<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?>
<rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>তুলট | Md Nurnobi islam sumon | Activity</title>
	<link>https://toulot.com/n_members/mdnurnobiislamsumon/activity/</link>
	<atom:link href="https://toulot.com/n_members/mdnurnobiislamsumon/activity/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<description>Activity feed for Md Nurnobi islam sumon.</description>
	<lastBuildDate>Tue, 21 Jul 2026 10:30:19 +0600</lastBuildDate>
	<generator>https://buddypress.org/?v=</generator>
	<language>en-US</language>
	<ttl>30</ttl>
	<sy:updatePeriod>hourly</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>2</sy:updateFrequency>
	
						<item>
				<guid isPermaLink="false">0660925a28e33026bec21b146dc16d52</guid>
				<title>নুরনবীর ঘরের জানালার বাইরে আকাশটা আজ কেমন যেন ভারী হয়ে আছে। বর্ষার মেঘগুলো জমে জমে কালচে রঙ ধারণ করেছে, কিন্তু বৃষ্টি নামছে না। ঠিক যেমন নুরনবীর চোখের কোণায় জল জমে আছে, কিন্তু সেটা টুপ করে খসে পড়ছে না। বুকের ভেতরটা একটা অচেনা শূন্যতায় মুচড়ে উঠছে বারবার।

বিছানার এককোণে একটা ছোট নীল রঙের পশমি কম্বল ছড়ানো। ঠিক তার পাশেই পড়ে আছে একটা প্লাস্টিকের বল, যার ভেতরে ছোট একটা ঘণ্টা আছে। বলটা নড়লেই টুংটাং শব্দ হতো। কিন্তু আজ ঘরটা নিথর, নিস্তব্ধ। কোনো শব্দ নেই।
কারণ, এই ঘরের প্রাণ, নুরনবীর শখের বিড়াল &#039;পুষ্প&#039; আজ চলে গেছে। এমন এক অজানা শহরে চলে গেছে, যেখান থেকে কেউ কোনোদিন ফিরে আসে না।

সকাল থেকেই নুরনবীর মনটা ভালো ছিল না। প্রতিদিন ভোর ৫টায় পুষ্পর নরম থাবার ছোঁয়া আর হালকা মিউ মিউ ডাকে তার ঘুম ভাঙতো। পুষ্প নুরনবীর বুকের ওপর উঠে বসে তার নাক দিয়ে নুরনবীর গালে গুঁতো দিতো। ওটাই ছিল ওর আদর চাওয়ার ধরণ। কিন্তু আজ ভোর ৫টায় কোনো থাবার ছোঁয়া মেলেনি।

নুরনবী ধড়ফড় করে উঠে বসেছিল। পুরো ঘর খুঁজেছে। খাটের নিচে, আলমারির ওপরে, রান্নাঘরের কোণায় কোথাও পুষ্প নেই। শেষমেশ ড্রইংরুমের বড় সোফাটার নিচে ও আবিষ্কার করে পুষ্পকে। পুষ্প শুয়ে আছে, কিন্তু তার সেই চিরচেনা চঞ্চলতা নেই। শরীরটা কেমন যেন ঠান্ডা, শক্ত। চোখ দুটো অর্ধেক বোজা।

নুরনবী যখন ওকে কোলে তুলে নিয়েছিল, তখনই বুঝতে পেরেছিল পুষ্প আর এই পৃথিবীতে নেই। গত কয়েকদিন ধরে ওর একটু জ্বর ছিল, খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দিয়েছিল। ডাক্তার দেখানো হয়েছিল, ওষুধও চলছিল। সবাই ভেবেছিল ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ২৬ জুনের এই অভিশপ্ত সকালে পুষ্প সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল।

ড্রইংরুমে এসে বসল নুরনবী। কোলে পুষ্পর নিথর শরীর। ঠিক এই সময় কলিংবেলটা বেজে উঠল। দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকল নুরনবীর ছোট বোন নুর এবং তার প্রিয় বন্ধু সুমন।

নুর এসেই বলল, &quot;ভাইয়া, পুষ্পর জন্য নতুন একটা ক্যাটফুড নিয়ে এসেছি, ও তো কদিন ধরে...।&quot;
নুরের কথা শেষ হলো না। নুরনবীর কোলে পুষ্পর শান্ত শরীরটা দেখেই নুরের হাত থেকে ক্যাটফুডের প্যাকেটটা মেঝেতে পড়ে গেল। সুমনের মুখের হাসিটাও এক পলকে মিলিয়ে গেল।

নুর আস্তে আস্তে হেঁটে এসে নুরনবীর পাশে বসল। পুষ্পর গায়ে হাত রাখতেই নুরের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

&quot;পুষ্প আর নেই রে নুর,&quot; নুরনবীর গলাটা কেঁপে উঠল। &quot;ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।&quot;
সুমন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নুরনবীর কাঁধে হাত রাখল। &quot;নুরনবী, নিজেকে শক্ত কর দোস্ত। পুষ্প অনেক কষ্ট পাচ্ছিল গত দুটো দিন। ও হয়তো এখন শান্তিতে আছে।&quot;

নুর পুষ্পর মাথাটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল, &quot;মনে আছে ভাইয়া, তিন বছর আগে এই জুন মাসেই বৃষ্টিভেজা একটা রাতে ওকে আমরা রাস্তার পাশ থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম? কতটুকু ছিল তখন! একটা চায়ের কাপের সমান।&quot;
স্মৃতির পাতাগুলো যেন এক নিমিষে উন্মোচিত হলো তিনজনের সামনে।

২০২৩ সালের এক ঝুম বৃষ্টির রাতে সুমন আর নুরনবী চা খেয়ে ফিরছিল। রাস্তার ধারে একটা ডাস্টবিনের পাশে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল একমুঠো সাদা-কালো পশমের দলা। সুমনের চোখেই প্রথম পড়েছিল। নুরনবী প্রথমে বিড়াল পোষার ব্যাপারে একটু ইতস্তত করছিল, কিন্তু নুরের জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত ওটাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। ধুয়ে-মুছে সাফ করার পর দেখা গেল ওটা একটা অসম্ভব সুন্দর বিড়ালের ছানা। নুরনবী নিজেই তার নাম রেখেছিল &#039;পুষ্প&#039;।
দেখতে দেখতে পুষ্প হয়ে উঠেছিল এই বাড়ির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সুমন মৃদু হেসে বলল, &quot;আমার মনে আছে, প্রথম প্রথম পুষ্প যখন এই ঘরে এসেছিল, ও শুধু নুরনবীর ল্যাপটপের কিবোর্ডের ওপর গিয়ে বসে থাকত। নুরনবী অফিশিয়াল কাজ করছে, আর পুষ্প এসে টাইপ করে দিচ্ছে—*asdfghjkl*। কতদিন যে সুমনের বসের কাছে ভুল মেসেজ গেছে তার ইয়ত্তা নেই!&quot;

নুর চোখের জল মুছে বলল, &quot;আর আমার সাথে ওর প্রতিদিনের মারামারি! আমি পড়তে বসলেই ও এসে আমার খাতার ওপর ঘুমাতো। আমি কলম নাড়ালে ও ভাবতো ওটা খেলার জিনিস। থাবা দিয়ে কলম কেড়ে নিতো। আজ থেকে আমার খাতাগুলো কেমন ফাঁকা পড়ে থাকবে।&quot;

বেলা বাড়ার সাথে সাথে ঘরের ভেতরের নীরবতা যেন আরও গাঢ় হতে লাগল। নুরনবী পুষ্পর দিকে তাকিয়ে রইল। সাদা পশমের মাঝে কালো ছোপ ছোপ দাগ। ঠিক যেন একটা জীবন্ত তুলোর পুতুল ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু এই ঘুম আর ভাঙবে না।
নুরনবী ফিসফিস করে বলল, &quot;পুষ্প যেখানে গেছে, সেখানে কি ও ভালো থাকবে সুমন? ওখানে কি ওকে কেউ সময়মতো খেতে দেবে? ও তো একা ঘুমাতে পারতো না। রাতে আমার গায়ের সাথে লেপ্টে না ঘুমালে ওর ঘুম আসতো না।&quot;

সুমন নুরনবীর পাশে বসে সান্ত্বনার সুরে বলল, &quot;ওখানে কোনো কষ্ট নেই নুরনবী। ওটা একটা অজানা সুন্দর শহর। সেখানে কোনো রোগ নেই, ইনজেকশনের ভয় নেই, ক্যাটফুড ফুরিয়ে যাওয়ার চিন্তা নেই। সেখানে পুষ্পদের মতোন সব ভালো ভালো আত্মারা মনের আনন্দে প্রজাপতির পেছনে ছুটে বেড়ায়। ও খুব ভালো থাকবে।&quot;

নুর বলল, &quot;ভাইয়া, পুষ্প তোকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত। তুই অফিস থেকে ফিরলে দরজার সামনে ও যেভাবে লেজ উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত, সেটা আমি কোনোদিন ভুলব না। ও তোর মন খারাপ বুঝতো। তুই যখনই বিষণ্ণ হয়ে বসে থাকতিস, ও এসে তোর কোলে মাথা রাখত। ও ছিল আমাদের এক টুকরো আনন্দ।&quot;
নুরনবী পুষ্পর কপালে একটা শেষ চুমু খেল। চোখের পানি আর ধরে রাখা গেল না। অঝোরে কেঁদে ফেলল নুরনবী। সুমন আর নুরও নিজেদের ধরে রাখতে পারল না। তিন বছরের অজস্র স্মৃতি, আনন্দ, আর ভালোবাসা এক মুহূর্তে চোখের জল হয়ে ঝরে পড়ল।

দুপুরের দিকে সুমন বলল, &quot;নুরনবী, এবার আমাদের উঠতে হবে। পুষ্পর শেষ কাজটা করতে হবে। ওকে তো আর এভাবে রাখা যাবে না।&quot;
নুরনবী মাথা নাড়ল। তারা সিদ্ধান্ত নিল বাড়ির পেছনে যে ছোট বাগানটা আছে, যেখানে একটা বড় শিউলি গাছ আছে, তার নিচেই পুষ্পকে সমাহিত করা হবে। পুষ্প শিউলি তলায় খেলতে খুব ভালোবাসত। শরৎকালে যখন ফুল ঝরে পড়ত, ও সেই ফুলগুলো নিয়ে থাবা দিয়ে খেলত।
সুমন একটা কোদাল জোগাড় করে আনল। নুরনবী পুষ্পকে তার প্রিয় নীল কম্বলটায় সুন্দর করে জড়াল। সাথে দিল ওর সেই প্রিয় প্লাস্টিকের ঘণ্টার বলটা।

বাগানের শিউলি গাছের নিচে সুমন আর নুরনবী মিলে একটা গভীর গর্ত খুঁড়ল। নুর পাশেই দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। দুপুরের শান্ত বাতাসে শিউলি গাছের পাতাগুলো কাঁপছিল, যেন ওরাও পুষ্পর বিদায়ের শোকে মূহ্যমান।

কম্বলে জড়ানো পুষ্পকে যখন গর্তে নামানো হচ্ছিল, নুরনবীর হাত দুটো কাঁপছিল। ও আলতো করে পুষ্পকে শুইয়ে দিল।
&quot;ভালো থাকিস আমার পুশতু,&quot; নুরনবী বিড়বিড় করে বলল। &quot;তোর অজানা শহরের দিনগুলো সুন্দর হোক।&quot;
ধীরে ধীরে মাটি চাপা দেওয়া হলো। ওপর দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হলো কিছু সবুজ ঘাস আর ফুল।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে ২৬ জুনের আকাশে। এতক্ষণে ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমেছে। বৃষ্টির জল ধুয়ে দিচ্ছে শিউলি তলার নতুন মাটি।

নুরনবী, নুর আর সুমন ড্রইংরুমে বসে আছে। ঘরের কোণায় পুষ্পর খাবারের বাটিটা এখনো রাখা। কিন্তু সেখানে আর কেউ এসে হুমড়ি খেয়ে পড়বে না।

সুমন বলল, &quot;আজকের দিনটা আমাদের জন্য খুব কষ্টের, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, পুষ্প আমাদের জীবনে শুধু আনন্দই দিয়ে গেছে। ও কোনোদিন আমাদের দুঃখ দিতে চায়নি। ও যতদিন ছিল, আমাদের ঘরটা হাসিতে ভরিয়ে রেখেছিল।&quot;
নুর নুরনবীর হাত ধরে বলল, &quot;হ্যাঁ ভাইয়া। পুষ্প চলে যায়নি। ও আমাদের হৃদয়ে, আমাদের গল্পে সবসময় থাকবে। যখনই আমরা শিউলি তলার দিকে তাকাব, ভাবব পুষ্প ওখানে মনের সুখে খেলা করছে।&quot;

নুরনবী জানালার বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনল। বুক থেকে একটা মস্ত বড় পাথর যেন নেমে গেল। হ্যাঁ, কষ্ট তো থাকবেই। প্রিয় কিছু হারিয়ে গেলে শূন্যতা তৈরি হয়, তবে সেই শূন্যতা জুড়ে থাকে সুন্দর কিছু স্মৃতি।

পুষ্প হয়তো আজ এমন এক অজানা শহরে চলে গেছে যেখান থেকে ফেরা যায় না, কিন্তু সেই শহরের সীমানা পেরিয়েও তার ভালোবাসা নুরনবী, নুর আর সুমনের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে। ২৬ জুনের এই বৃষ্টিভেজা রাতটি পুষ্পর চলে যাওয়ার দিন হিসেবে নয়, বরং তাদের জীবনে এক রাজকন্যার মতোন এসে আলো ছড়িয়ে যাওয়ার দিন হিসেবেই স্মৃতির পাতায় রয়ে গেল।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255749/</link>
				<pubDate>Fri, 26 Jun 2026 13:09:45 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>নুরনবীর ঘরের জানালার বাইরে আকাশটা আজ কেমন যেন ভারী হয়ে আছে। বর্ষার মেঘগুলো জমে জমে কালচে রঙ ধারণ করেছে, কিন্তু বৃষ্টি নামছে না। ঠিক যেমন নুরনবীর চোখের কোণায় জল জমে আছে, কিন্তু সেটা টুপ করে খসে পড়ছে না। বুকের ভেতরটা একটা অচেনা শূন্যতায় মুচড়ে উঠছে বারবার।</p>
<p>বিছানার এককোণে একটা ছোট নীল রঙের পশমি কম্বল ছড়ানো। ঠিক তার পাশেই পড়ে আছে একটা প্লাস্টিকে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255749"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255749/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">b7e6390c133dd9e6992a7df385c2bd2b</guid>
				<title>অসমাপ্ত ক্লাস,  উন্মুক্ত রাজপথ
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন 
ইউনিভার্সিটি অফ দ্যা পিপল 


চব্বিশের জুলাইয়ের সেই দুপুরটা আর দশটা সাধারণ অলস দুপুরের মতোই কেটে যেতে পারত। কলেজের দোতলার চার নম্বর ক্লাসরুমের পুরোনো সিলিং ফ্যানটা তার চেনা ছন্দে ক্যাঁচক্যাচ শব্দ করে ঘুরছিল। সেই শব্দের সাথে মিশে ছিল চকের খসখস আওয়াজ। ফিন্যান্সের স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে মূলধনী ব্যয়ের একটা জটিল সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত। কিন্তু আজ সেই চকের শব্দের চেয়েও তীব্র হয়ে বাজছিল বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে রাখা মোবাইল ফোনগুলোর ভাইব্রেশন ও নোটিফিকেশন টোন।

বাতাস কেমন যেন ভারী হয়ে আসছিল। ক্লাসরুমের ভেতরে পিনপতন নীরবতা, কিন্তু কারও মন আজ ব্ল্যাকবোর্ডের অঙ্কে নেই। সবার চোখ খাতার আড়ালে চলে গেছে কোলের ওপর রাখা জ্বলন্ত স্ক্রিনগুলোতে। ফেসবুকের নিউজফিডজুড়ে তখন শুধুই ধোঁয়া, টিয়ারগ্যাস আর সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দ। ঢাকার রাজপথে নিজেদের বয়সী সাধারণ শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত নিথর দেহ আর বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের সেই ছবিটা মাত্রই স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে। একে একে খবর আসছিল ক্যাম্পাসের ভেতরে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর নির্মমভাবে লাঠিসোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে একদল হেলমেটধারী।

বেঞ্চে বসে থাকা শান্ত ও মেধাবী ছেলে নুরনবী (সুমন)-এর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চশমার কাঁচটা আঙুল দিয়ে ঠিক করতে গিয়ে দেখল তার হাত কাঁপছে। এটা ভয়ের কাঁপুনি নয়, এ এক আদিম এবং তীব্র ক্ষোভ। যে বয়সে ছেলেদের ক্লাসরুমে বসে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সে তাদের রক্তে ভিজছে পিচঢালা রাজপথ।
ঠিক তখনই পেছনের বেঞ্চ থেকে তাকবির ফিসফিসিয়ে বলল, &quot;সুমন, আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকবি? ঢাকায় আমাদের ভাই-বোনদের মেরে তক্তা বানাচ্ছে। জাকিয়া আর বৃষ্টি অলরেডি লাইব্রেরির সামনে মেয়েদের জড়ো করে ফেলেছে। আমরা কি এই চার দেয়ালে বসে ফিন্যান্সের সূত্র মুখস্থ করব? আমাদের কি বিবেক বলতে কিচ্ছু নেই?&quot;

নুরনবী স্যারের দিকে তাকাল। স্যারের চোখ দুটোও আজ কেমন যেন উদাস, তিনিও ডেক্সে হাত রেখে জানালার বাইরে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি চকটা টেবিলের ওপর রেখে চশমাটা খুললেন। একটু নরম কিন্তু ভারী সুরে বললেন, &quot;বস। মন যদি ক্লাসে না থাকে, তবে জোর করে লাভ নেই। আজ আর পড়াব না।&quot; যেন স্যারও জানেন, আজ ক্লাসরুমের এই তত্ত্বীয় শিক্ষার চেয়ে বাইরের রাজপথের বাস্তব শিক্ষাটা অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।

নুরনবীর মনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব এক নিমেষে কেটে গেল। সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। হাতের কলমটা খাতার ওপর রেখে ঠাস করে ডায়েরিটা বন্ধ করল। সেই শব্দের রেশ কাটতে না কাটতেই ক্লাসের দরজায় এসে দাঁড়াল সাঈদ আর সৌরভ। কলেজের পেছনের বেঞ্চের এই ডানপিটে দুই বন্ধুর চোখেমুখে আজ কোনো দুষ্টুমি বা চপলতা নেই, আছে এক অদ্ভুত কাঠিন্য। সাঈদ দরজার পাশ থেকে নিচু স্বরে ডাকল, &quot;দোস্ত, কলেজের মূল গেটের বাইরে পুলিশ পজিশন নিচ্ছে। স্থানীয় কিছু চেনা গুন্ডাপাণ্ডাও লাঠিসোটা নিয়ে ঘুরছে। তামিম আর শাহাদাত ভাই ব্যানার নিয়ে রেডি। তুই না নামলে মিছিলের মুখ খোলা যাচ্ছে না। সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে।&quot;

পুরো ক্লাসের সবার চোখ তখন নুরনবীর দিকে। সে-ই এই ব্যাচের অলিখিত অভিভাবক। ঠিক তখনই এক কোণ থেকে সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখা, ঝামেলা এড়িয়ে চলা ছেলে সাফোয়ান হঠাৎ তার ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ধড়ফড় করে দাঁড়িয়ে গেল। তার গলাটা একটু কাঁপলেও সে স্পষ্ট গলায় বলল, &quot;যাবিই যখন, সবাই একসাথে চল। তোদের একা বিপদে ফেলে আমি এই আরামের বেঞ্চে বসে থাকতে পারব না। মরলে সবাই একসাথে মরব।&quot;

সারা ক্লাসরুমে যেন একটা বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল। একের পর এক বেঞ্চ ছেড়ে ছাত্ররা উঠে দাঁড়াতে লাগল। করিডোর ধরে যখন তারা দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল, তখন পুরো কলেজ জুড়ে এক অলিখিত সংকেত ছড়িয়ে পড়ল। ইকোনমিক্স, ইংলিশ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান সব ক্লাসরুমের দরজা একে একে খুলে যাচ্ছে। উপচে পড়া প্লাবনের মতো শিক্ষার্থীরা করিডোরে নেমে আসছে।

সিঁড়ির মুখে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল জাকিয়া, বৃষ্টি, জবা আর মিম। জাকিয়া আর বৃষ্টির হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, যাতে কাঁচা হাতে লেখা &quot;কোটা নয়, মেধা হোক মুক্তির পথ।&quot; অন্যদিকে জবা আর মিমের ব্যাগে আজ কোনো নোটবই নেই, আছে লাল-সবুজ রঙের ক্যানভাস, চক আর রং-তুলি। জবা নুরনবীর দিকে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নাড়ল, যার নীরব অর্থ ছিল &#039;আমরা মেয়েরাও পিছু হটব না, ভাইদের পাশে শেষ পর্যন্ত আছি।&#039;

প্রিন্সিপাল স্যারের রুমের সামনে কয়েকজন প্রবীণ শিক্ষক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তাদের চোখে উদ্বেগ, কিন্তু আজ আর কেউ &quot;ক্লাসে ফিরে যাও&quot; বা &quot;শৃঙ্খলা ভঙ্গ করো না&quot; বলার সাহস পেলেন না। কারণ তারা জানেন, আজ যে শৃঙ্খলা ভাঙার ডাক এসেছে, তা এক বৃহত্তর ন্যায়ের শৃঙ্খলা গড়ার জন্য।

কলেজের প্রধান ফটকটার লোহার গ্রিল গলিয়ে যখন এই একঝাঁক তরুণ উন্মুক্ত রাজপথে পা রাখল, তখন দুপুরের কড়া রোদ তাদের পিঠ পুড়িয়ে দিচ্ছিল। পিছে পড়ে রইল তাদের চেনা ক্যাম্পাস, সাজানো টেবিল-চেয়ার, পরীক্ষার রুটিন আর একটা অসমাপ্ত ক্লাস। আর সামনে দিগন্ত বিস্তৃত তপ্ত, ধূলিময় এবং অনিশ্চিত পিচঢালা পথ।

তামিম দৌড়ে এসে নুরনবীর হাতে একটা বড় ব্যানার তুলে দিল, যাতে কালো অক্ষরে লেখা &quot;বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন&quot;। তাকবির বুক ভরে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে নুরনবীর দিকে তাকাল, &quot;সুমন, মিছিলের মুখটা এবার খুলে দে!&quot;

নুরনবী আকাশের দিকে তাকিয়ে তার ডান হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে ওপরে তুলল। এতক্ষণের শান্ত, চশমা পরা নরম ছেলেটার চোখ দুটো তখন জ্বলন্ত কয়লার মতো জ্বলছে। সে শুধু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, &quot;শুরু কর তাকবির।&quot;

তাকবিরের কণ্ঠের প্রথম স্লোগানটা যেন বোমার মতো ফাটল &quot;আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে?&quot;
মুহূর্তের মধ্যে পেছনের শ-খানেক গলা এক হয়ে মফস্বল শহরের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে গর্জে উঠল। খাতার পাতা থেকে তাদের জীবন ততক্ষণে চিরদিনের জন্য স্থানান্তরিত হয়ে গেছে পিচঢালা উন্মুক্ত রাজপথে।


কলেজের মূল ফটকের লোহার গ্রিলটা পেরিয়ে যখন একঝাঁক শিক্ষার্থীর বিশাল মিছিলটা শহরের প্রধান ট্রাফিক মোড়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখন চারপাশের চেনা মফস্বল শহরটাকে একদম অচেনা লাগছিল। দুপুরের চড়া রোদে পিচঢালা রাস্তাটা থেকে কেমন যেন একটা তপ্ত ভাপ উঠছিল। রাস্তার দুপাশের দোকানপাটগুলো তখন ভয়ে আধা-বন্ধ। সাধারণ পথচারীরা ফুটপাতে থমকে দাঁড়িয়ে দেখছিল এই তরুণদের। সবার চোখেমুখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক আর বিস্ময়ের মিশ্রণ। ঢাকার বাইরে এই শান্ত, ঘুমন্ত মফস্বল শহরেও যে এমন একটা উত্তাল তরঙ্গের সৃষ্টি হতে পারে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি।

মিছিলের একেবারে সামনে ব্যানার ধরে দাঁড়িয়ে ছিল নুরনবী, তাকবির, সাঈদ আর সৌরভ। তামিম একটু পর পর পেছন থেকে এসে সবার হাতে পানির বোতল তুলে দিচ্ছিল আর লাইনের শৃঙ্খলা ঠিক রাখছিল। মিছিলের মাঝখান থেকে জাকিয়া আর বৃষ্টি মেয়েদের ফ্রন্টলাইনটা শক্ত করে ধরে রেখেছিল। তাদের পেছনে ছিল জবা আর মিম, যাদের হাতে ধরা প্ল্যাকার্ডগুলোতে আঁকা ছিল জলন্ত চোখ আর চব্বিশের জুলাইয়ের প্রতিরোধের নানা প্রতীক।
তাকবিরের বজ্রকণ্ঠ তখন মফস্বল শহরের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। সে যখনই গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠছিল, &quot;রক্তের দাগ, মুছতে দেব না!&quot;, তখন পেছনের শ-খানেক শিক্ষার্থীর সম্মিলিত কণ্ঠ গর্জে উঠছিল, &quot;লাড়াই করো, লড়তে হবে!&quot; সাফোয়ান, যে এতকাল মিছিলে চড়া গলায় স্লোগান দিতে লজ্জা পেত, আজ তাকেও দেখা গেল সবার চেয়ে জোরে গলা মেলাতে। তার ফর্সা মুখটা রোদে আর ক্ষোভে লাল হয়ে উঠেছে।

মিছিলটা যখন শহরের মূল চত্বর অর্থাৎ &#039;শহীদ মিনার মোড়&#039;-এর কাছাকাছি পৌঁছাল, তখনই দূর থেকে দেখা গেল পুলিশের একটি নীল রঙের ভ্যান আর জলকামান রাস্তা জুড়ে আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশের হাতে টিয়ারগ্যাস লাঞ্চার আর লম্বা লাঠি। শুধু পুলিশই নয়, তাদের ঠিক পেছনেই অবস্থান নিয়েছিল স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক ক্যাডার আর চেনা গুন্ডাপাণ্ডা। তাদের হাতে ছিল ক্রিকেট ব্যাট, হকিস্টিক আর লোহার রড।

মিছিলের গতি এক মুহূর্তের জন্য কিছুটা শ্লথ হয়ে এল। পেছনের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকের মধ্যেই একটা মৃদু গুঞ্জন আর ভয়ের হিমেল হাওয়া বয়ে গেল। ঠিক তখনই নুরনবী (সুমন) তার হাতের ব্যানারটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে পেছনের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, &quot;কেউ পিছু হটবে না। আমরা কোনো অন্যায় করছি না, আমরা আমাদের অধিকারের কথা বলছি। ভয় পেলেই ওরা আমাদের পিষে দেবে।&quot;

নুরনবীর এই শান্ত অভয়বাণী জাদুর মতো কাজ করল। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছনের বেঞ্চের ডানপিটে ছেলে সাঈদ আর সৌরভ মিছিলের লাইন ভেঙে একদম সামনে এসে দাঁড়াল। সৌরভ রাস্তা থেকে একটা পরিত্যক্ত কাঠের টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে বাতাসে ঘুরিয়ে চিৎকার করে বলল, &quot;ভয় পাবি না কেউ! আমরা ভাইয়েরা সামনে আছি। কার কত বড় বুক, এসে দেখাক!&quot;

ঠিক তখনই এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখল পুরো শহর। শহরের চেনা রিকশাচালক শাহাদাত ভাই, যিনি প্রতিদিন এই মোড়েই যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করেন, তিনি হুট করেই নিজের রিকশাটা টেনে এনে পুলিশের ভ্যানের ঠিক বিশ গজ সামনে আড়াআড়ি করে দাঁড় করিয়ে দিলেন। শুধু তাই নয়, আশেপাশের আরও দুই-তিনজন রিকশাচালককে ডেকে বললেন, &quot;আইসো মিয়ারা! আমাগো ছাওয়ালপাওয়ালগো বাঁচাইতে হইব।&quot; শাহাদাত ভাই নিজের রিকশা দিয়ে একটা জীবন্ত ব্যারিকেড তৈরি করে ফেললেন, যাতে পুলিশের গাড়ি বা ক্যাডাররা চট করে মিছিলের ওপর হামলা করতে না পারে। তিনি নুরনবীর দিকে তাকিয়ে গামছা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে চেঁচিয়ে বললেন, &quot;তোমরা আগাও বাজানরা! আমরা গরিব মানুষ, কিন্তু তোমাদের পিছে আছি।&quot;

পুলিশের ওপাশ থেকে তখন প্রথম টিয়ারগ্যাসের শেলটা ছোঁড়া হলো। বাতাসে একটা শিস কাটার শব্দ হলো আর পরমুহূর্তেই বিকট শব্দে মিছিলের ঠিক মাঝখানে একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি হলো। ঝাঁঝালো গ্যাসের ধোঁয়ায় চোখ-মুখ জ্বলতে শুরু করল সবার। শিক্ষার্থীরা কাশতে কাশতে এদিক-ওদিক ছুটতে লাগল। জাকিয়া আর বৃষ্টি চট করে পকেট থেকে পানির বোতল বের করে জবা আর মিমের চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে দিতে লাগল।
ক্যাডার বাহিনী এই সুযোগটাই খুঁজছিল। তারা &quot;ধর ধর&quot; চিৎকার করে লাঠিসোটা নিয়ে শাহাদাত ভাইয়ের রিকশার ব্যারিকেড ভেঙে ছাত্রদের দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। কিন্তু মফস্বলের প্রথম স্ফুলিঙ্গ যে ততক্ষণে দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করেছে, তা তারা বুঝতে পারেনি। সাঈদ আর সৌরভ ধেয়ে আসা প্রথম দলটার সামনে গিয়ে নিজেদের শরীরকে ঢাল বানিয়ে দিল। তপ্ত পিচঢালা রাজপথে প্রথম ইটের টুকরোটা এসে পড়ল।

নুরনবী তার চশমাটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরে অন্য হাতে তাকবিরকে টেনে তুলল, যে ধোঁয়ায় কাঁপছিল। দুজনে মিলে আবার ব্যানারটা উঁচিয়ে ধরল। ইন্টারনেট ততক্ষণে ধীর হতে শুরু করেছে, মোবাইলের স্ক্রিনে আর কোনো সিগন্যাল নেই। চারপাশ থেকে বাইরের দুনিয়া বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, এক অনিশ্চিত অন্ধকারের চাদর ঢাকছে পুরো দেশকে। কিন্তু এই একমুঠো তরুণ-তরুণীর পা দুটো তখন পিচঢালা রাজপথে আরও শক্ত করে চেপে বসেছে। তারা বুঝে গেছে, এই ক্লাসটা অসমাপ্তই থেকে যাবে, যতক্ষণ না রাজপথ মুক্ত হচ্ছে।



১৮ই জুলাইয়ের সন্ধ্যার পরপরই পুরো দেশটা যেন এক মস্ত বড় ব্ল্যাকহোলের ভেতর পড়ে গেল। মোবাইল স্ক্রিনের কোণায় থাকা ফোর-জি (4G) চিহ্নটা এক ঝটকায় উধাও হয়ে গেল। কোনো নোটিফিকেশন নেই, কোনো মেসেজের টুংটাং শব্দ নেই, কোনো নিউজফিড স্ক্রল করা যাচ্ছে না। সরকার ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট। মফস্বল শহরটি মুহূর্তের মধ্যে বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে এক ভূতুড়ে রূপ নিল। ঢাকা বা দেশের অন্য কোথাও কী ঘটছে, কার ওপর গুলি চলছে, কে বেঁচে আছে আর কে শহীদ হয়েছে তা জানার আর কোনো উপায় রইল না।
শহরের মোড়ে মোড়ে তখন সাঁজোয়া যান আর থমথমে সেনাবাহিনীর টহল। এক ধরনের দমবন্ধ করা নীরবতা আর আতঙ্ক গ্রাস করেছিল প্রতিটি বাড়িকে। কিন্তু এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতেও চার নম্বর ক্লাসরুমের সেই একঝাঁক তরুণের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইটা থেমে থাকেনি। ইন্টারনেট না থাকলে কী হবে, মানুষের মনকে তো আর শাটডাউন করা যায় না!

পরদিন ভোরে জাকিয়া আর বৃষ্টির মাথায় একটা নতুন বুদ্ধি এল। তারা বুঝতে পারল, এখন ডিজিটাল মাধ্যমের চেয়ে অ্যানালগ বা কাগজের চিরকুট অনেক বেশি শক্তিশালী। জাকিয়া তার পড়ার টেবিল থেকে ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে ছোট ছোট চিরকুট বানাতে শুরু করল। তাতে লেখা থাকল &quot;আজ বিকেল ৪টায় শহীদ মিনার মোড়ে জমায়েত। ইন্টারনেট বন্ধ করে আমাদের কণ্ঠ রোধ করা যাবে না। আপনার সন্তানকে রাজপথে পাঠান।&quot;

বৃষ্টি সেই চিরকুটগুলো ভাঁজ করে নিজের ওড়নার নিচে লুকিয়ে বের হলো। মফস্বলের চেনা গলিগুলোতে হেঁটে হেঁটে তারা পরিচিত বন্ধুদের বাড়ির দরজার নিচ দিয়ে, কিংবা বিশ্বস্ত রিকশাচালক শাহাদাত ভাইয়ের মাধ্যমে অন্য সাধারণ মানুষের হাতে এই চিরকুটগুলো পৌঁছে দিতে লাগল। এক অদৃশ্য তথ্যের জাল বোনা হতে থাকল পুরো শহর জুড়ে।
অন্য দিকে, আন্দোলনের এই থমথমে রাতগুলোকে ক্যানভাস বানানোর দায়িত্ব নিল জবা আর মিম। ২৩শে জুলাইয়ের মধ্যরাত। পুরো শহর তখন ঘুমে কাদা, কিংবা আতঙ্কে ঘরের বাতি নিভিয়ে বসে আছে। ঠিক তখন জবা আর মিম তাদের পিঠের ব্যাগে চকের গুঁড়ো, স্প্রে পেইন্টের ক্যান আর কয়েক রঙের প্লাস্টিক ইমালশনের কৌটো নিয়ে চুপিচুপি ঘর থেকে বের হলো। তাদের সাথে পাহারাদার ও লজিস্টিকস হিসেবে ছিল তামিম এবং সাফোয়ান। সাফোয়ান তটস্থ চোখে চারদিকের গলির মোড়ে নজর রাখছিল, যাতে পুলিশের কোনো গাড়ি এলে আগেভাগে সংকেত দেওয়া যায়।

শহরের সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিশাল সাদা দেয়ালটার সামনে এসে দাঁড়াল জবা। তার নরম তুলির হাতটা আজ আর কোনো শান্ত জলরঙের ছবি আঁকছিল না, আজ তার তুলি ছিল বারুদ। মিম টর্চের আলোটা হালকা করে দেয়ালের ওপর ফেলল, আর জবা দ্রুত হাতে বড় বড় অক্ষরে লিখতে শুরু করল &quot;বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, দেয়াল জুড়ে প্রতিরোধের স্বর।&quot;

স্প্রে পেইন্টের খসখস শব্দে রাতের নীরবতা ভাঙছিল। মিম অন্য একটি ওয়ালে লাল রঙ দিয়ে ফুটিয়ে তুলল একটি অবাধ্য মুষ্টিবদ্ধ হাত, যা শিকল ভেঙে বেরিয়ে আসছে। তামিম ফিসফিস করে বলল, &quot;জবা, একটু তাড়াতাড়ি হাত চালাও, মোড়ের ওপাশে একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা যাচ্ছে!&quot;
জবা শেষ টান দিয়ে দেয়ালে লিখে দিল &quot;রক্তের দাগ মুছতে দেব না।&quot;

পরদিন সকালে যখন মফস্বল শহরের মানুষ ঘুম থেকে উঠে বাজারের দিকে যাচ্ছিল, তখন তারা থমকে দাঁড়িয়ে গেল। যে দেয়ালগুলো এতকাল বিজ্ঞাপনে নোংরা হয়ে থাকত, সেই দেয়ালগুলো আজ কথা বলছে! লাল, কালো আর সবুজ রঙের সেই গ্রাফিতিগুলো অবরুদ্ধ শহরের মানুষের মনে এক অদ্ভুত সাহস এনে দিল। ইন্টারনেট বন্ধ করেও যে তরুণদের দমিয়ে রাখা যায়নি, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হয়ে রইল মফস্বলের সেই দেয়ালগুলো। নূরনবী (সুমন) সেই দেয়ালের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জবা আর মিমের দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসল। সে বুঝল, অসমাপ্ত ক্লাসের শিক্ষার্থীরা এখন দেয়াল লিখনের মাধ্যমে পুরো শহরের ঘুম ভাঙানোর মহাকাব্য লিখে চলেছে।



জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহের সেই বিকেলটা মফস্বল শহরের ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের মতো খোদাই হয়ে রইল। চারদিকের বাতাস যেন একদম স্থির হয়ে গিয়েছিল, কোনো গাছের পাতাও নড়ছিল না। আকাশটা মেঘলা হলেও ভ্যাপসা গরম আর গুমোট ভাবটা ক্রমশ বাড়ছিল, যেন কোনো এক বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস দিচ্ছিল।

নুরনবীর নেতৃত্বে সেদিন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিলটি যখন শহরের তিতাস মোড় পার হয়ে হাসপাতালের দিকে এগোচ্ছিল, তখন আচমকাই চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে পড়ে তারা। ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় শহরের অন্য প্রান্তের কোনো খবর তাদের কাছে ছিল না। তারা জানত না যে, মাত্র আধা ঘণ্টা আগে জেলা শহরের মূল পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স এবং হেলমেট পরা এক বিশাল ক্যাডার বাহিনীকে নামানো হয়েছে।
হঠাৎ করেই কোনো ধরনের উসকানি বা সতর্কবার্তা ছাড়াই মিছিলের পেছন থেকে প্রথম হামলাটি হলো। বিকট শব্দে একটা সাউন্ড গ্রেনেড ফাটল জাকিয়া আর বৃষ্টির ঠিক কয়েক গজ দূরে। তীব্র আলো আর কান ফাটানো শব্দে পুরো এলাকা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। জাকিয়া কানে হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল, তার চারপাশ তখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন।
&quot;সবাই একসাথে থাকো! লাইন ভাঙবে না!&quot; নুরনবী চশমাটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরে অন্য হাতে জাকিয়াকে টেনে তোলার চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করে উঠল।

কিন্তু ততক্ষণে চারদিক থেকে ইটের টুকরো আর রড নিয়ে ক্যাডাররা মিছিলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পুলিশের তরফ থেকে অবিরাম টিয়ারগ্যাস আর রাবার বুলেট ছোঁড়া হচ্ছিল। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে গেল। যে মফস্বল শহরের শান্ত রাস্তায় মানুষ প্রতিদিন বিকেলে হাঁটত, সেই রাস্তাটা মুহূর্তের মধ্যে একটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো।
ঠিক এই চরম বিপদের মুখে নিজেদের বুককে ঢাল বানিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল সাঈদ আর সৌরভ। কলেজের পেছনের বেঞ্চের এই দুই ডানপিটে ছেলে আজ অন্য এক ধাতুতে গড়া। সাঈদ রাস্তা থেকে একটা ভাঙা কাঠের তক্তা কুড়িয়ে নিয়ে ধেয়ে আসা তিন-চারজন হেলমেটধারীকে আটকে দিল। অন্যদিকে সৌরভ খালি হাতেই একটা ইটের আঘাত আড়াল করে বৃষ্টি আর মিমকে পেছনের একটা গলির ভেতর ঠেলে দিল, &quot;তোরা ভেতরে যা! মিম, বৃষ্টিকে নিয়ে পালা!&quot;

সৌরভ যখন ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার সাঈদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে যাবে, ঠিক তখনই পুলিশের ওপাশ থেকে একটা শটগানের নল সোজা তাদের দিকে তাক করা হলো। একটা তীব্র &#039;থাড&#039; শব্দ হলো। পরমুহূর্তেই দেখা গেল, সৌরভ তার ডান হাত দিয়ে নিজের বুকটা চেপে ধরে পিচঢালা রাস্তার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ছে। তার সাদা শার্টের বুকটা নিমেষের মধ্যে টকটকে লাল রক্তে ভিজে যেতে লাগল। রাবার বুলেট নয়, ওটা ছিল তাজা ছররা গুলি।

&quot;সৌরভ!&quot; সাঈদের এক বুক ফাটানো চিৎকার পুরো মফস্বল শহরের কোলাহলকে ছাপিয়ে গেল। সে লাঠিসোটার পরোয়া না করে সৌরভের রক্তাক্ত দেহটা জড়িয়ে ধরল।

এই পুরো দৃশ্যটা কয়েক গজ দূর থেকে দেখছিল সাফোয়ান। যে সাফোয়ান ক্লাসে সবসময় পেছনের কোণায় গুটিসুটি মেরে বসে থাকত, সামান্য চিল্লামিলিতে যে ভয় পেত, সৌরভের বুকের সেই তাজা রক্ত দেখে তার ভেতরের সাফোয়ানটা যেন এক সেকেন্ডে মরে গেল। আর তার জায়গায় জন্ম নিল এক চেনা-অচেনা লড়াকু তরুণ। তার চোখের সমস্ত ভয় উবে গিয়ে সেখানে জমা হলো এক অতিপ্রাকৃতিক হিংস্র ক্ষোভ।

সাফোয়ান আর পেছনে পা বাড়াল না। সে রাস্তা থেকে একটা বড় ইটের টুকরো তুলে নিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই সরাসরি ধেয়ে আসা ক্যাডারদের দিকে ছুটে গেল। তার এই আচমকা আর মরিয়া আক্রমণ দেখে আক্রমণকারীরাও এক মুহূর্তের জন্য ভড়কে গেল। সাফোয়ান চিৎকার করে বলতে লাগল, &quot;তোরা আমার ভাইকে মারলি! তোদের আমি ছাড়ব না!&quot;
সাফোয়ানের এই অবিশ্বাস্য রূপান্তর দেখে লাইনের পেছনের অন্য ছেলেদের মধ্যেও এক নতুন শক্তি চলে এল। তারা সবাই মিলে লাঠিসোটা নিয়ে উল্টো প্রতিরোধ গড়ে তুলল। এই সুযোগে তামিম আর রিকশাচালক শাহাদাত ভাই নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বুলেটের মাঝখানেই ছুটে এলেন। শাহাদাত ভাই তার রিকশায় সৌরভের নিথরপ্রায় দেহটা তুলে নিলেন। তামিম সৌরভের ক্ষতবিক্ষত বুকটা নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখল, যাতে রক্তক্ষরণ কিছুটা কমে। শাহাদাত ভাই গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে রিকশার প্যান্ডেল চেপে হাসপাতালের দিকে ছুটলেন, তার চোখ দিয়ে তখন জল গড়াচ্ছিল।

বিকেলের আলো যখন মরে আসছিল, তখন রাজপথের ধুলো আর ধোঁয়া কিছুটা শান্ত হলো। কিন্তু তপ্ত পিচঢালা রাস্তার ওপর লেপ্টে রইল সৌরভের বুকের তাজা রক্ত। নুরনবী সেই রক্তের দাগের দিকে তাকিয়ে হাত মুঠো করল। তার চার নম্বর ক্লাসরুমের সেই চঞ্চল বন্ধুটা আজ হাসপাতালের আইসিইউতে জীবনের শেষ লড়াই লড়ছে। সাফোয়ান ক্লান্ত হয়ে রাস্তার একপাশে বসে কাঁপছিল, তার শার্টেও সৌরভের রক্তের ছিটে লেগে আছে।

অসমাপ্ত ক্লাসের খাতাগুলো তখন হয়তো কলেজের ডেস্কে ধুলো খাচ্ছিল, কিন্তু এই তরুণরা বুঝে গিয়েছিল এখন আর ক্লাসে ফেরার কোনো পথ খোলা নেই। এই রক্তের হিসেব না চুকিয়ে তারা আর ঘরে ফিরবে না। রাজপথই এখন তাদের একমাত্র পরিচয়, একমাত্র ঠিকানা।


৪ঠা আগস্টের সারারাত মফস্বল শহরের কোনো বাড়িতে আলো জ্বলেনি, কিন্তু কেউ ঘুমাতেও পারেনি। হাসপাতালের সাদা বেডে তখন সৌরভ অবচেতন অবস্থায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিল, আর বাইরে তার বন্ধুরা নুরনবী, তাকবির, সাফোয়ান চোখে এক ফোঁটা ঘুম ছাড়াই পার করে দিয়েছিল অন্তহীন এক রাত। সবার মনে একটাই প্রশ্ন ছিল, কাল কী হবে?
অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক ৫ই আগস্টের সকাল।
সকাল থেকেই মফস্বলের আকাশটা অন্যদিনের চেয়ে আলাদা লাগছিল। বাতাস কেমন যেন হালকা, মেঘের ফাঁক গলে বের হওয়া রোদটা তীব্র কিন্তু স্নিগ্ধ। সকাল ১০টা বাজতেই মফস্বলের অলিতে-গলিতে মানুষের ঢল নামতে শুরু করল। এত চেনা মানুষ, এত চেনা মুখ, অথচ আজ সবাইকে কেমন যেন নতুন লাগছিল।

নুরনবী আর তাকবির যখন হাসপাতালের গেট দিয়ে বাইরে বের হলো, তখন দেখল জাকিয়া, বৃষ্টি, জবা আর মিম অলরেডি সেখানে দাঁড়িয়ে। তাদের পেছনে প্রায় হাজার খানেক সাধারণ মানুষ। সেখানে শুধু শিক্ষার্থীরা ছিল না; ছিল সাধারণ অভিভাবক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আর রিকশাচালক শাহাদাত ভাইয়ের মতো অজস্র শ্রমজীবী মানুষ। শাহাদাত ভাই তার রিকশার হ্যান্ডেলে একটা লাল-সবুজ পতাকা বেঁধে মিছিলে সবার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তাকবির যখন তার জীবনের সবচেয়ে লম্বা শ্বাসটি নিয়ে শেষবারের মতো স্লোগান ধরল &quot;স্বৈরাচারের গদিতে, আগুন জ্বালো এক সাথে!&quot; তখন পেছনের হাজারো মানুষের কণ্ঠস্বর সুনামীর মতো আছড়ে পড়ল মফস্বলের রাজপথে।

দুপুর ২টার দিকে আচমকাই খবরটা এল। শহরের একজন বড় ব্যবসায়ী তার দোকান থেকে একটা পুরোনো রেডিও নিয়ে রাস্তায় ছুটে এলেন, &quot;বাবাজিরা! তোমরা জিতে গেছ! হাসিনা পালাইছে! দেশ স্বাধীন হইছে!&quot;

এক মুহূর্তের জন্য পুরো জনসমুদ্র স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার পরের মুহূর্তেই পুরো মফস্বল শহর এক অভূতপূর্ব উল্লাসে ফেটে পড়ল। মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। জাকিয়া আর বৃষ্টি একে অপরের হাত ধরে খুশিতে লাফিয়ে উঠছিল, আর জবা ও মিম তাদের রঙের কৌটো থেকে লাল-সবুজ আবির আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছিল। এতদিনের ভয়, এতদিনের অবরুদ্ধ দমবন্ধ করা কষ্ট এক নিমেষে বাতাসে মিলিয়ে গেল।

সাফোয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। সে দৌড়ে গিয়ে নুরনবীকে জড়িয়ে ধরল, &quot;সুমন, আমরা পেরেছি রে! আমাদের সৌরভের রক্ত বৃথা যায়নি!&quot;

বিকেলের দিকে যখন চারপাশের উল্লাস একটু শান্ত হয়ে এল, তখন নুরনবী তার বন্ধুদের দিকে তাকাল। কোনো কথা না বলেই তারা সবাই এক সাথে পা বাড়াল তাদের সেই পুরোনো চেনা কলেজের দিকে।
কলেজের লোহার গেটটা আজ খোলাই ছিল। 

করিডোর দিয়ে হেঁটে যখন তারা দোতলার চার নম্বর ক্লাসরুমের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন চারদিক একদম নিস্তব্ধ। ক্লাসরুমের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তারা দেখল—ঠিক চব্বিশের জুলাইয়ের সেই দুপুরের মতোই সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাচ শব্দ করে ঘুরছে। ব্ল্যাকবোর্ডে স্যারের হাতের সেই ফিন্যান্সের সমীকরণটা চকের আবছা দাগে এখনো রয়ে গেছে।
নুরনবী ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে তার নিজের চেনা বেঞ্চিটায় বসল। ডেস্কের ওপর হাত রাখতেই তার চোখ আটকে গেল কোণায় পড়ে থাকা একটা ডায়েরির দিকে। ঠিক চব্বিশের জুলাইয়ের দুপুরে যেভাবে খাতাটা অর্ধেক খোলা অবস্থায় ফেলে সে রাজপথে নেমে গিয়েছিল, খাতাটা আজো ঠিক সেভাবেই পড়ে আছে। বাতাসে তার সাদা পাতাগুলো ওড়ছিল।

নুরনবী ডায়েরিটা হাতে তুলে নিল। তার পাশে এসে দাঁড়াল তাকবির, জাকিয়া, বৃষ্টি, সাফোয়ান, জবা আর মিম। জবা তার পকেট থেকে একটা কলম বের করে নুরনবীর হাতে দিল।

নুরনবী খাতার সেই অসমাপ্ত পাতাটার দিকে তাকাল। জুলাইয়ের সেই দুপুরে যেখানে ফিন্যান্সের ক্লাসের খাতা বন্ধ হয়েছিল, আজ ৫ই আগস্টের এই নতুন আলোয় সে সেখানে একটি নতুন লাইন লিখল—

&quot;ক্লাসটি হয়তো আজ থেকে আবার শুরু হবে, ব্ল্যাকবোর্ডে আবার মিলবে ফিন্যান্সের জটিল অংক। কিন্তু আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় এবং শ্রেষ্ঠ পরীক্ষাটা আমরা দিয়ে এসেছি বাইরের ওই উন্মুক্ত রাজপথে। চব্বিশের জুলাইয়ের রক্ত দিয়ে আমরা যে নতুন খাতাটা খুলেছি, সেখানে আর কোনো বৈষম্যের ইতিহাস লেখা হবে না।&quot;

নুরনবী খাতাটা বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকাল। মফস্বল শহরের আকাশে তখন এক স্বাধীন, রক্তিম সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আর হাসপাতালের বেড থেকে ফোনে তামিমের মেসেজ এল—সৌরভের জ্ঞান ফিরেছে, সে জিজাঙ্কু হাসিমুখে বন্ধুদের খুঁজছে। বন্ধুদের সবার চোখে তখন বিজয়ের অশ্রু, আর মুখে এক নতুন ভোরের তৃপ্তি।



বিজয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোর পর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে আরও দুটো মাস খসে গেছে। মফস্বল শহরের আকাশে এখন আর চব্বিশের জুলাইয়ের সেই ভ্যাপসা গরম নেই; বাতাসে এখন শরতের হিমেল ছোঁয়া, কাশবনের দোলা আর এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। শহরের তিতাস মোড় কিংবা শহীদ মিনার চত্বরে এখন আর টিয়ারগ্যাসের ঝাঁঝালো গন্ধ পাওয়া যায় না, বাতাসে মিশে থাকে নতুন স্বাধীন দেশের শিউলি ফুলের সুবাস।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/255053/</link>
				<pubDate>Sun, 21 Jun 2026 10:03:59 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অসমাপ্ত ক্লাস,  উন্মুক্ত রাজপথ<br />
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন<br />
ইউনিভার্সিটি অফ দ্যা পিপল </p>
<p>চব্বিশের জুলাইয়ের সেই দুপুরটা আর দশটা সাধারণ অলস দুপুরের মতোই কেটে যেতে পারত। কলেজের দোতলার চার নম্বর ক্লাসরুমের পুরোনো সিলিং ফ্যানটা তার চেনা ছন্দে ক্যাঁচক্যাচ শব্দ করে ঘুরছিল। সেই শব্দের সাথে মিশে ছিল চকের খসখস আওয়াজ। ফিন্যান্সের স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে মূলধনী ব&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-255053"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/255053/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">5bde04217cf204402cdf67dbfe539595</guid>
				<title>“নীল বাতাসের গন্ধ”

অন্ধকারকে ছোঁবার সাহস শুধু স্মৃতিদেরই থাকে। তারা ফিসফিস করে, কখনও তীব্র চিৎকারে জানান দেয় তাদের উপস্থিতি, ঠিক যেন এই মধ্যরাতের মতো। বৃষ্টি জানত, এই রাত তার জন্য নয়। এই রাতের তারারা সাইদের নয়, কিংবা এই শহরের নয়। এই রাতটা একান্তই তার পুরোনো, জং-ধরা অতীতের।

আজকাল বড্ড বেশি স্মৃতি এসে ভিড় করে। বৃষ্টি সাইদের ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল, চোখের সামনে ঝলসে উঠছিল শহরের নিয়ন আলো। আর নাকে আসছিল সেই চেনা, পুরোনো গন্ধটা নীল বাতাসের গন্ধ। সে গন্ধ কোনো পারফিউমের নয়, কোনো ফুলেরও নয়; সে গন্ধ ছিল ভেজা ইউক্যালিপটাস পাতা, লবণাক্ত বাতাস আর পুরোনো লাইব্রেরির স্যাঁতসেঁতে কাগজের। সে গন্ধ ছিল, এক কথায়, সৌরভের।
“কী ভাবছ এত?”

সাইদের কণ্ঠস্বর। ভারী, উষ্ণ, অত্যন্ত বাস্তব। বৃষ্টি চমকে পেছনে তাকাল। সাইদ তার দিকেই তাকিয়ে ছিল, হাতে কফির মগ। তার চোখে দুশ্চিন্তার হালকা ছায়া। এই দুশ্চিন্তা বৃষ্টির চেনা। গত পাঁচ বছরে সে বহুবার দেখেছে সাইদকে তার অতীত থেকে টেনে আনতে!

বৃষ্টি হাসার চেষ্টা করল, “কিছু না। পুরনো একটা কথা মনে পড়ছিল।”
“নীল বাতাস?” সাইদ হাসল। “তোমার আর সৌরভের সেই পাগলামি?”

বৃষ্টির হৃৎপিণ্ড হঠাৎ এক তীব্র দহনে কেঁপে উঠল। সাইদ কীভাবে এত সহজে উচ্চারণ করে সেই নাম, সেই স্মৃতি, যা তার নিজের কাছে আজও এক নিষিদ্ধ ফল?
নীল বাতাস— এই নামটা তারা রেখেছিল একটি বিশেষ দিনের, একটি বিশেষ মুহূর্তের। সেবার তারা তিন জন— বৃষ্টি, সৌরভ, আর সাইদ— গিয়েছিল দীঘা থেকে কিছুটা দূরে এক পরিত্যক্ত, পুরোনো বাংলোয়। বাংলোর চারপাশে কেবল ঝাউবন আর সমুদ্রের গর্জন। বাংলোর বারান্দার মেঝে ছিল হালকা নীল রঙের। সৌরভ বিশ্বাস করত, সেই নীল মেঝেতে পা রাখলে যে বাতাস আসে, তার একটা আলাদা গন্ধ থাকে, যা কেবল স্বপ্ন দেখতে শেখায়।

“ওটা পাগলামি ছিল না, সাইদ,” বৃষ্টির গলায় সামান্য রুক্ষতা। “ওটা ছিল আমাদের সত্যি।”
“কিন্তু সে সত্যিটা তো আর নেই, বৃষ্টি।” সাইদের চোখ সরাসরি তার চোখে। “সৌরভ নেই। সৌরভ চলে গেছে।”

হ্যাঁ, সৌরভ নেই। এই বাক্যটাই হলো বর্তমান আর অতীতের মাঝের সেই ধারালো কাঁটাতার, যার দু’দিকেই রক্ত ঝরে।
তখন তাদের বয়স উনিশ-কুড়ি। জীবনের সবথেকে সুন্দর, সবথেকে অনিশ্চিত সময়। সৌরভ ছিল প্রকৃতির মতোই অপ্রতিরোধ্য। তার মধ্যে ছিল এক শিল্পীসত্তা, যে তার সব অনুভূতিকে তীব্র রঙে প্রকাশ করতে চাইত। আর সাইদ? সাইদ ছিল তাদের নোঙর। শান্ত, যুক্তিবাদী, সৌরভের ঝোড়ো আবেগকে সামলানোর একমাত্র মানুষ। আর বৃষ্টি ছিল সেই কেন্দ্র, যার দু’দিকে বাঁধা ছিল এই দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরু।

সেবার বাংলোয় গিয়ে প্রথম দিনই সৌরভ বলেছিল, “বৃষ্টি, দেখ! এই বাতাস নীল। এতে ভেজা স্বপ্নের গন্ধ আছে।”
বৃষ্টি হেসেছিল। সৌরভের চোখে ছিল এক তীব্র নেশা। সে নেশা ছিল জীবনকে সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করার। সাইদ তখন তাদের জন্য মাছ ভাজছিল, কিন্তু তার চোখে ছিল এক সূক্ষ্ম ঈর্ষা, যা বৃষ্টি সে সময় বুঝতে পারেনি।

সেই রাতে, বাংলোর পুরোনো, ভাঙা ছাদে বসেছিল তিন জন। পূর্ণিমা ছিল না, তবুও আকাশ ছিল তারার আলোয় ঝলমলে। সৌরভ একটি পুরোনো ডায়েরি বের করে বলেছিল, “শোন, আমি একটা গল্প লিখেছি। নাম  ‘নীল বাতাসের গন্ধ’।”
বৃষ্টি মুগ্ধ হয়ে শুনেছিল। গল্পটা ছিল এমন এক মেয়ের, যে তার সবথেকে প্রিয় বন্ধুকে ভুল বোঝে, আর সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে তার স্মৃতিতে নিজেকে আটকে ফেলে।

সাইদ সেদিন গল্পটা শুনেছিল চুপ করে। পরে, যখন সৌরভ ছাদে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সাইদ বৃষ্টির কাছে এসে বলেছিল, “বৃষ্টি, সৌরভ তোমায় ভালোবাসে।”
বৃষ্টির বুক কেঁপে উঠেছিল। “আর তুমি?”
সাইদ সমুদ্রের দিকে তাকিয়েছিল। তার মুখ ছিল অন্ধকারে ঢাকা। “আমি ভালোবাসার অধিকার চাই না। আমি শুধু চাই, তুমি খুশি থাকো।”

সেই উত্তরটা বৃষ্টিকে আজও তাড়া করে। সাইদ কখনও নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করেনি, কিন্তু তার প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল বৃষ্টির প্রতি গভীর অনুরাগের প্রমাণ। অথচ বৃষ্টি তখন অন্ধ ছিল সৌরভের প্রতি। সৌরভের তীব্রতা, সৌরভের উন্মাদনা তাকে এক ভিন্ন জগতের হাতছানি দিত।

বৃষ্টি জানে, সৌরভের চলে যাওয়াটা ছিল এক দুর্ঘটনা। সমুদ্রের ধারে ঝাউবনের পথ ধরে ফিরছিল ওরা। বৃষ্টি সাইদের বাইকের পেছনে, সৌরভ হাঁটছিল কিছুটা দূরে, আপন মনে গুনগুন করতে করতে। হঠাৎ সেই কালো রাত, সেই ট্রাক, আর সৌরভের সেই শেষ চিৎকার— সবটাই এক বিভীষিকা।
কিন্তু গত কিছুদিন ধরে বৃষ্টি এক অদ্ভুত স্মৃতিতে আক্রান্ত। সে স্মৃতি দুর্ঘটনার নয়, বরং তার কিছু আগের। বাংলোর সেই নীল মেঝেতে তারা শেষবারের মতো যখন একসঙ্গে ছিল, তখন সৌরভ তাকে একটি কথা বলেছিল।

সৌরভ বলেছিল, “বৃষ্টি, আমার চলে যাওয়ার পর যদি তুমি কখনও খুব একা হয়ে যাও, সাইদকে বলবা, আমি তাকে ক্ষমা করে গেছি।”

ক্ষমা? কেন? সাইদ কী করেছিল?
বৃষ্টি কখনও এই কথা কাউকে বলতে পারেনি, সাইদকেও না। কারণ সে জানে, সাইদ নিজেকে সৌরভের মৃত্যুর জন্য দায়ী করে। সেই রাতে সাইদই বাইক চালাচ্ছিল, এবং সে-ই সৌরভকে জোর করে হাঁটতে পাঠিয়েছিল— এইটুকু সত্যি। কিন্তু &#039;ক্ষমা করে গেছি&#039;— এই বাক্যটির পেছনের গভীর অর্থ কী?

“বৃষ্টি,” সাইদের হাতে আলতো স্পর্শ। “ঠান্ডা লাগছে। ভেতরে এসো।”
বৃষ্টি ঘুরে দাঁড়াল। আজ তার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।
“সাইদ, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
সাইদ কফি মগটা বারান্দার রেলিং-এ রাখল। “করো।”

“সৌরভের চলে যাওয়ার ঠিক আগে… বাংলোতে, কী হয়েছিল আমাদের তিন জনের মধ্যে? এমন কোনো কথা… যা আমি ভুলে গেছি?

সাইদের চোখে এক পলকের জন্য গাঢ় কালো মেঘ জমে উঠল। তারপর সেই মেঘ দ্রুত সরে গেল। সে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।

“তুমি কেন এত বছর পর এসব জিজ্ঞেস করছ, বৃষ্টি? সব তো স্পষ্ট ছিল। আমরা মজা করছিলাম। আর... তারপর সেই দুর্ঘটনা।”
“না, সাইদ,” বৃষ্টি মাথা ঝাঁকাল। “আমার মনে আছে, সৌরভ সেদিন খুব উত্তেজিত ছিল। সে একটা গোপন কথা বলেছিল… যা আমাদের জীবনে একটা বড় পরিবর্তন আনতে পারত। কী ছিল সেই গোপন কথা?”
বৃষ্টির মনে হলো, এই নীল বাতাসের গন্ধ, যা এতদিন সৌরভের স্মৃতি বহন করত, আজ তাতে কেমন যেন একটা ভয়ের, একটা চাপা মিথ্যার গন্ধ মিশে আছে। আর সেই মিথ্যাটা লুকিয়ে আছে সাইদের এই শান্ত, স্থির চোখের গভীরে। সাইদ সব জানে। কিন্তু সে কেন বলছে না? সৌরভের সেই অদ্ভুত স্মৃতি, যা বর্তমানকে গ্রাস করতে চাইছে  তার জন্ম কি সাইদের কোনো গোপন সত্য থেকে?
“বৃষ্টি, আমি তোমাকে ভালোবাসি,” সাইদ হঠাৎ বলল। পুরোনো দিনের মতো ভালোবাসা নয়, এই ভালোবাসাটা এখনকার। এই ভালোবাসায় অধিকারবোধ আছে, কর্তৃত্ব আছে। “কিন্তু আমি সৌরভ নই। আমি তোমার কল্পনা নই। তুমি অতীতটাকে এত আঁকড়ে ধরে কেন থাকতে চাও?”

বৃষ্টি এক পা পেছিয়ে গেল। তার মনে হলো, সৌরভের সেই ডায়েরির গল্পটা কেবলই এক মেয়ের গল্প ছিল না। সেটা ছিল তাদের তিন জনেরই গল্প— বন্ধুকে ভুল বোঝার গল্প, আর সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্তের গল্প। আর সেই প্রায়শ্চিত্তের শেষ অধ্যায়টা লেখা হয়নি...


সাইদ ঘরে ফেরা অবধি বৃষ্টি অপেক্ষা করল না। তার মনে ঝড় বইছিল। সাইদের চোখে সেই এক পলকের মেঘ— বৃষ্টি এখন নিশ্চিত, ওটা দুশ্চিন্তা ছিল না, ছিল লুকানো কোনো সত্যের ভয়। সৌরভের শেষ কথা, &quot;আমি তাকে ক্ষমা করে গেছি,&quot; এই বাক্যটি এখন কেবল স্মৃতি নয়, এটি একটি নির্দেশক, যা সাইদের বর্তমান জীবনের স্থিতাবস্থা ভাঙতে চাইছে।

বৃষ্টি দ্রুত সাইদের শোবার ঘরে ঢুকল। ঘরটি পরিপাটি, নিরাভরণ। সাইদের জীবনে কোনো বাহুল্য নেই। সবকিছুই গুছানো, যেমন তার জীবন। কিন্তু বৃষ্টি জানে, এই গুছানো জীবনের আড়ালেই লুকিয়ে আছে বিশৃঙ্খল এক সত্য। সৌরভের কিছু জিনিস সাইদের কাছে থাকার কথা। বই, স্কেচবুক, হয়তো সেই পুরোনো ডায়েরিটা।

আলমারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে তার হাত গেল সাইদের ড্রয়ারের গভীরে। সেখানে কাপড়-চোপড়ের নিচে সে পেল একটি ছোট চামড়ার বাক্স। হাত কাঁপছিল বৃষ্টির। এটা সাইদের ব্যক্তিগত জায়গা, তার অনুমতি ছাড়া ঘাঁটা অন্যায়। কিন্তু তার কাছে এখন সাইদের বর্তমানের চেয়ে সৌরভের অতীতের গোপন কথা জানা বেশি জরুরি।

চামড়ার বাক্সটা খুলতেই নাকে এল আরও তীব্রভাবে সেই গন্ধ  পুরোনো কাগজ আর ভেজা তামাকের। ভেতরে ছিল কিছু চিঠি, সৌরভের আঁকা কয়েকটি স্কেচ এবং একদম নিচে ভাঁজ করা একটি কাগজ।

বৃষ্টি স্কেচগুলোতে চোখ বোলাল। সবকটিতেই কেবল একটাই মুখ  তার নিজের। সৌরভের তুলিতে সে ছিল জীবন্ত, কখনও উচ্ছল, কখনও গভীর। সে বুঝতে পারছিল, সৌরভ তাকে কতটা ভালোবাসত, যা সাইদের ভালোবাসার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা, আরও বেশি উন্মত্ত।

ভাঁজ করা কাগজটা খুলল বৃষ্টি। এটা ছিল একটা চিঠি, কিন্তু এর শেষে কোনো নাম ছিল না। হাতের লেখা সৌরভেরই:
...বৃষ্টিকে আমি সত্যিটা জানাতে পারলাম না। ওকে হাসতে দেখতে আমার খুব ভালো লাগে, তাই মিথ্যাটা থাকুক। জানি, তুই আমাকে সাহায্য করতে চাস, কিন্তু এভাবে বিক্রি হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়, সাইদ। আমি চলে যাচ্ছি। দূরে, অনেক দূরে। তুই নিজের মতো বাঁচ, আর পারলে নিজের স্বপ্নগুলো পূরণ করিস। আমার যা আছে, তাতেই আমি খুশি। শুধু একটাই অনুরোধ  যদি কখনও আমি ফিরতে না পারি, তুই বৃষ্টিকে দেখে রাখিস। তুই তাকে ভালোবাসিস, এটা আমি জানি। আর হ্যাঁ, বন্ধু  আমি তোকে ক্ষমা করে গেলাম। এটা তোর জন্য আমার শেষ উপহার...

চিঠিটা পড়ে বৃষ্টির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। এ কোন সত্য? কিসের ক্ষমা? কিসের ‘বিক্রি হওয়া’? এই চিঠি তো সৌরভের মৃত্যুর ইঙ্গিত দিচ্ছে না, বরং দূরে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বৃষ্টির মনে হলো, এই তথাকথিত দুর্ঘটনা হয়তো দুর্ঘটনা ছিল না, ছিল সৌরভের পালিয়ে যাওয়াকে ধামাচাপা দেওয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টা, যা হয়তো সাইদ করেছিল, অথবা অন্য কেউ। কিন্তু কেন?

বৃষ্টি চোখ বন্ধ করল। সেই রাতের দৃশ্যটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল, যেন একটি পুরোনো ছবির রিল। বাংলোর শেষ রাত। ঝাউবনের শনশন শব্দ। 

বৃষ্টি, সৌরভ আর সাইদ বসেছিল বাংলোর নীল মেঝেতে। সৌরভ সেদিন ছিল অস্বাভাবিক শান্ত। সে সাধারণত হাসি-ঠাট্টায় ঘর মাতিয়ে রাখত, কিন্তু সেদিন সে কেবল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল।

“আমি যাচ্ছি, বৃষ্টি,” সৌরভ হঠাৎ বলেছিল।
বৃষ্টি অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল, “কোথায় যাচ্ছিস?”

“দূর, অনেক দূরে। যেখানে আকাশটা আরও বেশি নীল। আমি আর এখানে থাকতে পারছি না। আমি দম বন্ধ হয়ে আসছি।”
সাইদ ঘরে ছিল না, সে তখন বাইরে লনে কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছিল।

সৌরভ ঝুঁকে এসে বৃষ্টির কানে ফিসফিস করে বলেছিল, “শোনো, আমার একটা স্বপ্ন ছিল। প্যারিসে গিয়ে আর্ট স্কুল থেকে ডিগ্রি নেব। তার জন্য টাকা দরকার ছিল। সাইদ আমার হয়ে একজনের কাছে সাহায্য চেয়েছিল  যার আর্ট গ্যালারি আছে। কিন্তু লোকটা… সে আমার কাজ কিনে নেবে, বিনিময়ে আমাকে তার ব্যক্তিগত কর্মচারীর মতো কাজ করতে হবে। সাইদ রাজি হয়ে গিয়েছিল আমার অজান্তে।”

বৃষ্টি চমকে উঠেছিল। “সাইদ কেন এমন করবে?”
“সে আমাকে সাহায্য করতে চেয়েছিল,” সৌরভের গলায় ছিল হতাশা, রাগ নয়। “কিন্তু আমি এই শর্ত মানতে পারিনি। আমি আর ওর মুখ দেখতে চাই না, বৃষ্টি। আমি নিজের যোগ্যতায় কিছু করব। তাই এই রাতেই আমি চলে যাব, কাউকে না বলে।”

বৃষ্টির মনে পড়ে গেল, সে রাতটা ছিল ঝগড়ার রাত। সৌরভ চলে যেতে চেয়েছিল, আর বৃষ্টি তাকে আটকাতে চেয়েছিল। সে সাইদকে ডাকতে গিয়েছিল।
“সাইদ! সাইদ! দেখ, সৌরভ কী বলছে!”
সাইদ দ্রুত ঘরে এসেছিল। তার চোখে ছিল এক গভীর ক্ষত।

“সৌরভ, তোর যা লাগবে আমি দেব, কিন্তু এভাবে আমাকে অপমান করিস না।”
“অপমান? তুই আমার স্বপ্ন বেচে দিচ্ছিলি, সাইদ!” সৌরভের কণ্ঠস্বর কাঁপছিল। “আমি এই মিথ্যা জীবন চাই না। আমি আজই যাব। আর তুই, বৃষ্টি— তুই বরং সাইদের সাথে থাক। ও তোর যত্ন নিতে পারবে। আমি পারতাম না। আমি তো কেবল স্বপ্ন দেখতে জানি।”

সেটাই ছিল তাদের শেষ কথা। সেই রাতের শেষে সৌরভ বাংলোর পেছন দিক দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টি আর সাইদ ঝগড়া করছিল, ভাবছিল সৌরভ হয়তো রাগ কমে ফিরে আসবে।
এরপর সকালে, যখন তারা সৌরভকে খুঁজতে বেরিয়েছিল, তখনই খবর আসে— ঝাউবনের পথে একটি ট্রাক ধাক্কা মেরেছে এক যুবককে। তার পরিচয়পত্র দেখে সাইদ আর বৃষ্টি ছুটে গিয়েছিল হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে তারা দেখে, সৌরভের লাশ।
কিন্তু এখন বৃষ্টির মনে প্রশ্ন জাগছে  ওই লাশটা কি সত্যিই সৌরভের ছিল?

চিঠিটা হাতে নিয়ে বৃষ্টি অনুভব করল, তার স্মৃতিতে কোথাও একটা বড়সড় ফাঁক ছিল। সাইদ কি তাকে বলেছিল যে সৌরভ ফিরে আসতে গিয়ে মারা গেছে? নাকি সে ধরে নিয়েছিল যে সৌরভ ফিরে আসতে গিয়েই মারা গেছে?

যদি সৌরভ পালিয়ে গিয়ে থাকে, তবে কে মারা গিয়েছিল সেই রাতে? আর কেন সাইদ এবং তার পরিবার ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়েছিল?

বৃষ্টি দ্রুত স্কচের নিচে রাখা পুরোনো খবরের কাগজের কাটিংগুলো বের করল। পাঁচ বছর আগের খবর। শিরোনাম: ‘অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের অস্বাভাবিক মৃত্যু: পরিচয় জানতে চেষ্টা চলছে।’ এর নিচে ছোট্ট করে লেখা: ‘পরে বন্ধুর মাধ্যমে শনাক্ত।’

অজ্ঞাতপরিচয়? তাহলে হাসপাতালে গিয়ে সাইদ কী বলেছিল?
হঠাৎ দরজায় চাবির শব্দ হলো। সাইদ ফিরে এসেছে। বৃষ্টি দ্রুত হাতে চিঠি আর কাটিংগুলো বাক্সে ভরে, বাক্সটি ড্রয়ারে রেখে দিল।

সাইদ ঘরে ঢুকল, তার চোখে প্রশান্তির ছাপ। “কী খুঁজছিলে?”
“কফি কাপটা,” বৃষ্টি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। “কোথায় রেখেছ মনে পড়ছে না।”
সাইদ হাসল। “সেটা বারান্দায়, রেলিং-এ আছে।”

বৃষ্টি আলতো করে হাসল। “ওহ হ্যাঁ, ভুলে গিয়েছিলাম।”
কিন্তু সাইদ তার চোখে চোখ রাখল। “তুমি কিছু লুকোচ্ছ, বৃষ্টি। তোমার শরীর কাঁপছে কেন? তুমি কি ড্রয়ার খুলেছিলে?”
বৃষ্টির মনে হলো, আর মিথ্যা বলার প্রয়োজন নেই। এই সম্পর্কটা একটা মিথ্যার ওপরেই দাঁড়িয়েছিল।

“সৌরভ চলে যেতে চেয়েছিল, সাইদ,” বৃষ্টি শান্ত গলায় বলল। “সে মারা যায়নি। সে পালিয়ে গিয়েছিল। সে তোমার কাছে একটা চিঠি লিখেছিল। ক্ষমা চেয়েছিল, তাই না? কিসের ক্ষমা? তুমি ওকে আর তার স্বপ্নকে বিক্রি করে দিয়েছিলে, সাইদ।”

সাইদের মুখটা পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেল। তার চোখে সেই পুরোনো ভয়টা ফিরে এল।
“কে বলেছে তোমাকে এসব?” সাইদের কণ্ঠস্বর চাপা, বিপজ্জনক।
“নীল বাতাস আমাকে বলেছে,” বৃষ্টি ফিসফিস করল। “সেদিন রাতে কে মারা গিয়েছিল, সাইদ? সৌরভ যদি চলে গিয়ে থাকে, তবে কে ওই দুর্ঘটনায় মারা গেল? তুমি কেন আমাদের জীবনের এত বড় একটা সত্যি গোপন করলে?”

সাইদ এক পা এগিয়ে এল। “আমি তোমাকে রক্ষা করছিলাম, বৃষ্টি। সৌরভ ছিল একটা আগুনের ফুলকি। সে তোমাকে কেবল জ্বালাতেই পারত। আমি তোমাকে স্থিতিশীলতা দিয়েছি।”

“স্থিরতা? না, সাইদ,” বৃষ্টি মাথা ঝাঁকাল। “তুমি আমাকে একটা মিথ্যার কবরের ওপর বাঁচতে শিখিয়েছিলে। নীল বাতাস— ওটা সৌরভের স্বপ্ন ছিল, যা তুমি গলা টিপে মেরে ফেলেছিলে। আর সেই মৃত্যুর দায় তুমি নিজের ঘাড়ে না নিয়ে, একটা দুর্ঘটনা সাজিয়ে সৌরভকেই চিরতরে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলে।”

বৃষ্টির মনে পড়ল, সেদিন হাসপাতালে সাইদ কেন বারবার তাকে বাইরে থাকতে বলেছিল। কেন সে একাই লাশ শনাক্ত করেছিল। হয়তো সে সত্যিটা জানত।
সাইদ বুঝতে পারল, সব শেষ। তার সাজানো সংসার ভেঙে গেছে।

“বৃষ্টি, আমি তোমাকে ভালোবাসতাম। সৌরভের চেয়েও বেশি। আর সে চলে যাচ্ছিল। আমার জীবনের একমাত্র অবলম্বনকে সে এক নিমিষেই ছেড়ে যাচ্ছিল। আমি সহ্য করতে পারিনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম— তুমি যাতে আর তার ফিরে আসার আশায় না থাকো। তাই… আমি বলেছিলাম যে সে মারা গেছে।”
বৃষ্টির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। এই পাঁচ বছরের প্রতিটি হাসি, প্রতিটি প্রেম, প্রতিটি বিশ্বাস আজ অর্থহীন মনে হলো।
“আর যে মারা গিয়েছিল?”

সাইদ এবার চোখ নামাল। “ওটা ছিল একজন গরিব মানুষ। তার পরিচয় কেউ জানত না। আমি খবরটা চাপা দিতে পেরেছিলাম।”
সাইদ হয়তো সত্যিটা বলছে। কিন্তু বৃষ্টির মন অন্য কিছুতে আটকে আছে। সৌরভের সেই ডায়েরি! সেটার মধ্যে কি আরও কিছু আছে?
বৃষ্টি দ্রুত ঘুরে ড্রয়ারের দিকে গেল। চামড়ার বাক্সটা তুলে সে ভেতরে হাত দিল। চিঠি, স্কেচ সব আছে। কিন্তু একটা জিনিস নেই।
সৌরভের হাতে লেখা সেই ডায়েরিটা নেই।
সাইদ তাকে লক্ষ্য করছিল। “কী খুঁজছ?”
বৃষ্টি সাইদের দিকে তাকাল। তার চোখে এখন ভয় নেই, আছে কেবল কঠিন জেদ। সে জানে, এই গল্পের শেষ এখনও বাকি।
“ডায়েরি,” বৃষ্টি শান্ত গলায় বলল। “সৌরভ যে গল্পটা লিখেছিল— ‘নীল বাতাসের গন্ধ’— সেটা কোথায়, সাইদ? ওটা কি তোমার কাছে আছে?”
সাইদ বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল, যেন সেখান থেকে সে তার হারিয়ে যাওয়া শান্তি খুঁজে পাবে। “ডায়েরি? কোন ডায়েরি?” সে হাসার চেষ্টা করল। “তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, বৃষ্টি। ওগুলো সব অতীত। তুমি বর্তমানকে দেখো।”
কিন্তু বৃষ্টি জানত, বর্তমানটা একটা ভুল। আর সেই ভুলের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সেই ডায়েরিতে। নীল বাতাসের গন্ধ, যা এতদিন সৌরভের স্মৃতি মনে করিয়ে দিত, আজ যেন সাইদের অপরাধবোধের গন্ধও নিয়ে আসছে।

সাইদ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল, ক্লান্ত এবং পরাজিত। তার পিঠ বৃষ্টির দিকে। এই মুহূর্তে সে কেবল একজন প্রেমিক নয়, সে একজন অপরাধী— যে পাঁচটি বছর ধরে একটি মিথ্যাকে রক্ষা করার জন্য নিজের জীবনকে বলি দিয়েছে।
বৃষ্টির চোখে এখন আর শুধু প্রতারণার রাগ নেই, আছে এক গভীর অনুসন্ধিৎসা। ডায়েরিটা! সৌরভের সমস্ত আবেগ, সমস্ত গোপন কথা লেখা থাকত সেই নীল মলাটের ডায়েরিতে। সাইদ নিশ্চিতভাবেই সেটা সরিয়ে ফেলেছে।
“তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছিলে, সাইদ,” বৃষ্টির কণ্ঠস্বর কঠিন। “কিন্তু কেন? তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে আমি চিরকাল এই মিথ্যার ওপর সুখী থাকতে পারব?”
“তুমি অন্তত শান্তিতে ছিলে,” সাইদ ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে জল। “তুমি স্বপ্ন দেখতে না— তোমার প্রিয়জন চলে গেছে। তুমি বাস্তবকে মেনে নিয়েছিলে। আমি তোমাকে ভালোবেসে সেই কষ্টটা দূর করতে চেয়েছিলাম, বৃষ্টি।”
বৃষ্টির হঠাৎ মনে পড়ল, সৌরভের স্বভাব। সে কখনই তার প্রিয় জিনিস কোথাও লুকিয়ে রাখত না, বরং এমনভাবে রাখত যাতে মনে হতো সেটা সেখানে ভুলবশত রাখা। আর ডায়েরি? সৌরভের কাছে ডায়েরি ছিল তার মনের প্রতিচ্ছবি, যাকে সে সম্মান করত, কিন্তু গোপন করত না।
বৃষ্টির চোখ গেল সাইদের বুকশেলফের দিকে। এই ফ্ল্যাটে সাইদ কেবল তার নিজের বই আর কিছু প্রফেশনাল রিপোর্ট রাখে। কিন্তু কোণার দিকে, ধুলো জমা একটি ছোট তাকে, দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো আমলের কয়েকটি বই। এগুলি সাইদের নয়। এগুলি সৌরভের।
সৌরভের প্রিয় ছিল রবীন্দ্রনাথ। বিশেষ করে ‘সঞ্চয়িতা’। বৃষ্টি জানে, সৌরভ তার সবথেকে ব্যক্তিগত জিনিস এই বইটার ভেতরের ফাঁকা জায়গায় রাখত।
সাইদের চোখে চোখ রেখে বৃষ্টি দ্রুত শেলফের দিকে এগিয়ে গেল। সাইদ তাকে থামানোর কোনো চেষ্টা করল না। সে হয়তো বুঝতে পেরেছিল— যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।
বৃষ্টি আলতো করে ‘সঞ্চয়িতা’ বইটি নামাল। ওজনটা স্বাভাবিকের চেয়ে ভারী। বইটা খুলতেই ভেতরের পৃষ্ঠাগুলো ফাঁকা করা এক গহ্বর চোখে পড়ল। আর সেই গহ্বরেই রাখা ছিল নীল মলাটের সেই ডায়েরি— যার নাম সৌরভ দিয়েছিল, &#039;নীল বাতাসের দলিল&#039;।
বৃষ্টির হাত কাঁপছিল না। সে ধীরে ডায়েরিটা খুলল। দ্রুত পাতা উল্টে সে খুঁজছিল সেই তারিখ— বাংলো থেকে ফেরার আগের রাত।
পৃষ্ঠাটি ছিল ভাঁজ করা, এবং অন্য লেখার চেয়ে এখানে কালির রঙ ছিল সামান্য গাঢ়।
তারিখ: ২৫শে জুলাই, [পাঁচ বছর আগের তারিখ]
নীল বাতাসের গন্ধ আজ শেষবারের মতো নিলাম। আর বেশিদিন নিতে পারব না, বৃষ্টি। ডাক্তার যা বলল, তাতে আর বড়জোর মাস ছয়েক। আমি তোমায় বলতে পারলাম না। দেখলে তুমি দুর্বল হয়ে যেতে। তুমি ভেঙে পড়তে। আর সাইদ? সাইদ... সে আমাকে বাঁচানোর জন্য পাগল। সে লোকটার সঙ্গে কথা বলেছিল, টাকার জন্য সে আমার স্বপ্ন বিকিয়ে দিচ্ছিল। আমি ওর ওপর রাগ করিনি, বৃষ্টি। আমি জানি, ও তোমাকে ভালোবাসে, আর আমাকেও।
আমি ওকে আমার শেষ ইচ্ছের কথা জানিয়েছি। আমি বললাম, আমি চাই না তুমি আমার মৃত্যু দেখো। আমি চাই, তুমি মনে করো, আমি আমার স্বপ্ন খুঁজতে দূরে কোথাও চলে গেছি। সেটাই আমার জন্য শান্তি হবে।
সাইদ প্রথমটা মানতে চাইল না। ও বারবার বলল, তুই কেন এত কষ্ট দিচ্ছিস নিজেকে, কেন তোর নিজের মৃত্যুটাকে লুকিয়ে রাখছিস? আমি ওকে বললাম, এটা মৃত্যু নয়, এটা মুক্তি। মুক্তি তার জন্য, যাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি— তার কষ্ট দূর করার মুক্তি।
সাইদ আমার শেষ কথা রেখেছে। সে রাজি হয়েছে মিথ্যাটা বাঁচিয়ে রাখতে। কাল ভোরে আমি হাঁটা দেব। আর সাইদ, সে তোমার পাশে থাকবে। সে তোমাকে এই শহরের সবথেকে বাস্তব সত্যটা দেবে, যা আমি দিতে পারতাম না। জানি, ও আজীবন এই অপরাধের বোঝা বইবে। তাই বন্ধু— আমি তোকে ক্ষমা করে গেলাম। তুই ভালো থাকিস, আর বৃষ্টিকে ভালো রাখিস। আমার নীল বাতাসের গন্ধ তোমার স্মৃতিতেই থাকবে...
বৃষ্টির হাত থেকে ডায়েরিটা মেঝেতে পড়ে গেল। ‘ক্ষমা করে গেছি’— এই বাক্যের অর্থটা এখন স্পষ্ট। সাইদ তাকে স্বপ্ন বিক্রি করে দেওয়ার জন্য ক্ষমা চায়নি, সৌরভ তাকে ক্ষমা করেছিল এই কঠিন মিথ্যাটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য। সাইদ প্রতারক নয়, সে ছিল এক নিরুপায় বন্ধু, যে তার প্রিয় বন্ধুর শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে নিজের সমস্ত সুখ ও শান্তিকে বিসর্জন দিয়েছিল।
সৌরভ চলে গিয়েছিল তার রোগকে লুকাতে। আর সাইদ, সে মিথ্যার প্রাচীর তুলেছিল বৃষ্টিকে সৌরভের অনিবার্য মৃত্যুর যন্ত্রণা থেকে বাঁচাতে। আর সেই পথে, অন্য একজন অজ্ঞাতপরিচয় মানুষের মৃত্যু, সাইদের জীবনে চিরকালের অপরাধবোধ হয়ে থেকে গেল।
বৃষ্টির চোখের জল থামল। এখন তার রাগ নেই। আছে কেবল এক বিশাল শূন্যতা এবং দুজনের প্রতিই অসীম করুণা। একজন চলে গেল মিথ্যাকে আশ্রয় করে, আরেকজন থেকে গেল মিথ্যাকে জীবন করে।
বৃষ্টি ডায়েরিটা তুলে নিয়ে সাইদের দিকে ফিরল।
“তুমি কেন আমাকে বলনি, সাইদ?” বৃষ্টির কণ্ঠস্বরে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল কেবল গভীর প্রশ্ন। “তুমি কেন একা এই বোঝা বহন করলে?”
সাইদ তার কাছে এল। তার চোখ অশ্রুসজল। “আমি চেয়েছিলাম তুমি সৌরভকে মনে রাখো— সাহসী, মুক্ত। আমি চাইনি তুমি জানো— সে দুর্বল ছিল, মৃত্যুভয়ে পালানো এক মানুষ ছিল। আমি চেয়েছিলাম তুমি ভালোবাসায় বাঁচো, মৃত্যুতে নয়।”
বৃষ্টি এবার সাইদের হাত ধরল। পাঁচ বছর ধরে এই লোকটা নিঃশব্দে ভালোবাসার চরম মূল্য দিয়ে গেছে। সৌরভের স্মৃতিকে সে চিরন্তন করে রেখেছিল, তার নিজের অস্তিত্বের বিনিময়ে।
“আর সেই অজ্ঞাতপরিচয় মানুষটি?” বৃষ্টি জিজ্ঞেস করল।
“তার পরিবার ছিল না। সে ছিল একজন পরিযায়ী শ্রমিক। আমি তার শেষকৃত্য করেছিলাম। তার ছবিটা আমার পার্সে আজও আছে। আমি চেষ্টা করি, তার নামটা মনে রাখতে, কারণ... তার মৃত্যুটা আমার জীবন,” সাইদ তার মাথা নত করল।
বৃষ্টি আর কিছু বলল না। সৌরভের ডায়েরি তার হাতে, সাইদের সত্য তার সামনে। তাদের মধ্যেকার দূরত্ব এখন সম্পূর্ণ মুছে গেছে। তারা দু&#039;জনেই এখন সৌরভের সেই ‘নীল বাতাসের গন্ধ’ নামক ট্র্যাজেডির অংশ।

বৃষ্টি সাইদের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এল। হাতে সৌরভের ডায়েরি। বাইরে তখন সকালের প্রথম আলো ফুটছে। শহরের বাতাস স্বাভাবিক, তাতে নেই কোনো স্যাঁতসেঁতে ইউক্যালিপটাস বা লবণাক্ত জলের গন্ধ।
কিন্তু বৃষ্টি জানে, তার ভেতরের জগতে সেই গন্ধটা চিরকাল থেকে যাবে। নীল বাতাসের গন্ধ— যা কেবল স্বপ্ন দেখতে শেখায়, যা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে, আর যা অবশেষে সবথেকে কঠিন সত্যকে উন্মোচন করে দেয়।
অতীত আর বর্তমানের মাঝে আটকে থাকা সেই অদ্ভুত স্মৃতিটা এখন আর অদ্ভুত নয়। এটি ছিল নিখাদ ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের এক জটিল সমীকরণ, যার সমাধান এতদিনে হলো। বৃষ্টি এখন মুক্ত। সে সাইদের কাছে ফিরে যাবে কিনা, সে জানে না। কিন্তু সে জানে, সাইদ আর সৌরভ— দু&#039;জনেই তাকে জীবনের দুটি চরম প্রান্তে দাঁড়িয়ে ভালোবেসেছিল।
বৃষ্টি এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নীল বাতাসটা তার ভেতরের শূন্যতাকে স্পর্শ করল। সে বুঝতে পারল, সৌরভের সেই ডায়েরির গল্পটা

 ‘নীল বাতাসের গন্ধ’ আজ তার নিজের জীবনের সমাপ্তি পেল।
সে পথ চলতে শুরু করল, পেছনে ফেলে এল সাইদের নীরব আত্মত্যাগ আর সৌরভের সাহসী বিদায়। জীবন এখন নতুন করে শুরু হবে, হয়তো একটু বেশি নীল, একটু বেশি বিষণ্ণ, কিন্তু অবশ্যই সত্যি।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/254911/</link>
				<pubDate>Sat, 20 Jun 2026 11:48:42 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>“নীল বাতাসের গন্ধ”</p>
<p>অন্ধকারকে ছোঁবার সাহস শুধু স্মৃতিদেরই থাকে। তারা ফিসফিস করে, কখনও তীব্র চিৎকারে জানান দেয় তাদের উপস্থিতি, ঠিক যেন এই মধ্যরাতের মতো। বৃষ্টি জানত, এই রাত তার জন্য নয়। এই রাতের তারারা সাইদের নয়, কিংবা এই শহরের নয়। এই রাতটা একান্তই তার পুরোনো, জং-ধরা অতীতের।</p>
<p>আজকাল বড্ড বেশি স্মৃতি এসে ভিড় করে। বৃষ্টি সাইদের ফ্ল্যাটের বারান&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-254911"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/254911/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>8</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">b98ea3d987252985b0d4b2ceb7e52bde</guid>
				<title>“লাশবাহী নদীর পাশে”

নীরবতা নদীর পাড় ছিল অদ্ভুত। এলাকার লোকজনের কাছে এর নাম ছিল &#039;লাশবাহী নদী&#039;, কারণ ভরা বর্ষায় প্রায় প্রতি বছরই এখানে ভেসে আসত অচেনা কোনো মৃতদেহ। তবুও, এই শুষ্ক মৌসুমে নদীটি শান্ত, এক অলস দৈত্যের মতো পড়ে থাকত।

সেদিন ছিল ভরা দুপুর। সুমন আর সৌরভ মাছ ধরার জন্য নদীর ভেতরের দিকে গিয়েছিল। যে জায়গাটা গ্রামের বাকিদের কাছে ছিল প্রায় নিষিদ্ধ, কারণ সেখানে নদীর বাঁকটা খুব ভয়ানক। সেখানেই দেখা গেল সেই অদ্ভুত দৃশ্য।
“কিরে, এটা কীসের পায়ের ছাপ?” সৌরভ ফিসফিস করে বলল, তার চোখ বিস্ময়ে বড়।
সুমন ঝুঁকে পড়ল। ছাপটা কোনো সাধারণ পায়ের ছাপ ছিল না। খালি পায়ের, কিন্তু এত বড় যে সুমনের নিজের পা তার অর্ধেক হবে। ছাপগুলো কাদা থেকে শুরু হয়ে ভেজা বালির ওপর দিয়ে শুকনো ঘাসের দিকে চলে গেছে। সবচেয়ে অদ্ভুত, ছাপগুলো নদীর পাড় থেকে বাইরের দিকে যাচ্ছে। যেন কেউ গভীর জল থেকে উঠে দ্রুতগতিতে দৌড়ে পালিয়েছে।
“মানুষের নাকি অন্য কিছুর?” সুমনের গলাতেও একরাশ ভয়।

“মানুষেরই, তবে... এত বড় পায়ের মানুষ তো এই তল্লাটে নেই!” সৌরভ চারপাশে তাকাল। তাদের দ্রুত এই খবরটা নূরকে জানানো দরকার। নূর, গ্রামের একমাত্র ব্যক্তি, যার বইয়ের জ্ঞান আর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে সবাই শ্রদ্ধা করে।
তারা দুজন দ্রুত গ্রামে ফিরে গেল।

নূর, একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষক, তার বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। তার বয়স হলেও চোখ ছিল বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ। সুমন আর সৌরভ হাঁপাতে হাঁপাতে তাকে সব বলল।

নূর সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। “চলো।”
নদীর পাড়ে পৌঁছে নূর খুব মনোযোগ দিয়ে ছাপগুলো পরীক্ষা করলেন। তিনি কেবল ছাপের আকার নয়, তার গভীরতা এবং ভেতরের কণার দিকেও নজর দিলেন।

“সাইদ ভাই, আপনি কী মনে করেন?” নূর এলাকার মাতব্বর সাইদকে প্রশ্ন করলেন, যিনি উৎসুক জনতার ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
সাইদ, স্থূলকায় একজন মানুষ, তার নাক কুঁচকে বললেন, “আরে ধুর! গাঁজাখুরি গল্প। নিশ্চই কোনো মাতাল মাঝরাতে জল খেতে এসে কাদা মেখে চলে গেছে। এর মধ্যে রহস্য খুঁজতে যেও না, নূর। লোক হাসাবে।”
নূর সাইদের কথায় কান দিলেন না। তিনি আঙুল দিয়ে ছাপের ভেতরের ভেজা বালিগুলো ছুঁয়ে দেখলেন।

“সাইদ ভাই, দেখুন,” নূর শান্ত স্বরে বললেন, “এই ছাপের ভেতরের বালিগুলো এখনও ভিজে। মানে, এই ঘটনা খুব বেশি হলে ভোর রাতের। আর ছাপের গভীরতা বলছে, লোকটার ওজন কম করে হলেও একশো কেজির উপরে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ছাপগুলো পাড়ের একেবারে শেষ অংশ থেকে শুরু হয়েছে, যেখানে সাধারণত জল থাকে। মনে হচ্ছে, লোকটা নদী থেকে কোনো কিছু নিয়ে উঠে এসেছে।”
সুমন ফিসফিস করে সৌরভকে বলল, “লাশবাহী নদী… তবে কি কোনো লাশ?”

খবরটা দ্রুত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। মিষ্টি আর বৃষ্টি, গ্রামের দুই চঞ্চল তরুণী, তাদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে এই গল্প করছিল।
“শুনেছিস? বিরাট বড় পায়ের ছাপ,” মিষ্টি বলল। “নিশ্চই কোনো শয়তান ওটা! নীরবতা নদী এমনিতেই ভালো না।”
বৃষ্টি বলল, “আমার মনে হয় এর সাথে ঐ নতুন লোকটার সম্পর্ক আছে।”
“নতুন লোক? জাকিয়া মাসি?”

জাকিয়া, সম্প্রতি এই গ্রামে এসেছেন। নদীর পাড় থেকে কিছুটা দূরে, বুনো ঝোপঝাড়ের আড়ালে একটা পুরোনো কুঁড়েঘরে তিনি একা থাকেন। তিনি গ্রামের কারো সাথে মেশেন না, খুব ভোরে বেরিয়ে যান আর সন্ধ্যায় ফেরেন। তার নীরবতা আর একাকীত্ব তাকে এমনিতেই রহস্যময় করে তুলেছে।
সাইদ জাকিয়ার নাম শুনেই নূরের কাছে এলেন। “নূর, আমি আগেই বলেছি, এই মহিলারা এসব বাজে জিনিস টানে। ঐ জাকিয়া! সে নির্ঘাত কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছে। ওকে ধরো।”

নূর শান্তভাবে বললেন, “সাইদ ভাই, প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা যায় না। আর জাকিয়ার পায়ের মাপ এত বড় হওয়ার সম্ভাবনা কম।”
“তবে ও কেন এত লুকায়? কেন মানুষের সাথে কথা বলে না?” সাইদ চেঁচিয়ে উঠলেন। সাইদের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট, গ্রামের সমস্ত সমস্যার দায় জাকিয়ার ওপর চাপিয়ে দেওয়া।
নূর তখন তামিম আর শিহাবকে ডাকলেন। “তামিম, তুমি আর শিহাব পাড় বরাবর ঐ পায়ের ছাপগুলো অনুসরণ করো। দেখো কোথায় গিয়ে থেমেছে। সুমন, তুমি ওদের সাহায্য করো।”

তিনজন তরুণ, তামিম, সুমন আর শিহাব, সতর্কভাবে ছাপগুলো অনুসরণ করতে শুরু করল। ছাপগুলো প্রথমে শুকনো ঘাসের মধ্যে দিয়ে, তারপর খেতের আল ধরে গ্রামের উল্টো দিকে চলে গেছে। শিহাব ছিল স্বভাবতই নীরব, কিন্তু তার চোখে ছিল অনুসন্ধিৎসা। তামিম ছিল কিছুটা ভীতু, বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিল।
“যদি সত্যি লাশ হয়?” তামিম কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।

“তাহলে আমরা প্রমাণ পাব,” সুমন আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিল।
প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটার পর, ছাপগুলো হঠাৎই শেষ হলো। শেষ ছাপটা পড়েছিল একটা ঘন বাঁশঝাড়ের পাশে। বাঁশঝাড়ের ওপাশেই জাকিয়ার কুঁড়েঘর।

শিহাব নীরবে মাটিতে ঝুঁকল। “ভাই, দেখুন, এখানে কিছু একটা টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”
মাটিতে একটা দীর্ঘ, অস্পষ্ট দাগ ছিল, যা ছাপগুলো থেকে আলাদা। মনে হচ্ছে, কেউ কোনো ভারী জিনিস ঘাসের ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে গেছে। দাগটা বাঁশঝাড়ের ভেতরে জাকিয়ার বাড়ির দিকে চলে গেছে।

সুমন আর তামিম ভয়ে আর এগোতে পারল না। কিন্তু শিহাব তাদের থামিয়ে দিল।
“দাঁড়াও,” সে বলল। “দাগটা কেবল এই পর্যন্ত এসেছে, তারপর আবার ঘুরে গেছে।”
তারা ভালো করে দেখল। দাগটা বাঁশঝাড়ের ভেতরে কিছুদূর গিয়ে একটা ভাঙা মাটির পাত্রের কাছে থেমেছে। কিন্তু এরপরের মাটিতে কোনো দাগ বা ছাপ নেই। কেবল, পাত্রের পাশে মাটিটা সদ্য খোঁড়া হয়েছে এবং আবার ভরাট করা হয়েছে। মাটিটা বেশ আলগা।
“এখানেই কিছু একটা চাপা দেওয়া হয়েছিল,” সুমন উত্তেজিত হয়ে বলল।
কিন্তু ততক্ষণে গ্রামের বাকি লোক, সাইদ আর নূরের নেতৃত্বে, সেখানে পৌঁছে গেছে।
সাইদ হাঁক দিলেন, “জাকিয়া! বেরিয়ে আয়! তোর সব চালাকি আজ শেষ!”

জাকিয়া, রোগা এবং কিছুটা ফ্যাকাশে চেহারার মহিলা, তার দরজা খুলে বেরোলেন। তার চোখে ভয় ছিল না, ছিল এক ধরণের গভীর শূন্যতা।
“কী হয়েছে?” জাকিয়া শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলেন।
সাইদ আঙ্গুল তুলে সদ্য খোঁড়া মাটিটা দেখালেন। “এখানে কী লুকিয়েছিস? পায়ের ছাপ আর এই খোঁড়া মাটি সব বলছে। নিশ্চয়ই কোনো লাশ!”
জাকিয়া এক মুহূর্তের জন্য মাটির দিকে তাকালেন, তারপর মাথা তুলে নূরকে দেখলেন। তার চোখে একটা গোপন আবেদন ছিল।
নূর এগিয়ে এসে জাকিয়ার সামনে দাঁড়ালেন। “জাকিয়া, আমরা আপনার ক্ষতি করতে চাই না। শুধু জানতে চাই, নীরবতা নদীর পাড়ে যে পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে, সেটা কার? আর এই মাটিতে কী চাপা দেওয়া হয়েছে?”
জাকিয়া ধীরে ধীরে বললেন, “আমি কাউকেই দেখিনি। মাঝরাতে আমি বাড়ি থেকে বেরোই না।”
বৃষ্টি আর মিষ্টি তখন ফিসফিস করছিল। “মিথ্যা বলছে! ওর চোখ দেখ।”

নূর বললেন, “আর ঐ খোঁড়া মাটি?”
জাকিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “ওটা… ওটা আমার জিনিস ছিল। আমার জীবনের সব সঞ্চয়, কিছু পুরোনো স্মৃতি। নদীর জলে ভেসে যাচ্ছিল, তাই পাড় থেকে উঠে এসে তাড়াতাড়ি এখানে লুকিয়েছিলাম। কেউ যাতে দেখতে না পায়।”
সাইদ অট্টহাসি হেসে উঠলেন। “টাকা? আর এত রাতে একা একশো কেজির লোক কেন নদীর পাড় থেকে উঠল? সত্যি বল! কাকে মেরেছিস?”
জাকিয়ার মুখ কঠিন হলো। “আমি কাউকে মারিনি। আমার কথা বিশ্বাস না হলে আপনারা মাটি খুঁড়ে দেখতে পারেন।”

নূর কিছুক্ষণ জাকিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, জাকিয়া কিছু একটা লুকাচ্ছেন, কিন্তু সেটা খুনের ভয় নয়, অন্য কোনো গভীর বেদনা। তিনি তার হাত তুলে ভিড়টাকে থামালেন।
“আমরা পরে দেখব,” নূর বললেন। তিনি জাকিয়াকে আরেকবার দেখলেন, তারপর তার দৃষ্টি গেল সাইদের পায়ের দিকে।
সাইদ, নিজেকে ভিড়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করার জন্য, বারবার পা ঝাঁকাচ্ছিলেন। তার পায়ে ছিল চামড়ার মোটা স্যান্ডেল, যা সাধারণত গ্রামে কেউ ব্যবহার করে না।

সন্ধ্যা নামছিল। সবাই জাকিয়ার ওপর সন্দেহ নিয়ে ফিরে গেল। কেবল নূর একা বসে নদীর পাড়ের ছাপগুলো নিয়ে ভাবছিলেন।
“একশো কেজি… বড় পা… নদী থেকে উঠে আসা… জিনিস লুকিয়ে আবার ফিরে যাওয়া,” নূর মনে মনে সব পুনরাবৃত্তি করলেন।
হঠাৎই তার মাথায় একটা ভাবনা খেলে গেল। তিনি দ্রুত সুমনকে ডেকে পাঠালেন।
“সুমন, তুমি কি একটা কাজ করতে পারবে? সাইদ ভাইয়ের জুতোটা বা একটা ভালো পায়ের ছাপের একটা পরিমাপ এনে দিতে পারবে?”
সুমন অবাক হলেও কথা বাড়াল না। সাইদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে সাহস হলো না, তাই সে কৌশলে সাইদের পুরোনো জুতো রাখার ঘর থেকে তার ব্যবহৃত একটা স্যান্ডেলের ভেতরের মাপ কাগজে টুকে আনল।
নূর মাপটা ভালো করে দেখলেন। স্যান্ডেলটা ছিল অস্বাভাবিক বড়, প্রায় ১৫ নম্বরের কাছাকাছি। এই মাপের পা গ্রামে আর কারও নেই। কিন্তু ছাপটা ছিল খালি পায়ের।

পরের দিন ভোরবেলা। নূর আবার একা সেই বাঁশঝাড়ের কাছে গেলেন। তিনি খুঁড়ে রাখা মাটিটার দিকে তাকালেন। জাকিয়া বলেছেন তিনি টাকা লুকিয়েছিলেন। কিন্তু টাকা যদি নদীর জলে ভেসে আসে, তাহলে তার সাথে একশো কেজির বিশাল দেহের কী সম্পর্ক?
তিনি আবারও সেই বাঁশঝাড়ের শেষ প্রান্তে গেলেন, যেখানে ছাপগুলো হঠাৎ শেষ হয়েছে। আর সেই টেনে নিয়ে যাওয়ার দাগটা। এবার তিনি গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন। টেনে নিয়ে যাওয়ার দাগটা যতটা না ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার, তার চেয়ে বেশি মনে হচ্ছিল কোনো আটকে যাওয়া বস্তু পা দিয়ে টেনে তোলার দাগ।
নূর তখন সাইদের জুতো আর ছাপের আকারের মধ্যে একটা অদ্ভুত মিল খুঁজে পেলেন।
“যদি ছাপটা পা এর না হয়?” নূর নিজেকেই প্রশ্ন করলেন। “যদি ওটা... অন্য কোনো অঙ্গের ছাপ হয়?”

হঠাৎই তার চোখ গেল নদীর দিকে। তিনি দ্রুত হেঁটে নদীর পাড়ের সেই প্রথম ছাপের কাছে গেলেন। এবার তিনি কেবল ছাপের দিকে তাকালেন না, তাকালে ছাপের পাশাপাশি ভেজা বালির ওপর দিয়ে চলে যাওয়া সাইদের স্যান্ডেলের হালকা ছাপটার দিকে। সাইদ কালও এখানে এসেছিলেন, এবং তার ভারী দেহের কারণে তার জুতো সামান্য কাদার ওপরও গভীর দাগ ফেলেছিল।
নূর তার হাতে থাকা পরিমাপের কাগজের সাথে সাইদের জুতো আর পায়ের ছাপের তুলনা করলেন।

“একই দৈর্ঘ্যের ছাপ,” নূর ফিসফিস করে বললেন। “তবে খালি পায়ের ছাপটা এত চওড়া কেন?”
উত্তরটা তাকে চমকে দিল। খালি পায়ের ছাপটা আসলে ছিল না, ওটা ছিল একটি ছদ্মবেশী ছাপ। কেউ তার আসল পায়ের মাপ গোপন করার জন্য এমন কিছু ব্যবহার করেছে। কিন্তু কেন?
নূর সোজা সাইদের বাড়ির দিকে হাঁটলেন। সাইদ তখন বারান্দায় বসে পান চিবোচ্ছিলেন।
“সাইদ ভাই, একটা কথা জানতে চাই,” নূর শান্তভাবে বললেন। “আপনার পায়ের মাপ ১৫, তাই তো?”
সাইদ সামান্য চমকে গেলেন। “তাতে কী? এটা কি অপরাধ?”
“না, অপরাধ নয়,” নূর বললেন। “কিন্তু গতকাল নীরবতা নদীর পাড়ে যে ছাপটা পাওয়া গিয়েছিল, সেটা আপনার পায়ের ছাপের মতোই লম্বা। কিন্তু খালি পায়ের ছাপটা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ চওড়া। আসলে, ওটা কোনো মানুষের পায়ের ছাপ ছিল না। ওটা ছিল আপনার জুতো খুলে, তার ভেতরের দিকটা ব্যবহার করে তৈরি করা এক কৃত্রিম ছাপ।”

সাইদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“কী বলছিস এসব?”
“আমি বাঁশঝাড়ের কাছে গিয়েছি। মাটি খোঁড়া হয়েছে। কিন্তু জাকিয়া লাশ লুকাননি, তিনি শুধু তার স্মৃতি আর টাকা লুকানোর জন্য মিথ্যে বলেছেন। আসল রহস্য আপনি লুকিয়েছিলেন,” নূর সাইদের চোখের দিকে তাকালেন। “আপনি কোনো একটা ভারী জিনিস নদীতে ফেলেছিলেন। এমন একটা জিনিস, যা ভেসে গেলে আপনার বিপদ হতো। আপনি ভেবেছিলেন স্রোত ওটা দূরে নিয়ে যাবে। কিন্তু ওটা নদীর পাড়েই আটকে গিয়েছিল। আর সেই গভীর রাতে, আপনি আপনার বড় জুতো খুলে, জুতোটার ভেতরের দিকটা দিয়ে কৃত্রিম পায়ের ছাপ তৈরি করে পাড় থেকে নেমেছিলেন। যাতে সবাই ভাবে এটা কোনো রহস্য, আর আপনার আসল কাজ কেউ না দেখে।”
সাইদের হাত থেকে পান পড়ে গেল। তিনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। “কী ছিল সেটা?”

নূর শান্তভাবে বললেন, “আপনিই বলুন, সাইদ ভাই। আপনি নীরবতা নদীতে কী ফেলেছিলেন, যা এত রাতে এত লুকোচুরি করে আবার তুলতে হলো?”

সাইদ মাথা নিচু করে ফেললেন। তার মোটা শরীরটা কাঁপছিল। তার আর কথা বলার শক্তি ছিল না। জাকিয়াকে ফাঁসানোর চেষ্টা ছিল কেবল একটা নাটক, যাতে কেউ তার আসল কাজের দিকে নজর না দেয়। তিনি জানতেন, নদীর পাড়ে পাওয়া সেই অচেনা পায়ের ছাপ আর কারো নয়—সেটা ছিল তার নিজের ভীতি আর অপরাধ ঢাকার এক ব্যর্থ চেষ্টা।

আর নীরবতা নদী, সে তো চুপচাপ ছিলই। মানুষের সব গোপন পাপ সে নিজের বুকে সযত্নে ধারণ করে।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/254636/</link>
				<pubDate>Wed, 17 Jun 2026 19:49:38 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>“লাশবাহী নদীর পাশে”</p>
<p>নীরবতা নদীর পাড় ছিল অদ্ভুত। এলাকার লোকজনের কাছে এর নাম ছিল &#8216;লাশবাহী নদী&#8217;, কারণ ভরা বর্ষায় প্রায় প্রতি বছরই এখানে ভেসে আসত অচেনা কোনো মৃতদেহ। তবুও, এই শুষ্ক মৌসুমে নদীটি শান্ত, এক অলস দৈত্যের মতো পড়ে থাকত।</p>
<p>সেদিন ছিল ভরা দুপুর। সুমন আর সৌরভ মাছ ধরার জন্য নদীর ভেতরের দিকে গিয়েছিল। যে জায়গাটা গ্রামের বাকিদের কাছে ছিল প্রায় নি&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-254636"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/254636/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>7</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">6959c8b52208539d174f9b2e82e75232</guid>
				<title>আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছেন সকল গুণীজন?</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/254541/</link>
				<pubDate>Wed, 17 Jun 2026 01:50:30 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছেন সকল গুণীজন?</p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">baeb23e4b5d8ea643a9680feff202b1b</guid>
				<title>“রক্তমাখা ইউনিফর্ম”

রাত তখন প্রায় দুটো। ডাস্টবিন থেকে উঠে আসা পচা গন্ধ আর টহলদারি পুলিশের বাঁশির তীক্ষ্ণ শব্দ ছাড়া শহরটা ঘুমিয়ে ছিল। সে ঘুম যেমন ছিল নিশ্চিন্ত, তেমনই ছিল ভঙ্গুর। কারণ, শহরের স্নায়ুতন্ত্রের কেন্দ্রে, &#039;অপারেশন নাইটফল&#039;-এর শেষ প্রস্তুতি চলছিল।
​ইউনিফর্ম পরে দাঁড়িয়ে ছিল ইন্সপেক্টর নূর সুমন। বছর পঁয়ত্রিশের যুবক। তার উর্দি ছিল ইস্ত্রি করা, কিন্তু তার ভেতরে থাকা মানুষটা ছিল কুঁচকে যাওয়া কাগজের মতো – অনেক রাতে না-ঘুমানো, গোপনীয়তার ভারে চাপা। রেইডের ম্যাপটা তার সামনে ছড়ানো। মানচিত্র নয়, যেন পুরো শহরের হৃৎপিণ্ড। লক্ষবস্তু – &#039;নেক্সাস&#039;, শহরের পুরনো প্রান্তে লুকিয়ে থাকা এক পরিত্যক্ত গুদাম, যা এখন স্থানীয় মাফিয়া বস &#039;ভিক্টর সান্যাল&#039;-এর অবৈধ ব্যবসার কেন্দ্র। ড্রাগ, চোরাচালান, এবং সবচেয়ে ভয়ংকর, ক্ষমতা।
​নূর সুমন তার দলের দিকে তাকাল। বিশজন অফিসার, সবাই অভিজ্ঞ, সবাই চুপচাপ। কিন্তু সুমন জানত, এই অপারেশনের আসল চালক তারা নয়। আসল চালক হল উপরমহলের অলিখিত নির্দেশ, যা শহরের পুরনো রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোকে রাতারাতি উল্টে দিতে চায়। এই রেইড শুধু ভিক্টরকে ধরার জন্য নয়, এটি ছিল একটি নতুন যুগের সূচনা, যেখানে শহরের নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি অন্য হাতে চলে যাবে।
​&quot;আমরা যাচ্ছি, কেবল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। অন্য কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই। কেউ বাড়াবাড়ি করলে, সে আমার দলের লোক হলেও ছাড় পাবে না। রেডি?&quot;

​নূর সুমনের গলা পাথরের মতো শক্ত। সে যখন টিমের দিকে তাকাচ্ছে, তখন তার চোখ এড়িয়ে গেল না কনস্টেবল নূরনবী-র আতঙ্কিত দৃষ্টি। নূরনবী নতুন, মাত্র মাসখানেক হয়েছে চাকরিতে। তার ইউনিফর্ম এখনও ঝকঝকে, এখনও কোনো রক্তের দাগ লাগেনি। সুমনের ভয় ছিল, আজকের রাতে হয়তো সেই দাগ লেগে যাবে, আর সেই দাগ মুছতে মুছতেই নূরনবী একদিন সুমনের মতো অনুভূতিহীন হয়ে যাবে।

​গুদাম পর্যন্ত রাস্তাটা ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন। রেইডের গাড়িগুলো হেডলাইট নিভিয়ে নিঃশব্দে এগোচ্ছে, যেন তারা শহরের গভীরের কোনো গোপন রোগের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে এগোচ্ছে।
​ভিক্টর সান্যাল। মানুষটা ছিল শহরের নোংরা নালার মতো – সবাই জানত সে আছে, কিন্তু কেউ তাকে স্পর্শ করতে চাইত না। তার প্রভাব পুলিশের সদর দপ্তর থেকে শুরু করে রাজ্যের মন্ত্রীর ড্রয়িংরুম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সুমন জানত, আজকের এই রেইড একটা অসম্ভব কাজ, কারণ হয় ভিক্টর আগেই খবর পেয়ে গেছে, না হয় ভিক্টরের লোক এই দলেই লুকিয়ে আছে।
​গুদামের সামনে এসে গাড়ি থামল। চারিদিক নিস্তব্ধ। সুমন হাত দিয়ে নির্দেশ দিল। দরজা ভাঙার দলটা ধাতব শব্দ করে তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। সুমনের দল অনুসরণ করল।
​ভেতরের দৃশ্যটা ছিল সিনেমার সেট-আপের মতো। সারি সারি বাক্স, তাতে কিসের চিহ্ন তা অনুমান করা কঠিন। একপাশে বেশ কিছু কম্পিউটার আর মনিটর, বোঝা যায় এখান থেকেই পুরো অবৈধ নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রিত হতো। কিন্তু, গুদামটা ছিল একদম খালি। ভিক্টর নেই, তার লোক নেই, এমনকি চোরাচালানের মালও নেই।
​সুমনর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। উপরমহল চেয়েছিল সে ভিক্টরের ঘাঁটিতে যাক, প্রমাণ করুক যে ভিক্টরের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ভিক্টর পালিয়ে গেছে, এবং যাওয়ার আগে একটা ফাঁদ পেতে গেছে।
​ঠিক তখনই, গুদামের পিছনের দরজা থেকে তীব্র গুলির শব্দ শুরু হলো।

​সুমন দেয়ালের আড়ালে ঝাঁপ দিল, ঠিক তার পেছনেই নূরনবী। নূরনবী ভয়ে কাঁপছে।
​&quot;স্যার, এ তো অ্যামবুশ! ওরা কোত্থেকে এলো?&quot; নূরনবী ফিসফিস করে বলল।
​&quot;চুপ! পিছনে ফিরে দেখার সময় নেই। নূরনবী, তুমি এই গেটের দিকে দেখবে। আর গুলি চালানোর আগে নিশ্চিত হবে, ওটা তোমার লক্ষ্য!&quot; সুমন চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলল।
​পিছনের দরজা দিয়ে একে একে ভিক্টরের প্রায় পঁচিশ-ত্রিশজন অস্ত্রধারী লোক ভেতরে ঢুকতে শুরু করেছে। তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট – কাউকে জীবিত রাখা নয়।
​সংঘর্ষটা ছিল ভয়াবহ। গুদামের মধ্যে ধাতব প্রতিধ্বনি তুলে গুলির আওয়াজ, কাঁচ ভাঙার শব্দ আর মানুষের চিৎকার। সুমন ছিল পুরনো ধাঁচের পুলিশ অফিসার, যিনি শ্যুটিং-এর চেয়ে স্ট্র্যাটেজিতে বেশি বিশ্বাস করতেন। কিন্তু আজকের রাতে স্ট্র্যাটেজির জায়গাটা বুলেট নিয়ে নিয়েছে।
​সুমন নেতৃত্ব দিল, এক কোণ থেকে অন্য কোণে যাওয়া, আড়াল নেওয়া, এবং অত্যন্ত নির্ভুলভাবে পাল্টা ফায়ার করা। সে জানত, এই অন্ধকার গুদামে তারা শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, বারুদেও পিছিয়ে আছে।
​হঠাৎ, ডানদিকে এক চিৎকার। কনস্টেবল প্রীতম বুক চেপে ধরে পড়ে গেল। তার ইউনিফর্ম মুহূর্তে রক্তে ভিজে উঠল। নূরনবী চিৎকার করে তার দিকে যেতে চাইল, কিন্তু সুমন তাকে টেনে ধরল।
​&quot;যেতে পারবে না! ওটা শেষ!&quot; সুমনর গলায় কোনো আবেগ ছিল না। সে শুধু দেখছিল, কীভাবে একটা তাজা প্রাণ শেষ হয়ে গেল।
​এই সময়, ভিক্টরের লোকগুলো ভেতরে গ্রেনেড নিক্ষেপ করল। প্রথম গ্রেনেডটা ফাটতেই গুদামের কংক্রিটের ছাদ কেঁপে উঠল। ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সুমন বুঝতে পারল, তার দলটা ভেঙে যাচ্ছে।

​সময় দ্রুত চলে যাচ্ছিল। বাইরে পুলিশের আরও গাড়ি আসছে, সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে, এই গুদামের ভেতরে, সুমন আর তার বাকি দশজন অফিসার একা।
​ভিক্টরের লোকেরাও এখন মরিয়া। তারা জানে বাইরে থেকে আরও সাহায্য আসছে।
​সুমন চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য ভাবল। সে এখন জানে কেন এই রেইড ফাঁদ ছিল। উপরমহল জানত ভিক্টর আজ রাতে নেই। কিন্তু তারা চেয়েছিল, ভিক্টরের দল এবং সুমনের দল—দু’পক্ষের মধ্যেই একটি বড় সংঘর্ষ হোক। ফলস্বরূপ, শহরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এর সুযোগ নেবে নতুন এক রাজনৈতিক শক্তি, যারা এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করবে।
​সুমনর রাগ তার ভয়কে ছাপিয়ে গেল। সে দেয়াল থেকে উঠে দাঁড়াল।
​&quot;নূরনবী! আমার পেছনে এসো! ওরা ভেবেছে আমরা মরব! আমরা মরব না! আমরা ওদের শেষ দেখব!&quot;
​সুমন ফায়ার করতে করতে সামনের দিকে এগোতে শুরু করল। সে কোনো হিসেব করছিল না, শুধু বাঁচতে এবং বাকিদের বাঁচাতে চাইছিল। তার ইউনিফর্মে তখন প্রীতমের ছিটকে আসা রক্ত, আর তার কপালে নিজের ঘাম। সেই মুহূর্তে তার ইউনিফর্ম হয়ে উঠল এক রক্তমাখা প্রতীক, যা প্রমাণ করছিল—এই যুদ্ধে কেউই নৈতিকভাবে জয়ী নয়।
​একটি কঠিন মুহূর্ত। সুমন দেখল, দুজন অস্ত্রধারী গুদামের মুখ্য কন্ট্রোল রুমের দিকে ছুটছে। তারা নিশ্চিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ডিভাইস ধ্বংস করতে চাইছে।
​সুমন নূরনবীকে কন্ট্রোল রুমের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিল।
​&quot;ওখানে যাও! ওদের থামাও! ওই কন্ট্রোল রুম ওদের শেষ চাল, নূরনবী!&quot;
​নূরনবী দ্বিধাগ্রস্ত, কিন্তু সুমনের চোখে দেখল এক তীব্র প্রতিজ্ঞা। সে মাথা নেড়ে গুদামের বামপাশ ধরে কন্ট্রোল রুমের দিকে ছুটল।

​সুমন আর বাকি অফিসারদের কভার ফায়ারের সুযোগ নিয়ে নূরনবী কন্ট্রোল রুমে পৌঁছাল। ভেতরে দুজন লোক তখনও ফাইল ছিঁড়ছে এবং কম্পিউটার হার্ড ড্রাইভ ভাঙছে। নূরনবী তার বন্দুক হাতে ভেতরে ঢুকল। ভিক্টরের লোকগুলো তাকে দেখে চমকে উঠল।
​প্রথম লোকটা বন্দুক তোলার আগেই নূরনবী গুলি করল। নির্ভুল নিশানায় লোকটা পড়ে গেল। অন্যজন টেবিলের ওপর থেকে লাফিয়ে এসে নূরনবীকে ধাক্কা দিল।
​নূরনবী-র ইউনিফর্ম দেওয়ালে ঘষা খেল। তাদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হলো। নূরনবী নতুন হলেও তার ট্রেনিং ছিল কঠিন। সে লোকটার হাত মুচড়ে ধরল, এবং ঠিক সেই সময়ে, তার বন্দুকের নল লোকটার দিকে তাক করে গুলি করল।
​কন্ট্রোল রুমের মধ্যে তখন ধোঁয়া আর রক্তের গন্ধ। নূরনবী দেখল, একটি ভাঙা হার্ড ড্রাইভ মেঝেতে পড়ে আছে। কিন্তু একটি ছোট ইউএসবি ড্রাইভ তখনও কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত। এটা নিশ্চয়ই তাদের শেষ চেষ্টা ছিল।
​নূরনবী কাঁপতে কাঁপতে ইউএসবি ড্রাইভটা বের করল এবং সেটা তার জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে রাখল। এই ড্রাইভেই ছিল ভিক্টরের সাম্রাজ্যের সমস্ত তথ্য।
​বাইরে, গুলির শব্দ কমে এসেছে। পুলিশের অতিরিক্ত বাহিনী এসে গেছে। ভিক্টরের লোকগুলো এখন আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অনেকেই ধরা পড়েছে, বাকিরা মরেছে।
​ভোর হচ্ছে। কুয়াশা কেটে যাচ্ছে। গুদামের বাইরে তখন সাংবাদিক, পুলিশের উঁচু কর্মকর্তারা আর সাধারণ মানুষের ভিড়। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর ফ্ল্যাশলাইট পুরো এলাকাটাকে একটা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো দেখাচ্ছে।
​সুমন গুদামের বাইরে বেরিয়ে এল। তার ইউনিফর্ম ছেঁড়া, রক্তে মাখা – নিজের রক্ত নয়, সহকর্মীর রক্ত। সে দেখল, কমিশনার নিজে এসেছেন।
​কমিশনার সুমনের দিকে এগিয়ে এলেন। তার চোখে কোনো কৃতজ্ঞতা বা উদ্বেগ ছিল না, শুধু ছিল হিসেব।
​&quot;ইন্সপেক্টর সুমন, আপনি বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। অপারেশন নাইটফল সফল। ভিক্টরের সাম্রাজ্য আজ থেকে শেষ।&quot;
​সুমন ক্লান্ত চোখে কমিশনারের দিকে তাকাল।
​&quot;স্যার, প্রীতম মারা গেছে। আরও দুজন গুরুতর আহত।&quot;
​কমিশনারের মুখ থেকে কোনো অভিব্যক্তি এল না। &quot;দেশের জন্য এটাই স্বাভাবিক। তবে চিন্তা করবেন না, আমরা সবকিছু ঢেকে দেব। ভিক্টর সান্যালকে &#039;পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলি করে মারা গেছে&#039; বলে দেখানো হবে।&quot;
​সুমন বুঝতে পারল। ভিক্টর সান্যাল আজ থেকে কেবল একটি নাম নয়, একটি শহীদ—নতুন ক্ষমতার উত্থানের জন্য এক বলিদান। আজকের রেইড ভিক্টরকে শেষ করতে আসেনি, এসেছিল ক্ষমতাকে এক হাত থেকে অন্য হাতে তুলে দিতে। এবং এই পুরো প্রক্রিয়াটায়, সুমনের ইউনিফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে রক্ত লেগেছে।
​সুমন চুপচাপ তার দলের দিকে তাকাল। নূরনবী তখন তার পাশে দাঁড়িয়ে। তার চোখ শুকনো, কিন্তু ভেতরে এক নতুন ধরনের ভয়।
​সুমনর দৃষ্টি গেল তার নিজের ইউনিফর্মের দিকে। রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আসছে। সে হঠাৎ নূরনবীকে ফিসফিস করে বলল, &quot;নূরনবী, তুমি ইউএসবি ড্রাইভটা কাউকে দেখাবে না। এটা তোমার কাছে থাক। এটা প্রমাণ, আসল নকশাটা এখনও আমরা জানি না।&quot;
​নূরনবী ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। সে বুঝল, এই শহরের নকশা কেবল গুদামের মানচিত্রে আঁকা ছিল না, তা ছিল প্রতিটি ইউনিফর্মের রক্তমাখা দাগে লেখা। এক রাতের রেইড শহরটার কেবল বাহ্যিক কাঠামোই নয়, এর নৈতিক কাঠামোটাও বদলে দিয়েছে। আর সেই নতুন, রক্তমাখা নকশার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকল সুমন আর নূরনবী।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/254501/</link>
				<pubDate>Tue, 16 Jun 2026 15:09:56 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>“রক্তমাখা ইউনিফর্ম”</p>
<p>রাত তখন প্রায় দুটো। ডাস্টবিন থেকে উঠে আসা পচা গন্ধ আর টহলদারি পুলিশের বাঁশির তীক্ষ্ণ শব্দ ছাড়া শহরটা ঘুমিয়ে ছিল। সে ঘুম যেমন ছিল নিশ্চিন্ত, তেমনই ছিল ভঙ্গুর। কারণ, শহরের স্নায়ুতন্ত্রের কেন্দ্রে, &#8216;অপারেশন নাইটফল&#8217;-এর শেষ প্রস্তুতি চলছিল।<br />
​ইউনিফর্ম পরে দাঁড়িয়ে ছিল ইন্সপেক্টর নূর সুমন। বছর পঁয়ত্রিশের যুবক। তার উর্দি ছিল ই&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-254501"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/254501/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">12be020cfe9ca42c33f326039cec494a</guid>
				<title>“রক্তমাখা ইউনিফর্ম”

রাত তখন প্রায় দুটো। ডাস্টবিন থেকে উঠে আসা পচা গন্ধ আর টহলদারি পুলিশের বাঁশির তীক্ষ্ণ শব্দ ছাড়া শহরটা ঘুমিয়ে ছিল। সে ঘুম যেমন ছিল নিশ্চিন্ত, তেমনই ছিল ভঙ্গুর। কারণ, শহরের স্নায়ুতন্ত্রের কেন্দ্রে, &#039;অপারেশন নাইটফল&#039;-এর শেষ প্রস্তুতি চলছিল।

​ইউনিফর্ম পরে দাঁড়িয়ে ছিল ইন্সপেক্টর নূর সুমন। বছর পঁয়ত্রিশের যুবক। তার উর্দি ছিল ইস্ত্রি করা, কিন্তু তার ভেতরে থাকা মানুষটা ছিল কুঁচকে যাওয়া কাগজের মতো – অনেক রাতে না-ঘুমানো, গোপনীয়তার ভারে চাপা। রেইডের ম্যাপটা তার সামনে ছড়ানো। মানচিত্র নয়, যেন পুরো শহরের হৃৎপিণ্ড। লক্ষবস্তু  &#039;নেক্সাস&#039;, শহরের পুরনো প্রান্তে লুকিয়ে থাকা এক পরিত্যক্ত গুদাম, যা এখন স্থানীয় মাফিয়া বস &#039;ভিক্টর সান্যাল&#039;-এর অবৈধ ব্যবসার কেন্দ্র। ড্রাগ, চোরাচালান, এবং সবচেয়ে ভয়ংকর, ক্ষমতা।

​নূর সুমন তার দলের দিকে তাকাল। বিশজন অফিসার, সবাই অভিজ্ঞ, সবাই চুপচাপ। কিন্তু সুমন জানত, এই অপারেশনের আসল চালক তারা নয়। আসল চালক হল উপরমহলের অলিখিত নির্দেশ, যা শহরের পুরনো রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোকে রাতারাতি উল্টে দিতে চায়। এই রেইড শুধু ভিক্টরকে ধরার জন্য নয়, এটি ছিল একটি নতুন যুগের সূচনা, যেখানে শহরের নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি অন্য হাতে চলে যাবে।
​&quot;আমরা যাচ্ছি, কেবল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। অন্য কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই। কেউ বাড়াবাড়ি করলে, সে আমার দলের লোক হলেও ছাড় পাবে না। রেডি?&quot;

​নূর সুমনের গলা পাথরের মতো শক্ত। সে যখন টিমের দিকে তাকাচ্ছে, তখন তার চোখ এড়িয়ে গেল না কনস্টেবল নূরনবী-র আতঙ্কিত দৃষ্টি। নূরনবী নতুন, মাত্র মাসখানেক হয়েছে চাকরিতে। তার ইউনিফর্ম এখনও ঝকঝকে, এখনও কোনো রক্তের দাগ লাগেনি। সুমনের ভয় ছিল, আজকের রাতে হয়তো সেই দাগ লেগে যাবে, আর সেই দাগ মুছতে মুছতেই নূরনবী একদিন সুমনের মতো অনুভূতিহীন হয়ে যাবে।

​গুদাম পর্যন্ত রাস্তাটা ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন। রেইডের গাড়িগুলো হেডলাইট নিভিয়ে নিঃশব্দে এগোচ্ছে, যেন তারা শহরের গভীরের কোনো গোপন রোগের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে এগোচ্ছে।

​ভিক্টর সান্যাল। মানুষটা ছিল শহরের নোংরা নালার মতো  সবাই জানত সে আছে, কিন্তু কেউ তাকে স্পর্শ করতে চাইত না। তার প্রভাব পুলিশের সদর দপ্তর থেকে শুরু করে রাজ্যের মন্ত্রীর ড্রয়িংরুম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সুমন জানত, আজকের এই রেইড একটা অসম্ভব কাজ, কারণ হয় ভিক্টর আগেই খবর পেয়ে গেছে, না হয় ভিক্টরের লোক এই দলেই লুকিয়ে আছে।

​গুদামের সামনে এসে গাড়ি থামল। চারিদিক নিস্তব্ধ। সুমন হাত দিয়ে নির্দেশ দিল। দরজা ভাঙার দলটা ধাতব শব্দ করে তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। সুমনের দল অনুসরণ করল।
​ভেতরের দৃশ্যটা ছিল সিনেমার সেট-আপের মতো। সারি সারি বাক্স, তাতে কিসের চিহ্ন তা অনুমান করা কঠিন। একপাশে বেশ কিছু কম্পিউটার আর মনিটর, বোঝা যায় এখান থেকেই পুরো অবৈধ নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রিত হতো। কিন্তু, গুদামটা ছিল একদম খালি। ভিক্টর নেই, তার লোক নেই, এমনকি চোরাচালানের মালও নেই।

​সুমনর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। উপরমহল চেয়েছিল সে ভিক্টরের ঘাঁটিতে যাক, প্রমাণ করুক যে ভিক্টরের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ভিক্টর পালিয়ে গেছে, এবং যাওয়ার আগে একটা ফাঁদ পেতে গেছে।
​ঠিক তখনই, গুদামের পিছনের দরজা থেকে তীব্র গুলির শব্দ শুরু হলো।

​সুমন দেয়ালের আড়ালে ঝাঁপ দিল, ঠিক তার পেছনেই নূরনবী। নূরনবী ভয়ে কাঁপছে।
​&quot;স্যার, এ তো অ্যামবুশ! ওরা কোত্থেকে এলো?&quot; নূরনবী ফিসফিস করে বলল।
​&quot;চুপ! পিছনে ফিরে দেখার সময় নেই। নূরনবী, তুমি এই গেটের দিকে দেখবে। আর গুলি চালানোর আগে নিশ্চিত হবে, ওটা তোমার লক্ষ্য!&quot; সুমন চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলল।

​পিছনের দরজা দিয়ে একে একে ভিক্টরের প্রায় পঁচিশ-ত্রিশজন অস্ত্রধারী লোক ভেতরে ঢুকতে শুরু করেছে। তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট – কাউকে জীবিত রাখা নয়।
​সংঘর্ষটা ছিল ভয়াবহ। গুদামের মধ্যে ধাতব প্রতিধ্বনি তুলে গুলির আওয়াজ, কাঁচ ভাঙার শব্দ আর মানুষের চিৎকার। সুমন ছিল পুরনো ধাঁচের পুলিশ অফিসার, যিনি শ্যুটিং-এর চেয়ে স্ট্র্যাটেজিতে বেশি বিশ্বাস করতেন। কিন্তু আজকের রাতে স্ট্র্যাটেজির জায়গাটা বুলেট নিয়ে নিয়েছে।

​সুমন নেতৃত্ব দিল, এক কোণ থেকে অন্য কোণে যাওয়া, আড়াল নেওয়া, এবং অত্যন্ত নির্ভুলভাবে পাল্টা ফায়ার করা। সে জানত, এই অন্ধকার গুদামে তারা শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, বারুদেও পিছিয়ে আছে।
​হঠাৎ, ডানদিকে এক চিৎকার। কনস্টেবল প্রীতম বুক চেপে ধরে পড়ে গেল। তার ইউনিফর্ম মুহূর্তে রক্তে ভিজে উঠল। নূরনবী চিৎকার করে তার দিকে যেতে চাইল, কিন্তু সুমন তাকে টেনে ধরল।

​&quot;যেতে পারবে না! ওটা শেষ!&quot; সুমনর গলায় কোনো আবেগ ছিল না। সে শুধু দেখছিল, কীভাবে একটা তাজা প্রাণ শেষ হয়ে গেল।
​এই সময়, ভিক্টরের লোকগুলো ভেতরে গ্রেনেড নিক্ষেপ করল। প্রথম গ্রেনেডটা ফাটতেই গুদামের কংক্রিটের ছাদ কেঁপে উঠল। ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সুমন বুঝতে পারল, তার দলটা ভেঙে যাচ্ছে।

​সময় দ্রুত চলে যাচ্ছিল। বাইরে পুলিশের আরও গাড়ি আসছে, সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে, এই গুদামের ভেতরে, সুমন আর তার বাকি দশজন অফিসার একা।

​ভিক্টরের লোকেরাও এখন মরিয়া। তারা জানে বাইরে থেকে আরও সাহায্য আসছে।
​সুমন চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য ভাবল। সে এখন জানে কেন এই রেইড ফাঁদ ছিল। উপরমহল জানত ভিক্টর আজ রাতে নেই। কিন্তু তারা চেয়েছিল, ভিক্টরের দল এবং সুমনের দল দু’পক্ষের মধ্যেই একটি বড় সংঘর্ষ হোক। ফলস্বরূপ, শহরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এর সুযোগ নেবে নতুন এক রাজনৈতিক শক্তি, যারা এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করবে।
​সুমনর রাগ তার ভয়কে ছাপিয়ে গেল। সে দেয়াল থেকে উঠে দাঁড়াল।
​&quot;নূরনবী! আমার পেছনে এসো! ওরা ভেবেছে আমরা মরব! আমরা মরব না! আমরা ওদের শেষ দেখব!&quot;

​সুমন ফায়ার করতে করতে সামনের দিকে এগোতে শুরু করল। সে কোনো হিসেব করছিল না, শুধু বাঁচতে এবং বাকিদের বাঁচাতে চাইছিল। তার ইউনিফর্মে তখন প্রীতমের ছিটকে আসা রক্ত, আর তার কপালে নিজের ঘাম। সেই মুহূর্তে তার ইউনিফর্ম হয়ে উঠল এক রক্তমাখা প্রতীক, যা প্রমাণ করছিল এই যুদ্ধে কেউই নৈতিকভাবে জয়ী নয়।

​একটি কঠিন মুহূর্ত। সুমন দেখল, দুজন অস্ত্রধারী গুদামের মুখ্য কন্ট্রোল রুমের দিকে ছুটছে। তারা নিশ্চিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ডিভাইস ধ্বংস করতে চাইছে।
​সুমন নূরনবীকে কন্ট্রোল রুমের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিল।

​&quot;ওখানে যাও! ওদের থামাও! ওই কন্ট্রোল রুম ওদের শেষ চাল, নূরনবী!&quot;
​নূরনবী দ্বিধাগ্রস্ত, কিন্তু সুমনের চোখে দেখল এক তীব্র প্রতিজ্ঞা। সে মাথা নেড়ে গুদামের বামপাশ ধরে কন্ট্রোল রুমের দিকে ছুটল।

​সুমন আর বাকি অফিসারদের কভার ফায়ারের সুযোগ নিয়ে নূরনবী কন্ট্রোল রুমে পৌঁছাল। ভেতরে দুজন লোক তখনও ফাইল ছিঁড়ছে এবং কম্পিউটার হার্ড ড্রাইভ ভাঙছে। নূরনবী তার বন্দুক হাতে ভেতরে ঢুকল। ভিক্টরের লোকগুলো তাকে দেখে চমকে উঠল।

​প্রথম লোকটা বন্দুক তোলার আগেই নূরনবী গুলি করল। নির্ভুল নিশানায় লোকটা পড়ে গেল। অন্যজন টেবিলের ওপর থেকে লাফিয়ে এসে নূরনবীকে ধাক্কা দিল।
​নূরনবী-র ইউনিফর্ম দেওয়ালে ঘষা খেল। তাদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হলো। নূরনবী নতুন হলেও তার ট্রেনিং ছিল কঠিন। সে লোকটার হাত মুচড়ে ধরল, এবং ঠিক সেই সময়ে, তার বন্দুকের নল লোকটার দিকে তাক করে গুলি করল।

​কন্ট্রোল রুমের মধ্যে তখন ধোঁয়া আর রক্তের গন্ধ। নূরনবী দেখল, একটি ভাঙা হার্ড ড্রাইভ মেঝেতে পড়ে আছে। কিন্তু একটি ছোট ইউএসবি ড্রাইভ তখনও কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত। এটা নিশ্চয়ই তাদের শেষ চেষ্টা ছিল।
​নূরনবী কাঁপতে কাঁপতে ইউএসবি ড্রাইভটা বের করল এবং সেটা তার জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে রাখল। এই ড্রাইভেই ছিল ভিক্টরের সাম্রাজ্যের সমস্ত তথ্য।
​বাইরে, গুলির শব্দ কমে এসেছে। পুলিশের অতিরিক্ত বাহিনী এসে গেছে। ভিক্টরের লোকগুলো এখন আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অনেকেই ধরা পড়েছে, বাকিরা মরেছে।

​ভোর হচ্ছে। কুয়াশা কেটে যাচ্ছে। গুদামের বাইরে তখন সাংবাদিক, পুলিশের উঁচু কর্মকর্তারা আর সাধারণ মানুষের ভিড়। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর ফ্ল্যাশলাইট পুরো এলাকাটাকে একটা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো দেখাচ্ছে।

​সুমন গুদামের বাইরে বেরিয়ে এল। তার ইউনিফর্ম ছেঁড়া, রক্তে মাখা – নিজের রক্ত নয়, সহকর্মীর রক্ত। সে দেখল, কমিশনার নিজে এসেছেন।

​কমিশনার সুমনের দিকে এগিয়ে এলেন। তার চোখে কোনো কৃতজ্ঞতা বা উদ্বেগ ছিল না, শুধু ছিল হিসেব।

​&quot;ইন্সপেক্টর সুমন, আপনি বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। অপারেশন নাইটফল সফল। ভিক্টরের সাম্রাজ্য আজ থেকে শেষ।&quot;
​সুমন ক্লান্ত চোখে কমিশনারের দিকে তাকাল।
​&quot;স্যার, প্রীতম মারা গেছে। আরও দুজন গুরুতর আহত।&quot;

​কমিশনারের মুখ থেকে কোনো অভিব্যক্তি এল না। &quot;দেশের জন্য এটাই স্বাভাবিক। তবে চিন্তা করবেন না, আমরা সবকিছু ঢেকে দেব। ভিক্টর সান্যালকে &#039;পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলি করে মারা গেছে&#039; বলে দেখানো হবে।&quot;
​সুমন বুঝতে পারল। ভিক্টর সান্যাল আজ থেকে কেবল একটি নাম নয়, একটি শহীদ—নতুন ক্ষমতার উত্থানের জন্য এক বলিদান। আজকের রেইড ভিক্টরকে শেষ করতে আসেনি, এসেছিল ক্ষমতাকে এক হাত থেকে অন্য হাতে তুলে দিতে। এবং এই পুরো প্রক্রিয়াটায়, সুমনের ইউনিফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে রক্ত লেগেছে।

​সুমন চুপচাপ তার দলের দিকে তাকাল। নূরনবী তখন তার পাশে দাঁড়িয়ে। তার চোখ শুকনো, কিন্তু ভেতরে এক নতুন ধরনের ভয়।
​সুমনর দৃষ্টি গেল তার নিজের ইউনিফর্মের দিকে। রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আসছে। সে হঠাৎ নূরনবীকে ফিসফিস করে বলল, &quot;নূরনবী, তুমি ইউএসবি ড্রাইভটা কাউকে দেখাবে না। এটা তোমার কাছে থাক। এটা প্রমাণ, আসল নকশাটা এখনও আমরা জানি না।&quot;

​নূরনবী ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। সে বুঝল, এই শহরের নকশা কেবল গুদামের মানচিত্রে আঁকা ছিল না, তা ছিল প্রতিটি ইউনিফর্মের রক্তমাখা দাগে লেখা। এক রাতের রেইড শহরটার কেবল বাহ্যিক কাঠামোই নয়, এর নৈতিক কাঠামোটাও বদলে দিয়েছে। আর সেই নতুন, রক্তমাখা নকশার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকল সুমন আর নূরনবী।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/254494/</link>
				<pubDate>Tue, 16 Jun 2026 13:12:22 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>“রক্তমাখা ইউনিফর্ম”</p>
<p>রাত তখন প্রায় দুটো। ডাস্টবিন থেকে উঠে আসা পচা গন্ধ আর টহলদারি পুলিশের বাঁশির তীক্ষ্ণ শব্দ ছাড়া শহরটা ঘুমিয়ে ছিল। সে ঘুম যেমন ছিল নিশ্চিন্ত, তেমনই ছিল ভঙ্গুর। কারণ, শহরের স্নায়ুতন্ত্রের কেন্দ্রে, &#8216;অপারেশন নাইটফল&#8217;-এর শেষ প্রস্তুতি চলছিল।</p>
<p>​ইউনিফর্ম পরে দাঁড়িয়ে ছিল ইন্সপেক্টর নূর সুমন। বছর পঁয়ত্রিশের যুবক। তার উর্দি ছিল&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-254494"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/254494/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">fd168cf1e9b812840b42d7c0f22d19d5</guid>
				<title>হাফ লেডিস? না, আমি পুরোপুরি আমি!


রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে নূরনবী আজ হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। পেছন থেকে একদল তরুণের উচ্চহাস্য ভেসে আসে, সঙ্গে তীক্ষ্ণ একটি মন্তব্য,

“দেখ দেখ, ওটা সেই হাফ লেডিস! হা হা হা!”
তারা নিজেদের মধ্যে হেসে গড়াগড়ি খায়।
নূরনবীর মুখ থমথমে হয়ে ওঠে। সে পেছনে তাকায় না, প্রতিবাদও করে না; ঠোঁটের কোণে কেবল এক চিলতে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু ওটা কি আদেও হাসি? না, ওটা আসলে একটা চাপা কান্না, যা সে পরম মমতায় মুখের অবয়বে এনে বুকের গভীরতম প্রকোষ্ঠে চেপে রাখে।

“হাফ লেডিস!”  এই শব্দটা আজ আর তার কানে কেবল কাঁটা হয়ে বিঁধে না, বরং ধারালো ছুরি হয়ে বুকের ভেতর ক্ষত তৈরি করে।

সে মনে মনে ভাবে, মানুষ বড় অদ্ভুত! তারা বোঝে না যে একটা কণ্ঠের কোমলতা মানেই মেয়েলি স্বভাব নয়। তারা শেখে নি যে, নম্রতা কোনো দুর্বলতা নয়। মানুষ কেন বোঝে না যে, কেউ নিজের জন্মগত শারীরিক গঠন বা কণ্ঠস্বর নিজের ইচ্ছায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না আর তার কোনো প্রয়োজনও নেই।
নূরনবী ছোটবেলা থেকেই সমবয়সীদের চেয়ে একটু ভিন্ন ছিল। তার কণ্ঠটা ছিল সুমিষ্ট, কিছুটা পাতলা। চেহারায় এক ধরনের সহজাত কোমল ভাব। বন্ধুদের হুল্লোড়ের মাঝে সে ছিল শান্ত ও গম্ভীর। আর এই ভিন্নতার জন্যই সমাজ তাকে খোঁটা দিত— “তুই মেয়ে না ছেলে রে?” কেউ কেউ আড়ালে হাসাহাসি করত “দেখিস না, হাফ লেডিস একটা!”

স্কুলে পড়ার সময় একদিন ক্লাসের এক শিক্ষক পর্যন্ত সবার সামনে বলে ফেলেছিলেন,
“তোর কণ্ঠে তো পুরো মেয়েদের মতন সুর!”
মুহূর্তেই পুরো ক্লাসরুমে হাসির রোল উঠেছিল।

নূরনবী সেদিন বাসায় এসে ঘরের কোণে চুপচাপ চোখের জল ফেলেছিল। মা এসে পরম আদরে তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন,
“সোনা আমার, তোর এই কণ্ঠ আল্লাহর দেওয়া এক পবিত্র আমানত। মানুষ অশিক্ষিত আর বিবেকহীন বলেই এমন ঠাট্টা করে। তুই দেখিস, এই স্বর দিয়েই তুই একদিন গান গাইবি, কবিতা পড়বি, মানুষের মনে আলো ছড়াবি।”

সেদিন অবুঝ নূরনবী জানত না মায়ের মুখ থেকে বের হওয়া এই ‘স্বর’ শব্দটাই একদিন তার জীবনের পথচলার শক্তি হবে, আবার একই সাথে সমাজলড়াইয়ের মূল অস্ত্রও হয়ে উঠবে।

সময় তার নিজস্ব নিয়মে গড়ায়। কলেজে উঠে নূরনবী পুরোদমে আবৃত্তি আর গান শুরু করে। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় মঞ্চে দাঁড়িয়ে সে নিজের প্রতিভা দিয়ে সবার মন জয় করে নেয়। তবুও কিছু মানুষের বাঁকা নজর পিছু ছাড়ে না। পেছনে ফিসফিসানি শোনা যায়—
“ও তো হাফ লেডিস! ছেলেরা আবৃত্তি করবে গর্জন দিয়ে, ও করে ফিসফিসিয়ে!”

একদিন এক বড় আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় সে মঞ্চে উঠল। পিনপতন নীরবতায় সবাই তার পরিবেশনা শুনছিল। তার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের ভাঁজে ছিল কাব্যের শরীর আর হৃদয়ের গভীর স্পর্শ। অনুষ্ঠান শেষে এক শ্রোতা এসে বললেন,
“তোমার কণ্ঠটা ভীষণ সুন্দর হে তরুণ। কিন্তু বড্ড মেয়েলি শোনায়। একটু ‘ভয়েস ট্রেনিং’ নাও, পুরুষালি করো।”

নূরনবী শুধু মৃদু হাসল। কারণ, এই অযাচিত পরামর্শ আর কটূক্তির দেয়াল সে অনেক আগেই ডিঙিয়ে এসেছে। এখন মানুষের করতালির চেয়ে নিজের আত্মতৃপ্তিই তার কাছে বড় প্রাপ্তি।

এরই ধারাবাহিকতায় একদিন ঢাকা শহরের একটি স্বনামধন্য টেলিভিশন অনুষ্ঠান থেকে আমন্ত্রণ পেল সে। অনুষ্ঠানটির নাম ছিল ‘তারুণ্যের প্রতিভা’, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিভাবান তরুণ-তরুণীরা অংশ নিচ্ছিল।

মঞ্চের আলো ঝলমল করে উঠতেই সঞ্চালক নূরনবীকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বললেন,
“আজ আমাদের মাঝে আছেন ভোলার ছেলে কবি, আবৃত্তিকার ও গায়ক নূরনবী। তবে তার কণ্ঠ শুনলে আপনারা হয়তো কিছুটা বিভ্রান্ত হতে পারেন। কারণ সেটি বেশ সুরেলা এবং একটু... কী বলব, হাফ লেডিস টাইপের!”

নূরনবী তখনো মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে। সঞ্চালকের এই অপ্রত্যাশিত মন্তব্যে সে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বহু বছর ধরে জমিয়ে রাখা পুরোনো সব অপমান আর কষ্ট একযোগে তার বুকে ভর করল। কিন্তু পরক্ষণেই এক বুক আত্মবিশ্বাস নিয়ে সে নিজেকে গুছিয়ে নিল। ধীরস্থির পায়ে মঞ্চে উঠে মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে বলল:
 “ধন্যবাদ আমাকে ‘হাফ লেডিস’ বলে সম্বোধন করার জন্য। তবে আজ এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিতে চাই আমি পুরোপুরি একজন পুরুষ, পুরোপুরি একজন মানুষ, এবং সবচেয়ে বড় কথা আমি পুরোপুরি ‘আমি’।

আমার প্রতিভা, আমার কণ্ঠ আর আমার আত্মা এই তিনের সমন্বয়ে আমি একজন পরিপূর্ণ সত্তা। মানুষকে যদি ছোট করতেই হয়, তবে তার কণ্ঠস্বর বা চেহারা দেখে নয়, তার নিচু মানসিকতা আর আচরণ দেখে বিচার করুন। আমি জন্মেছি পুরুষ হয়ে, মরবও পুরুষ হয়েই। কিন্তু আমার আসল পরিচয় শুধু লিঙ্গে নয়, আমার পরিচয় আমি একজন শিল্পী।
 আপনাদের ‘হাফ’ শব্দের সংকীর্ণ ঘৃণায় আমার ‘পূর্ণতা’ কখনও হারিয়ে যাবে না।”

পুরো মিলনায়তন জুড়ে এক মুহূর্তের স্তব্ধতা নেমে এল। আর তার ঠিক পরের মুহূর্তেই যেন বজ্রপাতের মতো করতালির ঝড় উঠল।
সেদিনের সেই বলিষ্ঠ বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। চারদিকে শিরোনাম ওঠে: 

“আমি হাফ লেডিস না, আমি পূর্ণ একজন মানুষ”  নূরনবী।  সমাজ যেন নতুন করে অনুধাবন করতে শিখল সব কণ্ঠ, সব চেহারা কিংবা সব আচরণকে এক জোড়াতালির ছাঁচে ফেলা যায় না।

আজ নূরনবী নিজের শহরে একটি স্বনামধন্য সাহিত্য সংগঠন পরিচালনা করে। বহু তরুণ-তরুণী সেখানে আসে আবৃত্তি, গান আর বক্তৃতার শিল্পকলা শিখতে। একদিন এক কিশোর দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে তাকে প্রশ্ন করল,
“ভাইয়া, আমার কণ্ঠটা একটু বেশিই কোমল। লোকে এই নিয়ে খুব হাসাহাসি করে। আমি কী করব?”

নূরনবী তার কাঁধে হাত রেখে পরম ভরসায় জবাব দিল,
“তুমি প্রকৃতিগতভাবে যা, সেটাই তোমার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। দুনিয়ার মানুষ হাসলে হাসুক। মনে রাখবে, তোমাকে জয় করতে হবে তোমার এই নিজস্ব স্বরেই, তোমার এই রূপেই, সম্পূর্ণ নিজের মতো করে।”
সে জানে, সমাজ রাতারাতি বদলে যায় না। এখনো হয়তো চেনা রাস্তায় হাঁটলে কেউ কেউ আড়ালে-আবডালে ফিসফিস করে বলে— “ওই দেখ, হাফ লেডিস যায়!”

কিন্তু এখন আর নূরনবীর মাথা নিচু হয় না। সে বুক চিতিয়ে, নিজের আত্মসম্মান ও গর্ব নিয়ে হেঁটে চলে। কারণ সে জানে, সে কারও অর্ধেক কিছু নয়। সে সমাজের তৈরি কোনো সস্তা সংজ্ঞার ‘লেডিস’ নয়। সে তার নিজের মতো করেই অনন্য, নিজের মতো করেই সুন্দর ঠিক যেমনটা তার কণ্ঠ, আর ঠিক যেমনটা তার পবিত্র মন।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/254390/</link>
				<pubDate>Mon, 15 Jun 2026 07:48:03 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> হাফ লেডিস? না, আমি পুরোপুরি আমি!</p>
<p>রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে নূরনবী আজ হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। পেছন থেকে একদল তরুণের উচ্চহাস্য ভেসে আসে, সঙ্গে তীক্ষ্ণ একটি মন্তব্য,</p>
<p>“দেখ দেখ, ওটা সেই হাফ লেডিস! হা হা হা!”<br />
তারা নিজেদের মধ্যে হেসে গড়াগড়ি খায়।<br />
নূরনবীর মুখ থমথমে হয়ে ওঠে। সে পেছনে তাকায় না, প্রতিবাদও করে না; ঠোঁটের কোণে কেবল এক চিলতে মৃ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-254390"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/254390/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>8</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">f65029b323fe091302257312d1734323</guid>
				<title>“শেষ ল্যাম্পপোস্টের নিচে তুমি”

আমি এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে শেষ ল্যাম্পপোস্টটা দেখা যায় না। কিন্তু আমার মন জানে, এখনও যদি বৃষ্টি হয়, ওই ল্যাম্পপোস্টটার হলদেটে আলোর নিচে শ্যাওলা-ধরা ফুটপাথটা নিশ্চয়ই চিকচিক করে ওঠে। শীতকালে ওর চারপাশে ভিড় করে আসে জোনাকিরা, আর গরমের রাতে পুরনো দিনের মতো এখনও হয়তো কোনও যুবক তার প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করে হাতে দুটো ভাঁজ করা চিঠি আর বুকে একরাশ চাপা অস্থিরতা। সেই যুবকটা আমিই ছিলাম, অথবা আমিই হতে চেয়েছিলাম।
প্রথমেই মনে পড়ে দীপের কথা। ও ছিল আমাদের ত্রয়ীর মেরুদণ্ড। আমি ছিলাম একটু চুপচাপ, ধ্যানী কবিতা লিখতাম, আর নীলা ছিল স্বপ্নের মতো আর্দ্র, ছায়াঘেরা। 

আমাদের বাড়িগুলো ছিল একটা পুরোনো লেনের শেষ মাথায়। আর সেই লেনের শেষ প্রান্তে ছিল ওই ল্যাম্পপোস্টটা। একটা সময় ছিল যখন দিনের শেষে আমরা তিনজন সেখানে না দাঁড়ালে দিনটা সম্পূর্ণ হতো না। কোনো গোপন পরিকল্পনার জন্ম হতো ওখানে, কিংবা সদ্য দেখা কোনো সিনেমার রিভিউ। দীপের উচ্চকণ্ঠ হাসিটা এখনও আমার কানে বাজে। ওর চোখে ছিল পৃথিবীর প্রতি এক তীব্র আগ্রাসন সবকিছু জয় করার এক নেশা।

আমাদের যৌবনের সমস্ত এলোমেলো আবেগ, সমস্ত নীরব ভাষা, ওই আলো-ছায়ার খেলার মধ্যেই বেড়ে উঠেছিল।
আমার আর নীলার প্রেমের বীজ উপ্ত হয়েছিল অনেকটা দীপের মাধ্যমেই। আমি নীলাকে দেখতাম, কিন্তু বলার সাহস পেতাম না। আমার মনের কথাগুলো যেন কেবল দীপের কাছেই পৌঁছাত—ও-ই ছিল আমার বার্তাবাহক, আমার অপ্রকাশিত ভাষার স্বরলিপি।

&quot;নীলা, তোর জন্য রূপম একটা গান লিখেছে, শোন...&quot;
দীপের গলাটা ভেসে আসত দূর থেকে, আর আমি লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতাম। নীলা শান্ত চোখে তাকাত, ওর কালো চোখ দুটোয় যেন লক্ষ লক্ষ তারা জ্বলত, আর সেই তারার আলোয় আমার সমস্ত দ্বিধা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে যেত।

একদিন দীপের সাইকেলটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সেদিন সন্ধ্যা নামার পর শুধু আমি আর নীলা হেঁটেছিলাম। সেদিন বৃষ্টি ছিল না, বাতাসও ছিল না। প্রকৃতি যেন শ্বাস চেপে ধরেছিল আমাদের প্রথম নিরাবরণ নীরবতাটুকু শোনার জন্য।
&quot;তোর কবিতাগুলো খুব সুন্দর,&quot; নীলা বলেছিল।

আমার হাত-পা তখন কাঁপছিল। আমি কেবল মাথা নেড়েছিলাম।

&quot;আর ওই শেষ ল্যাম্পপোস্টের কাছেই কেন যেন সব ভালো কথা মনে আসে, তাই না?&quot;
আমি সাহস করে ওর দিকে তাকালাম। &quot;জানিস নীলা, কখনও কখনও মনে হয় ল্যাম্পপোস্টটা শুধু আমাদের জন্যই জ্বলে। ওটা সব দেখে, সব জানে... কিন্তু চুপ করে থাকে।&quot;

আমাদের প্রেমটা ছিল ওই ল্যাম্পপোস্টের আলোর মতোই—ছায়া মাখা, নরম, কিন্তু চারপাশের অন্ধকারকে ভয় পায় না। আমরা কখনোই হাত ধরি নি, কখনোই সরাসরি প্রেম নিবেদন করি নি। আমাদের প্রেম ছিল একে অপরের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকা, দীর্ঘ নীরবতা, আর দীপের অনুপস্থিতিতে ঘটা সেইসব সংক্ষিপ্ত মুহূর্তগুলো।

কিন্তু সময়টা একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। সেটা আমরা ভালো করেই জানতাম। আর দীপের জীবনের গতি ছিল আমাদের চেয়েও দ্রুত।

দীপের জীবনের মোড় ঘুরে গেল খুব আচমকা। ও কোনো এক অদ্ভুত নেশায় মেতেছিল পাহাড় দেখবে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যাবে। ওর কাছে আমাদের এই শহরটা, আমাদের এই ল্যাম্পপোস্টটা—সবটাই ছিল একটা পুরোনো, বাঁধা জীবন। একদিন খুব ভোরে ও চলে গেল। কাউকে কিছু না বলে। শুধু একটা চিরকুট রেখে গেল আমার টেবিলে, সেখানে লেখা ছিল: &quot;আলোর নিচে বেশিদিন থাকা যায় না, রূপম। ছায়াগুলো বড় অস্বস্তি দেয়। কিন্তু তোর আর নীলার ছায়াটা যেন চিরকাল ওই ল্যাম্পপোস্টের নিচে থাকে। আমি ফিরলে যেন সবটা একই রকম দেখতে পাই।&quot;

দীপের চলে যাওয়াটা ছিল আমাদের জীবনে প্রথম বড়সড় আঘাত। ও শুধু আমার বন্ধু ছিল না, ছিল আমাদের মধ্যেকার সেতু। ও চলে যেতেই আমাদের ত্রয়ীর একটা বাহু ভেঙে পড়ল।

প্রথম কয়েকমাস আমরা অপেক্ষা করেছিলাম। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতাম—আমি আর নীলা। মনে হতো এই বুঝি দীপের পরিচিত সাইকেলের বেলের আওয়াজ শোনা যাবে।
অপেক্ষাগুলোই আসলে &#039;হারিয়ে যাওয়া সময়&#039; হয়ে ফিরে আসে।

দীপের অনুপস্থিতিতে আমার আর নীলার সম্পর্কটা আরও নিবিড় হয়ে উঠল, কিন্তু একই সাথে আরও কঠিন। দীপের চলে যাওয়ার শূন্যতাটা আমাদের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে গেল। এখন আমি চাইলে নীলার হাত ধরতে পারতাম, বা আমার মনের কথাগুলো স্পষ্ট করে বলতে পারতাম। কিন্তু দীপের স্মৃতি আমাদের দুজনকে বেঁধে রাখল এক নীরব অপরাধবোধে। যেন দীপের স্বপ্নের জগৎটা আমাদের দুজনকে একসাথে থাকতে বারণ করত, যতক্ষণ না ও ফিরে আসে।
সেই সময়টায় ল্যাম্পপোস্টের আলোটা যেন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। ওর নিচে এখন আর হাসি নেই, নেই কোনো দুষ্টু পরিকল্পনা। শুধু দীর্ঘশ্বাস আর প্রশ্ন।

একদিন নীলা আমাকে বলল, &quot;দীপের কথা খুব মনে পড়ছে, রূপম। ও না থাকলে যেন সব আলো মরে যায়।&quot;

আমি ওর দিকে তাকিয়েছিলাম। ওর চোখ দুটো ছলছল করছিল। সেদিন আমার বুকে একটা প্রচণ্ড কষ্ট হয়েছিল। ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের দ্বন্দ্বে আমার তরুণ প্রেমটা যেন শ্বাস নিতে পারছিল না। আমি জানতাম, আমি যদি ওকে সেদিনই আমার ভালোবাসার কথা জানাতাম, তবে ও দীপের স্বপ্নটাকে ঠেলে দিয়ে হয়তো আমার কাছে আসত। কিন্তু আমি পারলাম না। আমার বন্ধুত্বের ঋণ, না-ফেরা সময়ের প্রতি আমার আনুগত্য আমাকে সেদিন নীরব থাকতে বাধ্য করল।
আমাদের সম্পর্কের শেষ মুহূর্তগুলোও ওই ল্যাম্পপোস্টের নিচে।

তখন আমি কলেজে। নীলা তার বাবার বদলির জন্য শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। বিদায়ের দিন বিকেলে, যখন শেষবারের মতো সূর্য ডুবছিল, আমরা দুজনে গিয়েছিলাম সেই ল্যাম্পপোস্টটার নিচে।
পুরো রাস্তাটা ছিল জনশূন্য। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বিকেলের লাল আলোটা এসে পড়েছিল নীলার মুখে। ও একটা সবুজ শাড়ি পরেছিল, আর ওর খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছিল।

&quot;রূপম,&quot; ও ডাকল। ওর গলায় এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।

আমি ওর দিকে তাকালাম। আমার বুকের ভেতরটা তখন ধুকপুক করছে। এই তো শেষ সুযোগ! এই মুহূর্তে আমাকে বলতে হবে &#039;নীলা, যেও না। তোমাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব অর্থহীন।&#039;

কিন্তু আমার ঠোঁট দুটো যেন সেলাই করা ছিল। আমি কেবল বললাম, &quot;সাবধানে থেকো।&quot;

নীলা মৃদু হাসল। সেই হাসিটার মধ্যে ছিল একরাশ অভিযোগ, একরাশ না-বলা কথা। ও হয়তো আমার মুখ থেকে কিছু একটা শোনার অপেক্ষা করছিল। ও হয়তো চেয়েছিল, আমার অব্যক্ত প্রেমটা শেষবারের মতো চিৎকার করে উঠুক।

&quot;রূপম, তুই জানিস,&quot; নীলা বলল, &quot;ওই ল্যাম্পপোস্টটা কেন শুধু আমার চোখে পড়ে? কারণ, ওটা আলো দেয় বলেই চারপাশের অন্ধকারটাকে আরও স্পষ্ট করে দেখায়।&quot;
ও দাঁড়িয়েছিল ল্যাম্পপোস্টের ঠিক নিচে। ওর মুখটা পুরোপুরি আলোয় ভেজা। আমি দাঁড়িয়েছিলাম ছায়ায়। আমাদের দুজনের অবস্থানটা যেন আমাদের সম্পর্কের প্রতীক ছিল ও ছিল আলোর দিকে, আর আমি কেবলই ছায়া।

তারপর ও ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল। আর আমি... আমি শুধু দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি দেখলাম, নীলা লেনের মোড় ঘুরছে। ওর শাড়ির আঁচলটা শেষবারের মতো উড়ে গেল ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলোয়। আর তারপর, ও মিলিয়ে গেল।
আমি তখনও দাঁড়িয়ে ছিলাম। 

ল্যাম্পপোস্টের নিচে এখন আর কেউ নেই। দীপের চিরকুট, আমার না-বলা প্রেম, আর নীলার ফিরে না আসা সবকিছু একসাথে মিশে গেল সেই নির্জন ল্যাম্পপোস্টের নিচে। আর সেই মুহূর্ত থেকে আমি স্পষ্ট বুঝেছিলাম, যে সময় একবার হারিয়ে যায়, সে সত্যিই আর কখনও ফিরে আসে না। কারণ, যারা চলে যায়, তারা সবথেকে জরুরি মানুষগুলোকে সাথে নিয়েই যায়, আর রেখে যায় শুধু শূন্যতা আর শেষ ল্যাম্পপোস্টের নিচে জমে থাকা স্মৃতিরাশি।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/254297/</link>
				<pubDate>Sun, 14 Jun 2026 16:49:05 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>“শেষ ল্যাম্পপোস্টের নিচে তুমি”</p>
<p>আমি এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে শেষ ল্যাম্পপোস্টটা দেখা যায় না। কিন্তু আমার মন জানে, এখনও যদি বৃষ্টি হয়, ওই ল্যাম্পপোস্টটার হলদেটে আলোর নিচে শ্যাওলা-ধরা ফুটপাথটা নিশ্চয়ই চিকচিক করে ওঠে। শীতকালে ওর চারপাশে ভিড় করে আসে জোনাকিরা, আর গরমের রাতে পুরনো দিনের মতো এখনও হয়তো কোনও যুবক তার প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-254297"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/254297/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>7</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">86e8651a603350d77d77f0385cf1ea0a</guid>
				<title>পিতৃহারা আর্তনাদ 

​ঘর জুড়ে এক অচেনা, ভারী নীরবতা। যে ঘরে ফজরের আযানের পর বাবার কোরআন তেলাওয়াতের মৃদু গুঞ্জন শোনা যেত, যেখানে সকালে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার শব্দ আর বাজারের গল্প ছিল নিত্যদিনের ঘটনা, আজ সেই ঘরটাই যেন দম বন্ধ করে আছে। দেওয়ালের পুরাতন ঘড়িটার টিক টিক শব্দ এখন আর সময়ের হিসেব দেয় না, বরং প্রতিটি টিক যেন গভীর শূন্যতার জানান দেয় আরিশা-কে।

​প্রায় দু&#039;মাস হলো। বাবা আকমল হোসেন সাহেবের আকস্মিক ইন্তেকালের পর থেকেই তাদের পরিবার এক কঠিন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। প্রথম ক&#039;দিন আত্মীয়-স্বজনদের ভিড় ছিল, সমবেদনা ছিল, জানাজার পর সবাই আসছিলেন। এখন সবাই চলে গেছেন, পড়ে আছে শুধু শূন্যতা আর সেই অসহ্য নীরবতা। বাবার প্রিয় তসবিহ-টি শেলফের উপর তেমনই রাখা আছে, আরিশা সেটি স্পর্শ করতে ভয় পায়। তসবিহ-টা যেন বাবার হাতে ধরার স্মৃতি নিয়ে আছে, আর সেই স্পর্শের অনুপস্থিতিটাই এখন সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা।

​মা রওশন আরা বেগম শোকের ভারে একেবারেই ভেঙে পড়েছেন। সারাদিন জায়নামাজে বসে থাকেন, অথবা বিছানায় শুয়ে থাকেন চুপচাপ। দেওয়ালে ঝোলানো বাবার ছবির দিকে তাঁর একপলক দৃষ্টি। আরিশা যখন খাবার নিয়ে আসে, তিনি শুধু মাথা নেড়ে না করে দেন। ইশারায় বোঝান, তাঁর ক্ষিদে নেই। এই নীরব শোকের মোকাবিলা করা আরিশা&#039;র জন্য সবচেয়ে কঠিন। মায়ের চোখে পানি নেই, তাই হয়তো আরিশা&#039;র চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরে।

​ছোট ভাই ফারহান, সবে নবম শ্রেণিতে উঠেছে। বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে সে যেন দিকভ্রান্ত। হাসিখুশি, চঞ্চল ছেলেটা এখন ঘরে বসে থাকে, বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও মন থাকে দূরে কোথাও। আরিশা বোঝে, ফারহান বড় হয়ে উঠছে, আর এই কঠিন সময়ে তার মাথার উপর থেকে নির্ভরতার ছায়া সরে গেল। সে জানে না কীভাবে ভাইকে সান্ত্বনা দেবে, কারণ তার নিজেরই এখন নির্ভরতার প্রয়োজন।
​আরিশা, বাইশ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, এখন এই পরিবারের একমাত্র অভিভাবক। আকমল সাহেবের স্বল্প সঞ্চয় ছিল, কিন্তু তা দিয়ে আর ক&#039;দিন চলবে? প্রতি মাসের শুরুতেই বাড়ির মালিকের কড়া গলায় ভাড়া চাওয়ার অভ্যাসটা এখন আরও বেশি নির্মম মনে হয়। মাস গেলে ফারহানের স্কুলের বেতন, মায়ের ওষুধের খরচ, আর নিত্যদিনের বাজার খরচ সব কিছুর ভার এখন তার কাঁধে।

​একদিন গভীর রাতে, যখন চারদিক শান্ত, আরিশা বাবার পুরোনো কাঠের সিন্দুকটি খুলল। সিন্দুকের ভেতরের চেনা গন্ধ পুরোনো কাগজপত্রের গন্ধ, কর্পূরের মিশ্রিত ঘ্রাণ, আর বাবার কাপড়ের পরিচিত সুবাস তার বুক চিরে গভীর দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এলো। এই মুহূর্তে কান্নায় ভেঙে পড়লে চলবে না। সে সিন্দুকের তলা থেকে একটি ছোট চামড়ার ব্যাগ বের করলো। সেখানে পাওয়া গেল কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যাঙ্কের পাসবুক, আর একটি ভাঁজ করা চিঠি। বাবার অবসরকালীন সামান্য কিছু টাকা হাতে আসবে, কিন্তু তা পেতে দীর্ঘ সময় লাগবে। 

আর এই মুহূর্তে প্রয়োজন নগদ অর্থের।
​আরিশা সিদ্ধান্ত নিলো, তাকে কাজ খুঁজতে হবে। সেলাইয়ের কাজ সে খুব ভালো জানে। পাড়ার করিম চাচা-র দর্জির দোকানে গিয়ে কথা বলল। করিম চাচা আকমল সাহেবকে চিনতেন, তিনি প্রথমে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর বললেন, &quot;আরিশা মা, এই ছোট কাজ তুমি কেন করবে? তোমার বাবা শুনলে...&quot;

​আরিশা মাথা নিচু করে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, &quot;করিম চাচা, এখন ছোট-বড় ভাবার সময় নেই। আমার কাজ চাই। আমি মজুরিতে সেলাই করে দেব।&quot;
​করিম চাচা তাকে কিছু বাচ্চাদের ফ্রক আর কামিজ সেলাইয়ের কাজ দিলেন। মজুরি সামান্য, কিন্তু শুরুটা হলো।

​পরের দিন থেকে আরিশা&#039;র নতুন জীবন শুরু। ফজরের আযানের আগেই ঘুম থেকে উঠে যায়। মায়ের সেবা করা, ফারহানকে নামাজ পড়তে বসানো এবং জোর করে নাশতা করানো, তারপর সেলাই মেশিন নিয়ে বসা। মেশিনের একটানা প্যাডেলের আওয়াজ এখন তাদের ঘরে একমাত্র গতিশীলতার শব্দ। হাতের আঙুলে সুঁইয়ের খোঁচা লাগে, কাপড় সেলাই করতে গিয়ে পিঠে ব্যথা ধরে যায়, কিন্তু সে থামে না। 

প্রতিটি সেলাই যেন দারিদ্র্যের সাথে তার নিরলস সংগ্রাম, প্রতিটি ফোঁড় যেন বাবার অসমাপ্ত দায়িত্ব পালনের নীরব অঙ্গীকার।
​কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়লো। রাতের পর রাত জেগে কাজ করে তার চোখের নিচে কালি পড়েছে। একদিন সেলাই মেশিনটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। 

দীর্ঘদিনের ব্যবহার আর তেল না দেওয়ার কারণে মেশিন জ্যাম হয়ে গেছে। ফারহান ঘরে ছিল, সে দিদিকে শান্ত করতে এগিয়ে এলো। &quot;আপু, আমি কাল তেল এনে দেব। তুমি একটু বিশ্রাম নাও।&quot;

​ফারহানের এই আকস্মিক দায়িত্বজ্ঞান আরিশা&#039;কে আরও কষ্ট দেয়। এই বয়সে তার তো ক্রিকেট খেলা বা গল্পের বইয়ে ডুবে থাকার কথা ছিল। কিন্তু সে এখন সংসারের হাল বুঝতে শিখছে।
​সেদিন রাতে, আরিশা যখন সেলাইয়ের টুকরোগুলো গোছাচ্ছে, হঠাৎ ফারহান এসে তার পাশে দাঁড়ালো। &quot;আপু, আব্বা কেন চলে গেলেন?&quot;

​প্রশ্নটা যেন হিমশীতল তীরের মতো আরিশা&#039;র বুকে বিঁধলো। সে মাথা তুলে ভাইয়ের দিকে তাকালো। ফারহানের চোখে সেই শিশুসুলভ চঞ্চলতা নেই, আছে এক গভীর জিজ্ঞাসা, যা কোনো উত্তর খোঁজে না।
​আরিশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, &quot;আল্লাহর ইচ্ছা ছিল, ফারহান। আমাদের চেয়ে আল্লাহ তাঁকে বেশি ভালোবাসেন।&quot;

​ফারহান শান্তভাবে বলল, &quot;কিন্তু আপু, আব্বা তো বলেছিল, আমাকে ইঞ্জিনিয়ার হতে দেখবে। আমার রেজাল্ট বেরোলে মিষ্টি আর আমার পছন্দের সাইকেলটা কিনে দেবে। তাহলে কেন চলে গেলেন?&quot;
​আরিশা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। এই সময়টাতে বাবা হারানোর যে গভীর বেদনা ফারহানের মধ্যে চাপা ছিল, তা এখন কান্নার রূপে বেরিয়ে এলো। &quot;আপু, আমার খুব ভয় করছে। আব্বা ছাড়া...&quot; ফারহান ফিসফিস করে কাঁদতে লাগলো।

​আরিশা ফারহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। সে নিজেও নিঃশব্দে কেঁদে উঠলো। এই কান্না শুধু বাবার জন্য নয়, এই কান্না তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য, এই কান্না ফারহানের কেড়ে নেওয়া শৈশবের জন্য, এই কান্না মায়ের নীরব কষ্টের জন্য। এই কান্নাটাই হলো &#039;পিতৃহারা আর্তনাদ&#039;, যা শুধু ঘরের চার দেওয়াল আর নিরব আকাশ শুনতে পায়।
​এই ঘটনার পর আরিশা যেন নতুন করে মনোবল পেল। শুধু সেলাই করে সংসার চলবে না। তাকে আরও কিছু করতে হবে। সে বিকেলবেলা কয়েকটি বাচ্চাকে টিউশন দেওয়া শুরু করলো। তার নিজের লেখাপড়ার জ্ঞান কাজে লাগালো। চারজন ছাত্র এলো। তাদের পড়ানো শেষ করে যখন সে ফিরতো, তখন এশার আযানের সময়।
​এক সন্ধ্যায়, বাড়ি ফেরার পথে সে দেখল তাদের পুরনো প্রতিবেশী আক্তার সাহেব, যিনি বাবার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, অন্য একজন প্রতিবেশীর সাথে তার পরিবার নিয়ে আলোচনা করছেন।

​&quot;আহা, আকমলের স্ত্রী তো অসুস্থ। মেয়েটা একা আর কতদিন টানবে? শেষমেশ খুব কষ্ট হবে মনে হচ্ছে! কারো সাহায্য ছাড়া...&quot;
​কথাগুলো আরিশা&#039;র কানে তপ্ত সীসার মতো লাগলো। সে দ্রুত পা চালিয়ে বাড়িতে ফিরে এলো। ভেতরের রাগ আর অভিমান তার চোখের জল শুকিয়ে দিল। সাহায্য? কারো করুণা? না, তা হবে না। সে বাবার সম্মান রক্ষা করবে, নিজের মেহনতে তাদের মাথা উঁচু রাখবে।

​রাতে যখন সেলাই মেশিন চলছে, তখন সে নতুন করে প্রতিজ্ঞা নিলো। সেলাই মেশিনের একটানা ঘড়ঘড় শব্দে সে যেন বাবার কণ্ঠস্বর শুনতে পেল—&quot;আরিশা মা, ভয় পেও না। আল্লাহ্ তোমার সহায়। তুমি সাহসী মেয়ে।&quot;

​সেলাইয়ের সুতো ছিঁড়ে গেল। সে সুতো বাঁধল। সেলাই মেশিনের তেল ফুরিয়ে এলো, সে ফারহানকে বলে রাখল। শরীর দুর্বল হলো, কিন্তু সে থামল না। প্রতিটি বাধা তার ভেতরে আরও জেদ তৈরি করলো।
​মাস শেষ হলো। সেলাইয়ের মজুরি, টিউশনির টাকা, সব মিলিয়ে সে বাড়ির ভাড়া আর ফারহানের স্কুলের বেতন দিতে পারল। টাকাগুলো যখন বাড়ির মালিককে দিল, তখন আরিশা&#039;র মনে হলো, সে আজ বাবার অসমাপ্ত কাজটা শেষ করলো। মালিককে টাকা দেওয়ার পর হাতে যা রইল, তা দিয়ে চলতেই হবে।

​সেদিন রাতে মা রওশন আরা বেগম হঠাৎ উঠে বসলেন। আরিশা অবাক হয়ে দেখল, মা উঠে দাঁড়িয়েছেন, দীর্ঘ দু&#039;মাস পর। মা ধীরে ধীরে বাবার ছবিটার দিকে গেলেন। তারপর একটি দীর্ঘ, শীতল শ্বাস নিলেন।
​&quot;আকমল, তুমি দেখেছো? আমাদের মেয়েটা...&quot; বলতে গিয়ে তিনি আর পারলেন না, তার চোখে জল এলো। কিন্তু এবার সেই জল শুধু শোকের নয়, তাতে যেন এক চাপা গর্বের ঝলক।
​আরিশা ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরলো। মা ফিসফিস করে বললেন, &quot;এখন কাঁদিস না, মা। এখন তো তোর বাবার স্বপ্নগুলো পূরণ করার সময়। তুই একা নয়, আমি আছি, আর আল্লাহ্ আছেন।&quot;

​সেই রাতে আরিশা অনুভব করলো, পিতৃহারা আর্তনাদ তাকে দুর্বল করেনি, বরং তাকে ইস্পাতের মতো কঠিন করেছে। বাবা নেই, কিন্তু বাবার দায়িত্ব তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। সেলাই মেশিনের আওয়াজ আরও জোরে হলো। আগামীকালের সূর্য আরও কঠিন দিনের বার্তা নিয়ে আসবে, কিন্তু আরিশা এখন আর একা নয়। সে জানে, এই লড়াই তার একার নয়, এই লড়াই এই পরিবারের অস্তিত্বের।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/254224/</link>
				<pubDate>Sat, 13 Jun 2026 16:32:05 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>পিতৃহারা আর্তনাদ </p>
<p>​ঘর জুড়ে এক অচেনা, ভারী নীরবতা। যে ঘরে ফজরের আযানের পর বাবার কোরআন তেলাওয়াতের মৃদু গুঞ্জন শোনা যেত, যেখানে সকালে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার শব্দ আর বাজারের গল্প ছিল নিত্যদিনের ঘটনা, আজ সেই ঘরটাই যেন দম বন্ধ করে আছে। দেওয়ালের পুরাতন ঘড়িটার টিক টিক শব্দ এখন আর সময়ের হিসেব দেয় না, বরং প্রতিটি টিক যেন গভীর শূন্যতার জানান দেয় আরিশ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-254224"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/254224/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">9d76d88184c37b1021794b2af4f50cca</guid>
				<title>Md Nurnobi islam sumon and ফারহান সীমান্ত are now friends</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/254135/</link>
				<pubDate>Sat, 13 Jun 2026 06:04:07 +0600</pubDate>

				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">f9bc85359b001f96a71aa6a979c4937d</guid>
				<title>“আগুনের গলিতে বৃষ্টি”

হঠাৎ ভোর। শহরের রাস্তায় তখন অন্ধকারের মতোই বিষণ্ণতা। আগুন জ্বলছিল গলির কোণে, যেন পুরো শহর ছাপিয়ে আছে লাল রঙের আতঙ্ক। ধোঁয়া আর ধুলোর মধ্যে মানুষরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, কেউ কেউ চিৎকার করছে, কেউ বা নিজের ছোট ছোট পরিবারের জন্য হাহাকার করছে।

তিনতলার একটি ভবনের পাশে, আগুনের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসছিল এক অদ্ভুত মানুষ। চোখে ধূসর ক্যানভাসের মতো কিছু ঝলসানো ছায়া। শরীর যেন আগুনের তাপ সহ্য করতে পারে এমনভাবে তৈরি, কিন্তু তার পায়ে জল ছোঁয়া মাত্রই পোড়া ছাল ভিজে যাচ্ছে। মানুষগুলো তাকে দেখে থমকে দাঁড়াল। কেউ চিৎকার করল, কেউ পিছিয়ে গেল।

“কে তুমি?” এক বৃদ্ধ ভয়ে কণ্ঠ উচ্চ করল।

অদ্ভুত মানুষটি কোনো উত্তর দিল না। তার কণ্ঠ যেন আগুনের শব্দের মতো ভেসে উঠল, কিন্তু মানুষরা শুনতে পেল না। সে শুধু এগিয়ে গেল। ধোঁয়া, আগুন, আর ধুলো সবই যেন তার পথ থেকে সরে যাচ্ছিল।

শহরের একটি ছোট গলিতে পৌঁছালেই, অদ্ভুত মানুষটি হঠাৎ থেমে গেল। সে তার হাত ছড়িয়ে দিল, আর আকাশের দিকে তাকাল। তখনই শুরু হলো বৃষ্টি।

কিন্তু এই বৃষ্টি সাধারণ বৃষ্টি নয়। আগুনের জ্বলন্ত ছাইরঙের রাস্তায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গে, জলগুলো যেন আগুনকে নরম করে দিচ্ছে। ধোঁয়া আর আগুন মিলিয়ে মৃদু কুয়াশার মতো ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষজন বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। কেউ ভাবল, এটি কি দেবদূতের জাদু, কেউ ভাবল, এটিই কি স্বর্গীয় সাহায্য?

বৃষ্টি ধীরে ধীরে শহরের প্রতিটি অঙ্গনে প্রবেশ করল। আগুনের লাল রঙ ফিকে হতে শুরু করল। ধোঁয়া গলে গেল, ধুলো ঝরে গেল। আর সেই অদ্ভুত মানুষটি ভিজে ভিজে দাঁড়িয়ে রইল, যেন অপেক্ষা করছে।

শহরের মানুষগুলো তখন সাহস পেল। কেউ বালতি ভরে পানি নিয়ে এল, কেউ আগুন নেভানোর চেষ্টা করল। আগুনের সাথে লড়াই করতে করতে, তারা বুঝল—এই অদ্ভুত মানুষটি কোনো সাধারণ মানুষ নয়। তার উপস্থিতি যেন তাদের শক্তি দিচ্ছে।

শহরের এক কোণায় এক শিশুর চোখে কাঁদার জল আর বৃষ্টির জল মিশে এক অদ্ভুত দৃশ্য সৃষ্টি হলো। শিশুটি বলল, “দেখো, আগুনের মধ্যে বৃষ্টি পড়ছে।”

মানুষেরা তখন ধীরে ধীরে আগুন নেভানোর কাজে অংশ নিতে লাগল। অদ্ভুত মানুষটি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তার চোখে একটি মৃদু হাসি ধরা দিল, তবে তা কেউ ধরতে পারল না।

বৃষ্টি থামার পর, শহরের রাস্তাগুলো কাদা-মাটির সঙ্গে ভিজে গেল। আগুনের ছাই আর আগুনের ধোঁয়া মিশে শহরকে যেন নতুন রূপ দিল। মানুষগুলো তখন বুঝল, আগুনের মধ্যে দেখা এই অদ্ভুত মানুষটি ছিল তাদের জন্য একটি প্রতীক। তিনি কোনো দৈহিক বিপদ নয়, বরং আশা ও নতুন সূচনার প্রতীক।

মানুষেরা শহরের ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে তাকাল। তাদের চোখে আতঙ্কের পরিবর্তে সাহসের আভা। কেউ কেঁদে উঠল, কেউ হাসল। আগুন যে তাদের সবকিছু ছিন্ন করেছে, তা সত্য। কিন্তু সেই অদ্ভুত মানুষটির উপস্থিতি যেন শিখিয়েছে প্রত্যেক ধ্বংসের পর আসে পুনর্জন্মের বৃষ্টি।

শহর তখন ধীরে ধীরে জীবন্ত হতে শুরু করল। মানুষগুলো আগুনের ধ্বংস থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের বাড়ি, নিজের রাস্তা, নিজের জীবন পুনর্গঠন করল। আর সেই অদ্ভুত মানুষটি ধীরে ধীরে শহরের দৃশ্য থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

কেউ তাকে খুঁজল না। কেউ জানতে পারল না সে কে। তবে একটি কথাই সবাই মনে রাখল—আগুনের গলিতে বৃষ্টি এসেছে, আর এই বৃষ্টি মানুষের হৃদয়েও নতুন আলো জ্বালিয়েছে।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/254095/</link>
				<pubDate>Fri, 12 Jun 2026 18:32:22 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>“আগুনের গলিতে বৃষ্টি”</p>
<p>হঠাৎ ভোর। শহরের রাস্তায় তখন অন্ধকারের মতোই বিষণ্ণতা। আগুন জ্বলছিল গলির কোণে, যেন পুরো শহর ছাপিয়ে আছে লাল রঙের আতঙ্ক। ধোঁয়া আর ধুলোর মধ্যে মানুষরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, কেউ কেউ চিৎকার করছে, কেউ বা নিজের ছোট ছোট পরিবারের জন্য হাহাকার করছে।</p>
<p>তিনতলার একটি ভবনের পাশে, আগুনের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসছিল এক অদ্ভুত মানুষ। চোখে ধূ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-254095"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/254095/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>4</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">9c218ecfaa203ff7509c2c113b6a0714</guid>
				<title>ছারখার বস্তি
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন 

তখন ২০২০ সাল। আমি ইসলামিয়া হাই স্কুলের নবম শ্রেণির এক চঞ্চল শিক্ষার্থী। কৈশোরের সেই দিনগুলো বেশ আনন্দ আর উদ্দীপনার মধ্য দিয়েই কাটছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুলের বন্ধুদের আড্ডা আর নানা রকম কার্যক্রম—সব মিলিয়ে জীবনটা একটা চেনা ছন্দে চলছিল। নতুন বছরের শুরুতেই আমাদের বিদ্যালয়ে বার্ষিক খেলাধুলার ধুম লেগে গেল। দৌড়ঝাঁপ, হইচই আর মাঠ কাঁপানো সেই দিনগুলো শেষ হতে না হতেই স্কুল প্রাঙ্গণে এলো এক নতুন উন্মাদনা বিতর্ক প্রতিযোগিতা।

আমাদের বাংলা স্কুল প্রাঙ্গণে এই বিতর্ক সভা ও প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। বিতর্কের নাম শুনলেই মনের ভেতর এক অন্যরকম রোমাঞ্চ কাজ করত। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আমাদের দল গঠন করা হলো। আমরা দিন-রাত এক করে যুক্তির পিঠে যুক্তি সাজানোর সব রকম প্রস্তুতি ও কঠিন প্রশিক্ষণ শেষ করলাম। দলের দলনেতা ছিল আমাদের সহপাঠী বাবলু, আর আমি ছিলাম দলের দ্বিতীয় বক্তা।

অবশেষে এলো সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটি। সকাল থেকেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর নার্ভাসনেস কাজ করছিল। বিতর্কের উদ্দেশ্যে সকাল ঠিক ৮টায় আমরা সবাই আমাদের ইসলামিয়া হাই স্কুলে এসে জড়ো হলাম। সেখান থেকে স্যারদের তত্ত্বাবধানে রওনা হয়ে সকাল ৯টার মধ্যে আমরা মূল প্রতিযোগিতা ভেন্যু অর্থাৎ বাংলা স্কুলে পৌঁছে গেলাম। হলভর্তি দর্শক আর বিপক্ষ দলের ধারালো যুক্তি সব মিলিয়ে প্রতিযোগিতা জমে উঠেছিল একদম ক্ষুরধার। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে লড়েছিলাম। কিন্তু দিনটি হয়তো আমাদের ছিল না। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর, একেবারে শেষ মুহূর্তে সামান্য কয়েক পয়েন্টের ব্যবধানে আমরা হেরে গেলাম।
এতদিনের খাটাখাটনি আর এত কাছাকাছি এসে হেরে যাওয়ার পর আমাদের পুরো দলের মন খারাপ হয়ে গেল। বাবলুসহ আমরা সবাই তখন হারের সেই বিষণ্ণতা আর মন খারাপের রেশ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলাম। ঠিক তখনই আচমকা বজ্রপাতের মতো এক দুঃসংবাদ নিয়ে হাজির হলেন আমাদের শিক্ষক। স্যারের মুখটা তখন ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তিনি এসে আমাদের জানালেন, &quot;রূপনগর বস্তিতে ভয়াবহ আগুন লেগেছে!&quot;

খবরটা শোনা মাত্রই আমাদের দলনেতা বাবলুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। কারণ ওর পুরো পরিবার ওই রূপনগর বস্তিতেই ছোট একটা ঘরে থাকত। বাবলু মুহূর্তের মধ্যে গভীর এক অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠল এবং সবার সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়ল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং আমাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে স্যার আমাদের নিয়ে দ্রুত নিজেদের বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফিরে যাওয়ার জন্য রওনা হলেন।

আমরা যখন ফিরতি পথ ধরলাম, চারপাশের দৃশ্য দেখে বুকটা কেঁপে উঠল। পথিমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম অগ্নিকাণ্ডের সেই ভয়াবহ রূপ আর চারপাশের মানুষের বুকফাটা হাহাকার। পথচলতি বস্তিবাসীদের চোখে-মুখে চরম আতঙ্ক, নারীদের আর্তনাদ, আর তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে যেটুকু সম্ভব আসবাবপত্র ও মালামাল বের করে আনার এক আকুল, ব্যর্থ চেষ্টা। এই দৃশ্য দেখে বাবলু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চলন্ত রিকশা থেকেই ও হুট করে নেমে পড়ল এবং চোখের পলকে ভিড়ের মাঝে নিজের পরিবারের খোঁজে তার বাসার দিকে দৌড় দিল। আমরা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এর কিছু সময় পর আমরা অত্যন্ত ভারী মনে খবর পেলাম, বাবলুদের ঘরসহ ওদের সর্বস্ব সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তাসের ঘরের মতো বিলীন হয়ে গেছে ওদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু।

তখন বিকেল গড়িয়ে এসেছে। চারদিকের সেই কালো ধোঁয়া আর মানুষের কান্নার টানে আমিও আর ঘরে স্থির থাকতে পারলাম না। বিকেলের দিকে আমি নিজে সেই রূপনগর বস্তির ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, তা দেখার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। চোখের সামনে কোনো ঘরবাড়ি ছিল না, ছিল শুধু সারি সারি কালো কয়লা আর ধ্বংসস্তূপ। পুরো বস্তিটা আগুনে পুড়ে একেবারে ছারখার হয়ে গেছে। মানুষগুলো সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে।

দিনটি ছিল ২০২০ সালের ১১ই মার্চ। একদিকে বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর ছড়াচ্ছিল, আর অন্যদিকে চোখের সামনে এক নিমিষেই একঝাঁক মানুষের স্বপ্ন ও সংসার ছাই হয়ে যাওয়ার এই নির্মম দৃশ্য। আমার জীবনের ডায়েরিতে এই দিনটি এক গভীর ক্ষত এবং বিষাদময় এক স্মৃতি হয়ে চিরকাল রয়ে গেল।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/253578/</link>
				<pubDate>Mon, 08 Jun 2026 07:18:01 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>ছারখার বস্তি<br />
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন </p>
<p>তখন ২০২০ সাল। আমি ইসলামিয়া হাই স্কুলের নবম শ্রেণির এক চঞ্চল শিক্ষার্থী। কৈশোরের সেই দিনগুলো বেশ আনন্দ আর উদ্দীপনার মধ্য দিয়েই কাটছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুলের বন্ধুদের আড্ডা আর নানা রকম কার্যক্রম—সব মিলিয়ে জীবনটা একটা চেনা ছন্দে চলছিল। নতুন বছরের শুরুতেই আমাদের বিদ্যালয়ে বার্ষিক খেলাধুলার ধুম লেগে গেল&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-253578"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/253578/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>8</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">be92a3ea4f9d5610d2a438a3e0473e73</guid>
				<title>কফিশপের টেবিল নাম্বার সাত
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন 

কফিশপের ঘড়ি ঠিক সকাল নয়টার সময় বাজল, আর ঠিক তখনই সে টেবিল নাম্বার সাতের দিকে এগোল। টেবিলটা জানালার পাশে, যেখানে ভোরের সূর্যের হালকা আলো কাচের ফাঁক দিয়ে ঢুকত। সে আগে কখনো এই টেবিলে বসেনি। তবু আজ যেন কোনো অদ্ভুত তাড়না তাকে টেনে এনেছিল।

টেবিলের across দিকে একজন বসে আছেন, একরাশ নীরবতায়। তিনি বয়সে প্রায় তিরিশ, চশমার ফ্রেম ঘন কালো, গায়ে ধূসর শার্ট, হাতে ল্যাপটপ। সে যেদিকে তাকাল, চোখগুলো যেন ভিজে ভিজে আলো খুঁজছিল। প্রতিদিন এই সময়, ঠিক এই টেবিলে, তিনি বসে থাকতেন।

সে হেসে স্বাভাবিক স্বরে বলল, &quot;সকালের কফি মানে, নতুন দিনের শুরু?&quot;
অচেনা মানুষটি কিছুক্ষণ থমথম করে তাকাল। তারপর কাঁধ উঁচু করে হালকা হেসে বললেন, &quot;হ্যাঁ, ঠিক তাই। প্রতিদিন এই সময়।&quot;

প্রথম দিনটা ছিল অদ্ভুত। তারা শুধু চেয়েছিল কফি। কিন্তু পরের দিন, আর তার পরের দিনও, দুজনেই এই টেবিলে এসে বসতে থাকল। কোন কথা শুরু হলো না। শুধু নীরবতা, আর মাঝে মাঝে হালকা চোখের যোগাযোগ।

এক সপ্তাহ পর, প্রথমবারের মতো সে জিজ্ঞেস করল, &quot;আপনি কি সবসময় এই সময়ে আসেন?&quot;
&quot;হ্যাঁ,&quot; অচেনা মানুষটি বললেন, &quot;প্রায় তিন বছর ধরে। ঠিক এই সময়, ঠিক এই টেবিলে।&quot;
তাহলে কী, তিন বছর ধরে টেবিল সাতেই তিনি বসেছেন? সে অবাক হয়ে বলল, &quot;তিন বছর? এবং এই টেবিলে কেউ আপনার সাথে বসেনি?&quot;
&quot;না,&quot; অচেনা মানুষটি উত্তর দিল, &quot;কেবল আমি। আর আজ, আপনি।&quot;

এদিকে, প্রতিদিন আসার এই অভ্যাসে ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত দৃঢ় বন্ধন তৈরি হলো। তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করত না, কেবল থাকত। কখনো কখনো একে অপরের দিকে তাকানো, আরেকজনের চশমার আড়ালে থাকা চোখ পড়ার অনুভূতি, ছিল যেন সারা দিনের সমস্ত কথা।

একদিন, সে নিজেই ভেঙে পড়ল। &quot;আমি এই টেবিলে কেন আসি, তা জানি না। হয়তো… এখানে কিছু খুঁজছি।&quot;
অচেনা মানুষটি নীরব রইলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, &quot;আমিও ঠিক তাই। এখানে বসে আমি নিজের ক্ষতগুলো দেখি। আর হয়তো কিছু ঠিক করতে চেষ্টা করি।&quot;

দিনগুলো কেটে গেল। জানালার আলো বদল হলো, বারান্দার চা-গন্ধ মিশে গেল কফির গন্ধে। টেবিল নাম্বার সাত যেন তাদের দিনের সঙ্গী হয়ে উঠল। কেউ কিছু বলত না, শুধু বসে থাকত।

এক বিকেল, হঠাৎ বাইরে ঝড় এল। কফিশপের জানালা কাঁপতে লাগল, বাতাসের সঙ্গে কাগজ উড়ে গেল। সে হাত বাড়িয়ে খোলা জানালার পাশে বসা অচেনা মানুষটির দিকে তাকাল। &quot;আজকে কেন এখানে আসলেন?&quot;
অচেনা মানুষটি ধীরে ধীরে উত্তর দিল, &quot;আজও খুঁজছি। কিন্তু মনে হচ্ছে কিছু মিলে গেছে। হয়তো আমরা দুইজন একে অপরের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, না জানি।&quot;

এরপর থেকেই তারা কথাবার্তা শুরু করল। ছোট ছোট, অদ্ভুত প্রশ্ন “আপনি আজ কেমন আছেন?” “আজ চা নেবেন নাকি কফি?” এগুলো ধীরে ধীরে দীর্ঘ আলোচনায় রূপ নিল।

একদিন, সে লক্ষ্য করল, অচেনা মানুষটির টেবিলের কোণে ছোট্ট খাতা। খাতার পাতা ভরা অক্ষর, ছোট ছোট নোট। সে আগ্রহ নিয়ে খাতাটি দেখল। অচেনা মানুষটি হালকা হেসে বললেন, &quot;এটা আমার ছোট্ট রহস্য। প্রতিদিন এখানে বসে আমি নিজের গল্প লিখি।&quot;

সে খাতার পাতায় চোখ পড়ল ছোট গল্প, কবিতা, মানুষের চোখের কথা, শহরের শব্দ, ঝড়ের গন্ধ। যেন সেই নীরবতাতেই অচেনা মানুষটি সমস্ত জীবনকে লিখে রেখেছেন।

ধীরে ধীরে সে বুঝল, কফিশপের টেবিল নাম্বার সাত শুধু কফি বা নীরবতার স্থান নয়। এটা ছিল এমন এক জায়গা যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারত। যেখানে চোখের ভাষা কথা বলে, আর নীরবতা সবচেয়ে বড় সংলাপ হয়।

কিছুদিন পর, দুজনের মধ্যে অদ্ভুত বন্ধুত্ব তৈরি হলো। তারা একে অপরকে বলল না, কেবল বোঝে। টেবিল নাম্বার সাত যেন তাদের সম্পর্কের এক অদৃশ্য সেতু।

এক বিকেল, কফিশপের মালিক নতুন করে সাজানোর কথা বলল। সব টেবিল নতুন রঙে রাঙানো হবে। সে ভাবল, যদি টেবিল সাত বদলে যায়? সেই নীরবতা, সেই আলো, সেই ঝড়ের গন্ধ, সব কি হারিয়ে যাবে?

তাদের অচেনা মানুষটি হেসে বলল, &quot;টেবিল নাম্বার নয়, সময় এবং অভ্যাসই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেখানে বসব, সেখানে আমাদের গল্প হবে।&quot;

আর তাই, প্রতিদিন তারা আসতে থাকল নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট টেবিলে। আর কফিশপের অন্যান্য অতিথিরা তাদের নীরব বন্ধন লক্ষ্য করত। কেউ জানতে চায়, কেন তারা কথা বলেন না। কেউ কৌতূহল দেখায়। কিন্তু তারা শুধু বসে থাকত, কফি চুমুক দিয়ে, চোখের কোণে এক অদ্ভুত হাসি নিয়ে।

ধীরে ধীরে কফিশপের অন্য গ্রাহকেরাও টেবিল নাম্বার সাতের রহস্য উপলব্ধি করতে শুরু করল। তারা বুঝতে পারল, এখানে বসা দুজনের মধ্যে কিছু আছে কোনো সাধারণ কফি সময়ের চেয়ে বেশি। এটা ছিল একটি নীরব অভ্যাস, যা ধীরে ধীরে তাদের জীবনের নিঃশব্দ গল্পের অংশ হয়ে উঠল।

এক বিকেল, ঝড়ে ভরা শহরের মধ্যে কফিশপের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকল। সে আবার টেবিল নাম্বার সাতের দিকে এগোল। অচেনা মানুষটি সেখানে বসে আছেন, হালকা ধূসর চশমার নিচে চোখে ভরা অজানা গল্প। সে চুপচাপ বসে গেল। দুই চোখের মধ্যে চোখ পড়ল, আর নীরবতা আবার তাদের মধ্যে কথার মতো ভেসে উঠল।

টেবিল নাম্বার সাতের কাছে বসে, কফির গন্ধ, ঝড়ের শব্দ, সূর্যের আলো সব মিলেমিশে একটি অদ্ভুত সুর তৈরি করল। যেন এই নীরব বন্ধন তাদের নিজের জীবনের অর্ধেক অংশ হয়ে গিয়েছে। তারা জানত না, কখনও এই গল্পের শেষ হবে কিনা। তবে আজ, এই মুহূর্তে, টেবিল নাম্বার সাত ছিল তাদের পৃথিবী।

প্রতিদিন ঠিক সকাল নয়টার সময়, তারা আসত। অচেনা মানুষটির চোখে কাগজের পাতার গল্প, আর তার নিজের চোখে নতুন দিনের প্রত্যাশা। তারা বলত না, শুধু বুঝত। কফিশপের টেবিল নাম্বার সাতের কাছে, নীরবতা হয়ে গিয়েছিল কথার বিকল্প, এবং কফি হয়ে উঠেছিল একটি সময়ের সাক্ষী।

এভাবে প্রতিদিন চলতে থাকল। ঝড় এল, রোদ উঠল, শহরের শব্দ এসে গেল। কিন্তু টেবিল নাম্বার সাত তাদের জন্য অচল, অদ্বিতীয়। এখানে বসে তারা বুঝল, কোনো মানুষকে বোঝার জন্য শব্দের প্রয়োজন হয় না, চোখ, অভ্যাস এবং নীরবতা অনেক বেশি বলবৎ হতে পারে।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/250323/</link>
				<pubDate>Fri, 22 May 2026 10:21:08 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>কফিশপের টেবিল নাম্বার সাত<br />
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন </p>
<p>কফিশপের ঘড়ি ঠিক সকাল নয়টার সময় বাজল, আর ঠিক তখনই সে টেবিল নাম্বার সাতের দিকে এগোল। টেবিলটা জানালার পাশে, যেখানে ভোরের সূর্যের হালকা আলো কাচের ফাঁক দিয়ে ঢুকত। সে আগে কখনো এই টেবিলে বসেনি। তবু আজ যেন কোনো অদ্ভুত তাড়না তাকে টেনে এনেছিল।</p>
<p>টেবিলের across দিকে একজন বসে আছেন, একরাশ নীরবতায়। তিনি বয়&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-250323"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/250323/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">9d957387605681187b920e1cc88603d5</guid>
				<title>ভাঙা হোস্টেলের জানালা
 মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন 

ভাঙা হোস্টেলের জানালার কাচ এখন শুধুই শব্দমুক্ত ধুলো। কিছুদিন আগে পর্যন্ত সেই জানালা ছিল একটি ছোট জগৎ। ছাত্রের একা থাকা, রাতের নিঃশ্বাস, এবং অদৃশ্য হাওয়ার গল্পে ভরা।

সুমন প্রথমদিন হোস্টেলে এলে দেখেছিল কেমন অচেনা শান্তি। বর্ষার ঝড় এসে হোস্টেলের পুরনো দেয়াল গিলে খেয়েছে, আর জানালার একপাশে কাঁচ ফাটার রেখা নদীর মতো ছড়িয়ে আছে। সেই ফাটায় ঢুকা বাতাস কেঁপে ওঠে তার হৃদের সঙ্গে।

প্রথম রাতেই সুমন বুঝতে পারে, হোস্টেল কেবল দেয়াল ও দরজা নয়। এখানে স্মৃতিগুলোই বসবাস করে। সে জানালার কাছে বসে এক ডায়েরি খুঁজে পায়। ধুলো ছুঁয়ে কিছু শব্দও উঠে আসে “যদি কেউ পড়ে, জানো আমি এখানে ছিলাম।”

ডায়েরিটা একটি ছাত্রের লেখা। নাম নেই। কিন্তু হাতের দাগ, শব্দের ফাটল, তার দৃষ্টির আঘাত সবকিছু জানায় এটি একজনের জীবনের টুকরো। সে লিখেছে,

&quot;এই জানালার বাইরে আমি কখনো যাব না। সবাই বাইরে জীবনের দিকে ছুটে যায়, আমি শুধু এখানে তাকিয়ে থাকি। হয়তো কেউ বুঝবে, হয়তো কেউ চোখ রাখবে, আর আমি অদৃশ্য হব।&quot;

সুমন প্রথমে ভেবেছিল, এটি শুধু এক ভাঙা ছাত্রের ডায়েরি। কিন্তু পড়তে পড়তে সে বুঝতে পারে, প্রতিটি শব্দ তার নিজের হৃদয়ের ভাঙা অংশকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।

প্রতিদিন বিকেলবেলা হোস্টেলের উঠোনে আড্ডা হয়। কেউ জানালার দিকে তাকায় না। কেবল সুমন। সে বুঝতে পারে যে, জানালার ফাঁক দিয়ে কখনো একজন ছাত্র চুপচাপ বাইরে তাকাতো। কখনো কাঁদতো, কখনো হাসতো। কেউ তা লক্ষ্য করত না।

একদিন সন্ধ্যায়, বাতাসে একটা অদ্ভুত গন্ধ আসে। ধুলো ও গামছার মিশ্রণ। সুমন জানালার কাছে বসে থাকে। হঠাৎ সে দেখে, ডায়েরির পাতা যেন নিজেই উড়ে গেছে, বাতাসে। লেখা এসেছে &quot;আমি চলে যাচ্ছি। জানালা হবে শুধু একটি স্মৃতি।&quot;

সুমন অবাক হয়ে যায়। কি করে এটি সম্ভব? ডায়েরি তার হাতেই আছে। কিন্তু শব্দগুলো যেন বাতাসে ভেসে গেছে।

পরের দিন সুমন জানালার পাশে বসে নতুন চিঠি খুঁজে পায়। এইবার শব্দগুলো আরও তীব্র, আরও গভীর।

&quot;যখন কেউ শোনে না, তখন শব্দই আমার বন্ধু। জানালা আমার কান, বাতাস আমার আত্মা। তুমি যদি পড়ো, বুঝবে। কিন্তু তুমি থাকবে কেবল পাঠকের মতো, কখনো আমার মতো।&quot;

সুমন বুঝতে পারে, এই জানালা শুধু একটি কাঁচের ফাটাই নয়। এটি এক জীবনের কাহিনী, যেটা কোনো মানুষ পড়তে পারে না। সে ভেতরে ভেতরে কেঁদে ওঠে, জানালা যেন তার চোখের জলও চুষে নেয়।

কয়েকদিন পর হোস্টেলে খবর আসে, যে ছাত্রটি অদৃশ্য। কেউ জানে না কোথায় গেল। কেউ খুঁজে পায়নি। কিন্তু জানালার ফাটায়, বাতাসে, ধুলোতে এখনও তার চিঠি লুকানো।

সুমন জানালার পাশে বসে থাকে। বাতাসের শব্দ শুনে। ধুলোয় লেখা পড়ে। কিছু বলতে চায় না। শুধু বসে থাকে। কখনও কখনও মনে হয়, জানালার দিকে তাকিয়ে কেউ তাকে দেখে।

হোস্টেল আরও পুরনো হয়ে গেছে। কিন্তু জানালার ফাঁক, বাতাসের শব্দ, ধুলো—সবকিছু অদৃশ্য ছাত্রটির গল্প বলতে থাকে। সুমন জানে, সে আর ফিরে আসবে না। তবে তার চিঠি, তার শব্দ, জানালার ফাটায় লুকানো সবকিছু আছে।

সুমন নিজেও অদৃশ্য হয়ে যেতে চায়। জানালা দেখেছে তাকে। বাতাস শুনেছে। ধুলো লিখেছে। সে লিখে রাখে,

&quot;আমি জানালার পাশে বসে তার গল্প শুনি। সে নেই, তবে আছে। অদৃশ্য, কিন্তু জীবিত।&quot;

শরতের রাত আসে। হোস্টেলের উঠোনে বাতাস নেমে আসে। জানালার কাচের ফাটায় ঝলসানো আলো পড়ে। সুমন চুপচাপ বসে থাকে। বাতাস ভেঙে যায়, শব্দ ভেঙে যায়, কিন্তু চিঠি এখনও আছে।

দিন যায়। কেউ জানালা লক্ষ্য করে না। কেউ ডায়েরি পড়ে না। কিন্তু সুমন জানে, প্রতিটি শব্দ তার হৃদয়ে মেলে। সে বুঝতে পারে, এই জানালা শুধু স্মৃতি নয়, এটি হলো একটি ছাত্রের অদৃশ্যতার সাক্ষ্য।

কয়েক সপ্তাহ পর হোস্টেলের দরজা বন্ধ থাকে। ধুলো জমে। কিন্তু জানালার ফাটায়, বাতাসের হাওয়ায়, অদৃশ্য ছাত্রের চিঠি লুকানো থাকে।

সুমন প্রতিদিন জানালার পাশে বসে। পড়ে, শব্দ শোনে। ধুলো ছুঁয়ে অনুভব করে। সে জানে, এই জানালা আর কেবল জানালা নয়। এটি একটি জীবনের প্রতিচ্ছবি, একটি অদৃশ্যতার চিঠি, একটি গল্প যা কেউ লিখেছে, কেউ পড়েছে, কিন্তু কেউ কখনো পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/249836/</link>
				<pubDate>Thu, 21 May 2026 02:30:14 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>ভাঙা হোস্টেলের জানালা<br />
 মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন </p>
<p>ভাঙা হোস্টেলের জানালার কাচ এখন শুধুই শব্দমুক্ত ধুলো। কিছুদিন আগে পর্যন্ত সেই জানালা ছিল একটি ছোট জগৎ। ছাত্রের একা থাকা, রাতের নিঃশ্বাস, এবং অদৃশ্য হাওয়ার গল্পে ভরা।</p>
<p>সুমন প্রথমদিন হোস্টেলে এলে দেখেছিল কেমন অচেনা শান্তি। বর্ষার ঝড় এসে হোস্টেলের পুরনো দেয়াল গিলে খেয়েছে, আর জানালার একপাশে কাঁচ ফা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-249836"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/249836/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>9</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">14679fbe92cae535258041cd8e3a030e</guid>
				<title>গুমরাতের শেষ সাক্ষী
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন

রাতের আকাশ ছিল অন্ধকারে জড়ানো, যেন তার কোনো সীমা নেই। শহরের আলো দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিল, কিন্তু সেই আলোও নিঃশব্দ, নিঃশেষ। এমন রাতে, যখন শহরের প্রায় সব মানুষ ঘুমোয়, তখন একা একা রাস্তায় হাঁটা পথিকেরা প্রায়ই নিজের ছায়ার সঙ্গে কথা বলে। আর সেই ছায়ার সঙ্গে কথা বলা কেউ শুনে না, কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য চোখ সব দেখছে।

নূরানী, এক তরুণী, একেবারেই সাধারণ জীবনের মানুষ। তবে আজকের রাতটা তার জন্য ছিল অস্বাভাবিক। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে সে হঠাৎ অনুভব করল রাত যেন তার চারপাশে অদৃশ্যভাবে ঘনিয়ে আসছে। গাছের ছায়া তার উপর নেমে এল, রাস্তার বাতিগুলো যেন আরও দূরে সরে গেল। তার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল না, কিন্তু মনে হচ্ছিল কেউ তার পেছনে আছে।

একটি গলিতে ঢুকতেই সে দেখল, একটি পুরনো ঘর। ঘরের জানালা থেকে আলো ফেটে আসছে না, কিন্তু ভেতরের অন্ধকারে যেন কেউ তাকিয়ে আছে। নূরানী স্থির হয়ে দাঁড়াল। হৃদয় দ্রুত ধড়ধড় করছিল, কিন্তু কৌতূহল তাকে দূরে যাওয়ায় বাধা দিল।

“কে আছে সেখানে?” সে ধীরে ধীরে বলল। কোনো উত্তর এল না। কিন্তু অদৃশ্য চোখগুলো তার প্রতি নজর রেখেছে তাকে দেখছে, কিন্তু প্রকাশ করছে না।

গলির শেষে পৌঁছে নূরানী বুঝতে পারল, শহরের এই নিঃশব্দ রাতে কেউ তার গল্প শুনছে। সে নিজেও অবাক হয়েছিল কেন রাতের এই নিঃশব্দে তাকে কেউ খুঁজে বের করল। এই অনুভূতি একধরনের অদ্ভুত এক শান্তি এনে দিল, যা তার কখনও আগে অনুভূত হয়নি।

নূরানীর মতো শহরে অনেক মানুষ রাতের নিঃশব্দে একাকী হয়। কেউ তার একাকীত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে, কেউ স্মৃতির সঙ্গে। কিন্তু এই রাতের সাক্ষী—যে গুম হয়ে যাওয়া রাতের একমাত্র জীবন্ত চোখ সব কিছুই দেখছে। সে শুধু দেখেই থেমে থাকে না; রাতকে অনুভব করে, রাতকে নিজের করে নেয়।

নূরানী অজান্তে সেই সাক্ষীর সঙ্গে যোগাযোগ করছিল। তার চোখের কোণে কিছু অদ্ভুত ছায়া নাচছে। মনে হচ্ছিল, যদি সে একটু সাহস দেখায়, সে অদৃশ্য চোখের রহস্যের সঙ্গে মিলিত হতে পারবে।

হঠাৎ, একটি হাওয়া বয়ে এলো। গাছের পাতার শব্দ, দূরের কুকুরের ঘেউ ঘেউ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করল। নূরানী বুঝতে পারল, সে কেবল এই রাতে একা নয়। কেউ, কিছু, বা এমনকি রাতের নিজস্ব এক চেতনা তাকে দেখছে, শোনছে।

তার পথ চলা আরও গভীরে প্রবেশ করল। গলির মোড়ে হঠাৎ একটি ছোট ছায়াময় বারান্দা দেখা গেল। বারান্দার নিচে একটি পুরনো বেঞ্চ। বেঞ্চে বসে থাকা মানুষগুলো নিঃশব্দে চেয়ে থাকে। কিন্তু আজ সেখানে কোনো মানুষ নেই শুধু শীতল বাতাস আর কিছু অদৃশ্য উপস্থিতি। নূরানী অনুভব করল, এই রাতের সাক্ষী তার চারপাশে ঘিরে আছে।

সে ধীরে ধীরে বসল। মনে হচ্ছিল, এই নিঃশব্দ রাতের মধ্যে সে তার সব ভয়, তার সব কষ্ট, তার সমস্ত অনুভূতি প্রকাশ করতে পারবে। কিন্তু কোন শব্দ বের হয়নি শুধু নিঃশব্দ। নিঃশব্দ সেই শক্তি যা মানুষকে কখনও ভয় দেয়, কখনও শান্তি দেয়।

একটা মুহূর্তে নূরানী নিজেকে হারাতে বসেছিল। কিন্তু সেই সময়েই সে বুঝল এই রাতের সাক্ষী কেবল দেখছে না, সে বাঁচতে চায়। বাঁচার ইচ্ছা এমন এক শক্তি যা রাতের আঁধারেও জীবন্ত।

নূরানী নিজের বুকের ভেতর সেই শক্তি অনুভব করল। তার জীবনের ছোট ছোট ঘটনা ভালোবাসা, দুঃখ, হাসি, কান্না সব কিছু যেন একসাথে তার সামনে চলে এল। সেই অভিজ্ঞতা তাকে বলল, রাত কখনও শেষ হয় না; রাতের গভীরে সঠিক চোখ থাকলেই সব কিছু জীবন্ত থাকে।

সেই অদৃশ্য চোখ নূরানীর দিকে আরও ঘনিষ্ঠ হলো। মনে হলো, এটি শুধু একজন সাক্ষী নয়, বরং সেই নিঃশব্দ রাতের প্রতিফলন, যা জীবনের এক অদ্ভুত বাস্তবতা জানাচ্ছে। নূরানী হঠাৎ অনুভব করল, এই সাক্ষী তার নিজের জীবনের একটি অংশ হয়ে গেছে।

রাত আরও গভীরে ঢুকে গেছে। শহরের সব শব্দ ধীরে ধীরে মরে গেছে। কেবল নিঃশব্দ এবং নিঃশব্দের সঙ্গে তার হৃদয়ের স্পন্দন বাকি। নূরানী বুঝতে পারল, এই নিঃশব্দে তার জীবন এবং এই রাতের সাক্ষীর জীবন একাকার হয়ে গেছে।

নূরানী কিছুটা ভয় পেলেও, তার ভয় আর ভাঙতে পারল না। কারণ সে বুঝেছে এই গুমরাতের শেষ সাক্ষী শুধু দেখছে না, বাঁচার চেষ্টা করছে। আর বাঁচার চেষ্টা করলেই, নিঃশব্দ রাতের মধ্যে নতুন এক জীবন খুঁজে পাওয়া যায়।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/249481/</link>
				<pubDate>Wed, 20 May 2026 04:47:12 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>গুমরাতের শেষ সাক্ষী<br />
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন</p>
<p>রাতের আকাশ ছিল অন্ধকারে জড়ানো, যেন তার কোনো সীমা নেই। শহরের আলো দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিল, কিন্তু সেই আলোও নিঃশব্দ, নিঃশেষ। এমন রাতে, যখন শহরের প্রায় সব মানুষ ঘুমোয়, তখন একা একা রাস্তায় হাঁটা পথিকেরা প্রায়ই নিজের ছায়ার সঙ্গে কথা বলে। আর সেই ছায়ার সঙ্গে কথা বলা কেউ শুনে না, কিন্তু কোনো এক অদৃশ্&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-249481"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/249481/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>8</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">9193307c5e4a836560033c21f2af0592</guid>
				<title>Md Nurnobi islam sumon and সেলিনা বিনতে কারীম are now friends</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/248987/</link>
				<pubDate>Mon, 18 May 2026 15:12:27 +0600</pubDate>

				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">784979971c08a27551e9e47fd6819bde</guid>
				<title>Md Nurnobi islam sumon changed their profile picture</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/248659/</link>
				<pubDate>Sun, 17 May 2026 17:08:03 +0600</pubDate>

				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">4a33a98dbc273312968edfc8fcec7fea</guid>
				<title>নীরব চত্বরে ছায়া
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন 


আন্দোলনের দামামা থেমে গেছে। পিছনে ফেলে যাওয়া সেই তীব্র উত্তেজনার রেশটুকুও আজ আর বাতাসে নেই। এখন কেবল একটিই শব্দ, যা এই বিশাল শিক্ষাঙ্গনকে গ্রাস করে আছে—সেটি হলো নীরবতা। সেই নীরবতা এতই ঘন, এতই ভারি যে মনে হয় এটি যেন কোনো শূন্যস্থান নয়, বরং একটি নতুন, অপ্রকাশিত পদার্থের মতো ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণে জমে আছে।
​প্রধান ফটক থেকে শুরু করে অ্যাকাডেমিক ভবনগুলোর মাঝের পথ ধরে হেঁটে গেলে পায়ের নিচে স্যান্ডেলের ঘর্ষণে সৃষ্ট যে শব্দ হয়, তা-ও যেন এই নৈঃশব্দ্যের কারণে অস্বাভাবিক জোরে কানে বাজতে থাকে। পিচ্ছিল পথে ধূলো জমে আছে বহুদিনের অব্যবহারে, যেন সময় এখানে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল কিছুদিনের জন্য। আর সেই ধুলোর সঙ্গে মিশে আছে ঝরা পাতার এক গাঢ়, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ; যা একই সঙ্গে পুরনো স্মৃতি এবং বর্তমানের শূন্যতাকে মনে করিয়ে দেয়।
​যেখানে এক সপ্তাহ আগেও হাজারো কণ্ঠের উন্মত্ত চিৎকার, স্লোগানের গর্জন, এবং প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতিতে আকাশ বাতাস কাঁপতো, আজ সেখানে কেবল নীরবতা। চারপাশের বিশাল অট্টালিকাগুলো যেন বোবা সাক্ষী। ক্লাসরুমের বন্ধ, কিন্তু কাঁচ ভাঙা জানালা দিয়ে ফিসফিস করে বাতাস ঢুকছে। সেই বাতাস ফাঁকা ব্ল্যাকবোর্ড, ধুলো জমা ডেস্ক আর চকহীন ডাস্টার স্পর্শ করে বেরিয়ে যাচ্ছে—কিন্তু কোনো ছাত্র নেই, কোনো শিক্ষকের উপস্থিতি নেই। অডিটোরিয়ামের ভেতরে অসংখ্য লাল রঙের চেয়ারগুলো সারি সারি করে ফাঁকা পড়ে আছে। প্রতিটি চেয়ার যেন একজন অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর প্রতীক, যাদের জায়গা এখন চিরকালের জন্য শূন্য। কারো পদচারণার শব্দ নেই, কোনো সাইকেলের রিংটোন নেই। শুধু একটি দূরের ঘড়ির যান্ত্রিক টিকটিক শব্দ, যা সময়ের সাথে সঙ্গে যেন একাকীত্বের সুর বাজাচ্ছে।

​নূরনবী প্রধান গেটের ঠিক বাইরে, পরিচিত মার্বেল পাথরের পিলারের পাশে দাঁড়ানো ছিল। তার চোখে এক অদ্ভুত ক্ষতচিহ্ন লেগে আছে—যা কেবল বাইরের চোখ দিয়ে দেখা যায় না, বরং তা হৃদয়ের গভীরতম স্তরের আঘাত। এটি কোনো সাধারণ শারীরিক আঘাত নয়, বরং আন্দোলনের চরম মুহূর্তগুলোতে দেখা কিছু দৃশ্য যা তার আত্মাকে বিদ্ধ করেছে।
​সেদিন, যখন পুলিশবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়লো, নূরনবী অনুভব করেছিল তার বুক পকেটে হৃদপিণ্ড যেন আছড়ে পড়ছে। শব্দহীন সেই চিৎকারের স্মৃতি আজও তার কানে বাজে—চিৎকারটি তার নিজের ছিল না, ছিল তার সামনের সারিতে দাঁড়ানো এক বন্ধুর। ছুরির মতো ধারালো পুলিশের দৃষ্টি, হাতের লাঠির নির্মমতা এবং একটু দূরে মাটিতে লুটিয়ে পড়া এক বন্ধুর কাঁদা মুখ—এই দৃশ্যগুলো এখন তার কাছে ফ্যাকাশে ফটোগ্রাফের মতো, যা কখনোই স্মৃতি থেকে মোছা যাবে না।
​নূরনবী নিজের বুকের ভিতরে হাত চেপে ধরল। সে ভয় অনুভব করছে, কিন্তু এই অনুভূতিটি সাধারণ ভয় নয়; এটি হলো এক ধরনের অসহায় কষ্ট। সেই কষ্ট যা আসে যখন কেউ দেখে যে সে তার সবটুকু দিয়েও একটি পবিত্র উদ্দেশ্যকে রক্ষা করতে পারেনি। একটি প্রশ্ন তার মনে বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে: এত রক্ত, এত অশ্রু কি তবে বৃথা গেল?
​ক্যাম্পাসের মধ্যবিত্ত চত্বরে—যেখানে একসময় ছাত্ররা মুক্ত পাখির মতো উড়ত, হাসি-ঠাট্টা আর আড্ডায় মেতে থাকত—আজ শুধু লম্বা লম্বা ছায়া। সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ছিল, তাই প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ভবন তাদের দীর্ঘায়িত ছায়া ফেলেছিল মাটিতে। প্রতিটি ছায়া যেন চিৎকার করছে, কিন্তু শব্দ নেই—তারা যেন সেই ছাত্রদের অনুপস্থিতির শোক পালন করছে।
​নূরনবী দেখল মাটিতে পড়ে থাকা একটি রঙহীন ব্যাগ, হয়তো কোনো ছাত্রী তাড়াহুড়োয় ফেলে গিয়েছিল। ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে পড়ে আছে কিছু প্রতিবাদী পোস্টার, যাদের স্লোগান এখন নীরব। আর একটু দূরে, ধূলোর মধ্যে চকচক করছে একটি জিনিস—একটিমাত্র ছুরি। কেউ হয়তো আত্মরক্ষার জন্য এনেছিল, বা ভয়ের তাড়নায় দ্রুত ফেলে দিয়েছিল। সেই ছুরিটি দেখে নূরনবীর হাতে এক দমবন্ধ করা অনুভূতি হলো। সে অনুভব করল—ভয় এখনও বাতাসে মিশে আছে, এবং এই নীরবতা কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী বিরতি মাত্র।
​নূরনবী ভাবলো, এই ক্যাম্পাস এখন আমাদের স্মৃতিগুলোর বিশাল কবরস্থান। আমরা প্রতিটি পদক্ষেপ নিচ্ছি সেই কবরগুলোর ওপর দিয়ে।

নূরনবী ধীরে ধীরে মধ্য চত্বরের গভীর শূন্যতার দিকে এগিয়ে চলল। প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে গিয়ে তার মনে হলো, যেন সে মাটির ওপর দিয়ে নয়, বরং সময়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে—এমন এক সময়, যা বর্তমানে স্থির কিন্তু অতীতে ভারাক্রান্ত। আন্দোলনের রেশে ক্ষতবিক্ষত এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণেই তার সহযোদ্ধাদের স্মৃতি যেন একটি অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করছে।
​হঠাৎ, একটি অচেনা শীতলতা অনুভব করে সে থমকে দাঁড়াল। সূর্য আরও খানিকটা হেলে পড়েছে, তাই চারপাশের ছায়াগুলো এখন গাঢ় এবং দীর্ঘ। ভিড়ের মধ্যে থেকেও সে স্পষ্ট দেখতে পেল জাকিয়ার ছায়া, যদিও জাকিয়া বাস্তবে সেখানে ছিল না। এই ছায়াটি কেবল একটি মায়া বা দৃষ্টিভ্রম ছিল না; এটি ছিল গভীর সংযোগের ফল। জাকিয়া ছিল আন্দোলনের সময় তার পাশে, তার অবিচল হাসি ছিল কঠিনতম সময়েও তাদের অনুপ্রেরণা। আজ সেই হাসি কেবল স্মৃতি, আর বাস্তবে সে নেই।
​“জাকিয়া, তুমি কি সত্যিই চলে গেছো, নাকি এই নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে আছো?” নূরনবী ফিসফিস করে ভাবলো।

​কেবল সেই ছায়া, নীরব কিন্তু শক্তিশালী। নূরনবী বুঝতে পারল, তার বন্ধুরা কেবল অনুপস্থিত নয়, তারা এই ক্যাম্পাসের প্রতি ইঞ্চি জায়গায় তাদের শক্তি এবং প্রতিজ্ঞা রেখে গেছে। সে এগিয়ে চলল, যেন ছায়াটি তাকে পথ দেখাচ্ছে—প্রতিটি ধাপ যেন মাটির মধ্যে হারাচ্ছে, কিন্তু এক অদৃশ্য পথে তারা আবার মিলিত হতে চলেছে।
​নূরনবী একসময় তাদের প্রিয় ক্লাসরুমের দিকে এগোতে শুরু করল। করিডোরেও একই নীরবতা, কিন্তু একটি কক্ষের দিকে তাকাতেই সে একটি পরিচিত দৃশ্য দেখল: মিমির ব্যাগ। ব্যাগটি খোলা, এবং তার বইগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মিমি, যে সবসময় গুছিয়ে থাকতে ভালোবাসতো, তার ব্যাগ এভাবে পড়ে থাকাটা এক অস্বাভাবিক সংকেত।
​নূরনবী বইগুলো হাতে তুলে নিল। কয়েকটি পৃষ্ঠায় কিছু লেখা, কিছু আঁকা—হয়তো শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়োয় কিছু লিখে গিয়েছিল। সে মিমিকে জানে, সে সাধারণত কোনো লেখা শেষ করে যায় না, কিন্তু এবার যেন তাকে থামানো হয়েছিল। একটি নির্দিষ্ট পৃষ্ঠায় তার দৃষ্টি আটকে গেল:
​“আমরা হারব না। তারা চাইছে আমরা ভয় পাই। কিন্তু আমরা নীরব নই।”

​এই লাইনগুলো কোনো সাধারণ লেখা ছিল না; এটি ছিল একটি শপথ, একটি অদম্য আত্মার শেষ বার্তা। নূরনবী নিজেকে শক্ত হাতে ধরে রাখল। এই ক্যাম্পাস চত্বরে সে হয়তো একা, কিন্তু তার বন্ধুরা এই নীরবতার মধ্যেই তাদের বার্তা রেখে গেছে। প্রতিটি লিফলেট, প্রতিটি দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি, প্রতিটি ছায়ায় সে তাদের স্মৃতি আর সংকল্প খুঁজে পাচ্ছে। এই নীরবতাই তাদের যোগাযোগ মাধ্যম।
​ক্যাম্পাসের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে, যেখানে পুরনো বট গাছটির নিচে প্রায়শই তাদের আলোচনা সভা বসতো, সেখানে একটি মূর্তির মতো স্থির হয়ে বসে ছিল সুমি। তার চোখ লাল, স্পষ্টতই বহু কান্নার ছাপ, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। তার নীরবতা যেন এই ক্যাম্পাসের সামগ্রিক কষ্টের প্রতিচ্ছবি।
​নূরনবী খুব সাবধানে তার কাছে চলে গেল। কোনো প্রশ্ন নয়, কোনো সান্ত্বনাও নয়। তারা দুজনে কেবল একে অপরের দিকে চেয়ে রইল—এক গভীর নৈঃশব্দ্যের মধ্যে। এই চুপ, এই দৃষ্টির সংযোগ—হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী। এটি ছিল একে অপরকে বোঝার, একে অপরের ভয়কে স্বীকার করে নেওয়ার এবং টিকে থাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার একটি ভাষা।
​ঠিক সেই মুহূর্তে, পিছনের গেটের দিকে একটি দ্রুত নড়াচড়া দেখা গেল। ঘাসের উপর লাফিয়ে আসে সৌরভ, যার চোখে ভয়ের চিহ্ন থাকলেও তার মুখে বিজয়ের দৃঢ়তা। সে কিছু বলল না, কেবল তার হাতে ধরা বস্তুটি দেখাল—একটি ছিন্ন-ভিন্ন পোস্টার, যা সে সম্ভবত গেটের কাছে লুকিয়ে রেখেছিল বা খুঁজে পেয়েছে।
​পোস্টারে লেখা ছিল: “আমাদের মুক্তি অনিবার্য।”
​নূরনবীর চোখে পানি আসে। সৌরভের এই নীরব উপস্থাপনাই যেন তাদের শক্তিকে ধরে রেখেছে। সেই ছিন্নভিন্ন পোস্টার—আন্দোলনের শেষ প্রতীক—যেন তাদের মনে করিয়ে দিল যে তারা কেবল ব্যক্তি নয়, তারা একটি ধারণা, যা সহজে ধ্বংস করা যায় না।
​ছায়ার মধ্য দিয়ে তারা ধীরে ধীরে একত্রিত হতে শুরু করল। নূরনবী, সুমি এবং সৌরভ—তিনজন নীরব যোদ্ধা। প্রতিটি চত্বরে, প্রতিটি ফাঁকা জায়গায় তারা অনুভব করল তাদের বন্ধুরা এখনও অদৃশ্যভাবে উপস্থিত। তবে সবাই জানে, কোথাও কোথাও পুলিশের আতংক এখনও বাস করছে। নীরবতা কীভাবে কাটানো যাবে, তা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই, কিন্তু তাদের এই সংযোগই ছিল প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। এই গভীর নীরবতা আর বিচ্ছিন্নতা তাদের নতুন করে এক হতে সাহায্য করছে।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/248658/</link>
				<pubDate>Sun, 17 May 2026 17:04:51 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>নীরব চত্বরে ছায়া<br />
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন </p>
<p>আন্দোলনের দামামা থেমে গেছে। পিছনে ফেলে যাওয়া সেই তীব্র উত্তেজনার রেশটুকুও আজ আর বাতাসে নেই। এখন কেবল একটিই শব্দ, যা এই বিশাল শিক্ষাঙ্গনকে গ্রাস করে আছে—সেটি হলো নীরবতা। সেই নীরবতা এতই ঘন, এতই ভারি যে মনে হয় এটি যেন কোনো শূন্যস্থান নয়, বরং একটি নতুন, অপ্রকাশিত পদার্থের মতো ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-248658"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/248658/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">c67e812bfed110f0aa2d86f53a49c20f</guid>
				<title>রাতের গোপন সমাবেশ
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন 

​নূরনবী ধীরে ধীরে তার ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া হাত দুটো পকেটের আরও গভীরে ঢুকিয়ে দিল। এই শীতের রাতটি কেবল হাড়-কাঁপানো ছিল না, এর মধ্যে যেন মিশে ছিল এক চাপা ইতিহাস, যা এই শহরে দীর্ঘকাল ধরে লুকিয়ে আছে। গভীর শ্বাস নিতেই তার ফুসফুস শীতল, ধোঁয়াটে বাতাস টেনে নিলো— মনে হলো সেই বাতাস তার রুক্ষ গালগুলোকে কেবল স্পর্শ করছে না, বরং একটি চাপা ক্ষোভের মতো দংশন করছে। রাস্তার পিচেট ঢালা মাটিতে জমে থাকা জল হালকাভাবে চাঁদ-আলোর এক প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছিল; কেউ হয়তো অল্পক্ষণ আগেই দ্রুত পায়ে হেঁটে গেছে, কিন্তু সেই ছায়ামূর্তি বা তার পায়ের শব্দ কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। নূরনবী চোখ ফেরানোর আগেই সেই জমে থাকা জল আর চারপাশের গভীর আঁধার এমনভাবে মিলেমিশে গেল, যেন প্রকৃতিও তাদের এই গোপন যাত্রাকে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখছে।
​তার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এক নিদারুণ সতর্কতা। সে এগিয়ে গেলো পুরনো ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের সেই জরাজীর্ণ পেছনের গেটটির দিকে। এই গেট বহু বছর ধরে বন্ধ, যেন প্রবেশ করার অনুমতি দিতে সে নারাজ। এই ফটকের পিছনেই ছিল সেই বহু পুরনো ভবনটি, যার জানালাগুলো দীর্ঘ দিন আগে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। কক্ষগুলো তখন থেকেই ছিল তালাবন্ধ, ঘরগুলো তখন থেকে নির্জনতার এক অঘোষিত মন্দির। এই নির্জনতা কেবল মানুষের অনুপস্থিতির কারণে নয়, বরং এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ংকর সত্যের নীরবতার কারণে।
​ভেতরের জানালা দিয়ে ফিকে চাঁদের চুয়াশা আলো ভেন্টিলেটরের মরিচা ধরা জালে আটকে ফিল্টার হয়ে প্রবেশ করছিল। সেই দুর্বল, ভূতুরে আলোয় কক্ষের ভেতরের দেয়ালগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, যেখানে জমে থাকা শত যুগের ধুলা, ভাঙা পাথরের টুকরো আর স্যাঁতসেঁতে মরচে পড়ার এক অদ্ভুত গন্ধ মিশে ছিল— এ এক এমন গন্ধ যা শুধু সময়ের নয়, চাপা পড়া অপমানেরও। এই ভাঙা, পরিত্যক্ত ভবনের নীরবতার মাঝেই আজ এক গোপন সভার আয়োজন হয়েছে, যেখানে চারজন মানুষ তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে একত্রিত হয়েছে।
​কক্ষের ঠিক মাঝখানে মেঝেতে রাখা একটি মাত্র মোমের ক্যান থেকে হলদেটে, ভেজা আলো ছিটকে পড়ছিল। এই দুর্বল আলোর বৃত্তে ইতোমধ্যেই চারজন ছায়ামূর্তি অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। তাদের নীরবতা এতটাই তীব্র ছিল যে মনে হচ্ছিল যেন তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসও বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছিল না। এক কোণায় ছিল একটি ভাঙা কাঠের চেয়ার, তার জীর্ণতা যেন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক প্রতীকী ছবি। আরেক কোণায় পুরনো মেঝেতে পড়ে ছিল ছিঁড়ে যাওয়া স্মৃতির একটি ছবি— হয়তো কোনও ফেলে আসা দিনের হাসি-খুশির টুকরো, যা এখন এই অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে তাদের বর্তমান যন্ত্রণার বিপরীতে এক তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। লাভাল আলোর কম্পন আর গাঢ় ছায়ার খেলাতে তাদের চোখ-মুখ এতটাই অস্পষ্ট ছিল যে তাদের ভিতরের ভাবনাগুলো কেবল অনুমিত হচ্ছিল, কিন্তু তা বোঝার সাধ্য ছিল না কারও। এই অস্পষ্টতা যেন তাদের নিরাপত্তার এক প্রতীক।
​নূরনবী দরজাটা ধীরে ধীরে, প্রায় ইঞ্চি ইঞ্চির মাপে ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। তার চামড়ার জুতো যখন ভেজা মেঝে স্পর্শ করল, তখন সেই সামান্য আওয়াজটুকুও যেন দেওয়ালে কানে টিপে ধরে থাকা গভীর নিস্তব্ধতাকে ভাঙতে পারল না, বরং তা নীরবে এই নতুন উপস্থিতিকে স্বীকার করে নিলো।
​“আসছি,” সে ফিসফিস করে বলল। এই শব্দটি যেন তার নিজের অস্তিত্বের এক নিবেদন ছিল, এক শপথ ছিল।
​চাপা নিস্তব্ধতার মধ্য থেকে এক কন্ঠস্বর উঠে এলো— সেই কন্ঠ ছিল চাপা, সতর্ক।
“সব ঠিক আছে, নূরনবী? কেউ পিছু নেয়নি তো?”
​নূরনবী মাথা নাড়ল। এই মাথা নাড়া ছিল শুধু হ্যাঁ-সূচক নয়, ছিল তার ভেতরের সমস্ত সংকল্পের এক নীরব স্বীকৃতি। সে হাতে ধরে থাকা পুরনো, হলুদ হয়ে যাওয়া একটি মোটা দিয়ালোগ ফাইলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। ফাইলটি সাবধানে মেঝেতে নামিয়ে রেখে বলল, “এইটা নিয়ে এসেছি। সব ভিডিও ফুটেজ, নথিপত্র আর স্মৃতি— সবকিছু এখানে সুরক্ষিত আছে, এক মিনিটের জন্যও আমার চোখের আড়াল হয়নি।”
​সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষমাণ ছায়ামূর্তির মধ্যে থেকে একজন উঠে দাঁড়ালো। এই মানুষটির চিবুকে অবিন্যস্ত দাড়ি, যা দীর্ঘদিনের ঘুমহীন রাত ও মানসিক উদ্বেগের প্রতীক। তার চোখে ছিল গভীর ক্লান্তি ও সতর্কতার ছাপ। এ হলো সৌরভ, এই গোপন দলের নীরব নেতা।
​“ঠিক আছে, সৌরভ,” সে বলল এক অদ্ভুত শান্ত, প্রায় ধীরভাবে। তার কন্ঠে যেন বহুদিনের জমে থাকা ঝড়ো মেঘের চাপা গর্জন ছিল। “সময় নষ্ট করা যাবে না। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। চলো শুরু করি।”
​দরজাটি সাবধানে, শব্দহীনভাবে বন্ধ হলো। জানালার ভাঙা ফাঁক দিয়ে চাঁদের মুখ যেন একটু ফিসফিস করে উঠলো, যেন সেও তাদের এই গোপন কথোপকথন শোনার জন্য উন্মুখ। মোমের আলো কমে যাওয়ায় ভেজা দেয়ালগুলো উষ্ণ হলো না, বরং সেই ঠাণ্ডা, ভেজা স্পর্শে ঘরটা থরথর করে কাঁপতে লাগলো— যেন এই দেয়ালগুলোও কেবল দর্শক নয়, তারা দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ সত্যের প্রথম সাক্ষী হতে প্রস্তুত হচ্ছিল।

​সৌরভ প্রথম তার নীরবতা ভাঙল। তার মুখটি এখন মোমের ক্ষীণ আলোয় আরও অচেনা লাগছিল, যেন বহুদিনের মানসিক যন্ত্রণায় তার পরিচিত রেখাগুলো মুছে গেছে। গলা ছিল ভেঙে যাওয়া, রুক্ষ— আবেগের ভারে থমকে যাওয়া এক নদী যেন। চোখে ছিল কৈফিয়ত দেওয়ার চাপা ভার আর ভয়, যা বহু কষ্টের পরে আজ মুক্তি পেতে চাইছে।
​“সে দিন… মাঝরাতে আমাকে বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল,” সে এক গভীর, কষ্টকর নিশ্বাস টেনে বলল, যেন তার ফুসফুস থেকে দীর্ঘদিনের জমানো বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে। “চোখ বাঁধা, গলা বাঁধা, সমস্ত কিছুই ছিল কেঁদে ওঠার জন্য প্রস্তুত। এই বাঁধন শুধু শরীরের ছিল না, ছিল আমার কণ্ঠস্বরের। তারা আমার ওপর চরম মানসিক চাপ সৃষ্টি করছিল, জোর করছিল থানায় গিয়ে একটা মিথ্যা বয়ান দিতে। তারা জানতে চেয়েছিল কারা আছে আমার সাথে, কোথা থেকে আসা, আমাদের উদ্দেশ্য কী— আমি শুধু বলেছিলাম, আমি ছিলাম একা। এই একা থাকার দাবি ছিল আমাদের বাকিদের সুরক্ষার একমাত্র ঢাল।
​&quot;তিনদিন ধরে… তারা শুধু মিথ্যা কথা বললো, সেটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ভীতি। আমার সত্য ছিল তাদের ক্ষমতার বিপরীত, তাদের তৈরি করা মিথ্যা আখ্যানের ঠিক উল্টো। আমি ছিলাম আমার দেহের এক প্রহরী, আমার ভেতরের সত্যকে আগলে রাখা এক দুর্ভেদ্য দেয়াল, যার কোনো দুর্বলতা তারা খুঁজে পায়নি। তারা চেষ্টা করেছিল আমার ভেতরের মানুষটাকে ভেঙে দিতে, কিন্তু আমি জানতাম, আমার এই নীরবতা আরও বড় এক প্রতিবাদের জন্ম দেবে।
​&quot;তারপর এক রাতে… একটি ছলনায় তারা আমাকে ছেড়ে দেয়। শহরের বাইরে নদীর ধারে, যেখানে নীরবতা ছাড়া আর কিছু ছিল না। আমি বাঁচি— শুধু এই বাঁচা আর নিঃশ্বাসটুকুই আমার প্রাপ্তি ছিল, কিন্তু সেই বাঁচার ভেতরে কোনো শান্তি ছিল না। আমি আজ এখানে বসেছি, এই আলো-অন্ধকারে, এই স্মৃতির মাঝে, কারণ আমি জানি— আজ সেই ভয়কে জয় করে সত্য বলার সময় এসেছে। এই সত্য শুধু আমার একার নয়, এটি এই নীরব প্রজন্মের সত্য।”
​কক্ষের ভেতরে চেপে বসা নীরবতা যেন আরও গাঢ় হলো। সবাই সৌরভের প্রতিটি শব্দকে যেন নিজেদের ভেতরে গ্রহণ করছিল।
​মোমের শিখা একটি ক্ষীণ ফিসফিস শব্দ করল। দেয়ালগুলো যেন সেই শব্দ শুনে শিউরে উঠলো। সময় যেন সেই মুহূর্তে থমকে গিয়ে সমস্ত ক্যালেন্ডারের কাঁটা বন্ধ করে দিলো, যেন প্রকৃতিও এই কঠিন সত্য হজম করার জন্য সময় নিচ্ছিল।
​এর পরে মোমের ক্যানটি নিজের হাতে তুলে ধরলো জাকিয়া। তার মুখে কালো স্কার্ফ শক্তভাবে বাঁধা ছিল, কেবল চোখ দুটি উন্মুক্ত। সেই চোখে ছিল লালচে রেশ, যা কেবল তীব্র ক্রোধ অথবা দীর্ঘস্থায়ী কান্নার পরেই দেখা যায়— এ যেন অবিচারের বিরুদ্ধে হৃদয়ের রক্তক্ষরণ।
​“আমরা ছিলাম আটজন মেয়ে…” সে শুরু করলো। তার কণ্ঠস্বর প্রথমে নিচু হলেও ধীরে ধীরে দৃঢ় হয়ে উঠলো, যেন একটি চাপা আগুন জ্বলে উঠছে।
​“ছাত্রাবাসের মেয়েদের ঘর। রাতটা ছিল শান্ত, প্রকৃতির কোনো কোলাহল ছিল না, চাঁদ উঠেছিল, বাতাস যেন একটা শান্ত গানের মতো বয়ে যাচ্ছিল। আমরা গল্প করছিলাম… হাসছিলাম, আমাদের ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করছিলাম। সেই স্বপ্নগুলো ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। হঠাৎ করেই দরজায় একটা বিকট শব্দ হলো, আর ভাঙা দরজাটা খুলে গেল। তারা ঢুকে পড়ল। যারা এসেছিল, তারা নিজেদের ‘পুলিশ’ নামে পরিচয় দিয়েছিল, কিন্তু তাদের চোখে কোনো আইন বা মানবতা ছিল না, তারা ছিল ক্ষুধার্ত পশুর মতো। তাদের লক্ষ্য ছিল ভয় সৃষ্টি করা, স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া।
​&quot;কেমন ভয়, কী সাংঘাতিক আতঙ্ক! আমাদের কেউ ভয়ে চিৎকার করতে পারেনি। মুখ, গলার স্বর, চোখ, সব যেন এক অদৃশ্য দড়ি দিয়ে বাঁধা পড়ে গিয়েছিল।
​&quot;আমি… আমি তখন… শুধু মাটিতে পড়েছিলাম, স্তব্ধ হয়ে, যেন আমি আর আমার শরীর এক নই।
আমি সবাইকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই পশুতুল্য আক্রমণকে বাধা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু…
​&quot;কেউ বাঁচেনি। আমাদের ভেতরের আত্মাটা কেউ বাঁচাতে পারেনি। তারা আমাদের কণ্ঠস্বর কেড়ে নিয়েছে, আমাদের সাহসকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আজ আমরা সেই নীরবতা ভেঙেছি।”
​তার গলা এই কথাগুলো বলেই থেমে গেল, তীব্র আবেগে তার চোখ ছলছল করে উঠলো। মোমরশ্মিটা নড়ে উঠলো, যেন সেও জাকিয়ার সাথে সেই গভীর কান্নাকে অনুভব করতে চাইল।
​বাতাস আবার একটু ঠাণ্ডা হয়ে উঠলো, যেন ভেতরের উষ্ণতাকেও গ্রাস করতে চাইল। ধুলো ভিজে যায়, কিন্তু মাঝখানে রাখা পুরনো পেনড্রাইভটা গলে যায় না, বরং সেই যন্ত্রের ভেতরেই একটি দাম্পত্যের মতো করে স্মৃতিগুলো সযত্নে সংরক্ষণ করা আছে, মুক্তির অপেক্ষায়।

​নূরনবী তখন উঠে দাঁড়ালো। তার হাত এক পুরনো কাঠের টেবিলের রুক্ষ পৃষ্ঠে রেখে সে বলল, তার কন্ঠস্বরে এখন আর ভয় নেই, আছে এক শীতল ইস্পাত-কঠিন সংকল্প।
​“আজ রাত যা-ই হোক, এইখানে এই আঁধারে আমরা সত্যকে বাঁচাবো।
এই ভিডিও আর ডেটা ছাড়া অন্য কোনো জায়গায় কেউ জানতে পারবে না আসল ঘটনা। এই শহর, এই বিশ্ববিদ্যালয়, এই দেশ— সবার জানতে হবে, এমন কী হলে আমরা নীরব থাকি? কী কারণে আমরা মাথা নিচু করে নিজেদের বিবেককে বলি দিই? আমাদের নীরবতা তাদের অপরাধকে বৈধতা দেয়, আর আজ আমরা সেই বৈধতা ছিন্ন করব।”
​এরপর সুমনা— হালকা ছায়ার প্লাস্টিক চেয়ারে বসে থাকা মেয়েটি তার নীরবতা ভেঙে দিল। তার কথাগুলো ছিল হাঁ করে ছুরি মারার মতো তীক্ষ্ণ, সরাসরি আঘাতকারী।
​“এই পেনড্রাইভে… প্রায় সাতচল্লিশ মিনিটের ভিডিও আছে। চারুকলা অনুষদের সেই ল্যাব থেকে গোপনে তোলা। আমার যে বন্ধুরা ছিল, তারা ভয়ে আমাকে বারবার বলেছিল— ‘ভালো হয় নাকি না তোর! এ সব ছেড়ে দে!’ কিন্তু আমি বলেছিলাম, সত্য একটাই: তারা যা করেছে, তার বিবরণ দেব, আমি মুখ খুলব। ভিডিওতে স্পষ্ট আছে— ব্যারিকেড ভাঙার শব্দ, পা ধরে টেনে নিয়ে যাওয়ার আওয়াজ, চিৎকার, লাঠির আঘাত, রক্ত, কান্না, এবং সব শেষে নদীর আঁকাবাঁকা পথে তাদের পলায়ন, তাদের কাপুরুষতা। সবাই বলল— জীবন বাঁচুক।
​&quot;কিন্তু… আমি বাঁচতে চাই না এই মিথ্যা আর ভয়ের চাপে। এই জীবন মূল্যহীন যদি সত্য না থাকে। আমি চাই, যারা নিজেদের ক্ষমতার ছাপ ফেলেছে, তারা জানুক তাদের সেই ছায়া আর দেশ-প্রেমিকের নয়, তারা হয়েছে ‘মানুষ হত্যাকারী’, আর তাদের এই অপরাধের জন্য কোনো ক্ষমা নেই।”
​মোমরশ্মি ক্ষণিকের জন্য ঝাপসা হলো, দেয়াল আরও ভিজে উঠলো, কক্ষটা যেন এখন পুরোপুরি বুঝতে পারল— স্মৃতি ফিসফিস করছে না, স্মৃতি চিৎকার করছে, ন্যায়বিচার চাইছে।
​তখন তাকবীর ভাইয়া— যার মুখে ছাঁচ পড়া বিরক্তি, আর চোখে নিরাপত্তাহীনতার দুশ্চিন্তা— তিনি বললেন,
“সময়ের সামান্য ক্ষতি হলেই তারা এই ভিডিওর অস্তিত্ব মুছে দেবে, যেমন তারা আমাদের ইতিহাস মুছে দিতে চায়। তাই আজ রাতেই এই ভিডিও পাঠাতে হবে— বাইরে, এমন এক ঠিকানায় যেখানে এটি চিরকাল থেকে যাবে, যেখানে তাদের হাত পৌঁছাবে না।
আমরা তিনটি মাধ্যম বেছে নেব: একটি নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, একটি নির্লিপ্ত ব্লগার নেটওয়ার্ক, আর একটি শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, যার মাধ্যমে একযোগে সব প্রকাশিত হবে।
সবকিছুতে FOIA-এর (Freedom of Information Act) মতো করে সমস্ত তথ্য প্রকাশিত হোক, যেন কেউ আর নীরব না থাকতে পারে, যেন সবাই শুনতে বাধ্য হয়।
আমাদের আত্মা মুক্ত হবে না, যতক্ষণ এই সত্য গোপন থাকবে, যতক্ষণ এই জঘন্য অপরাধের কোনো বিচার না হবে।”
​দরজাটি একবার নড়ে উঠলো, সামান্য একটু ঠাণ্ডা বাতাস ভেতরে ঢুকলো। মোম জ্বলে উঠলো আবার, ধুলো নড়ে উঠলো, আর চাঁদের আলো ভেতরে আরও তীব্রভাবে প্রবেশ করলো।
​কেউ আর কিছু বলল না।
​ফিরে পাওয়া ফাইলগুলো সযত্নে টেবিলে রাখা হলো। পেনড্রাইভ, নথি, চাঁদের হালকা ছায়া, আর পুরনো মেঝে— এই সমস্ত কিছু মিলে যেন এক অদ্ভুত সুরক্ষা কম্বল তৈরি করেছিল, যার ভেতরে ছিল মুক্তির বীজ।
​বাতাস যেন তখন এক নীরব সুর শোনালো। শান্ত, কিন্তু ভেজা। এক করুণ গানের মতো, নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর আর্তনাদময়, যা কেবল আত্মার গভীরতম স্তরে শোনা যায়।
​জাকিয়া গলা ভাঙা, কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল,
“আমরা যদি না বলি, কে বলবে? আমরাই তো শেষ সাক্ষী।
আমরা যদি ভয়ে চুপ থাকি, কে শোনাবে? আমাদের নীরবতা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পাপ।
এই শহরের দুষ্কৃতীরা যদি আজ বাঁচে— কলঙ্ক শুধু আমাদের নয়, তাদেরই, যারা ভয়কে অস্ত্র বানিয়ে মানুষ হত্যা করে, এবং যারা জেনে-শুনে নীরব থাকে, যারা সত্যকে চাপা দিতে চায়।”
​কেউ উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও ছিল না।
​নূরনবী, যার মুখে এখন শীতল দৃঢ়তা, আর চোখে প্রতিশোধের আগুন, সে হাত বাড়িয়ে মোমটা তুলে নিলো।
​“চলো,” সে শান্তভাবে বলল। তার কন্ঠস্বর ছিল চূড়ান্ত আদেশের মতো।
​“একদম রাত ৩:৩৩ মিনিটে, এই ভিডিও ছাপিয়ে, URL, HASH, PASSWORD— সব গোপনভাবে পাঠানো হবে। আমরা এমন এক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করব, যা তাদের প্রযুক্তির নাগালের বাইরে।
কেউ যদি এক ফাইল ডিলিট করে দেয়— অন্য ফাইল আছে, দশটা কপি আছে, মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে।
কেউ যদি জানালা ভেঙে তোলে— অন্য জানালা আছে, শত চোখ জেগে আছে, আমাদের পক্ষ থেকে পুরো পৃথিবী দেখবে।
কেউ যদি চেয়েও ধোঁয়া জমায়— আমরা ব্যাকআপ রাখবো, যুগের পর যুগ ধরে, এই সত্য কখনোই পুরোনো হবে না।
​&quot;আমাদের এই কাজ ভয় নিয়ে নয়, আমাদের ভালবাসা নিয়ে। ভালোবাসা সত্যের, আর সত্য কখনো মুছে যায় না, তা চিরন্তন। আজকের এই রাত হবে নীরবতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রথম জয়।”
​একেকটা প্রতিশ্রুতি, একেকটা সংকল্প যেন তাদের মনের গভীরে বাজতে লাগলো। তারা একে অপরের দিকে তাকালো, চোখে ছিল গভীর এক আস্থা।
​মোম একবার flicker করল, বাতাস ভেঙে গেলো, ধুলো ভিজে পড়ল।
​তাদের নীরবতা এক পাগল নীরবতা। সকলের চোখ জলের মতো ঝাপসা, কিন্তু সেই চোখেই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এক নতুন যুদ্ধের সংকল্প। কেউ আর বেশি কথা বলতে চাইল না, কারণ কথা শেষ হয়ে গেছে, এবার কাজের পালা।
​কিন্তু রাত আর অপেক্ষা করতে চায় না।
​তাই তারা মিলল চুপচাপ, এক গভীর কমটেড়ানো ঘুমের মতো, কিন্তু তাদের ভেতরের চেতনা ছিল পুরোপুরি সজাগ।
​ফিরে যাওয়ার পথে নূরনবী হাঁটে— হেঁটে মাটির নিচে কখনো পানি, কখনো কুয়াশা, যা তার জুতোকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। তার পায়ে পড়েছে গাছের শুকনো পাতা, যা প্রতি পদক্ষেপে মৃদু শব্দ করছিল। কোনো কণা অচেনা ধুলোর সাথে মিশে গেছে। সে অনুভব করে এই পথের ধুলো আর জল যেন তার ভেতরের ভয়ের সাথে বাইরের পৃথিবীর এক গভীর সংযোগ স্থাপন করছে।
​চন্দ্র যখন তার গায়ে শীতল, কিন্তু দৃঢ় আলো ফেলল, সে অনুভব করল— ভয় আর বিশ্বাস একসঙ্গে কাজ করছে, একে অপরের হাত ধরে। ভয় আছে, কারণ এই পথ বিপদসঙ্কুল; কিন্তু বিশ্বাস আছে, কারণ তারা সত্যের পথে হাঁটছে। তার মনে হলো, সে শুধু হাঁটছে না, সে ইতিহাসের এক নতুন পাতায় স্বাক্ষর রাখছে।
​আর আমি, লিখি না, বলি না— শুধু হেঁটে চলি। এই পথ, এই রাত, এই সমাবেশ— সবই এক বৃহত্তর সত্যের অংশ।
​রাত শেষ হয়নি।
সমাবেশও হয়নি শেষ।
আর সত্য— মোল্লাপড়া আঁধার নয়, আলো খুঁজে পেয়েছে, এবং সেই আলো এখন ছড়িয়ে পড়বে সারা বিশ্বে।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/247638/</link>
				<pubDate>Wed, 13 May 2026 15:56:06 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>রাতের গোপন সমাবেশ<br />
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন </p>
<p>​নূরনবী ধীরে ধীরে তার ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া হাত দুটো পকেটের আরও গভীরে ঢুকিয়ে দিল। এই শীতের রাতটি কেবল হাড়-কাঁপানো ছিল না, এর মধ্যে যেন মিশে ছিল এক চাপা ইতিহাস, যা এই শহরে দীর্ঘকাল ধরে লুকিয়ে আছে। গভীর শ্বাস নিতেই তার ফুসফুস শীতল, ধোঁয়াটে বাতাস টেনে নিলো— মনে হলো সেই বাতাস তার রুক্ষ গালগুলোকে কেবল স&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-247638"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/247638/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
		
	</channel>
</rss>