয়েছে?

প্রশ্নগুলো এখন আর আলাদা নয়। একে অপরকে ধরে একটা অদৃশ্য জালের মতো শক্ত হয়ে উঠছে। 

পথের শেষে একটা পাথরের দেয়াল দেখা গেল। তার নিচে সামান্য ফাঁক। বাইরে থেকে বাতাস আসছে। লারসেন হাঁটু গেড়ে বসে ফাঁকটা পরীক্ষা করল। পাথর সরানোর জায়গা আছে। সে দুহাতে চাপ দিল। বহু বছরের ধুলো ঝরে পড়ল। তারপর পাথরটা সামান্য নড়ল।

লারসেন আরও জোর দিল। একটা সরু ফাঁক তৈরি হলো। বাইরের আলো ভেতরে ঢুকে পড়ল। 

মারদেকা চোখ কুঁচকে গেল। তারা পাহাড়ের অন্য পাশে এসে উঠেছে।

ফাঁকটা ছিল একটা খাড়া ঢালের নিচে, যেখানে বড় বড় পাথর প্রাকৃতিকভাবে একটার ওপর আরেকটা পড়ে একটা গুহার মতো জায়গা তৈরি করেছে। নিচে গভীর খাদ। তার ওপারে পাহাড়ের ঢাল। দূরে শুকনো নদীর মতো একটা সাদা রেখা দেখা যাচ্ছে।

লারসেন প্রথমে বেরিয়ে চারপাশ পরীক্ষা করল। তারপর মারদেকাকে ইশারা করল। 

দুজন বাইরে এল। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। পেছনে সেই গোপন পথ। সামনে খোলা পাহাড়। 

কিন্তু লারসেনের চোখ তখন নিচের ঢালের দিকে। সেখানে একটা ঘোড়া বাঁধা।

ঘোড়াটা কালো নয়, বাদামি। তার গায়ে ঘামের দাগ। লাগাম নতুন। জিনও নতুন। তার মানে কেউ এখানে এসেছে এবং খুব বেশিক্ষণ আগে যায়নি।

লারসেন ঘোড়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। জিনের পাশে হাত বুলিয়ে দেখল। তারপর ঘোড়ার পায়ের দিকে তাকাল। “ওরা এখানে আসেনি,” সে বলল।

মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল।

লারসেন নিচের মাটির দিকে ইশারা করল। সেখানে ঘোড়ার খুরের দাগ। কিন্তু দাগগুলো গুহার দিকে এসেছে। ফিরে যাওয়ার কোনো চিহ্ন নেই।

“ঘোড়াটা কার?”

লারসেন উত্তর দিল না। সে জিনের নিচে হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট চামড়ার থলে বের করল। থলেটা খুব সাধারণ। কিন্তু লারসেন সেটা হাতে নিয়েই চিনে ফেলল। তার আঙুল শক্ত হয়ে গেল।

মারদেকা বুঝতে পারল, আবার কোনো পুরোনো স্মৃতি তাকে আঘাত করেছে।

লারসেন থলেটা খুলল। ভেতরে একটা ভাঁজ করা কাগজ। আর একটা ছোট ধাতব পাত। ধাতব পাতটা হাতে নিয়েই তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। সেটার ওপর খোদাই করা ছিল তিনটি ছোট দাগ এবং নিচে একটা অক্ষর। 

লারসেন সেটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

“এটা কী?” মারদেকার প্রশ্ন করলো।

কিন্তু উত্তর এল না। লারসেন কাগজটা খুলল। কাগজে মাত্র কয়েকটি লাইন লেখা। বেশিরভাগই মুছে গেছে। কিন্তু নিচের অংশ স্পষ্ট।

লারসেন পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে গেল। তারপর কাগজটা ভাঁজ করে ফেলল।

মারদেকা এবার তার হাতের দিকে তাকাল। “কী লেখা ছিল?”

লারসেন ধীরে বলল, “যে রাতে আগুন লেগেছিল, সেই রাতে এখানে তিনজন মানুষ ছিল না।”

মারদেকা কিছু বলল না। 

“চারজন ছিল।” পাহাড়ের বাতাস হঠাৎ যেন আরও ঠান্ডা হয়ে গেল। লারসেন দূরের দিকে তাকিয়ে রইল। “আমি এত বছর ধরে একজনকে ভুলে ছিলাম।”

মারদেকার চোখে প্রশ্ন। “কে?”

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “যে মানুষটা তোমাকে নিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।”

মারদেকা স্থির হয়ে গেল। তার মাথার ভেতর যেন একটা দরজা খুলে গেল। আগুন। ধোঁয়া। একজন মানুষ তার হাত ধরে টানছে। কাঠের দরজা। নীল কাপড়। আর সেই কণ্ঠস্বর। “দৌড়াও!”

মারদেকা হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে। চোখের সামনে দৃশ্যগুলো এবার আগের চেয়ে পরিষ্কার। সে দেখতে পাচ্ছে, আগুনে জ্বলছে ঘরের একটা অংশ। একজন মানুষ পড়ে আছে। আরেকজন লোক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। তার গায়ে গাঢ় নীল কাপড়। কিন্তু এবার মুখটাও যেন সামান্য দেখা যাচ্ছে।

মারদেকা চোখ খুলে ফেলল। “আমি তাকে চিনি।”

লারসেন নিচু হয়ে তার সামনে বসে পড়ল। “কাকে?”

মারদেকা উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে যতই মনে করার চেষ্টা করছে, মুখটা ততই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। 

ঠিক তখনই পাহাড়ের ওপর থেকে একটা বন্দুকের গুলির শব্দ হলো। ধুম্ শব্দটা পাথরে প্রতিধ্বনিত হয়ে কয়েকবার ফিরে এল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মারদেকাকে টেনে পাথরের আড়ালে নিয়ে গেল। আরেকটা গুলি। পাথরের গায়ে আঘাত লেগে ছোট ছোট টুকরো ছিটকে পড়ল।

লারসেন পাথরের আড়াল থেকে সামান্য মাথা তুলল। দূরের ঢালে দুটো কালো ছায়া দেখা যাচ্ছে। তারা নিচের দিকে নামছে। একজনের হাতে রাইফেল। আরেকজন ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে।

মারদেকা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।

লারসেন তার কানে ফিসফিস করে বলল, “ওরা আমাদের দেখেছে।”

মারদেকা পাথরের ফাঁক দিয়ে দূরের লোকগুলোর দিকে তাকাল। একজন ঘোড়ায় উঠেছে। অন্যজন পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে। তারপর ঘোড়সওয়ার লোকটি হাত তুলল। তার কবজির কাছে গাঢ় নীল কাপড়।

মারদেকার বুকের ভেতর আবার সেই পুরোনো শব্দ বাজল। দৌড়াও।

কিন্তু এবার সেই শব্দের সঙ্গে আরেকটা শব্দও মিশে গেল। একটা নাম। খুব ক্ষীণ। প্রায় শোনা যায় না। মারদেকা চোখ বন্ধ করল। কিন্তু, তার ঠোঁট নড়ল। “এলিয়াস...”

লারসেন যেন বজ্রাঘাতে স্থির হয়ে গেল। “কী বললে?”
 
মারদেকা নিজেও বুঝতে পারছে না সে কী বলেছে। “আমি... একটা নাম শুনেছি।”

লারসেনের মুখ থেকে রক্ত সরে গেল। 

“এলিয়াস।” সে নামটা খুব ধীরে উচ্চারণ করল।

তারপর বহু বছর পর প্রথমবারের মতো লারসেনের চোখে এমন ভয় দেখা গেল, যা আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কারণ এলিয়াস ছিল সেই মানুষ, যাকে লারসেন মৃত বলে জানত।

আর যদি মারদেকার স্মৃতিতে এখনও তার নাম বেঁচে থাকে, তাহলে তার অর্থ একটাই। সেই রাতের আগুনে সবাই মারা যায়নি।

লারসেন পাথরের আড়াল থেকে নিজের পিস্তল বের করল। দূরের লোকগুলো এখন ঢাল বেয়ে নিচে নামছে। তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। তারা শুধু আশ্রয় পাহারা দিতে আসেনি। তারা কাউকে খুঁজছে।

আর লারসেন এখন বুঝতে পারছে, বহু বছর আগে যে মানুষটাকে সে হারিয়ে ফেলেছিল, সেই মানুষ হয়তো এতদিন ধরে এই পাহাড়ের ছায়াতেই বেঁচে ছিল।

মারদেকা তার দিকে তাকাল। “এলিয়াস কে?”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “আমার সবচেয়ে বড় ভুল।”

পরের মুহূর্তেই দূরে আবার গুলির শব্দ উঠল।

লারসেন মারদেকার কাঁধ ধরে তাকে পাহাড়ের নিচের সরু পথের দিকে ঠেলে দিল। “দৌড়াও।”

মারদেকা এক মুহূর্ত থমকে গেল। এই শব্দটাই সে এতদিন ধরে তার স্মৃতির অন্ধকারে শুনে এসেছে। দৌড়াও।

কিন্তু এবার সেই শব্দ তার নিজের স্মৃতি থেকে আসেনি।  এসেছে লারসেনের মুখ থেকে। 
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/267766/</link>
				<pubDate>Mon, 31 Aug 2026 03:40:03 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২২<br />
দুপুরের সূর্য তখন পাহাড়ের মাথার ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিমে নামতে শুরু করেছে। পুরোনো আশ্রয়ের ধ্বংসস্তূপের চারপাশে আলো আর ছায়ার অদ্ভুত খেলা চলছে। কোথাও পাথরের গায়ে রোদ এত তীব্র যে চোখ মেলে তাকানো কঠিন, আবার তার পাশেই কয়েক হাত দূরে এমন গাঢ় ছায়া, যেন দিনের আলো সেখানে কোনোদিন পৌঁছায়নি।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-267766"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/267766/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">2311d21505933b869e8acbca36e91fca</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায় ২১
সকালের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই লারসেন ঘুম থেকে উঠে পড়েছিল। আসলে ঘুম থেকে ওঠার প্রশ্নই ছিল না। রাতের শেষ প্রহর থেকে সে বিছানায় শুয়ে ছিল, কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই বহু বছরের পুরোনো কিছু দৃশ্য তার মাথার ভেতর ফিরে আসছিল। আগুনের লাল আলো, পাহাড়ের গায়ে কালো ছায়া, ছুটে চলা ঘোড়ার খুরের শব্দ, আর অন্ধকারের মধ্যে কারও চিৎকার। সেই চিৎকারের শব্দ এখন আর পরিষ্কারভাবে মনে পড়ে না তার। বহু বছর ধরে স্মৃতি নিজেই যেন কিছু অংশ মুছে দিয়েছে। কিন্তু এমন কিছু রাত আছে, যেগুলো মানুষ যতই ভুলে যেতে চায়, শেষ পর্যন্ত তারাই আবার ফিরে আসে।

ঘরের বাইরে তখন ভোরের ঠান্ডা বাতাস বইছিল। দূরের পাহাড়গুলো ধূসর অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশের পূর্ব দিকটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে উঠছে, কিন্তু সূর্যের দেখা এখনও নেই। র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে রাতের শিশির জমে আছে। ঘোড়াগুলোর আস্তাবল থেকে মাঝে মাঝে নাক ঝাড়ার শব্দ ভেসে আসছে। কোথাও একটা কাঠের দরজা বাতাসে সামান্য কেঁপে উঠল।

লারসেন বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গেল। দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। গতকাল সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বহু বছর ধরে যে পথের কথা মনে পড়লেই তার বুকের ভেতর একটা ভারী পাথর নেমে বসত, এবার সেই পথেই ফিরে যেতে হবে। পার্থক্য শুধু একটাই। বহু বছর আগে সে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছিল। এবার সে সেখানে যাচ্ছে নিজের ইচ্ছায়।

কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে মারদেকা। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার মনে দ্বিধা ছিল। এখনও আছে। ছেলেটাকে বিপদের দিকে নিয়ে যাওয়া ঠিক কি না, সে প্রশ্নের উত্তর লারসেন নিজের কাছেও পুরোপুরি দিতে পারেনি। অথচ মারদেকাকে র&#x200d;্যাঞ্চে রেখে যাওয়ার কথাও এখন আর ভাবতে পারছে না। যারা গতকাল র&#x200d;্যাঞ্চে এসেছিল, তারা ছেলেটাকে দেখেছে। তারা তার ব্যাপারে জানতে চেয়েছে। এর অর্থ একটাই, মারদেকা এখন আর এই ঘটনার বাইরে নেই।

বরং হয়তো সে কোনোদিনই বাইরে ছিল না। 

টেবিলের ওপর রাখা দুটি কালচে ধাতব চাকতির দিকে তার চোখ গেল। দুটি চাকতি পাশাপাশি রাখা। একটির ওপরের চিহ্ন অন্যটির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, কিন্তু তাদের মধ্যে এমন একটা মিল আছে যা কেবল পুরোনো নিয়ম জানা মানুষই বুঝতে পারবে। লারসেনের আঙুল ধীরে ধীরে একটি চাকতির ওপর গিয়ে থামল। ঠান্ডা ধাতুর স্পর্শে তার মনে হলো, সে যেন বহু বছর পেছনে ফিরে গেছে।

সে হাত সরিয়ে নিল। এখন অতীত মনে করার সময় নয়। এবার অতীতের কাছে যাওয়ার সময়। দরজার বাইরে হালকা একটা শব্দ হলো। 

লারসেন ঘুরে দাঁড়াল। “ভেতরে আসো।”

দরজা খুলে মারদেকা ঢুকল। ছেলেটা পুরোপুরি তৈরি। পায়ে পুরোনো বুট, কোমরে ছুরি, গায়ে মোটা কাপড়ের জ্যাকেট। তার চুল এখনও পুরোপুরি আঁচড়ানো হয়নি। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ আছে। লারসেন বুঝল, সেও রাতে খুব বেশি ঘুমায়নি।

মারদেকা ঘরে ঢুকে প্রথমেই টেবিলের ওপর রাখা চাকতি দুটির দিকে তাকাল। তার চোখে সেই অদ্ভুত পরিবর্তন আবার দেখা গেল। 

লারসেন সেটা লক্ষ্য করল। “কিছু মনে পড়ছে?”

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে চাকতিগুলোর একটিকে ছুঁতে গিয়েও থেমে গেল। “কাল রাতেও মনে করার চেষ্টা করেছি।”

লারসেন অপেক্ষা করল।

“কিন্তু যতবার মনে করতে যাই, সবকিছু যেন কুয়াশার মধ্যে চলে যায়।” ছেলেটা জানালার দিকে তাকাল। বাইরে পাহাড়ের দিকে। “শুধু সেই কথাটা শুনতে পাই।”

লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে উঠল। “দৌড়াও?”

মারদেকা ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। ঘরের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।

লারসেন টেবিল থেকে দুটি চাকতি তুলে নিল। সেগুলো আলাদা আলাদা কাপড়ে জড়িয়ে নিজের ভেতরের জ্যাকেটের পকেটে রেখে দিল। তারপর মারদেকার দিকে তাকাল। “আমরা বের হব।”

মারদেকার চোখ উঠল। “কোথায়?”

“যেখানে হয়তো তোমার প্রশ্নের কিছু উত্তর আছে।”

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “সেই পাহাড়ি আশ্রয়ে?”

লারসেন তার দিকে তাকাল। ছেলেটা এখন আগের চেয়ে অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। তাকে সব কথা বলে দিতে হয় না। বললো, “হ্যাঁ।”

মারদেকা আর কোনো প্রশ্ন করল না।

লারসেন ভেবেছিল, ছেলেটা হয়তো ভয় পাবে। হয়তো দ্বিধা করবে। কিন্তু তার চোখে ভয় নেই। আছে অপেক্ষা। এমন এক ধরনের অপেক্ষা, যা মানুষ তখনই অনুভব করে যখন সে বুঝতে পারে, বহুদিন ধরে যার উত্তর খুঁজছে, সেই উত্তর হয়তো খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। “তোমার ছুরিটা আছে?”

মারদেকা কোমরের দিকে হাত দিল। “আছে।”

“ঠিক আছে। কিন্তু মনে রেখো, ছুরি থাকার অর্থ এই নয় যে তোমাকে তা ব্যবহার করতে হবে।”

মারদেকা সামান্য মাথা নেড়ে বলল। “আমি জানি।”

লারসেনের মুখে ক্ষীণ একটা পরিবর্তন এল। সে জানত, ছেলেটা কথাটা মুখস্থ করে বলছে না। গত কয়েক মাসে সে অন্তত এটুকু শিখেছে। অস্ত্র হাতে থাকলে মানুষ শক্তিশালী হয় না। অনেক সময় অস্ত্র হাতে থাকার কারণেই মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।

বাইরে তখন র&#x200d;্যাঞ্চ ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। লারসেন দরজা খুলে বেরিয়ে এল। ঠান্ডা বাতাস তার মুখে লাগল। আকাশের কিনারায় সূর্যের প্রথম আলো দেখা দিয়েছে। ঘাসের ওপর শিশির চিকচিক করছে। আস্তাবলের সামনে একজন লোক ঘোড়ার জিন ঠিক করছে। রান্নাঘরের দিক থেকে ধোঁয়া উঠছে।

ইলাই আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে বড় একটা কফির পাত্র নামাচ্ছিল। লারসেনকে দেখে বৃদ্ধ মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গেল, সে খবরটা জানে।

র&#x200d;্যাঞ্চে কোনো খবর বেশিক্ষণ গোপন থাকে না। বিশেষ করে যখন আগের দিন সাতজন সশস্ত্র অচেনা লোক এসে লারসেনের সঙ্গে কথা বলে চলে যায়।

ইলাই কিছুক্ষণ লারসেনের দিকে তাকিয়ে রইল। “সত্যিই যাচ্ছ?”

লারসেন থামল। “হ্যাঁ।”

বৃদ্ধ এবার মারদেকার দিকে তাকাল। তারপর আবার লারসেনের দিকে।

“ওকেও সাথে নেবে?”

লারসেন মাথা ঝাঁকালো।

ইলাইয়ের মুখের ভাঁজগুলো যেন আরও গভীর হয়ে গেল। সে জানত, মারদেকা আর সেই পাহাড়ি ছেলে নেই, যে প্রথমদিকে মানুষের ভিড় দেখলে দূরে দাঁড়িয়ে থাকত। কিন্তু তবু তার চোখে মারদেকা এখনও সেই ছেলেই। “পাহাড় এখন আগের মতো নেই, লারসেন।”

লারসেন শান্ত গলায় বলল, “আমিও আগের মতো নেই।”

ইলাই কিছু বলল না। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর সে ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল একটা কাপড়ে মোড়ানো খাবারের পুঁটলি হাতে নিয়ে। “খালি পেটে রহস্য খুঁজতে যেও না।” 

মারদেকার মুখে সামান্য হাসি ফুটল। ইলাই পুঁটলিটা তার হাতে দিল।

র&#x200d;্যাঞ্চের অন্য পাশে বাড দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে কফির মগ। কিন্তু সে কফি খাচ্ছিল না। লারসেন ও মারদেকাকে দেখেই সে ধীরে এগিয়ে এল। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা গেল, এই যাত্রার ব্যাপারে সে সন্তুষ্ট নয়। তবু সে জানে, লারসেন একবার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে বদলানো কঠিন। “কখন ফিরবেন?”

লারসেন বলল, “ফিরে আসার মতো কিছু হাতে পেলেই ফিরব।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি লোকজনকে পাহাড়ের দিকে নজর রাখতে বলেছি। গতকালের দলটা চলে গেছে, কিন্তু তাদের আশপাশে আরও লোক ছিল।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “জানি।”

“ক্লে আর হ্যাঙ্ক পাহারার ব্যবস্থা দেখছে। রুবেন ব্ল্যাক রিভারের দিকে একজনকে পাঠিয়েছে। শহরে কোনো খবর পাওয়া গেলে জানানো হবে।”

লারসেন এবার বাডের দিকে তাকাল। র&#x200d;্যাঞ্চে না থাকলেও সবকিছু ঠিকভাবে চলবে, এই বিশ্বাস সে বাডের ওপর রাখতে পারে। বহু বছর ধরে মানুষটাকে সে দেখেছে। বাড খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু বিপদের সময় তার মাথা ঠান্ডা থাকে। “র&#x200d;্যাঞ্চটা সামলিও।”

বাড মৃদু গলায় বলল, “সেটা নিয়ে ভাববেন না।” তারপর চোখ গেল মারদেকার দিকে। “আর তুমি, লারসেন যা বলবে, তার বাইরে এক পা-ও যেও না।”

লারসেন ঘুরে আস্তাবলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। দুটি ঘোড়া আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। একটি বড়, ধূসর রঙের ঘোড়া, লারসেনের। অন্যটি অপেক্ষাকৃত ছোট, কিন্তু পাহাড়ি পথে চলার জন্য শক্তপোক্ত। মারদেকা গত কয়েক মাস ধরে ঘোড়াটিকে চালিয়েছে। প্রাণীটি তার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

মারদেকা নিজের জিন পরীক্ষা করল। লারসেন দূর থেকে তাকিয়ে ছিল।

ছেলেটা প্রথমে লাগাম দেখল, তারপর জিনের নিচের বাঁধন। এরপর পায়ের রেকাব। এই সবকিছু এখন সে আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করে। আগে ঘোড়ায় উঠতে পারলেই তার কাছে যথেষ্ট ছিল। এখন সে জানে, পাহাড়ে ছোট ভুলও বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে।

লারসেন ধীরে বলল, “কী দেখছ?”

মারদেকা মাথা না তুলেই বলল, “বাঁধনটা একটু ঢিলা।”

লারসেন কাছে এসে পরীক্ষা করল। বাঁধন সত্যিই ঢিলা ছিল। সে কিছু বলল না। শুধু নিজের ঘোড়ার দিকে এগিয়ে গেল।

মারদেকা লারসেনের মুখের দিকে তাকাল। প্রশংসা পাবে বলে অপেক্ষা করছিল না সে, কিন্তু বুঝতে পারল, লারসেন দেখেছে।

কিছুক্ষণ পর দুজন ঘোড়ায় চড়ে রওনা হলো। র&#x200d;্যাঞ্চের লোকেরা দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

বাড বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে। ক্লে আস্তাবলের পাশে। হ্যাঙ্ক বেড়ার কাছে। এলাই রান্নাঘরের দরজায়। সকালের আলো তখন র&#x200d;্যাঞ্চের কাঠের দেয়াল, ঘোড়ার পিঠ আর ধুলোমাখা পথের ওপর পড়ছে।

মারদেকা একবার পেছনে তাকাল। তারপর সামনে। র&#x200d;্যাঞ্চ ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।

প্রথম দিকে পথটা পরিচিত ছিল। খোলা জমি, শুকনো ঘাস, নিচু ঝোপ আর মাঝে মাঝে পাথরের স্তূপ। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর ভূমির রং বদলাতে শুরু করল। জমি উঁচু-নিচু হয়ে গেল। দূরের পাহাড়গুলো আর শুধু দৃশ্যের অংশ নয়, ধীরে ধীরে তাদের সামনে দেয়ালের মতো উঠে দাঁড়াতে লাগল।

লারসেন খুব বেশি কথা বলছিল না। মারদেকাও না। তাদের ঘোড়ার খুরের শব্দ, চামড়ার জিনের কড়কড় শব্দ আর মাঝে মাঝে বাতাসে শুকনো ঘাসের দুলে ওঠার আওয়াজ, এই ছিল পথের প্রধান সঙ্গী।

কিছুদূর যাওয়ার পর লারসেন পথ থেকে সামান্য সরে গিয়ে একটা শুকনো খাতের ধারে থামল। 

মারদেকা তার পেছনে এসে ঘোড়া থামাল। “কিছু হয়েছে?”

লারসেন ঘোড়া থেকে নামল না। নিচের মাটির দিকে তাকাল। “হয়েছে কি না, সেটা তুমি বলো।”

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে এল। 

লারসেন কিছুটা দূরে সরে গেল। 

এটা পরীক্ষা, মারদেকা বুঝতে পারল। সে মাটির কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। শুকনো মাটি। তার ওপর ছড়িয়ে আছে পুরোনো ঘাস। প্রথম দেখায় কিছুই চোখে পড়ার কথা নয়। কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করল না।

লারসেন তাকে একটা জিনিস বারবার শিখিয়েছে, যে মানুষ প্রথম দেখাতেই উত্তর পেয়ে যায়, সে সাধারণত ভুল উত্তর পায়। 

মারদেকা মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হাত দিয়ে না ছুঁয়ে চোখ দিয়ে একটা রেখা অনুসরণ করল। খাতের কিনারায় দুটো ছোট পাথর সরে গেছে। তার পাশে ঘাসের মাথা ভাঙা। আরও একটু দূরে শুকনো মাটিতে চাপ পড়েছে। সে ধীরে উঠে দাঁড়াল। “এখান দিয়ে লোক গেছে।”

লারসেন জিজ্ঞেস করল, “কতজন?”

মারদেকা আবার নিচে তাকাল। “একজন না।”

সে কয়েক কদম সামনে এগোল। “তিনজন। হয়তো চারজন।”

লারসেন এবার ঘোড়া থেকে নেমে এল। সে মাটির দিকে তাকাল, তারপর মারদেকার দিকে। নিচু হয়ে একটা চিহ্ন পরীক্ষা করল। “তুমি তিন বা চারজন বলেছ। কেন?”

মারদেকা শুকনো খাতের দিকে ইঙ্গিত করল। “ওরা একই জায়গা দিয়ে যায়নি। একজন একটু ভারী। তার পায়ের চাপ বেশি। আরেকজন পাথরের ওপর দিয়ে গেছে।”

লারসেন কিছু বলল না। তার মুখের ভাব দেখে বোঝা গেল, সে উত্তরটা শুনে খুশি হয়েছে। কিন্তু তারপর তার চোখ খাতের ওপাশে গিয়ে থেমে গেল।

মারদেকাও তাকাল। সেখানে দূরে একটা শুকনো ঝোপের ডাল ভেঙে আছে। খুব বেশি বড় কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু বাতাসের দিক অনুযায়ী ডালটা এমনভাবে ভাঙার কথা নয়।

লারসেন ধীরে কোমরের দিকে হাত নিয়ে গেল।

মারদেকা সেটা দেখল। “কী?”

লারসেন নিচু গলায় বলল, “আমরা একা নই।”

বাতাস তখনও বইছে। দূরে কোথাও একটা বাজপাখি ডাকল। দুজনেই নীরব হয়ে গেল।

মারদেকা স্বভাবতই নিজের কোমরের ছুরির দিকে হাত নিতে যাচ্ছিল। কিন্তু লারসেনের আগের কথাটা তার মনে পড়ে গেল। যা দেখবে, আগে বুঝবে। তার হাত থেমে গেল।

সে চারপাশে তাকাল। প্রথমে সামনে। তারপর ডানদিকে পাথুরে ঢাল। তারপর বামদিকে শুকনো ঝোপের সারি। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পাহাড়ি পরিবেশে বড় হতে হতে সে জানে, কিছু না দেখা মানেই সেখানে কিছু নেই, এমন নয়। 

হঠাৎ তার নাকে একটা গন্ধ এল। খুব হালকা। ঘোড়ার ঘামের গন্ধ। মারদেকা মুখ ঘুরিয়ে ডানদিকে তাকাল। সেখানে তাদের নিজেদের ঘোড়া ছাড়া আর কোনো প্রাণী দেখা যাচ্ছে না। সে ধীরে বলল, “ওখানে ঘোড়া ছিল।”

লারসেন এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। “কোথায়?”
 
মারদেকা পাথুরে ঢালের দিকে আঙুল তুলল। “ওপাশে।”

দুজনেই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর লারসেন লারসেন ঘোড়ায় উঠল। বললো, “চলো।”

মারদেকা অবাক হলো। “দেখবেন না!”

“না। কারণ যে মানুষ নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে, তার মানে সে চায় তুমি তাকে খুঁজতে যাও।”

মারদেকা নিজের ঘোড়ায় উঠল। তারা খাতের পথ ছেড়ে আবার এগিয়ে গেল। কিন্তু এবার তাদের চলার ভঙ্গি বদলে গেছে। আগে তারা পাহাড়ের দিকে যাচ্ছিল। এখন তারা জানে, পাহাড়ও হয়তো তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

সূর্য আরও উপরে উঠল। সকাল ধীরে ধীরে উষ্ণ হতে শুরু করল। পথ যত এগোতে লাগল, ততই চারপাশের ভূখণ্ড কঠিন হয়ে উঠল। কোথাও খাড়া পাথরের দেয়াল, কোথাও সরু গিরিখাত, কোথাও শুকনো নদীর পুরোনো পথ। মাঝে মাঝে লারসেন এমন সব বাঁক নিচ্ছিল, যেগুলো দেখে মনে হচ্ছিল সে বহু বছর আগে এই পথ মুখস্থ করে নিয়েছিল।

মারদেকা বুঝতে পারছিল, এই মানুষটি এখন অন্যরকম। র&#x200d;্যাঞ্চে লারসেন ছিল শিক্ষক। 
এই পথে সে যেন আবার বহু বছর আগের একজন মানুষ হয়ে উঠছে। একটা সরু পথের মুখে এসে লারসেন ঘোড়া থামাল।

সামনে পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে। নিচে পাথরের মধ্যে দিয়ে সরু একটা পথ বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়েছে। মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। “আমরা এই পথ দিয়ে যাব?”

“একসময় যেতাম।”

মারদেকা আবার জিজ্ঞেস করল, “কত বছর আগে?”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তোমার জন্মেরও আগে।”

মারদেকা কথাটা শুনে আর প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার চোখে কৌতূহল জমে রইল।

লারসেন ঘোড়া নিয়ে নিচে নামতে শুরু করল। মারদেকা তার পেছনে।

পথটা ধীরে ধীরে আরও সরু হয়ে এল। দুপাশের পাথর এমনভাবে উঠে গেছে যে আকাশের একটা সরু ফালি ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। ঘোড়ার খুরের শব্দ পাথরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও পথের ওপর পুরোনো ধসের চিহ্ন। কিছু পাথর নতুন। কিছু বহুদিনের।

মারদেকা হঠাৎ থেমে গেল। 

লারসেন পেছনে তাকাল। “কী হলো?”

মারদেকা মাথা তুলল না। সে পাথরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। দেয়ালের ওপর প্রায় মুছে যাওয়া একটা চিহ্ন। প্রথম দেখায় মনে হবে সময়ের ক্ষয়ে তৈরি কোনো দাগ।

কিন্তু মারদেকার চোখ স্থির হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর অকারণে ধাক্কা লাগল।

লারসেন ধীরে ঘোড়া ঘুরিয়ে তার কাছে এল। “কী দেখছ?”

মারদেকা হাত তুলে দেয়ালের দিকে দেখাল। “এটা।”

লারসেনের মুখ মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। পাথরের গায়ে ক্ষীণভাবে খোদাই করা সেই চিহ্নটি সে চিনতে পেরেছে। বহু বছর আগে এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় এমন চিহ্নই ব্যবহার করা হতো।

সে ঘোড়া থেকে নেমে কাছে গেল। পাথরের ওপর হাত বুলিয়ে দেখল। পুরোনো চিহ্ন। 
খুব পুরোনো। কিন্তু তার নিচে আরও একটা জিনিস আছে। এক টুকরো কাপড়। 
পাথরের সরু ফাঁকে আটকে আছে। বাতাসে সামান্য দুলছে। লারসেন হাত বাড়িয়ে সেটি টেনে বের করল। কাপড়টা মলিন। ধুলোয় ভরা। কিন্তু তার রং এখনও বোঝা যায়। গাঢ় নীল। 

মারদেকার মুখের রং বদলে গেল। এক মুহূর্তের জন্য সে যেন আর সেই সরু পাহাড়ি পথে দাঁড়িয়ে নেই। তার চোখের সামনে অন্ধকার একটা কাঠের দেয়াল ভেসে উঠল। 
দরজা। দরজার পাশে নীল কাপড়। তারপর একটা হাত। কেউ তার হাত শক্ত করে ধরেছে। একটা কণ্ঠস্বর। আতঙ্কে ভরা। “দৌড়াও!”

মারদেকা হঠাৎ পিছিয়ে গেল। তার ঘোড়া অস্থির হয়ে মাথা ঝাঁকাল।

লারসেন দ্রুত তার বাহু ধরে ফেলল। “মারদেকা!”

ছেলেটা হাঁপাচ্ছে। সে চারপাশে তাকাল। যেন কোথায় আছে, সেটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগছে। “আমি...” তার কণ্ঠ শুকিয়ে গেছে। “আমি একটা ঘর দেখেছি।”

লারসেনের হাত আরও শক্ত হলো। “কেমন ঘর?”

“কাঠের।”

“আর?”

মারদেকা চোখ বন্ধ করল। তার কপালে ঘাম জমেছে। “একটা দরজা ছিল।”

লারসেন কিছু বলল না।

মারদেকার ঠোঁট কেঁপে উঠল। “দরজার পাশে নীল কাপড়।”

লারসেনের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা থেমে গেল। এই পথ। পুরোনো চিহ্ন। 
নীল কাপড়। আর মারদেকার স্মৃতি। এবার এগুলোকে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।

ঠিক তখন দূরে কোথাও পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ হলো। খুব ক্ষীণ। কিন্তু এই নীরব গিরিখাতে শব্দটা স্পষ্ট শোনা গেল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল। মারদেকাও ঘুরে তাকাল। পাহাড়ের ওপর কেউ নেই। 
তবু দুজনেই জানল, তারা একা নয়।

লারসেন ধীরে হাত সরিয়ে কোমরের পিস্তলের কাছাকাছি রাখল। তার চোখ ঠান্ডা হয়ে গেছে। 

দুজন আবার ঘোড়ায় উঠল। কিন্তু এবার তারা আগের পথ ধরে এগোল না।

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে পাথরের দেয়ালের পাশের সরু পথটার দিকে তাকাল। সেই পথ প্রায় ঝোপে ঢেকে গেছে। বহু বছর ধরে কেউ ব্যবহার করেনি বলেই মনে হয়। কিন্তু তার মুখে এমন একটা ভাব দেখা গেল, যেন সে পথটাকে চিনেছে।

মারদেকা তার দিকে তাকাল। “ওদিকে?”

লারসেন উত্তর দিল, “ওই পথটা পুরোনো আশ্রয়ের দিকে যায়।”

পাহাড়ের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে গেল। গাঢ় নীল কাপড়ের টুকরোটা লারসেনের মুঠোর মধ্যে কেঁপে উঠল। সে সেটি নিজের পকেটে রেখে দিল। তারপর ঘোড়ার মাথা ঘুরিয়ে সেই সরু, পরিত্যক্ত পথের দিকে এগিয়ে গেল। মারদেকা তার পেছনে চলল।

আর তাদের অজান্তেই, গিরিখাতের অনেক ওপরে, পাথরের আড়াল থেকে কেউ একজন ধীরে ধীরে সরে গেল। তার কোমরের কাছে বাতাসে এক টুকরো গাঢ় নীল কাপড় সামান্য দুলে উঠল।

সরু পথটা এতটাই পুরোনো যে প্রথম কয়েক গজ যাওয়ার পরই মনে হলো, পাহাড়ের বুক থেকে পথটি যেন বহু বছর আগে মুছে গেছে। শুকনো ঝোপের ডাল ঘোড়ার শরীর ঘেঁষে যাচ্ছিল, কোথাও কোথাও পাথরের ধার ঘোড়ার পায়ের কাছে উঠে এসেছে। লারসেন সামনে থেকে পথ পরিষ্কার করে এগোচ্ছিল না, বরং পথটাকে নিজের মতো করে খুঁজে নিচ্ছিল। তার শরীরের ভঙ্গিতে এমন একটা কিছু ছিল, যা মারদেকা আগে খুব কমই দেখেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের পরিচিত জমিতে লারসেনের চলাফেরা ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু এই পাহাড়ি পথে তার প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি মোড় নেওয়া, এমনকি ঘোড়ার লাগাম টানার ধরনও যেন বহু বছরের পুরোনো কোনো স্মৃতির নির্দেশ মেনে চলছিল।

মারদেকা কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারল, তারা যে পথ দিয়ে যাচ্ছে সেটি আসলে একেবারে পরিত্যক্ত নয়। কোথাও শুকনো ঘাসের নিচে শক্ত মাটি, কোথাও পাথরের ওপর ঘষা দাগ, আবার কোথাও ঝোপের ডাল মানুষের চলাচলের কারণে সামান্য বাঁকানো। এসব চিহ্ন এত পুরোনো যে সাধারণ চোখে সেগুলো ধরা পড়ার কথা নয়। কিন্তু লারসেনের চোখও সেগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে না। বরং প্রতিটি চিহ্ন দেখার পর তার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠছে। 

পথটা একটু ওপরে উঠে গিয়ে আবার নিচে নেমে গেল। নিচে ছোট একটা শুকনো খাত। বর্ষাকালে হয়তো সেখানে পাহাড়ি জল নেমে আসে, কিন্তু এখন পাথরের ফাঁকে শুধু ধুলা আর শুকনো পাতার স্তর। খাতের ওপারে একটা পুরোনো গাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছটার অর্ধেক ডাল শুকিয়ে গেছে, কাণ্ডের গায়ে বজ্রপাতের কালো দাগ। তার নিচে পড়ে থাকা পাথরের ওপর শ্যাওলার আস্তরণ জমে আছে।

লারসেন হঠাৎ ঘোড়া থামাল। মারদেকাও সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। 

লারসেন কিছু বলল না। সে শুধু সামনে তাকিয়ে রইল।

মারদেকা চারপাশ শুনতে চেষ্টা করল। বাতাসের শব্দ ছাড়া কিছু নেই। দূরে কোনো পাখি ডাকছে না। ঝোপের মধ্যে ছোট প্রাণীর চলাফেরার শব্দও নেই। পাহাড়ি জায়গায় এই ধরনের নীরবতা কখনও কখনও শব্দের চেয়েও বেশি সতর্ক করে দেয়। স্বাভাবিক পরিবেশে কোথাও না কোথাও জীবন থাকে, একটা পাখি ডাকে, কোনো শুকনো ডাল ভাঙে, টিকটিকি পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে যায়। এখানে যেন সবকিছু কিছুক্ষণের জন্য থেমে আছে।

লারসেন ঘোড়া থেকে নামল। পাথরের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে আঙুল দিয়ে ধুলা সরাল। সেখানে একটা অস্পষ্ট দাগ। মানুষের বুটের গোড়ালির মতো।

মারদেকা ঘোড়া থেকে নেমে তার পাশে দাঁড়াল।

লারসেন ধীরে বলল, “এটা আজকের।”

মারদেকা নিচে তাকিয়ে রইল। দাগটা খুব গভীর নয়। কিন্তু ধুলার ওপর তার ধারগুলো এখনও ভাঙেনি। কয়েক ঘণ্টার বেশি পুরোনো হওয়ার কথা নয়। সে চারপাশে তাকাল। “তাহলে সে জানে আমরা আসছি?”

লারসেন কিছুক্ষণ উত্তর দিল না। “যে মানুষ আমাদের গতিপথ জানতে চাইছে, সে যদি এই পথও জানে, তাহলে আমাদের আসার খবর তার কাছে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে না।”

লারসেনের কথায় ভয় ছিল না। ছিল হিসাব। মারদেকা বুঝতে পারল, বিপদের সময় এই মানুষটা ভয়কে জায়গা দেয় না। ভয়কে সে তথ্যের মতো ব্যবহার করে। কোথায় বিপদ হতে পারে, কতজন হতে পারে, কীভাবে আসতে পারে, সবকিছুকে ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখে। তারা আবার চলতে শুরু করল।

পাহাড় ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। নিচের খোলা জমি এখন অনেক দূরে। সামনে পাথরের দেয়াল উঠে এসেছে, তার গায়ে শুকনো লতাগুল্ম ঝুলছে। সূর্যের আলো সরাসরি সেখানে পৌঁছাতে পারছে না। বাতাস ঠান্ডা হয়ে এসেছে। কোথাও কোথাও পাথরের ফাঁকে বরফের মতো ঠান্ডা জল জমে আছে, যদিও অনেকদিন ধরে বৃষ্টি হয়নি।

মারদেকা অনুভব করল, তার মনে অদ্ভুত একটা চাপ তৈরি হচ্ছে। সে এই জায়গায় আগে কখনও আসেনি, অন্তত তার মনে নেই। অথচ পথের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পাথরের আকার, এমনকি বাতাসের গন্ধও কোথাও যেন পরিচিত।

সে চোখ বন্ধ করল। এক মুহূর্তের জন্য আবার সেই কাঠের ঘর। অন্ধকার। দরজার নিচ দিয়ে বাইরে থেকে আগুনের আলো ঢুকছে। কেউ খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তার ছোট হাত একটা বড় হাতের মধ্যে আটকে। তারপর সেই কণ্ঠস্বর। “দৌড়াও!” মারদেকা চোখ খুলে ফেলল। 

ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা লারসেন তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে বুঝতে পেরেছে। “আবার দেখেছ?”

মারদেকা ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।” 

“একই ঘর?”

“হ্যাঁ।”

“কিছু বদলেছে?”

মারদেকা কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, “এবার আগুন দেখেছি।”

লারসেনের মুখের ওপর যেন হঠাৎ একটা ছায়া নেমে এল। সে আর প্রশ্ন করল না। ঘোড়ার লাগাম টেনে সামনে তাকাল।

মারদেকা বুঝতে পারল, আগুনের কথাটা লারসেনের কাছে নতুন কিছু নয়। বরং সে যেন এমন একটা শব্দ শুনেছে, যার অর্থ সে অনেক আগেই জানত।

পথ আরও সরু হয়ে গেল। কিছুদূর পর একটা পাথুরে দেয়াল পথের সামনে এসে দাঁড়াল। দেয়ালের এক পাশে এতটুকু ফাঁক যে ঘোড়া কষ্ট করে ঢুকতে পারবে। লারসেন ঘোড়া থেকে নেমে লাগাম হাতে নিল। সে প্রথমে নিজে ফাঁকটা দিয়ে গেল, তারপর ঘোড়াকে টেনে নিয়ে গেল। মারদেকাও একইভাবে অনুসরণ করল।

ফাঁকটা পেরিয়ে তারা এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছাল, যেখান থেকে নিচের পুরো গিরিখাত দেখা যায়। ওপরে আকাশ এখন সরু একটা নীল ফালি। নিচে পাথর, ঝোপ আর ছায়া। দূরে তারা যে পথ দিয়ে এসেছিল, সেটাও দেখা যাচ্ছে।

লারসেন দাঁড়িয়ে গেল। 

মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো মানুষ নেই। কিন্তু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেল। নিচের একটা পাথরের ওপর সূর্যের আলো পড়েছে। তার পাশে যেন একটা ছোট কালো বিন্দু নড়ল।

মারদেকা চোখ কুঁচকে তাকাল। একটা পাখি নয়। একটা মানুষ। পাথরের আড়াল থেকে মাথাটা সামান্য উঠেছিল। তারপর আবার অদৃশ্য। সে লারসেনের হাত ছুঁয়ে নিচের দিকে দেখাল।

লারসেন তাকাল। তার চোখে কোনো বিস্ময় দেখা গেল না। বরং ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য কঠিন রেখা ফুটে উঠল। সে হাত তুলে মারদেকাকে নিচু হতে ইশারা করল। দুজনেই পাথরের আড়ালে সরে গেল। কিছুক্ষণ তারা নড়ল না।

নিচে যে লোকটি ছিল, সে এবার বেরিয়ে এল। দূরত্ব এত বেশি যে মুখ দেখা যায় না। লোকটি ঘোড়ার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চারপাশ দেখল। তারপর নিজের কোমরের কাছে হাত নিয়ে কিছু একটা ঠিক করল। বাতাস হঠাৎ তার পোশাকের একটা অংশ উড়িয়ে দিল। গাঢ় নীল।

মারদেকার বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল। লারসেনের চোখ সরু হয়ে গেল।

লোকটি কিছুক্ষণ পর ঘোড়ায় উঠল এবং অন্যদিকে চলে গেল। সে তাদের দেখতে পায়নি। অথবা দেখেও এমন ভান করেছে যেন পায়নি।

লারসেন দীর্ঘক্ষণ তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল। 

“সে আমাদের দেখেছে?” মারদেকা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

লারসেন ধীরে বলল, “আমি জানি না।”

“তাহলে?”

“এখন জানার দরকারও নেই।”

লারসেন ঘোড়ার লাগাম ধরল। তার মুখে এমন এক স্থিরতা এসেছে, যা মারদেকা বহুবার দেখেছে, কিন্তু আজ তার অর্থ অন্যরকম মনে হলো। এতক্ষণ তারা শত্রুকে খুঁজছিল। এখন লারসেন বুঝেছে, শত্রুও তাদের পথ দেখছে।

পথের শেষ অংশে পৌঁছাতে তাদের আরও প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল। সূর্য তখন মাথার অনেকটা ওপরে। কিন্তু পাহাড়ের ভেতর আলো ছায়ায় ভেঙে গেছে। কোথাও তীব্র রোদ, কোথাও দিনের মাঝখানেও সন্ধ্যার মতো অন্ধকার। শেষ পর্যন্ত একটা খোলা জায়গা দেখা গেল।

মারদেকা প্রথমে বুঝতে পারল না, জায়গাটার বিশেষত্ব কী। তারপর ধীরে ধীরে তার চোখে পড়ল, পাথরের দেয়ালের নিচে কাঠের কিছু ভাঙা অংশ পড়ে আছে। কিছু পুরোনো কড়িকাঠ, অর্ধেক মাটির নিচে ঢুকে থাকা দরজার মতো একটা কাঠের ফ্রেম, আর পাশে পাথর দিয়ে তৈরি নিচু দেয়ালের অবশিষ্ট অংশ।

লারসেন ঘোড়া থামিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। মারদেকা বুঝল, এটাই সেই জায়গা। পুরোনো আশ্রয়।

কিন্তু আশ্রয় বলার মতো কিছুই আর নেই। সময়, বরফ, বৃষ্টি, আগুন আর মানুষের হাত মিলে জায়গাটাকে প্রায় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। তবু ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও বোঝা যায়, একসময় এখানে একটা কাঠের ঘর ছিল। পাহাড়ের গায়ে এমনভাবে বানানো হয়েছিল, বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। সামনে একটা সরু পাথুরে চত্বর। তার এক পাশে গভীর খাদ। অন্য পাশে পাহাড়ের দেয়াল।

লারসেন ঘোড়া থেকে নামল। সে অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। তার চোখ ধীরে ধীরে ঘরের অবশিষ্ট অংশের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কোথায় ছিল দরজা, কোথায় জানালা, কোথায় আগুন জ্বলত, কোথায় ঘোড়া বাঁধা হতো, যেন সবকিছু তার চোখের সামনে এখনও অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে প্রথমবার বুঝল, লারসেন শুধু একটা পুরোনো জায়গায় ফিরে আসেনি। সে নিজের জীবনের এমন একটা অংশে ফিরে এসেছে, যেটাকে বহু বছর ধরে নিজের ভেতর কবর দিয়ে রেখেছিল।

লারসেন ধীরে ধীরে ভাঙা কাঠের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। একটা পাথরের নিচে হাত ঢুকিয়ে ধুলো সরাল। কিছুই পেল না। তারপর অন্য জায়গায় গেল। সেখানে একটা কালো হয়ে যাওয়া লোহার টুকরো পড়ে ছিল। সে সেটি তুলে নিল।

মারদেকা কাছে এসে দাঁড়াল।

লারসেন লোহার টুকরোটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এখানেই আগুন লেগেছিল।”

মারদেকার বুকের ভেতর আবার সেই অদ্ভুত অনুভূতি ফিরে এল। সে ভাঙা কাঠের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার আঙুল কাঠের ওপর ছুঁতেই শরীরের ভেতর যেন বিদ্যুৎ ছুটে গেল। একটা ঘর। ধোঁয়া। চিৎকার।

একজন মানুষ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। তার হাত রক্তে ভেজা। আর একটা ছোট ছেলে দৌড়াচ্ছে।

মারদেকা হঠাৎ পিছিয়ে এল। “আমি এখানে ছিলাম।”

লারসেন স্থির হয়ে গেল। “কী বললে?”

মারদেকা নিজের বুকের ওপর হাত রাখল। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে। “আমি... এখানে ছিলাম।”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার মুখের সমস্ত কঠোরতা সরে গিয়ে এক ধরনের গভীর, ক্লান্ত ভাব ফুটে উঠল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই আশ্রয়ের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একটা শব্দ হলো। খুব ক্ষীণ। কাঠের নিচে কিছু যেন নড়ল।

দুজনেই থেমে গেল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মারদেকার সামনে এসে দাঁড়াল। তার ডান হাত পিস্তলের ওপর। চোখ ধ্বংসস্তূপে স্থির। কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই। তারপর আবার। একটা শুকনো কাঠ ভাঙার মতো শব্দ।

লারসেন মারদেকাকে পেছনে থাকতে ইশারা করল। সে ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপের দিকে এগিয়ে গেল। পাথরের আড়াল, ভাঙা কাঠ, শুকনো মাটি, সবকিছু একবার করে পরীক্ষা করল। তারপর একটা ভারী কাঠ সরাল। নিচে একটা ছোট গর্ত। গর্তের ভেতর অন্ধকার। 

লারসেন নিচু হয়ে তাকাল। তার চোখে এমন একটা পরিবর্তন দেখা গেল, যা মারদেকা আগে কখনও দেখেনি। সে হাত বাড়িয়ে গর্তের ভেতর থেকে একটা পুরোনো চামড়ার থলে বের করল। থলেটা ধুলায় ঢাকা। চামড়া শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু মুখটা এখনও বাঁধা। লারসেন থলেটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মারদেকা এগিয়ে এল। “ওটার ভেতরে কী?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে থলেটার ওজন বুঝতে চেষ্টা করল। তারপর মুখের বাঁধন খুলল।

ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কয়েকটা পুরোনো কাগজ, কিছু কালচে হয়ে যাওয়া মুদ্রা, আর একটা ভাঁজ করা কাগজের টুকরো। লারসেন কাগজটা খুলল।

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কাগজে লেখা অক্ষরগুলো বয়সের কারণে অনেকটাই মুছে গেছে। তবু কয়েকটি শব্দ স্পষ্ট। লারসেন পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে গেল।

মারদেকা বলল, “কী আছে?”

লারসেন কাগজটা তার হাতে দিল না। বরং চোখ তুলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া আশ্রয়ের দিকে তাকাল। “যে জিনিসের জন্য এত বছর পর মানুষগুলো ফিরে এসেছে, তার একটা অংশ এখনও এখানেই ছিল।”

মারদেকা চুপ করে রইল। দূরে পাহাড়ের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে গেল। তারপর খুব দূর থেকে ভেসে এল ঘোড়ার খুরের শব্দ। একবার। দুবার। তারপর দ্রুত।

লারসেন মাথা তুলল। শব্দটা আশ্রয়ের দিকে আসছে না। আসছে পাহাড়ের অন্য দিক থেকে। তার চোখ মুহূর্তের মধ্যে কঠিন হয়ে গেল। সে কাগজটা ভাঁজ করে নিজের পকেটে রাখল, চামড়ার থলেটা তুলে নিল এবং মারদেকার দিকে তাকাল। “আমাদের এখানে আসার খবর পৌঁছে গেছে।”

মারদেকা কিছু বলল না। তার চোখ তখন ধ্বংসস্তূপের ওপর। ভাঙা কাঠের নিচে একটা ছোট ধাতব জিনিস দেখা যাচ্ছে। সে নিচু হয়ে সেটি তুলে নিল। তারপর তার মুখের রং বদলে গেল।

ধাতব জিনিসটার ওপর খোদাই করা ছিল সেই একই চিহ্ন, যা সে পাথরের দেয়ালে দেখেছিল। কিন্তু চিহ্নটার নিচে আরও একটা দাগ ছিল। একটা ছোট অক্ষর। মারদেকা অক্ষরটা পড়তে পারল না। 

লারসেন তার হাত থেকে জিনিসটা নিয়ে দেখল। কয়েক সেকেন্ড পর তার চোখে যে আতঙ্ক ফুটে উঠল, সেটা এত ক্ষণিকের ছিল যে মারদেকা নিশ্চিত হতে পারল না সে সত্যিই তা দেখেছে কি না। 

লারসেন ধাতব টুকরোটা মুঠোয় বন্ধ করে ফেলল। “চলো।”

“কোথায়?”

লারসেন পাহাড়ের অন্য ঢালের দিকে তাকাল। “এই আশ্রয়ে আমরা একা নই।”

দূরে আবার ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। এবার আরও কাছে।

লারসেন মারদেকার ঘোড়ার লাগাম ধরল। তার মুখে ফিরে এসেছে সেই পুরোনো কঠোরতা। কিন্তু এবার তার চোখে শুধু অতীতের ভয় ছিল না। ছিল নিশ্চিত জ্ঞান। কেউ তাদের অনুসরণ করে এখানে এসেছে।

আর সেই মানুষটি শুধু লারসেনের পুরোনো পথ জানে না, সে জানে এই আশ্রয়ের নিচে কী লুকিয়ে আছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/267297/</link>
				<pubDate>Sun, 30 Aug 2026 03:51:57 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায় ২১<br />
সকালের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই লারসেন ঘুম থেকে উঠে পড়েছিল। আসলে ঘুম থেকে ওঠার প্রশ্নই ছিল না। রাতের শেষ প্রহর থেকে সে বিছানায় শুয়ে ছিল, কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই বহু বছরের পুরোনো কিছু দৃশ্য তার মাথার ভেতর ফিরে আসছিল। আগুনের লাল আলো, পাহাড়ের গায়ে কালো ছায়া, ছুটে চলা ঘোড়ার খুরের শব্দ, আর অন্ধকারে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-267297"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/267297/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">1ca5158408a06212f897a3cdcf0e4e06</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–বিশ
রাতের সেই মুহূর্তটা অনেকক্ষণ ধরে লারসেনের মনে ঘুরতে থাকল। মারদেকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ছুরি, চোখে এমন এক স্থিরতা, যে স্থিরতা কোনো তেরো বছরের ছেলের চোখে থাকার কথা নয়। লারসেন জানত, ছেলেটা এখন আর শুধু কৌতূহলী নয়। সে বুঝতে শুরু করেছে, র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশে যে অস্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে তার নিজের জীবনেরও কোনো অদৃশ্য সম্পর্ক আছে। বাইরে থেকে মানুষ যত শান্তই দেখাক, কোনো একটা শব্দ, কোনো একটা গন্ধ, কোনো একটা পুরোনো চিহ্ন সেই পাপকে আবার জাগিয়ে তুলতে পারে। গত কয়েকদিনে সেই সব চিহ্ন একে একে ফিরে এসেছে। আর এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এমন একজন, যার শৈশব হয়তো সেই পুরোনো ঘটনার সঙ্গে অজান্তেই জড়িয়ে আছে।

লারসেন ধীরে ধীরে মারদেকার কাছ থেকে সরে এল। ছেলেটাকে আর কিছু বলল না। শুধু একবার তার হাতে ধরা ছুরিটার দিকে তাকাল। ছুরিটা সে নিজেই দিয়েছিল। সেই ছুরি দিয়ে মারদেকা এখন কাঠের গুঁড়িতে আঘাত করে, বাতাসের গতি বোঝে, দূরত্ব মাপে, নিজের শরীরের ভারসাম্য ঠিক করতে শেখে। কিন্তু লারসেনের মনে হলো, ছুরির ধার শেখানোর চেয়ে কঠিন কাজ এখন সামনে। 

সে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। প্রদীপের আলোয় টেবিলের ওপর দ্বিতীয় কালচে চাকতিটা পড়ে ছিল। চাকতিটা সে কিছুক্ষণ আগেও হাতে নিয়েছিল, কিন্তু এবার সেটাকে দেখার ভঙ্গি বদলে গেল। ধাতব চাকতিটা নিছক একটা চিহ্ন নয়। গত রাতের পাহাড়ি আশ্রয়, দেয়ালের চিহ্ন, গাঢ় নীল কাপড়, পুরোনো কার্তুজ, শুকনো খাতে পাওয়া পদচিহ্ন, সবকিছু যেন একই সুতোয় বাঁধা। 

ভোরের কিছু আগে লারসেন আগুনের পাশে বসে ছিল। রাতের শেষ আগুনটুকু তখন নিভে আসছে। কাঠের ভেতর লালচে কয়লার আভা মাঝে মাঝে জ্বলে উঠছে, আবার ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বাড ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বুঝতে পারছিল, আজকের রাত অন্য রাতের মতো শেষ হবে না। লারসেনের মুখে সেই পুরোনো কঠোরতা ফিরে এসেছে, কিন্তু তার নিচে আরও কিছু আছে। 

মারদেকাও তখন ঘুমিয়ে নেই। সে নিজের ঘরে বসে ছিল। লারসেনের কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছিল। সব সত্যি একসঙ্গে জানা ভালো নয়। কথাটা সে বুঝেছে। কিন্তু তার মনে আরেকটা প্রশ্ন জন্মেছে, যদি সত্যি না জানে, তাহলে কীভাবে বুঝবে কোন বিপদ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে? 

সূর্য ওঠার কিছু পরে লারসেন নিজেই বাডকে ডেকে পাঠাল।

র&#x200d;্যাঞ্চ তখন ধীরে ধীরে দিনের কাজে ফিরে যাচ্ছে। ঘোড়াগুলোকে খাওয়ানো হয়েছে, গবাদি পশু ঘেরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে। লোকজনের চলাফেরায় আগের দিনের মতো স্বাভাবিকতা ফিরেছে বলে মনে হলেও লারসেন জানত, এই স্বাভাবিকতা কেবল উপরের আবরণ। পাহাড়ের দিকে তাকালেই তার মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের ওপারে কেউ এখনও অপেক্ষা করছে।

বাড ঘরে ঢুকতেই লারসেন জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাকে বসতে ইশারা করল। টেবিলের ওপর মানচিত্র মেলে রাখা। পাশে দ্বিতীয় চাকতি। আর তার পাশে পুরোনো সেই কাগজ, যার মাঝখানে লেখা নামটি এখন দুজন মানুষের মধ্যেকার নীরবতার মতো ভারী হয়ে আছে।

বাড বসে পড়ল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল না। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মানচিত্রের ওপর আঙুল রাখল। আঙুলটা র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে পশ্চিমে, তারপর আরও দূরে পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে এগোল। “এই জায়গাটা মনে আছে?”

বাড মানচিত্রের দিকে তাকাল। জায়গাটা তার অপরিচিত নয়। বহু বছর আগে কয়েকবার সে লারসেনের সঙ্গে ওই অঞ্চলে গিয়েছিল। কিন্তু তখনও সে জানত না, সেই পথের সঙ্গে লারসেনের জীবনের কী সম্পর্ক। “মনে আছে।”

লারসেন মাথা নেড়ে চাকতিটার দিকে তাকাল। “এই চিহ্নটা আমি প্রথম দেখেছিলাম ওই পথেই।”

বাডের চোখ চাকতির ওপর স্থির হলো।

লারসেন এবার আর থামল না। “অনেক বছর আগে আমি একদল ঘোড়সওয়ারের সঙ্গে কাজ করতাম।”

ঘরের ভেতর যেন হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে গেল। বাড কোনো প্রশ্ন করল না। সে শুধু শুনতে লাগল।

লারসেন ধীরে ধীরে বলল, “ওরা ডাকাত ছিল না। অন্তত নিজেদের ডাকাত বলত না। সীমান্তের এপার-ওপার দিয়ে মাল নিয়ে যেত। অস্ত্র, টাকা, মদ, কখনও নথি, কখনও এমন কিছু জিনিস যার নাম জানাটাও বিপজ্জনক ছিল। যার কাছে টাকা থাকত, সে টাকা দিত। যার কাছে অস্ত্রের দরকার ছিল, সে অস্ত্র নিত। আর আমরা শুধু পথ দেখাতাম।”

লারসেনের চোখ তখন মানচিত্রের ওপর। তার মনে হচ্ছিল, বহু বছর আগের সেই পথগুলো আবার চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে। ধুলোমাখা ঘোড়ার পিঠ, দীর্ঘ রাতের যাত্রা, শুকনো নদীর খাত, পাহাড়ের গায়ে লুকানো সরু পথ, আর কয়েকজন মানুষের মুখ। তখন সে তরুণ ছিল। শক্তি ছিল, সাহস ছিল, পৃথিবী সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ছিল। সে ভাবত, মানুষকে তার কাজ দিয়ে বিচার করা যায়। সে জানত না, কোনো কাজের আসল অর্থ অনেক সময় তার সামনে থাকা জিনিসে নয়, তার পেছনে থাকা উদ্দেশ্যে লুকিয়ে থাকে।

বাড ধীরে বলল, “আপনি তখন জানতেন না, ওরা আর কী করত?”

লারসেন মাথা তুলল। “প্রথমদিকে না।” তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল, “কিন্তু পরে বুঝেছিলাম।” 

দলটা সীমান্তের পথগুলো ভালোভাবে জানত। কোথায় পাহারার লোক কম, কোথায় নদী পার হওয়া যায়, কোথায় রাতে আগুন জ্বালানো নিরাপদ, কোথায় ঘোড়া লুকিয়ে রাখা যায়, সব তাদের জানা ছিল। তাদের চলার নিজস্ব নিয়ম ছিল। আর সেই নিয়মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল চিহ্ন। দূর থেকে কোনো মানুষকে দেখে বোঝা যেত না সে দলের লোক কি না। কিন্তু গাঢ় নীল কাপড়ের একটা টুকরো, কোমরে বাঁধা একটা কালচে চাকতি, কিংবা নির্দিষ্ট জায়গায় আঁকা একটা চিহ্ন, এগুলো ছিল তাদের ভাষা।

চাকতিটা একজন অপরিচিত লোকের কাছে ছিল নিছক ধাতব টুকরো। কিন্তু দলের লোকেরা জানত, কোন চাকতির কোন চিহ্ন কোন পথের পরিচয়, কোন আশ্রয় নিরাপদ, কোন জায়গায় আগে মাল রাখা হয়েছে, কোন পথ ব্যবহার করা যাবে আর কোন পথ এড়িয়ে চলতে হবে।

চাকতি ছিল তাদের কাছে এমন এক ভাষা, যা কাগজে লেখা থাকত না। লারসেন টেবিলের ওপর দ্বিতীয় চাকতিটা আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিল। “এই জিনিসটার জন্যই আমি আজ তোমাদের সামনে বসে আছি।”

বাডের চোখ সরু হলো। “এটা কি কোনো লুকানো সম্পদের চিহ্ন?”

লারসেন মাথা নাড়ল। “না। সম্পদ কোথায় আছে সেটা সরাসরি বলে না। শুধু এমন মানুষকে পথ চিনিয়ে দেয়, যে আগে থেকেই নিয়মটা জানে।”

বাড কিছুক্ষণ চাকতির দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ল, এতদিন ধরে সে ভেবেছিল চাকতিটা হয়তো কোনো গুপ্তধনের চাবি। এখন বুঝতে পারছে, ব্যাপারটা আরও ভয়ংকর। চাবি হারালে তালা খোলা যায় না, কিন্তু একটা পথের চিহ্ন হারালে শুধু পথ হারায় না, পথের সঙ্গে জড়ানো সমস্ত গোপন জিনিসও অদৃশ্য হয়ে যায়।

লারসেন জানালার দিকে তাকাল। “আমি যখন বুঝলাম ওরা শুধু চোরাচালান করছে না, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।”

বাড চুপ করে রইল।

লারসেনের চোখে তখন বহু বছরের পুরোনো একটা রাতের ছায়া নেমে এসেছে। দলটা ধীরে ধীরে বদলে গিয়েছিল। আগে তারা যে মাল বহন করত, তার সঙ্গে মানুষের জীবন জড়িত ছিল না। পরে বন্দুকের বাক্স বাড়তে লাগল। অচেনা লোকেরা আসতে শুরু করল। তাদের সঙ্গে এমন কিছু নথি চলাচল করত, যেগুলো সাধারণ ব্যবসার কাগজ ছিল না। সীমান্তের দুই অঞ্চলের কয়েকজন ক্ষমতাবান মানুষের নাম সেখানে থাকত। কিছু জায়গার জমি, কিছু অস্ত্রের চালান, কিছু সৈন্যের গতিবিধি, কিছু অর্থের হিসাব, সবকিছু যেন এক অদৃশ্য জালের অংশ।

লারসেন তখন বুঝেছিল, তারা শুধু মাল বহন করছে না। তারা একটা বড় খেলার ঘুঁটি হয়ে গেছে। আর সেই খেলায় মানুষ মারা গেলে তার হিসাবও টাকার মতো লেখা হয়।

বাড ধীরে বলল, “তখন আপনি দল ছেড়ে দিয়েছিলেন?”

লারসেনের মুখ শক্ত হলো। “হ্যাঁ।”

কিন্তু কথাটা বলার পরও সে চুপ করে রইল। কারণ দল ছেড়ে যাওয়াটাই গল্পের শেষ নয়। বরং আসল পাপ শুরু হয়েছিল তার পরে। লারসেনের আঙুল মানচিত্রের ওপর থেমে গেল। পাহাড়ের পশ্চিমে একটা জায়গা, তারপর আরও দক্ষিণে একটা সরু পথ। “আমি চলে যাওয়ার আগে একটা চালান এসেছিল।”

“কী ছিল?”

“টাকা।”

বাডের চোখে সামান্য পরিবর্তন এল।

লারসেন বলল, “অনেক টাকা। এত টাকা যে একটা ছোট র&#x200d;্যাঞ্চ কয়েক প্রজন্ম চালানো যায়। কিন্তু টাকার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল আরেকটা জিনিস।” সে পুরোনো কাগজটার দিকে তাকাল। “একটা নথি।”

ঘরের নীরবতা আরও ঘন হয়ে উঠল। লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “ওরা ভেবেছিল টাকা আর নথি নিরাপদ জায়গায় আছে। কিন্তু আমি তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম। আমি জানতাম, ওই জিনিসগুলো যদি আবার তাদের হাতে ফিরে যায়, তাহলে অনেক মানুষ মারা যাবে।”

বাড ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করছিল, গল্পটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। “আপনি সেগুলো নিয়ে চলে গিয়েছিলেন?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। তার মুখে এমন একটা ছায়া ফুটে উঠল, যেন এই প্রশ্নটাই সে এত বছর ধরে নিজেকে করেছে। “আমি নিয়ে যাইনি।”

বাড চমকে তাকাল।

লারসেন ধীরে বলল, “আমি শুধু জানতাম ওগুলো কোথায় ছিল।”

এই কথার পর দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল। বাইরে একটা ঘোড়া হঠাৎ হ্রেষাধ্বনি করল। বাতাসে দরজার কড়িকাঠ সামান্য কেঁপে উঠল। কিন্তু ঘরের ভেতর দুজন মানুষই যেন বহু বছর আগের একটা জায়গায় ফিরে গেছে।

লারসেনের চোখে তখন সেই পুরোনো আগুনের রাত ফিরে এসেছে। সে জানত, টাকা কোথায় রাখা হয়েছিল। সে জানত, নথিটা কোথায় লুকানো হয়েছিল। আর সে এটাও জানত, দলটির কেউ যদি বুঝতে পারে যে সে সবকিছু জানে, তাহলে তাকে বাঁচতে দেওয়া হবে না। সে দল ছেড়ে চলে এসেছিল।

কিন্তু যাওয়ার আগে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার জন্য আজও তার ঘুম ভেঙে যায়। সে রাতের সবকিছু এখনও তার মনে নেই। কিছু ছবি আছে, কিছু শব্দ আছে, কিছু মুখ আছে। কিন্তু একটা জিনিস সে কখনও ভুলতে পারেনি, তার নিজের সিদ্ধান্তের কারণে কয়েকজন মানুষ মারা গিয়েছিল। সে তাদের বাঁচাতে পারেনি।

আর যে জিনিসগুলো সে লুকিয়ে রেখেছিল, সেগুলোও পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। তাই এত বছর পরও সে জানে, হিসাব শেষ হয়নি। 

বাড ধীরে বলল, “আপনি এতদিন কাউকে বলেননি কেন?”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “কারণ যত কম মানুষ জানে, তত কম মানুষ বিপদে পড়ে।” তারপর একটু থেমে যোগ করল, “কিন্তু এখন আর সেটা যথেষ্ট নয়।”

এই কথাটার অর্থ বাড বুঝতে পারল। লারসেন এবার প্রথমবারের মতো অতীতের দরজা খুলেছে। কিন্তু দরজার ওপারে এখনও এমন কিছু আছে, যা সে পুরোপুরি বলতে পারছে না।

ঠিক তখন দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। দুজনেই চুপ করে গেল। মারদেকা। 
সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কি না, বোঝা গেল না।

লারসেন কয়েক মুহূর্ত দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল, “ওকে ভেতরে আসতে বলো।”

বাড উঠে দরজা খুলল। মারদেকা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে কোনো কৌতূহলী শিশুর দৃষ্টি নেই। সে যেন অনেকক্ষণ ধরে নিজের ভেতরে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর এখানে এসেছে। লারসেন তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা চাকতিটার দিকে একবার চোখ গেল।

মারদেকার পকেটের কাছে হাত ছিল। যেখানে সে নিজের চাকতিটা নিরাপদে রাখে। 

লারসেনের বুকের ভেতর হঠাৎ অস্বস্তি জেগে উঠল। প্রথমবার সে স্পষ্টভাবে ভাবল, এই ছেলেটার শৈশবের কোনো ছবি হয়তো কেবল স্মৃতি নয়। হয়তো সেই ছবির পেছনে সত্যিই এই মানুষগুলো ছিল। আর সেই সত্যিটা বলার সময় এসে গেছে।

লারসেন ধীরে চেয়ারটা টেনে দিল। “বসো, মারদেকা।”

মারদেকা বসে পড়ল।

লারসেন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জানালার বাইরে তাকাল। দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। দিনের আলোয় সবকিছু শান্ত। অথচ সে জানে, সেই পাহাড়ের কোথাও তার অতীত এখনও জীবিত।

সে ধীরে চাকতিটা হাতে তুলে নিল। “তুমি এই চিহ্নটা আগে কোথায় দেখেছ, সেটা আমাকে বলবে?”

মারদেকা কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ চাকতির ওপর স্থির হয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “আমি জানি না।”

কথাটা সত্যি কি না, লারসেন বুঝতে পারল না।

কিন্তু মারদেকার চোখে যে ভয় এক মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠেছিল, সেটা লারসেনের চোখ এড়াল না।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার মনে হলো, বহু বছর আগে যে পাপ থেকে সে পালিয়ে এসেছিল, তার ছায়া শুধু তার র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরে আসেনি। সেটা ফিরে এসেছে মারদেকার স্মৃতির ভেতর দিয়েও। 

লারসেন এবার সত্যিটা বলতে মুখ খুলল। কিন্তু বাইরে, দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকা বাড হঠাৎ ঘোড়ার ক্ষীণ শব্দ শুনতে পেল। একটা নয়। কয়েকটা।

সে ধীরে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। আর তার চোখে যে দৃশ্য ফুটে উঠল, সেটা দেখে তার হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোমরের বন্দুকের দিকে চলে গেল।

র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে কয়েকজন অচেনা ঘোড়সওয়ার এগিয়ে আসছে। এবার তারা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে না। এবার তারা সরাসরি র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে আসছে।

র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে এগিয়ে আসা ঘোড়সওয়ারদের সংখ্যা প্রথমে তিনজন বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু পাহাড়ের ঢালের ছায়া পেরিয়ে তারা যখন একটু নিচে নেমে এল, তখন বোঝা গেল, পেছনে আরও কয়েকজন আছে। সকালের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। পূর্ব আকাশে সূর্যের আগমনের আভা উঠেছে মাত্র, আর সেই ম্লান আলোয় ঘোড়াগুলোর শরীর কখনও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, কখনও আবার পাহাড়ের ছায়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। তাদের চলার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু সেটাই বরং বেশি অস্বস্তিকর। যারা কোনো জায়গায় হঠাৎ হামলা করতে আসে, তারা সাধারণত দ্রুত আসে। আর যারা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, তারা আগে থেকেই জানে কোথায় যাচ্ছে। তারা পথ নিয়ে নিশ্চিত, নিজেদের শক্তি সম্পর্কে নিশ্চিত, এবং সবচেয়ে বড় কথা, তারা জানে সামনে থাকা মানুষগুলো তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কি না।

বাড জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল। তার ডান হাত কোমরের বন্দুকের ওপর স্থির। চোখের পাতা প্রায় নড়ছিল না। বহু বছরের অভিজ্ঞতায় সে বুঝতে শিখেছে, দূরের মানুষকে শুধু তাদের পোশাক বা ঘোড়ার রঙ দেখে বিচার করা যায় না। ঘোড়ার গতি, দলবদ্ধ হওয়ার ধরন, দূরত্ব বজায় রাখার পদ্ধতি, কে সামনে আর কে পেছনে, কে চারপাশ দেখছে, এসবই বলে দেয় তাদের উদ্দেশ্য। এই দলটি সাধারণ পথিকের দল নয়। তারা এমনভাবে আসছে যেন র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি বেড়া, প্রতিটি ঘোড়ার আস্তাবল এবং প্রতিটি পাহারার জায়গা তারা আগে থেকেই মেপে রেখেছে।

বাড ধীরে জানালা থেকে সরে এল। লারসেন তখনও টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে। মারদেকা তার সামনে বসে, কিন্তু ছেলেটার চোখ এখন লারসেনের দিকে নয়। সে বাডের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইছিল কী ঘটেছে। বাডের চোখে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটা লুকোনোর মতো ছিল না। লারসেনও জানত, আর সময় নেই। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে সত্যিটা সে বলতে শুরু করতে চেয়েছিল, এখন সেই সত্যির সঙ্গে বন্দুকের শব্দও জুড়ে যেতে পারে।

লারসেন ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো ভয় ছিল না। বরং অদ্ভুত এক স্থিরতা। এই মানুষটাকে বাড বহুবার বিপদের মুখে দেখেছে। গুলি চলার আগে, গুলি চলার পরে, ঘোড়া ছুটে যাওয়ার সময়, কিংবা কোনো মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনার সময়। প্রতিবারই লারসেনের মধ্যে একটা জিনিস অপরিবর্তিত থেকেছে। বিপদ যত কাছে আসে, তার মন তত ঠান্ডা হয়ে যায়। অন্যরা যেখানে আতঙ্কে সিদ্ধান্ত হারায়, লারসেন সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ফিরে পায়। সে জানালার দিকে না তাকিয়েই বলল, “কতজন?”

বাড উত্তর দিল, “সামনে পাঁচজন। পেছনে আরও দুজনের মতো।”

লারসেন মাথা নেড়ে জানালার কাছে গেল। পর্দার ফাঁক দিয়ে একবার বাইরে তাকাল। তারপর সঙ্গে সঙ্গে সরে এল। তার চোখে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল না, কিন্তু বাড বুঝল, সে ঘোড়সওয়ারদের পোশাকের কোনো একটা অংশ চিনেছে। “ওদের সরাসরি উঠোনে ঢুকতে দেবে না।”

বাড অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। “কেন?”

লারসেন শান্ত গলায় বলল, “কারণ ওরা জানতে চায় আমরা তাদের দেখে কী করি।”

এই কথার পর সে আর কিছু বলল না। ঘরের ভেতর একটা অদৃশ্য উত্তেজনা জমে উঠল। মারদেকা ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার হাত পকেটের কাছে। সেখানে তার নিজের কালচে চাকতি। ছেলেটা কিছু বলছে না, কিন্তু তার শরীরের ভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে, সে প্রস্তুত হচ্ছে। 

লারসেন সেটা লক্ষ্য করল। কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে কাছে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল। “তুমি এখন কোনো অস্ত্র তুলবে না।”

মারদেকা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু লারসেনের চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। “যা দেখবে, মনে রাখবে। কিন্তু নিজের থেকে কিছু করবে না।” এই কথাটা বলেই লারসেন সরে গেল।

মারদেকা মাথা নেড়ে জানালার পাশে দাঁড়াল। সে জানত, এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছুরি নয়। তার চোখ আর কান। লারসেন তাকে অনেকদিন ধরে একটা কথা শেখাচ্ছে, বন্দুকের আগে মানুষকে পড়তে হয়। আজ প্রথমবার সেই শিক্ষা বাস্তবের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে।

র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে তখন কয়েকজন মানুষ ইতিমধ্যে বেরিয়ে এসেছে। হ্যাঙ্ক ডসন ঘোড়ার আস্তাবলের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ক্লে মরগান পশ্চিম দিকের বেড়ার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য পাহারাদাররা নিজেদের জায়গা নিয়েছে, কিন্তু কেউ বন্দুক হাতে প্রকাশ্যে দাঁড়ায়নি। লারসেন ইচ্ছা করেই লোকগুলোকে ছড়িয়ে থাকতে দিয়েছিল। সবাই যদি এক জায়গায় জড়ো হয়, আগন্তুকেরা বুঝে যাবে কোথায় প্রতিরোধ হবে। আর লারসেন চায় না তার শত্রুরা এত সহজে তাদের অবস্থান বুঝে ফেলুক।

ঘোড়সওয়াররা আরও কাছে এল। এবার তাদের পোশাক পরিষ্কার দেখা গেল। ধুলোয় মলিন কোট, মাথায় চওড়া কিনারার টুপি, কোমরে অস্ত্র। তাদের পোশাকে কোনো নির্দিষ্ট চিহ্ন নেই। দূর থেকে দেখে সাধারণ ভাড়াটে বন্দুকধারীর দল বলেই মনে হয়। কিন্তু লারসেন জানত, সত্যিকারের বিপদ কখনও নিজের পরিচয় গায়ে লিখে নিয়ে আসে না।

সামনের লোকটি ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিল। তার পাশে থাকা দুজনও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে গেল। তারা র&#x200d;্যাঞ্চের মূল দরজার দিকে সরাসরি না গিয়ে অর্ধচন্দ্রাকারে এগিয়ে এল। পেছনের দুজন আরও দূরে থেকে রইল। যেন পুরো র&#x200d;্যাঞ্চটাকে একটা অদৃশ্য বৃত্তের মধ্যে রেখে দিয়েছে।

বাড সেটা দেখে নিঃশব্দে বলল, “ওরা জায়গাটা চেনে।”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ শুধু সামনের লোকটির ওপর। লোকটির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মুখে কয়েক দিনের দাড়ি। বাঁ গালের কাছে পুরোনো কাটা দাগ। ঘোড়াটা কালো, শক্তপোক্ত, কিন্তু অতিরিক্ত সাজানো নয়। লোকটি ঘোড়ার লাগাম এক হাতে ধরে রেখেছে। অন্য হাতটা কোমরের কাছাকাছি। এমনভাবে, যেন সে বন্দুক ধরেনি, অথচ এক মুহূর্তেই ধরতে পারবে।

লারসেনের চোখ হঠাৎ তার কোমরের বেল্টে আটকে গেল। চামড়ার বেল্টের নিচে গাঢ় নীল কাপড়ের খুব সরু একটা ফালি দেখা যাচ্ছে। এত সরু যে সাধারণ চোখে সেটা চোখে পড়ার কথা নয়।

কিন্তু লারসেন দেখল। তার মনে হলো, বহু বছর আগের একটা দরজা যেন আবার খুলে গেল। সেই নীল কাপড়। সেই পুরোনো চিহ্ন। সেই মানুষদের ঘোড়ার পিঠ। আগুনের রাত। মৃত মানুষের মুখ। আর তারপর এক অন্ধকার পথ, যেখানে সে একা চলে গিয়েছিল।

লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না। কিন্তু তার ভেতরে বহু বছরের পুরোনো একটা ক্ষত যেন আবার খুলে রক্ত ঝরাতে শুরু করল।

সামনের ঘোড়সওয়ারটি র&#x200d;্যাঞ্চের বেড়ার কাছে এসে ঘোড়া থামাল। কিছুক্ষণ চারপাশ দেখল। তারপর উচ্চস্বরে বলল, “আমরা লারসেনের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।”

র&#x200d;্যাঞ্চের কোথাও কোনো উত্তর এল না। লোকটি আবার বলল, “আমরা জানি সে এখানে আছে।”

লারসেন এবার নিজেই বাড়ির বারান্দায় বেরিয়ে এল। তার হাতে কোনো বন্দুক নেই। কোমরের পিস্তল অবশ্য যথাস্থানে। বাড তার কয়েক পা পেছনে। মারদেকা দরজার আড়াল থেকে তাকিয়ে আছে। 

লারসেন বারান্দার শেষ ধাপে এসে থামল। “আমিই লারসেন।”

সামনের লোকটি তাকে কিছুক্ষণ দেখল। তার চোখে বিস্ময় নেই। যেন সে ইতিমধ্যেই জানত, এই মানুষটিই সামনে আসবে। “অনেক বছর পর দেখা হচ্ছে।”

লারসেনের চোখ সরু হয়ে এল। সে লোকটাকে চিনতে পারছে না। অন্তত মুখ দেখে নয়। কিন্তু কথার ভঙ্গি, শরীরের স্থিরতা, ঘোড়ার ওপর বসার ধরন, সবকিছু তার স্মৃতির কোথাও গিয়ে আঘাত করল।

“আমাকে চিনতে পারছেন না?”

লারসেন ধীরে বলল, “চেনার মতো কিছু দেখছি না।”

লোকটি সামান্য হাসল। “সময় অনেক কিছু বদলে দেয়।”

লারসেন বলল, “সময় মুখ বদলায়। অভ্যাস বদলায় না।”

লোকটির হাসি মিলিয়ে গেল। এই ছোট কথোপকথনের মধ্যেই দুজন মানুষ একে অপরকে মেপে নিল। কে কতটা জানে, কে কতটা লুকাচ্ছে, কে আগে গুলি চালাতে পারে, কে অপেক্ষা করবে, সবকিছুর হিসাব যেন কয়েক মুহূর্তের মধ্যে হয়ে গেল।

বাড তখন লক্ষ্য করল, সামনের লোকটির পেছনে থাকা একজন ঘোড়সওয়ার বারবার বাড়ির ডানদিকে তাকাচ্ছে। আরেকজনের চোখ আস্তাবলের দিকে। তৃতীয়জন পাহাড়ের পথের দিকে। তারা কথা বলছে না, কিন্তু প্রত্যেকেই আলাদা জায়গা দেখছে। এরা শুধু লারসেনের সঙ্গে কথা বলতে আসেনি। তারা র&#x200d;্যাঞ্চের অবস্থান পরীক্ষা করছে।

লারসেনও সেটা বুঝেছে। “কী চাই?”

সামনের লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমাদের লোকের সঙ্গে কথা বলতে হবে।”

“কোন লোক?” 

লোকটির চোখ এবার সামান্য বদলে গেল। “যে জিনিস আপনার কাছে আছে।”

লারসেনের মুখে কোনো অভিব্যক্তি এল না। কিন্তু বারান্দার দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মারদেকার বুকের ভেতর হঠাৎ ধাক্কা লাগল। তার হাত অজান্তেই পকেটের ওপর চলে গেল। চাকতিটা সেখানে আছে।

লারসেন সেটা দেখতে পেল না, কিন্তু যেন অনুভব করল। “আমার কাছে অনেক জিনিস আছে।”

সামনের লোকটি বলল, “আমরা জানি কোনটা।”

লারসেন এবার একটু সামনে এগিয়ে এল। “তাহলে তোমাদের ভুল হয়েছে। আমি কোনো জিনিস কাউকে দেব না।”

লোকটির চোখ কঠিন হয়ে উঠল। “আপনি এখনও আগের মতোই জেদি।”

এইবার লারসেনের মনে হলো, সে কণ্ঠটা আগে শুনেছে। খুব বহু বছর আগে। কোনো এক রাতে। আগুনের আলোয়। কেউ একজন তাকে বলেছিল, পালিয়ে গিয়ে লাভ নেই। 
তারপর গুলি চলেছিল।

লারসেনের বুকের ভেতর হঠাৎ পুরোনো স্মৃতির একটা দরজা খুলে গেল। কিন্তু সে সেটা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিল। এখন স্মৃতিতে ডুবে যাওয়ার সময় নয়। সে লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমাদের নেতা কোথায়?”

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আপনি এখনও নামটা উচ্চারণ করতে ভয় পান?” 

বাডের শরীর শক্ত হয়ে গেল। লারসেনের চোখে এবার প্রথমবারের মতো পরিবর্তন দেখা গেল।

লোকটি আরেকবার বলল, “আপনি জানেন সে বেঁচে আছে।”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। দূরে একটা কাক ডাকল। সকালের আলো তখন আরও উজ্জ্বল হয়েছে। পাহাড়ের গায়ে সূর্যের প্রথম রেখা পড়েছে। অথচ র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে যেন সময় থেমে আছে।

বাড বুঝতে পারল, এই লোকেরা যে নামের কথা বলছে, সেই নামই গত রাতে লারসেন কাগজে দেখিয়েছিল। বহু বছর ধরে মৃত বলে ধরে নেওয়া মানুষটি সত্যিই ফিরে এসেছে। আর এই ঘোড়সওয়াররা তার দূত হয়ে এসেছে।

কিন্তু লারসেন তখন অন্য কিছু লক্ষ্য করছিল। সামনের লোকটির ডান হাতের কবজিতে একটা সরু দাগ। ঘোড়ার লাগাম ধরার সময় হাতের চামড়া সামান্য উঠে আসছে। সেই দাগটা লারসেনের মনে পড়ে গেল। একটা মানুষ। একটা রাত। একটা আগুন। আর সেই রাতের শেষে যে মানুষটি ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে গিয়েছিল, তার কবজিতেও একই জায়গায় এমন একটা দাগ ছিল।

লারসেনের চোখ হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। সে এবার বুঝল। এই লোকটি শুধু দলের একজন নয়। সে সেই রাতের সাক্ষী। হয়তো সেই রাতের অংশও।

কিন্তু তার মুখ থেকে নাম বের করার আগেই পাহাড়ের দিক থেকে একটা তীক্ষ্ণ শব্দ এল। গুলি নয়। পাখির ডাকের মতো।

সামনের ঘোড়সওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। তার পেছনের লোকেরাও এক মুহূর্তে সতর্ক হয়ে উঠল।

লারসেন বুঝে গেল, এটা সংকেত। র&#x200d;্যাঞ্চের বাইরে থাকা আরও কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তার চোখ পাহাড়ের দিকে উঠল। কিছু দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পাহাড়ের ঢালের এক জায়গায় শুকনো ঘাসের মাথা সামান্য দুলে উঠল। বাতাস সেই মুহূর্তে অন্যদিকে বইছিল। কেউ সেখানে আছে। শুধু একজন নয়।

লারসেনের মনে হলো, এই দলটি র&#x200d;্যাঞ্চে এসেছে সামনে থেকে কথা বলার জন্য, কিন্তু আসল উদ্দেশ্য অন্য কোথাও। তারা চাইলে রাতেই আক্রমণ করতে পারত। তারা করেনি। কারণ তারা অপেক্ষা করছিল। তারা জানতে চাইছিল, র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরে কী আছে, কে কোথায় থাকে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, চাকতিটা কার কাছে।

মারদেকার দিকে তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য গেল। ছেলেটা এখনও দরজার আড়ালে। 
লারসেনের মনে হলো, শত্রুরা হয়তো তাকে দেখেনি। কিন্তু তারপরই সামনের লোকটির চোখ বাড়ির দিকে উঠল। তার দৃষ্টি সরাসরি দরজার আড়ালে গিয়ে থামল। 
“ছেলেটা কে?”

লারসেনের শরীরের ভেতর যেন মুহূর্তের জন্য বরফ জমে গেল। সে এক পা সামনে এগিয়ে এল। “তোমার জানার দরকার নেই।”

লোকটি মৃদু হাসল। “আমাদের দরকার আছে।”

এইবার বাড আর নিজেকে থামাতে পারল না। সে কোমর থেকে বন্দুকের হাতল বের করে আনল। একই সঙ্গে র&#x200d;্যাঞ্চের অন্য প্রান্তে ক্লে আর হ্যাঙ্কও নিজেদের অবস্থান বদলাল। 

কিন্তু লারসেন হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিল। এখন গুলি চালালে র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশে থাকা অদৃশ্য লোকগুলোও বেরিয়ে আসবে।

সামনের লোকটি সেটা বুঝে ফেলেছে। সে ধীরে ঘোড়ার মাথা ঘুরিয়ে নিল। “আজ আমরা শুধু কথা বলতে এসেছি।”

লারসেন ঠান্ডা গলায় বলল, “পরের বার?”

লোকটি ঘোড়ার ওপর বসেই তার দিকে তাকাল। “পরের বার হয়তো কথা থাকবে না।” সে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিতে শুরু করল। তার পেছনের লোকগুলোও ধীরে ধীরে সরে গেল। কিন্তু তারা যাওয়ার সময় একবারও র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে পিঠ পুরোপুরি ফিরিয়ে দিল না। কয়েক গজ দূর যাওয়ার পর সামনের লোকটি থামল। তারপর পেছনে তাকিয়ে বলল, “চাকতিটা যার কাছে আছে, তাকে নিয়ে সাবধানে থাকবেন।”

লারসেনের চোখ সরু হলো।

লোকটি আর কিছু বলল না। ঘোড়াগুলো ধীরে ধীরে পাহাড়ের দিকে চলে গেল। কয়েক মিনিট পর তাদের শব্দও মিলিয়ে গেল। কিন্তু র&#x200d;্যাঞ্চের কেউ নড়ল না। কারণ সবাই জানত, তারা চলে গেলেও বিপদ চলে যায়নি।

লারসেন ধীরে দরজার দিকে ফিরে তাকাল। মারদেকা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ ফ্যাকাশে নয়, কিন্তু চোখে এক ধরনের কঠিন আলো। পকেটের ওপর তার হাত।

লারসেন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল, “এবার তোমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় হয়েছে।”

মারদেকা এগিয়ে এল। বাডও কাছে এসে দাঁড়াল। অন্যরা দূরে রইল।

লারসেন ঘরে ঢুকে মারদেকার কাছ থেকে প্রথম চাকতিটা চেয়ে নিল। সেটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর দ্বিতীয় চাকতিটা তার পাশে রাখল। দুটো ধাতব চাকতি পাশাপাশি রাখা মাত্র সকালের আলোয় তাদের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠল।

মারদেকা দুটির দিকে তাকিয়ে রইল। দুটোর চিহ্ন একই নয়। কিন্তু তাদের মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক আছে, যা চোখ এড়ায় না।

লারসেন চেয়ার টেনে বসে পড়ল। তারপর অনেকক্ষণ ধরে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। যেন কথাগুলো সাজানোর জন্য সময় দরকার। শেষ পর্যন্ত সে বলল, “অনেক বছর আগে একটা দল ছিল। তারা সীমান্তের দুই পাশে চলত। তাদের কাজ শুধু চোরাচালান ছিল না। তারা মানুষের গোপন তথ্য বহন করত, অস্ত্র বহন করত, টাকা বহন করত। আর কখনও কখনও মানুষও।”

মারদেকা চুপ করে শুনছিল। 

লারসেন বলল, “আমি তাদের সঙ্গে ছিলাম।”

ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। মারদেকার চোখে বিস্ময় ফুটল, কিন্তু সে কিছু বলল না।

লারসেন আবার বলল, “আমি তখন তরুণ ছিলাম। বুঝতাম না, কোন পথ কোথায় গিয়ে শেষ হয়। ভাবতাম আমি শুধু পথ দেখাচ্ছি। কিন্তু পরে বুঝলাম, আমি এমন একটা জালের অংশ হয়ে গেছি যার শেষ কোথায়, সেটা কেউ জানে না।”

সে ধীরে চাকতিগুলোর দিকে তাকাল। “এই চিহ্ন ছিল সেই দলের ভাষা।”

মারদেকা নিচু হয়ে চাকতিগুলোর দিকে তাকাল। সহসা তার মনে আবার সেই অস্পষ্ট ছবি ফিরে এল। একটা কাঠের দেয়াল। গাঢ় নীল কাপড়। একটা দরজা। আর কোনো একজন মানুষের হাত। সেই হাত তার হাতের ওপর রাখা। সে চোখ বন্ধ করল। মুহূর্তের মধ্যে তার মাথার ভেতর একটা শব্দ উঠল। “দৌড়াও।” 

মারদেকা হঠাৎ চোখ খুলল।

লারসেন তাকে দেখছিল। “কী মনে পড়ল?”

মারদেকা উত্তর দিতে পারল না। তার বুকের ভেতর দ্রুত শ্বাস উঠানামা করছে। সে জানে না সেই শব্দ কার। কিন্তু একটা জিনিস সে নিশ্চিতভাবে অনুভব করছে। শব্দটা তার নিজের কল্পনা নয়।

সে খুব ধীরে বলল, “কেউ আমাকে একবার দৌড়াতে বলেছিল।”

লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “কে?”

মারদেকা মাথা নাড়ল। “জানি না।”

বাড তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হলো, দূরের পাহাড়ের আড়ালে এখনও কেউ তাদের দেখছে। হয়তো সেই মানুষ, যে ঘোড়সওয়ারদের পাঠিয়েছে। হয়তো সেই মানুষ, যার নাম বহু বছর ধরে মৃতদের তালিকায় ছিল।

লারসেন ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ এবার আর শুধু অতীতের দিকে নয়। সামনে থাকা ছেলেটার দিকে। সে বুঝতে পারল, এতদিন যে প্রশ্নের উত্তর সে নিজের কাছেও দিতে চায়নি, আজ সেই প্রশ্ন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

মারদেকা কে? কেন এই চাকতি তার কাছে চেনা মনে হয়? কেন সে চিহ্নগুলো দেখলে এমন কিছু মনে করতে পারে যা তার নিজের স্মৃতি হওয়ার কথা নয়? আর সবচেয়ে বড় কথা, সেই পুরোনো রাতের আগুনের সঙ্গে এই ছেলেটার কী সম্পর্ক?

লারসেন জানত, এসব প্রশ্নের উত্তর তার কাছে পুরোপুরি নেই। কিন্তু সে এটাও জানত, উত্তর খুঁজতে হলে তাকে আবার সেই জায়গায় ফিরতে হবে যেখান থেকে সে বহু বছর আগে পালিয়ে এসেছিল। 

পাহাড়ের ওপারে। পুরোনো আশ্রয়ের কাছে। সেই পথের কাছে, যেখানে একদিন টাকা আর নথি লুকানো হয়েছিল। আর যেখানে হয়তো এখনও এমন কোনো সত্যি পড়ে আছে, যেটা জানলে শুধু লারসেনের অতীত বদলাবে না, মারদেকার ভবিষ্যৎও বদলে যাবে।

বাইরে তখন সূর্য উঠে গেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর আলো ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষজন আবার দিনের কাজে ফিরছে। ঘোড়াগুলোকে বাইরে আনা হচ্ছে, রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে, দূরে গবাদি পশুর ডাক শোনা যাচ্ছে। সবকিছু যেন স্বাভাবিক।

কিন্তু লারসেন জানত, এই স্বাভাবিকতা আর বেশিদিন থাকবে না। কারণ শত্রুরা এবার নিজেদের দেখিয়ে গেছে। তারা জানে চাকতি দুটো কোথায়।

তারা জানে লারসেন এখনও বেঁচে আছে। তারা জানে মারদেকা এই র&#x200d;্যাঞ্চে আছে। আর তারা এমন একজনের হয়ে কাজ করছে, যার নাম বহু বছর ধরে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল।

লারসেন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের দিকে তাকাল। তারপর খুব ধীরে মুঠো বন্ধ করল। বহু বছর আগে সে একটা পথ ছেড়ে এসেছিল। আজ সেই পথ আবার তাকে ডাকছে। আর এবার সে একা যাবে না।

তার পাশে থাকবে সেই তেরো বছরের ছেলেটা, যে এখনও জানে না তার নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য কোথায় লুকিয়ে আছে।

দূরের পাহাড়ের ওপর দিয়ে একটা কালো পাখি উড়ে গেল। লারসেনের চোখ সেই পাখির দিকে উঠল। তারপর সে মারদেকার দিকে তাকাল। ছেলেটা তখনও দুটো চাকতির দিকে তাকিয়ে। তার চোখে ভয় নেই।

শুধু একটা প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাদের সবাইকে আবার সীমান্তের ওপারে যেতে হবে। এবার শুধু পুরোনো হিসাবের জন্য নয়। মারদেকার অতীতের জন্যও।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/266941/</link>
				<pubDate>Sat, 29 Aug 2026 07:01:52 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–বিশ<br />
রাতের সেই মুহূর্তটা অনেকক্ষণ ধরে লারসেনের মনে ঘুরতে থাকল। মারদেকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ছুরি, চোখে এমন এক স্থিরতা, যে স্থিরতা কোনো তেরো বছরের ছেলের চোখে থাকার কথা নয়। লারসেন জানত, ছেলেটা এখন আর শুধু কৌতূহলী নয়। সে বুঝতে শুরু করেছে, র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশে যে অস্বাভাবিকতা তৈরি&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-266941"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/266941/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">cf626c6ef1f1036b89eedb74de8b3b05</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–উনিশ
রাত তখন আরও গভীর হয়ে উঠেছে। পাহাড়ের গায়ে চাঁদের আলো এখনও পুরোপুরি পড়েনি, অথচ আকাশের কালো বিস্তারে তারাগুলো এমনভাবে জ্বলছিল যেন দূর কোনো অদৃশ্য আগুনের ছাই বাতাসে ছড়িয়ে আছে। শুকনো খাতের পাশে দাঁড়িয়ে লারসেন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। তার ঘোড়াটা পেছনে অস্থিরভাবে পা বদলাচ্ছিল, মাঝে মাঝে নাসারন্ধ্র দিয়ে গরম বাতাস ছাড়ছিল। কিন্তু লারসেন ঘোড়াটার দিকে ফিরল না। তার সমস্ত মনোযোগ ছিল পাহাড়ের ঢালের দিকে, যেখানে কয়েক মুহূর্ত আগে ক্ষীণ একটা আলো জ্বলে উঠেছিল এবং তারপর হঠাৎ নিভে গিয়েছিল।

আলোটা এত ক্ষীণ ছিল যে অন্য কেউ হয়তো সেটাকে চোখের ভুল বলে ধরে নিত। দূরের কোনো পাথরে চাঁদের আলো পড়া, শুকনো ঝোপের ফাঁকে জোনাকির মতো কোনো ক্ষণস্থায়ী জ্যোতি, অথবা কোনো মানুষের হাতে ঢাকা লণ্ঠনের সামান্য প্রতিফলন। কিন্তু লারসেন জানত, সে ভুল দেখেনি। বহু বছর প্রেইরিতে কাটিয়েছে সে। অন্ধকারে মানুষের আলো আর প্রকৃতির আলো আলাদা করে চেনার মতো চোখ তার তৈরি হয়েছে অনেক আগেই। আর যে আলো একবার জ্বলে উঠেই নিভে যায়, সেটাকে সে কখনও অবহেলা করে না।

সে ধীরে ধীরে ঘোড়ার কাছে ফিরে এল। লাগামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঘোড়ার পিঠে উঠল না। বরং লাগাম ধরে পায়ে হেঁটে পাহাড়ের ঢালের দিকে এগোতে লাগল। ঘোড়ার খুরের শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত যায়। পাথরের ওপর লোহার খুরের আঘাত রাতের নিস্তব্ধতায় অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট শোনা যায়। লারসেন জানত, যদি সত্যিই কেউ তাকে নজরে রেখে থাকে, তবে ঘোড়ায় চড়ে ওপরে ওঠা মানে নিজের অবস্থান ঘোষণা করে দেওয়া। সে বরং ঘোড়াটাকে নিচের ছায়ার মধ্যে রেখে নিজেই উঠবে।

ঢালটা খুব খাড়া নয়, কিন্তু মাটি শুকনো এবং আলগা। কোথাও কোথাও ছোট পাথর পায়ের নিচে গড়িয়ে যাচ্ছে। লারসেন প্রতিটি পদক্ষেপ হিসেব করে ফেলছে। পায়ের চাপ যতটা সম্ভব হালকা। শরীরের ভার এমনভাবে রাখছে যাতে পাথর না গড়ায়। মাঝে মাঝে সে থেমে যাচ্ছে, মাথা সামান্য কাত করে চারপাশের শব্দ শুনছে।

কিছু নেই। শুধু বাতাস। দূরের কোনো নিশাচর পাখি একবার ডাকল। তারপর আবার নীরবতা। 

লারসেন আরও ওপরে উঠল। ঢালের মাঝামাঝি গিয়ে সে থামল। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে হাতের তালু দিয়ে ধুলো সরাল। কিছু শুকনো ঘাস চ্যাপ্টা হয়ে আছে। খুব পুরোনো নয়। তার পাশে পাথরের গায়ে সামান্য ঘষার দাগ। কেউ এখানে দাঁড়িয়েছে। তারপর নিচু হয়ে বসেছে অথবা হাঁটু গেড়েছে।

লারসেন চোখ সরু করল। মানুষটা একা ছিল না। তার একটু দূরে আরও দুটো ভাঙা ঘাসের গোছা। কেউ হয়তো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর ঢালের ওপরের দিকে গেছে।

লারসেন আর সময় নষ্ট করল না। সে আরও ওপরে উঠতে লাগল। পাহাড়ের ঢাল যত ওপরে উঠছিল, বাতাস তত ঠান্ডা হচ্ছিল। নিচের প্রেইরি এখন অনেকটা নিচে পড়ে গেছে। দূরে লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চের কিছু আলো ক্ষীণ বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছে। এত দূর থেকে র&#x200d;্যাঞ্চটাকে শান্ত, নিরাপদ একটা জায়গা বলে মনে হয়। কিন্তু লারসেন জানে, সেই শান্তির নিচে এখন এমন একটা বিপদ ঢুকে পড়েছে, যার শিকড় হয়তো বহু বছর আগের।

অবশেষে সে একটা পুরোনো কাঠের আশ্রয় দেখতে পেল। আশ্রয় বলা যায় কি না সন্দেহ। চারদিকে শুকনো কাঠের খুঁটি, এক পাশে কাত হয়ে থাকা দেয়াল, ছাদের অর্ধেক ভেঙে পড়েছে। তবু বোঝা যায়, একসময় এখানে মানুষ থাকত। হয়তো পথিকেরা। হয়তো শিকারি। হয়তো এমন লোকেরা, যারা নিজেদের অস্তিত্ব গোপন রেখে চলত।

লারসেন আশ্রয়ের সামনে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখল। কোনো ঘোড়া নেই। কোনো মানুষ নেই। আগুনের গন্ধ নেই। কিন্তু এখানে কেউ ছিল।

সে ধীরে ধীরে ভাঙা দরজার কাছে গেল। কাঠের দরজাটা অর্ধেক ঝুলছে। বাতাস লাগলে সামান্য নড়ে কড়কড় শব্দ করছে। লারসেন হাত বাড়িয়ে দরজাটা সরাল। ভেতরটা অন্ধকার। সে কোমর থেকে পিস্তল বের করল না। শুধু হাতটা অস্ত্রের কাছে রাখল এবং ভেতরে ঢুকে গেল।

ঘরের মেঝে শুকনো ধুলোয় ঢাকা। এক কোণে পুরোনো খড়ের স্তূপ। দেয়ালের কাঠে পোকায় খাওয়া অসংখ্য ছোট ছিদ্র। ছাদের ভাঙা অংশ দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। বহু বছর ধরে কেউ এখানে নিয়মিত বসবাস করেনি, সেটা পরিষ্কার।

কিন্তু মেঝের ধুলোয় কয়েকটি তাজা চিহ্ন ছিল। লারসেন প্রথমেই সেগুলো দেখল। একজন এখানে দাঁড়িয়েছে। আরেকজন বসেছে। তারপর তার চোখ গিয়ে থামল দেয়ালের পাশে পড়ে থাকা একটা কাপড়ের টুকরোয়। গাঢ় নীল। 
লারসেন নিচু হয়ে সেটা তুলে নিল।

কাপড়টা আগের দিনের পাওয়া টুকরোটার মতোই মোটা। বুনন শক্ত। বয়সের কারণে কাপড়ের কিছু অংশ শক্ত হয়ে গেছে, কিন্তু রঙের গভীর নীল এখনও স্পষ্ট। লারসেন কাপড়টা আঙুলের মধ্যে মুচড়ে দেখল। তারপর নাকের কাছে নিয়ে এল।

ঘোড়ার গন্ধ নেই। ধোঁয়ার গন্ধও নেই। কিন্তু কাপড়ে খুব ক্ষীণ একটা তেলের গন্ধ আছে। পুরোনো অস্ত্রের তেল। তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। সে কাপড়টা পকেটে রাখল। তারপর মেঝের দিকে তাকাল।

একটা খালি কার্তুজ পড়ে আছে। লারসেন সেটা তুলে নিল। আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে দেখল। ধাতব খোসার গায়ে মরচে ধরেছে, কিন্তু সম্পূর্ণ পুরোনো নয়। ক্যালিবারটা দেখে তার মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল।

এটা সাধারণ র&#x200d;্যাঞ্চের রাইফেলের কার্তুজ নয়। এই ধরনের অস্ত্র সে বহু বছর আগে দেখেছে। খুব কাছ থেকে। তার নিজের জীবনের এমন একটা সময়ে, যখন বন্দুকের শব্দ মানেই ছিল বেঁচে থাকা অথবা মরে যাওয়া।

লারসেন কার্তুজটা পকেটে রাখল। তারপর ভাঙা কাঠের একটা বাক্সের অংশ দেখতে পেল। বাক্সটা দেয়ালের পাশে পড়ে আছে। ঢাকনা ভেঙে গেছে। একটা লোহার কবজা এখনও কাঠের সঙ্গে আটকে। লারসেন বাক্সের টুকরোটা তুলে নিল। কাঠের ওপর একটা পুরোনো দাগ রয়েছে। চিহ্ন নয়, যেন কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে একসময় একটা সংখ্যা কাটা হয়েছিল।

সে সংখ্যাটা দেখে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর বাক্সটা নামিয়ে রাখল। ঘরের সবচেয়ে দূরের দেয়ালে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল। চিহ্নটা সেখানে আঁকা। কালো হয়ে যাওয়া কাঠের ওপর। একটা বাঁকানো রেখা, তার ভেতর দিয়ে কাটা সরু দাগ, আর নিচের দিকে অর্ধচন্দ্রের মতো একটা বক্রতা।

লারসেন কয়েক পা এগিয়ে গেল। আঙুল দিয়ে চিহ্নটা ছুঁল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, বহু বছর আগের একটা দরজা আবার খুলে গেছে।

সে তখনও যুবক। পৃথিবীকে অন্য চোখে দেখত। বিশ্বাস করত মানুষের কথা। বিশ্বাস করত বন্ধুত্বের ওপর। কয়েকজন মানুষের সঙ্গে পথ চলেছিল, যাদের সে নিজের জীবনের অংশ বলে মনে করেছিল। তাদের ঘোড়ার জিনে এই চিহ্ন ছিল। তাদের পোশাকে এই গাঢ় নীল কাপড় ছিল। আর তাদের অস্ত্রের বাক্সে এমন কার্তুজ থাকত, যেগুলো দিয়ে রাতের অন্ধকারে মানুষ মারা হয়েছিল।

তারপর এসেছিল সেই রাত। আগুন। গুলির শব্দ। বিশ্বাসঘাতকতা। আর এমন কয়েকজন মানুষের মৃত্যু, যাদের মুখ লারসেন আজও ভুলতে পারেনি।

সে চোখ বন্ধ করল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, আবার সেই রাতের ধোঁয়া নাকে ঢুকছে। কেউ চিৎকার করছে। কেউ ঘোড়া ছুটিয়ে পালাচ্ছে। কেউ পেছন থেকে গুলি চালাচ্ছে। তারপর সবকিছু অন্ধকার।

লারসেন চোখ খুলল। বর্তমান ফিরে এল। সে ধীরে ধীরে দেয়াল থেকে সরে দাঁড়াল। 
এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। যারা র&#x200d;্যাঞ্চে এসেছিল তারা কোনো হঠাৎ তৈরি হওয়া দল নয়। তারা পুরোনো কোনো হিসাবের উত্তরাধিকারী। তাদের হাতে পুরোনো চিহ্ন আছে। পুরোনো অস্ত্রের স্মৃতি আছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, তারা জানে কোথায় কী খুঁজতে হবে।

অর্থাৎ তারা প্রস্তুত হয়ে এসেছে। একদিনে নয়। এক মাসে নয়। বছরের পর বছর ধরে।

লারসেন আশ্রয়ের ভাঙা জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। পাহাড়ের ঢাল অন্ধকারে ডুবে আছে। নিচে তার ঘোড়া দাঁড়িয়ে। তার ওপরে বিশাল আকাশ।

সে ধীরে নিজের পকেট থেকে কালচে ধাতব চাকতিটা বের করল। চাঁদের আলোয় চাকতিটা সামান্য ঝলকে উঠল। চিহ্নটা যেন দেয়ালের চিহ্নের দিকে তাকিয়ে আছে। 
দুটো চিহ্ন পুরোপুরি একই নয়, কিন্তু একই হাতের লেখা বলেই মনে হয়। যেন একটা ছিল মূল, আর অন্যটা তার কোনো প্রতিলিপি। 

লারসেনের মনে হলো, চাকতিটা শুধু কোনো পরিচয়ের চিহ্ন নয়। এটা হয়তো কোনো পুরোনো গোষ্ঠীর পরিচয়। হয়তো কোনো গোপন পথের। হয়তো এমন কোনো সম্পদের, যার জন্য মানুষ মরতে পারে। আর যদি তা-ই হয়, তবে প্রশ্ন একটাই। এত বছর পরে তারা আবার কেন ফিরেছে? 

লারসেন চাকতিটা মুঠোয় চেপে ধরল। ঠিক তখনই খুব ক্ষীণ একটা শব্দ হলো। পাথরের ওপর পাথর ঘষার শব্দ। সে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল। পিস্তল বেরিয়ে এল হাতে। 
দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল। কিছু নেই।

লারসেন ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল। বাইরে মাথা বের না করে প্রথমে নিচের ছায়া দেখল। তারপর শরীরটা সামান্য সরিয়ে পাহাড়ের ঢালের দিকে তাকাল। কেউ নেই।

শুধু একটা ছোট পাথর ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নিচে নেমে গেছে। সে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর পিস্তল কোমরে গুঁজে দিল।

কেউ তাকে দেখছে কি না, সে নিশ্চিত নয়। কিন্তু এখন সে নিশ্চিত, এই জায়গাটা শুধু অতীতের স্মৃতি নয়। কেউ সম্প্রতি এখানে এসেছে। কেউ এই পুরোনো আশ্রয়কে আবার ব্যবহার করছে।

লারসেন ভাঙা কাঠের মেঝেটা আরও একবার পরীক্ষা করল। একটা কোণে ধুলো সরিয়ে ছোট্ট একটা দাগ পেল। যেন ভারী কিছু সেখানে রাখা হয়েছিল। কাঠের ওপর গোলাকার ঘষার চিহ্ন। তার হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে চাকতির দিকে গেল। তারপর সে থেমে গেল। এটা কি কেবল কাকতালীয়? 

লারসেনের মনে প্রথমবার একটা ভয় ঢুকল। নিজের জন্য নয়। মারদেকার জন্য। ছেলেটা এখন র&#x200d;্যাঞ্চে আছে। তার বয়স তেরো পেরিয়েছে। চোখে আগের চেয়ে বেশি সতর্কতা। কানে সামান্য শব্দও এড়িয়ে যায় না। ছুরি হাতে তার দক্ষতা বাড়ছে। কিন্তু সে এখনও জানে না, যে অন্ধকার তাকে ঘিরে আসছে তার গভীরতা কতটা।

আর লারসেন জানে, কিছু সত্যি এমন থাকে, যেগুলো জানা মানেই বিপদের দিকে এক পা এগিয়ে যাওয়া। সে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। নিচে নেমে ঘোড়ার কাছে পৌঁছে আবার একবার পাহাড়ের দিকে তাকাল। কেউ নেই।

কিন্তু এবার তার মনে হলো, অন্ধকারের ভেতর কোথাও চোখ জ্বলছে। সে ঘোড়ায় উঠল। ঘোড়া ঘুরিয়ে ফিরতি পথ ধরলো। আর একবারও পেছনে তাকাল না।

অন্যদিকে, লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে তখন রাত অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। মারদেকা ঘুমায়নি। 
ছেলেটা নিজের ঘরের জানালার পাশে বসে ছিল। তার সামনে ছোট প্রদীপ। প্রদীপের হলুদ আলোয় কালচে চাকতিটা রাখা। মাঝে মাঝে সে সেটার দিকে তাকাচ্ছিল, আবার চোখ বন্ধ করছিল।

স্মৃতি ফিরে আসছিল না। শুধু কিছু অস্পষ্ট ছবি। একটা কাঠের দেয়াল। একটা পুরোনো দরজা। দরজার পাশে ঝোলানো গাঢ় নীল কাপড়। আর সেই চিহ্ন।

সে জানত না ছবিগুলো সত্যি, নাকি তার কল্পনা। কিন্তু একটা ব্যাপার তাকে অস্বস্তিতে ফেলছিল। সে চিহ্নটা শুধু দেখেনি। কখনও যেন ছুঁয়েছিল।

তারপর দরজায় হালকা শব্দ হলো। মারদেকা দ্রুত চাকতিটা হাতে তুলে নিল। 

দরজা খুলে বাড ভেতরে ঢুকল। কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

মারদেকা চাকতিটা হাতে রেখেই বলল, “আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব।”

বাড চুপ করে রইল।

মারদেকা এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। “লারসেন আমাকে এখানে কেন এনেছিলেন?”

বাডের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না। সে জানালার বাইরে তাকাল। দূরে পাহারার আগুন জ্বলছে। রাতের বাতাসে তার ধোঁয়া বাঁকা হয়ে উঠছে। র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশে লোকজনের চলাফেরা কমে এসেছে। মাঝে মাঝে ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে ধীরে বলল, “তোমার এখানে থাকার কারণ তোমার নিজের ভবিষ্যৎ।”

মারদেকা মাথা নাড়ল। “এটা উত্তর নয়।”

বাড তার দিকে তাকাল। ছেলেটার চোখে এবার এমন দৃঢ়তা যে বাড কিছুক্ষণ কথা খুঁজে পেল না। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “সবকিছু জানা আর সবকিছু বলা এক জিনিস নয়।”

মারদেকার চোখ সরু হয়ে এল। “তাহলে আপনি জানেন।”

বাড কোনো উত্তর দিল না। এই নীরবতাই মারদেকার কাছে যথেষ্ট ছিল।

সে চাকতিটা মুঠোয় চেপে ধরল। তারপর ধীরে বলল, “লারসেন কি আমার জন্য ভয় পান?”

বাড এবার ছেলেটার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার চোখে এমন একটা দৃষ্টি ফুটে উঠল, যা মারদেকা আগে দেখেনি। “লারসেন ভয় পায় না।” কিছুক্ষণ থেমে যোগ করলো, “কিন্তু যাকে সে নিজের মানুষ ভাবে, তাকে হারানোর ভয় সে বোঝে।”

মারদেকা আর কিছু বলল না। 

বাড দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খোলার আগে সে একবার পেছনে তাকাল। 
“ঘুমাও।”

মারদেকা শান্ত গলায় বলল, “লারসেন কোথায় গেছেন?”

বাডের হাত দরজার হাতলে স্থির হয়ে গেল। সে উত্তর দিল না। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

মারদেকা একা হয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দূরের অন্ধকারে চোখ রাখতেই তার মনে হলো, লারসেন যে কারণে বাইরে গেছে, সেই কারণের সঙ্গে তার নিজের অতীতও জড়িয়ে আছে। 

রাত আরও গভীর হলো। অনেক পরে দূরে ঘোড়ার ক্ষীণ শব্দ শোনা গেল। মারদেকা জানালার পাশে দাঁড়িয়েই রইল। 

ভোর হওয়ার কিছু আগে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরল। আকাশ তখন কালচে নীল। পূর্ব দিগন্তে আলো এখনও ওঠেনি। র&#x200d;্যাঞ্চের পাহারার আগুন প্রায় নিভে এসেছে। ঘোড়ার খুরের শব্দে বাড বাইরে বেরিয়ে এল।

লারসেন ঘোড়া থেকে নামল। তার মুখে সারারাতের ক্লান্তি নেই। বরং অদ্ভুত এক কঠিন স্থিরতা। 

বাড এগিয়ে এসে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল।

লারসেন হাত তুলে তাকে থামাল। “ভেতরে চলো।”

দুজন ঘরে ঢুকল। দরজা বন্ধ হওয়ার পর লারসেন কোমরের চামড়ার ব্যাগ খুলল। তার ভেতর থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করল। কাগজটা এত পুরোনো যে ভাঁজের জায়গাগুলো প্রায় ছিঁড়ে গেছে। এক পাশে বাদামি দাগ। অন্য পাশে মোমের পুরোনো সিলের চিহ্ন।

বাড কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল। লারসেন সেটা টেবিলের ওপর মেলে ধরল। কাগজের মাঝখানে একটা নাম লেখা। একটা নাম, যেটা বহু বছর ধরে মৃত মানুষের তালিকায় ছিল।

বাডের মুখের রঙ বদলে গেল। সে খুব নিচু গলায় বলল, “এটা অসম্ভব।”

লারসেন ধীরে মাথা তুলল। “অসম্ভব জিনিসই কখনও কখনও সবচেয়ে বেশি সময় বেঁচে থাকে।” 

বাড আবার নামটার দিকে তাকাল। 

লারসেন জানালার বাইরে ভোরের প্রথম আলো ফুটতে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “লোকটা বেঁচে আছে।”

লারসেনের কথাটা ঘরের বাতাসে কিছুক্ষণ ঝুলে রইল। বাইরে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে পাহাড়ের কালো রেখাগুলোকে ফিকে করে আনছে। রাতের শেষ প্রহরের ঠান্ডা এখনও জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছিল, অথচ বাড হিগিন্সের কপালে হঠাৎ ঘামের চিকচিকে বিন্দু দেখা দিল। টেবিলের ওপর মেলে রাখা পুরোনো কাগজটার দিকে সে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। কাগজের মাঝখানে যে নামটি লেখা, সেটাকে সে চিনত না এমন নয়। নামটি সে প্রথম শুনেছিল বহু বছর আগে, কিন্তু কখনও লারসেনের মুখ থেকে নয়। অন্য লোকের মুখে, অর্ধেক কথায়, থেমে যাওয়া গুজবে, কোনো পুরোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অস্পষ্ট ইঙ্গিতে। তারপর সময়ের সঙ্গে নামটি মুছে গিয়েছিল। অন্তত বাড তাই ভেবেছিল। এখন বুঝতে পারছে, কিছু নাম মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে গেলেও তাদের ছায়া মুছে যায় না।

বাড ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ কাগজ থেকে সরল না। লারসেন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার পিঠের ওপর ভোরের ম্লান আলো এসে পড়েছে। চওড়া কাঁধ, স্থির ভঙ্গি, মাথার সামান্য নত রেখা দেখে মনে হচ্ছিল, বহু বছরের ক্লান্তি সত্ত্বেও মানুষটা যেন কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বাড তাকে বহু বছর ধরে চেনে। এত বছর যে, লারসেনের মুখের সামান্য পরিবর্তন থেকেও তার মনের অবস্থা আন্দাজ করতে পারে। আজকের মুখ সে আগে দেখেছে। বহু বছর আগে, যখন কোনো পুরোনো ক্ষত আবার রক্ত ঝরাতে শুরু করেছিল।

বাডের মনে পড়ে গেল, এক শীতের রাতে সে লারসেনকে প্রথমবার সেই অদ্ভুত চিহ্নের কথা জিজ্ঞেস করেছিল। র&#x200d;্যাঞ্চের উত্তরের বেড়ার কাছে একটা অচেনা ঘোড়ার দাগ পাওয়া গিয়েছিল। লারসেন দাগটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। বাড তখন জিজ্ঞেস করেছিল, ব্যাপারটা কী। লারসেন কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু পাহারা বাড়াতে বলেছিল। তার কয়েক বছর পর আবার একই ধরনের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল এক মৃত ঘোড়ার জিনে। সেবারও বাড প্রশ্ন করেছিল। লারসেন শুধু তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, পুরোনো ব্যাপার। তারপর আর কিছু বলেনি।

বাড কখনও জোর করেনি। কারণ সে জানত, লারসেনের নীরবতার পেছনে কারণ আছে। আর বিশ্বস্ত মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কখনও কখনও প্রশ্নের উত্তর আদায় করা নয়, বরং প্রয়োজনের সময় নিজের লোকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা।

আজ সেই পুরোনো নীরবতা যেন প্রথমবার অর্থ পেল। বাড নিচু গলায় বলল, “আপনি এত বছর ধরে এই নামটা জানতেন?”

লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়েই রইল। পাহাড়ের ওপরে সূর্যের আলো এখনও ওঠেনি, কিন্তু আকাশের রং বদলে গেছে। কালোর জায়গায় নীল, নীলের নিচে ধূসর, আর তার নিচে খুব ক্ষীণ লাল রেখা। নতুন দিনের আগমন যেন এই র&#x200d;্যাঞ্চের ওপরও কোনো অদৃশ্য সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। “জানতাম।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, “আপনি কি নিশ্চিত, লোকটা সেই একই মানুষ?”

লারসেন এবার ঘুরে দাঁড়াল। “নিশ্চিত না হলে তোমাকে বলতাম না।”

বাড আর কিছু বলল না। তার চোখ আবার কাগজের দিকে চলে গেল। এত বছর ধরে সে ভেবেছে, লারসেনের অতীতের শত্রুরা হয়তো একে একে হারিয়ে গেছে। কেউ মরেছে, কেউ অন্য রাজ্যে চলে গেছে, কেউ নিজের নাম বদলে অদৃশ্য হয়েছে। কিন্তু যদি এই মানুষটি বেঁচে থাকে, তাহলে আরও একটা প্রশ্ন সামনে আসে। সে এত বছর কোথায় ছিল? কেন এখন ফিরে এসেছে? আর কেন লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চের আশেপাশে আবার সেই পুরোনো চিহ্নের ছায়া দেখা যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তার কাছে নেই।

কিন্তু লারসেনের চোখে যে উত্তর খোঁজার তাগিদ দেখা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যায়, মানুষটা নিজেও সবকিছু জানে না। তার জানা জিনিস আর অজানা জিনিসের মাঝখানে যেন একটা গভীর অন্ধকার পড়ে আছে। সেই অন্ধকারের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বহু বছরের পুরোনো কোনো ঘটনা, এমন কিছু যার শেষ এখনও হয়নি।

লারসেন কাগজটা ভাঁজ করে বুকের পকেটে রাখল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা কালচে ধাতব চাকতিটা তুলে নিল। ভোরের আলোয় চাকতিটির খোদাই করা চিহ্নটি আরও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ধাতুর ধার বহুদিনের ঘর্ষণে মসৃণ হয়ে গেছে, কিন্তু মাঝখানের চিহ্নটি এখনও তীক্ষ্ণ। লারসেন চাকতিটাকে হাতের তালুর ওপর রেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

এই চাকতিটি সে প্রথম পেয়েছিল সেই রাতের হামলার আগে। আগের ঘটনাটা অন্যরকম ছিল। কয়েকদিন আগে আস্তাবলে একটা ঘোড়া চুরি হয়েছিল। চোর ঘোড়াটাকে নিয়ে পালানোর সময় কোনো এক মুহূর্তে এই একই ধরনের আরেকটি চাকতি ফেলে গিয়েছিল। লারসেন সেটি খুঁজে পেয়েছিল ঘোড়ার খোঁয়াড়ের কাছে। চাকতিটা হাতে নেওয়ার পর সে চিহ্নটি চিনেছিল, কিন্তু তখনও সে নিশ্চিত ছিল না, পুরোনো স্মৃতির কোন দরজা এই চিহ্ন খুলতে চাইছে। সে চাকতিটা নিজের কাছে রেখেছিল কিছুদিন। তারপর একসময় সেটি মারদেকার হাতে তুলে দিয়েছিল, কারণ ছেলেটাকে সে বলেছিল জিনিসটা যত্ন করে রাখতে। এর বেশি কিছু বলেনি।

কিন্তু সেই রাতের হামলার পর ঘটনাটা বদলে যায়। অন্ধকারে একজন আস্তাবলে ঢুকেছিল। নিঃশব্দে। এমনভাবে, যেন জায়গাটা সে আগে থেকেই চেনে। লারসেনের ওপর গুলি চালানোর চেষ্টা হয়েছিল। গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল, আর আক্রমণকারী পালিয়ে যাওয়ার সময় ইচ্ছে করেই আরেকটি চাকতি সেখানে ফেলে গিয়েছিল।

সেই দ্বিতীয় চাকতিটাই এখন লারসেনের হাতে। সেদিন রাতেই সে বুঝেছিল, চাকতিটা ভুল করে পড়ে যায়নি। একজন অভিজ্ঞ লোক কখনও পালানোর সময় এমন জিনিস ফেলে যায় না, যদি না তার ফেলে যাওয়ার কারণ থাকে। আক্রমণকারী চাইলে চাকতিটা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারত। তার কাছে সময়ও ছিল। অথচ সে সেটি রেখে গেছে এমন জায়গায়, যেখানে লারসেনের চোখে পড়বেই।

এটা ছিল একটা বার্তা। হয়তো হুমকি। হয়তো পরিচয়ের ঘোষণা। হয়তো পুরোনো কোনো দরজা আবার খুলে দেওয়ার ইচ্ছাকৃত সংকেত। আর চিহ্নটিও সে চিনেছিল। 
কিন্তু তার অর্থ বাডকে বলেনি।

চাকতিটা হাতের মধ্যে ঘুরাতে ঘুরাতে লারসেনের চোখের সামনে সেই রাতের আস্তাবলটা আবার ভেসে উঠল। অন্ধকার, ঘোড়ার আতঙ্কিত শব্দ, বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধ, কাঠের খুঁটির আড়াল থেকে আসা গুলির শব্দ, তারপর ছুটে পালিয়ে যাওয়া মানুষের অস্পষ্ট ছায়া। লোকটার মুখ সে দেখতে পায়নি। কিন্তু তার চলার ভঙ্গি, গুলির পর মুহূর্তের দ্বিধা, আর চাকতিটা রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, সবকিছুই যেন কোনো পুরোনো প্রশিক্ষণের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল।

তারপর গত রাতের পাহাড়ি আশ্রয়ে আবার সেই চিহ্ন দেখা গেছে। এবার ব্যাপারটা আর কেবল স্মৃতি নয়। এটা একটা নিশ্চিত প্রমাণ যে পুরোনো চিহ্নটি আবার ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু লারসেনের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল অন্য জায়গায়।

ওরা যদি সত্যিই চাকতিটা চায়, তাহলে দ্বিতীয় চাকতিটা রেখে গেল কেন? উত্তরটা হয়তো সেখানেই লুকিয়ে আছে। ওরা হয়তো চাকতিটা খুঁজছে না। ওরা খুঁজছে সেই জিনিস, যার সঙ্গে চাকতিটির সম্পর্ক।

চাকতিটা তাদের কাছে চাবি নয়, বরং চাবির চিহ্ন। আর সেই চিহ্ন দেখিয়ে কেউ লারসেনকে জানিয়ে দিয়েছে, যারা একসময় অদৃশ্য হয়েছিল তারা আবার ফিরে এসেছে। প্রথম চাকতিটা ঘোড়া চুরির সময় দুর্ঘটনাবশত পড়ে গেলেও দ্বিতীয় চাকতিটা ছিল ইচ্ছাকৃত। সেই দ্বিতীয় চাকতিটা যেন প্রথমটির অস্তিত্বকে অর্থপূর্ণ করে তুলেছে। লারসেন ধীরে চাকতিটা মুঠোয় চেপে ধরল। 

বাড তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে কিছুক্ষণ পরে বলল, “এই চিহ্নের সঙ্গে ওই নামের সম্পর্ক আছে?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। চাকতিটা সে ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে দেখল। তারপর টেবিলের ওপর রাখল। “সম্ভবত।”

বাডের মুখে চিন্তার রেখা গভীর হলো। সে চাকতিটার দিকে তাকাল, কিন্তু হাত বাড়াল না। লারসেনের হাতে থাকা জিনিসে অনুমতি ছাড়া হাত দেওয়া তার স্বভাব নয়। “ওরা কি এটা খুঁজছে?”

লারসেন কিছুক্ষণ নীরব থাকল। “চাকতিটা নয়।”

বাড ভ্রু কুঁচকাল। 

লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “চাকতিটা রেখে যাওয়ার কারণটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

বাড বুঝতে পারল না। কিন্তু লারসেনের মুখ দেখে আর প্রশ্ন করল না।

বাইরে তখন র&#x200d;্যাঞ্চের প্রথম মানুষজন জেগে উঠছে। দূরে ঘোড়ার নড়াচড়া, আস্তাবলের দরজা খোলার শব্দ, পাহারার আগুনে কাঠ ফেটে যাওয়ার শব্দ, সব মিলিয়ে নতুন দিনের স্বাভাবিক ব্যস্ততা শুরু হচ্ছে। অথচ এই ঘরের ভেতর সময় যেন এখনও রাতেই আটকে আছে।

বাড ধীরে বলল, “তাহলে তারা কী চায়?”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। “সেটাই জানতে হবে।”

“আপনি কি আগে থেকেই জানতেন, তারা আবার আসতে পারে?”

লারসেন মাথা নাড়ল। “আসবে, সেটা জানতাম না।”
 
একটু থেমে সে বলল, “কিন্তু একদিন পুরোনো হিসাব ফিরে আসতে পারে, সেটা কখনও ভুলিনি।”

বাড মাথা নিচু করল। এটাই হয়তো লারসেন এত বছর ধরে বলতে না চাওয়া কথার সবচেয়ে কাছাকাছি উত্তর। সে জানত, লারসেনের জীবনে এমন কিছু ঘটেছিল যার ছায়া কখনও পুরোপুরি সরে যায়নি। এখন সেই ছায়া আবার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছে।

কিন্তু লারসেনের হাতে থাকা দ্বিতীয় চাকতিটা যেন তাকে আরও একটি কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। এবার যারা এসেছে তারা শুধু অতীতের কথা মনে করিয়ে দিতে আসেনি। তারা চায় লারসেন জানুক, তারা ফিরে এসেছে।

বাড দরজার দিকে এগোতে যাচ্ছিল। ঠিক তখন লারসেন তাকে থামাল। “বাড।”

বাড ফিরে তাকাল।

“মারদেকাকে এখন কিছু বলবে না।”

বাডের চোখে সামান্য বিস্ময় ফুটে উঠল। তারপর সে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। “জি।”

একটু থেমে সে বলল, “কিন্তু ছেলেটা বেশিদিন কিছু না জেনে থাকবে না।”

লারসেনের মুখে কঠিন এক ছায়া নেমে এল। “আমি জানি।”

এই কথার পর আর কিছু বলার ছিল না।

মারদেকা যে অন্য ছেলেদের মতো নয়, সেটা বাড অনেক আগেই বুঝেছে। বয়স তেরোর শেষ দিকে, কিন্তু চারপাশের পৃথিবীকে দেখার তার চোখ বয়সের চেয়ে অনেক পুরোনো। সে শুধু দেখে না, মিলিয়ে দেখে। পায়ের ছাপের সঙ্গে মানুষের ওজন, ঘোড়ার খুরের দাগের সঙ্গে তার গতি, বাতাসের গন্ধের সঙ্গে আগন্তুকের উপস্থিতি, ভাঙা ডালের সঙ্গে চলার দিক, সবকিছুকে সে একসঙ্গে বিচার করে। লারসেন তাকে এসব শেখাচ্ছে বহুদিন ধরে। এখন সেই শিক্ষাই লারসেনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ শত্রু যদি ছেলেটার সামনে এসে পড়ে, মারদেকা শুধু নিজের চোখে দেখা জিনিসের ওপর নির্ভর করবে না। সে প্রশ্ন করবে, খুঁজবে, অনুসরণ করবে, এবং একসময় এমন জায়গায় পৌঁছে যাবে যেখানে তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

বাড দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।

লারসেন কিছুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে রইল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা দ্বিতীয় চাকতিটির দিকে আবার তাকাল। তার মনে হলো, ছোট্ট ধাতব টুকরোটার ওজন যেন হঠাৎ অনেক বেড়ে গেছে। আর একটা ব্যাপার, প্রথম চাকতিটা যেটা নিজেই সেদিন মারদেকাকে রাখতে দিয়েছিল। তখন সে ভাবেনি, একদিন এই দুই চাকতির অস্তিত্ব একই রহস্যের দুই প্রান্তকে জুড়ে দেবে।

সকালের খাবারের সময় র&#x200d;্যাঞ্চের চেহারা অন্য দিনের মতোই ছিল। বৃদ্ধ ইলাই আগুনের ওপর বড় লোহার পাত্র বসিয়ে মাংস, আলু আর পেঁয়াজ নেড়ে দিচ্ছিল। ধোঁয়ার সঙ্গে মশলার গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল। 

মারদেকা খাবারের সামনে বসে ছিল, কিন্তু তার মন খাবারে ছিল না। তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল পাহাড়ের দিকে। বৃদ্ধ ইলাই দূর থেকেই বিষয়টা লক্ষ্য করেছিল। বহু বছর রান্নাঘরের আগুনের পাশে বসে মানুষের মুখ দেখার অভ্যাস তার। ক্ষুধার্ত মানুষ খাবারের দিকে তাকায়, চিন্তিত মানুষ খাবারের মধ্য দিয়েও অন্য কিছু দেখতে থাকে। মারদেকার চোখে দ্বিতীয়টাই ছিল।

ইলাই কিছু না বলে তার সামনে আরও এক টুকরো গরম রুটি রেখে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর মারদেকা নিচু গলায় বলল, “ইলাই, রাতে লারসেন ফিরেছিল কখন?”

বৃদ্ধ লোকটি পেছন ফিরে তাকাল। “ভোরের আগে।”

মারদেকা মাথা নেড়ে আবার পাহাড়ের দিকে তাকাল। তার মুখে আর কোনো প্রশ্ন এল না। কিন্তু চোখে প্রশ্ন আরও গভীর হলো। সে জানত লারসেন বাইরে গিয়েছিল। কিন্তু সে জানত না, কেন গিয়েছিল। আর এই না-জানাটাই তার ভেতরের অস্বস্তিকে বাড়িয়ে তুলছিল।

কিছুক্ষণ পর বাড এসে তার পাশে বসল। আগুনের শিখা দুজনের মুখে ওঠানামা করছিল। কিছু সময় তারা দুজনেই চুপ করে রইল। রান্নাঘরের পাত্রে ফুটতে থাকা ঝোলের শব্দ আর দূরের ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি ছাড়া কাছাকাছি আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না।

মারদেকা আগুনের দিকে তাকিয়েই নিচু গলায় বলল, “লারসেন আমাকে বলেছিলেন, তিনি বাইরে যাচ্ছেন। কিন্তু কোথায় যাচ্ছেন, সেটা বলেননি।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

মারদেকা এবার তার দিকে তাকাল। “আপনি জানেন তিনি কোথায় গিয়েছিলেন?”

বাড সরাসরি উত্তর দিল না। “যতটুকু জানি, তার সবটা বলার সময় এখনও আসেনি।”

মারদেকার চোখ সরু হয়ে এল। “তাহলে সত্যিই কিছু একটা হয়েছে।”

বাড তার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটার চোখে যে আগ্রহ, সেটা নিছক কৌতূহল নয়। সেখানে সতর্কতা আছে। সে বুঝতে চাইছে, তার চারপাশে কী বদলে গেছে। “সব পুরোনো ব্যাপার জানার সময় এখনো আসেনি, মারদেকা।”

মারদেকা আর প্রশ্ন করল না। সে জানে, বাডকে চাপ দিয়ে উত্তর বের করা যাবে না। কিন্তু কথাগুলো সে মনে রাখল। নিজের মতো করে জোড়া লাগাতে শুরু করল রাতের শব্দ, লারসেনের ফিরে আসার সময়, তার মুখের কঠোরতা, আর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকার ভঙ্গি।

বাডের মনে হলো, ছেলেটাকে কিছু না বলা হয়তো তাকে রক্ষা করছে না। বরং অন্ধকারের দিকে নিজের পথ নিজে খুঁজে নেওয়ার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। 
তবু এখনই সব বলা যাবে না। কারণ এটা হয়তো তাদের সবার নিরাপত্তার ব্যাপার।

দুপুরের দিকে র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম প্রান্তে হ্যাঙ্ক ডসন অদ্ভুত ঘোড়ার দাগ দেখতে পেল। খবর পেয়ে লারসেন সেখানে গেল। শুকনো মাটিতে খুরের চাপ স্পষ্ট ছিল। দুটো ঘোড়া পাশাপাশি এসেছিল। কিছু দূর গিয়ে তাদের পথ আলাদা হয়েছে। একজন পাহাড়ের দিকে গেছে, অন্যজন দক্ষিণের দিকে।

লারসেন হাঁটু গেড়ে মাটির দাগ পরীক্ষা করল। খুরের গভীরতা, পায়ের দূরত্ব, মাটির ভাঙন, সবকিছু সে খুঁটিয়ে দেখল। ঘোড়াগুলো খুব দ্রুত আসেনি। বরং সতর্কভাবে এগিয়েছে। যারা ঘোড়ায় ছিল, তারা পথ চিনত। তারা জানত কোথায় মাটি শক্ত, কোথায় নরম, কোথায় খুরের দাগ সহজে চোখে পড়বে না।

লারসেন একটা ছোট পাথর উল্টে দিল। পাথরের নিচে চাপা পড়ে ছিল আধখাওয়া সিগারেটের টুকরো। সে সেটা তুলে নিল। সস্তা তামাক। কিন্তু তামাকের সঙ্গে মিশে থাকা অন্য একটা গন্ধ তার নাকে এসে লাগল। বহু বছর আগে এমন গন্ধ সে পেয়েছিল। এমন মানুষের কাছ থেকে, যাদের নাম সে আর উচ্চারণ করতে চায়নি।

হ্যাঙ্ক তার দিকে তাকিয়ে ছিল। “কিছু পেয়েছেন?”

লারসেন সিগারেটের টুকরোটা পকেটে রেখে উঠে দাঁড়াল। “ওরা খুব কাছে এসেছিল।”

হ্যাঙ্কের মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে আর প্রশ্ন করল না।

সন্ধ্যা নামার সময় র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর অস্বাভাবিক শান্তি নেমে এল। দিনের আলো পাহাড়ের পেছনে ডুবে গেল। গবাদি পশুগুলোকে ঘেরের মধ্যে ঢোকানো হলো। ঘোড়াগুলোকে শেষবারের মতো পানি দেওয়া হলো। পাহারার লোকেরা নিজেদের অবস্থান নিল। ইলাই রান্নাঘরে রাতের খাবারের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। আগুনের আলো আর ধোঁয়ার গন্ধ চারপাশের অন্ধকারে মিশে গেল।

লারসেন নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। দিনের আলোয় যে পাহাড় দূর থেকে নিস্তব্ধ মনে হয়, রাত নামলে সেটাই যেন অন্য রূপ নেয়। কালো ঢাল, পাথরের ছায়া, ঝোপের ফাঁকে জমে থাকা অন্ধকার। সেই অন্ধকারের কোথাও মানুষ আছে কি না বোঝার উপায় নেই।

কিন্তু লারসেন জানে, কেউ আছে। তার চোখ হঠাৎ র&#x200d;্যাঞ্চের পেছনের দিকে গেল। 
মারদেকা সেখানে দাঁড়িয়ে। হাতে ছুরি। চোখ পাহাড়ের দিকে।

লারসেন কিছুক্ষণ তাকে দেখল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। 

মারদেকা ফিরে তাকাল না। কিছুক্ষণ পর সে বলল, “ওরা এখানে আছে।”

লারসেন থেমে গেল। “কাদের কথা বলছ?”

মারদেকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়েই বলল, “যারা আপনাকে খুঁজছে।”

লারসেনের চোখ সরু হয়ে এল। ছেলেটা অনুমান করছে। কিন্তু সেই অনুমানের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। 

মারদেকা এবার তার দিকে তাকাল। “আপনি আমাকে সত্যিটা বলবেন না, তাই তো?”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। “সব সত্যি একসঙ্গে জানা ভালো নয়।”

মারদেকা মাথা নেড়ে নিল। “আমি জানি।” তারপর আবার পাহাড়ের দিকে তাকাল। তার চোখে হতাশা ছিল না। ছিল অপেক্ষা।

লারসেন সেই চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, ছেলেটাকে আর দূরে রেখে নিরাপদ রাখা যাবে না। বিপদ যখন দরজার বাইরে এসে দাঁড়ায়, তখন শুধু দরজা বন্ধ করে রাখা যায় না। একদিন তাকে জানতেই হয়, দরজার ওপারে কী আছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/266125/</link>
				<pubDate>Thu, 27 Aug 2026 04:55:56 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–উনিশ<br />
রাত তখন আরও গভীর হয়ে উঠেছে। পাহাড়ের গায়ে চাঁদের আলো এখনও পুরোপুরি পড়েনি, অথচ আকাশের কালো বিস্তারে তারাগুলো এমনভাবে জ্বলছিল যেন দূর কোনো অদৃশ্য আগুনের ছাই বাতাসে ছড়িয়ে আছে। শুকনো খাতের পাশে দাঁড়িয়ে লারসেন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। তার ঘোড়াটা পেছনে অস্থিরভাবে পা বদলাচ্ছিল, মাঝে মাঝে নাসা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-266125"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/266125/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>7</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">ce24cd5ee2fd698da1ca1deec1a1e8f4</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–আঠারো
পরদিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল, কিন্তু লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে যারা ছিল তারা জানত, আগের রাতের পর থেকে কিছুই আর পুরোপুরি আগের মতো নেই। সূর্য ওঠার আগেই পূর্ব দিগন্তে ফ্যাকাশে আলো জমেছিল। প্রেইরির ওপর পাতলা কুয়াশার মতো ঠান্ডা বাতাস ভেসে বেড়াচ্ছিল। শুকনো ঘাসের মাথাগুলো শিশিরে ভিজে ছিল, আর দূরের পাহাড়ের গায়ে রাতের শেষ ছায়া তখনও আটকে আছে। আস্তাবলের ভেতর ঘোড়াগুলো ধীরে ধীরে নড়াচড়া শুরু করেছে। কোনোটা খুর দিয়ে মাটিতে ঠুকছে, কোনোটা মাথা ঝাঁকাচ্ছে, আবার কোনোটা নাক দিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে খড়ের গন্ধের সঙ্গে নিজের উষ্ণ নিঃশ্বাস মিশিয়ে দিচ্ছে। 

বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, র&#x200d;্যাঞ্চের জীবন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছে। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার নিচে একটা চাপা সতর্কতা জমে আছে। লোকেরা কথা বলছে নিচু গলায়। কেউ দূরের পাহাড়ের দিকে তাকালে একটু বেশি সময় তাকিয়ে থাকছে। উত্তর আর পশ্চিমের বেড়ার কাছে পাহারা আগের চেয়ে ঘন। আর প্রত্যেকের মনে একই প্রশ্ন, যারা রাতের অন্ধকারে এসেছিল তারা কি সত্যিই চলে গেছে?

লারসেন ভোরের আলো ফুটতেই ঘর থেকে বের হয়েছিল। তার হাতে রাইফেল ছিল না। কোমরে পিস্তল আর ছুরিটা ছিল, এই দুটোই যথেষ্ট। সে উঠোন পেরিয়ে প্রথমে উত্তর দিকের বেড়ার কাছে গেল। রাতের শিশিরে মাটি এখনও নরম। আগের দিনের পদচিহ্নের অনেকটাই বাতাস আর মানুষের চলাফেরায় নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু কিছু জায়গায় চিহ্ন এখনও টিকে আছে। লারসেন নিচু হয়ে একটা দাগ দেখল। আঙুল দিয়ে ছুঁল না। শুধু চোখ দিয়ে মাপল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দূরের প্রেইরির দিকে তাকাল। সেখানে কিছুই নেই। কোনো মানুষ নেই। কোনো ঘোড়া নেই। শুধু বাতাসে ঘাসের ঢেউ।

বাড একটু পরে তার কাছে এসে দাঁড়াল। হাতে কফির ধোঁয়া ওঠা কাপ। কয়েক মুহূর্ত সে কিছু না বলে লারসেনের সঙ্গে একই দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “রাতটা শান্ত ছিল।”

লারসেন উত্তর দিল, “শান্ত রাত মানেই সবসময় নিরাপদ নয়।”

বাড কাপ থেকে এক চুমুক নিয়ে বলল, “আমি জানি।”

তারপর আর কথা হলো না। দুজনের মধ্যে এই নীরবতাটাই বহু বছরের পরিচয়ের ফল। একে অন্যকে সব কথা বলতে হয় না। একজনের চোখের পরিবর্তন অন্যজন বুঝে নেয়। 

লারসেন পশ্চিমের দিকে হাঁটতে শুরু করল। বাডও পেছনে গেল। গতকাল যেখানে কাপড়ের টুকরোটা পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে এসে লারসেন থামল। মাটির ওপর রাতের বাতাস অনেক চিহ্ন মুছে দিয়েছে। তবু কয়েকটি ঘাস এখনও ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। একটা জায়গায় মাটি একটু উঁচু হয়ে আছে। আর সেখানেই গতকাল পাওয়া গিয়েছিল কাপড়ের টুকরোটা।

লারসেন কিছুক্ষণ জায়গাটা পরীক্ষা করল। তার চোখে সেই পুরোনো শিকারির দৃষ্টি ফিরে এসেছে। কোনো কিছুই তার কাছে শুধু একটা দাগ নয়। প্রতিটি দাগের পেছনে একটা মানুষ। আর মানুষের পেছনে থাকে উদ্দেশ্য।

সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ওরা এখানে দাঁড়িয়েছিল।”

বাড চারপাশে তাকাল। “কীভাবে বুঝলেন?”

“ঘাসের মাথা ভাঙার ধরন। একজন দাঁড়িয়েছিল, অন্যজন ঘোড়ার কাছে ছিল।”

বাড নিচু হয়ে দেখল। তারপর বলল, “আপনি মনে করছেন তারা দুজন ছিল?”

লারসেন উত্তর দিল না। সে আরও পশ্চিমে তাকাল। “আমি মনে করছি, যারা এসেছিল তাদের সংখ্যা আমরা এখনও জানি না।”

এই কথাটা বাডকে কিছুক্ষণ চুপ করিয়ে দিল। রাতের হামলার সময় অন্ধকার, গুলির শব্দ আর ঘোড়ার ছুটে চলা সবকিছুকে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছিল যে কয়জন লোক ছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায়নি। কেউ একজন গুলি চালিয়েছিল। কেউ ঘোড়া নিয়ে পালিয়েছিল। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সবাই চোখের সামনে ছিল।

লারসেন মাটির ওপর একটা সরু দাগের দিকে তাকিয়ে বলল, “এখান থেকে পশ্চিমে যাওয়ার একটা পথ আছে।”

বাড বলল, “ঘোড়ার?”

“হ্যাঁ। কিন্তু ওরা সরাসরি যায়নি।”

“কেন?”

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “কারণ তারা চায়নি কেউ তাদের পথ সহজে অনুসরণ করুক।”

বাড ধীরে মাথা নেড়ে বুঝে নিল। দুজন ফিরে আসতে শুরু করল। 

উঠোনের কাছে এসে বাড হঠাৎ বলল, “মারদেকা ভোর হওয়ার আগেই উঠে গেছে।”

লারসেনের মুখে খুব সামান্য পরিবর্তন হলো। “কোথায়?”

“আস্তাবলে। ঘোড়াগুলো দেখছিল।”

লারসেন আর কিছু না বলে সেদিকে হাঁটল।

আস্তাবলের ভেতরে তখন সকালের আলো পুরোপুরি ঢোকেনি। কাঠের ফাঁক দিয়ে সূর্যের সরু রেখা মেঝেতে পড়েছে। খড়ের গন্ধ, ঘোড়ার উষ্ণ শরীরের গন্ধ আর পুরোনো চামড়ার গন্ধে জায়গাটা ভারী হয়ে আছে। মারদেকা একটা বাদামি ঘোড়ার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। তার চোখে ঘুমের কোনো চিহ্ন নেই। আগের রাতের ক্লান্তি শরীরে থাকলেও মন যেন আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে।

লারসেন দরজায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকে দেখল।

মারদেকা ঘুরে তাকিয়ে বলল, “ওটা আজ অন্যরকম আচরণ করছে।”

লারসেন ঘোড়াটার দিকে তাকাল। “কীভাবে?”

“বারবার পশ্চিমের দিকে তাকাচ্ছে।”

লারসেনের চোখ সঙ্গে সঙ্গে বাইরে চলে গেল। “তুমি কি কিছু দেখেছ?”

“না।”

“তাহলে বললে কেন?”

মারদেকা একটু থেমে বলল, “ওর কান বারবার ওই দিকে যাচ্ছে।”

লারসেন ঘোড়াটার কান লক্ষ্য করল। সত্যিই প্রাণীটা মাঝেমধ্যে মাথা ঘুরিয়ে পশ্চিমের দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।

লারসেন তার কাছে গিয়ে ঘোড়াটার ঘাড়ে হাত রাখল। “প্রাণী অনেক সময় মানুষের আগে বিপদ টের পায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রতিবার বিপদ থাকবে।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

তারপর লারসেনের চোখ মারদেকার কোমরের দিকে গেল। সেখানে ছোট একটা চামড়ার খাপ ঝুলছে। “কালকের ছুরিটা কোথায়?”

মারদেকা হাত দিয়ে খাপটা ছুঁয়ে বলল, “এখানে।”

এটা সেই ছুরি নয় যেটা আগের দিন প্রশিক্ষণের সময় লারসেন তাকে দিয়েছিল। গতকাল সন্ধ্যায় সে তাকে ছোট একটা পুরোনো ছুরি দিয়েছিল, যেটা সে নিজের কাছে রাখত। ছুরিটার হাতল কালচে হয়ে গেছে, ফলার ওপর বয়সের দাগ আছে, কিন্তু ভারসাম্য ভালো। লারসেন জানে, প্রতিদিনের অনুশীলনের জন্য মারদেকার নিজের একটা ছুরি দরকার। প্রতিবার নিজের ছুরি না থাকলে হাত কখনও অস্ত্রের ওজনের সঙ্গে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয় না।

কয়েক সপ্তাহ আগে সে মারদেকাকে যে ছুরিটা চিনিয়েছিল, সেটা তার বাবা ব্যবহার করতেন। তাই গত রাতের পর সে সিদ্ধান্ত বদলেছে। বাবার ছুরিটা সে নিরাপদে রেখে দিয়েছে। অনুশীলনের জন্য তাকে এই নতুন ছুরিটাই দিয়েছে। 

মারদেকা খাপের ওপর হাত রেখে বলল, “আমি আজ অনুশীলন করতে পারি?”

লারসেন তার দিকে তাকাল। “প্রতিদিন করবে।”

মারদেকার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল, “কিন্তু আমার সামনে নয়।”

ছেলেটার মুখে বিস্ময় ফুটল।

“একই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রতিদিন একইভাবে ছুরি ছোড়া শেখা নয়। তোমাকে নিজের ভুল নিজেকেই ধরতে হবে।”

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কতবার?”

“যতক্ষণ হাত ক্লান্ত না হয়। তার আগে থামবে।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।

লারসেন তখন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর একটা কথা। ছুরিটা কখনও খেলনা হিসেবে ব্যবহার করবে না। র&#x200d;্যাঞ্চে কেউ না থাকলে তবেই অনুশীলন করবে। লক্ষ্য সামনে থাকবে, পেছনে কী আছে সেটা আগে দেখবে।”

মারদেকা গম্ভীর হয়ে বলল, “বুঝেছি।”

লারসেন চলে গেল। কিন্তু কয়েক পা যাওয়ার পর তার মনে হলো, মারদেকাকে সে আর শুধু অস্ত্র শেখাচ্ছে না। ধীরে ধীরে তাকে এমন একটা জীবনের জন্য তৈরি করছে যেখানে ভুলের মূল্য খুব বেশি।

দুপুরের আগে র&#x200d;্যাঞ্চের কাজ স্বাভাবিক গতিতে চলতে লাগল। গরু উত্তর পাশের চারণভূমিতে সরানো হলো। দুজন লোক ভাঙা বেড়া মেরামত করল। মিগুয়েল আস্তাবলের দরজার কবজা বসিয়ে দিল। ক্লে মরগান পশ্চিমের সীমানা আরেকবার ঘুরে এল। বাড লোকজনকে কাজ ভাগ করে দিল। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু লারসেনের ঘরে সেই স্বাভাবিকতার কোনো জায়গা নেই।

টেবিলের ওপর তিনটি জিনিস পাশাপাশি রাখা ছিল। এলি ব্রুকসের চিঠি, পুরোনো চামড়ার টুকরো, আর কালচে ধাতব চাকতি।

লারসেন প্রথমে চিঠিটা খুলল। তিনটি জায়গার নাম আবার পড়ল। তারপর পুরোনো চামড়ার টুকরোটার ওপর চোখ রাখল। চামড়ায় আঁকা চিহ্নগুলো বহু বছরের পুরোনো। কালচে হয়ে যাওয়া রেখাগুলো এতটাই ক্ষীণ যে অপরিচিত চোখে সেগুলো শুধু এলোমেলো দাগ মনে হতে পারে। কিন্তু লারসেন জানে, এগুলো এলোমেলো নয়।

চাকতিটা হাতে তুলে নিয়ে সে চামড়ার ওপর রাখল। চিহ্নটা পুরোপুরি মেলেনি। কিন্তু একটা অংশ মিলে গেল। লারসেন স্থির হয়ে গেল।

এত বছর পরেও তার মনে আছে সেই চিহ্নের মূল রেখা। তখন সে ছিল অন্য মানুষ। তখন তার পাশে ছিল এমন কয়েকজন মানুষ, যাদের নাম সে বহু বছর ধরে মুখে নেয়নি। সেই সময়ের কথা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতর পুরোনো একটা ভার ফিরে এল। সে চোখ বন্ধ করল। কিছুক্ষণ পর আবার চোখ খুলে চাকতিটা উল্টে দিল।

পেছনের অংশে খুব ক্ষীণ একটা আঁচড়। এত ছোট যে আলো না পড়লে বোঝা যায় না। সে নিজের ছুরির ডগা দিয়ে নয়, আঙুলের নখ দিয়ে রেখাটা অনুসরণ করল। তারপর হঠাৎ তার মনে পড়ল, এলি ব্রুকসের চিঠিতে তিনটি জায়গার পাশে যে চিহ্নগুলো ছিল, তার একটির বাঁকও প্রায় একই রকম।

এবার বিষয়টা আর কাকতালীয় মনে হলো না। তিনটি জায়গা। পুরোনো চিহ্ন। চাকতি। আর তার র&#x200d;্যাঞ্চ। কিন্তু একটা প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত। যদি এই চিহ্ন এত পুরোনো হয়, তবে রাতের লোকগুলোর হাতে এর প্রতিলিপি এল কীভাবে?

লারসেন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। উঠোনে মারদেকা নেই। বাডও নেই। পশ্চিমের দিকে কয়েকজন লোক কাজ করছে। তার মনে হলো, এখনই মারদেকাকে সব বলা যাবে না।

ছেলেটার হাতে চাকতি আছে। কিন্তু চাকতিটা তাকে উত্তর দেবে না। বরং প্রশ্ন করবে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মারদেকা হয়তো এমন জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে যেখানে তার বয়স তাকে রক্ষা করবে না।

দরজায় আবার শব্দ হলো। বাড ঢুকল। তার হাতে আগের দিনের কাপড়ে মোড়া সেই টুকরোটা। সে দরজা বন্ধ করে টেবিলের কাছে এসে কাপড়টা খুলল। কাপড়টা মেলে ধরতেই সকালের আলোয় তার বুনন স্পষ্ট হয়ে উঠল।

লারসেন কাপড়টার দিকে তাকিয়ে রইল।

বাড বলল, “আমি আজ ভালো করে দেখেছি।”

লারসেন কাপড়টা হাতে নিল। ছেঁড়া প্রান্তটা চোখের কাছে তুলে ধরল। কাপড়ের সুতো সাধারণ র&#x200d;্যাঞ্চের পোশাকের মতো নয়। বুননটা মোটা, কিন্তু শক্ত। কয়েক জায়গায় সুতো ঘষে মসৃণ হয়ে গেছে। ছেঁড়া প্রান্তের কাছে কালচে নীল রঙের ক্ষীণ দাগ এখনও টিকে আছে।

লারসেনের চোখ স্থির হয়ে গেল।

বাড ধীরে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি এই কাপড় আগে দেখেছেন?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে কাপড়ের বুনন আঙুলের মধ্যে নিয়ে অনুভব করল। তারপর ধীরে বলল, “হ্যাঁ।”

বাড অপেক্ষা করল। 

লারসেনের চোখ তখন আর কাপড়ের ওপর নেই। বহু বছর আগের একটা দৃশ্য তার মনে ফিরে এসেছে। ধুলোমাখা একটা পথ। কয়েকজন ঘোড়সওয়ার। তাদের পোশাকের ওপর একই ধরনের মোটা কাপড়। আর সেই কাপড়ের গাঢ় নীল রং।

সে আবার কাপড়ের ছেঁড়া প্রান্তটা দেখল। তারপর পুরোনো চামড়ার টুকরোর দিকে তাকাল। এরপর কালচে চাকতিটা হাতে নিল।

বাড বুঝতে পারছিল, লারসেন এমন কিছু মনে করার চেষ্টা করছে যা বহু বছর ধরে সে ইচ্ছা করেই ভুলে থাকতে চেয়েছে।

কিছুক্ষণ পর বাড ধীরে বলল, “আপনি ওদের চিনেছেন?”

লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। “মানুষকে নয়। একটা সময়কে।”

বাড আর কিছু বলল না।

লারসেন কাপড়টা ভাঁজ করে টেবিলে রাখল। তার চোখে এবার এমন একটা কঠিনতা দেখা গেল, যা বাড বহু বছর আগে দেখেছিল, কিন্তু তারপর থেকে খুব কমই দেখেছে।
তারপর ধীরে বলল, “ওটা কোনো এক ব্যক্তির চিহ্ন নয়।”

বাড অপেক্ষা করল।

“ওটা একটা দলের চিহ্ন ছিল।”

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

বাড নিচু গলায় বলল, “কোন দলের?”

লারসেন উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি আবার চাকতিটার দিকে গেল।

বহু বছর আগে যে নামটা সে নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলেছিল, সেই নামটা আজ আবার ফিরে আসছে। সে জানে, নাম উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো দরজাগুলো খুলে যাবে। আর সেই দরজার ওপারে আছে এমন কিছু মানুষ, যাদের সে ভেবেছিল আর কোনোদিন দেখতে হবে না।

কিন্তু রাতের গুলির শব্দ, এলি ব্রুকসের চিঠি, তিনটি জায়গার চিহ্ন, কালচে চাকতি আর পশ্চিমের বেড়ার কাছে পাওয়া কাপড়ের টুকরো তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, অতীত কখনও সত্যি মরে না। কখনও কখনও সে শুধু অপেক্ষা করে।

লারসেন ধীরে বলল, “ওরা শুধু র&#x200d;্যাঞ্চে ঢোকেনি।”

বাড তার দিকে তাকাল।

“ওরা কিছু খুঁজছিল।”

“কী?”

লারসেনের চোখ এবার মারদেকার দিকে গেল না। সে জানালার বাইরে তাকিয়েই বলল, “সেটাই জানতে হবে।”

ঠিক সেই সময় দরজার বাইরে মারদেকার পায়ের শব্দ শোনা গেল।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে কাপড়টা ভাঁজ করে চিঠির নিচে সরিয়ে রাখল। কালচে চাকতিটা আগের জায়গায় রেখে দিল। তার মুখ আবার শান্ত হয়ে গেল।

দরজা খুলে মারদেকা ভেতরে ঢুকল। তার কপালে ঘাম। হাতে ছুরির খাপ। চোখে অনুশীলনের পরের সেই তীব্র মনোযোগ।

লারসেন তার দিকে তাকাল।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে পকেট থেকে কালচে চাকতিটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর বলল, “আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি।”

লারসেনের চোখ চাকতি থেকে উঠে ছেলেটার মুখে স্থির হলো। “কী?”

মারদেকা চাকতিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই চিহ্নটা আমি আগে কোথাও দেখেছি।”

ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।

বাড লারসেনের দিকে তাকাল।

লারসেনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য পুরোনো অন্ধকার ফিরে এল। সে বুঝল, সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

বাড কিছু বলল না। শুধু লারসেনের দিকে তাকিয়ে রইল। বহু বছরের পরিচয়ে সে জানে, লারসেন যখন কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে এভাবে চুপ করে যায়, তখন তার মাথার ভেতর শুধু বর্তমান নয়, বহু দূরের কোনো অতীতও জেগে ওঠে।

লারসেন ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। চাকতিটা হাতে তুলে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত আলোয় ঘুরিয়ে দেখল। ধাতুর গায়ে বয়সের কালচে ছাপ, কিনারায় ক্ষয়, আর মাঝখানে খোদাই করা সেই অদ্ভুত চিহ্ন। এতদিন ধরে জিনিসটা তার কাছে ছিল একটা অজানা স্মারক, কিন্তু এখন সেটাই যেন অতীতের বন্ধ দরজার চাবি হয়ে উঠেছে। সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে বলল, “কোথায় দেখেছ?”

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে জানালার দিকে তাকাল। বাইরে র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে দুজন লোক একটা ঘোড়াকে নিয়ে ব্যস্ত। দূরে গরুগুলো ধীর গতিতে ঘাস খাচ্ছে। বাতাসে শুকনো মাটির গন্ধ। সবকিছু এত স্বাভাবিক যে কয়েক ঘণ্টা আগের উত্তেজনাকে যেন মিথ্যে বলে মনে হয়। কিন্তু তার চোখে সেই স্বাভাবিকতার কোনো ছাপ নেই। সে ধীরে বলল, “ঠিক কোথায় দেখেছি মনে করতে পারছি না। কিন্তু চিহ্নটা নতুন নয়। মনে হচ্ছে, অনেক আগে দেখেছি।”

লারসেনের দৃষ্টি তার মুখ থেকে সরল না। “কোনো জায়গায়?”

মারদেকা মাথা নেড়ে বলল, “হয়তো।”

বাড এবার বুঝল, ছেলেটা অনুমান করছে না। সে সত্যিই কিছু মনে করার চেষ্টা করছে। তার বয়স কম, কিন্তু গত কয়েক মাসে সে এমন কিছু দেখেছে ও শিখেছে, যা অনেক বড় মানুষের জীবনেও আসে না। তার স্মৃতির ভেতর হয়তো এমন কোনো ছবি লুকিয়ে আছে, যার অর্থ সে নিজেই জানে না।

লারসেন চাকতিটা আবার টেবিলে রাখল। “তুমি যখন প্রথম এটা পেয়েছিলে, তখন কি এর চিহ্নটা লক্ষ্য করেছিলে?”

“না। তখন শুধু চাকতিটাই দেখেছিলাম।”

“এখন কেন মনে হলো?”

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আজ ছুরি ছোড়ার সময়।”

লারসেনের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। 

মারদেকা এবার হাত দিয়ে নিজের কোমরের কাছে দেখাল। “একবার লক্ষ্য থেকে ফিরে আসার সময় চাকতিটা আমার কোমরের কাছে ধাক্কা খায়। হাত দিয়ে সেটা ঠিক করতে গিয়ে চিহ্নটার ওপর আঙুল পড়ে। তখন মনে হলো, এই রেখাটা আমি আগে দেখেছি।”

লারসেনের চোখে চিন্তার ছায়া আরও গাঢ় হলো। মানুষের স্মৃতি অদ্ভুত জিনিস। চোখ কোনো দৃশ্য ভুলে যেতে পারে, কিন্তু শরীর অনেক সময় কোনো স্পর্শ, কোনো গন্ধ, কোনো শব্দ কিংবা কোনো রেখা মনে রেখে দেয়। বহু বছর পরে হঠাৎ কোনো ছোট্ট ঘটনা সেই স্মৃতির দরজা খুলে দিতে পারে। লারসেন নিজেও জানে, তার নিজের অতীতের কতকিছু সে চোখের সামনে দেখেও ভুলে থাকতে চেয়েছে, অথচ কিছু স্পর্শ আর কিছু শব্দ আজও তার ভেতরে জীবন্ত।

সে ধীরে বলল, “কোথায় দেখেছ সেটা মনে করার চেষ্টা করো না। জোর করে মনে করতে গেলে ভুল মনে পড়বে।”

মারদেকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

লারসেন বলল, “যেদিন সত্যি মনে পড়বে, তখন নিজে থেকেই মনে পড়বে।”

মারদেকা মাথা নেড়ে চাকতিটা তুলে নিল। কিন্তু ঘর থেকে বের হওয়ার আগে একবার বাডের দিকে তাকাল। বাড তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা কিছু বুঝতে পারল না, তবু তার মনে হলো, ঘরের মধ্যে এমন কিছু আছে যা তার কাছ থেকে লুকানো হচ্ছে।

দরজা বন্ধ হওয়ার পর বাড ধীরে বলল, “ছেলেটা কিছু টের পাচ্ছে।”

লারসেন জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে মারদেকাকে দেখা যাচ্ছে। সে উঠোন পেরিয়ে পশ্চিমের দিকে যাচ্ছে। তার হাঁটার মধ্যে আগের সেই ছেলেমানুষি তাড়াহুড়ো নেই। গত কয়েক মাসে ছেলেটা বদলেছে। শরীর এখনও কিশোরের মতো সরু, কিন্তু হাঁটার ভঙ্গিতে একটা সতর্কতা এসেছে। চোখ সবসময় চারপাশ মাপছে। কোনো শব্দ শুনলে মাথা ঘুরছে। কোনো মানুষকে দেখলে তার হাত অজান্তেই কোমরের কাছে চলে যাচ্ছে।

লারসেন ধীরে বলল, “পাচ্ছে।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আপনি কতদিন ওকে অন্ধকারে রাখবেন?”

লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়েই বলল, “যতদিন প্রয়োজন।”

বাড দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আপনি জানেন, ও থামবে না।”

“আমি জানি। চাকতিটা নিয়ে ও নিজেই খুঁজবে।”

“তাহলে আগে থেকে সব বলা ভালো নয়?”

লারসেন এবার ঘুরে তাকাল। তার মুখ শান্ত, কিন্তু চোখের গভীরে কঠিন সিদ্ধান্ত। “সব সত্যি সবসময় একসঙ্গে বলা যায় না, বাড।”

বাড আর কিছু বলল না। সে জানে, লারসেনের এই স্বর মানে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। যে বিষয় নিয়ে সে কথা বলছে, সেখানে আর তর্ক করে লাভ নেই।

লারসেন টেবিলের ওপর রাখা কাপড়ের টুকরোটার দিকে তাকাল। আবার সেটা হাতে তুলে নিল। মোটা বুনন, গাঢ় নীল রঙের ক্ষীণ দাগ, ছেঁড়া প্রান্ত। সাধারণ চোখে এর মধ্যে বিশেষ কিছু নেই। কিন্তু লারসেনের কাছে এটা এখন একটা পুরোনো ছায়ার অংশ। সে এমন কাপড় বহু বছর আগে দেখেছে। সেই সময়ের কথা মনে পড়লেই তার চোখের সামনে কয়েকটা মুখ ভেসে ওঠে। কিছু মুখ মৃত। কিছু মুখ অদৃশ্য। আর অন্তত একজনের মুখ এমন, যাকে সে ইচ্ছা করেই ভুলে থাকতে চেয়েছিল।

তারপর তার দৃষ্টি চলে গেল এলি ব্রুকসের চিঠির দিকে। চিঠিতে উল্লেখ করা তিনটি জায়গা তার মাথায় আবার ফিরে এল। প্রথম জায়গাটা ছিল উত্তর-পশ্চিমের পুরোনো শুকনো খাতের কাছে। দ্বিতীয়টা পাহাড়ের নিচের পরিত্যক্ত গবাদি পশুর পথ। তৃতীয় জায়গাটা ছিল তার নিজের র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ব্রুকসের ভাষা ছিল সতর্ক, কিন্তু লারসেন সেই সতর্কতার আড়ালে আরও কিছু বুঝেছিল। মার্শাল এলি ব্রুকস শুধু জায়গাগুলোর নাম জানায়নি। সে চেয়েছিল লারসেন নিজে সেই জায়গাগুলোর অর্থ বুঝুক।

আর এখন চাকতিটা সেই তিন জায়গাকে অন্য এক রেখায় জুড়ে দিচ্ছে।

লারসেন টেবিলের নিচের পুরোনো কাঠের বাক্স খুলে একটা মানচিত্র বের করল। মানচিত্রটা নতুন নয়। বহু বছর ধরে ভাঁজ হয়ে থাকা কাগজের কিনারা শক্ত হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কালি ফ্যাকাশে। পুরোনো পথের অনেক চিহ্ন এখন আর বাস্তবে নেই, কিন্তু লারসেনের স্মৃতিতে সেগুলো এখনও স্পষ্ট। সে মানচিত্রটা টেবিলের ওপর মেলে ধরল।

এক এক করে তিনটি জায়গা চিহ্নিত করল। তারপর চাকতিটা মানচিত্রের মাঝখানে রাখল। কিছুক্ষণ কোনো নড়াচড়া হলো না।

লারসেনের আঙুল ধীরে ধীরে প্রথম জায়গা থেকে দ্বিতীয় জায়গার দিকে গেল। তারপর তৃতীয় জায়গা। তিনটি বিন্দুকে চোখে মিলিয়ে সে একটা কাল্পনিক রেখা টানল। রেখাটা গিয়ে শেষ হলো সেই অঞ্চলে, যেখানে বহু বছর আগে একটা পুরোনো পথ ছিল। তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। পথটা সে চেনে।

শুধু পথ নয়, সেই পথের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি শুকনো পাথর, প্রতিটি পুরোনো গাছের ছায়া তার মনে আছে। বহু বছর আগে সেই পথ দিয়ে সে গিয়েছিল। তখন তার পাশে ছিল কয়েকজন মানুষ, যাদের নাম সে আজও উচ্চারণ করতে চায় না। সেই সময়ের একটা ভুল তাকে বহু বছর ধরে তাড়া করেছে। পরে সে ভেবেছিল, সেই অধ্যায় শেষ হয়েছে।

কিন্তু অতীত কখনও মানুষের ইচ্ছেমতো শেষ হয় না। 

বাড মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “ওটা কি সেই পথ?”

লারসেন মাথা তুলল না। “হ্যাঁ।”

“আপনি এতদিন বলেছিলেন পথটা বন্ধ হয়ে গেছে।”

“বন্ধ হয়েছিল।”

“কত বছর আগে?”

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “যখন আমরা ভেবেছিলাম সব শেষ।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “সব শেষ হয়নি।”

লারসেনের চোখ আবার মানচিত্রে নেমে গেল। “না।”

দুজনের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল। বাইরে বাতাস উঠেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে শুকনো ঘাসের গন্ধ ঘরে ঢুকছে। দূরে কোনো ঘোড়া একবার নাক ঝেড়ে উঠল। র&#x200d;্যাঞ্চের স্বাভাবিক শব্দগুলো চলতেই থাকল, অথচ এই ছোট ঘরের ভেতর যেন বহু বছরের পুরোনো একটা হিসাব আবার খুলে বসেছে।

অবশেষে লারসেন সিদ্ধান্ত নিল। সে মানচিত্র ভাঁজ করে রেখে দিল। চাকতিটা পকেটে ঢোকাল। কাপড়টা চিঠির সঙ্গে রেখে দিল। তারপর বলল, “আজ রাতেই আমি বের হব।”

বাড বিস্মিত হলো না। শুধু জিজ্ঞেস করল, “একা?”

“হ্যাঁ।”

বাডের মুখে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। “মারদেকাকে?”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “ওকে সঙ্গে নেব না।”

বাড মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সে জানে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু নিরাপত্তা নেই। লারসেন মারদেকাকে এমন কিছু থেকে দূরে রাখতে চাইছে, যার ভয় সে নিজের মধ্যে বহু বছর ধরে বহন করছে।

বাড ধীরে বলল, “আপনি ফিরতে দেরি করলে?”

“র&#x200d;্যাঞ্চ তুমি সামলাবে।”

বাড মাথা নেড়ে বলল, “আর যদি না ফেরেন?”

লারসেনের চোখে কঠিন একটা হাসি ফুটল। “তাহলে তুমি জানবে কী করতে হবে।”

বাড আর কিছু বলল না।

সন্ধ্যার আগেই র&#x200d;্যাঞ্চে প্রস্তুতি শুরু হলো। কাউকে কিছু জানানো হলো না। লারসেন শুধু বলল, সে পশ্চিম দিকে যাবে এবং সম্ভবত রাতের আগে ফিরবে না। বাড লোকজনকে নিজের মতো করে বুঝিয়ে দিল। কেউ প্রশ্ন করল না। র&#x200d;্যাঞ্চে যারা দীর্ঘদিন কাজ করেছে তারা জানে, লারসেন যখন কোনো কথা না বাড়িয়ে কাজের নির্দেশ দেয়, তখন সেই নির্দেশের পেছনে এমন কারণ থাকে যা জানার দরকার নেই।

মারদেকা তখন উঠোনের এক পাশে বসে নিজের ছুরিটা পরিষ্কার করছিল। ছুরিটা তার কাছে নতুন, কিন্তু তার হাতের সঙ্গে ইতিমধ্যে একটা পরিচিত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলার ওপর কাপড় চালানোর সময় সে বারবার আলোয় সেটা পরীক্ষা করছিল। ছুরিটা কীভাবে ধরতে হয়, কতটা চাপ দিতে হয়, কোথায় ভারসাম্য, এসব এখন তার হাত বুঝতে শুরু করেছে। কিন্তু ছুরির ফলার দিকে তাকানোর চেয়ে তার চোখ বেশি ছিল দূরের দিকে।

লারসেন কিছুক্ষণ তাকে দেখল। তারপর কাছে গিয়ে বলল, “আজ কতক্ষণ অনুশীলন করেছ?”

মারদেকা মাথা না তুলে বলল, “বেশিক্ষণ নয়।”

“কেন?”

“হাত শক্ত হয়ে যাচ্ছিল।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক করেছ।”

মারদেকা এবার মাথা তুলল। সে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কোথাও যাচ্ছেন?”

প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিকভাবে করা হলেও লারসেন বুঝল, ছেলেটা তাকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিল।

“হ্যাঁ।”

মারদেকা আর প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার চোখ লারসেনের কোমরের পিস্তলের দিকে গেল। তারপর ঘোড়ার দিকে। ঘোড়ার জিন বাঁধা হয়েছে। লাগাম পরীক্ষা করা হয়েছে। পানির চামড়ার থলি প্রস্তুত। এসব কোনো সাধারণ সন্ধ্যার কাজ নয়।

লারসেন সেটা লক্ষ্য করল। “তুমি আজ রাতে ঘরের বাইরে থাকবে না।”

ছেলেটা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু থেমে গেল। 

লারসেন তার কাঁধে হাত রাখল। তার হাতের চাপ ছিল দৃঢ়, কিন্তু স্নেহহীন নয়। “সবকিছুর উত্তর এখনই জানতে হয় না।”

মারদেকা নিচু গলায় বলল, “কিন্তু আপনি যখন কিছু লুকান, তখন বুঝতে পারি।”

লারসেনের হাত কাঁধে স্থির হয়ে গেল। এই ছেলেটা আগের মারদেকা নয়। তার মধ্যে এখনও শিশুসুলভ সরলতা আছে, কিন্তু সেই সরলতার নিচে তৈরি হয়েছে এক ধরনের তীক্ষ্ণ বোধ।

লারসেন ধীরে বলল, “তাহলে আজ শুধু এটুকু মনে রাখো। যে মানুষ সত্যি খুঁজতে চায়, তাকে আগে অপেক্ষা করতে শিখতে হয়।”

মারদেকা তার দিকে তাকিয়ে রইল। লারসেন চলে গেল।

রাত নামার কিছু আগে সে ঘোড়ায় চড়ল। বাড দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে তখন সূর্যের শেষ আলো। পশ্চিমের পাহাড়গুলো লালচে হয়ে উঠেছে। বাতাসে রাতের ঠান্ডা নামতে শুরু করেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের লোকেরা দূরে নিজেদের কাজে ব্যস্ত, কেউ জানে না তাদের মালিক কোথায় যাচ্ছে। কিংবা জানলেও প্রশ্ন করার সাহস নেই।

বাড ধীরে বলল, “সাবধানে যাবেন।”

লারসেন শুধু মাথা নেড়ে পশ্চিমের দিকে রওনা হলো।

র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে কিছু দূর যেতেই সে ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিল। প্রেইরির ওপর সন্ধ্যার ছায়া নেমে এসেছে। শুকনো ঘাস ঘোড়ার পায়ের সঙ্গে ঘষা খেয়ে মৃদু শব্দ করছে। দূরে পাহাড়গুলো ক্রমে কালো হয়ে উঠছে। আকাশে প্রথম কয়েকটা তারা দেখা দিয়েছে।

রাত যত ঘন হলো, তত পুরোনো স্মৃতিগুলো স্পষ্ট হতে লাগল। বহু বছর আগে এই পথ দিয়েই সে গিয়েছিল। তখন তার সঙ্গে ছিল আরও কয়েকজন। তাদের মধ্যে একজনের কোমরেও এমন একটা চাকতি ছিল। তখন চাকতিটা ছিল পরিচয়ের চিহ্ন। পরে সেটা হয়ে উঠেছিল বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ। 

লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে তখনও জানে না, চাকতিটা কীভাবে আবার তার হাতে এসেছে। কে এটা এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিল, কে সেটা এখন তার র&#x200d;্যাঞ্চের কাছে এনে ফেলেছে, আর সবচেয়ে বড় কথা, কেন?

কিন্তু একটা ব্যাপার সে এখন নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারছে। যে দলটাকে সে মৃত বলে ধরে নিয়েছিল, তাদের কেউ একজন এখনও বেঁচে আছে। আর সেই মানুষটি জানে লারসেন কোথায় আছে।

পাহাড়ের কাছে পৌঁছে লারসেন ঘোড়া থামাল। সামনে শুকনো খাত। চাঁদের আলো তখনও পুরোপুরি ওঠেনি। চারপাশে এমন অন্ধকার যে দূরের পাথর আর ছায়ার পার্থক্য বোঝা কঠিন। বাতাস খাতের ভেতর দিয়ে বয়ে গিয়ে শুকনো ঘাসে সরসর শব্দ তুলছে।

লারসেন ঘোড়া থেকে নামল। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে শুকনো মাটির ওপর হাত রাখল। তার আঙুল ধীরে ধীরে মাটির খসখসে স্তর পরীক্ষা করতে লাগল। শিকারির মতো তার চোখও চারপাশে ঘুরছিল। কোনো শব্দ নেই। কোনো তাজা ঘোড়ার গন্ধ নেই। তবু জায়গাটার মধ্যে একটা অস্বাভাবিকতা আছে।

কিছুক্ষণ পর তার আঙুলে একটা দাগ অনুভূত হলো। ঘোড়ার খুরের দাগ নয়। মানুষের জুতোর চাপ। খুব নতুন নয়। কিন্তু একেবারে পুরোনোও নয়। লারসেন উঠে দাঁড়াল। তার চোখ এবার মাটির ওপর থেকে আশপাশের ঢালে উঠল। কেউ এখানে এসেছে। একবার নয়, সম্ভবত একাধিকবার।

সে আরও কিছু দূরে এগিয়ে গেল। একটা পাথরের পাশে থামল। পাথরের নিচে মাটির একটা অংশ যেন সম্প্রতি সরানো হয়েছে। সে হাত দিয়ে মাটি সরাল। কিছু বের হলো না। শুধু একটা সরু কালচে সুতো। লারসেন সুতোটা তুলে আলোয় ধরল। একই গাঢ় নীল। কাপড়ের টুকরোর মতোই। তার চোখে তখন আর কোনো সন্দেহ নেই।

কেউ এখানে এসেছিল। এবং সে শুধু পথ দিয়ে যায়নি। সে অপেক্ষা করেছিল। হয়তো লারসেনের জন্য। হয়তো অন্য কারও জন্য।

লারসেন আবার ঘোড়ার দিকে ফিরল। কিন্তু ওঠার আগে তার চোখ পাহাড়ের ঢালের দিকে গেল। সেখানে অন্ধকারের মধ্যে এক মুহূর্তের জন্য ক্ষীণ একটা আলো দেখা গেল। তারপর নিভে গেল।

লারসেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দূরে কোনো গুলির শব্দ হলো না। কোনো ঘোড়ার শব্দও নয়। শুধু বাতাস। কিন্তু সে জানে, ওই আলো কাকতালীয় নয়।

লারসেন ধীরে ধীরে ঘোড়ায় উঠল। এবার তার মুখে এমন একটা অভিব্যক্তি ফুটে উঠল, যা বহু বছর ধরে তার মুখে দেখা যায়নি। শিকারির মুখ। সে বুঝে গেল, তাকে কেউ অনুসরণ করছে না। বরং তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর সেই পথের শেষ কোথায়, সেটা এখনও সে জানে না।

এদিকে র&#x200d;্যাঞ্চে মারদেকা নিজের ঘরে বসে ছিল। বাইরে রাত নেমেছে। বাড তাকে খেতে ডাকলেও সে বেশি কিছু খায়নি। খাবারের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার মতো অবস্থা তার ছিল না। তার মন বারবার সেই কালচে চাকতির দিকে ফিরে যাচ্ছে।

চাকতিটা সে বিছানার পাশে রেখেছে। ঘরের ছোট প্রদীপের আলোয় চিহ্নটা আবার দেখা যাচ্ছে। আলো বদলালে রেখাগুলোর আকৃতিও যেন বদলে যায়। কখনও মনে হয়, এটা কোনো অচেনা প্রতীক। আবার কখনও মনে হয়, সে সত্যিই এই চিহ্ন বহু আগে কোথাও দেখেছে।

মারদেকা আঙুল দিয়ে রেখাটার ওপর ছুঁয়ে গেল। হঠাৎ তার মনে একটা ছবি ভেসে উঠল। অনেক পুরোনো একটা জায়গা। কাঠের দেয়াল। দরজার পাশে ঝোলানো একটা কাপড়। আর সেই কাপড়ে আঁকা ছিল একই চিহ্ন।

ছবিটা এত দ্রুত চলে গেল যে সে নিশ্চিত হতে পারল না। যেন অন্ধকারের মধ্যে কেউ একটা দরজা খুলে আবার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিয়েছে। 

সে চোখ বন্ধ করল। আবার মনে করার চেষ্টা করল। এবার একটা শব্দ যেন কানে এল। কারও কণ্ঠ। পুরুষের কণ্ঠ। কিন্তু কথাটা স্পষ্ট নয়।

মারদেকা চোখ খুলে ফেলল। তার বুক দ্রুত উঠানামা করছে। সে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল, যেন নিজের ঘরের ভেতরেও কোনো অদৃশ্য উপস্থিতি খুঁজছে। তারপর জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে অন্ধকার।

র&#x200d;্যাঞ্চের দূরের অংশে একটা ঘোড়া হ্রেষাধ্বনি করল। বাতাসে খড়ের গন্ধ। কোথাও একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। তারপর আবার নীরবতা।

মারদেকা জানে, লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে নেই। কিন্তু সে জানে না, লারসেন কোথায় গেছে।

কিছুক্ষণ পর সে আবার ঘরে ফিরে এল। চাকতিটা হাতে নিল। ধাতুর ঠান্ডা স্পর্শ তার আঙুলে লাগতেই সেই অস্পষ্ট স্মৃতিটা আবার মাথার ভেতর জেগে উঠল। সে নিজের মনে বলল, “আমি এটা কোথায় দেখেছি?” কোনো উত্তর এল না।

শুধু স্মৃতির গভীর থেকে সেই অস্পষ্ট ছবিটা আবার একবার ভেসে উঠল।

মারদেকা জানত না, সেই স্মৃতি তার নিজের অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, নাকি লারসেনের অতীতের সঙ্গে। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল, বিষয়টা কেবল চাকতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কোনো একটা জায়গা, কোনো একটা মানুষ, কিংবা কোনো একটা ঘটনা তার স্মৃতির গভীরে চাপা পড়ে আছে।

সেই রাতেই সে একটা সিদ্ধান্ত নিল। লারসেন যতই তাকে অপেক্ষা করতে বলুক, সে আর শুধু অপেক্ষা করবে না। সে খুঁজবে। তবে অস্ত্র হাতে নয়। প্রথমে স্মৃতির মধ্যে।

পরদিন ভোরে লারসেন ফিরে আসার আগেই সে বাডের কাছে যাবে। কারণ মারদেকা এখন বুঝতে শুরু করেছে, র&#x200d;্যাঞ্চে যে রহস্য ঢুকেছে, সেটা এক অদৃশ্য সুতোর মত তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এমন একটা অতীতের দিকে, যার সঙ্গে তার নিজের জীবনেরও হয়তো কোনো সম্পর্ক আছে। 

আর পশ্চিমের অন্ধকার পাহাড়ের নিচে, সেই একই সময়ে, লারসেন একা দাঁড়িয়ে ছিল। 
তার সামনে ছিল পুরোনো পথ। পেছনে র&#x200d;্যাঞ্চ। আর তার মুঠোর ভেতর শক্ত হয়ে ধরা ছিল কালচে ধাতব চাকতি।

সে নিচু গলায় বলল, “এবার দেখি, কে আগে পৌঁছায়।” তারপর ঘোড়ার লাগাম টেনে সে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/265659/</link>
				<pubDate>Tue, 25 Aug 2026 12:15:40 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–আঠারো<br />
পরদিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল, কিন্তু লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে যারা ছিল তারা জানত, আগের রাতের পর থেকে কিছুই আর পুরোপুরি আগের মতো নেই। সূর্য ওঠার আগেই পূর্ব দিগন্তে ফ্যাকাশে আলো জমেছিল। প্রেইরির ওপর পাতলা কুয়াশার মতো ঠান্ডা বাতাস ভেসে বেড়াচ্ছিল। শুকনো ঘাসের মাথাগুলো শিশিরে ভিজে ছিল,&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-265659"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/265659/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">f2055c85bd8fea329bc44843a23a5958</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–সতের
আকাশে কোনো মেঘ নেই। ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে প্রেইরির ওপর। রাতের শেষ অন্ধকার অনেক আগেই সরে গেছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ঠান্ডা এখনও বাতাসের মধ্যে মিশে আছে। পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠে এসেছে, আর তার ফ্যাকাশে সোনালি আলো ধীরে ধীরে শুকনো ঘাসের মাথা, কাঠের বেড়া, র&#x200d;্যাঞ্চের পুরোনো বাড়ি আর শেডের দেয়ালের ওপর গড়িয়ে পড়ছে। রাতের শিশির এখনও কোথাও কোথাও ঘাসের ডগায় আটকে আছে। সূর্যের আলো পড়লে সেগুলো ক্ষুদ্র কাচের টুকরোর মতো ঝিলিক দিয়ে উঠছে। দূরের পাহাড়গুলোর গায়ে আলো আর ছায়ার খেলা চলছে। কোথাও সোনালি আলো, কোথাও ধূসর ছায়া, আবার কোথাও পাহাড়ের ঢাল এখনও সকালের নীলচে অন্ধকারে ঢাকা।

ঘোড়াগুলোও ধীরে ধীরে রাতের আতঙ্ক কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। আস্তাবলের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে খুরের শব্দ ভেসে আসছে। কোনো ঘোড়া নাক ঝেড়ে মাথা ঝাঁকাচ্ছে, কোনোটা কাঠের দরজায় মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভোরের বাতাসে ঘোড়ার শরীরের উষ্ণ গন্ধ, শুকনো খড় আর ভেজা মাটির গন্ধ মিশে আছে। অথচ কয়েক ঘণ্টা আগেও এই একই জায়গায় গুলির শব্দে রাত কেঁপে উঠেছিল।

সকালের আলোয় শেডের দেয়ালের ক্ষতটা এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। লারসেনকে লক্ষ্য করে ছোড়া সেই একটি গুলি শেডের কাঠে গিয়ে আঘাত করেছিল। যেখানে গুলিটি কাঠে ঢুকেছিল, সেখানে ছোট একটি গর্তের চারপাশে কাঠের তন্তু ছিঁড়ে বাইরে বেরিয়ে আছে। আঘাতের ধাক্কায় গর্তটির চারপাশের কাঠ সামান্য ফেটে গেছে। তার কাছাকাছি রাতের গোলাগুলির সময় তৈরি হওয়া আঘাতের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে। কোথাও কাঠের সরু ফালি ভেঙে ঝুলে আছে, কোথাও আঘাতের জায়গায় কালচে বারুদের দাগ লেগে আছে। দেয়ালের নিচে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাঠের ছোট টুকরো, শুকনো ঘাস আর রাতের তাড়াহুড়োয় এদিক-ওদিক সরে যাওয়া কিছু জিনিস। অন্ধকারে যেসব চিহ্ন চোখে পড়েনি, সূর্যের আলো সেগুলোকে এখন একে একে প্রকাশ করছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও মৃত্যু কতটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল, সেই কথাই যেন নীরবে বলে যাচ্ছে শেডের কাঠের সেই ক্ষত।

র&#x200d;্যাঞ্চের লোকেরা নিজেদের কাজে ফিরে গেছে। রাতের আতঙ্কের পরেও কাজ থেমে থাকে না। কেউ উত্তর দিকের বেড়া পরীক্ষা করছে, কেউ ঘোড়াগুলোর দেখাশোনা করছে, কেউ শেডের ক্ষতিগ্রস্ত কাঠ পরীক্ষা করছে। মিগুয়েল আস্তাবলের ভাঙা দরজার কবজা খুলে বসেছে। রুবেন কোল শেডের দেয়ালের ক্ষত পরীক্ষা করে কাঠের অবস্থা দেখছে। ক্লে মরগান পশ্চিম দিকের সীমানা ঘুরে এসেছে। প্রত্যেকেই কাজে ব্যস্ত, কিন্তু তাদের চলাফেরার মধ্যে আগের দিনের স্বাভাবিকতা নেই। কেউ বেশি কথা বলছে না। দূরে কোথাও ঘোড়ার হঠাৎ শব্দ উঠলে কয়েকজনের মাথা একসঙ্গে সেই দিকে ঘুরে যাচ্ছে। বাতাসে শুকনো ঘাসের মৃদু শব্দ হলেও চোখ চলে যাচ্ছে প্রেইরির দিকে।

লারসেন কাউকে র&#x200d;্যাঞ্চের সীমানার বাইরে যেতে নিষেধ করেছে। রাতের অন্ধকারে যারা এসেছিল, তাদের পেছনে ছুটে গিয়ে অজানা জায়গায় নিজেদের লোক হারানোর মতো বোকামি সে করতে চায় না। যারা এসেছিল, তারা যদি আবার ফিরে আসে, আলোয় তাদের দেখা যাবে। আর যদি তারা চলে গিয়ে থাকে, তবে মাটির ওপর রেখে যাওয়া চিহ্নই তাদের পথের কথা বলবে।

বাড উত্তর দিকের বেড়ার কাছে দুজন লোক দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পশ্চিম দিকটাও পরীক্ষা করা হয়েছে। কোথাও তাজা ঘোড়ার খুরের চিহ্ন, কোথাও চাপা পড়া ঘাস, কোথাও মানুষের বুটের দাগ। কিন্তু রাতের অন্ধকার আর তাড়াহুড়োর মধ্যে কোনো চিহ্নই পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

বাইরে থেকে র&#x200d;্যাঞ্চটা আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে বলে মনে হয়। কিন্তু যারা গত রাতের ঘটনাটা দেখেছে, তারা জানে এই স্বাভাবিকতা খুব পাতলা একটা পর্দা। তার নিচে এখনও ভয় আছে। সন্দেহ আছে। আর আছে এমন এক অদৃশ্য বিপদের অনুভূতি, যার কোনো মুখ এখনও দেখা যায়নি।

বাড়ির ভেতরের ছোট ঘরটায় লারসেন একা দাঁড়িয়ে ছিল। জানালার কাঠের পাল্লা অর্ধেক খোলা। সকালের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে ঘরের মেঝের ওপর তির্যক একটা উজ্জ্বল রেখা তৈরি করেছে। সেই আলোর মধ্যে ধুলোর ক্ষুদ্র কণাগুলো ধীরে ধীরে ভেসে বেড়াচ্ছে। ঘরের বাতাসে পুরোনো কাঠ, চামড়া আর রাতের ঠান্ডা মিশে আছে।

টেবিলের ওপর এলি ব্রুকসের চিঠি খোলা। তার পাশে পুরোনো চামড়ার টুকরো। আর তার পাশে পড়ে আছে কালচে ধাতব চাকতিটি। 

লারসেন অনেকক্ষণ কোনো কিছু স্পর্শ করল না। তার দুই হাত জানালার কাঠের ওপর রাখা। চোখ বাইরে, কিন্তু সে আসলে প্রেইরি দেখছে না। তার মনে বারবার ফিরে আসছে এলি ব্রুকসের অফিসঘর। দেয়ালে ঝোলানো মানচিত্র। তিনটি জায়গায় চিহ্ন। সেই তিনটি জায়গাকে কল্পনায় যুক্ত করলে মাঝখানে এসে পড়ে তার র&#x200d;্যাঞ্চ। তারপর সিল মারা খাম। আর সেই চিঠির কয়েকটি লাইন। ওরা হয়তো তোমার জমি চায় না। তোমার জমির চেয়েও পুরোনো কোনো জিনিসের জন্য ওরা ফিরে এসেছে।

লারসেন ধীরে জানালা থেকে সরে এসে টেবিলের কাছে গেল। চিঠির ওপর হাত রাখল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তার মুখে কোনো ভাব প্রকাশ পেল না, কিন্তু চোখের গভীরে চিন্তার রেখা আরও গাঢ় হলো। তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামল কালচে চাকতিটার ওপর।

একই চিহ্নের দ্বিতীয় চাকতি এখন মারদেকার কাছে। গত রাতের অচেনা লোকটা সেটা রেখে গেছে। লারসেন কেন চাকতিটা মারদেকাকে দিয়েছে, সেই সিদ্ধান্তের পুরো ব্যাখ্যা সে নিজেকেও দেয়নি। তবে একটা বিষয় সে জানে, বিশ্বাস কোনোদিন এক লাফে তৈরি হয় না। ছোট ছোট পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সেটা তৈরি হয়।

সে দেখতে চেয়েছিল, মারদেকা এমন একটা জিনিস নিজের কাছে রাখতে পারে কি না যার অর্থ সে জানে না, কিন্তু যার গুরুত্ব সে বুঝতে পারে। গত রাতের ঘটনাগুলো ছেলেটাকে তার চোখে আরও বদলে দিয়েছে। 

মারদেকা ভয় পেয়েছিল। কিন্তু ভয়কে নিজের চোখের ওপর বসতে দেয়নি। সে লক্ষ্য করেছে মানুষের মুখ, দৃষ্টি, থেমে যাওয়া কথা, বদলে যাওয়া আচরণ। লারসেন বহু বছর ধরে মানুষের চোখ পড়েছে। বন্দুক হাতে থাকা লোক নিজের মুখের কথা দিয়ে অনেক কিছু লুকাতে পারে, কিন্তু তার চোখ অনেক সময় সত্যিটা বলে দেয়।

মারদেকা সেই জিনিসটা বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিক দ্রুত বুঝতে শুরু করেছে। এই ক্ষমতা তাকে বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে। আবার ঠিকভাবে শেখানো গেলে একদিন এটাই তাকে বাঁচাতেও পারে।

দরজায় হালকা শব্দ হলো। লারসেন মুখ না ঘুরিয়েই বলল, “ভেতরে এসো।”

দরজা খুলে বাড ঢুকল। হাতে রাইফেল। কাঁধে সকালের ঠান্ডা বাতাসের গন্ধ। বুটের নিচে শুকনো মাটি লেগে আছে। রাত জাগার ক্লান্তি মুখে থাকলেও চোখে সেই পুরোনো সতর্কতা।

ঘরে ঢুকে বাড প্রথমে লারসেনের দিকে তাকাল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা চাকতি আর চামড়ার টুকরোটার দিকে তার দৃষ্টি গেল। বাইরে থেকে আসা আলোয় চাকতিটা কালচে ধাতুর মতো নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে।

বাড ধীরে বলল, “উত্তরের দিকটা এখন শান্ত।”

লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল, “পশ্চিম?”

“ক্লে মরগান দেখে এসেছে। তাজা লোকের চিহ্ন নেই। তবে বেড়ার ওপারে একটা জায়গায় ঘাস চাপা পড়েছে।”

লারসেন এবার তার দিকে ফিরল। “কেউ অনুসরণ করেনি তো?”

বাড মাথা নেড়ে বলল, “না। আপনার কথা পরিষ্কার ছিল। কেউ সীমানার বাইরে যাবে না।”

লারসেন আবার জানালার দিকে তাকাল। তার চোখে কঠিন স্থিরতা। “আমরা এখন তাদের পেছনে গেলে তারা বুঝবে আমরা কী জানি। আমি বরং চাই, তারা ভাবুক আমরা কিছুই জানি না।”

বাডের মুখে সামান্য হাসি ফুটল। সে রাইফেলটা দেয়ালের পাশে ঠেকিয়ে রেখে বলল, “আপনি কখনও সহজ পথ নেন না।” 

লারসেনের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি দেখা গেল। “সহজ পথ সবসময় নিরাপদ পথ নয়।”

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। বাইরে ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। তারপর আবার নীরবতা।

বাডের চোখ ধীরে ধীরে টেবিলের ওপরের চাকতিতে গিয়ে থামল। সে বলল, “ওটা কি আগে দেখেছেন?” 

লারসেন উত্তর দিল, “হ্যাঁ।”

বাড আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। লারসেনের অতীত সম্পর্কে সে অনেক কিছু জানে না। জানার চেষ্টাও করে না। বহু বছর ধরে সে বুঝে গেছে, মানুষের জীবনে কিছু দরজা থাকে যেগুলো বাইরে থেকে খুলতে যাওয়া উচিত নয়।

তবে কিছুক্ষণ পর সে আবার বলল, “মারদেকার হাতে ওটা ........!” কথাটা শেষ করল না।

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আমিই দিয়েছি।”

বাডের চোখে এবার চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। “ওকে বিশ্বাস করছেন?”

লারসেন পাল্টা প্রশ্ন করল, “তুমি করো না?”

বাডের মুখে এবার সত্যিকারের হাসি ফুটল। “আমি ওকে অনেক দিন ধরেই বিশ্বাস করি।”

লারসেনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য উষ্ণতা দেখা গেল।

মারদেকা যখন প্রথম এই র&#x200d;্যাঞ্চে এসেছিল, তখন সে ছিল পাহাড় থেকে পালিয়ে আসা এক কিশোর। ক্ষুধা ছিল, ভয় ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল একরোখা জেদ। বাডই প্রথম তাকে র&#x200d;্যাঞ্চের কাজের মধ্যে টেনে নিয়েছিল। ঘোড়ার পরিচর্যা, পানি তোলা, খড় সরানো, বেড়া মেরামত, জিন পরিষ্কার করা, ভোরে ওঠা, রাতের কাজ শেষ করে সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখা, একটা র&#x200d;্যাঞ্চ কীভাবে মানুষের হাত আর ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, এসব মারদেকা প্রথম শিখেছিল বাডের কাছ থেকেই।

বাড বলল, “আমি শুধু ভাবছিলাম, চাকতিটা ওর কাছে রাখা ঠিক হবে কি না।”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তুমিও জানো, এটা সাধারণ জিনিস নয়।”

বাড জানালার বাইরে তাকাল। প্রেইরির ওপর সকালের আলো তখন আরও উজ্জ্বল হয়েছে। সে ধীরে বলল, “আমি ওকে ভয় দেখাতে চাই না।”

লারসেনের কণ্ঠ শান্ত রইল। “ওকে ভয় দেখানো আর সত্যিটা থেকে দূরে রাখা এক জিনিস নয়।”

বাড মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর বলল, “ছেলেটা এমনিতেই যা দেখে তার চেয়ে বেশি বুঝতে শুরু করেছে।”

লারসেনের চোখে আবার সেই চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। “গত রাতে সে একজন লোকের হাঁটার ধরনও মনে রেখেছে।”

বাড এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। “ও কথাটাই আমি আপনাকে বলতে এসেছিলাম।”

লারসেন চুপ করে রইল।

বাড বলল, “মারদেকা বলেছে, লোকগুলোর একজন বাঁ পায়ে সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। আমি নিজে সেটা নিশ্চিত করে দেখিনি। রাতের আলো ভালো ছিল না। কিন্তু ছেলেটা বলছে, লোকটা ঘোড়ার দিকে যাওয়ার সময় বাঁ পায়ের ওপর পুরো চাপ দিচ্ছিল না।”

লারসেনের চোখ সরু হয়ে এল। সে কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলল না। তারপর ধীরে বলল, “ওকে ডেকে আনো।”

বাড দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে থেমে পেছন ফিরে তাকাল।
“ও রাত থেকে ঘুমায়নি। বলেছিলাম একটু শুয়ে নিতে। শুনল না।”

লারসেনের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। “কেন?”

বাড হেসে বলল, “বলেছে, যারা এসেছিল তাদের একজনের হাঁটা ভুলে যেতে চায় না।”

লারসেন কিছুক্ষণ বাডের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “ওকে পাঠাও।”

বাড বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার পর ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল।

লারসেন টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, মারদেকাকে এখন শুধু আরও কিছু শেখানো দরকার। ছেলেটা দেখতে শিখছে। মানুষের আচরণ পড়তে শিখছে। কিন্তু চোখ যা দেখে, শরীর যদি তার সঙ্গে তাল না মেলায়, তবে বিপদের মুহূর্তে সেই জ্ঞান কোনো কাজে আসে না।

কয়েক সপ্তাহ আগে সে মারদেকাকে বলেছিল, “আগামীকাল থেকে তোমার পা শিখবে।” 
সেই শিক্ষা এখনও শেষ হয়নি। আজ তার সঙ্গে আরও কিছু যোগ হবে।

লারসেন টেবিল থেকে চাকতিটা তুলে নিল। ধাতব পৃষ্ঠে আঙুল বোলাল না। শুধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার রেখে দিল। ছেলেটার হাতে এখন অন্য চাকতিটা আছে। আজ সেটাই যথেষ্ট। রহস্যের পুরো ভার এখনই তার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

কিছুক্ষণ পর বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। মারদেকা দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। তার পেছনে বাড। ছেলেটার চোখে রাত জাগার ক্লান্তি থাকলেও মুখে সেই অদ্ভুত সতর্কতা এখনও আছে।

লারসেন বাডের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি যাও। উত্তরের লোকগুলোকে বলে দাও, দুপুরের আগে কেউ সীমানা ছাড়বে না।”

বাড মাথা নেড়ে বেরিয়ে যেতে লাগল। দরজার কাছে গিয়ে সে মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। মুখে কঠিন ভাব এনে বলল, “ইলাই তোমাকে খাবার খেতে বলেছে। খালি পেটে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না।”

মারদেকা হেসে বলল, “আমি পরে খাব।”

বাড ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। মাথা নেড়ে বলল, “লারসেনকে যত খুশি প্রশ্ন করো, কিন্তু ইলাইকে অপেক্ষা করিয়ে রেখো না। ওটা আমার পক্ষে সামলানো কঠিন।”

লারসেনের মুখেও ক্ষীণ হাসি ফুটল। বাড চলে গেল। মারদেকা ঘরে ঢুকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

লারসেন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “চাকতিটা কোথায়?”

মারদেকা মাথা নেড়ে পকেট থেকে চাকতিটা বের করল। সকালের আলোয় কালচে ধাতব পৃষ্ঠে ক্ষীণ ঝিলিক দেখা গেল। সে চাকতিটা মুঠোর ওপর রেখে লারসেনের দিকে বাড়িয়ে ধরল।

লারসেন সেটা হাতে নিল না। শুধু তাকিয়ে রইল। 

মারদেকা কিছুক্ষণ চাকতিটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “আপনি কি জানেন এটা কী?”

লারসেন তার চোখের দিকে তাকাল। “তুমি কী মনে করো?”

মারদেকা একটু ভেবে বলল, “কোনো চিহ্ন।” আবার চাকতিটার দিকে তাকাল। “হয়তো কোনো লোককে চেনায়।”

লারসেন কিছু বলল না।

মারদেকা আরও কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “হয়তো পুরোনো কোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িত।”

লারসেনের চোখে সামান্য হাসি ফুটল। “এবার তুমি অনুমান করছ।”

মারদেকা মাথা নিচু করল।

লারসেন শান্ত গলায় বলল, “অনুমান করা খারাপ নয়। কিন্তু অনুমানকে সত্যি মনে করা বিপজ্জনক।”

মারদেকা মাথা তুলল। “আপনি বলেছিলেন।”

লারসেন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “আজ তোমার আরেকটা শিক্ষা হবে।”

মারদেকার চোখে কৌতূহল জ্বলে উঠল। “কী শিক্ষা?”

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। শুধু দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

মারদেকা চাকতিটা আবার পকেটে রেখে তার পেছনে বেরিয়ে এল।

বাড়ির পেছনে র&#x200d;্যাঞ্চের পুরোনো শেডের আড়ালে একটা ছোট খোলা জায়গা ছিল। একসময় সেখানে ঘোড়ার সরঞ্জাম রাখা হতো। এখন জায়গাটা প্রায় ব্যবহার হয় না। চারদিকে খসখসে কাঠের বেড়া। এক পাশে পড়ে আছে শুকনো গাছের মোটা গুঁড়ি। মাটির ওপর ছোট ছোট পাথর, শুকনো ঘাস আর পুরোনো খড়ের টুকরো ছড়িয়ে আছে। জায়গাটার ওপারে কোনো বাধা নেই। শুধু বিস্তৃত প্রেইরি।

সকালের বাতাসে ঘাসের সমুদ্র ধীরে ধীরে দুলছে। দূরে পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আলো আরও নেমে এসেছে। কোথাও একটা বাজপাখি আকাশে চক্কর দিচ্ছে। তার ডানার নিচে আলো পড়ে এক মুহূর্তের জন্য সাদা ঝিলিক দেখা গেল। তারপর সে আবার উঁচুতে উঠে গেল।

লারসেন মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চারপাশ দেখল। তারপর কোমরের পাশ থেকে একটা ছুরি বের করল। 

মারদেকার চোখ সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটার দিকে চলে গেল। ছুরিটা বড় নয়। হাতলের কাঠ বহু ব্যবহারে মসৃণ হয়ে গেছে। ফলার একপাশে সকালের সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে। ধাতুর ওপর বয়সের ক্ষীণ দাগ আছে, কিন্তু ধার এখনও পরিষ্কার।

মারদেকা বুঝে গেল। তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

তার মুখের পরিবর্তন লারসেনের চোখ এড়াল না। বলল, “আজ থেকে তুমি ছুরি নিক্ষেপ শেখা শুরু করবে।”

কথাটা শুনে মারদেকা কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। যেন সে নিজের কানে শোনা কথাটা বিশ্বাস করতে চাইছে, কিন্তু পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না।

লারসেন এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তবে মনে রেখো, এটা খেলা নয়।”

মারদেকার মুখের আনন্দ একটু থেমে গেল। সে গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে দাঁড়াল।

লারসেন গাছের গুঁড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। পুরোনো কাঠের গায়ে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা দাগ। কোথাও কুঠারের আঘাত, কোথাও কাঠের ফাটল, কোথাও পুরোনো ছুরির সরু চিহ্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঠের রং মলিন হয়ে গেছে, কিন্তু প্রতিটি দাগ এখনও নিজের গল্প বহন করছে।

লারসেন একটা নির্দিষ্ট জায়গার দিকে ইঙ্গিত করল। “ওখানে তাকাও।”

মারদেকা তাকাল। 

“কী দেখছ?”

“অনেক দাগ।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “কোনটা নতুন?”

মারদেকা চোখ সরু করল। বাতাসে শুকনো ঘাসের ডগা দুলছে। তার মাঝেও ছেলেটার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সে মাঝামাঝি একটা সরু দাগ দেখিয়ে বলল, “ওটা।”

লারসেন সন্তুষ্ট হলো। “ভালো। তোমার চোখ এখনও কাজ করছে।” 

তারপর সে মারদেকাকে কয়েক পা দূরে নিয়ে গেল। “এখানে দাঁড়াও।”

মারদেকা দাঁড়াল। লারসেন তার পায়ের দিকে তাকাল। কয়েক সপ্তাহের শিক্ষা তার চোখে অভ্যাস হয়ে গেছে। দুই পা পাশাপাশি নয়। শরীরের ভার একদিকে জমিয়ে নয়। মাটির ওপর এমনভাবে দাঁড়াতে হবে যেন হঠাৎ নড়তে হলেও ভারসাম্য হারিয়ে না যায়।

মারদেকা নিজের পায়ের অবস্থান ঠিক করল। লারসেন বলল, “গত কয়েক সপ্তাহে আমরা যে জিনিসটা শিখেছি, আজ সেটাই কাজে লাগবে।”

মারদেকা বুঝল। “পায়ের ভারসাম্য?”

“হ্যাঁ।”

লারসেন ছুরিটা তার হাতে দিল। “ধরো।”

মারদেকা সাবধানে ছুরিটা ধরল। লারসেন তার আঙুলের অবস্থান দেখল। তারপর বলল, “স্বাভাবিকভাবে ধরো। শক্ত করে নয়।”

মারদেকা হাতের চাপ কমাল।

লারসেন বলল, “এখন ছুরিটাকে অস্ত্র হিসেবে ভাববে না। ওজন হিসেবে অনুভব করো।”

মারদেকা ছুরিটার দিকে তাকাল। হাতের তালুতে ধাতুর ঠান্ডা অনুভূত হলো। কিছুক্ষণ পর বলল, “ভারটা সামনে।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক।”

সে ছুরিটা আবার নিজের হাতে নিল। “আজ তুমি শুধু একটা জিনিস শিখবে। হাত, চোখ আর শরীর যেন একই মুহূর্তে একই কাজে থাকে।”

মারদেকা মন দিয়ে শুনল।

লারসেন নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত সে নড়ল না। বাতাস তার জামার প্রান্ত সামান্য দুলিয়ে দিচ্ছে। দূরের ঘাসের ওপর সূর্যের আলো নড়ছে। অথচ লারসেন যেন সবকিছুর বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তার পা মাটিতে স্থির। দৃষ্টি গাছের গুঁড়ির একটি নির্দিষ্ট জায়গায়। তারপর হঠাৎ তার হাত এগিয়ে গেল। ছুরিটা বাতাস কেটে গিয়ে গাছের গুঁড়িতে গিয়ে ঠুকে বসে রইল।

মারদেকার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সে প্রায় এগিয়ে যাচ্ছিল।

লারসেন শান্ত গলায় বলল, “থামো।”

মারদেকা থেমে গেল।

লারসেন ছুরিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “প্রথম শিক্ষা?”

মারদেকা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “তাড়াহুড়ো করা যাবে না।”

লারসেন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। “আগে দাঁড়াতে হবে। তারপর লক্ষ্য দেখতে হবে।”

মারদেকার হাতে এবার ছুরিটা উঠল। উত্তেজনা তার চোখে স্পষ্ট। 

লারসেন সেটা বুঝতে পারল। “নিজেকে শান্ত করো।”

মারদেকা গভীর শ্বাস নিল। তারপর নিজের জায়গায় দাঁড়াল। গাছের গুঁড়ির দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা গেল না। তারপর ছুরিটা তার হাত থেকে বেরিয়ে গেল। কাঠের গুঁড়িতে লাগল না। মাটির পাশে গিয়ে পড়ল। মারদেকার মুখে হতাশা নেমে এল।

লারসেন ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভালো।”

মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল।

লারসেন বলল, “এখন তুমি জানলে, শুধু ইচ্ছা করলেই হয় না।”

মারদেকা মাটিতে পড়ে থাকা ছুরিটার দিকে তাকাল। সে সেটা তুলে নিল।

দ্বিতীয়বারও লক্ষ্যভেদ হলো না। তৃতীয়বার ছুরিটা গুঁড়ির কিনারায় গিয়ে লাগল, কিন্তু কাঠে আটকে থাকার আগেই নিচে পড়ে গেল। মারদেকার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

লারসেন তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, রাগ হচ্ছে। “রাগ করছ?”

মারদেকা মাথা নেড়ে বলল, “না।”

লারসেনের কণ্ঠে কঠোরতা এল। “করছ।”

মারদেকা এবার চুপ করে গেল।

লারসেন তার কাছে এসে দাঁড়াল। সকালের আলোয় দুজনের ছায়া শুকনো মাটির ওপর লম্বা হয়ে পড়ে আছে। “এই রাগটাই কিন্তু তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু হতে পারে।”

মারদেকা নিচু গলায় বলল, “আমি পারব।”

লারসেন বলল, “পারবে। কিন্তু পারার আগে ব্যর্থ হতে হবে।”

কিছুক্ষণ পরে মারদেকা আবার ছুরিটা হাতে নিল। লারসেন এবার তাকে থামিয়ে দিল। 
“চোখ বন্ধ করো।”
 
মারদেকা অবাক হলেও চোখ বন্ধ করল। চারপাশের শব্দ তখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। দূরে ঘোড়ার নড়াচড়া, কাঠের কোথাও হালকা কড়কড় শব্দ, বাতাসে ঘাসের ঘর্ষণ, আর অনেক দূরে কোনো পাখির ডাক।

লারসেন বলল, “পায়ের নিচের মাটি অনুভব করো।”

মারদেকা স্থির রইল।

“এখন চোখ খোলো।”

সে চোখ খুলল।

“এবার কাঠের গুঁড়িটা দেখো না,” লারসেন বলল। “একটা নির্দিষ্ট জায়গা দেখো।”

মারদেকা গাছের গুঁড়ির ওপর ছোট একটা দাগ বেছে নিল। তার দৃষ্টি সেখানে স্থির হলো। কিছুক্ষণ পর ছুরিটা তার হাত থেকে বেরিয়ে গেল। এবার ছুরিটা গুঁড়ির মাঝামাঝি গিয়ে আঘাত করল। কাঠের ভেতর ছুরিটা কেঁপে উঠল।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত নড়ল না। তারপর মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।

লারসেনও সামান্য হাসল। “এইবার হয়েছে।”

মারদেকার চোখে আনন্দ জ্বলে উঠল। “আমি পেরেছি!”

লারসেন বলল, “একবার সফল হওয়া মানে শেখা শেষ নয়।”

মারদেকার হাসি একটু কমে গেল। সে মাথা নেড়ে আবার ছুরির দিকে এগোল।

তারপর আরও কয়েকবার চেষ্টা হলো। কখনও ছুরি কাঠে লাগল, কখনও পাশে গিয়ে পড়ল, কখনও গুঁড়ির ওপর আঘাত করে মাটিতে গড়িয়ে গেল। সূর্য ধীরে ধীরে আরও ওপরে উঠতে লাগল। সকালের ঠান্ডা একটু একটু করে কমে এল। শুকনো ঘাসের ওপর শিশির শুকিয়ে গেল। দূরের পাহাড়ের ছায়া সরে গিয়ে আরও বেশি জায়গা সোনালি আলোয় ভরে উঠল। 

মারদেকার কপালে ঘাম জমল।

লারসেন তাকে থামাল। “আজ যথেষ্ট।”

মারদেকা ক্লান্ত গলায় বলল, “আরেকবার।”

লারসেন মাথা নেড়ে না বলল। “শরীর ক্লান্ত হয়ে গেলে শেখার ওপর জোর করা উচিত নয়।”

মারদেকা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছুরিটা ফিরিয়ে দিল।

লারসেন সেটা কোমরের পাশে গুঁজে নিল। 

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

গাছের গুঁড়িতে নতুন দাগগুলো সকালের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পুরোনো দাগের ভিড়ে তারাও এখন নতুন হয়ে উঠেছে। খুব বড় নয়, খুব গভীরও নয়। কিন্তু মারদেকা জানে, এগুলো তার নিজের হাতের তৈরি।

লারসেন গাছটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ তুমি একটা জিনিস বুঝলে।”

মারদেকা তার দিকে তাকাল। 

“ছুরি নিক্ষেপের আসল লড়াই লক্ষ্য আর ছুরির মধ্যে নয়।”

দূরে তখন বাডের গলা শোনা গেল। র&#x200d;্যাঞ্চের লোকজনকে সে কোনো নির্দেশ দিচ্ছে। তারপর ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি উঠল। একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল। র&#x200d;্যাঞ্চ আবার দিনের কাজে ঢুকে পড়েছে।

লারসেন হাঁটতে শুরু করল।

মারদেকা তার পাশে এসে হাঁটল।

কয়েক পা এগিয়ে লারসেন হঠাৎ থেমে গেল। মাটির দিকে তাকিয়ে সে বলল, “এখানে কী দেখছ?”

মারদেকা নিচু হলো। শুকনো মাটিতে মানুষের পুরোনো বুটের দাগ। তার পাশে ঘোড়ার খুরের চাপ। কয়েকটি ঘাস মাটির দিকে বাঁকা হয়ে আছে। বাতাসে কিছু দাগ ইতিমধ্যে ঝাপসা হয়ে গেছে। সে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে বলল, “কেউ এখানে দাঁড়িয়েছিল।”

লারসেন জিজ্ঞেস করল, “কতক্ষণ?”

মারদেকা আবার দাগগুলোর দিকে তাকাল। তারপর মাথা তুলল। “জানি না।”

লারসেনের চোখে সন্তুষ্টির ক্ষীণ ছাপ ফুটে উঠল। “এই উত্তরটাই চাই। যেটা জানো না, সেটা জানি না বলতে পারা বড় শিক্ষা।”

মারদেকা মাথা নেড়ে আবার তার পাশে হাঁটতে লাগল। র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে ফিরতে ফিরতে সে পকেটের ভেতর হাত ঢোকাল। আঙুলের ডগায় ঠান্ডা ধাতব চাকতিটা অনুভব করল। গত রাতের রহস্য এখনও তার সামনে অন্ধকার।

অচেনা লোকগুলো কারা, কেন তারা এসেছিল, কেন তাদের একজন সেই চাকতি রেখে গেল, লারসেন তার সম্পর্কে কতটা জানে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও নেই।

কিন্তু আজ সকালে সে অন্য কিছু শিখেছে। অন্ধকারের মধ্যে শুধু সাহস নিয়ে হাঁটা যায় না। চোখ খোলা রাখতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়। নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আর সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে নিজের ভেতরের ভয় ও রাগকে নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দেওয়া যায় না।

সামনে লারসেন হাঁটছিল। তার কোমরের পাশে ছুরিটা নীরবে দুলছিল। সকালের আলোয় তার ধাতব ফলায় মাঝেমধ্যে সূর্যের ক্ষীণ ঝিলিক দেখা যাচ্ছিল। পেছনে পড়ে রইল পুরোনো গাছের গুঁড়িটা। তার গায়ে এখন মারদেকার হাতে তৈরি কয়েকটি নতুন দাগ। ছোট দাগ। অগভীর দাগ। কিন্তু নিজের হাতে তৈরি।

মারদেকা আরেকবার পকেটের ভেতর চাকতিটা স্পর্শ করল। তারপর চোখ তুলে সামনে তাকাল।

র&#x200d;্যাঞ্চের বাড়ি ধীরে ধীরে কাছে আসছে। উঠোনে লোকজনের চলাফেরা। ঘোড়ার শব্দ। কাঠের চাকার কড়কড়। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে সকালের খাবারের গন্ধ। 
জীবন যেন আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু লারসেন জানে, এই স্বাভাবিকতা স্থায়ী নয়।

প্রেইরির ওপারে কোথাও যারা রাতের অন্ধকারে এসেছিল, তারা হয়তো এখনও তাকিয়ে আছে। হয়তো তারা দূর থেকে র&#x200d;্যাঞ্চের গতিবিধি দেখছে। হয়তো তারা অপেক্ষা করছে পরবর্তী সুযোগের জন্য। আর তাদের একজন বাঁ পায়ে সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটে। এই ছোট্ট তথ্যটাই এখন লারসেনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

সে জানে, মানুষের মুখ মনে রাখা কঠিন। কিন্তু হাঁটার ভঙ্গি বদলানো আরও কঠিন। 
মারদেকা সেটা লক্ষ্য করেছে। এই কারণেই ছেলেটাকে আরও শেখানো দরকার। 

শুধু ছুরি নয়। শুধু চোখ নয়। মানুষকে পড়তে হবে। মাটিকে পড়তে হবে। বাতাসকে পড়তে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের ভেতরটাকেও পড়তে হবে।

র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে ঢোকার আগে লারসেন একবার পেছনে তাকাল। দূরের প্রেইরি তখন পুরোপুরি সূর্যের আলোয় ভেসে গেছে। রাতের অন্ধকারের কোনো চিহ্ন সেখানে নেই। শুধু ঘাসের ঢেউ আর তার ওপরে নীল আকাশ। তবু লারসেনের চোখে সেই প্রেইরি শান্ত মনে হলো না।

বাড়িতে ঢোকার আগে লারসেন একবার পেছনে তাকাল। তার চোখ প্রথমে শেডের দিকে গেল। তারপর উত্তরের বেড়া। তারপর পশ্চিমের খোলা জমি। এরপর দূরের পাহাড়। ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। মারদেকা তার পেছনে।

ঘরের ভেতর এখন আর সকালের সেই ঠান্ডা নেই। জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকে মেঝের একটা বড় অংশ উজ্জ্বল করে তুলেছে। টেবিলের ওপর আগের মতোই এলি ব্রুকসের চিঠি পড়ে আছে। পাশে পুরোনো চামড়ার টুকরো। তার পাশে কালচে ধাতব চাকতিটা।

লারসেন চেয়ার টেনে বসল। কিন্তু বসেও বিশ্রাম নিল না। তার চোখ চাকতিটার ওপর গিয়ে স্থির হলো। হাত বাড়িয়ে টেবিলের চাকতিটা তুলে নিল। আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে দেখল। ধাতব পৃষ্ঠে সময়ের ক্ষত আছে। কোথাও ক্ষীণ আঁচড়, কোথাও কালচে জমাট দাগ। মাঝখানের চিহ্নটা এত পুরোনো যে তার রেখাগুলো প্রায় মসৃণ হয়ে এসেছে। তবু লারসেনের চোখে সেটার প্রতিটি বাঁক এখনও পরিষ্কার।

বহু বছর আগে সে এই চিহ্ন দেখেছিল। খুব কাছ থেকে। এমন এক সময়, যখন সে এখনও লারসেন হয়ে ওঠেনি। সেই স্মৃতিটা হঠাৎ তার মনে উঠল, কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে সরিয়ে দিল। এখন অতীতে ফিরে যাওয়ার সময় নয়। বর্তমানই যথেষ্ট বিপজ্জনক।

সে চিঠিটা আবার হাতে নিল। এলি ব্রুকসের লেখা কয়েকটি লাইন তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। তিনটি জায়গা। তিনটি চিহ্ন। আর মাঝখানে তার র&#x200d;্যাঞ্চ। 

এতদিন সে ভেবেছিল, হয়তো জমির কোনো পুরোনো মালিকানা নিয়ে ব্যাপারটা। হয়তো পুরোনো কোনো দলিল, কোনো গোপন জমি, কোনো খনিজ সম্পদ। কিন্তু গত রাতের লোকগুলো সেই ধারণাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

যদি শুধু জমির জন্য তারা আসত, তবে এতটা সাবধানে আসার প্রয়োজন ছিল না। তারা গুলি চালিয়েছে।

কিন্তু র&#x200d;্যাঞ্চে ঢোকার পর যতটা সময় পেয়েছিল, তার মধ্যে কেউ লুটপাট করেনি। একটা ঘোড়াই শুধু নিয়েছে। সেটারও যুৎসই কোন কারণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।তবে আর কিছু নেওয়ার চেষ্টা করেনি। খাবার বা অস্ত্র চুরি করেনি। তারা যেন শুধু কিছু খুঁজছিল। আর সেই কিছুটা কী?

লারসেনের চোখ মারদেকার ওপর গিয়ে থামল। তার কাছে থাকা দ্বিতীয় চাকতিটা যেন অদৃশ্যভাবে এই প্রশ্নের উত্তর বহন করছে।

মারদেকা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়াল। “ওরা কি এইটার জন্য এসেছিল?” সে জিজ্ঞেস করল।

লারসেন চাকতিটা নামিয়ে রাখল। “হতে পারে।”

“কিন্তু, প্রথমটা তো সে ফেলে গিয়েছিল।” 

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “হতে পারে দুটো এক জিনিস নয়।”

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। সে আর প্রশ্ন করল না।

এই ছেলেটার একটা পরিবর্তন লারসেন লক্ষ করল। কয়েক মাস আগে হলে মারদেকা পরপর প্রশ্ন করত। এখন সে অপেক্ষা করতে শিখছে। উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত চুপ থাকতে পারছে। গত কয়েক সপ্তাহের শিক্ষা হয়তো সত্যিই তার ভেতরে জায়গা করে নিচ্ছে।

লারসেন জানালার দিকে তাকাল। বাইরে বাড এখন শেডের পাশে দাঁড়িয়ে। তার সঙ্গে ক্লে মরগান কথা বলছে। দুজনের মুখের ভঙ্গি দেখে বোঝা যায়, তারা কোনো সাধারণ র&#x200d;্যাঞ্চের ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করছে না।

কিছুক্ষণ পর বাড দরজায় এসে দাঁড়াল। “লারসেন।”

লারসেন মাথা তুলল।

বাড ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। তার হাতে একটা ছোট কাপড়ের টুকরো। মুখে আগের চেয়ে বেশি গম্ভীর ভাব। সে টেবিলের ওপর কাপড়টা রাখল। “পশ্চিমের বেড়ার কাছে পেয়েছি।”

লারসেন কাপড়টা তুলে নিল। আঙুলের মধ্যে ঘষে দেখল। সেটা মাটির রঙে মলিন হয়ে গেছে। একটা প্রান্ত ছেঁড়া। কাপড়ের ওপর শুকনো কাদার দাগ।

বাড বলল, “আর পেয়েছি কতগুলো ঘোড়ার খুরের দাগ।”

লারসেন চোখ তুলল। “কয়টা?”

“দুটো ঘোড়া। একজনের ঘোড়া ভারী ছিল। অন্যটার খুর ছোট।”

লারসেন কাপড়টা নামিয়ে রাখল। তার চোখে চিন্তার ছাপ ঘন হলো।

“ওরা কি দুজন ছিল?”

বাড মাথা নেড়ে বলল, “নিশ্চিত নই। তবে দাগ দুটো আলাদা।” একটু ইতস্তত করে বলল, “মারদেকা যে লোকটার কথা বলেছিল, তার মতো একটা পায়ের দাগও আছে।”

ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। কথাটা শুনে তার চোখ বাডের দিকে উঠল।

বাড কাপড়টা আবার তুলে দেখাল। “ডান পায়ের ছাপ গভীর। বাঁ পায়েরটা তুলনায় হালকা। মনে হচ্ছে লোকটা বাঁ পায়ে পুরো ভর দিচ্ছিল না।”

লারসেন উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এবার আগের সেই স্থিরতা নেই। তার জায়গায় এসেছে ঠান্ডা মনোযোগ। সে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। পশ্চিম দিকের প্রেইরি সকালের আলোয় চকচক করছে। ঘাসের ঢেউয়ের মধ্যে কোথাও কোনো মানুষ নেই। কোনো ঘোড়া নেই। শুধু দূরে কয়েকটা কালো বিন্দু, হয়তো গরু।

মারদেকা তখনও জানালার দিকে তাকিয়ে।

লারসেন তার দিকে ফিরে বলল, “তুমি যে লোকটার হাঁটার কথা বলেছিলে, সেটা আবার মনে করার চেষ্টা করো।”

মারদেকা চোখ বন্ধ করল না। বরং জানালার বাইরে তাকিয়েই স্মৃতিটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল। রাতের অন্ধকার। ঘোড়ার ছায়া। মানুষের দৌড়।

তারপর একজন একটু ধীরে হাঁটছে। বাঁ পা। সে ধীরে বলল, “লোকটা পুরোপুরি খুঁড়িয়ে হাঁটছিল না।”

লারসেন অপেক্ষা করল।

“শুধু বাঁ পায়ে চাপ কম ছিল। যেন ব্যথা ছিল।”

“আর কিছু?”

মারদেকা কপাল কুঁচকাল। “সে ঘোড়ার কাছে যাওয়ার আগে একবার থেমেছিল।”

“কেন?”

“জানি না।”

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “ভালো। জানো না বলেছ।”

মারদেকা এবার তার দিকে তাকাল।

লারসেনের মুখে সামান্য প্রশান্তি দেখা গেল।

এই ছেলেটাকে তাড়াহুড়ো করে বড় করে তোলা যাবে না। সে এখনও শিশু। কিন্তু তার চোখের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। সেই চোখকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

টেবিলের ওপর রাখা চাকতিটার দিকে তার দৃষ্টি আবার গেল। হয়তো এই ছোট ধাতব টুকরোটাই সেই পুরোনো দরজার চাবি, যার অস্তিত্ব এতদিন সে ভুলে থাকতে চেয়েছিল।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/265094/</link>
				<pubDate>Mon, 24 Aug 2026 04:43:37 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–সতের<br />
আকাশে কোনো মেঘ নেই। ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে প্রেইরির ওপর। রাতের শেষ অন্ধকার অনেক আগেই সরে গেছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ঠান্ডা এখনও বাতাসের মধ্যে মিশে আছে। পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠে এসেছে, আর তার ফ্যাকাশে সোনালি আলো ধীরে ধীরে শুকনো ঘাসের মাথা, কাঠের বেড়া, র&#x200d;্যাঞ্চের পুরোনো বাড়ি&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-265094"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/265094/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">2783c33514a154ee3d148b5116b6d1d9</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–ষোল
ভোর হওয়ার আগের সেই শেষ অন্ধকারটা অন্য সব রাতের অন্ধকারের চেয়ে আলাদা। রাত তখন আর গভীর হচ্ছে না, যদিও সকাল এখনও দিগন্তের ওপারে। পূর্ব আকাশের নিচু প্রান্তে কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তারাগুলোর ধার যেন ধীরে ধীরে ভোঁতা হয়ে আসছে। প্রেইরির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাস শুকনো ঘাসের মাথাগুলোকে একবার এদিকে, একবার ওদিকে নুইয়ে দিচ্ছে। দূরে কোনো অচেনা নিশাচর পাখি একবার ডেকে থেমে গেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের বাড়ি, শেড, আস্তাবল আর বেড়ার সারি অন্ধকারের মধ্যে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কয়েক ঘণ্টা আগের গুলির শব্দ এখনও তাদের কাঠের শরীরের ভেতরে জমে আছে।

উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল ওলফ লারসেন। তার ডান হাতে রিভলভার। বাঁ হাতের মুঠোয় ধরা কালচে ধাতব চাকতিটা। লণ্ঠনের হলুদ আলো বাতাসে দুলছিল, আর সেই দুলতে থাকা আলোয় চাকতিটির গায়ে খোদাই করা চিহ্নটা কখনও স্পষ্ট, কখনও অস্পষ্ট হয়ে উঠছিল। শেডের কাঠে যেখানে গুলি লেগেছে, সেখানে এখনও তাজা ক্ষত দেখা যাচ্ছে। কাঠের ছোট ছোট টুকরো মাটিতে ছড়িয়ে আছে। কোথাও কোথাও পোড়া কাঠের গন্ধের সঙ্গে বারুদের গন্ধ মিশে আছে। কয়েকটি ঘোড়া আস্তাবলের ভেতর অস্থিরভাবে পা বদলাচ্ছে। রাতের আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি।

লারসেন ধীরে ধীরে মুঠো খুলে চাকতিটার দিকে তাকাল। একই চিহ্নের আরেকটি চাকতি তার পকেটে রয়েছে। একটা পাওয়া গিয়েছিল আগেই, আরেকটা রেখে গেছে গত রাতের অচেনা লোকটা। এই সামান্য পার্থক্যটাই এখন তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ যদি শুধু ভয় দেখাতে আসত, গুলি চালিয়ে চলে যেত। কেউ যদি ঘোড়া চুরি করতে আসত, ঘোড়াটা নিয়ে পালাত। কিন্তু এই লোকগুলো ঘোড়া নিয়েছে, গুলি চালিয়েছে, আর তার সঙ্গে রেখে গেছে একটা চিহ্ন। এমন কাজ কখনও উদ্দেশ্য ছাড়া হয় না।

বাড ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। তার হাতে এখনও রাইফেল। কয়েক মুহূর্ত সে চাকতিটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “দুটো দেখতে একই রকম।”

লারসেন চাকতিটা আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে শান্ত গলায় বলল, “দেখতে একই। কিন্তু একই জিনিস আর একই অর্থ এক কথা নয়।”

বাড ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি কি মনে করছেন, দুটো আলাদা উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে?”

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে চাকতিটা লণ্ঠনের আরও কাছে নিয়ে গিয়ে ধাতুর গায়ে জমে থাকা ক্ষীণ দাগগুলো পরীক্ষা করল। তারপর ধীরে বলল, “এখনও জানি না। তবে দুটো একসঙ্গে এখানে আসেনি, এটা আমি নিশ্চিত।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আপনি এই চিহ্ন আগেও দেখেছেন।”

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত তার চোখ স্থির রইল বাডের মুখে। তারপর ধীরে বলল, “হ্যাঁ। বহু বছর আগে।”

বাডের কণ্ঠ নিচু হয়ে এল। “কোথায়?”

লারসেন উত্তর দেওয়ার আগে চারপাশে একবার তাকাল। ক্লে মরগান, রুবেন কোল, মিগুয়েল আর হ্যাঙ্ক ডসনও কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। রাতের গুলির শব্দে সবাই জেগে উঠেছিল, কিন্তু এখন তাদের চোখে ঘুমের কোনো চিহ্ন নেই। প্রত্যেকেই বুঝতে পারছে, লারসেনের হাতে থাকা ছোট্ট ধাতব চাকতিটা গত রাতের হামলার চেয়েও বড় কোনো রহস্যের দরজা খুলে দিয়েছে।

লারসেন ধীরে চাকতিটা মুঠোয় বন্ধ করে বলল, “কোথায় দেখেছিলাম, সেটা এখন বলার সময় হয়নি।”

ক্লে মরগান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “তাহলে জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ।”

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে সামান্য মাথা নাড়িয়ে বলল, “খুব।”

রুবেন কোল নিচু গলায় বলল, “চিহ্নটা কি কোনো দলের?”

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “হতে পারে।”

মিগুয়েল এবার জিজ্ঞেস করল, “কোন দলের?”

লারসেন ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলল, “সেটা এখনও জানি না। আর একটা চিহ্ন দেখেই কোনো দলের নাম বলে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।”

ক্লে একটু এগিয়ে এসে বলল, “কিন্তু গত রাতের লোকগুলো এটা ইচ্ছে করেই রেখে গেছে।”

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “সেটা আমি অস্বীকার করছি না।” তারপর সে চাকতিটা আবার লণ্ঠনের আলোয় ধরল। “কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কেন রেখে গেল?”

কেউ কোন উত্তর দিল না। 

প্রেইরির ওপর দিয়ে হঠাৎ একটু জোরে বাতাস বয়ে গেল। লণ্ঠনের শিখা কেঁপে উঠল। শেডের ছায়া কয়েক মুহূর্তের জন্য উঠোনের ওপর লম্বা হয়ে পড়ল, তারপর আবার আগের জায়গায় ফিরে এল। সেই ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা সবাই যেন একই অদৃশ্য প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

লারসেন ধীরে বলল, “আজ রাতের ঘটনা এখানেই শেষ নয়। কিন্তু এখন আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হবে অন্ধকারের মধ্যে ছুটে গিয়ে কাউকে খুঁজতে যাওয়া।”

হ্যাঙ্ক ডসন রাইফেলের বাঁটটা শক্ত করে ধরে বলল, “তাহলে আমরা বসে থাকব?”

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল, “বসে থাকব না। ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করব। আলো হলে মাটি কথা বলবে।”

বাড ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “আপনি পায়ের চিহ্নের কথা বলছেন।”

লারসেন শান্ত গলায় বলল, “পায়ের চিহ্ন, ঘোড়ার খুরের দাগ, ভাঙা ঘাস, মাটির চাপ, সবকিছু। রাতের অন্ধকারে মানুষ অনেক কিছু লুকাতে পারে, কিন্তু ভোরের আলো মাটির স্মৃতি মুছে দেয় না।”

কথাটা শুনে সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

মারদেকা এতক্ষণ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার শরীরের ওপর রাতের ঠান্ডা জমে আছে, কিন্তু সে সেটা অনুভব করছে না। তার চোখ বারবার লারসেনের মুঠোয় থাকা চাকতিটার দিকে চলে যাচ্ছিল। চাকতিটা তার কাছে কেবল অচেনা ধাতব টুকরো নয়। সে বুঝতে পারছে, লারসেন ওটা দেখার পর বদলে গেছে। খুব সামান্য বদল, কিন্তু সেই সামান্য পরিবর্তনই মারদেকার চোখ এড়ায়নি। আগের মতোই লোকটা শান্ত, আগের মতোই তার মুখে কোনো আতঙ্ক নেই, কিন্তু তার চোখে এখন যেন অন্য কোনো সময়ের ছায়া এসে পড়েছে।

ইলাই ধীরে ধীরে মারদেকার পাশে এসে দাঁড়াল। সে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “ঠান্ডা লাগছে?”

মারদেকা মাথা নাড়িয়ে বলল, “না।”

ইলাই তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, ছেলেটা ঠান্ডার কথা ভাবছে না। সে মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কী ভাবছ?”

মারদেকা কিছুক্ষণ লারসেনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “লারসেন চাকতিটা দেখে ভয় পেয়েছেন।”

ইলাই অবাক হয়ে বলল, “তুমি তাই মনে করছ?”

মারদেকা ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু ভয় পেলে মানুষ পিছিয়ে যায়। তিনি পিছিয়ে যাননি।”

ইলাই কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

মারদেকা আবার ধীরে বলল, “তাই হয়তো এটা ঠিক ভয় নয়। তিনি এমন কিছু মনে করেছেন, যেটা আমরা জানি না।”

ইলাই ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কথাটা বয়সের তুলনায় অদ্ভুত পরিণত মনে হলো। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই দূর থেকে লারসেনের গলা শোনা গেল। “মারদেকা।”

ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল।

লারসেন হাতের চাকতিটা পকেটে রেখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “এদিকে এসো।”

মারদেকা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। সবাই একটু সরে দাঁড়াল। লারসেন কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “তুমি কী ভাবছিলে?”

মারদেকা একটু ইতস্তত করে বলল, “আমি ভাবছিলাম, আপনি চাকতিটা দেখে ভয় পেয়েছেন।”

লারসেনের চোখে ক্ষীণ একটা পরিবর্তন দেখা গেল। সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেন?”

মারদেকা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “কারণ চাকতিটা হাতে নেওয়ার পর আপনি আর আগের মতো কথা বলছেন না।”

লারসেন চুপ করে রইল।

মারদেকা এবার নিজের কথাগুলো আরও গুছিয়ে বলতে শুরু করল। “আপনি প্রথমে চিহ্নটার দিকে তাকালেন। তারপর শেডের দিকে তাকালেন। তারপর আস্তাবলের দিকে। তারপর আবার চাকতিটার দিকে। মনে হলো, এই তিনটা জায়গার মধ্যে কোনো সম্পর্ক খুঁজছেন।”

বাডের চোখ এবার বড় হয়ে উঠল। ক্লে মরগানও ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

লারসেন ধীরে বলল, “আর?”

মারদেকা বলল, “বাড যখন জিজ্ঞেস করল চাকতিটা কী, তখন আপনি উত্তর দিতে দেরি করলেন। কিন্তু ক্লে যখন জিজ্ঞেস করল কোথায় দেখেছিলেন, তখনও আপনি জায়গাটার নাম বললেন না। মনে হলো, জায়গাটা আপনি মনে করতে চাইছেন না।”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “তুমি অনেক কিছু লক্ষ্য করেছ।”

মারদেকা মাথা নিচু করে বলল, “আমি শুধু দেখেছি।”

লারসেনের চোখে এবার প্রথমবারের মতো মুগ্ধতার ক্ষীণ ছাপ ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে মারদেকার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “শুধু দেখা আর লক্ষ্য করা এক জিনিস নয়। বেশিরভাগ মানুষ চোখ দিয়ে দেখে, কিন্তু খুব কম মানুষ দেখে কী বদলেছে।”

মারদেকা চুপ করে রইল।

লারসেন আবার বলল, “তুমি যা দেখেছ, সেটা ঠিকভাবে বলেছ। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবে। তুমি যা দেখেছ আর তুমি যা ভেবেছ, এই দুটোকে কখনও এক করে ফেলবে না।”

মারদেকা মাথা তুলে তাকাল।

লারসেন ধীরে বলল, “দেখা জিনিস হলো সত্য। তার অর্থ কী, সেটা হলো অনুমান। অনুমান ভুল হতে পারে।”

মারদেকা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “তাহলে আমি ভুলও হতে পারি?”

লারসেনের মুখে এবার খুব সামান্য হাসি ফুটল। সে মাথা নেড়ে বলল, “অবশ্যই। আমিও পারি।”

বাড বিস্মিত চোখে লারসেনের দিকে তাকাল। লারসেন নিজের ভুলের সম্ভাবনা এত সহজে স্বীকার করে, এটা সে খুব কমই শুনেছে।

মারদেকা আবার চাকতিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে আপনি কি জানেন, এটা কী?”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “আমি কিছু জানি।”

মারদেকা অপেক্ষা করল।

লারসেন ধীরে যোগ করল, “আর কিছু জিনিস জানতে চাই।”

মারদেকা বলল, “যে লোকগুলো এসেছিল, তারা কি এই চিহ্নের জন্য এসেছিল?”

লারসেন এবার তার দিকে গভীরভাবে তাকাল। তারপর ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলল, “হতে পারে। আবার নাও হতে পারে।”

মারদেকা কিছু বলল না।

লারসেন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু তুমি একটা ভালো প্রশ্ন করেছ।”

ছেলেটার চোখে সামান্য আলো ফুটে উঠল।

লারসেন আর কিছু না বলে সরে গেল। কিন্তু তার ভেতরে তখন অন্য একটা চিন্তা জন্ম নিয়েছে।

এতদিন সে মারদেকাকে দেখেছে একটা বুনো ছেলে হিসেবে, যে পাহাড়ি গ্রাম থেকে পালিয়ে এসে শহরে আশ্রয় নিয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে তার মধ্যে সাহস দেখেছে, শারীরিক ভারসাম্য দেখেছে, বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা দেখেছে। সে ভেবেছিল, ছেলেটাকে অস্ত্র ধরতে শেখানো যাবে। পায়ের অবস্থান শেখানো যাবে। চোখ ও হাতের সমন্বয় শেখানো যাবে।

কিন্তু আজ প্রথমবার সে অন্য কিছু দেখল। মারদেকা মানুষকে দেখছে। শুধু মানুষ নয়, মানুষের আচরণের ছোট ছোট পরিবর্তনও দেখছে। আর সেটা কোনো শিক্ষক তাকে শেখায়নি।

লারসেনের মনে হলো, এই ক্ষমতাটা যদি ঠিকভাবে তৈরি করা যায়, তাহলে একদিন ছেলেটা এমন কিছু দেখতে পারবে যা একজন অভিজ্ঞ বন্দুকবাজও চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। সে সিদ্ধান্তটা তখনই নেয়নি। কিন্তু সিদ্ধান্তের বীজটা তার মনে গেঁথে গেল।

এদিকে বাড শেডের দিকে এগিয়ে গিয়ে কাঠের ক্ষত পরীক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, “গুলির দিকটা দেখেছি। ও শেডের আড়াল থেকে গুলি চালিয়েছে। খুব বেশি সময় এখানে ছিল না।”

ক্লে মরগান যোগ করল, “আমি পশ্চিম দিকের মাটিতে দুই ধরনের বুটের দাগ পেয়েছি।”

লারসেনের চোখ এবার আস্তাবলের দিকে গেল। কয়েক মুহূর্ত সে কিছু বলল না। তারপর ধীরে বলল, “ঘোড়াটা তারা নিয়েছে।”

বাড বলল, “হ্যাঁ।” 

“কিন্তু ঘোড়াটাই তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল না।”

বাড তাকিয়ে রইল।

লারসেন আবার বলল, “যদি শুধু ঘোড়া নিতে আসত, তাহলে গুলি চালানোর প্রয়োজন ছিল না। আর যদি শুধু আমাদের ভয় দেখাতে আসত, তাহলে ঘোড়াটা নিয়ে যেত না।”

ক্লে মরগান বলল, “তাহলে তারা কী চেয়েছিল?”

লারসেন ধীরে পকেটের ওপর হাত রাখল। “এখনও জানি না।” তারপর একটু থেমে যোগ করল, “কিন্তু তারা কিছু খুঁজছিল।”

বাডের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “কী?”

লারসেন উত্তর দিল না। সে ধীরে মাথা তুলে প্রেইরির দিকে তাকাল। 

দিগন্তের নিচে তখন আলো ফুটতে শুরু করেছে। অন্ধকারের কালো রং ধীরে ধীরে নীলচে হয়ে আসছে। দূরের পাহাড়ের গায়ে আলো পড়েনি এখনও, কিন্তু তাদের চূড়াগুলো আকাশের পটভূমিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির বাতাসে কাঁপছে। আস্তাবলের ভেতর একটা ঘোড়া নাক ঝেড়ে আবার পা বদলাল।

রাত শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু লারসেন জানে, আসল রাত এখনও শেষ হয়নি। সে ধীরে বলল, “ভোর হলে মাটির চিহ্নগুলো দেখা হবে। কেউ এখন র&#x200d;্যাঞ্চের বাইরে যাবে না।” 

বাড মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে।”

লারসেন একবার মারদেকার দিকে তাকাল। ছেলেটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু ঘুম নেই। সে আবারও চারপাশের মাটি, শেড, আস্তাবল আর বেড়ার দিকে তাকাচ্ছে।

লারসেন কিছুক্ষণ তাকে দেখল। তারপর মনে মনে বলল, এই ছেলেটাকে আমি এতদিন যতটা দেখেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু তার ভেতরে আছে। সে এখনও জানে না, সেই ক্ষমতা তাকে কোথায় নিয়ে যাবে।

কিন্তু গত রাতের চাকতি আর মারদেকার কয়েকটি প্রশ্ন তাকে একই সঙ্গে একটা কথা বুঝিয়ে দিয়েছে। র&#x200d;্যাঞ্চকে রক্ষা করার জন্য শুধু বন্দুকধারী লোক যথেষ্ট নয়। তাদের মধ্যে এমন একজনও দরকার, যে অন্ধকারের মধ্যে অন্যরা যা দেখতে পায় না, সেটা দেখতে পারে।

লারসেন পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে চাকতিটা শক্ত করে ধরল। তারপর ধীরে বলল, “আজ অনেক কাজ আছে।”

মারদেকা তার দিকে তাকাল। লারসেন আর কিছু বলল না। দুজনের মাঝখানে ভোরের প্রথম আলো এসে পড়ছিল।

আর লারসেনের মনে তখন বহু বছরের পুরোনো একটা দরজা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছিল, যার ওপারে ছিল এক মৃত মানুষের রক্ত, একটা অচেনা চিহ্ন, আর এমন এক গল্প, যেটা সে ভেবেছিল বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে।

কিন্তু গত রাত প্রমাণ করেছে, গল্পটা শেষ হয়নি। কেউ সেই গল্পের পরের অধ্যায় লিখতে আবার ফিরে এসেছে।

ভোরের প্রথম আলো যখন র&#x200d;্যাঞ্চের কাঠের বাড়িটার ছাদের কিনারা ছুঁয়ে উঠল, তখন রাতের অন্ধকার আর এক লাফে সরে গেল না। বরং ধীরে ধীরে পিছু হটতে লাগল, যেন প্রেইরির ওপর থেকে বিদায় নেওয়ার আগে শেষবারের মতো চারপাশটা দেখে নিতে চাইছে। শেডের দেয়ালে গুলির ক্ষতগুলো এখন আরও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কাঠের ফাঁটল থেকে ছিটকে বেরিয়ে থাকা তন্তুগুলো সোনালি আলোয় চিকচিক করছে। উঠোনের মাটিতে রাতের পায়ের ছাপ, ঘোড়ার খুরের দাগ আর ছড়িয়ে থাকা কাঠের টুকরোগুলো এমনভাবে পড়ে আছে, যেন কয়েক ঘণ্টা আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এখনও শেষ হয়নি।

লারসেন বাড়ির পেছনের বারান্দা থেকে ধীরে নিচে নামল। রাতভর প্রায় চোখ বন্ধ করেনি সে, তবু তার হাঁটার ভঙ্গিতে ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই। শুধু মুখটা আগের চেয়ে কঠিন। পকেটের ভেতর রাখা ধাতব চাকতিটা হাঁটার সঙ্গে সামান্য নড়ে উঠছিল, আর প্রতিবার সেই নড়াচড়া অনুভব করলেই তার মনে এলি ব্রুকসের মুখটা আবার ভেসে উঠছিল।

ব্ল্যাক রিভারের মার্শাল খুব কম কথার মানুষ ছিল। যে মানুষ নিজের অফিসে দরজা বন্ধ করে কাউকে ডাকে, সে সাধারণত এমন কিছুই বলে, যা বাইরে ছড়িয়ে পড়ার মতো নয়। এলি তখন মানচিত্রের ওপর তিনটি জায়গা দেখিয়েছিল। তিনটি উঁচু জায়গা, যেখান থেকে দূর পর্যন্ত নজর রাখা যায়। আর সেই তিনটি জায়গাকে কল্পনায় যুক্ত করলে মাঝখানে এসে পড়ে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ।

তার মনে আবার এলি ব্রুকসের অফিসঘর ভেসে উঠল। দেয়ালের মানচিত্রে তিনটি পয়েন্ট। সেই তিনটি জায়গার মাঝখানে তার র&#x200d;্যাঞ্চ। এলির গলায় সেই সতর্কতা, আগে জায়গা দেখছে, মানুষের অভ্যাস বুঝছে, তারপর সিদ্ধান্ত নেবে।

শহরের বাইরে যে লোকগুলো কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘুরছিল, পশ্চিমের ফেরিঘাট দিয়ে যারা এসেছিল, আর গত রাতে যারা লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে ঢুকেছিল, তাদের মধ্যে কোনো না কোনো যোগসূত্র আছে।

সেদিন কথাগুলো শুনে লারসেন সতর্ক হয়েছিল। কিন্তু ভয় পায়নি। তারপর এসেছিল সিল মারা খাম।

তারপর সেই সিল মারা খাম। চিঠিটা সে কাউকে দেখায়নি। এমনকি বাডকেও নয়। কারণ এলি যে কথাগুলো লিখেছিল, সেগুলো এমন ছিল না যে কাউকে পড়ে শোনানো যায়। সেখানে নিশ্চিত কোনো নাম ছিল না, কোনো দলের উল্লেখও ছিল না। ছিল শুধু কিছু সন্দেহ, কিছু পুরোনো ঘটনার ইঙ্গিত আর একটা সতর্কতা, যা তখন লারসেন পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।

চিঠির কয়েকটি লাইন। ওরা হয়তো তোমার জমি চায় না। তোমার জমির চেয়েও পুরোনো কোনো জিনিসের জন্য ওরা ফিরে এসেছে। 

লারসেনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে তখনও বুঝতে পারেনি, এলি কী বোঝাতে চেয়েছিল। এখন চাকতিটা হাতে নিয়ে তার মনে হচ্ছে, সেই কথার ভেতরে হয়তো আরও কিছু ছিল।

এলি চিঠিতে সবকিছু লিখতে পারেনি। হয়তো পারেনি, কারণ সে জানত, বার্তাটা ভুল হাতে পড়তে পারে। হয়তো সে নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল না। কিন্তু একটা বিষয় এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই।

এখন সে বুঝতে শুরু করেছে। হয়তো। এই ‘হয়তো’ শব্দটাই তাকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলছিল।

তার পেছনে কয়েক পা দূরে মারদেকা হাঁটছিল। ছেলেটা কিছু বলছিল না। রাতের ঘটনার পর থেকে সে যেন আরও চুপচাপ হয়ে গেছে, কিন্তু তার চোখ আগের চেয়ে বেশি কাজ করছে। সে হাঁটার সময় মাটির দিকে তাকাচ্ছে, আবার মাথা তুলে শেডের দেয়াল, আস্তাবলের দরজা আর বেড়ার দিকে তাকাচ্ছে। যেন প্রতিটি জিনিসের মধ্যে কোনো অদৃশ্য সুতো খুঁজছে।

উত্তরের বেড়ার কাছে বাডকে দেখা গেল। এক হাঁটু মাটিতে, হাতে রাইফেল। সে কিছুক্ষণ একটা পায়ের ছাপ পরীক্ষা করে উঠে দাঁড়াল, তারপর কয়েক গজ এগিয়ে আবার নিচু হলো। ভোরের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা চিহ্নগুলো একে একে বেরিয়ে আসছিল।

লারসেন কাছে গিয়ে থামল। মাটির দিকে তাকিয়েই সে বলল, “কী বলছে মাটি?”

বাড নিচের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “লোকটা এই দিক দিয়ে বেরিয়েছে। বেড়ার কাছে এসে দৌড়ের গতি কমেছে।”

লারসেন হাঁটু গেড়ে বসে পায়ের চিহ্নগুলো পরীক্ষা করল। শুকনো মাটিতে বুটের গোড়ালির দাগ কয়েক জায়গায় গভীর, কিন্তু বেড়ার একেবারে কাছে এসে চাপ হঠাৎ হালকা হয়ে গেছে।

সে ধীরে বলল, “লাফ দিয়েছে।”

বাড মাথা নেড়ে বলল, “আমারও তাই মনে হচ্ছে।”

লারসেন বেড়ার ওপারের ঘাসের দিকে তাকাল। শিশির এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। কয়েকটা ঘাসের ডগা ভাঙা, কিছু নিচের দিকে চাপা। কিন্তু তার পরেই চিহ্নগুলো প্রায় মিলিয়ে গেছে। লোকটা জানত কীভাবে মাটির ওপর নিজের উপস্থিতি যতটা সম্ভব কমিয়ে ফেলতে হয়।

বাড এবার লারসেনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আরেকটা জিনিস আছে।”

লারসেন মাথা তুলল।

বাড পশ্চিম দিকের বেড়ার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “সেদিন যে চামড়ার টুকরোটা পেয়েছিলাম, সেটা কি এখনও আপনার কাছে আছে?”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর পকেট থেকে রুমালে মোড়া সরু একটা জিনিস বের করল। রুমাল খুলতেই কালচে চামড়ার ফালিটা দেখা গেল। বয়সে শক্ত হয়ে গেছে, এক প্রান্ত ছেঁড়া। মাঝখানে এমন একটা ক্ষীণ দাগ, যা প্রথম দেখায় সাধারণ আঁচড় বলেই মনে হয়।

“ফেলে দিইনি,” লারসেন বলল।

বাড মৃদু গলায় বলল, “আমি ভেবেছিলাম আপনি রাখবেন।”

লারসেন চামড়াটার দিকে তাকিয়ে বলল, “কিছু জিনিস ফেলে দিতে নেই।”

মারদেকা একটু কাছে এগিয়ে এল। লারসেন তাকে থামাল না। বরং চামড়ার টুকরোটা সকালের আলোয় এমনভাবে ধরল, যাতে ছেলেটাও দেখতে পারে।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইল।

লারসেন পকেট থেকে ধাতব চাকতিটা বের করে চামড়ার পাশে রাখল। প্রথমে দুটির মধ্যে কোনো মিল বোঝা গেল না। কিন্তু চামড়াটা সামান্য ঘুরিয়ে ধরতেই ক্ষীণ রেখাগুলো এমনভাবে মিলতে শুরু করল যে মাঝখানের নকশাটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠল।

মারদেকা নিচু গলায় বলল, “এটা পুরো চিহ্ন নয়।”

লারসেন তার দিকে তাকাল।

ছেলেটা আবার চামড়াটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ছেঁড়া অংশের সঙ্গে চিহ্নের একটা অংশও চলে গেছে।”

বাড বিস্মিত হয়ে চামড়াটার দিকে ঝুঁকে পড়ল।

লারসেন কিছু বলল না। সে শুধু চামড়ার ছেঁড়া প্রান্ত আর চাকতির চিহ্নের বাঁকগুলো পাশাপাশি মিলিয়ে দেখল।

মারদেকার কথা ঠিক।

বাড ধীরে বলল, “তাহলে চামড়াটা এই চিহ্নের সঙ্গে যুক্ত।”

লারসেন এবার দ্বিতীয় চাকতিটাও বের করল। দুটো ধাতব টুকরো পাশাপাশি রাখতেই একই চিহ্ন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।

বাতাসের সঙ্গে শুকনো ঘাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না।

মারদেকা আবার চামড়াটার দিকে তাকিয়ে বলল, “চিহ্নটা শুধু পুরোনো হয়ে মুছে যায়নি।”

লারসেন এবার চোখ তুলে তার দিকে তাকাল।

ছেলেটা বলল, “কেউ ঘষেছে।”

লারসেন চামড়াটা আঙুলের ডগায় উল্টেপাল্টে দেখল। সত্যিই দাগের চারপাশে সূক্ষ্ম ঘষার রেখা রয়েছে। চামড়ার স্বাভাবিক ক্ষয় একরকম, আর চিহ্নের ওপরের ক্ষয় অন্যরকম।

সে ধীরে বলল, “ঠিক বলেছ।”

বাড এবার গম্ভীর হয়ে উঠল। “কেউ চিহ্নটা মুছে ফেলতে চেয়েছিল।”

লারসেন শান্তভাবে বলল, “কিন্তু পুরোপুরি পারেনি।”

তার কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা ছিল না। বরং এমন এক শান্ত ভাব ছিল, যা বাডকে আরও চিন্তিত করে তুলল।

লারসেন চামড়াটা আবার পকেটে রাখল। তারপর দুটো চাকতি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

একটার প্রান্তে মরচে বেশি। অন্যটার গায়ে নতুন আঁচড়। একটা যেন বহু বছর ধরে কোথাও লুকিয়ে ছিল। অন্যটা এসেছে গত রাতের অচেনা লোকের হাত থেকে।

বাড বলল, “দুটো একসঙ্গে তৈরি হয়নি।”

লারসেন ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “সম্ভবত নয়।”

“তাহলে এত বছর পর একই চিহ্ন আবার কেন?”

লারসেন উত্তর দিল না। তার চোখের সামনে আবার এলি ব্রুকসের অফিসটা ভেসে উঠল। টেবিলের ওপর খালি কার্তুজ। দেয়ালের মানচিত্র। পশ্চিমের ফেরিঘাট দিয়ে আসা চারজন অচেনা ঘোড়সওয়ার। আর সেই চিঠি।

চিঠির শেষ অংশটা সে বহুবার পড়েছে। যদি ওরা সত্যিই সেই পুরোনো পথ ধরে এগোয়, তাহলে তোমার র&#x200d;্যাঞ্চের আশপাশে যা আছে, তার দিকে নজর রেখো। আমি নিশ্চিত নই ওরা জমির জন্য এসেছে, না জমির নিচে বা অতীতে লুকিয়ে থাকা অন্য কিছুর জন্য।

তখন কথাগুলো তার কাছে অস্পষ্ট ছিল। তবে আজ নয়। আজ সে প্রথমবার অনুভব করল, এলি হয়তো এই চিহ্নের কথা জানত। অথবা অন্তত শুনেছিল। কিন্তু সে নিশ্চিত ছিল না। তাই নাম লেখেনি। লারসেনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

মারদেকা তখনও চাকতি দুটির দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ পর সে বলল, “যে লোকটা গত রাতে এসেছিল, সে জানত এগুলোর একটা আমাদের কাছে আছে।”

বাড তার দিকে তাকাল। লারসেনও তাকাল।

মারদেকা এবার ধীরে বলল, “নইলে দ্বিতীয়টা এখানে রেখে যাওয়ার দরকার ছিল না।”

কেউ কিছু বলল না।

ছেলেটা আবার বলল, “সে যদি শুধু ভয় দেখাতে চাইত, গুলি করেই চলে যেতে পারত।”

লারসেনের চোখে ক্ষীণ একটা পরিবর্তন দেখা গেল।

মারদেকা বলল, “আর যদি শুধু ঘোড়া নিতে আসত, তাহলে চাকতিটা রেখে যেত না।”

বাড এবার পুরোপুরি ছেলেটার দিকে ফিরল।

মারদেকা একটু থেমে যোগ করল, “হয়তো সে চায় আমরা বুঝি, আগের চাকতিটা ভুলে যাইনি।”

লারসেন ধীরে চাকতি দুটো মুঠোয় বন্ধ করল। এই কথাটা সে নিজেও ভাবছিল। কিন্তু অন্য কারও মুখে শোনেনি।

এত অল্প বয়সে ছেলেটা ঘটনাগুলোকে শুধু আলাদা আলাদা করে দেখছে না। সে তাদের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজছে।

লারসেনের মনে সেই বীজটা আরও গভীরে বসে গেল। সে ধীরে বলল, “তুমি একটা জিনিস বুঝতে শুরু করেছ।”

মারদেকা তার দিকে তাকাল। “কী?”

লারসেন বলল, “ঘটনা কখনও একা আসে না। মানুষ আলাদা আলাদা চিহ্ন রেখে যায়, কিন্তু যারা মন দিয়ে দেখে, তারা বুঝতে পারে কোন চিহ্নগুলো একই পথের।”

মারদেকা কিছু বলল না।

লারসেন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই ক্ষমতা বন্দুকের চেয়েও বিরল।”

বাডের চোখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠল। লারসেন খুব কম মানুষকেই এমন কথা বলে।

দূরে বাড়ির পেছন থেকে ইলাইয়ের গলা শোনা গেল। সকালের খাবার তৈরি। কফির ধোঁয়া ঠান্ডা বাতাসে ভেসে উঠছে। র&#x200d;্যাঞ্চের অন্য লোকেরা নিজেদের কাজে ছড়িয়ে পড়ছে। ক্লে মরগান বেড়ার ভাঙা অংশ পরীক্ষা করছে। রুবেন কোল শেডের গুলির ক্ষত দেখছে। মিগুয়েল আস্তাবলের দরজা মেরামত করছে। বাইরে থেকে সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

কিন্তু লারসেন জানে, স্বাভাবিকতা এখন শুধু একটা পাতলা পর্দা।

সে পকেটে চাকতি দুটো রাখল। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “আজ কেউ র&#x200d;্যাঞ্চের সীমানা পেরোবে না। পশ্চিমের পাহাড়, নদীর পথ, উত্তর দিকের পুরোনো রাস্তা, সব জায়গায় চোখ থাকবে।”

বাড মাথা নেড়ে বলল, “আমি লোক ভাগ করে দিচ্ছি।”

লারসেন বলল, “কাউকে অনুসরণ করবে না।”

বাড থেমে তার দিকে তাকাল।

লারসেন শান্তভাবে যোগ করল, “এলি ব্রুকসও একই কথা বলেছিল।”

বাডের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। এতদিন পর প্রথমবার লারসেন নিজে থেকে মার্শালের নাম উচ্চারণ করল। সে আর কিছু বলল না। কিন্তু এটা বুঝল, ব্ল্যাক রিভার শহরের ঘটনাগুলো আর গত রাতের হামলা এখন লারসেনের মনে একসঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে।

লারসেন বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। মারদেকা তার পাশে এল।

বারান্দার সিঁড়িতে ওঠার আগে লারসেন থামল। পকেট থেকে একটা চাকতি বের করল। কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে ছেলেটার হাতে দিল।

মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল। 

লারসেন ধীরে বলল, “এটা রাখো।”

ছেলেটা ঠান্ডা ধাতব চাকতিটা মুঠোয় নিল।

“কাউকে দেখাবে না,” লারসেন বলল।

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে যোগ করল, “আর যদি কেউ জিজ্ঞেস করে?”

মারদেকা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “যা বলার দরকার নেই, সেটা বলব না।”

লারসেনের মুখে খুব সামান্য হাসি ফুটল। “ঠিক।” তারপর সে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে এখন শুধু একটা ধাতব চাকতি নেই। সে বুঝতে পারছে না কেন লারসেন তাকে এটা দিল, কিন্তু এটুকু বুঝতে পারছে, লোকটা তাকে আগের মতো দেখছে না।

দূরে বাড দাঁড়িয়ে ছিল। সে একবার মারদেকার হাতে থাকা চাকতিটার দিকে তাকাল, তারপর ছেলেটার মুখের দিকে। কিছু বলল না।

সূর্য তখন পুরোপুরি প্রেইরির ওপর উঠে এসেছে। রাতের অন্ধকার সরে গেছে। শিশির শুকাতে শুরু করেছে। ঘাসের ডগায় আলো জমেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের মানুষগুলো আবার নিজেদের কাজে ফিরে গেছে। 

কিন্তু লারসেন জানে, আসল কাজ এখনই শুরু হয়েছে। ব্ল্যাক রিভারের মার্শাল যে অদৃশ্য ছায়ার কথা বলেছিল, সেই ছায়া এখন আর দূরের পাহাড়ে নেই। সে এসে দাঁড়িয়েছে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে।

একটা পুরোনো চামড়ার টুকরো। দুটো কালচে ধাতব চাকতি। একটা সিল মারা চিঠি। 
আর গত রাতের গুলির দাগ। এগুলো আর আলাদা আলাদা ঘটনা নয়। লারসেন এখন সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, এই সত্যের প্রথম সুতোটা ধরতে তাকে সাহায্য করেছে এমন এক ছেলে, যাকে কয়েক মাস আগেও সে শুধু আশ্রয় দেওয়া এক বুনো পাহাড়ি ছেলে বলেই চিনত।

বারান্দার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে লারসেন একবার পেছনে তাকাল। মারদেকা এখনও সেখানে দাঁড়িয়ে। তার মুঠোয় চাকতিটা। চোখে প্রশ্ন।

আর সেই প্রশ্নের ভেতরে এমন এক মনোযোগ, যা লারসেনের বহু বছরের অভিজ্ঞতাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। সে ধীরে ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করল। বাইরে প্রেইরি আগের মতোই শান্ত। দূরের পাহাড় নীলচে কুয়াশার মতো স্থির।

আকাশে কোনো মেঘ নেই।  কিন্তু সেই শান্ত দৃশ্যের নিচে বহু বছর আগের এক পুরোনো গল্প আবার নড়েচড়ে বসেছে। আর লারসেন এখন জানে, এবার সেই গল্পের শেষটা না জেনে তার আর থেমে থাকার উপায় নেই।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/264894/</link>
				<pubDate>Sun, 23 Aug 2026 11:50:11 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–ষোল<br />
ভোর হওয়ার আগের সেই শেষ অন্ধকারটা অন্য সব রাতের অন্ধকারের চেয়ে আলাদা। রাত তখন আর গভীর হচ্ছে না, যদিও সকাল এখনও দিগন্তের ওপারে। পূর্ব আকাশের নিচু প্রান্তে কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তারাগুলোর ধার যেন ধীরে ধীরে ভোঁতা হয়ে আসছে। প্রেইরির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাস শুকনো ঘাসের মাথাগুলোক&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-264894"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/264894/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">f6a3edfb2798d61cb452ac69cff7ba0d</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–পনের
মারদেকা উত্তরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দূরে কোথাও সেই ঘোড়ার ক্ষীণ হ্রেষাধ্বনি আর শোনা যাচ্ছে না। কেবল মাঝে মাঝে বাতাস শুকনো ঘাসের মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, আর তাতে ঘাসগুলো একসঙ্গে সরে গিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসছে। র&#x200d;্যাঞ্চের বাড়ির বারান্দায় লণ্ঠনের হলুদ আলো জ্বলছে। সেই আলো থেকে কয়েক গজ দূরেই অন্ধকার এত ঘন যে তার ভেতরে কী আছে বোঝা কঠিন।

টোকার শব্দে লারসেন দরজা খোলে বারান্দায় বেরিয়ে এলো। হাতে রিভলবার। মারদেকাকে দেখেই প্রশ্ন ছুড়লো, “তুমি ভেতরে যাওনি?” 

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিল না। সে আরও একবার উত্তরের দিকে তাকিয়ে তারপর বলল, “ওরা আমাদের একটা ঘোড়া নিয়ে গেল।” 

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ওরা কি তবে এজন্যই এসেছিল?”

মারদেকার চোখ অন্ধকারের দিকে। সে ধীরে বলল, “ওরা ঘোড়াটা নিয়ে গেছে, পাশাপশি চিহ্ন লুকানোর চেষ্টা করেছে। তবে সেটা তত জোরেসোরে নয়।” 

শব্দ শুনে ততক্ষণে বাডও চলে এসেছে। তার হাত থেকে রাইফেল ঝুলছে। মারদেকার কথা তার কানেও গেছে। বুঝতে পারলো ছেলেটা ভুল কিছু দেখেনি। বলল, “মনে হচ্ছে ওরা ইচ্ছে করেই চাইছে, যাতে আমরা বুঝতে পারি ঘোড়াটা র&#x200d;্যাঞ্চের বাইরে গেছে।” 

লারসেন কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, “ঠিক তাই। এটা চুরি নয়, বাড। এটা একটা বার্তা।”

মারদেকা এবার লারসেনের দিকে তাকাল। “কীসের বার্তা?” 

লারসেন তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটার মুখে ভয় আছে, কিন্তু সেই ভয় তাকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে না। বরং তার চোখে প্রশ্ন। লারসেন ধীরে বলল, “ওরা বুঝাতে চাইছে যেন আমরা জানি, ওরা চাইলে র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতর থেকে কিছু নিয়ে যেতে পারে।” 

কথাটা শুনে মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর তার চোখ আবার অন্ধকারের দিকে চলে গেল।

বাড রাইফেলের নলটা সামান্য নামিয়ে বলল, “আর তীরটা?” 

লারসেনের মুখ আরও শক্ত হয়ে গেল। সে বারান্দার সেই কাঠের খুঁটির দিকে তাকাল, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও তীরটা গেঁথে ছিল। তারপর বলল, “তীরটা ছিল দ্বিতীয় বার্তা।” 

মারদেকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। লারসেন সাধারণত নিশ্চিত না হয়ে কোন কথা বলে না। 

হঠাৎ আস্তাবলের ভেতর থেকে একটা ঘোড়া জোরে পা ঠুকল। কাঠের মেঝেতে খুরের শব্দ উঠল। তারপর আরেকটা ঘোড়া অস্থির হয়ে উঠল। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। বাডও তাকাল। লারসেন হাতের রিভলভার শক্ত করে ধরল। কয়েক মুহূর্ত পর সব আবার শান্ত হয়ে গেল।

মারদেকা ধীরে বলল, “ঘোড়াগুলো এখনও অস্থির।” 

বাড তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। ওরা কিছু টের পেয়েছে।” 

মারদেকা একটু ভেবে বলল, “কিন্তু এবার আগের মতো নয়।” 

বাড ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে?” 

মারদেকা আস্তাবলের দিকে তাকিয়েই বলল, “আগে একটা ঘোড়া ভয় পেয়েছিল, তারপর অন্যগুলো। এখন ওরা শুধু নড়ছে। যেন বাইরে কিছু আছে, কিন্তু সেটা কাছে আসছে না।”

লারসেনের চোখে ক্ষীণ একটা আগ্রহ ফুটে উঠল। সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি এখন শব্দের পার্থক্যও ধরতে পারছ।” 

মারদেকা কোনো উত্তর দিল না। সে নিজেও বুঝতে পারছিল না ঠিক কীভাবে সে ব্যাপারটা বুঝেছে। কয়েক মাস আগে এমন প্রশ্ন করলে হয়তো সে শুধু ঘোড়াগুলো ভয় পেয়েছে বলত। এখন সে শব্দের ভেতরের পার্থক্য শুনতে চেষ্টা করে।

বাড ধীরে রাইফেলটা নামিয়ে বলল, “আজ রাতে আর কাউকে বাইরে যেতে দেওয়া ঠিক হবে না।” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “ঠিক বলেছ।” তারপর সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি আজ আমার সাথেই থাকবে।” 

মারদেকা মাথা নাড়ল, কিন্তু যাওয়ার আগে আবার উত্তরের দিকে তাকাল। সেখানে এখন কিছুই নেই। শুধু অন্ধকার।

তারা তিনজন ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের রাতের শব্দ কিছুটা ম্লান হয়ে গেল। রান্নাঘরের আগুন প্রায় নিভে এসেছে। ইলাই তখন শেষবারের মতো একটা পাত্র সরিয়ে রেখে তাদের দিকে তাকাল। তার চোখ প্রথমে লারসেনের হাতে থাকা রিভলভারে, তারপর বাডের রাইফেলে গিয়ে থামল। সে কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু বুঝতে পারল, রাতটা স্বাভাবিক নয়।

লারসেন টেবিলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাড রাইফেলটা দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখল না, বরং নিজের হাতের নাগালেই রাখল। 

ইলাই ধীরে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?” 

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “উত্তরের দিকে কিছু অস্বাভাবিক নড়াচড়া হয়েছিল।” 

ইলাই আর প্রশ্ন করল না। সে মারদেকার মুখের দিকে তাকাল। ছেলেটার চোখে তখনও বাইরের অন্ধকারের ছাপ।

মারদেকা একটা চেয়ার টেনে বসতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ থেমে গেল। তার মনে পড়ল কিছু একটা। সে লারসেনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি একটা জিনিস দেখেছিলাম।” 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “কী?” 

মারদেকা একটু ভেবে বলল, “উত্তরের বেড়ার কাছে যে কালো দাগটা পেয়েছিলাম, তার গন্ধ ঘোড়ার জিনে ব্যবহার করা তেলের মতো ছিল।” বাড তাকাল তার দিকে। লারসেনও স্থির হয়ে গেল।

বাড ধীরে বলল, “তুমি নিশ্চিত?” 

মারদেকা মাথা নাড়ল। “গন্ধটা আগে পেয়েছি। আস্তাবলে।” 

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর লারসেনের দিকে তাকাল।

“তাহলে লোকটা ঘোড়ার জিনের ব্যাপারে জানে।” লারসেন বলল, “অথবা সে এমন জায়গা থেকে এসেছে যেখানে এই ধরনের তেল ব্যবহার করা হয়।” 

কথাটা শুনে ঘরের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।

ইলাই ধীরে মারদেকার পাশে এসে দাঁড়াল। সে ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে বলল, “তুমি আজ অনেক কিছু দেখেছ।” 

মারদেকা নিচু গলায় বলল, “আমি শুধু যা দেখেছি সেটাই বলেছি।” 

ইলাই মৃদু স্বরে বলল, “সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যা দেখেছ, তার বাইরে গিয়ে কিছু ধরে নিও না।” 

মারদেকা মাথা তুলল। 

লারসেনও ইলাইয়ের দিকে তাকাল। কথাটা সাধারণ হলেও এর মধ্যে এমন একটা শিক্ষা ছিল, যা সে নিজেও মারদেকাকে দিতে চাইত। সে ধীরে চেয়ার টেনে বসল। তারপর মারদেকার দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ তুমি একটা জিনিস ভালো করেছ।” 

মারদেকা চুপ করে রইল। লারসেন বলল, “তুমি ভয় পেয়েছিলে, কিন্তু ভয় তোমাকে অন্ধ করেনি।” 

মারদেকা কিছু বলল না। লারসেন আবার বলল, “মনে রেখো, ভয় থাকা খারাপ নয়। ভয়কে না বোঝাই খারাপ।”

বাড এবার মৃদু হেসে বলল, “আর একটা কথা মনে রাখবে। অন্ধকারে যে জিনিসটা নড়ছে, সেটা সবসময় শত্রু নয়।” 

মারদেকা তার দিকে তাকাল। বাড বলল, “কখনও কখনও সেটা শুকনো ঘাসও হতে পারে।” 

মারদেকার মুখে খুব সামান্য হাসি ফুটল। কিন্তু লারসেন হাসল না। সে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।

বাইরে বাতাস একটু বেড়েছে। জানালার কাঠের পাল্লা খুব সামান্য কেঁপে উঠল। তারপর আবার স্থির। দূরে কোথাও একটা নিশাচর পাখি ডাকল। তার পরেই অনেক দূর থেকে ঘোড়ার খুরের অস্পষ্ট শব্দ ভেসে এল। একবার। তারপর থেমে গেল।

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল। বাডও শুনেছে। লারসেন চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত শব্দটার দিক বোঝার চেষ্টা করল। তারপর বলল, “পশ্চিমে।” 

বাড মাথা নাড়ল। “অনেক দূরে।” 

মারদেকা ধীরে বলল, “দুটো ঘোড়া।” 

বাড এবার তার দিকে তাকিয়ে মৃদু বিস্মিত হলো। সে নিজেও শুনেছিল, কিন্তু শব্দ এত ক্ষীণ যে আলাদা করা কঠিন।

লারসেন উঠে দাঁড়াল। “আজ রাতটা আমরা পাহারা দেব।” 

বাড রাইফেল তুলে নিল। “আমি প্রথম পালা নেব।” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “না। প্রথম পালা আমি নেব।” বাড আপত্তি করতে যাচ্ছিল, কিন্তু লারসেন হাত তুলে থামিয়ে দিল। “তুমি সারাদিন কাজ করেছ। ভোরের আগে তোমারও দরকার হবে।”

বাড কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল। 

লারসেন মারদেকার দিকে তাকিয়ে বলল, “আর মারদেকা থাকবে আমার সঙ্গে।” 

রাত আরও গভীর হয়ে গেল। র&#x200d;্যাঞ্চের ঘরগুলো একে একে নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। রান্নাঘরের আগুন নিভে গেছে অনেকক্ষণ আগে। ইলাই নিজের ঘরে চলে গেছে। বাডও শেষ পর্যন্ত লারসেনের কথামতো রাইফেলটা পাশে রেখে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। সারাদিনের পরিশ্রমে তার শরীর ক্লান্ত ছিল, কিন্তু ঘুম গভীর হওয়ার আগেই ভোরের পাহারার কথা তার মনে গেঁথে ছিল। লারসেন জানত, ভোরের আগে তাকে জাগাতে হবে না। সময় হলে বাড নিজেই উঠে যাবে।

লারসেন বাড়ির পেছনের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে রিভলভার, কিন্তু অস্ত্রটা নিচু করে রাখা। সে বাইরে তাকিয়ে ছিল এমনভাবে, যেন শুধু চোখ দিয়ে নয়, পুরো রাতটাকেই পড়ার চেষ্টা করছে। জানালার কাঁচে তার নিজের মুখের অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে বাতাসের ধাক্কায় জানালার পাল্লা সামান্য কেঁপে উঠছিল। প্রতিবারই লারসেনের চোখ সেদিকে চলে যাচ্ছিল, তারপর আবার অন্ধকারের দিকে ফিরে আসছিল।

মারদেকা ঘরের অন্য পাশে বসে ছিল। তার সামনে একটা ছোট কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর একটা নিভু নিভু লণ্ঠন জ্বলছে। সে কথা বলছিল না। 

কিছুক্ষণ পর লারসেন জানালা থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, “ঘুম আসছে?” 

মারদেকা মাথা নাড়ল, “না।” 

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “ঘুমানোর চেষ্টা করো।” 

মারদেকা ধীরে বলল, “বাইরে যদি কেউ থাকে?” 

লারসেন শান্ত গলায় বলল, “তাহলে সে এখনো জানে না আমরা তাকে দেখেছি।” 

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আর যদি সে জানে?” 

লারসেনের ঠোঁট সামান্য শক্ত হলো। সে বলল, “তাহলে সে আরও সাবধানে চলবে।”

মারদেকা কথাটার অর্থ বুঝতে চেষ্টা করল। 

লারসেন আবার জানালার দিকে তাকাল। “মনে রেখো, মারদেকা, শত্রু তোমাকে যত কম জানে, তত ভালো। কিন্তু তুমি যদি তার সম্পর্কে কিছু জানতে পারো, সেটা আরও ভালো।” 

মারদেকা মাথা নিচু করল। 

লারসেন বলল, “আজ রাতে তুমি বাইরে যাবে না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুমি কিছু করবে না। চোখ খোলা রাখবে, কান খোলা রাখবে। কোনো শব্দ শুনলে সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেবে না। আগে বুঝবে।” 

মারদেকা তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। 

কিছুক্ষণ পর ঘরের নীরবতা আবার ফিরে এল। বাইরে বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই। দূরের কোনো গাছের শুকনো ডাল ঘষে ঘষে কাঁপছে। মারদেকা চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে চোখ বন্ধ করল, কিন্তু ঘুমাল না। তার মাথার মধ্যে বারবার একই দৃশ্য ফিরে আসছিল। উত্তরের অন্ধকার, শুকনো ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মানুষ, দূরে সরে যাওয়া দুটো ঘোড়া, আর বারান্দার কাঠে গেঁথে থাকা তীর। 

হঠাৎ লারসেন হাত তুলে তাকে ইশারা করল। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলল। লারসেন নড়ছে না। তার মাথা সামান্য কাত। সে শুনছে। মারদেকাও নিঃশ্বাস আটকে কান পাতল। প্রথমে কিছুই বোঝা গেল না। তারপর খুব দূর থেকে একটা ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। যেন শুকনো মাটির ওপর বুটের তলা ঘষে গেছে। শব্দটা একবার হলো, তারপর থেমে গেল।

মারদেকা ফিসফিস করে বলল, “পশ্চিমে?” 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আরও কিছুক্ষণ শুনল। তারপর খুব আস্তে বলল, “না। উত্তর-পশ্চিম।” 

মারদেকা উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল। 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে তাকে থামাল। “এখানেই থাকো।” 

মারদেকা আবার বসে পড়ল। 

লারসেন জানালার নিচু অংশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তাকানোর সময় সে শরীরটা এমনভাবে রাখল, যাতে জানালার ফাঁক দিয়ে তার অবয়ব বাইরে থেকে দেখা না যায়।

কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। তারপর দূরে একটা ঘোড়া খুব আস্তে নড়ল। তার সঙ্গে চামড়ার জিনের ক্ষীণ শব্দ। লারসেনের চোখ সরু হয়ে গেল। সে জানালা থেকে সরে এসে ঘরের মাঝখানে দাঁড়াল। 

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, শব্দটা সাধারণ নয়। 

লারসেন ধীরে বলল, “ওরা আবার ঘোড়ার কাছে এসেছে।” 

মারদেকা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কেন?” 

লারসেন বলল, “জানি না। কিন্তু এবার ওরা র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে তাকিয়ে নেই।”

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত ভেবে বলল, “তাহলে ওরা অন্য কিছু খুঁজছে?” 

লারসেন তার দিকে তাকাল। ছেলেটার প্রশ্নটা তার মনে দাগ কাটল। সে ধীরে বলল, “হতে পারে।” তারপর জানালার দিকে ফিরে গেল। “কিন্তু কী, সেটা এখনো জানি না।” বাইরে আবার নীরবতা নেমে এল। কিছুক্ষণ পর সে জানালার পাশে থেকে সরে এসে চেয়ারে বসল। রিভলভারটা তার ডান হাতে। 

মারদেকা নিচু গলায় বলল, “আপনি কি মনে করেন, তারা আজ রাতে আবার আসবে?” 

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “আমি মনে করি, তারা আজ রাতে আমাদের পরীক্ষা করছে।” 

মারদেকা বলল, “কীসের পরীক্ষা?” 

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমরা কতটা সতর্ক, সেটা দেখার।”

মারদেকা ধীরে মাথা নাড়ল। তার চোখে চিন্তার ছাপ। সে বলল, “তাহলে ওরা অপেক্ষা করছে।”

লারসেন বলল, “আমরাও।” কথাটা বলেই সে সামান্য হাসল না, বরং তার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। “যে আগে অধৈর্য হবে, সে ভুল করবে।”

সময় এগিয়ে চলল। লণ্ঠনের তেল কমে আসছিল। বাইরে আকাশের কোনো পরিবর্তন এখনও বোঝা যায় না। রাত যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। মারদেকা একসময় চেয়ারের পিঠে মাথা ঠেকাল। তার চোখ আধবোজা হয়ে এল। লারসেন তাকে কিছু বলল না। সে জানত, ছেলেটার শরীর ক্লান্ত। কিন্তু ঘুমের আগের সেই অবস্থাতেও মারদেকার কান যেন বাইরে রয়ে গেছে।

হঠাৎ মারদেকা চোখ খুলে ফেলল। তার মাথা সামান্য কাত হলো। 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল। মারদেকাকে হাত তুলে কোনো শব্দ না করার ইশারা করল। কয়েক মুহূর্ত পর খুব ক্ষীণ একটা শব্দ শোনা গেল। টুক। তারপর আরেকবার। টুক। তার চোখ এবার দরজার দিকে গেল। শব্দটা বাইরে থেকে এসেছে। খুব কাছ থেকে।

মারদেকা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। লারসেন হাত তুলে তাকে নিজের পেছনে দাঁড়াতে বলল। দুজনেই নিঃশব্দে দরজার দিকে এগোল। লারসেন রিভলভারটা বুকের কাছে তুলল। তার বাঁ হাত দরজার কপাটের ওপর স্থির।

আবার শব্দ হলো। টুক। এবার মারদেকা বুঝতে পারল, শব্দটা দরজায় নয়। দরজার ঠিক বাইরে কাঠের বারান্দার নিচে কোথাও। 

লারসেনও বুঝেছে। সে দরজা খোলেনি। বরং কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থেকে নিচু গলায় বলল, “ওরা খুব কাছে এসেছে।”

মারদেকার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে তাকানোর চেষ্টা করল। বাইরে লণ্ঠনের আলোয় বারান্দার কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বারান্দার নিচের অন্ধকার তার চোখের নাগালের বাইরে।

তারপর হঠাৎ বাইরে ঘোড়ার দড়ি টানার মতো শব্দ হলো। এক মুহূর্তের জন্য দুজনেই স্থির হয়ে গেল। 

লারসেন ধীরে ধীরে দরজার পাশে সরে দাঁড়াল। তার চোখে এবার সেই পরিচিত কঠোরতা। সে ফিসফিস করে বলল, “মারদেকা, পেছনে যাও।”

মারদেকা এক পা পিছিয়ে গেল। পরের মুহূর্তেই বাইরে থেকে একটা ছায়া খুব দ্রুত বারান্দার কিনারা পেরিয়ে গেল।

মারদেকা খুব আস্তে বলল, “লোকটা চলে গেল?”

লারসেন মাথা নাড়ল। “না।”

মারদেকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

লারসেন ধীরে রিভলভারের কক নামিয়ে দিল। তারপর বলল, “সে এখনো এখানেই আছে।”

ঘরের ভেতর আবার নিস্তব্ধতা নেমে এল। 

আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাও এখন বুঝে গেছে, র&#x200d;্যাঞ্চের লোকেরা তার উপস্থিতি টের পেয়েছে।

রাত তখন অনেক গভীর। আকাশের তারাগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কিন্তু প্রেইরির ওপর চাঁদের আলো এখনও পড়েনি। বাড়ির ভেতরের বাতাসও যেন ভারী হয়ে আছে। লারসেন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। বাইরে আর কোনো শব্দ নেই।

মারদেকা ধীরে ধীরে জানালার কাছে এগিয়ে গেল। লারসেন তাকে থামাল না। ছেলেটা জানালার একেবারে পাশে না গিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। উঠোনে লণ্ঠনের আলো স্থির হয়ে আছে। ঘোড়াগুলোও এখন শান্ত। কিন্তু উত্তরের দিকে তাকালেই তার মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের মধ্যে কিছু একটা বদলে গেছে। সে ধীরে বলল, “লোকটা কোথায় গেল?” 

লারসেন নিচু গলায় উত্তর দিল, “যেখানে গেলে তাকে দেখা যাবে না।” 

মারদেকা আবার জিজ্ঞেস করল, “সে কি আমাদের ভয় দেখাতে চায়?” 

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “যদি ভয় দেখানোই তার উদ্দেশ্য হতো, তাহলে তীর ছুড়ে চলে যেত। এখন সে আমাদের দেখছে।”

মারদেকা জানালা থেকে সরে এল। তার চোখে চিন্তার ছাপ। সে ধীরে বলল, “তাহলে সে অপেক্ষা করছে।” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। কিন্তু কিসের জন্য, সেটা এখনো বোঝা যাচ্ছে না।” 

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ বলল, “ঘোড়াটা নিয়ে যাওয়ার পরও সে ফিরে এসেছে।” 

লারসেন তার দিকে তাকাল। “এই কথাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” 

মারদেকা বলল, “মানে ঘোড়াটা নেওয়াই তার আসল কাজ ছিল না।” 

লারসেনের চোখে এবার সামান্য প্রশংসার ছাপ ফুটে উঠল। সে বলল, “সম্ভবত নয়।”

ঘরের বাইরে হঠাৎ একটা ক্ষীণ শব্দ হলো। দুজনেই থেমে গেল। শব্দটা খুব নিচু, যেন শুকনো ঘাসের ওপর কারও বুট ঘষে গেছে। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে রিভলভার তুলে ধরল। মারদেকা তার পেছনে সরে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। তারপর দূরে একটা ঘোড়া মাথা ঝাঁকাল। তার গলায় বাঁধা ধাতব অংশ খুব সামান্য শব্দ করল। লারসেন কয়েক সেকেন্ড শুনে ধীরে অস্ত্রটা নিচু করল। সে বলল, “ওটা আস্তাবলের দিক থেকে।” 

মারদেকা মাথা নাড়ল। “কিন্তু লোকটা ওইদিকে ছিল না।” 

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি নিশ্চিত?” 

মারদেকা উত্তর দিল, “না। শুধু শব্দের দিকটা ভেবে বলছি।”

লারসেন কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “এই পার্থক্যটাই মনে রাখবে। নিশ্চিত না হলে নিশ্চিতের মতো কথা বলবে না।” 

মারদেকা মাথা নাড়ল। সে বুঝতে পারছিল, এই রাত শুধু অচেনা লোকদের নিয়ে নয়। এই রাত তার শেখারও একটা পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। লারসেন তাকে বহুদিন ধরে বলেছে, চোখ যা দেখে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো চোখ যা দেখেনি সেটা বুঝতে পারা। 

কিছুক্ষণ পর লারসেন ধীরে ঘরের একপাশে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখা লণ্ঠনটা একটু নিচু করে দিল। ঘর আরও অন্ধকার হয়ে গেল। সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে বলল, “এখন জানালার কাছে দাঁড়াবে না।” 

মারদেকা জিজ্ঞেস করল, “কেন?” 

লারসেন বলল, “বাইরে থেকে আলোয় তোমার ছায়া দেখা যেতে পারে।” মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে সরে এল। সে দেয়ালের পাশে গিয়ে বসল। লারসেনও দরজার কাছের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল।

সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। মারদেকার চোখ ধীরে ধীরে অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। তার কানে এখন ছোট ছোট শব্দও আলাদা হয়ে আসছে। হঠাৎ তার মনে হলো একটা শব্দ অন্যরকম। সে মাথা তুলল। কয়েক মুহূর্ত শুনে লারসেনের দিকে তাকাল। তারপর খুব আস্তে বলল, “ওটা ঘোড়ার শব্দ নয়।” 

লারসেন তার কাছে এল। “কী শুনলে?” মারদেকা বলল, “মাটিতে কিছু পড়ল।” 

লারসেন স্থির হয়ে শুনতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আবার একটা ক্ষীণ শব্দ হলো। এবার সে নিজেও শুনল। শব্দটা বাড়ির পশ্চিম পাশে, শেডের দিক থেকে এসেছে।

লারসেন রিভলভার হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগোল। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। লারসেন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি এখানেই থাকবে।” মারদেকা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু লারসেনের চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। সে জানত, এবার তর্ক করার সময় নয়। লারসেন দরজার কাছে গিয়ে থামল। বাইরে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর দরজাটা খুব সামান্য খুলে বাইরে পা রাখল।

মারদেকা দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে রইল। লারসেন বারান্দার ছায়া ধরে এগিয়ে গেল। তার চলার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়া নেই। সে জানে, তাড়াহুড়া করলে শব্দ হবে। শেডের কাছে পৌঁছে সে নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল। তারপর হাত বাড়িয়ে ধুলোর ওপর পড়ে থাকা একটা ছোট বস্তু তুলে নিল।

মারদেকা দূর থেকে দেখতে পেল, বস্তুটা চকচক করছে। লারসেন সেটা হাতে ঘুরিয়ে দেখল। তারপর কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখের ভাব বদলে গেল। সে বস্তুটা পকেটে রেখে ধীরে ধীরে ফিরে এল।

দরজার কাছে এসে মারদেকা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কী এটা?” 

লারসেন ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। তারপর বলল, “একটা ধাতব বাকল।” 

মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল। “ঘোড়ার জিনের?” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।” মারদেকার চোখ সরু হয়ে গেল। সে বলল, “তাহলে লোকটা ঘোড়ার কাছাকাছি ছিল।” 

লারসেন বলল, “হতে পারে। কিন্তু বাকলটা এখানে কীভাবে এল, সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।”

মারদেকা কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, “যদি লোকটা ঘোড়ার কাছে গিয়ে থাকে, তাহলে সে আস্তাবলের ভেতরও ঢুকেছিল?” 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে টেবিলের কাছে গিয়ে ধাতব বাকলটা বের করে লণ্ঠনের আলোয় দেখল। বাকলের এক পাশে খুব সামান্য আঁচড়। লারসেন আঙুল দিয়ে সেটা ছুঁয়ে দেখল। তারপর ধীরে বলল, “এটা পুরোনো নয়।”

মারদেকা উঠে দাঁড়াল। “তাহলে?” 

লারসেন বাকলটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে বলল, “তাহলে কেউ আমাদের খুব কাছ থেকে পরীক্ষা করছে।” 

মারদেকার চোখে আবার সেই অস্থিরতা ফিরে এল। সে বলল, “কিন্তু বাড তো উত্তরের দিকে পাহারা দেওয়ার কথা ছিল।” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “ভোরের আগে সে উঠবে। এখন সে ঘুমাচ্ছে।” তারপর একটু থেমে বলল, “আর সেই কারণেই আমি চাই না তুমি বাইরে যাও।”

মারদেকা চুপ করে গেল। তার মনে হলো, এই রাতটা যেন ধীরে ধীরে একটা অদৃশ্য জালের মতো চারপাশে শক্ত হয়ে আসছে।

লারসেন আবার জানালার দিকে তাকাল। তারপর মারদেকার দিকে ফিরে বলল, “আজ রাতে তুমি যে জিনিসটা সবচেয়ে ভালোভাবে শিখবে, সেটা কোনো অস্ত্র দিয়ে শেখানো যাবে না। সবসময় শত্রুকে দেখার আগে তার উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করবে। অস্ত্র হাতে নেওয়া সহজ। কিন্তু কখন অস্ত্র তুলবে, সেটা বুঝতে পারাই আসল শিক্ষা।”

মারদেকা ধীরে মাথা নাড়ল। তার চোখে এবার আগের ভয় নেই। আছে গভীর মনোযোগ। সে বুঝতে পারছে, লারসেন তাকে শুধু বিপদ থেকে দূরে রাখছে না। এই রাতের প্রতিটি মুহূর্ত দিয়ে তাকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করছে।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে খুব দূরে একটা ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি শোনা গেল। এবার শব্দটা আগের চেয়ে পরিষ্কার। তারপর আরেকটা ঘোড়া সাড়া দিল। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে জানালার দিকে তাকাল। মারদেকাও শুনেছে। কয়েক সেকেন্ড পর সে খুব আস্তে বলল, “দুটো ঘোড়া।”

লারসেন তার দিকে তাকাল। তারপর জানালার অন্ধকারে চোখ স্থির রেখে বলল, “হ্যাঁ। এবার তারা উত্তরে নেই।”

মারদেকার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। “তাহলে কোথায়?”

লারসেন উত্তর দেওয়ার আগেই পশ্চিম দিক থেকে খুব ক্ষীণ একটা ধাতব শব্দ ভেসে এল।

লারসেনের হাত রিভলভারের ওপর শক্ত হয়ে গেল। সে ধীরে বলল, “এবার মনে হচ্ছে, তারা র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরের আরেকটা পথ পরীক্ষা করছে।”

মারদেকা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে তখন আর কৌতূহল ছিল না। সে বুঝতে পারছিল, রাতের অপেক্ষার সময় শেষের দিকে এগোচ্ছে।

ধাতব শব্দটা দ্বিতীয়বার শোনার পর লারসেন আর অপেক্ষা করল না। সে দরজার পাশের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল, রিভলভারের হাতল শক্ত করে ধরে। মারদেকা দেয়ালের পাশে নিঃশব্দে বসে ছিল। বাইরে পশ্চিম দিকের শেডের কাছে বাতাসের শব্দ ছাড়া কিছুই নেই। তারপর হঠাৎ খুব নিচু একটা ঘর্ষণের শব্দ উঠল, যেন কেউ কাঠের বেড়ার গায়ে হাত রেখে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। লারসেন মাথা সামান্য কাত করল। এবার সে নিশ্চিত। কেউ র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরে ঢোকার পথ খুঁজছে।

লারসেন ধীরে দরজার কাছে গিয়ে ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। উঠোনের একপাশে লণ্ঠনের আলো, তার পরেই গভীর ছায়া। শেডের পেছনের অংশটা পুরোপুরি অন্ধকার। সে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর খুব আস্তে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। মারদেকা তার পেছনে তাকিয়ে রইল। লারসেন বারান্দা পেরিয়ে সরাসরি শেডের দিকে না গিয়ে বাঁদিকে ঘুরল, যাতে বাইরে থেকে তার অবস্থান বোঝা না যায়। তার পায়ের নিচে শুকনো মাটি, তবু সে এমনভাবে পা ফেলছিল যেন প্রতিটি শব্দ আগেই মেপে নিচ্ছে।

শেডের কোণ ঘুরতেই একটা ছায়া হঠাৎ নড়ল। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে রিভলভার তুলল। লোকটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। দুজনের মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি ছিল না। অন্ধকারে মুখ দেখা যাচ্ছিল না, শুধু বোঝা গেল লোকটার গায়ে গাঢ় রঙের পোশাক এবং মাথায় চওড়া কিনারার টুপি। লারসেন নিচু গলায় বলল, “যেখানে আছো, সেখানেই দাঁড়াও।” 

লোকটা কোনো উত্তর দিল না। বরং এক পা পিছিয়ে গেল।

লারসেন আরেক পা এগিয়ে বলল, “র&#x200d;্যাঞ্চে ঢুকে কী খুঁজছ?” 

এবারও কোনো উত্তর নেই। লোকটা হঠাৎ ডানদিকে ঘুরে দৌড় দিল। 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার পেছনে ছুটল। কয়েক গজ যেতেই লোকটা বেড়ার দিকে ছুটে গেল। লারসেন বুঝতে পারল, লোকটা আগেই বেরিয়ে যাওয়ার পথ ঠিক করে রেখেছে। সে চিৎকার করে বলল, “থামো!” কিন্তু লোকটা থামল না।

ঠিক তখনই লোকটা ঘুরে গুলি ছুড়ল। গুলির শব্দে পুরো র&#x200d;্যাঞ্চ কেঁপে উঠল। রাতের নিস্তব্ধতা মুহূর্তে ভেঙে গেল। গুলিটা লারসেনের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে শেডের কাঠে আঘাত করল। কাঠের টুকরো ছিটকে পড়ল। লারসেন নিচু হয়ে মাটিতে গড়িয়ে একপাশে সরে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে রিভলভার তুলল। কিন্তু লোকটা দ্বিতীয় গুলি চালানোর আগেই অন্ধকারের মধ্যে ঝাঁপিয়ে বেড়ার দিকে এগিয়ে গেল।

বাড়ির ভেতর থেকে দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ হলো। প্রথমে ইলাই ছুটে বেরিয়ে এল। তার পেছনে রুবেন কোল, ক্লে মরগান, মিগুয়েল এবং হ্যাঙ্ক ডসন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাডও ঘুম থেকে উঠে রাইফেল হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। গুলির শব্দে কারও ঘুম আর থাকার কথা নয়। 

ইলাই চারদিকে তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে?” 

বাড রাইফেল তুলে শেডের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেউ গুলি করেছে।”

ক্লে মরগান ইতিমধ্যে বারান্দা থেকে নিচে নামছিল। সে বলল, “কোথায় গেছে?” 

রুবেন কোল তার পেছনে এগিয়ে এসে রাইফেল হাতে বলল, “বেড়ার দিকে গেছে।” 

মিগুয়েলও অস্ত্র তুলে নিল। হ্যাঙ্ক ডসন ঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত চারপাশ দেখল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সবাই বুঝে গেল, র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরে একজন সশস্ত্র লোক ঢুকেছিল এবং এখন পালাচ্ছে।

ক্লে মরগান দৌড় দেওয়ার জন্য এগিয়ে যেতেই লারসেন হাত তুলে থামিয়ে দিল। সে তখন শেডের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার রিভলভার এখনও হাতে। সে কঠিন গলায় বলল, “কেউ বেড়ার বাইরে যাবে না।” 

ক্লে থেমে তার দিকে তাকাল। “কিন্তু লোকটা এখনো বেশি দূরে যায়নি।” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “সেটাই কারণ। বাইরে তার আরো লোকজন থাকতে পারে।” 

রুবেন কোল সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। মিগুয়েলও চারদিকে তাকাল। 

হ্যাঙ্ক ডসন ধীরে বলল, “ওরা যদি আমাদের বাইরে টেনে নিতে চায়?” 

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে আমরা তাদের সেই সুযোগ দেব না।”

বাড এবার লারসেনের কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে ঘুমের কোনো চিহ্ন নেই। সে জিজ্ঞেস করল, “তুমি ঠিক আছ?” 

লারসেন মাথা নাড়ল। “গুলি লাগেনি।” 

বাড শেডের কাঠে গুলির দাগের দিকে তাকাল। তারপর বলল, “লোকটা কী চেয়েছিল?” 

লারসেন কয়েক মুহূর্ত উত্তর দিল না। সে মাটির দিকে তাকাল, যেখানে লোকটার পায়ের চিহ্ন এখনও দেখা যাচ্ছে। তারপর ধীরে বলল, “সেটা এখনো জানি না। তবে সে শুধু ভয় দেখাতে আসেনি।”

মারদেকা তখন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। ইলাই এবার মারদেকার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সে ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে বলল, “ভেতরে থাকো।” 

মারদেকা কিছু বলল না। বাইরে ক্লে মরগান আর মিগুয়েল শেডের দিকে তাকিয়ে আছে, রুবেন কোল উঠোনের উত্তর দিকটা দেখছে, আর হ্যাঙ্ক ডসন বাড়ির পেছনের অন্ধকার পরীক্ষা করছে। বাড রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে আছে লারসেনের পাশে। সবাই এখন জানে, রাতের বিপদ আর দূরের কোনো অদৃশ্য ব্যাপার নয়। একজন সশস্ত্র লোক র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে গুলি চালিয়ে গেছে।

লারসেন ধীরে শেডের কাছে গিয়ে কাঠের গায়ে হাত রাখল। গুলির জায়গাটা পরীক্ষা করে সে মাটিতে তাকাল। সেখানে লোকটার বুটের চিহ্ন। কয়েক গজ দূরে বেড়ার কাছে গিয়ে সে থামল। মাটির ওপর একটা ছোট ধাতব বস্তু পড়ে আছে। লারসেন নিচু হয়ে সেটা তুলে নিল। লণ্ঠনের আলোয় আনতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল। এটা সেই একই ধরনের ধাতব চাকতি, যেটা সে কিছুক্ষণ আগে শেডের কাছ থেকে পেয়েছিল, কিন্তু এবার চাকতির গায়ে খোদাই করা চিহ্নটা আরও স্পষ্ট।

বাড কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “কী পেয়েছ?” 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে চাকতিটা হাতের তালুতে উল্টেপাল্টে দেখল। তারপর ধীরে বলল, “এটা সে ইচ্ছে করে ফেলেছে।” 

বাড ভ্রু কুঁচকে বলল, “চিহ্নটা তুমি চেন?” 

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “চিনি। কিন্তু এখনই এর অর্থ বলার সময় নয়।” 

রুবেন কোল এগিয়ে এসে চাকতিটার দিকে তাকাল। ক্লে মরগানও তার পাশে দাঁড়াল। মিগুয়েল আর হ্যাঙ্ক ডসনও এগিয়ে এল। চারজনের মুখেই প্রশ্ন।

লারসেন চাকতিটা মুঠোর মধ্যে বন্ধ করে ফেলল। তারপর সবাইকে উদ্দেশ করে বলল, “আজ রাত থেকে র&#x200d;্যাঞ্চের পাহারা বদলাবে। কেউ একা বাইরে যাবে না। আর ভোর হলে আমরা প্রথমে বেড়া, শেড আর আস্তাবল পুরোটা পরীক্ষা করব।” 

বাড মাথা নাড়ল। “আমি ভোরে উত্তর দিকটা দেখব।” 

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু একা নয়।” বাড এবার কিছু বলল না।

দূরে কোথাও আবার ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি শোনা গেল। সবাই একসঙ্গে সেই দিকে তাকাল। কিন্তু এবার কেউ দৌড়াল না। কেউ গুলি তুলল না। তারা শুধু দাঁড়িয়ে শুনল। কয়েক মুহূর্ত পর শব্দটা থেমে গেল। রাত আবার শান্ত হয়ে গেল, কিন্তু আগের সেই শান্তি আর নেই।

লারসেন ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখ গিয়ে থামল মারদেকার ওপর। ছেলেটা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে ভয় নেই, কিন্তু সে জানে আজকের রাত তার জন্যও একটা পরিবর্তনের শুরু। লারসেন কিছু বলল না। শুধু রিভলভারটা কোমরে গুঁজে নিল। তারপর সে নিচু গলায় বলল, “সবাই ভেতরে যাও। আজ রাত শেষ হয়নি।”

কেউ আর প্রশ্ন করল না। একে একে ক্লে মরগান, রুবেন কোল, মিগুয়েল এবং হ্যাঙ্ক ডসন বাড়ির ভেতরে ঢুকল। ইলাই মারদেকাকে সঙ্গে নিয়ে গেল। বাড শেষবারের মতো চারপাশ দেখে দরজা বন্ধ করল। লারসেন সবার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল, হাতে সেই কালচে ধাতব চাকতি। পকেট থেকে আগে পাওয়া চাকতিটাও বের করলো। 

সে ভাবছে, বহুদিন ধরে ছায়ার মধ্যে চলতে থাকা ষড়যন্ত্র প্রথমবার র&#x200d;্যাঞ্চের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। আর ভোর হলে সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে তাদের জানতে হবে, শত্রু আসলে কতটা কাছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/264551/</link>
				<pubDate>Sat, 22 Aug 2026 08:53:40 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–পনের<br />
মারদেকা উত্তরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দূরে কোথাও সেই ঘোড়ার ক্ষীণ হ্রেষাধ্বনি আর শোনা যাচ্ছে না। কেবল মাঝে মাঝে বাতাস শুকনো ঘাসের মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, আর তাতে ঘাসগুলো একসঙ্গে সরে গিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসছে। র&#x200d;্যাঞ্চের বাড়ির বারান্দায় লণ্ঠনের হলুদ আলো জ্বলছে। সেই&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-264551"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/264551/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">edf31000824ad248bb087d451a869929</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

অধ্যায়–চৌদ্দ
মারদেকা দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। আস্তাবলের উঠোনটা প্রায় ফাঁকা। সকালের রোদ এখন অনেকটাই তীব্র হয়ে উঠেছে। কাঠের বেড়ার ওপর পড়ে থাকা আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। দূরে কয়েকটা ঘোড়া মাথা নিচু করে ঘাস খাচ্ছে। বাতাসে শুকনো খড়ের গন্ধ, ঘোড়ার ঘামের গন্ধ আর গরম কাঠের একটা কড়া গন্ধ মিশে আছে।

কিন্তু সেই মুহূর্তে এসবের কোনোটাই মারদেকার মনে জায়গা করে নিতে পারল না। তার কান এখনও সেই শব্দটা নিয়েই ব্যাস্ত। খুব ক্ষীণ একটা শব্দ। যেন ধাতব কোনো জিনিস কাঠের সঙ্গে ঠেকে আবার সরে গেছে।

মারদেকা দরজার ফাঁকটা আরেকটু বাড়িয়ে দিল। তার ডান হাত তখনও দরজার কাঠে রাখা। শরীরের বেশির ভাগটা ছায়ার মধ্যে, শুধু মুখের এক পাশ রোদের মধ্যে বেরিয়ে আছে। সে উঠোনের দিকে তাকাল। কেউ নেই। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে সে বাইরে বেরিয়ে এল।

বুটের তলায় শুকনো মাটি কচমচ করে উঠল। শব্দটা শুনে সে সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল। বাঁদিকে র&#x200d;্যাঞ্চের মূল উঠোন। ডানদিকে পুরোনো কাঠের বেড়া। তার ওপারে নিচু ঝোপঝাড় আর শুকনো ঘাসের বিস্তীর্ণ জমি। আরও দূরে প্রেইরি নেমে গেছে ঢেউ খেলানো বাদামি-সবুজ সমতলের দিকে।

সকালের বাতাস তখনও পুরোপুরি থেমে যায়নি। ঘাসের মাথাগুলো একসঙ্গে দুলছে। তারপর হঠাৎ ডানদিকে, আস্তাবলের পেছনের দিক থেকে খুব মৃদু একটা ঘর্ষণের শব্দ এল। মারদেকার চোখ সরু হয়ে গেল। সে শব্দের দিকে এগিয়ে গেল।

আস্তাবলের পেছনে একটা পুরোনো কাঠের গাড়ি রাখা। বহুদিন ব্যবহার না হওয়ায় চাকাগুলোর ওপর ধুলোর মোটা আস্তরণ জমেছে। গাড়ির একপাশে কয়েকটা ভাঙা বস্তা, পুরোনো দড়ি আর একটা মরচেধরা লোহার চাকা পড়ে আছে। মারদেকা গাড়িটার আড়ালে তাকাল।

কেউ নেই। সে এবার হাঁটু গেড়ে মাটির দিকে তাকাল। ধুলোয় কয়েকটা ছাপ দেখা যাচ্ছে। ঘোড়ার নয়, বুটের। কিন্তু ছাপগুলো খুব পরিষ্কার নয়। কিছুটা পুরোনো, কিছুটা নতুন। তার ওপর বাতাসে উড়ে আসা শুকনো ঘাস আর ধুলো জমে আছে।

মারদেকা আঙুল দিয়ে একটা ছাপের কিনারা ছুঁয়ে দেখল। তারপর হাত সরিয়ে নিল। এখানে কেউ এসেছিল। কখন এসেছিল, সেটা বোঝা কঠিন।

ঠিক তখনই দূর থেকে বাড হিগিন্সের গলা শোনা গেল, &quot;মারদেকা!&quot;

ছেলেটা ঘুরে তাকাল। বাড দ্রুত পায়ে আস্তাবলের দিকে এগিয়ে আসছে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে স্বাভাবিক নিশ্চিন্ততা নেই। মুখটাও আগের মতো শান্ত নয়।

বাড কাছে এসে প্রথমে ছেলেটার মুখের দিকে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, &quot;তুমি এখানে কী করছ?&quot;

মারদেকা আস্তাবলের পেছনের দিকে তাকাল। &quot;একটা শব্দ পেয়েছিলাম।&quot;

&quot;কী শব্দ?&quot;

&quot;লোহার মতো কিছু কাঠে লেগেছিল।&quot;

বাড সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে তাকাল। তার চোখ একবার গাড়ির ওপর গেল, তারপর বেড়ার দিকে। সে কোনো কথা না বলে মারদেকার পাশে এসে দাঁড়াল। &quot;কোথায় শুনেছ?&quot;

মারদেকা হাত তুলে আস্তাবলের পেছনের দিকে দেখাল। বাড সেখানে গিয়ে মাটির দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত কিছু বলল না। তারপর ধীরে হাঁটু গেড়ে বসল।

মাটির ওপর বুটের ছাপটা সে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। কিছুক্ষণ ছাপটার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর উঠে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি এবার চলে গেল উত্তরের দিকে, সেই দিকেই র&#x200d;্যাঞ্চের পুরোনো বেড়া। কয়েক মুহূর্ত সে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। &quot;চলো।&quot;

মারদেকা তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল।

র&#x200d;্যাঞ্চের উত্তর দিকটা অন্য অংশের তুলনায় অনেক বেশি নির্জন। এখানে মানুষের চলাচল কম। বেড়ার কয়েকটি খুঁটি বেঁকে গেছে, কোথাও কাঠের অংশ পচে গিয়েছে। বেড়ার ওপারে কোমরসমান শুকনো ঘাস। তার মধ্যে ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট পাথর, কাঁটাঝোপ আর আগের বছরের শুকনো গাছের ডাল।

মাটিটাও এখানে শক্ত। ঘোড়ার খুরের ছাপ থাকলে সহজেই চোখে পড়ে। বাড হঠাৎ থেমে গেল। মারদেকাও থামল। বাড নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল। সেখানে সত্যিই কয়েকটি খুরের ছাপ। একটার ওপর আরেকটা পড়েছে। কিছুটা বাতাসে মুছে গেছে। কিন্তু দুটো ঘোড়া যে এখানে দাঁড়িয়েছিল, সেটা বোঝা যায়।

মারদেকা নিঃশব্দে ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। 

বাড বলল, &quot;এগুলো আমি রাতেই পেয়েছিলাম।&quot;

মারদেকা মাথা তুলল। &quot;কেউ ঘোড়ায় করে এখানে এসেছিল?&quot;

বাড বেড়ার ওপারের দিকে তাকাল। ”এখন সেটাই জানতে হবে।&quot; সে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে বেড়ার একটা খুঁটি পরীক্ষা করল। কাঠের গায়ে নতুন ঘষার দাগ। তার ভ্রু কুঁচকে গেল। &quot;এই দাগটা আগে ছিল না।&quot;

মারদেকা কাছে এসে তাকাল। দাগটা খুব সামান্য। যেন ধাতব কোনো জিনিস কাঠের সঙ্গে ঘষা খেয়েছে। কাঠের গায়ে নতুন হলদে আঁশ উঠে আছে। সে আঙুল বাড়িয়ে দাগটার ওপর রাখল। তারপর হাত সরিয়ে নিল। &quot;আস্তাবলে যে শব্দটা পেয়েছিলাম...&quot;

বাড তার দিকে তাকাল। কেউ হয়তো রাতে র&#x200d;্যাঞ্চের আশেপাশে ঘোরাফেরা করেছে। কিন্তু কেন? সে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখ এবার বেড়ার ওপারে। সেখানে কোনো মানুষ নেই। কোনো ঘোড়াও নেই। শুধু বাতাসে দুলতে থাকা শুকনো ঘাস।

দূরে একটা বাজপাখি আকাশে চক্কর দিচ্ছে। বাড নিচু গলায় বলল, &quot;এই কথাটা এখন কাউকে বলবে না।&quot;

মারদেকা মাথা নাড়ল। সে আবার মাটির দিকে তাকাল। খুরের ছাপগুলো যেন তার চোখে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে বলল, &quot;ওরা কি র&#x200d;্যাঞ্চটাকে দেখছিল?&quot;

বাড এবার তার দিকে তাকাল। তারপর বলল, &quot;হতে পারে।&quot; বেড়ার ওপর হাত রাখল। দূরের প্রেইরির দিকে তাকিয়ে তার মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল। কিন্তু কে এসেছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সে কেন এসেছিল। আস্তে করে ঘুরে দাঁড়াল। &quot;চলো।&quot;

মারদেকা তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক কদম যাওয়ার পর সে আবার থেমে গেল। তার চোখ আস্তাবলের দিকে। সেখানে বাতাসের সঙ্গে একটা ঝুলন্ত লোহার বকল দুলছে। বকলটা কাঠের খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। টক। টক। খুব ক্ষীণ একটা শব্দ।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে থাকল। তারপর বুঝতে পারল, কিছুক্ষণ আগে যে শব্দ সে শুনেছিল, সেটা হয়তো এই বকলেরও হতে পারে। কিন্তু তার চোখ আবার চলে গেল আস্তাবলের পেছনের সেই জায়গাটার দিকে। কারণ শব্দটা সে শুনেছিল বকলটা থামার আগেই।

মারদেকা ধীরে ধীরে আবার হাঁটতে শুরু করল। বাড তার পাশে। তারা যখন আস্তাবলের কাছে ফিরে এল, তখন মারদেকা হঠাৎ মাটির দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। ধুলোয় একটা সরু দাগ।

ঘোড়ার খুরের নয়। কোনো ভারী জিনিস টেনে নিয়ে যাওয়ারও নয়। বরং যেন বুটের গোড়ালি ঘুরে যাওয়ার সময় মাটিতে একটা অর্ধচন্দ্রাকার দাগ তৈরি হয়েছে।

মারদেকা নিচু হয়ে সেটা দেখল। বাডও পাশে এসে দাঁড়াল।

মারদেকা দাগটার ওপর হাত রাখল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, &quot;কেউ এখানে দাঁড়িয়েছিল।&quot;

বাড তার দিকে তাকাল। &quot;কীভাবে বুঝলে?&quot;

মারদেকা এবার মাটির দিকে তাকিয়েই বলল, &quot;দাগটা একদিকে নয়।&quot;

বাড কিছুক্ষণ দাগটার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর তার মুখে ধীরে ধীরে একটা কঠিন ভাব ফুটে উঠল। সে চারপাশে তাকাল। কেউ দেখছে না। কেউ জানে না। 

আর সেই মুহূর্তে বাড প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল, রাতের সেই অচেনা ঘোড়ার ছাপ হয়তো কেবল বেড়ার বাইরে এসে থেমে থাকা কোনো পথিকের ব্যাপার নয়।

কেউ হয়তো র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতর পর্যন্ত এসেছিল। কতটা কাছে? কেন? আর কী দেখেছে? 
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর এখনো অন্ধকারে। বাড নিচু গলায় বলল, &quot;এখান থেকে সরে যাও। আমরা জানি না কে কোথা থেকে তাকিয়ে আছে।&quot;

মারদেকা আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে ধীরে ধীরে আস্তাবলের দিকে ফিরে গেল।

বাড আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে রইল না। সে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে র&#x200d;্যাঞ্চের মূল বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার বুটের তলায় শুকনো মাটি কচমচ করে উঠছিল, কিন্তু তার মন পড়ে ছিল অনেক পেছনে, উত্তরের বেড়ার কাছে, সেই অচেনা খুরের ছাপ আর কাঠের গায়ে নতুন আঁচড়ের মধ্যে। 

র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর তখন দুপুরের রোদ নেমে এসেছে। সকালের কোমল আলো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। আকাশে একটাও মেঘ নেই। সূর্যের তাপে প্রেইরির ঘাসের রং আরও ফিকে, আরও ধূসর দেখাচ্ছে। দূরের পাহাড়গুলো যেন গরম বাতাসের ভেতর সামান্য কাঁপছে।

উঠোনে আগের মতোই কাজ চলছে। কয়েকজন কাউবয় ঘোড়া প্রস্তুত করছে, কেউ জিন বাঁধছে, কেউ কাঠের বাক্স সরাচ্ছে, কেউ আবার ভাঙা বেড়া মেরামত করছে। 

বাড কাউকে কিছু বলল না। সে প্রথমে নিজের ঘোড়াটার কাছে গেল। ঘোড়াটা মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। লাগামের দড়ি খুলে আবার শক্ত করে বাঁধল, তারপর ঘোড়ার পিঠে হাত বুলিয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তার চোখ চলে গেল মূল বাড়ির দিকে। লারসেনের ঘরের জানালাগুলো বাইরে থেকে বন্ধ দেখাচ্ছে। বারান্দায় কেউ নেই। সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। লারসেনকে এখনই সবটা জানাতে হবে।

সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে গেল। লারসেন বেরিয়ে এল। তার মুখ আগের মতোই শান্ত, কিন্তু চোখে সেই পরিচিত সতর্কতা। শহর থেকে আসা লোকটার সঙ্গে কথা শেষ হয়েছে। লোকটি এখন ঘরের ভেতরের একপাশে বসে আছে। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে সে একবার বাইরে তাকাল, তারপর আবার চুপ করে বসে রইল।

লারসেন বাডের দিকে তাকাল। &quot;কীছু হয়েছে?&quot;

বাড সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে একবার লোকটার দিকে তাকাল। লোকটি তাদের কথা শুনতে পারে এমন দূরত্বে বসে আছে।

লারসেন সেটা বুঝতে পারল। সে ধীরে বারান্দার একপাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাডও তার পেছনে গেল। &quot;বল।&quot;

বাড নিচু গলায় বলল, &quot;উত্তরের দিকটা আবার দেখলাম। খুরের ছাপ দুটো ঘোড়ার। সেটা আগের মতোই আছে। কিন্তু বেড়ার একটা খুঁটিতে নতুন আঁচড় পেয়েছি।&quot;

লারসেনের চোখ সামান্য সরু হলো। &quot;কী ধরনের আঁচড়?&quot;

&quot;ধাতব কিছু ঘষা লেগেছে মনে হয়।&quot; বাড একটু থামল। &quot;আস্তাবলের পেছনে মাটিতে বুটের দাগ পেয়েছি।&quot;

লারসেন এবার তার দিকে পুরোপুরি ফিরে তাকাল। &quot;নতুন?&quot;

&quot;নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কিন্তু একটা দাগের মাটি এখনও শক্ত হয়ে বসেনি।&quot;

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল। &quot;মারদেকা সেটা দেখেছে?&quot; 

&quot;হ্যাঁ।&quot;

&quot;সে কী বলেছে?&quot;

&quot;আস্তাবলের কাছে শব্দ শুনেছিল।&quot;

লারসেনের চোখে এবার সামান্য পরিবর্তন দেখা গেল। &quot;কী শব্দ?&quot;

&quot;লোহার মতো কিছু কাঠে লাগার শব্দ।&quot;

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তার চোখ তখন উঠোনের ওপারে। সেখানে মারদেকা একটা কালো ঘোড়ার লাগাম ঠিক করছে। ছেলেটা মাথা নিচু করে নিজের কাজে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, &quot;ওকে কিছু বলবে না&quot;।

বাড অবাক হয়ে তাকাল। কিন্তু লারসেনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করার অভ্যাস তার নেই।

লারসেন আবার বলল, &quot;আজ থেকে উত্তর দিকের বেড়াটা নজরে রাখবে। তবে প্রকাশ্যে নয়।&quot;

&quot;আবার যদি কেউ আসে?&quot;

লারসেনের চোখ এবার কঠিন হয়ে উঠল। &quot;তখন তাকে আসতে দেবে।&quot;

বাড কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। &quot;আসতে দেব?&quot;

লারসেন ধীরে বলল, &quot;হ্যা, দেখব সে কী করতে আসে।&quot;

বাডের ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, লারসেন এখনই বন্দুকের দিকে যেতে চাইছে না। 

বারান্দায় দাঁড়িয়ে লারসেন কিছুক্ষণ মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা তখন ঘোড়াটার কেশর আঁচড়ে দিচ্ছে। তার ভঙ্গিতে কোনো অস্থিরতা নেই। কিন্তু লারসেন জানে, ছেলেটার চোখ এখন আগের মতো নেই। একবার কোনো অস্বাভাবিক জিনিস চোখে পড়লে সে সেটাকে সহজে ভুলবে না।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতে শুরু করল। সূর্য পশ্চিম আকাশের দিকে একটু একটু করে হেলে পড়েছে। তাপ এখনও কমেনি, কিন্তু আলোয় সেই কঠিন সাদা ঝাঁঝটা নেই। 

র&#x200d;্যাঞ্চের কাজও ধীরে ধীরে কমে এসেছে। কেউ ঘোড়াগুলোকে খোঁয়াড়ে ফিরিয়ে নিচ্ছে। কেউ দিনের শেষের সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখছে। রান্নাঘরের দিক থেকে সন্ধ্যার খাবারের প্রস্তুতির গন্ধ ভেসে আসতে শুরু করল।

মারদেকা তখন আস্তাবলের ভেতরে শেষ ঘোড়াটার খুর পরিষ্কার করছিল।

বাড দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাকে কিছুক্ষণ দেখল। হেসে বলল, &quot;সব কাজ একদিনে শেষ করতে নেই।&quot;

মারদেকা খুরটা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর দুজনেই আস্তাবলের বাইরে এল।

বিকেলের আলো তখন উঠোনের ওপর লম্বা হয়ে পড়েছে। ফটকের ওপারে প্রেইরি প্রায় নিস্তব্ধ। মারদেকা একবার উত্তরের দিকে তাকাল। হঠাৎ বলল, &quot;আজ রাতে ওদিকটায় যাবেন?&quot;

বাডের মুখে মৃদু হাসি ফুটল। &quot;তোমার মাথায় এখন অনেক প্রশ্ন ঘুরছে।&quot;

মারদেকা ধীরে বলল, &quot;হ্যাঁ।&quot;

দুজনেই ধীরে ধীরে মূল বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। কিন্তু তারা জানত না, উত্তরের বেড়ার ওপারে তখন কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

প্রেইরির শুকনো ঘাসের মধ্যে একজন মানুষ নিচু হয়ে বসে ছিল। তার শরীর প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে আছে। মাথায় চওড়া টুপি, গায়ে ধুলোমাখা কোট। হাতে একটা ছোট দূরবীন। সে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখ প্রথমে আস্তাবলের দিকে গেল। 
তারপর মূল বাড়ির দিকে। শেষে থামল মারদেকার ওপর।

লোকটি দূরবীন নামিয়ে নিল। তার ঠোঁটে খুব সামান্য একটা হাসি ফুটল। তারপর সে পেছনে তাকাল। দূরে তার ঘোড়া বাঁধা ছিল। ঘোড়াটা এত নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে দূর থেকে তাকে শুকনো ঝোপের মতো মনে হয়।

লোকটি ধীরে উঠে দাঁড়াল। সে বেড়ার দিকে এগিয়ে গেল না। বরং ঘুরে প্রেইরির দিকে হাঁটতে শুরু করল। 

সূর্য তখন পশ্চিম দিগন্তের ওপর রক্তের মতো লাল হয়ে উঠছে। র&#x200d;্যাঞ্চের বাড়িগুলোর ছায়া লম্বা হয়ে প্রেইরির দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই ছায়ার বাইরে, ঘাসের সমুদ্রের মধ্যে, অচেনা মানুষটি তার ঘোড়ায় চড়ে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।

তার পেছনে পড়ে রইল শুধু খুরের কয়েকটি অস্পষ্ট দাগ। দাগগুলো বাতাসে খুব বেশিক্ষণ থাকবে না। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে সে এসেছিল, সেটার ছাপ এত সহজে মুছে যাওয়ার নয়।

সন্ধ্যা নামতে নামতে প্রেইরির রং বদলে গেল। পশ্চিম আকাশের রক্তিম আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। দূরের পাহাড়গুলোর মাথা কালো হয়ে উঠেছে, আর তাদের নিচে বিস্তৃত ঘাসের সমুদ্রটা যেন অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। দিনের গরম এখনও মাটির বুক থেকে বেরোচ্ছে, কিন্তু বাতাসে রাতের ঠান্ডার আভাস এসে গেছে।

লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে সন্ধ্যার কাজ প্রায় শেষ। আস্তাবলের দরজাগুলো একে একে বন্ধ হচ্ছে। ঘোড়াগুলোকে শেষবারের মতো খাবার দেওয়া হয়েছে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে হলুদ আলো বাইরে পড়ে উঠোনের ধুলোর ওপর একটা ছোট আলোকচত্বর তৈরি করেছে। বাড়ির ভেতর থেকে থালা-বাসনের শব্দ ভেসে আসছে।

কিন্তু উত্তর দিকের র&#x200d;্যাঞ্চটা অন্ধকার। সেখানে কোনো আলো নেই, কোনো মানুষের কণ্ঠ নেই। শুধু বাতাসে শুকনো ঘাসের ঘর্ষণের শব্দ, আর দূরের কোথাও নিশাচর পাখির ক্ষীণ ডাক।

মারদেকা আস্তাবলের দরজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এল। তার হাতে একটা ছোট লণ্ঠন। দরজায় তালা লাগানোর আগে সে একবার ভেতরের দিকে তাকাল। সারি সারি ঘোড়া অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। কারও চোখে লণ্ঠনের আলো পড়ে ক্ষণিকের জন্য জ্বলে উঠল, তারপর আবার অন্ধকারে হারিয়ে গেল। মারদেকা দরজাটা টেনে বন্ধ করল।

এক পা এগিয়ে যেতেই থেমে গেল সে। তার মাথা সামান্য কাত হলো। কোথাও একটা শব্দ হয়েছে। খুব ক্ষীণ। মনে হলো শুকনো ঘাসের মধ্যে কোনো কিছু ঘষে গেল।

মারদেকা লণ্ঠনটা একটু নিচু করে ধরল। চারপাশে তাকাল। উঠোন ফাঁকা। মূল বাড়ির বারান্দায় একটা বাতি জ্বলছে। আলোয় কাঠের সিঁড়িগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার বাইরে অন্ধকার এত ঘন যে কয়েক গজ দূরের জিনিসও ঠিকমতো বোঝা যায় না। মারদেকা দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে লণ্ঠনটা নিভিয়ে দিল। অন্ধকার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘিরে ফেলল। কিছুক্ষণ সে নড়ল না। তার চোখ ধীরে ধীরে অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করল। আকাশে তখন কয়েকটা তারা দেখা দিয়েছে। উত্তরের দিকে কালো ঘাসের মাথাগুলো বাতাসে দুলছে।

আবার শব্দ হলো। এবার একটু পরিষ্কার। টুক। মনে হলো কাঠের সঙ্গে ধাতব কোনো জিনিসের হালকা সংঘর্ষ। মারদেকার বুকের ভেতর ধুক করে উঠল। সকালের সেই শব্দটা তার মনে পড়ে গেল, আস্তাবলের কাছে শোনা সেই অদ্ভুত শব্দ।

সে নিঃশব্দে এক পা পিছিয়ে গেল। তারপর আরেক পা। কিন্তু এবার সে ভয় পেয়ে পালাল না। লারসেন তাকে শিখিয়েছে, অজানা শব্দ থেকে দূরে সরে যাওয়ার আগে জানতে হয় শব্দটা কোথা থেকে এসেছে।

মারদেকা মাটির দিকে তাকাল। চাঁদের আলো এখনও ওঠেনি। তবু আকাশের ক্ষীণ আলোয় শুকনো মাটির ওপর কিছু দাগ বোঝা যাচ্ছে। সে হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে মাটি ছুঁল। ঠান্ডা। শুকনো। কিন্তু এক জায়গায় মাটি একটু নরম। আঙুল দিয়ে ছুঁতেই সেটা ভেঙে গেল।

ঘোড়ার খুর নয়। বুটের ছাপ।

মারদেকার নিঃশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে ধীরে মাথা তুলল। ছাপটা আস্তাবলের পেছনের দিকে গেছে। আর তার পরের ছাপটা অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেছে।

মারদেকা উঠে দাঁড়াল। তাকে একটা জিনিস জানতে হবে। লোকটা কোথায় গেছে?

সে ধীরে ধীরে এগোল। লণ্ঠন জ্বালাল না। শুধু হাত দিয়ে সামনে পথ মেপে নিচ্ছে। তার বুটের নিচে শুকনো ঘাস চাপা পড়ে খুব সামান্য শব্দ করছে।

আস্তাবলের পেছনে পৌঁছে সে থেমে গেল। সেখানে একটা পুরোনো কাঠের বেড়া। বেড়ার ওপারে অন্ধকার প্রেইরি। দিনের আলোয় জায়গাটা খুব সাধারণ মনে হলেও সন্ধ্যার পর সেটাই যেন অন্য এক জগৎ হয়ে উঠেছে। বেড়ার ওপারের ঘাসগুলো বাতাসে দুলছে, আর অন্ধকারের মধ্যে তাদের মাথাগুলো কখনও দেখা যাচ্ছে, কখনও হারিয়ে যাচ্ছে।

মারদেকা নিচু হয়ে মাটির দিকে তাকাল। দুটি ছাপ। তারপর তিনটি। তারপর আর কিছু নেই। সে মাথা তুলে বেড়ার দিকে তাকাল। একটা খুঁটির গায়ে অদ্ভুত কালচে দাগ। হাত বাড়িয়ে দাগটা ছুঁল। তার আঙুলে কালো গুঁড়ো লেগে গেল। সে সেটা নাকের কাছে নিয়ে গেল। তেলের গন্ধ। ঘোড়ার জিনের চামড়ায় ব্যবহৃত তেলের মতো।

হঠাৎ তার পেছনে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ হলো। মারদেকা ঘুরে দাঁড়াল। কেউ নেই। 
শুধু আস্তাবলের কালো দেয়াল। তারপর বাম দিকে ঘাসের মধ্যে কিছু একটা নড়ল। সে ধীরে ধীরে এক পা পিছিয়ে এল। ঘাস আবার নড়ল। এবার একটু বেশি।

মারদেকার চোখ সরু হয়ে গেল। সে বুঝল, বাতাস ওই দিক থেকে আসছে না। তাহলে ঘাস নড়ছে কেন? একটা শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ হলো। সে আর দাঁড়িয়ে থাকল না। সে এক ঝটকায় পাশের কাঠের দেওয়ালের আড়ালে সরে গেল। তারপর নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর ঘাসের মধ্যে আর কোনো শব্দ নেই।

হঠাৎ দূরে একটা ঘোড়া হ্রেষাধ্বনি করে উঠল। র&#x200d;্যাঞ্চের আস্তাবল থেকে নয়। প্রেইরির দিক থেকে। মারদেকার শরীর শক্ত হয়ে গেল। ঘোড়া আছে বাইরে। তারমানে কেউ আছে ওখানে। সে ধীরে মাথা বাড়িয়ে বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকাল। অন্ধকারের মধ্যে কিছুই দেখা গেল না। কিন্তু তারপর খুব দূরে একটা ক্ষীণ আলো দেখা গেল।

লণ্ঠনের আলো। এক মুহূর্ত দেখা গেল। তারপর অদৃশ্য।

মারদেকা চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল। আলোটা আবার জ্বলে উঠল। এবার একটু অন্য জায়গায়। কেউ হাঁটছে না। ঘোড়ায় চড়েছে। লণ্ঠনটা ঘোড়ার পাশে দুলছে। বুঝতে পারল, লোকটা চলে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? সে এত কাছে এসে আবার ফিরে যাচ্ছে কেন?

মারদেকা আর অপেক্ষা করল না। সে দৌড় দিল না, বরং যতটা সম্ভব নিঃশব্দে বেড়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে র&#x200d;্যাঞ্চের মূল বাড়ির দিকে এগোল। কয়েক কদম যাওয়ার পর হঠাৎ থেমে গেল। তার কানে তখন আরেকটা শব্দ এসেছে। খুব দূরে। ঘোড়ার খুরের শব্দ। একটা ঘোড়া নয়। দুটো।

শব্দ ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। মারদেকা দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল। তার মনে পড়ল সকালের কথা। দুটো ঘোড়ার ছাপ। বাডের মুখ। লারসেনের সতর্কতা। আর সেই অচেনা লোক, যে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে এবার স্পষ্টতঃ বুঝতে পারল, লোকটা একা আসেনি।

মারদেকা দ্রুত মূল বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। বারান্দায় পৌঁছানোর আগেই সে দেখতে পেল বাড সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে রাইফেল। চোখ উত্তরের দিকে। সেও থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত শ্বাস সামলে বলল, &quot;ওরা এসেছে।&quot;

বাডের মুখের ভাব বদলে গেল। &quot;কারা?&quot;

মারদেকা উত্তরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। &quot;জানি না।&quot;

বাড সিঁড়ি থেকে নেমে তার কাছে এল। &quot;কতজন?&quot;

&quot;দেখিনি।&quot;

&quot;তাহলে কীভাবে জানো?&quot;

মারদেকা নিচু গলায় বলল, &quot;দুটো ঘোড়া গেছে।&quot;

বাডের চোখ সরু হয়ে গেল। &quot;কোথা দিয়ে?&quot;

&quot;উত্তরের বেড়ার ওদিক দিয়ে।&quot;

বাড আর কোনো কথা বলল না। সে মারদেকার কাঁধে হাত রেখে তাকে নিজের পেছনে সরিয়ে দিল। &quot;ভেতরে যাও।&quot;

বাডের কণ্ঠ এবার কঠিন। মারদেকা বুঝল, আর কথা বলা যাবে না। সে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগোল।

কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে আবার থেমে গেল। তার চোখ উত্তরের অন্ধকারে। বাড তখন রাইফেল তুলে ধরেছে।

&quot;বাড...&quot;

&quot;কী?&quot;

মারদেকা খুব নিচু গলায় বলল, &quot;ওরা চলে যায়নি।&quot;

বাড তার দিকে তাকাল। &quot;কী বললে?&quot;

মারদেকা উত্তর দিল না। তার চোখ র&#x200d;্যাঞ্চের উত্তর-পশ্চিম কোণের দিকে স্থির। 
সেখানে একটা শুকনো গাছ। গাছটার নিচে অন্ধকারের মধ্যে একটা মানুষের অবয়ব।
একেবারে স্থির।

বাডও এবার সেটা দেখতে পেল। তার আঙুল রাইফেলের ট্রিগারের কাছে শক্ত হয়ে গেল। লোকটা নড়ল না। শুধু কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে মাথাটা সামান্য তুলল। 
তারপর হাত উঠাল। তার হাতে কিছু একটা আছে। মারদেকার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

বাড ফিসফিস করে বলল, &quot;নিচু হও!&quot;

দুজনেই একই সঙ্গে ঝুঁকে পড়ল। পরের মুহূর্তে অন্ধকার চিরে একটা তীক্ষ্ণ সো সো শব্দ ছুটে এল। গুলি নয়। একটা তীর। তীরটা এসে বাড়ির বারান্দার কাঠের খুঁটিতে গেঁথে গেল।

মারদেকা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। বাড ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে এবার বিস্ময়ের চেয়ে বেশি ছিল ক্রোধ। সে তীরটার দিকে তাকাল। তারপর অন্ধকারের দিকে। কিন্তু শুকনো গাছটার নিচে আর কেউ নেই। মানুষটা অদৃশ্য হয়ে গেছে।

বাড দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই বাড়ির ভেতর থেকে লারসেনের কণ্ঠ ভেসে এল। সে ঘুরে তাকাল।

লারসেন দরজার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে রিভলভার। চোখ উত্তরের অন্ধকারে। সে ধীরে ধীরে বাইরে এসে বারান্দায় দাঁড়াল। কাঠের খুঁটিতে গেঁথে থাকা তীরটার দিকে তাকিয়ে তার মুখ এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। 

তারপর তীরটা টেনে বের করল। তীরের মাথায় ছোট একটা কাপড় বাঁধা। লারসেন কাপড়টা খুলল। ভেতরে ভাঁজ করা একটা কাগজ। বাডের চোখ কাগজটার ওপর স্থির হয়ে গেল। মারদেকাও তাকিয়ে আছে।

লারসেন কাগজটা খুলল। মাত্র কয়েকটি শব্দ। সে পড়ল। তারপর আবার পড়ল। তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। কিন্তু এবার তার চোখে যে ঠান্ডা কঠোরতা ফুটে উঠল, সেটা বাড আগে বহুবার দেখেছে। সেই কঠোরতা দেখা দিলে সাধারণত পশ্চিমের কোনো মানুষ খুব বেশি সময় নিরাপদ থাকে না।

বাড নিচু গলায় বলল, &quot;কী লেখা আছে?&quot;

লারসেন কাগজটা ভাঁজ করল। কয়েক মুহূর্ত কোনো উত্তর দিল না।

মারদেকার বুকের ভেতর যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। বাডের মুখও শক্ত হয়ে উঠল।

লারসেন বারান্দার কিনারায় দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে তখনও ভাঁজ করা কাগজটা। উত্তরের প্রেইরির দিকে তাকিয়ে তার চোখ এতটাই স্থির যেন মনে হচ্ছিল, অন্ধকারের পর্দা ভেদ করে সে সেই অদৃশ্য মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছে।

বাড রাইফেলটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার আঙুল ট্রিগারের ওপর নয়, কিন্তু খুব কাছেই। 

মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তার বুক দ্রুত উঠানামা করছে, কিন্তু সে কোনো শব্দ করছে না। তার চোখ উত্তরের অন্ধকারে। সেই অন্ধকারের মধ্যে আবার ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। তারপর থেমে গেল।

বাড ধীরে মাথা ঘুরিয়ে লারসেনের দিকে তাকাল। &quot;ওরা র&#x200d;্যাঞ্চের বাইরে থেমেছে।&quot;

লারসেন মাথা নাড়ল। &quot;জানি।&quot;

&quot;তীরটা কি শুধু ভয় দেখানোর জন্য?&quot;

লারসেন কাগজটার দিকে তাকাল। &quot;হতে পারে।&quot;

বাড আর কিছু বলল না।

লারসেন ধীরে ধীরে কাগজটা খুলল। লণ্ঠনের হলুদ আলোয় কাগজের ওপর লেখা কয়েকটি শব্দ আবার দেখা গেল। অক্ষরগুলো বড় নয়, কিন্তু লেখার ভঙ্গিতে এমন এক ধরনের আত্মবিশ্বাস ছিল, যেন যে লোক লিখেছে সে জানে, এই কাগজ পড়ার পর যার হাতে পড়বে, সে তার কথাকে হালকা করে দেখবে না।

মারদেকা অনিচ্ছায় এক পা এগিয়ে এল। &quot;কী লেখা আছে?&quot;

লারসেন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাগজটা ভাঁজ করে কোটের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। &quot;সেটা তোমার এখনই জানার দরকার নেই।&quot;

মারদেকা আর প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার চোখে যে প্রশ্নটা রয়ে গেল, সেটা লারসেন বুঝতে পারল। সে উত্তরের দিকে তাকিয়েই বলল, &quot;কারণ ওরা আমাদের ভয় দেখিয়ে জানিয়ে দিয়েছে যে ওরা এখানে আছে।&quot;

লারসেন এবার বারান্দার কাঠের খুঁটির দিকে তাকাল, যেখানে কয়েক মুহূর্ত আগেও তীরটা গেঁথে ছিল। &quot;যে মানুষ সত্যিই কাউকে মারতে আসে, সে আগে থেকে খবর দিয়ে জানায় না।&quot;

বাড ধীরে মাথা নাড়ল। কথাটা সত্যি। পশ্চিমে সে বহুবার দেখেছে, সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষগুলো কখনও নিজেদের উপস্থিতি ঘোষণা করে না। তারা ছায়ার মতো আসে, কাজ শেষ করে চলে যায়। যারা গুলি চালানোর আগে কথা বলে, তাদের ভয়ংকর বলা যায়, কিন্তু যারা কথা না বলে গুলি চালায়, তাদের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগই থাকে না।

হঠাৎ র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম দিক থেকে একটা ঘোড়া চেঁচিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আরও দুটো ঘোড়া আস্তাবলের ভেতর অস্থির হয়ে নড়েচড়ে উঠল। খুরের শব্দ কাঠের মেঝেতে দ্রুত আঘাত করতে লাগল।

মারদেকার মাথা ঘুরে গেল। &quot;ওরা ঘোড়াগুলোকে ভয় দেখাচ্ছে,&quot; সে ফিসফিস করে বলল।

লারসেন তার দিকে তাকাল। 

মারদেকা একটু থেমে বলল, &quot;ওরা কাছাকাছি আছে।&quot;

লারসেনের চোখে ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল। &quot;কেন বলছ?&quot;

&quot;ঘোড়াগুলো একসঙ্গে ভয় পায়নি। একটা আগে চেঁচিয়েছে। তারপর অন্যগুলো।&quot;

বাড এবার ছেলেটার দিকে তাকাল। তার মুখে অল্প বিস্ময় ফুটে উঠেছে।

লারসেন ধীরে বলল, &quot;ভালো।&quot;

তারপর সে বাডের দিকে ফিরল। &quot;তুমি উত্তর দিকটা দেখো।&quot;

&quot;আর পশ্চিম?&quot;

&quot;আমি দেখছি।&quot;

বাড সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। লারসেন মারদেকার দিকে তাকাল। &quot;তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।&quot; মারদেকা মাথা নাড়ল।

তারা দুজন বাড়ির পশ্চিম পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল। লারসেনের হাতে রিভলভার। মারদেকার হাতে একটা ছোট লণ্ঠন। সলতেটা কমানো। পায়ের কাছে ছোট্ট আলো ফেলছে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে আগের সেই কিশোরসুলভ অস্থিরতা নেই। প্রতিটি পা ফেলার আগে সে মাটি অনুভব করছে। শুকনো ঘাস কোথায় বেশি, কোথায় কম, কোথায় মাটি শক্ত, কোথায় বুটের পুরোনো ছাপ, তার চোখ সবকিছু ধরছে।

বাড়ির পশ্চিম পাশটা অন্য জায়গার তুলনায় অনেক অন্ধকার। মূল উঠোনের আলো এখানে এসে পৌঁছায় না। একটা পুরোনো কাঠের শেডের ছায়া প্রায় পুরো জায়গাটাকে ঢেকে রেখেছে। শেডের পেছনে কয়েকটা মরচে ধরা কৃষি-সরঞ্জাম পড়ে আছে। বহুদিন ব্যবহার না হওয়া একটা লোহার চাকা মাটিতে কাত হয়ে পড়ে আছে। তার ওপর শুকনো লতাগুল্ম উঠে গেছে।

লারসেন হঠাৎ হাত তুলে থামার ইশারা করল। সে নিচু হয়ে ঝোপের সামনে মাটি পরীক্ষা করল। কিছুক্ষণ পর তার আঙুল একটা চিহ্নের ওপর থেমে গেল। বুটের ছাপ। খুব নতুন। ছাপটার দিকে সে তাকিয়ে থাকল।

মারদেকা কাছে এসে নিচু হলো। লন্ঠনের সলতেটা একটু বাড়িয়ে দিল। 

লারসেন বলল, &quot;একজন এখানে দাঁড়িয়েছিল।&quot; একটু দূরের মাটির দিকে তাকাল। আরেকটা ছাপ। তারপর আরেকটা। ছাপগুলো পশ্চিম দিকে গেছে।

মারদেকা মাথা তুলল। &quot;সে আমাদের দেখছিল।&quot;

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। &quot;সম্ভবত।&quot;

&quot;তাহলে এখন সে কোথায়?&quot;

লারসেন উত্তর দিল না। দূরে আবার ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। এইবার শব্দটা অনেক স্পষ্ট। দুটো ঘোড়া। কিন্তু তারা র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে আসছে না। পশ্চিমের দিকে যাচ্ছে। লারসেন কয়েক মুহূর্ত শুনে বলল, &quot;চলো।&quot;

তারা দ্রুত বাড়ির পেছনে ফিরে এল। বাড তখন উত্তর দিক থেকে ফিরে আসছে। তার মুখ গম্ভীর।

&quot;কী পেয়েছ?&quot; লারসেন জানতে চাইল।

বাড মাথা নাড়ল। &quot;কেউ নেই। কিন্তু বেড়ার ওপারে নতুন ছাপ আছে। আগের গুলোর চেয়ে তাজা।&quot;

লারসেন কিছু বলল না। বাড এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল, &quot;আর একটা জিনিস পেয়েছি।&quot; সে হাত বাড়িয়ে ছোট একটা বস্তু দেখাল। চামড়ার সরু ফালি। কালো চামড়া। এক প্রান্ত ছেঁড়া। 

লারসেন সেটা হাতে নিল। চামড়ার ওপর খুব ক্ষীণ একটা দাগ ছিল। যেন কোনো চিহ্ন একসময় খোদাই করা হয়েছিল, পরে ইচ্ছা করে ঘষে মুছে ফেলা হয়েছে। লারসেনের চোখ সেই দাগের ওপর স্থির হয়ে গেল।

বাড জিজ্ঞেস করল, &quot;চেনেন?&quot;

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। চামড়ার টুকরোটা মুঠোয় বন্ধ করে ফেলল। &quot;না,&quot; সে ধীরে বলল।

বাড তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, লারসেন সত্যি বলছে না। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রশ্ন করে কোনো লাভ নেই। হঠাৎ বাড়ির ভেতর থেকে দরজা খোলার শব্দ হলো।

শহর থেকে আসা সেই লোকটি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে একটা কাপ। কিন্তু মুখে কোনো স্বাভাবিক ভাব নেই। বাইরের অস্থিরতা সেও টের পেয়েছে। সে নিচু গলায় বলল, &quot;আমার ঘোড়াটা কোথায়?&quot;

বাড ঘুরে তাকাল। &quot;আস্তাবলে।&quot;

লোকটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, &quot;আমাকে এখন যেতে হবে।&quot;

তিনজনই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল। লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। &quot;তুমি নিশ্চিত?&quot;

লোকটা একবার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো। 

বাড আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। সে আস্তাবলের দিকে হাঁটা দিল। ফিরে এলো তার লাল-সাদা ঘোড়াটা নিয়ে। বিদায় নিয়ে লোকটা সন্ধ্যের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

লারসেন তার পেছনে তাকিয়ে রইল। তারপর মারদেকার দিকে ফিরে বলল, &quot;তুমি এখানে থাকবে।&quot; তারপর আবার ঘরে ঢুকে গেল।

মারদেকা মাথা নাড়ল।  কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে রইল না। সে উঠোনে নেমে এল। ততক্ষণে লন্ঠনের সলতেটা আবার নামিয়ে দিয়েছে। ধীরে আস্তাবলের দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখ তখন মাটিতে। নিচে ধুলোর ওপর ভারী কিছু টেনে নেবার দাগ। সে আস্তে করে হাঁটু গেড়ে বসে দাগটা পরীক্ষা করল। সহসা তার চোখে এমন এক পরিবর্তন এল, যা কয়েক মাস আগেও তার মধ্যে দেখা যেত না।

সে ধীরে মাথা তুলল। দূরে উত্তরের অন্ধকারে একটা ছায়া নড়ল। মাত্র এক মুহূর্ত। তারপর অদৃশ্য।

মারদেকার বুকের ভেতর আবার সেই ধক করে ওঠা অনুভূতি হলো। কিন্তু এবার সে ভয় পেল না। সে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। সে বুঝে গেছে, এই পথ দিয়ে একটা ঘোড়া গেছে। ঘোড়াতে কোন সওয়ারী ছিল না। কেউ একজন ঘোড়াটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু, সেই ছাপ মুছবার জন্য ঘোড়ার পিছে বস্তায় ভারী কিছু ভরে টেনে নিয়ে গেছে।

তার চোখ তখন উত্তরের বেড়ার দিকে। অন্ধকারের মধ্যে যেন কেউ তাকে দেখছে। স্রে দ্রুত ঘরে ফিরে এলো। লারসেনের দরজায় টোকা দিল।

আর সেই মুহূর্তেই দূরে কোথাও ঘোড়ার ক্ষীণ হ্রেষাধ্বনি শোনা গেল। একবার। তারপর আরেকবার।  
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/263924/</link>
				<pubDate>Thu, 20 Aug 2026 03:22:45 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–চৌদ্দ<br />
মারদেকা দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। আস্তাবলের উঠোনটা প্রায় ফাঁকা। সকালের রোদ এখন অনেকটাই তীব্র হয়ে উঠেছে। কাঠের বেড়ার ওপর পড়ে থাকা আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। দূরে কয়েকটা ঘোড়া মাথা নিচু করে ঘাস খাচ্ছে। বাতাসে শুকনো খড়ের গন্ধ, ঘোড়ার ঘামের গন্ধ আর গরম কাঠের একটা কড়া গন্ধ মিশে আছ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-263924"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/263924/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">f973d774317f88e445be04ad2dbd40b9</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–তের
পরদিন সকাল। সূর্য তখনও পুরোপুরি ওপরে ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু প্রেইরির বুক থেকে ভোরের শীতলতা এখনও সরে যায়নি। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের ডগাগুলো প্রথম সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। দূরের পাহাড়গুলো ধূসর নীল থেকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দক্ষিণ দিক থেকে আসা হালকা বাতাস শুকনো ঘাসের মাথাগুলো একসঙ্গে দুলিয়ে দিচ্ছে।

লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের পেছনের খোলা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে।

তার সামনে গতকালের সেই কটনউডের গুঁড়ি। বহু বছরের রোদ-বৃষ্টি আর কুড়ালের আঘাতে কাঠটা ক্ষয়ে গেছে। গুঁড়ির গায়ে অসংখ্য দাগ, ফাটল আর কালচে ছোপ। তার সামনে মাটির ওপর পাশাপাশি তিনটি সরু রেখা টানা।

মারদেকা কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে লারসেনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার পরনে র&#x200d;্যাঞ্চের সাধারণ কাজের পোশাক। হাতে কিছু নেই। কিন্তু গতকালের তুলনায় তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে সামান্য পরিবর্তন এসেছে। সে আর নিজের পায়ের দিকে বারবার তাকাচ্ছে না। বরং সামনে, পাশে, পেছনে, চারপাশের সবকিছু একসঙ্গে লক্ষ্য করার চেষ্টা করছে।

বাড হিগিন্স একটু দূরে একটা পুরোনো কাঠের খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করা। মুখে সেই পরিচিত গম্ভীর ভাব, কিন্তু চোখে কৌতূহল।

লারসেন মাটির তিনটি দাগের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, &quot;গতকাল তুমি চোখ দিয়ে দেখতে শিখেছ।&quot;

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। সকালের আলোয় তার মুখের শক্ত রেখাগুলো আরও স্পষ্ট। &quot;আজ পা দিয়ে দেখতে শিখবে।&quot;

মারদেকার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। &quot;পা দিয়ে?&quot; সে কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

লারসেনের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটল। &quot;শুনতে অদ্ভুত লাগছে, তাইনা?&quot;

মারদেকা একটু ইতস্তত করে মাথা নেড়ে বলল, &quot;জ্বী, একটু।&quot;

লারসেন আর কিছু বলল না। মাটির প্রথম দাগটার কাছে গিয়ে বুটের আগা দিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে বলল, &quot;এখানে দাঁড়াও।&quot;

মারদেকা এগিয়ে গিয়ে দাগটার ওপর দাঁড়াল।

লারসেন তার সামনে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হাত তুলে মারদেকার দুই পায়ের দিকে ইশারা করল। &quot;পা দুটো একটু ফাঁক করো। এতটা নয়। হ্যাঁ, এবার ঠিক আছে। শরীরের ভার মাঝখানে রাখো।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে ভঙ্গি ঠিক করল।

লারসেন তার চারপাশে হাঁটতে শুরু করল। কখনও ডান পাশে, কখনও বাঁ পাশে, কখনও একেবারে পেছনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার চোখ মারদেকার পায়ের পাতা, হাঁটু আর কোমরের অবস্থান পরীক্ষা করছে।

প্রেইরির বাতাস একটু জোরে বইছে। পাশের লম্বা ঘাসগুলো ঢেউয়ের মতো দুলছে। দূরে কয়েকটি ঘোড়া মাথা তুলে এদিকে তাকিয়ে আবার ঘাস খেতে শুরু করে।

মারদেকা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথম মিনিটটা সহজেই কেটে যায়। দ্বিতীয় মিনিটে তার ডান পায়ের পেশিতে হালকা টান পড়ে। তৃতীয় মিনিটে সে অজান্তেই বাম পায়ের ওপর শরীরের ভার একটু বেশি দিয়ে ফেলে।

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়। &quot;ওদিকে হেলবে না&quot;।

মারদেকা একটু চমকে তাকায়। &quot;আমি তো কিছু করিনি।&quot;

লারসেন  মারদেকার কাছে এসে নিচু হয়ে পায়ের অবস্থাটা দেখে নেয়। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়িয়ে বলে, &quot;করেছ। তোমার শরীর ক্লান্ত হয়ে অন্য পায়ের ওপর ভর নিতে চাইছে।&quot;

মারদেকা নিজের পায়ের দিকে তাকায়।

লারসেন তার দৃষ্টি অনুসরণ করে মাটির দিকে তাকায়, তারপর ধীরে বলে, &quot;ক্লান্তি খারাপ নয়। ক্লান্তির কারণে ভুল করা খারাপ।&quot;

মারদেকা কোনো উত্তর দেয় না। সে আবার শরীরের ভার মাঝখানে ফিরিয়ে আনে।

কিছুক্ষণ পর লারসেন পেছনে সরে গিয়ে হাত দিয়ে সামনে ইশারা করে। &quot;এবার হাঁটো।&quot;

মারদেকা প্রথম পা বাড়াতেই লারসেন বলে ওঠে, &quot;থামো।&quot;

ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়।

লারসেন তার কাছে এসে মাটির দিকে তাকায়। শুকনো ধুলোর ওপর বুটের ছাপ স্পষ্ট। &quot;কীভাবে পা ফেললে?&quot;

মারদেকা নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে বলে, &quot;জানি না।&quot;

লারসেন ধীরে মাথা নাড়ে। &quot;সেটাই সমস্যা।&quot;

সে হাঁটু সামান্য বাঁকিয়ে মাটির ওপর হাত রাখে। শুকনো মাটি আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ে। &quot;তুমি যখন হাঁটো, তোমার চোখ সামনে থাকে। কিন্তু পা মাটির সঙ্গে কথা বলে। কোথায় শক্ত, কোথায় নরম, কোথায় পাথর, কোথায় গর্ত, কোথায় শুকনো ঘাসের নিচে মাটি ফাঁপা, পা সেটা আগে বুঝতে পারে।&quot; 

সে হাতের ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায়। &quot;তুমি যদি নিজের পায়ের কথা শুনতে না শেখো, একদিন এমন জায়গায় গিয়ে পড়বে যেখানে চোখ তোমাকে বাঁচাতে পারবে না।&quot;

মারদেকা নিচের মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে সামনে হাঁটতে শুরু করে। এক পা। দুই পা। তিন পা।

লারসেন এবার কোনো নির্দেশ দেয় না।

মারদেকা নিজের পায়ের নিচের মাটি অনুভব করার চেষ্টা করে। কোথাও শক্ত মাটি, কোথাও সামান্য নরম। কোথাও ছোট পাথর বুটের তলায় গড়িয়ে যাচ্ছে। কোথাও শুকনো ঘাস চাপা পড়ে মৃদু শব্দ করছে।

হঠাৎ তার ডান পা একটা ছোট গর্তে ঢুকে যায়। শরীর সামান্য দুলে ওঠে। কিন্তু সে পড়ে না।

লারসেনের চোখ সরু হয়ে আসে। সে কয়েক কদম এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, &quot;কী করলে?&quot;

মারদেকা নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, &quot;পা সরিয়ে নিয়েছি।&quot; 

লারসেন মাথা নাড়িয়ে বলে, &quot;না। পড়ার আগেই শরীরের ভার অন্য পায়ে দিয়েছ।&quot;

মারদেকা এবার চুপ করে থাকে।

লারসেন বাডের দিকে তাকায়। &quot;দেখেছ?&quot;

বাড এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার খুঁটি থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ে। &quot;হ্যাঁ। ছেলেটার পা দ্রুত শিখছে।&quot;

লারসেন আবার মারদেকার দিকে তাকায়। তার চোখে ক্ষীণ সন্তুষ্টি। &quot;শুধু পা নয়। তোমার শরীরও শিখছে।&quot;

দূরে একটা ঘোড়া হঠাৎ জোরে হ্রেষাধ্বনি করে ওঠে। র&#x200d;্যাঞ্চের মূল ঘরের দিক থেকে ধোঁয়া উঠছে। রান্নাঘরের কাজ শুরু হয়ে গেছে। কয়েকজন কাউবয় আস্তাবলের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সকালের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে বাড়ছে। 

কিন্তু লারসেনের কাছে এই মুহূর্তে র&#x200d;্যাঞ্চের অন্য কোনো শব্দের গুরুত্ব নেই।

সে দ্বিতীয় দাগটার কাছে গিয়ে বুটের আগা দিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে বলে, &quot;এখানে দাঁড়াও।&quot;

মারদেকা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায়।

লারসেন এবার হাত তুলে সতর্ক করে দেয়, &quot;এবার আমার দিকে তাকাবে না। চারপাশ দেখবে।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে চোখ ঘোরায়।

লারসেন তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। &quot;সামনে কী?&quot;

মারদেকা তাকিয়ে উত্তর দেয়, &quot;গুঁড়ি।&quot;

&quot;ডানে?&quot;

&quot;ঘাস।&quot;

লারসেন আরও একটু ডানদিকে হাত বাড়ায়। &quot;ওদিকে?&quot;

মারদেকা চোখ কুঁচকে তাকায়। &quot;আস্তাবল।&quot;

&quot;বাঁয়ে?&quot;

&quot;পুরোনো বেড়া।&quot;

লারসেন এবার একেবারে পেছনে চলে যায়। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে প্রশ্ন করে, &quot;পেছনে?&quot;

মারদেকা ঘাড় না ঘুরিয়েই বলে, &quot;আপনি।&quot;

লারসেনের মুখে এবার স্পষ্ট সন্তুষ্টির ছাপ দেখা যায়। &quot;ভালো।&quot; সে আরও কয়েক কদম পেছনে সরে যায়। তারপর বলে, &quot;এবার হাঁটো।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।

লারসেন তার পেছনে আসে না।

বাডও নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।

মারদেকা কয়েক কদম যাওয়ার পর হঠাৎ থেমে যায়।

লারসেন দূর থেকে জিজ্ঞেস করে, &quot;কেন থামলে?&quot;

মারদেকা মাথা সামান্য কাত করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ সামনে, কিন্তু কান যেন অন্যদিকে। &quot;শব্দ হয়েছে,&quot; সে ধীরে বলে।

বাডের মুখের ভাব বদলে যায়। লারসেনও সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে যায়।

&quot;কী শব্দ?&quot; লারসেন এবার আগের চেয়ে নিচু গলায় জানতে চায়।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর ডান দিকের শুকনো ঘাসের দিকে তাকিয়ে বলে, &quot;ঘাসের মধ্যে।&quot;

তিনজনই নিঃশব্দ হয়ে যায়। শুধু বাতাসের শব্দ। ঘাসের ঘর্ষণের শব্দ। তারপর হঠাৎ শুকনো ঘাসের আড়াল থেকে একটা খরগোশ বেরিয়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সেটি কয়েক লাফে দূরে চলে যায়।

বাডের মুখে প্রশস্ত হাসি ফুটে ওঠে। সে মাথা নেড়ে বলে, &quot;চোখের চেয়ে কানও খারাপ নয়।&quot;

লারসেন অবশ্য হাসে না। সে খরগোশটার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে মারদেকার দিকে ফিরে বলে, &quot;পশ্চিমে যে মানুষ শুধু সামনে তাকায়, সে অর্ধেক পৃথিবী অন্ধ হয়ে দেখে।&quot;

মারদেকা কিছু বলে না। তার চোখ তখনও শুকনো ঘাসের দিকে।

লারসেন মাটির তিনটি দাগের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে, &quot;আজকের শিক্ষা মনে রাখবে।&quot; 

মারদেকা তার দিকে তাকায়। &quot;কী শিখলাম?&quot;

লারসেন মাথা সামান্য কাত করে বলে, &quot;তুমি বলো।&quot;

মারদেকা কিছুক্ষণ চিন্তা করে। তারপর নিজের বুটের দিকে তাকিয়ে বলে, &quot;পা আগে বুঝবে।&quot;

লারসেন মাথা নাড়ে। &quot;আর?&quot;

মারদেকা এবার চারপাশে তাকায়। সকালের আলোয় র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি জিনিস যেন তার চোখে আলাদা হয়ে উঠেছে। ঘোড়ার খোঁয়াড়, পুরোনো বেড়া, কটনউডের গুঁড়ি, দূরের ঘাস, বাতাসে দুলতে থাকা শুকনো ডাল।

সে ধীরে বলে, &quot;চোখ একা যথেষ্ট নয়।&quot;

বাডের মুখে এবার মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। &quot;এবার ঠিক বলেছ।&quot;

সূর্য ততক্ষণে আরও ওপরে উঠে এসেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের ব্যস্ততাও বেড়ে গেছে। আস্তাবল থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ আসছে। কাউবয়রা নিজেদের কাজে ছড়িয়ে পড়ছে। রান্নাঘরের দিক থেকে ভাজা রুটির গন্ধ বাতাসে ভেসে আসছে।

লারসেন মাটির দাগগুলোর দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে তারপর মারদেকার দিকে ফিরে দাঁড়ায়। &quot;এখন যাও।&quot;

মারদেকা নড়ছে না। &quot;কোথায়?&quot; সে জানতে চায়।

লারসেনের মুখে এবার অল্প হাসি ফুটে ওঠে। &quot;যেখানে প্রতিদিন যাও। কাজের সময় হয়ে গেছে।&quot;

মারদেকা বুঝতে পারে। সে ঘুরে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে হাঁটতে শুরু করে। কয়েক পা যাওয়ার পর হঠাৎ থেমে পেছনে তাকায়। লারসেন এখনও দাঁড়িয়ে আছে। বাডও তার পাশে।

মারদেকা কিছু বলে না। শুধু একবার নিজের পায়ের দিকে তাকায়। তারপর মাথা তুলে আবার হাঁটতে শুরু করে। আজ তার হাঁটার ভঙ্গি গতকালের মতো নয়।

পা মাটিতে পড়ছে একইভাবে, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে এখন সচেতনতা আছে। শুকনো ঘাসের শব্দ সে শুনছে। মাটির শক্ত-নরম পার্থক্য অনুভব করছে। বাতাস কোন দিক থেকে আসছে, সেটাও যেন অজান্তে বুঝতে পারছে।

লারসেন অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়া দেখে। বাড ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। দুজনের মাঝখানে কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা হয় না। তারপর বাড নিচু গলায় বলে, &quot;ছেলেটা বদলাচ্ছে।&quot;

লারসেন চোখ সরায় না। দূরে মারদেকার ছোট হয়ে আসা অবয়বের দিকে তাকিয়েই উত্তর দেয়, &quot;সবাই বদলায়।&quot;

বাড মাথা নাড়ে। &quot;ওর বদলানোটা অন্যরকম।&quot;

লারসেন এবার ধীরে শ্বাস নেয়। তার চোখে এমন এক ভাব ফুটে ওঠে, যেন সে ছেলেটার বর্তমানের চেয়ে অনেক দূরের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে। &quot;ওকে তাড়াহুড়ো করে বড় করা যাবে না, বাড,&quot; সে নিচু গলায় বলে। &quot;পশ্চিম নিজেই ওকে বড় করে দেবে।&quot;

দুজনেই আর কথা বলে না। র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তারা দেখতে পায়, মারদেকা ইতিমধ্যে আস্তাবলের দরজায় পৌঁছে গেছে।

সে দরজায় হাত রাখে। এক মুহূর্ত থামে। তারপর ফাঁক করে ভেতরে তাকায়।

ঘোড়াগুলোর উষ্ণ নিঃশ্বাস, খড়ের গন্ধ, কাঠের মেঝেতে খুরের মৃদু শব্দ, ছাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া সকালের আলো আর সেই আলোর মধ্যে ভেসে বেড়ানো অসংখ্য ধুলোর কণা, সবকিছু আজ তার কাছে যেন অন্যরকম স্পষ্ট।

মারদেকা ধীরে ধীরে আস্তাবলের ভেতরে ঢুকে যায়। ভেতরে ঢুকতেই দরজার ফাঁক দিয়ে আসা সকালের আলোটা তার পেছনে লম্বা একটা ছায়া ফেলে। কয়েক মাস আগের সেই ছোট, রোগা ছেলেটার সঙ্গে এখনকার মারদেকার বেশ পার্থক্য। শরীর এখনও কিশোরের মতোই সরু, কিন্তু কাঁধ দুটো আগের চেয়ে চওড়া হয়েছে। বাহুর পেশিতে কাজের টান স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ঘোড়া সামলানো, খড়ের বস্তা টানা, কাঠের বোঝা ওঠানো আর র&#x200d;্যাঞ্চের নিত্যদিনের পরিশ্রম তার শরীরকে ধীরে ধীরে শক্ত করে তুলেছে। মুখের শিশুসুলভ গোলাভাবও অনেকটা কমে এসেছে। বয়স তেরোর কাছাকাছি পৌঁছেছে, আর সেই পরিবর্তন তার হাঁটা, দাঁড়ানো এবং তাকানোর ভঙ্গিতেও ধরা পড়ে।

আস্তাবলের ভেতরটা দিনের ব্যস্ততায় জেগে উঠছে। কয়েকটি ঘোড়া খড়ের ওপর দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে খাবার চিবোচ্ছে। কোথাও লোহার খুর কাঠের মেঝেতে ঠুকছে, কোথাও জিনের চামড়া টেনে শক্ত করার শব্দ। বাতাসে শুকনো খড়, ঘোড়ার ঘাম আর চামড়ার পুরোনো গন্ধ মিশে আছে।

মারদেকা কোনো কথা না বলে তার কাজের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। একটা ধূসর ঘোড়ার পিঠের ওপর হাত বুলিয়ে কিছুক্ষণ স্থির থাকে। ঘোড়াটা মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়, তারপর আবার খাবারের দিকে মুখ নামায়।

মারদেকা ঘোড়াটার পায়ের দিকে তাকায়। তারপর খুরের পাশে জমে থাকা খড় সরিয়ে দেয়।

আগে এসব কাজ সে করত অভ্যাসবশত। এখন তার চোখ অন্যভাবে কাজ করে। খুরের নিচে মাটি কেমন, ঘোড়াটা পায়ের ওপর সমান ভার দিচ্ছে কি না, কান দুটো স্বাভাবিকভাবে নড়ছে কি না, চোখে অস্থিরতা আছে কি না, সবকিছুই সে লক্ষ্য করে।

আস্তাবলের দরজা ঠেলে সদ্য ভেতরে আসা বাড হিগিন্সও তাকে কিছুক্ষণ দেখে। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। &quot;ওটার পেছনের বাঁ পা দেখেছ?&quot; বাড জিজ্ঞেস করে।

মারদেকা মাথা নাড়িয়ে ঘোড়াটার পায়ের দিকে তাকায়। &quot;হ্যাঁ।&quot;

বাড আর কিছু বলে না। সে ঘোড়াটার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে। খুরটা হাতে তুলে দেখে। খুরের কিনারায় সামান্য কাদা জমে আছে।

&quot;এটা পরিষ্কার করো,&quot; সে বলল। &quot;তারপর আবার দেখবে।&quot;

মারদেকা নিচু হয়ে কাজ শুরু করে।

বাড পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। আগের মতো তাকে প্রতিটি ধাপ বুঝিয়ে দিতে হয় না। ছেলেটা এখন নিজের চোখে ভুল ধরতে শেখে। কয়েক মুহূর্ত পর মারদেকা মাথা তোলে।

&quot;খুরে সমস্যা নেই।&quot;

বাড তার দিকে তাকায়। &quot;তুমি নিশ্চিত?&quot;

মারদেকা আবার খুরটার দিকে তাকায়। তারপর ঘোড়াটার পায়ের ওপর চোখ রাখে। &quot;খুরে নয়। হাঁটার সময় ও ডান দিকে ভার দিচ্ছে।&quot;

বাড এবার চুপ করে যায়। ঘোড়াটাকে সামান্য সামনে হাঁটিয়ে নেয়। কয়েক পা যেতেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়। বাম পেছনের পা মাটিতে পড়ার পর ঘোড়াটা সামান্য দ্রুত ডান পায়ের ওপর ভার সরিয়ে নেয়।

বাড ধীরে মাথা নাড়ে। &quot;ভালো দেখেছ।&quot;

মারদেকা শুধু মাথা নোয়ায়। তারপর ঘোড়াটার পা আবার পরীক্ষা করতে থাকে।

বাড কিছুক্ষণ তাকে দেখে থেকে আস্তাবলের দরজার দিকে তাকায়। বাইরে লারসেন আর নেই। তবে কিছু দূরে তার ঘোড়াটা বাঁধা। সম্ভবত সে অন্য কাজে গেছে।

বাড নিচু গলায় বলে, &quot;আজ থেকে একটা কথা মনে রাখবে। চোখ যা দেখে, হাত যেন তার চেয়ে বেশি কিছু করার চেষ্টা না করে।&quot;

মারদেকা মাথা নাড়ে।

এই ছোট্ট ছেলেটার মধ্যে একটা পরিবর্তন বাড বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছে। আগে কোনো কাজের নির্দেশ পেলে মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে সেটা করার চেষ্টা করত। এখন সে এক মুহূর্ত থামে। দেখে। ভাবে। তারপর হাত বাড়ায়।

এই থেমে যাওয়াটাই তাকে অন্যরকম করে তুলছে।

আস্তাবলের বাইরে তখন সূর্য আরও ওপরে উঠেছে। সকালের শীতলতা প্রায় কেটে গেছে। দূরের প্রেইরিতে বাতাসের সঙ্গে ঘাসের ঢেউ তৈরি হচ্ছে। র&#x200d;্যাঞ্চের মূল উঠোনে কয়েকজন ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের বুটের শব্দ ধুলো মাড়িয়ে দূরে সরে যায়।

কিছুক্ষণ পর আস্তাবলের দরজার বাইরে লারসেনকে দেখা যায়। সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে। রোদ থেকে ছায়ায় আসতেই তার চোখ কিছুক্ষণের জন্য অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়। তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামে মারদেকার ওপর।

ছেলেটা তখন ঘোড়ার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে। লারসেন তাকে কিছু বলে না।

মারদেকা তাকে দেখতে পেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।

লারসেন ঘোড়াটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, &quot;কী হয়েছে?&quot;

মারদেকা সংক্ষেপে বলে, &quot;পায়ে ব্যথা নেই। হাঁটার সময় ভার বদলাচ্ছে।&quot;

লারসেন ঘোড়াটার কাছে গিয়ে পা পরীক্ষা করে। তারপর কয়েক পা হাঁটিয়ে দেখে।

ফিরে এসে মারদেকার দিকে তাকায়। &quot;ঠিক ধরেছ।&quot; এই দুই শব্দের বেশি কিছু সে বলে না।

কিন্তু মারদেকার চোখে সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়। প্রশংসা শুনে সে হাসে না, উচ্ছ্বসিতও হয় না। শুধু একবার মাথা নোয়ায়।

লারসেন সেটা লক্ষ্য করে। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য সন্তুষ্টির ছায়া ফুটে ওঠে। সে ঘুরে বেরিয়ে যায়।

মারদেকা তার চলে যাওয়া দেখে না। সে আবার ঘোড়াটার দিকে ফিরে যায়।

বাইরে সূর্য আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আস্তাবলের ছায়া ধীরে ধীরে ছোট হচ্ছে। দিন এগিয়ে যাচ্ছে।

আর মারদেকার ভেতরেও কিছু একটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে, যেটা কোনো একদিন হঠাৎ করে প্রকাশ পাবে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজ, ভুল, সংশোধন আর নীরব শিক্ষার ভেতর দিয়েই সেটা তৈরি হচ্ছে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে তার শরীর যেমন শক্ত হচ্ছে, তেমনি তার নীরবতাও বদলে যাচ্ছে। আগে তার চুপ করে থাকা ছিল অচেনা পৃথিবীর সামনে অসহায়তার চিহ্ন। এখন সেই নীরবতা অনেকটা সচেতনতার। 

সে কম কথা বলে। কিন্তু যখন বলে, তখন দেখে নিয়ে ভেবে চিন্তে বলে।

আস্তাবলের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাড একবার পেছনে তাকায়।

মারদেকা তখন ধূসর ঘোড়াটাকে ধীরে ধীরে হাঁটাচ্ছে। তার পদক্ষেপ মেপে পড়ছে। চোখ সামনে। কান চারপাশে। হাত শান্ত।

বাডের মনে হয়, ছেলেটা আর শুধু র&#x200d;্যাঞ্চে আশ্রয় পাওয়া একটা পাহাড়ি বালক নেই। সে ধীরে ধীরে র&#x200d;্যাঞ্চেরই একজন হয়ে উঠছে।

কিন্তু পশ্চিমের মাটিতে মানুষ যখন কোনো জায়গার অংশ হয়ে ওঠে, তখন সেই মাটির বিপদও একসময় তার নিজের বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। 

দূরের প্রেইরির ওপরে হঠাৎ একটা কালো বিন্দু দেখা যায়। বাড প্রথমে সেটাকে বাজপাখি ভেবেছিল। তারপর বুঝতে পারে, ওটা পাখি নয়।

দূরের পথের ওপর ধুলো উঠছে। খুব সামান্য। কিন্তু ধুলোটা স্থির নয়। কেউ ঘোড়ায় চড়ে আসছে।

বাড চোখ সরু করে তাকিয়ে থাকে।

মারদেকা তখনও কিছু জানে না। সে ধূসর ঘোড়াটাকে নিয়ে আস্তাবলের ভেতরে ফিরছে।

কিন্তু বাডের মুখের ভাব বদলে গেছে। কারণ লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে দূর থেকে আসা প্রতিটি ঘোড়ার ধুলোকে গুরুত্ব দিতে শিখিয়েছে। আর এই ধুলোটা আসছে র&#x200d;্যাঞ্চের শহরমুখী পথ ধরে। কে আসছে, কেন আসছে, আর তার খবর কী, সেটা এখনও কেউ জানে না। 

দূরের পথের ওপর ধুলোটা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠছে। প্রথমে শুধু প্রেইরির বাদামি মাটির ওপর একটা অস্পষ্ট রেখা দেখা যাচ্ছিল, এখন বোঝা যাচ্ছে সেটি এক জায়গায় স্থির নেই, ধীরে ধীরে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছে। কখনও ধুলো বাতাসে উঠে অশ্বারোহীটাকে পুরোপুরি আড়াল করে ফেলছে, আবার পরক্ষণেই তার ভেতর থেকে ঘোড়ার মাথা আর আরোহীর টুপির কিনারা দেখা যাচ্ছে। ঘোড়ার খুরের মৃদু শব্দও এখন বাতাসে ভেসে আসছে।

বাড হিগিন্স আস্তাবলের দরজায় দাঁড়িয়ে চোখ সরু করে পথটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এক হাত দরজার কাঠে রাখা। রোদে পোড়া মুখের ওপর সকালের আলো পড়েছে, কিন্তু তার চোখে কোনো স্বস্তি নেই। পথটা ব্ল্যাক রিভারের দিক থেকে এসেছে। এই পথ তার অচেনা নয়। প্রতিদিনই কেউ না কেউ এই পথ দিয়ে র&#x200d;্যাঞ্চে আসে, আবার চলে যায়। তবু একা অশ্বারোহীটির ধীর গতির মধ্যে এমন কিছু আছে, যা বাডের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে সতর্ক করে দেয়।

আস্তাবলের ভেতরে মারদেকা তখন আর একটি ঘোড়ার খুর পরীক্ষা করছে। বাড কিছুক্ষণ তাকে লক্ষ্য করে তারপর নিচু গলায় বলে, &quot;ওদিকটা দেখো।&quot; 

সে চিবুক তুলে প্রেইরির দিকে ইঙ্গিত করে। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে কাজ থামিয়ে বাইরে আসে। কয়েক মুহূর্ত চোখ কুঁচকে দূরের পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে কোনো কৌতূহল নেই, শুধু মনোযোগ। &quot;একজন আসছে,&quot; সে ধীরে বলে।

বাড তার দিকে তাকিয়ে থাকে। &quot;আর কী দেখছ?&quot; 

মারদেকার চোখ তখনও দূরের ধুলোর ওপর স্থির। &quot;সে দ্রুত আসছে না।&quot; 

বাড এবার সামান্য ভ্রু তোলে। &quot;কীভাবে বুঝলে?&quot; 

মারদেকা উত্তর দিতে একটু সময় নেয়। তারপর বলে, &quot;ধুলো কম উঠছে। ঘোড়া দৌড়াচ্ছে না।&quot; 

কথাটা শুনে বাড আর কিছু বলে না। ছেলেটা এখন শুধু চোখ দিয়ে দৃশ্য ধরতে শেখেনি, সেই দৃশ্য থেকে সঠিক অর্থও বের করতে শিখেছে।

অশ্বারোহীটি ক্রমে কাছে আসে। লাল-সাদো একটি ঘোড়া, তার ওপর মাঝবয়সী এক লোক। মাথায় চওড়া কিনারার টুপি, গায়ে ধুলোমাখা বাদামি কোট। কোমরের কাছে চামড়ার বেল্ট দেখা যাচ্ছে। অস্ত্র আছে কি না এত দূর থেকে বোঝা যায় না। লোকটি ঘোড়াকে তাড়া দিচ্ছে না। বরং এমনভাবে এগিয়ে আসছে, যেন পথটা তার পরিচিত এবং গন্তব্য সম্পর্কে তার কোনো সন্দেহ নেই।

বাড এবার মারদেকার দিকে ফিরে বলে, &quot;লারসেনকে খবর দাও।&quot; 

মারদেকা তার মুখের দিকে তাকায়। বাডের কণ্ঠে এবার এমন দৃঢ়তা যে আর কোনো প্রশ্ন করার প্রয়োজন পড়ে না। মারদেকা মাথা নাড়িয়ে র&#x200d;্যাঞ্চের মূল বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে। সে দৌড়ায় না। হাঁটার গতি অবশ্য আগের চেয়ে দ্রুত। কিন্তু যাওয়ার সময়ও একবার কাঁধের ওপর দিয়ে পথটার দিকে তাকিয়ে নেয়।

র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে তখন দিনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। ক্লে মরগান একটা ভারী কাঠের বাক্স ছায়ার মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মিগুয়েল একটা ঘোড়ার জিনের বকল পরীক্ষা করছে। রুবেন কোল পুরোনো বেড়ার খুঁটিতে হাতুড়ির আঘাত বসাচ্ছে। হ্যাঙ্ক ডসন একটু দূরে দাঁড়িয়ে একটা লাগামের চামড়া পরীক্ষা করছে। মারদেকা তাদের পাশ দিয়ে চলে যায়। কেউ তাকে থামায় না। এখন এই র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি মানুষই জানে, মারদেকা অকারণে কখনও তাড়াহুড়ো করে না।

মূল বাড়ির বারান্দায় উঠে সে দরজায় দুবার টোকা দেয়। ভেতর থেকে কাগজ সরানোর শব্দ আসে। তারপর লারসেনের কণ্ঠ শোনা যায়, &quot;এসো।&quot; 

মারদেকা দরজা খুলে ঢোকে। ঘরের ভেতরটা বাইরে থেকে অনেক ঠান্ডা। জানালার পর্দা অর্ধেক নামানো। কাঠের টেবিলের ওপর ছড়ানো কয়েকটি কাগজ, একটা পুরোনো মানচিত্র আর কালির বোতল। লারসেন মাথা নিচু করে কিছু লিখছে।

মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলে, &quot;পথে একজন আসছে।&quot; 

লারসেন লেখা থামায়। কলমটা ধীরে টেবিলের ওপর রেখে ছেলেটার দিকে তাকায়। &quot;কত দূরে?&quot; সে জানতে চায়। 

মারদেকা বলে, &quot;আস্তাবল থেকে বেশি দূরে নয়।&quot; 

লারসেন এবার উঠে দাঁড়ায়। &quot;ঘোড়া?&quot; 

&quot;লাল-সাদা।&quot; 

লারসেন কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, &quot;তুমি নিজে দেখেছ?&quot; 

মারদেকা মাথা নাড়ে। &quot;জি।&quot;

লারসেনের চোখে সামান্য আগ্রহ ফুটে ওঠে। &quot;আর?&quot; 

এবার মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, &quot;লোকটার অত তাড়াহুড়ো নেই।&quot; 

লারসেন আর কোনো প্রশ্ন করে না। শুধু দরজার দিকে এগিয়ে যায়। মারদেকা তার পেছনে বেরিয়ে আসে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে লারসেন দূরের পথের দিকে তাকায়। অশ্বারোহী এখন অনেকটাই কাছে। ঘোড়ার গায়ে জমে থাকা ঘাম রোদে চকচক করছে। খুরের আঘাতে শুকনো মাটি উঠে ছোট ছোট ধুলোর মেঘ তৈরি করছে। লারসেন নিচের উঠোনের দিকে তাকিয়ে বলে, &quot;বাড।&quot; 

বাড তখনই আস্তাবল থেকে বেরিয়ে আসে। &quot;জি?&quot; 

লারসেন শান্তভাবে বলে, &quot;লোকটাকে এখানে আসতে দাও।&quot; 

বাড মাথা নাড়ে।

মারদেকা বারান্দায় দাঁড়িয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ সে বলে, &quot;লোকটা বারবার পেছনে তাকাচ্ছে।&quot; 

লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকায়। তারপর নিজের চোখ পথের ওপর স্থির করে। অশ্বারোহী তখন কয়েকশো গজ দূরে। সত্যিই লোকটা একবার কাঁধ ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। কয়েক মুহূর্ত পর আবারও একই কাজ করে। লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না, কিন্তু তার দৃষ্টি আগের চেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে।

বাতাসের দিক হঠাৎ বদলে যায়। প্রেইরির ওপর দিয়ে একটা দীর্ঘ ঝাপটা এসে শুকনো ঘাসগুলোকে একসঙ্গে নুইয়ে দেয়। দূরের পাহাড়ের গায়ে সকালের আলো একটু ফিকে হয়ে আসে। অশ্বারোহী এবার র&#x200d;্যাঞ্চের ফটকের কাছে পৌঁছে যায়। বাড ফটক খুলে দাঁড়ায়। ঘোড়াটা ধীরে ভেতরে ঢোকে। লোকটি চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়, তারপর ঘোড়া থামায়।

বাড এগিয়ে গিয়ে লাগাম ধরে। লোকটি ঘোড়া থেকে নামতে নামতে বারান্দার দিকে তাকায়। তার চোখ প্রথমে লারসেনের ওপর থামে, তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মারদেকার দিকে যায়। কয়েক মুহূর্ত সে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আবার লারসেনের দিকে ফিরে বলে, &quot;ওলফ লারসেন?&quot; 

লারসেন সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়েই মাথা নাড়ে। &quot;বলে যাও।&quot;

লোকটি কোটের ভেতর হাত ঢোকায়। মারদেকার চোখ সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের দিকে চলে যায়। লারসেনও সেটা লক্ষ্য করে। লোকটি কোনো অস্ত্র বের করে না। তার বদলে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের হয়। সে কাগজটা এগিয়ে দিয়ে বলে, &quot;ব্ল্যাক রিভার থেকে পাঠিয়েছে।&quot;

লারসেন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে কাগজটা হাতে নেয়। কাগজের ওপর শহরের অফিসের সিল। সে সিলটার দিকে একবার তাকিয়ে তারপর কাগজ খুলে পড়ে। প্রথম কয়েক লাইন পড়ার সময় তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। কিন্তু নিচের দিকে যেতে যেতে তার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে ওঠে। বাড দূর থেকে সেটা লক্ষ করে। মারদেকাও লক্ষ করে। কেউ কোনো প্রশ্ন করে না।

লারসেন কাগজটা ভাঁজ করে লোকটির দিকে তাকায়। &quot;ভেতরে এসো।&quot; 

লোকটি ঘোড়ার দিকে তাকায়। বাড সঙ্গে সঙ্গে বলে, &quot;ঘোড়াটা আমি দেখছি।&quot; লোকটি লাগাম বাডের হাতে তুলে দেয়।

লারসেন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। মারদেকাও তার পেছনে যেতে চায়। কিন্তু দরজার কাছে এসে লারসেন ফিরে তাকিয়ে বলে, &quot;তুমি কাজে ফিরে যাও।&quot; 

কণ্ঠে কোনো কঠোরতা নেই, কিন্তু সিদ্ধান্তটা স্পষ্ট। 

মারদেকা থেমে যায়। &quot;জি।&quot; 

লারসেন লোকটাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।

বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে মারদেকা। বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে তার চোখে কোনো শিশুসুলভ কৌতূহল নেই। শুধু একটা স্থির ভাব। তারপর ধীরে ধীরে আস্তাবলের দিকে হাঁটে।

পথে যেতে যেতে তার চোখ বারবার চারপাশে ঘুরে যায়। উঠোনের ধুলো, বেড়ার ওপারে দুলতে থাকা ঘাস, দূরের পথ, ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়ার খুরের ছাপ, সবকিছুই তার চোখে ধরা পড়ে। কয়েক মাস আগেও এই দৃশ্যগুলো তার কাছে শুধু র&#x200d;্যাঞ্চের স্বাভাবিক অংশ ছিল। এখন প্রতিটি জিনিসের মধ্যে সে কোনো না কোনো অর্থ খুঁজতে শেখে।

আস্তাবলের দরজায় পৌঁছে মারদেকা হাত রাখে। ভেতর থেকে ঘোড়ার উষ্ণ নিঃশ্বাসের শব্দ আসে। খড়ের গন্ধ বাতাসে মিশে আছে। ছাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া রোদের সরু রেখার মধ্যে অসংখ্য ধুলোর কণা ভেসে বেড়াচ্ছে। সে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে।

কাজ আবার শুরু হয়। কিন্তু আজকের সকাল আর আগের মতো নেই।

লারসেন দরজা বন্ধ করার পর ঘরের ভেতর কিছুক্ষণ কোনো শব্দ শোনা যায় না।

বাইরে তখন র&#x200d;্যাঞ্চের স্বাভাবিক ব্যস্ততা চলছে। কোথাও ঘোড়ার খুরের শব্দ, কোথাও কাঠের বাক্স সরানোর ঘর্ষণ, কোথাও ধাতব বকলের টুংটাং। কিন্তু মূল বাড়ির এই ঘরটা যেন সেই সব শব্দ থেকে আলাদা হয়ে আছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া সকালের আলো টেবিলের ওপর পড়ে থাকা কাগজগুলোর ওপর সরু রেখা এঁকে দিয়েছে।

লারসেন টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে সেই ভাঁজ করা কাগজ।

কাগজটা সে আবার খুলে। শহরের অফিসের সিলটা একবার দেখে নেয়। তারপর নিচের অংশটায় চোখ নামায়। সেখানে কয়েকটি নাম, একটা তারিখ, আর কয়েকটি জায়গার উল্লেখ রয়েছে। শব্দগুলো খুব বেশি নয়, কিন্তু প্রতিটি শব্দের ওজন যেন আলাদা।

লারসেন ধীরে ধীরে চেয়ার টেনে বসে। কাগজটা টেবিলের ওপর রেখে সে পাশে থাকা পুরোনো মানচিত্রটা টেনে নেয়। মানচিত্রে ব্ল্যাক রিভার, র&#x200d;্যাঞ্চের অবস্থান, দক্ষিণের পাহাড় আর পশ্চিমের দীর্ঘ পথগুলো মোটা কালো রেখায় চিহ্নিত। তার আঙুল ধীরে ধীরে ব্ল্যাক রিভার থেকে পশ্চিম দিকে এগোয়।

তারপর থেমে যায়। কাগজে লেখা জায়গাটার সঙ্গে মানচিত্রের একটা দূরবর্তী অংশ মিলে যায়। লারসেনের মুখে কোনো বিস্ময় নেই। শুধু চোয়ালটা একটু শক্ত হয়ে ওঠে।

লারসেন এবার শহর থেকে আসা লোকটার দিকে তাকায়। &quot;বসো।&quot;

লোকটা সামনে থাকা কাঠের চেয়ারটায় বসে। লারসেন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর কাগজটা আঙুলের ডগায় ঠেলে টেবিলের মাঝখানে নিয়ে আসে। 

&quot;এটা তোমার হাতে কে দিয়েছে?&quot;

লোকটা সামান্য গলা পরিষ্কার করে বলে, &quot;ব্ল্যাক রিভারের মার্শাল এলি ব্রুকস।&quot;

&quot;তোমাকে আর কী বলেছে?&quot;

লোকটা এবার একটু অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসে। &quot;বলেছে, খবরটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার হাতে পৌঁছানো দরকার।&quot;

লারসেন এবার তার দিকে তাকায়। &quot;শুধু এতটুকু?&quot;

লোকটা মাথা নাড়ে। &quot;আর একটা কথা বলেছে।&quot;

&quot;কী?&quot;

&quot;শহরে কয়েকজন লোককে গত দুই দিনে দেখা গেছে। তারা নিজেদের ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু শহরের কেউ তাদের চেনে না।&quot;

ঘরের বাতাস যেন একটু ভারী হয়ে যায়।

লারসেন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। জানালার কাছে গিয়ে পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকায়। উঠোনের ওপারে কয়েকজন লোক নিজেদের কাজে ব্যস্ত। তার চোখ তাদের ওপর নয়। আরও দূরে, র&#x200d;্যাঞ্চের ফটকের বাইরে চলে যাওয়া পথের ওপর স্থির।

&quot;কতজন?&quot;

লোকটা বলে, &quot;তিনজনকে নিশ্চিতভাবে দেখা গেছে।&quot;

লারসেন ধীরে জিজ্ঞেস করে, &quot;অস্ত্র?&quot;

&quot;লুকানো ছিল। তবে চলন দেখে মনে হয়েছে, ওরা খালি হাতে নয়।&quot;

লারসেন কোনো উত্তর দেয় না। কয়েক মুহূর্ত পর সে জানালার কাছ থেকে সরে আসে। টেবিলের ওপর রাখা কাগজটা তুলে নেয়। নিচের দিকে লেখা কয়েকটি লাইন আবার পড়ে।

&quot;ওরা শহরে আছে?&quot; লোকটার কাছে জানতে চায়।

লোকটা বলে, &quot;শেষ খবর তাই।&quot;

&quot;কতক্ষণ আগে?&quot;

&quot;গত রাত।&quot;

লারসেন মাথা নিচু করে কাগজটা ভাঁজ করে। এবার তার মুখে সিদ্ধান্তের ছাপ দেখা যায়। &quot;তুমি এখন কোথায় যাবে?&quot;

লোকটা একটু অবাক হয়ে তাকায়। &quot;শহরে ফেরার কথা ছিল।&quot;

&quot;ঠিক আছে।&quot; লারসেন কাগজটা নিজের কোটের ভেতর ঢুকিয়ে নেয়। &quot;তবে সূর্য ডোবার আগে র&#x200d;্যাঞ্চ ছেড়ো না।&quot;

লোকটা এবার মাথা নাড়ে।

দরজার বাইরে হঠাৎ কারও পায়ের শব্দ শোনা যায়। দুজনেই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকায়।

শব্দটা থেমে যায়। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর দূর থেকে বাডের গলা শোনা যায়, &quot;বস!&quot;

লারসেন দরজা খুলে বাইরে আসে।

বারান্দায় বাড দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে স্বাভাবিক ভাব নেই। 

&quot;কী হয়েছে?&quot; লারসেন নিচু গলায় জানতে চায়।

বাড একটু কাছে এসে বলে, &quot;উত্তরের বেড়ার কাছে নতুন ঘোড়ার ছাপ পেয়েছি।&quot;

লারসেনের চোখ সরু হয়ে আসে। &quot;কখন?&quot;

&quot;রাতের।&quot;

&quot;নিশ্চিত?&quot;

বাড মাথা নাড়ে। &quot;পুরোনো ছাপের ওপর নতুন ছাপ পড়েছে। ঘোড়াটা র&#x200d;্যাঞ্চে ঢোকেনি। বেড়ার বাইরে থেমে ছিল।&quot;

লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে, &quot;কতজন?&quot;

&quot;একজনের ছাপ পরিষ্কার।&quot; 

&quot;আর?&quot;

বাড এবার একটু থামে। &quot;আরেকটা ঘোড়া ছিল বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু বাতাসে অনেকটা মুছে গেছে।&quot;

লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন আসে না। সে বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করে।

&quot;বাড।&quot;

&quot;হ্যাঁ?&quot;

&quot;কাউকে কিছু বলবে না।&quot;

বাড মাথা নাড়ে। &quot;বুঝেছি।&quot;

লারসেন হাঁটতে শুরু করে। বাড তার পাশে আসে। দুজনেই র&#x200d;্যাঞ্চের উত্তর দিকের দিকে এগিয়ে যায়।

তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে সেই অচেনা লোকটি। সে কিছুক্ষণ দুজনের চলে যাওয়া দেখে, তারপর ধীরে ঘরের ভেতরে ফিরে যায়।

এদিকে আস্তাবলে মারদেকা কাজ করছে। বাইরের কোনো কথাই সে শুনতে পায়নি। তার সামনে এখন একটা কালো ঘোড়া। ঘোড়াটার কেশর ঘন এবং এলোমেলো। চোখ দুটো উজ্জ্বল, কিন্তু স্বভাবটা শান্ত নয়। মারদেকা তার গলায় হাত রাখতেই ঘোড়াটা মাথা সামান্য সরিয়ে নেয়। তার কান দুটো সামনের দিকে ওঠে।

আস্তাবলের বাইরে থেকে হঠাৎ একটা শব্দ আসে। খুব ক্ষীণ। ধাতব কিছু কাঠের সঙ্গে ঠেকে যাওয়ার মতো।

মারদেকা মাথা তোলে। সে ঘোড়াটার গলায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এবার তার মন পুরোপুরি বাইরে।

ধীরে আস্তাবলের দরজার কাছে যায়। দরজাটা পুরো বন্ধ নয়। কাঠের ফাঁক দিয়ে বাইরে উঠোনের একটা অংশ দেখা যায়। সেখানে তাকিয়ে সে কাউকেই দেখতে পায়না।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/263586/</link>
				<pubDate>Wed, 19 Aug 2026 03:39:41 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–তের<br />
পরদিন সকাল। সূর্য তখনও পুরোপুরি ওপরে ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু প্রেইরির বুক থেকে ভোরের শীতলতা এখনও সরে যায়নি। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের ডগাগুলো প্রথম সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। দূরের পাহাড়গুলো ধূসর নীল থেকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দক্ষিণ দিক থেকে আসা হালকা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-263586"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/263586/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">d34adebabe0078127e2f1c75e41448dc</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)
 
অধ্যায়–বারো
পরদিন ভোরে প্রেইরির ওপর এখনও রাতের শিশিরের শেষ স্পর্শ লেগে আছে। দিগন্তের পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফুটলেও চারপাশের বাতাসে ভোরের শীতলতা রয়ে গেছে। দূরের উঁচু ঘাসগুলো বাতাসে ধীরে ধীরে দুলছে, যেন অদৃশ্য কোনো স্রোত তাদের বুকের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। র&#x200d;্যাঞ্চের বিশাল চারণভূমি জুড়ে গরুগুলো অলসভাবে ঘাস খেতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও ঘোড়ারা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে, মাঝে মাঝে লেজ নেড়ে মাছি তাড়াচ্ছে। আস্তাবলের ভেতর থেকে খড়ের গন্ধ, চামড়ার জিনের গন্ধ আর ঘোড়ার উষ্ণ নিশ্বাস মিলেমিশে এক পরিচিত সকালের আবহ তৈরি করেছে।

ইলাই বরাবরের মতো সবার আগেই জেগে উঠেছে। রান্নাঘরের চুলায় কফির পাত্র চড়িয়েছে। মোটা লোহার তাওয়ায় রুটি সেঁকার শব্দ ভেসে আসছে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে ধোঁয়া উঠে ধীরে ধীরে ভোরের নীল আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর একে একে কাউবয়েরা বেরিয়ে এল। কেউ মুখ ধুচ্ছে, কেউ ঘোড়ার জিন কাঁধে তুলে নিচ্ছে, কেউ আবার কফির মগ হাতে দাঁড়িয়ে দিনের কাজের কথা বলছে। গত কয়েক সপ্তাহের অদৃশ্য চাপ তাদের মুখ থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি, কিন্তু মানুষ এমনই। বিপদ যত দীর্ঘ হয়, তাকে নিয়েই বাঁচতে শিখে যায়।

মারদেকা আগের মতোই সবচেয়ে আগে উঠে কাজ শুরু করেছে। এখন আর কেউ তাকে কী করতে হবে, সেটা বলে দিতে হয় না। কোন ঘোড়াকে আগে খাওয়াতে হবে, কোনটার পায়ের নাল আলগা, কোনটার জিনে নতুন করে তেল লাগানো দরকার, সবকিছুই সে নিজে থেকেই বুঝে নেয়। আস্তাবলের এক কোণে দাঁড়িয়ে সে একটা বাদামি ঘোড়ার কেশর আঁচড়ে দিচ্ছিল। ঘোড়াটা শান্ত হয়ে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে আছে। কাজ করতে করতে মারদেকার চোখ মাঝেমধ্যে উঠোনের দিকে চলে যাচ্ছে। কয়েক দিন ধরে সে একটা অভ্যাস গড়ে তুলেছে। কাজের ফাঁকেও চারপাশে নজর রাখা। কে কোথায় যাচ্ছে, কোন ঘোড়া অস্থির আচরণ করছে, কোন দরজাটা খোলা রয়ে গেছে, এসব যেন অজান্তেই তার চোখে ধরা পড়ে।

ওলফ লারসেন অনেকক্ষণ ধরে বারান্দা থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। বয়স তাকে ধীর করেছে, কিন্তু তার চোখের তীক্ষ্ণতা একটুও কমেনি। মারদেকাকে লক্ষ্য করতে করতে তার মনে হলো, ছেলেটাকে আর শুধু কাজ শেখানোর সময় শেষ। এখন তাকে দক্ষতা শেখাতে হবে। এমন দক্ষতা, যা একজন সাধারণ কাউবয়কে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।

ঠিক তখনই বাড হিগিন্স বারান্দায় উঠে এল। &quot;আজ কোথায় পাঠাবেন ওকে?&quot;

লারসেন মগটা নামিয়ে রাখল। &quot;আজ র&#x200d;্যাঞ্চের কোনো কাজ নেই ওর।&quot;

বাড অবাক হয়ে তাকাল। &quot;তাহলে?&quot;

লারসেন উত্তর না দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। মারদেকার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, &quot;কাজ থামাও। আমার সঙ্গে চলো।&quot;

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশটা নামিয়ে রাখল। &quot;জি।&quot;

এখন আর শব্দ বের করতে তার আগের মতো কষ্ট হয় না। বাক্য ছোট, কিন্তু উচ্চারণ অনেক পরিষ্কার।

আস্তাবলের পেছনে পুরোনো একটি শেড ছিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় বহু বছর ধরে সেখানে ভাঙা জিন, পুরোনো গাড়ির চাকা আর নষ্ট যন্ত্রপাতি ফেলে রাখা হয়েছে। র&#x200d;্যাঞ্চের লোকজন খুব একটা ওদিকে যায় না। লারসেন দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। মারদেকাও তার পেছনে ঢুকল।

ঘরটার ভেতরে আলো কম। ছাদের ফাঁক দিয়ে সূর্যের সরু কয়েকটি রেখা ধুলো ভেদ করে মেঝেতে পড়েছে। এক পাশে পুরোনো কাঠের বাক্স স্তূপ করে রাখা। অন্য পাশে দেয়ালে ঝুলছে নানা রকম দড়ি, লোহার হুক, হাতুড়ি, করাত, পুরোনো জিনের চামড়া। সবকিছুর মাঝখানে একটি লম্বা কাঠের টেবিল।

লারসেন ধীরে ধীরে টেবিলের কাছে গিয়ে নিচের ড্রয়ার খুলল। অনেকগুলো কাপড়ে মোড়া জিনিসের মধ্যে থেকে সে একটি চামড়ার খাপ বের করল। খাপটা খুব পুরোনো। 
চামড়ার রং কালচে হয়ে গেছে। কিন্তু যত্নের অভাব নেই। সে খাপটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর খুব ধীরে ভেতর থেকে একটি ছুরি বের করল।

সকালের সূর্যের একটি সরু আলোর রেখা ঠিক তখনই ফলার ওপর এসে পড়ল। ইস্পাতের চিকচিকে ধার মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরটাকে যেন অন্যরকম করে তুলল। এটা সাধারণ রান্নাঘরের ছুরি নয়। আবার বিশাল কোনো শিকারি ছুরিও নয়। ফলাটা সরু, ভারসাম্য নিখুঁত, হাতলটা পালিশ করা হরিণের শিং দিয়ে তৈরি। বহু বছর ব্যবহারের চিহ্ন আছে, কিন্তু কোথাও অবহেলার ছাপ নেই।

মারদেকা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। তার চোখে কৌতূহল।

লারসেন অনেকক্ষণ ছুরিটার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বলল, &quot;এটা আমার বাবার ছুরি।&quot;

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। বাইরে কোথাও একটা ঘোড়া হালকা হ্রেষাধ্বনি করল। দূরে হাতুড়ির শব্দ শোনা গেল।

লারসেন ছুরিটা হাতের তালুতে ঘুরিয়ে নিয়ে খুব শান্ত কণ্ঠে বলল, &quot;আজ থেকে তোমার নতুন শিক্ষা শুরু হবে।&quot; ওলফ লারসেনের কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা ছিল না। যেন প্রতিদিনের কাজের তালিকায় আরেকটি নতুন দায়িত্ব যোগ হয়েছে মাত্র। 

অথচ সেই ছোট্ট কাঠের শেডের ভেতরে দাঁড়িয়ে মারদেকার মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটির গুরুত্ব অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা। বাইরে সকালের আলো ক্রমেই উজ্জ্বল হচ্ছে, কিন্তু শেডের ভেতর এখনও আধো অন্ধকার। ছাদের পুরোনো তক্তার ফাঁক দিয়ে কয়েকটি সরু আলোর রেখা ভেতরে ঢুকে ধুলোর কণাগুলোকে ঝিকমিক করে তুলেছে। দেয়ালে ঝোলানো পুরোনো জিন, মরচে ধরা লোহার হুক, পাকানো দড়ি আর কাঠের হাতলওয়ালা যন্ত্রপাতি দেখে মনে হয়, এই ঘরটি বহু বছর ধরে র&#x200d;্যাঞ্চের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ওলফ লারসেন টেবিলের ওপর রাখা ছুরিটার দিকে কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর সেটাকে আবার ধীরে ধীরে চামড়ার খাপের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। তার প্রতিটি নড়াচড়া এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে মনে হয়, কাজটা সে হাজারবার করেছে। &quot;এটাকে অস্ত্র ভাবার আগে একটা জিনিস হিসেবে চিনতে শেখো।&quot;

মারদেকা মন দিয়ে শুনছে। তার চোখ ছুরির ওপর স্থির।

লারসেন খাপটা হাতে নিয়েই বলতে লাগল, &quot;এই একটা জিনিস দিয়ে দড়ি কাটা যায়, জিনের চামড়া ঠিক করা যায়, আগুন ধরানোর জন্য কাঠ ছাঁটা যায়, শিকার করা যায়, নিজের খাবার তৈরি করা যায়। আর যখন আর কোনো পথ থাকে না, তখন নিজের জীবনও বাঁচানো যায়।&quot;

সে আবার ছুরিটা বের করল। ফলার ওপর সকালের আলো এসে পড়তেই চিকচিক করে উঠল ইস্পাত। ফলাটার কোথাও বাড়তি কারুকাজ নেই। সৌন্দর্যের জন্য নয়, কাজের জন্য বানানো। বছরের পর বছর ব্যবহারে হাতলের হরিণশিং আরও মসৃণ হয়েছে। এমন একটা জিনিস, যেটা যত পুরোনো হয়েছে, ততই যেন ব্যবহারকারীর হাতের অংশ হয়ে উঠেছে।

&quot;বেশির ভাগ মানুষ ভুলটা এখানেই করে,&quot; লারসেন শান্তভাবে বলল, &quot;তারা ছুরিকে আগে অস্ত্র ভাবে, পরে যন্ত্র।&quot;

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। বাইরে কোথাও একটা ঘোড়া খুর ঠুকল। দূরে হাতুড়ির মৃদু শব্দ ভেসে এল। কিন্তু শেডের ভেতরে যেন সময় একটু ধীরে চলছিল। 

লারসেন ছুরিটা মারদেকার দিকে বাড়িয়ে দিল। &quot;ধরো।&quot;

মারদেকা দুহাতে ছুরিটা নিল। সে ফলায় হাত লাগাল না। হাতলের মাঝখানটা শক্ত করে ধরল। ঠান্ডা ইস্পাতের ওজন ধীরে ধীরে তার হাতে অনুভূত হলো। কয়েক মুহূর্ত সে শুধু ছুরিটা অনুভব করল। মুঠো একটু আলগা করল, আবার শক্ত করল। তারপর কবজি সামান্য ঘুরিয়ে ভারসাম্য বোঝার চেষ্টা করল।

লারসেন লক্ষ্য করছিল। &quot;কেমন লাগছে?&quot;

মারদেকা একটু ভেবে বলল, &quot;ভারসাম্য... ভালো।&quot;

&quot;কীভাবে বুঝলে?&quot;

মারদেকা নিজের হাতের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল, &quot;হাতে... টানছে না।&quot;

ঠিক তখন দরজার পাশে হালকা একটা শব্দ হলো। বাড হিগিন্স এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে কিছু বলল না। শুধু ছেলেটার হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বহু বছরের অভিজ্ঞতায় সে জানে, যে মানুষ প্রথমবার কোনো যন্ত্র হাতে নিয়ে তার ভারসাম্য অনুভব করতে পারে, সে শেখার পথ অনেকটাই পেরিয়ে এসেছে।

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, &quot;ঠিক বলেছ। যে ছুরি হাত টেনে নেয়, সেটা দীর্ঘক্ষণ ব্যবহার করা যায় না।&quot;

সে টেবিলের নিচ থেকে একটা মোটা শণের দড়ি বের করল। দড়িটার গায়ে ধুলোর আস্তরণ জমে আছে। বহুদিনের পুরোনো হলেও আঁশগুলো শক্ত। &quot;কেটে দেখো।&quot;

মারদেকা দড়িটার ওপর ছুরির ধার বসাল। স্বাভাবিকভাবেই সে হাতের জোর বাড়াতে যাচ্ছিল। 

&quot;না।&quot; লারসেনের শান্ত কণ্ঠ তাকে থামিয়ে দিল। সে মারদেকার হাত থেকে ছুড়িটা চেয়ে নিল। তারপর নিজের হাতে দড়িটা ধরে ছুরির ফলা বসাল। কোনো বাড়তি শক্তি নয়। শুধু কবজির মাপা একটি টান। মুহূর্তেই দড়িটা দু&#039;টুকরো হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। &quot;শক্তি দিয়ে নয়,&quot; বলল, &quot;ধার দিয়ে কাটতে হবে।&quot; 

সে কাটা দড়ির টুকরো মারদেকার হাতে দিল। ছুরিটা আবার ফিরিয়ে দিয়ে বলল, &quot;এবার তুমি।&quot;

মারদেকা গভীর মনোযোগে লারসেনের হাতের নড়াচড়া মনে করার চেষ্টা করল। তারপর আগের মতো চাপ না দিয়ে শুধু ফলাটাকে কাজ করতে দিল।

ফস্। দড়িটা পরিষ্কারভাবে কেটে গেল।

বাডের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

লারসেন বলল, &quot;মনে রেখো, মানুষ যত কম শক্তি খরচ করে কাজ করতে পারে, সে তত বেশি সময় টিকে থাকে। পশ্চিমে শক্তি নষ্ট করার সুযোগ খুব কম।&quot; সে টেবিল থেকে তার বাবার ছুড়ির খাপটা তুলে নিল। মারদেকাকে কোমরে সেটা জড়িয়ে নিতে বললো। 

তারপর তারা শেড থেকে বেরিয়ে খোলা জায়গায় এল। সকালের রোদ তখন আরও তীব্র হয়েছে। বাতাসে শুকনো ঘাসের গন্ধ। একটু দূরে কয়েকটা পুরোনো জুনিপার গাছের গুঁড়ি সারি করে পড়ে আছে। বছরের পর বছর রোদ-বৃষ্টি খেয়ে কাঠগুলো শক্ত পাথরের মতো হয়ে গেছে। কাছেই একপাশে পড়ে আছে কাটা ডালের স্তূপ।

লারসেন একটি গুঁড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে কোমরে রাখা নিজের ছুরিটার খাপ খুলল। &quot;আজ ছুরি ছোড়া শেখাব না।&quot;

মারদেকার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। সে হয়তো ভেবেছিল, আজই লক্ষ্যভেদ শেখানো হবে।

লারসেন সময় নিয়ে ধীরে ধীরে বলল, &quot;আগে শিখবে, ছুরি কীভাবে বের করতে হয়।&quot;

সে কোমরে খাপে রাখা ছুরির হাতলে হাত রাখল। তার আঙুলের অবস্থান, কবজির ভঙ্গি, কাঁধের স্থিরতা, সবকিছু এত স্বাভাবিক যে মনে হয় শরীর আর অস্ত্র আলাদা নয়। একটি মসৃণ টানে ছুরিটা বেরিয়ে এল। এক মুহূর্ত। তারপর আবার একই শান্ত ভঙ্গিতে খাপের ভেতর ফিরে গেল।

কোনো শব্দ নেই। কোনো অযথা প্রদর্শন নেই। শুধু অভ্যাসের নিখুঁত ছাপ।

&quot;যে মানুষ ছুরি বের করতেই হিমশিম খায়,&quot; লারসেন বলল, &quot;সে কখনও ছুরি ব্যবহার করতে পারবে না।&quot; এবার সে মারদেকার হাতের ছুড়িটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলো।

এরপর শুরু হলো অনুশীলন। কোনো লক্ষ্যবস্তু নেই। কোনো কাঠে আঘাত নয়। কোনো ছোড়াছুড়ি নয়। শুধু একই কাজ, বারবার। খাপ থেকে ছুরি বের করা। আবার খাপে ঢোকানো। আবার বের করা। আবার ঢোকানো।

প্রথম কয়েকবার মারদেকার আঙুল হাতলের ঠিক জায়গায় বসছিল না। কখনও হাত একটু বেশি ওপরে উঠে যাচ্ছিল, কখনও খাপের মুখ খুঁজে পেতে সময় লাগছিল। একবার তো অসাবধানতায় ফলার ধার প্রায় আঙুল ছুঁয়ে ফেলেছিল। লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার কবজি আলতো করে ধরে ঠিক করে দিল। রাগ করল না। ধমকালও না।

শুধু বলল, &quot;ধীরে।&quot; আরেকবার বললো, &quot;তাড়াহুড়ো নয়।&quot; আবার বললো, &quot;একইভাবে।&quot;

সময় কেটে যেতে লাগল। সূর্য ধীরে ধীরে মাথার ওপর উঠে এল। গরম বাড়তে শুরু করল। মারদেকার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে গাল ভিজিয়ে দিচ্ছে। ডান হাতের কবজিতে টান ধরেছে। তবু সে থামল না। প্রতিবার আগের ভুলটা শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করল।

বাড একপাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, বাইরে থেকে দেখলে যে কেউ ভাববে এখানে কিছুই শেখানো হচ্ছে না। অথচ সে জানে, সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা সবসময় সবচেয়ে সাধারণ অনুশীলনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

প্রায় এক ঘণ্টা পরে মারদেকা টানা দশবার ছুরিটা বের করে আবার একই মসৃণতায় খাপে ফিরিয়ে রাখতে পারল। 

লারসেন প্রথমবার সন্তুষ্টির সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, &quot;এবার যথেষ্ট।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়ল। হাত ক্লান্ত, কিন্তু চোখে ক্লান্তি নেই। বরং নতুন কিছু শেখার আনন্দ স্পষ্ট।

বাড হেসে বলল, &quot;সকাল থেকে একটা দড়িও কাটতে দিলে না, একটা কাঠেও আঘাত করতে দিলে না।&quot;

লারসেন নিজের ছুরিটা কোমরে গুঁজে শান্ত স্বরে উত্তর দিল, &quot;যে হাত অস্ত্রকে সম্মান করতে শেখেনি, সেই হাতকে লক্ষ্যবস্তু দেওয়া উচিত নয়।&quot; সে একবার মারদেকার দিকে তাকাল। &quot;আজ ও ছুরি চালানো শেখেনি।&quot; একটু থেমে ধীরে যোগ করল, 
&quot;আজ ও শিখেছে, কীভাবে ছুরির ওপর নিজের হাতের নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়।&quot;

মারদেকা কিছুক্ষণ নিজের হাতে ধরা ছুরিটার দিকে তাকিয়ে রইল। ইস্পাতের ফলায় শেডের আধো অন্ধকার আলো নিঃশব্দে ঝিলিক দিচ্ছে। এতক্ষণ যে ছুরিটা শুধু একটা ধারালো জিনিস বলে মনে হচ্ছিল, এখন সেটাকে যেন অন্যরকম লাগছে। একটা অস্ত্র নয়, বহু বছরের অভিজ্ঞতার ভার যেন ওর ভেতর জমে আছে। আজ সে প্রথমবার বুঝতে পারল, একটি অস্ত্রের সবচেয়ে ধারালো অংশ তার ইস্পাত নয়। সবচেয়ে ধারালো অংশ হলো সেই হাত, যে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।

ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে হাত বাড়াল। &quot;দাও।&quot;

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটা দুই হাতে এগিয়ে দিল। কোমর থেকে খাপটাও খুলে দিল।

লারসেন অত্যন্ত যত্ন করে ছুরিটা নিল। ফলার ধার একবার চোখ বুলিয়ে দেখল, তারপর ধীরে ধীরে চামড়ার খাপের ভেতর ঢুকিয়ে কোমরে নিজের ছুরিটার পাশে গুজে দিল। কাজটা এমন স্বাভাবিকভাবে করল, যেন বহু বছরের অভ্যাসে হাত আর ছুরির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না।

শেডের বাইরে রোদের তেজ আরও বেড়েছে। খোলা দরজা দিয়ে গরম বাতাস ঢুকে আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। দূরে আস্তাবলের দিক থেকে ভেসে আসছে ঘোড়ার ডাক। কোথাও একটা হাতুড়ি নিয়মিত ছন্দে লোহার ওপর আঘাত করছে। র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি মানুষ নিজের কাজে ব্যস্ত, কিন্তু এই ছোট্ট শেডের ভেতরে যেন অন্য এক শিক্ষা চলছে, যার সঙ্গে দিনের কাজের কোনো মিল নেই।

বাড হিগিন্স দেয়ালে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এতক্ষণে সে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। &quot;প্রথম দিনের জন্য খারাপ হয়নি।&quot;
 
লারসেন তার দিকে তাকাল না। শান্ত গলায় বলল, &quot;প্রথম দিন আজও শুরু হয়নি।&quot;

বাড মৃদু হেসে চুপ করে গেল। সে জানে, লারসেন যখন এভাবে কথা বলে, তখন তার মাথায় আরও অনেক দূরের পরিকল্পনা থাকে।

লারসেন শেড থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। মারদেকা ও বাডও তার সঙ্গে বেরোল।

দুপুরের রোদে পুরো র&#x200d;্যাঞ্চ ঝলমল করছে। আস্তাবলের সামনে দুজন কাউবয় একটা কালো ঘোড়ার জিন শক্ত করে বাঁধছে। আরও দূরে কয়েকজন ভাঙা বেড়ার খুঁটি বদলাচ্ছে। শুকনো প্রেইরির ওপর গরম হাওয়ায় হালকা ধুলোর পরত ভেসে উঠছে। আকাশ এত পরিষ্কার যে অনেক ওপরে ভেসে থাকা বাজপাখিটাকেও স্পষ্ট দেখা যায়।

শেডের পেছনের খোলা জায়গায় এসে লারসেন থামল। সেখানে বহুদিন আগে কাটা একটি কটনউড গাছের মোটা গুঁড়ি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। গুঁড়িটার গায়ে অসংখ্য পুরোনো কুড়ালের দাগ। কোথাও কাঠ ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, কোথাও বৃষ্টির কালচে ছাপ এখনও রয়ে গেছে। বোঝাই যায়, বহু বছর ধরে জায়গাটা শুধু কাঠ কাটার জন্য নয়, অনুশীলনের কাজেও ব্যবহার হয়েছে।

লারসেন নিচু হয়ে মাটি থেকে একটা শুকনো আখরোট তুলে গুঁড়িটার ওপর রেখে দিল। তারপর মারদেকার দিকে তাকাল।

&quot;ওটা দেখছ?&quot;

&quot;জি।&quot;

&quot;তাহলে শুধু দেখো।&quot;

মারদেকা স্থির চোখে আখরোটটার দিকে তাকিয়ে রইল।

&quot;শুধু ওটাকে নয়,&quot; লারসেন আবার বলল, &quot;ওটার চারপাশও দেখো।&quot;

মারদেকার দৃষ্টি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হলো। গুঁড়ির গায়ের ফাটল, কাঠের রঙের পার্থক্য, ডান পাশের ছোট ছায়ার রেখা, নিচের শক্ত মাটি, তার ওপর ছড়িয়ে থাকা শুকনো পাতার টুকরো, সবকিছুই এবার আলাদা করে চোখে পড়তে লাগল।

এক ঝলক বাতাস এলো। গুঁড়ির পায়ের কাছে পড়ে থাকা শুকনো ঘাস নড়ে উঠল। মাথার ওপর দিয়ে বাজপাখিটা এক পাক ঘুরে পশ্চিমে সরে গেল। লারসেন বলল, 
&quot;পশ্চিমে লক্ষ্য কখনও একা থাকে না।&quot;

সে গুঁড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। &quot;বাতাস থাকে। আলো থাকে। ছায়া থাকে। মাটি থাকে। এগুলোর একটাও চোখ এড়িয়ে গেলে ভুল হবে।&quot;

মারদেকা এবার আর শুধু আখরোট দেখছে না। সে পুরো জায়গাটা দেখছে।

লারসেন সন্তুষ্টির সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, &quot;ভালো।&quot; তারপর ধীরে ধীরে যোগ করল, 
&quot;এখন তোমার হাতে কোনো অস্ত্র নেই। ইচ্ছে করেই নেই। কারণ আগে চোখ শিখবে, তারপর হাত। হাতকে শেখানো সহজ। চোখকে শেখাতে সময় লাগে।&quot;

বাড চুপচাপ দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিল। তার মনে পড়ল, বহু বছর আগে ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে লারসেন একদিন তাকেও প্রায় একই শিক্ষা দিয়েছিল। তখন সে বুঝতে পারেনি। আজ মারদেকার দিকে তাকিয়ে সেই দিনের কথাগুলো নতুন করে অর্থ পেল।

প্রেইরির ওপর দুপুরের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। সামনে পড়ে থাকা ছোট্ট আখরোটটা নড়েনি, কিন্তু সেটাকে দেখার ভঙ্গি বদলে গেছে। আর সেই পরিবর্তনই বুঝিয়ে দিচ্ছিল, মারদেকার শিক্ষা আজ আর শুধু হাতে সীমাবদ্ধ নেই। আজ থেকে তার চোখও শেখা শুরু করল।

সেদিনই বিকেলের রোদ ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশের দিকে হেলে পড়তে শুরু করেছে। দুপুরের সেই নির্মম তাপ আর নেই, তবে মাটির ভেতরে জমে থাকা উত্তাপ এখনও বাতাসে অনুভব করা যায়। প্রেইরির বুক জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শুকনো ঘাসের ডগাগুলো সোনালি আলোয় চকচক করছে। দূরে কোথাও একঝাঁক বুনো পাখি আচমকা উড়ে গিয়ে আবার অনেক দূরে নেমে বসল। বিশাল চারণভূমিতে ছড়িয়ে থাকা গরুগুলো ধীরে ধীরে পানির খোঁয়াড়ের দিকে এগোচ্ছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে তাদের চলার ভঙ্গিতেও যেন এক ধরনের অলসতা নেমে এসেছে।

র&#x200d;্যাঞ্চের অন্য প্রান্তেও দিনের শেষ কাজগুলো শুরু হয়ে গেছে। দুজন কাউবয় কাঁধে লম্বা বেড়ার খুঁটি নিয়ে ফিরছে। আরেকজন পুরোনো জিনে তেল মাখাচ্ছে। কামারশালার সামনে আগুনের রং ফিকে হয়ে এসেছে। লোহার ওপর হাতুড়ির শব্দ এখন অনেক কম, তবু মাঝেমধ্যে টং... টং... করে ভেসে এসে চারপাশের নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছে। আস্তাবলের ভেতর থেকে খড় চিবোনোর মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঘোড়াগুলো যেন বুঝতে পেরেছে, দিনের পরিশ্রম প্রায় শেষ।

শেডের পেছনের খোলা জায়গাটায় এই কোলাহলের কিছুই নেই। এখানে শুধু বাতাস আছে। রোদ আছে। আর আছে বহু বছরের পুরোনো সেই কটনউড গাছের গুঁড়ি, যার গায়ে অসংখ্য কুড়ালের দাগ সময়ের ইতিহাস হয়ে জমে আছে।

ওলফ লারসেন কটনউড গাছের গুঁড়িটার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে কোনো তাড়া নেই। যেন সে অপেক্ষা করছে, ছেলেটা নিজে থেকে চারপাশকে অনুভব করুক।

মারদেকাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে। এখন আর সে শুধু আখরোটটার কথা ভাবছে না। তার চোখ এদিক-ওদিক ঘুরছে। কোথায় আলো পড়েছে, কোথায় ছায়া ঘন, কোথা দিয়ে বাতাস বইছে, সবকিছুই যেন আলাদা আলাদা করে তার ভেতরে জায়গা নিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পরে লারসেন নিচু হয়ে নিজের বুটের আগা দিয়ে মাটিতে একটি সরল রেখা টেনে দিল। শুকনো ধুলো সরিয়ে গাঢ় মাটি বেরিয়ে এল। তার থেকে চার-পাঁচ হাত দূরে গিয়ে আরেকটি রেখা টানল। তারপর আরও কয়েক কদম পেছনে গিয়ে তৃতীয় রেখা।

সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তিনটি দাগের দিকে তাকিয়ে রইল। &quot;এগুলো দেখছ?&quot;

&quot;জি।&quot;

&quot;আজ তোমার কাজ খুব সহজ।&quot; 

মারদেকা মন দিয়ে শুনছে। &quot;এই প্রথম দাগে দাঁড়াও।&quot;

সে গিয়ে দাঁড়াল।

লারসেন তার চারপাশে একবার ধীরে ধীরে হাঁটল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকে ভালো করে দেখে নিল। &quot;পা দুটো খুব কাছাকাছি রেখো না।&quot;

মারদেকা সামান্য ফাঁক করল। 

&quot;এতটাও নয়।&quot; সে আবার ঠিক করল।

লারসেন নিজের পা দেখিয়ে বলল, &quot;মাটি যেন তোমাকে ধরে রাখে। তুমি যেন মাটিকে আঁকড়ে ধরতে না যাও।&quot;

মারদেকা কথাটা পুরো বুঝল কি না বোঝা গেল না, কিন্তু সে দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা আরেকবার ঠিক করল।

লারসেন এবার তার কাঁধে আলতো হাত রাখল। একটু ঘুরিয়ে দিল। তারপর কোমরের অবস্থান ঠিক করল। সবশেষে বলল, &quot;এবার চোখ তুলে সামনে তাকাও।&quot;

মারদেকা তাকাল।

&quot;কী দেখছ?&quot;

&quot;গুঁড়ি।&quot;

&quot;শুধু গুঁড়ি?&quot;

মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, &quot;না... গুঁড়ির পেছনের ঘাসও।&quot;

&quot;আর?&quot;

&quot;ডান পাশে... ছায়া।&quot;

লারসেনের ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটল। &quot;ভালো।&quot; সে ধীরে ধীরে প্রথম দাগ থেকে দ্বিতীয় দাগে গিয়ে দাঁড়াল। &quot;এবার এখান থেকে দেখো।&quot;

মারদেকা এগিয়ে এল। একই গুঁড়ি। একই জায়গা। কিন্তু দৃশ্যটা বদলে গেছে।

এখান থেকে আখরোটটা একটু ছোট দেখায়। গুঁড়ির বাঁ পাশের ফাটলটা স্পষ্ট দেখা যায়। আগে চোখে না পড়া একটা শুকনো ডালও এখন দেখা যাচ্ছে।

লারসেন বলল, &quot;মানুষ ভাবে, জায়গা বদলালে শুধু দূরত্ব বদলায়।&quot; সে মাথা নাড়ল। &quot;আসলে বদলায় চোখ।&quot;

বাড এতক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে পড়ল, প্রায় পনেরো বছর আগে ঠিক এই জায়গাতেই লারসেন তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। তখন তারও মনে হয়েছিল, এসবের কোনো মানে নেই। কিন্তু পরে বুঝেছিল, বন্দুক বা ছুরি হাতে নেওয়ার বহু আগেই একজন মানুষ তার চোখ দিয়ে লড়াই করতে শেখে।

লারসেন এবার তৃতীয় দাগটার দিকে ইশারা করল। &quot;আজ এখানেই শেষ।&quot; 

মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল। &quot;কোন অস্ত্রের দরকার নেই!&quot;

লারসেনের কণ্ঠ আগের মতোই শান্ত। &quot;শরীরের ভারসাম্য না বুঝে অস্ত্র হাতে নিলে, অস্ত্রই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে।&quot; সে কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। তারপর ধীরে ধীরে যোগ করল, &quot;আগামীকাল থেকে তোমার পা শিখবে।&quot;

প্রেইরির ওপর তখন বিকেলের আলো আরও নরম হয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের রং তামাটে হয়ে উঠছে। লম্বা ছায়া কটনউডের গুঁড়ি পেরিয়ে ধীরে ধীরে শুকনো ঘাসের ভেতর গড়িয়ে যাচ্ছে। তিনজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

কেউ আর কোনো কথা বলল না। কারণ ওলফ লারসেন জানত, একজন মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার আগে তাকে মাটির ওপর ঠিকভাবে দাঁড়াতে শেখানোই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/263064/</link>
				<pubDate>Tue, 18 Aug 2026 04:10:23 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)</p>
<p>অধ্যায়–বারো<br />
পরদিন ভোরে প্রেইরির ওপর এখনও রাতের শিশিরের শেষ স্পর্শ লেগে আছে। দিগন্তের পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফুটলেও চারপাশের বাতাসে ভোরের শীতলতা রয়ে গেছে। দূরের উঁচু ঘাসগুলো বাতাসে ধীরে ধীরে দুলছে, যেন অদৃশ্য কোনো স্রোত তাদের বুকের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। র&#x200d;্যাঞ্চের বিশাল চারণভূমি জুড়ে গরুগুলো অ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-263064"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/263064/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">9e7c0faefa9fa29cc9cd0ba6f29a1bdb</guid>
				<title>অধ্যায়–এগারো
&quot;ও... কাজ... খুঁজতে... আসেনি।&quot;

&quot;ও... ঘোড়া... গুনছিল।&quot;

দুটি ছোট্ট বাক্য যেন অফিসঘরের নিস্তব্ধ বাতাস চিরে ছড়িয়ে পড়ল। দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে বাইরে পা বাড়ানো ওলফ লারসেন আর বাড হিগিন্স একই সঙ্গে থেমে গেল। দুজনেই ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। কেরোসিনের লণ্ঠনের হলদে আলোয় মারদেকা তখনও দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। তার চোখে ভয় নেই, অহংকারও নেই। সে শুধু যা দেখেছে, তাই বলেছে। কয়েক মাস আগে যে ছেলেটি একটি শব্দও বুঝত না, আজ সে নিজের পর্যবেক্ষণকে ভাষা দিতে পেরেছে। কথাগুলো ভাঙা, উচ্চারণে জড়তা আছে, কিন্তু তাতে সত্যের ধার একটুও কমেনি।

কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। লারসেনের মতো মানুষ খুব কমই বিস্ময় প্রকাশ করে। তার মুখের রেখা প্রায় কখনও বদলায় না। অথচ এই মুহূর্তে বাড স্পষ্ট দেখল, তার চোখেও বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে মারদেকার দিকে এগিয়ে এল। ছেলেটার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। যেন প্রথমবার তাকে নতুন করে দেখছে। এই কয়েক মাসে মারদেকা লম্বা হয়েছে। কাঁধে মাংসপেশি জমতে শুরু করেছে। প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রমে তার শরীর থেকে শৈশবের দুর্বলতা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। রোদে পুড়ে গায়ের রং আরও গাঢ় হয়েছে। মুখের সরলতা এখনও আছে, কিন্তু চোখে এখন এমন এক স্থিরতা জন্ম নিয়েছে, যা বয়সের চেয়েও অনেক বেশি অভিজ্ঞতার পরিচয় দেয়।

বাডের মুখে অজান্তেই মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে শান্ত স্বরে বলল, &quot;আমি ভেবেছিলাম, তুমি শুধু শুনতে শিখেছ। এখন দেখছি, বলতে শুরু করেছ।&quot;

মারদেকা একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নিচু করল। এতদিনের নীরবতার পরে এতগুলো মানুষের সামনে মুখ খোলা তার জন্য সহজ ছিল না।

ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, &quot;তুমি কেন এমনটা মনে করলে?&quot;

মারদেকা একটু সময় নিল। শব্দ খুঁজে নিতে এখনও তার কষ্ট হয়। &quot;পানি... খাচ্ছিল।&quot; সে থামল। &quot;কিন্তু... চোখ... আস্তাবলে।&quot; আরও একটু ভেবে বলল, &quot;ঘোড়া... বেশি... দেখছিল।&quot;

বাক্যগুলো ছোট। ভাঙা। কিন্তু তার ভেতরের যুক্তি স্পষ্ট।

লারসেন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে জানালার বাইরে তাকাল। তারপর বলল, &quot;পশ্চিমে অনেকেই বন্দুক চালাতে পারে। অনেকেই ঘোড়া চালাতে পারে। কিন্তু সবাই দেখতে পারে না।&quot;

সে আবার মারদেকার দিকে ফিরে তাকাল। &quot;যে মানুষ দেখতে শেখে, সে অনেক সময় বিপদকে অন্যদের আগে চিনে ফেলে।&quot;

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। তারপর লারসেন খুব সংক্ষিপ্তভাবে বলল, &quot;আজ তুমি ভালো দেখেছ।&quot;

এটুকুই। আর কোনো প্রশংসা নয়। কিন্তু বাড জানত, ওলফ লারসেনের মুখ থেকে এই কয়েকটি শব্দ বের হওয়া সহজ ব্যাপার নয়।

লারসেন লণ্ঠনটা হাতে তুলে নিল। &quot;চলো, বাড।&quot; দুজন ধীরে ধীরে অফিসঘর থেকে বেরিয়ে এল।

বাইরে রাত অনেক গভীর। আকাশজুড়ে অগণিত তারা। দূরে প্রেইরির বুক চিরে পাহারারত কাউবয়ের লণ্ঠন ছোট্ট আলোর বিন্দুর মতো এদিক সেদিক দুলছে। কিছুক্ষণ তারা দুজনেই নীরবে হাঁটল। 

তারপর বাড নিচু গলায় বলল, &quot;ছেলেটা বদলে যাচ্ছে।&quot;

লারসেন হাঁটা থামাল না। &quot;হ্যাঁ।&quot; 

&quot;আমি ভাবিনি এত তাড়াতাড়ি ভাষাটা আয়ত্ত করবে।&quot;

লারসেন মৃদু স্বরে বলল, &quot;ভাষা শেখাটা বড় কথা নয়।&quot; সে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে যোগ করল, &quot;আমি অপেক্ষা করছিলাম, কবে ও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে শিখবে।&quot;

বাড কিছু বলল না। তার বহু বছরের অভিজ্ঞতা বলছিল, এই রাতের পর থেকে মারদেকাকে আর আগের মতো দেখা যাবে না।

পরদিন ভোরে সূর্যের প্রথম আলো প্রেইরির ওপর ছড়িয়ে পড়তেই লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ আবার জেগে উঠল। আস্তাবলে ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি, রান্নাঘর থেকে ইলাইয়ের হাঁক, উঠোনে কাউবয়দের ব্যস্ত পদচারণা, সবকিছুই আগের মতো। কিন্তু এই সাধারণ সকালের ভেতরেই অদৃশ্যভাবে একটি পরিবর্তন ঘটে গেছে।

সকালের নাশতা শেষ হওয়ার পর ওলফ লারসেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ মারদেকার কাজ লক্ষ্য করল। ছেলেটা আগের মতোই নিষ্ঠার সঙ্গে ঘোড়ার জিন পরীক্ষা করছে, পানির ট্যাংক ভরছে, তারপর একসময় নিচু হয়ে রাতের খুরের দাগগুলোও দেখে নিল। সে শুধু কাজ করছে না, চারপাশও পর্যবেক্ষণ করছে।

লারসেন তখন বাডকে ডেকে শুধু একটি বাক্য বলল, &quot;আজ থেকে মারদেকার কাজ একটু বদলাবে।&quot;

বাড হিগিন্স বারান্দা থেকে নিচের উঠোনের দিকে তাকাল। মারদেকা তখন আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে একটা ঘোড়ার কাঁধে ব্রাশ চালাচ্ছে। কাজের ভেতর এমন মনোযোগ যে আশপাশে কে কী বলছে, সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। 

বাড শান্ত গলায় বলল, &quot;কোন কাজটা দিতে চান?&quot;

ওলফ লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ ছেলেটার কাজ দেখল। তারপর বলল, &quot;যে কাজ শেখানো যায়, তার বেশির ভাগই ও শিখে ফেলেছে। এখন এমন কিছু শেখাতে হবে, যা বইয়ে লেখা থাকে না।&quot;

&quot;মানে?&quot;

&quot;পশ্চিমকে পড়তে শেখাতে হবে।&quot;

বাড চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারছিল, লারসেনের মাথায় ইতিমধ্যেই একটা পরিকল্পনা তৈরি হয়ে গেছে।

লারসেন ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠোনে নেমে এল। মারদেকা তখনও ঘোড়ার গা পরিষ্কার করছে। লারসেন কাছে আসতেই সে কাজ থামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। &quot;আজ তোমাকে আমার সঙ্গে বাইরে যেতে হবে।&quot;

মারদেকার চোখে কৌতূহল ফুটে উঠল। &quot;জি... কোথায়?&quot; ভাষাটা এখনও পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়, তবু আগের দিনের তুলনায় শব্দগুলো অনেক সহজে বেরিয়ে এল।

লারসেনের চোখের কোণে অদৃশ্য হাসি ফুটল। &quot;র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরেই। তবে কোন কাজ করতে নয়, দেখতে।&quot;

মারদেকা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন ঘোড়ায় চড়ে রওনা দিল। বাডও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। র&#x200d;্যাঞ্চের উত্তর দিকের চারণভূমি পেরিয়ে তারা ধীরে ধীরে আরও নির্জন প্রান্তে পৌঁছাল। এখানে মানুষের আনাগোনা কম। শুকনো ঘাসের ভেতর দিয়ে সরু পথ এঁকেবেঁকে চলে গেছে। দূরে নিচু টিলা, তারও ওপারে জুনিপার আর সেজব্রাশের ঝোপ।

লারসেন ইচ্ছে করেই কোনো কথা বলছিল না। শুধু এগিয়ে যাচ্ছিল। মারদেকাও নীরব। সে বুঝে গেছে, আজকের শেখাটা কথায় হবে না।

একসময় তারা একটা শুকিয়ে যাওয়া খালের ধারে থামল। জায়গাটা নিরিবিলি। চারদিকে এমন নীরবতা যে বাতাসে শুকনো পাতার ঘষাঘষির শব্দও শোনা যায়।

লারসেন ঘোড়া থেকে নেমে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসল। হাত দিয়ে ধুলো সরাল। &quot;এদিকে এসো।&quot;

মারদেকা কাছে এসে নিচু হয়ে বসল। 

লারসেন মাটির ওপর পাশাপাশি থাকা কয়েকটা খুরের দাগ দেখিয়ে বলল, &quot;বলতে পারো, কতগুলো ঘোড়া গেছে?&quot;

মারদেকা মন দিয়ে দাগগুলো দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে বলল, &quot;তিনটা।&quot;

&quot;কীভাবে বুঝলে?&quot;

&quot;দাগ... আলাদা।&quot;

লারসেন মাথা নাড়ল। &quot;আবারও দেখো।&quot;

মারদেকা এবার আরও মনোযোগ দিয়ে দেখল। একটু পরে একটা জায়গায় আঙুল রাখল। &quot;না...&quot; সে নিজের কথাই যেন নিজে ঠিক করল। &quot;চারটা।&quot;

বাড আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।

লারসেন বলল, &quot;শেষেরটা আগে যায়নি। পরে এসেছে।&quot;

মারদেকা বিস্মিত চোখে তাকাল। &quot;কীভাবে বুঝলেন?&quot;

লারসেন মাটির ওপরের দাগে আঙুল বুলিয়ে বলল, &quot;এই দাগটা অন্যগুলোর ওপর উঠে গেছে। যে পরে আসে, তার চিহ্ন আগেরটার ওপর পড়ে।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বুঝল।

লারসেন আবার বলল, &quot;মাটি কখনও মিথ্যে বলে না। মানুষ বলে।&quot; তারপর সে উঠে দাঁড়াল।

&quot;আজ থেকে তোমার কাজ শুধু ঘোড়া সামলানো নয়। প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা তুমি আমার বা বাডের সঙ্গে বের হবে। পথ দেখবে। দাগ পড়বে। বাতাসের গন্ধ চিনবে।&quot; সে চারদিকে তাকাল। &quot;পশ্চিমের সবচেয়ে বড় বইটা কাগজে ছাপা হয়নি।&quot;

মারদেকা চুপচাপ শুনছে। 

লারসেন নিচু হয়ে এক মুঠো ধুলো তুলে বাতাসে ছেড়ে দিল। ধুলোকণা বাতাসের টানে উত্তর-পশ্চিমে ভেসে গেল। &quot;এই বইটা লেখা আছে মাটিতে, ধুলোয়, ঘাসে, বাতাসে আর মানুষের ফেলে যাওয়া চিহ্নে। যে এই বই পড়তে পারে, সে অনেক সময় বন্দুক বের হওয়ার আগেই বুঝে যায় সামনে কী অপেক্ষা করছে।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল। এই প্রেইরি, এই শুকনো খাল, এই ধুলোমাখা পথ, এতদিন তার কাছে ছিল শুধু পথ আর মাটি। আজ প্রথমবার তার মনে হলো, এগুলোও কথা বলে। আর সে সেই ভাষা শিখতে শুরু করেছে।

শুকিয়ে যাওয়া খালের ধারে বেশ কিছুক্ষণ কাটানোর পর ওলফ লারসেন আবার ঘোড়ায় চড়ল। ফেরার জন্য মূল পথ ধরল না। বরং র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম দিকের উঁচু টিলাগুলোর দিকে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল। বাড হিগিন্স একবার তার দিকে তাকাল। জায়গাটা র&#x200d;্যাঞ্চের সীমানার ভেতরেই, কিন্তু কাউবয়রা খুব প্রয়োজন ছাড়া এদিকে আসে না। টিলার পর টিলা, মাঝেমধ্যে পাথুরে ঢাল, কোথাও কোমরসমান সেজব্রাশ, কোথাও খোলা পাথরের চাতাল। এখান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত প্রেইরি দেখা যায়। যে কেউ যদি র&#x200d;্যাঞ্চকে নজরে রাখতে চায়, এই জায়গাগুলোই তার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক।

তিনজন ধীরে ধীরে টিলার চূড়ায় উঠল। ওপরে উঠে মারদেকা নিজের অজান্তেই থেমে গেল। সামনে যতদূর চোখ যায়, রোদে ঝলমল করছে ঘাসের সমুদ্র। তার মাঝখানে ছড়িয়ে আছে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের চারণভূমি। আরও দূরে সরু ফিতের মতো দেখা যাচ্ছে ব্ল্যাক রিভারের দিকে চলে যাওয়া রাস্তা। মাঝে মাঝে ধুলোর মেঘ তুলে কোনো ওয়াগন এগিয়ে যাচ্ছে। এত উঁচু জায়গা থেকে পুরো এলাকাকে একসঙ্গে দেখার সুযোগ তার আগে হয়নি।

লারসেন ঘোড়া থেকে নেমে একটা চ্যাপ্টা পাথরের ওপর দাঁড়াল। &quot;যুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই ভালো যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্র দেখে নেয়।&quot;

সে চারদিকে হাত ঘুরিয়ে বলল, &quot;এখান থেকে কী দেখছ?&quot;

মারদেকা মন দিয়ে চারদিকে তাকাল। &quot;র&#x200d;্যাঞ্চ।&quot;

&quot;আর?&quot;

&quot;রাস্তা।&quot;

&quot;আর?&quot;

মারদেকা এবার আরও সময় নিয়ে দেখল। দূরে একটা সরু গিরিখাত চোখে পড়ল। আরও দূরে শুকনো নদীর আঁকাবাঁকা রেখা। সে ধীরে ধীরে বলল, &quot;ওই... গিরিখাত... লুকানো যায়।&quot;

লারসেনের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল। &quot;ঠিক।&quot; সে আর কিছু না বলে মারদেকাকে আরও কিছুক্ষণ চারপাশ দেখতে দিল।

কিছুক্ষণ পরে সে নিচু হয়ে মাটিতে একটা লাঠি দিয়ে কয়েকটা দাগ কাটল। খুব সহজ একটা মানচিত্র তৈরি হলো। র&#x200d;্যাঞ্চ, রাস্তা, টিলা, শুকনো খাল আর গিরিখাত। &quot;যদি কেউ র&#x200d;্যাঞ্চে আসতে চায়, কোন দিকটা বেছে নেবে?&quot;

মারদেকা মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে রইল। সে তাড়াহুড়ো করল না। তারপর লাঠিটা নিয়ে গিরিখাতের দিকে ইশারা করল। &quot;এখানে।&quot;

&quot;কেন?&quot;

&quot;চোখে... কম... পড়ে।&quot;

বাড এবার হেসে ফেলল। &quot;ভুল বলেনি।&quot;

লারসেন মাথা নাড়ল। &quot;যে নিজের পথ লুকাতে চায়, সে কখনও খোলা মাঠ দিয়ে আসে না।&quot;

সে লাঠিটা মাটিতে ফেলে দিল। &quot;মনে রেখো, মানুষ নিজের মতো করে ভাবে। কিন্তু বিপদ সব সময় নিজের সুবিধামতো পথ বেছে নেয়।&quot;

ফেরার সময় সূর্য অনেকটাই পশ্চিমে হেলে পড়েছে। ঘোড়াগুলো ধীরগতিতে নামছিল পাথুরে ঢাল বেয়ে। হঠাৎ মারদেকার চোখ ডান পাশের একটা জুনিপার গাছের দিকে আটকে গেল। সে কিছু না বলে ঘোড়া থামাল। 

লারসেনও সঙ্গে সঙ্গে থামল। &quot;কী হয়েছে?&quot;

মারদেকা গাছটার দিকে এগিয়ে গেল। নিচু হয়ে মাটির কাছ থেকে একটা সরু ডাল তুলে নিল। ডালটার এক পাশ অদ্ভুতভাবে কাটা। সে গাছটার কাণ্ডে হাত বুলিয়ে দেখল। তারপর বলল, &quot;এটা... স্বাভাবিক... না।&quot;

বাডও নেমে এল। গাছটার গায়ে খুব ছোট্ট একটা কাটা দাগ। দেখলে মনে হবে শুকনো ডাল ভেঙে লেগেছে। কিন্তু ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, ধারালো ধাতু দিয়ে একবার টেনে কাটা হয়েছে।

লারসেন কিছুক্ষণ দাগটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চারপাশে চোখ বুলিয়ে শান্ত গলায় বলল, &quot;পুরোনো।&quot; সে আঙুল দিয়ে দাগের শুকিয়ে যাওয়া অংশ ছুঁয়ে দেখাল। 
&quot;কমপক্ষে কয়েক সপ্তাহ আগের।&quot;

বাড বলল, &quot;কাউবয়দের কাজ?&quot;

&quot;হতে পারে। আবার নাও হতে পারে।&quot; এর বেশি কিছু বলল না লারসেন। কারণ প্রমাণ ছাড়া সে কখনও সিদ্ধান্ত নেয় না।

তারা আবার ঘোড়ায় চড়ে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে ফিরতে লাগল। মারদেকা একবার পেছন ফিরে সেই জুনিপার গাছটার দিকে তাকাল। ছোট্ট একটা কাটা দাগ। হয়তো তুচ্ছ। হয়তো নয়। সে বুঝতে পারল, পশ্চিমে সব রহস্য রক্ত আর গুলির শব্দ দিয়ে শুরু হয় না। কখনও কখনও একটি অদ্ভুত দাগই অনেক বড় গল্পের প্রথম বাক্য হয়ে দাঁড়ায়।

র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরতে ফিরতে সূর্য প্রায় দিগন্ত ছুঁয়ে ফেলেছে। পশ্চিমের আকাশে লাল, কমলা আর বেগুনি রঙের দীর্ঘ রেখা ছড়িয়ে আছে। শুকনো ঘাসের মাথায় সেই আলো পড়ে যেন আগুনের আভা জ্বলছে। দূরে গবাদি পশুর পাল ধীরে ধীরে নিজেদের ঘেরের দিকে ফিরছে। কাউবয়দের শিস, ঘোড়ার খুরের শব্দ আর গরুর ডাক মিলে সন্ধ্যার পরিচিত সুর তৈরি করেছে। দিনের ব্যস্ততা শেষ হওয়ার মুখে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ যেন আবার নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছে। অথচ ওলফ লারসেনের মনে আজ সারাদিন ধরে একটি কথাই ঘুরছে। মারদেকার চোখ। ছেলেটা শুধু দেখে না, দেখার পর মনে রাখেও।

রাতের খাবার শেষ হওয়ার পর প্রতিদিনের মতো পাহারার নতুন পালা দায়িত্ব বুঝে নিল। কয়েকজন কাউবয় লণ্ঠন হাতে উত্তর আর পশ্চিমের বেড়ার দিকে চলে গেল। দুজন দক্ষিণের চারণভূমির দিকে রওনা হলো। একজন আস্তাবলের পাশে থেকে গেল। গত কয়েক সপ্তাহে এই নিয়ম সবার কাছে অভ্যাস হয়ে গেছে। কেউ আর প্রশ্ন করে না কেন এত সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ প্রত্যেকেই বুঝেছে, যে বিপদ দেখা যায় না, তাকে হালকাভাবে নেওয়াই সবচেয়ে বড় ভুল।

খাওয়াদাওয়ার পরে ওলফ লারসেন বারান্দায় বসে পাইপে আগুন ধরাল। বাড হিগিন্স এসে পাশের চেয়ারে বসল। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ উঠোনের দিকে তাকিয়ে রইল। একটু দূরে মারদেকা দিনের শেষে ব্যবহৃত জিন, লাগাম আর রশিগুলো গুছিয়ে তাদের নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দিচ্ছে। কাজ শেষ হওয়ার পরও সে তাড়াহুড়ো করে ঘুমাতে যায় না। কোনো না কোনো কিছু পরীক্ষা করে দেখে। কোথাও বকলস আলগা আছে কি না, চামড়ার বেল্ট শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে কি না, পানির পাত্র ভরা আছে কি না।

বাড ধীরে ধীরে বলল, &quot;ওকে আজ সারাক্ষণ লক্ষ্য করছিলাম।&quot;

লারসেন পাইপ থেকে ধোঁয়া ছাড়ল। &quot;কী দেখলে?&quot;

&quot;আপনি যখন খালের ধারে খুরের দাগ দেখাচ্ছিলেন, ও শুধু আপনার কথাই শোনেনি। আপনি কোথায় দাঁড়াচ্ছেন, কীভাবে দাগ ছুঁয়ে দেখছেন, সেটাও লক্ষ করছিল।&quot;

লারসেন মৃদু হাসল। &quot;সেটাই শেখার প্রথম ধাপ।&quot;

বাড বলল, &quot;বেশির ভাগ মানুষ উত্তর মুখস্থ করে। ও পদ্ধতিটা শিখছে।&quot;

কিছুক্ষণ নীরবতা। দূরে পাহারায় থাকা এক কাউবয়ের শিস ভেসে এল। তারপর আবার সব শান্ত।

লারসেন ধীরে ধীরে বলল, &quot;আমার বয়স যখন ওর মতো ছিল, আমার বাবা আমাকে একটা কথা বলেছিলেন।&quot;

বাড তার দিকে তাকাল। &quot;তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমে সবচেয়ে দামি জিনিস জমি নয়, গরু নয়, সোনাও নয়। সবচেয়ে দামি জিনিস হলো বিচারবুদ্ধি। সেটা হারালে বন্দুকও মানুষকে বাঁচাতে পারে না।&quot;

বাড মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। &quot;মারদেকার মধ্যে সেই বিচারবুদ্ধির শুরুটা দেখা যাচ্ছে।&quot;

&quot;তাই ওকে তাড়াহুড়ো করে কিছু শেখানো যাবে না।&quot; লারসেনের কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু দৃঢ়। &quot;ভিত শক্ত না হলে বড় মানুষ হওয়া যায় না।&quot;

এই সময় ইলাই বারান্দায় উঠে এল। তার হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির পাত্র। হেসে বলল, &quot;আজ তোমাদের দুজনের আলোচনার কি কোন শেষ আছে?&quot;

বাড মুচকি হেসে কাপ এগিয়ে দিল। ইলাই কফি ঢালতে ঢালতে বলল, &quot;ছেলেটা কিন্তু আজ দুপুরে আমাকে অবাক করেছে।&quot;

লারসেন তাকাল। &quot;কী করেছে?&quot;

&quot;রান্নাঘরে এসে প্রথমবার নিজে থেকে বলেছে, &#039;আর পানি লাগবে?&#039;&quot;

ইলাইয়ের চোখে স্নেহের হাসি। &quot;একসময় একটা কথাও বলতে পারত না। এখন নিজের থেকে জিজ্ঞেস করছে।&quot;

কেউ কিছু বলল না। ছোট্ট ঘটনাও কখনও কখনও বড় পরিবর্তনের আভাস দেয়।

কফি শেষ করে লারসেন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। বারান্দা থেকে নামতে নামতে তার চোখ গেল আস্তাবলের দিকে। মারদেকা এখনও সেখানে।

একটা পুরোনো চামড়ার লাগাম হাতে নিয়ে সে মন দিয়ে সেলাইয়ের জায়গাটা পরীক্ষা করছে। তারপর খুব যত্ন করে তেল মাখিয়ে সেটাকে আবার ঝুলিয়ে রাখল। কাজটা করার জন্য কেউ তাকে বলেনি। তবু সে করছে। কারণ সে এখন বুঝতে শিখেছে, ভালো র&#x200d;্যাঞ্চ শুধু বড় গবাদি পশুর পাল দিয়ে গড়ে ওঠে না। ছোট ছোট যত্ন দিয়েই তার ভিত্তি শক্ত হয়।

লারসেন কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, &quot;কাল থেকে আরেকটা নতুন কাজ শুরু হবে।&quot;

বাড প্রশ্ন করল না। সে জানত, লারসেন যখন এভাবে বলে, তখন সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়ে গেছে।

রাত আরও গভীর হলো। আস্তাবলের লণ্ঠন নিভে গেল। এক এক করে র&#x200d;্যাঞ্চের সব আলো অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল। শুধু দূরের প্রেইরিতে পাহারারত কাউবয়দের লণ্ঠনগুলো নক্ষত্রের মতো জ্বলতে থাকল। 

আর সেই রাতেই, নিজের ছোট্ট ঘরে শুয়ে মারদেকা অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারল না। বারবার তার মনে পড়ছিল লারসেনের কথাগুলো। &quot;পশ্চিমের সবচেয়ে বড় বইটা লেখা আছে মাটিতে, ধুলোয়, ঘাসে আর বাতাসে।&quot;

সে জানত না, আগামী দিনের পাঠ শুধু সেই বই পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

খুব শিগগিরই তাকে হাতে তুলে দেওয়া হবে এমন একটি জিনিস, যা পশ্চিমের প্রতিটি মানুষের সাথে থাকে, কিন্তু খুব কম মানুষই তার প্রকৃত মূল্য বুঝতে শেখে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/262777/</link>
				<pubDate>Mon, 17 Aug 2026 13:26:54 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অধ্যায়–এগারো<br />
&#8220;ও&#8230; কাজ&#8230; খুঁজতে&#8230; আসেনি।&#8221;</p>
<p>&#8220;ও&#8230; ঘোড়া&#8230; গুনছিল।&#8221;</p>
<p>দুটি ছোট্ট বাক্য যেন অফিসঘরের নিস্তব্ধ বাতাস চিরে ছড়িয়ে পড়ল। দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে বাইরে পা বাড়ানো ওলফ লারসেন আর বাড হিগিন্স একই সঙ্গে থেমে গেল। দুজনেই ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। কেরোসিনের লণ্ঠনের হলদে আলোয় মারদেকা তখনও দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। তার চোখে ভয় নেই, অহংকারও নেই। সে শুধু যা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-262777"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/262777/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">c2f478aaa14c572c94c6f5d6535d6832</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–দশ
ব্ল্যাক রিভার শহরের মানুষ নতুন আগন্তুকটিকে আর দ্বিতীয়বার খেয়াল করল না। পশ্চিমের এই ছোট্ট শহরে প্রায়ই নানা জায়গা থেকে পথিক আসে, দুদিন থাকে, আবার চলে যায়। কেউ ভাগ্যের সন্ধানে, কেউ গবাদি পশুর ব্যবসায়, কেউ বা কেবল পথের ক্লান্তি মেটাতে। তাই ধুলোমাখা পোশাক পরা এক অচেনা লোককে নিয়ে কারও কৌতূহল জাগল না। লোকটা ধীরে ধীরে প্রধান সড়ক ধরে হাঁটতে হাঁটতে শহরের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে দেখল। কোথায় লোহার কারখানা, কোথায় খাদ্যশস্যের গুদাম, কোথায় ডাকঘর, কোথায় মার্শাল এলি ব্রুকসের অফিস, সবকিছুই যেন অন্যমনস্ক চোখে দেখে নিচ্ছে। কিন্তু তার দৃষ্টি কখনও অস্থির হলো না। বহুদিনের অভ্যাসে সে এমনভাবে চারপাশ লক্ষ করছিল, যেন সে কিছুই দেখছে না।

একসময় সে শহরের শেষ প্রান্তে এসে থামল। এখান থেকে কাঁচা পথটা সোজা চলে গেছে ওলফ লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে। সে বেশিক্ষণ দাঁড়াল না। পথের ধারে পড়ে থাকা শুকনো একটা ডাল জুতোর আগা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে আবার শহরের ভেতর ফিরে গেল। দূর থেকে দেখলে মনে হতো, লোকটা শুধু পথ হারিয়ে এদিকটায় চলে এসেছিল। কিন্তু তার চোখে যে হিসাব চলছিল, সেটা কেউ বুঝতে পারল না।

সেই সময় লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে সকাল অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। সূর্যের আলোয় শিশির শুকিয়ে গেছে। চারণভূমির দিকে গবাদি পশুর দীর্ঘ সারি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। মারদেকা আজ বাড হিগিন্সের সঙ্গে নয়, ক্লে মরগানের সঙ্গে কাজ করছে। লারসেন ইচ্ছে করেই কয়েক সপ্তাহ ধরে তাকে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কাজ করাচ্ছে। প্রত্যেক কাউবয়ের কাজের ধরন আলাদা। বাড ধৈর্য নিয়ে শেখায়, ক্লে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত, মিগুয়েল অল্প কথা বলে কিন্তু কাজে কখনও ভুল করে না। লারসেন চায়, মারদেকা শুধু একজনের কাছ থেকে নয়, সবার কাছ থেকেই কিছু না কিছু শিখুক।

আজ তাদের দায়িত্ব ছিল দক্ষিণের চারণভূমিতে ছড়িয়ে থাকা ছোট একটা গবাদি পশুর দলকে মূল পালের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া। কাজটা সহজ মনে হলেও বাস্তবে তা নয়। কোনো পশু যদি ভয় পেয়ে ভুল দিকে দৌড় দেয়, তাহলে বাকিরাও তাকে অনুসরণ করে। তখন পুরো পাল সামলাতে অনেক সময় লেগে যায়।

ক্লে খুব কম কথা বলে কাজ করছিল। সে শুধু হাতের ইশারা আর ঘোড়ার গতির মাধ্যমে মারদেকাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল কোন দিক দিয়ে এগোতে হবে। কয়েক মাস আগের মারদেকা হলে হয়তো উত্তেজনায় ঘোড়া ছুটিয়ে পশুগুলোকে আরও ভয় পাইয়ে দিত। কিন্তু আজ সে ধৈর্য ধরল। ঘোড়াটাকে অযথা দৌড় করাল না। ধীরে ধীরে বৃত্ত তৈরি করে একপাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া তিনটি বাছুরকে আবার মূল দলের দিকে ফিরিয়ে আনল।

দূর থেকে ক্লে পুরো দৃশ্যটা লক্ষ্য করছিল। কাজ শেষ হলে সে কিছুক্ষণ মারদেকার দিকে তাকিয়ে থেকে শুধু বলল, &quot;এবার ঠিক করেছ।&quot;

একজন কম কথার মানুষের মুখে এই চারটি শব্দই ছিল বড় পুরস্কার।

দুপুরের আগে তারা গবাদি পশুগুলোকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনল। র&#x200d;্যাঞ্চের ফটকের কাছে পৌঁছাতেই ইলাই বারান্দা থেকে হাত তুলে ডাকল। দুপুরের খাবার তৈরি।

ঘোড়া থেকে নামতে নামতে মারদেকা খেয়াল করল, ওলফ লারসেন উঠোনে দাঁড়িয়ে দূরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি স্থির। যেন সে কারও অপেক্ষা করছে।

ঠিক তখনই ধুলোমাখা রাস্তার অনেক দূরে একটা ছোট্ট বিন্দু নড়তে দেখা গেল।

একটি মাত্র ঘোড়া। আরোহী ধীরে ধীরে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকেই এগিয়ে আসছে। এত দূর থেকে মানুষটিকে চেনার উপায় নেই। উঠোনে উপস্থিত প্রায় সবাই স্বাভাবিকভাবেই একবার তাকাল।

কিন্তু ওলফ লারসেনের চোখে যে সতর্কতা ফুটে উঠল, তা মারদেকার দৃষ্টি এড়াল না। ছেলেটা অজান্তেই অনুভব করল, এই আগন্তুক হয়তো কেবল পথ জিজ্ঞেস করতে আসেনি।

র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে তখন দুপুরের কাজ প্রায় থেমে এসেছে। গবাদি পশুর একটা অংশকে ছায়ার দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আস্তাবল থেকে ভেসে আসছে ঘোড়ার নড়াচড়ার শব্দ। ইলাই বারান্দা থেকে আবার একবার খাবারের জন্য ডাক দিলেও কেউ আর সেদিকে মন দিল না। দূরের ধুলোমাখা রাস্তা ধরে আসা একাকী আরোহী এখন অনেকটাই কাছে চলে এসেছে।

লোকটা র&#x200d;্যাঞ্চের প্রধান ফটকের কাছে এসে ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিল। তারপর বিনা তাড়াহুড়োয় ভেতরে ঢুকল। তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। রোদে পোড়া মুখ, গালের ডান পাশে পুরোনো একটা দাগ, মাথায় বিবর্ণ বাদামি টুপি। ধুলোমাখা কোটের নিচে সাধারণ শার্ট, কোমরে পুরোনো রিভলভার। তাকে দেখে কোনো কুখ্যাত বন্দুকবাজ বলে মনে হয় না। বরং বহু পথ ঘোরা একজন সাধারণ পথিক বলেই মনে হয়।

সে ঘোড়া থেকে নেমে প্রথমেই টুপিটা খুলে সম্মান জানাল। &quot;শুভ দুপুর।&quot;

ওলফ লারসেনও শান্ত গলায় উত্তর দিল। &quot;শুভ দুপুর।&quot;

লোকটা চারদিকে একবার তাকিয়ে বলল, &quot;একটু পানি পাওয়া যাবে?&quot;

ইলাই ইতিমধ্যেই বারান্দা থেকে নেমে এসেছে। পশ্চিমের অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী পথিককে পানি না দেওয়া অভদ্রতা। সে কোনো প্রশ্ন না করেই ঠান্ডা পানিভরা একটা টিনের মগ এগিয়ে দিল। লোকটা ধীরে ধীরে পানি খেল। তারপর মগটা ফিরিয়ে দিয়ে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মাথা ঝুঁকাল। &quot;ধন্যবাদ।&quot;

লারসেন এবার জিজ্ঞেস করল, &quot;কোথা থেকে আসছ?&quot;

লোকটা এক মুহূর্তও দেরি না করে উত্তর দিল, &quot;উত্তরের দিক থেকে। কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজের খোঁজে ঘুরছি। শুনেছিলাম ব্ল্যাক রিভারে কাজের অভাব নেই। শহরে আজ সকালটা কাটালাম, দু&#039;এক জায়গায় কথাও বললাম। কিন্তু আমি যে ধরনের কাজ জানি, সেরকম কিছু এখনও জোটেনি। তাই ভাবলাম আশপাশের কয়েকটা র&#x200d;্যাঞ্চেও একবার খোঁজ নিয়ে দেখি।&quot;

কথাগুলো শুনে সন্দেহ করার মতো কিছু নেই। ব্ল্যাক রিভারের মতো ব্যস্ত শহরে কাজের সন্ধানে মানুষ আসেই। তবু লারসেনের অভিজ্ঞ চোখ অন্য কিছু লক্ষ করছিল। লোকটা যতবার কথা বলছে, ততবারই তার চোখ নিঃশব্দে র&#x200d;্যাঞ্চের বিভিন্ন দিকে ঘুরে যাচ্ছে। একবার আস্তাবল, একবার গবাদি পশুর ঘেরা, একবার পানির ট্যাংক, তারপর অফিসঘরের দিকে। দৃষ্টিটা এত দ্রুত যে সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়বে না। কিন্তু ওলফ লারসেন বহু বছর ধরে মানুষের চোখ পড়তে শিখেছে।

সে আবার জিজ্ঞেস করল, &quot;কী কাজ জানো?&quot;

&quot;ঘোড়া সামলাতে পারি। গবাদি পশু নিয়েও কাজ করেছি। প্রয়োজন হলে বেড়া মেরামত, মাল টানা, সবই করি।&quot;

লারসেন শুধু মাথা নেড়ে রইল।

ঠিক সেই সময় মারদেকা আস্তাবলের পাশ থেকে সবকিছু দেখছিল। কথাবার্তার অনেকটাই সে এখন বুঝতে পারে। কয়েক মাস আগে হলে এত দ্রুত ইংরেজি ধরতে পারত না। আজ সে শুধু কথাই শুনছিল না, লোকটার আচরণও লক্ষ করছিল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল লোকটার ঘোড়ার ওপর।

ঘোড়াটা বাদামি রঙের। শক্তসমর্থ। কিন্তু তার বাঁ দিকের সামনের নালে একটা ছোট ভাঙা অংশ রয়েছে।

মারদেকার বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল।

সকালে বাড হিগিন্স তাকে যে খুরের দাগ দেখিয়েছিল, তার একটাতেও ঠিক এমনই ভাঙা নালের ছাপ ছিল।

সে নিশ্চিত হতে পারল না। হয়তো এটা নিছক কাকতালীয়। পশ্চিমে হাজার হাজার ঘোড়ার নাল ভাঙে। তবু তার চোখ আর ঘোড়াটার পা থেকে সরল না।

ঠিক তখনই বাড হিগিন্স ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। সে প্রথমে লোকটার মুখের দিকে নয়, সরাসরি ঘোড়ার সামনের পায়ের দিকে তাকাল। তারপর এক মুহূর্তের জন্য তার চোখের সঙ্গে মারদেকার চোখ মিলল।

কোনো কথা হলো না। কোনো ইশারাও নয়। কিন্তু দুজনেই বুঝে গেল, তারা একই জিনিস লক্ষ্য করেছে।

লারসেন তখনও এমনভাবে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছিল, যেন তার মনে কোনো সন্দেহই নেই।

কিছুক্ষণ পরে সে বলল, &quot;খেয়ে তারপর যেও। পথ এখনও অনেক বাকি।&quot;

লোকটা কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে মাথা নোয়াল। &quot;আপনার এই উপকার মনে থাকবে।&quot;

দুপুরের খাবারের সময় অতিথিকেও টেবিলে বসানো হলো। সে ধীরে সুস্থে খাচ্ছে, মাঝেমধ্যে পথের গল্প করছে, কোথায় কোথায় ঘুরেছে সে কথা বলছে। কিন্তু মারদেকা লক্ষ্য করল, লোকটা যখনই কথা থামাচ্ছে, তখনই চোখ দিয়ে নিঃশব্দে চারপাশ মেপে নিচ্ছে। যেন প্রতিটি মুখ, প্রতিটি ভবন, প্রতিটি দরজা, এমনকি উঠোনের দূরত্বও মনে গেঁথে রাখছে।

খাওয়া শেষ করে লোকটা আবার ঘোড়ায় চড়ল। বিদায় জানিয়ে ধীরে ধীরে প্রধান রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল।

সে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার পর বাড নিচু গলায় মারদেকাকে বলল, &quot;ওর ঘোড়ার বাঁ দিকের সামনের নালটা দেখেছ?&quot;

মারদেকা শান্তভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

বাড আর কিছু বলল না। এখনও অভিযোগ তোলার সময় আসেনি।

কিন্তু সকালের সেই খুরের দাগ আর এই ভাঙা নাল, দুটো একসঙ্গে মিলিয়ে তার অভিজ্ঞ মন প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে সতর্ক হয়ে উঠল।

র&#x200d;্যাঞ্চ আবার নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এল। অতিথি চলে গেছে, উঠোনে আর তার কোনো চিহ্ন নেই। গবাদি পশুর পাল আবার চারণভূমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। আস্তাবলে ঘোড়াগুলোকে পরিচর্যা করা হচ্ছে। দূরে লোহার কারিগরের হাতুড়ির টংটং শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, কয়েক ঘণ্টা আগে এখানে কোনো অচেনা পথিক এসেছিল, এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। কিন্তু ওলফ লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে যারা বহুদিন ধরে কাজ করছে, তারা সবাই বুঝতে পারছিল, অদৃশ্যভাবে কিছু একটা বদলে গেছে।

বিকেলের দিকে বাড হিগিন্স লারসেনের অফিসঘরে ঢুকল। ভেতরে তখন লারসেন খোলা হিসাবের খাতা দেখে কিছু লিখছিল। জানালার ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের আলো কাঠের মেঝেতে লম্বা ছায়া ফেলেছে। বাড দরজা বন্ধ করে ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল।

&quot;লোকটার ব্যাপারে আপনার কী মনে হলো?&quot;

লারসেন কলমটা নামিয়ে রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

&quot;মিথ্যে বলেছে, এমন বলতে পারছি না।&quot;

বাড মাথা নেড়ে বলল, &quot;আমিও না।&quot;

&quot;কিন্তু সব সত্যিও বলেনি।&quot; দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল।

এত বছরের একসঙ্গে কাজের পর তারা জানে, সন্দেহ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। শুধু সন্দেহের ওপর ভর করে কাউকে শত্রু বানানো যায় না। আবার সন্দেহকে পুরোপুরি উপেক্ষাও করা যায় না।

বাড ধীরে ধীরে বলল, &quot;ওর ঘোড়ার ভাঙা নালটা সকালে দেখা দাগের সঙ্গে মিলে যায়।&quot;

লারসেন মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবল। &quot;মিলে যেতে পারে। আবার কাকতালীয়ও হতে পারে।&quot;

&quot;হতে পারে।&quot;

&quot;তবে একটা কথা ঠিক।&quot;

&quot;কী?&quot;

&quot;লোকটা র&#x200d;্যাঞ্চ দেখতে এসেছিল।&quot;

অফিসঘরে আবার নীরবতা নেমে এল। ঠিক সেই সময় দরজায় মৃদু শব্দ হলো।

মারদেকা ভেতরে ঢুকে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। ইলাই তাকে পাঠিয়েছে। হিসাবের খাতাগুলো আবার আলমারিতে তুলে রাখতে হবে। সে নিঃশব্দে কাজ শুরু করল। কিন্তু কাজ করতে করতেই বাড আর লারসেনের কথাগুলো তার কানে যাচ্ছিল।

বাড নিচু গলায় বলল, &quot;যদি ও সত্যিই খবর নিতে এসে থাকে, তাহলে আবারও আসবে।&quot;

লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। &quot;হ্যাঁ। তবে পরেরবার হয়তো একা আসবে না।&quot;

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।

মারদেকা শেষ খাতাটা হাতে তুলে আলমারির দিকে এগোল। কিন্তু তার মনে বারবার ভেসে উঠছিল দুপুরের সেই লোকটার মুখ। তার হাঁটার ভঙ্গি। কথা বলার সময় চোখের দৃষ্টি। আর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছিল ঘোড়াটার আচরণ।

সে জীবনে খুব কম মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। কিন্তু মানুষকে দেখেছে অনেক। নিজের গ্রামে শিকারিদের দেখেছে। ব্যবসায়ীদের দেখেছে। সীমান্তের পথ ধরে চলা কাফেলাও দেখেছে। কেউ যখন সত্যিই ক্লান্ত হয়, তখন সে প্রথমে পানি খোঁজে, তারপর ছায়া। কেউ যখন কাজের খোঁজে আসে, তখন মানুষের মুখের দিকে বেশি তাকায়। কিন্তু লোকটা যেন মানুষের চেয়ে জায়গাগুলোকে বেশি দেখছিল।

মারদেকা ধীরে ধীরে খাতাটা আলমারিতে রেখে জানালার বাইরে তাকাল। দূরে আস্তাবলের সামনে কয়েকটা ঘোড়া নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে আছে।

সেই লোকটাও সবচেয়ে বেশি সময় সেদিকেই তাকিয়েছিল। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে উঠল। সে যেন কোনো অদৃশ্য সূত্রের খুব কাছে পৌঁছে গেছে। কিন্তু এখনও সেই সূত্রকে ভাষায় প্রকাশ করার মতো আত্মবিশ্বাস তার হয়নি। সে শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

ওলফ লারসেন একবার আড়চোখে ছেলেটার দিকে তাকাল। গত কয়েক মাসে সে অনেক বদলেছে। আগে মারদেকা শুধু কাজ দেখত। এখন সে কাজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কারণও খুঁজতে শুরু করেছে।

লারসেন মনে মনে বুঝল, একজন ভালো কাউবয় তৈরি হতে পরিশ্রম লাগে। কিন্তু একজন ভালো পর্যবেক্ষক তৈরি হতে লাগে সময়। আর সেই সময়টা হয়তো ধীরে ধীরে এসে গেছে।

বাইরে তখন সূর্য পশ্চিমের টিলার আড়ালে ডুবে গেছে। দিনের শেষ আলো মিলিয়ে যেতেই র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে একে একে লণ্ঠন জ্বলে উঠল। সারাদিনের কাজের পর সবাই রাতের খাবার খেয়ে যে যার দায়িত্বে ছড়িয়ে পড়ল। নিরাপত্তার নতুন নিয়ম এখন আর আলাদা করে কারও মনে করিয়ে দিতে হয় না। নির্দিষ্ট সময়েই পাহারার পালা বদল হলো। একজন কাউবয় উত্তর দিকের বেড়া ধরে এগিয়ে গেল, আরেকজন দক্ষিণের চারণভূমির দিকে ঘোড়া ছোটাল। দূরে কোথাও ঘোড়ার খুরের মৃদু শব্দ শোনা গেল, তারপর আবার চারদিক আগের মতো নিশ্চুপ হয়ে রইল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে যেন কোনো অশান্তির ছায়াই নেই। অথচ এই নীরবতার আড়ালেই প্রত্যেকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক।

রাত আরও গভীর হলে ওলফ লারসেন নিজের অফিসঘরে বসে দিনের হিসাবপত্র গুছিয়ে রাখছিল। টেবিলের ওপর রাখা কেরোসিনের লণ্ঠনের হলুদ আলোয় কাঠের দেয়ালে লম্বা ছায়া পড়েছে। কিছুক্ষণ পরে বাড হিগিন্স ভেতরে ঢুকল। দরজা বন্ধ করে সে চুপচাপ একটা চেয়ারে বসল। অনেক বছরের সঙ্গী হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে কথার চেয়ে নীরবতার মূল্যই বেশি।

কিছুক্ষণ পরে লারসেন খাতাটা বন্ধ করে বলল, &quot;লোকটার কথা মাথা থেকে যাচ্ছে না।&quot;

বাড ধীরে ধীরে মাথা তুলল। &quot;আমারও না।&quot;

&quot;তুমি কী দেখলে?&quot;

বাড একটু ভেবে বলল, &quot;যে মানুষ সত্যিই কাজ খোঁজে, সে কাজের কথা বলে। লোকটা বলছিল ঠিকই, কিন্তু তার চোখ অন্য জায়গায় ছিল।&quot;

লারসেন কোনো উত্তর দিল না। লণ্ঠনের শিখাটা হালকা দুলে উঠল। বাইরে রাতের বাতাস জানালার পাল্লায় আলতো ধাক্কা দিল।

কিছুক্ষণ পরে বাড আবার বলল, &quot;খুরের দাগের সঙ্গে ওর ঘোড়ার নাল মিলেছে। সেটা কাকতালীয়ও হতে পারে।&quot;

&quot;হতে পারে।&quot;

&quot;কিন্তু একটা ব্যাপার কাকতালীয় বলে মনে হচ্ছে না।&quot;

&quot;কোনটা?&quot;

&quot;ও র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটা কোণ দেখছিল।&quot;

লারসেন এবার ধীরে ধীরে জানালার বাইরে তাকাল। অন্ধকারে আস্তাবলের ছায়া অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ সে কোনো কথা বলল না।

তারপর শান্ত গলায় বলল, &quot;আমাদের হাতে এখনও সন্দেহ আছে। প্রমাণ নেই।&quot;

বাড উঠে দাঁড়াল। &quot;তাহলে?&quot;

&quot;অপেক্ষা।&quot;

একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের ভেতরেই ছিল বহু বছরের অভিজ্ঞতা।

এই সময় দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মারদেকা। ইলাই তাকে হিসাবের খাতাগুলো গুছিয়ে রাখতে পাঠিয়েছিল। কাজ শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। তবু সে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। দুপুরের সেই পথিকের প্রতিটি মুহূর্ত যেন এখনও তার চোখের সামনে ভাসছে। লোকটা পানি খাচ্ছে। কথা বলছে। ঘোড়ার জিন ঠিক করছে। অথচ তার দৃষ্টি বারবার ঘুরে যাচ্ছে আস্তাবল, বেড়া আর চারণভূমির দিকে।

লারসেন লণ্ঠনটা হাতে তুলে নিল। &quot;চলো, বাড। আজ আর কিছু বোঝা যাবে না।&quot;

দুজন ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। অফিসঘরের ভেতর তখন শুধু মারদেকা দাঁড়িয়ে। দরজার চৌকাঠে এসে লারসেন একবার থামল। তারপর বাইরে পা বাড়াল।

ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে ভেসে এল একটি কণ্ঠ।

ধীর। জড়ানো। কিন্তু একেবারে স্পষ্ট।

&quot;ও... কাজ... খুঁজতে... আসেনি।&quot;

দুজনেই থেমে গেল। 

অফিসঘরের ভেতর থেকে আবার সেই কণ্ঠ শোনা গেল।

&quot;ও... ঘোড়া... দেখছিল।&quot;
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/261785/</link>
				<pubDate>Sat, 15 Aug 2026 03:58:02 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–দশ<br />
ব্ল্যাক রিভার শহরের মানুষ নতুন আগন্তুকটিকে আর দ্বিতীয়বার খেয়াল করল না। পশ্চিমের এই ছোট্ট শহরে প্রায়ই নানা জায়গা থেকে পথিক আসে, দুদিন থাকে, আবার চলে যায়। কেউ ভাগ্যের সন্ধানে, কেউ গবাদি পশুর ব্যবসায়, কেউ বা কেবল পথের ক্লান্তি মেটাতে। তাই ধুলোমাখা পোশাক পরা এক অচেনা লোককে নিয়ে কারও কৌতূহল জাগল না।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-261785"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/261785/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">cd1be44c2bb921fcb6678c27f6f25f21</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–নয়
বিকেলের শেষ আলো নিভে যাওয়ার আগেই ওলফ লারসেন ব্ল্যাক রিভার শহর ছেড়ে র&#x200d;্যাঞ্চের পথে রওনা হয়েছিল। সারাদিনের গরমের পর প্রেইরির বাতাসে হালকা শীতলতা নেমে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ধীরে ধীরে টিলার আড়ালে ডুবে যাচ্ছে, তার লালচে আলো শুকনো ঘাসের সমুদ্রজুড়ে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। লারসেনের ঘোড়া পরিচিত পথ ধরে স্থির গতিতে এগিয়ে চলেছে। তার চোখ সামনে, কিন্তু মন পড়ে আছে মার্শাল এলি ব্রুকসের অফিসে। চারজন অচেনা ঘোড়সওয়ারের খবর, গত দুই মাসের অস্বাভাবিক চলাফেরা, পাহাড়চূড়ার নজরদারি, সবকিছু মিলিয়ে তার বহু বছরের অভিজ্ঞতা একটাই কথা বলছে, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। কেউ একজন ধৈর্য ধরে সময়ের অপেক্ষা করছে।

র&#x200d;্যাঞ্চের ফটক চোখে পড়তেই সে দেখল, উঠোনে এখনও কাজ চলছে। গবাদি পশুর একটা দলকে ঘেরার ভেতরে ঢোকানো হচ্ছে। ক্লে মরগান আর মিগুয়েল শেষ কয়েকটা গরুকে তাড়িয়ে আনছে। বাড হিগিন্স আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে একটা ঘোড়ার সামনের পা পরীক্ষা করছে। দূরে রান্নাঘরের চিমনি দিয়ে ধোঁয়া উঠছে। ইলাই নিশ্চয়ই রাতের খাবারের শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবকিছুই স্বাভাবিক, তবু আজ এই পরিচিত দৃশ্যের দিকে তাকিয়েও লারসেনের মনে এক ধরনের অদ্ভুত সতর্কতা কাজ করল। এতদিন সে এই র&#x200d;্যাঞ্চকে নিজের পরিশ্রমে গড়ে তুলেছে। এখন প্রথমবারের মতো মনে হলো, এই বিস্তীর্ণ জমিটাকে শুধু চালালেই হবে না, রক্ষা করতেও হবে।

মারদেকা ঠিক তখনই পানির বড় কাঠের পিপে থেকে বালতি ভরে আস্তাবলের পাশে রাখা লোহার টবে ঢালছিল। কয়েক মাস আগের সেই ক্লান্ত, ভীত, পথহারা ছেলেটাকে এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তার চলাফেরায় আত্মবিশ্বাস এসেছে, কাজের ভঙ্গিতে এসেছে অভ্যাস। বাড দূর থেকে কিছু বলার আগেই সে অনেক কাজ বুঝে করতে পারে। লারসেনকে ফিরতে দেখে সে বালতিটা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মুখে কোনো প্রশ্ন নেই, কিন্তু চোখে কৌতূহল স্পষ্ট।

লারসেন ঘোড়া থেকে নেমে লাগামটা বাডের হাতে দিল। বাড এক নজর তার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে গেল, শহরে যা আলোচনা হয়েছে, তা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।

সে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, &quot;খারাপ কিছু?&quot;

লারসেন চারপাশে একবার তাকিয়ে বলল, &quot;সবাইকে খাওয়ার পর অফিসঘরে আসতে বলো। কথা আছে।&quot; এইটুকুই। এর বেশি কিছু বলল না সে।

বাড আর কোনো প্রশ্ন করল না। এত বছর একসঙ্গে কাজ করতে করতে সে জানে, ওলফ লারসেন যখন নিজে থেকে কথা গোপন রাখে, তখন তার পেছনে যথেষ্ট কারণ থাকে।

রাত নেমে আসতে বেশি সময় লাগল না। একে একে সবাই খাওয়া শেষ করল। ইলাই টেবিল গুছিয়ে আগুনে আরেকটু কাঠ দিল। বাইরে প্রেইরির ওপর পূর্ণ অন্ধকার নেমে এসেছে। দূরে কোথাও একটা কায়োটির দীর্ঘ ডাক ভেসে এল, তারপর আবার চারদিক নিস্তব্ধ।

লারসেনের অফিসঘরে একটা বড় তেলের বাতি জ্বলছে। কাঠের টেবিলের চারপাশে বাড, ক্লে, মিগুয়েল, রুবেন কোল আর হ্যাঙ্ক ডসন বসে আছে। মারদেকা প্রথমে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ভেবেছিল, বড়দের আলোচনায় তার থাকার কথা নয়। কিন্তু লারসেন দরজার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, &quot;তুমিও ভেতরে এসো।&quot;

ছেলেটা একটু ইতস্তত করলেও শেষ পর্যন্ত ভেতরে এসে দরজার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

লারসেন ধীরে ধীরে সবার মুখের দিকে তাকাল। তারপর কোনো ভূমিকা না করেই শহরে মার্শাল এলি ব্রুকসের সঙ্গে হওয়া পুরো কথোপকথন সংক্ষেপে জানিয়ে দিল। পশ্চিমের ফেরিঘাট, অচেনা ঘোড়সওয়ার, গত কয়েক মাসের সন্দেহজনক চলাফেরা, পাহাড়ের চূড়া থেকে নজরদারি, সবই।

ঘরের ভেতর কেউ কথা বলল না।

ক্লে প্রথম নীরবতা ভাঙল। &quot;তাহলে ব্যাপারটা শুধু আমাদের র&#x200d;্যাঞ্চের নয়।&quot;

&quot;না,&quot; লারসেন বলল। &quot;আজ আমাদের দিকে নজর। কাল অন্য কারও দিকে যেতে পারে।&quot;

মিগুয়েল ধীরে ধীরে বলল, &quot;আমরা কী করব?&quot;

লারসেন টেবিলের ওপর দু হাত রাখল। &quot;ভয় পাব না। কিন্তু অসতর্কও থাকব না। গতকাল থেকে পাহারার নিয়ম যেভাবে বদলেছে, সেভাবেই চলবে। কেউ একা দূরে যাবে না। টিলা, নদীর ধারের পথ আর পশ্চিমের চারণভূমিতে নজর বাড়ানো হবে। তবে মনে রেখো, কাউকে দেখলেই গুলি চালাবে না। আমরা এখনও জানি না, শত্রু কে।&quot;

বাতির আলোয় বসে থাকা সবাই গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মারদেকা এক এক করে সবার মুখের দিকে তাকাল। সব কথা সে বুঝতে পারল না, কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট বুঝল। এতদিন সে এই র&#x200d;্যাঞ্চকে শুধু নিজের আশ্রয় হিসেবে দেখেছে। আজ প্রথমবার তার মনে হলো, এই জায়গাটার ওপর সত্যিই কোনো অদৃশ্য বিপদ নেমে আসছে। আর সেই বিপদের কথা জেনেও এখানকার কেউ পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে না। সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকার।

সেদিন রাতেই মারদেকার মনে আরেকটি নতুন উপলব্ধির জন্ম হলো। পশ্চিমে সাহস মানে শুধু বন্দুক চালানো নয়। কখনও কখনও সাহস মানে অন্ধকার নেমে আসার আগেই তাকে চিনে নেওয়া, আর ভোর না ফোটা পর্যন্ত নিজের জায়গা ছেড়ে না যাওয়া।

রাতের বৈঠক শেষ হওয়ার পর র&#x200d;্যাঞ্চের জীবন আবার নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে গেল। তবে সেই ছন্দের ভেতরে কোথাও যেন এক অদৃশ্য পরিবর্তন স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে। আজকের রাতের পাহাড়ায় যারা থাকবে, তারা প্রস্তুতি নিতে বেরিয়ে গেল। বাকীরা সবাই নিশ্চুপ থাকলো। কেউ আর অকারণে উচ্চস্বরে কথা বললো না। দূরে ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনে বুঝলো পাহারাদরা কাজে যোগ দিল।  যাবার ফাঁকে একবার মাথা তুলে আস্তাবলের দরজা, গুদামের তালা, পানির ট্যাংক, সবকিছু একবার করে চোখ বুলিয়ে নিল। নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা করে কাজ করা এখন র&#x200d;্যাঞ্চের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ হয়ে গেছে।

পরদিন সকালে সূর্য ওঠার আগেই বাড হিগিন্স মারদেকাকে নিয়ে র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম দিকের চারণভূমির দিকে বেরিয়ে পড়ল। দুজনেই ঘোড়ায় চড়ে এসেছে। কয়েক মাস আগেও মারদেকাকে ঘোড়ার পিঠে ঠিকমতো বসে থাকতে শেখাতে হয়েছে। এখন সে নিজের ভারসাম্য এমনভাবে ধরে রাখতে পারে যে মাঝারি গতিতে ছুটলেও আর দুলে যায় না। বাড ইচ্ছে করেই কোনো কথা বলছিল না। সে জানে, আজকের শিক্ষা কান দিয়ে নয়, চোখ দিয়ে নিতে হবে।

চারণভূমির শেষ প্রান্তে গিয়ে তারা ঘোড়া থেকে নামল। জায়গাটা অনেকটাই নির্জন। সামনে নিচু একটা শুকনো খাল, তার ওপারে ঢেউ খেলানো প্রেইরি। দূরে কয়েকটা জুনিপার আর কটনউড গাছ ছাড়া আর কিছু নেই। সকালের রোদ এখনও তেমন তেজি হয়নি। শিশিরে ভেজা মাটি নরম। বাড হাঁটু গেড়ে বসে আঙুল দিয়ে মাটির ওপর একটা খুরের ছাপ দেখাল।

মারদেকা প্রথমে বিশেষ কিছু বুঝতে পারল না। তার চোখে সব ছাপই প্রায় একই রকম। বাড কোনো ব্যাখ্যা দিল না। সে শুধু ইশারা করে ছাপটার চারপাশ দেখতে বলল।

মারদেকা আরও কাছে ঝুঁকে বসল। এবার সে লক্ষ করল, ছাপের কিনারাগুলো বেশ ধারালো। ধুলোর ওপর এখনও হালকা ভেজা ভাব আছে। মনে হচ্ছে খুব বেশিক্ষণ আগে এটা তৈরি হয়নি।

বাড সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নেড়ে আরেকটু সামনে হাঁটল। কয়েক গজ দূরে গিয়ে আরেকটা খুরের দাগ দেখাল। দেখতে প্রায় একই রকম, কিন্তু এবার মারদেকা নিজেই পার্থক্যটা খুঁজতে চেষ্টা করল। এই দাগের ভেতরে শুকনো ধুলো জমে গেছে। একপাশের কিনারা ভেঙেও পড়েছে। সে মাথা তুলে বাডের দিকে তাকাতেই বাডের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। ছেলেটা না শুনেও শিখছে।

এরপর বাড নিজের ঘোড়াটাকে কয়েক গজ দূরে নিয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটিয়ে আনল। তারপর আবার থামল। এবার মাটিতে পাশাপাশি তিন রকমের দাগ। একটি পুরোনো, একটি কয়েক ঘণ্টার, আর একটি একেবারে নতুন। সে কোনো কথা না বলে মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল।

মারদেকা এক এক করে সবগুলো পরীক্ষা করল। কখনও বসে, কখনও হাঁটু গেড়ে, কখনও আলোয় চোখ সরু করে। তারপর দ্বিধা না করেই নতুন দাগটার ওপর হাত রাখল।

বাড এবার প্রথমবারের মতো মুখ খুলল। &quot;ভালো।&quot;

একটি মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই একটি শব্দের মূল্য মারদেকার কাছে অনেক বড়। এতদিনে সে বুঝে গেছে, বাড হিগিন্স অকারণে প্রশংসা করে না।

কিছুক্ষণ পর তারা আরও পশ্চিমে এগোল। সেখানে মাটির ধরন বদলে গেছে। কোথাও শক্ত কাঁকর, কোথাও শুকনো ঘাস, কোথাও আবার বালির আস্তরণ। বাড এবার বোঝাল, সব জায়গায় খুরের ছাপ একভাবে থাকে না। শক্ত মাটিতে দাগ কম পড়লেও ছোট ছোট পাথরের অবস্থান বদলে যায়। শুকনো ঘাস মাড়িয়ে গেলে ঘাস সোজা হতে সময় লাগে। আবার বালির ওপর বাতাসও অনেক সময় চিহ্ন মুছে দেয়। তাই একজন দক্ষ ট্র্যাকার কখনো শুধু এক জায়গার দিকে তাকায় না। সে চারপাশ মিলিয়ে দেখে।

মারদেকা গভীর মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি বিষয় মনে রাখছিল। তার মনে হচ্ছিল, এতদিন সে প্রেইরিকে শুধু দেখেছে। আজ প্রথমবার সে যেন প্রেইরির ভাষা পড়তে শিখছে। এই মাটিরও স্মৃতি আছে। যে মানুষ বুঝতে পারে, তার কাছে প্রতিটি দাগ, প্রতিটি ভাঙা ডাল, প্রতিটি চাপা ঘাস একেকটা বাক্য হয়ে ওঠে।

ঠিক তখনই বাড হঠাৎ হাঁটা থামিয়ে দিল। সে নিচু হয়ে মাটির একটা জায়গা পরীক্ষা করল। তারপর কয়েক পা সামনে গিয়ে আবার থামল। এবার তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে।

মারদেকাও এগিয়ে এল। সে দেখল, শুকনো মাটির ওপর পাশাপাশি দুটো ঘোড়ার খুরের দাগ। দাগ দুটো খুব নতুন নয়, আবার খুব পুরোনোও নয়। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেগুলো র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে আসেনি, র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম সীমানা ঘেঁষে অনেকটা পথ গিয়ে আবার উত্তর-পশ্চিমের দিকে ফিরে গেছে।

বাড অনেকক্ষণ কিছু বলল না। তারপর খুব ধীরে চারদিকে একবার তাকাল। তার অভিজ্ঞ চোখ বলছিল, এটা হয়তো কেবল দুজন পথচারীর চিহ্ন। কিন্তু তার বহু বছরের প্রবৃত্তি আরেকটা কথাও বলছিল। কেউ একজন কয়েক দিন আগে এখান দিয়ে শুধু পথ অতিক্রম করেনি। সে এই জায়গাটা মন দিয়ে দেখে গেছে।

বাড হিগিন্স আরও কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ একবার মাটির দিকে, একবার দিগন্তের দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বহু বছরের অভিজ্ঞতায় সে জানে, প্রেইরিতে সব খুরের দাগই সন্দেহের নয়। কাউবয়, শিকারি, পথহারা ভ্রমণকারী, এমনকি পাশের র&#x200d;্যাঞ্চের লোকজনও মাঝেমধ্যে এদিক দিয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু অভিজ্ঞ মানুষের চোখ শুধু দাগ দেখে না, দাগের উদ্দেশ্যও বোঝার চেষ্টা করে। এই দুটি ঘোড়া কোথাও থামেনি, গবাদি পশুর পালের দিকে যায়নি, পানির উৎসের দিকেও নয়। বরং লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম সীমানা বরাবর অনেকটা পথ এগিয়ে আবার ফিরে গেছে। যেন কেউ দূর থেকে পুরো জায়গাটা দেখে নিয়ে চলে গেছে।

মারদেকা বাডের মুখের দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারছিল, এই দাগগুলো সাধারণ নয়। বাড এবার মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে নিজের আঙুল দিয়ে কয়েকটি চিহ্ন দেখাল। একটি জায়গায় ঘোড়ার খুর একটু গভীরভাবে বসেছে। তার পাশেই ঘাস চাপা পড়ে আছে। তারপর সে হাত তুলে সামনে থাকা টিলাটার দিকে ইশারা করল।

মারদেকা মাথা তুলে তাকাল। টিলাটা খুব উঁচু নয়। কিন্তু সেখানে দাঁড়ালে র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিমের চারণভূমি, আস্তাবলের দিকের পথ, এমনকি প্রধান ফটকের আশপাশও অনেক দূর পর্যন্ত চোখে পড়ে। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার মনে পড়ে গেল কয়েক সপ্তাহ আগে রাতের অন্ধকারে সেই টিলার কাছাকাছি দুটি অচেনা ঘোড়সওয়ারকে দেখা গিয়েছিল। তারা কোনো ঝামেলা করেনি, শুধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গিয়েছিল। আজকের দৃশ্যটা যেন সেই স্মৃতিকেই আরও বাস্তব করে তুলল।

বাড এবার উঠে দাঁড়াল। সে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইল না। অকারণে ভয় পাওয়াও যেমন ভুল, তেমনি অকারণে নিশ্চিন্ত থাকাও বোকামি। সে কোমর থেকে ছোট একটা ভাঁজ করা ছুরি বের করে পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা শুকনো জুনিপার গাছের গায়ে অতি ছোট্ট একটা দাগ কেটে দিল। তারপর মারদেকার দিকে তাকিয়ে ইশারায় বোঝাল, জায়গাটা মনে রাখতে হবে। পরে দরকার হলে আবার এখানে ফিরে আসবে।

ফিরতি পথে দুজনের কেউই খুব একটা কথা বলল না। সকাল গড়িয়ে তখন প্রায় দুপুর। প্রেইরির ওপর গরম বাড়তে শুরু করেছে। দূরে গবাদি পশুর পাল নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে। সবকিছুই স্বাভাবিক। অথচ বাডের মাথার ভেতর বারবার ঘুরে ফিরছে সেই দুটি খুরের দাগ।

র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরে প্রথমেই সে ওলফ লারসেনকে খুঁজল। লারসেন তখন কাঠের বেড়ার একটা অংশ মেরামত করা দেখছিল। বাড কাছে গিয়ে সংক্ষেপে সব কথা জানাল। কোথায় দাগ দেখা গেছে, কতটা নতুন, কোন দিকে গেছে, সবই।

লারসেন মন দিয়ে শুনল। তারপর কোনো প্রশ্ন না করে কয়েক মুহূর্ত পশ্চিমের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখে উদ্বেগের ছাপ নেই, কিন্তু চোখ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। &quot;চিহ্নটা রেখে এসেছ?&quot;

বাড মাথা নেড়ে বলল, &quot;হ্যাঁ।&quot;

&quot;ভালো করেছ।&quot; এর বেশি কিছু বলল না লারসেন। কারণ এখনও হাতে কোনো প্রমাণ নেই। শুধু সন্দেহের ওপর ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া তার স্বভাব নয়। কিন্তু সে এটাও জানে, প্রেইরির প্রতিটি বড় ঘটনা শুরু হয় এমনই ছোট্ট কোনো ইঙ্গিত দিয়ে।

বিকেলের দিকে সে মারদেকাকে নিজের অফিসঘরে ডাকল। ছেলেটা ভেতরে ঢুকতেই লারসেন টেবিলের ওপর রাখা ব্ল্যাক রিভার ও আশপাশের এলাকার একটা পুরোনো মানচিত্র খুলে দিল। এত বড় কাগজে আঁকা পুরো অঞ্চল মারদেকা আগে কখনও দেখেনি। নদী, টিলা, শুকনো খাল, চারণভূমি, শহরের রাস্তা, সবকিছুই তাতে চিহ্নিত।

লারসেন আঙুল দিয়ে র&#x200d;্যাঞ্চের অবস্থান দেখাল। তারপর পশ্চিমের সেই টিলার দিকে ইশারা করল, যেখানে আজ বাড আর মারদেকা গিয়েছিল। এরপর দু জায়গার মাঝখানে আঙুল চালিয়ে ধীরে ধীরে ছেলেটার দিকে তাকাল।

মারদেকা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। কিন্তু একটু পরেই তার চোখে উপলব্ধির ঝলক দেখা দিল। সে বুঝতে শুরু করেছে, র&#x200d;্যাঞ্চ শুধু কয়েকটা ঘর, আস্তাবল আর গবাদি পশুর সমষ্টি নয়। চারপাশের পাহাড়, টিলা, নদী, শুকনো খাল, পুরোনো পথ, সবকিছু মিলিয়েই এই ভূমি। যে এই ভূখণ্ডকে চেনে, সে অনেক সময় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তার আভাস পেয়ে যায়।

ওলফ লারসেন ছেলেটার চোখের সেই পরিবর্তনটা লক্ষ করল। কিছু বলল না। শুধু মনে মনে ভাবল, ঠিক এই কারণেই সে মারদেকাকে অন্যদের মতো শুধু কাজ শেখাচ্ছে না। সে চাইছে, একদিন এই ছেলেটা যেন পুরো পশ্চিমকে পড়তে শেখে, যেমন একজন মানুষ একটি খোলা বই পড়ে।

ঠিক সেই সময়, ব্ল্যাক রিভারের পশ্চিমে বহু দূরের এক নির্জন গিরিখাতের আড়ালে চারটি ঘোড়া বাঁধা ছিল। তাদের মালিকেরা আগুন জ্বালায়নি। দিনের আলো পুরোপুরি ফুরিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় তারা নীরবে বসে ছিল। তাদের একজন কোমর থেকে ভাঁজ করা একটা মানচিত্র বের করে মাটিতে মেলে ধরল। আঙুলের ডগা ধীরে ধীরে এক জায়গায় গিয়ে থামল। লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ।

কেউ কোনো কথা বলল না। তবু নীরবতার ভেতরেই বোঝা গেল, অপেক্ষার সময় ধীরে ধীরে শেষের দিকে এগিয়ে আসছে।

অন্ধকার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে গিরিখাতের ওপর আকাশটা তারায় ভরে উঠল। চারটি ঘোড়া নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে শুকনো ঘাস খাচ্ছিল। তাদের মালিকেরা আগুন জ্বালাল না। ধোঁয়া অনেক দূর থেকে দেখা যায়, আর তারা চাইছিল না এই অঞ্চলে তাদের উপস্থিতির কোনো চিহ্ন রেখে যেতে। কয়েক মুহূর্ত আগে যে মানচিত্রটা মাটিতে বিছানো ছিল, সেটি আবার গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে। 

চারজনের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে প্রবীণ লোকটি চারপাশে একবার তাকিয়ে ধীর গলায় বলল, &quot;আরও কিছুদিন। তারপর আমরা ঠিক করব, কোথা থেকে শুরু করা হবে।&quot;

অন্য একজন নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, &quot;লারসেন?&quot;

লোকটা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে কোমর থেকে একটা ছোট দূরবীন বের করে পশ্চিমের টিলার দিকে তাকাল। তারপর দূরবীনটা নামিয়ে বলল, &quot;না। তাড়াহুড়ো করলে ভুল হবে। আগে নিশ্চিত হতে হবে, কারা ওর পাশে দাঁড়াবে, আর কারা দাঁড়াবে না।&quot;

তার কথায় আর কেউ আপত্তি করল না। তারা সবাই জানে, প্রেইরিতে বন্দুকের গুলির চেয়েও মূল্যবান জিনিস হলো ধৈর্য। যে আগে নিজের রাগ দেখায়, সে অনেক সময় নিজের দুর্বলতাও প্রকাশ করে ফেলে।

এদিকে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে রাতের খাবার শেষ হয়েছে। দিনের পরিশ্রমে সবাই ক্লান্ত। কেউ নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে, কেউ আস্তাবলে শেষবারের মতো ঘোড়াগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। ইলাই রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। এত বছর এই র&#x200d;্যাঞ্চে কাটানোর পরও তার একটা অভ্যাস বদলায়নি। ঘুমোতে যাওয়ার আগে সে একবার পুরো উঠোনটা দেখে নেয়। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।

মারদেকা আস্তাবলের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের দায়িত্বের শেষ কাজটুকু করছিল। সে একে একে ঘোড়াগুলোর পানির পাত্র পরীক্ষা করে দেখল। তারপর খড়ের গাদার পাশে রাখা কাঠের দরজাটা ভালোভাবে বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এল। কাজ শেষ হলেও সে সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ফিরল না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পশ্চিমের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। দিনের বেলায় বাডের সঙ্গে দেখা সেই খুরের দাগ দুটো বারবার তার মনে পড়ছিল। সে জানে না কেন, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, সেই দাগগুলো শুধু মাটিতে নয়, তার মনেও যেন একটা চিহ্ন এঁকে রেখে গেছে।

ঠিক তখনই পেছন থেকে ওলফ লারসেনের কণ্ঠ ভেসে এল। &quot;কী দেখছ?&quot;

মারদেকা চমকে ফিরে তাকাল। লারসেন ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। দুজনেই কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। সামনে শুধু অন্ধকার প্রেইরি। দূরে টিলার কালো রেখা। তার ওপরে অসংখ্য তারা।

লারসেন শান্ত গলায় বলল, &quot;পশ্চিমকে ভয় করলে এখানে টিকে থাকা যায় না। আবার পশ্চিমকে অবহেলাও করা যায় না।&quot;

মারদেকা মন দিয়ে তার কথা শুনছিল।

&quot;আজ তুমি মাটির দাগ পড়তে শিখছ। কাল হয়তো মানুষের দাগও পড়তে শিখবে। মনে রেখো, মানুষের মুখ অনেক সময় মিথ্যা বলতে পারে। কিন্তু তার কাজ খুব কমই মিথ্যা বলে।&quot;

মারদেকা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কথাগুলোর পুরো অর্থ হয়তো সে আজ বুঝতে পারছে না। কিন্তু সে অনুভব করল, ওলফ লারসেন তাকে শুধু র&#x200d;্যাঞ্চের কাজ শেখাচ্ছে না। তাকে এমনভাবে গড়ে তুলছে, যাতে একদিন সে নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে মানুষ আর পরিস্থিতিকে চিনতে পারে।

পরদিন সকালটা ছিল অস্বাভাবিক শান্ত। সূর্যের আলোয় ভেজা প্রেইরি যেন আগের দিনের সব দুশ্চিন্তা ভুলে গেছে। গবাদি পশুর পাল স্বাভাবিক নিয়মে চারণভূমির দিকে এগিয়ে চলেছে। কাউবয়েরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত। দূর থেকে দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না, এই র&#x200d;্যাঞ্চের মানুষগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক।

কিন্তু ঠিক সেই সময় ব্ল্যাক রিভার শহরের পশ্চিম প্রান্তে এক অচেনা লোক ঘোড়া থেকে নেমে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে প্রধান সড়কের দিকে হাঁটা দিল। তার পোশাক ছিল সাধারণ পথিকের মতো। কোমরে পুরোনো রিভলভার। মুখে ক্লান্তির ছাপ। তাকে দেখে কেউ দ্বিতীয়বার ফিরে তাকাল না।

লোকটা ধীরে ধীরে রাস্তার দুপাশের দোকানগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে এগিয়ে চলল। কোথাও থামল না। কারও সঙ্গে কথা বলল না। কিন্তু তার তীক্ষ্ণ চোখ যেন শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিঃশব্দে মেপে নিচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরে সে একবার মাথা ঘুরিয়ে শহরের শেষ প্রান্তের দিকে তাকাল, যেখানে রাস্তা ধরে এগোলেই পৌঁছানো যায় ওলফ লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে।

তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। তারপর সে আবার ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।

ব্ল্যাক রিভারের মানুষ তখনও জানত না, তাদের শহরে একজন নতুন আগন্তুক এসেছে। কিন্তু সেই মানুষটির আগমন নিছক ভ্রমণ ছিল না। সে এসেছিল দেখতে, মনে রাখতে, আর সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/261042/</link>
				<pubDate>Thu, 13 Aug 2026 06:33:14 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–নয়<br />
বিকেলের শেষ আলো নিভে যাওয়ার আগেই ওলফ লারসেন ব্ল্যাক রিভার শহর ছেড়ে র&#x200d;্যাঞ্চের পথে রওনা হয়েছিল। সারাদিনের গরমের পর প্রেইরির বাতাসে হালকা শীতলতা নেমে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ধীরে ধীরে টিলার আড়ালে ডুবে যাচ্ছে, তার লালচে আলো শুকনো ঘাসের সমুদ্রজুড়ে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। লারসেনের ঘোড়া পরিচিত পথ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-261042"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/261042/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">839b6c54a27f17ab58c8efcd36fffa60</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–আট
ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশের বিশাল প্রেইরিটা ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করল। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের ডগায় সূর্যের আলো পড়ে অসংখ্য কাচের টুকরোর মতো ঝিকমিক করছে। দূরের টিলাগুলো নীলচে কুয়াশার আড়ালে আধো দেখা যাচ্ছে। কোথাও একটা কোয়েল ডেকে উঠল, তারপর আবার চারদিকে নেমে এল গভীর নিস্তব্ধতা। সেই নীরবতা ভাঙল আস্তাবলের ভেতর থেকে ভেসে আসা ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি আর লোহার নালের ঠকঠক শব্দে। র&#x200d;্যাঞ্চের আর সব সকালের মতোই কাজ শুরু হয়েছে, কিন্তু আজকের বাতাসে এমন একটা অদৃশ্য টান লেগে আছে, যা এখানে বহুদিনের মানুষরাও স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে।

ইলাই রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গরম কফির মগগুলো একে একে কাঠের ট্রের ওপর সাজিয়ে রাখছিল। আগুনে সেঁকা ভুট্টার রুটি আর শুকনো মাংসের গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু আজ কেউ ধীরে সুস্থে নাশতা খাওয়ার মেজাজে নেই। উঠোনের মাঝখানে ওলফ লারসেন দাঁড়িয়ে নিজের ঘোড়ার জিন আর লাগাম শেষবারের মতো পরীক্ষা করছিল। গত সন্ধ্যায় ব্ল্যাক রিভারের ডেপুটি মার্শাল এসে যে খবর দিয়ে গেছে, সেটার পর থেকে সে খুব কম কথাই বলেছে। এলি ব্রুকসের মতো মানুষ অকারণে কাউকে ডেকে পাঠায় না। তার মানে শহরে এমন কিছু ঘটেছে, যার সঙ্গে লারসেনের সম্পর্ক থাকা অস্বাভাবিক নয়।

মারদেকা ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। কয়েক মাসের মধ্যে এই দৃশ্য তার কাছে অনেকটাই পরিচিত হয়ে গেছে। ভোরবেলা কাউবয়দের প্রস্তুতি, ঘোড়ার পিঠে জিন তোলা, পানির চামড়ার থলি বেঁধে নেওয়া, উইনচেস্টার কাঁধে তুলে নেওয়া, এসব এখন আর তাকে আগের মতো বিস্মিত করে না। তবু আজ সে বুঝতে পারছিল, কিছু একটা আলাদা। বাড হিগিন্সের মুখে সেই সহজ হাসিটা নেই। ক্লে মরগান অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ। মিগুয়েলও বারবার পশ্চিম দিকের রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে।

লারসেন নাশতা শেষ করে ধীরে ধীরে সবার দিকে তাকাল। তারপর বলল, &quot;আমি শহরে যাচ্ছি। ফিরে আসতে বিকেলও হতে পারে।&quot;

ক্লে সংক্ষেপে মাথা নেড়ে বলল, &quot;র&#x200d;্যাঞ্চের দায়িত্ব নিয়ে ভাববেন না।&quot;

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, &quot;আমি না ফেরা পর্যন্ত কেউ অকারণে র&#x200d;্যাঞ্চের সীমানার বাইরে যাবে না।&quot;

বাড মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কয়েকদিন আগেও কথাটা হয়তো বাড়াবাড়ি মনে হতো। কিন্তু রাতের টিলায় দেখা সেই অচেনা দুই ঘোড়সওয়ারের পর আর কেউ এটাকে অযথা সতর্কতা বলে ভাবছে না।

মারদেকা নিঃশব্দে সব শুনছিল। কথার অর্ধেকও সে বুঝতে পারে না, কিন্তু মানুষের মুখ পড়তে সে শিখে গেছে। ওলফ লারসেনের চোখের স্থিরতা, বাডের গম্ভীর মুখ, ক্লের সংক্ষিপ্ত উত্তর, সব মিলিয়ে সে বুঝতে পারল, আজকের যাত্রা সাধারণ কোনো শহর সফর নয়।

লারসেন ঘোড়ায় চড়ে বসতেই হঠাৎ তার চোখ মারদেকার ওপর গিয়ে থামল। কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থেকে সে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। মারদেকা এগিয়ে এলো।

লারসেন শান্ত গলায় বলল, &quot;আজ তুমি র&#x200d;্যাঞ্চেই থাকবে।&quot;

মারদেকা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল। কয়েক মাস আগে লারসেন তাকে ব্ল্যাক রিভার শহর ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। সেই দিনের প্রতিটি দৃশ্য এখনো তার মনে উজ্জ্বল। সে ভেবেছিল, হয়তো আবার শহরে যাওয়ার সুযোগ হবে। কিন্তু লারসেনের চোখে তাকিয়ে সে বুঝে গেল, আজকের যাত্রা অন্যরকম। এতে কৌতূহলের জায়গা নেই, আছে দায়িত্ব। সে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

বাড এগিয়ে এসে তার কাঁধে আলতো চাপড় দিল। তারপর বলল, &quot;আজ আমার সঙ্গে থাকবে।&quot;

এই কথাটা মারদেকা পুরোপুরি না বুঝলেও বাডের হাতের স্পর্শ বুঝল। সে জানে, র&#x200d;্যাঞ্চে থেকে গেলেও অলস বসে থাকতে হবে না। নতুন কিছু শেখার সুযোগ নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ওলফ লারসেন একাই র&#x200d;্যাঞ্চের ফটক পেরিয়ে শহরের রাস্তার দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। সকালের সূর্য তখন ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে। ধুলোমাখা পথের ওপর ঘোড়ার খুরের দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মারদেকা অনেকক্ষণ সেই পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ফিরে বাডের পাশে এসে দাঁড়াল।

বাড কিছু না বলে আস্তাবলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। মারদেকাও তার পেছন পেছন চলল। র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরে আরেকটি কর্মব্যস্ত দিনের শুরু হলো, কিন্তু সেই সময় ব্ল্যাক রিভারের দিকে এগিয়ে চলা একাকী ঘোড়সওয়ার জানত না, কয়েক ঘণ্টা পরে মার্শাল এলি ব্রুকস যে খবর তাকে জানাবে, সেটাই তাদের সবার জীবনকে ধীরে ধীরে এমন এক পথে ঠেলে দেবে, যেখান থেকে আর কোনো কিছুই আগের মতো থাকবে না।

সকালের রোদ একটু একটু করে তীব্র হয়ে উঠছিল। ওলফ লারসেনের ঘোড়ার খুরের শব্দ অনেক আগেই দূরে মিলিয়ে গেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোন আবার ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছে। গরুর পাল চারণভূমির দিকে বেরিয়ে গেছে, আস্তাবলে নতুন ঘোড়াগুলোর পরিচর্যা চলছে, কোথাও হাতুড়ির শব্দ, কোথাও করাতের ঘষা, কোথাও আবার শুকনো ঘাসের গাদায় লোকজন ব্যস্ত। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এই র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর অদৃশ্য একটা আশঙ্কার ছায়া নেমে এসেছে। কিন্তু যারা এখানে বহু বছর ধরে কাজ করছে, তারা প্রত্যেকেই জানে, আজকের দিনের প্রতিটি মুহূর্ত অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি সতর্ক হয়ে কাটাতে হবে।

বাড হিগিন্স মারদেকাকে নিয়ে আস্তাবলের পেছনের খোলা জায়গায় গেল। সেখানে কয়েকটা কাঠের খুঁটি পুঁতে গোল একটা ঘেরা জায়গা তৈরি করা হয়েছে। নতুন ঘোড়াকে মানুষে অভ্যস্ত করার জন্য মাঝেমধ্যেই জায়গাটা ব্যবহার করা হয়। আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বছর তিনেক বয়সী একটা বাদামি ঘোড়া। প্রাণীটা পুরোপুরি বুনো নয়, আবার পুরোপুরি শান্তও নয়। মানুষের উপস্থিতি সে মেনে নেয়, কিন্তু হঠাৎ শব্দ শুনলেই কান খাড়া করে ওঠে, অস্থিরভাবে পা বদলায়।

বাড কিছুক্ষণ ঘোড়াটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মারদেকার দিকে ফিরে হাতের ইশারায় বোঝাল, আজ কোনো কাজ জোর করে করা যাবে না। ধৈর্য ধরতে হবে। এতদিন সে মারদেকাকে ঘোড়ার পরিচর্যা, জিন বাঁধা, লাগাম পরানো শিখিয়েছে। আজ শেখাবে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রাণীর বিশ্বাস অর্জন করতে হলে নিজের অস্থিরতা আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

মারদেকা ধীরে ধীরে ঘেরাটার ভেতরে ঢুকল। সে কোনো তাড়াহুড়ো করল না। কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে শুধু ঘোড়াটার দিকে তাকিয়ে রইল। প্রাণীটাও তার দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনের মাঝখানে নিঃশব্দ এক ধরনের বোঝাপড়া তৈরি হতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত পর মারদেকা খুব আস্তে এক পা এগোল। ঘোড়াটা মাথা তুলে বাতাস শুঁকল, তারপর আবার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরও কিছুক্ষণ পর সে নিজের হাতটা ধীরে ধীরে সামনে বাড়িয়ে দিল। এবারও কোনো ভয় দেখাল না প্রাণীটা। শুধু গলা একটু নামিয়ে ছেলেটার হাতের গন্ধ শুঁকে নিল।

বাড দূর থেকে সবকিছু দেখছিল। সে কোনো নির্দেশ দিচ্ছিল না। কারণ কিছু শিক্ষা মুখে বলে দেওয়া যায় না। নিজের অনুভূতি দিয়ে শিখতে হয়। কয়েক মাস আগে এই ছেলেটা মানুষের ভাষাই বুঝত না। এখন সে শুধু মানুষ নয়, প্রাণীর আচরণও মন দিয়ে পড়তে শিখছে। তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সে আগে দেখে, তারপর কাজ করে।

একসময় বাড ঘেরার ভেতরে ঢুকে মারদেকার হাতে একটা লম্বা দড়ি দিল। দড়ির অন্য প্রান্তে ছোট একটা চামড়ার ফাঁস বাঁধা। তবে সেটা ব্যবহার করার জন্য নয়, শুধু হাতে ধরে ঘোড়ার পাশে পাশাপাশি হাঁটার অনুশীলনের জন্য। সে ইশারায় বোঝাল, প্রাণীটাকে টেনে নেওয়া যাবে না। তাকে নিজের ইচ্ছায় সঙ্গে আসতে দিতে হবে।

মারদেকা ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল। প্রথমে ঘোড়াটা দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একবার মাথা নাড়িয়ে খুব ধীর গতিতে তার পেছনে হাঁটতে শুরু করল। দুজনের মাঝখানে দড়িটা ঢিলে হয়ে ঝুলে আছে। কোথাও কোনো টান নেই। বাডের ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটে উঠল। ঠিক এভাবেই একজন ভালো অশ্বারোহী তৈরি হয়। শক্তি দিয়ে নয়, ধৈর্য দিয়ে।

দুপুরের দিকে কাজ শেষ হলে ইলাই বারান্দায় বসে মারদেকার জন্য অপেক্ষা করছিল। আজ পড়াশোনার সময় সে নতুন কোনো অক্ষর শেখাল না। বরং এতদিনে শেখা শব্দগুলো দিয়েই ছোট ছোট বাক্য গঠন করতে শুরু করল। মারদেকা কষ্ট করে শব্দগুলো উচ্চারণ করছিল। অনেক জায়গায় ভুল হচ্ছিল, কিন্তু আগের মতো থেমে যাচ্ছিল না। ভুল বুঝতে পারলেই আবার শুরু করছিল। ইলাই সন্তুষ্ট মনে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারছিল, ভাষা আর কাজ, দুটোই ধীরে ধীরে একসঙ্গে এগোচ্ছে।

এদিকে সকালের রোদের তীব্রতা হামাগুড়ি দিয়ে খড়দাহে ধাবিত হতে না হতেই ব্ল্যাক রিভারের প্রধান সড়কে ওলফ লারসেনের ঘোড়া ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ল। কয়েক মাস আগেও এই রাস্তা দিয়ে সে মারদেকাকে শহর দেখিয়েছিল। আজ তার চোখে সেই শহরের কোনো দৃশ্যই ধরা পড়ছে না। সে সরাসরি মার্শাল এলি ব্রুকসের অফিসের সামনে এসে ঘোড়া থামাল। কাঠের বারান্দায় বাঁধা দোলনা চেয়ারটা খালি। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই ডেপুটি মার্শাল, যে আগের দিন র&#x200d;্যাঞ্চে গিয়েছিল। লারসেনকে দেখেই সে দরজা খুলে সরে দাঁড়াল।

ভেতরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এলি ব্রুকস যেন অনেকক্ষণ ধরেই এই মুহূর্তটার অপেক্ষা করছিল। ওলফ লারসেন ঘরে ঢুকতেই সে দরজার দিকে একবার তাকাল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ডেপুটি মার্শাল দরজাটা আস্তে করে টেনে বন্ধ করে দিল। ঘরের ভেতর নেমে এল এক ধরনের ভারী নীরবতা। দূরে প্রধান রাস্তা থেকে ভেসে আসছে ঘোড়ার খুরের ছন্দময় শব্দ, মাঝে মাঝে লোহার কারখানার হাতুড়ির টংটাং আওয়াজ। কিন্তু সেই সব শব্দ যেন এই ছোট্ট অফিসঘরের ভেতরে ঢুকতে পারছে না।

এলি নিজের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড ওলফ লারসেনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, &quot;তোমাকে ডাকার কারণটা সহজ নয়।&quot;

লারসেন টুপিটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। তার মুখে কোনো উদ্বেগের ছাপ নেই, কিন্তু বহু বছরের অভিজ্ঞতায় সে বুঝে গেছে, এলি ব্রুকস কথাটা শুরু করার আগে নিজের ভাষা বেছে নিচ্ছে। সে শান্ত গলায় বলল, &quot;শুনছি।&quot;

এলি টেবিলের ড্রয়ার খুলে ভেতর থেকে একটা ছোট কাপড়ের থলে বের করল। থলেটা খুলতেই কয়েকটা পিতলের খালি কার্তুজ টেবিলের ওপর গড়িয়ে পড়ল। প্রথম দেখায় এগুলো সাধারণ কার্তুজের খোসা বলেই মনে হয়। কিন্তু লারসেন একটা হাতে তুলে নিয়ে চোখের সামনে ধরতেই তার দৃষ্টি বদলে গেল। প্রতিটি খোসার তলায় একই নির্মাতার ছাপ। ব্ল্যাক রিভারের আশেপাশে এই ধরনের গোলাবারুদ খুব কম মানুষ ব্যবহার করে।

এলি বলল, &quot;গত তিন সপ্তাহে শহরের বাইরে তিনটা আলাদা জায়গা থেকে এগুলো পেয়েছি।&quot;

লারসেন কোনো মন্তব্য করল না।

এলি আবার বলল, &quot;প্রথমে ভেবেছিলাম কয়েকজন শিকারি এসেছে। কিন্তু পরে বুঝলাম, তারা শিকার করতে আসেনি। তারা জায়গা দেখছিল।&quot;

লারসেন কার্তুজটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। &quot;কোন দিক?&quot;

এলি এবার দেয়ালে ঝোলানো একটা বড় মানচিত্রের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে ব্ল্যাক রিভার, আশপাশের খামার, নদী, পাহাড় আর র&#x200d;্যাঞ্চগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করা আছে। সে একে একে তিনটি জায়গায় আঙুল রাখল। তিনটিই শহরের বাইরে। তিনটিই এমন উঁচু জায়গা, যেখান থেকে দূর পর্যন্ত নজর রাখা যায়।

লারসেন কয়েক মুহূর্ত মানচিত্রটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, &quot;তিনটা জায়গা মিলে একটা বৃত্ত তৈরি করছে।&quot;

এলি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। &quot;আর সেই বৃত্তের মাঝখানে কী আছে, সেটা তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ।&quot;

লারসেন উত্তর দিল না। তার প্রয়োজনও ছিল না। মানচিত্রে সেই কাল্পনিক বৃত্তের মাঝামাঝি জায়গাতেই বিস্তৃত লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ।

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। বাইরে রাস্তা দিয়ে একটা ঘোড়ার গাড়ি চলে গেল। চাকার শব্দ কয়েক মুহূর্ত শোনা গেল, তারপর মিলিয়ে গেল দূরে।

এলি এবার নিচু স্বরে বলল, &quot;আমি এখনও নিশ্চিত নই তারা কারা। কিন্তু তারা ধৈর্য ধরে কাজ করছে। তারা তাড়াহুড়ো করছে না। আগে জায়গা দেখছে, মানুষের অভ্যাস বুঝছে, তারপর সিদ্ধান্ত নেবে।&quot;

লারসেন জানালার দিকে তাকাল। শহরের সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিদিনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কেউ জানেই না, এই ছোট্ট অফিসঘরের ভেতরে এমন একটা আলোচনা চলছে, যার ফল পুরো অঞ্চলকে বদলে দিতে পারে।

সে ধীরে ধীরে বলল, &quot;তুমি আমাকে শুধু সাবধান করার জন্য ডাকোনি।&quot;

এলি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। &quot;না। আমি সাহায্য চাইতে ডেকেছি।&quot;

লারসেন এবার পুরো মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকাল।

এলি বলল, &quot;শহরের ভেতর আমি নজর রাখতে পারি। আমার ডেপুটি আছে। খবর আনার লোক আছে। কিন্তু শহরের বাইরে আমার চোখ কম। তোমার লোকজন প্রতিদিন প্রেইরি, পাহাড় আর নদীর ধার ঘুরে বেড়ায়। তারা এমন অনেক কিছু দেখতে পারে, যা আমার লোকদের চোখে পড়বে না।&quot;

লারসেন কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, &quot;আমার লোকেরা কাউবয়, আইনরক্ষী নয়।&quot;

&quot;জানি,&quot; এলি শান্ত গলায় বলল। &quot;তাদের কাউকে বন্দুক হাতে কাউকে তাড়া করতে বলছি না। শুধু অস্বাভাবিক কিছু দেখলে আমাকে জানাবে। সেটাই যথেষ্ট।&quot;

এটা যুক্তিসঙ্গত অনুরোধ। বহু বছর ধরে সে নিজের র&#x200d;্যাঞ্চ রক্ষা করেছে। কিন্তু এখন ব্যাপারটা শুধু তার জমির নয়। কেউ যদি এই অঞ্চলে সংগঠিতভাবে ঘাঁটি গেড়ে বসতে শুরু করে, তাহলে একদিন না একদিন ব্ল্যাক রিভারের প্রত্যেকটি পরিবার তার প্রভাব অনুভব করবে। লারসেন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। &quot;আজ থেকেই ব্যবস্থা করব।&quot;

ঠিক তখনই দরজায় তিনবার মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

এলি মুখ তুলে বলল, &quot;ভেতরে আসো।&quot;

দরজা খুলে সেই ডেপুটি মার্শাল ভেতরে ঢুকল, যে কিছুক্ষণ আগে লারসেনকে অফিসে ঢুকিয়ে বাইরে পাহারায় দাঁড়িয়ে ছিল। সে টুপিটা হাতে নিয়ে সম্মান জানিয়ে বলল, &quot;মার্শাল, পশ্চিমের ফেরিঘাট থেকে একজন টহলদার এসেছে। বলছে জরুরি খবর আছে।&quot;

এলি আর লারসেন একে অপরের দিকে তাকাল। এলি শান্ত স্বরে বলল, &quot;ওকে ভেতরে পাঠাও।&quot;

ডেপুটি আবার বাইরে বেরিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের নীরবতার মধ্যে লারসেনের দৃষ্টি ধীরে ধীরে দরজার দিকে স্থির হয়ে রইল। তার বহু বছরের অভিজ্ঞতা বলছিল, এই দরজা দিয়ে যে মানুষটা এখন ঢুকবে, তার মুখে হয়তো এমন একটি খবর থাকবে, যা ব্ল্যাক রিভারের ওপর ঝুলে থাকা অদৃশ্য ছায়াটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে।

ডেপুটি মার্শাল বেরিয়ে যাওয়ার পর অফিসঘরের ভেতর আবার কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল। বাইরে দুপুরমুখী কড়া রোদ এখন কাঠের বারান্দার অর্ধেকটা জুড়ে পড়েছে। রাস্তার ধুলোয় দু একটি ঘোড়ার গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে, দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে লোকজন নিজেদের কাজে ব্যস্ত। শহরের স্বাভাবিক জীবন চলছেই, অথচ এই ছোট্ট অফিসঘরের ভেতরে এমন এক আলোচনার সূচনা হয়েছে, যার খবর ব্ল্যাক রিভারের আর কেউ জানে না।

কয়েক সেকেন্ড পর দরজাটা আবার খুলল। ডেপুটি মার্শাল ভেতরে ঢুকল না। সে কেবল দরজার পাশে সরে দাঁড়াল। তার পেছন দিয়ে ধুলোয় মাখামাখি পোশাক পরা একজন মধ্যবয়সী লোক ভেতরে এল। রোদে পুড়ে তার মুখ তামাটে হয়ে গেছে। বুটজোড়া ধুলোর আস্তরণে ঢাকা। কোমরে কোনো বন্দুক নেই। কাঁধে চামড়ার পানির থলি। দীর্ঘ পথ একটানা অতিক্রম করার ক্লান্তি তার চোখেমুখে স্পষ্ট। লোকটা টুপি খুলে সম্মান জানাল।

এলি ব্রুকস শান্ত গলায় বলল, &quot;বসো।&quot;

লোকটা মাথা নেড়ে বলল, &quot;সময় নেই, মার্শাল। ঘোড়াটাও প্রায় ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। খবরটা দিয়েই আবার ফিরতে হবে।&quot;

এলি আর লারসেন দুজনেই মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকাল।

লোকটা গলা ভিজিয়ে ধীরে ধীরে বলল, &quot;আজ ভোরে পশ্চিমের ফেরিঘাটের ওপারে চারজন অচেনা ঘোড়সওয়ারকে দেখেছি। নদী পার হয়ে এপারে এসেছে। ফেরিঘাটে তারা বেশিক্ষণ দাঁড়ায়নি। কারও সঙ্গে কথাও বলেনি।&quot;

এলি জিজ্ঞেস করল, &quot;শহরের দিকে এসেছিল?&quot;

&quot;না।&quot;

&quot;তাহলে?&quot;

লোকটা উত্তর দিল, &quot;নদীর ধার ধরে উত্তর-পশ্চিমের পুরোনো পথ ধরে চলে গেছে। যে পথ দিয়ে সাধারণ মানুষ খুব কমই যাতায়াত করে।&quot;

লারসেনের চোখ সরু হয়ে এল। &quot;তুমি নিশ্চিত?&quot;

লোকটা দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল। &quot;আমি তাদের যথেষ্ট দূর থেকে অনুসরণ করেছি। তারা বারবার পেছনে তাকাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ অনুসরণ করছে কি না, সেটা যাচাই করছে। পরে আর ঝুঁকি নিইনি।&quot;

এলি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল, &quot;চেহারা চিনতে পেরেছ?&quot;

লোকটা মাথা নেড়ে বলল, &quot;না। সবাই টুপির কিনারা নিচু করে রেখেছিল। দুজনের মুখে দাড়ি ছিল। একজনের ডান গালে পুরোনো কাটা দাগ দেখেছি। আর একটা জিনিস মনে আছে।&quot;

&quot;কী?&quot;

&quot;চারজনের ঘোড়াই খুব ভালো মানের। পথের ডাকাতদের ঘোড়া এমন হয় না। আর তাদের জিনিসপত্রও সস্তা নয়।&quot;

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তাকিয়ে সে যেন নিজের মনেই হিসাব কষছিল। সাধারণ ডাকাত হলে শহরে ঢুকত। সরাইখানায় খেত, মদের দোকানে যেত, কারও সঙ্গে ঝগড়া করত। কিন্তু এরা সেসব কিছুই করছে না। তারা শহরকে এড়িয়ে চলছে। তার মানে তাদের লক্ষ্য অন্য কোথাও।

এলি নিচু গলায় বলল, &quot;আমি লোক পাঠাতে পারি। কিন্তু তারা এখন কোথায় আছে, সেটা কেউ জানে না।&quot;

লারসেন জানালা থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, &quot;লোক পাঠিয়ো না।&quot;

এলি বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল। &quot;কেন?&quot;

&quot;কারণ তারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে না। তারা অপেক্ষা করছে। তুমি যদি এখন লোক পাঠাও, তারা অদৃশ্য হয়ে যাবে। তারপর মাসের পর মাস আর কোনো চিহ্ন পাওয়া যাবে না।&quot;

এলি কিছুক্ষণ ভেবে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। সে জানে, প্রেইরির জীবন সম্পর্কে ওলফ লারসেনের অভিজ্ঞতা তার চেয়ে অনেক বেশি।

লারসেন এবার ফিরে দাঁড়াল। &quot;আমার লোকেরা নজর রাখবে। তবে তারা কাউকে অনুসরণ করবে না। শুধু দেখবে, মনে রাখবে, আর খবর দেবে।&quot;

এলি বলল, &quot;আমিও শহরের ভেতরে খোঁজ চালিয়ে যাব। এরা যদি কোনো ভুল করে, আমরা সেটা ধরব।&quot;

টহলদার লোকটা টুপিটা আবার মাথায় পরে নিল। সে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই এলি তাকে থামাল।

&quot;ফেরিঘাটে ফিরে যাও। কিন্তু কাউকে কিছু বলবে না। মানুষ অকারণে ভয় পেলে আমাদের কাজ আরও কঠিন হবে।&quot;

লোকটা সংক্ষিপ্তভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে বেরিয়ে গেল। ডেপুটি মার্শাল আবার দরজা টেনে বন্ধ করে বাইরে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।

ঘরের ভেতরে ওলফ লারসেন আর এলি ব্রুকস আর কোনো কথা বলল না। তাদের দুজনেরই মনে একই প্রশ্ন ঘুরছিল। চারজন অচেনা ঘোড়সওয়ার কি শুধু পথ যাচাই করছে, নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো দল রয়েছে?

ঠিক সেই সময়, বহু মাইল দূরে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে মারদেকা আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে একে একে ঘোড়াগুলোর শরীরে ব্রাশ চালাচ্ছিল। দিনের আলো ধীরে ধীরে প্রখর হয়ে দুপুরের কোলে আছড়ে পড়ার পায়তারা করছিল। সে জানে না, এই মুহূর্তে ব্ল্যাক রিভারে তার ভবিষ্যৎকে ঘিরে প্রথম সত্যিকারের তদন্ত শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ভাগ্য অদ্ভুতভাবে নিজের পথ তৈরি করে। অচেনা চারজন ঘোড়সওয়ার, একজন অভিজ্ঞ মার্শাল, একজন দূরদর্শী র&#x200d;্যাঞ্চ মালিক, আর প্রেইরির এক কিশোর ছেলেকে ঘিরে যে অদৃশ্য সুতো বোনা শুরু হয়েছে, খুব শিগগিরই সেই সুতোগুলো এক জায়গায় এসে মিলবে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/260546/</link>
				<pubDate>Wed, 12 Aug 2026 03:39:12 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–আট<br />
ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশের বিশাল প্রেইরিটা ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করল। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের ডগায় সূর্যের আলো পড়ে অসংখ্য কাচের টুকরোর মতো ঝিকমিক করছে। দূরের টিলাগুলো নীলচে কুয়াশার আড়ালে আধো দেখা যাচ্ছে। কোথাও একটা কোয়েল ডেকে উঠল, তারপর আবার চারদিকে নেমে এল গভীর নিস্তব্&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-260546"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/260546/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">1ef1b3516f75dd87ac2e2e8a29fd3db6</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়-সাত
পরদিন ভোরে র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে ছিল। সূর্যের প্রথম আলো পাহাড়ের কাঁধ ছুঁয়ে তৃণভূমির ওপর ছড়িয়ে পড়লেও অন্য দিনের মতো কোথাও হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। আস্তাবলের সামনে ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তাদের পরিচর্যা করতে আসা কাউবয়দের মুখে আজ অদ্ভুত গাম্ভীর্য। যেন রাতের অন্ধকার পুরোপুরি সরে গেলেও তার সঙ্গে ভয়টা কোথাও যায়নি। আগের সন্ধ্যায় ব্ল্যাক রিভার শহর থেকে ফিরে আসার পর থেকে সবাই জানে, অদৃশ্য কোথাও একটা ঝড় জমছে। পশ্চিমের চরাগাহের শুকনো ঘাসের ভেতর যে বার্তা রেখে আসা হয়েছে, তাতে এটা তো পরিস্কার, হুমকিটা মিথ্যা নয়। আর সেই কারণেই আজ সকাল থেকে র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক।

মারদেকার ঘুম ভাঙল ঘোড়ার ক্ষীণ হ্রেষাধ্বনিতে। কয়েক মাস আগেও এমন শব্দ তার কাছে ছিল সম্পূর্ণ অচেনা, অথচ এখন এই শব্দেই তার সকাল শুরু হয়। বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সে দেখল উঠোনে বাড হিগিন্স, ক্লে মরগান আর রুবেন কোল নিচু গলায় কথা বলছে। তাদের কথার অর্থ সে পুরোপুরি বুঝতে পারে না, কিন্তু মুখের ভাব বুঝতে তার আর অসুবিধা হয় না। আগের দিনের সেই শহর ভ্রমণের আনন্দ যেন রাতারাতি কোথায় মিলিয়ে গেছে। কাল পর্যন্ত যে মানুষগুলো হেসে কথা বলছিল, আজ তাদের চোখে শুধু হিসাব আর সতর্কতা।

ঘর থেকে বেরিয়ে সে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। রান্নাঘরের দরজা খোলা। ভেতরে ইলাই আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে সকালের নাস্তার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বড় লোহার প্যানে বেকনের টুকরো ভাজা হচ্ছে। পাশে কফির পাত্র থেকে ধোঁয়া উঠছে। আরেক পাশে ওভেন থেকে সদ্য বের করা রুটির গন্ধ পুরো ঘর ভরে দিয়েছে। ইলাই বয়সে বৃদ্ধ হলেও তার চলাফেরায় কোনো অস্থিরতা নেই। বহু বছরের অভ্যাসে সে একা হাতে সব সামলে নেয়। কখন রুটি নামাতে হবে, কখন কফি ঢালতে হবে, কখন ডিম উল্টে দিতে হবে, সব যেন না দেখেই জানে। মারদেকাকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে মৃদু হেসে হাতের ইশারায় ভেতরে ডাকল। তারপর কাঠের টেবিলের ওপর রাখা একটা প্লেট তার সামনে এগিয়ে দিল। কয়েক মাস আগেও এই ছেলেটা ক্ষুধা পেলে কীভাবে খাবার চাইতে হয় জানত না। এখন সে নিজের জায়গায় চুপচাপ বসে অপেক্ষা করে। এই ছোট্ট পরিবর্তনটুকুও ইলাইয়ের চোখ এড়ায় না।

খেতে খেতে মারদেকা বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছিল। উঠোনে দাঁড়িয়ে ওলফ লারসেন এক এক করে সবার সঙ্গে কথা বলছে। কখনো আস্তাবলের দিকে ইশারা করছে, কখনো দক্ষিণের চারণভূমির দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন কাউবয় ঘোড়ায় চড়ে উত্তর দিকের বেড়া পরীক্ষা করতে বেরিয়ে গেল। আরেকজন পশ্চিমের পাহাড়মুখী পথ ধরে চলে গেল। র&#x200d;্যাঞ্চে এমন টহল আগে সে দেখেনি। গতকাল শহরে যাওয়ার সময় যে আনন্দ আর কৌতূহল তার চোখে ছিল, আজ তার জায়গা নিয়েছে এক অদ্ভুত অস্বস্তি। সে বুঝতে পারছে, বড়রা এমন কিছুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার আকার সে এখনও কল্পনাও করতে পারে না।

নাস্তা শেষ করে ইলাই তাকে নিয়ে পড়ার ঘরে গেল। টেবিলের ওপর স্লেট, চক আর কয়েকটা পুরোনো বই রাখা। কিন্তু আজ ইলাইয়ের মনও যেন পুরোপুরি পড়াশোনায় নেই। মাঝেমধ্যে সে জানালার বাইরে তাকাচ্ছে। মারদেকাও সেটা লক্ষ্য করল। তারপরও পড়া বন্ধ হলো না। ইলাই ধীরে ধীরে নতুন কয়েকটা শব্দ লিখে দেখাল। Gate, Fence, North, South। প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করে আবার আঙুল তুলে বাইরের কোনো না কোনো দিক দেখিয়ে দিল। মারদেকা প্রথমে বুঝতে পারছিল না কেন আজ এসব শেখানো হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর তার মনে হলো, হয়তো র&#x200d;্যাঞ্চের কাজের জন্যই এই শব্দগুলো দরকার। সে মন দিয়ে উচ্চারণ করতে লাগল। ভুল হলো, আবার বলল। আবার ভুল হলো, তবু থামল না। ইলাই সন্তুষ্ট চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। এই ছেলেটার সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রতিভা নয়, তার অধ্যবসায়।

দুপুরের দিকে বাড হিগিন্স দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ইলাইয়ের সঙ্গে দু একটা কথা বলার পর সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় বাইরে ডাকল। মারদেকা স্লেটটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল। দরজার বাইরে বেরোতেই সে দেখল আস্তাবলের সামনে ইতিমধ্যে কয়েকটা জিন, দড়ি আর নতুন করে তেল মাখানো লাগাম সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বাডের মুখে আগের মতোই সেই সংযত কঠোরতা, কিন্তু চোখে আজ বাড়তি দায়িত্বের ছাপ। মনে হলো, আজকের শিক্ষা অন্য দিনের মতো হবে না। আজ থেকে তাকে শুধু কাজ শেখানো হবে না, শেখানো হবে সতর্ক থাকতে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে মারদেকা বুঝতে না পারলেও, তার জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল।

মারদেকা স্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে বাড হিগিন্সের পেছন পেছন বাইরে বেরিয়ে এল। উঠোন পেরিয়ে দুজনে ধীরে ধীরে উত্তর দিকের চারণভূমির দিকে হাঁটতে লাগল। সকালটা পরিষ্কার। আকাশে একটাও মেঘ নেই। দূরের পাহাড়গুলো নীলচে কুয়াশার আড়াল থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাতাসে শুকনো ঘাসের গন্ধ। চারদিকে সবকিছু আগের মতোই শান্ত দেখাচ্ছে। কিন্তু সেই শান্তির ভেতরেও আজ যেন একটা চাপা টানটান ভাব লুকিয়ে আছে। গত সন্ধ্যার সেই অজ্ঞাত হুমকির পর থেকে র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি মানুষ বুঝে গেছে, এখন আর শুধু কাজ জানলেই চলবে না, চারপাশও দেখতে জানতে হবে।

বাড খুব বেশি কথা বলল না। সে মাঝে মাঝে থামছে, চারদিকে তাকাচ্ছে, আবার হাঁটছে। মারদেকাও তার প্রতিটি ভঙ্গি অনুসরণ করছে। কিছুদূর গিয়ে বাড একটা উঁচু টিলার ওপর উঠে দাঁড়াল। সেখান থেকে র&#x200d;্যাঞ্চের প্রায় অর্ধেকটা চোখে পড়ে। আস্তাবল, গরুর খোঁয়াড়, উত্তর দিকের বেড়া, আরও দূরে শহরের শেষ মাথার কয়েকটা ছাদ, সব একসঙ্গে দেখা যায়। বাড ধীরে ধীরে চারদিকে হাত ঘুরিয়ে দেখাল। তারপর নিজের দুই চোখের দিকে আঙুল ছুঁইয়ে আবার চারপাশের দিকে ইশারা করল।

মারদেকা বুঝতে পারল, আজ তাকে কোনো নতুন কাজ শেখানো হচ্ছে না। শেখানো হচ্ছে কীভাবে দেখতে হয়।

পাহাড়ের গ্রামে বড় হওয়ার কারণে এই শিক্ষাটা তার কাছে পুরোপুরি নতুনও নয়। ছোটবেলায় শিকারে বের হলে গ্রামের প্রবীণরা বলত, যে শুধু সামনে তাকায়, সে শিকার হারায়; যে চারপাশ দেখে, সেই বেঁচে ফিরে আসে। সেই কথাগুলো হঠাৎ মনে পড়ে গেল তার। সে ধীরে ধীরে চারদিকে তাকাতে শুরু করল। বাতাসে ঘাস কোন দিকে দুলছে, কোথায় কাক উড়ছে, কোন ঝোপে খরগোশ লুকিয়ে আছে, কোন পথে গরুর পাল যাচ্ছে, সবকিছু আলাদা করে খেয়াল করতে লাগল।

বাড কিছুক্ষণ তাকে লক্ষ্য করল। তারপর উত্তর দিকের বেড়ার দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে সে কোনো কথা না বলে একটা খুঁটির গায়ে হাত রাখল। খুঁটিটা শক্ত। তারপর পাশের খুঁটিতে হাত দিল। সেটাও ঠিক আছে। কিন্তু তৃতীয় খুঁটির কাছে গিয়ে সে থেমে গেল। কাঠের গায়ে খুব সূক্ষ্ম একটা আঁচড়। নতুন। যেন ধারালো কিছু একটা ঘষে গেছে। আঁচড়টা এতই ছোট যে না দেখালে চোখেই পড়ত না। বাড আঙুল দিয়ে দাগটা দেখাল।

মারদেকা কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ল। কিছুক্ষণ দাগটার দিকে তাকিয়ে থেকে তার চোখ চলে গেল নিচের মাটিতে। সেখানে শুকনো ধুলোর ওপর খুব সামান্য চাপা পড়ার চিহ্ন। মানুষের পায়ের ছাপ স্পষ্ট নয়, কিন্তু ঘাসের মাথাগুলো একদিকে বেঁকে আছে। সে ধীরে ধীরে কয়েক পা এগিয়ে গেল। আরও একটু দূরে একটা ভাঙা ডাল পড়ে আছে। ডালটা শুকনো হলেও ভাঙার জায়গাটা এখনো ফ্যাকাশে সাদা। অর্থাৎ খুব বেশিদিন আগে ভাঙেনি। সে নিচু হয়ে ডালটা তুলে বাডকে দেখাল।

বাড ডালটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখল। তারপর চারপাশে চোখ বুলিয়ে আবার মাটির দিকে তাকাল। এবার তার মুখের ভাব আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নয়, কিন্তু এতগুলো ছোট ছোট লক্ষণ একসঙ্গে কখনোই অবহেলা করার মতো নয়। কেউ একজন এই দিকটায় এসেছিল। হয়তো শুধু দেখে গেছে। হয়তো আরও কিছু করার সুযোগ খুঁজেছে।

ফিরে আসার পথে বাড একবারও কোনো কথা বলল না। কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে গেছে। আর মারদেকাও বুঝতে পারছিল, আজকের সকালটা অন্য দিনের মতো শেষ হয়নি। সে প্রথমবার উপলব্ধি করল, র&#x200d;্যাঞ্চ পাহারা দেওয়া মানে শুধু বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা নয়। তারও আগে দরকার চোখ খোলা রাখা। কারণ পশ্চিমের এই দেশে অনেক সময় বিপদ বন্দুকের গুলির শব্দ করে আসে না। নিঃশব্দে এসে চারপাশে নিজের উপস্থিতির ছোট ছোট চিহ্ন রেখে যায়। আর যে মানুষ সেই চিহ্ন পড়তে পারে, সে অনেক সময় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই শত্রুর খবর পেয়ে যায়।

র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরে তারা দেখল ওলফ লারসেন উঠোনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। বাড সংক্ষেপে সব কথা জানিয়ে দিল। লারসেন মন দিয়ে শুনল। তারপর একবার মারদেকার দিকে তাকাল। ছেলেটা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার চোখে আজ নতুন একটা পরিবর্তন স্পষ্ট। কয়েক মাস আগে সে শুধু আশ্রয়প্রার্থী ছিল। এখন সে ধীরে ধীরে এই র&#x200d;্যাঞ্চের চোখ হয়ে উঠতে শিখছে। আর ওলফ লারসেনের মনে প্রথমবারের মতো দৃঢ়ভাবে জন্ম নিল একটি ভাবনা, সময় এলে এই ছেলেটাকে শুধু রক্ষা করলেই হবে না, তাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন একদিন সে নিজেই এই ভূমিকে রক্ষা করতে পারে।

বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। পশ্চিমের আকাশে সূর্যটা ঢলে পড়েছে, তবু তার শেষ আলো র&#x200d;্যাঞ্চের বিস্তীর্ণ তৃণভূমির ওপর তামাটে আভা ছড়িয়ে রেখেছে। উঠোনের একপাশে কয়েকটা ঘোড়া মাথা নিচু করে শুকনো খড় চিবোচ্ছে। আস্তাবলের চালের নিচে ঝুলে থাকা চামড়ার জিন আর লাগামগুলো সোনালি আলোয় চকচক করছে। দূরে গরুর পাল ফিরিয়ে আনছে দুজন কাউবয়। বাতাসে ধুলোর সঙ্গে মিশে আছে শুকনো ঘাস, ঘোড়ার ঘাম আর কাঠের গন্ধ। সবকিছুই যেন আগের মতো স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই কোথাও একটা অদৃশ্য টান তৈরি হয়েছে। দুপুরে নদীর ধারে পাওয়া সেই অচেনা খুরের দাগ যেন সবার মনে অজান্তেই একটা রেখা টেনে দিয়েছে।

ওলফ লারসেন কোনো কথা না বলে কিছুক্ষণ উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ একবার করে সবার মুখের ওপর ঘুরে গেল। ক্লে মরগান, বাড হিগিন্স, মিগুয়েল, হ্যাঙ্ক, রুবেন, তারপর এসে থামল মারদেকার ওপর। ছেলেটা অন্যদের থেকে একটু পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে এখনো সেই দড়িটা, যেটা দিয়ে সে দুপুরে নদীর ধারে একটা ভাঙা বেড়ার খুঁটি টেনে সোজা করেছিল। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখ দুটো সতর্ক। যেন চারপাশের প্রতিটি শব্দ সে আলাদা করে শুনছে।

লারসেন ধীরে ধীরে বলল, &quot;আজ থেকে পাহারা বদলাবে।&quot; কথাটা শুনেই সবাই তার দিকে তাকাল। &quot;এখন থেকে রাতে দুজন করে পাহারা দেবে। একজন উত্তর দিক দেখবে, আরেকজন নদীর দিক। দিনের বেলায়ও যে যেখানে কাজ করবে, আশপাশে নজর রাখবে। কোনো অচেনা খুরের দাগ, ভাঙা বেড়া, অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে। অনুমান নয়, প্রমাণ চাই।&quot;

কেউ কোনো প্রশ্ন করল না। র&#x200d;্যাঞ্চের লোকেরা জানে, ওলফ লারসেন অকারণে নিয়ম বদলায় না। তার সিদ্ধান্তের পেছনে সবসময় কারণ থাকে। বাড মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ক্লে শুধু বলল, &quot;আজ রাত থেকেই শুরু করছি।&quot; মিগুয়েল চুপচাপ নদীর দিকের পাহারার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিল। হ্যাঙ্ক কিছু না বলেই আস্তাবলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। সে জানে, রাতে বেরোতে হলে ঘোড়াগুলোও প্রস্তুত রাখতে হবে।

এই সবকিছু মারদেকা নীরবে দেখছিল। কথাগুলোর অর্ধেকও সে বুঝতে পারছে না। কিন্তু মানুষের মুখের ভাব, চোখের ভাষা, শরীরের ভঙ্গি, এগুলো বোঝার ক্ষমতা তার অনেক আগেই তৈরি হয়েছে। সে বুঝল, আজ থেকে কিছু একটা বদলে গেছে। র&#x200d;্যাঞ্চের মানুষগুলো আগের মতো নিশ্চিন্ত নেই।

সন্ধ্যার খাবারের সময়ও সেই পরিবর্তনটা টের পাওয়া গেল। বড় টেবিলের চারপাশে সবাই বসেছে, ইলাই নিজের হাতে রান্না করা গরম স্ট্যু আর রুটি পরিবেশন করছে। অন্যদিন এই সময় দু একজন হেসে গল্প করে, দিনের কাজের হিসাব দেয়, কেউ ঘোড়ার কথা বলে, কেউ গরুর। আজ কথাবার্তা কম। শুধু প্রয়োজনীয় কথাই হচ্ছে। ইলাইও সেটা বুঝতে পারল। বৃদ্ধ একবার লারসেনের দিকে তাকাল। লারসেন মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে খাচ্ছে। তার চোখে সেই গভীর চিন্তার ছায়া, যেটা ইলাই বহু বছর ধরে চেনে।

খাওয়া শেষ হওয়ার পর ইলাই মারদেকাকে নিয়ে পড়ার ঘরে গেল। সেদিনের পাঠ ছিল কয়েকটা নতুন শব্দ। &quot;River&quot;, &quot;Fence&quot;, &quot;North&quot;, &quot;Watch&quot;। বৃদ্ধ প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করে বোঝাতে লাগল। মারদেকা মন দিয়ে শুনল, বারবার বলল, আবার লিখল। হঠাৎ &quot;Watch&quot; শব্দটা শুনে তার মনে বিকেলের দৃশ্যটা ভেসে উঠল। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বাড আর মিগুয়েলের সতর্ক চোখ, লারসেনের কঠিন মুখ, সবার নীরবতা। শব্দের অর্থ সে পুরো বুঝল না, কিন্তু অনুভব করল, এই শব্দটার সঙ্গে আজকের দিনের একটা সম্পর্ক আছে।

রাত অনেকটা নেমে এলে র&#x200d;্যাঞ্চ ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দূরের প্রান্তরে কায়োটের দীর্ঘ ডাক ভেসে এল। আকাশজুড়ে অসংখ্য তারা। উঠোনের মাঝখানে একটা কেরোসিনের লণ্ঠন জ্বলছে। তার হলুদ আলোয় ছায়াগুলো আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। মারদেকা ঘুমোতে যাওয়ার আগে অভ্যাসমতো বারান্দায় এসে দাঁড়াল। কয়েক মাস আগেও সে পাহাড়ের চূড়া থেকে দূরের শহরের আলো দেখত। এখন সে দাঁড়িয়ে আছে সেই র&#x200d;্যাঞ্চের বারান্দায়, যেটা তার নতুন ঘর হয়ে উঠেছে।

ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল একটা দৃশ্য। উত্তর দিকের বেড়ার পাশে ক্লে মরগান ঘোড়ায় চড়ে ধীরে ধীরে টহল দিচ্ছে। অন্যদিকে নদীর পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে মিগুয়েল। দুজনের হাতেই রাইফেল। আগে কখনো সে রাতের বেলা এমন পাহারা দেখেনি। তার মনে প্রশ্ন জাগল, কিন্তু জিজ্ঞেস করার মতো ভাষা এখনো সে শেখেনি।

সে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুতভাবে তার মনে হলো, এই র&#x200d;্যাঞ্চটা যেন আজ আর আগের মতো নিশ্চিন্ত নেই। কোথাও কেউ আছে। দেখা যাচ্ছে না, তবু আছে। সেই অদৃশ্য উপস্থিতি বাতাসের ভেতরেও যেন অনুভব করা যায়।

আর বহু দূরে, ব্ল্যাক রিভারের পশ্চিম প্রান্তের অন্ধকারে, দুটি ঘোড়া কোনো শব্দ না করে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছিল। তাদের আরোহীরা র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে আসছিল না। তারা শুধু দূরের উঁচু টিলা থেকে একবার লারসেনের জমির দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত নীরবে পর্যবেক্ষণ করল। তারপর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে আবার অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল। তারা কোনো চিহ্ন রেখে গেল না। কোনো গুলি ছোড়েনি। কোনো বেড়া কাটেনি। কিন্তু সেদিন রাতেই প্রথমবারের মতো শিকারি আর শিকারের মাঝখানের দূরত্ব আরও একটু কমে এল।

পরদিন ভোরে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর আবারও একটি নতুন দিনের সূচনা হলো। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের প্রথম আলো ফুটতেই রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের মাথাগুলো সোনালি ঝিলিক ছড়িয়ে উঠল। দূরের পাহাড়গুলো তখনও হালকা কুয়াশার আবরণে ঢাকা। আস্তাবল থেকে ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি ভেসে আসছে, গরুর ঘণ্টা ধীরে ধীরে বেজে উঠছে, আর ইলাই রান্নাঘরের চুলায় শুকনো ওক কাঠ জ্বালিয়ে সকালের নাশতার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাইরে থেকে সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক মনে হলেও র&#x200d;্যাঞ্চের ভেতরের পরিবেশে অদৃশ্য একটা পরিবর্তন এসে গেছে। আগের মতো কেউ আর নিশ্চিন্তে কাজ করছে না। প্রত্যেকের চোখ মাঝেমধ্যে অকারণেই র&#x200d;্যাঞ্চের সীমানার দিকে চলে যাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে দূরের টিলায় দেখা সেই দুই অচেনা ঘোড়সওয়ার যেন কাউকে কিছু না বলেও সবার মনে একটি সতর্ক সংকেত রেখে গেছে।

নাশতা শেষ করেই ওলফ লারসেন সবাইকে উঠোনে ডেকে পাঠাল। ক্লে মরগান, বাড হিগিন্স, মিগুয়েল, রুবেন কোল, হ্যাঙ্ক ডসন, সবাই এসে দাঁড়াল। মারদেকাও একটু দূরে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। লারসেন শান্ত গলায় বলল, আজ থেকে র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি সীমানা নতুন করে পরীক্ষা করা হবে। উত্তর দিকের নদীর পাড়, পশ্চিমের টিলা, দক্ষিণের চারণভূমি, সব জায়গা প্রতিদিন ঘুরে দেখতে হবে। কেউ একা বের হবে না। সন্ধ্যার আগেই সবাই ফিরবে। তার কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা ছিল না, কিন্তু এতদিন যারা তার সঙ্গে কাজ করেছে, তারা জানে এই স্বরই সবচেয়ে বিপজ্জনক। ওলফ লারসেন কখনো অকারণে ভয় পায় না। তাই সে যখন সতর্ক হয়, তখন অন্যরাও বুঝে নেয়, বিষয়টা হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সেদিন বাড হিগিন্স মারদেকাকে সঙ্গে নিয়েই দক্ষিণের বেড়া ধরে বেরোল। কয়েক মাস আগেও ছেলেটা শুধু তাদের কাজ দেখত। এখন সে নিজেও কাজের অংশ হয়ে উঠেছে। বাড তাকে নতুন কোনো কৌশল শেখাল না। বরং এতদিন যা শিখেছে, সেগুলো বাস্তবে খেয়াল করতে বলল। কোথাও বেড়ার তার ঢিলে হয়েছে কি না, কোথাও খুঁটির গোড়ার মাটি নরম হয়েছে কি না, কোথাও শুকনো ঘাস অস্বাভাবিকভাবে চ্যাপ্টা হয়ে আছে কি না, সবকিছুই লক্ষ্য করতে বলল। মারদেকা ধীরে ধীরে হাঁটছিল। মাঝেমধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে মাটির দিকে তাকাচ্ছিল, শুকনো ডাল সরিয়ে দেখছিল, আবার উঠে দাঁড়াচ্ছিল। সে এখনো মিগুয়েলের মতো দক্ষ ট্র্যাকার নয়, কিন্তু তার ভেতরে পর্যবেক্ষণের অভ্যাস জন্মাতে শুরু করেছে। বাড সেটা লক্ষ্য করছিল। সে বুঝতে পারছিল, ছেলেটা আর শুধু নির্দেশ পালন করছে না, নিজের চোখ দিয়েও পৃথিবীকে পড়তে শিখছে।

দুপুরের দিকে তারা র&#x200d;্যাঞ্চে ফিরে এলো। ইলাই তখন বারান্দার ছায়ায় বসে মারদেকার জন্য স্লেট আর বই সাজিয়ে রেখেছে। কয়েক ঘণ্টা ধরে অক্ষর আর ছোট ছোট শব্দ নিয়ে পড়াশোনা চলল। আগের তুলনায় এখন সে অনেক সহজে শব্দ চিনতে পারে। মাঝে মাঝে ভুল করে, আবার নিজেই সেটা ঠিক করার চেষ্টা করে। ইলাই তাকে কখনো তাড়া দেয় না। তার বিশ্বাস, যে ছেলে ধৈর্য ধরে পাহাড় পেরিয়ে নতুন জীবন খুঁজে নিতে পারে, সে একদিন বইয়ের পাতার ভেতর থেকেও নিজের পথ খুঁজে নেবে।

বিকেলের শেষ ভাগে সূর্যের আলো একটু নরম হয়ে এলে র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে হঠাৎ এক ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে উঠল। সবাই স্বাভাবিকভাবেই মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। ধুলোমাখা একটি বাদামি ঘোড়া দ্রুত এগিয়ে এসে প্রধান বাড়ির সামনে থামল। ঘোড়া থেকে নামল ব্ল্যাক রিভারের ডেপুটি মার্শাল। লোকটিকে দেখে লারসেন সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল। বহুবার শহরে গেলে তার সঙ্গে দেখা হয়েছে। 

সে টুপি খুলে সম্মান জানিয়ে বলল, &quot;মার্শাল এলি ব্রুকস আপনাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শহরে যেতে বলেছেন।&quot;

লারসেন স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। &quot;কী হয়েছে?&quot;

ডেপুটি মার্শাল মাথা নেড়ে বলল, &quot;মার্শাল বিস্তারিত কিছু বলেননি। শুধু বলেছেন, বিষয়টা আপনার নিজের কানে শোনা দরকার।&quot;

লারসেন আর কোনো প্রশ্ন করল না। এলি ব্রুকসকে সে বহু বছর ধরে চেনে। মানুষটা অকারণে কাউকে খবর পাঠায় না। বিশেষ করে নিজের ডেপুটিকে র&#x200d;্যাঞ্চ পর্যন্ত পাঠানোর প্রয়োজন সে তখনই মনে করবে, যখন শহরের ভেতরে এমন কিছু ঘটেছে, যার ছায়া শহরের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরেও পড়তে পারে। এই কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট ঘটনাগুলো একে একে লারসেনের মনে ফিরে এল। রাতের অচেনা ঘোড়সওয়ার, বেড়ার বাইরে পাওয়া অস্বাভাবিক চিহ্ন, শহরে কিছু মানুষের অদ্ভুত নড়াচড়া। এতদিন পর্যন্ত এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন যেন অদৃশ্য সুতোয় সবকিছু এক জায়গায় বাঁধা পড়তে শুরু করেছে।

ডেপুটি মার্শাল চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ উঠোনে নীরবতা নেমে রইল। বাতাসে শুকনো ঘাস দুলছে। দূরে গরুর পাল ধীরে ধীরে পানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। লারসেন অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত বলল, &quot;কাল সকালে আমি ব্ল্যাক রিভারে যাব।&quot;

শুধু একটি বাক্য। কিন্তু সেই বাক্য শুনেই বাড, ক্লে আর মিগুয়েল একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল। তাদের কারও মুখে প্রশ্ন নেই। কারণ তারা জানে, ওলফ লারসেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব দিক ভেবেই নেয়।

মারদেকা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। কথোপকথনের বেশিরভাগই সে বুঝতে পারেনি। কিন্তু একটি শব্দ আবার তার কানে স্পষ্ট ধরা পড়ল। ব্ল্যাক রিভার।

কয়েক মাস আগে সেই শহরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েই তার জীবনের মোড় ঘুরেছিল। এখন আবার সেই শহরের নাম উচ্চারিত হচ্ছে, কিন্তু এবারের স্বর সম্পূর্ণ আলাদা। এতে বিস্ময়ের চেয়ে সতর্কতার সুর বেশি। সে বুঝতে পারছিল না কী ঘটতে চলেছে, কিন্তু অনুভব করছিল, র&#x200d;্যাঞ্চের মানুষগুলোর চোখে যে অদৃশ্য সতর্কতা নেমে এসেছে, তার সঙ্গে ব্ল্যাক রিভারের কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে।

পশ্চিমের আকাশে তখন সূর্য ধীরে ধীরে লাল হয়ে নামছে। দীর্ঘ ছায়া এসে পড়েছে র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে। সেই ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে মারদেকা নীরবে শহরের দিকেই তাকিয়ে রইল। সে জানত না, পরদিন ওলফ লারসেন ব্ল্যাক রিভারে গিয়ে কী শুনবে। কিন্তু ভাগ্য যেন অদৃশ্য হাতে ধীরে ধীরে সব গুটি সাজিয়ে ফেলছে। আর সেই খেলায় মারদেকা, ওলফ লারসেন, ব্ল্যাক রিভার এবং অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা অজানা শত্রুর পথ খুব শিগগিরই প্রথমবারের মতো এক বিন্দুতে এসে মিলিত হবে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/260278/</link>
				<pubDate>Tue, 11 Aug 2026 05:45:53 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়-সাত<br />
পরদিন ভোরে র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে ছিল। সূর্যের প্রথম আলো পাহাড়ের কাঁধ ছুঁয়ে তৃণভূমির ওপর ছড়িয়ে পড়লেও অন্য দিনের মতো কোথাও হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। আস্তাবলের সামনে ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তাদের পরিচর্যা করতে আসা কাউবয়দের মুখে আজ অদ্ভুত গাম্ভীর্য। যেন রা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-260278"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/260278/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">7ea520a86b77ff63caf3523ae690af32</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–ছয়
পরদিন ভোরে ব্ল্যাক রিভারের ওপর হালকা কুয়াশার চাদর নেমে ছিল। নদীর দিক থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাস শুকনো ঘাসের মাথাগুলোকে আস্তে আস্তে দুলিয়ে দিচ্ছিল। পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে, কিন্তু র&#x200d;্যাঞ্চের বিস্তীর্ণ তৃণভূমির ওপর এখনো রাতের শিশির ঝলমল করছে। দূরে গরুর পাল নিঃশব্দে ঘাস খাচ্ছে। মাঝেমধ্যে কোনো বাছুর মায়ের ডাক শুনে মাথা তুলে তাকাচ্ছে, আবার ঘাসের ভেতর মুখ নামিয়ে দিচ্ছে। আস্তাবলের সামনে ঘোড়াগুলোও একে একে জেগে উঠেছে। কেউ খুর দিয়ে মাটি আঁচড়াচ্ছে, কেউ দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ তুলে মাথা ঝাঁকাচ্ছে। এই দৃশ্য এখন আর মারদেকার কাছে নতুন নয়। কয়েক মাস আগেও প্রতিটি সকাল তাকে বিস্মিত করত, কিন্তু আজ সে জানে, সূর্য ওঠার আগেই এই র&#x200d;্যাঞ্চের জীবন শুরু হয়ে যায়। পশ্চিমের মানুষ দিনের আলোকে কখনো অপচয় করে না।

গতকালের শহর-ভ্রমণের স্মৃতি এখনো তার চোখের ভেতর ভাসছে। ব্ল্যাক রিভারের দোকানগুলো, মানুষের ভিড়, গরম রুটির গন্ধ, খেলনার দোকানের কাঁচের ভেতর রাখা ছোট্ট কাঠের ঘোড়া, সবকিছু যেন রাতে ঘুমের মধ্যেও তাকে অনুসরণ করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শহরের চাকচিক্য তাকে র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়নি। বরং আজ সকালে উঠোনে পা রাখতেই তার মনে হলো, এটাই তার নিজের জায়গা। সে অভ্যাসমতো প্রথমে আস্তাবলের দিকে গেল। দরজা খুলতেই ভেতর থেকে উষ্ণ নিশ্বাসের সঙ্গে খড়ের গন্ধ এসে লাগল মুখে। সারি সারি ঘোড়া শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে কয়েকটা তাকে দেখেই কান খাড়া করল। বাদামি রঙের বুড়ো ঘোড়াটা, যেটার জিন বাঁধা সে প্রথম শিখেছিল, মাথা বাড়িয়ে তার কাঁধে নাক ছুঁইয়ে দিল। মারদেকা হেসে তার কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। ভাষা আলাদা হলেও মানুষ আর প্রাণীর মধ্যে যে বিশ্বাস জন্মাতে পারে, সেটা সে ধীরে ধীরে নিজের জীবন দিয়েই শিখছে।

বাইরে বেরোতেই বাড হিগিন্স তাকে দেখে মাথা নেড়ে ডাকল। এখন আর আগের মতো বেশি ইশারা করতে হয় না। মারদেকা অনেক শব্দ শিখে ফেলেছে। পুরো বাক্য বলতে পারে না, কিন্তু ছোট ছোট নির্দেশ বুঝতে পারে। বাড মাটিতে রাখা দুটি খালি পানির বালতির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, &quot;ওয়াটার।&quot; মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে বালতি দুটো তুলে কূপের দিকে হাঁটল। কাজটা খুব কঠিন নয়, কিন্তু সহজও নয়। বালতি ভরে ফিরতে ফিরতে তার হাত টনটন করতে লাগল। তবু সে থামল না। কারণ সে বুঝে গেছে, এই র&#x200d;্যাঞ্চে কাউকে আলাদা করে মূল্য দেওয়া হয় না। এখানে যে যত ভালো কাজ করে, তার মূল্য ততই বাড়ে।

সকাল গড়াতে গড়াতে তার হাতে আরও ছোট ছোট কাজ এসে জমল। কোথাও শুকনো খড় এনে রাখতে হলো, কোথাও ভাঙা বেড়ার পাশে নতুন খুঁটি টেনে দিতে হলো, কোথাও আবার দড়ি গুছিয়ে ঝুলিয়ে রাখতে হলো। কয়েক মাস আগেও যেসব জিনিস তার কাছে দুর্বোধ্য ছিল, আজ সেগুলোর অনেকটাই সে নিজে থেকে বুঝে করতে পারে। ভুল এখনো হয়, কিন্তু সেই ভুল আর আগের মতো ঘনঘন হয় না। 

বাড দূর থেকে দাঁড়িয়ে কয়েকবার তার কাজ দেখল। কোনো মন্তব্য করল না। শুধু একসময় মিগুয়েলের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, &quot;ছেলেটাকে এখন আর সবসময় বলে দিতে হয় না।&quot;

মিগুয়েল হেসে উত্তর দিল, &quot;আমি তো প্রথম দিনই বলেছিলাম, ওর চোখ দুটো আলাদা।&quot;

বাড কিছু বলল না। কিন্তু মুখের কোণে চাপা একটা হাসি ফুটে উঠল।

এই সময়টায় ইলাই প্রায়ই উঠোনের এক কোণে বসে পুরোনো বই পড়ত। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। মারদেকা খড়ের বোঝা নামিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে গিয়ে বৃদ্ধের পাশে দাঁড়াল। ইলাই বই বন্ধ করে তার দিকে তাকাল। তারপর মাটিতে কাঠি দিয়ে ধীরে ধীরে কয়েকটা শব্দ লিখল। Horse. River. Sky. তারপর একে একে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করল।

মারদেকাও ধীরে ধীরে অনুসরণ করল। &quot;Horse.&quot; এই শব্দে আর তার জড়তা নেই। &quot;River.&quot; এবারও উচ্চারণ মোটামুটি পরিষ্কার। &quot;Sky.&quot; এই শব্দটা বলতে গিয়ে সে একটু আটকে গেল। ইলাই আবার বলল। মারদেকা দ্বিতীয়বারে ঠিক করে উচ্চারণ করল।

বৃদ্ধের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে এবার আকাশের দিকে আঙুল তুলে আবার বলল, &quot;Sky.&quot; তারপর নদীর দিকে ইশারা করল, &quot;River.&quot; তারপর আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়াগুলোর দিকে দেখিয়ে বলল, &quot;Horse.&quot;

মারদেকা এবার শুধু শব্দ মুখস্থ করল না। শব্দ আর বাস্তব জিনিসের সম্পর্কটাও বুঝতে শুরু করল। ভাষা তার কাছে আর কাগজের অক্ষর হয়ে থাকল না। ধীরে ধীরে তা পৃথিবীকে চিনে নেওয়ার নতুন দরজায় পরিণত হতে লাগল।

দুপুরের দিকে ওলফ লারসেন মাঠ ঘুরে ফিরে এল। ঘোড়া থেকে নেমে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দূর থেকে মারদেকাকে দেখল। ছেলেটা তখন একা হাতে চামড়ার দড়িগুলো পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখছে। কাজ শেষ হলে সে নিজেই সেগুলো ঠিক জায়গায় ঝুলিয়ে দিল। কেউ তাকে সেটা করতে বলেনি। সে নিজের দায়িত্ব বুঝে করেছে। লারসেনের অভিজ্ঞ চোখে বিষয়টা এড়িয়ে গেল না। সে ধীরে ধীরে বাডের পাশে এসে দাঁড়াল। &quot;কেমন করছে?&quot;

বাড চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল, &quot;কাজ শেখানো যায়। কিন্তু কাজ খুঁজে নেওয়া শেখানো যায় না। ও নিজে থেকেই সেটা শিখছে।&quot;

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বিস্তীর্ণ র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। দূরে গরুর ঘণ্টার মৃদু শব্দ ভেসে আসছে। তার চোখ তখনও মারদেকার ওপর স্থির। কয়েক মাস আগে যে ছেলেটা শুধু আশ্রয়ের জন্য এখানে এসেছিল, সে আজ ধীরে ধীরে এই র&#x200d;্যাঞ্চের জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। হয়তো এখনও কেউ সেটা মুখে বলবে না। কিন্তু এই কঠিন পশ্চিমে স্বীকৃতি কথায় নয়, কাজে দেওয়া হয়। আর মারদেকা অজান্তেই সেই স্বীকৃতির দিকে এক ধাপ করে এগিয়ে চলেছে।

কিন্তু একই সময়, ব্ল্যাক রিভারের অন্য প্রান্তে কয়েক জোড়া চোখও নীরবে অপেক্ষা করে আছে। তারা তাড়াহুড়ো করছে না। তারা জানে, বড় আঘাত হানতে হলে আগে সময়কে নিজের পক্ষে আনতে হয়। আর সময়, ধীরে ধীরে, অদৃশ্য স্রোতের মতো, সবাইকে নিজের নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে চলেছে।

সেদিন বিকেলের দিকে রোদ যখন একটু নরম হতে শুরু করেছে, তখন র&#x200d;্যাঞ্চের কাজও ধীরে ধীরে গুছিয়ে আসছিল। প্রখর উত্তাপ কেটে গিয়ে তৃণভূমির ওপর দিয়ে শুষ্ক কিন্তু আরামদায়ক বাতাস বইতে শুরু করেছে। দূরের পাহাড়গুলোর গা ধীরে ধীরে গাঢ় নীল হয়ে উঠছে। সূর্যের আলোয় ঘাসের মাথাগুলো সোনালি রঙে ঝিলমিল করছে। গরুর পালকে পশ্চিমের চারণভূমি থেকে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি চলছে। কয়েকজন কাউবয় ঘোড়ায় চড়ে দূরে ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ বাঁশির মতো সরু সুরে ডাক দিচ্ছে, কেউ লম্বা দড়ি ঘুরিয়ে অলস হয়ে পড়া একটা বাছুরকে আবার পালের দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এই দৃশ্য এখন মারদেকার কাছে শুধু দেখার বিষয় নয়। সে মন দিয়ে লক্ষ্য করে, কে কখন কী করছে, কেন করছে। কারণ সে বুঝে গেছে, র&#x200d;্যাঞ্চে প্রতিটি কাজেরই একটা নিয়ম আছে। সেই নিয়ম না বুঝে শুধু অনুকরণ করলে কখনো প্রকৃত কাউবয় হওয়া যায় না।

বাড হিগিন্স অনেকক্ষণ ধরেই তাকে লক্ষ করছিল। কয়েক মাসে ছেলেটার মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটা চোখে না পড়ে উপায় নেই। আগের মতো সে আর প্রতিটি কাজের আগে নির্দেশের অপেক্ষা করে না। কোথাও দড়ি পড়ে থাকলে নিজে থেকেই গুছিয়ে রাখে, খড়ের গাদা কমে গেলে এনে ভরে দেয়, পানির পাত্র খালি দেখলে কাউকে না বলেই ভরে ফেলে। সবচেয়ে বড় কথা, সে এখন মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক কথাই বুঝে নিতে পারে। ভাষা পুরো শেখেনি, কিন্তু কাজের ভাষা শিখে ফেলেছে।

বাড আস্তাবলের ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ পরে হাতে একটা পুরোনো কিন্তু ভালো অবস্থার জিন নিয়ে বেরিয়ে এল। জিনটা সে মাটিতে নামিয়ে রাখল। তারপর মারদেকাকে ডাকল। ছেলেটা দ্রুত এগিয়ে এল। বাড এবার কোনো কথা বলল না। শুধু জিনটার দিকে তাকাল, তারপর আস্তাবলের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝারি গড়নের বাদামি ঘোড়াটার দিকে আঙুল তুলল।

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। এই কাজ সে আগেও শিখেছে। কিন্তু সেদিন বাড প্রতিটি ধাপে তাকে সাহায্য করেছিল। আজ বাডের হাত দুটো বুকের ওপর ভাঁজ করা। তার চোখে এমন একটা দৃষ্টি, যা স্পষ্ট বলে দিচ্ছে, আজ সাহায্য করা হবে না।

ছেলেটা ধীরে ধীরে জিনটা তুলে নিল। আগের তুলনায় এখন তার শরীর অনেকটা শক্ত হয়েছে। প্রথম দিকে যে ওজন তাকে টলিয়ে দিত, আজ সেটা সামলাতে কষ্ট হচ্ছে না। সে ঘোড়ার পাশে গিয়ে একবার প্রাণীটার ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিল। ঘোড়াটাও শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব সাবধানে জিনটা তুলে পিঠের ওপর বসাল। প্রথমবারেই ঠিক জায়গায় বসাতে পারল না। নিজের ভুল সে নিজেই বুঝল। আবার নামাল। একটু পেছনের দিকে সরিয়ে দ্বিতীয়বার বসাল। এবার অবস্থান ঠিক হলো।

বাড এখনো চুপ করে আছে।

মারদেকা নিচু হয়ে পেটের নিচ দিয়ে বেল্ট টেনে আনল। বাকলে আটকে ধীরে ধীরে টান দিল। তারপর আবার হাত ঢুকিয়ে দেখল কোথাও বেশি শক্ত হয়ে গেছে কি না। এই অভ্যাসটা সে বাডের কাছ থেকেই শিখেছে। ঘোড়ার শরীরের আরাম আগে, মানুষের সুবিধা পরে। সবকিছু শেষ করে সে এক পা পিছিয়ে দাঁড়াল।

বাড এগিয়ে এসে নিজে হাতে জিনটা পরীক্ষা করল। সামনের বাঁধন, পেছনের বেল্ট, পায়ের রকাব, সবকিছু একবার দেখে নিয়ে সে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট স্বরে বলল, &quot;ভালো।&quot;

মাত্র একটি শব্দ। কিন্তু সেই একটি শব্দই মারদেকার বুকের ভেতর অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল।

দূরে দাঁড়িয়ে ওলফ লারসেন পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। সে কাছে এসে ঘোড়াটার লাগাম হাতে নিল। তারপর এক মুহূর্তও কিছু না বলে নিজের বুটের পা রেকাবে রেখে অনায়াসে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল। কয়েক কদম সামনে গিয়ে আবার নেমে এল। জিনে কোনো সমস্যা হয়নি। লারসেন এবার বাডের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, &quot;এবার ওকে পরের ধাপ শেখানোর সময় হয়েছে।&quot;

মারদেকা কথাটা পুরো বুঝতে পারল না। কিন্তু &quot;নেক্সট&quot; শব্দটা সে আগে শুনেছে। নতুন কিছু শেখানো হবে, এটুকু বুঝে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

বাড হালকা হেসে বলল, &quot;আগে ভারসাম্য। তারপর গতি।&quot; 

লারসেন সম্মতি জানাল।

সন্ধ্যার আগে তারা র&#x200d;্যাঞ্চের পেছনের খোলা চারণভূমিতে গেল। জায়গাটা সমতল। চারদিকে নরম ঘাস। নতুন কাউকে ঘোড়ায় চড়া শেখানোর জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা হয় না। বাড সেই একই শান্ত স্বভাবের বাদামি ঘোড়াটাকে নিয়ে এল। এবার সে নিজে ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে মারদেকার দিকে তাকাল।

কোনো তাড়া নেই। কোনো চাপ নেই। শুধু একটা নতুন শিক্ষার শুরু।

মারদেকা ধীরে ধীরে ঘোড়ার পাশে এসে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতর উত্তেজনা বাড়ছে। এতদিন সে ঘোড়ার পরিচর্যা করেছে, জিন পরিয়েছে, লাগাম ধরেছে, পাশে পাশে হেঁটেছে। কিন্তু আজ প্রথমবার সে বুঝতে পারল, সামনে যে দরজাটা খুলতে যাচ্ছে, তার ওপারেই রয়েছে পশ্চিমের মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। একজন মানুষকে সত্যিকারের কাউবয় বানায় শুধু বন্দুক নয়, তার আগে ঘোড়া।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে, র&#x200d;্যাঞ্চের বেড়ার অনেক দূরে, ধুলোমাখা পথের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে একজন অচেনা ঘোড়সওয়ার এগিয়ে আসছিল। সে র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে তাকাল না, ভেতরে ঢোকার চেষ্টাও করল না। শুধু দূর থেকে জায়গাটা একবার চোখে মেপে নিয়ে আবার নিজের পথ ধরে চলে গেল। র&#x200d;্যাঞ্চের কেউ তাকে খেয়াল করল না।

কিন্তু পশ্চিমের দেশে অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা শুরু হয় এমনভাবেই, যখন কেউ বুঝতেই পারে না যে খেলা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

পরদিন ভোরে সূর্যের আলো যখন ব্ল্যাক রিভারের বিস্তীর্ণ প্রেইরির ওপর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন র&#x200d;্যাঞ্চের পেছনের খোলা চারণভূমিটা প্রায় নিস্তব্ধ। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের মাথায় আলো পড়ে ছোট ছোট কাঁচের টুকরোর মতো ঝিলিক দিচ্ছে। দূরে গরুর পাল এখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। কয়েকজন কাউবয় তাদের দিনের কাজ শুরু করার আগে ঘোড়াগুলোর জিন পরীক্ষা করছে। বাতাসে ঘাস, শুকনো মাটি আর চামড়ার গন্ধ মিশে আছে। সেই খোলা জায়গার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাড হিগিন্স, তার পাশে আগের দিনের সেই শান্ত স্বভাবের বাদামি ঘোড়াটা। আর কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে আছে মারদেকা। গত সন্ধ্যায় লারসেন বলেছিল, এবার তার পরের শিক্ষা শুরু হবে। সেই কথাটাই সারারাত তার মনে ঘুরেছে। উত্তেজনা আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে অজানা কিছুর প্রতি স্বাভাবিক ভয়।

বাড আজও বেশি কথা বলল না। সে জানে, অনেক শিক্ষা মুখে বোঝানো যায় না, হাতে ধরে দেখাতে হয়। প্রথমে সে নিজেই খুব ধীরে ধীরে রেকাবে পা রাখল, শরীরের ভারসাম্য ঠিক রেখে অনায়াসে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল। তারপর আবার নেমে এল। একবারও তাড়াহুড়ো করল না। প্রতিটি নড়াচড়া এত স্বাভাবিক যে মনে হয় কাজটা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ ব্যাপার। তারপর সে রেকাবের দিকে আঙুল দেখিয়ে মারদেকাকে এগিয়ে আসতে ইশারা করল।

মারদেকা ঘোড়ার পাশে এসে দাঁড়াল। একবার প্রাণীটার চোখের দিকে তাকাল। গত কয়েক মাসে সে শিখেছে, ঘোড়াকে কখনো ভয় দেখানো যায় না। ভয় দেখালে সে ভয়ই ফিরিয়ে দেয়। সে আলতো করে ঘোড়ার ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিল। বাদামি ঘোড়াটা শান্তভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মারদেকা বাম পা রকাবে তুলল। ডান হাত দিয়ে জিনের সামনের অংশ শক্ত করে ধরল। কিন্তু শরীরটা ওপরে তোলার মুহূর্তেই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। এক ঝটকায় আবার মাটিতে নেমে এল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিগুয়েল হেসে ফেলল। তবে সেই হাসিতে বিদ্রূপ ছিল না, ছিল নিজের প্রথম দিনের স্মৃতি।

বাডও হাসল না। সে শুধু আবার একই কাজ করে দেখাল। এবার সে নিজের শরীরের ভর কোথায় রাখতে হবে, সেটা হাতের ইশারায় বোঝাল। মারদেকা দ্বিতীয়বার চেষ্টা করল। এবার সে একটু ওপরে উঠতে পারল, কিন্তু ডান পা ঘোড়ার পিঠের ওপারে নেওয়ার আগেই শরীর কাত হয়ে গেল। আবার নেমে এল। কপালে ঘাম জমল। ঠোঁট কামড়ে সে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তৃতীয়বার চেষ্টা করল।

এইবার সে ঘোড়ার পিঠে উঠতে পারল।

তবে ঠিকমতো বসতে পারল না। শরীর শক্ত হয়ে আছে। দুই হাত এত জোরে জিন আঁকড়ে ধরেছে যে আঙুলের গাঁট সাদা হয়ে উঠেছে। ঘোড়াটা কয়েক পা এগোতেই তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। মনে হলো, এই বুঝি পড়ে যাবে। বাড দ্রুত এগিয়ে এসে লাগাম হাতে নিল। খুব ধীরে ধীরে ঘোড়াটাকে হাঁটাতে লাগল। মারদেকা প্রথমে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল। তারপর সাহস করে আবার খুলল। নিচের পৃথিবীটা আগের মতো নেই। সবকিছু যেন একটু উঁচু থেকে দেখা যাচ্ছে। বাতাসও অন্যরকম লাগছে।

বাড শান্ত গলায় বলল, &quot;শরীর শক্ত কোরো না।&quot;

মারদেকা পুরো বাক্যটা বুঝল না, কিন্তু বাড নিজের কাঁধ ঢিলে করে দেখাতেই সে অর্থটা ধরতে পারল। সে ধীরে ধীরে শরীরের জড়তা কমানোর চেষ্টা করল। আশ্চর্যের ব্যাপার, সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার চলাও অনেক আরামদায়ক মনে হতে লাগল। কয়েক মিনিট পরে তার মুখে অচেনা এক হাসি ফুটে উঠল। এই প্রথম সে ঘোড়ার পিঠে বসে পৃথিবীকে দেখছে।

দূরে দাঁড়িয়ে ওলফ লারসেন সব দেখছিল। ইলাইও বারান্দা থেকে তাকিয়ে আছে। বৃদ্ধের চোখে যেন এক ধরনের পিতৃস্নেহের কোমলতা। সে ধীরে ধীরে বলল, &quot;ছেলেটা শিখছে।&quot;

লারসেন উত্তর দিল, &quot;শুধু শিখছে না। ও মনে রাখছে।&quot;

বৃদ্ধ তার দিকে তাকাল।

লারসেন মৃদু স্বরে বলল, &quot;যাকে এক জিনিস বারবার শেখাতে হয়, সে কর্মী হয়। কিন্তু যে একবার দেখে মনে রাখে, সে একদিন নেতৃত্ব দেয়।&quot;

কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে গেল। কেউ আর কিছু বলল না।

পরবর্তী কয়েক দিন একই নিয়মে চলতে লাগল শিক্ষা। প্রথমে শুধু হাঁটা। তারপর ধীরে ধীরে মোড় নেওয়া। লাগাম কতটা টানতে হয়, কখন ছেড়ে দিতে হয়, ঘোড়ার চলার ছন্দের সঙ্গে নিজের শরীর কীভাবে মিলিয়ে নিতে হয়, এসব ছোট ছোট বিষয় বাড ধৈর্য ধরে শেখাতে লাগল। সে কখনো রাগ করত না। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল, মারদেকার সবচেয়ে বড় শক্তি তার কৌতূহল নয়, তার অধ্যবসায়। একই ভুল সে দ্বিতীয়বার খুব কমই করে।

এক বিকেলে অনুশীলন শেষে মারদেকা একাই ঘোড়াটাকে নিয়ে আস্তাবলের দিকে ফিরছিল। ঘোড়াটা ধীর পায়ে হাঁটছে। ছেলেটার দুই হাতে লাগাম, চোখে গভীর মনোযোগ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সে বহুদিন ধরেই এই কাজ করছে। ঠিক তখনই র&#x200d;্যাঞ্চের প্রধান ফটকের সামনে এক অপরিচিত ঘোড়সওয়ার এসে থামল। ধুলোমাখা কোট, মাথায় চওড়া টুপি। সে ভেতরে ঢুকল না। শুধু দূর থেকে র&#x200d;্যাঞ্চটার দিকে একবার তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ঘোড়া ঘুরিয়ে আবার শহরের দিকেই চলে গেল। মারদেকা তাকে খেয়ালই করল না।

কিন্তু বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ওলফ লারসেন লোকটাকে দেখেছিল। তার চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য সরু হয়ে এল। লোকটাকে সে চিনতে পারেনি।

আর পশ্চিমের দেশে এমন অচেনা মুখ, যে দূর থেকে শুধু দেখে চলে যায়, তাকে কখনোই সম্পূর্ণ নিরীহ বলে ধরে নেওয়া হয় না। এখানেই পরবর্তী দিনের অস্থিরতার প্রথম নীরব ছায়া এসে পড়ল।

ব্ল্যাক রিভার শহর থেকে ফেরার পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেল। বাইরে থেকে সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক। ভোর হলে কাউবয়রা মাঠে যাচ্ছে, দুপুরে গরুর পাল অন্য চরাগাহে সরানো হচ্ছে, সন্ধ্যায় ক্লান্ত ঘোড়াগুলো আস্তাবলে ফিরছে। কিন্তু ওলফ লারসেন বুঝতে পারছিল, এই স্বাভাবিকতার নিচে কোথাও একটা অদৃশ্য টান তৈরি হয়েছে। বহু বছরের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, বড় ঝড় আসার আগে প্রকৃতি যেমন অকারণ শান্ত হয়ে যায়, তেমনি মানুষের শত্রুরাও আঘাত হানার আগে কিছুদিন নিঃশব্দে অপেক্ষা করে। শহরে গিয়েও সে সেই অস্বস্তিটা অনুভব করেছিল। কয়েকজন পুরোনো পরিচিত মানুষের চোখে সে এমন এক ধরনের সংকোচ দেখেছে, যা তারা লুকানোর চেষ্টা করছিল। কেউ কিছু বলেনি, কিন্তু সবাই যেন কিছু একটা জানে। এই নীরবতাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছিল।

মারদেকা অবশ্য এসবের কিছুই বুঝতে পারছিল না। তার পৃথিবী এখনও অনেক সহজ। সকালে ইলাইয়ের কাছে পড়াশোনা, দুপুরে বাডের সঙ্গে র&#x200d;্যাঞ্চের কাজ শেখা, আর বিকেলে সুযোগ পেলেই দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। তবে একটা পরিবর্তন সত্যিই ঘটেছে। কয়েক মাস আগেও র&#x200d;্যাঞ্চের লোকেরা তাকে কৌতূহল নিয়ে দেখত। এখন আর কেউ তাকে অচেনা মনে করে না। রান্নাঘরে ঢুকলে রোজা তাকে আলাদা করে খেতে ডাকে। বাড কোনো কাজ শুরু করার আগে ইশারায় তাকে পাশে দাঁড়াতে বলে। ইলাই মাঝে মাঝে বই বন্ধ করে তাকে ছোট ছোট বাক্য বলায়। 

এমনকি ক্লে মরগানও, যে প্রথম দিন থেকেই ছেলেটাকে অপছন্দ করছিল, সেও এখন কাজের ফাঁকে কখনও কখনও ছোট্ট করে জানতে চায়, &quot;সব ঠিক আছে?&quot; 

মারদেকা সব শব্দ বোঝে না, কিন্তু মানুষের চোখের ভাষা এখন অনেকটাই শিখে ফেলেছে। সে বুঝতে পারে কে তাকে গ্রহণ করেছে, কে এখনও দূরত্ব রেখে চলে।

সেদিন বিকেলের দিকে বাড তাকে নিয়ে উত্তর দিকের পুরোনো বেড়াগুলো দেখতে গেল। কয়েকটা খুঁটি ঢিলে হয়ে গেছে। দুজনে মিলে নতুন কাঠ বসাচ্ছিল। কাজ করতে করতেই বাড মাঝেমধ্যে তাকে দড়ি এগিয়ে দিতে বলছে, হাতুড়ি ধরতে বলছে, খুঁটি সোজা করে রাখতে বলছে। মারদেকা এখন আর আগের মতো ভুল করে না। কাজ শুরুর আগে সে নিজেই চারপাশ দেখে নেয়, কী লাগতে পারে আন্দাজ করার চেষ্টা করে। 

বাড একসময় খেয়াল করল, কথা না বলেও ছেলেটা তার প্রয়োজনের অর্ধেক বুঝে ফেলছে। সে মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল, &quot;এভাবেই শেখা যায়।&quot; 

কথার পুরো অর্থ মারদেকা বুঝল না, কিন্তু প্রশংসার সুরটা বুঝল। তার মুখে অজান্তেই ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।

বেড়া মেরামত শেষ করে দুজনে একটু উঁচু ঢিবির ওপর দাঁড়াল। সেখান থেকে পুরো র&#x200d;্যাঞ্চটা দেখা যায়। পশ্চিমে ডুবে যাওয়া সূর্যের আলোয় ঘাসগুলো যেন তামার পাতার মতো ঝিলমিল করছে। দূরে গরুর পাল ধীরে ধীরে ফিরছে। কাউবয়দের ছায়া লম্বা হয়ে মাঠের ওপর বিছিয়ে গেছে। সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মারদেকার মনে হলো, এই জায়গাটা সত্যিই তার নিজের হয়ে উঠছে। পাহাড়ের ওপারের ছোট্ট গ্রামটা এখনও তার স্মৃতিতে আছে, কিন্তু সেই স্মৃতির ব্যথা এখন আর আগের মতো তীব্র নয়। মানুষের জীবনে কখন যে নতুন শেকড় গজিয়ে ওঠে, মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না।

ঠিক তখনই দক্ষিণ দিকের পথ থেকে একটা ঘোড়া দ্রুত ছুটে আসতে দেখা গেল। ঘোড়াটার গা ধুলোয় ঢাকা, আর আরোহী বারবার পেছনে তাকাচ্ছে। বাডের মুখের হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সে চোখ কুঁচকে লোকটাকে চিনতে চেষ্টা করল। কয়েক মুহূর্ত পর চিনতে পেরে বলল, &quot;স্যাম!&quot; পরক্ষণেই সে ঢিবি থেকে নেমে গেল। যথাসম্ভব দ্রুত র‌্যাঞ্চের দিকে এগুলো। 

বাডের হাবভাবে মারদেকাও বুঝে গেল বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। সেও তাকে অনুসরণ করলো।

লোকটা র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে ঢুকেই প্রায় লাফিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল। তার শ্বাস দ্রুত উঠছে। মুখ শুকিয়ে গেছে। ওলফ লারসেন তখন বারান্দা থেকে নেমে এগিয়ে এল। চারপাশের সবাই কাজ থামিয়ে তাকিয়ে আছে।

স্যাম কিছুক্ষণ শ্বাস সামলে নিচু গলায় বলল, &quot;বস... পশ্চিমের চরাগাহের কাছে... দুটো গরু মরে পড়ে আছে।&quot;

লারসেনের চোখ স্থির হয়ে গেল। &quot;রোগ?&quot;

স্যাম ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। &quot;না।&quot;

&quot;তাহলে?&quot; 

স্যাম এবার আরও নিচু গলায় বলল, &quot;গুলির দাগ আছে।&quot;

এক মুহূর্তের জন্য পুরো উঠোনে এমন নীরবতা নেমে এল, যেন বাতাসও থেমে গেছে। বাড ধীরে ধীরে মারদেকার দিকে তাকাল। ছেলেটা কথাগুলোর অর্থ বুঝতে পারেনি, কিন্তু সবার মুখের পরিবর্তন সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে দিনের ক্লান্তি আর শান্তি ছিল, সেখানে এখন অদৃশ্য উত্তেজনা জমে উঠেছে।

ওলফ লারসেন কোনো কথা বলল না। শুধু ধীরে ধীরে ঘুরে আস্তাবলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে র&#x200d;্যাঞ্চের প্রত্যেক মানুষ বুঝে গেল, এটা সাধারণ ঘটনা নয়। কেউ যদি গরু চুরি করত, সেটা একরকম কথা। কিন্তু গুলি করে মেরে রেখে যাওয়া অন্য বার্তা বহন করে। এটা ক্ষতি করার জন্য নয়, ভয় দেখানোর জন্য।

বারান্দার সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে মারদেকা স্থির চোখে সব দেখছিল। সে এখনও জানে না পশ্চিমের মানুষের এই নীরবতার মানে কী। কিন্তু তার বুকের ভেতর আবার সেই অচেনা অস্বস্তিটা ফিরে এল, যেটা সে প্রথম অনুভব করেছিল সেদিন, যখন কয়েকজন অচেনা ঘোড়সওয়ার র&#x200d;্যাঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছিল। তার মনে হলো, বাতাসের গন্ধ যেন হঠাৎ বদলে গেছে।

আর অনেক দূরে, পশ্চিমের চরাগাহের শুকনো ঘাসের ভেতর, সন্ধ্যার আলো নিভে আসার সঙ্গে সঙ্গে দুটো মৃত গরুর পাশে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছিল মাটিতে পড়ে থাকা খালি কার্তুজের খোসা। কেউ সেগুলো তুলে নেয়নি। যেন ইচ্ছে করেই রেখে যাওয়া হয়েছে। যেন কেউ চাইছে, ওলফ লারসেন সেগুলো দেখুক... এবং বুঝে যাক, খেলা সত্যিই শুরু হয়ে গেছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/260163/</link>
				<pubDate>Mon, 10 Aug 2026 11:41:50 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–ছয়<br />
পরদিন ভোরে ব্ল্যাক রিভারের ওপর হালকা কুয়াশার চাদর নেমে ছিল। নদীর দিক থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাস শুকনো ঘাসের মাথাগুলোকে আস্তে আস্তে দুলিয়ে দিচ্ছিল। পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে, কিন্তু র&#x200d;্যাঞ্চের বিস্তীর্ণ তৃণভূমির ওপর এখনো রাতের শিশির ঝলমল করছে। দূরে গরুর পাল নিঃ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-260163"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/260163/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">b80b338bbcd2dac328aeceea23cf02c4</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–পাঁচ
রাতের শেষ প্রহর। ব্ল্যাক রিভারের ওপর তখনো ভোরের আলো নামেনি। শহরের প্রধান রাস্তার দুপাশে সারি সারি কাঠের দোকান, লোহার কারখানা, কামারের চুল্লি, ডাকঘর আর সেলুনগুলো অন্ধকারে ডুবে আছে। দিনের বেলা যে রাস্তা ঘোড়ার খুরের শব্দ, গরুর পাল, ব্যবসায়ীদের হাঁকডাক আর মাতাল কাউবয়দের হাসিতে মুখর থাকে, সেই রাস্তা এখন এতটাই নিস্তব্ধ যে দূরের চার্চের টাওয়ারে বসে থাকা একজোড়া কাকের ডানা ঝাপটানোর শব্দও শোনা যায়। 

কিন্তু শহরের পশ্চিম প্রান্তের সেই পুরোনো গুদামঘরটার ভেতরে এখনো আলো জ্বলছে। মোটা কাঠের দরজার ফাঁক গলে লণ্ঠনের হলুদ আলো বাইরে এসে পড়েছে। ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে আছে সস্তা হুইস্কির গন্ধ, পুরোনো চামড়ার গন্ধ আর বহুদিন পরিষ্কার না করা কাঠের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। টেবিলের ওপর ছড়ানো মানচিত্রটা এখনো আগের জায়গাতেই পড়ে আছে। তার ওপর মোটা কালিতে গোল করে দাগ দেওয়া জায়গাটার নাম, লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ। 

লম্বা কালো কোট পরা লোকটা কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকে জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। পূর্ব আকাশে খুব সামান্য আলো ফুটতে শুরু করেছে। সে ধীরে ধীরে ঘুরে বাকিদের দিকে তাকাল। তার চোখে এমন এক ধরনের ঠান্ডা স্থিরতা, যা সাধারণ ডাকাতদের মধ্যে দেখা যায় না। সে তাড়াহুড়ো করে না, উত্তেজিতও হয় না। যেন প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অনেক দূর পর্যন্ত ভেবে নেয়। নিচু গলায় বলল, &quot;আজ নয়। কালও নয়। শিকারকে ধরতে হলে আগে তার অভ্যাস জানতে হয়।&quot; 

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দাড়িওয়ালা লোকটা বিরক্ত মুখে বলল, &quot;তাহলে আমরা কতদিন অপেক্ষা করব?&quot; 

কালো কোটের লোকটা হালকা হাসল। &quot;যতদিন দরকার। ওলফ লারসেন বোকা মানুষ নয়। তার র&#x200d;্যাঞ্চে ঢুকতে হলে আগে জানতে হবে কে কখন বেরোয়, কে কখন পাহারা দেয়, আর কোথায় সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটা আছে।&quot; 

কথাগুলো শুনে আর কেউ প্রতিবাদ করল না। কারণ তারা সবাই জানে, এই লোকটার পরিকল্পনা একবার শুরু হলে সে খুব কমই ভুল করে। কয়েক মুহূর্ত পর সে মানচিত্রটা গুটিয়ে ফেলল। তারপর শান্ত গলায় বলল, &quot;আজ থেকে নজর রাখা শুরু হবে। শহরে যারা আসে, তাদের মধ্যে নতুন মুখগুলোর ওপরও চোখ রাখবে। বিশেষ করে... সেই ছেলেটার ওপর।&quot; 

বাকিরা অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল। &quot;কোন ছেলেটা?&quot; 

লোকটা জানালার বাইরে তাকিয়ে উত্তর দিল, &quot;যে পাহাড় থেকে নেমে এসেছে। যার জন্য লারসেন নিজের দরজা খুলে দিয়েছে। একজন মানুষ কারণ ছাড়া এমন কাজ করে না।&quot; সে আর কিছু বলল না। কিন্তু কথাগুলো বাতাসে এমনভাবে ঝুলে রইল, যেন অদৃশ্য কোনো জাল ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে।

সেই সময় শহর থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সকাল শুরু হচ্ছিল। রাতের শিশিরে ভিজে থাকা ঘাসের ডগাগুলো সূর্যের প্রথম আলোয় রুপোর মতো ঝলমল করছে। দূরের পাহাড়গুলো নীলচে কুয়াশার আড়ালে আধাআধি ঢাকা। আস্তাবলের ভেতর থেকে ঘোড়ার নাক ঝাড়ার শব্দ ভেসে আসছে। গরুর পালও ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। র&#x200d;্যাঞ্চের লোকজনের দিনের শুরু হয়েছে আগের মতোই নিয়ম মেনে। কেউ পানির পাম্প চালাচ্ছে, কেউ আগুনে কফির পাত্র বসাচ্ছে, কেউ আবার চামড়ার জিনে তেল দিচ্ছে। এই নিয়মের ভেতরেই পশ্চিমের মানুষের জীবন। এখানে অলসতার জায়গা নেই। প্রকৃতি প্রতিদিন নতুন করে পরীক্ষা নেয়, আর যে পরীক্ষায় ফেল করে, তাকে দ্বিতীয় সুযোগ খুব কমই দেয়।

মারদেকারও ঘুম ভেঙে গেছে অনেক আগেই। গত রাত থেকে উত্তেজনায় তার ঠিকমতো ঘুমই হয়নি। আজ সে প্রথমবার ব্ল্যাক রিভার শহরে যাবে। এই কয়েকটা দিন সে শুধু দূর থেকে শহরটাকে দেখেছে। আজ সে সেই রাস্তা দিয়ে হাঁটবে, যেখানে এতদিন শুধু কল্পনায় নিজেকে দেখেছে। বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তার চোখ চলে গেল দূরের দিকে। সকালের কুয়াশার ফাঁক দিয়ে শহরের কয়েকটা ছাদ অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। তার বুকের ভেতর আবারও সেই পুরোনো কৌতূহল ফিরে এল। পাহাড়ের ওপারে থাকতে সে ভাবত, শহরে গেলে হয়তো সব মানুষ সুখে থাকে। এখানে এসে সে বুঝেছে, মানুষ যেখানে থাকে, সেখানেই আনন্দ আছে, কষ্টও আছে। তবু শহরটার প্রতি তার আকর্ষণ এতটুকু কমেনি। বরং আরও বেড়েছে। কারণ এখন সে জানে, ওই শহরের সঙ্গে তার নতুন জীবনের সম্পর্ক তৈরি হতে যাচ্ছে।

ইলাই দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। বৃদ্ধ কিছুক্ষণ ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল। উত্তেজনায় মারদেকার চোখ দুটো আজ যেন আরও বড় হয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে বলল, &quot;আজ অনেক কিছু দেখবে। কিন্তু সবকিছু দেখে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না। শহরে মানুষ অবাক হওয়া চোখ খুব তাড়াতাড়ি চিনে ফেলে।&quot; 

কথাগুলোর অর্থ মারদেকা পুরো বুঝল না। কিন্তু ইলাইয়ের কণ্ঠের কোমলতা তাকে আশ্বস্ত করল। সে শুধু মাথা নেড়ে হাসল। তারপর তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে এল।

উঠোনে তখন ওলফ লারসেন নিজের ঘোড়ার জিন শক্ত করে বাঁধছে। ক্লে মরগানও প্রস্তুত। বাড হিগিন্স একটা বস্তার মুখ দড়ি দিয়ে বাঁধছে। বোঝাই যাচ্ছে, তারা শুধু শহর ঘুরতে যাচ্ছে না। র&#x200d;্যাঞ্চের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসও আনতে হবে। লারসেন একবার চোখ তুলে মারদেকার দিকে তাকাল। ছেলেটার চোখে যে উচ্ছ্বাস, সেটা তার দৃষ্টি এড়াল না। খুব সামান্য হাসল সে। তারপর শান্ত গলায় বলল, &quot;বাছা আজ তোমাকে ব্ল্যাক রিভার দেখাবো।&quot;

মারদেকা কথাটা বুঝল না, কিন্তু ইশারাটা বুঝল। তার বুকের ভেতরটা আবার ধক করে উঠল। সে জানত না, আজকের এই ছোট্ট যাত্রাই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথচলাগুলোর একটি হতে চলেছে। কারণ ব্ল্যাক রিভার শুধু একটা শহরের নাম নয়। এই শহরই তাকে মানুষ চেনাবে, বন্ধু দেবে, শত্রুও দেবে। আর অজান্তেই, একই সকালে, শহরের অন্য প্রান্তে কয়েক জোড়া ঠান্ডা চোখও অপেক্ষা করতে শুরু করেছে সেই ছোট্ট ছেলেটাকে প্রথমবার কাছ থেকে দেখার জন্য।

সুর্যের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়তে না পড়তেই লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ আবার নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এল। আস্তাবলের সামনে তখন ঘোড়ার খুরের শব্দ, দড়ি টানার আওয়াজ আর কাউবয়দের ছোট ছোট নির্দেশে চারপাশ মুখর হয়ে উঠেছে। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মারদেকা আগের মতোই বাড হিগিন্সের কাছে এসে দাঁড়াল। কয়েক মাস আগেও এই বিশাল আস্তাবল, ঘোড়ার সারি, চামড়ার জিন আর লাগামের ভিড় তাকে ভড়কে দিত। এখন আর দেয় না। এখন সে জানে কোন ঘোড়াটা অস্থির, কোনটা শান্ত, কোনটার কাছে ধীরে যেতে হয়, আর কোনটার গায়ে হাত রাখলেই সে নিশ্চিন্ত হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। এখনও সে দক্ষ নয়, কিন্তু আর অপরিচিতও নয়। এই কয়েক মাসে র&#x200d;্যাঞ্চের প্রতিটি সকাল তার শরীর আর মনে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে চোখ বন্ধ করেও সে কাজের ক্রম বলে দিতে পারবে।

বাড তখন একটা বাদামি ঘোড়ার খুর পরীক্ষা করছিল। মারদেকাকে দেখেই মাথা তুলে তাকাল। আগের মতো আর হাত নেড়ে ডাকতে হলো না। ছেলেটা নিজে থেকেই পাশে এসে দাঁড়াল। বাড ঘোড়াটার একটা পা আলতো করে তুলে ধরল, তারপর হাতের ছোট লোহার হুক দিয়ে খুরের ভেতরে আটকে থাকা শুকনো কাদা পরিষ্কার করতে লাগল। কাজ শেষ করে একই হুকটা মারদেকার হাতে দিল। 

ছেলেটা একবার তার মুখের দিকে তাকাল, তারপর হাঁটু গেড়ে বসে ঘোড়ার অন্য পাটা ধরল। প্রথম দিকে এই কাজ করতে গিয়ে সে ভয় পেত। যদি ঘোড়া লাথি মারে? এখন আর সেই ভয় নেই। বরং হাতের স্পর্শেই সে বুঝতে পারে প্রাণীটা অস্থির না শান্ত। ধীরে ধীরে খুর পরিষ্কার করতে করতে সে একবারও তাড়াহুড়ো করল না। বাড চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখল। কাজ শেষ হলে শুধু মাথা নেড়ে মৃদু হাসল। এই হাসিটুকুই মারদেকার কাছে অনেক বড় পুরস্কার।

সকালের নাশতার পর ইলাইয়ের সঙ্গে পড়াশোনাও এখন আগের চেয়ে অনেক এগিয়েছে। কয়েক মাসের চেষ্টায় মারদেকা ছোট ছোট ইংরেজি শব্দ চিনতে শিখেছে। নিজের নাম লিখতে পারে। ওলফ, হর্স, ওয়াটার, ব্রেড, হাউস, স্কাই, রিভার, এই শব্দগুলো এখন আর তার কাছে অচেনা নয়। অনেক সময় ভুল করে, অক্ষর উল্টে ফেলে, উচ্চারণ আটকে যায়, কিন্তু সে হাল ছাড়ে না। ইলাইও কখনো বিরক্ত হয় না। বৃদ্ধ জানে, এই ছেলেটার সবচেয়ে বড় শক্তি তার ধৈর্য। যে ছেলে তিন দিন পাহাড় পেরিয়ে একা অজানা শহরে পৌঁছাতে পারে, তার কাছে একটা ভাষা শেখা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

দুপুরের একটু আগে ওলফ লারসেন আস্তাবলের দিকে এল। তার হাতে একটা মোটা হিসাবের খাতা। সঙ্গে ছিল রুবেন কোল। দুজনে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় কিছুক্ষণ কথা বলল। মারদেকা দূর থেকে দেখছিল। ভাষা পুরোপুরি না বুঝলেও কিছু শব্দ এখন তার কানে ধরা পড়ে। আজও দু একটা শব্দ সে চিনতে পারল। &quot;ব্ল্যাক রিভার&quot;... &quot;স্টোর&quot;... &quot;ময়দা&quot;... &quot;পেরেক&quot;... &quot;কেরোসিন&quot;। কথাগুলো শুনে তার কৌতূহল জাগল। কয়েক দিন পরপরই র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে কেউ না কেউ শহরে যায় প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে। এতদিন সে শুধু তাদের যেতে দেখেছে। কখনো যাওয়ার সুযোগ হয়নি।

রুবেন ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, ঠিক তখনই লারসেনের চোখ গিয়ে পড়ল মারদেকার ওপর। কয়েক মুহূর্ত সে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়াল। লারসেন খাতাটা বন্ধ করে তার দিকে তাকিয়ে খুব সহজ স্বরে বলল, &quot;আজ না। কিন্তু শিগগিরই তোমাকে শহর দেখাব।&quot; 

কথাগুলো মারদেকা পুরো বুঝল না। শুধু &quot;টাউন&quot; শব্দটা তার কানে আটকাল। এই শব্দটা সে আগেও শুনেছে। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখে আলো জ্বলে উঠল। লারসেন সেটা লক্ষ করল। মৃদু হেসে তার কাঁধে হাত রেখে আবার নিজের কাজে চলে গেল।

সারাটা বিকেল সেই একটি শব্দই মারদেকার মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল। টাউন। ব্ল্যাক রিভার। যে শহরকে সে প্রথম দেখেছিল দূরের পাহাড় থেকে, যে শহরের আলো তাকে নিজের গ্রাম ছেড়ে এত দূর টেনে এনেছিল, যে শহরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে নতুন জীবন পেয়েছিল, সেই শহরের ভেতরটা সে এখনও দেখেনি। র&#x200d;্যাঞ্চের বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে দূরের ধোঁয়া ওঠা চিমনি আর ছাদের সারির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, ওখানে কত মানুষ, কত দোকান, কত অজানা গল্প লুকিয়ে আছে। 

পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙতেই মারদেকা বুঝতে পারল, আজকের সকালটা অন্য রকম। কারণ আগের দিন সন্ধ্যায় খাবারের টেবিলে বসে ওলফ লারসেন নিজেই ইলাইকে বলেছিল, &quot;ওকে আর পিছিয়ে দেওয়া যাবে না। কাল ছেলেটাকে ঠিক শহর দেখিয়ে আনব।&quot; 

কথাটা শুনে মারদেকা পুরো অর্থ বুঝতে পারেনি, কিন্তু &quot;টাউন&quot; শব্দটা সে চিনতে শিখেছে। সেই শব্দটাই সারারাত তার মাথার ভেতর ঘুরেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও লারসেন তাকে শহরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিল। তারপর গরু চুরির ঘটনা, র&#x200d;্যাঞ্চের বাড়তি কাজ আর নানা ব্যস্ততায় বিষয়টা পিছিয়ে গিয়েছিল। তখন মারদেকা কিছুই বলেনি। সে এতদিনে বুঝে গেছে, এই র&#x200d;্যাঞ্চে কোনো কাজ কারণ ছাড়া স্থগিত হয় না। তাই আবার যখন লারসেন নিজেই কথা দিল, তখন ছেলেটার মনে অদ্ভুত এক উত্তেজনা জন্ম নিল। মনে হচ্ছিল, যে শহরের আলো তাকে পাহাড়ের ওপার থেকে টেনে এনেছিল, আজ অবশেষে সে সেই শহরের ভেতরে হাঁটবে।

সকালের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। উঠোনে দাঁড়িয়ে বাড হিগিন্স একটা বাদামি ঘোড়ার জিন পরীক্ষা করছিল। মিগুয়েল গরুর খোঁয়াড়ের দিকে যাচ্ছে। রুবেন কোল বেড়ার একটা ভাঙা অংশ দেখে লোকজনকে নির্দেশ দিচ্ছে। সবকিছুই স্বাভাবিক, তবু মারদেকার কাছে আজ সবকিছু যেন একটু উজ্জ্বল লাগছিল। সে বারবার বাড়ির সামনে এসে শহরের দিকের রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল। 

ইলাই সেটা দেখে মৃদু হেসে বলল, &quot;অপেক্ষা করতে শেখাও মানুষের একটা শিক্ষা।&quot; 

কথাটা মারদেকা পুরো বুঝল না, কিন্তু বৃদ্ধের হাসি বুঝল। সে আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর ওলফ লারসেন বারান্দা থেকে নেমে এল। আজ তার কোমরে শুধু রিভলভার নয়, কাঁধে হালকা একটা কোটও ঝুলছে। সে চারদিকে একবার তাকিয়ে বাডকে কয়েকটা নির্দেশ দিল। তারপর মারদেকার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। মারদেকা দৌড়ে এগিয়ে এল। লারসেন তার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, &quot;আজ টাউন।&quot; 

এবার ছেলেটা শব্দটা চিনতে পারল। তার চোখ মুহূর্তের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মুখে এমন এক আনন্দ ফুটে উঠল, যা কোনো ভাষা ছাড়াই বোঝা যায়।

বাড এগিয়ে এসে বলল, &quot;ওকে কি হাঁটিয়েই নিয়ে যাবেন বস?&quot; 

লারসেন মাথা নেড়ে বলল, &quot;হ্যাঁ। প্রথম দিন ওর চোখ দিয়ে শহরটা দেখতে চাই। ঘোড়ার পিঠে বসলে অনেক কিছুই চোখ এড়িয়ে যায়।&quot; 

বাড হালকা হেসে আর কিছু বলল না। সে জানত, লারসেন যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তার পেছনে একটা কারণ থাকেই।

মারদেকা দ্রুত নিজের পুরোনো টুপিটা মাথায় পরে নিল। তারপর একবার ঘুরে র&#x200d;্যাঞ্চটার দিকে তাকাল। কয়েক মাস আগেও এই জায়গাটা ছিল তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। এখন এই উঠোন, এই আস্তাবল, এই গরুর খোঁয়াড়, এই মানুষগুলো তার প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারল না কেন, কিন্তু বাড়ি থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য বেরিয়েও তার মনে হলো, যেন আপন কিছু পেছনে রেখে যাচ্ছে।

ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল। মারদেকা তার এক কদম পেছনে। র&#x200d;্যাঞ্চের প্রধান ফটক পেরিয়ে তারা সেই ধুলোমাখা পথ ধরে এগিয়ে চলল, যে পথ কয়েক মাস আগে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত আর ভীত এক কিশোর একা হেঁটে এসেছিল। তখন তার সামনে ছিল অনিশ্চয়তা। যাকে সামনে রেখে সে এসেছিল, সে ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত। আজ তার পাশে হাঁটছে এমন একজন মানুষ, যাকে সে সবচেয়ে বেমী চেনে। যার উপস্থিতি তাকে নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়। পথটা একই, কিন্তু যাত্রাটা আর আগের মতো নয়।

সকালের রোদ ধীরে ধীরে তৃণভূমির ওপর নেমে আসছিল। দূরে ব্ল্যাক রিভারের প্রথম দালানগুলোর ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে। শহরটা যেন ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। মারদেকার বুকের ভেতর আবার সেই পুরোনো কৌতূহল জেগে উঠল। সে জানত না, আজ সে কী কী দেখবে। শুধু জানত, তার জীবনের আরেকটা নতুন দরজা খুলতে চলেছে।

আর ঠিক সেই সময়, ব্ল্যাক রিভারের অন্য প্রান্তে, আগের রাতের সেই অন্ধকার ঘরের মানুষগুলো আরেকবার একত্র হয়েছিল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা মানচিত্রটা এবার গুটিয়ে রাখা হয়েছে। কথাবার্তা কম, কিন্তু সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ়। তাদের লক্ষ্য এখনও একটাই, ওলফ লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চ। তারা জানত না, এই মুহূর্তে লারসেন শহরের দিকেই হাঁটছে। আর তারা তো জানার প্রশ্নই আসে না যে, তার পাশে হাঁটছে এক কিশোর, যার ভাগ্য খুব অচিরেই অদৃশ্য সুতোয় জড়িয়ে যাবে তাদের পরিকল্পনার সঙ্গে। এখনো কেউ কাউকে চেনে না। কিন্তু ভাগ্য অনেক সময় মানুষের পরিচয় ঘটিয়ে দেয়, তারও অনেক আগে।

ব্ল্যাক রিভারের প্রথম ঘরগুলো চোখে পড়তেই মারদেকার হাঁটার গতি অজান্তেই ধীর হয়ে গেল। শহরটাকে সে এর আগে দু&#039;বার দেখেছে, কিন্তু দূর থেকে। একবার পাহাড়ের মাথা থেকে, যখন রাতের অন্ধকারে ছড়িয়ে থাকা আলোগুলোকে তার মনে হয়েছিল মাটিতে নেমে আসা আকাশের তারা। আরেকবার যখন ক্ষুধায়, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া শরীর নিয়ে শহরের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সেদিন তার চোখে পৃথিবী দেখার মতো শক্তি ছিল না। আজ প্রথমবার সে সচেতনভাবে ব্ল্যাক রিভারের ভেতরে প্রবেশ করছে।

র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে শহরে আসার পথটা খুব বেশি দীর্ঘ নয়। ধুলোমাখা রাস্তা ধীরে ধীরে শক্ত মাটির চওড়া পথে মিলেছে। দুই ধারে ছোট ছোট কাঠের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। কোথাও কাপড় শুকোচ্ছে, কোথাও একটা বাচ্চা ছেলে কাঠের চাকা গড়িয়ে খেলছে, কোথাও আবার বৃদ্ধা মহিলা বারান্দায় বসে ভুট্টার খোসা ছাড়াচ্ছে। রাস্তায় চলতে চলতে মানুষজন ওলফ লারসেনকে দেখে মাথা নেড়ে সম্ভাষণ জানাচ্ছে। কেউ থেমে দু&#039;একটা কথাও বলছে। লারসেনও সংক্ষেপে জবাব দিচ্ছে। মারদেকা বিস্মিত হয়ে সব দেখছে। পাহাড়ের তার গ্রামে সবাই সবাইকে চিনত। কিন্তু এই শহরে এত মানুষের মাঝেও একজন মানুষকে এত সম্মান করা যায়, সেটা তার কল্পনার বাইরে ছিল।

একসময় তারা শহরের মূল সড়কে পৌঁছাল। সঙ্গে সঙ্গেই মারদেকার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। দু&#039;পাশে সারি সারি দোকান। কোথাও কামারের দোকান থেকে হাতুড়ির টংটং শব্দ ভেসে আসছে। কোথাও কাঠমিস্ত্রি করাত চালাচ্ছে। একটা দোকানের সামনে ঝুলছে নানা রঙের কাপড়। আরেকটায় চামড়ার জুতো, বেল্ট আর জিন সাজানো। বাতাসে ঘোড়ার গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে গরম রুটির গন্ধ, তামাকের গন্ধ, চামড়া আর কাঠের গন্ধ। চারদিকের শব্দ যেন একসঙ্গে মিশে একটা জীবন্ত নদীর মতো বয়ে চলেছে। এত মানুষকে একসঙ্গে সে জীবনে কখনো দেখেনি।

মারদেকা কখনো ডানদিকে তাকায়, কখনো বাঁদিকে। কখনো দোকানের জানালার ভেতরে উঁকি দেয়, কখনো রাস্তার মাঝখান দিয়ে ছুটে যাওয়া ঘোড়ার গাড়ির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। একবার তো এতটাই মুগ্ধ হয়ে একটা খেলনার দোকানের সামনে থেমে গেল যে লারসেন কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে বুঝতে পারল ছেলেটা আর পাশে নেই। সে ফিরে তাকিয়ে দেখল, মারদেকা কাঁচের ওপারে রাখা ছোট্ট কাঠের ঘোড়াটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। লারসেন কিছু বলল না। শুধু মৃদু হেসে অপেক্ষা করল। মারদেকা নিজেই দৌড়ে এসে আবার তার পাশে দাঁড়াল। মুখে লজ্জার হাসি।

রাস্তার মোড়ে পৌঁছে লারসেন একটা বেকারির সামনে থামল। ভেতর থেকে সদ্য ওভেন থেকে বের হওয়া রুটির গন্ধ ভেসে আসছে। দোকানদার লারসেনকে দেখে হেসে বলল, &quot;অনেক দিন পর এদিকে এলেন।&quot;

লারসেনও হেসে জবাব দিল, &quot;র&#x200d;্যাঞ্চই সব সময় আটকে রাখে।&quot;

দোকানদারের চোখ এবার মারদেকার দিকে গেল। কৌতূহল নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে বলল, &quot;নতুন ছেলে?&quot;

লারসেন সংক্ষেপে বলল, &quot;এখন আমাদের সঙ্গেই আছে।&quot;

লোকটা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। পশ্চিমের মানুষ অযথা অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলায় না। সে কাউন্টারের ওপর থেকে একটা ছোট মধু মাখানো রুটি তুলে মারদেকার দিকে বাড়িয়ে দিল। মারদেকা প্রথমে লারসেনের মুখের দিকে তাকাল। অনুমতি পেয়ে ধীরে ধীরে রুটিটা হাতে নিল। এক কামড় দিতেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। এমন স্বাদ সে আগে কখনো পায়নি। দোকানদার হেসে উঠল। শিশুর মতো সেই বিস্ময় দেখে তার নিজেরও ভালো লাগল।

খাবার শেষ করে তারা আবার হাঁটা শুরু করল। কিছু দূর এগিয়ে একটা বড় দোতলা কাঠের ভবনের সামনে এসে লারসেন থামল। ভবনের ওপরে বড় অক্ষরে লেখা, ব্ল্যাক রিভার ব্যাংক। লারসেনের এখানে কিছু কাজ ছিল। সে মারদেকার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, &quot;এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। কোথাও যাবে না।&quot;

মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। এতদিনে সে এই কথাটুকু বুঝতে শিখেছে।

লারসেন ভবনের ভেতরে ঢুকে গেল।

মারদেকা একা দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখতে লাগল। তার কাছে প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি ঘোড়া, প্রতিটি দোকান যেন নতুন একটা গল্প। 

ঠিক তখনই রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা একজন লম্বা মানুষ তার দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটার গায়ে ধুলোমাখা কালো কোট, মাথায় নিচু করে পরা টুপি। মুখের বেশিরভাগটাই ছায়ায় ঢাকা। সে কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে মারদেকার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে চোখ সরিয়ে ব্যাংকের দরজার দিকে তাকাল, যেদিক দিয়ে ওলফ লারসেন ভেতরে ঢুকেছে।

লোকটার ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। তারপর কোনো তাড়াহুড়ো না করে সে রাস্তার ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।

মারদেকা কিছুই বুঝল না। সে আবার অন্যদিকে তাকিয়ে একটা ঘোড়ার গাড়ি দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু, সে জানলই না যে শহরটাকে সে স্বপ্নের মতো সুন্দর ভেবেছিল, সেই শহরই নীরবে তাকে আর ওলফ লারসেনকে এমন এক ঘটনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার পর থেকে তাদের কারও জীবন আর আগের মতো থাকবে না।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/259439/</link>
				<pubDate>Tue, 04 Aug 2026 06:30:40 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–পাঁচ<br />
রাতের শেষ প্রহর। ব্ল্যাক রিভারের ওপর তখনো ভোরের আলো নামেনি। শহরের প্রধান রাস্তার দুপাশে সারি সারি কাঠের দোকান, লোহার কারখানা, কামারের চুল্লি, ডাকঘর আর সেলুনগুলো অন্ধকারে ডুবে আছে। দিনের বেলা যে রাস্তা ঘোড়ার খুরের শব্দ, গরুর পাল, ব্যবসায়ীদের হাঁকডাক আর মাতাল কাউবয়দের হাসিতে মুখর&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-259439"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/259439/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">ab70088cd79dc7acec8c4327c29f7efc</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়–চার
দূরের ধুলোর রেখাটা ক্রমশ বড় হতে লাগল। বিকেলের সূর্য তখন পশ্চিমে একটু হেলে পড়েছে, কিন্তু তার তাপের কোনো কমতি নেই। শুষ্ক তৃণভূমির ওপর দিয়ে গরম বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সেই বাতাসে শুকনো ঘাস একসঙ্গে দুলে উঠছে, যেন অদৃশ্য কোনো হাত বারবার সেগুলোকে স্পর্শ করে যাচ্ছে। র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকেই এখন চোখ রেখে দিয়েছে দিগন্তের দিকে। মুহূর্তখানেক আগেও যেখানে শুধু ধুলোর অস্পষ্ট পর্দা দেখা যাচ্ছিল, এখন সেখানে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কয়েকটি ঘোড়া দ্রুত এগিয়ে আসছে। তাদের খুরের আঘাতে শুকনো মাটি উড়ে আকাশে ধুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। দূরত্ব এতটাই বেশি যে আরোহীদের মুখ চেনা যাচ্ছে না, কিন্তু তারা যে সোজা লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের দিকেই আসছে, তাতে আর কোনো সন্দেহ নেই।

ওলফ লারসেন বারান্দা থেকে ধীরে ধীরে নেমে এল। তার চলাফেরায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই, অথচ তাকে দেখলেই বোঝা যায়, মনের ভেতরে প্রতিটি সম্ভাবনার হিসাব সে ইতিমধ্যেই কষে ফেলেছে। কয়েক কদম এগিয়ে এসে সে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়াল। ক্লে মরগান, বাড হিগিন্স, মিগুয়েল, রুবেন কোল আর হ্যাঙ্ক ডসন নিঃশব্দে তার চারপাশে অবস্থান নিল। কেউ বন্দুক বের করল না, কিন্তু প্রত্যেকের হাত এমন জায়গায় রয়েছে, যেখান থেকে প্রয়োজন পড়লে এক মুহূর্তের মধ্যেই অস্ত্র বেরিয়ে আসবে। পশ্চিমের মানুষ অকারণে অস্ত্র প্রদর্শন করে না। তবে প্রয়োজনের সময় এক মুহূর্তও দেরি করে না।

মারদেকা বারান্দার খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। কয়েক মাস আগেও এমন দৃশ্যের অর্থ সে বুঝত না। কিন্তু র&#x200d;্যাঞ্চে কাটানো এই অল্প সময়েই সে মানুষের চোখের ভাষা পড়তে শিখেছে। ওলফ লারসেনের মুখ শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির নিচে সতর্কতা আছে। বাডের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। ক্লে সামান্য পা ফাঁক করে দাঁড়িয়েছে, যেন যে কোনো মুহূর্তে শরীর ঘুরিয়ে বন্দুক বের করতে পারবে। কেউ উচ্চস্বরে কথা বলছে না। এই নীরবতাই যেন সবচেয়ে জোরে কথা বলছে।

মারদেকার বুকের ভেতরও অজানা একটা চাপ অনুভূত হলো। পাহাড়ের জঙ্গলে বড় হওয়ায় বিপদের গন্ধ চিনতে তার ভুল হয় না। বনে হঠাৎ পাখির ডাক থেমে গেলে যেমন শিকারিরা বুঝে নেয়, আশপাশে কোনো শিকারি জন্তু ঘোরাফেরা করছে, ঠিক তেমনি মানুষের মাঝেও এমন এক ধরনের নীরবতা আছে, যার মানে হলো সবাই অপেক্ষা করছে। সেই অপেক্ষা কখনো আনন্দের হয় না।

ঘোড়সওয়াররা আরও কাছে এলো। এখন তাদের টুপি, ধুলোমাখা কোট আর ঘোড়াগুলোর রঙ আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে। পাঁচজন মানুষ। সামনে যে লোকটা, তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। প্রশস্ত কাঁধ, রোদে পোড়া মুখ, চিবুকে ছাঁটা দাড়ি। মাথার টুপিটা অনেক দিনের ব্যবহারেই রং হারিয়েছে। কোমরে রিভলভার ঝুলছে, কিন্তু তার হাত বন্দুকের ওপর নেই। পেছনের চারজনেরও একই অবস্থা। তাদের ভঙ্গিতে সতর্কতা আছে, কিন্তু শত্রুতার প্রকাশ নেই।

আরও খানিকটা কাছে আসতেই বাড হিগিন্সের মুখের কঠিন ভাব কিছুটা নরম হয়ে এল। সে চোখ কুঁচকে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলল, “মনে হচ্ছে চেনা মানুষ।”

ক্লে উত্তর দিল না। সে অপেক্ষা করল আরও কয়েক মুহূর্ত।

অবশেষে ঘোড়াগুলো র&#x200d;্যাঞ্চের বেড়ার সামনে এসে গতি কমিয়ে দিল। ধুলো ধীরে ধীরে থিতিয়ে পড়তে লাগল। সামনের লোকটা টুপির কিনারা সামান্য তুলে সম্মানের ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, “শুভ অপরাহ্ন, মিস্টার লারসেন।”

ওলফ লারসেন এবার লোকটাকে চিনতে পারল। তার মুখে ক্ষীণ হাসি ফুটল। “টম ব্যারেট।”

লোকটাও হেসে মাথা নেড়ে বলল, “ভাবছিলাম আপনি হয়তো চিনতে পারবেন না।”

“দশ বছরে মানুষ বদলায়,” লারসেন শান্ত গলায় বলল, “কিন্তু ভালো ঘোড়সওয়াররা খুব বেশি বদলায় না।”

উঠোনের টানটান উত্তেজনা যেন এক লহমায় খানিকটা কমে গেল। বাড ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিল কোমরের কাছ থেকে। হ্যাঙ্কও কাঁধের শক্তভাব কিছুটা ছেড়ে দিল। মারদেকা বুঝতে পারল, এরা শত্রু নয়। তবু তার কৌতূহল একটুও কমল না। কারণ সে এই মানুষগুলোর কাউকেই আগে দেখেনি।

টম ব্যারেট ঘোড়া থেকে নামল। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছে বোঝাই যাচ্ছে। তার কোটে ধুলোর আস্তরণ, বুটে শুকনো কাদা লেগে আছে। সে কয়েক পা এগিয়ে এসে লারসেনের সঙ্গে হাত মেলাল। তারপর চারপাশে তাকিয়ে বলল, “আপনার র&#x200d;্যাঞ্চ আগের চেয়ে আরও বড় হয়েছে।”

লারসেন হালকা হেসে বলল, “কাজ করলে জমিও বাড়ে, দায়ও বাড়ে।”

টমের মুখের হাসিটা মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল। “সেই দায়ের কথাই বলতে এসেছি।” কথাটা শুনে আবার নীরবতা নেমে এল।

মারদেকা দূর থেকে দাঁড়িয়ে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভাষার অর্ধেকও বোঝে না, কিন্তু মানুষের মুখ বুঝতে পারে। এই লোকটা এত দূর শুধু গল্প করতে আসেনি। তার চোখে পথের ক্লান্তির চেয়ে চিন্তার ছাপ বেশি।

ইলাই কখন যে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে, কেউ খেয়াল করেনি। বৃদ্ধও চুপচাপ আগন্তুকদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বহু বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, পশ্চিমের পথে কেউ যদি পাঁচজন মানুষ নিয়ে কোনো র&#x200d;্যাঞ্চে আসে, তবে তার কারণ সাধারণত সুখবর হয় না।

ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে বলল, “ভেতরে এসো। বাইরে দাঁড়িয়ে খারাপ খবর শোনার অভ্যাস আমার নেই।”

টম মাথা নেড়ে সায় দিল। সে নিজের লোকদের ইশারা করতেই তারাও ঘোড়া থেকে নেমে লাগাম ধরে উঠোনে ঢুকল।

মারদেকা স্বভাবতই একপাশে সরে দাঁড়াল। লোকগুলো তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একজন মাঝবয়সী কাউবয় কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকাল। অচেনা পোশাক, শ্যামলা মুখ, কালো চুল আর সেই ভিন্নধর্মী চোখ দেখে লোকটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু এগিয়ে চলে গেল।

মারদেকা তাদের চলে যেতে দেখল। তার মনে হচ্ছিল, এই মানুষগুলোর সঙ্গে শুধু নতুন মুখই আসেনি, এসেছে নতুন কোনো ঘটনা। র&#x200d;্যাঞ্চে আসার পর থেকে সে শিখেছে, পশ্চিমের জীবন কখনো একই রকম থাকে না। একদিন শান্ত, পরের দিন ঝড়। আজ সকালের সূর্য যেমন ছিল সাধারণ, বিকেলের আলো তেমন আর নেই।

সে ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগিয়ে এল। দরজার ভেতর দিয়ে দেখতে পেল, ওলফ লারসেন সবাইকে নিয়ে বসার ঘরে ঢুকছে। দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ হলো না। ভেতর থেকে চাপা গলায় কথাবার্তা শুরু হলো।

মারদেকা কিছুই বুঝতে পারল না। তবু তার মনে হলো, সেই কথাগুলোর ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে এমন কিছু, যা শুধু লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের ভবিষ্যৎ নয়, তার নিজের জীবনকেও অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।

বসার ঘরটার জানালাগুলো খোলা ছিল। বিকেলের আলো কাঠের মেঝের ওপর লম্বা আড়াআড়ি দাগ এঁকে রেখেছে। দেয়ালে ঝোলানো কয়েকটা পুরোনো রাইফেল, হরিণের শিং আর একটা বড় মানচিত্র ঘরটাকে যেন আরও গম্ভীর করে তুলেছে। মাঝখানে রাখা ভারী ওক কাঠের টেবিলের চারপাশে ওলফ লারসেন, টম ব্যারেট, ক্লে মরগান, বাড হিগিন্স, মিগুয়েল, রুবেন কোল আর হ্যাঙ্ক ডসন বসেছে। ইলাই নীরবে কফির পাত্র আর কয়েকটা মগ টেবিলে রেখে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে, এই আলোচনায় তার বলার কিছু নেই, কিন্তু শোনার মতো অনেক কিছু আছে।

মারদেকা বাইরে বারান্দার খুঁটির আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ভেতরের সব কথা তার কানে পৌঁছাচ্ছে না, তবে ভাঙা ভাঙা কিছু শব্দ সে ধরতে পারছে। কয়েক মাস আগেও এই শব্দগুলো তার কাছে অর্থহীন আওয়াজ ছিল। এখন অন্তত কিছু শব্দ তার পরিচিত। হর্স... ক্যাটল... ব্ল্যাক রিভার... শব্দগুলোর মানে পুরোপুরি না বুঝলেও সে আন্দাজ করতে পারে, আলোচনা র&#x200d;্যাঞ্চ আর শহরকে ঘিরেই।

টম ব্যারেট কফির মগটা হাতে নিয়েও চুমুক দিল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে সে ধীরে ধীরে বলল, “গত তিন সপ্তাহে শহরের আশপাশ থেকে মোট বারোটা গরু উধাও হয়েছে।”

লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। “জানি,” সে শান্ত গলায় বলল। “আমার তিনটাও গেছে।”

“শুধু আপনার নয়,” টম বলল। “ম্যাকঅ্যালিস্টারের চারটা, বুথের দুটো, আর দক্ষিণের ক্রিকের পাশে যারা থাকে, তাদেরও কয়েকটা গরু হারিয়েছে।”

মিগুয়েল নিচু গলায় বলল, “চিহ্ন পেয়েছিলাম। কিন্তু নদীর ধারে গিয়ে মিলিয়ে গেছে।”

টম এবার মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। “ঠিক সেটাই বলতে এসেছি। চিহ্নগুলো শুধু মিলিয়ে যায়নি। কেউ ইচ্ছে করেই মুছে ফেলেছে।”

ক্লে মরগান এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার সে টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে সামান্য ঝুঁকে এল। “কাউবয়?”

টম মাথা নাড়ল। “পেশাদার।” ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।

পশ্চিমে গরু চুরি নতুন কিছু নয়। ক্ষুধার্ত মানুষ একটা-দুটো গরু নিয়ে পালিয়েছে, এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কিন্তু যারা চিহ্ন মুছে ফেলে, নদী ব্যবহার করে পথ গোপন করে, বিভিন্ন র&#x200d;্যাঞ্চ থেকে অল্প অল্প করে গরু সরিয়ে নেয়, তারা সাধারণ চোর নয়। তারা পরিকল্পনা করে কাজ করে।

ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে কফিতে চুমুক দিল। “শহরের মার্শাল কী করছে?”

টম মৃদু হেসে ফেলল। সেই হাসিতে আনন্দের চেয়ে বিদ্রূপ বেশি। “মার্শাল এলি ব্রুকস ভালো মানুষ। কিন্তু ব্ল্যাক রিভারের বাইরে তার লোক নেই। শহরের রাস্তা সে সামলাতে পারে, প্রেইরির পঞ্চাশ মাইল ভেতরে গিয়ে নয়।”

বাড হিগিন্স জানতে চাইলো, “তাহলে?”

“তাই আমরা নিজেরাই খোঁজ করছি।” টম আগের মতই হেসে উত্তর দিল।

লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর উঠে গিয়ে দেয়ালে ঝোলানো মানচিত্রটার সামনে দাঁড়াল। ব্ল্যাক রিভার শহর, তার উত্তরের পাহাড়, পশ্চিমের শুকনো প্রেইরি, দক্ষিণের নদী আর পূর্বের বনভূমি, সবকিছু সেই মানচিত্রে আঁকা আছে। আঙুল দিয়ে কয়েকটা জায়গা দেখিয়ে সে বলল, “যদি কেউ গরু নিয়ে যায়, তাকে কোথাও বিক্রি করতে হবে। এতগুলো গরু লুকিয়ে রাখা যায় না।”

টমও উঠে এসে মানচিত্রের সামনে দাঁড়াল। “সেটাই সমস্যা। ব্ল্যাক রিভারে বিক্রি হয়নি।”

“তাহলে?”

“হয় আরও পশ্চিমে... নয়তো সীমান্তের ওপারে।”

ক্লে ধীরে ধীরে শিস দিল। “সীমান্তের ওপারে গেলে আর ফেরত পাওয়া কঠিন।”

“জানি।”

মারদেকা দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরের সবাইকে দেখছিল। সে কথাগুলো বুঝতে পারছে না, কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারছে, ঘরের ভেতরে কেউ রাগ করছে না, কেউ চিৎকার করছে না, অথচ সবাই খুব চিন্তিত। তার পাহাড়ি গ্রামের মানুষ হলে এতক্ষণে তর্ক শুরু হয়ে যেত। এখানে সবাই ধীরে ধীরে কথা বলছে। যেন প্রতিটি শব্দের দাম আছে।

ঠিক তখনই ইলাই বাইরে বেরিয়ে এল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মারদেকাকে দেখে মৃদু হেসে বলল, “ক্ষুধা?”

শব্দটা মারদেকা এখন চেনে। সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

ইলাই তার কাঁধে হাত রেখে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে সে লক্ষ্য করল, মারদেকা বারবার পেছন ফিরে বসার ঘরের দিকে তাকাচ্ছে।

বৃদ্ধ সেটা বুঝতে পারল। হেসে বলল, “একদিন... সব বুঝবে।”

মারদেকা পুরো বাক্যটা বুঝল না। কিন্তু ওয়ান ডে কথাটা ইলাই আগেও শিখিয়েছিল। সে শুধু মৃদু হেসে মাথা নেড়ে দিল।

রান্নাঘরে ঢুকেই সে সদ্য বেক করা রুটি আর গরম স্ট্যুর বাটি টেবিলে নামিয়ে রাখলো। মারদেকার দিকে ফিরে স্নেহভরা চোখে বললো, “এসো খেয়ে নাও।”

সে কথাটা বুঝল না, কিন্তু কণ্ঠের উষ্ণতা বুঝল। এই র&#x200d;্যাঞ্চে আসার পর সে একটা বিষয় শিখেছে, সব ভাষা শব্দ দিয়ে বলা হয় না। কিছু ভাষা শুধু মানুষের চোখ আর ব্যবহারে লুকিয়ে থাকে।

খেতে খেতে তার চোখ চলে গেল জানালার বাইরে। সেখান থেকে দূরে ব্ল্যাক রিভার শহরের কয়েকটা ছাদের মাথা দেখা যায়। দুপুরের আলোয় সেগুলো ঝিলমিল করছে। একটা গির্জার চূড়া, তার পাশে ধোঁয়া উঠতে থাকা লোহার কারখানা, আরও দূরে সেলুনের উঁচু সাইনবোর্ড বাতাসে দুলছে।

শহরটা খুব দূরে নয়। হাঁটলে হয়তো আধঘণ্টার পথ। মারদেকা দীর্ঘক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল। সে এখনো শহরটাকে ঠিকমতো দেখেনি। প্রথম দিন ক্লান্ত শরীরে শুধু রাস্তা আর মানুষ দেখেছিল। তারপর থেকে তার পৃথিবী সীমাবদ্ধ ছিল লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চেই।

কিন্তু আজ তার মনে হলো, ওই শহরের ভেতরেও নিশ্চয়ই আরেকটা পৃথিবী আছে। সেখানে এমন মানুষ আছে, যারা এই র&#x200d;্যাঞ্চের লোকদের মতো নয়। সেখানে দোকান আছে, লোহার কারখানা আছে, হোটেল আছে, সেলুন আছে, হয়তো বিপদও আছে।

আর বসার ঘরে যে আলোচনা চলছে, তার সুতোও যেন গিয়ে মিশেছে সেই শহরের কোথাও।

বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছিল। লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চের ওপর দুপুরের তীব্র উত্তাপ আর নেই। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা একটু কাত হয়ে পড়েছে। মাঠের ওপর দিয়ে দীর্ঘ ছায়া পড়তে শুরু করেছে। বসার ঘরের আলোচনা শেষ হতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল। টম ব্যারেট আর তার সঙ্গীরা যখন বাইরে বেরিয়ে এল, তখন তাদের মুখে আসার সময়কার ক্লান্তির সঙ্গে আরও একটা অনুভূতি যোগ হয়েছে। সেটা হলো দায়িত্বের ভার। বিদায়ের আগে ওলফ লারসেন প্রত্যেকের সঙ্গে করমর্দন করল। বেশি কথা বলল না। শুধু বলল, সাবধানে থাকবে। পশ্চিমে এখন আর আগের মতো শান্ত সময় নেই।

টম নিজের ঘোড়ায় ওঠার আগে একবার চারপাশে তাকাল। তার চোখ গিয়ে থামল আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মারদেকার ওপর। ছেলেটা নীরবে সব দেখছে। চোখে কৌতূহল, কিন্তু অকারণ ভয় নেই। টম কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ওলফ লারসেনকে বলল, ”এই ছেলেটাই কি সেই ইন্ডিয়ান বালক, যাকে কয়েক মাস আগে শহর থেকে নিয়ে এসেছিলেন?

লারসেন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

টম আবার মারদেকার দিকে তাকাল। তারপর মৃদু হেসে বলল, ”বদলে গেছে। প্রথম দেখার সময় মনে হয়েছিল পথ হারানো এক বুনো শাবক। এখন দেখছি চোখে অন্যরকম স্থিরতা এসেছে”।

লারসেন শান্ত গলায় বলল, ”মানুষের জীবনে কখনো কখনো শুধু একটা সুযোগই যথেষ্ট”।

টম আর কিছু বলল না। ঘোড়ার লাগাম টেনে সে সঙ্গীদের নিয়ে শহরের দিকে রওনা হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই খুরের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল। ধুলো ধীরে ধীরে বসে এলো। র&#x200d;্যাঞ্চে আবার সেই চেনা নীরবতা ফিরে এল। কিন্তু এই নীরবতা আগের মতো নিশ্চিন্ত নয়। যেন অদৃশ্য কোনো ছায়া চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মারদেকা অনেকক্ষণ পর্যন্ত পথটার দিকে তাকিয়ে রইল। লোকগুলো চলে গেলেও তাদের কথাবার্তার আবহ যেন বাতাসে রয়ে গেছে। সে কিছুই বুঝতে পারেনি, কিন্তু অনুভব করেছে, বড়দের মুখে আজ হাসি কম ছিল। পশ্চিমের এই নতুন পৃথিবীতে সে একটা জিনিস শিখেছে। যখন অভিজ্ঞ মানুষ কম কথা বলে, তখন বুঝতে হয় সামনে সহজ সময় নেই।

সন্ধ্যার আগেই বাড হিগিন্স তাকে ডাকল। হাতের ইশারায় আস্তাবলের ভেতরে নিয়ে গেল। আজ নতুন কোনো কাজ শেখানোর ইচ্ছে আছে তার।

আস্তাবলের ভেতরে ঢুকতেই পরিচিত গন্ধটা নাকে এল। শুকনো খড়, ঘোড়ার গায়ের উষ্ণতা, চামড়ার জিনে মাখানো তেল আর পুরোনো কাঠের গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছে। কয়েকটা ঘোড়া নিশ্চিন্তে খড় চিবোচ্ছে। কেউ আবার অলস ভঙ্গিতে মাথা দুলিয়ে মাছি তাড়াচ্ছে।

বাড একটা মোটা দড়ি হাতে তুলে মারদেকার সামনে দাঁড়াল। তারপর দড়িটা ভাঁজ করে একটা ফাঁস তৈরি করল। ধীরে ধীরে দেখাতে লাগল কীভাবে দড়ি পাকাতে হয়, কীভাবে ফাঁসটা গোল রাখতে হয়। সে জানে, ভাষা দিয়ে বোঝানো এখনো কঠিন। তাই প্রতিটি কাজ খুব ধীরে, খুব পরিষ্কারভাবে করছে।

মারদেকা মন দিয়ে দেখল। তারপর বাড দড়িটা তার হাতে তুলে দিল। প্রথমবারেই ফাঁসটা এলোমেলো হয়ে গেল।

বাড মাথা নেড়ে আবার দেখাল। দ্বিতীয়বার আগের চেয়ে ভালো হলো। তৃতীয়বারে দড়িটা প্রায় ঠিকঠাক পাকাতে পারল মারদেকা।

বাডের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে এবার আস্তাবলের বাইরে একটা কাঠের খুঁটি দেখিয়ে ইশারা করল।

মারদেকা বুঝল, এবার ফাঁস ছুড়ে খুঁটিটাকে ধরতে হবে। সে চেষ্টা করল। ফাঁস গিয়ে খুঁটির অনেক আগে মাটিতে পড়ে গেল।

আবার চেষ্টা করল। এবার খুঁটির ওপর দিয়ে চলে গেল। তৃতীয়বার দড়িটা খুঁটিতে লেগেও আটকে রইল না।

বাড একবারও বিরক্ত হলো না। সে জানে, রশি ছোড়া শুধু হাতের জোরের ব্যাপার নয়। এতে ধৈর্য লাগে, সময় লাগে।

মারদেকাও হাল ছাড়ল না। সে বারবার চেষ্টা করতে লাগল। 

একসময় বাড লক্ষ্য করল, ছেলেটা প্রতিবার ভুল করার পর একটু থেমে ভাবছে। আগের ভুলটা যেন মনে রাখার চেষ্টা করছে। এই স্বভাবটাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

ঠিক তখনই পাশের ঘোড়ার খোঁয়াড় থেকে একটা তরুণ ঘোড়া হঠাৎ জোরে হ্রেষাধ্বনি করে উঠল। নতুন মানুষ দেখলে সে প্রায়ই অস্থির হয়ে পড়ে। দড়ি টানতে টানতে মাথা উঁচু করে ছটফট করতে লাগল।

বাড দ্রুত সেদিকে এগোতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই মারদেকা দড়িটা মাটিতে রেখে ধীরে ধীরে ঘোড়াটার দিকে এগিয়ে গেল।

তার হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সে সরাসরি ঘোড়ার চোখের দিকে তাকাল না। একটু পাশ ঘেঁষে গিয়ে খুব আস্তে করে নিজের ভাষায় কী যেন বলতে শুরু করল। সেই ভাষা বাডের অচেনা। শব্দগুলো পাহাড়ি ঝরনার মতো ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে।

ঘোড়াটা প্রথমে আরও একবার মাথা ঝাঁকাল। তারপর ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করল। মারদেকা আলতো করে তার ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণীটা স্থির হয়ে গেল।

বাড অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সকালেও সে এমন একটা দৃশ্য দেখেছিল। এখন আবার দেখল। এটা কাকতালীয় নয়।

বাড বহু বছর ধরে ঘোড়া সামলাচ্ছে। তার অভিজ্ঞতা বলছে, কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই প্রাণীদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারে। শেখানো যায় না, শুধু থাকে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। তারপর খুব ধীরে বলল, তুমি ঘোড়াদের ভাষা জানো, তাই না?

মারদেকা কথাটা বুঝল না। কিন্তু বাডের চোখের গভীর মুগ্ধতা বুঝতে পারল।

দূরে তখন ওলফ লারসেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। তার মুখে আগের মতোই সেই সংযত ভাব।

কিন্তু মনে মনে সে উপলব্ধি করছিল, এই ছেলেটার শিক্ষা শুধু বই, অক্ষর আর র&#x200d;্যাঞ্চের কাজে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রকৃতি তাকে এমন কিছু উপহার দিয়েছে, যা কোনো শিক্ষক শেখাতে পারে না।

আর পশ্চিমের এই কঠিন পৃথিবীতে এমন উপহার একদিন আশীর্বাদও হতে পারে, আবার অভিশাপও।

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে পশ্চিমের বিশাল আকাশ জুড়ে লাল, কমলা আর সোনালি রঙের বিস্তীর্ণ চাদর বিছিয়ে দিল। সারাদিনের ব্যস্ততার পর লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ যেন দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। দূরের চারণভূমি থেকে গরুর পাল ফিরছে। তাদের গলায় বাঁধা ঘণ্টাগুলোর টুংটাং শব্দ বাতাস ভরিয়ে তুলেছে। আস্তাবলের সামনে কয়েকটা ঘোড়া মাথা নিচু করে খড় খাচ্ছে। শুকনো ঘাসের গন্ধ, ঘোড়ার শরীরের উষ্ণ গন্ধ আর কাঠের পুরোনো আস্তাবলের গন্ধ মিশে চারপাশে এক পরিচিত পরিবেশ তৈরি করেছে। দিনের শেষ আলোয় কাউবয়রা ধীরে ধীরে নিজেদের কাজ গুটিয়ে নিচ্ছে। কেউ লাগাম খুলছে, কেউ জিন নামিয়ে যত্ন করে ঝুলিয়ে রাখছে, কেউ আবার পানির ট্যাংক ভরছে। সারাদিনের ক্লান্তি তাদের শরীরে স্পষ্ট, কিন্তু কাজ শেষ করার আগ পর্যন্ত কারও হাতে অলসতা নেই।

মারদেকাও আজ অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যস্ত ছিল। বাড হিগিন্স তাকে ছোট ছোট কয়েকটা দায়িত্ব দিয়েছিল। কখনো পানির বালতি টেনে আনতে হয়েছে, কখনো ঘোড়ার সামনে খড় রাখতে হয়েছে, কখনো আবার ব্যবহৃত ব্রাশগুলো পরিষ্কার করে জায়গামতো রেখে দিতে হয়েছে। কাজগুলো খুব সাধারণ হলেও ছেলেটা এমন মনোযোগ দিয়ে করছিল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তার কাঁধেই তুলে দেওয়া হয়েছে। বাড দূর থেকে কয়েকবার তাকিয়ে দেখেছে। কোথাও ভুল হলে ধৈর্য ধরে শুধরে দিয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় তার চোখ এড়িয়ে যায়নি। মারদেকাকে একবার কোনো কাজ দেখিয়ে দিলে দ্বিতীয়বার একই ভুল আর হচ্ছে না। এই বয়সে এমন মনোযোগ খুব কম ছেলের মধ্যেই দেখা যায়।

ওলফ লারসেনও কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। গত কয়েক দিনে সে বুঝে গেছে, এই ছেলেটার সবচেয়ে বড় শক্তি তার শরীর নয়, তার শেখার ক্ষমতা। মানুষ তাকে যা শেখায়, সে শুধু তা নকল করে না; বোঝার চেষ্টা করে। আর যেদিন কোনো মানুষ বোঝার চেষ্টা শুরু করে, সেদিন থেকেই সে অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। মারদেকা তখন একটা ভারী কাঠের বালতি দুই হাতে ধরে পানির ট্যাংকের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। বালতিটা তার জন্য যথেষ্ট ভারী। হাঁটার সময় শরীর সামান্য দুলে যাচ্ছে। তবু সে থামছে না, অভিযোগ করছে না। 

লারসেন কিছুক্ষণ সেটা দেখে শান্ত গলায় ডাকল, &quot;মারদেকা।&quot; ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে সেই চিরচেনা কৌতূহল। লারসেন হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। মারদেকা এগিয়ে এলে সে র&#x200d;্যাঞ্চের পশ্চিম দিকের দিকে আঙুল তুলে দেখাল। গাছের সারির ওপাশে দূরে ব্ল্যাক রিভার শহরের কয়েকটা ছাদের মাথা আর চার্চের চূড়ার অস্পষ্ট অবয়ব দেখা যাচ্ছে। তারপর নিজের বুকের দিকে আঙুল রেখে আবার শহরের দিকে ইশারা করল। ধীরে ধীরে বলল, &quot;আগামীকাল... শহর।&quot; 

কথাটা মারদেকা পুরো বুঝতে পারল না। কিন্তু ইশারাটা বুঝল। তার চোখ মুহূর্তের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বুকের ভেতর যেন কেউ হঠাৎ আগুন জ্বেলে দিল। 

তিন দিন পাহাড় পেরিয়ে সে যে শহরের আলো দেখে ছুটে এসেছিল, সেই শহরকে সে এখনো সত্যিকার অর্থে দেখেইনি। প্রথম দিন রাতের অন্ধকারে সেলুনে ঢুকেছিল, তারপর সোজা এই র&#x200d;্যাঞ্চে চলে এসেছে। তারপর থেকে তার পৃথিবী বলতে এই র&#x200d;্যাঞ্চ, এই মাঠ, এই আস্তাবল আর এই মানুষগুলো। কাল সে প্রথমবার সেই রহস্যময় শহরের ভেতরে যাবে। উত্তেজনায় তার ছোট্ট বুকটা দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল।

ইলাই তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে মারদেকার পাশে দাঁড়াল। ছেলেটার চোখের উচ্ছ্বাস দেখে তার নিজেরও মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে বলল, &quot;শহর বড় অদ্ভুত জায়গা। সেখানে মানুষ অনেক। কেউ তোমাকে সাহায্য করবে, কেউ ঠকানোর চেষ্টা করবে। কেউ হাসিমুখে কথা বলবে, আবার কেউ চোখের দিকেও তাকাবে না। মনে রাখবে, ভালো মানুষকে চিনতে যেমন সময় লাগে, খারাপ মানুষকেও তেমনি চিনতে শেখা দরকার।&quot; 

মারদেকা কথাগুলোর অর্ধেকও বুঝল না। কিন্তু ইলাইয়ের কণ্ঠের কোমলতা আর সতর্কতার মিশ্র সুর তার কানে ঠিকই পৌঁছাল। সে শুধু বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, শহরটা নিশ্চয়ই এমন এক জায়গা, যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন বিস্ময় অপেক্ষা করে থাকে।

রাতের খাবারের সময় র&#x200d;্যাঞ্চের সবাই আগের মতোই লম্বা কাঠের টেবিলে একসঙ্গে বসেছিল। বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে, কিন্তু ভেতরে ঝোলানো কেরোসিন লণ্ঠনের হলুদ আলোয় ঘরটা উষ্ণ আর প্রাণবন্ত লাগছিল। 

কথাবার্তার ফাঁকে ড্যান ম্যাকরি জানাল, ”কয়েক দিনের মধ্যেই ব্ল্যাক রিভারে বড় গবাদিপশুর হাট বসবে। আশপাশের প্রায় সব র&#x200d;্যাঞ্চ থেকেই লোকজন আসবে”। 

রুবেন কোল বলল, ”গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শহরে অনেক অচেনা লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের বেশির ভাগই কাউবয় নয়, আবার ব্যবসায়ীও মনে হয় না”। 

ক্লে মরগান মাথা না তুলে শান্ত গলায় বলল, &quot;অচেনা মুখ যত বাড়ে, বিপদের গন্ধও তত ঘন হয়।&quot; 

কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত সবাই চুপ করে রইল। ওলফ লারসেন কোনো মন্তব্য করল না। সে শুধু ধীরে ধীরে কফির মগটা নামিয়ে রাখল। তার নীরবতাই যেন বলে দিচ্ছিল, কথাগুলো সে গুরুত্ব দিয়েই শুনেছে।

খাওয়াদাওয়া শেষ হওয়ার পর মারদেকা একা বাইরে বেরিয়ে এল। র&#x200d;্যাঞ্চের চারপাশে ততক্ষণে রাতের নীরবতা নেমে এসেছে। আকাশ এত পরিষ্কার যে অসংখ্য তারা যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। দূরে ব্ল্যাক রিভার শহরের ছোট ছোট আলো জ্বলছে। অন্ধকারের মধ্যে আলোগুলোকে দেখে তার মনে পড়ল সেই প্রথম রাতের কথা, যখন ক্ষুধার্ত আর ক্লান্ত শরীর নিয়ে সে পাহাড়ের চূড়া থেকে এই একই আলো দেখেছিল। তখন এই আলো তার কাছে ছিল শুধু স্বপ্নের প্রতিশ্রুতি। আর আজ সেই স্বপ্নের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে সে। আগামীকাল সে সেই শহরের রাস্তায় হাঁটবে, মানুষের ভিড় দেখবে, দোকান দেখবে, হয়তো নতুন কিছু শিখবে। হয়তো পৃথিবীটা তার কল্পনার চেয়েও বড়। 

কিন্তু সে জানে না, একই শহরের অন্য প্রান্তে এই মুহূর্তেই আরেকটি গল্প শুরু হয়ে গেছে। ব্ল্যাক রিভারের এক নির্জন গলির ভেতরে মদের গন্ধে ভরা অন্ধকার ঘরে কয়েকজন লোক গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় কথা বলছে। তাদের সামনে ছড়িয়ে রাখা একটা পুরোনো মানচিত্রের ওপর মোটা কালিতে চিহ্ন দেওয়া আছে একটি জায়গা। লারসেন র&#x200d;্যাঞ্চ। লম্বা, কালো কোট পরা লোকটা ধীরে ধীরে আঙুল দিয়ে সেই নামের ওপর চাপ দিল। তার ঠোঁটের কোণে শীতল একটা হাসি ফুটে উঠল। সে খুব নিচু স্বরে বলল, &quot;আর বেশি দেরি নেই।&quot; ঘরের ভেতর আর কেউ কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু তাদের চোখের দৃষ্টিই বলে দিল, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে। 
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/259351/</link>
				<pubDate>Mon, 03 Aug 2026 05:45:23 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়–চার<br />
দূরের ধুলোর রেখাটা ক্রমশ বড় হতে লাগল। বিকেলের সূর্য তখন পশ্চিমে একটু হেলে পড়েছে, কিন্তু তার তাপের কোনো কমতি নেই। শুষ্ক তৃণভূমির ওপর দিয়ে গরম বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সেই বাতাসে শুকনো ঘাস একসঙ্গে দুলে উঠছে, যেন অদৃশ্য কোনো হাত বারবার সেগুলোকে স্পর্শ করে যাচ্ছে। র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা প্র&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-259351"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/259351/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">608cd5dec53c41e50a508def575d771d</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়-তিন
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি মাটিতে নেমে আসেনি। পূর্ব দিগন্তের নিচু আকাশে লালচে আভা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, যেন রাতের কালো পর্দার নিচ থেকে কেউ নিঃশব্দে আগুনের রেখা টেনে দিচ্ছে। দূরের পাহাড়গুলো এখনো গাঢ় ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মাথার ওপর কুয়াশার পাতলা আস্তরণ ভেসে বেড়াচ্ছে, আর নিচের বিশাল তৃণভূমির ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো প্রথম আলোর স্পর্শে ক্ষণিকের জন্য রুপোর মতো ঝলসে উঠছে। 

বাতাসে রাতের শীতলতা এখনো রয়ে গেছে। সেই বাতাসে শুকনো সেজবুশের গন্ধ, ভেজা মাটির গন্ধ আর দূরের আস্তাবল থেকে ভেসে আসা ঘোড়ার উষ্ণ নিশ্বাসের গন্ধ একসঙ্গে মিশে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যা শুধু পশ্চিমের এই বিস্তীর্ণ প্রান্তরেই অনুভব করা যায়। চারপাশ এতটাই নীরব যে দূরে কোথাও একা একটা ম্যাগপাই ডেকে উঠতেই মনে হলো, বিশাল প্রান্তর যেন তার উত্তর শুনতে থেমে গেছে। কিন্তু এই নীরবতা প্রতারণাময়। কারণ ওলফ লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে দিনের কাজ শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখানে সূর্য ওঠার অপেক্ষা করে কেউ জীবন শুরু করে না। যারা এই কঠিন ভূখণ্ডে বেঁচে থাকতে শিখেছে, তারা জানে, দিনের প্রথম আলো ওঠার আগের সময়টুকুই সবচেয়ে মূল্যবান।

আস্তাবলের সামনে তখন মৃদু ব্যস্ততা। রাতের শিশিরে ভিজে থাকা কাঠের বেড়ার গায়ে লণ্ঠনের শেষ আলোটা মিটমিট করছে। দুজন কর্মচারী ঘোড়াগুলোর সামনে খড় ফেলছে, আরেকজন বড় কাঠের টবে পানি ভরছে। ঘোড়াগুলোও বুঝতে পেরেছে আজ তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। কেউ খুর দিয়ে মাটি আঁচড়াচ্ছে, কেউ নাক দিয়ে গরম বাষ্প ছাড়ছে, কেউ আবার অস্থির হয়ে মাথা নাড়ছে। তাদের চামড়ার গায়ে হাত বুলিয়ে, জিনের ফিতে টেনে, লাগাম পরীক্ষা করে একে একে প্রস্তুত হচ্ছিল চারজন মানুষ। 

ক্লে মরগান নিজের কালো ঘোড়াটার পাশে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে জিনের নিচের বেল্ট শক্ত করছিল। কাজের সময় তার মুখে কোনো তাড়াহুড়ো থাকে না। প্রতিটি গিঁট, প্রতিটি বাকল, প্রতিটি চামড়ার ফিতে সে এমনভাবে পরীক্ষা করে যেন যুদ্ধের আগে সৈনিক নিজের অস্ত্র পরীক্ষা করছে। তার একটু দূরে মিগুয়েল হাঁটু গেড়ে বসে একটা খুর তুলে দেখছিল। আঙুল দিয়ে লোহার নাল ছুঁয়ে দেখল, তারপর ঘোড়াটার পা নামিয়ে দিয়ে মাটির ওপর চোখ বুলিয়ে নিল। অন্যদের কাছে এটা হয়তো অভ্যাস, কিন্তু মিগুয়েলের কাছে প্রতিটি খুর, প্রতিটি দাগ, প্রতিটি ভাঙা ঘাসের ডগা একটা ভাষা। যে ভাষা পড়ে সে মানুষের গতিবিধি বুঝে নিতে পারে। রুবেন কোল কোমরের বেল্টে গুলি গুঁজছিল। কাজ করতে করতেও ঠোঁটের কোণে তার সেই চিরচেনা হাসিটা লেগেই আছে। যেন পৃথিবীতে এমন কোনো বিপদ নেই, যেটাকে একটু ঠাট্টা দিয়ে হালকা করা যায় না। আর হ্যাঙ্ক ডসন চুপচাপ একটা কাঠের খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে উইনচেস্টারের নলে তেল মাখানো কাপড় বুলিয়ে যাচ্ছিল। বিশাল শরীরের মানুষটা যতটা ভয়ংকর দেখতে, কাজের সময় ততটাই ধীর আর নিখুঁত। তার মুখে কোনো কথা নেই, শুধু অভ্যাসে গড়া স্থিরতা।

বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে সবকিছু দেখছিল ওলফ লারসেন। হাতে ধোঁয়া ওঠা কালো কফির মগ। পরনে গাঢ় রঙের শার্ট, তার ওপর চামড়ার ভেস্ট। কোমরে আগের মতোই রিভলভার ঝুলছে, কিন্তু আজ সে নিজে কোথাও যাচ্ছে না। তার প্রয়োজনও নেই। নেতা সব যুদ্ধে নিজে নামে না, কখন লোক পাঠাতে হয় আর কখন নিজে এগোতে হয়, সেটা সে জানে। তার দৃষ্টি একবার ক্লের ওপর, একবার মিগুয়েলের ওপর, আবার রুবেন আর হ্যাঙ্কের ওপর ঘুরে গেল। এই চারজনকে সে বহু বছর ধরে চেনে। প্রত্যেকের শক্তি কোথায়, দুর্বলতা কোথায়, কে বিপদের সময় কী সিদ্ধান্ত নেবে, সব তার জানা। তাই নির্দেশ দেওয়ার সময় সে কখনো অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না।

কিছুক্ষণ পরে ক্লে এগিয়ে এসে বারান্দার নিচে দাঁড়াল। মাথার টুপিটা সামান্য তুলে বলল, “বস, আমরা প্রস্তুত।”

লারসেন মগটা ঠোঁট থেকে নামাল। তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য চারজনের মুখের ওপর ঘুরে গেল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “গরুগুলো আমার দরকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার তোমাদের জীবিত ফিরে আসা।”

চারজনই নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

লারসেন আবার বলল, “চিহ্ন যতই পরিষ্কার হোক, অন্ধভাবে পিছু নেবে না। কেউ যদি ইচ্ছে করে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়, বুঝবে ফাঁদ পাতা হয়েছে।”

মিগুয়েল বলল, “আমি সামনে থাকব।”

“সেই কারণেই বলছি,” লারসেন উত্তর দিল। “মাটি তোমাকে সত্যি কথা বলে, কিন্তু মানুষ সবসময় বলে না।”

কথাটা শুনে রুবেন মৃদু হেসে ফেলল। “আপনি না থাকলে আমরা অর্ধেক বুদ্ধি নিয়েই চলি, বস।”

লারসেন তাকাল না। শুধু বলল, “তাই হলে আজ পুরো বুদ্ধিটাই ব্যবহার করবে।”

ক্লে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল। রোদ এখনো ওঠেনি, তবু তার চোখে সেই চিরচেনা কঠিন দীপ্তি। সে লাগাম টেনে ঘোড়াটাকে সামনের দিকে আনল। “ফিরতে দেরি হলে অপেক্ষা করবেন না।”

লারসেনের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল। “দেরি হলে বুঝব, তোমরা কাজ করছ। আর যদি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসো, তখন প্রশ্ন করব।”

রুবেন নিচু স্বরে হেসে উঠল। হ্যাঙ্কের দাড়ির আড়ালেও যেন অল্প হাসি দেখা গেল। শুধু ক্লে কোনো জবাব দিল না। তার কাছে কাজই কথা।

ঠিক সেই সময় বারান্দার দরজার আড়ালে একটা ছোট্ট ছায়া নড়ে উঠল। মারদেকা।

ঘুম ভাঙার পর প্রথমে সে বুঝতেই পারেনি কোথায় আছে। কয়েক মুহূর্ত বিছানায় বসে থাকার পর আগের রাতের সব ঘটনা মনে পড়তেই তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে এসেছে। নতুন শার্টটা এখনো তার গায়ে একটু ঢিলেঢালা। প্যান্টের কোমর বেল্ট দিয়ে আঁটতে হয়েছে। পায়ে বুট পরার অভ্যাস না থাকায় হাঁটার সময় এখনো একটু অস্বস্তি হচ্ছে। তবু সে নিঃশব্দে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কেউ তাকে লক্ষ্য না করে।

তার চোখ একবার ঘোড়াগুলোর দিকে, একবার বন্দুকের দিকে, আবার মানুষের মুখের দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাহাড়ের গ্রামে শিকারিরা অস্ত্র নিয়ে বেরোত, কিন্তু এমন প্রস্তুতি সে কখনো দেখেনি। এখানে প্রত্যেকটা কাজের মধ্যে একটা নিয়ম আছে, একটা শৃঙ্খলা আছে। কেউ চিৎকার করছে না, কেউ অকারণে ব্যস্ত নয়। অথচ প্রত্যেকে জানে, সামনে বিপদ থাকতে পারে। এই দৃশ্যটা তার কাছে নতুন, অদ্ভুত, আর একই সঙ্গে মুগ্ধকর।

ওলফ লারসেন প্রথমেই ছেলেটাকে দেখতে পেল। কিছু না বলে শুধু হাতের দুই আঙুল সামান্য নেড়ে তাকে কাছে ডাকল।

মারদেকা একটু ইতস্তত করল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার পায়ের শব্দ প্রায় শোনা যায় না।

লারসেন নিচু হয়ে তার চোখের সমান উচ্চতায় এল। তারপর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা চারটা ঘোড়ার দিকে ইশারা করল, আবার উত্তর দিগন্তের দিকে হাত বাড়াল। কোনো শব্দ নয়, শুধু ইশারা।

মারদেকা মন দিয়ে সেটা দেখল। তারপর মাথা তুলে চারজন মানুষের দিকে তাকাল। আবার দূরের পথের দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত পর খুব আস্তে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সে অর্থটা ধরতে পেরেছে। তারা কোথাও যাচ্ছে।

লারসেনের চোখে অদৃশ্য একটুখানি সন্তুষ্টি ফুটে উঠল। ভাষা এখনো আলাদা, কিন্তু বোঝাপড়ার প্রথম সেতুটি যেন নীরবে তৈরি হতে শুরু করেছে।

চারজন অশ্বারোহী একে একে লাগাম টেনে ঘোড়াগুলোকে ঘুরিয়ে নিল। প্রথমে ক্লে মরগান, তার ঠিক পেছনে মিগুয়েল, তারপর রুবেন কোল আর সবশেষে হ্যাঙ্ক ডসন। আস্তাবলের সামনে জমে থাকা ভেজা মাটিতে খুরের আঘাতে ছোট ছোট কাদা ছিটকে উঠল। সকালের নিস্তব্ধতা ভেঙে একসঙ্গে চার জোড়া খুরের ছন্দময় শব্দ উঠোন পেরিয়ে ধীরে ধীরে র&#x200d;্যাঞ্চের উত্তর দিকের সরু পথ ধরে মিলিয়ে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ পর্যন্ত তাদের পিঠ দেখা যাচ্ছিল। তারপর তারা একটা ঢালু টিলা অতিক্রম করতেই শুধু ধুলোর হালকা রেখাটা ভেসে রইল। সেটাও শেষ পর্যন্ত সকালের বাতাসে মিলিয়ে গেল। বিশাল প্রান্তর আবার নিস্তব্ধ হয়ে উঠল। কিন্তু সেই নীরবতা আর আগের মতো ছিল না। যেন কয়েক মুহূর্ত আগেই এখানে ঘটে যাওয়া প্রস্তুতির প্রতিধ্বনি এখনো বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মারদেকা অনেকক্ষণ উত্তর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে কৌতূহল, বিস্ময়, আর এক অদ্ভুত অনুভূতি, যার নাম সে নিজেও জানে না। পাহাড়ের ওপারের ছোট্ট গ্রামে বড় হওয়ার সময় সে বহুবার শিকারিদের দলকে জঙ্গলে ঢুকতে দেখেছে। কেউ আর ফিরত না, এমনও হয়েছে। কেউ আহত হয়ে ফিরেছে। আবার কেউ শিকার নিয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু সেখানে মানুষের দল ছিল ছোট, অস্ত্র ছিল সাধারণ, আর উদ্দেশ্য ছিল বেঁচে থাকা। এখানে যেন সবকিছু অন্যরকম। এই মানুষগুলো শিকারে যায় না, দায়িত্ব পালন করতে যায়। তারা এমনভাবে বেরিয়ে গেল যেন এটাই তাদের প্রতিদিনের জীবন। বিপদ যেন তাদের কাছে ভয় নয়, কাজেরই একটা অংশ। মারদেকা বুঝতে পারছিল না, এই পৃথিবীটা তার পরিচিত পৃথিবী থেকে এত আলাদা কেন। তবু তার মনে হচ্ছিল, সে এই পার্থক্যগুলো জানতে চায়।

ওলফ লারসেন আর কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কফির শেষ চুমুক দিয়ে মগটা রেলিংয়ের ওপর রেখে ঘুরে ভেতরে চলে গেল। যাওয়ার আগে শুধু একবার মারদেকার দিকে তাকিয়েছিল। কোনো নির্দেশ দেয়নি, কোনো ডাকও দেয়নি। কিন্তু সেই দৃষ্টির মধ্যে এমন একটা নিশ্চিন্ত ভরসা ছিল, যেন সে জানে ছেলেটা কোথাও পালিয়ে যাবে না। মারদেকাও নড়ল না। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই র&#x200d;্যাঞ্চের সকাল দেখতে লাগল।

এখন চারদিকে ব্যস্ততা বাড়তে শুরু করেছে। দূরের গরুর খোঁয়াড় থেকে কর্মচারীরা পাল বের করে আনছে। শত শত গরু ধীরে ধীরে খোলা মাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের গলার ঘণ্টার একটানা টুংটাং শব্দ সকালের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। কয়েকজন কাউবয় লম্বা লাঠি হাতে গরুগুলোকে দিক নির্দেশ করছে। কেউ বাঁশির মতো চিকন শিস দিচ্ছে, কেউ ছোট ছোট শব্দ করে পশুগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আশ্চর্যের বিষয়, এত বড় পাল নিয়েও কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই। প্রত্যেক মানুষ জানে তার কাজ, প্রত্যেক প্রাণীও যেন নিজের নিয়মে চলতে অভ্যস্ত। মারদেকা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। তার গ্রামের মানুষ এত বড় গরুর পাল কখনো একসঙ্গে দেখেনি। এতগুলো প্রাণীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা মৃদু কাশির শব্দ শোনা গেল।

মারদেকা ফিরে তাকিয়ে দেখল, ইলাই দাঁড়িয়ে আছে। বৃদ্ধের হাতে একটা কাঠের ট্রে। তার ওপর ধোঁয়া ওঠা এক বাটি ওটমিল, দুটো মোটা রুটির টুকরো আর একটা মাটির মগ। ইলাই ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা নাড়ল। তারপর হাতের ইশারায় তাকে ভেতরে ডাকল।

মারদেকা একটু ইতস্তত করল। বাইরে এত কিছু দেখার আছে, তবু বৃদ্ধের মুখের কোমল হাসিটা তাকে আশ্বস্ত করল। সে ধীরে ধীরে ইলাইয়ের পিছু নিল।

রান্নাঘরের পাশের ছোট্ট খাবার ঘরটায় সকালবেলার আলো জানালা দিয়ে ঢুকে কাঠের টেবিলের ওপর পড়েছে। রাতের মতো বড় আয়োজন নেই। লারসেন সম্ভবত আগেই খেয়ে নিজের কাজে চলে গেছে। টেবিলে শুধু দুটো প্লেট সাজানো। ইলাই ট্রেটা নামিয়ে মারদেকার সামনে খাবার এগিয়ে দিল। তারপর নিজের বুকে হাত রেখে বলল, ”ইলাই।&quot;

মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলল। সেও নিজের বুকের ওপর হাত রেখে বলল, ”মারদেকা।&quot;

ইলাই খুশি হয়ে মাথা নেড়ে হাসল। তারপর রুটিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে ধীরে ধীরে বলল, &quot;ব্রেড।&quot;

মারদেকা শব্দটা মন দিয়ে শুনল। ঠোঁট নেড়ে বলার চেষ্টা করল, &quot;বে...ড।&quot; উচ্চারণটা ঠিক হলো না।

ইলাই হেসে ফেলল না। ধৈর্য ধরে আবার বলল, &quot;ব্রেড।&quot;

এইবার মারদেকা একটু ধীরে বলল, &quot;ব্রেড।&quot;

বৃদ্ধের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে মগটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, কফি।&quot;

মারদেকা শব্দটা পুনরাবৃত্তি করল। &quot;ক...ফি।&quot;

ইলাই আবার মাথা নাড়ল। এরপর একে একে সে কয়েকটা সহজ শব্দ শেখাতে লাগল। &quot;ওয়াটার।&quot; &quot;ফুড।&quot; &quot;ডোর।&quot; প্রতিবারই প্রথমে নিজে বলছে, তারপর জিনিসটা দেখাচ্ছে, শেষে মারদেকাকে বলার সুযোগ দিচ্ছে। কোনো বই নেই, কোনো অক্ষর নেই, কোনো চাপ নেই। শুধু জিনিসের সঙ্গে শব্দের পরিচয়। যেন একটা ছোট্ট শিশু প্রথমবার পৃথিবীর নামগুলো শিখছে।

মারদেকার চোখে তখন সেই একই তীব্র মনোযোগ। সে শুধু শব্দ মুখস্থ করছে না, মানুষের ভাষার ভেতর ঢোকার দরজাটা খুঁজে পাচ্ছে। প্রতিটি নতুন শব্দ বলার পর তার মুখে এমন এক ধরনের আনন্দ ফুটে উঠছিল, যেন সে অদৃশ্য কোনো ধন খুঁজে পেয়েছে।

খাওয়া শেষ হলে ইলাই তাকে নিয়ে বাড়ির পেছনের দিকে বেরিয়ে এল। সকালের রোদ তখন আরও উজ্জ্বল হয়েছে। র&#x200d;্যাঞ্চের পেছনে একটা সরু পথ চলে গেছে ফলের বাগানের পাশ দিয়ে। কয়েকটা পুরোনো আপেলগাছ, দু-একটা নাশপাতির গাছ আর তার ফাঁকে ফাঁকে ছোট সবজিখেত। ইলাই হাঁটতে হাঁটতে মাঝেমধ্যে কোনো গাছের দিকে আঙুল দেখিয়ে তার নাম বলছিল। মারদেকা সবকিছুই মন দিয়ে শুনছিল। অনেক শব্দই সে ঠিকমতো বলতে পারছিল না, কিন্তু তার মনে রাখার ক্ষমতা অসাধারণ। একবার শুনেই আবার বলার চেষ্টা করছিল।

বাগান পেরিয়ে তারা যখন আস্তাবলের কাছে পৌঁছাল, তখন ভেতর থেকে ঘোড়ার নড়াচড়ার শব্দ ভেসে আসছিল। দুপুরের রোদ তখনো খুব তীব্র হয়নি। বাতাসে শুকনো খড়ের গন্ধ, চামড়ার জিনে লাগানো তেলের গন্ধ আর ঘোড়ার শরীরের উষ্ণ গন্ধ মিশে আছে। দূরে কয়েকজন কাউবয় গরুর পাল নিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছে। কেউ লাগাম টানছে, কেউ দড়ি গুটিয়ে কাঁধে ফেলছে। চারপাশে অবিরাম কাজ চলছে, কিন্তু অযথা কোনো চিৎকার নেই। প্রত্যেকে জানে তার দায়িত্ব কী।

আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল বাড হিগিন্স। হাতে একটা মোটা ব্রাশ, সামনে বাদামি রঙের এক বৃদ্ধ ঘোড়া। সে ধীরে ধীরে প্রাণীটার গা পরিষ্কার করছিল। মারদেকা আর ইলাইকে আসতে দেখে সে কাজ থামাল। কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার চোখে বিস্ময় ছিল না। কারণ এই ছেলেটাকে সে আগেই দেখেছে। সেই রাতে রকডাস্ট সেলুনে, ধুলোয় মাখা, ক্ষুধায় কাতর, ভীত একটা হাফ-ব্রীড ছেলেকে ওলফ লারসেন নিজের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। তখনই বাড ভেবেছিল, লোকটা হয়তো এক রাত আশ্রয় দিয়ে বিদায় করবে। কিন্তু কয়েকদিন পর সেই একই ছেলেকে পরিষ্কার কাপড় পরে র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ধারণা বদলাতে শুরু করেছে।

বাড ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। মারদেকার চারপাশে একবার ঘুরে দেখল। তারপর মৃদু হেসে বলল, &quot;তোমাকে তো চেনাই যাচ্ছে না।&quot;

মারদেকা কথাটা বুঝল না। শুধু লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

ইলাই হেসে বলল, &quot;ও এখনো ভাষা শিখছে।&quot;

বাড মাথা নেড়ে আবার ঘোড়ার দিকে ফিরল। কিছু না বলে হাতে থাকা ব্রাশটা মারদেকার দিকে বাড়িয়ে দিল।

মারদেকা ব্রাশটার দিকে তাকাল। তারপর বাডের দিকে।

বাড এবার ঘোড়ার গায়ে ধীরে ধীরে দু-একবার ব্রাশ চালিয়ে দেখাল। এরপর আবার ব্রাশটা ছেলেটার হাতে দিল।

এবার আর বুঝতে অসুবিধা হলো না। মারদেকা সাবধানে ঘোড়ার কাছে এগিয়ে গেল। প্রথমে হাত বাড়িয়ে প্রাণীটার গলায় আলতো করে স্পর্শ করল। ঘোড়াটাও শান্তভাবে তার গন্ধ শুঁকে আবার মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সে ধীরে ধীরে ব্রাশ চালাতে শুরু করল।

প্রথম কয়েকবার হাতের চাপ বেশি হয়ে গেল। ঘোড়াটা কান নাড়ল। বাড সঙ্গে সঙ্গে তার কবজি আলতো করে ধরে চাপটা কমিয়ে দিল। কোনো কথা বলল না। শুধু কাজটা আবার করে দেখাল।

মারদেকা মন দিয়ে দেখল। তারপর আবার চেষ্টা করল। এবার অনেক ভালো হলো।

বাড একটু দূরে সরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করতে লাগল। ছেলেটা একবার যে ভুল করছে, দ্বিতীয়বার আর সেই ভুল করছে না। প্রতিটা নির্দেশ মন দিয়ে দেখছে, তারপর নিজের মতো করে ঠিক করে নিচ্ছে। এই গুণটা বাডের নজর এড়াল না।

প্রায় আধঘণ্টা কেটে গেল। বাদামি ঘোড়াটার গা ধীরে ধীরে ধুলোহীন হয়ে উঠল। রোদে তার লোম চকচক করতে লাগল।

বাড এগিয়ে এসে নিজের হাতে ঘোড়ার গায়ে একবার হাত বুলিয়ে দেখল। তারপর খুব সংক্ষেপে বলল, &quot;ভালো।&quot;

শব্দটা ছোট। কিন্তু মারদেকা বুঝে গেল, এটা প্রশংসা। তার মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।

বাডও অজান্তে হাসল। তার মনে পড়ল সেই রাতের কথা। রকডাস্ট সেলুনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ধুলোয় ঢাকা, ক্ষুধার্ত ছেলেটার চোখেও ঠিক এমনই একগুঁয়ে আলো ছিল। আজও সেই আলো আছে। শুধু তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নিরাপত্তার অনুভূতি। সে নিজের মনে ভাবল, &quot;হয়তো বস ভুল করেননি।&quot;

ঠিক তখনই আস্তাবলের ভেতর থেকে একটা ধূসর ঘোড়া অস্থির হয়ে হ্রেষাধ্বনি করে উঠল। বাড ঘুরে তাকাল। তারপর মারদেকার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় ডাকল। তাকে নিয়ে গেল আস্তাবলের এক কোণে। সেখানে সারি করে ঝুলছে জিন, লাগাম, দড়ি আর নানা ধরনের সরঞ্জাম। প্রতিটা ব্যবহারের পর পরিষ্কার করে নির্দিষ্ট জায়গায় ঝুলিয়ে রাখা হয়। বাড একটা পুরোনো চামড়ার জিন নামিয়ে তার হাতে দিল। 

মারদেকা কয়েক মুহূর্ত জিনটার দিকে তাকিয়ে রইল। চামড়ার তৈরি ভারী জিনিসটা তার কাছে অদ্ভুত লাগছিল। এতদিন সে শুধু মানুষের পিঠে কিংবা ঘোড়ার খালি পিঠে চড়ে পথ চলতে দেখেছে। এমনভাবে চামড়া আর লোহার তৈরি একটা আসন ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলাফেরা করতে পারে, এটা সে আগে জানত না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সে আঙুল দিয়ে জিনটার গায়ে হাত বুলিয়ে দেখল। বহু বছরের ব্যবহারে চামড়াটা নরম হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দাগ পড়েছে, আবার কোথাও নতুন করে তেল লাগানোর কারণে হালকা চকচক করছে। পিতলের বাকলগুলো সকালের আলোয় মৃদু ঝিলিক দিচ্ছে। ছেলেটার চোখে আবার সেই পরিচিত কৌতূহল ফুটে উঠল।

বাড কিছু বলল না। সে জানত, ভাষা দিয়ে বোঝানোর চেয়ে দেখিয়ে শেখানোই এখন সবচেয়ে সহজ উপায়। সে দুই হাতে জিনটা তুলে আস্তে করে ধূসর রঙের শান্ত স্বভাবের একটা ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দিল। তারপর একে একে বেল্টগুলো কোথা দিয়ে নামাতে হয়, বুকের নিচে কীভাবে আটকে দিতে হয়, আর পেটের নিচ দিয়ে যাওয়া চামড়ার ফিতে কতটা শক্ত করে বাঁধতে হয়, সব ধীরে ধীরে দেখাতে লাগল। প্রতিটি নড়াচড়া ছিল অভ্যাসে নিখুঁত, তাড়াহুড়ো নেই, অস্থিরতা নেই। বোঝাই যায়, এই কাজ সে হাজারবার করেছে। কাজ শেষ করে সে আবার সব খুলে ফেলল। তারপর জিনটা দুহাতে তুলে মারদেকার দিকে বাড়িয়ে দিল।

মারদেকা প্রথমে একটু ইতস্তত করল। তারপর জিনটা হাতে নিল। ওজন তার ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। দুই হাতে ধরেও ভার সামলাতে গিয়ে শরীরটা সামান্য কেঁপে উঠল। দাঁত চেপে সে সেটাকে ঘোড়ার পিঠে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু প্রথম চেষ্টাতেই জিনটা এক পাশে কাত হয়ে ঝুলে পড়ল। সে বিস্মিত চোখে বাডের দিকে তাকাল। বাড শুধু মাথা নেড়ে আবার চেষ্টা করতে ইশারা করল।

দ্বিতীয়বার জিনটা ঠিকই পিঠে উঠল, কিন্তু অনেকটা সামনে চলে গেল। এবারও বাড কিছু বলল না। শুধু হাত বাড়িয়ে সঠিক জায়গাটা দেখিয়ে দিল। মারদেকা আবার নামাল। আবার তুলল। তৃতীয়বারও ভুল হলো। চতুর্থবারও পুরোপুরি ঠিক হলো না। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, সে একই ভুল দ্বিতীয়বার করছে না। প্রতিবারই আগের চেয়ে একটু ভালো হচ্ছে। তার কপালে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু জমেছে। বাহুর পেশি টনটন করছে। তবু একবারের জন্যও বিরক্ত হয়ে জিনটা ফেলে দেয়নি।

কিছুটা দূরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওলফ লারসেন নীরবে সব দেখছিল। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। তার দৃষ্টি ছিল মারদেকার ওপর। ছেলেটা কত দ্রুত শিখছে, সেটা নয়, সে দেখছিল কীভাবে শিখছে। অনেক মানুষ প্রথম ব্যর্থতার পরেই অজুহাত খোঁজে। কেউ বলে কাজটা কঠিন, কেউ বলে তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু এই হাফ ব্রীড ছেলেটা একবারও নিজের অক্ষমতার দিকে তাকাচ্ছে না। সে শুধু বুঝতে চাইছে কোথায় ভুল হয়েছে।

ঠিক তখনই ইলাই ট্রেতে করে কফি নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। একটা মগ লারসেনের হাতে দিয়ে আরেকটা বাডের দিকে বাড়িয়ে ধরল।

বাড হাত তুলে মৃদু হাসল। &quot;এখন না।&quot; তার চোখ তখনও মারদেকার দিকেই।

আরেকবার চেষ্টা করল ছেলেটা। এবার সে আগের ভুলগুলো মনে রাখল। জিনটা তুলে একটু পেছনের দিকে সরিয়ে আস্তে করে নামিয়ে দিল। এবার সেটা ঠিক জায়গায় বসে গেল। সে নিজেও বুঝতে পারল, কিছু একটা ঠিক হয়েছে। বাড ধীরে ধীরে ঘোড়াটার চারপাশ ঘুরে দেখল। তারপর তার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। &quot;এই তো হয়েছে।&quot;

মারদেকা কথাটা বুঝল না। কিন্তু লোকটার চোখের ভাষা বুঝল। নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণেও একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।

বাড এবার হাঁটু গেড়ে বসে ঘোড়ার পেটের নিচ দিয়ে ঝুলে থাকা বেল্টটার দিকে আঙুল দেখাল। তারপর নিজের হাতে একবার টেনে দেখিয়ে ইশারা করল, এবার এটা বাঁধতে হবে।

মারদেকা ধীরে ধীরে ঘোড়ার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। হাত বাড়িয়ে বেল্টটা ধরতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘোড়াটা বিরক্ত হয়ে ঠুক করে একটা পা মাটিতে মারল। শব্দটা আস্তাবলের ভেতর প্রতিধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়ল। নতুন কেউ হলে হয়তো ভয় পেয়ে সরে যেত। মারদেকাও এক মুহূর্ত থমকে গেল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে ধীরে ধীরে নিজের হাতটা ঘোড়াটার পেটের পাশে রেখে আলতো করে বুলিয়ে দিল। তারপর খুব নিচু স্বরে নিজের মাতৃভাষায় কী যেন বলতে শুরু করল।

বাড বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। ইলাইও থেমে গেল।

কথাগুলোর অর্থ কেউ বুঝল না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কয়েক মুহূর্ত আগেও যে ঘোড়াটা অস্থির ছিল, সে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল। মাথা নিচু করে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। মারদেকা এবার অনায়াসে বেল্টটা টেনে এনে বাকলে আটকে দিল।

আস্তাবলের ভেতর কয়েক সেকেন্ডের জন্য নীরবতা নেমে এল। বাড ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার বহু বছরের অভিজ্ঞতায় এমন দৃশ্য খুব বেশি দেখা হয়নি। সব ঘোড়া মানুষের ভাষা বোঝে না, কিন্তু মানুষের আচরণ বোঝে। আর এই ছেলেটার মধ্যে প্রাণীদের সঙ্গে অদ্ভুত এক সহজ সম্পর্ক আছে। সে ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তার মুখটা অমলিন হাসিতে ভরে উঠলো।

বাডের মুখে আবারো প্রশংসার হাসি দেখে মারদেকা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। মানুষের চোখের ভাষা বোঝার জন্য কোন শব্দ দরকার হয় না। বাডের চোখে অবহেলা ছিল না, করুণা ছিল না। ছিল এক ধরনের স্বীকৃতি। সেই স্বীকৃতি ছেলেটার বুকের ভেতরে অদ্ভুত একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল। পাহাড়ের গ্রামের জীবনে কেউ তাকে কখনো কোনো কাজের জন্য বাহবা দেয়নি। সেখানে সবাই কাজ করত, কারণ কাজ না করলে বেঁচে থাকা যেত না। ভালো করলে কেউ আলাদা করে কিছু বলত না, ভুল করলে শাসন মিলত। অথচ এই অচেনা মানুষটা সামান্য একটা জিন ঠিকমতো বসাতে পারার জন্য তার কাঁধে হাত রেখে হাসল। ছোট্ট ঘটনাটা মারদেকার মনে এমনভাবে গেঁথে গেল, যেন বহুদিনের শুকনো মাটিতে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়েছে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ওলফ লারসেনও এবার কফির মগটা নামিয়ে রাখল। তার স্থির চোখের গভীরে চিন্তার একটা নতুন রেখা ফুটে উঠল। সে মনে মনে বুঝল, এই ছেলেটা শুধু শেখার ক্ষমতা নিয়েই আসেনি। প্রকৃতি তাকে আরও কিছু দিয়ে পাঠিয়েছে।

এরপরের দিনগুলোতে বাড প্রায় প্রতিদিনই তাকে সঙ্গে রাখত। প্রথমে সহজ কাজ, তারপর একটু কঠিন। কখনো ঘোড়ার গা ব্রাশ করতে দিত, কখনো খড় এনে দিতে বলত, কখনো লাগাম পরিষ্কার করাত। কোনো কাজই তাড়াহুড়ো করে শেখাত না। ভুল করলে ধমক দিত না, আবার একই ভুল দ্বিতীয়বার করতে দিত না। মারদেকাও অবিশ্বাস্য ধৈর্য নিয়ে প্রতিটি কাজ শিখতে লাগল। একবার দেখলে দ্বিতীয়বার আর ভুল করত না। তার চোখ যেন সবকিছু গিলে নিচ্ছিল। বাড মাঝে মাঝে অবাক হয়ে দেখত, যে ছেলেটা এখনো ঠিকমতো ইংরেজি বলতে পারে না, সে শুধু হাতের ইশারা দেখেই পুরো কাজটা বুঝে ফেলছে। অনেক সময় কোনো নির্দেশ দেওয়ার আগেই সে বুঝে যেত পরের কাজটা কী হতে পারে। ধীরে ধীরে র&#x200d;্যাঞ্চের কর্মচারীরাও বিষয়টা লক্ষ্য করতে শুরু করল। কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলত না, কিন্তু প্রায় সবাই বুঝে গেল, ছেলেটা সাধারণ নয়।

অন্যদিকে সন্ধ্যা নামলেই মারদেকার আরেকটা জীবন শুরু হতো। রাতের খাবার শেষে ইলাই তাকে নিয়ে যেত সেই ছোট্ট পড়ার ঘরে। কেরোসিনের লণ্ঠনের হলদে আলোয় টেবিলের ওপর খুলে রাখা থাকত স্লেট, চক আর পুরোনো কয়েকটা বই। ইলাই ধীরে ধীরে তাকে অক্ষর শেখাত। প্রথমদিকে অক্ষরগুলো তার কাছে ছিল পাথরের গায়ে আঁকা রহস্যময় চিহ্নের মতো। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সে বুঝতে শুরু করল, এই ছোট ছোট চিহ্ন একসঙ্গে মিলেই মানুষের কথা হয়ে যায়। সে নিজের নাম লিখতে শিখল। প্রথমে কাঁপা হাতে বড় বড় অক্ষরে, তারপর একটু একটু করে ঠিকঠাক। নিজের নাম লেখা শেষ হলে সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই অক্ষরগুলোর দিকে। এতদিন তার নাম ছিল শুধু একটা শব্দ, যা মানুষ মুখে বলত। আজ প্রথমবার সে দেখল, সেই নাম কাগজেও বেঁচে থাকতে পারে। ইলাইয়ের চোখে তখন এমন আনন্দ, যেন নিজের নাতিকে প্রথম লেখা শিখতে দেখছে।

ওলফ লারসেন সবকিছু দূর থেকে দেখত। তার স্বভাবই ছিল এমন। সে অযথা কাউকে প্রশংসা করত না, আবার অহেতুক হস্তক্ষেপও করত না। বারান্দায় বসে কফির মগ হাতে অনেক সন্ধ্যায় সে দেখেছে, পড়ার ঘরের জানালার পাশে মাথা নিচু করে বসে আছে মারদেকা। কখনো আবার আস্তাবলের পাশে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার কেশর আঁচড়ে দিচ্ছে। কোনো কাজেই তার অস্থিরতা নেই। যেন প্রতিটি মুহূর্ত থেকে কিছু না কিছু শিখে নেওয়ার চেষ্টা করছে। 

এক সন্ধ্যায় বাড বারান্দায় উঠে এসে চুপচাপ লারসেনের পাশে দাঁড়িয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ দুজনের কেউ কথা বলেনি। তারপর বাড নিচু গলায় বলেছিল, &quot;বস, ছেলেটার হাত অন্যরকম। ঘোড়াগুলো ওকে খুব তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করে ফেলছে।&quot; 

লারসেন কফিতে এক চুমুক দিয়ে শুধু বলেছিল, &quot;মানুষের আগে পশুরা অনেক সময় সত্যিকারের স্বভাব চিনতে পারে।&quot; তারপর আবার নীরবতা নেমে এসেছিল।

কিন্তু এই শান্ত দিনগুলোও বেশিদিন অশান্তিহীন রইল না। এক বিকেলে কাজ শেষ হওয়ার মুখে দূরের পাহাড়ি পথের দিকে নজর পড়তেই পাহারায় থাকা এক কাউবয় হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। সবাই তাকিয়ে দেখল, পশ্চিমের আলোয় দূরে ধুলোর সরু রেখা উঠছে। প্রথমে মনে হলো, হয়তো কয়েকজন সাধারণ পথিক। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই বোঝা গেল, ঘোড়াগুলো প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসছে। র&#x200d;্যাঞ্চের উঠোনে কাজ করা লোকেরা একে একে থেমে গেল। কেউ লাগাম শক্ত করে ধরল, কেউ বন্দুকের দিকে হাত বাড়াল। ওলফ লারসেন বারান্দা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো ভয় নেই, কিন্তু চোখ দুটো আরও ধারালো হয়ে উঠেছে।

মারদেকাও সবার সঙ্গে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না কী হয়েছে, কিন্তু চারপাশের পরিবেশ বদলে যাওয়ার কারণ অনুভব করতে পারছে। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে উঠোনে হাতুড়ির শব্দ, মানুষের হাসি আর ঘোড়ার ডাক মিলেমিশে ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। দূরের ধুলোর রেখাটা ক্রমশ বড় হচ্ছে। সূর্য তখন পশ্চিমের পাহাড়ের কাঁধে হেলে পড়েছে। সেই লাল আলোয় দ্রুত ছুটে আসা অশ্বারোহীদের অবয়ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল।

ওলফ লারসেন খুব আস্তে বলল, &quot;সবাই প্রস্তুত থাকো।&quot; তার গলার স্বর ছিল শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত স্বরের মধ্যেই এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যাতে উপস্থিত প্রত্যেক মানুষ বুঝে গেল, নতুন কিছু শুরু হতে যাচ্ছে।

মারদেকা নিঃশব্দে লারসেনের দিকে তাকাল। তার ছোট্ট বুকের ভেতর অকারণ ধুকপুক শুরু হয়েছে। সে জানে না কারা আসছে। জানে না কেন সবাই এত সতর্ক। কিন্তু তার মনে হলো, যেদিন সে পাহাড় পেরিয়ে এই র&#x200d;্যাঞ্চে এসেছিল, সেদিন যেমন তার জীবনের একটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল, ঠিক তেমনি আজও আরেকটি নতুন অধ্যায়ের দরজা ধীরে ধীরে খুলতে যাচ্ছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/259299/</link>
				<pubDate>Sun, 02 Aug 2026 12:13:29 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়-তিন<br />
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি মাটিতে নেমে আসেনি। পূর্ব দিগন্তের নিচু আকাশে লালচে আভা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, যেন রাতের কালো পর্দার নিচ থেকে কেউ নিঃশব্দে আগুনের রেখা টেনে দিচ্ছে। দূরের পাহাড়গুলো এখনো গাঢ় ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মাথার ওপর কুয়াশার পাতলা আস্তরণ ভেসে বেড়াচ্ছে, আর নিচের বিশাল তৃণভূ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-259299"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/259299/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">61cc4c9079a9c81cd39ec48abddbbc76</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়-দুই
রকডাস্ট সেলুন থেকে বেরিয়েই ওলফ লারসেন থামল না। ধীর পায়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। মারদেকাও কোনো কথা না বলে তার পিছু পিছু চলল। শহরের রাত তখন পুরোপুরি নেমে এসেছে। রাস্তার দু&#039;পাশে কাঠের খুঁটির মাথায় ঝোলানো কেরোসিনের বাতিগুলো হলদে আলো ছড়িয়ে নিস্তব্ধ পরিবেশটাকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে। দিনের ভিড় নেই, কিন্তু শহর তখনো ঘুমোয়নি। কোথাও মাতালের চিৎকার, কোথাও তাসের আড্ডা, কোথাও আবার লোহার নালের সঙ্গে পাথরে ঘোড়ার খুরের ঠকঠক শব্দ ভেসে আসছে। সেলুন থেকে বেরিয়ে আসা লোকগুলো একবার লারসেনের দিকে, আরেকবার তার পেছনে হাঁটা ধুলোয় মাখা হাফ ব্রীড ছেলেটার দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে উঠেলো। কিন্তু, কেউ সামনে এসে কিছু বলার সাহস পেল না।

মারদেকা হাঁটতে হাঁটতে চারপাশ দেখছিল। এত বড় শহরে সে এই প্রথম রাত দেখছে। প্রতিটা জিনিসই তার কাছে নতুন। দোকানের সামনে কাঁচের জানালা, লোহার সাইনবোর্ড, রঙিন কাপড় ঝোলানো বারান্দা, কামারের দোকানের সামনে সাজিয়ে রাখা ঘোড়ার নাল, কসাইখানার সামনে ঝোলানো গরুর চামড়া, সবকিছুই তার চোখে বিস্ময় জাগাচ্ছে। মাঝে মাঝে কোনো ঘোড়া পাশ দিয়ে চলে গেলে সে একটু সরে দাঁড়াচ্ছে। আবার কোনো কুকুর ঘেউ ঘেউ করলে চমকে উঠছে। কিন্তু একবারও লারসেনকে হারিয়ে ফেলছে না। অদ্ভুত একটা বিশ্বাস জন্মে গেছে তার মনে। লোকটা যতক্ষণ সামনে আছে, ততক্ষণ কেউ তাকে আঘাত করবে না।

ব্ল্যাক রিভারের প্রধান রাস্তা পেরিয়ে তারা শহরের উত্তর দিকের উঁচু জায়গাটায় উঠে এলো। এখানকার বাড়িগুলো নিচের শহরের বাড়িগুলোর মতো গাদাগাদি করে বানানো নয়। প্রতিটা বাড়ির সামনে খোলা জায়গা। কোথাও ঘোড়ার আস্তাবল, কোথাও ছোট ফলের বাগান, কোথাও আবার গবাদি পশুর ঘের। আরও খানিকটা এগিয়ে একটা বড় কাঠের বাড়ির সামনে এসে থামল লারসেন। চারদিকে সাদা রঙের বেড়া। ভেতরে কয়েকটা ওক গাছ। বারান্দার একপাশে সারি করে রাখা দোলনা চেয়ার। বাড়িটার পাশেই বিশাল একটা আস্তাবল। ভেতর থেকে ঘোড়ার নড়াচড়ার শব্দ ভেসে আসছে। দরজার ওপরে ঝোলানো লণ্ঠনের আলোয় পুরো জায়গাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

মারদেকা মাথা উঁচু করে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার গ্রামের প্রধানের ঘরটাও এর অর্ধেক ছিল না। এত বড় বাড়ির কথা সে শুধু গল্পেই শুনেছে।

লারসেন সোজা বারান্দায় উঠে দরজায় হাত রাখতেই ভেতর থেকে খুলে গেল সেটা। প্রায় ষাট বছরের এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। মাথার চুল প্রায় সাদা। গায়ে পরিষ্কার এপ্রোন। মুখে বয়সের ছাপ থাকলেও চোখদুটো এখনো তীক্ষ্ণ।

বৃদ্ধ প্রথমে লারসেনের দিকে তাকাল। তারপর মারদেকাকে দেখে কপাল কুঁচকে গেল, &quot;এ কে?&quot;

লারসেন কোট খুলতে খুলতে শান্ত গলায় বলল, &quot;আজ থেকে ও আমাদের সঙ্গে থাকবে।&quot;

বৃদ্ধের মুখে বিস্ময় আরও বেড়ে গেল। বৃদ্ধ বলল, &quot;একজন... ইন্ডিয়ান?&quot;

লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। &quot;হাফ ব্রীড।&quot; এক কথার বেশি বলল না।

বৃদ্ধ আর প্রশ্ন করল না। লারসেনের সঙ্গে প্রায় ত্রিশ বছর আছে সে। এই মানুষটার স্বভাব সে জানে। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে লারসেন অনেক ভেবে নেয়। একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে সেটা বদলায় না। সে একটু সরে দাঁড়াল। লারসেন ভেতরে ঢুকল।

মারদেকা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। জীবনে প্রথমবার এমন একটা বাড়ির ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছে সে। তার পা যেন এগোতে চাইছে না। ভয় করছে, ভেতরে ঢুকলেই হয়তো কেউ তাকে বের করে দেবে।

লারসেন পেছন ফিরে তাকাল। তারপর শুধু হাতের ইশারায় ডাকল। মারদেকা এবার ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

বাড়িটার ভেতরটাও তার কাছে বিস্ময়ের আরেক জগৎ। মেঝেতে মোটা কার্পেট। দেয়ালে ঝোলানো হরিণ আর বাইসনের শিং। একপাশে পাথরের তৈরি ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছে। আগুনের হলদে আলো ঘরটাকে আরামদায়ক করে তুলেছে। দেয়ালে কয়েকটা বন্দুক সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা। একটা কাঁচের আলমারিতে সারি সারি বই। ছাদের কড়িকাঠে ঝুলছে তামার লণ্ঠন।

মারদেকা পা টিপে টিপে হাঁটছিল। তার মনে হচ্ছিল, একটু জোরে হাঁটলেই বুঝি এত সুন্দর ঘরটা ভেঙে যাবে।

বৃদ্ধ তখনো ছেলেটার দিকে তাকিয়ে। তার চোখে কৌতূহলের সঙ্গে একটা সংশয়ও আছে।

লারসেন সেটা বুঝতে পারল। শান্ত গলায় বলল, &quot;ইলাই, গরম পানি বসাও।&quot;

বৃদ্ধ অবাক হয়ে বলল, &quot;গোসল করাবেন?&quot;

&quot;হ্যাঁ।&quot;

&quot;আর কাপড়?&quot;

&quot;আমার ছেলের পুরোনো কাপড়গুলো আছে?&quot;

প্রশ্নটা শুনে বৃদ্ধ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে মাথা নেড়ে বলল, &quot;আছে। সবই আছে।&quot; কথাটা বলেই মারদেকার দিকে একবার ফিরেই পরমুহুর্তে যোগ করলো, “ওগুলো ওর গায়ে ফীট করবে তো?” 
 
”চোখের মাথা খেয়েছ নাকি! না তুমি সত্যিই বুড়ো হয়ে গেছ।” লারসেন মৃদু হেসে দিল। তারপর বললো, “ভালো করে তাকিয়ে দেখ গায়ে-গতরে ও আমার ছেলের মতই।” 

লারসেনকে অনুসরণ করে ইলাই আবারো মারদেকাকে দেখলো। তার চোখ এবার উজ্জল হয়ে উঠলো। 

মারদেকা বুঝতে পারল না, বৃদ্ধের মুখটা হঠাৎ এমন উজ্জল হয়ে গেল কেন। সে শুধু আগুনের দিকে তাকিয়ে দুই হাত মেলে ধরল। তিন দিন ধরে পাহাড়ের ঠান্ডা রাত আর দিনের রোদে কাটিয়ে এমন উষ্ণতা সে অনেকদিন পায়নি।

ঠিক তখনই বাইরে ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। একটা নয়। কয়েকটা।

ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যেতেই ইলাই দরজার দিকে তাকাল। মুহূর্ত পরেই উঠোনে পরপর চারটা ঘোড়া এসে থামল। অনেক দূরের পথ পেরিয়ে ফেরার ক্লান্তি তাদের গা থেকেই বোঝা যাচ্ছে। ঘোড়াগুলোর শরীর ঘামে ভিজে চকচক করছে। নাক দিয়ে গরম বাষ্প বেরোচ্ছে। আরোহীরা একে একে জিন থেকে নেমে লাগামগুলো বারান্দার রেলিংয়ে বেঁধে ধীর পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল।

সবার আগে ঢুকল লম্বা, চওড়া কাঁধের এক যুবক। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। রোদে পোড়া মুখ, সরু ঠোঁট, কপালের ওপর তির্যক একটা পুরোনো ক্ষতচিহ্ন। কোমরে নিচু হয়ে ঝুলছে হাতির দাঁতের বাঁটওয়ালা দুটো কোল্ট। হাঁটার ভঙ্গিতেই আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠছে। লোকটার নাম ক্লে মরগান। ওলফ লারসেনের দলের সবচেয়ে দ্রুত বন্দুকবাজ হিসেবে ব্ল্যাক রিভারে তার যথেষ্ট সুনাম আছে।

তার পেছনে ঢুকল রুবেন কোল। মাঝারি গড়নের মানুষ। চোখে-মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকে। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কী লুকিয়ে থাকে, সেটা কেউ সহজে বুঝতে পারে না। হিসেব করে কথা বলা আর মানুষের মন বুঝে চলার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে তার।

তৃতীয় লোকটা মিগুয়েল। ছোটখাটো, গায়ের রং তামাটে। মাথায় চওড়া কিনারাওয়ালা সোমব্রেরো। মরুভূমি, পাহাড় কিংবা জঙ্গলে পথ হারানো মানুষকে খুঁজে বের করার মতো দক্ষ ট্র্যাকার আশেপাশের দশটা শহরে আর নেই।

সবশেষে ঢুকল হ্যাঙ্ক ডসন। বিশালদেহী, কম কথার মানুষ। মুখভর্তি দাড়ি। ডান কাঁধে ঝুলছে উইনচেস্টার। তাকে দেখলে প্রথমেই মনে হয়, মানুষের চেয়ে ভালুকের সঙ্গে লড়াই করতেই যেন বেশি স্বচ্ছন্দ।

চারজনই ভেতরে ঢুকে একসঙ্গে টুপি খুলল।

ক্লে বলল, &quot;শুভ সন্ধ্যা, বস।&quot;

লারসেন মাথা নেড়ে অভিবাদন গ্রহণ করল। &quot;ফিরতে দেরি হলো।&quot;

ক্লে উত্তর দিল, &quot;উত্তরের চর থেকে কয়েকটা গরু সরে গিয়েছিল। সেগুলো খুঁজে আনতেই সময় লেগেছে।&quot;

&quot;সব ফিরে এসেছে?&quot; আবারো প্রশ্ন করলো লারসেন।

&quot;একটাও বাদ যায়নি।&quot; ঘাড় কাৎ করে তাকে আশ্বস্ত করলো ক্লে।

লারসেন আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। কথার চেয়ে কাজের মূল্য সে সবসময় বেশি দেয়।

এই সময় চারজনেরই চোখ গিয়ে পড়ল ফায়ারপ্লেসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মারদেকার ওপর। ভেজা চুল। পরিষ্কার মুখ। কিন্তু পোশাক আর চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, ছেলেটা এই বাড়ির কেউ নয়।

রুবেন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। হ্যাঙ্ক ভ্রু কুঁচকাল। মিগুয়েলের চোখে ফুটে উঠল মমতা।

শুধু ক্লে অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। ধীরে ধীরে মারদেকার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখদুটো ধারালো। সে তার স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা চকচকে দৃষ্টি দিয়ে মারদেকার দিকে তাকাল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখে নিয়ে লারসেনের দিকে ফিরে শান্ত গলায় বলল, &quot;নতুন লোক?&quot;

লারসেন সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল। &quot;হ্যাঁ।&quot;

&quot;র&#x200d;্যাঞ্চে কাজ করবে?&quot;

&quot;সময়ই বলে দেবে।&quot;

ক্লে এবার প্রথমবারের মতো ছেলেটার চোখের দিকে তাকাল। মারদেকাও তার দিকে তাকিয়ে রইল। দু&#039;জনের কেউ চোখ সরাল না। কয়েক মুহূর্তের নীরবতায় যেন অদৃশ্য একটা লড়াই হয়ে গেল। 

শেষ পর্যন্ত ক্লে’ই চোখ ফিরিয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল। &quot;দেখে তো বুনো নেকড়ের বাচ্চা মনে হচ্ছে।&quot; 

কথাটা মারদেকা বুঝল না। কিন্তু লোকটার চোখের ভাষা বুঝল। এই মানুষটা তাকে পছন্দ করেনি।

ঠিক তখনই লারসেনের গলা শোনা গেল। &quot;ক্লে।&quot; 

একটা শব্দ। কিন্তু সেই এক শব্দেই ক্লে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। &quot;জি, বস।&quot;

&quot;ওকে একা থাকতে দাও।&quot; 

&quot;ঠিক আছে বস।&quot; ক্লে ধীরে ধীরে সরে এল। আস্তে আস্তে তার ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। 

সেই হাসির অর্থ তখন কেউ বুঝতে পারেনি। শুধু ওলফ লারসেন কয়েক মুহূর্ত স্থির চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল।

মিগুয়েল তখন কোমরের থলি থেকে একটা শুকনো আপেল বের করে মারদেকার দিকে বাড়িয়ে দিল। ছেলেটা প্রথমে দ্বিধা করল। তারপর আপেলটা হাতে নিল। মিগুয়েল মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

রুবেনও হাসল।

হ্যাঙ্ক নির্বিকার মুখে ফায়ারপ্লেসের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

ঘরের ভেতরের পরিবেশ আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল। ক্লে মরগান আর বাকিরা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ফিরেছে। ইলাই তাদের হাতে একে একে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ ধরিয়ে দিল। চারজন যে যার মতো বসে পড়ল। কেউ বুট খুলে পা ছড়িয়ে দিল, কেউ কোমর থেকে বন্দুকের বেল্ট খুলে চেয়ারের পিঠে ঝুলিয়ে রাখল। সারাদিন ঘোড়ার পিঠে কাটানোর ক্লান্তি মুখে স্পষ্ট। তবু ওলফ লারসেনের সামনে বসে কেউ অকারণে গল্প জুড়ে দিল না। এই বাড়িতে অযথা বকবক করার অভ্যাস কারও নেই।

লারসেন কফির মগে একবার চুমুক দিয়ে ইলাইয়ের দিকে তাকাল। &quot;গরম পানি তৈরি?&quot;

ইলাই মাথা নেড়ে বলল, &quot;অনেকক্ষণ হলো।&quot;

লারসেন এবার মারদেকার দিকে তাকাল। ছেলেটা এখনো ফায়ারপ্লেসের সামনে দাঁড়িয়ে আগুনের শিখার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। আগুনের এত কাছে বসে শরীর গরম করার সুযোগ সে কোনোদিন পায়নি। পাহাড়ের গ্রামে শীতের রাতে আগুন জ্বালানো হতো ঠিকই, কিন্তু সেই আগুন ছিল খোলা আকাশের নিচে। এমন সুন্দর পাথরের চুল্লির মধ্যে বন্দি আগুন তার কাছে নতুন বিস্ময়।

লারসেন মারদেকার দিকে তাকাল। ইশারা করে বলল, &quot;চলো।&quot; মারদেকা তার পিছু নিল। 

বাড়ির পেছনের দিকে ছোট্ট একটা গোসলখানা। বড় কাঠের টবে ধোঁয়া ওঠা পানি ভরা। পাশে সাবান, তোয়ালে আর পরিষ্কার কাপড় রাখা।

ছেলেটা থমকে দাঁড়াল। এত পানি একসঙ্গে সে শুধু নদীতেই দেখেছে। কিন্তু কাঠের টবের মধ্যে গরম পানি ভরে কেউ গোসল করে, এমন দৃশ্য তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন।

লারসেন নিজে টবের কাছে গিয়ে পানিতে হাত ডুবিয়ে দেখল। তারপর মারদেকার দিকে তাকিয়ে নিজের জামার বোতাম খুলে দেখাল। ইশারায় বোঝাল, কাপড় খুলে পানিতে নামতে। 

মারদেকা এবার বুঝল। ধীরে ধীরে নিজের নেংটির মতো পোশাকটা খুলে একপাশে রাখল। তার শরীরজুড়ে আঁচড়ের দাগ। হাঁটুতে শুকনো রক্ত। পায়ের পাতায় অসংখ্য কাঁটার খোঁচা।

লারসেন সেদিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তিন দিনের পথ। একটা বারো বছরের ছেলে। একাই এসেছে। অদ্ভুত জেদ আছে ছেলেটার।

মারদেকা সাবধানে পা ডুবাল পানিতে। তারপরই চমকে উঠল। এত গরম পানিতে সে কোনোদিন নামেনি। কয়েক মুহূর্ত পরে ধীরে ধীরে শরীরটা পানির ভেতর ডুবিয়ে দিল। চোখ দুটো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে এল। মুখে এমন এক প্রশান্তির ছাপ ফুটে উঠল, যা দেখে ওলফ লারসেনের মুখেও অজান্তে হালকা হাসি ফুটে উঠল।

গোসলের পর ঘরে ফিরে এসে লারসেন মারদেকাকে ইলাইয়ের হাতে তুলে দিল। তাকে বৃদ্ধের সাথে যেতে ইশারা করলো। ছেলেটা এবার নির্ভয়ে ইলাইয়ের সঙ্গে চলে গেল।

ওরা চোখের আড়ালে চলে যেতেই রুবেন কফির মগটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। বলল, &quot;বস, ছেলেটাকে কোথায় পেলেন?&quot;

লারসেন সংক্ষেপে পুরো ঘটনাটা বলল। সেলুনের সামনে মাতালদের হাতে অপদস্থ হওয়ার কথা, ছেলেটার ক্ষুধার্ত চেহারা, আর তাকে খাবার খাওয়ানোর কথা।

সবাই চুপচাপ শুনল। শুধু ক্লে মরগানের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না।

কথা শেষ হতেই সে শান্ত গলায় বলল, &quot;একজন হাফ ব্রীডকে বাড়িতে তুলে আনা কি ঠিক হলো?&quot;

ঘরের ভেতর মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এল। হ্যাঙ্ক ধীরে ধীরে কফির মগটা নামিয়ে রাখল। মিগুয়েল চোখ তুলে লারসেনের দিকে তাকাল। রুবেনও অপেক্ষা করতে লাগল, লারসেন কী বলে তা শোনার জন্য।

লারসেন তাড়াহুড়ো করে উত্তর দিল না। জানালার বাইরে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলল, &quot;ও একটা বাচ্চা ছেলে।&quot;

ক্লে মাথা নাড়ল। &quot;আজ হয়তো বাচ্চা। কিন্তু, পাঁচ বছর পর এরকম থাকবে না।&quot;

লারসেন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। &quot;তো?&quot;

ক্লে একটু গলা পরিষ্কার করল। &quot;হাফ ব্রীডদের আমি চিনি, বস। ওরা কোনো দিকেরই হয় না। শ্বেতাঙ্গরা ওদের বিশ্বাস করে না। ইন্ডিয়ানরাও না। শেষে নিজের সুবিধা যেখানে, সেদিকেই যায়।&quot;

লারসেনের মুখের ভাব বদলাল না। সে শুধু জিজ্ঞেস করল, &quot;তুমি কি ওকে চেনো?&quot;

&quot;না।&quot;

&quot;তাহলে আগে মানুষটাকে চিনে নাও। তারপর বিচার কোরো।&quot;

ক্লে আর কিছু বলল না। কিন্তু তার মুখ দেখে বোঝা গেল, সে কথাগুলো মেনে নেয়নি।

ঠিক তখনই করিডোর থেকে একটা শব্দ ভেসে এল। সবাই ঘুরে তাকাল। 

ইলাই ধীরে ধীরে হাঁটছে। তার পাশে মারদেকা। কিন্তু এই ছেলেটাকে যেন আর চেনাই যাচ্ছে না।

মুখ থেকে ধুলো ময়লা ধুয়ে গেছে। লম্বা কালো চুল ভেজা অবস্থায় পেছনে আঁচড়ে দেওয়া। গায়ে পরিষ্কার নীল শার্ট। কোমরে চামড়ার বেল্ট। বাদামি প্যান্টটার ঝুল একটু ছোট হলেও বাদামী মোজার সাথে মিশে গেছে বলে খারাপ লাগছে না। পায়ে ছোট্ট একজোড়া বুট।

মুহূর্তের জন্য ঘরে উপস্থিত সবাই নির্বাক হয়ে গেল। রুবেন বিস্ময়ে শিস দিয়ে উঠল। হ্যাঙ্কের মুখেও হাসি ফুটল।

মিগুয়েল মৃদু স্বরে বলল, &quot;এ তো একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেছে। একদম চেনাই যাচ্ছে না।&quot;

শুধু ক্লে কোনো মন্তব্য করল না। সে শুধু স্থির চোখে মারদেকার দিকে তাকিয়ে রইল।

লারসেন ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ছেলেটার সামনে গিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখল। তারপর ইলাইয়ের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে করে বলল, &quot;ভালো হয়েছে।&quot;

ইলাইয়ের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। বৃদ্ধ প্রায় ত্রিশ বছর ধরে এই বাড়িতে কাজ করছে। লারসেনের মুখে দুটো প্রশংসার কথা শোনা তার কাছে বিরল ঘটনা।

ঠিক সেই সময় রান্নাঘর থেকে ভেসে এল ভাজা মাংসের গন্ধ। ইলাই বলল, &quot;রাতের খাবার তৈরি।&quot;

লারসেন মাথা নেড়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। মারদেকা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে না, এত বড় টেবিলে সে বসবে কোথায়? পুরোটাই খাবারের প্লেট দিয়ে ভরা।

যেন ওর মনের কথাটা বুঝতে পেরেই ওলফ লারসেন পেছন ফিরে ওর দিকে তাকাল। 
তারপর সে নিজে টেবিলে তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারটা টেনে বসে পড়লো। মারদেকাকে তার ডান পাশের খালি চেয়ারটার দিকে হাত দিয়ে ইশারা করে বললো, &quot;এখানে বসো।&quot;

ঘরের ভেতর উপস্থিত পাঁচজন মানুষই এবার একসঙ্গে মারদেকার দিকে তাকাল।

ছেলেটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার মুখে দ্বিধা, চোখে বিস্ময়। চেয়ারটার সামনে এসে থেমে গেল। বিকেলে সেলুনে টুলের ওপর বসতে গিয়ে যেভাবে সবার হাসির পাত্র হয়েছিল, ঘটনাটা এখনো তার মনে তাজা। তাই এবার সে খুব সাবধানে চেয়ারটার দিকে তাকাল। হাত বাড়িয়ে একবার পিঠ ছুঁয়ে দেখল। তারপর ধীরে ধীরে বসতে গেল। শরীরের ভার ঠিকমতো সামলাতে না পেরে চেয়ারটা সামান্য দুলে উঠল। ছেলেটা চমকে আবার উঠে দাঁড়াল। মনে হলো, বুঝি এবারও পড়ে যাবে।

রুবেনের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছিল। কিন্তু লারসেনের উপস্থিতিতে সেটা আর বাইরে এল না।

ইলাই এগিয়ে এসে চেয়ারটা শক্ত করে ধরে রাখল। তারপর হাতের ইশারায় আবার বসতে বলল।

এবার খুব সাবধানে বসে পড়ল মারদেকা। দু&#039;হাত দিয়ে চেয়ার আঁকড়ে ধরে এমনভাবে বসে রইল, যেন একটু নড়লেই সেটা উল্টে যাবে।

ইলাই একে একে সবার সামনে খাবার সাজিয়ে দিতে লাগল। ধোঁয়া ওঠা গরুর মাংস, সেদ্ধ আলু, বিনস, মাখন মাখানো রুটি আর বড় একটা পাত্রে গাঢ় গ্রেভি। শেষে কফির পটটা টেবিলের মাঝখানে রেখে সবার মগ ভরে দিল।

মারদেকা খাবারের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্ষুধায় তার পেট মোচড় দিচ্ছে। কিন্তু কেউ খাওয়া শুরু না করায় সেও হাত বাড়াতে সাহস পেল না। এ রকম নিয়ম তার অজানা, তবু অন্যদের দেখে বুঝে নিয়েছে, আগে অপেক্ষা করতে হয়।

লারসেন চারপাশে একবার তাকিয়ে নিজের প্লেটের দিকে হাত বাড়াল। সঙ্গে সঙ্গে বাকিরাও খাওয়া শুরু করল।

মারদেকা কিছুক্ষণ তাদের দেখল। প্রত্যেকে ছুরি আর কাঁটা দিয়ে মাংস কেটে খাচ্ছে। সে দ্বিধাভরে নিজের সামনে রাখা ছুরিটা হাতে নিল। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখল। তারপর কাঁটাচামচটা হাতে নিয়ে মাংসে গেঁথে কাটতে গেল। মাংস কাটার বদলে পুরো প্লেটটাই প্রায় টেবিল থেকে পড়ে যাচ্ছিল।

হ্যাঙ্ক তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে প্লেটটা সামলে দিল। মারদেকা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।

লারসেন শান্তভাবে সবকিছু দেখছিল। সে নিজের প্লেট থেকে একটা রুটির টুকরো ছিঁড়ে হাতে নিল। তারপর ছুরি-কাঁটা সরিয়ে রেখে হাত দিয়েই মাংস ছিঁড়ে খেতে শুরু করল।

ঘরে বসে থাকা চারজনই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। ওলফ লারসেনকে কেউ কোনোদিন হাত দিয়ে খেতে দেখেনি।

লারসেন কোনো দিকে না তাকিয়েই বলল, &quot;ও যেভাবে পারে, সেভাবেই খাবে।&quot; কথাটা আর কারও উদ্দেশে নয়, যেন পুরো ঘরের জন্যই বলা।

মারদেকা বুঝতে পারল না কথার মানে। কিন্তু লারসেনকে হাত দিয়ে খেতে দেখে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সেও সঙ্গে সঙ্গে দু&#039;হাতে রুটি ছিঁড়ে মাংস তুলে খেতে শুরু করল।

মিগুয়েল মৃদু হেসে মাথা নিচু করল। হ্যাঙ্ক নিজের প্লেটেই মন দিল। রুবেন একবার লারসেনের দিকে তাকিয়ে আবার খেতে শুরু করল। 

শুধু ক্লে মরগানের চোখ দুটো সরু হয়ে এল। সে বুঝতে পারছিল, ব্যাপারটা শুধু দয়া নয়। ওলফ লারসেন নিজের আচরণ দিয়ে ছেলেটাকে অপমানের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। এ কাজ সে খুব কম মানুষের জন্যই করে। তারমানে ছেলেটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টা তার পছন্দ হলো না।

খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। ঠিক তখন বাইরে উঠোনে একটা ঘোড়া এসে থামার শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে সবাই মাথা তুলে তাকাল।

এত রাতে সাধারণত কেউ আসে না। ইলাই দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

দরজা খুলতেই দেখা গেল, একজন অশ্বারোহী ঘোড়া থেকে নেমে দ্রুত বারান্দায় উঠে আসছে। ধুলোয় ঢাকা চেহারা। হাঁপাচ্ছে। অনেকটা পথ না থেমে ছুটে এসেছে বোঝাই যাচ্ছে।

লোকটা ঘরে ঢুকেই টুপি খুলল। লারসেন তাকে চিনল। সে উত্তর দিকের র&#x200d;্যাঞ্চের কর্মচারী।

লোকটা শ্বাস সামলে বলল, &quot;বস... খারাপ খবর আছে।&quot;

টেবিলে বসে খেতে থাকা সবারই হাত থেমে গেল। 

লারসেন ধীরে ধীরে কফির মগটা নামিয়ে রাখল। তার চোখ স্থির। &quot;বলো।&quot;

লোকটা একবার ঘরের সবাইকে দেখে নিল। তারপর নিচু গলায় বলল, &quot;উত্তরের চর থেকে তিনটা দুধেল গাভী নেই।&quot;

ক্লে সঙ্গে সঙ্গে বলল, &quot;নেকড়ে?&quot;

লোকটা মাথা নাড়ল। &quot;না।&quot;

&quot;ইন্ডিয়ান?&quot;

&quot;তাও মনে হয় না।&quot;

ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। লারসেন এবার চেয়ারে হেলান না দিয়ে সোজা হয়ে বসল। &quot;তাহলে?&quot;

লোকটা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, &quot;যে চিহ্ন দেখেছি... তাতে মনে হচ্ছে কাজটা পেশাদার গরু চোরের।&quot;

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। ফায়ারপ্লেসের আগুন তখনও টুকটুক করে জ্বলছে।

আর টেবিলের এক কোণে বসে মারদেকা বিস্মিত চোখে একবার একজনের দিকে, একবার আরেকজনের দিকে তাকিয়ে আছে। লোকগুলোর মুখের ভাষা সে বুঝতে পারে না, কিন্তু তাদের চোখের চাহনি দেখে সে বুঝতে পারল, খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা ঘটেছে।

ঘরের ভেতর আর কেউ কথা বলল না। আগুনের শিখাগুলো ফায়ারপ্লেসের ভেতর টুকটুক করে জ্বলছে। বাইরে হালকা বাতাসে ওক গাছের ডালপালা দুলছে। কফির মগ থেকে ধোঁয়া উঠছে, কিন্তু কারও হাতে আর সেটা উঠল না।

ওলফ লারসেন কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইল। যেন খবরটা শুনে সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে মনে মনে সব হিসাব মিলিয়ে নিচ্ছে। এই স্বভাবটা তার পুরোনো। কোনো খবর শুনেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে না। আগে ভাবে, তারপর কথা বলে। অবশেষে সে মাথা তুলল। বলল, &quot;কবে বুঝতে পেরেছ?&quot;

লোকটা উত্তর দিল, &quot;ঘণ্টাখানেক আগে। সন্ধ্যার পর চর ঘুরতে গিয়ে দেখি গরুগুলো নেই।&quot;

&quot;পায়ের দাগ?&quot;

&quot;অনেকগুলো।&quot;

&quot;কতজন?&quot;

&quot;ঠিক বুঝতে পারিনি। তবে তিনজনের কম হবে না।&quot;

লারসেন আবার চুপ করে গেল।

ক্লে মরগান এবার বলল, &quot;এখনই বেরোই, বস। রাত বেশি হয়নি। ভাগ্য ভালো থাকলে ভোরের আগে ধরে ফেলতে পারব।&quot;

মিগুয়েলও মাথা নেড়ে সায় দিল। &quot;আমি পথ চিনে নিতে পারব।&quot;

কিন্তু লারসেন মাথা নাড়ল। &quot;না।&quot;

একটা শব্দেই সবাই থেমে গেল।

ক্লে অবাক হয়ে তাকাল। &quot;কিন্তু বস...&quot;

লারসেন শান্ত গলায় বলল, &quot;অন্ধকারে তাড়া করতে গেলে আমরাই বিপদে পড়বো। আর ওরাও সেটাই চাইবে। আগে থেকেই যদি জায়গা বেছে নিয়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখে, তাহলে ওদের আ্যম্বুশে পড়ে আমাদের লোকই মরবে।&quot;

ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল। ক্লে বুঝল, যুক্তিটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

লারসেন বলল, &quot;ভোর হতেই বেরোবে।&quot; সে এবার মিগুয়েলের দিকে তাকাল। &quot;তুমি পথ দেখবে।&quot;

মিগুয়েল মাথা নেড়ে বলল, &quot;ঠিক আছে।&quot;

&quot;ক্লে, তুমিও যাবে।&quot;

&quot;জি।&quot;

&quot;রুবেন আর হ্যাঙ্কও যাবে।&quot;

দু&#039;জনেই সম্মতি জানাল।

লারসেন আবার খবর নিয়ে আসা লোকটার দিকে তাকাল। &quot;ঘোড়াটা খুলে রাখো। খেয়ে ঘুমাও। ভোরে আবার বেরোতে হবে।&quot;

লোকটা টুপি হাতে নিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বাইরে চলে গেল। 

দরজা বন্ধ হতেই ইলাই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। &quot;আজ আর খাওয়া হবে না মনে হচ্ছে।&quot;

লারসেন তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। &quot;হবে। খালি পেটে কাউকে কাজে পাঠানো যায় না।&quot;

ইলাই আর কিছু বলল না। উঠে গিয়ে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবার আবার গরম করতে লাগল।

এইসব কথাবার্তার কিছুই বুঝতে পারছিল না মারদেকা। সে শুধু লক্ষ্য করছিল, খবরটা আসার পর থেকেই ঘরের প্রত্যেকটা মানুষের মুখ বদলে গেছে। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে হাসি ছিল, সেখানে এখন কঠিন গাম্ভীর্য।

সে আস্তে করে লারসেনের দিকে তাকাল। লোকটার মুখে কোনো ভয় নেই। কোনো অস্থিরতাও নেই। যেন এমন ঘটনা তার জীবনে নতুন নয়।

কিছুক্ষণ পর সবাই আবার চুপচাপ খাওয়া শেষ করল। তারপর একে একে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

ক্লে নিজের বন্দুকের বেল্ট কোমরে বাঁধতে বাঁধতে একবার মারদেকার দিকে তাকাল। চোখে সেই একই ঠান্ডা দৃষ্টি। তারপর কোনো কথা না বলেই দরজার দিকে হাঁটল।

রুবেন বিদায়ের সময় ছেলেটার মাথায় আলতো করে হাত রেখে বেরিয়ে গেল।

মিগুয়েল কোমরের থলি থেকে আরেকটা শুকনো আপেল বের করে তার হাতে দিল। এবার মারদেকা হেসে ফেলল। ভাষা আলাদা হলেও এই মানুষটার মমতা সে বুঝতে শিখেছে।

হ্যাঙ্ক শুধু মাথা নেড়ে বাইরে চলে গেল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই চারটে ঘোড়ার খুরের শব্দ রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বাড়িটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল।

ইলাই তখন একটা কেরোসিনের বাতি হাতে নিয়ে ফিরে এল। লারসেনের দিকে তাকিয়ে বলল, &quot;ছেলেটার শোবার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।&quot;

লারসেন মাথা নাড়ল। &quot;কোথায়?&quot;

&quot;আমার ঘরের পাশের ছোট কক্ষটায়।&quot; 

&quot;ভালো।&quot;

ইলাই মারদেকার কাছে গিয়ে হাতের ইশারায় তাকে ডাকল। মারদেকা যাওয়ার আগে একবার লারসেনের দিকে তাকাল।

ওলফ লারসেন চেয়ারে বসেই ছিল। তারপর খুব আস্তে মাথা নেড়ে তাকে যেতে বলল।
ছেলেটা ইলাইয়ের পিছু নিল। 

করিডোর পেরিয়ে ছোট্ট একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল তারা। ঘরটায় একটা কাঠের খাট, পরিষ্কার বিছানা, জানালার পাশে ছোট্ট টেবিল আর দেয়ালে ঝোলানো একটা লণ্ঠন। এত পরিষ্কার ঘরে সে কোনোদিন থাকেনি।

ইলাই বিছানার দিকে আঙুল দেখিয়ে হাসল। মারদেকা ধীরে ধীরে খাটের কাছে এগিয়ে গেল। হাত দিয়ে নরম কম্বলটা ছুঁয়ে দেখল। তারপর সাবধানে বসে পড়ল। এত নরম বিছানায় শরীর ডুবে যেতেও পারে, সেটা তার জানা ছিল না।

ইলাই লণ্ঠনের আলো একটু কমিয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। একবার ফিরে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তারপর দরজাটা আস্তে করে টেনে বন্ধ করে দিল।

বাইরে তখন গভীর রাত। দূরে কোথাও একা একটা কোয়োটে ডাকছে।

মারদেকা কম্বলটা গায়ে টেনে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করার আগমুহূর্তে তার মনে পড়ল পাহাড়ের ওপারের ছোট্ট সেই গ্রামটার কথা। মায়ের কথা। আগুনের পাশে বসে শোনা শহরের গল্পগুলোর কথা।

সেই গল্পের শহরেই আজ তার প্রথম রাত। সে জানে না আগামীকাল তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। শুধু এটুকু জানে, তিন দিন আগে যে ছেলেটা একা একা পাহাড় পেরিয়ে অজানা পথ ধরেছিল, সেই ছেলেটার জীবন আজ নিঃশব্দে অন্য এক পথে মোড় নিতে শুরু করেছে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/259142/</link>
				<pubDate>Sat, 01 Aug 2026 05:56:04 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়-দুই<br />
রকডাস্ট সেলুন থেকে বেরিয়েই ওলফ লারসেন থামল না। ধীর পায়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। মারদেকাও কোনো কথা না বলে তার পিছু পিছু চলল। শহরের রাত তখন পুরোপুরি নেমে এসেছে। রাস্তার দু&#8217;পাশে কাঠের খুঁটির মাথায় ঝোলানো কেরোসিনের বাতিগুলো হলদে আলো ছড়িয়ে নিস্তব্ধ পরিবেশটাকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে। দিনের ভিড় নেই&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-259142"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/259142/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>1</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">9b703d2fa9ff7c9a1642d1641ef99f0a</guid>
				<title>সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) 

অধ্যায়-এক
তিন দিন ধরে পাহাড় ডিঙিয়ে, জঙ্গল পেরিয়ে, শুকনো প্রেইরি আর পাথুরে উপত্যকার ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছে ছেলেটা। প্রথম দিনটা কেটে গিয়েছিল উৎসাহে, দ্বিতীয় দিনটা কষ্টে, আর তৃতীয় দিনে এসে শরীরের সমস্ত শক্তি যেন ফুরিয়ে গিয়েছিল। পথে দু&#039;একটা ঝরনা না পেলে তৃষ্ণাতেই হয়তো মরতে হতো তাকে। ক্ষুধা লাগলে কখনও বুনো ওল খুঁড়ে খেয়েছে, কখনও পাথর ছুড়ে ধেড়ে ইঁদুর মেরে পেট ভরিয়েছে। 

সারা জীবন সে পাহাড়ের ওপারের ছোট্ট ইন্ডিয়ান গ্রাম ছাড়া আর কিছু দেখেনি। গ্রামের বয়স্করা মাঝে মাঝেই আগুন জ্বেলে বসে শহরের গল্প করত। সেখানে নাকি কাঠের দোতলা বাড়ি আছে, ঘোড়ার গাড়ি আছে, রাতেও দিনের মতো আলো জ্বলে, দোকানে ইচ্ছে করলেই খাবার পাওয়া যায়। এসব গল্প শুনে শুনেই তার মনে একদিন শহর দেখার নেশা চেপে বসে। শেষ পর্যন্ত কাউকে কিছু না বলে এক গভীর রাতে গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সে। কোথায় যাবে, কত দূর যেতে হবে, শহরের মানুষ তাকে আপন করে নেবে কি না, এসব নিয়ে একবারও ভাবেনি। শুধু জানত, পাহাড়ের ওপারে একটা অন্য পৃথিবী আছে, সেই পৃথিবীটা একবার নিজের চোখে দেখতেই হবে।

সকালের দিকে ব্ল্যাক রিভার শহরে পৌঁছে সে প্রথমে ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। এত মানুষ, এত ঘোড়া, এত শব্দ সে জীবনে কখনও একসঙ্গে শোনেনি। কেউ তাকে লক্ষ্যও করছিল না। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত। অনেকক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে সে একটা ঘোড়ার আস্তাবলের কাছে গিয়ে ওয়াটারিং ট্রাফ থেকে পেট ভরে পানি খেল। তারপর স্টেবল হ্যান্ডের চোখ এড়িয়ে খড়ের একটা বড় গাদার ভেতর ঢুকে শুয়ে পড়ল। তিন দিনের ক্লান্তি এমনভাবে তাকে গ্রাস করেছিল যে, মুহূর্তের মধ্যেই গভীর ঘুম নেমে এলো চোখে। ঘুম ভাঙল যখন, তখন সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। শহরের ওপর সন্ধ্যার ছায়া নেমে এসেছে। ক্ষুধা আবার পেটের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। খড়ের গাদা থেকে বেরিয়ে সে গন্ধের টানেই হাঁটতে শুরু করল। ভাজা মাংসের সেই গন্ধ যেন তাকে টেনে নিয়ে এলো শহরের সবচেয়ে জমজমাট জায়গাটায়।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে রকডাস্ট সেলুন। দু&#039;পাশে কেরোসিনের বাতি জ্বলছে। কাঠের বারান্দায় কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে গল্প করছে। দরজার সামনে বাঁধা আছে কয়েকটা দামি ঘোড়া। ভেতর থেকে ভেসে আসছে পিয়ানোর সুর, মানুষের হাসি, মদের গ্লাসের টুংটাং শব্দ আর মেয়েদের খিলখিল হাসি। ছেলেটা ধীরে ধীরে মাথা তুলে জানালার স্বচ্ছ কাচ গলে ভেতরে তাকাল। ড্যান্সফ্লোর ইতিমধ্যে জমে উঠেছে। কতকগুলো সুন্দরী মহিলা একে অন্যের কোমর জড়িয়ে দল বেঁধে নাচছে। পুরুষেরা যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা টেবিল দখল করে বসে আছে। কারও হাতে মদের গ্লাস, কেউ মাতাল হয়ে খিস্তি আউড়াচ্ছে, কেউ আবার নাচনেওয়ালীদের হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছে। এইসব কিছু তার কাছে রূপকথার মতো মনে হলো। জীবনে প্রথমবার এমন দৃশ্য দেখে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ক্ষুধার জ্বালা পর্যন্ত যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল সে।

ছেলেটার নাম মারদেকা। বয়স বারোর বেশি নয়। সে একজন হাফ ব্রীড ইন্ডিয়ান। তার মা ছিল পাহাড়ের ওপারের এক ইন্ডিয়ান গোত্রের মেয়ে। বাবা ছিল একজন শ্বেতাঙ্গ। লোকটাকে সে কখনও দেখেনি। শুধু মায়ের মুখে শুনেছে, বহু বছর আগে এক শিকারি তাদের এলাকায় এসেছিল। কয়েক মাস থাকার পর একদিন চলে যায়। তারপর আর কখনও ফিরে আসেনি। সেই থেকেই গ্রামের লোকেরা মারদেকাকে নিজেদের একজন বলে মেনে নিতে পারেনি। কেউ তাকে শ্বেতাঙ্গ বলত না, আবার ইন্ডিয়ান বলেও স্বীকার করত না। ছোটবেলা থেকেই সে একঘরে হয়ে বড় হয়েছে। তাই গ্রামের প্রতি তার টানও খুব বেশি ছিল না।

ঠিক সেই সময় পেছন থেকে একটা গলা ভেসে এলো। লোকটা বলল, &quot;দে দোন্দে বিনো এস্তে তাপার্রাবোস?&quot; 

কথাটার মানে মারদেকা বুঝল না। কিন্তু গলার ভঙ্গি শুনেই বুঝে গেল, তাকে নিয়েই হাসাহাসি হচ্ছে। সে ঘুরে দাঁড়াতেই চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মাতাল লোক তার দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। একজন এগিয়ে এসে তার কোমরে জড়ানো নেংটির মতো পোশাকটা ধরে টান দিল। আরেকজন হাত বাড়িয়ে তার এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে দিল যেন কোনো অদ্ভুত জন্তু দেখছে।

মারদেকা বিপদ বুঝতে পেরে দৌড়ে পালাতে গেল। কিন্তু দু&#039;পা যাওয়ার আগেই পাশ থেকে একটা মোটা হাত তাকে জাপটে ধরল। পরমুহূর্তেই সে মাটি থেকে ওপরে উঠে গেল। লোকটা কোমর জড়িয়ে তাকে বাতাসে তুলে নিয়েছে। মারদেকা প্রাণপণে হাত-পা ছুড়তে লাগল। মুখ দিয়ে তার সেই অচেনা চি হি শব্দ বেরোতে লাগল। সে আঁচড় কাটল, কামড়াতে গেল, কিন্তু মাতাল লোকটার শক্তির সাথে পেরে উঠলো না। 

চারপাশের লোকগুলোর হাসির শব্দে যেন গোটা রাস্তা কেঁপে উঠল। কেউ হাততালি দিচ্ছে, কেউ আবার টুপি খুলে শূন্যে ঘুরিয়ে চিৎকার করছে। মাতাল লোকটা মারদেকাকে দুহাতে মাথার ওপর তুলে ধরে যেন অদ্ভুত কোনো জানোয়ারের প্রদর্শনী করছে। ছেলেটা প্রাণপণে হাত-পা ছুড়ছে। তার মুখ দিয়ে একটার পর একটা বিজাতীয় চি হি শব্দ বেরিয়ে আসছে। চোখ দুটো ভয় আর অপমানে লাল হয়ে উঠেছে। এত মানুষের সামনে তাকে নিয়ে যে হাসাহাসি হচ্ছে, তার কারণ সে ঠিক বুঝতে না পারলেও এটুকু বুঝতে পারছিল, এরা তাকে মানুষ বলে গণ্য করছে না।

ঠিক সেই সময় সেলুনের ব্যাটউইং দরজা দুটো ধীরে ধীরে খুলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে ভেতরের আলো বাইরে এসে ছড়িয়ে পড়ল। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে হাসির শব্দটা যেন আচমকাই থেমে গেল। যে লোকটা মারদেকাকে মাথার ওপর তুলে ধরেছিল, সেও ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।

ওলফ লারসেন। লোকটার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। কিন্তু চেহারায় বয়সের ছাপ খুব বেশি নেই। লম্বা, চওড়া বুক, মোটা কাঁধ। মাথাভর্তি ধূসর চুল সুন্দর করে আঁচড়ানো। ঠোঁটের ওপর ঘন গোঁফ। কালো কোটের নিচে ধবধবে সাদা শার্ট। কোমরে নিচু হয়ে ঝুলছে হাতির দাঁতের বাঁটওয়ালা দুইটা কোল্ট। তার চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত চোখের ভেতর এমন একটা কঠোরতা ছিল, যার সামনে ব্ল্যাক রিভারের সবচেয়ে মাতাল লোকটাও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

লারসেন শহরে শুধু ধনী মানুষ বলেই সম্মান পায় না। তার কথার দাম আছে। বিচারবুদ্ধি আছে। প্রয়োজন হলে সে যেমন মানুষকে সাহায্য করে, তেমনি অন্যায় করলে নিজের লোককেও ছাড় দেয় না। এই শহরের বহু ব্যবসা তার হাতে চলে। র&#x200d;্যাঞ্চ আছে, গরুর পাল আছে, কাঠের মিল আছে। শহরের শেরিফ পর্যন্ত তার সঙ্গে কথা বলার সময় ভেবেচিন্তে কথা বলে।

সে একবার চারপাশে তাকাল। তারপর শান্ত গলায় বলল, &quot;ছেলেটাকে ছেড়ে দাও।&quot;

কথাটা খুব আস্তে বলা হয়েছিল। অথচ যেন বন্দুকের গুলির চেয়েও বেশি জোরে গিয়ে লাগল উপস্থিত সবার কানে। মাতাল লোকটা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। তাড়াতাড়ি মারদেকাকে ছেড়ে দিল। 

ধপ করে ধুলোয় পড়ে গেল ছেলেটা। সে সঙ্গে সঙ্গে গুটিসুটি মেরে বসে নিজের কোমরের সরে যাওয়া নেংটিটা ঠিক করতে লাগল। তারপর মাথা নিচু করে বসে রইল। মনে হলো, আবার কেউ হয়তো তাকে ধরে ফেলবে।

লারসেন ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এল। এক হাঁটু ভেঙে নিচু হয়ে বসল। কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। এত কাছ থেকে ছেলেটাকে দেখে সে বুঝল, ছেলেটা সাধারণ ইন্ডিয়ান নয়। চোখের রং, মুখের গড়ন, কাঁধের হাড়, সবকিছুতেই শ্বেতাঙ্গ রক্তের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু গায়ের রং, চুল আর চাহনিতে আবার ইন্ডিয়ানদের বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। হাফ ব্রীড। এক নজরেই বুঝে গেল সে।

মারদেকা ভয় পাওয়া হরিণশাবকের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার চোখে বিদ্রুপ নেই, রাগ নেই। এমন দৃষ্টি সে আগে কখনও দেখেনি।

লারসেন মৃদু হেসে বলল, &quot;ভয় পেয়ো না। কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করবে না।&quot;

মারদেকা কথাটা বুঝল না। কিন্তু গলার স্বরটা বুঝল। এই মানুষটা অন্যদের মতো নয়।

লারসেন হাত বাড়িয়ে দিল। ছেলেটা একটু ইতস্তত করল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে দিল। লারসেন এক টানে তাকে দাঁড় করিয়ে দিল।

উপস্থিত লোকগুলো নিঃশব্দে সবকিছু দেখছে। তাদের অনেকেরই কৌতূহল হচ্ছে। একটা নেংটি পরা হাফ ব্রীড ছেলের জন্য শহরের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষটা এত মাথা ঘামাচ্ছে কেন?

লারসেন চারদিকে একবার তাকাল। তার চোখ যাদের ওপর পড়ল, তারা সবাই চোখ নামিয়ে নিল।&quot;আর কেউ ওকে বিরক্ত করবে না।&quot;

কেউ কোনো উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও ছিল না। ওলফ লারসেনের কথা ব্ল্যাক রিভারে আদেশের মতোই মানা হয়।

সে ঘুরে সেলুনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। দু&#039;পা গিয়ে থামল। পেছনে তাকাল। মারদেকা তখনও আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে। লারসেন হাত তুলে ইশারা করল। ”এসো।&quot;

ছেলেটা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর যেন অনেক ভেবে ধীরে ধীরে তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল।

ব্যাটউইং ঠেলে দু&#039;জনে সেলুনে ঢুকতেই ভেতরের কোলাহল কিছুটা থেমে গেল। পিয়ানোর সুর চলছে, মেয়েরা নাচছে, লোকজন মদ খাচ্ছে, কিন্তু প্রায় সবার চোখই এখন নতুন অতিথির দিকে।

এত নোংরা, ধুলোয় মাখা, আধা উলঙ্গ একটা ইন্ডিয়ান ছেলেকে কেউ কোনোদিন এই সেলুনে ঢুকতে দেখেনি।

মারদেকা বিস্ময়ে চারপাশে তাকাতে লাগল। মাথার ওপর ঝুলছে কাঁচের লণ্ঠন। দেয়ালে হরিণের শিং। এক কোণে পিয়ানো বাজাচ্ছে সাদা চুলের এক বুড়ো। মেয়েদের রঙিন পোশাক তার চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে গরম মাংস আর রুটির গন্ধ। তার পেট আবার মোচড় দিয়ে উঠল।

লারসেন নিজের চিরচেনা টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। লোকজন সরে গিয়ে রাস্তা করে দিল। সে চেয়ারে বসে মারদেকার দিকে তাকাল।

ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। কি করবে বুঝতে পারছে না। 

লারসেন পাশে রাখা একটা চেয়ার টেনে দেখিয়ে দিল, &quot;বসো।&quot;

মারদেকা চেয়ারটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর এমনভাবে নিচে বসে পড়ল, যেন চেয়ারটা নয়, মেঝেটাই তার বসার জায়গা।

কাছের কয়েকটা টেবিল থেকে চাপা হাসির শব্দ উঠল। লারসেন কিছু বলল না। ওয়েটারকে হাত তুলে ডাকল। 

ওয়েটার দৌড়ে এসে দাঁড়াল। লারসেন বলল, &quot;একটা কাঠের টুল নিয়ে এসো। আর রান্নাঘরে যা আছে, সবচেয়ে ভালো খাবারটা এই ছেলেটার সামনে দাও।&quot;

ওয়েটার মাথা নেড়ে চলে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই একটা মজবুত কাঠের টুল এনে রাখা হলো।

লারসেন নিজে উঠে দাঁড়িয়ে মারদেকাকে ইশারা করল। বলল, &quot;এখানে বসো।&quot;

ছেলেটা এবার বুঝল। ধীরে ধীরে উঠে টুলের ওপর বসতে গেল। কিন্তু জীবনে কোনোদিন টুলে না বসার ফল যা হওয়ার তাই হলো। একদিকে বেশি ভর পড়তেই টুলটা কাৎ হয়ে গেল। ধড়াম করে আবার মেঝেতে পড়ে গেল সে।

এবার আর চাপা হাসি নয়। সারা সেলুন হো হো করে হেসে উঠল। কেউ বলল, &quot;নেংটো জংলি!&quot; আরেকজন বলল, &quot;আগে বসা শিখে আয়!&quot;

মারদেকা লজ্জায় মাথা নিচু করে মেঝেতে বসে রইল। 

ওলফ লারসেনের মুখে কোনো হাসি ফুটল না। সে ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর নিচু হয়ে দুহাতে মারদেকাকে তুলে নিল। যেন ছোট্ট একটা শিশুকে কোলে তোলা হয়।

সারা সেলুন নিঃশব্দ হয়ে গেল। লারসেন কোনো কথা না বলে তাকে নিজের টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। তারপর শান্তভাবে নিজের চেয়ারে ফিরে বসল।

ওয়েটারও ঠিক সেই সময় ধোঁয়া ওঠা ভাজা মাংস, সসেজ, রুটি আর এক মগ দুধ এনে মারদেকার সামনে নামিয়ে রাখল। খাবারের গন্ধ নাকে যেতেই ছেলেটার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। 

সারা সেলুন তখন অদ্ভুত এক নীরবতায় ডুবে আছে। একটু আগেও যেখানে হাসি, চিৎকার আর মাতালের উল্লাসে কান পাতা দায় হয়ে উঠেছিল, সেখানে এখন কেবল পিয়ানোর মৃদু সুর আর প্লেটের সঙ্গে ছুরিকাঁটার ঠোকাঠুকির শব্দ শোনা যাচ্ছে। সবাই যে যার জায়গায় বসে আছে ঠিকই, কিন্তু চোখের কোণে কোণে একই কৌতূহল। ওলফ লারসেনের মতো মানুষ একটা নেংটি পরা হাফ ব্রীড ছেলেকে নিজের টেবিলের ওপর বসিয়ে খাওয়াচ্ছে, এমন দৃশ্য ব্ল্যাক রিভারের কেউ কোনোদিন দেখেনি।

মারদেকা এসবের কিছুই বুঝতে পারছিল না। তার সামনে ধোঁয়া ওঠা ভাজা মাংস, মোটা সসেজ, এক টুকরো রুটি আর দুধের মগ। এত খাবার সে একসঙ্গে জীবনে কখনো দেখেনি। প্রথমে সাবধানে একটা মাংসের টুকরো তুলে শুঁকল। তারপর দাঁত বসাতেই চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। এমন স্বাদ তার কাছে একেবারে নতুন। পরের মুহূর্তেই আর কোনো ভদ্রতার বালাই রইল না। দুহাতে খাবার তুলে গোগ্রাসে মুখে পুরতে লাগল। মাংসের রস তার থুতনি বেয়ে বুকের ওপর পড়ছে, রুটির টুকরো মেঝেতে গড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। মনে হচ্ছে, কেউ বুঝি এই বুঝি খাবারগুলো কেড়ে নেবে।

ওলফ লারসেন স্থির চোখে ছেলেটার খাওয়া দেখছিল। তার সামনে রাখা হুইস্কির গ্লাসে সে একবারও চুমুক দিল না। একসময় ওয়েটার চুপচাপ এসে খালি গ্লাসটা ভরে দিয়ে চলে গেল। লারসেন তখনও ছেলেটার দিকেই তাকিয়ে।

সেলুনের এক কোণে বসে থাকা মোটা গড়নের একজন কাউবয় আর থাকতে পারল না। চেয়ার ঠেলে উঠে ধীরে ধীরে লারসেনের টেবিলের কাছে এগিয়ে এলো। লোকটার নাম বাড হিগিন্স। শহরের প্রায় সবাই তাকে চেনে। বছর দশেক ধরে লারসেনের র&#x200d;্যাঞ্চে কাজ করে। লোকটা খারাপ নয়, তবে মুখে যা আসে তাই বলে ফেলে।

বাড বলল, &quot;বস, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?&quot;

লারসেন চোখ তুলল। &quot;করো।&quot;

বাড ইতস্তত করে মারদেকার দিকে তাকাল, &quot;এই ছুঁচোটাকে নিয়ে কী করবেন?&quot;

সারা সেলুন আবার চুপ হয়ে গেল। অনেকেই কান খাড়া করল। লারসেনের চিবুক শক্ত হয়ে গেল। মুখের ভাব বদলে গেলেও সে উত্তর দিতে তাড়াহুড়ো করল না। টেবিলের ওপর আঙুল দিয়ে দুবার টোকা মেরে তারপর ধীরে ধীরে বলল, &quot;এখনো কিছু ভাবিনি।&quot;

বাড একটু হেসে ফেলল। &quot;হাফ ব্রীডদের বিশ্বাস নেই, বস। আজ আছে, কাল নেই। বড় হলে হয় চোর হবে, না হয় ডাকাত।&quot;

কথাটা শুনে কয়েকজন মাথা নেড়ে সায় দিল। 

লারসেনের মুখের ভাব বদলাল না। শান্তভাবে বলল, &quot;তোমার কথাও একসময় অনেকে এভাবেই বলত, বাড।&quot;

কথাটা শুনে বাডের মুখ শুকিয়ে গেল। সে জানে, কথাটা মিথ্যে নয়। বহু বছর আগে এই শহরে এসে সে নিজেও ছিল মাতাল আর ঝগড়াটে। লারসেনই তাকে কাজ দিয়েছিল। মানুষ হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল।

লারসেন আবার বলল, &quot;মানুষ খারাপ হয়ে জন্মায় না। সুযোগের অভাবে খারাপ হয়।&quot;

বাড আর কোনো কথা বলল না। মাথা নিচু করে নিজের টেবিলে ফিরে গেল।

এই সময় মারদেকা শেষ টুকরো রুটিটাও মুখে পুরে দুধের মগটা দুই হাতে তুলে এক নিঃশ্বাসে খালি করে ফেলল। তারপর মগটা নামিয়ে এমনভাবে চারদিকে তাকাল, যেন বুঝতে চাইছে এবার কী করতে হবে।

লারসেন নিজের প্লেটটা তার দিকে এগিয়ে দিল।জানতে চাইলো, &quot;আরও খাবে?&quot;

ছেলেটা কথাটা বুঝল না। কিন্তু প্লেটের দিকে তাকিয়েই অর্থ বুঝে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে না সূচক ইশারা করল। তার পেট ভরে গেছে।

লারসেন এবার প্রথমবারের মতো মৃদু হেসে উঠল। 

ঠিক তখনই সেলুনের মালিক কার্লোস এগিয়ে এল। মাঝবয়সী মেক্সিকান। মুখে সারাক্ষণ হিসেবি ভাব। লারসেনের কানের কাছে মুখ এনে নিচু গলায় বলল, &quot;মিস্টার লারসেন, লোকজন আপত্তি করছে।&quot;

লারসেন ভ্রু তুলল। 

কার্লোস আবার বলল, &quot;ছেলেটার গা থেকে খুব গন্ধ বেরোচ্ছে। মেয়েরা অভিযোগ করছে।&quot;

লারসেন শান্ত গলায় ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করল, &quot;তোমারও আপত্তি আছে?&quot;

কার্লোস অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মুখ কাচু-মাচু করে বলল, &quot;না... মানে... আমি শুধু তাদের কথাই বলছি।&quot;

লারসেন চেয়ার ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সেলুনের ভেতর আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সে একবার চারদিকে তাকাল। তারপর পরিষ্কার গলায় বলল, “একে নিয়ে যার আপত্তি আছে, সে আজ রাতের খাবার অন্য কোথাও গিয়ে খাবে। বিল আমি মিটিয়ে দেব।&quot;

কেউ কোনো কথা বলল না। নাচনেওয়ালীরা আবার নাচ শুরু করল। পিয়ানোও আগের মতো বাজতে লাগল। যেন কিছুই ঘটেনি।

কার্লোস বিব্রত মুখে মাথা নেড়ে সরে গেল। লারসেন আবার বসে পড়ল।

মারদেকা এবার তার দিকে তাকিয়ে আছে। এতক্ষণে সে বুঝেছে, এই মানুষটার উপস্থিতিতে কেউ তাকে আঘাত করতে সাহস পায় না। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই।

লারসেন কিছুক্ষণ ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে নিজের বুকের দিকে আঙুল দিয়ে বলল, &quot;ওলফ।&quot;

মারদেকা কিছু বুঝল না। 

লারসেন আবার নিজের বুকে হাত রাখল। বলল, &quot;ওলফ।&quot;

এবার মারদেকা বুঝল। লোকটা নিজের নাম বলছে।

সে নিজের বুকেও হাত রাখল। ধীরে ধীরে বলল, &quot;মা...র...দে...কা।&quot; শব্দগুলো একটু জড়ানো। তবু পরিষ্কার।

লারসেন মাথা নেড়ে নামটা মনে রাখল। বলল, &quot;মারদেকা।&quot;

ছেলেটার মুখে প্রথমবারের মতো হাসি ফুটল। এতক্ষণে সে বুঝল, অন্তত একজন মানুষ তার নামটা জানতে চেয়েছে। শুধু তাকে দেখে হাসেনি।

লারসেনের বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে উঠল। বহু বছর আগে তারও একটা ছেলে ছিল। মাত্র আট বছর বয়সে জ্বরে মারা যায়। তারপর আর কখনো সংসার করেনি সে। কাজ, ব্যবসা আর এই শহর নিয়েই জীবন কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই ক্ষুধার্ত, অসহায় ছেলেটার চোখে সে যেন বহু বছর আগের সেই শিশুটার ছায়া দেখতে পেল।

বাইরে তখন রাত পুরোপুরি নেমে এসেছে। সেলুনের জানালার বাইরে বাতাসে ধুলো উড়ছে। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল।

ওলফ লারসেন ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। মারদেকার দিকে ফিরে বলল, &quot;চলো।&quot;

মারদেকা কথাটা বুঝল না, কিন্তু ইশারা বুঝল। সে টেবিল থেকে নেমে লারসেনের পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করল। সেলুনের দরজা পেরিয়ে দু&#039;জনে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে এল।

রাস্তার দুই পাশে কেরোসিনের বাতিগুলো দুলছে। শহরের লোকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল, ব্ল্যাক রিভারের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষটা নিজের পাশে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ধুলোয় মাখা এক হাফ ব্রীড ছেলেকে।
(চলবে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/259032/</link>
				<pubDate>Thu, 30 Jul 2026 06:46:50 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সীমানা পেরিয়ে<br />
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ) </p>
<p>অধ্যায়-এক<br />
তিন দিন ধরে পাহাড় ডিঙিয়ে, জঙ্গল পেরিয়ে, শুকনো প্রেইরি আর পাথুরে উপত্যকার ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছে ছেলেটা। প্রথম দিনটা কেটে গিয়েছিল উৎসাহে, দ্বিতীয় দিনটা কষ্টে, আর তৃতীয় দিনে এসে শরীরের সমস্ত শক্তি যেন ফুরিয়ে গিয়েছিল। পথে দু&#8217;একটা ঝরনা না পেলে তৃষ্ণাতেই হয়তো মরতে হতো তাকে। ক্ষুধা লাগলে কখনও বুনো ওল&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-259032"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/259032/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">ee6d4eda7b0726cf1624bd88186cdd55</guid>
				<title>শোধ
(ওয়েস্টার্ণ গল্প)

জোনাথন হাক পেশায় একজন গিটার বাদক। রকডাস্ট হোটেলের সেলুনে গিটার বাজিয়ে গান গেয়ে জীবন নির্বাহ করে। তার বউ শার্লিন হাক একজন ওয়েটার। তারা দুজনেই ভালোবেসে বিয়ে করেছে। এক সাথে জীবিকা নির্বাহের দরুন তাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা বেশ। ফলে সংসার জীবনে তারা বেশ সুখী।

প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই রকডাস্ট হোটেলের সেলুনটা জমে উঠে। কাউন্টারের পেছনে বোতলের সারি, ধোঁয়ায় ঝাপসা বাতাস, মাতাল কাউবয়দের হাসি আর তাসের টেবিলে বাজির শব্দের মাঝেও জোনাথনের গিটারের সুর যেন আলাদা করে কানে বাজে। আর সেই সুরের ফাঁকেই টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরে বেড়ায় শার্লিন। ব্যস্ততার মাঝেও দুজনের চোখে চোখ পড়লে এক চিলতে হাসি বিনিময় হয়। সেই হাসিতেই যেন তাদের ছোট্ট সংসারের সমস্ত সুখ ভেসে উঠে।

একদিন তাদের হোটেল কাম সেলুনে এক পেশাদার বন্দুকবাজের আগমন ঘটে। তার চোখ পড়ে সুন্দরী শার্লিনের উপর। সে তাকে তার রুমে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করতে চায়। শার্লিন বাধা দিলে সে জোরাজুরি করে। এক পর্যায় সে চিৎকার করতে গেলে তার গলা চেপে ধরে মেরে ফেলে পালিয়ে যায়।

সেদিন জোনাথন দৌড়ে গিয়ে শুধু স্ত্রীর নিথর দেহটাই দেখতে পেয়েছিল। তার গিটারটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে সে তুলে নিয়েছিল শার্লিনের হাতু দুটো। ঠান্ডা হাত দুটো নিজের বুকে চেপে ধরে সে অনেকক্ষণ বসে ছিল। চোখে পানি ছিল না, ছিল শুধু পাথরের মতো নিশ্চুপ এক শূন্যতা। সেদিনই সে বুঝেছিল, পৃথিবীতে এমন কিছু ঋণ আছে, যা আদালত শোধ করতে পারে না। সেগুলো মানুষকে নিজের হাতেই শোধ করতে হয়।




অনেক বছর পর অন্য এক শহরে একটা সেলুনে একজন নাম না জানা আগন্তক আসে। সে উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে, “আমি একজনকে খুঁজছি।” পশ্চিমে এই কথার মানে হলো, তার সাথে পুরনো কোন হিসেব বাকী আছে।

কথাটা শুনেই সেলুনের ভেতরের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। তাসের টেবিলে বসা খেলোয়াড়রা হাত থামিয়ে নিশ্চুপ তাকিয়ে রয়। গ্লাস মুছতে মুছতে থেমে যায় বারটেন্ডারের হাত। বাতাসে হঠাৎ একটা চাপা উত্তেজনা জমে উঠে।

“তুমি তাকে চেনো?” কেউ একজন তাকে জিজ্ঞেস করে।

উত্তরে সে বলে, “না। তবে আমি তাকে খুঁজছি এটা জানার পর সে নিজেই আমাকে চিনে নেবে।”

এবার সবার মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়। সবাই এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে থাকে। আগন্তক ততক্ষণে সেলুনের বারের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তার কোমরে ডান পাশে ঝুলে থাকা হোলস্টারের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা পিস্তলের বাটটা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ওটার চকচকে ভাবটা সহজেই বুঝিয়ে দিচ্ছে পিস্তলটা সদ্য কেনা হয়েছে।

কেউ একজন খুব আস্তে করে বলে, “বন্দুকটা নতুন... কিন্তু লোকটার চোখ দুটো একদম পুরনো।” কথাটা শুনে কেউ আর উত্তর দেয় না।

“বাছা, তুমি কি আমাকে খুঁজছো?” 

লোকটা কখন এসে আগন্তকের পেছনে দাঁড়িয়েছে, কেউ খেয়ালই করেনি। সবার মনযোগ ছিল আগন্তকের প্রতি। তাই তার কথা বলার শান্ত ভাব আর পা ফাঁক করে দাঁড়ানোর ভঙ্গী উপস্থিত সবাইকে বুঝিয়ে দেয় শো-ডাউন আসন্ন। সবাই দ্রুত লাইন অব ফায়ার থেকে সরে দাঁড়ায়।

চেয়ারগুলো একপাশে সরিয়ে নেওয়া হয়। কয়েকজন দেয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। মুহূর্তের মধ্যে সেলুনের মাঝখানে ফাঁকা একটা বৃত্ত তৈরি হয়ে যায়। শুধু দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে মুখোমুখি।

আস্তে করে ঘুরে দাঁড়ায় আগন্তক। লোকটা তার থেকে মাপা দূরত্বে সেলুনের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা ঠেলে ভেতরে আসা রোদের চকচকে আলোর সামনে তাকে ছায়াময় বিভৎস দেখাচ্ছে। ঠোঁটের একটা কোণ বেঁকে উপরে উঠে আছে।

না, সে হাসছে না। ওটা একটা ক্ষতচিহ্ন, যা ঠোঁটের ফিনিশিং লাইনটাকে ঠেলে উপরে তুলে দিয়েছে। অনেক আগে একটা মেয়ের হাত থেকে ছুড়ে ফেলা মদের বোতলের ভাঙা কাঁচে লেগে কেটে যাওয়ায় ওটার সৃষ্টি হয়েছিল। ওকে চিনবার জন্য আগন্তকের ওই চিহ্নই যথেষ্ট।

এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে যায়। আগন্তকের চোখে কোনো রাগ নেই, কোনো উত্তেজনাও নেই। যেন বহু বছর ধরে আগলে রাখা একটা কাজ শেষ করতে এসেছে সে।

“ঠিক ধরেছ। আমি তোমাকেই খুঁজছি।” বলেই সে হাত ঠেলে দেয় হোলস্টারের দিকে। পরক্ষণেই হাঁটু গেড়ে বসে যায়। ধীরে সুস্থে পিস্তলটা হাতে নিয়ে লোকটার দিকে তাক করে।

সবাই দেখে সেলুনের মাঝখানে দাঁড়ানো লোকটা আগে পিস্তল ড্র করেছে। কিন্তু, বারের সামনে দাঁড়ানো আগন্তক সহসা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ায় তার ছোড়া গুলি পেছনের বারে আঘাত করে। একরাশ বোতল ভাঙার আওয়াজ শোনা যায়। মদের তীব্র গন্ধে মুহূর্তেই বাতাস ভারী হয়ে উঠে।

পরক্ষণেই আগন্তকের গুলি আঘাত করে লোকটাকে। বুক পেতে গুলিটা গ্রহণ করে সে। তারপর সটান শরীর উল্টে মেঝেতে পড়ে যায়।

সেলুনে নেমে আসে অস্বস্তিকর নীরবতা। শুধু ভাঙা বোতল থেকে গড়িয়ে পড়া মদের টুপটাপ শব্দ শোনা যায়।

আগন্তক এগিয়ে এসে পরে থাকা লোকটার মাথার কাছে দাঁড়ায়। 

“তুমি... তুমি......” বিস্ময়ে ককিয়ে উঠে লোকটা। তার মুখ ঠেলে রক্ত বেরিয়ে আসে।

আস্তে করে উবু হয় আগন্তক। তার কানের কাছে ফিসফিস করে উচ্চারণ করে, ”জোনাথন হাক।”

নামটা শুনেই চোখ বড়বড় হয়ে যায় লোকটার। যেন বহু বছর আগের একটা রাত সহসাই জীবন্ত হয়ে তার চোখের সামনে ফিরে আসে। মাথাটা উপরে উঠাতে চায় সে। পরক্ষণেই স্থির হয়ে যায়।

লোকটা মরে গেছে বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়ায় আগন্তক। একবার চারদিকে তাকায়। উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলে, “ওর কাছে আমার একটা ঋণ ছিল। তাই শোধ দিলাম।”

বলেই সমবেত লোকজনের ভেতর দিয়ে সেলুনের বাইরে বেরিয়ে যায় সে। কেউ তাকে থামানোর চেষ্টা করে না। কেউ কোনো প্রশ্নও করে না। পশ্চিমে সবাই জানে, কিছু হিসেব নিজেকেই মেটাতে হয়। একজন প্রকৃত পুরুষ মাত্রই তা করে।
(২৯ জুলাই, ২০২৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/258913/</link>
				<pubDate>Wed, 29 Jul 2026 06:22:17 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>শোধ<br />
(ওয়েস্টার্ণ গল্প)</p>
<p>জোনাথন হাক পেশায় একজন গিটার বাদক। রকডাস্ট হোটেলের সেলুনে গিটার বাজিয়ে গান গেয়ে জীবন নির্বাহ করে। তার বউ শার্লিন হাক একজন ওয়েটার। তারা দুজনেই ভালোবেসে বিয়ে করেছে। এক সাথে জীবিকা নির্বাহের দরুন তাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা বেশ। ফলে সংসার জীবনে তারা বেশ সুখী।</p>
<p>প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই রকডাস্ট হোটেলের সেলুনটা জমে উঠে।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-258913"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/258913/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>8</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">6e28a49295c56cd27a097635557a377b</guid>
				<title>নিষিদ্ধের ব্যাকরণ

এই শহর এখন আর কোনো মানচিত্র নয়,
এটি দীর্ঘশ্বাস, 
অপরাধবোধ আর অঘোষিত কামনার
এক বিশাল আর্কাইভ।

প্রতিটি ব্যালকনিতে ঝুলে থাকে
অর্ধেক ব্যবহৃত চুম্বনের শুকিয়ে যাওয়া দাগ,
আর প্রতিটি লিফট ধীরে ধীরে উঠে যায়
এমন এক নির্জন তলায়,
যেখানে ভালোবাসার প্রবেশ নিষিদ্ধ,
শুধু শরীরের দীর্ঘ ছায়াগুলো নীরবে অপেক্ষা করে।

তোমার ত্বক ছুঁয়েছিলাম আমি,
যেন বহুদিন অনাহারে থাকা
একটি পরিত্যক্ত শব্দ
অবশেষে নিজের হারিয়ে যাওয়া অর্থটুকু খুঁজে পেয়েছে
তোমার নিঃশ্বাসের ভেতরে।

তারপর হঠাৎ
সমস্ত জানালা একসঙ্গে খুলে গেল,
আর সভ্যতা তার অসংখ্য কৌতূহলী চোখ নিয়ে
আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল
একটি অপরাধস্থলের নিঃশব্দ সাক্ষীর মতো।

মুহূর্তের মধ্যেই
শহরটি বিচারকের কালো পোশাক পরে নিল,
আমাদের ঠোঁটের বিরুদ্ধে
রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ দায়ের হলো,
আর প্রতিটি চুম্বনকে
আদালতের নথিতে লেখা হলো
একটি সামাজিক অপরাধের স্বীকারোক্তি হিসেবে।

কামনা এখানে
কোনো বিছানার ক্ষণস্থায়ী ঘটনা নয়,
এটি এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক ভাষা,
একটি অবৈধ পতাকা,
যা রাতের বাতাসে সামান্য উড়ে উঠলেই
সমস্ত সকাল অস্বস্তিতে কেঁপে ওঠে,
আর নীতিবাদীরা তাদের মুখোশ আরও শক্ত করে পরে নেয়।

আমরা একে অপরকে
কখনোই নগ্ন করিনি,
খুলে ফেলেছিলাম শুধু
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে
আমাদের শরীরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া
ভয়, লজ্জা আর নিষেধের পুরোনো পোশাকগুলো।

তবু ইতিহাস
আমাদের প্রতিটি আলিঙ্গনকে
শুধু শরীরের ব্যাকরণে লিখে রাখল,
কেউ পড়তে চাইল না
তার গভীরে লুকিয়ে থাকা
অসংখ্য নির্বাসিত হৃদস্পন্দনের গোপন ভাষা,
যেখানে কামনার চেয়েও বড় ছিল
একজন আরেকজনের কাছে আশ্রয় হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা।

একদিন
এই নগরীর সমস্ত নিয়নবাতি নিভে যাবে,
সমস্ত আদালত ধুলো হয়ে যাবে,
আর নীতির দেয়ালগুলোও একসময় ভেঙে পড়বে
সময়ের অবিরাম বৃষ্টির নিচে।

তখনও হয়তো
কোনো অচেনা প্রেমিক
অন্ধকারের গভীর থেকে হাত বাড়িয়ে দেবে,
আর কোনো অচেনা প্রেমিকা
তার আঙুলের উষ্ণতা ছুঁয়ে
নিঃশব্দে বুঝে যাবে,

নিষিদ্ধ ছিল না
মানুষের স্পর্শ,
নিষিদ্ধ ছিল না
দুটি শরীরের পারস্পরিক আত্মসমর্পণ,

নিষিদ্ধ ছিল শুধু
সমস্ত ভয়, সমস্ত আইন, সমস্ত ভণ্ড নৈতিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে
একজন মানুষকে
তার সমস্ত অসম্পূর্ণতা নিয়ে
নিঃসংকোচে ভালোবেসে ফেলা।
(২৯ জুলাই, ২০২৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/258905/</link>
				<pubDate>Wed, 29 Jul 2026 04:05:09 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>নিষিদ্ধের ব্যাকরণ</p>
<p>এই শহর এখন আর কোনো মানচিত্র নয়,<br />
এটি দীর্ঘশ্বাস,<br />
অপরাধবোধ আর অঘোষিত কামনার<br />
এক বিশাল আর্কাইভ।</p>
<p>প্রতিটি ব্যালকনিতে ঝুলে থাকে<br />
অর্ধেক ব্যবহৃত চুম্বনের শুকিয়ে যাওয়া দাগ,<br />
আর প্রতিটি লিফট ধীরে ধীরে উঠে যায়<br />
এমন এক নির্জন তলায়,<br />
যেখানে ভালোবাসার প্রবেশ নিষিদ্ধ,<br />
শুধু শরীরের দীর্ঘ ছায়াগুলো নীরবে অপেক্ষা করে।</p>
<p>তোমার ত্বক ছুঁয়েছিলাম আ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-258905"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/258905/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">4a9efa0af980b9237fffb280163bf280</guid>
				<title>“শুধু তোমার জন্য”

দুপুরের রোদটা কাঁচের দেয়াল ভেদ করে বহুতল মার্কেটের ভেতরেও এসে পড়েছে। সাদা টাইলসের উপর ছড়িয়ে থাকা আলোয় মানুষের ছায়াগুলো ক্রমশঃ লম্বা হয়ে যাচ্ছে। কোথাও বাচ্চাদের হাসি, কোথাও দোকানিদের ডাকাডাকি, কোথাও নতুন কাপড়ের গন্ধ। চারতলার খোলা বারান্দা ঘেঁষে দাঁড়ালে নিচের তিনটা তলা একসাথে চোখে পড়ে। মাঝখানটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। রেলিংয়ের ওপাশে তাকালে মনে হয় পৃথিবীটা অনেক নিচে নেমে গেছে। সেই রেলিংয়ের পাশ দিয়েই ধীরে ধীরে হাঁটছে মোজাফ্ফর আর সালমা। 

মাস কয়েক আগে বিয়ে হয়েছে ওদের। শহরের উপকণ্ঠে টিনের চালওয়ালা ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া নিয়েছে মোজাফ্ফর। এক কামরার সেই ঘরে একটা খাট, একটা টেবিল, দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার আর রান্নাঘরের কোণে কয়েকটা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পাতিল। সংসার বলতে এটুকুই। কিন্তু প্রথম কয়েকটা দিন ওদের কাছে মনে হয়েছিল, এর চেয়ে সুখের জীবন বুঝি আর হয় না। 

সকালে অফিসে বের হওয়ার আগে সালমা নিজ হাতে প্লেটে গরম ভাত তুলে দিত। সাথে ডিম ভাজা। রাতে ফিরে এলে গামছা এগিয়ে দিত। ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুয়ে মোজাফ্ফর মাঝে মাঝেই ভাবত, মানুষ আসলে খুব বেশি কিছু চায় না। স্রেফ নিজের একটা ঘর আর সেই ঘরে অপেক্ষা করার একজন মানুষ থাকলেই যথেষ্ট।

মোজাফ্ফর একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির বিক্রয়কর্মী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডাক্তারদের চেম্বার, ওষুধের দোকান আর ক্লিনিক ঘুরে বেড়ায়। মাস শেষে বেতন হাতে পায় ঠিকই, কিন্তু সেই টাকার বড় একটা অংশ চলে যায় গ্রামের বাড়িতে। বৃদ্ধ বাবা আর মায়ের ওষুধ, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা, ছোট বোনের কলেজে যাওয়া। এসবের পর হাতে যা থাকে, তা দিয়ে শহরের সংসার চালানোই কষ্টকর। তারপরও সে কখনো সালমাকে এসব বোঝাতে চায়না। বরং নিজের কষ্টটুকু লুকিয়ে রেখে সবসময় হাসিমুখেই বলে, &quot;আরেকটু সময় দাও। সব ঠিক হয়ে যাবে।&quot;

যদিও সালমা খুব বেশি কিছু চাইত না। তবে যখনই কিছু চাইত, সেটা মন থেকেই চাইত। কখনো নতুন শাড়ি, কখনো একটা স্যান্ডেল, কখনো পাশের বাসার ভাবির হাতে থাকা মোবাইলের মতো একটা মোবাইল। 

মোজাফ্ফর প্রথমে না করত। তারপর সালমা অভিমান করত। সেই অভিমান খুব ভয় পেত সে। মেয়েটা কথা বলা বন্ধ করে দিত। রান্না করত, কিন্তু খেতে ডাকত না। নিজেও খেত না। একই বিছানায় শুয়েও উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকত। সেই নীরবতা মোজাফ্ফরের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার ছিল। শেষ পর্যন্ত সে অফিস থেকে অগ্রিম নিয়ে হলেও সালমার ইচ্ছেটা পূরণ করত। তারপর পুরো মাসটা ধার করা টাকার বোঝা মাথায় নিয়ে কাটাত।

আজ সালমার জন্মদিন। এই দিনটার জন্য প্রায় দেড় মাস ধরে একটু একটু করে টাকা জমিয়েছে মোজাফ্ফর। দুপুরে চা খাওয়া কমিয়েছে। নিজের জন্য একটা নতুন শার্ট কেনেনি। কয়েকদিন রিকশার বদলে হেঁটে অফিসে গেছে। সবকিছু করেছে শুধু এই একটা দিনের জন্য। এই দিনটার জন্যই সে আজ অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে।

সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সালমা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কপালে ছোট্ট একটা টিপ পরল। তারপর ঘুরে মোজাফ্ফরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। বললো, &quot;আজ  সারাদিন কিন্তু আমারে রাগাইতে পারবা না।&quot;

মোজাফ্ফরও হেসে ফেলল। বললো, &quot;নারে বউ, আজকে তোমার দিন।&quot;

দুজনেই রিকশায় করে মার্কেটে এল। চারতলার একটা রেস্টুরেন্টে বসে দুপুরের খাবার খেল। চিকেনের শেষ টুকরোটা নিজের প্লেট থেকে তুলে সালমার প্লেটে রেখে দিল মোজাফ্ফর। বললো, &quot;তুমি খাও। আমার আর লাগবো না।&quot;

সালমা তখন সত্যিই খুশি ছিল। তার চোখেমুখে সেই আনন্দ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। 

খাওয়া শেষে তারা একটা শাড়ির দোকানে ঢুকল। দোকানের কর্মচারী একের পর এক শাড়ি খুলে দেখাতে লাগল। লাল, নীল, মেরুন, বেগুনি হরেক রকম শাড়ি। নতুন কাপড়ের গন্ধে পুরো দোকানটা ভরে আছে।

অনেকক্ষণ দেখে মোজাফ্ফর একটা শাড়ি আলাদা করল। তার কাছে সেটাই সবচেয়ে সুন্দর মনে হলো। কারণ সৌন্দর্যের সঙ্গে দামটাও তার নাগালের ভেতর ছিল। শাড়িটা হাতে নিয়ে সালমার দিকে বাড়িয়ে দিল। বললো, &quot;এইডা নাও। তোমারে খুব সুন্দর মানাইবো।&quot;

সালমা শাড়িটার দিকে একবার তাকাল। তারপর মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে সে নিজেই একটা শাড়ি নামিয়ে আনল। গাঢ় লাল রঙের উপর সোনালি জরির কাজ। আলো পড়তেই শাড়িটা ঝিলমিল করে উঠল। বললো, &quot;আমি এইডা নিব।&quot;

মোজাফ্ফর দোকানীর দিকে তাকালো। তার মুখ তেকে দাম শুনে ওর বুকের ভেতরটা ককিয়ে উঠলো। মানিব্যাগে থাকা টাকাগুলো যেন তাকে উপহাস করতে লাগলো। শাড়িটার দাম তার সামর্থ্যের বাইরে।

সে অনেক কষ্টে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। সালমাকে বললো, &quot;আরেকটা দেখো। এইডার দাম একটু বেশি।&quot;

সালমার কপালে ভাঁজ পড়ল। &quot;কত বেশি?&quot;

মোজাফ্ফর উত্তর দিল না। তার নীরবতাই উত্তর হয়ে দাঁড়াল।

সালমার চোখের দৃষ্টিটা বদলে গেল। একটু রাগত স্বরে বললো, &quot;কেন তোমার কাছে এইডা কেনার মত টাকা নাই?&quot;

মোজাফ্ফর ধীরে মাথা নিচু করল। অনুনয়ের কন্ঠে বললো, &quot;এই মাসে আর পারতেছি না বউ। প্লিজ একটু বুঝনের চেষ্টা কর।&quot; তার বলার ভঙ্গীতে দোকানের ভেতরের বাতাসটাও যেন ভারী হয়ে উঠল।

সালমা ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব নিচু গলায় এমন কিছু কথা বলতে শুরু করল, যেগুলো কেবল মোজাফ্ফরের কানে পৌঁছাল। কিন্তু সেই কথাগুলোর প্রতিটা যেন ধারালো কাঁচের টুকরোর মতো তার বুকের ভেতরে ঢুকে যেতে লাগল।

সালমা বললো, &quot;যখন পারোই না, তখন এত বড় বড় কথা কও ক্যান? বিয়ার পর আমার পথ্থম জন্মদিনে পছন্দের একটা শাড়ি কিনে দিতে পারবা না, তাইলে এহানে নিয়া আইছো কেন?&quot;

মোজাফ্ফর আর দাঁড়াতে পারল না। দোকান থেকে বেরিয়ে এল। সালমাও পেছন পেছন বেরিয়ে এল। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। তবু দুজনেই পাশাপাশি হাঁটছে।

একসময় এসে দাঁড়াল চারতলার রেলিংয়ের কাছে। মোজাফ্ফর পেছাতে পেছাতে এসে কোমর ঠেকিয়ে দাঁড়াল রেলিংয়ে। সালমা তার ঠিক সামনে।

মার্কেটের কোলাহল তখনও আগের মতোই চলছে। অথচ মোজাফ্ফরের কাছে সব শব্দ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল।

সালমা হাত নাড়িয়ে কথা বলেই যাচ্ছে। &quot;তোমার মতো মানুষেরে বিয়া করাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।&quot;

কথাটা শুনে মোজাফ্ফর আর উত্তর দিল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল সালমার দিকে। তারপর অদ্ভুত ধীরতায় ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। রেলিংয়ের ওপাশে অনেক নিচে মানুষ হাঁটছে। কেউ হাসছে। কেউ কেনাকাটা করছে। পৃথিবীটা ঠিক আগের মতোই চলছে। 

তার হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ল। মায়ের কথা মনে পড়ল। ছোট ভাইটার ভর্তি ফি। 
অফিসের হিসাব বিভাগের লোকটার মুখ। নিজের সেই অগণিত প্রতিশ্রুতি। একটা ভালো বাসা নেবে। সালমাকে একটা সোনার চুড়ি কিনে দেবে। মাকে শহরে এনে ডাক্তার দেখাবে। ছোট ভাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবে।

কিছুই হয়নি। সে শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়েই গেছে। ধীরে ধীরে আবার সামনে তাকাল।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সালমাকে তখন তার হঠাৎ খুব অচেনা মনে হলো। মনে হলো, এই মেয়েটা সেই মানুষ নয়, যার জন্য প্রতিদিন সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করত। এই মুখটা যেন তাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছে, সে ব্যর্থ। সে অক্ষম। সে কারও স্বপ্ন পূরণ করার মতো মানুষ নয়।

এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, এই পৃথিবীতে তার আর কোনো প্রয়োজন নেই। সে খুব ধীরে দুই হাত তুলে রেলিংয়ের ওপর রাখল। তার চোখদুটো আশ্চর্য রকম শান্ত হয়ে এসেছে।

সালমা তখনও বুঝতে পারেনি কী হতে যাচ্ছে। সে বিরক্ত গলায় বললো, &quot;চুপ কইরা আছ কেন? এরকম সংয়ের মত দাঁড়াইয়া থাকলেই কি সব ঠিক হইয়া যাইবো?&quot;

মোজাফ্ফর শেষবারের মতো স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাল। তারপর দুই হাতের ভর দিয়ে শরীরটা রেলিংয়ের একটু ওপরে তুলল। কয়েক সেকেন্ড স্থির থাকলো যেন সে ওটার উপর বসতে চাইছে। পরমুহুর্তেই নিজেকে পেছনে ঠেলে দিল। 

সালমা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। যখন বুঝল, তখন শুধু দেখল, মোজাফ্ফরের শরীরটা সহসাই তার চোখের সামনে থেকে নেই হয়ে গেল।

সে চিৎকার করে উঠল। দৌড়ে গিয়ে রেলিং আঁকড়ে নিচে তাকাল।

নিচে মানুষের ভিড় জমে গেছে। কেউ ছুটে যাচ্ছে। কেউ চিৎকার করছে। কেউ মোবাইল বের করছে। কিন্তু সালমা কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।

তার কানে শুধু বারবার ভেসে আসছে দুপুরের সেই কথাটা। &quot;আজকে তোমার দিন।&quot;

সালমার দুই হাত তখনও রেলিং শক্ত করে ধরে আছে। কিন্তু সে জানেনা, যে হাতটা তার সারাজীবন ধরে রাখার কথা ছিল, সেটাকে সে আর কোনোদিন ধরতে পারবে না।
(সমাপ্ত)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/258716/</link>
				<pubDate>Sun, 26 Jul 2026 05:57:58 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>“শুধু তোমার জন্য”</p>
<p>দুপুরের রোদটা কাঁচের দেয়াল ভেদ করে বহুতল মার্কেটের ভেতরেও এসে পড়েছে। সাদা টাইলসের উপর ছড়িয়ে থাকা আলোয় মানুষের ছায়াগুলো ক্রমশঃ লম্বা হয়ে যাচ্ছে। কোথাও বাচ্চাদের হাসি, কোথাও দোকানিদের ডাকাডাকি, কোথাও নতুন কাপড়ের গন্ধ। চারতলার খোলা বারান্দা ঘেঁষে দাঁড়ালে নিচের তিনটা তলা একসাথে চোখে পড়ে। মাঝখানটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। রেলিংয়ের ওপাশ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-258716"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/258716/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">39ded47f26eaf206d18253c5cb7a6a76</guid>
				<title>মানুষের ভীড়ে অন্য মানুষ

মেসের ছোট্ট রুমটায় বসে রাশেদ শেষবারের মতো টাকাগুলো গুনল। প্রায় এক বছর ধরে টিউশনি করে একটু একটু করে জমিয়েছে। কত দিন দুপুরে শুধু একটা কলা খেয়ে কাটিয়েছে। ঈদে নতুন জামা কেনেনি। বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যায়নি। সব কষ্টের একটাই কারণ। আজ সে একটা টাচ মোবাইল কিনবে। নিজের খুব শখ ছিল। পড়াশোনারও দরকার ছিল। ফোনটা থাকলে অনলাইনে ক্লাস করতে পারবে, নোট দেখতে পারবে, চাকরির প্রস্তুতি নিতে পারবে। মানিব্যাগটা পকেটে রেখে আয়নায় একবার নিজের মুখটা দেখল। নিজেকে তার খুব সন্তুষ্ট মনে হলো। একটু মুচকি হেসে দরজায় তালা লাগিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

রাস্তায় এসে মোবাইল মার্কেটে যাওয়ার জন্য একটা রিকশায় উঠল। রিকশাওয়ালার বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে। মুখে সাদা দাড়ি। গায়ে পুরোনো একটা শার্ট। পা দুটো দেখে মনে হচ্ছিল, অনেক বছর ধরে রিকশার প্যাডেল ঘুরাতে ঘুরাতে শক্ত হয়ে গেছে। কিছু দূর যেতেই উনার পকেটে থাকা বাটন ফোনটা বেজে উঠল। তিনি রিকশা থামিয়ে ফোনটা কানে নিলেন। ওপাশে কী বলা হচ্ছে শোনা যাচ্ছিল না। শুধু লোকটার কথাগুলো ভেসে এলো। 

তিনি নিচু গলায় বললেন, &quot;কান্দিস না। আমি তো চেষ্টা করতাছি। কি কস ? কালকের মইধ্যে টাকা না দিলে পরীক্ষা দিতে পারবো না!” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললেন, &quot;অহন আমি কার কাছে যামু? কই পামু অত ট্যাহা। সারাদিন রিকশা চালাইয়া আর কয় ট্যাহাই পাই। হুন, পোলাডারে কইস মন খারাপ না করতে। আমি দেহি কি করন যায়।&quot; ফোনটা বুক পকেটে রেখে তিনি গামছা দিয়ে চোখ মুছে আবার রিকশা চালাতে লাগলেন। 

রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, &quot;চাচা, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?&quot;

লোকটা ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে ফিরে বললেন, &quot;কও বাবা।&quot;

রাশেদ বলল, &quot;আপনার ছেলের কী হইছে?&quot;

লোকটা এবার সামনে ফিরে মাথা নিচু করে বললেন, &quot;এই বছর মেট্রিক পরীক্ষা দিব। কাল ফরম ফিলাপের শেষ দিন। আমি অহনো ট্যাহা জোগাড় করতে পারি নাই। পোলাডা পড়া-শোনায় খুব ভালো। শুধু ট্যাহার জন্য যদি পরীক্ষা দিতে না পারে, তাইলে বাপ হইয়া আমি কেমনে সয্য করি?&quot;

এরপর আর কেউ কোনো কথা বলল না। রিকশার চাকার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ হলো না।

মোবাইল মার্কেটের সামনে এসে রিকশা থামল। রাশেদ ভাড়া দিয়ে দোকানের ভেতরে ঢুকে গেল। কাঁচের শোকেসে সাজানো মোবাইলগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, &quot;ভাই, ওই ফোনটা একটু দেন তো?&quot; 

দোকানদার ফোনটা এগিয়ে দিলেন। রাশেদ অনেক যত্ন করে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে নিজের মুখটা দেখলো। সহসা কি মনে করে বাইরে তাকালো। দোকানের কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখলো, বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা দোকানের দিকেই তাকিয়ে আছেন। তারপর ধীরে ধীরে রিকশা ঘুরিয়ে তার সীটে উঠে বসলেন। কিন্তু, তার মাথাটা নিচু। প্যাডেলে চাপ দেওয়ার আগে একবার গামছা দিয়ে নিজের চোখটা মুছলেন।  

রাশেদ আবার হাতের মোবাইলটার দিকে ফিরলো। তারপর আস্তে করে ওটা টেবিলের ওপর রেখে দ্রুত দোকান থেকে বেরিয়ে এল।

দোকানদার অবাক হয়ে বললেন, &quot;ভাই, ফোনটা নেবেন না?&quot;

রাশেদ শুনেও যেন শুনল না। সে প্রায় দৌড়ে গিয়ে রিকশার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, &quot;চাচা, একটু দাঁড়ান।&quot;

রিকশাওয়ালা সজোরে ব্রেক কষলেন। অবাক হয়ে বললেন, &quot;কী হইছে বাবা?&quot;

রাশেদ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। তারপর ভেতরে থাকা সব টাকাগুলো লোকটার হাতে ধরিয়ে দিল। ”এই টাকা গুলা নেন।”

লোকটা কেমন যেন ভয় পেয়ে গেলেন। টাকাগুলো ওকে ফেরত দিতে দিতে বললেন, &quot;না বাবা। এইডা কী করতাছ? আমি এই টাকা নিতে পারমু না।&quot;

রাশেদ তাঁর হাতটা শক্ত করে ধরে চেপে বলল, &quot;রাখেন চাচা। এই টাকা দিয়া আপনার ছেলের ফরম ফিলাপ কইরা দেন।&quot;

লোকটার চোখ ভিজে উঠলো। কাঁপা গলায় বললেন, &quot;কিন্তু এইডা তো তোমার টাকা।&quot;

রাশেদ মুচকি হেসে বলল, &quot;হ, আমারই টাকা। একটা মোবাইল কিনার জন্য গত এক বছর ধইরা অনেক কষ্ট কইরা জমাইছিলাম।&quot;

বৃদ্ধ মানুষটা যেন কথাই হারিয়ে ফেললেন। অনেকক্ষণ রাশেদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, &quot;না বাবা। তোমার এত দিনের কষ্টের টাকা আমি নিতে পারমু না। আমার পোলার কপালে যা আছে তাই হইব।&quot;

রাশেদ এবার টাকাগুলো ভাঁজ করে লোকটার শার্টের বুকপকেটে গুঁজে দিল। তারপর দুই হাত দিয়ে তাঁর হাতটা ধরে আস্তে করে বলল, &quot;চাচা, আমারে আর না কইরেন না। আমার আব্বাও মানুষের বাড়িতে কামলা দেয়। আমি জানি, পোলার জন্য একজন গরিব বাপের বুকের ভিতরে কতটা কষ্ট হয়। মোবাইল আমি পরেও কিনতে পারমু। কিন্তু আপনার পোলা যদি পরীক্ষাই দিতে না পারে, তাইলে তার জীবনটাই নষ্ট হইয়া যাইবো। এই ক্ষতিটা আমি কোনোদিন মেনে নিতে পারুম না।&quot;

লোকটার ঠোঁট কাঁপছিল। তিনি কিছু বলতে গিয়েও পারলেন না। হঠাৎ দুই হাত দিয়ে রাশেদের হাত শক্ত করে ধরে কেঁদে ফেললেন। সেই কান্না ছিল না শুধু টাকার জন্য। সেই কান্না ছিল একজন অসহায় বাবার কৃতজ্ঞতাবোধের কান্না। অনেকক্ষণ পর তিনি চোখ মুছে বললেন, &quot;বাবা... তোমার আব্বা অনেক ভাগ্যবান।&quot;

রাশেদের চোখও ভিজে উঠল। সে মাথা নিচু করে বলল, &quot;ভাগ্যবান আমিও চাচা। আমার আব্বা ছোটবেলা থেইকা একটা কথাই কইছে। আর কিছু না হোক, একজন মানুষ হইস বাপ।&quot;

বৃদ্ধ মানুষটা কাঁপতে কাঁপতে রাশেদের মাথায় হাত রাখলেন। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, &quot;আল্লাহ, আমার পোলাডারে যদি মানুষ বানাও, তাইলে এই ছেলেটার মতো বানাইও। তারে অন্যের কষ্ট বুঝার মত মন দিও।&quot;

রাশেদ আর দাঁড়াল না। আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল। পেছন থেকে বৃদ্ধ মানুষটার ভেজা গলাটা আবার ভেসে এলো, &quot;বাবা... আল্লাহ তোমারে ভালো রাখুক।&quot;

রাশেদ কোন কথা বললো না। শুধু একবার হাত তুলে ইশারা করল। তারপর চলমান মানুষের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
(৬ই জুলাই, ২০২৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/256718/</link>
				<pubDate>Mon, 06 Jul 2026 05:27:35 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>মানুষের ভীড়ে অন্য মানুষ</p>
<p>মেসের ছোট্ট রুমটায় বসে রাশেদ শেষবারের মতো টাকাগুলো গুনল। প্রায় এক বছর ধরে টিউশনি করে একটু একটু করে জমিয়েছে। কত দিন দুপুরে শুধু একটা কলা খেয়ে কাটিয়েছে। ঈদে নতুন জামা কেনেনি। বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যায়নি। সব কষ্টের একটাই কারণ। আজ সে একটা টাচ মোবাইল কিনবে। নিজের খুব শখ ছিল। পড়াশোনারও দরকার ছিল। ফোন&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-256718"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/256718/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">31c1c737da9efbf5261f3ea1147a6a95</guid>
				<title>শিলালিপি
সন্ধ্যা নামে, জানালাতে কাঁদে কুয়াশার জল,
ফিরে আসে স্মৃতিরা সব, জাগে নিঃশব্দ ছল।

মানুষভরা পথের শেষে দাঁড়াই একা আমি,
চারদিকে আলোর মেলা, অন্তর অন্ধগামী।

বুকের ভেতর মরুভূমি, উড়ে বালুর ধোঁয়া,
শুকনো নদীর বুকে শুধু মৃত জোয়ারের ছোঁয়া।

নিভে-যাওয়া নক্ষত্র যেন আমার পরিচয়,
হাজার মুখের মাঝখানেও আপন কেউ আর নয়।

রাত গভীর, শূন্য ঘরে জেগে থাকে দীর্ঘশ্বাস,
দেয়ালজুড়ে ছায়ারা সব লেখে বিষণ্ন ইতিহাস।

নিঃসঙ্গতা প্রাচীন কোনো সমাধিফলকপ্রায়,
প্রতিদিন সে একটু একটু প্রাণের প্রদীপ খায়।

তখন বুঝি, মৃত্যু কেবল দেহের অবসান নয়,
সবাইকে ছুঁয়ে থেকেও একা হওয়াই মহাক্ষয়।
(১৪ মাত্রার মাত্রাবৃত্তে)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/256536/</link>
				<pubDate>Sat, 04 Jul 2026 05:15:42 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>শিলালিপি<br />
সন্ধ্যা নামে, জানালাতে কাঁদে কুয়াশার জল,<br />
ফিরে আসে স্মৃতিরা সব, জাগে নিঃশব্দ ছল।</p>
<p>মানুষভরা পথের শেষে দাঁড়াই একা আমি,<br />
চারদিকে আলোর মেলা, অন্তর অন্ধগামী।</p>
<p>বুকের ভেতর মরুভূমি, উড়ে বালুর ধোঁয়া,<br />
শুকনো নদীর বুকে শুধু মৃত জোয়ারের ছোঁয়া।</p>
<p>নিভে-যাওয়া নক্ষত্র যেন আমার পরিচয়,<br />
হাজার মুখের মাঝখানেও আপন কেউ আর নয়।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-256536"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/256536/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">f03f04ab6dd89fa669b7ed7958973072</guid>
				<title>নিঃসঙ্গতার উপাখ্যান

নিভে যাওয়া নক্ষত্রের মতো আমি নিজেকেই হারাই ধীরে,
রাত্রির শিরায় শিরায় জমে ওঠে নির্বাক বিষণ্নতার লবণ।
চারপাশে মানুষের ভিড়, তবু কণ্ঠে কোনো সম্বোধন নেই,
আমি যেন পরিত্যক্ত কোনো মন্দিরের শেষ প্রদীপশিখা।

জানালার কাচে জমে থাকা কুয়াশা আমার আত্মজীবনী,
প্রতিটি বিন্দুতে লেখা আছে অপ্রকাশিত দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস।
বুকের ভেতর এক অনন্ত মরুভূমি বালুঝড় তোলে নীরবে,
সেখানে কোনো পাখি উড়ে না, কোনো নদী পথ খুঁজে পায় না।

নিঃসঙ্গতা এক অদৃশ্য সমাধি, জীবিতদের জন্য নির্মিত,
যেখানে প্রতিদিন একটু একটু করে কবর হয় অনুভূতিগুলো।
আমি সেই কবরের প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি অনন্তকাল,
নিজেরই ছায়াকে চিনতে গিয়ে বারবার অপরিচিত হই।

কখনো মনে হয়, আমি এক নির্বাসিত গ্রহের শেষ অধিবাসী,
যার আকাশে কোনো সূর্য ওঠে না, কোনো প্রার্থনা জ্বলে না।
অন্ধকারের সঙ্গে আমার এক গোপন আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে,
সে-ই একমাত্র জানে আমার নীরব কান্নার উচ্চারণ।

রাত গভীর হলে শূন্যতা এসে বসে মাথার পাশে,
তার শীতল আঙুলে জেগে ওঠে বিস্মৃত স্মৃতির দহন।
তখন বুঝি, মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর মৃত্যু রক্তপাত নয়,
বরং ধীরে ধীরে সকলের ভেতর থেকেও একা হয়ে যাওয়া।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/256535/</link>
				<pubDate>Sat, 04 Jul 2026 05:14:13 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>নিঃসঙ্গতার উপাখ্যান</p>
<p>নিভে যাওয়া নক্ষত্রের মতো আমি নিজেকেই হারাই ধীরে,<br />
রাত্রির শিরায় শিরায় জমে ওঠে নির্বাক বিষণ্নতার লবণ।<br />
চারপাশে মানুষের ভিড়, তবু কণ্ঠে কোনো সম্বোধন নেই,<br />
আমি যেন পরিত্যক্ত কোনো মন্দিরের শেষ প্রদীপশিখা।</p>
<p>জানালার কাচে জমে থাকা কুয়াশা আমার আত্মজীবনী,<br />
প্রতিটি বিন্দুতে লেখা আছে অপ্রকাশিত দীর্ঘশ্ব&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-256535"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/256535/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">c1c4f9cbab903575ff39b936174cf037</guid>
				<title>মনের গহীনে আলো

বিকেলের আলোটা আজ কেমন যেন মলিন। সারাদিন আকাশে রোদ ছিল না। ধূসর মেঘগুলো শহরের ওপর একটা বিষণ্ন চাদরের মতো ঝুলে আছে। সামনের বাড়ির ছাদের কার্নিশ থেকে বৃষ্টির জমে থাকা পানি টুপটাপ করে নিচে পড়ছে। দূরে কোথাও একটা কাক ডেকে উঠল। তারপর আবার চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এমন বিকেলগুলোতে মানুষের মন খুব সহজেই খারাপ হয়ে যায়।

জানালার পাশে ছোট্ট বিছানাটার কোণায় বসে আছে নীলা। দুই হাঁটু ভাঁজ করে বুকের কাছে তুলে নিয়েছে। থুতনিটা হাঁটুর ওপর রাখা। তার দৃষ্টি জানালার ওপারে। সামনের বাড়ির ছাদে দুটো কবুতর পাশাপাশি বসে আছে। একটার ঠোঁট আরেকটার গায়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে হঠাৎ বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। ঘরটার ভেতর কেমন একটা অগোছালো ভাব। পড়ার টেবিলের ওপর কলেজের বইগুলো এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে। খোলা খাতার ওপর একটা নীল রঙের কলম। পাশে অর্ধেক খাওয়া কফির মগ। কফিটা অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। টেবিলের এক কোণে ছোট্ট একটা টবে মানিপ্ল্যান্ট গাছ। কয়েকদিন পানি না দেওয়ায় পাতাগুলো ঝুলে পড়েছে। অনেকটা নীলার মনের মতো।

পাশের ঘরে টেলিভিশনের শব্দ ভেসে আসছে। তার মা সোফায় আধশোয়া হয়ে সিরিয়াল দেখছেন। মাঝেমধ্যে আবার ফোন হাতে নিয়ে ফেসবুক স্ক্রল করছেন। কখনো কারও ছবিতে লাইক দিচ্ছেন, কখনো কোনো আত্মীয়ের পোস্টে মন্তব্য করছেন। একেক সময় নিজের মনেই হেসে উঠছেন। বাবা এখনো ফেরেননি। তিনি ফিরবেন রাত দশটার পরে। তারপর খাওয়া-দাওয়া করে ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় ছুড়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন। মেয়ের সঙ্গে দুটো কথা বলার সময় তার নেই। শেষ কবে তিনি মেয়ের ঘরে এসে মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, &quot;মা, কেমন আছিস?&quot; তা নীলার মনেও নেই।

ঠিক তখনই তার ফোনটা টুং করে বেজে উঠল। সে চমকে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। অচেনা একটা মেসেজ। &quot;আপনার কবিতাটা খুব সুন্দর ছিল।&quot;

নীলা ভুরু কুঁচকে প্রোফাইলটা খুলল। নাম, আরিফ রহমান। প্রোফাইল ছবিতে হাসিমুখের একটা ছেলে। খুব সাধারণ চেহারা। কোনো অদ্ভুত কিছু নেই। সে কিছুক্ষণ দ্বিধায় রইল। অচেনা কাউকে উত্তর দেওয়া ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত আঙুলের ডগা দিয়ে ছোট্ট করে লিখল, &quot;ধন্যবাদ।&quot;

মেসেজটা যেতেই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল। &quot;আপনি কি নিয়মিত লেখেন?&quot; 

নীলা একটু অবাক হলো। আজকাল কে আর কারও লেখা পড়ে! সে কয়েক সেকেন্ড ভেবে লিখল, &quot;না। মাঝে মাঝে লিখি।&quot;

ওপাশ থেকে আবার মেসেজ এল। &quot;লিখবেন। আপনার লেখায় কষ্টটা বেশ স্পষ্ট।&quot;

কথাটা পড়ে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। একজন অচেনা মানুষ তার লেখার ভেতরের কষ্টটুকু বুঝে ফেলল, অথচ এতদিনে বাড়ির কেউ একবারও জিজ্ঞেস করেনি তার মন খারাপ কি না।

সেদিন তাদের আরও কিছু কথা হলো। কী পড়ে, কোন কলেজে পড়ে, কী ধরনের বই ভালো লাগে, এসব নিয়ে ছোট ছোট কথা। 

রাত অনেক হয়ে গেলে আরিফ একটা মেসেজ পাঠাল। &quot;অনেক রাত হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়ুন। আর একটা কথা... ভালো থাকবেন।&quot;

মেয়েটা অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ তাকে শেষ কবে ভালো থাকার কথা বলেছে, তা তার মনে নেই। তারপর খুব আস্তে করে ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরল।

এরপর দিনগুলো কেমন দ্রুত বদলে যেতে লাগল। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নিত সে। দেখত, একটা মেসেজ পড়ে আছে। &quot;ঘুম ভেঙেছে?&quot; দুপুরে আবার আরেকটা। &quot;খেয়েছো?&quot; রাতে। &quot;আজ এত চুপচাপ কেন?&quot; এই ছোট ছোট খোঁজ নেওয়াগুলো ধীরে ধীরে নীলার জীবনের অংশ হয়ে গেল।

একদিন দুপুরে খাওয়ার টেবিলে বসে সে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, &quot;মা, আজ কলেজে আমি আবৃত্তিতে প্রথম হয়েছি।&quot; 

মা ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না তুলেই বললেন, &quot;ভালো হয়েছে।&quot; কথাটা বলে তিনি আবার মোবাইলে ডুবে গেলেন।

নীলা চুপচাপ ভাত মাখতে লাগল। তার খুব ইচ্ছে করছিল মা একবার জিজ্ঞেস করুন, &quot;কি কবিতা বলেছিস?&quot; কিংবা একটু হাসিমুখে বলুন, &quot;আমার মেয়েটা তো খুব ভালো।&quot; কিন্তু কিছুই হলো না। ডাইনিং টেবিলের ওপরে রাখা গ্লাসের পানিটা হঠাৎ তার কাছে খুব ঝাপসা লাগতে শুরু করল।

সেদিন রাতে আরিফের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সে হঠাৎ লিখে ফেলল, &quot;আজ আমি আবৃত্তিতে প্রথম হয়েছি।&quot;

মেসেজটা দেখেই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল। &quot;সত্যি! অভিনন্দন। আমি জানতাম তুমি পারবে।&quot;

অদ্ভুত ব্যাপার। কথাটা পড়ে নীলার চোখের কোণে পানি এসে গেল। সারাদিন ধরে সে যে একটা কথার অপেক্ষা করছিল, সেটা একজন অচেনা মানুষ তাকে বলে দিল।

এরপর শুধু মেসেজ নয়, ফোনেও কথা হতে লাগল। কখনো বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে, কখনো ছাদে দাঁড়িয়ে, কখনো গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পরে। একদিন বিকেলে আকাশে প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল। জানালার কাঁচ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে। দূরে বিদ্যুতের তারে কয়েকটা ভেজা চড়ুই বসে আছে। ঠিক তখনই ফোনটা টুং করে বেজে উঠল। 

আরিফ লিখেছে, &quot;মাঝে মাঝে খুব একা লাগে।&quot;

নীলা অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে লিখল, &quot;আমারও।&quot;

ওপাশ থেকে আবার মেসেজ এল। &quot;তোমাকে একটা কথা বলি? যারা খুব হাসে, তারা সাধারণত খুব একা হয়।&quot;

মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর লিখল, &quot;আমিও খুব একা।&quot;

এই একটা বাক্যের মধ্যেই যেন দুজন মানুষের দূরত্ব অনেকটা কমে গেল।

শীত পড়তে শুরু করেছে। এক সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে পশ্চিম আকাশ দেখছিল নীলা। আকাশটা কমলা রঙে রাঙা হয়ে আছে। পাখিরা ঝাঁক বেঁধে নিজেদের বাসায় ফিরছে। দূরের একটা মিনার থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। 

ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ এল। &quot;তোমাকে একটা কথা বলব?&quot;

নীলার বুকের ভেতরটা অকারণে ধক করে উঠল। সে কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে লিখল, &quot;বলো।&quot;

ওপাশ থেকে উত্তর আসতে বেশি সময় লাগল না। &quot;একদিন দেখা করতে চাই।&quot;

মেয়েটা স্থির হয়ে গেল। হালকা ঠান্ডা বাতাস এসে তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। নিচের রাস্তায় দোকানগুলোতে একে একে আলো জ্বলে উঠছে। সে অনেকক্ষণ কিছু লিখতে পারল না। 

অবশেষে খুব ধীরে টাইপ করল, &quot;আমি কখনো ফেসবুকের কারও সঙ্গে দেখা করিনি।&quot;

আরিফ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল। &quot;আমি খারাপ কেউ নই। শুধু একটু গল্প করব।&quot;

নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার বুকের ভেতরে কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে। ভয়ও লাগছে, আবার ভালোও লাগছে। অনেকক্ষণ পরে সে লিখল, &quot;আচ্ছা।&quot;

মেসেজটা পাঠানোর পর সে ফোনটা বুকে চেপে ধরল। জানালার ওপারে তখন সন্ধ্যা পুরোপুরি নেমে এসেছে। আশপাশের বাড়িগুলোর জানালায় আলো জ্বলছে। দূরে কোথাও একটা ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে নীলা নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, জীবনে বুঝি নতুন একটা দরজা খুলতে যাচ্ছে। সে জানত না, সেই দরজার ওপাশে আলোও আছে, আবার গভীর অন্ধকারও আছে।

সেদিন সকাল থেকেই নীলার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছিল। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই বারবার মোবাইলের স্ক্রিনে সময় দেখছে। কখনো আলমারি খুলছে, কখনো আবার বন্ধ করে দিচ্ছে। বিছানার ওপর তিনটা জামা ছড়িয়ে রেখেছে। কোনটা পরে যাবে, সেটাই বুঝতে পারছে না। জানালার বাইরে মেঘলা আকাশ। মাঝেমধ্যে হালকা বাতাস এসে পর্দাটা উড়িয়ে দিচ্ছে। নিচের রাস্তায় ভ্যানওয়ালা চিৎকার করে সবজি বিক্রি করছে। পাশের বাড়ির একটা ছোট ছেলে সাইকেল চালাতে চালাতে বারবার হর্ন বাজাচ্ছে। কিন্তু নীলার কানে এসব কিছুই ঢুকছে না। আজ সে প্রথমবারের মতো আরিফের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। ভোর থেকে বুকের ভেতরটা এমনভাবে ধুকপুক করছে যেন সে কোনো পরীক্ষার হলে বসতে যাচ্ছে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে অনেকক্ষণ দেখল। হালকা আকাশি রঙের একটা কামিজ বের করল। চুলগুলো আঁচড়ে খোলা রাখল। চোখে সামান্য কাজল দিল। তারপর আবার সব মুছে ফেলল। মনে হলো, বেশি সাজলে খারাপ দেখাবে। ঠিক তখনই ফোনটা টুং করে বেজে উঠল। 

আরিফ মেসেজ পাঠিয়েছে। &quot;ভয় লাগছে নাকি?&quot; 

মেয়েটার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল। সে কয়েক সেকেন্ড ভেবে লিখল, &quot;একটু।&quot; 

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল, &quot;ভয় পেয়ো না। আমি কিন্তু দেখতে খুবই সাধারণ একজন মানুষ।&quot; 

কথাটা পড়ে নীলা অজান্তেই হেসে ফেলল। মনে হলো, ছেলেটা যেন তার সামনেই বসে আছে।

দুপুরের একটু পর সে মায়ের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। তার মা তখনও ফোনে ব্যস্ত। কারও সঙ্গে ভিডিও কলে গল্প করছেন। ঘরের ভেতর হাসির শব্দ ভেসে আসছে। নীলা আস্তে করে বলল, &quot;মা, আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।&quot; 

মা ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না তুলেই বললেন, &quot;হুম, যাও।&quot; 

নীলা একটু ইতস্তত করে আবার বলল, &quot;আমার ফিরতে একটু দেরি হতে পারে।&quot; 

এবারও একই উত্তর এল। &quot;ঠিক আছে।&quot; 

কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, একবারও জিজ্ঞেস করলেন না তিনি। মেয়েটা কয়েক সেকেন্ড দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। নিচে নামতে নামতে তার বুকের ভেতরটা কেমন খালি হয়ে গেল। মাঝে মাঝে মানুষকে অবহেলা করার সবচেয়ে নিষ্ঠুর উপায় হলো তাকে কোনো প্রশ্ন না করা।

শহরের ব্যস্ত রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা ক্যাফে। বাইরে লাল রঙের সাইনবোর্ড। কাঁচের দরজার ভেতর থেকে হলুদাভ আলো বাইরে এসে পড়েছে। রাস্তার পাশে দুটো কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছের নিচে ঝরে পড়া শুকনো ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে আছে। কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই কফির মিষ্টি গন্ধ নাকে এসে লাগল নীলার। দেয়ালজুড়ে কাঠের ফ্রেমে ঝোলানো পুরোনো ঢাকার কিছু সাদা-কালো ছবি। এক কোণায় টবে লাগানো মানিপ্ল্যান্ট। ছাদ থেকে ঝুলে থাকা ছোট ছোট বাতিগুলো পুরো জায়গাটাকে অদ্ভুত সুন্দর করে তুলেছে।

জানালার ধারের টেবিলটায় বসে আছে একটা ছেলে। কালো শার্ট পরা। সামনে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ। বারবার হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। দরজা খুলে নীলাকে ভেতরে ঢুকতে দেখেই ছেলেটা উঠে দাঁড়াল। মুখে মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠল তার। কয়েক সেকেন্ড মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থেকে সে বলল, &quot;তুমি নীলা?&quot; 

মেয়েটা শুধু মাথা নাড়ল। এত জোরে তার বুক ধুকপুক করছে যে মনে হচ্ছে আশেপাশের সবাই বুঝি শুনতে পাচ্ছে। আরিফ হেসে বলল, &quot;তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি ভাইভা দিতে এসেছো।&quot; 

নীলা এবার হেসে ফেলল। তারপর খুব আস্তে করে বলল, &quot;আসলে আমি একটু নার্ভাস।&quot; 

ছেলেটা কফির কাপটা পাশে সরিয়ে রেখে বলল, &quot;আমিও।&quot;

সেদিন বিকেলটা খুব দ্রুত কেটে গেল। কফির কাপের ধোঁয়া একসময় মিলিয়ে গেল। জানালার ওপারে সূর্যের আলো ফিকে হয়ে এল। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো একে একে জ্বলে উঠল। কিন্তু তাদের গল্প শেষ হলো না। বই নিয়ে কথা হলো, ছোটবেলা নিয়ে কথা হলো, স্বপ্ন নিয়ে কথা হলো। 

বিদায়ের আগে আরিফ একটু ইতস্তত করে বলল, &quot;একটা ছবি তুলি?&quot; 

নীলা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল। ক্যাফের বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে তারা একটা সেলফি তুলল। ছবিটায় দুজনেই হাসছে। খুব সাধারণ একটা ছবি। অথচ সেই মুহূর্তে নীলার কাছে সেটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ছবি।

এরপর দিনগুলো দ্রুত বদলে যেতে লাগল। এখন আর শুধু ফোনে কথা নয়, প্রায়ই দেখা হয় তাদের। কখনো লেকের ধারে, কখনো বইমেলায়, কখনো শহরের কোনো ছোট্ট রেস্তোরাঁয়। একদিন বিকেলে তারা নদীর ধারে গিয়েছিল। শীতের শেষ দিকের বিকেল। আকাশটা কমলা রঙে রাঙা। নদীর পানি সোনালি হয়ে ঝলমল করছে। দূরে কয়েকটা নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। নদীর পাড়ের ঘাসে বসে দুজনেই চুপচাপ সূর্যাস্ত দেখছিল।

হঠাৎ আরিফ খুব শান্ত গলায় বলল, &quot;জানো, তোমার সঙ্গে কথা বলতে খুব ভালো লাগে।&quot;

নীলা নদীর দিকে তাকিয়েই বলল, &quot;আমারও।&quot;

ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, &quot;তোমার কি কখনো খুব একা লাগে না?&quot;

মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, &quot;সবসময় লাগে।&quot;

আরিফ তখন তার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল, &quot;এখন থেকে লাগবে না।&quot;

কথাটা শুনে নীলার বুকের ভেতরটা কেমন উষ্ণ হয়ে উঠল। কেউ কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তবু তার মনে হলো, পৃথিবীতে সে আর একা নয়।

এরপর শুরু হলো ছবি তোলার দিন। কখনো কফির কাপ হাতে, কখনো বইমেলার গেটের সামনে, কখনো নদীর ধারে দাঁড়িয়ে। ছবিগুলো একসময় ফেসবুকে উঠতে শুরু করল। প্রতিটা ছবির নিচে অসংখ্য লাইক আর মন্তব্য। কেউ লিখছে, &quot;সুন্দর জুটি।&quot; কেউ লিখছে, &quot;মাশাআল্লাহ।&quot; কেউ আবার হাসির ইমোজি দিয়ে বলছে, &quot;কবে খাওয়াচ্ছ?&quot; প্রতিটা মন্তব্য পড়ে নীলার ভালো লাগত। সে মনে মনে ভাবত, এই মানুষটা বুঝি সত্যিই তার জীবনের শূন্য জায়গাগুলো পূরণ করে দিয়েছে।

কিন্তু বাড়িতে কেউ কিছু জানত না। একদিন রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে তার বাবা বললেন, &quot;তোর পরীক্ষা কবে?&quot; 

নীলা উত্তর দিল, &quot;আগামী মাসে।&quot; 

বাবা মাথা নেড়ে বললেন, &quot;ও আচ্ছা।&quot; তারপর আবার খবর দেখতে শুরু করলেন। 

কথাটা সেখানেই শেষ হয়ে গেল। মেয়েটা চুপচাপ ভাত মাখতে লাগল। সে মনে মনে ভাবল, যদি সে আজ বলে, আমি একজনের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করি, তাহলেও হয়তো কেউ খুব একটা অবাক হবে না। কারণ তার জীবনে কী হচ্ছে, সেটা জানার সময় এই বাড়ির কারও নেই।

শীতের এক বিকেলে তাদের দেখা হলো একটা পার্কে। গাছের পাতা ঝরে পড়ছে। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে মানুষ হাঁটছে, আর মচমচ শব্দ হচ্ছে। সেদিন আরিফকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল। সে খুব কম কথা বলছিল। মুখেও হাসি নেই।

নীলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, &quot;তোমার কি হয়েছে?&quot;

ছেলেটা জোর করে হাসল। &quot;কিছু না।&quot;

&quot;মিথ্যে বলছো।&quot;

আরিফ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, &quot;অফিসের কিছু ঝামেলা।&quot;

নীলা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। কিন্তু সেদিন তার বুকের ভেতরটা অকারণে কেঁপে উঠেছিল।

এরপর ধীরে ধীরে সব বদলে যেতে শুরু করল। মেসেজের উত্তর আসতে দেরি হতে লাগল। ফোন বন্ধ পাওয়া যেতে লাগল। রাতের পর রাত কোনো কথা হতো না। একদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আরিফের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। পরদিনও না। তার পরের দিনও না।

উদ্বিগ্ন হয়ে নীলা বারবার মেসেজ পাঠাল। &quot;তুমি কোথায়?&quot; &quot;তোমার কি হয়েছে?&quot; &quot;একবার উত্তর দাও।&quot; কিন্তু কোনো উত্তর এল না।

এক রাতে ঘুম ভেঙে সে ফোনটা হাতে নিল। ফেসবুকে গিয়ে সার্চ দিল। তারপর কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইল। আরিফের আইডিটা নেই।

সে আবার খুঁজল। আবার। আবার। কিন্তু না। আইডিটা সত্যিই নেই। মনে হলো কেউ যেন তার বুকের ভেতর থেকে একটা অংশ ছিঁড়ে নিয়ে গেছে।

সেদিন রাতটা সে জানালার পাশে বসেই কাটিয়েছিল। আকাশে কোনো চাঁদ ছিল না। চারপাশে শুধু অন্ধকার। দূরের কয়েকটা বাড়ির জানালায় মিটমিট করে আলো জ্বলছিল। সামনের বাড়ির ছাদে দুটো কবুতর পাশাপাশি বসে ছিল, ঠিক যেভাবে প্রথম দিন সে দেখেছিল। শুধু পার্থক্য একটা। সেদিন তার হাতে একটা আলো ছিল। আজ সেই আলোটা নিভে গেছে।


শীতের রাত। জানালার কাঁচে কুয়াশা জমে আছে, দূরের বাড়িগুলোর আলো কেমন ঝাপসা দেখাচ্ছে। পুরো ঘর অন্ধকার, শুধু পড়ার টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট স্টাডি ল্যাম্পটা জ্বলছে। তার হলুদ আলোয় বিছানার কোণায় বসে আছে নীলা। দুই হাঁটু বুকের কাছে টেনে নিয়েছে। তার চোখ দুটো ফুলে গেছে। গত তিন রাত সে ঠিকমতো ঘুমায়নি। আরিফের কোনো খোঁজ নেই। ফোন বন্ধ, ফেসবুক আইডি নেই, মেসেঞ্জারে পাঠানো সব মেসেজের পাশে শুধু একটা ধূসর টিক চিহ্ন। প্রথম দিন সে ভেবেছিল, হয়তো কোনো সমস্যা হয়েছে। দ্বিতীয় দিনেও নিজেকে বুঝিয়েছে। তৃতীয় দিন এসে বুকের ভেতরে একটা অজানা ভয় জমতে শুরু করেছে। মানুষের জীবন থেকে মানুষ এভাবে হঠাৎ হারিয়ে যায়?

ঠিক তখনই তার ফোনটা টুং করে বেজে উঠল। রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। এই সময় সাধারণত কেউ তাকে মেসেজ দেয় না। সে ফোনটা হাতে নিতেই দেখল, কলেজের বান্ধবী মিথিলা একটা লিংক পাঠিয়েছে। তার নিচে শুধু একটা লাইন লেখা, &quot;নীলা, এটা কি তুই?&quot; 

মেয়েটা ভুরু কুঁচকে লিংকটায় চাপ দিল। পরের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেল। মোবাইলের স্ক্রিনে একটা ভিডিও চলছে। সেখানে একটা মেয়ে, সম্পূর্ণ নগ্ন। তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেই মুখটা নীলার।

মেয়েটার হাত থেকে ফোনটা নিচে পড়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল, হাত-পা কাঁপতে শুরু করল, আর কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে যেন বুঝতেই পারল না পৃথিবীতে কী ঘটে গেছে। তারপর আবার ফোনটা তুলে নিল। আবার ভিডিওটা দেখল। না, এটা সে নয়। এটা কোনোভাবেই সে হতে পারে না। মুখটা তার, কিন্তু শরীরটা নয়। তার মনে হলো, কেউ যেন তার বুকের ওপর বিশাল একটা পাথর চাপিয়ে দিয়েছে।

ঠিক তখনই আরেকটা মেসেজ এল। তারপর আরেকটা। তারপর আরও একটা। &quot;এটা কি সত্যি?&quot; &quot;তুই এমন?&quot; &quot;তোর ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে!&quot; কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফোনটা অবিরাম কাঁপতে লাগল। অচেনা নম্বর থেকে কল আসছে, মেসেঞ্জারে নোংরা মেসেজ আসছে, ফেসবুকে একের পর এক কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য জমা হচ্ছে। মেয়েটা বিছানার ওপর বসে কাঁপতে লাগল। তারপর হঠাৎ বুকফাটা একটা চিৎকার বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে।

শব্দটা শুনে পাশের ঘর থেকে তার মা দৌড়ে এলেন। ঘরে ঢুকেই তিনি অবাক হয়ে বললেন, &quot;কী হয়েছে?&quot;

নীলা কাঁপতে কাঁপতে ফোনটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিল। তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। সে কোনোমতে বলল, &quot;মা... আমি না... আমি কিছু করিনি... এটা আমি না...&quot;

মা ভিডিওটা দেখলেন। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর তার মুখের রঙ বদলে গেল। তিনি ধীরে ধীরে বিছানার ধারে বসে পড়লেন। যেন তিনিও বুঝতে পারছেন না কী করা উচিত।

ঠিক তখনই বাইরে কলিং বেল বেজে উঠল। রাত বারোটায় কে আসতে পারে? বাবা দরজা খুলতেই দেখা গেল পাশের ফ্ল্যাটের আনোয়ার সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখটা অস্বস্তিতে ভরা। তিনি নিচু গলায় বললেন, &quot;ভাই, একটা ভিডিও নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। ভাবলাম আপনাদের জানিয়ে যাই।&quot;

বাবার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তিনি আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে নীলার ঘরের দিকে এগিয়ে এলেন। ঘরে ঢুকেই দেখলেন, মেয়েটা মায়ের কোলে মুখ গুঁজে কাঁদছে। আর তার স্ত্রী স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন।

সেই রাতেই তাদের পুরো পৃথিবী যেন বদলে গেল। 

পরদিন সকালটা ছিল আরও ভয়ংকর। ফজরের আজানের কিছুক্ষণ পর থেকেই ফোন আসতে শুরু করল। আত্মীয়স্বজন, দূর সম্পর্কের খালা, ফুফু, প্রতিবেশী—সবাই যেন হঠাৎ খুব আপন হয়ে উঠেছে। কেউ সহানুভূতি দেখাচ্ছে, কেউ কৌতূহল, কেউ আবার সরাসরি অপমান করছে। বিকেলের মধ্যেই নীলার ছবিসহ ভিডিওটা অসংখ্য ফেসবুক পেজে ছড়িয়ে পড়ল।

ঘরের পর্দা টেনে দেওয়া হয়েছে, জানালা বন্ধ, দরজা বন্ধ। তবুও নীলার মনে হচ্ছে, বাইরের সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে বিছানার কোণায় বসে আছে। চুলগুলো এলোমেলো, সারারাত কান্না করতে করতে চোখ ফুলে গেছে। 

ঠিক তখনই তার বাবা ঘরে ঢুকলেন। জীবনে এই প্রথম তিনি মেয়েকে এমন ভেঙে পড়তে দেখলেন। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর খুব ধীরে বললেন, &quot;সত্যি করে বল, তুই কোনো ভুল করেছিস?&quot;

কথাটা শুনে নীলার বুকের ভেতরটা ভেঙে গেল। সে বাবার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল। &quot;তুমিও আমাকে বিশ্বাস করছো না, বাবা?&quot;

লোকটা যেন পাথর হয়ে গেলেন। তার মেয়েটা এমনভাবে কাঁদছে, অথচ তিনি বুঝতেই পারেননি শেষ কবে তার সঙ্গে বসে গল্প করেছেন। তিনি বুঝতেই পারেননি, তার মেয়ের জীবনে কে এসেছে, কে চলে গেছে। তিনি বুঝতেই পারেননি, তার মেয়েটা কতটা একা। সেই মুহূর্তে তার বুকের ভেতরে ভীষণ অপরাধবোধ জন্ম নিল।

সেই রাতে নীলা খুব আস্তে করে বিছানা ছেড়ে উঠল। ঘরের সবাই তখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে কুয়াশা, রাস্তায় কোনো মানুষ নেই। দূরে একটা কুকুর ডেকে উঠল। মেয়েটা অনেকক্ষণ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে পড়ার টেবিলের ড্রয়ার খুলল। ভেতর থেকে একটা ঘুমের ওষুধের পাতা বের করল। তার হাত কাঁপছে, চোখ দিয়ে অবিরাম পানি পড়ছে। তার মনে হচ্ছে, পৃথিবীতে তার জন্য আর কিছু নেই।

ঠিক তখনই দরজাটা আস্তে করে খুলে গেল। তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি হয়তো অনেকক্ষণ ধরেই জেগে ছিলেন। মেয়ের হাতে ওষুধের পাতা দেখে তার বুক কেঁপে উঠল। তিনি এক দৌড়ে এসে নীলার হাতটা চেপে ধরলেন।

কাঁপা গলায় বললেন, &quot;তুই কী করতে যাচ্ছিলি?&quot;

নীলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে বাবাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। &quot;আমি বাঁচতে চাই না, বাবা... আমি পারছি না... সবাই আমাকে ঘৃণা করবে...&quot;

লোকটা মেয়েকে বুকের ভেতর চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। অনেক বছর পরে তিনি প্রথমবারের মতো বুঝলেন, সন্তানের পাশে শুধু টাকা-পয়সা থাকলেই হয় না, তার পাশে মানুষ হিসেবেও থাকতে হয়। তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, &quot;তুই কিছু করবি না। আমি আছি। তোর মা আছে। আমরা আছি।&quot;

পরদিন সকালেই নীলার বাবা তাকে নিয়ে সাইবার ক্রাইম ইউনিটে গেলেন। অফিসটা খুব সাধারণ। কয়েকজন কর্মকর্তা কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করছেন। 

একজন নারী কর্মকর্তা সব কথা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন, &quot;প্রথম কথা, আপনি কোনো অপরাধ করেননি। এটা এখন অনেকের সঙ্গেই হচ্ছে। এআই ব্যবহার করে মানুষের ছবি নিয়ে ভুয়া ভিডিও বানানো হচ্ছে।&quot;

কথাটা শুনে নীলা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, বুকের ওপর চাপা পাথরটা একটু হালকা হলো।

তদন্ত শুরু হলো। নীলার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, পুরোনো ছবি, মেসেঞ্জারের চ্যাট—সব খুঁটিয়ে দেখা হলো। কয়েকদিন পর সত্যিটা বেরিয়ে এল। আরিফের নামটাই মিথ্যা। ছবিটাও চুরি করা। পুরো পরিচয়টাই ছিল একটা ফাঁদ। আর সেই ভিডিও তৈরি করা হয়েছে নীলার ফেসবুকে আপলোড করা অসংখ্য ছবি ব্যবহার করে।

যেদিন অপরাধী গ্রেপ্তার হলো, সেদিন আকাশে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল নীলা। 

তার বাবা এসে খুব আস্তে করে বললেন, &quot;ছেলেটাকে ধরেছে।&quot;

মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব ধীরে বাবার দিকে তাকাল। লোকটার চোখেও পানি। তিনি এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। &quot;মা, আমি তোকে সময় দিইনি। তোর পাশে থাকিনি। আমাকে ক্ষমা করে দিস।&quot;

কথাটা শুনে নীলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, জানালার কাঁচ বেয়ে পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। অনেকদিন পরে তার মনে হলো, সে আর একা নয়।

কয়েক মাস পরে নীলা আবার কলেজে ফিরল। মানুষের ফিসফাস এখনো আছে, কৌতূহলী দৃষ্টিও আছে, কিন্তু সে বদলে গেছে। এখন সে মাথা নিচু করে হাঁটে না। একদিন কলেজের সেমিনারে তাকে বক্তব্য দিতে বলা হলো। মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে সে অনেকগুলো তরুণ-তরুণীর দিকে তাকাল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, &quot;অনলাইনে পরিচয় হওয়া সব মানুষ খারাপ নয়। কিন্তু কাউকে না জেনে, না বুঝে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক। নিজের ব্যক্তিগত তথ্য আর ছবি নিয়ে সতর্ক থাকবে। আর যদি কখনো এআই দিয়ে তৈরি কোনো ভুয়া ছবি বা ভিডিও নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে পড়, তাহলে লুকিয়ে থাকবে না, নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভাববে না। পরিবারের কাছে যাও, আইনের সাহায্য নাও। কারণ কউকে বিশ্বাস করা অপরাধ নয়। অপরাধ তার, যে তোমার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রযুক্তিকে অস্ত্র বানিয়ে তোমার জীবন ধ্বংস করে দিতে চায়।&quot;

পুরো হলঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সামনের সারিতে বসে থাকা তার বাবা-মা চোখ মুছছিলেন। মঞ্চের আলোয় দাঁড়িয়ে নীলা হঠাৎ অনুভব করল, অন্ধকার কখনো চিরস্থায়ী হয় না। কিছু অন্ধকার মানুষকে ভেঙে দেয়, আর কিছু অন্ধকার মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/256534/</link>
				<pubDate>Sat, 04 Jul 2026 04:56:29 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>মনের গহীনে আলো</p>
<p>বিকেলের আলোটা আজ কেমন যেন মলিন। সারাদিন আকাশে রোদ ছিল না। ধূসর মেঘগুলো শহরের ওপর একটা বিষণ্ন চাদরের মতো ঝুলে আছে। সামনের বাড়ির ছাদের কার্নিশ থেকে বৃষ্টির জমে থাকা পানি টুপটাপ করে নিচে পড়ছে। দূরে কোথাও একটা কাক ডেকে উঠল। তারপর আবার চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এমন বিকেলগুলোতে মানুষের মন খুব সহজেই খারাপ হয়ে যায়।</p>
<p>জানালার&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-256534"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/256534/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">89156f621e83fe71fb69f8f263d8197b</guid>
				<title>মান-অভিমানের পরে

সংসারে কখনো ঝড় ওঠে, কথার ভাঁজে ভাঁজে জমে ওঠে মেঘ,
তুচ্ছ অভিমানে দুটি মন যেন দুটি দূর নক্ষত্র হয়ে যায়।
একজন নীরবে জানালার পাশে বসে থাকে,
অন্যজন বালিশে মুখ গুঁজে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
তবু বুকের গভীরতম গোপন কুঠুরিতে
একজনই আরেকজনের জন্য অনন্ত অপেক্ষা হয়ে জেগে থাকে।

কারণ স্বামী-স্ত্রীর প্রেম শুধু হাত ধরে পথ চলার গল্প নয়,
শুধু চোখে চোখ রেখে হাসার কোনো ক্ষণিক মায়াও নয়;
এ প্রেমে আছে চুলে আঙুল ছুঁইয়ে দেওয়ার কোমলতা,
আছে দীর্ঘ আলিঙ্গনে সমস্ত ক্লান্তি ভুলে যাওয়ার শান্তি,
আছে কপালে নেমে আসা স্নেহভরা চুম্বনের মৃদু কাঁপন,
আছে একে অপরের বুকে মুখ রেখে পৃথিবীটাকে ভুলে থাকার গভীর প্রশ্রয়।

অভিমান যত গভীর হয়, ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও তত তীব্র হয়ে ওঠে,
রাত যত গাঢ় হয়, তত কাছে চলে আসে দুটি অস্থির হৃদয়।
একটি হাত নিঃশব্দে আরেকটি হাত খুঁজে নেয়,
একটি মুখ এসে থামে প্রিয় বুকের উষ্ণ আশ্রয়ে,
আর সমস্ত দূরত্ব, সমস্ত নীরবতা, সমস্ত মান ভেঙে
দুটি মানুষ আবার ভালোবাসার এক অদৃশ্য স্রোতে ভেসে যায়।

দাম্পত্যের সবচেয়ে মধুর সত্য এই,
প্রেম এখানে শুধু মনের জানালায় ফুল হয়ে ফোটে না,
প্রেম শরীরের উষ্ণতাতেও তার নীড় বাঁধে;
একটি স্পর্শে জেগে ওঠে হাজার অনুভব,
একটি আলিঙ্গনে গলে যায় দিনের সমস্ত অভিমান,
আর একই বিছানার নরম অন্ধকারে
দুটি মানুষ পরস্পরের নিঃশ্বাসে, পরস্পরের হৃদস্পন্দনে
আবার নতুন করে একে অপরকে আবিষ্কার করে।

তাই ঝগড়া থাকুক, অভিমান থাকুক, 
কিছু নোনা জলও জমুক চোখের কোণে,
তবু রাতের শেষে একটি হৃদয় আরেকটি হৃদয়ের কাছে ফিরে আসুক,
একটি শরীর আরেকটি শরীরের উষ্ণতায় খুঁজে পাক তার চিরচেনা আশ্রয়;
কারণ স্বামী-স্ত্রীর প্রেমের পূর্ণতা ঠিক সেখানেই—
যেখানে মান ভেঙে যায় একটি চুম্বনে,
দূরত্ব মুছে যায় একটি গভীর আলিঙ্গনে,
আর দুটি মানুষ সমস্ত পৃথিবী ভুলে
একজনের বুকে আরেকজন হয়ে বেঁচে থাকে আজীবন।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/256384/</link>
				<pubDate>Thu, 02 Jul 2026 07:24:03 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>মান-অভিমানের পরে</p>
<p>সংসারে কখনো ঝড় ওঠে, কথার ভাঁজে ভাঁজে জমে ওঠে মেঘ,<br />
তুচ্ছ অভিমানে দুটি মন যেন দুটি দূর নক্ষত্র হয়ে যায়।<br />
একজন নীরবে জানালার পাশে বসে থাকে,<br />
অন্যজন বালিশে মুখ গুঁজে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,<br />
তবু বুকের গভীরতম গোপন কুঠুরিতে<br />
একজনই আরেকজনের জন্য অনন্ত অপেক্ষা হয়ে জেগে থাকে।</p>
<p>কারণ স্বামী-স্ত্রীর প্রেম শুধু হাত ধরে পথ চলার গল্প নয়,&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-256384"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/256384/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">889cf4ec1e1aaead450a0f69a2a6ff0d</guid>
				<title>আলোর পথে

আষাঢ় মাসের শেষ দিক। সারা দিন আকাশে রোদ আর মেঘের লুকোচুরি চলেছে। বিকেলের দিকে হালকা বাতাস উঠেছে। কমলাপুর রেলস্টেশনের চারপাশে তখনও মানুষের ভিড় কমেনি। লাল জামা পরা কুলি মাথায় মালপত্র নিয়ে দৌড়াচ্ছে, চায়ের দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছে, হকাররা গলা ফাটিয়ে পানি, বাদাম আর চিপস বিক্রি করছে। দূরে কোথাও একটা ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে শত শত কবুতর উড়ে গিয়ে স্টেশনের টিনের ছাদের ওপর বসে পড়ল। মানুষের এই ভিড়ের মধ্যেও এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের দিকে কেউ তাকিয়ে দেখে না। যারা প্রতিদিন এই স্টেশনের আশপাশেই ঘুরে বেড়ায়, অথচ কারও স্মৃতিতে জায়গা পায় না।

সেলিম, ওমর আর মতিন তেমনই তিনটা ছেলে।

তাদের বাড়ি স্টেশনের পশ্চিম পাশের বস্তিতে। বস্তি বলতে টিন, বাঁশ, পলিথিন আর পুরোনো কাপড় জোড়া দিয়ে বানানো ছোট ছোট ঘর। সরু গলিগুলো এতটাই চিকন যে দুজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটলে কাঁধে কাঁধ লেগে যায়। ড্রেনের পানি প্রায়ই উপচে পড়ে। বর্ষার দিনে কাদা, শীতের দিনে কুয়াশা আর গরমের দিনে অসহ্য গুমোটে ভরে থাকে জায়গাটা।

সেলিমের বাবা রিকশা চালায়, কিন্তু নিয়মিত নয়। ওমরের বাবা অসুস্থ। মতিনের বাবা বহু বছর আগে কোথায় যেন চলে গেছে, আর ফেরেনি। তিনজনের মায়েরা অন্যের বাসায় কাজ করে কোনোমতে সংসার টেনে নেয়। ছেলেদের দিকে খেয়াল রাখার সময় তাদের নেই।

তিন বন্ধুরই বয়স দশের কাছাকাছি। কিন্তু তাদের জীবন দেখে মনে হয় যেন অনেক বড় হয়ে গেছে। ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, মুখে একটু পানি দেয়, তারপর বড় বড় প্লাস্টিকের বস্তা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তাদের কাজ ভাঙারি কুড়ানো। কেউ প্লাস্টিকের বোতল কুড়ায়, কেউ কাগজ, কেউ ভাঙা লোহা। দিনের শেষে সেগুলো বিক্রি করে যে কয়টা টাকা পাওয়া যায়, তা দিয়েই পেট চলে।

সেদিন দুপুরে রোদটা একটু বেশি ছিল। রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনজনের শরীর ঘামে ভিজে গেছে। এমন সময় সেলিম একটা বড় প্লাস্টিকের ডিব্বা কুড়িয়ে পেল।

সেলিম বলল, &quot;এইডা বেইচ্যা আজ দুইডা ট্যাহা বেশি পাইমু।&quot;

ওমর হেসে বলল, &quot;তাইলে আজকা একেকজনে একটা কইরা ডিম খাইতে পারুম।&quot;

মতিন চোখ বড় বড় করে বলল, &quot;ডিম! আরে, কবে খাইছি মনে নাই।&quot;

তিনজনই হেসে উঠল। তাদের হাসিটা ছিল খুব ছোট ছোট আনন্দে ভরা।

সারা দিন ঘুরে বিকেলের দিকে তারা প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়াল। এই জায়গাটা তাদের খুব পছন্দ। এখানে ভিড় কম। বসে বসে ট্রেন দেখা যায়। আকাশ দেখা যায়।

কিন্তু সেদিন সেখানে অন্যরকম একটা দৃশ্য। 

একজন যুবতী মেয়ে মাটিতে বসে আছেন। তাকে ঘিরে তাদের বয়সী কয়েকজন ছেলে-মেয়ে গোল হয়ে বসে আছে। মেয়েটির পরনে সাদা সালোয়ার কামিজ, কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ। তার চোখে চশমা। মুখে এক ধরনের শান্ত হাসি।

ওমর কৌতূহলী হয়ে বলল, &quot;ওইহানে কী হইতাছে রে?&quot;

সেলিম বলল, &quot;চল, গিয়া দেখি।&quot;

তিনজন ধীরে ধীরে গিয়ে একটু দূরে বসে পড়ল।

মেয়েটি তখন বলছিলেন, &quot;তোমরা কেউ খারাপ না। শুধু সুযোগ পাওনি। সুযোগ পেলে মানুষ নিজের জীবন বদলে দিতে পারে।&quot;

ছেলেগুলো মুগ্ধ হয়ে শুনছে।

তিনি আবার বললেন, &quot;পড়াশোনা মানুষকে নতুন চোখ দেয়। শিক্ষা মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখায়।&quot;

কথাগুলো তিন বন্ধুর কানে নতুন লাগল।

মেয়েটি তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, &quot;তোমরা নতুন এসেছ?&quot;

সেলিম মাথা নেড়ে বলল, &quot;হ, আপা।&quot;

মেয়েটি বললেন, &quot;তোমাদের নাম কী?&quot;

তিনজন একে একে নিজেদের নাম বলল।

তিনি বললেন, &quot;আমি মেহরিন। প্রতিদিন বিকেলে এখানে আসি। তোমরা চাইলে আমার সঙ্গে বসতে পারো।&quot;

ওমর লজ্জা পেয়ে বলল, &quot;আমরা বইসা থাকলে সমস্যা নাই তো?&quot;

মেহরিন হেসে বললেন, &quot;একদম না। বরং তোমরা এলে আমি খুশি হব।&quot;

সেদিন তিনি তাদের একটা গল্প শোনালেন। এক গরিব ছেলের গল্প, যে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করে একদিন শিক্ষক হয়েছিল।

গল্পটা শুনে তিন বন্ধু চুপ করে রইল।

ফেরার সময় মতিন বলল, &quot;আপা যা কইল, সব সত্যি নাকি?&quot;

সেলিম বলল, &quot;মনে হয় সত্যিই হইব।&quot;

পরদিন বিকেলেও তারা এল। তারপর তার পরদিনও। তারপর প্রায় প্রতিদিনই।

এখন তাদের দিনের সবচেয়ে প্রিয় সময় হলো বিকেলবেলা। কাজ শেষে তারা দৌড়ে চলে আসে প্ল্যাটফর্মের ওই শেষ মাথায়।

মেহরিন আপা কখনো গল্প বলেন, কখনো পৃথিবীর বড় বড় মানুষের কথা বলেন, কখনো সততা, ভালোবাসা আর স্বপ্নের কথা বলেন।

একদিন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, &quot;তোমরা বড় হয়ে কী হতে চাও?&quot;

সবাই চুপ।

মতিন মাথা নিচু করে বলল, &quot;এইডা তো কহনো ভাবি নাই আপা।&quot;

সেলিম বলল, &quot;আমাগো মতো পোলাপানও কিছু হইতে পারে নাকি?&quot;

মেহরিন মৃদু হেসে বললেন, &quot;অবশ্যই পারে। মানুষ কোথা থেকে এসেছে, সেটা বড় কথা নয়। সে কোথায় যেতে চায়, সেটাই বড় কথা।&quot;

ওমর অবাক হয়ে বলল, &quot;তাইলে আমরাও স্কুলে পড়তে পারুম?&quot;

মেহরিন বললেন, &quot;হ্যাঁ, যদি তোমরা সত্যি মন দিয়ে চাও।&quot;

সেদিন তিন বন্ধুর মনে প্রথমবারের মতো একটা স্বপ্ন জন্ম নিল।

সেদিন রাতে সেলিম মাকে বলল, &quot;মা, আমি যদি স্কুলে যাই, তয় কেমন হয়?&quot;

মা অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি বললেন, &quot;তুই স্কুলে যাইতে চাস?&quot;

সেলিম বলল, &quot;হ।&quot;

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, &quot;যদি যাইতে পারস, আমার চাইতে খুশি আর কেউ হইব না।&quot;

পরদিন মেহরিন আপা খাতা আর পেন্সিল নিয়ে এলেন।

তিনি বললেন, &quot;আজ থেকে আমরা পড়া শুরু করব।&quot;

তিন বন্ধু বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তিনি মাটিতে আঙুল দিয়ে লিখলেন অ।

তারপর বললেন, &quot;এটা অ।&quot;

তিনজন একসঙ্গে বলল, &quot;অ।&quot;

কিছুদিনের মধ্যেই তারা নিজেদের নাম লিখতে শিখে গেল।

সেলিম নিজের নাম লিখে চিৎকার করে উঠল। বলল, &quot;দ্যাখ দ্যাখ, আমি আমার নাম লিখতে পারতাছি!&quot;

ওমর খুশিতে লাফিয়ে বলল, &quot;আমিও পারছি!&quot;

মতিনের চোখ চকচক করছিল। সে বলল, &quot;আগে ভাবতাম এইসব শুধু বড়লোকের পোলাপানের জন্য।&quot;

মেহরিন বললেন, &quot;না, শিক্ষা সবার জন্য।&quot;

কয়েক মাস কেটে গেল। তিন বন্ধু এখন আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে। তারা ঝগড়া কম করে, পরিষ্কার থাকার চেষ্টা করে, নতুন নতুন শব্দ শিখছে, বই পড়তে শিখছে।

একদিন মেহরিন বললেন, &quot;তোমরা কি সত্যি স্কুলে ভর্তি হতে চাও?&quot;

তিনজন একসঙ্গে বলল, &quot;চাই আপা।&quot;

মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, &quot;ঠিক আছে। আমি তোমাদের স্কুলে ভর্তি করাব।&quot;

মতিন অবিশ্বাসের সুরে বলল, &quot;সত্যি কইতাছেন আপা? আমরাও স্কুলে যামু?&quot;

মেহরিন হেসে বললেন, &quot;হ্যাঁ, তোমরাও যাবে।&quot;

কয়েকদিন পরে তিনি তিনজনকে নিয়ে কাছের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলেন।

বড় গেট, বিশাল মাঠ, উঁচু ভবন দেখে তিনজনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

ওমর বলল, &quot;হায় আল্লাহ! এইডা কত বড় স্কুল!&quot;

সেলিম ফিসফিস করে বলল, &quot;আমরা এইহানে বইয়া পড়মু?&quot;

মেহরিন বললেন, &quot;হ্যাঁ। আজ থেকে এই স্কুলও তোমাদের।&quot;

ওরা ভর্তি হয়ে গেল।

যেদিন তারা নতুন ইউনিফর্ম পরে স্কুলে গেল, সেদিন বস্তির মানুষজন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিল।

সেলিমের মা চোখ মুছতে মুছতে বললেন, &quot;আমার পোলাডা বই লইয়া স্কুলে যাইতাছে!&quot;

ওমরের মা বললেন, &quot;মন দিয়া পড়িস বাবা।&quot;

মতিনের মা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন, &quot;তুই অনেক বড় হইস রে বাবা।&quot;

নতুন জীবন শুরু হলো। সকালে স্কুল, বিকেলে একটু কাজ, রাতে পড়াশোনা।

দিন যায়, মাস যায়। একসময় তারা ক্লাসের সেরা ছাত্রদের একজন হয়ে ওঠে।

বছরের শেষে স্কুলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হলো।

মঞ্চে উঠে সেলিম বলল, &quot;আমরা আগে রেললাইনের ধারে ভাঙারি কুড়াইতাম। মানুষ আমাদের দিকে ফিরেও চাইত না। এক আপা আমাদের শিখিয়েছে, মানুষ চাইলে নিজের জীবন বদলাতে পারে। আমরা এখন পড়ছি। একদিন আমরাও আমাদের মত আরও অনেক ছেলেমেয়ের পাশে দাঁড়াব।&quot;

মাঠজুড়ে হাততালি পড়ে গেল। সামনের সারিতে বসে থাকা মেহরিনের চোখে জল।

অনুষ্ঠান শেষে তিন বন্ধু দৌড়ে তার কাছে গেল। ওমর বলল, &quot;আপা, আপনি না থাকলে আমরা এখনও রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম।&quot;

মতিন বলল, &quot;আপা, আপনি আমাদের নতুন জীবন দিয়েছেন।&quot;

সেলিম ভেজা গলায় বলল, &quot;একদিন আমরাও আপনার মতো হয়ে গরিব ছেলে-মেয়েদের নতুন স্বপ্ন দেখাবো।&quot;

মেহরিন তিনজনকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বললেন, &quot;আমি শুধু তোমাদের হাতটা ধরেছিলাম। বাকী পথটা তোমরা নিজেরাই হেঁটে এসেছ।&quot;

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। স্টেশনের বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছে। দূরে একটা ট্রেন হুইসেল দিয়ে ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছাড়ল। সেই একই প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে তিনটি ছেলে।  তাদের চোখেও জ্বলছে আলো।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/256368/</link>
				<pubDate>Thu, 02 Jul 2026 06:16:21 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>আলোর পথে</p>
<p>আষাঢ় মাসের শেষ দিক। সারা দিন আকাশে রোদ আর মেঘের লুকোচুরি চলেছে। বিকেলের দিকে হালকা বাতাস উঠেছে। কমলাপুর রেলস্টেশনের চারপাশে তখনও মানুষের ভিড় কমেনি। লাল জামা পরা কুলি মাথায় মালপত্র নিয়ে দৌড়াচ্ছে, চায়ের দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছে, হকাররা গলা ফাটিয়ে পানি, বাদাম আর চিপস বিক্রি করছে। দূরে কোথাও একটা ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল। মুহূর্ত&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-256368"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/256368/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>1</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">29b27f903171c9c1b02ca6282f44ddc3</guid>
				<title>ভালোবাসা প্রেম নয়

শীতের শেষ দিকের বিকেল। পুরোনো ঢাকার সরু গলিগুলো তখন কুয়াশা আর ধুলোর মিশ্র এক আবছা আলোয় ডুবে থাকে। কোথাও ভাজা পেঁয়াজুর গন্ধ, কোথাও রিকশার ঘণ্টি, কোথাও স্কুল ছুটি শেষে বাড়ি ফেরা বাচ্চাদের চিৎকার। তিনতলা পুরোনো বাড়িটার ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল অয়ন। ছাদের এক কোণে কয়েকটা ভাঙা টব, শুকিয়ে যাওয়া তুলসী গাছ, তার পাশেই বাবার লাগানো একটা শিউলি গাছ। গাছটাতে এখন আর খুব একটা ফুল ফোটে না, তবু প্রতি শীতে দু-একটা সাদা ফুল ঝরে পড়ে। অয়ন হাতে একটি নীল খাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। খাতার পাতায় কিছু কবিতা, কিছু অসমাপ্ত বাক্য, কিছু নামহীন অনুভূতি। সে প্রায়ই এখানে এসে দাঁড়ায়। কারণ পৃথিবীর ভিড়ের মধ্যে এই ছাদটুকুই তার নিজের।

পাঁচ বছর আগে বাবা মারা গেছেন। মানুষটা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। সারা জীবন সাদা পাঞ্জাবি পরে সাইকেলে করে স্কুলে যেতেন। মৃত্যুর দিনও টেবিলের ওপর খোলা ছিল ছাত্রদের খাতা। বাবা চলে যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব নিঃশব্দে এসে পড়েছিল অয়নের ওপর। মা, ছোট বোন, বাড়ির ঋণ—সবকিছুর ভার কাঁধে নিয়ে সে বুঝতেই পারেনি কখন তার নিজের জীবনটা কোথাও হারিয়ে গেছে। তার বয়স এখন বত্রিশ। শহরের একটি কলেজে বাংলা পড়ায়। ছাত্ররা তাকে খুব পছন্দ করে, সহকর্মীরা সম্মান করে, কিন্তু সন্ধ্যা নামলে তার ঘরটায় এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে আসে।

মা বললেন, &quot;তোর বয়স কম হলো না, বাবা। এবার নিজের সংসারের কথাও ভাব।&quot;

অয়ন মৃদু হেসে বলল, &quot;সব মানুষের ভাগ্যে সংসার লেখা থাকে না, মা।&quot;

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, &quot;ভাগ্যের ওপর সব ছেড়ে দিলে হয়? মানুষকে কখনো কখনো নিজের ভাগ্য নিজেকেই লিখতে হয়।&quot;

অয়ন উত্তর দিল না।

বিয়ের কথা বহুবার উঠেছে। আত্মীয়রা পাত্রী দেখিয়েছে। কারও ছবি এসেছে, কারও বায়োডাটা। কিন্তু কোনো মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়নি, এই মানুষটির সঙ্গে সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব। সে ভেবেছিল, ভালোবাসা হয়তো খুব ভাগ্যবান মানুষদের জন্য। তার জীবনে দায়িত্ব আছে, অভ্যাস আছে, কিন্তু প্রেম বলে কিছু নেই।

তারপর একদিন কলেজে নতুন একজন প্রভাষক যোগ দিলেন। তার নাম মেহরীন।

প্রথম দিন স্টাফরুমে ঢুকেই মেয়েটি সবাইকে নম্র হাসিতে শুভেচ্ছা জানিয়েছিল। সাধারণ সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে কালো ব্যাগ, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা। কিন্তু তার চোখ দুটো অয়নকে থমকে দিয়েছিল। যেন বহুদিনের না-কাঁদা কিছু জল সেখানে জমে আছে।

মেহরীন বলল, &quot;আমি নতুন এসেছি। আশা করি আপনাদের সহযোগিতা পাব।&quot;

অয়ন মাথা নেড়ে বলল, &quot;অবশ্যই। কোনো প্রয়োজন হলে বলবেন।&quot;

এরপর ধীরে ধীরে পরিচয় বাড়ল। স্টাফরুমে চায়ের কাপের পাশে গল্প জমতে লাগল। তারা বই নিয়ে কথা বলত, কবিতা নিয়ে কথা বলত, ছাত্রদের দুষ্টুমি নিয়ে হাসত। কখনো কখনো কথা চলে যেত ব্যক্তিগত জীবনের দিকে।

একদিন লাইব্রেরিতে বসে মেহরীন বলল, &quot;আপনি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন কেন?&quot;

অয়ন হেসে বলল, &quot;সব মানুষের ভেতরে সমান শব্দ থাকে না।&quot;

মেহরীন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, &quot;যাদের ভেতরে বেশি শব্দ থাকে, তারা বাইরে কম কথা বলে।&quot;

সেদিন অয়ন প্রথমবার মেয়েটির দিকে অন্যরকমভাবে তাকিয়েছিল।

তারপর দিনগুলো অদ্ভুতভাবে বদলে যেতে লাগল। কলেজে যাওয়ার আগে সে খেয়াল করত মেহরীন এসেছে কি না। স্টাফরুমে ঢুকে অজান্তেই তার চোখ প্রথমে মেয়েটির চেয়ারের দিকে যেত। ছুটির পর কোনোদিন মেহরীন না এলে দিনটা কেমন অসম্পূর্ণ লাগত।

একদিন বিকেলে বৃষ্টি নামল। কলেজের বারান্দায় তারা দুজন দাঁড়িয়ে ছিল। মাঠের ওপর সাদা বৃষ্টির রেখা পড়ছে।

মেহরীন বলল, &quot;বৃষ্টি আমার খুব প্রিয়।&quot;

অয়ন জিজ্ঞেস করল, &quot;কেন?&quot;

মেহরীন মৃদু হেসে বলল, &quot;কারণ বৃষ্টির সময় মানুষ নিজের কান্না লুকাতে পারে।&quot;

অয়ন তাকিয়ে রইল। সেই মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল, এই মেয়েটির ভেতরে গভীর কোনো দুঃখ বাস করে।

ধীরে ধীরে তার নিজের ভেতরেও কিছু বদলাতে লাগল। অনেক বছর পর সে কারও জন্য অপেক্ষা করছে। কারও অসুখে উদ্বিগ্ন হচ্ছে। কারও হাসিতে নিজের অজান্তেই ভালো লাগছে।

আর তখনই জন্ম নিল ভয়। এ কি প্রেম?

এক রাতে খাবার টেবিলে বসে হঠাৎ সে মাকে প্রশ্ন করল, &quot;মা, মানুষ কীভাবে বুঝতে পারে যে সে কাউকে ভালোবাসে?&quot;

মা অবাক হয়ে তাকালেন। মা বললেন, &quot;তুই কি কাউকে পছন্দ করিস?&quot;

অয়ন মাথা নাড়ল। বলল, &quot;না, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।&quot;

মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, &quot;যে মানুষটার কষ্টে তোর নিজের বুক ব্যথা করে, আর যার সুখের জন্য তুই নিজের সুখ ত্যাগ করতে পারিস, তাকে মানুষ ভালোবাসে।&quot;

সেদিন রাতে অয়ন ঘুমাতে পারল না।

কয়েকদিন পর বিকেলে স্টাফরুমে চা খেতে খেতে মেহরীন হঠাৎ বলল, &quot;আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।&quot;

কথাটা শুনে অয়ন যেন কিছুই বুঝতে পারল না।

মেহরীন বলল, &quot;পরিবার অনেক আগে থেকে কথা বলে রেখেছিল। আগামী মাসে বিয়ে।&quot;

অয়ন ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, &quot;অভিনন্দন।&quot; কিন্তু সেই হাসি তার নিজের কাছেই কৃত্রিম মনে হলো।

সেদিন রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে সে বুঝল, তার বুকের ভেতরে অদ্ভুত একটা ব্যথা হচ্ছে। যে ব্যথার কোনো নাম সে জানে না।

পরদিন মেহরীন তার দিকে তাকিয়ে বলল, &quot;আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছেন?&quot;

অয়ন বলল, &quot;না।&quot;

মেহরীন বলল, &quot;তাহলে এত চুপচাপ কেন?&quot;

অয়ন অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, &quot;আপনি সুখী হবেন?&quot;

মেহরীন উত্তর দিল না। অনেকক্ষণ পর সে ধীরে বলল, &quot;সব বিয়ে কি সুখের জন্য হয়?&quot;

কথাটা শুনে অয়ন কেঁপে উঠল।

তারপর সে জানতে পারল, মেহরীনের বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। ছোট ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সংসারের অনেক দায়িত্ব তার কাঁধে। পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস তার নেই।

এরপর দিনগুলো দ্রুত কেটে যেতে লাগল। বিয়ের তারিখ যত এগিয়ে আসছিল, অয়নের ভেতরের অস্থিরতাও তত বাড়ছিল। সে বুঝতে পারছিল, সে প্রেমে পড়েছে। কিন্তু এই উপলব্ধি এসেছে খুব দেরিতে।

একদিন বিকেলে কলেজের পেছনের কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে মেহরীন তাকে ডাকল। শীতের বাতাসে শুকনো পাতা ঝরছিল।

মেহরীন বলল, &quot;আমি যদি একটা কথা জিজ্ঞেস করি, সত্যি উত্তর দেবেন?&quot;

অয়ন বলল, &quot;দেব।&quot;

মেহরীন সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল, &quot;আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?&quot;

অয়ন যেন হঠাৎ নিজের ভেতরের সব শব্দ হারিয়ে ফেলল।

অনেকক্ষণ পরে সে বলল, &quot;জানি না। শুধু জানি, তোমাকে না দেখলে আমার দিন অসম্পূর্ণ লাগে। তোমার কষ্টে আমার বুক ব্যথা করে। তোমার সুখের কথা ভেবে আমি নিজের কথা ভুলে যাই।&quot;

মেহরীনের চোখ ভিজে উঠল। বলল, ”হয় আপনি খুব চালাক, নয়তো ভীষণ বোকা।”

অয়ন অবাক হলো, “এ কথা বললেন কেন ?“

মেহরীন বলল, &quot;এটাই তো প্রেম।&quot;

চারপাশে তখন কৃষ্ণচূড়ার শুকনো পাতা উড়ছিল। অয়ন কিছু বলল না।

মেহরীন মৃদু কণ্ঠে বলল, &quot;আর সেই কারণেই আমাদের একসঙ্গে হওয়া সম্ভব নয়।&quot;

অয়ন অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

মেহরীন বলল, &quot;প্রেম সবসময় মানুষকে কাছে আনে না। কখনো কখনো দূরে সরিয়েও দেয়।&quot;

তারপর সে চলে গেল।

বিয়ের দিন সন্ধ্যায় শহরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। অয়ন নিজের ঘরে একা বসে ছিল। জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছিল।

মা এসে তার পাশে বসলেন। বললেন, &quot;তুই কাঁদছিস?&quot;

অয়ন চোখ মুছে বলল, &quot;না।&quot;

মা তার মাথায় হাত রেখে বললেন, &quot;সব ভালোবাসা মানুষকে পাওয়া শেখায় না, বাবা। কিছু ভালোবাসা মানুষকে ছেড়ে দিতেও শেখায়।&quot;

অয়ন মাথা নিচু করে বসে রইল।

সেই মুহূর্তে সে বুঝল, প্রেম আসলে অধিকার নয়। প্রেম মানে হয়তো কারও হাত ধরে সারাজীবন পাশে থাকা নয়। প্রেম মানে কখনো কখনো কাউকে হারিয়েও তার ভালো চাওয়া। নিজের সমস্ত আকাঙ্ক্ষাকে নিঃশব্দে বিদায় জানিয়ে তার জন্য প্রার্থনা করা।

বহু বছর পরে এক শীতের সন্ধ্যায় সে আবার সেই নীল খাতাটা খুলল। জানালার বাইরে কুয়াশা নেমেছে। দূরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে।

সে প্রথম পাতায় লিখল, &quot;যে ভালোবাসা মানুষকে নিজের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, নিজের সমস্ত অহং আর সংযম ভেঙে দেয়, অথচ প্রিয় মানুষটির মঙ্গল কামনা করতে শেখায়, সম্ভবত তাকেই প্রেম বলে।&quot;

লেখা শেষ করে সে খাতাটা বন্ধ করল। আকাশে তখন একটি তারা জ্বলছে। অয়ন মৃদু হেসে ফেলল।

কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে না থাকার জন্য। তারা আসে শুধু এই শিক্ষা দিতে যে মানুষের হৃদয় কখনো কখনো নিজের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে, আর প্রেমের সবচেয়ে গভীর রূপ হয়তো প্রাপ্তি নয়, নীরব সমর্পণ।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/256246/</link>
				<pubDate>Wed, 01 Jul 2026 07:24:51 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>ভালোবাসা প্রেম নয়</p>
<p>শীতের শেষ দিকের বিকেল। পুরোনো ঢাকার সরু গলিগুলো তখন কুয়াশা আর ধুলোর মিশ্র এক আবছা আলোয় ডুবে থাকে। কোথাও ভাজা পেঁয়াজুর গন্ধ, কোথাও রিকশার ঘণ্টি, কোথাও স্কুল ছুটি শেষে বাড়ি ফেরা বাচ্চাদের চিৎকার। তিনতলা পুরোনো বাড়িটার ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল অয়ন। ছাদের এক কোণে কয়েকটা ভাঙা টব, শুকিয়ে যাওয়া তুলসী গাছ, তার পাশেই বাবার লাগানো এ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-256246"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/256246/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">59b13064683aba4ee9787920a8491c04</guid>
				<title>কতটুকু ভালোবাসলে তাকে প্রেম বলা যায়

কতটুকু ভালোবাসলে তাকে প্রেম বলা যায়, আমি জানি না।
শুধু জানি, মায়ের জন্য যে অশ্রু ঝরে তার ভেতরে কোনো দহন নেই,
বাবার জন্য যে উদ্বেগ জেগে থাকে তা নিঃশব্দ আশ্রয়ের মতো,
ভাই কিংবা বোনের প্রতি মমতা এক প্রাচীন বৃক্ষের ছায়া,
যেখানে আকাঙ্ক্ষা নেই, আছে শুধু দীর্ঘ সহাবস্থানের নৈঃশব্দ্য।

প্রেম সম্ভবত অন্য কোনো দুর্বোধ্য উপাখ্যান।
দুটি শরীরের মধ্যবর্তী অদৃশ্য চৌম্বকত্ব,
দুটি মনের গোপন উপনিবেশে জন্ম নেওয়া এক বিপজ্জনক পরাগরেণু,
যা ধীরে ধীরে রক্তে মিশে যায়
এবং সমস্ত যুক্তিকে নির্বাসনে পাঠায়।

তোমার চোখের দিকে তাকালে আমার ভেতরে
অপরিচিত নীহারিকার মতো বিস্তৃত হয় এক অনির্বচনীয় কম্পন।
আমার শিরায় শিরায় জেগে ওঠে সুপ্ত নক্ষত্রের আর্তি,
আমি তখন নিজের ভেতর আর নিজেকে খুঁজে পাই না,
শুধু শুনতে পাই আদিম কোনো সমুদ্রের উন্মনা গর্জন।

প্রেম আসলে দেহেরও বেশি কিছু,
আবার কেবল আত্মার বিশুদ্ধ উচ্চারণও নয়।
এ এক সম্মিলিত বিপর্যয়,
যেখানে স্পর্শের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মহাকালের বিষাদ,
চুম্বনের ভেতরে লুকিয়ে থাকে জন্মান্তরের ক্ষুধা,
এবং বিচ্ছেদের সম্ভাবনা থেকেও জন্ম নেয় আশ্চর্য সমর্পণ।

যে ভালোবাসা মানুষকে নিরাপদ করে, তা মমতা।
যে ভালোবাসা মানুষকে উৎকণ্ঠিত করে, তা আকর্ষণ।
আর যে ভালোবাসা মানুষকে নিজের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়,
নিজের সমস্ত অহং, সমস্ত প্রজ্ঞা ও সমস্ত সংযম
কারো চোখের সামনে নিঃস্ব করে দেয়,
সম্ভবত তাকেই প্রেম বলে।

তাই আমি প্রেমকে কোনো পবিত্র সংজ্ঞা বলি না।
আমি তাকে বলি এক দুর্নিবার অভিকর্ষ,
এক মহাজাগতিক অভিসার,
যেখানে দুটি দেহ এবং দুটি মন
পরস্পরের দিকে পতিত হতে হতে
একসময় একই অন্ধকারে দীপ্ত হয়ে ওঠে।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/256223/</link>
				<pubDate>Wed, 01 Jul 2026 06:02:27 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>কতটুকু ভালোবাসলে তাকে প্রেম বলা যায়</p>
<p>কতটুকু ভালোবাসলে তাকে প্রেম বলা যায়, আমি জানি না।<br />
শুধু জানি, মায়ের জন্য যে অশ্রু ঝরে তার ভেতরে কোনো দহন নেই,<br />
বাবার জন্য যে উদ্বেগ জেগে থাকে তা নিঃশব্দ আশ্রয়ের মতো,<br />
ভাই কিংবা বোনের প্রতি মমতা এক প্রাচীন বৃক্ষের ছায়া,<br />
যেখানে আকাঙ্ক্ষা নেই, আছে শুধু দীর্ঘ সহাবস্থানের নৈঃশব্দ্য।</p>
<p>প্রেম সম্ভবত অন্য কোনো&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-256223"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/256223/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">09c14abc74b5288eabb1c314d06a131c</guid>
				<title>শুধু সত্যের আলোয়

বৈশাখের শেষ বিকেল। সারাদিনের তীব্র রোদের পর সূর্যটা তখন পশ্চিমের আকাশে লাল হয়ে ঝুলে আছে। আকাশে এক টুকরো মেঘও নেই, তবু বাতাসে কেমন যেন একটা ক্লান্তি জমে আছে। মাঠ থেকে মানুষজন ফিরছে। কারও কাঁধে কোদাল, কারও হাতে মাছ ধরার জাল, কেউ বা গরুর দড়ি ধরে হাঁটছে। গ্রামের মাঝখানের কাঁচা রাস্তার ধারে রমিজের চায়ের দোকানটায় ইতিমধ্যে আড্ডা জমে উঠেছে। এই দোকানটাতেই গ্রামের সব খবরের জন্ম হয়, আবার এখান থেকেই সেগুলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। দোকানের এক কোণে গামছা কাঁধে দিয়ে বসেছিল হাশেম আলী। লোকটার মুখ শুকিয়ে কাঠ। তিন দিন ধরে তার বউ জ্বরে পড়ে আছে। বাজারের ওষুধ এনে খাইয়েছে, গ্রামের কবিরাজও দেখিয়েছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। তার চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, ক&#039;রাত ধরে সে ঠিকমতো ঘুমায়নি।

ঠিক তখনই রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে এল কুদ্দুস মাওলানা। লোকটাকে দেখলে গ্রামের মানুষ কেমন যেন একটু সোজা হয়ে বসে। বছর পাঁচেক আগে শহর থেকে এসে এই গ্রামেই থিতু হয়েছে সে। লম্বা সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় পাগড়ি, হাতে সবসময় একটা তসবিহ। কথাবার্তাও কেমন যেন অন্যরকম। মাঝেমধ্যে আরবি শব্দ বলে, কেউ বুঝুক আর না বুঝুক, সবাই মাথা নেড়ে সায় দেয়।

কুদ্দুস দোকানে উঠে বেঞ্চিতে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। &quot;মানুষের ঈমান আর আগের মতো নাই। আল্লাহর ভয়ও নাই। আমি না থাকলে এই গ্রামের কী হইত, আল্লাহই ভালো জানে।&quot; কথাটা বলেই সে চোখ বুজে তসবিহের দানা ঘোরাতে লাগল। লোকজনও চুপচাপ তার কথা শুনতে লাগল। ধর্মের কথা উঠলে গ্রামের মানুষ এমনিতেই একটু নীরব হয়ে যায়। 

হাশেম অনেকক্ষণ ইতস্তত করার পর আস্তে করে তার কাছে গিয়ে বসল। তার মুখে এমন এক অসহায় ভাব ছিল, মনে হচ্ছিল বুকের ভেতরের সব সাহস সে কোথাও হারিয়ে ফেলেছে। &quot;হুজুর, আমার বউডার খুব জ্বর। কিছুতেই ভালো হইতাছে না।&quot;

কুদ্দুস সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিল না। সে চোখ বন্ধ করেই বসে রইল। তার এই চোখ বন্ধ করে থাকার অভ্যাসটা গ্রামের মানুষের কাছে খুব রহস্যময় মনে হতো। তাদের ধারণা ছিল, লোকটা বুঝি এমন কিছু দেখতে পায় যা সাধারণ মানুষ দেখে না। বেশ কিছুক্ষণ পর সে চোখ খুলে হাশেমের দিকে তাকাল। &quot;তোমার বউয়ের উপর খারাপ ছায়া পড়ছে।&quot;

কথাটা শুনে হাশেমের বুকটা ধক করে উঠল। &quot;খারাপ ছায়া?&quot;

&quot;হ। এই জ্বর-টর সাধারণ কিছু না।&quot;

হাশেমের গলা কেঁপে উঠল। &quot;তাইলে কী করুম হুজুর?&quot;

কুদ্দুস তসবিহ ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, &quot;একটা কালা ছাগল লাগবো। কিছু খরচও আছে। আমি আমল করুম। ইনশাআল্লাহ ভালো হইয়া যাইবো।&quot;

হাশেমের মুখটা আরও শুকিয়ে গেল। তার ঘরে টাকা নেই। একটা ছাগল কেনারও সামর্থ্য নেই। কিন্তু হুজুরের কথার ওপর সন্দেহ করার সাহসও তার নেই। সেদিন রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিল, তার একমাত্র দুধেল গাভীটা বিক্রি করে দেবে।

পরদিন সকালে খবরটা সোহেল মাস্টারের কানে গেল। তিনি হাশেমকে ডেকে পাঠালেন। গ্রামের স্কুলটার পাশের আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে দু&#039;জনে অনেকক্ষণ কথা বললেন। &quot;আগে ডাক্তার দেখাও হাশেম। সব অসুখ জ্বিন-ভূতের কারণে হয় না।&quot;

হাশেম কেমন অসহায় চোখে তার দিকে তাকাল। &quot;আপনে কি হুজুরের চাইতে বেশি জানেন মাস্টার সাব?&quot;

কথাটা শুনে সোহেল মাস্টার আর কিছু বললেন না। তিনি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি জানতেন, মানুষের মনে যখন ভয় ঢুকে যায়, তখন যুক্তির কথা আর কেউ শুনতে চায় না।

এরপর দিন যেতে লাগল আর কুদ্দুসের প্রভাবও বাড়তে লাগল। কারও গরু হারালে সে বলে দেয় বদনজর লেগেছে। কারও ছেলে অসুস্থ হলে বলে, শত্রুপক্ষ তাবিজ করেছে। কেউ ব্যবসায় লোকসান করলে বলে, ঘরে অশুভ ছায়া আছে। গ্রামের মানুষও চোখ বন্ধ করে তার কথা বিশ্বাস করতে লাগল।

এক বিকেলে রহিমা বেগম উঠানে বসে কাঁথা সেলাই করছিল। বয়স হয়েছে তার। মাথার চুল প্রায় সাদা। স্বামী নেই, সন্তান নেই। ছোট্ট এক টুকরো জমিই তার শেষ সম্বল। সেদিন কুদ্দুস তার বাড়িতে গিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর হঠাৎ বলল, &quot;তোমার বয়স হইছে। মৃত্যুর কথা ভাবো?&quot;

বৃদ্ধার বুকটা ধক করে উঠল। &quot;আল্লাহ যখন নিবেন, তখন যামু বাবা।&quot;

কুদ্দুস একটু ঝুঁকে এল। &quot;তোমার তো কেউ নাই। জমিটা যদি ধর্মের কাজে দান কইরা যাও, পরকালে উপকার হইবো।&quot;

রহিমা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। &quot;আমি কীভাবে দান করুম?&quot;

কুদ্দুস তসবিহের দানা ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, &quot;আমার নামে লিখে দাও। আমি মাদ্রাসার কাজে লাগামু।&quot;

সেই রাতেই বৃদ্ধার আর ঘুম হলো না। মৃত্যুর ভয় মানুষের বুকের ভেতর এমনভাবে বাসা বাঁধে যে, অনেক সময় সে নিজের ভালো-মন্দও বুঝতে পারে না। কয়েক দিনের মধ্যেই সে জমিটা কুদ্দুসের নামে লিখে দিল।

এর কিছুদিন পর আরেকটা ঘটনা ঘটল। জয়নাল মিয়ার মেয়ে রুবিনা কলেজে পড়ে। লেখাপড়ায় খুব ভালো। তার স্বপ্ন, একদিন শিক্ষক হবে। জুমার নামাজের পরে মসজিদের উঠানে দাঁড়িয়ে কুদ্দুস বলল, &quot;মেয়েদের বেশি পড়ালেখা ঠিক না। বেশি লেখাপড়া করলে মেয়েরা বেপথে যায়।&quot;

লোকজন ফিসফিস করতে লাগল। জয়নাল মিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, &quot;আমার মাইয়াডা তো শুধু পড়াশোনা করে হুজুর।&quot;

কুদ্দুস ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। &quot;ধর্মের কথা না মানলে পরে আফসোস করবা।&quot;

সেদিন রাতে জয়নাল মিয়ার ঘরে ভারী নীরবতা নেমে এল। রুবিনা শুধু একবার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলেছিল, &quot;আমি কী দোষ করছি বাবা?&quot;

জয়নাল মিয়া মেয়ের দিকে তাকাতে পারেনি। &quot;হুজুর নিষেধ করছেন মা। আমি ধর্মের বিরুদ্ধে যাইতে পারুম না।&quot;

সেদিন রাতে মেয়েটা অনেক কেঁদেছিল। সে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, যে ধর্ম মানুষকে জ্ঞান অর্জন করতে বলে, সেই ধর্ম কীভাবে তার বই-খাতা কেড়ে নিতে পারে।

সবকিছু চুপচাপ দেখছিল সোহেল মাস্টার। কিন্তু তার কথা কেউ শুনতে চাইত না। বরং গ্রামের অনেকেই তাকে ধর্মবিরোধী বলেও সন্দেহ করতে শুরু করেছিল। এমন সময় শহর থেকে তার পুরনো বন্ধু আবদুল হাকিম এলেন। তিনি বড় এক মাদ্রাসার শিক্ষক। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর সোহেল মাস্টার সব কথা খুলে বললেন। হাকিম সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, &quot;ধর্মের সবচেয়ে বড় শত্রু সে না, যে ধর্মকে ঘৃণা করে। সবচেয়ে বড় শত্রু সে, যে ধর্মরে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে।&quot;

পরদিন জুমার নামাজের পর মসজিদের উঠান ভরে গেল মানুষে। কুদ্দুসও সেখানে ছিল। হাকিম সাহেব অনেকক্ষণ সবার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, &quot;আমি কয়টা প্রশ্ন করুম।&quot;

সবাই চুপ করে রইল। তিনি কুদ্দুসের দিকে তাকালেন। &quot;আপনে কইলেন মেয়েদের পড়ালেখা হারাম। এর প্রমাণ কী?&quot;

কুদ্দুস একটু থমকে গেল। &quot;আপনে কইলেন সব অসুখ খারাপ ছায়ার কারণে হয়। এর ভিত্তি কী?&quot;

উঠানে ফিসফিস শুরু হয়ে গেল। কুদ্দুসের কপালে ছোট ছোট ঘাম জমল। &quot;আপনে আমারে পরীক্ষা নিতে আইছেন?&quot;

হাকিম সাহেব মৃদু হেসে বললেন, &quot;ধর্মের কথা বলনের আগে জ্ঞান লাগবে। মানুষরে ভয় দেখানো সহজ, সত্য কওয়া কঠিন।&quot; তারপর তিনি গ্রামের মানুষের দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। &quot;পাগড়ি পরলেই কেউ আলেম হয় না। ধর্মের নাম নিলেই সব কথা সত্য হইয়া যায় না। প্রশ্ন করো। জানো। না বুঝলে জিজ্ঞেস করো।&quot;

হঠাৎ রহিমা বেগম উঠে দাঁড়াল। &quot;তাইলে আমার জমি?&quot; তার গলা কাঁপছিল।

হাকিম সাহেব নরম গলায় বললেন, &quot;জান্নাতের মালিক আল্লাহ। কোনো মানুষ আপনাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।&quot;

বৃদ্ধার চোখ ভিজে উঠল।

হাশেমও উঠে দাঁড়াল। &quot;তাইলে আমার গাভীডা বিক্রি করলাম ক্যান?&quot;

তারপর জয়নাল মিয়াও দাঁড়িয়ে পড়ল। &quot;আমার মাইয়ার পড়াশোনা বন্ধ করাইলেন ক্যান?&quot;

উঠানের বাতাস কেমন যেন ভারী হয়ে গেল। এতদিন মানুষ কুদ্দুসের দিকে ভক্তির চোখে তাকিয়েছে। সেদিন তারা প্রথমবার তার দিকে প্রশ্নের চোখে তাকাল।

কুদ্দুস হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। &quot;তোমরা সবাই আমার বিরুদ্ধে!&quot; কিন্তু তার গলায় আর আগের সেই জোর ছিল না।

সেদিনের পর থেকে খয়েরডাঙ্গা গ্রামটা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল। রুবিনা আবার কলেজে যাওয়া শুরু করল। হাশেম তার বউকে শহরে নিয়ে গেল। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলল, সামান্য সংক্রমণ আর রক্তশূন্যতা। কয়েক দিনের ওষুধেই সে ভালো হয়ে গেল। রহিমা বেগম অনেক দৌড়াদৌড়ির পর নিজের জমিটাও ফিরে পেল। আর কুদ্দুসের বাড়ির সামনে মানুষের ভিড় জমা বন্ধ হয়ে গেল।

এক সন্ধ্যায় সে একা উঠানে বসে ছিল। আকাশে মেঘ জমেছে। দূরে কোথাও একটা শালিক ডাকছিল। সোহেল মাস্টার ধীরে ধীরে তার বাড়িতে গেলেন। কুদ্দুস মাথা নিচু করে বসে ছিল। অনেকক্ষণ পরে বলল, &quot;মানুষ আর আমারে মানে না।&quot;

সোহেল মাস্টার শান্ত গলায় বললেন, &quot;মানুষ আপনাকে মানত না, ডরাইত।&quot;

কুদ্দুস কোনো কথা বলল না। 

মাস্টার আবার বললেন, &quot;ধর্ম মানুষরে মুক্তি দেয়, বন্দি করে না। কিন্তু আপনে ধর্মরে ভয়ের হাতিয়ার বানাইছিলেন।&quot;

সেদিন রাতে খয়েরডাঙ্গা গ্রামের আকাশে বৃষ্টি নেমেছিল। টিনের চালের ওপর টুপটাপ শব্দ হচ্ছিল। গ্রামের মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছিল, কিন্তু অনেকের বুকের ভেতর নতুন একটা চিন্তার জন্ম হচ্ছিল। হয়তো প্রথমবারের মতো তারা বুঝতে শুরু করেছিল, ধর্মকে ভালোবাসা আর ধর্মের নামে কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা এক জিনিস নয়।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/256112/</link>
				<pubDate>Tue, 30 Jun 2026 06:24:20 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>শুধু সত্যের আলোয়</p>
<p>বৈশাখের শেষ বিকেল। সারাদিনের তীব্র রোদের পর সূর্যটা তখন পশ্চিমের আকাশে লাল হয়ে ঝুলে আছে। আকাশে এক টুকরো মেঘও নেই, তবু বাতাসে কেমন যেন একটা ক্লান্তি জমে আছে। মাঠ থেকে মানুষজন ফিরছে। কারও কাঁধে কোদাল, কারও হাতে মাছ ধরার জাল, কেউ বা গরুর দড়ি ধরে হাঁটছে। গ্রামের মাঝখানের কাঁচা রাস্তার ধারে রমিজের চায়ের দোকানটায় ইতিমধ্যে আড্ডা জম&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-256112"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/256112/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">2326957e84f230faa22223084edcf609</guid>
				<title>চোখ

তার দৃষ্টি মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। সে যখন তাকিয়ে ছিল, আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গিয়েছিল। কাঁচের মত চকচকে সে দৃষ্টি। মনে হচ্ছিল সে যেন তাকিয়ে নেই। এক জোড়া ঘষা কাঁচ অনড় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে তার চোখে।

একদিন বর্ষণ মুখর বাদলা রাতে সে এসেছিল। বারান্দার বেঞ্চিতে বাবা আমকে জড়িয়ে ধরে বসেছিলেন। আমি আদুরে ছানার মত বাবার বুকের কাছে গুটিসুটি মেরে বসে ছিলাম। বাবা সামনের অন্ধকারের দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে ক্ষণে ক্ষণে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। আমার কেবলি মনে হচ্ছিল, উনি সম্ভবত কারো জন্য অপেক্ষা করছেন।

অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। আমার মা-বোন ঘুমিয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। কেবল জেগে ছিলাম আমি আর বাবা। আসলে আমি বাবার অত্যাধিক নেওটা বলে উনাকে ছাড়া ঘুমানোর চিন্তাও করতাম না। আর বাবাও আমাকে ছাড়া রাত কাটাতে পারতেন না। সে কারণেই সেই নিবিড় রাত্রিতে বাবার সঙ্গে আমিও জেগে ছিলাম।

ক&#039;দিন যাবৎ বাবাকে খুব অস্থির দেখাচ্ছিল। তিনি কেবলি কানের কাছে রেডিও রেখে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করেন। আবার কখনো কখনো মায়ের সাথে ফিসফাস করে কি সব আলোচনা করেন। আমার বড় বোনকেও দেখি সাড়াক্ষণ কেমন যেন সন্ত্রস্থ দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কি যেন খুঁজে ফেরে। বেশ ক&#039;দিন যাবৎ স্কুলেও যাচ্ছে না। সন্ধ্যা হলেই বাতি নিভিয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার তালে থাকে। শুধু সেদিনের রাতটাই ব্যতিক্রম। মা-বোন ঘুমিয়ে গেলেও বাবা আর আমি ঠিকই জেগে ছিলাম।


হঠাৎ একদিন আমাদের &#039;ভাড়ার ঘর&#039;টাকে (পুরনো আসবাবপত্র রাখার ঘর, যদিও আমার জন্য ওটা ছিল পলানো ঘর) বাবা ঝেটিয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করছিলেন বলে আমি খুব অবাক হচ্ছিলাম। কিছুটা মনও খারাপ হয়েছিল আমার পালিয়ে থাকার সুন্দর একটা জায়গা নষ্ট হচ্ছিল বলে। তারপরেও আমি বাবা-মা, বোন কাউকেই কিছু বলতে পারছিলাম না। আমার যা বয়েস, সে সময় এরকম অনেক কিছুই স্রেফ দেখে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। তবে আমি আরো আশ্চর্য হয়েছিলাম, যখন দেখলাম ভেতর বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখা পুরনো চৌকিটাকে ঘষে-মুছে পরিস্কার করে ভাড়ারে স্থাপন করা হলো। তারপর একটা পরিস্কার কাঁথা বিছিয়ে তাতে বালিশ দিয়ে দেওয়া হল। তখনি আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না, নিঃসন্দেহে আমাদের ঘরে কোন অতিথির পদার্পন ঘটবে।

সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত্রি প্রথম প্রহর চলে এলেও, এই যে বাবার জেগে থেকে চাতক পাখির মত অন্ধকারে তাকিয়ে থাকা, এর সাথে যে ভাড়ারের যোগসূত্র আছে, তা বুঝার জন্য আমার খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। সেকারণেই আচমকা আাঁধার ফুঁড়ে সে যখন আমাদের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো, আমি মোটেও চমকিত হলাম না। আমার ঠিক মনে হলো, বাবা আসলে এরই জন্য অপেক্ষা করছেন।


বিদু্যৎ চমকের আলোয় আমি ওকে দেখলাম। ওর দৃষ্টি মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। সে যখন আমাদের দিকে তাকালো, আমি ভয় পেয়ে গেলাম। শক্ত করে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। তার কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল। সারা মুখ জুড়ে গোঁফ-দাঁড়ির জঙ্গল, সাথে পরিধেয় সাদা পাঞ্জাবী-পায়জামায় কেমন যেন ভীতিকর লাগছিল। সে যখন বারান্দায় উঠে এল, আমরা তখন তার খুব কাছেই ছিলাম। এত কাছে যে, আমি তার ভেজা শরীরের গন্ধ পাচ্ছিলাম। অনেকটা ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ।

বাবা আমাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। বৈঠক ঘরের ভেজানো দরজা ঠেলে ঢুকে গেলেন ভেতরে । মানুষটা যে অন্ধকারে আমাদের অনুসরণ করছে, তা তার গায়ের গন্ধের কারণেই ঠাহর করতে পারলাম। ভেতরে ঢুকে বাবা আবার দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমাকে কোল থেকে নামিয়ে আন্দাজে তক্তপোষে বসিয়ে দিলেন। তারপর ফস্ শব্দে দিয়াশলাই জ্বালিয়ে কুঁপি বাতি ধরালেন। মানুষটা তখনো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তার ভেজা চুল-দাঁড়ি থেকে টপটপ করে জল ঝরছে। পরনের ভেজা পাঞ্জাবীটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। সুঠাম একটা শরীরের অবয়ব ফুঁটে উঠেছে তাতে। হাতে ধরা কালো পলিথিনের বস্তাটা আস্তে করে মেঝেয় নামিয়ে রাখলো। এই প্রথম আমি খেয়াল করলাম মানুষটা অসম্ভব লম্বা। এমনকি বাবার দীঘল শরীর থেকেও এক মাথা উঁচু। বাবা এগিয়ে গেল তার দিকে। সেও এগোলো। জড়িয়ে ধরলো দু&#039;জন দু&#039;জনকে। বাবা আমার দিকে পেছন ফিরে ছিল বলে আমি তার কাঁধের উপর দিয়ে লোকটার চোখ দেখতে পেলাম। মনে হচ্ছিল সে যেন তাকিয়ে নেই। এক জোড়া ঘষা কাঁচ অনড় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে তার চোখে।







বেশ ক&#039;দিন হলো লোকটা আমাদের বাড়িতে আছে। বাড়িতে না বলে বলা উচিৎ ভাড়ারে আছে। কারণ একটিবারের জন্যও সে ওঘর থেকে বের হয়নি। আসার পর সেই যে ঢুকেছে, তারপর আর তার দেখা নেই। আমি খুব কৌতুহলী হয়ে উঠছিলাম লোকটা আসলে ভেতরে কি করছে তাই দেখার জন্য। দরজায় এক-আধটা ফুঁটো বা টিনের বেড়ায় এক চিলতে ফাঁক-ফোঁকর খুঁজছিলাম হন্যে হয়ে। কিন্তু, কিসের কি। এক রত্তি ফুঁটো কিংবা ফোঁকর পেলাম না কোথাও। ইদানীং বাবাকেও ঘর হতে খুব একটা বেরুতে দেখি না। যদিও বা বের হন, ফেরেন তাড়াতাড়ি। তার চলাফেরাতেও কেমন যেন সাবধানী ভাব চলে এসেছে। মাঝে মাঝে ভাড়ার ঘরে তাকেও ঢুকতে দেখি। ঢুকেই দরোজা বন্ধ করে দেন। ফলে আমার কৌতুহল নিবারণের কোন সুযোগই মেলে না।


একদিন সকালে হরেক মানুষের চেচামেচিতে আমার ঘুম ভাঙ্গে। চোখ মেলে বাবাকে বিছানায় দেখতে পেলাম না। লাফিয়ে বিছানা ছেড়ে এসে দেখি, মুন্সী বাড়ির ছোট ছেলে তার ক&#039;জন বন্ধুকে সাথে নিয়ে এসে আমাদের উঠোনে জটলা করছে। আমি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সবকিছু খেয়াল করতে লাগলাম।

আপনে কইতাছেন, আপনার লগে মুক্তিগো কোন যোগাযোগ নাই ? বাবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো সে।

না নাই। সমান তালে জবাব দিল বাবা। তোমরা হুদাই আমারে সন্দেহ করতাছো।


তাই যদি হয়, তাইলে আমগো আলবদর দলে যোগ দিতাছেন না কেন ? আপনের বউ-মাইয়ার ইজ্জতের ডর নাই বুঝি ?

এইডা কি কও মিয়া ? বাবাকে রেগে যেতে দেখি। আমার বউ-মাইয়া কি তোমগো পর ?

এই কথায় মুন্সি বাড়ির ছেলে খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠে। আরে না না, পর অইবো ক্যান ? আইজ বাদে কাল, আপনার মাইয়ারে তো আমিই বিয়া করূম। হের লাইগ্যাই তো আপনের ভাল-মন্দ নিয়া আমার যত চিন্তা। কথাটা বলে আবারো হেসে দিল। তারপর সঙ্গী-সাথিদের দিকে ফিরে জানতে চাইলো, তোরা কি কস ?


সমস্বরে সবাই তার কথায় সায় দিল। বাবার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি, অনেক কষ্টে নিজেকে স্থির রেখেছেন। আচমকা রাগে ফেঁটে পড়লেন তিনি। চিৎকার করে বলে উঠলেন। আমার মাইয়ারে কাইট্যা গাঙ্গে ভাসাইয়া দিমু। তবু তোর মত শয়তানের লগে বিয়া দিমু না।

আরে দিবেন দিবেন। না দিলে আপনেরে মুক্তি ফৌজের লগে আঁতাত করনের লাইগ্যা আর্মিগো ক্যাম্পে লইয়া যামু। এই জন্য কই কি, আমাগো দলে আহেন। এতে বউ-মাইয়ার ইজ্জতও বাঁচবো, আপনেও নিশ্চিন্তে জিন্দেগী পার করতে পারবেন।

আমি জীবনের পরোয়া করিনা। ইজ্জত বাঁচানোর মালিক আল্লাহ। তোদের যা ইচ্ছা তাই কর, আমি তোগো সাথে নাই। কথাটা বলেই বাবা আচমকা ঘুরে দাঁড়ালেন। তারপর বুক ফুলিয়ে ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

সে রাতে আাঁধার নামার সাথে সাথে মুন্সী বাড়ির ছেলের দল আবার এল। সাথে দু&#039;জন পাক আর্মি। এসেই দরজা ধাক্কাতে লেগে গেল। বাবা আমাকে খাাটের তলে ঠেলে দিলেন। তারপর দ্রুত দরোজা খুলে দিলেন। হ্যাজাক বাতির তীব্র আলোয় সাড়া উঠোন দিনের মত আলোকিত। আমি খাটের তল থেকে স্পষ্ট দেখলাম, আর্মি দুজন বাবাকে এক ধাক্কায় সামনে ঠেলে দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। সাথে মুন্সী বাড়ির ছেলেও আছে

তুম মুক্তি হ্যায় ? একজন বাবার দিকে রাইফেল বাগিয়ে জানতে চাইলো।

কাভি নেহি। বাবাও সমান তেজে উত্তর দিল। মেয় সাচ্চা মুসলিম হেয়। মেরা মুল্লক পাকিস্থান হ্যায়।

ইয়ে ঝুট বলতাহে। পাশ থেকে মুন্সী বাড়ির ছেলে বলে উঠলো। ইয়ে সাচ্চা মুসলিম নেহি। উসকে বগল বেগানা জানানা মজুত হেয়। বলেই সে লাফিয়ে আমাদের পাশের ঘরে চলে গেল। ওঘর থেকে আমার মা-বোনের আর্ত চিৎকার শুনতে পেলাম। মুন্সীর ছেলের পিছু পিছু আমার বাবাও যেতে চাইলো। কিন্তু আর্মিদের একজন তার জামার কলার চেপে ধরায় সম্ভব হলো না। ততক্ষণে মুন্সীর ছেলে টেনে হিচরে আমার বোনটাকে এ ঘরে নিয়ে এল। পিছু পিছু আমার মা&#039;ও ছুটে এসেছে। তাকে এক ধাক্কায় বিছানায় ফেলে দিয়ে আমার বোনকে ঠেলে দিল অন্য পাক সেনার দিকে। একটা পলকা বালিশের মত ওকে লুফে নিল সৈন্যটা। ভয়ে থরথর করে কাঁপছে বোন আমার। ক্রমাগত বাবা-মা বলে চিৎকার করছে।

দোহাই সাব এ মেরা এক লত্তি বেটি হ্যায়। উসকে ছোড় দাও সাহাব। মেয় সাচ্চা মুসলিম হেয়। ইয়ে ভি মুসলিম আউরত হেয়। বাবা সৈনিকটার পা জড়িয়ে ধরে অনুনয় করতে লাগলেন।

ঠিক হ্যায়। তোম ভি সাচ্চা মুসলিম। ইয়ে ভি সাচ্চা মুসলিম। লেকিন হাম তো ইসকা পরখ করনা পরেগা। বলেই আমার বোনের গাল চেটে দিয়ে খিক খিক করে হেসে উঠলো সৈনিকটা।

বাবা লজ্জায়-ঘৃণায় চোখ বন্ধ করে ফেললেন। যে সৈনিকটা বাবাকে ধরে রেখেছিল, সে এবার বাবাকে ছেড়ে দিল। তারপর বাবার পেটে কষে একটা লাথি ঝাড়লো। ছিটকে গিয়ে বাবাও মা&#039;র পাশে লুটিয়ে পড়ল। হানাদারের দলটা আমার বোনকে নিয়ে উল্লাস করতে করতে বেড়িয়ে গেল। যাবার আগে দরজার বাহির থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে গেল মুন্সীর ছেলে। তারও অরেকক্ষণ পর যখন আমার বোনের চিৎকারের আওয়াজও আর শোনা গেল না। তখনি আমি খাটের তল থেকে বেড়িয়ে এলাম। বাবা-মা আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।

সারারাত আমরা এভাবেই জড়াজড়ি করে পড়ে ছিলাম। রাতের আঁধার কেটে গিয়ে সবে দিনের আলো উঠি উঠি করছে, এমনি সময় দূর থেকে অনেকগুলো গুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম। বাবা-মা ভয় পেয়ে আমায় শক্ত করে চেপে ধরলেন। এর কিছুক্ষণ বাদেই আমাদের ঘরের বাহির দরজা খোলে গেল। পুরোটা দরজা আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষটা। তার বাম হাতের চকচকে কালো পাইপ সদৃশ জিনিষটা চিনতে আমার বিন্দুমাত্রও ভ্রম হলো না। ঠিক এরকম পাক সেনাদের কাছেও দেখেছি। কিন্তু, আমার অবাক হবার পালা এল তখনি, যখন দেখলাম তার ডান হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে আমারী বড় বোন। হাতটা ছেড়ে দিতেই বোনটা লাফিয়ে এসে পড়ল আমাদের উপর। আমার মত করে ওকেও শক্ত করে চেপে ধরলেন বাবা-মা। অস্ফুট শব্দ করে তিনজনই সমস্বরে কেঁদে উঠলেন।

আমি নিজেকে ছাড়িয়ে লোকটার দিকে ফিরে তাকালাম। এই প্রথম ওর চোখে অন্য কিছু দেখতে পেলাম- যা দেখে আমি মোটেও ভয় পেলাম না। বরঞ্চ ওকে দেখে নিজেকে আমার খুব&#039;ই নিরাপদ মনে হলো। আমি আলগোছে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। অবিশ্বাস্য শক্তিবলে সে আমায় এক টানে কোলে তুলে নিল। আমি পরম নির্ভরতায় মানুষটাকে জড়িয়ে ধরলাম।






আমি জানিনা ও আসলে কে ছিল। তবে সেদিন ভোরেই সে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তারপর যুদ্ধ চলাকালীল ওকে আর দেখতে পাইনি। যদিও দেশ স্বাধীন হবার পর অনেকের টুকরো টুকরো কথাই আমার কানে এসেছে। ও নাকি ছিল পাক আর্মির দুর্ধষ বাংগালী কমান্ডো মেজর আনোয়ার। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবার জন্য সে সুদূর পাকিস্থান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল। বাবার সাথে তার কি ভাবে যোগাযোগ হয়েছিল আমি জানিনা। তবে এটা বুঝতে পারি আমাদের এলাকায় যে কয়টা কমান্ডো অপারেশন হয়েছিল তার পেছনে ছিল সেই মানূষটাই। আমার এই চুয়ান্ন বছর বয়সে এসেও যে কোন বিপদে আমি সেই মানুষটার&#039;ই চোখ দেখতে পাই- যা আমায় পরম নির্ভরতায় সামনে এগিয়ে যাবার সাহস যোগায়।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255988/</link>
				<pubDate>Mon, 29 Jun 2026 04:09:24 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>চোখ</p>
<p>তার দৃষ্টি মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। সে যখন তাকিয়ে ছিল, আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গিয়েছিল। কাঁচের মত চকচকে সে দৃষ্টি। মনে হচ্ছিল সে যেন তাকিয়ে নেই। এক জোড়া ঘষা কাঁচ অনড় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে তার চোখে।</p>
<p>একদিন বর্ষণ মুখর বাদলা রাতে সে এসেছিল। বারান্দার বেঞ্চিতে বাবা আমকে জড়িয়ে ধরে বসেছিলেন। আমি আদুরে ছানার মত বাবার বুকের&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255988"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255988/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">a57b50c57757f41806c3e25f612c79cd</guid>
				<title>তোমার জন্য

তোমার যদি সৃষ্টি না হতো
সুন্দর পৃথিবীটা দেখা হতো না আমার।
অন্ধকার জঠরের বিন্দুবৎ আবির্ভাব থেকে
তুমিই দিয়েছিলে আমায় মানব সন্তানের পূর্ণতা।
তোমার স্নেহময় উষ্ণতার মাঝেই
আমার সংসার সীমান্তে হেঁটে যাওয়া।
তোমার জীবন যদি আমায় দান না করতে
আমার বেঁচে থাকা হতো সম্ভাবনাহীন।
তোমার জন্যই নারী আমার অকপট শ্রদ্ধাঞ্জলি।

তুমি যদি না হাসতে
আমার আকাশে আলোময় নক্ষত্র ফুঁটতো না।
নিকষ অমানিশায় হারাতো আমার মুগ্ধতা।
সাজানো বাগানপাট বিরান হয়ে পড়ে থাকতো।
উশর মরুভূমিতে বইতো না কভু
আকণ্ঠ পিয়াসের ঝর্ণাধারা।
অসহায় তরুলতা বৃক্ষরাজি সকল
ফুলের আকুলতায় ব্যকুল হতো।
তোমার জন্যই নারী আমার পূজার আয়োজন।

তুমি যদি সুন্দর না হতে
রমণীয় সৌন্দর্যের কথা আমার জানা হতো না।
তোমার দেহজ ছন্দে আমার দৃষ্টিপরে জাগতো লোভ
নিষিদ্ধ চাওয়ার ভিড়ে তুমি হতে রিক্ত।
অদৃশ্য বক্ষবন্ধনীর আড়ালে তোমার হৃদকম্পন
আমায় প্রেমিক হতে বলতো না।
হৃদয় পটে আঁকা হতো না কোন ছবি
গভীর মমতায় যার বসবাস।
তোমার জন্যই নারী আমার সবটুকু ভালবাসা।

তুমি যদি নারী না হতে
অনাসৃষ্টি ঘটতো পৃথিবীতে।
আমি কিম্বা আমরা সবাই হতাম মনুষত্যহীন
অসভ্যতার আদলে গড়ে উঠতো মানবতা
গাঢ় অন্ধকারে ডুবে থাকতো জীবন।
আমাদের হৃদয় হতো ভালবাসা বিমুখ
প্রেমিক মন নিয়ে কাছে আসা হতো না কারো।
আমি কবি হতেম না মোটেই।
তোমার জন্যই নারী আমার এমনতরো কবিতা।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255987/</link>
				<pubDate>Mon, 29 Jun 2026 04:07:56 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>তোমার জন্য</p>
<p>তোমার যদি সৃষ্টি না হতো<br />
সুন্দর পৃথিবীটা দেখা হতো না আমার।<br />
অন্ধকার জঠরের বিন্দুবৎ আবির্ভাব থেকে<br />
তুমিই দিয়েছিলে আমায় মানব সন্তানের পূর্ণতা।<br />
তোমার স্নেহময় উষ্ণতার মাঝেই<br />
আমার সংসার সীমান্তে হেঁটে যাওয়া।<br />
তোমার জীবন যদি আমায় দান না করতে<br />
আমার বেঁচে থাকা হতো সম্ভাবনাহীন।<br />
তোমার জন্যই নারী আমার অকপট শ্রদ্ধাঞ্জলি।</p>
<p>তুমি যদি না হ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255987"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255987/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">2159a08900753c5af0d09de9977ba416</guid>
				<title>সনদের ওপারে শিক্ষার আহাজারি

ইদানীং দেখি অনেক ডিগ্রি
আলমারির কাচের ভেতর বন্দি থেকে থেকে
ধীরে ধীরে পুরোনো চিঠির মতো বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

যে ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে
একদিন স্বপ্নের নীলনকশা এঁকেছিল,
সে আজ চাকরির আবেদনপত্রের ভিড়ে
নিজের নামটুকুই বারবার লিখে যাচ্ছে।

অথচ তারই পাশের রাস্তায়
একজন অল্পশিক্ষিত মানুষ
কয়েকজন কর্মচারীর বেতন মিটিয়ে
নতুন আরেকটি প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা করছে।

আমি প্রায়ই থমকে যাই।

তাহলে শিক্ষা কি কেবল
একটি চাকরির প্রবেশপত্র,
নাকি তার চেয়েও বৃহত্তর কোনো অনন্ত সম্ভাবনার নাম?

আমার ভেতরে প্রশ্নের ধূলিঝড় ওঠে।
মনে হয়,
আমরা বুঝি সনদকে শিক্ষা ভেবে বসে আছি,
আর শিক্ষার প্রকৃত অর্থটাকে
কোনো পুরোনো পাঠ্যবইয়ের ভাঁজে ফেলে রেখেছি।

ঠিক তখনই একজন বয়সী মানুষ
আমার সমস্ত বিভ্রান্তির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলেন—

চাকরি মানুষকে জীবিকা দেয়,
কিন্তু শিক্ষা মানুষকে দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।

সনদ তোমার পরিচয়পত্র হতে পারে,
কিন্তু শিক্ষা তোমাকে নিজের সম্ভাবনা আবিষ্কারের সাহস দেয়।

যে শিক্ষিত হয়েও অপেক্ষা করতে জানে শুধু,
সে একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
আর যে মানুষ শেখে,
সে শূন্য হাতেও নতুন পথের নির্মাতা হয়ে ওঠে।

আমি নীরবে মাথা নিচু করি।

হঠাৎ মনে হয়,
শিক্ষার মূল্য আসলে মাস শেষে পাওয়া বেতনে নয়,
বরং সেই সক্ষমতায়
যেখানে একজন মানুষ নিজের জন্য নয়,
অন্য মানুষের জন্যও কর্মের দরজা খুলে দিতে পারে।

তখন বুঝতে পারি,
শিক্ষা কোনো ফ্রেমবন্দি সনদের নাম নয়।
শিক্ষা হলো নিজের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার শিল্প,
পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াবার বিজ্ঞান,
এবং অন্ধকার সময়ের ভেতরেও
একটি নতুন সকালের কল্পনা করার ক্ষমতা।

আর যে মানুষ
এই ক্ষমতাটুকু অর্জন করে ফেলে,
সে চাকরি পাক বা না পাক,
একদিন ঠিকই নিজের আলোর পরিধিতে
আরও অনেক মানুষের জীবন আলোকিত করে যায়।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255905/</link>
				<pubDate>Sun, 28 Jun 2026 06:38:28 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সনদের ওপারে শিক্ষার আহাজারি</p>
<p>ইদানীং দেখি অনেক ডিগ্রি<br />
আলমারির কাচের ভেতর বন্দি থেকে থেকে<br />
ধীরে ধীরে পুরোনো চিঠির মতো বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে।</p>
<p>যে ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে<br />
একদিন স্বপ্নের নীলনকশা এঁকেছিল,<br />
সে আজ চাকরির আবেদনপত্রের ভিড়ে<br />
নিজের নামটুকুই বারবার লিখে যাচ্ছে।</p>
<p>অথচ তারই পাশের রাস্তায়<br />
একজন অল্পশিক্ষিত মানুষ<br />
কয়েকজন কর্ম&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255905"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255905/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">85c329c8cfe8e2a76e8319564113e555</guid>
				<title>আড়ালে তার সূর্য হাসে

অনেকক্ষণ ধরেই পাশের বাড়ি থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। চিৎকারের ফাঁকে ফাঁকে একটা মেয়ের চাপা কান্না, ফোঁপানির শব্দ, যেন কেউ প্রাণপণে কাঁদা থামিয়ে রাখতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। খোকন বিছানায় বসে আছে। সবে বাইরে থেকে ফিরেছে। সারা শরীরে ক্লান্তি জমে আছে, তবু আজ বিশ্রাম নিতে পারছে না। এই কান্নার শব্দ তার বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা তৈরি করছে। এ দৃশ্য তার কাছে নতুন নয়। প্রায় প্রতিদিনই সে এই বাড়ি থেকে মেয়েটার চিৎকার শুনে। প্রথম প্রথম সে ভেবেছিল, অন্যের পারিবারিক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। মানুষ তাকে ভয় পায়, তার নাম শুনলে রাস্তা ছেড়ে দেয়, কিন্তু সে কখনো কোনো মেয়েলি ঝামেলায় নিজেকে জড়ায় না। তার নিজেরও কিছু নিয়ম আছে। কিন্তু আজ কেন জানি নিজেকে আটকে রাখতে পারছে না। মেয়েটার কান্না আজ যেন তার বুকের মধ্যে এসে বাজছে। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। পাশের বাড়ির একটা ঘরে আলো জ্বলছে। আলোটা বারবার কেঁপে উঠছে, মনে হচ্ছে ভেতরে ধস্তাধস্তি চলছে। তারপর আবার সেই চিৎকার, “মাফ করে দেন... আমি আর করব না...” কথাটা শেষ হওয়ার আগেই একটা প্রচণ্ড আঘাতের শব্দ ভেসে আসে। খোকনের মুখের পেশি শক্ত হয়ে ওঠে। তার দুই চোখ রক্তের মতো লাল হয়ে যায়। হঠাৎ তার মনে হয়, এই কান্না সে আর শুনতে পারছে না। আজ কিছু একটা করতেই হবে।

খোকন দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। রাত অনেক হয়েছে। চারপাশে নীরবতা। দূরে কোথাও কুকুর ডেকে উঠছে। কিন্তু পাশের বাড়ির সেই কান্না সমস্ত নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছে। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাড়িটার দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই যে দৃশ্যটা দেখে, তাতে তার সমস্ত শরীর আগুন হয়ে ওঠে। ঘরের মাঝখানে একটা সতেরো-আঠারো বছরের মেয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। মেয়েটার চুল এলোমেলো, গায়ের ওড়না সরে গেছে, ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির কর্তা মফিজ সাহেব। হাতে একটা মোটা বাঁশের লাঠি। তিনি একের পর এক আঘাত করে চলেছেন। পাশে দাঁড়িয়ে তার স্ত্রী রহিমা বেগম মুখ বিকৃত করে বলছেন, “আজ তোকে মেরেই ফেলব। চোর কোথাকার! টাকা চুরি করে আবার মুখের ওপর মিথ্যা কথা বলিস!”

মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলছে, “আমি টাকা নিই নাই। আল্লাহর কসম, আমি নিই নাই।”

কিন্তু কেউ তার কথা শুনছে না।

মফিজ সাহেব আবার লাঠি তুলতেই খোকন আর নিজেকে সামলাতে পারে না। এক লাফে সামনে গিয়ে লাঠিটা তার হাত থেকে টেনে নেয়। এত দ্রুত সবকিছু ঘটে যে কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারে না। তারপর সেই লাঠি দিয়েই সে সজোরে একটা বাড়ি বসিয়ে দেয় মফিজ সাহেবের পিঠে। লোকটা ব্যথায় চিৎকার করে মেঝেতে বসে পড়ে। খোকনের মুখ তখন পাথরের মতো শক্ত।

সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “একটা মাইয়ার গায়ে হাত তুলতে তোর লজ্জা করে না?”

মফিজ সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে আতঙ্ক। “খোকন! তুমি...”

কথা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা বাড়ি পড়ে তার কাঁধে। পাশ থেকে রহিমা বেগম ছুটে এসে স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তিনি খোকনের হাত চেপে ধরে চিৎকার করে বলেন, “খোকন থাম, উনারে মারতাছো কেন?”

খোকন তাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দেয়। মহিলাও আবার সামনে এসে দাঁড়ান। তখন রাগে অন্ধ হয়ে খোকন তাকেও দুই তিনটা বাড়ি মেরে দেয়। মহিলা চিৎকার করে পেছনে সরে যান। পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। শুধু মেয়েটার ফোঁপানির শব্দ শোনা যায়।

খোকন লাঠিটা ফেলে দিয়ে মেয়েটার দিকে তাকায়। মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে। মনে হচ্ছে এবার বুঝি সেও মার খাবে। খোকন ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে নিচু হয়ে বসে।

“তোর নাম কী?”

মেয়েটা কাঁপা গলায় বলে, “লায়লা।”

“তোর কেউ নাই?”

মেয়েটা মাথা নিচু করে ফেলে।

“বাবা-মা নাই। শুধু নানী আছে।”

খোকন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর আবার জিজ্ঞেস করে, “এই বাড়িতে কীভাবে আসছিস?”

লায়লা চোখ মুছতে মুছতে বলে, “গ্রাম থেকে আনছে। কইছিল নিজের মেয়ের মতো রাখবে।”

এই কথাটা শুনেই খোকনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। সে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই বয়সে একটা মেয়ের চোখে এত ভয়, এত কষ্ট থাকা উচিত নয়। তারপর সহসাই মেয়েটার হাত ধরে টেনে তুলে দাঁড় করায়। “আমার সঙ্গে যাবি?”

পেছন থেকে মফিজ সাহেব আবার চিৎকার করে ওঠেন, “ও আমাদের কাজের মেয়ে। ওকে নিয়ে যাওয়ার সাহস করবি না।”

খোকন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। তারপর এমন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায় যে লোকটা আর একটা কথাও বলতে পারে না।

সে আবার লায়লার দিকে ফিরে বলে, “চল আমার সাথে?”

লায়লা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন বুঝতেই পারছে না কী বলবে। “কোথায় যাব?”

“এই জাহান্নাম থেকে দূরে।”

মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর খুব আস্তে করে মাথা নাড়ে।

খোকন তার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখে। মেয়েটার শরীর কাঁপছে। সে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করে। পেছন থেকে রহিমা বেগম গালাগাল করতে থাকেন, মফিজ সাহেব চিৎকার করতে থাকেন, কিন্তু খোকন একবারও ফিরে তাকায় না। সে মেয়েটাকে নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে।

রাস্তায় তখন হালকা বাতাস বইছে। দূরের আকাশে মেঘ জমেছে। একটা রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। খোকন লায়লাকে নিয়ে তাতে উঠে বসে। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলে না। লায়লা শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। খোকন তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে, এই মেয়েটা জীবনে কোনোদিন নিরাপদ আশ্রয় পায়নি।

অনেকক্ষণ পর সে ধীরে বলে, “তুই যদি আবার ওই বাড়িতে যাস, ওরা তোকে মেরে ফেলবে।”

লায়লা মাথা নিচু করে থাকে। “আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই।”

খোকন জানে, কথাটা সত্যি। এই শহরে এত বড় পৃথিবীর ভেতরেও মেয়েটার কোনো জায়গা নেই।

হঠাৎ সে বলে ওঠে, “আমারে বিয়া করবি?”

লায়লা যেন আকাশ থেকে পড়ে। বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে যায়। “আপনি আমারে চেনেন না।”

খোকন একটু হাসে। “চিনতে কতদিন লাগে? মানুষের চোখ দেখলেই অনেক কিছু বুঝা যায়।”

লায়লা চুপ করে থাকে।

খোকন আবার বলে, “তোরে আর কেউ মারতে পারবে না। এই কথা দিতেছি।”

এই কথাটা শুনে মেয়েটার চোখ আবার ভিজে ওঠে। জীবনে প্রথমবার কেউ তাকে রক্ষা করার কথা বলছে।

রিকশা এসে থামে কাজী অফিসের সামনে। রাত গভীর হলেও কাজী সাহেব এখনও জেগে আছেন। খোকনকে দেখে তিনি অবাক হয়ে যান। সব কথা শোনার পর অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর লায়লার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “তোমার সম্মতি আছে?”

লায়লা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর আস্তে করে বলে, “এই মানুষটা যদি আমারে আর কাঁদতে না দেয়, তাহলে আমার আপত্তি নাই।”

খোকনের বুকটা কেমন করে ওঠে। সে প্রথমবার মেয়েটার দিকে ভালো করে তাকায়। মেয়েটার মুখে এখনও আঘাতের দাগ, কিন্তু চোখের মধ্যে একটা অদ্ভুত বিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে।

সেই রাতেই তাদের বিয়ে হয়ে যায়। কাগজে দুটো নাম লেখা হয়, দুজন সাক্ষী সই করে। কোনো আয়োজন নেই, কোনো গান নেই, কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। তবু লায়লার মনে হয়, এই ছোট্ট ঘরটাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কারণ আজ থেকে তাকে আর কেউ লাঠি দিয়ে মারবে না, চোর বলবে না, না খাইয়ে রাখবে না।

সেদিন রাতেই খোকন তাকে নিজের ঘরে নিয়ে আসে। ছোট্ট টিনের ঘর, কিন্তু আশ্চর্য রকম পরিপাটি। দেয়ালে একজন বয়স্ক মহিলার ছবি ঝুলছে।

লায়লা জিজ্ঞেস করে, “উনি কে?”

খোকন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, “আমার মা।”

তারপর ধীরে ধীরে জানায়, ছোটবেলায় সেও তার মাকে শশুর বাড়িতে কাজের মেয়ের মতই কাজ করতে দেখেছে, অপমান সহ্য করতে দেখেছে, কান্না করতে দেখেছে। কিন্তু তখন সে কিছুই করতে পারেনি। হয়তো সেই কারণেই আজ আর একটা মেয়ের কান্না তার সহ্য হয়নি।

লায়লা চুপ করে শুনতে থাকে।

বাইরে তখন রাত আরও গভীর হয়। আকাশে মেঘ সরে গিয়ে চাঁদ উঠেছে। জানালা দিয়ে সেই চাঁদের আলো ঘরে এসে পড়ছে।

খোকন ধীরে বলে, “আজ থেইকা তুই একা না।”

লায়লার চোখ ভিজে ওঠে।

সে মনে মনে একটা কথাই ভাবে, পৃথিবীতে সব মানুষ খারাপ নয়। কিছু মানুষ আছে, যারা অন্যের কান্নাকে নিজের কষ্ট মনে করে। আর সেই রাত থেকেই শুরু হয় তাদের নতুন জীবন, যেখানে লাঠির শব্দ নেই, অপমান নেই, আছে শুধু দুটো ভাঙা মানুষের একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা।

(খোকন ভাই আমার আত্মীয়। উনার বাস্তব জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই এই গল্পের অবতারনা।)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255904/</link>
				<pubDate>Sun, 28 Jun 2026 06:10:21 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>আড়ালে তার সূর্য হাসে</p>
<p>অনেকক্ষণ ধরেই পাশের বাড়ি থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। চিৎকারের ফাঁকে ফাঁকে একটা মেয়ের চাপা কান্না, ফোঁপানির শব্দ, যেন কেউ প্রাণপণে কাঁদা থামিয়ে রাখতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। খোকন বিছানায় বসে আছে। সবে বাইরে থেকে ফিরেছে। সারা শরীরে ক্লান্তি জমে আছে, তবু আজ বিশ্রাম নিতে পারছে না। এই কান্নার শব্দ তার বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থির&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255904"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255904/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">67970db4d43b5a8c16960b2a7f836712</guid>
				<title>একফালি আকাশের জবানবন্দি

ইদানীং আমার ঘরে রোদ ঢোকে না।
আসলে ঢোকার মতো ফাঁকটুকুই নেই আর।
চারদিকের কংক্রিটের দেহগুলো
দিনের আলোকে জিম্মি করে রেখেছে বহুদিন।

আমি মাঝেমধ্যে জানালার কাছে দাঁড়াই।
মাথা উঁচু করে
আকাশের একটা সরু রেখা দেখি।
যেন বিশাল নীলের মৃতদেহ থেকে
কেউ কেটে দিয়েছে একফালি চামড়া।

একসময় এই উঠানে শীত নামতো।
মা মাদুর পেতে ধান শুকাতেন।
বাবা রোদ পোহাতে পোহাতে বলতেন,
মানুষের বড়লোক হওয়ার আগে
একটু আকাশের মালিক হওয়া দরকার।

আমি তখন বুঝিনি।

এখন বুঝি।

এখন দিনের বেলাতেও
আমাকে সুইচ টিপে সূর্য জ্বালাতে হয়।

বয়সী দেয়ালগুলো স্যাঁতসেঁতে হয়ে ওঠে।
আলো না পেয়ে
ঘরের কোণে কোণে জন্ম নেয় ছত্রাক।
আমার মনেও বোধহয় জন্ম নেয় কিছু অন্ধকার।
যাদের নাম আমি আজও জানি না।

মাঝে মাঝে পাশের পনেরোতলা ভবনের দিকে তাকাই।
তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
আমি নিচু হয়ে যাই।
তারা সূর্য দেখে,
আমি শুধু সূর্যের অনুপস্থিতি দেখি।

তাদের বারান্দায় বিকেল নামে।
আমার ঘরে নামে আগেভাগে সন্ধ্যা।

আমি কখনো কখনো দেয়ালগুলোকে বলি,
এত উঁচু হয়ে কী লাভ হলো তোমাদের?
তোমরা কি সত্যিই আকাশ ছুঁয়েছ?
নাকি কেবল আমার ভাগের রোদটুকু চুরি করেছ?

তারা কোনো উত্তর দেয় না।

কংক্রিটের শরীরে 
বিবেক বলে কিছু থাকে না।

একদিন একটা শিশু আমাকে জিজ্ঞেস করল,
আচ্ছা, সূর্যও কি কারও বাড়িতে ঢুকতে পারে না?

আমি উত্তর দিতে পারিনি।

কারণ,
পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর ঘটনাগুলো
শিশুদের ভাষায় খুব সহজ শোনায়।

তারপর থেকে আমি ভাবি,
আমরা আসলে কেমন শহর বানাচ্ছি?

যেখানে ঘর আছে,
কিন্তু আকাশ নেই।

জানালা আছে,
কিন্তু জানালা দিয়ে আলো আসে না।

ছাদ আছে,
কিন্তু সেখানে রোদ শুকাতে পারে না
একজন বৃদ্ধ মায়ের ভেজা চুল।

আমরা বহুতল বানাতে বানাতে
নিজেদের খুব উঁচু ভেবে ফেলেছি।
অথচ খেয়াল করিনি,
আমাদের ছায়া ক্রমশ লম্বা হয়ে
কোনো এক একতলা বাড়ির বুকের ওপর গিয়ে পড়ছে।

সেখানে একজন মানুষ
আজও ভোরে উঠে
একফালি আলোর অপেক্ষা করে।

একজন বৃদ্ধা
মৃত স্বামীর কথা মনে করে
দিনের বেলাতেও বাতি জ্বালিয়ে বসে থাকেন।

একটি শিশু
সূর্যমুখীর টব হাতে নিয়ে ভাবে,
ফুলের সঙ্গে হয়তো সূর্যও জন্মায়।

আর আমি...

আমি শুধু মাথা উঁচু করে
সেই সরু আকাশটুকুর দিকে তাকিয়ে থাকি।

কারণ, আমি জানি
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য
শুধু ভাত লাগে না,
শুধু ইট-সিমেন্টের আশ্রয়ও লাগে না।

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য
প্রতিদিন দরকার একফালি রোদ,
একফালি আকাশ,
আর এমন কিছু প্রতিবেশী
যারা নিজের ঘর উঁচু করার আগে
অন্যের জানালাটার কথাও একবার ভাবে।

নইলে একদিন
এই শহরের সব মানুষই
নিজ নিজ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে
একই প্রশ্ন করবে—

এত দালান তুলে
আমরা ঠিক কতটুকু আকাশ হারিয়েছি?
(২৬ জুন, ২০২৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255794/</link>
				<pubDate>Sat, 27 Jun 2026 05:31:21 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>একফালি আকাশের জবানবন্দি</p>
<p>ইদানীং আমার ঘরে রোদ ঢোকে না।<br />
আসলে ঢোকার মতো ফাঁকটুকুই নেই আর।<br />
চারদিকের কংক্রিটের দেহগুলো<br />
দিনের আলোকে জিম্মি করে রেখেছে বহুদিন।</p>
<p>আমি মাঝেমধ্যে জানালার কাছে দাঁড়াই।<br />
মাথা উঁচু করে<br />
আকাশের একটা সরু রেখা দেখি।<br />
যেন বিশাল নীলের মৃতদেহ থেকে<br />
কেউ কেটে দিয়েছে একফালি চামড়া।</p>
<p>একসময় এই উঠানে শীত নামতো।<br />
মা মাদুর পেত&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255794"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255794/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">2b880816b27c3614b2e74b7aa922da95</guid>
				<title>একফালি রোদ

আমি আজকাল খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি। বয়স বাড়লে নাকি মানুষের ঘুম কমে যায়। আমারও তাই হয়েছে। ফজরের আজানের কিছুক্ষণ আগেই চোখ খুলে যায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি অপেক্ষা করি সূর্য ওঠার জন্য। ছোটবেলায় মনে হতো, সূর্য উঠলেই পৃথিবীটা নতুন করে বেঁচে ওঠে। জানালার ফাঁক দিয়ে সোনালি আলো ঘরে ঢুকে পড়ে, গাছের পাতাগুলো ঝিকমিক করে, মানুষের মনও কেমন উজ্জ্বল হয়ে যায়।

কিন্তু আমার ঘরে বহু বছর হলো সূর্যের আলো ঢোকে না।

বিছানা থেকে উঠে আমি প্রতিদিনের মতো সুইচ অন করি। দিনের শুরু হয় বৈদ্যুতিক বাতির আলোয়। তারপর দরজা খুলে ছোট্ট উঠানে দাঁড়াই। উঠান বলতে এখন আর কিছু নেই। চারপাশে দশতলা, বারোতলা, পনেরোতলা বিল্ডিং মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের বিশাল শরীরের নিচে আমার একতলা বাড়িটা যেন কোনো অনাথ শিশুর মতো চুপচাপ পড়ে আছে।

আমি মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকাই। আকাশের মাত্র একটা সরু ফালি দেখা যায়। সেই ফালিটুকুও দিনের বেশিরভাগ সময় কোনো না কোনো দালানের ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকে।

আমার বয়স তিপ্পান্ন পার হয়েছে। এই শহরে এসেছিলাম যখন আমার বয়স মাত্র নয়। বাবা তখন সরকারি চাকরি করতেন। আমরা উঠেছিলাম সরকারি কোয়ার্টারে। সেই সময়ের ঢাকা আজকের ঢাকার মতো ছিল না। বড় বড় গাছ ছিল, খোলা মাঠ ছিল, বাতাস ছিল, আকাশ ছিল। বিকেল হলেই মাঠে নেমে যেতাম। বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়াতাম, ক্রিকেট খেলতাম, কখনো কখনো ঘাসের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে মেঘ দেখতাম। মায়ের ডাক কানে এলেও ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করত না। তখন আকাশ এত বড় ছিল যে মনে হতো পৃথিবীটা যেন শুধু আমাদেরই। শীতের দুপুরে রোদের মধ্যে বসে বই পড়তাম, বর্ষার বিকেলে জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা গুনতাম। আলো, বাতাস আর খোলা জায়গা যে মানুষের জীবনের কত বড় সম্পদ, তা তখন বুঝিনি। মানুষ আসলে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর মূল্য তখনই বোঝে, যখন সেগুলো তার কাছ থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করে।

২০০৪ সালে বাবা অবসর নিলেন। সরকারি কোয়ার্টার ছেড়ে দিতে হবে। বহু বছরের সঞ্চয় আর পেনশনের টাকা দিয়ে ঢাকার উপকণ্ঠে ছোট্ট এক টুকরো জমি কিনলেন। তারপর অনেক কষ্টে একটা একতলা বাড়ি তুললেন। বাড়িটা খুব বড় ছিল না, কিন্তু আমাদের কাছে সেটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বাড়ি। চারপাশ ছিল ফাঁকা। পূর্ব দিকে একটা ধানের জমি, পশ্চিমে কয়েকটা টিনের ঘর, উত্তরে একটা পুকুর আর দক্ষিণে খোলা মাঠ। সকালবেলা সূর্যের আলো সোজা আমার ঘরের ভেতর এসে পড়ত। মা উঠানে শীতের রোদে চাল শুকাতেন, আচার দিতেন, শীতের কম্বল বের করে রোদে মেলে রাখতেন। বাবা বেতের চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়তেন আর মাঝেমধ্যে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। একদিন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী দেখছো? বাবা হেসে বলেছিলেন, মানুষকে বাঁচতে হলে শুধু ভাত-কাপড় লাগে না, একটু আকাশও লাগে। কথাটা তখন বুঝিনি। আজ বুঝি, খুব ভালো করেই বুঝি।

ধীরে ধীরে সবকিছু বদলে গেল। ধানের জমি ভরাট হয়ে গেল, পুকুরে মাটি ফেলা হলো, টিনের ঘরগুলো ভেঙে ফেলা হলো। একদিন দেখি পাশের জমিতে ইট, বালু, সিমেন্টের স্তূপ। কয়েক মাসের মধ্যে সেখানে ছয়তলা একটা ভবন দাঁড়িয়ে গেল। তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা। যে যত উঁচু বিল্ডিং বানাতে পারল, সে তত সফল হয়ে গেল। কেউ একবারও ভাবল না, পাশের বাড়িতে কে থাকে, তার জানালায় সূর্যের আলো পৌঁছাবে কিনা। কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের একতলা বাড়িটা চারদিক থেকে বিশাল দালানের মধ্যে আটকে গেল। একদিন দুপুরে ঘুম থেকে উঠে দেখি মা ঘরের ভেতর লাইট জ্বালিয়ে বসে আছেন। আমি অবাক হয়ে বললাম, দুপুরে লাইট কেন? মা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, দুপুর কোথায়? মনে হচ্ছে যেন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠেছিল।

এরপর থেকে আমাদের ঘরে দিনের বেলাতেও বাতি জ্বালাতে হতো। দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে ভাব ধরল, রান্নাঘরে ছত্রাক জমতে লাগল, কাপড় শুকাতে দেরি হতে লাগল। শীতকালে ঘরের ভেতরে এক ধরনের ভেজা গন্ধ লেগে থাকত। মা প্রায়ই বলতেন, একটু রোদ পেলে শরীরটা ভালো লাগত। কিন্তু সেই রোদ আর ফিরল না। বাবা একদিন উঠানে দাঁড়িয়ে আকাশের সরু ফালিটার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, মানুষ যখন নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জায়গা দখল করে নেয়, তখন অন্য মানুষের ভাগের আলোটাও চুরি হয়ে যায়। আমি সেদিন কোনো উত্তর দিতে পারিনি।

কয়েক বছর পরে মা মারা গেলেন। করোনার সময় বাবাও চলে গেলেন। তাদের মৃত্যুর পর এই বাড়িটা আরও বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে উঠল। আমি স্ত্রী আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে এখানে থাকি বটে, কিন্তু এই বাড়ির অন্ধকার যেন আমার ভেতরেও ছড়িয়ে গেছে। আমার ছেলে অনেকবার বলেছে, এই বাড়ি বিক্রি করে একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলি। স্ত্রীও বলেন, এত অন্ধকার বাড়িতে আর কতদিন? কিন্তু আমি পারি না। এই বাড়ির প্রতিটি ইটের সঙ্গে আমার বাবা-মায়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এই উঠানে দাঁড়িয়ে বাবা আকাশ দেখতেন। এই বারান্দায় বসে মা শীতের রোদে শাক কুটতেন। আমি কীভাবে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাই?

একদিন বিকেলে পাশের সাততলা ভবনের একজন বাসিন্দা আমার বাড়িতে এলেন। বয়স চল্লিশের মতো। তিনি চারপাশে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, চাচা, আপনার ঘরে তো খুব অন্ধকার। আমি হেসে বললাম, অভ্যাস হয়ে গেছে। তিনি কিছুক্ষণ পরে বললেন, আমাদের বিল্ডিংয়ের জন্য এমন হয়েছে? আমি তার দিকে তাকিয়ে শুধু হেসেছিলাম। উত্তর দিইনি। কারণ দোষ একা তার নয়। এ শহরের প্রায় সব মানুষই একই ভুল করে। নিজের জন্য আলো চায়, কিন্তু অন্যের আলো কেড়ে নেওয়ার কথা ভাবে না।

লোকটার নাম রাশেদ। এরপর মাঝে মাঝেই সে আসে। একদিন সে বলল, আমার মেয়ে প্রতিদিন বিকেলে ছাদে গিয়ে সূর্যাস্ত দেখে। আপনার তো সূর্য দেখারই সুযোগ নেই। আমি বললাম, আছে। শুধু একটু কষ্ট করে দেখতে হয়। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কোথায়? আমি আকাশের ছোট্ট ফালিটার দিকে আঙুল তুলে বললাম, ওই যে। সে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।

সেদিন রাতে বিদ্যুৎ চলে গেল। চারপাশের সব বিল্ডিং অন্ধকার। আমি উঠানে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। সরু ফালিটার মধ্যে কয়েকটা তারা জ্বলছে। হঠাৎ মনে হলো, আমি যেন একটা গভীর কুয়োর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। উপরে সামান্য আকাশ, চারপাশে শুধু দেয়াল। বুকের ভেতর একটা কষ্ট জমে উঠল। মনে পড়ল বাবার কথা। মানুষকে বাঁচতে হলে একটু আকাশও লাগে।

কয়েকদিন পরে পাশের বাড়ির একটা ছোট ছেলে আমার কাছে এসে বলল, আঙ্কেল, আপনার বাড়িতে সবসময় লাইট জ্বলে কেন? আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, কারণ আমার বাড়িতে সূর্য ঢুকতে পারে না। ছেলেটা অবাক হয়ে বলল, সূর্যও কি কারও বাড়িতে ঢুকতে পারে না? আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। একটা শিশুর প্রশ্নের সামনে অনেক সময় বড় মানুষও অসহায় হয়ে যায়।

এর কিছুদিন পর আমাদের এলাকায় একটা সভা হলো। পুরোনো বাসিন্দাদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে। সবাই রাস্তা, ড্রেন, গ্যাস, ময়লার কথা বলছিল। আমার কথা বলার পালা এলে আমি উঠে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, আমি আপনাদের কাছে রাস্তা চাই না, ড্রেন চাই না, গ্যাসও চাই না। আমি শুধু একটু সূর্যের আলো চাই। হলরুমটা একেবারে নীরব হয়ে গেল। আমি বলতে লাগলাম, দিনের বেলাতেও আমার ঘরে লাইট জ্বালাতে হয়। আমার মা শেষ বয়সে একটু রোদের জন্য কাঁদতেন। আমরা এমন শহর বানাচ্ছি, যেখানে মানুষ আকাশ দেখতে পায় না। এমন শহর কি সত্যিই বাস করার জন্য তৈরি হচ্ছে?

একজন বললেন, কিন্তু জমির দাম অনেক। জায়গা ছেড়ে বিল্ডিং করলে লাভ কমে যায়। আমি বললাম, লাভের জন্য কি আমরা মানুষের সূর্য কেড়ে নেব? আরেকজন বললেন, আইন তো আছে। আমি বললাম, আইন থাকলেও বিবেক কোথায়? আমি যদি এমন একটা বাড়ি বানাই, যার কারণে আমার পাশের বৃদ্ধ মানুষটা দিনের বেলাতেও লাইট জ্বালিয়ে বসে থাকে, তাহলে আমি কীভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমাই?

হলরুমে কেউ কোনো কথা বলল না।

সেদিন বাড়ি ফিরে আমি অনেকক্ষণ উঠানে বসে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমার কষ্টটা শুধু আমার একার নয়। এই শহরের হাজার হাজার মানুষ হয়তো একইভাবে অন্ধকারে বাস করছে। কেউ মুখ ফুটে বলে না, শুধু চুপচাপ সহ্য করে।

পরদিন সকালে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। দরজা খুলে দেখি রাশেদ দাঁড়িয়ে, সঙ্গে তার ছোট্ট মেয়ে। মেয়েটার হাতে একটা টব। সে হেসে বলল, দাদু, এটা আপনার জন্য। আমি অবাক হয়ে টবটা হাতে নিলাম। ছোট্ট একটা সূর্যমুখী গাছ। মেয়েটা বলল, বাবা বলেছে আপনার বাড়িতে রোদ আসে না, তাই আমি সূর্যের ফুল এনে দিলাম। আমার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। মেয়েটা আবার বলল, একদিন আপনার বাড়িতেও অনেক রোদ আসবে।

আমি তার মাথায় হাত রাখলাম। আমার চোখ ভিজে উঠেছে, সে বুঝতে পারেনি।

সন্ধ্যায় আমি টবটা নিয়ে উঠানে বসে ছিলাম। আকাশের সরু ফালিতে তখন লালচে আলো। আমি সূর্যমুখী গাছটার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, মানুষ কত অদ্ভুত! কেউ অন্যের আলো কেড়ে নেয়, আবার কেউ নিজের ছোট্ট হৃদয় থেকে আলো এনে অন্যের হাতে তুলে দেয়।

আজও ভোরে ঘুম ভাঙলে আমি দরজা খুলে উঠানে দাঁড়াই। মাথার ওপর উঁচু দালান, চারদিকে কংক্রিটের দেয়াল, আর ওপরে ছোট্ট একফালি আকাশ। আমি জানি, হয়তো আর কোনোদিন আমার ঘরে পূর্ণ রোদ ঢুকবে না। হয়তো জীবনের বাকি সময়টুকুও আমাকে দিনের বেলাতেই লাইট জ্বালিয়ে কাটাতে হবে। কিন্তু তবু আমার একটা আশা আছে। যারা আজ নতুন বাড়ি বানাচ্ছেন, তারা যদি একবার ভেবে দেখেন, তাদের বিল্ডিংয়ের ছায়া কোথায় গিয়ে পড়বে, কার জানালাটা বন্ধ হয়ে যাবে, কার ঘরে সূর্যের আলো পৌঁছাবে না, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতের কোনো শিশু এমন প্রশ্ন করবে না, সূর্যও কি কারও বাড়িতে ঢুকতে পারে না?

আমরা শহর বানাচ্ছি, কিন্তু শহরের সঙ্গে মানুষের মনটাকেও তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে। শুধু ইট, সিমেন্ট আর লোহার খাঁচা দিয়ে বসবাসের জায়গা হয়, বাসা হয় না। একটা বাসা তৈরি হয় আলো দিয়ে, বাতাস দিয়ে, খোলা আকাশ দিয়ে, বিকেলের রোদ দিয়ে। যে শহরে মানুষ আকাশ দেখতে পায় না, যে শহরে দিনের বেলাতেও লাইট জ্বালাতে হয়, সেই শহর যত আধুনিকই হোক, তার ভেতরে কোথাও একটা অন্ধকার থেকে যায়।

রাত গভীর হলে আমি আজও উঠানে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাই। সরু ফালির মধ্যে একটা তারা জ্বলে। আমি মনে মনে বাবাকে বলি, তুমি ঠিকই বলেছিলে বাবা, মানুষকে বাঁচতে হলে শুধু ভাত-কাপড় লাগে না। মানুষকে বাঁচতে হলে একটু আকাশ লাগে। আর সেই আকাশের সঙ্গে লাগে একফালি রোদ।
(২৭ জুন, ২০২৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255793/</link>
				<pubDate>Sat, 27 Jun 2026 05:15:19 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>একফালি রোদ</p>
<p>আমি আজকাল খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি। বয়স বাড়লে নাকি মানুষের ঘুম কমে যায়। আমারও তাই হয়েছে। ফজরের আজানের কিছুক্ষণ আগেই চোখ খুলে যায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি অপেক্ষা করি সূর্য ওঠার জন্য। ছোটবেলায় মনে হতো, সূর্য উঠলেই পৃথিবীটা নতুন করে বেঁচে ওঠে। জানালার ফাঁক দিয়ে সোনালি আলো ঘরে ঢুকে পড়ে, গাছের পাতাগুলো ঝিকমিক করে, মানুষের মনও কেমন&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255793"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255793/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">e698227b9a0ec73c4c97444f8d298a2a</guid>
				<title>চন্দ্রশিরা

তোমার ত্বকে মুখ রাখলেই খুলে যায় এক গুপ্ত নক্ষত্রপুঞ্জ,
শিরার ভেতর কাঁপতে থাকে প্রাচীন লবণের বিদ্যুৎ।
আমি দুই হাতে কুড়িয়ে নিই তোমার অনিদ্রার পরাগ,
আর অন্ধকারের গায়ে এঁকে দিই দহনলিপির মানচিত্র।

তুমি জানো, শরীরেরও নিজস্ব ব্যাকরণ আছে,
যেখানে প্রতিটি স্পর্শ একেকটি নির্বাসিত উচ্চারণ।
সেখানে আঙুল রাখলেই জেগে ওঠে ঘুমন্ত প্রবাল,
আর রক্তের ভেতর বেজে ওঠে অচেনা উপকূলের বাঁশি।

তোমার ঘাড়ে তখন জমে থাকে ধূমকেতুর ছাই,
তোমার ঠোঁটের কিনারায় দুলতে থাকে গোধূলির মাদকতা।
আমি বিস্ময়ের মতো নত হয়ে দেখি,
তোমার দেহ আসলে এক অনাবিষ্কৃত নীলিমাপঞ্জি।

ধীরে ধীরে তুমি পরিণত হও তরল নীহারিকায়,
আমি হয়ে যাই তার প্রদক্ষিণে ঘুরে চলা এক নিঃসঙ্গ গ্রহ।
আমাদের মাঝখানে ভেসে থাকে কিছু উষ্ণ কম্পন,
কিছু আদিম সংকেত, কিছু নিষিদ্ধ জ্যোতির্বিদ্যা।

তারপর বারবার জোয়ারের মতো ভেঙে পড়ে আমার আকাঙ্ক্ষা,
তোমার শ্বাসের উপত্যকায় রেখে আসে গোপন আগ্নেয়গিরি।
তুমি চোখ বন্ধ করলেই রাতের ভেতর জন্ম নেয়
অসংখ্য রূপালি ভূকম্প।

সেই কম্পনে কেঁপে ওঠে জানালার কাচ,
নক্ষত্রেরা বদলে ফেলে তাদের নির্ধারিত কক্ষপথ।
তুমি আমার বুকে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলো—
আরও কিছুক্ষণ অনন্ত হয়ে থাকো।

তখন আমি সমস্ত দহন নামিয়ে আনি তোমার শরীরে,
সমস্ত শীত সরিয়ে দিই উষ্ণতার গূঢ় প্রলেপে।
আমাদের নিঃশ্বাসে তৈরি হয় এক গোপন মহাদেশ,
যেখানে সময়ের কোনো নাগরিকত্ব নেই।

আর ভোরের আগে,
আমাদের ক্লান্ত দেহের শিলালিপিতে লেখা থাকে—
প্রেম আসলে দুটি মানুষের নয়,
দুই মহাজাগতিক নির্জনতার ধীরে ধীরে
একই কক্ষপথে এসে জ্বলে ওঠার নাম।
(রচনা : ২৫ জুন ২০২৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255667/</link>
				<pubDate>Fri, 26 Jun 2026 06:09:15 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>চন্দ্রশিরা</p>
<p>তোমার ত্বকে মুখ রাখলেই খুলে যায় এক গুপ্ত নক্ষত্রপুঞ্জ,<br />
শিরার ভেতর কাঁপতে থাকে প্রাচীন লবণের বিদ্যুৎ।<br />
আমি দুই হাতে কুড়িয়ে নিই তোমার অনিদ্রার পরাগ,<br />
আর অন্ধকারের গায়ে এঁকে দিই দহনলিপির মানচিত্র।</p>
<p>তুমি জানো, শরীরেরও নিজস্ব ব্যাকরণ আছে,<br />
যেখানে প্রতিটি স্পর্শ একেকটি নির্বাসিত উচ্চারণ।<br />
সেখানে আঙুল রাখলেই জেগে ওঠে ঘুমন্ত প&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255667"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255667/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">fbfc86ccf841b9a1c31103357cddd64a</guid>
				<title>জলরেখা

তোমার কাঁধে মুখ রাখলেই দেখি এক সমুদ্র জন্ম নেয়
শরীরের ভেতর নীল মাছেরা সাঁতার কাটে নির্জন দুপুরে।
আমি দু&#039;হাতে তুলে নিই তোমার ঘুমন্ত জোয়ার,
বাতাসের গায়ে লিখে দিই আমাদের গোপন বর্ণমালা।

তুমি জানো, শরীরও এক ধরনের বাগান,
যেখানে ঘাসের নিচে লুকিয়ে থাকে বৃষ্টির সরীসৃপ।
একটু স্পর্শ পেলে তারা জেগে ওঠে,
চোখের ভেতর ছড়িয়ে দেয় লবণাক্ত জ্যোৎস্না।

তোমার চুলে তখন শ্যাওলার গন্ধ,
তোমার ঠোঁটে মেঘের নরম অন্ধকার।
আমি জলজ হাতে ছুঁয়ে দেখি
কতটা আকাশ জমে আছে তোমার কলারবোনের কাছে।

তুমি ধীরে ধীরে বদলে যাও অন্য এক নদীতে,
আমি বদলে যাই তার পাড়ের অনন্ত কাশবন।
আমাদের মাঝখানে কেবল কিছু উষ্ণ বাতাস,
কিছু ভূতের মতো ঘুরে বেড়ানো আদিম আকাঙ্ক্ষা।

তারপর অবিশ্রান্ত ঢেউয়ের মতো
তোমার দিকে ঝুঁকে পড়ে আমার সমস্ত নিঃসঙ্গতা।
তোমার শরীরের নীল জমিনে
আমি রেখে আসি এক গুচ্ছ অদেখা নক্ষত্র।

রাত তখন অষ্টব্যাঞ্জনার সুরে ভরে ওঠে,
জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে ঘুমহীন চাঁদ।
তুমি আমার বুকে মুখ লুকিয়ে বলো—
আরেকটু মেঘ হও, আরেকটু বৃষ্টি।

আমি তখন সমস্ত আকাশ নামিয়ে আনি তোমার ত্বকে,
সমস্ত জলবসন্ত মুছে দিয়ে
এক গাঁদা ওমে ভিজিয়ে রাখি তোমাকে।
আর আমাদের শরীরের রোজনামচায়
জন্ম নেয় এক ও অদ্বিতীয় জলরেখা—
যেখানে তুমি আর আমি
একই সমুদ্রের দুই গোপন অক্টোপাস হাত।
(২৫ই জুন ২০২৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255666/</link>
				<pubDate>Fri, 26 Jun 2026 06:04:49 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>জলরেখা</p>
<p>তোমার কাঁধে মুখ রাখলেই দেখি এক সমুদ্র জন্ম নেয়<br />
শরীরের ভেতর নীল মাছেরা সাঁতার কাটে নির্জন দুপুরে।<br />
আমি দু&#8217;হাতে তুলে নিই তোমার ঘুমন্ত জোয়ার,<br />
বাতাসের গায়ে লিখে দিই আমাদের গোপন বর্ণমালা।</p>
<p>তুমি জানো, শরীরও এক ধরনের বাগান,<br />
যেখানে ঘাসের নিচে লুকিয়ে থাকে বৃষ্টির সরীসৃপ।<br />
একটু স্পর্শ পেলে তারা জেগে ওঠে,<br />
চোখের ভেতর ছড়িয়ে দেয় লবণাক্ত জ্যোৎস্ন&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255666"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255666/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">5bdcb26f47cd86b53be4f28f5be0df2a</guid>
				<title>প্রণয়ের অবক্ষয় ও আত্মার উচ্চারণ

এখন প্রেমের আগে খুলে যায় শরীরের গোপন দরজা,
স্পর্শের উন্মাদনায় হারিয়ে যায় প্রতীক্ষার মহিমা।
চোখের ভাষা মুছে গিয়ে ঠোঁট হয়ে ওঠে চুক্তিপত্র,
আবেগের স্থানে বসে ক্ষণিক কামনার স্থাপত্য।

যে আকর্ষণ জন্ম নেয় ত্বকের উষ্ণ প্রলোভনে,
সে দ্রুত নিভে যায় অভ্যাসের নির্লিপ্ত অন্ধকারে।

দু&#039;জন মানুষ তখন শুধু ব্যবহারের ইতিহাস,
এক ছাদের স্বপ্ন ভেঙে যায় অনাগ্রহের শব্দে।
কারণ শরীরেরও এক সীমিত বিস্ময় আছে,
অতিরিক্ত প্রাপ্তি সেখানে সৃষ্টি করে শূন্যতা।

কিন্তু যে প্রেম জন্ম নেয় গভীর মানসলোকে,
সে প্রেম স্পর্শের আগেই খুঁজে নেয় আত্মার ঠিকানা।

যেখানে হাত ধরার আগে হৃদয় ধরে হৃদয়,
যেখানে অপেক্ষাও হয়ে ওঠে এক প্রকার উপাসনা।
সে প্রেমে থাকে না দখলের কোনো তাড়াহুড়া,
থাকে পরস্পরকে জানার অনন্ত অভিযাত্রা।

তাই মন থেকে জন্ম নেওয়া প্রেমের শিকড় গভীর,
ঝড় এলেও সে ভেঙে পড়ে না সহজ পরাজয়ে।

যে প্রেম আত্মাকে ছুঁয়ে যায় নীরব আলোকরেখায়,
সেই প্রেমই একদিন সংসারের প্রদীপ হয়ে জ্বলে।
শরীর ক্ষণস্থায়ী, তার উন্মাদনা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত,
কিন্তু সত্যিকারের প্রেম—এক দীর্ঘ নক্ষত্রযাত্রা।

যারা হৃদয়ের ভেতর নির্মাণ করে ভালোবাসার গৃহ,
তাদের প্রেমই শেষ পর্যন্ত বিয়ের মঙ্গলধ্বনি শোনে।
(রচনাঃ ২৫ জুন ২০২৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255525/</link>
				<pubDate>Thu, 25 Jun 2026 03:53:46 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>প্রণয়ের অবক্ষয় ও আত্মার উচ্চারণ</p>
<p>এখন প্রেমের আগে খুলে যায় শরীরের গোপন দরজা,<br />
স্পর্শের উন্মাদনায় হারিয়ে যায় প্রতীক্ষার মহিমা।<br />
চোখের ভাষা মুছে গিয়ে ঠোঁট হয়ে ওঠে চুক্তিপত্র,<br />
আবেগের স্থানে বসে ক্ষণিক কামনার স্থাপত্য।</p>
<p>যে আকর্ষণ জন্ম নেয় ত্বকের উষ্ণ প্রলোভনে,<br />
সে দ্রুত নিভে যায় অভ্যাসের নির্লিপ্ত অন্ধকারে।</p>
<p>দু&#8217;জন মানুষ তখন শুধু ব্যবহারের ইতিহাস,<br />
এক ছ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255525"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255525/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">a3b327dee86e10b0b49f987f7e5c3dd4</guid>
				<title>রহমত মিয়াদের কাঁদতে নেই

মানুষটা বসে আছে। প্রতিদিনের মতই বসে আছে। মাথাটা সামান্য নুয়ে, দুই হাঁটুর মাঝখানে টিনের পুরোনো বাক্সটা রেখে জুতার সোলের ওপর সুঁই চালিয়ে যাচ্ছে। দেখলেই মনে হবে, এই পৃথিবীতে তার কোনো দুঃখ নেই। কোনো তাড়া নেই। যেন এই ফুটপাথের এক কোণেই তার সমস্ত জীবন থেমে আছে।

কিন্তু ভালো করে তাকালে ভুলটা ভেঙে যায়। লোকটার গায়ের রং কুচকুচে কালো। মুখভরা খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি। চোখের নিচে কালি জমে আছে। কপালের ভাঁজগুলো এত গভীর যে মনে হয় বছরের পর বছর দুঃখ সেখানে বাসা বেঁধে আছে। বয়স পঞ্চান্ন হবে। তবে তাকে দেখে আরো বেশি মনে হয়।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের এই ফুটপাথেই তার সংসার। এই দেয়ালের গায়েই সে প্রায় পঁচিশ বছর ধরে বসে। একটা ছোট কাঠের পিঁড়ি, একটা টিনের বাক্স, কিছু সুই, সুতা, হাতুড়ি আর পেরেক—এই তার সম্বল।

লোকটার নাম রহমত মিয়া। অবশ্য এই শহরে তাকে ওই নামে কেউ চেনে না। সবাই ডাকে মুচি। এই মুচি, জুতা ঠিক করবা? এই বুড়া, কত লাগব? এত বছর ধরে ডাক শুনতে শুনতে সে নিজেও যেন নিজের নামটা ভুলে গেছে।

তবে তারও তো একটা নাম ছিল। একটা ঘর ছিল। একটা উঠোন ছিল। একটা সংসার ছিল। সেই সংসারে একজন মানুষ ছিল, যে তাকে রহমত বলে ডাকত।

ডাকটা মনে পড়তেই সুঁই চালানো হাতটা হঠাৎ থেমে গেল। আস্তে করে মাথা তুলল সে। রাস্তার ওপাশে মানুষ ছুটছে। রিকশা যাচ্ছে। চায়ের দোকানে ভিড় বাড়ছে। পৃথিবী আগের মতই চলছে। শুধু তার পৃথিবীটা অনেক আগেই থেমে গেছে।

অনেক বছর আগে নদীর পাড়ের একটা গ্রামে তার দুই বিঘা জমি ছিল। বাপ-দাদার ভিটে ছিল। উঠোনের এক পাশে একটা কদম গাছ ছিল। বর্ষার দিনে সেই গাছের নিচে বসে তার বউ আয়েশা ধান শুকাত। সন্ধ্যা নামলে চুলা থেকে ধোঁয়া উঠত। পুকুর থেকে হাঁস ফিরত। আর ছোট্ট মেয়ে সখিনা খালি পায়ে দৌড়ে এসে বাবার গলা জড়িয়ে ধরত।

সুখ খুব বড় কিছু ছিল না। তবু ছিল। গরিব মানুষের সুখগুলো এমনই হয়। খুব ছোট। কিন্তু খুব আপন। 

তারপর একদিন নদী রাগ করল। প্রথমে জমির একপাশ ভাঙল। পরের বছর উঠোনের খানিকটা। তারও পরের বছর ঘরটা। শেষে এমন একদিন এল, যেদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রহমত মিয়া দেখল, তার বাপ-দাদার ভিটেটা কালো পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।

সেদিন আয়েশা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। রাতে ভাত খেতে খেতে আস্তে করে বলেছিল, চলো শহরে যাই। রহমত মিয়া অবাক হয়ে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। কই যামু? আয়েশা মৃদু হেসে বলেছিল, যেইখানে দুইডা ভাত পাই। 
সেই রাতেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

শহরে আসার পর শুরু হয়েছিল আরেক যুদ্ধ। ফুটপাতে ঘুমানো, স্টেশনে রাত কাটানো, কখনো একবেলা খেয়ে থাকা, কখনো না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়া। আয়েশা লোকের বাসায় কাজ নিল। রহমত মিয়া পুরোনো জুতা সেলাই করা শিখল।

দিনের শেষে তারা বসে হিসাব করত। আজ কয় টাকা হইল? কখনো ত্রিশ, কখনো চল্লিশ, কখনো তারও কম। হিসাব মিলত না। তবু আয়েশা হাসত। বলত, গরিবের জীবন নদীর মত রে। কূল ভাঙে, আবার কূলও গড়ে।

কথাটা শুনে রহমত মিয়া স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। এত কষ্টের মাঝেও মানুষটা কেমন করে হাসতে পারে! কিন্তু সেই হাসিটাও একদিন ফিকে হয়ে গেল।

প্রথমে শুকনা কাশি। তারপর জ্বর। তারপর কাশি দিতে দিতে মুখ দিয়ে রক্ত বের হলো।

সেদিন রহমত মিয়া ভয়ে কেঁপে উঠেছিল। বলেছিল, চলো, ডাক্তার দেখাই। 

আয়েশা তখনো মৃদু হেসেছিল। ডাক্তার কি ফ্রি দেখব? এই টেকা দিয়া আগে চাল কিনো।

কথাটা শুনে রহমত মিয়া আর কিছু বলতে পারেনি। শুধু স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।

ঠিক তখনই আরেক বিপদ নেমে এল। সখিনা গার্মেন্টস থেকে ফিরে সেদিন চুপচাপ বসে ছিল। চোখ দুটো লাল। রহমত মিয়া কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটা হঠাৎ কেঁদে ফেলল। বলল, আমার চাকরি নাই আব্বা।

রহমত মিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। ক্যান?

সখিনা মাথা নিচু করে বলল, সুপারভাইজার কইছিল, তারে খুশি করলে বেতন বাড়াইব। অফিসের পরে থাকতে কইছিল। আমি রাজি হই নাই। পরে কইছে, কাল থেইকা আমার আর কাজ নাই। কথাগুলো বলেই মেয়েটা দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল।

রহমত মিয়া কিছু বলল না। শুধু মেয়ের মাথায় হাত রাখল। তার বুকের ভেতর তখন আগুন জ্বলছে। কিন্তু গরিব মানুষের আগুনের কোনো ধোঁয়া হয় না। কেউ দেখে না। কেউ টের পায় না।

সেই রাতে সখিনা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, আব্বা, আমি কি ভুল করছি?

রহমত মিয়া মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। না মা। তুই ঠিক করছস।

তাহলে আল্লাহ আমাদের লগে এইরকম করে ক্যান?

প্রশ্নটা শুনে রহমত মিয়া চুপ করে ছিল। তার চোখের কোণ ভিজে উঠেছিল। কিন্তু কোনো উত্তর তার জানা ছিল না।

কয়েকদিন পর আয়েশার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেল। জ্বর আর কমে না। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। পাড়ার এক মহিলা এসে বলল, হাসপাতালে নিয়ে যাও। 

হাসপাতালে নিতে গেলেও টাকা লাগে। রিকশা লাগে। ওষুধ লাগে। তবু শেষ পর্যন্ত এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার করে সে আয়েশাকে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেল। হাসপাতালের বারান্দা ভরা মানুষ। কেউ মেঝেতে শুয়ে আছে, কেউ বেঞ্চে বসে আছে, কেউ কাঁদছে। ডাক্তার অনেকক্ষণ পরে এসে দেখে শুধু বলল, অনেক দেরি কইরা আনছেন। অবস্থা ভালো না।

কথাটা শুনে রহমত মিয়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। সারারাত সে হাসপাতালের বারান্দায় বসে রইল। সখিনা মায়ের মাথার কাছে বসে ছিল। ভোরের দিকে আয়েশা চোখ মেলে স্বামীর দিকে তাকাল। খুব আস্তে করে বলল, শোনো।

রহমত মিয়া দ্রুত কাছে এগিয়ে গেল। কও।

আয়েশা কষ্ট করে বলল, সখিনারে দেখবা।

দেখমু।

মাইয়াডারে কোনোদিন কষ্ট দিও না। কথাগুলো বলতে তার খুব কষ্ট হচ্ছিল। তারপর সে অনেক কষ্টে মৃদু হাসল। বলল, তুমি অনেক ভালো মানুষ আছিলা। তোমারে কিছুই দিতে পারলাম না।

রহমত মিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কাঁপা গলায় বলল, এইসব কইও না সখিনার মা।

কিন্তু আয়েশা তখন দূরে কোথাও তাকিয়ে আছে। কয়েক মুহূর্ত পর তার হাতটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে গেল। হাসপাতালের বারান্দায় বসে রহমত মিয়া বুঝতে পারল, তার পঁয়ত্রিশ বছরের সংসার শেষ হয়ে গেছে।

কিন্তু দুঃখেরও আবার নিচতলা থাকে। ডাক্তার চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর একজন লোক এসে বলল, লাশ নিয়া যান।

রহমত মিয়া ফ্যালফ্যাল করে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। কই নিমু?

লোকটা অবাক হয়ে বলল, দাফন করেন।

রহমত মিয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল। ট্যাকা নাই।

লোকটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, কবর দেওনেরও টাকা নাই?

রহমত মিয়া মাথা নিচু করে বসে রইল। সত্যিই তার কাছে একটা কাফনের কাপড় কেনার টাকাও ছিল না। সখিনা তখন মায়ের মৃতদেহের পাশে বসে কাঁদছে। বারবার বলছে, আব্বা, আম্মারে বাসায় লইয়া যাই।

রহমত মিয়া শুধু মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। কেমনে নিবি মা? কই নিবি? প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর ছিল না। 

সন্ধ্যার দিকে হাসপাতালের বারান্দায় আয়েশার লাশটা কাপড়ে ঢাকা অবস্থায় পড়ে ছিল। মানুষজন পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কেউ একবার তাকাচ্ছে, কেউ তাকাচ্ছেও না। রহমত মিয়া লাশের পাশে বসে ছিল। তার চোখে তখন আর পানি নেই। সব কান্না যেন শুকিয়ে গেছে।

একসময় হাসপাতালের দারোয়ান বের হয়ে এল। এই লাশ কার?

রহমত মিয়া কাঁপা গলায় বলল, আমার বউ।

তাহলে নিয়া যান।

পারুম না।

ক্যান?

কবর দেওনের টেকা নাই।

দারোয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ভেতরে চলে গেল।

একটু পর দুজন লোক নিয়ে ফিরে এল। তারা বলল, বেওয়ারিশ হিসেবে রাখি, পরে ব্যবস্থা হবে।

কথাটা শুনেই রহমত মিয়ার বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে গেল।

পঁয়ত্রিশ বছর যার সঙ্গে এক থালায় ভাত খেয়েছে, যার সঙ্গে সুখ-দুঃখের জীবন কেটেছে, যার কোলে তার সন্তান বড় হয়েছে, সেই মানুষটাই আজ বেওয়ারিশ হয়ে গেছে!

লোকগুলো যখন আয়েশার লাশটা স্ট্রেচারে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন রহমত মিয়া হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে কাপড়ের ওপর হাত রাখল। আয়েশা... তার গলা ভেঙে গেল। একবার মুখটা দেখি...

কেউ কিছু বলল না। স্ট্রেচারটা ধীরে ধীরে ভেতরে চলে গেল।

রহমত মিয়া অনেকক্ষণ হাসপাতালের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, পৃথিবীতে তার আর কেউ নেই।

পরদিন ভোরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে, সেই পুরোনো দেয়ালের পাশে, রহমত মিয়া আবার এসে বসে পড়ল। পেটের ক্ষুধা মানুষের শোকের চেয়েও বড়। টিনের বাক্সটা খুলল। সুইতে সুতা পরাতে গিয়ে হাত কাঁপছিল।

ঠিক তখন একজন লোক এসে বলল, এই মুচি, জুতাটা সেলাই করে দাও তো।

রহমত মিয়া আস্তে করে মাথা তুলল। তার চোখ দুটো লাল, মুখ শুকনো। সে খুব ধীরে বলল, দেন স্যার।

লোকটা জুতো খুলে তার সামনে রাখল। রহমত মিয়া জুতোটাকে কোলে তুলে নিল। তারপর সুঁইটা চামড়ার ভেতর ঢুকিয়ে দিল। একটা সেলাই। আরেকটা সেলাই। তার মনে হলো, সে জুতো না, নিজের বুকটাই সেলাই করছে।

রাস্তার মানুষ ছুটছে। অফিস খুলছে। চায়ের দোকানে ভিড় বাড়ছে। পৃথিবী আগের মতই চলছে। শুধু রহমত মিয়ার পৃথিবীটা আগের দিন হাসপাতালের সেই দরজার ভেতরে, এক বেওয়ারিশ লাশের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। তবু সে বসে আছে। কারণ সে একজন মুচি। আর মুচিদের কাঁদতে নেই। তাতে চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। ঝাপসা চোখে ছেঁড়া জুতো সেলাই করা যায় না।

যদিও নিজের ভাঙা জীবনটাকে সেলাই করার মতো কোনো সুতা তাদের কাছে থাকে না।
(রচনাঃ ২৪ জুন ২০২৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255522/</link>
				<pubDate>Thu, 25 Jun 2026 03:46:14 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>রহমত মিয়াদের কাঁদতে নেই</p>
<p>মানুষটা বসে আছে। প্রতিদিনের মতই বসে আছে। মাথাটা সামান্য নুয়ে, দুই হাঁটুর মাঝখানে টিনের পুরোনো বাক্সটা রেখে জুতার সোলের ওপর সুঁই চালিয়ে যাচ্ছে। দেখলেই মনে হবে, এই পৃথিবীতে তার কোনো দুঃখ নেই। কোনো তাড়া নেই। যেন এই ফুটপাথের এক কোণেই তার সমস্ত জীবন থেমে আছে।</p>
<p>কিন্তু ভালো করে তাকালে ভুলটা ভেঙে যায়। লোকটার গায়ের রং কুচকুচে কালো।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255522"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255522/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">51f3bb53ef43f2ce9865848d2e60d2e9</guid>
				<title>জেগে উঠছে বাংলাদেশ

এই যে হুনছেন? পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রীর ফিসফিস কথা শুনতে পেলেন ইমাম সাহেব। দরজায জানি কেডায় ধাক্কা দেয়।

হুমম শুনছি। স্ত্রীকে আস্তে করে উত্তর দিলেন । তিনি জেগে গেছেন আরো আগেই। এতক্ষণ ইচ্ছে করেই চুপ ছিলেন।


দিনকাল ভালো না। শুনেছেন পাকবাহীনি এখর শহর থেকে গ্রামেও চলে এসেছে। গ্রামের নিরীহ নারী-পুরুষ, বাচ্চা-কাচ্চা কেউই তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। তাদের সাথে যোগ হয়েছে শান্তি বাহিনী। রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্ নামে গ্রামেরই কিছু মানুষ তাদেরকে সাহায্য করছে। শুনেছেন তাদের পাশের গ্রামেও রাজাকার বাহিনী গঠন হয়েছে। তারা রাতের আঁধারে পাকবাহিনীকে চিনিয়ে দিচ্ছে সেই সব বাড়ি যাদের কেউ না কেউ মুক্তিযুদ্ধে গেছে। কাজেই তাদের গ্রামে আসতে আর কতক্ষণ।

গঞ্জ থেকে মুল যে সড়কটা গ্রামের ভেতর দিয়ে গেছে তার পাশেই জামে মসজীদ। মসজীদের পেছনেই ইমাম সাহেবের ঘর। অষ্টাদশী এক মাত্র মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন তিনি।

শুনেছেন তাদের গ্রামেও দু-চার জন মুক্তিফৌজে নাম লিখিয়েছে। যদিও তিনি সবসময় শান্তির পক্ষে। তারপরেও নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের উপর এমন নিষ্ঠূর অত্যচার তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। তবে নিজের এই না মেনে নেওয়াটা কখনোই সর্বসম্মুখে প্রকাশ করেন না। ফলে তিনি এ গ্রামের শান্তি বাহিনীর সুনজরেই আছেন।


তাই এত রাতে দরজা ধাক্কানোর শব্দে তিনিও কিছুটা তটস্ত হয়ে উঠলেন। তবে সাহস হারালেন না। দাঁড়াও দেখাতাছি। বলে তিনি বিছানা ছাড়বার উপক্রম করলেন।

যাইয়েন না। পাশ থেকে স্ত্রী তার হাত টেনে ধরলো।

ভয় পাইয়ো না। আল্লাহ ভরসা। স্ত্রীর হাতে চাপ দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করে বিছানা থেকে নেমে গেলেন তিনি।

টেবিলের উপর থাকা হ্যারিকেন এর সলতেটা উসকে দিলেন। ঘরময় আলো ছড়িয়ে পড়লো। সেই আলোয় চকির নিচ থেকে খড়ম জোড়া টেনে নিয়ে দরোজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

কেডায় ? প্রায় ফিসফিস করে জানতে চাইলেন।

দরজাটা খোলেন হুজুর। গলাটা আর্ত শুনালো।

ইমাম সাহেব গলাটা চিনতে পারলেন না। কিন্তু, কন্ঠস্বরের আকুলতাটা ঠিকই ঠাহর করতে পারলেন।

তিনি আল্লাহর নাম নিয়ে দরোজা খুললেন। চৌকাঠে একটা মানুষকে মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখলেন।

তুমি কেডায় বাবা?

মানুষটা মুখ তুললো। চাচা আমি ।

ইমাম সাহেব চিনতে পারলেন। এ গ্রামেরই ছেলে। বেশ আগেই মুক্তিযুদ্ধে নাম লিখিয়েছে। ওকে নিজের দরোজায় দেখে আতঁকে উঠলেন।

তুমি না যুদ্ধে গেছ?

না চাচা এদ্দিন ইন্ডিয়া আছিলাম। ট্রেনীং নিছি। এখন যুদ্ধে যামু। বাড়ি আইছিলাম মা-বাবার সাথে দেহা করতে। কথা বলার ফাঁকে বাম হাতটা ডান হাতের বাাঁহুতে চেপে ধরলো।

ইমাম সাহেব খেয়াল করলেন। ওর হাতের নিচে রক্ত। অন্ধকারে কালচে দেখাচ্ছে।

তোমার তো হাত কাইটা গেছেগা।

হ। আমি বাড়ি আইছি, শান্তিবাহিনী কেমনে জানি টের পায়া যায়। আমারে ধরনের লাইগ্যা অন্ধকারে ঘাপটি মাইরা ছিল। আমি ঘরের থন বাইর হইতেই জাপটাইয়া ধরে। আমি কোনমতে ছাড়াইয়া দৌড় দিসি। হেগো একজনের সামনে পইরা গেছিলাম। হে-ই ছুড়ি মারছে। এক নাগারে কথা বলে থামলো সে। পেছন ফিরে তাকালো। তারপর ইমাম সাহেবের হাতটা ধরে বলল, হুজুর আমারে একটু পলানোর জায়গা দেন।

ইমাম সাহেব প্রমাদ গুনলেন। তার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল। কি করবেন ভেবে পেলেন না।


হেরা আমারে খুঁজতাছে। পাইলে মাইরা ফালাইবো। হেরা চইলা গেলেই আমি যামুগা। ছেলেটার কন্ঠে অনুনয় ঝড়ে পড়লো।

আপনে ভেতরে আসেন। পেছন থেকে আর একটা কণ্ঠ তাড়া দিল। ঘাড় ফিরিয়ে পেছন ফিরে দেখলেন ইমাম সাহেব। তার মেয়ে উঠে এসেছে।

কিন্তু মা .... ইমাম সাহেব সবে বলতে শুরু করেছিলেন। আব্বা আপনে জলদি দরজা লাগাইয়া হারিকেনটা নিভান । তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠলো মেয়েটা। তারপর ছেলেটা ভেতরে ঢুকতেই তার হাত ধরে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে যেয়ে তার রুমের দরোজা লাগিয়ে দিল।


ইমাম সাহেব কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না। তবে মেয়ের কথামত দরোজা লাগিয়ে হারিকেন নিভিয়ে হতবিহব্বল হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তার স্ত্রী কোন কথা না বলে তাকে জোড়সে আকড়ে ধরলো।

ক্ষাণীক বাদেই বাইরে বেশ কিছু পদশব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই দরোজায় ঘা পড়লো।

দরোজা খোলেন হুজুর।

ইমাম সাহেব বুঝে নিলেন। বিপদ যা হবার হয়ে গেছে। তারপরেও বুকে সাহস রাখলেন। তারা একটা মানুষকে বাঁচাবার জন্য চেষ্টা করছেন। কাজেই এই চেষ্টাটা তারা চালিয়ে যাবেন। বাকী আল্লাহর ইচ্ছা।

এত রাতে কেডায়? তিনি স্পষ্ট গলায় জানতে চাইলেন।

আমরা শান্তি বাহিনী। কেউ একজন উত্তর দিল। আমরা এক জনরে খুঁজতাছি।

তা আমার বাড়িতে কেন?

হেয় আপনার বাড়িতেই ঢুকছে মনে হয়।

না আমার বাড়িতে কেউ আসে নাই।

দরজাটা খোলেন । আমরা নিজেরা দেখবার চাই।

তিনি মেয়ের ঘরের দরোজার দিকে তাকালেন। অন্ধকারে কিছু দেখতে পেলেন না। তার মনে হলো ওরাও কিছু দেখতে পাবে না।

দাঁড়াও খুলতাছি। তিনি স্ত্রীর আলিঙ্গন ছাড়িয়ে বিছানা থেকে নামলেন। হ্যারিকেন এর আলো বাড়িয়ে পায়ে খড়ম গলিয়ে দরোজার দিকে এগিয়ে গেলেন।


দরোজা খুরতেই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো ওরা। জনা তিনেক লোক। সবাইকেই তার চেনা মনে হলো। ঢুকেই তারা এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো। বিছানার দিকে চোখ পড়তেই সেদিকে এগিয়ে গেল একজন।

ওইটা আমার বিবি বাবা। ইমাম সাহেব তার সামনে দাঁড়িয়ে ককিয়ে উঠলেন।

সরেন আমাদের দেখতে দেন। ইমাম সাহেবকে সরিয়ে সে এগিয়ে গেলো খাঁটের দিকে। ইমাম সাহেবের স্ত্রী তড়িৎ শুয়ে থাকা অবস্থা থেকে উঠে বসে গেলেন। আাঁচল টেনে মুখ ঢাকলেন। সেটা দেখে সেদিকে এগোতে থাকা লোকটা থেমে গেলো। তখনি চোখ পড়লো মেয়েটার রুমের দরোজার দিকে। এবার সেদিকে এগোলো।

ওইডা আমার মাইয়ার ঘর বাবা।

ডাকেন ওরে। লোকটা খেঁকিয়ে উঠলো। তখনি তার চোখ পড়লো ঘরের মেঝের দিকে। ওখানে কালচে একটা দাগ দেখা যাচ্ছে। উঁবু হয়ে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলো। মুহুর্তেই তার মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়লো। পরক্ষণেই ঘুরে তেড়ে এলো ইমাম সাহেবের দিকে। কেউ আসে নাই না। তাইলে এই রক্ত আইলো কই থাইক্যা।

আ-আ-আমি জা-জা ....ইমাম সাহেব তোতলাতে লাগলেন।

হাত বাড়িয়ে তার কাঁধ ধরে নিজের দিকে টেনে আনলো লোকটা । পাশ থেকে বাকী দুজন জাপটে ধরলো ইমাম সাহেবকে।

বল ব্যাটা এই রক্ত কার? ইমাম সাহেবের শরীরটা ধরে ক্রমাগত ঝাঁকাতে লাগলো সে।

লজ্জায় দুঃথে ইমাম সাহেবের চোখে পানি চলে এলো। তিনি কিছু বলতে পারলেন না।

তখনি মেয়েটার রুমের দরোজা খোলে গেল। সবগুলো চোখ এক সাথে ঘুরে গেল সেদিকে।

জানতে চান রক্তটা কার? মেয়েটা দরোজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ-মুখ থেকে আগুন বের হচ্ছে। রক্তটা আমার। কােই থাইক্যা বাইর হইছে দেখতে চান। বলেই নিচু হয়ে তার জামার প্রান্তটা ধরে এক টানে কোমরের কাছে উঠিয়ে ফেলল। আপনাগো মা বোনরে জিগায়েন এই রক্ত পত্যেক মাসে কেন বাইর হয়।

উপস্থিত সবাই দেখলো মেয়েটার সবুজ পাজামার নিম্নাঙ্গ এর সামনের অংশটা লাল হয়ে আছে।

সবাই ওদিকে একবার তাকিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে লজ্জায় চোখ ঘুরিয়ে নিল। তারপর আর কিছু না বলে তৎক্ষণাত ইমাম সাহেবকে ছেড়ে দিয়ে দ্রত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু, ইমাম সাহেব তখনো তাকিয়ে থাকলেন। তিনি বিন্দুমাত্রও লজ্জা পেলেন না। তার কাছে মনে হলো তিনি মেয়ের লজ্জাস্থান দেখছেন না। দেখছেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকাটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255439/</link>
				<pubDate>Wed, 24 Jun 2026 05:30:57 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>জেগে উঠছে বাংলাদেশ</p>
<p>এই যে হুনছেন? পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রীর ফিসফিস কথা শুনতে পেলেন ইমাম সাহেব। দরজায জানি কেডায় ধাক্কা দেয়।</p>
<p>হুমম শুনছি। স্ত্রীকে আস্তে করে উত্তর দিলেন । তিনি জেগে গেছেন আরো আগেই। এতক্ষণ ইচ্ছে করেই চুপ ছিলেন।</p>
<p>দিনকাল ভালো না। শুনেছেন পাকবাহীনি এখর শহর থেকে গ্রামেও চলে এসেছে। গ্রামের নিরীহ নারী-পুরুষ, বাচ্চা-কাচ্&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255439"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255439/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>1</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">bd0e9745c77c3280d0090f9593663c9e</guid>
				<title>নন্দিত নরকে আমার স্বর্গবাস

মাঝে মাঝে আমার কি যে হয়
আমি সব ভুলে যাই।
উন্নাসিক নেশার হঠাৎ আবির্ভাব
আমার স্মৃতিতে ফাটল ধরায়।
বাগানের দূর্বা ঘাস
মায়ের টোল পড়া হাসি
কিম্বা হারিয়ে ফেলা একটা সুন্দর সকাল
কিছুই মনে থাকে না আমার।
হৃদয়ের ক্যানভাস থেকে
সবগুলো ছবিই বিম্মৃত হয়ে যায়।

নরকের গাড় অন্ধকারে
আমার দিন-রাত্রি কাটে।

প্রিয় হারা প্রেমিকার ক্রন্দসী বেদনা
নিরাভরণ স্বৈরিণীর উন্মাতাল নির্লজ্জতা
আমায় এতটুকু স্পর্শ করে না।

আমি যেন কোন মহাকাশ মানব।
দৃষ্টিতে দূরদর্শিতা ভর করে
আদিগন্ত স্বপ্নের জাল বুনি।
ঈশ্বরের লালিত্য ভাবনাগুলো
আমার বুকে তোলপাড় খায়।
অহর্নিশ অন্ধকারের ভিড়ে
ঐশ্বরিক সম্ভাবনার বীজ বপন করি।
নরকের ছাই চাপা আগুনে
আশীর্বাদের বাতি জ্বলে উঠে।
স্বপ্নের বৃক্ষগুলো পূর্ণতা পায়।
প্রোজ্জল আলোয় ভরে যায় দশ দিক।

দিব্য চক্ষু মেলে আমি দেখি
আমার নন্দিত নরকের সায়াহ্নে
এক টুকরো স্বর্গের হাতছানি।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255414/</link>
				<pubDate>Wed, 24 Jun 2026 04:13:53 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>নন্দিত নরকে আমার স্বর্গবাস</p>
<p>মাঝে মাঝে আমার কি যে হয়<br />
আমি সব ভুলে যাই।<br />
উন্নাসিক নেশার হঠাৎ আবির্ভাব<br />
আমার স্মৃতিতে ফাটল ধরায়।<br />
বাগানের দূর্বা ঘাস<br />
মায়ের টোল পড়া হাসি<br />
কিম্বা হারিয়ে ফেলা একটা সুন্দর সকাল<br />
কিছুই মনে থাকে না আমার।<br />
হৃদয়ের ক্যানভাস থেকে<br />
সবগুলো ছবিই বিম্মৃত হয়ে যায়।</p>
<p>নরকের গাড় অন্ধকারে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255414"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255414/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>1</slash:comments>
				
							</item>
		
	</channel>
</rss>